kalerkantho


গ ল্প

কেহ কারো মন বোঝে না

নাসিমা আনিস

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



কেহ কারো মন বোঝে না

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

উনি দরজায় বৃদ্ধ গন্ধরাজগাছটার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কী যেন ভাবলেন, তারপর বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকলেন। আমি পুকুরের এপাশে আমার আস্তানা থেকে তাকে পরিষ্কার দেখতে পেলাম।

রিকশা তিনি মূল গেটের বাইরে রেখে কিছুটা পথ হেঁটে খুব কিছু ভাবনায় আছেন—এমন ভঙ্গিতে বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হ্যাঁ, আমি খেয়াল করেছি, দরজায় উনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। উনি আমার ঘরের দিকে তাকাননি। তাকাননি মানেই তিনি আমার আর আমার ঘরের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। না, তাকিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন! তোমার কথা আমি ভুলে গেছি! নাকি তোমার কথা আমি কখনো ভুলব না বলে ভোলার চেষ্টার অংশ হিসেবে তোমার কিংবা তোমার ঘরের দিকে তাকালামই না!

হ্যাঁ, হাতে একটা মিষ্টিজাতীয় প্যাকেট ছিল, মিষ্টি! হবে হয়তো, চমক দেখাতে তো তার জুড়ি ভার! পৃথিবীতে কতক মানুষ থাকে, যারা শুধু চমক দেখিয়ে যায় আর তার চমকের আলোয় কী আগুনে কে মরল কে বাঁচল, সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ থাকে না। মিষ্টি হাতে দিয়ে তিনি হয়তো বলবেন, তিনি একজন ডাকসাইটে রাজনীতিক কি এমপিকে বিয়ে করেছেন। মাকে ইনিয়েবিনিয়ে বলবেন—বুবু, লোকটা খুব ভালো, আমায় এত ভালোবাসে! কোনো দিন ভালোবাসা পাইনি তো! মা পানের বাটা সামনে দিয়ে বলবেন—মঞ্জু, পান খাও। মঞ্জু নামের অপূর্ব মহিলা পানের বাটা কাছে নেবে, পান বানাবে কিন্তু খাবে না। —ওমা, তুমি পান খাওয়া ছাড়লা কবে! উনি জিবে কামড় দিয়ে বলবেন, ভুলে গেলেন? আপনার কাছে থাকতেই তো ছাড়ছি, উনি তো পান খাওয়া পছন্দ করতেন না! মা ভেতরে একটু ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে কি! পড়বে, স্বামীর ভাগ অন্য কেউ পেলেই যে ছেড়ে দিয়েছেন সে কথা কোনো নারী বলতে পারেন না।

মা দেখাতেন তাঁর সময় কোথায় এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর। এত বড় সংসার! দূর-দূরান্ত থেকে মক্কেলরা আসছে কঠিন কঠিন মামলা নিয়ে, স্বামী কি ছেলেকে বাঁচাতে জমিজিরাত বন্ধক দিয়ে টাকাকড়ি নিয়ে এসেছে, মুখের দিকে তাকালেই তো বোঝা যায় কী নিরুপায়, আহা! তাদের কি একটু সেবা দেওয়া দরকার না! আরো আছে, উকিলবাড়িতে আশ্রিত ছাত্র, বেকার চাকরীচ্ছু, বিপদগ্রস্ত সাহায্যপ্রার্থী! সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা বারণ, এটা বাবার হুকুম, মাও তাঁকে এ ব্যাপারে সদাসর্বদা সাহায্য করে গেছেন, দাদার আমলে একান্নবর্তী থাকতে যে সাতসেরি পিতলের হাঁড়িতে ভাত রাঁধা হতো, এখনো তা অব্যাহত। গেরস্তি নাই, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নাই। বাবা এসব দুই চোখে দেখতে পারতেন না। আমরা ভাই-বোনরা ছয়জন, আমি মেজো ছেলে, আমার ঘাড়ের একটি রগ ত্যাড়া, বাবা বেঁচে থাকতে মাকে বলতেন। কারণ ওনাকে বিয়ে করার পর আমি অন্দরমহল ছেড়ে এই বাইরের ঘরে আশ্রয় নিই, মাকে বলেছি বাড়ির কোনো ছায়া যদি আমার ঘরের আশপাশ দিয়ে হাঁটে তো আমি সব জ্বালিয়ে দিয়ে বাড়ি ছাড়ব। তখন আমি অনার্স পড়ি, ফিলসফি আমার সাবজেক্ট, শহরের নাট্যদলে আমার যাতায়াত। বাড়িতে এত বারোয়ারি মানুষ আসে যায় থাকে, আমি এসবে তাকাই না। বড় ভাই সহজ-সরল মানুষ, খুব ভালো ছাত্র, বিদ্বান কি না জানি না; কিন্তু সে কিছু একটা করে দেখাবে, বাবার ধারণা ছিল। আর আমার প্রতি ছিল...কী যে ছিল কেমন করে বলি! কিন্তু আমার ঢাকায় পড়তে না-যাওয়া নিয়ে বিরক্ত থাকলেও কখনো মুখে কিছু বলতেন না। মাকে নাকি একবার বলেছিলেন, দেশ উদ্ধার করতে হলে ঢাকায় গিয়ে পড়তে হয়, বড় মানুষদের কাছ থেকে দেখতে হয়।

