kalerkantho


উ প ন্যা স

মৃত্যু চমকের উজ্জ্বলতা

শাহ্‌নাজ মুন্নী

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মৃত্যু চমকের উজ্জ্বলতা

অঙ্কন : মানব

১.

বছর পরিক্রমা

২০১৫ সালের সকালবেলা একটি নতুন বছর শুরুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অনেকের কাছেই হয়তো মনে হয়েছিল, আগের বছরটা ছিল একটি গতানুগতিক বছর।

এ রকম বছর আগেও গেছে এবং ভবিষ্যতেও আরো আসবে।

পরিবর্তনহীন বছরগুলোকে কারো কারো কাছে মনে হতে পারে স্থির ও নিশ্চল, মনে হতে পারে সময় একটি বিভ্রম মাত্র, মনে হতে পারে জীবনের স্রোত বুঝি থমকে আছে। জ্ঞানী লোকেরা বলেন, বছরজুড়ে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না আসার দুটো অর্থ হতে পারে—এক. আমরা এরপর আরো পেছনের দিকে যাব, অথবা দুই. আমরা আবার সামনের দিকে যাব। যাঁরা এ রকম স্থবির সময়ে বাতাসে কান পাতবেন, তাঁদের মনে হতে পারে, চারপাশে অদ্ভুত পাণ্ডুর প্রেতাত্মারা ফিসফিস করে কথা বলছে, মৃত আত্মারা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা ভিড় করে আছে আমাদের চারপাশে, তাদের হয়তো অনেক কথা বলার ছিল, যা তারা বলতে পারেনি। বাতাসে কান পাতা মানুষদের তখন হয়তো মনে হতে পারে, লুক্রেতিউসের মহাকাব্যের সেই পঙিক্ত, ‘আমার ভয় হচ্ছে, তুমি হয়তো ভাববে আমরা অধার্মিকতার পথ ধরে চলে যাচ্ছি কোনো পঙ্কিল জগতে। কিন্তু মনে রেখো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মান্ধতাই অধর্মপথে মানুষকে পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করেছে। ’

 

২.

রক্তের ফোঁটা

গুলশানের ধুলো-ময়লা ভরা ধূসর সরু রাস্তাগুলোকে কখনোই, কোনো বিবেচনাতেই তার নিজের শহর কাসোলা ভালসেনিওর রাস্তার সঙ্গে তুলনা করার কোনো কারণ নেই। তবু যখন খুব সকালে বা আবছা সন্ধ্যায় সিজারে তাভেল্লা জগিং করতে বের হয় তখন হঠাৎ হঠাৎ এই রাস্তাগুলোকে কাসোলা ভালসেনিওর রাস্তা বলে ভুল হয় তার। শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, সুদান বা সোমালিয়ায় থাকতে এ রকম বিভ্রান্তি কখনোই হতো না তাভেল্লার, অথচ বাংলাদেশে এই অদ্ভুত ধোঁয়াটে অনুভবে আচ্ছন্ন হওয়ার কারণটা কী? এটা কি বয়স বৃদ্ধিজনিত মানসিক দুর্বলতা? হতে পারে তা-ই।

গত বছর ৫০ পেরিয়েছে তাভেল্লার, কম তো নয়, এক শর অর্ধেক, অর্ধশত বছর তাহলে কেটে গেল এই পুরনো ম্লান পৃথিবীতে!

তাভেল্লার জন্মদিনে লরা সোনালি চুল ঝাঁকিয়ে দুষ্টু হেসে স্কাইপে বলেছিল, ‘ইউ আর গেটিং ওল্ড, পাপা। ’

উত্তরে তাভেল্লাও হেসেছিল, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড, ইয়াং লেডি। ’

মেয়ে আরেক কাঠি সরেস। রসিকতা করে বলল, ‘দ্য-এ-ন, কংগ্র্যাটস পাপা, ইউ আর গেটিং গোল্ড। হি হি হি...’

বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্ভট সব ধারণা নিয়ে বসে থাকা ষোড়শী লরা বাপকে নিয়ে তার দুশ্চিন্তাও গোপন করেনি সেদিন। এমন পাণ্ডববর্জিত দেশে বাপ কেন পড়ে আছে, প্রশ্ন করেছিল সে। ডেভেলপমেন্ট সেক্টরের মানুষ হিসেবে তাভেল্লা অবশ্য জানে, অনভিজ্ঞরা বাংলাদেশকে যে রকম পশ্চাত্পদ অসভ্যের দেশ ভাবে, আদতে বাংলাদেশ ততটা পিছিয়ে পড়া কোনো দেশ নয়, বরং কেউ কেউ একে ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ বলে ডাকে। প্রফেশনাল জায়গা থেকেও তাই তার একটা আগ্রহ ছিল এই দেশটার অগ্রগতির রহস্যটা বোঝার, তা ছাড়া অফারটাও লোভনীয় ছিল, মাস শেষে প্রায় ১৫ হাজার ইউরো কামাই করা, মন্দ কী? এই টাকায় নিজের যেমন দিব্যি চলে যায়, তেমনি লরার মা সোফিয়ার দেনা-পাওনার দাবি মিটিয়ে কিছু জমানোও যায়।

