kalerkantho

গ ল্প

বরফের কফিন

মণিকা চক্রবর্তী

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



বরফের কফিন

অঙ্কন : ফারজানা জাহান

অদ্ভুত নির্জনতা। জানালার পর্দাটা তুললে দেখা যাচ্ছে বরফে মোড়া গির্জার চূড়া।

ডিভানের ওপর শুয়ে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কটা নিয়ে ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয় নিশাত। গত বছর নিউ ইয়ার পার্টিতেও ফয়সলের দুহাতের বাঁধনে নিজেকে মুক্তভাবে ছেড়ে দিয়ে নেচেছিল সে। আমেরিকার পিটার্সবার্গ শহর। ইস্পাতের শহর। নদীর ওপরে বিশাল ব্রিজের তোরণ। ওরা দুজনেই আইটিতে পড়তে এসেছিল। ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে দুই বছর ধরে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ জোগাড় করতে গিয়েই ফয়সলের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র। তারপর ঘনিষ্ঠতা। হেমন্ত পার হয়ে শীত আসার সময়টায় কেমন ভয় ভয় লাগে। যেন হামাগুড়ি দিতে দিতে একটা প্রচণ্ড শীতের পাহাড় তাকে জমিয়ে দেবে একেবারে। অদ্ভুত রহস্যময় এই তীব্র শীত আর তুষারপাতের সময়। নতুন বছরের কয়েকটা দিন আগে থেকেই সব কিছুর ছুটি হয়ে যায়। পুরো শহরটাতেই ছুটির আমেজ। তখন ক্যাম্পাসও খালি। অনেকেই চলে যায় ছুটি কাটাতে। নিশাতেরও ইচ্ছে করে এই ইস্পাতের শহর থেকে মুক্তি পেতে। সেই সময়টায় স্টিভ স্ট্রিটে এক রুমের চিলেকোঠার একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে নিশাত। বাড়িওয়ালার বয়স আশির ওপরে। নিঃসঙ্গ। তীব্র শীতের এই সময়টায় ভদ্রলোকটিও বড় একা। তার কুকুর টমি চেষ্টা করে বৃদ্ধের নিঃসঙ্গতাকে হটিয়ে দিতে। এই সময় নিশাত-ফয়সল জুটিকে পেয়ে ভদ্রলোক খুব খুশি হয়। ছুটির এই সময়টা ওরা গত দুই বছর এখানেই কাটিয়েছে। এখানকার কান্ট্রিসাইডটা দারুণ সুন্দর। ওরা দুজনে ঘুরে বেড়িয়েছে তুষারে ঢাকা জঙ্গলের বিভিন্ন এলোমেলো বাঁকে। পাইনের মাথায় তখন সাদা বরফের স্তূপ। অদ্ভুতভাবে সাদা, সর্বস্ব সাদা। রাতে ফিরে বারবিকিউ করেছে নিশাত, ফয়সল আর বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ বাড়িওয়ালা মিলে। টমিও আনন্দে বারবার গায়ের কাছে শরীর ঘষে দিয়ে জানিয়ে গেছে সবাইকে ঘিরে আঁকড়ে বেঁচে থাকার আনন্দ আর উত্তাপের কথা।