আর তিনি স্বামীকে উদ্ধার করতে এলেন বহু খাল-বিল, নদী-নালা পাড়ি দিয়ে বামনা থেকে এই সদরে। এসেছেন ডাকাত স্বামীকে বাঁচাতে। এলেন তো এলেনই, আর গেলেন না। মায়ের হাতের কাজটা কেড়ে নিয়ে করে ফেলেন, বিশে পঞ্চাশে মানুষের রান্না করে ফেলেন চোখের পলকে। বাড়িতে তিন-তিনটা কাজের লোক। মা যত নিষেধ করেন, তিনি তত কাজে উঠে-পড়ে লাগেন। মা তাঁর তরকারির গুণ গাইতে গাইতে বলেন, আহা! স্বামীকে বাঁচাতে তার কত চেষ্টা, হোক সে চোর কি ডাকাত। মানুষ কি এমনি এমনি চোর-ডাকাত হয় নাকি! আর যদি হয়েই যায় তো তাকে বাঁচাতে স্ত্রী প্রাণপাত চেষ্টা করবে না! কে জানে, ছাড়া পেলে সেও একদিন দামি কাজ করে সবাইকে সাহায্য করতে পারে, কত ডাকাতের গল্প শুনেছি এমন!

তখন দোতলার চিলেকোঠায় আমার ঘর। বাবার অফিসঘর নিচে, একেবারে বাড়িতে ঢুকতেই। বড় বড় আলমারি, মোটা মোটা বই, দু-একজন সহকারী। বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয় অনেক রাতে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, বাবা ফাইলে মুখ গুঁজে বসে আছেন, মুখ তুললে দেখি চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তমাখা দুশ্চিন্তা। বাবার ঘর দিয়েই রাতে ঢুকতে হয়, সদর দরজা বন্ধ হয়ে যায় এশার আজানের সঙ্গে সঙ্গে। কুকুরগুলো ওখানে বসে হল্লা করে আর বাবা মাঝেমধ্যে গিয়ে ওদের সঙ্গে কী কথা যেন বলে আসে, ওরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। ছোটবেলায় কোনো কোনো দিন বাবা ছাদে এসে বন্দুক ফুটাতেন, বাবাকে তখন দারুণ লাগত। বলতেন কোনো চোর-ডাকাতের সাহস নাই এ বাড়িতে ঢোকে...হা হা হা। বাবা তখন হাসতেন, কচি কতবেলগাছটা পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপত। বাবা একদিন বলেছিলেন, যুদ্ধে যাওয়া উচিত ছিল, কেন যে পালিয়ে বেড়ালাম মাকে নিয়ে!

