kalerkantho

গ ল্প

দূরের ভুবন

ইসহাক খান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



দূরের ভুবন

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

শরতের ঝলমলে আকাশ। কোথাও খণ্ড খণ্ড পেঁজা পেঁজা সাদা মেঘ।

শিল্পীর আঁকা স্থিরচিত্রের মতো। নিখাদ সেঁটে আছে গাঢ় নীল আকাশে। আবিদ হাসান মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটি অনেকক্ষণ একা একা উদাস চোখে তাকিয়ে দেখে। কিন্তু তার কাছে মোটেও মনোমুগ্ধকর মনে হচ্ছে না। বিষণ্নতার অতলে তলিয়ে নিজের জীবনের অসহায়ত্ব মেলাতে বারবার মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজেকেও অন্তহীন ভাসমান মেঘ মনে করে আকস্মিক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে শব্দ করে। শুধুই মনে হচ্ছে মেঘগুলোর মতো তার জীবনও স্থির-ভাসমান। উড়ছে না। গতিহীন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও ওই নিষ্প্রভ মেঘগুলোর মতো নিষ্প্রাণ অর্থহীন মনে করে আবিদ হাসান শূন্যে নিজের অস্তিত্ব খোঁজে। অনন্ত শূন্যতার মধ্যে তার জীবন যেন ওই মেঘগুলোর মতো গতিহীন, অস্তিত্বহীন, থেমে আছে।

আবিদ হাসান কিছুতেই নিজের মধ্যে এতটুকু স্থির, এতটুক স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে না। অস্থিরতার সুচালো তীব্র দংশন তাকে শুধুই মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্ষা তার জীবনে আর ফিরে আসবে না। একজন বাঙালি কবির কোনো একসময় পড়া সেই কবিতাটা বারবার মনে ভেসে উঠছে, ‘নারীরা ফেরে না—এই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া। ’ যদিও না ফেরার কথা বর্ষা কখনো বলেনি। সে বলেছে, সে আবার ফিরে আসবে, অবশ্যই আসবে। জোর দিয়ে বলেছে। আবিদ হাসান বর্ষার কথা বিশ্বাস করতে চায়। মনের মধ্যে বর্ষার ফিরে আসার অঙ্গীকার বিশ্বাসের গাঢ় রঙে রাঙাতে চায়। ভালোবাসার চালুনিতে ছেঁকে ছেঁকে বর্ষার কথাগুলো নিজের মতো তার অতৃপ্ত জমিনে সাজাতে চায়। কখনো অন্যের ভালোবাসা মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আবার সে বিমর্ষ, বিরহকাতরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কিছুতেই নিজের কাছে বর্ষার কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। শুধুই মনে হয় বর্ষা যা বলেছে, সবই কথার কথা। সবই তাকে খুশি করার জন্য। বর্ষা তার জীবনে আর ফিরবে না।

তাদের বিয়ের বয়স দুই বছর পুরো না হলেও কাছাকাছি। এই দুই বছরে বর্ষাকে যেমন দেখেছে, এত কাছে থেকে দেখেছে যে অনেক নির্মোহ-নিরাসক্ত জটিল মুহূর্ত সে অনায়াসে মেনে নিয়ে বর্ষাকে খুশি দেখতে চেয়েছে। বর্ষা তবু নির্বিকার। এখন বলছে বটে সে আবার ফিরে আসবে; কিন্তু তার মনের অভ্যন্তরে না বলা কথা আবিদ হাসান অন্তর্দৃষ্টিতে পাঠ করে জেনে নিয়েছে, বর্ষা আর ফিরে আসবে না। কিছুতেই আসবে না। সে আসলে নিরাপত্তার ভাবনায় এ ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। সে জানে, আবিদ হাসান চাইলে যেকোনো মুহূর্তে এ রকম শত শত বর্ষাকে সহজে সুদূরের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারে। তার মতো আকাশছোঁয়া ক্ষমতাধর মানুষটিকে সে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়নি। তাতে অনাহৃত অস্থিরতা সব কিছু গ্রাস করে ফেলবে। সোনার শিকল ছেড়ে তার বদলে ভারী-শক্ত লোহার শিকল দুপায়ে জড়িয়ে যেতে পারে। তাই তার এমন সহজ স্বীকারোক্তি, এক ধরনের পুতুল-পুতুল ছেলেখেলা। যে খেলা মন চাইলে অনায়াসে ভেঙে ফেলা যায়। বর্ষা এ-ও জানে, এটা সত্যের অপলাপ, প্রিয়জনের চোখে ধুলা দেওয়ার শামিল। কিন্তু বর্ষা আসলে নিজের কথিত মুক্তির জন্য দুপায়ে বাঁধা সূক্ষ্ম সোনার শিকল খুলে মুক্তির আস্বাদ নিতে চায়। তাই সে কৌশলী হতে চেয়েছে।