তবে টিনএজ মেয়েকে তো আর এত কিছু বুঝিয়ে বলার সময় নেই। তাভেল্লা শুধু বলেছিল—

‘তুমি যেমন ভাবছ আসলে তেমন না, দেশটা খুব ইন্টারেস্টিং মা, মানুষগুলো সরল আর পরিশ্রমী, ফিরে এসে ডিটেইল বলব তোমাকে...’

তাভেল্লা এ দেশে কাজ করছে নেদারল্যান্ডসের একটা এনজিওতে, ‘কৃষি ও প্রাণিসম্পদ টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ প্রকল্পে, প্রজেক্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে। তাভেল্লার দায়িত্ব এর পশুপালন ও রক্ষণ বিভাগের ‘নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রচলিত পদ্ধতিগুলো পর্যালোচনা ও উন্নয়ন’ পার্টটি দেখাশোনা করা।

হায়ার সেকেন্ডারি শেষ করে মূলত বাবার আগ্রহেই রোলাঙ্গা ইউনিভার্সিটিতে ভেটেরিনারি মেডিসিন পড়েছিল সিজারে তাভেল্লা। বাবা তাভেল্লা করাডো এলাকায় বিশিষ্ট পশুপ্রেমী মানুষ হিসেবে পরিচিত। কান্ট্রি সাইডে বিশাল এক ফার্ম হাউস আছে তাঁর। সেখানকার গরু, ভেড়া, শূকর আর হাঁস-মুরগির বিরাট দঙ্গল নিয়ে বিরাশি বছর বয়সেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যাপক ব্যস্ততা ভদ্রলোকের। মায়ের আছে এক ডজন বিড়াল আর গোটা ছয়েক কুকুর। সব মিলিয়ে তাভেল্লা পরিবার পশু-পাখিদের অভয়ারণ্য।

তবে সিনিয়র তাভেল্লা, মানে ওর বাবা তাভেল্লা করাডো হয়তো ভাবেননি তাঁর ভেটেরিনিয়ান পুত্র পশু-পাখির রোগ সারানোর ওষুধ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজ দেশ ইতালি ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাজ করে বেড়াবে।

‘ইচ্ছে করলে তুমি আমার খামারেই তো কাজ করতে পারো। গরিব দেশগুলোতে পড়ে থাকার দরকার কী?’ পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিলেন করাডো।

কিন্তু বাপের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি সিজারের কাছে। বরং এক যুগ ধরে তথাকথিত গরিব মানুষদের দেশে ঘুরতে ঘুরতে সিজারে তাভেল্লা এই যাযাবরের জীবনেই বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রথম দিকে অবশ্য খাবারদাবার নিয়ে বেশ কষ্ট হতো তার, ভিন্ন ধরনের খাবার মুখে রুচত না, মায়ের হাতের স্পেশাল স্পাগেটি, লাজানিয়া আর সোফিয়ার তৈরি করা চিকেন পাস্তা বা মাশরুম পিত্জা খুব মিস করত তাভেল্লা। ধীরে ধীরে সেই অনভ্যস্ততাও কাটিয়ে উঠেছে সে। আর এখন তো পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। ঢাকায়ও সে রকম কয়েকটা রেস্টুরেন্টের খোঁজ পেয়েছে তাভেল্লা, যাদের ফোনে অর্ডার করলে হোম ডেলিভারি দিয়ে যায়। তা ছাড়া অফিসে আসা-যাওয়ার পথে কয়েকটা পিত্জার দোকান পড়ে, সেখান থেকে কিনে নিলে একজন মানুষের দিব্যি খাওয়াদাওয়া হয়ে যায়। ঘরে রান্নাবান্নার বালাই নেই, বাড়তি কোনো ঝুট-ঝামেলাও নেই।

সিজার তাভেল্লা সন্ধ্যার আবছা আলোয় ঢাকার ফুটপাত ধরে ধীরে ধীরে দৌড়াতে থাকে। স্ট্রিট লাইটগুলো কিছু কিছু জ্বলে উঠেছে, কিছু জ্বলেনি, না-জ্বলা জায়গাগুলোতে অন্ধকার জমাট হয়ে আছে। সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সোফিয়া যেদিন তাকে ছেড়ে যায়, সেই দিনটির কথা মনে পড়ে যায় তাভেল্লার। সোফিয়া স্পষ্টই বলে দিয়েছিল, এভাবে নিজের ক্যারিয়ার ছেড়েছুড়ে তাভেল্লার সঙ্গে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সোফিয়ার চলে যাওয়াটা জমাট অন্ধকার হয়ে তাভেল্লার বুকের ভেতর চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। দুই বছর আর কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্ক হয়নি তার। এ সময়টাতে সোমালিয়ায় একদল পশু ডাক্তারকে উচ্চতর ট্রেনিং দেওয়ার কাজ করছিল তাভেল্লা।

