kalerkantho


গ ল্প

দাম্পত্যের ডালপালা

নাসরীন জাহান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



দাম্পত্যের ডালপালা

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

এইবার বাতি জ্বেলে দেয়ালে নিজের আচাভুয়ো আকৃতি দেখার চেষ্টা করে। ছায়া প্রস্ফুটিত হচ্ছে না, নিজেকে বাঁকায় আব্রাহাম, প্রসারিত করে নানা কায়দায় দেয়ালে মূর্ত হওয়ার চেষ্টা কেন করছে সে? তাই তো; বোদাই বোধে বিছানায় ফেরে।

শূন্য বিছানাটা তার মাঝে ফের উল্লাস তোলে। এ আমার একচ্ছত্র অধিকারের, পূর্বাশার নাম সে ঘুণাক্ষরেও মনে করতে চায় না।

একটা ডাইনি, পুরো বিছানাই প্রায় দখল করে ঘুমায়। একটা ধূসরতম ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায় মাঝে মাঝে আব্রাহামের সত্তায়, ওর ঘুমন্ত মুখের মধ্যেও একটা রাজা রাজা ভাব, যেন বলতে চায়, পূর্বাশা, দেখে যাও, আমি এই বিছানাটির একচ্ছত্র মালিক।

যাও যাও, বহুত হয়েছে। রীতিমতো হাত উঠিয়ে আব্রাহাম তাড়ানোর ভঙ্গি করে।

যখন সান্ধ্য ঢেউ ঘাগরা তুলছিল, গির্জায় গিয়েছিল সে, কী যে একটা প্রশান্তি! বরাবরই পেরেকবিদ্ধ যিশুকে দেখেছেন বিষণ্ন হয়ে, মেরির কোলে শিশুকে আত্মায় জীবন্ত অনুভব করতে চায়, আসে না। ফের গির্জা থেকে পূর্বাশায় বাঁক ঘুরে যায়।

ডাইনি।

তোর জন্য ধর্ম বদলেছি, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া গিয়েছি।

হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই।

দুজনের পরিচয় অফিসে, সেখানেই অন্তরঙ্গতা—সে কত যুগ আগের কথা। যেন যুগ নয়, সীমাহীন সময়ের ওপর দরদর মাকড়সা উড়ে জাল বিস্তার করে। জেনেছিল একজনের বাড়ি তেঁতুলিয়া, আরেকজন টেকনাফ—এই সিলটাই কেন যেন দুজনকে দুর্মরভাবে এক করতে আনুভূতিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু এ জন্য ওকে ডাইনি ভাবছে না, গতকাল মার্কেটের হাজ্জাত মনে পড়ায়—। ভাবনা কী যে এক লাগামহীন ছেঁড়া ছেঁড়া সুতোর মতো, একটা ভেবে টেনে শেষ করার আগেই এক রকম অনুভূতি হতেই আরেকটা এসে সেটাকে টেনে অন্য মোড়ে নিয়ে যায়। কী এক ঠাণ্ডা জলজ শব্দে চারপাশে তাকায়, না কিছু না, তার তৃষ্ণা পেয়েছে।

পানির বোতলটা রোজ স্ত্রীই সাজিয়ে রাখে। না, আজ পানি নেই বলে স্ত্রীকে মিস করার প্রশ্নই আসে না।

সে লিভিং স্পেসে যায় বিড়াল পায়ে।

স্ত্রী যেন ঘুণাক্ষরেও এই পানিহীনতার কথা ভেবে মজা না পায়।

সপ্রতিভ কিন্তু সাবধানে ছিটেফোঁটাও শব্দ না করে কিভাবে যে সে বোতলটা আনল এবং গলায় ঢকঢক করে ঢালল, নিজ সাফল্যে আব্রাহাম নিজেই বিমোহিত হয়।

বিয়ের সময় কত কথা, আমরা প্রথাগতদের মতো করব না, বিয়েবার্ষিকীতে বরের দেওয়া জীবনানন্দ পেয়ে কী উচ্ছ্বাস পূর্বাশার! ধীরে ধীরে মনে হলো, হাজব্যান্ডের সামনে এত আনকমন থাকার দরকার নেই।