শত সহস্র জটিল গিঁট যে আবিদ হাসান চোখের নিমেষে খুলে ফেলতে ও একই কায়দায় গিঁট দিতে অনায়াসলব্ধ, এককথায় নিপুণ অভ্যস্ততায় সিদ্ধ। সে কিনা বর্ষার মতো সাধারণ বালিকার, আবিদ হাসানের চেতনায় বর্ষা এখনো সেই ছোট্ট সরল বালিকা—তার সহজ-সরল কাঁচা হাতের সাজানো কৌশল আবিদ হাসানের না বুঝতে পারার ব্যাপারটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ব্যক্তিজীবনে আবিদ হাসান নিস্পৃহ, নিরাসক্ত, জটিল ধরনের। কিন্তু বর্ষার সহজ কৌশল সে সহজভাবেই মেনে নিয়ে বর্ষাকে খুশি করতে গিয়ে তার ভেতরের জটিল ক্ষুব্ধ মানুষটির কণ্ঠ ভয়ংকরভাবে চেপে ধরে রাখে। সেটা সে যেদিন বর্ষাকে বউ করে ঘরে এনেছে, সেদিন থেকেই তার এমনটা শুরু, ভেতরে আর বাইরে তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তবু তো শেষরক্ষা হলো না। এত কিছুর পরও বর্ষা তার হয়নি। একরাশ অন্ধকারের মতো জীবনের চারপাশ আবিদ হাসান প্রগাঢ় নিঃসঙ্গতাকে নতুন করে আবিষ্কার করে। সে বিষণ্নতার অতল থেকে নিজেকে উত্তোলিত করতে চায়। জমাটবাঁধা শরতের পেঁজা পেঁজা সাদা মেঘের মতো নিঃসঙ্গতায় ভাসিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেতে চায়। শূন্যে, একদম নিঃসীম শূন্যে। যেখানে নিজের বলে কিছু থাকে না। যেখানে নিজের বলে কেউ কিছু দাবিও করে না। এমন শূন্য চরাচরে, নিস্তরঙ্গ জীবনে সে মিশে যেতে চায়। এই অস্থির চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব আবিদ হাসানকে তীব্র দহনের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে।    

তার চেতনাজুড়ে শুধু বর্ষা। তার বর্ষা তাকে ছেড়ে চলে যাবে। আগামীকাল সকাল ১০টায় তার ফ্লাইট। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা! বর্ষা যেন মুক্তির আনন্দে ছটফট করছে। অস্থির প্রজাপতির মতো উড়ছে। পুরো সপ্তাহ এ মার্কেট-সে মার্কেট ঘুরে বেড়িয়েছে। মনের মতো কেনাকাটা করেছে শেষবারের মতো। আবিদ হাসানই তাকে এ ব্যাপারে বেশি উৎসাহ জুগিয়েছে। বর্ষা তাই দুর্বার, ছুটছে তার মতো। দুপুর না গড়াতেই সে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। শেষ কেনাকাটা। কোনো কিছু যেন ভুল না হয়। বাদ না পড়ে প্রিয় কোনো জিনিস। আবিদ হাসান জেনেবুঝে সব মেনে নিয়েছে। এই তো, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা! তার পরই একজন আরেকজন থেকে আলাদা। ভিন্ন জীবন। ভিন্ন স্বপ্নে বিভোর হবে। আর তো এভাবে কখনো বর্ষাকে কাছে থেকে দেখা হবে না। তাহলে বর্ষার শেষ ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে কেন? 