গার্সিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয় আরো পরে, ফিলিপাইনে এসে। অক্সফামের একটা প্রজেক্টে তখন কাজ করছিল তাভেল্লা। আর গার্সিয়া মেশবার্গার ছিল ইউএনডিপিতে। একসঙ্গে একটা প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে তাভেল্লার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। গার্সিয়ার বয়স তাভেল্লার কাছাকাছিই হবে। একটু মোটা ধাঁচের শরীর, বাদামি চোখ আর মাথায় ছোট করে কাটা সোনালি চুলের গার্সিয়া তখনো অবিবাহিতা, তাভেল্লাকে জানিয়েছিল, বিবাহ প্রথায় বিশ্বাস নেই তার। আর সে জন্যই স্বেচ্ছায় বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।

দু-দুজন বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেক-আপ হয়ে যাওয়ার পর ফিলিপাইনে একাই দিন কাটাচ্ছিল গার্সিয়া। সোফিয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর খানিকটা নিঃসঙ্গ ও হতাশ কিন্তু কাজপাগল তাভেল্লার সঙ্গে গার্সিয়ার বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। ম্যানিলায় থাকার ওই সময়টাতে উইকএন্ডগুলোতে প্রায়ই ওয়াইনের বোতল নিয়ে গার্সিয়ার ফ্ল্যাটে সময় কাটাত তাভেল্লা। সময়গুলো মন্দ কাটছিল না দুজনের। তবে এর মধ্যেই কিরগিজস্তানে বদলি হওয়ার চিঠি পায় গার্সিয়া। ওখানে আরেকটা নতুন প্রজেক্টের দায়িত্ব পড়েছে তার ঘাড়ে। গার্সিয়া চলে যাওয়ার পর ম্যানিলার রং ম্লান হয়ে গেল তাভেল্লার কাছে। ছয় মাসের মধ্যে অক্সফামের প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে কাজের অফার পায় তাভেল্লা।

ফোনে খবরটা গার্সিয়াকে জানাতেই খুব উৎসাহ দিল ও। বলল, ‘যাও, যাও, ভালোই হবে। আমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের এক কাজিন অনেক দিন ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিল। আমি ওখানে তোমার কাছে বেড়াতে আসব। ’

‘সত্যি, আসবে?’

‘হুম্, আসব, সামনের ছুটিতেই। ’

কথা রেখেছিল গার্সিয়া। জুন মাসে সত্যিই দুই সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে এসেছিল ও। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গার্সিয়াকে সঙ্গে করে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিনস আর বান্দরবান ঘুরতে গিয়েছিল তাভেল্লা। গরমটা বিচ্ছিরি ছিল, আর ছিল মানুষের ভিড়। এই দুটো ছাড়া বাংলাদেশকে মন্দ লাগেনি গার্সিয়ার কাছে।

গুলশানে নিজের ফ্ল্যাটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয়নকক্ষের নরম বিছানায় গার্সিয়াকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে তাভেল্লা বলেছিল, ‘মানুষই কিন্তু এ দেশের বড় সম্পদ, জানো? কৃষকরা এত পরিশ্রমী...আর এখানকার রোদ এত সুন্দর, এত তীব্র...’

‘এরপর কিরগিজস্তানে আমার প্লেসে আসো তুমি। ওখানকার লেক আর পাহাড় খুব ভালো লাগবে তোমার। ’ গার্সিয়া তার বুকে মাথা রেখে বলেছিল।

‘যাব। এখনকার কাজটা একটু গুছিয়ে নিই। ’ তাভেল্লা গার্সিয়ার সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ... গার্সিয়ার সঙ্গে সেই সুন্দর কল্লোলিত দিনগুলোও ফুরিয়ে গেল কত তাড়াতাড়ি।