নিশ্চয়ই এই মনে করেছে, কী আমূল বদলগুলোই না হতে থাকল, এই তো গতকাল জীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে মার্কেটে গিয়ে, এই দেখো তো—একটা নেকলেসও পছন্দ হচ্ছে না, আমাকে হেল্প করো না। বলে শেষমেশ দুজনের হাজ্জাত বেধে সব মাটি হয়ে গেল। কথা তিল থেকে তাল হলো। গয়না কিনবে হাজব্যান্ডের পকেট খুইয়ে, ফের চাপা ক্রোধের ধারা স্রোত অবয়ব বয়ে যায়, আবার বলে কি না তুমি তো আমাকে গিফট দিতেই চাও না, বরং আমি পছন্দ করে নেব, এতে তোমার ঝুঁকিতে পড়তে হলো না। কিন্তু হাজব্যান্ডেরও যে গিফটের দরকার—ক্রোধ উজ্জীবন প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই নিজেকে বিন্যস্ত করে, প্রতিবারই তো সে তোমাকে দেয় কিন্তু এইবার? পূর্বাশা কী সুন্দর যুক্তি দাঁড় করাল, পঞ্চাশতমতে স্ত্রী হাজব্যান্ডকে কিন্তু দেয় না, এত বছর সুন্দরভাবে সংসার আগলে রাখার জন্য এটা স্ত্রীরই প্রাপ্য— এটাই নিয়ম।

এ নিয়ম কে চালু করেছে? কোত্থেকে পেল সে এ কথা? এমন নিয়মের কথা সে কোথাও শোনেনি, কাউকে জিজ্ঞাসা করবে এই স্পৃহাও জাগেনি, নিজের দাম্পত্যের কথা কাউকে জানাতে আলফ্রেড পছন্দ করে না। কী সুন্দর রৌদ্র গানের মতো বয়ে যায় পূর্বাশার বচন—কোনো দিন কাউকে দাম্পত্যের দুরবস্থা জানাতে নেই, মাঝখান থেকে স্বামী-স্ত্রীর মিল হয়ে গেলে বন্ধুদের মাঝখানে তো খারাপ স্মৃতিটা রয়ে যায়।

ভেতরটা আচমকা উদ্ভাসিত হয়ে যায়, পূর্বাশাকে ডাকব, উল্টো আমিই স্যরি বলব—ভাবতে ভাবতেই উদ্ভাসিত প্রচ্ছায়ায় আত্মার সমস্ত ঘুপচি ভরে যায়। না না, ও একটা স্বার্থপর, দুধর্মেই আমাদের বিয়ে হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে মুসলিম সবাইকে জানিয়ে হয়েছিল, কিন্তু গোপনে খ্রিস্টান রীতির বিয়েতে পূর্বাশা মেরি, যিশুকে কত সম্মানই না করল। এরপর দেখো, গির্জায় যাওয়ার চিহ্ন পর্যন্ত নেই, হাজব্যান্ডকে ঠিকই নানা ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠান করিয়ে ছাড়ে।

না না, আমি আর ওর সঙ্গে সংসার করব না—হৃদয়ের ভুঁই ফুঁড়ে যেন বাক্য নয়, আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। জীবনের এই পর্যায়ে সুহৃদরা যা বলবে, এ নিয়ে কিছু ভাববে না। এই পর্যায়ে এসেই অনুভব হলো, একটাই জীবন। আব্রাহাম বলবে, বাকি জীবনটা নতুন করে বাঁচি। এই যন্ত্রণাকাতর উথাল-পাথাল জীবনকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই।

পূর্বাশা প্রথাগত উচ্চাভিলাষী, স্বার্থপর ও লোভী হয়ে গেছে। ভেতর থেকে একটি উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস উঠে তার মুখটাকে ছায়া করে দেয়।