ভাইয়া তত্ক্ষণাৎ বাবাকে খুশি করে দিত, তুমি না তোমার মায়ের অন্ধের যষ্টি! বাবা আবারও হাসতেন।

একটা ঘটনা ঘটে তখন। মা কোনো দিন ছাদে ওঠেন না, অথচ দেখি তিনি ছাদে আসেন আচার, কুল কিংবা অন্য কিছু নিয়ে। ছাদের আলিশায় উপুড় হয়ে কী যেন দেখেন আর তার পিঠের কাপড় সরে যায়। আমার পড়ার টেবিল বরাবর, কতবেলগাছের ছায়ায়, গাছে মানুষের মাথার সমান কতবেল—প্রথম দেখায় লোকে বোকা হয়ে যায়, এত বড়! প্রথমে মনে হয়, গাছের ছায়া বলে ওখানে দাঁড়ান, পড়ে আমার পিঠশিরদাঁড়া শিরশির করে। মাখনের মতো ঘাড় আর পিঠ উপচে ঝলমলে আলো পিছলে পড়ে, ব্লাউজের ওপরের কি নিচের অংশ বেয়ে। এরপর আরো কয়েক দিন। তারপর আর আসেন না। তিনি যে বাড়িতেই আছেন তা টের পাই মাঝেমধ্যে আচার কি আমসত্ত্ব শুকাতে দেখে কিংবা মা হয়তো বলছেন, তরকারি আজকাল মঞ্জু রানী রান্ধে, ভালোই রান্ধে। আমি বুঝি, বটে, তার নাম রানী! রানীর মতোই রূপ। কিন্তু ডাকাত তো শুনেছি খুব বিখ্যাত, তার বউটার বয়স এত কম কেন! পরে শুনেছি, ইনি ডাকাতের দ্বিতীয় পক্ষ। প্রথম পক্ষের বউ তিন সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছেন বহু বছর আগে।

মঞ্জু রানী নাকি এ বাড়িতে ছোটবেলায় আসতেন, মায়ের কেমন লতায়পাতায় বোন হয় সে। সেও মামলার কাজে বাবার সঙ্গে আসা। কিন্তু এ যাত্রা তিনি বোনের পরিচয়ে আসেননি, এসেছেন স্বামীর মামলা চালাতে, যাবজ্জীবন কি ফাঁসি থেকে বাঁচাতে।

এরশাদ হটাও আন্দোলনে সারা দেশ তোলপাড়। এই শহরও বেশ গরম। জানি, বাবা সব সময় যে দিকে মেঘ সেদিকে পাথলা দিয়ে চলেন। আর পটপরিবর্তন হলে কোর্টে এর একটা প্রভাব পড়ে। তবু আমি জানি, রানীর কেসটা বাবা অন্তত ঢাকা পর্যন্ত গড়িয়ে দিতে পারবেন। চেষ্টা করলে সাজা কমিয়ে কি বেকসুর খালাসও করিয়ে ফেলতে পারেন। আমার বিশ্বাস, বাবা যা পারবেন এই শহরের কোনো উকিল তাঁর চেয়ে বেশি পারবেন না। মা খাবার দিয়ে রানীকে জেলহাজতে পাঠান খুনি স্বামীকে দেখতে। দেখতে দেখতে তিন মাস হয়ে গেল রানীর এখানে থাকার। ভরা বর্ষায় এসেছেন, এখন শীত প্রায়। ঠাণ্ডা হাওয়াটা রাতে জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকলে কী যে মনে আসে কী যে মন চায়! কতবেলহীন গাছে নতুন কিশলয় দেখা দেয় কি দেয় না, জ্যোত্স্নাহীন রাত দোল দেয়। ছাদের আলিশায় বসে থাকি দূরে একটা খরস্রোতা নদী কল্পনায় আন্দাজ করি, এঁকেবেঁকে চলে গেছে। আসলে গভীর অন্ধকার। আলিশায় হাত বুলাই—এই জায়গায় রানী দাঁড়াত, ধনুকের মতো টান টান পিঠ, এখন দাঁড়ায় না। চোখটা নিচে যায়, ছায়া দুটি, বাবার জানালায় জড়াজড়ি করছে...।