এতক্ষণে দৌড় শুরুর আগের ওয়ার্ম আপ করা হয়ে গেছে তাভেল্লার। শরীরে তাপ বেড়েছে, গরম লাগছে তার, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ধীরে ধীরে দৌড়ানোর গতি বাড়াতে থাকে তাভেল্লা। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের টি-শার্ট আর সুতির ঢিলেঢালা ট্রাউজার। পায়ে নরম কেডস। মাথার পাতলা সোনালি চুলগুলো লেপ্টে আছে করোটির সঙ্গে। ৮৭ নম্বর রোড পেরিয়ে ৮৮ নম্বরে ঢুকল তাভেল্লা, সব শেষে ৯০ নম্বর রোডে এক চক্কর দিয়ে আবার বাড়ি ফেরার পথ ধরবে সে, প্রতিদিনই এভাবে দৌড়ানোর অভ্যাস তার, এক চক্করে ঘড়ি ধরে ৪০ মিনিট সময় লাগে তার। বাড়ি ফিরে বড় এক গ্লাস ঠাণ্ডা জুস খেয়ে কিছুক্ষণ কার্পেটে শবাসনে বিশ্রাম নেয় তাভেল্লা। তারপর হালকা গরম পানিতে একটা দুর্দান্ত শাওয়ার। বেশ ফ্রেশ একটা অনুভব হয় তখন।

আগামী সপ্তাহে প্রজেক্ট এরিয়া জামালপুর আর গাইবান্ধায় যেতে হবে, হেড অফিসে পাঠানোর জন্য একটা অগ্রগতি রিপোর্ট লিখতে হবে—একটা বাঁক নিয়ে ৯০ নম্বর রোডে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে নিজের সাপ্তাহিক কাজগুলো গুছিয়ে নেয় সিজারে তাভেল্লা। রোডটায় মানুষজন খুব বেশি নেই, স্ট্রিট লাইটগুলোও ঠিকমতো জ্বলছে না। এ দেশে এসব স্বাভাবিক ঘটনা। একটা ছোট্ট টং দোকানের সামনে চার-পাঁচজন লোকের জটলা। একটা কাঠের বেঞ্চে বসে কাচের গ্লাসে ভরা দুধ-চাতে টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে খাচ্ছে কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ। বড় বড় পায়ে দৌড়ে ওদের পেরিয়ে যায় তাভেল্লা। তখন সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা বাজে, আর একটু এগোলেই গুলশান ২ নম্বরের ৯০ নম্বর রোডের শেষ মাথায় পৌঁছে যাবে সিজারে তাভেল্লা। তারপর ঘুরে বাড়ির দিকে ফেরা। তাভেল্লা কনুইয়ের কাছে ভাঁজ করা হাত দুটো নাড়িয়ে প্রতিদিনের মতো ধীরেসুস্থে দৌড়াতে থাকে। আর মাত্র কয়েক পা, তার পরই ফিরবে সে, ঘোরার জন্য প্রথমে ঘাড় ফেরাল তাভেল্লা, আর তখনই মাথায় একটা প্রচণ্ড ধাক্কার মতো লাগল তার, মনে হলো মগজ কেটে তীক্ষ ধারালো কিছু একটা বেরিয়ে গেল। দৌড় থামাল না তাভেল্লা। শুধু সিনেমার মতো তার চারপাশের দৃশ্যাবলি পাল্টে যেতে থাকল, গুলশানের রাস্তা থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে তাভেল্লা চলে গেল কাসোলা ভালসেনিওর রাস্তায়, ওখানে ডিমের কুসুমের মতো লাল সূর্যের আলোয় হালকা কমলা রঙের স্নিগ্ধ ভোর নামছে, সেই আলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লাল টালি বসানো ছোট ছোট সাদা রঙের ঘরবাড়ি, বাড়ির সামনে সবুজ ঘাসের লন, ছোট বাগান, দেবশিশুরা হাত-পা ছুড়ে খেলছে সেখানে। সিজারে তাভেল্লা দৌড়াচ্ছে, সোফিয়া পুরনো দিনগুলোর মতো সকালের স্নিগ্ধ আলোতে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে, তার হাতে একগোছা টকটকে লাল গোলাপ।

ছোট্ট লরা একটা নীল রঙের বাইসাইকেল চালাচ্ছে, বাতাসে তার পাতলা সোনালি চুল উড়ছে। লরা হাত নাড়ছে বাবাকে দেখে...কিন্তু সিজারে তাভেল্লা থামতে পারছে না, তার পা যেন তার নিয়ন্ত্রণে নেই, পাগুলো দৌড়াচ্ছে স্বেচ্ছায় স্বয়ংক্রিয় স্বতঃস্ফূর্ততায়। তাভেল্লা দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে...এই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকা পথের শেষ কোথায়? কী আছে শেষে? কেউ কি জানে?

 

৩.

বাংলাদেশে ইতালীয় নাগরিক খুন

সন্ত্রাসী হামলায় ইতালির নাগরিক সিজারে তাভেল্লা নিহত হওয়ার ঘটনায় এনজিও সংস্থা আইসিসিওর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেলেন ভেন্ডার ভিত বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে গুলশান থানায় মামলা করেছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সিজারে তাভেল্লার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তার শরীরে একটি বুলেট ও পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক চিকিৎসকরা। এই হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি বলে জানান তিনি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট মাঠে নামলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এদিকে সাইট নামের একটি ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস এই হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে।

 

৪.