আত্মার তীব্র বজ্রস্বর নিজ সত্তায়ই অসহ্য ঠেকছে। বিয়ের পর আগে অরণ্যে গিয়েছিল, তখন এসে ন্যাশনাল পার্ক বলতে বাধত আব্রাহামের। কিন্তু পাতাঝরা সেই অরণ্যে গিয়ে ভেতরটায় হালকা বিষাদ এসে দুজনের সান্নিধ্য মজায় ফের তা পিছলে পড়েছিল। তখন সময় কই গার্ডেন দেখার।

দুজনের অফুরন্ত কথা বলা, টিফিন বক্সে নিয়ে যাওয়া খাবার কী উন্মাদনার মধ্যেই না কাটিয়েছিল সারা দিন।

অথচ বিয়ের বছর পর ফের গিয়ে অরণ্যকে সবুজে ফুলে পুষ্পিত পেয়েছে, কী তার সৌন্দর্যের ভঙ্গিমা, কিন্তু তারা দুজন ঘণ্টাতেই হাঁপিয়ে উঠেছিল।

এই-ই প্রেমজীবন আর দাম্পত্যজীবনের পার্থক্য। দাম্পত্য একে অন্যকে ঘরে পেয়ে খুবলে খুবলে নিঃসাড় করে দিয়ে এ কল্পনাটা বোধের মধ্যেও আনতে দেয় না, একটা আস্ত দীর্ঘ জীবন দুজনের একসঙ্গে কাটাতে হবে। নিজেদের একটু জমিয়ে বিন্যস্ত করে সমঝে চলি।

ফের গায়ের পশম খাড়া খাড়া আর ভেতরটা রিরি বোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ে, কী সুন্দর অনায়াসে পূর্বাশা কত বছর ধরে পাতলা রং ওঠা, অনেক সময় ছেঁড়া মেক্সিগুলোও আমার সামনে পরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ায়।  

 

ফুত্কারে নিভে যায়, আমি নিজেও তো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লুঙ্গিটা পরে দেহে আরামের মৌজ নিই ওর সামনেই। ফের ধীরে ধীরে অন্য এক বোধের অটুট সত্যতায় উপনীত হয়। আসলে বিয়ের এত বছর পর এগুলো দাম্পত্যে কোনো গুরুত্ব রাখে না।

তখন জীবনের অর্থ বিবর্তিত হয়ে আরো অনন্ত গূঢ়তায় চলে যায় দাম্পত্য।

কী গূঢ়তায়?

উত্তর মেলে না।

রাত ক্রমেই প্রলম্বিত।

বাড়ি বানানোর সময় লিভিং স্পেসের পাশে ইঞ্জিনিয়ারের ভুলে একটি জায়গা বেরিয়েছিল। পূর্বাশা এটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে অভিমান রুম নাম দিয়েছিল এর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাগ হলে আব্রাহামই ওই রুমে ঘুমাতে যায়, কিন্তু আজ আব্রাহাম অনড় ছিল। কিচ্ছুর বিনিময়ে এই খোলামেলা সাজানো বেডরুম সে ছাড়বে না, এ কারণে ছুটে গিয়ে সে পূর্বাশার চোখের শনি মদ নিয়ে বসেছে। মদের সঙ্গের উপকরণ সাজিয়ে এমন আয়েশ করে বসেছিল সে...। কিন্তু পূর্বাশা ওই ঘরে যাওয়ার পর অনভ্যাসে পানের ইচ্ছাটা চলে যায়।

কিন্তু সে পান করে যাচ্ছে দরজা আটকে, যত ভাববে পূর্বাশা দাবাগ্নিতে ওর ঘুম আসবে না। আলফ্রেডের আত্মার মধ্য দিয়ে একটা শান্তির শীতল জল বয়ে যায়।

পূর্বাশা নামটা আব্রাহামই দিয়েছিল, এ নামে শুধু আব্রাহাম ডাকে। নিজের নাম বিচ্যুত হওয়ায় তার স্ত্রীর অন্তত আব্রাহামের কাছে তার খারাপের চেয়ে ভালো লাগা বোধ হয়েছিল।