আজকের সময়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েক দিন আগেই পিটার্সবার্গে দুজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশকে গুলি করে মেরেছে সন্ত্রাসীরা। সন্দেহের তালিকায় কালো বা এশীয়রা। নিশাতের কালো গায়ের রং এই সাদার শহরে যেন আরো বেশি কালো হয়ে ওঠে। তার ভয় করে। শুধুই ভয় করে। শীতের তীব্র কনকনে বাতাস আরো ভয় ধরিয়ে দিতে থাকে। দরজা কিছুটা খোলা পেলেই ধেয়ে আসে। এ শহরের মানুষ বড়দিন কাটাতে ছুটিতে চলে গেছে। শীতের সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত নির্জনতায় ডুবে রয়েছে আশপাশ। রাস্তার পাশে রাখা গাড়িগুলোর ওপর বরফের সাদা পুরু স্তর জমে আছে। নিশাত জানালার পর্দা তুলে দিয়ে দেখে এসব। সকালে টমিকে দেখল বরফের ভেতর পা ডুবিয়ে খেলছে। ওর বৃদ্ধ মালিক হাঁপিয়ে উঠেছে টমির গলায় পরানো শিকলটিকে নিয়ে টমিকে সামলাতে। নিশাত এসবই দেখছে, কিন্তু তার একবারও ইচ্ছে হচ্ছে না, এই সময় বৃদ্ধ মালিক বা অন্য কারো মুখোমুখি হতে। অবশ্য রাস্তায় তেমন লোকজনও নেই। এই পাহাড়ি রাস্তায় বরফের স্থাপত্য চেনা পরিবেশকে সম্পূর্ণই পাল্টে দিয়েছে।

 নিশাতের খুব ইচ্ছে করছে এই সময় বাংলাদেশে এসে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে। মায়ের হাতের শীতের পিঠা, ঝলমলে রোদ, ভাই-বোনদের সঙ্গে আড্ডা! সব কিছুর জন্যই কেবলি মন টানে। ক্লান্ত, বিষণ্ন লাগে। নিশাত ছুটির এই সময়টায় একটা ক্যাফেতে সপ্তাহে তিন দিন কাজ করে। ফয়সলও ওখানেই কাজ করত। এখন অবশ্য ফয়সলের বিষয়টা সম্পূর্ণই স্মৃতি বা সময়ের কিছু অপচয়। নিশাত অতীতের বিষয়টাকে আজ বিভ্রান্তিই ভাবে। ক্যাফেতে কাজের সময় জ্যাজ মিউজিক বাজতে থাকে। সেই বাজনার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে নিশাতের নিজস্ব বিলাপ। কফি সার্ভ করতে করতে সে তীব্রভাবে অনুভব করে বেঁচে থাকার অর্থহীনতার মধ্যে এক অভিবাসী জীবনের রূপান্তরের কথা। কিন্তু কী করে আসবে সে! ছুটি কাটানোর টাকা নেই। একদিকে পড়ার চাপ, অন্যদিকে টিউশন ফির জোগাড়। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভিসা না পাওয়ার সমস্যা। আদৌ কি সে দেশে যেতে পারবে! পারলেও কত বছর পর! কেমন বিচ্ছিন্ন লাগে সব কিছুই।

তবু ফয়সলের ভাবনাটা মাথা থেকে বেরোতে চায় না। একই ভাষায়, একই সংকেতে, দুটি একাকী জীবন, কী করে যেন ক্যাফে শপের বাজনার তালে মিলে গিয়েছিল একদিন। নিশাত বুঝতে পারেনি, এ হলো আগুনে জ্বলে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণের বিহ্বলতা। কী এক আবেশে সে হয়ে গিয়েছিল শ্যামাপোকারই মতো। তার গায়ের কালো রং ভালোবাসায় সবুজ হয়ে উঠেছিল। আর শ্যামাপোকা হয়ে সে শুয়ে পড়েছিল ফয়সলের সবুজ চাদরে। সব সবুজ রং একত্রিত গাঢ় সবুজ হয়ে এক মুহূর্তেই পরিবর্তিত হয়েছিল আগুনের রঙে। আগুনে পুড়ে গিয়েছিল তার ডানা। সব কিছু উজাড় করে দেওয়ার পর আর কিছুই বাকি ছিল না।