আবিদ হাসান শরতের গাঢ় নীলাকাশ দেখে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

অনেক দিন পর সে ছাদে উঠেছে। চারপাশ খোলা বিশাল ছাদজুড়ে টবে সাজানো হরেক রকমের বাহারি ফুল। রংবেরঙের ফুল বাতাসে দুলছে। এগুলো সে নিজে সুচ দিয়ে রুমালে ফুল তোলার মতো টুকটুক করে নিজের হাতে সাজিয়েছে। তার ভীষণ প্রিয় সাদা গোলাপ। যে চারাগুলো সে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এনেছে। বাগানের মধ্যভাগে টবে দুলছে লতার মতো।

বর্ষা বেরিয়েছিল শরতের ঝলমলে রোদমাখা বিকেল মাথায় নিয়ে, ফিরল রাতের মায়াময় পেলবতা জড়িয়ে। শান্ত স্নিগ্ধ সুউচ্চ প্রাসাদোপম বাড়িটা নানা রঙের মায়াবী আলোতে জ্বলজ্বল করছে। এত আলো-আঁধারির খেলা এখানে, বর্ষার এত চেনা ঘর, তার পরও ভীষণ অচেনা মনে হয়। আজ অবশ্য এত কিছু দেখার অবকাশ নেই বর্ষার। আজ তার অসম্ভব ব্যস্ততা। যেন সে অসীম ব্যস্ততার মধ্যে ডুবতে ডুবতে সুড়ঙ্গের তলদেশ থেকে এতটুকু আলো ছিটকে বেরোতে দেখে পুলকিত বোধ করে। আর কয়েক ঘণ্টা পর সে এই দুর্গ থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি পেতে যাচ্ছে। মুক্তির আনন্দে সব কিছু এই প্রথম তার কাছে রঙিন হয়ে ওঠে। এতটা রঙিন তার কাছে আগে কখনো মনে হয়নি। সে প্রথমবারের মতো আবিদ হাসানের প্রাসাদোপম বাড়িটার দিকে গভীরভাবে খেয়াল করে। প্রথম যেদিন এই বাড়িতে বউ হিসেবে ঢোকে, সেদিন আর আজ যেন যোজন যোজন দূর। সেদিন গোটা এই প্রাসাদটা তার কাছে পাহাড়ের ভেতর ভয়ংকর এক গুহা মনে হয়েছে। আজ এক-একটা দরজা যেন অনায়াসে খুলে যাচ্ছে—আর বর্ষার কাছে মনে হচ্ছে গুহার অভ্যন্তরে সে যেন অনন্তকালের জন্য ঢুকে বন্দি হয়েছিল।

জীবনযুদ্ধে কেউ কেউ সহজেই বিজয়ের সিঁড়ি পেয়ে যায়। যেন বিজয় বড়ই নিরুদ্বিগ্ন। সহজলভ্য। অনায়াসে মিলে যায় সব। আবার কারো কারো জীবনে বিজয় বড়ই দুর্লভ। তারা চড়াই-উতরাই ভাঙতে ভাঙতে ক্লান্ত-বিষণ্ন হয়ে দিনের আলোতেও পথ হাতড়ে ফেরে। আবার কেউ কেউ হোঁচট খেতে খেতে, তার পরও মেরুদণ্ড সোজা করে বুক দিয়ে পাহাড় ঠেলে ঠেলে সামনের বাধা পেরোয়। সে এক কঠিন অসম যুদ্ধ। সে যুদ্ধে পথ কাটতে কাটতে কত প্রাণ পথেই নিঃশেষ হয়ে যায়। সবাই নয়, কেউ কেউ শেষ দাগ ছুঁতে পারে। তেমন বিরল মানুষদের গল্প আমরা কখনো কখনো হাতের কাছে সহজে পেয়ে যাই। আবিদ হাসান, চল্লিশোর্ধ্ব দাগ ছোঁয়া একজন বিজয়ী বীর। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে একটু একটু করে নিজেকে টেনে তুলেছে ওপরে। অনেক ওপরে। যাকে বলে প্রতিষ্ঠার স্বর্ণ শিখরে।