ক্রিকেট ক্রিকেট

ক্রিকেট আর রবীন্দ্রসংগীত—এ দুই বিষয়ে মহাবিশেষজ্ঞই বলা চলে নুরুল কবিরকে। রবীন্দ্রনাথের কোন গানটি পূজা পর্যায়ের, কোনটা প্রকৃতি আর কোনটা প্রেম তা চোখ বন্ধ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে দিতে পারেন তিনি। অনেক অপ্রচলিত রবীন্দ্রসংগীতের লাইনও তাঁর ঠোঁটের ডগায়। আবার দেশ-বিদেশের ক্রিকেটের স্কোরও তাঁর মুখস্থ। ক্রিকেটবিশ্বে কার স্ট্যাটাস কী, কে কেমন খেলছে, তা হয়তো তাঁর চেয়ে বেশি এই পাড়ার কেউ জানে না।

সেই নুরুল কবিরও আজ অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিমের ওপর মহা বিরক্ত। কত দিন ধরে ভেবে রেখেছিলেন দারুণ ফর্মে থাকা টাইগারদের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন ক্যাঙ্গারুদের ফাইটটা জমিয়ে দেখবেন তিনি। অথচ নিরাপত্তার অজুহাতে কী নখরা শুরু করল এরা। এই বলে আসব, এই বলে আসব না।

এদিকে বাংলাদেশের টিম ঘোষণা হয়ে গেছে, খেলোয়াড়রা প্র্যাকটিসও শুরু করে দিয়েছে। এরই মধ্যে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তাপ্রধান শন ক্যারল এসে র‌্যাবের সঙ্গে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার মিটিং করল। সবাই মিলে তাদের বলল, খেলোয়াড়দের গায়ে ফুলের টোকাটিও লাগতে দেওয়া হবে না। তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কোনো ভয় নেই, কোনো ফাঁক থাকবে না নিরাপত্তায়। আর এখন ওরা দেশে ফিরে গিয়ে বলছে, বাংলাদেশ সফর স্থগিত। কেন? তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা নাকি জানিয়েছে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা রয়েছে। অজিদের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। এ জন্য সিরিজ স্থগিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

নুরুল কবির অত্যন্ত দুঃখিত ও হতাশ। জঙ্গি হামলার কারণ দেখিয়ে কোনো দেশ বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলতে আসবে না—এটা মানতেই পারছেন না তিনি।

বাংলাদেশের অবস্থা তো পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো না যে পথে পথে বোমা ফাটছে, শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন রক্তারক্তি ঘটছে। মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই। তা তো না। দূর, এসব একেবারে বাজে অজুহাত। আসলে ওরা ভয় পেয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের তরুণ খেলোয়াড়দের দোর্দণ্ড প্রতাপকে।

নুরুল কবির দৈনিক পত্রিকার চিঠিপত্র কলামে এ বিষয়ে একটি চিঠি লেখার উদ্যোগ নেন। এটা হচ্ছে পত্র লিখে প্রতিবাদ ধরনের উদ্যোগ। যখন তুমি অন্য কিছু করতে পারবে না তখন অন্তত একটি পত্র লিখে প্রতিবাদ তো করা যায়—এই হচ্ছে এই পত্রের পেছনের মূল উদ্দেশ্য। নুরুল কবির কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসেন।

পত্রের শিরোনাম :

কেন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে খেলতে এলো না? প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন :

সম্প্রতি নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে বাংলাদেশে টেস্ট খেলতে এলো না অস্ট্রেলিয়া। এতে দেশবাসী অত্যন্ত মর্মাহত। গত ২০ বছরে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ওপরে উঠে এসেছে, এটা সবাই জানেন। তথাপি পাঠকের সুবিধার্থে আমি কিছু তথ্য দিতে চাই।

জুন ২০১৫ সালে বাংলাদেশ আইসিসি টেস্টে নবম, ওয়ানডেতে সপ্তম এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে দশম স্থানে অবস্থান করছে। তবে বাংলাদেশ এখানেই থেমে থাকবে না। ক্রমাগত উন্নতি করেই যাবে। যাঁরা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, তাঁরাই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ভালোবাসেন। ক্রিকেটপ্রেমী জনতার দেশ বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে ওয়ানডে ক্রিকেটে একটা পরিপক্ব দলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। নিয়মিত জিততে শিখে গেছে বাংলার দামাল টাইগাররা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ১৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়ে ১১টিতে জয় তুলে নিয়েছে টাইগার বাহিনী। এ বছর ক্রিকেটবিশ্বে দ্বিতীয় সেরা অবস্থানে আছে বাংলাদেশ, যা স্বভাবতই অনেকের কাছে গাত্রদাহের কারণ হয়েছে। এ তালিকায় ২৪টি ম্যাচ খেলে ১৮টিতে জয় তুলে নিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এটা এখন পরিষ্কার যে ক্রিকেটে বাংলাদেশ কারো অনুগ্রহের পাত্র নয়। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান এমন নয় যে কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। অনেকেই বলছেন, অস্ট্রেলিয়া নাকি হেরে যাওয়ার ভয়ে খেলতে আসেনি। জনমনে এমন প্রচারণাও আছে যে অস্ট্রেলিয়ার সফর স্থগিত করা ক্রিকেট রাজনীতির একটি চাল। ক্রিকেটবিশ্বের অনেক মোড়ল চান না ক্রিকেটে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নিক। এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা হার-না-মানা জাতি। শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও টিকে থাকা জাতি। একাত্তরে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জাতি। আমাদের হতাশ হলে চলবে না।