এখন ফয়সল নেই। সত্যিই সে নেই! কাজ ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছে। অন্য একজনকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছে আমেরিকায়। নিশাতের শুধুই ভয় লাগে। তার কোথাও যাওয়ার রাস্তা খোলা নেই। কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। কান্নাগুলোকে গিলে ফেলতে ফেলতে পার করতে চায় সে এই আতঙ্কিত সময়। ভুলে যাওয়ার চেষ্টায় সে শুধুই ঘুরতে থাকে ক্রমাগত কাজের পৃথিবীতে। হেরে যাওয়া। সব জায়গায়ই শুধু হেরে যাওয়া! এখন পাল্টে যাচ্ছে আমেরিকার নিয়ম। গত পঞ্চাশ বছরে কালোদের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই শিল্পের নগর। এখন ওরা এই শহরের নোংরা-আবর্জনা। পৃথিবীর সব নিয়মই কি পাল্টাচ্ছে! সব কিছুই হারাচ্ছে নিরাপত্তা। একগুঁয়ে প্রাণীরা এড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্যের সব চুক্তি! নিশাতের তীব্র ইচ্ছে করে ক্রীতদাসের জীবন ছেড়ে নিজের মাটিতে ফিরে আসতে। একেবারে মায়ের কোলে।

এক প্রবল নির্জনতায় এক রুমের চিলেকোঠায় একা শুয়ে আছে নিশাত। ফ্রিজে কিছু খাবার আছে। আছে এক বোতল হোয়াইট ওয়াইন। এই দুই দিন সে আর একবারও বাইরে যাবে না বলে স্থির করেছে। গত কয়েক বছরের প্রচণ্ড পরিশ্রম আর ক্লান্তি অবশ করে রেখেছে তার দেহ-মন। ভেতরে ছটফটানি আর অস্থিরতা। শেষ পর্যন্ত কোথায় স্থায়ী হতে পারবে সে? আসলেই কি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া যায়? কোথাও? চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে নিশাত। ঠাণ্ডা হয়ে আসছে শরীর। বাইরে ঠাণ্ডা কনকনে বাতাসের স্বর। বরফ ঝরছে, সাদা সাদা বরফ। সাদা মানুষদের মতো। কঠিন বরফ। প্রথম প্রথম তার ভালো লাগত পেঁজা তুলার মতো গুঁড়া গুঁড়া তুষার কণা। এই নৈঃশব্দ্যের ভেতর এখন সে অনুভব করছে তুষারগুলো ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে কঠিন বরফে। বরফের পাহাড় ঢেকে দিচ্ছে আলো আসার ক্ষুদ্রতম পথটুকুকেও। অন্ধকারে তার চেতনাগুলো হঠাৎ জেগে ওঠে। অস্পষ্টভাবে কোনো এক চেতনার ঢেউ চাঁদের আলোর মতো উঁকি দেয়। কুয়াশা, সাদা বরফের অন্ধকার আর ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া তীব্র কনকনে শীতের ভেতর মায়ের মুখ। যেন সেই অস্পষ্ট অবয়ব দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে। নিশাত অধীর হয়ে দেখছে সেই নিমগ্ন মুহূর্তটি। সবচেয়ে পবিত্রতম মুহূর্তটিকে হাত বাড়িয়ে অনুভব করতে চাইছে প্রবলভাবে। ছোটবেলার মতো কানের কাছে শুনতে পাচ্ছে মায়ের বলা পান্তাবুড়ির গল্প। তার টানা চোখ, পবিত্র মুখ আর দুটো প্রসারিত হাত নিশাতকে ডাকছে। শুধুই ডাকছে। জীবনের আমন্ত্রণে।

 

 

 দুই.

 

চার বছর পর। ফয়সল ঢাকায় ফিরেছে ছয় মাসের মতো হলো। তার নিজের ভেতরে রয়েছে ভুল বিশ্বাস, জানা-অজানা সংশয়। নিজেকে ইচ্ছে করেই আড়াল করে রেখেছে পরিবারের কাছে। কিছুটা বাধ্য হয়েই। পরিবারের সবার ওপরেই আছে তার তীব্র অভিমান। লিন্ডাকে সে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল ছোট ভাইটির পড়ার খরচ চালানোর জন্য। আব্বুর হার্টের চিকিৎসা। পশুর মতো শক্তি নিয়ে সে খেটেছে আমেরিকার মাটিতে পরিবারের একটুখানি সচ্ছলতার জন্য। নিশাত! হ্যাঁ নিশাতই তার একমাত্র আশ্রয় আর অবচেতনের আবেগ ছিল। এখনো তার মুখ ভাসে বুকের ভেতর। গত চার বছরে সে অনেক খুঁজেছে নিশাতকে। আমেরিকার নানা পরিচিত মহলে, ফেসবুকের পাতায়, পুরনো স্টিভ স্ট্রিটে। একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে গেছে নিশাত! তাহলে কোথায় গেল সেই মেয়েটি! এমন অভিমানী! ওর কথা ভাবলেই একটা তন্ময়তার আবেশ ফয়সলকে অবশ করে দেয়। আজও তাকে সে বাঁচিয়ে রেখেছে নিজের ভেতর। যেখানে তার সর্বস্ব!