না, বাবা সামান্য ডাকাতটার জন্য বিশেষ কিছু করতে পারেন নাই। আরো ছয় মাস কেসের কোনো সংবাদ আমরা জানতাম না। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু খুঁজি—পাই না। সংসার-তৃপ্ত এক মহিলা বিশাল সংসার আঁকড়ে দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন। রানীকে তার দেশে পাঠিয়ে দিতে বললে মা অত্যন্ত রুষ্ট হন। শেষে বাবাকেই বলি—বাড়ি ভর্তি করে তোমার মক্কেলরা যদি ঘুরে বেড়ায়, সেটি তোমার ছেলে-মেয়েদের জন্য খারাপ। বাবা হঠাৎ আমার এই কথায় কী বুঝলেন জানি না। বললেন, তোমার মাকে বলো, সব তাড়িয়ে বাড়ি হালকা করুক। আমার মা খুব বড় বাড়ির মেয়ে ছিলেন, সে কারণেই সম্ভবত মা দানধ্যান করে তাঁর পরিচয় দিতেন। সে সময় আমার দলের কাজে কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় আসতে হয়, দল নিয়ে পথনাটক করে বেড়াই, বাড়ির কথা ভুলে যাই। ফিরে গিয়ে দেখি বাড়িতে রানী নাই, রানীর স্বামীর যাবজ্জীবন হয়েছে এবং কেসটা এখন ঢাকায় উচ্চ আদালতে মুভ করবে। বাবাকে দেখি বাড়িতেই বেশি থাকেন, একটু আনমনা দেখায়। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাবাকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে হয়তো, নাকি তিনি একটু ধীরে চল নীতি নিলেন—জানি না।

কেস নিয়ে ঢাকায় যাওয়া বাবার পুরনো ব্যাপার। এবার দেখি সঙ্গে মঞ্জু রানী যায়। রাতের স্টিমারে কেবিন ভাড়া করে তাঁরা যাতায়াত করেন। একদিন শুনি তিনি কিছুদিন ঢাকায় থাকবেন মামলারই কোনো কাজে। মাসখানেক পর বাবা একা ফিরলেন আর মা পরদিন খুব জ্বরে পড়লেন। রানীর ডাকাত স্বামীর যাবজ্জীবন বহাল রইল, আমরা যেন জানতাম এ খবরই আসবে, বাবা ওর জন্য কিছু করবেন না।

সংসার অচল হওয়ার দশা, রানী এলেন রানির বেশে। মায়ের জ্বরের কারণ বুঝলাম। আশ্চর্য, বাড়িতে একটু চিত্কার-চেঁচামেচিও হলো না। মা নিজের ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন। আমি বাড়ি ছেড়ে পুকুরপাড়ের পরিত্যক্ত বাংলা ঘরটায় উঠলাম। এখানেই আমার খাবার আসে, আমি বাড়ি যাই না।

একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে। একদিন দুপুরে খুব ঝড়জল হলো, তারপর বাড়িতে একটা কালো জিপ এলে মা আর উনি দুজন কোথায় জানি গেলেন। পরে শুনেছিলাম, তিনি মাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলেন লাইগেশন করাতে। মা সাক্ষ্য দেবেন, তাঁর চার ছেলে আছে আর সন্তান চান না।

বছর তিনেক তাঁরা দুই সতীনে সংসার করলেন, বাবা স্ট্রোক করে নিচের অফিসঘরে মারা গেলেন অল্প বয়সে, পঞ্চাশ হয়েছে কি হয় নাই। তিনি বাবা মারা যাওয়ার পর অল্প কিছুদিন ছিলেন। মা তাঁকে খুব ভালোবাসতেন, বস্তুত মায়ের ভালোবাসা ছিল অপার। এমনকি বাবা ওনাকে সিনেমায় নিয়ে যান না বলে মা সঙ্গে করে সিনেমা দেখতে নিয়ে যেতেন বাবা বেঁচে থাকতে। নূপুর কিনে দিয়েছিলেন ওকে, আমাদের কোনো বোন ছিল না, সেটা কোনো কারণ কি না জানি না। বিয়ের পর যত দিন এ বাড়িতে ছিলেন, কোনো দিন আমার সামনে আসেননি; কিন্তু আমার সব সময় মনে হতো, তিনি আমাকে লক্ষ করতেন দূর থেকে। উপযাজক হয়ে সেবা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি, এটার কারণে তার প্রতি আমার অনুরাগ অব্যাহত ছিল হয়তো। আর আমি পারতপক্ষে বাবার মুখোমুখি হতাম না। আমি পড়া ছেড়ে দিলাম, নাটক ছেড়ে দিলাম আর শুধু দুটি মাত্র জিনিস ছাড়তে পারলে আমি বরিশাল ছাড়তে পারতাম সে সময়, সে নদী কীর্তনখোলা, লঞ্চঘাট আর জেলখানার গরাদ। আমি রোজ ঘাটে যেতাম আর মুখচেনা না-চেনা মানুষদের দেখতাম। মনে হতো নাটক দেখছি—সত্যি জীবন, কোনো অভিনয় নাই। যদিও জানি দু-চারজন ভিক্ষুক আছে, যারা একই জিনিস রোজ করে, একইভাবে হাত পাতে, একই গৎ আওড়ায়।