...লিখতে লিখতে নুরুল কবিরের চোখে পানি এসে যায়। তিনি কলম বন্ধ করে চিঠিটা আবার প্রথম থেকে পড়তে বসেন। তারপর আবার শুরু করেন...

‘আমরা হতাশ নই। যত ষড়যন্ত্রই হোক, সব ছিন্ন করে আমাদের দামাল ছেলেরা এগিয়ে যাবে। যাবেই। ষোলো কোটি মানুষের শুভ কামনা তাদের সঙ্গে আছে।

বিনীত

নুরুল কবির

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

মগবাজার, ঢাকা।

চিঠি লেখা শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে একটা খামে ঢুকিয়ে আঠা লাগান তিনি। এবার দৈনিক পত্রিকার ঠিকানায় পোস্ট করে দিতে হবে। নুরুল কবির ধৈর্য ধরতে পারছেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে এখনই পোস্ট অফিসে ছুটে যেতে। ঘড়িতে দুপুর বারোটা বাজে। প্রিয়তা, নুরুল কবিরের মেয়ে, ঘরেই আছে। থাকুক। পাঞ্জাবিটা বদলে নিয়ে একটা ছাতা হাতে পোস্ট অফিসের দিকে রওনা দেওয়ার জন্য দরজার ছিটকিনিতে হাত রাখেন আর তখনই পেছন থেকে প্রিয়তার গলা শোনা যায়, ‘কই যাও, আব্বা?’

নুরুল কবির ধরা পড়ে যাওয়া কিশোরের মতো কাঁচুমাচু মুখে বলেন, ‘একটু পোস্ট অফিসে যাচ্ছিলাম রে মা, পত্রিকায় একটা চিঠি লিখেছি...’

প্রিয়তা হাত বাড়ায়। বলে, ‘আমাকে দাও, আমি পোস্ট করে দেব। ’

কবির সাহেব বাধ্য ছেলের মতো মেয়ের হাতে চিঠিটা তুলে দেন। প্রিয়তা বেরিয়ে গেলে বাসাটা একেবারে খালি হয়ে যায়। রান্নাঘরে বৃদ্ধা তাজুর মার ঘটঘট্ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। হাবিবা কলেজ থেকে ফিরবে আরো ঘণ্টা তিনেক পর। আর মাত্র তিন মাস চাকরির মেয়াদ আছে ওর। তারপর নুরুল কবিরের মতোই অবসরে যাবে। সময় কাটানোর জন্য টিভির সামনে বসে কিছুক্ষণ উল্টোপাল্টা রিমোট টিপে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে এসে স্থির হন নুরুল কবির।

সন্ধ্যার পর থেকে টিভির রিমোট চলে যায় হাবিবার হাতে, একের পর এক উদ্ভট সিরিয়াল চলতে থাকে, হাবিবার চশমা পরা বয়স্ক চোখ মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিভি স্ক্রিনে আটকে থাকে। এই সময় ভালো-মন্দ কোনো কথাও বলা যায় না তাঁর সঙ্গে। নুরুল কবিরের ইচ্ছা করে প্রিয়তার বিষয়টা নিয়ে হাবিবার সঙ্গে আলোচনা করতে।

মেয়েটা দেড় মাস ধরে এই বাসায়, অথচ এক দিনের জন্যও জামাই আসেনি। কেন? কোনো গণ্ডগোল হয়েছে কি? কে জানে, মেয়ে তো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। অথচ নিজের পছন্দেই তো রায়হানকে বিয়ে করেছিল সে। প্রথম দেখায়ই ছেলেটাকে কেমন অদ্ভুত লেগেছিল নুরুল কবিরের কাছে। ইয়া ঢ্যাঙ্গা লম্বা, উদাসী চোখ, মাথায় এলোমেলো বাবরি চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, পরনে একটা রংচটা টি-শার্ট, অনেকগুলো পকেটওয়ালা ঢিলেঢালা প্যান্ট, কথা প্রায় বলেই না, সারাক্ষণ মাথা নিচু করে থাকে।

একদিন প্রিয়তা এসে বলল, এই ছেলেকেই তার পছন্দ। একেই বিয়ে করতে চায়।

হাবিবা ছেলে দেখে একটু গাঁইগুঁই করেছিল। জামাই হিসেবে এ রকম উলুঝুলু টাইপের ছেলেকে মোটেও পছন্দ হয়নি তার।

কিন্তু নুরুল কবির বললেন, ‘দেখো, প্রিয়তা তো বড় হয়েছে, ইউনিভার্সিটির মাস্টার। সব কিছু বোঝে। ও যখন সংসার করবে তখন আমাদের আর কী বলার আছে?’