রমজান মাস। প্রচণ্ড গরমে ক্ষিপ্ত মানুষজন, দোকানপাট, সব কিছুই। গ্রিন রোডের চারপাশের কাটা রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে সে বসুন্ধরা মার্কেটের দিকে। উদ্দেশ্য সিনে কমপ্লেক্সে একটা থ্রিডি মুভি দেখে সন্ধ্যাটা পার করবে। গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে সে বাধ্য হচ্ছে। কারণ সব গাড়িই রাস্তায় জ্যামে আটকে পড়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে সে দেখছে আজব কাণ্ডকারখানা। গত পাঁচ বছরে ঢাকা শহর বেশ বদলে গেছে। শহরটাকে একটু সবুজও মনে হচ্ছে। মানুষের হাতে প্রচুর টাকা। দ্রুতই বদলে গেছে মানুষের জীবনের মান। রাস্তায় তেমন কোনো ভিখারি চোখে পড়ল না। দোকানপাটগুলো খুব সেজেছে ঈদের উৎসব সামনে রেখে। তবু মানুষের মধ্যে এমন কোনো অভ্যাস চোখে পড়ল না, যা খুব চমত্কার বা মনে রাখার মতো। মানুষ ধর্মকে খুব ভালোভাবেই উদ্যাপন করছে, কিন্তু পাশাপাশি সংযমের মাসেও লোকজনের প্রবল অসহিষ্ণুতা একটা হতাশার কালো ছায়াকে প্রকট করে তুলেছে। চারদিকেই যেন জমা আছে উপর্যুপরি ক্ষোভ। চারপাশেই শুধু হল্লা, হিংস্রতা আর ক্ষোভ। হাঁটতে হাঁটতে ফয়সল ভাবছে ক্ষোভ সর্বত্রই। আমেরিকায়ও সে কম ছদ্মবেশ দেখেনি। অন্যকে না রাগিয়ে কথা বলার অভ্যাসটা ওরা কিছুটা রপ্ত করলেও প্রায়ই আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে। তখন দেখা যায়, অসহিষ্ণুতার ধরন। তবে আমেরিকায় যাওয়ার পর সে নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কখন বসুন্ধরার সিনে কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছে স্থির দাঁড়িয়ে গেছে ফয়সল। পা রাখার মতো একটুকু জায়গা নেই। লোকজন গ্রুপে গ্রুপে মেঝেতে বসেই ইফতারি খুলছে। খানিক পরেই আজান দেবে। সে চুপ করে এক কোনায় দাঁড়াতেই তার পাশে বসে থাকা গ্রুপের একজন ডেকে বলল, ‘ভাইজান, বসে পড়েন আমাদের সাথে। ’ এই দারুণ আপন ডাকে এতক্ষণের সব বিশৃঙ্খলার ভাবনাগুলো যেন হঠাৎ দূরে সরে গেল। নিশ্চিত যে বাঙালিদের অনেক অপ্রত্যাশিত খারাপ আচরণ আছে, কিন্তু এই যে আন্তরিক ডাক, এ-ও তো সত্য! সে তো একবারও জানতে চাইল না ফয়সল কোন ধর্মের! আদৌ সে রোজা রেখেছে কি না!