কেননা তার নিজের কাছেই তার নামটা মান্ধাতা আমলের তো বটেই, শুনতেও খারাপ লাগে।

অদ্ভুত এক বিষাদের ছায়া ঘুরে যায় মাথার ওপর আসন দিয়ে। আজ বিয়েবার্ষিকী। তাও পঞ্চাশতম। অন্য বছরগুলোতে রাত ১২টায় কী হুজ্জোতই না করে তারা। আগে সমস্ত আয়োজন করত তাদের কন্যা। সে থেকেই সেলিব্রেশনের অভ্যাস মূলত। এবারও কন্যা বিদেশ থেকে স্কাইপে ফোন দেবে। এই ভাবনাটা স্ফুলিঙ্গের মতো মাথাকে বিদ্ধ করে। অথচ কিছু আগে আবেগটা যখন এক ফালি নরম হয়েছিল শূন্য শয্যা হুহু করে উঠেছিল, ওয়ার্ডরোব থেকে পূর্বাশার একটা জামা এনে সেট করে পূর্বাশার শোয়ার জায়গায় দিয়েছিল। গত বছর মেয়ে ছিল না, পূর্বাশাই নিভৃতে আয়োজন করে তাকে একটা সুন্দর শার্ট প্রেজেন্ট করেছিল। কেন যে ক্রোধের সময় নস্টালজিক কথাগুলো মনে পড়ে না।

রাত কয়টা বাজে?

আচমকা দেহে বিদ্যুতের প্রবাহ হয় যেন। দিব্যি মেয়েটার সঙ্গে তার মা একা কথা বলে, মদ খেয়ে সে ঘুমাচ্ছে—এসব নানা প্রতিফলন মেয়ের সামনে তুলে ফোন রেখে দিয়েছে। রাত ১২টা তো কত আগেই পেরিয়েছে নিশ্চয়ই। মাথার দুই পাশটা দপদপ করে। এমন কাজটা করতে পারল পূর্বাশা?

কোনো দিন রাগ-অভিমান নিয়ে পূর্বাশা তাকে আলতো চুমু খেতে পারেনি, অভ্যাসে যা মাঝেমধ্যেই দুজন খায়, কোনো গিফট নিতেও পারে না, দিতেও না, কিচ্ছুর বিনিময়ে না। এমন অনেক অভ্যাস তাদের দুজনের মধ্যে আছে। নেকলেসটাও শেষমেশ কেনেনি, ক্রোধ ডুবন্ত আব্রাহামের তা ভালোও লেগেছিল।

এখন অশরীরী এক ছায়া অস্ত্র বাগিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। রোমকূপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কষ্ট তার অজানা-অসহায় বিপন্নতা নিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলতেই পূর্বাশার হাস্য উদ্ভাসিত মুখ কন্যা দিপিতার ফোন, আমাদের দুজনকে একসঙ্গে না দেখে কী রাগ, বলেই একটা প্যাকেট খুলে আব্রাহামের জন্য একটা আংটি বের করে এক হাতে ল্যাপটপ অন্য হাতে আংটিটা এগিয়ে দেয়, ডান হাতটা বাড়াও, মেয়ে দেখুক।

আহা নেকলেস!

ভেবে গভীর বিষাদে ঢোকার আগেই ঝনঝন করে পূর্বাশার কণ্ঠ, দিপিতাকে বলে, এতক্ষণ আমরা একসঙ্গেই ছিলাম আর আমার পছন্দের নেকলেসটা আগামী সপ্তাহে বানিয়ে দেবে তোমার বাবা। তোমাকে তো বলেছিই মা। শুধু কি মেয়েকে দেখাতেই এই আপসের নাটক? না, আব্রাহাম পূর্বাশার সত্তার শিরা অবধি জানে। অবশ্য মেয়ের ফোন তার ভেতর থেকে সব মেঘ সরিয়ে দিয়েছে।

ল্যাপটপ নিভে যায়। কী এক অজানা বোধে দেহ থেকে মুছে গিয়ে আত্মার প্রজ্বালনে একজন আরেকজনকে আমূল জড়িয়ে ধরে।


মন্তব্য