সেই বিয়ে হলো, সংসারও শুরু করল দুজন, অথচ এক বছর যেতে না যেতেই কী হয়েছে কে জানে, প্রিয়তা এসে উঠেছে বাপের বাড়িতে। এখান থেকেই ইউনিভার্সিটি যায়, এখানেই ফিরে আসে। রায়হানের সঙ্গে থেকে থেকে সে-ও হয়তো কম কথা বলা শিখে গেছে। সহজে কথা বলে না, প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় না।

 

 

৫.

পার্টি গোয়িং অন

গুলশানের অভিজাত পাঁচতারা হোটেল ওয়েস্টিনের বলরুম। একটি মৃদু নম্র মিষ্টি আলো ছাদ চুইয়ে নেমে এসে কক্ষটাকে আলো-আঁধারি মায়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নিচু স্বরে বেজে যাচ্ছে হালকা মিউজিক। বিদেশি কোনো দূতাবাসের আয়োজনে একটা পার্টি চলছে সেখানে। আমন্ত্রিতদের বেশির ভাগই বিদেশি। স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশিও আছেন বটে, তবে তাঁরা এলিট শ্রেণির। ক্ষমতা, প্রতিভা ও সুযোগ-সুবিধার কারণে এঁরা সমাজে উত্কৃষ্ট বলে বিবেচিত।

এ ধরনের পার্টিতে বসার জন্য কোনো চেয়ার থাকে না, সবাই দাঁড়িয়ে থাকে, হাঁটে, পরিচিতজনরা একসঙ্গে জটলা পাকায়, লাইন ধরে বুফে খাবার তুলে নেয়, যারা পছন্দ করে তারা মদ খায়, অন্যরা অরেঞ্জ বা আপেল, টমেটো বা পেঁপে, পেয়ারা বা পাইনঅ্যাপেল জুস খায়। গলায় বো বাঁধা স্মার্ট ছেলেরা হাতে ট্রে নিয়ে মদ ও মাংস সার্ভ করে।

রায়হানের সামনে দিয়ে এমন একটি ট্রে যাচ্ছিল, যাতে অলিভ আর ব্ল্যাকবেরি দিয়ে পাতলা লাল মাংসের স্মোকি স্লাইস খুব আকর্ষণীয়ভাবে ভাঁজ করে রাখা ছিল। টুথপিকের মতো চিকন কাঠিতে বিদ্ধ করে অনেকেই সেই সুদৃশ্য মাংসখণ্ড তুলে মুখে পুরছিল।

রায়হান ভাবল একটা নেবে কি না, সে হাত বাড়াল, তারপর কী মনে করে প্রায় ফিসফিস করে খাবার বহনকারী ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কি বিফ, না চিকেন?’

ছেলেটি হাসিমুখে নিচু গলায় বলে, ‘পর্ক, স্যার। ’

শোনামাত্র রায়হান দ্রুত তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত সরিয়ে নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না, আর তখনই সৌম্য শাহাদতকে দেখতে পায় সে। সৌম্যর সঙ্গে একটা মেয়ে, লম্বা, সুন্দর। কে? রায়হান চিনতে পারে না, সৌম্যর স্ত্রী ফারিয়া তো নয় এটা।

‘যা-ই হোক, তোমাকে পেলাম, অনেকক্ষণ পর একজন চেনাজানা মানুষ...’

রায়হানকে দেখতে পেয়ে সৌম্য হাসিমুখে এগিয়ে আসে। রায়হানও হাসে। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে।

‘তোমাদের পরিচয় আছে? নেই? ও আচ্ছা, ও মিতালি হক...’

সৌম্য তার পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে বলে। রায়হান আশা করেছিল, মিতালি হক সম্পর্কে সৌম্য আরো কিছু বলবে। বলবে, ও ভালো অভিনয় করে, গান করে, ছবি আঁকে, মডেলিং করে বা কবিতা লেখে। কিন্তু সৌম্য আর কিছু বলে না। মিতালি রায়হানের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে বেয়ারাদের ট্রে থেকে ফুলের মতো সাজিয়ে রাখা একটা মাংসের টুকরা টুথপিকে গেঁথে মুখে পুরে দিয়ে সৌম্যর কানে কানে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। সুসজ্জিত বেয়ারা ট্রে নিয়ে সরে যেতে চাইলে রায়হান তাকে ডাকে,

‘এটা কী?...পর্ক...?’