গ্রাম থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী যুবক আবিদ হাসান, তার চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। দুপায়ে আগাছা মাড়িয়ে তাকে পথ চলতে হয়েছে। বেকার জীবন কতটা দুঃসহ আবিদ হাসানের চেয়ে আর কে ভালো জানে। কী করেনি সে। এমএ পাস করে শুধু বেঁচে থাকার জন্য মোট বয়েছে বাসস্টেশনে। টিউশনি করেছে। সুদূরের আশায় মালিকের মেয়ের কাপড় পর্যন্ত কেচেছে। একগাদা ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর বিনিময়ে আবিদ হাসান পুরনো শহরের একজন ভুসিমালের ব্যবসায়ী হাজি জুলহাস ব্যাপারির বাড়িতে থাকা-খাওয়ার পাকা বন্দোবস্ত করে ভেবেছে, এবার বুঝি ভাগ্যের সোনালি সিঁড়ি ধরা দেবে তার কাছে। না। তা হয়নি। তাকে আবার পথে নামতে হয়েছে।

ঘটনাটি মজার। দুঃখের মধ্যেও আবিদ হাসান ঘটনাটিকে মজা হিসেবেই দেখে। একা একাই কৌতুক বোধ করে। হেসে ফেলে মনে হলেই।

মেয়েটির নাম শাহানা। নবম শ্রেণিতে পড়ে। বয়সের চেয়ে বেড়েছে শরীরের আকার। প্রথম দিনই আবিদ হাসান ভীষণ অবাক, যখন সে জানল শাহানা নবম শ্রেণিতে পড়ে। আবিদ হাসান ধরে নিয়েছিল নিদেনপক্ষে সে অনার্সে পড়ে। শ্যামলা রঙের মেয়েটির উপচানো বুক। চোখের ভাষায় তারার ঝিলিক। শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠেছিল আবিদ হাসান। ওই চোখে অচেনা আহ্বান। খেয়ালি হাসি তাকে আরো নাস্তানাবুদ করে তোলে। যখন সে জানতে পারে, ওই মেয়ে তার ছাত্রী। নাম শাহানা। নবম শ্রেণিতে পড়ে। দুবছর হলো একই ক্লাসে আছে। এর আগেও সে একইভাবে ক্লাস ডিঙিয়েছে। আবিদ হাসানের বিস্ময় যেন ঝরে ঝরে পড়ে। বেশি অবাক তার শরীরের বাড়ন্ত অবস্থা দেখে। যেভাবে সে বুকের ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ডাঁসা বুকজোড়া সামনে ঠেলে দিয়ে বসে, তাতে চোখ এমনিতে চকচক করতে থাকে। আবিদ তাকে ঠিকঠাক হয়ে বসতে বলতে পারে না। যদি সে ভাবে, স্যার তার দিকে তাকিয়ে শরীর গিলছে। যদি সে তার বাবা হাজি জুলহাস ব্যাপারিকে বলে দেয়? চাষাড়ে স্বভাবের ভুসিমালের ব্যবসায়ী হাজি জুলহাস ব্যাপারি মেয়ের অভিযোগ শুনে কতটা চাঁচাছোলা গালাগাল ঝাড়তে পারেন—সেই ভয়ংকর গালাগালের কথা ভেবে আবিদ হাসান নিঃশব্দে ভেতরে ভেতরে ঘেমে অস্থির হতে থাকে।