 লোকটির কথার উত্তরে একটু মিষ্টি হেসে সিনে কমপ্লেক্সের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফয়সল ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। সামনের একটা স্যুপের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশাত। ওর কালো চুলসহ মাথাটা সাদা ওড়নায় ঢাকা। ওটা ঠিক ওড়না না হিজাব সে বুঝে উঠতে পারল না। পাশেই খুব হ্যান্ডসাম একজন। উজ্জ্বল ফরসা মুখে চাপদাড়ি, জিন্স আর কালো ফতুয়ায় খুব শান্ত।

মুহূর্তেই ফয়সল ফিরে গেল অতীতে। হাজার কথার ভিড়। হাজার কথা নামছে, সরছে, উড়ছে। খুব নিঃশব্দে, খুব দ্রুত, একেবারেই নিজের ভেতরে। বুকের ভেতরটায় বড় একটা স্পেস যেন খুলে যাচ্ছে আর ভরে উঠছে শূন্যতায়, অবশতায়। সেই স্টিভ রোডের বাড়ি। বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা আর তার কুকুর। প্রচণ্ড তুষারপাত আর নিশাতের শরীরের উষ্ণতা। নিজের ভেতরে একটা বেপরোয়া ভাঙনের শব্দ শুনতে শুনতে সে পালাতে চাইল তাত্ক্ষণিকভাবে। কিন্তু পারল না। সেই জায়গায়ই আটকে থাকল স্থবির পা দুটো। নিশাত সরাসরি তাকাল তার দিকে। খুব ভ্রুক্ষেপহীনভাবে পরিচয় করিয়ে দিল তার হ্যান্ডসাম স্বামী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। ফয়সল চেয়ে চেয়ে দেখল নিশাতের শরীরে-মনে একটা নতুন গতি। আর এই অপ্রত্যাশিত হঠাৎ দেখায় ভেতরে ভেতরে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল সে। নিশাত খুব দ্রুতই সরে পড়ল। সারা জীবন সে ফয়সলকে প্রতারকই ভেবেছে। আজও তাই ভাবছে। নিশাতের তীব্র অস্বস্তিকর চেহারা তাই জানান দিচ্ছে। কোনো রকমে দুটো কথা বলে দ্রুত সরে পড়ার আগে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচয় করানোর সময়ও নিশাতের চোখে-মুখে ছিল একটা বিরক্তি আর কঠিন দৃঢ়তা। সে কি তার অনুভবের পুরো অতলটাতেই ফয়সলের জন্য ঘৃণা পুষে রেখেছে! অথবা একটা অস্বস্তিকর সময় হিসেবে মুছে ফেলেছে অতীত! কী জানি! সবই কি এত দ্রুত বদলে যায়!

নিশাত কখনো জানবে না লিন্ডার সঙ্গে এক বছরের মধ্যেই তার ব্রেকআপ হয়ে যাওয়ার বিষয়টা। সে কখনো জানবে না কতটা পারিবারিক চাপের মধ্যে লিন্ডাকে বিয়ে করে সিটিজেনশিপটা নিতে হয়েছিল। নিশাতের কাছে সে শুধুই প্রতারক। এখনো প্রতিবছর বরফের সময়টায় সে একা একাই গাড়ি চালিয়ে সেই বৃদ্ধের বাড়িতে যায়, নিশাতের খোঁজে। গত বছর সেই বৃদ্ধ মারা গেছে। নিশাত কি জানে? হয়তো জানে, অথবা জানে না। অথবা নিশাত আর শুনতে চায় না জীবনের জটিলতর কথাবার্তা।

এত ভিড়ের মধ্যে, মানুষের অবিরল স্রোতের মধ্যেও ফয়সলের কাছে চারপাশটা খুব নিঃশব্দ লাগছে। সে যেন হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে কাউকে। কিন্তু কাউকেই ছুঁতে পারছে না। হাতটা পৌঁছতে পারছে না কোনো স্বপ্নে বা বাস্তবে। তার ভেতরের যন্ত্রণাগুলো ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ নেই কোথাও। শুধু বুকের মধ্যে আছে এক গোপন বরফের কফিন।


মন্তব্য