 জেলখানার সবাই জানত, আমি তাঁর কাছের আত্মীয়, তিনি আমায় বাবা বলতেন, এই ডাকটা আমি ফিরিয়েছি, বলেছি আমি অন্তু, অন্তু বলেন। আর আমি আসি আমার এক নিকটাত্মীয়কে দেখতে, আপনাকেও একটু দেখে যাই। জানি না উনি বিশ্বাস করতেন কি না। উনি মোটেই বোকা নন। আমি তিন বছর প্রতি সপ্তাহে গেছি, কখনো সপ্তাহে দু-তিন দিনও। ভয়াবহ এক অস্থিরতা আমাকে তাড়া করত, আমি ছুটে যেতাম।

হ্যাঁ, তিনি আমাদের বাড়ি ছাড়ার পর একজন ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন, মায়ের মুখে শোনা। তিনিও মারা যান, কিন্তু সেখান থেকে তিনি একটি আশ্রয় পান, একটা বাড়ি। অতিসম্প্রতি মা বলছিলেন, রানীর একটা ভালো বিয়া হইছে। মায়ের ওর প্রতি সব সময় সম্ভ্রমাত্মক আচরণ ছিল, যেন তিনি ওনার সতিন, তার একটা মর্যাদাপূর্ণ আসন থাকা চাই এ বাড়িতে। আমিই সবচেয়ে বিরক্ত ছিলাম বাবার স্ত্রী হিসেবে তাকে পেয়ে, কিন্তু মা সব সময় বলতে চাইতেন, সম্মান না করো, অসম্মান তুমি ওকে করতে পারো না।

 ঘণ্টাখানেক পর তিনি চলে গেলেন। আমার কেন জানি একটা অন্য রকম অনুভূতি হলো এবার, আমি প্রায় ছয় মাস জেলখানায় যাই না। যাই না মানে তাকে আমি ভুলে গেছি, তা না। আমাকে এত ওষুধ খেতে হয় যে আমি বাড়িতেই সারা দিন-রাত ঘুমাই। আমার পক্ষে একা জেলখানা পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব না। কেউ নিয়ে যাবে তাও নিয়ে যাবে না। আর আমি যে ওনাকে দেখতে যাই, সেটা কাউকে বলাও আমার পছন্দ না। সংসার এই কয় বছরে অনেক বদলে গেছে। আমি শুধু পনেরো বা বিশ বছর আগের জীবনে রয়ে গেছি।

কী জানি কী ভেবে ভেতর বাড়ি গেলাম। শুনি, মা ফালু খালাকে বলছেন, আজ একটু ভালো কিছু রান্না করো। আজ খুশির দিন। দেখি টেবিলের ওপর মিষ্টির প্যাকেট।

 সন্ধ্যায় কীর্তনখোলার পাড়ে গিয়ে বসে থাকি। ঝড়জল হতে পারে, আকাশ লাল আর ঘোলা। নদী নারীর মতো—দিনদুপুরে, সন্ধ্যায় কি রাতে কত যে তার রূপ। বুঝতে পারি সে সময়েরই কারণে। আজ তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তার বয়স কত? আমি হিসাব করি নিজের বয়স, পঞ্চাশ হতে বেশি বাকি নাই, বাবা এই বয়সে চলে গেছিলেন। কিছু মাত্র ওষুধ কি সেবা না নিয়ে...। কীর্তনখোলা আজ ভয়াবহ, নদী-নালার দেশের মানুষ আমি, সাঁতার ভুলে গেছি। সাঁতার জানা মানুষ সাঁতার ভোলে না—লোকে বলে। লোকে কত ভুল জিনিস যে জানে! 


মন্তব্য