সেই ভুসিমালের ব্যবসায়ীর কল্যাণে আবিদ হাসান দিন দিন উপরে উঠতে থাকে। তার কাছেই বড়লোক হওয়ার তরিকা জেনে নিয়েছে। কিভাবে মানুষকে ঠকাতে হবে, কিভাবে ফাঁকি দিতে হবে, প্রয়োজনে মানুষ নিয়ে কিভাবে ব্যবসা করতে হবে। খুন করার দরকার হলে হাসতে হাসতে খুন করতে হবে। এসব তরিকা মেনেই  আজকের আবিদ হাসান। সোজা পথে কেউ এত সম্পদশালী হতে পারে না। বাঁকা পথে গিয়েই আজ সে ব্যাপক ক্ষমতাধর। বিরাট অর্থশালী। তার ইঙ্গিতে ঘাট অঘাট হয়। আবার অঘাট ঘাট হয়। সেই মানুষটি জোর করে তুলে এনে বিয়ে করা স্ত্রীকে স্বেচ্ছায় বিদেশ পাড়ি জমানোর পথে লালগালিচা বিছানোর ব্যাপারটা কোনোভাবেই মিলছে না। কী হলো মানুষটির? যার এত ক্ষমতা সে কি না নির্বিষ ঢোঁড়া সাপের মতো শীতল হয়ে আছে। শুধু কি তাই! তার ভেতরের ক্রোধ-ক্ষোভ কোনোভাবেই বাইরে আসতে দিচ্ছে না।

রাতের খাবারটা তারা একসঙ্গে খেল। খেতে খেতে আবিদ তাকে আরো প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিতে বলল। সঙ্গে টাকা আরো লাগবে কি না—সেই প্রশ্নে বর্ষা শুধু বলল, ‘টাকা আর লাগবে না। ’

‘লাগবে। বিদেশবিভুঁইয়ে দরকারে কোথায় টাকা পাবে?’

বর্ষা বলে, ‘আমার মামা আছে না?’

আবিদ বলে, ‘মামা ছিল। যত দিন তুমি বিয়ে করোনি। যেই তুমি বিয়ে করেছ তখন কেউ আর তোমার আপন নয়। অন্তত টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে। বিদেশে যাওয়া মানে এক ধরনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি সেই রকম হওয়া চাই। তুমি কোনো সংকোচ কোরো না। তোমার যাত্রা সুন্দর করতে যা যা করা দরকার সব আমি করব। তুমি শুধু তোমার প্রয়োজনের কথা বলবে।

এ ধরনের কথা আবিদের মুখে বর্ষা অজস্রবার শুনেছে। বর্ষাকে খুশি করতে আবিদ সব কিছু হাসিমুখে নির্দ্বিধায় করেছে। কিন্তু বর্ষাকে খুশি দেখেনি কখনো। শুভ্র ফুলের মতো মিষ্টি বর্ষা মুখটা বরাবরই তেতো বানিয়ে রাখে। আবিদ প্রথম প্রথম এই নিয়ে কিছু রাগী ধরনের কথা বললেও এখন আর কিছু বলে না।

একবারই কষে একটা চড় মেরেছিল বর্ষার ফর্সা গালে। রাগ সংযত করতে পারছিল না আবিদ। দুবাই থেকে আনা ফুলদানিটা আবিদের চোখের সামনে আছাড় মেরে ভেঙে ফেললে আবিদের মনে হয় তার হৃদয়টাই ভেঙে ফেলল বর্ষা। কষে এমন চড় মেরেছিল মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল বর্ষা। আবিদ আবার নিজেই ডাক্তার ডেকে বর্ষাকে চিকিৎসা করিয়েছে। এক চড়ের খেসারত দিয়েছে হাজার টাকায়। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি আর করেনি আবিদ। চেষ্টা করেছে সম্পর্ক উন্নয়নের। হয়নি। বর্ষা কোনোভাবে নিজেকে ধরা দেয়নি। ভালোবাসা সোনার হরিণ হয়ে আছে আবিদের কাছে। আবিদ একজন স্ত্রীর কাছে স্বামীর প্রাপ্য সামান্যই পেয়েছে। ওইটুকুতে তার পোষাচ্ছে না। তার চেয়ে নিঃসীম শূন্যতায় গভীরভাবে ডুবে থাকাও অনেক স্বস্তির। এক জীবনে অনেক পেয়েছে সে। বাকি জীবন সেই স্মৃতির জাবর কেটে পার করে দেওয়া আবিদের জন্য কোনো কঠিন কিছু না।

বর্ষার রাত নির্ঘুম কাটছে। বারবার সে ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে। যে মানুষ তার মতো বর্ষাকে মুচড়িয়ে দলা পাকালেও কোনো শোর উঠবে না। সেই মানুষ এত সহজে তাকে মুক্তি দিতে চাইছে কেন? নিশ্চয়ই তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। এত সহজে ছাড়ার পাত্র সে নয়। কতবার যে এই মানুষটি যমদূতের চেহারা নিয়ে বর্ষার সামনে হাজির হয়েছে। কতটা ভয়ংকর সে হতে পারে বর্ষা ছাড়া আর এত ভালো কেউ জানে না। বর্ষা কান খাড়া করে শুয়ে আছে। সামান্য শব্দ হলে বেডসুইচ টিপে লাইট জ্বালে। না। কেউ নেই। তার মনের ভ্রম। এই ভ্রমেই তাকে বেশি পেয়ে বসেছে। একবার সে নিজেকে নিশ্চিত করতে উঠে পায়ে পায়ে আবিদের রুমে যায়। লোকটি নিদ্রায় মগ্ন। এতটা মগ্ন যে ভূমিকম্প তাকে জাগাতে পারবে না। আশ্বস্ত হয়ে বর্ষা ফিরে ঘুমের কোলে ঢলে পড়তে চেয়েও পারছে না। মানুষটির এমন মগ্ন ঘুম তাকে মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে। তাহলে বর্ষা যা ভেবেছে, তা নয়। মানুষটির মনে কোনো উদ্দেশ্য নেই। সরলরৈখিকভাবে সে চেয়েছে বর্ষা তার মনের পরিবর্তন করে ফিরে আসুক। কিন্তু বর্ষা তো ভেবে রেখেছে সে আর ফিরবে না। একবার আমেরিকা গেলে সে ফেরার নামটি মুখে আনবে না। আবিদ এখানে বাঘ-সিংহ হলেও আমেরিকায় সে বিড়ালও না।

যে চোখে আগ্নেয়গিরির লাল টকটকে আগুন দেখেছে বর্ষা—সেই চোখ হেমন্তের আকাশের মতো শান্ত, বর্ষার আকাশের মতো ভেজা। বিদায়বেলায় আবিদ খুব নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলে, ‘ভালো থেকো। ’ জবাবে বর্ষা কিছু বলবে, হাত তুলে আবিদ তাকে থামিয়ে বলে, ‘তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি সব জানি। তুমি আর ফিরবে না। আমি কারো মিথ্যা সান্ত্বনা পেতে চাই না। আমার ভালোলাগা আমি খুঁজে নেব। তুমি ভালো থেকো। আমাকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ’ বলতে বলতে আবিদ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু দৃশ্যটি বর্ষার চোখ এড়ায় না। আবিদের চোখে জল। এই প্রথম একজন লৌহকঠিন মানুষকে সে কাঁদতে দেখল। বর্ষা খুব শান্ত ও স্বাভাবিকভাবে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে গেল। ফিরে তাকিয়ে দেখল ছাদে পাথরের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে আবিদ। আবিদের প্রাসাদের মতো বাড়িটা এই প্রথম মনোযোগ দিয়ে দেখল। এই প্রাসাদে এত দিন বাস করেও চারপাশটা এত নিখুঁতভাবে দেখা হয়নি বর্ষার। এই পাথরের প্রাসাদে এত দিন সে বন্দি হয়ে ছিল। আজ তার মুক্তি। মুক্তির আনন্দে পাখনা মেলে তার উড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্ষা মুক্তির আনন্দ অনুভব করতে পারছে না। মনে হচ্ছে ওই জীবনই তার ভালো ছিল।


মন্তব্য