‘এটা বিফ অ্যান্ড টার্কি, স্যার...’

‘ও, তাহলে তো খাওয়াই যায়। ’ রায়হান টুথপিকে গেঁথে ক্রিস্টালের ট্রে থেকে লেটুসের সবুজ বিছানায় শুয়ে থাকা মাংসের সুদৃশ্য ফুলটি তুলে নেয়।

হাতে একটা প্লেটে আধা-খাওয়া খাবার নিয়ে অনির্বাণ নন্দী তখন এসে পাশে দাঁড়ান। তিনি দূতাবাসের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, রায়হানের সঙ্গে সামান্য চেনাজানা আছে তাঁর। আচরণ দেখে মনে হলো, সৌম্যর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়তো আরেকটু বেশি।

‘১৮৯৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দ বিলেতে গরুর মাংস খেয়েছিলেন, জানেন? নিয়মিতই খেতেন। পরে অবশ্য খাওয়া ছেড়ে দেন। নিরামিষভোজী হয়ে যান। বাট আই লাইক বিফ...ভেরি সফট অ্যান্ড ডেলিশাস...’

অনির্বাণ নন্দী সম্ভবত বিফ কাবাব চিবুতে চিবুতে বলেন।

‘গরুর মাংস খাদ্যতালিকায় রাখা তো দোষের না। শুয়োরও রাখতে পারে, যার ভালো লাগে। ’

মিতালি একটু উষ্মার সঙ্গে বলে।

সৌম্য বোধ হয় বিষয়টা হালকা করতে চায়।

রায়হানের তখন পাশাপাশি দুটি ঘটনা মনে পড়ে, একটা খুবই সাম্প্রতিক।

কিছুদিন আগে বিবিসি নিউজ করেছিল, ভারতের উত্তর প্রদেশে দাদরি গ্রামে বাড়িতে গরুর মাংস রেখে খাওয়ার গুজবে মোহাম্মদ আখলাক নামের ৫০ বছর বয়সী এক মুসলমান ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরেছে এলাকার মানুষ। আখলাকের পরিবার যদিও বলেছে, তাদের ফ্রিজে খাসির মাংস ছিল, গরুর মাংস নয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ওর বন্ধু তপনের। রায়হানদের গ্রামের মেথরপাড়ায় তখন শুয়োর পালা হতো। নোংরা, কাদায় গড়াগড়ি খাওয়া গোলগাল কালো লোমশ প্রাণীগুলো দেখে গা ঘিনঘিন করত রায়হানের। কাদামাখা শুয়োরগুলো দেখিয়ে রায়হান একদিন বলেছিল—

‘আচ্ছা তপন, তোরা এসব শুয়োর কেমনে খাস? ঘেন্না লাগে না?’

তপন দাঁত বের করে হেসে বলত। ‘শোন, গরু যখন ঘাস খায়, তখন ঘাসের মধ্যে মানুষের ইয়েটিয়ে থাকলে সেটাও তো খায়, হে হে হে...তাই বলে কি গরুকে তোরা ঘেন্না করিস? আসলে এসব কিছু না, তোদের খাওয়ার অভ্যেস নেই, তাই এসব বলছিস...’

এই তপন কিন্তু কোরবানির ঈদ এলেই রায়হানদের বাড়ি এসে বাটি ভরা গরুর মাংস খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলত। ... অবশ্য বড় হয়ে রায়হান যখন টিভিতে বা পত্রিকায় সাদা সাদা মোটাসোটা গোলগাল শূকরের ছবি দেখেছে, দেখেছে তাদের গোলাপি ঠোঁট আর আয়েশি চেহারা, তখন আর ছোটবেলার ঘেন্নাবোধটা তার মনে টিকে থাকেনি। তার পরও শূকরের মাংস শুনলে এখনো তার খাওয়ার রুচি হয় না।

রায়হানের ইচ্ছা করে, এখানে, এই খাবার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আড্ডা দেওয়া মানুষগুলোর কাছে এই বিষয়টা বলে।

কিন্তু বাস্তবে রায়হান কিছুই বলে না। চুপচাপ কাঁটাচামচের ঘায়ে প্লেটে রাখা ল্যাম্ব রোস্টের একটা টুকরো ঘায়েল করার চেষ্টা করতে থাকে।

এরা এত চিজ খায়, সব খাবারে চিজ...’

মিতালি কাঁটাচামচ দিয়ে তার প্লেটে নেওয়া খাবার নাড়তে নাড়তে বলে।

‘চিজ কিন্তু ক্লাসিক খাবার। চিজের হিস্ট্রি জানো? পৃথিবীতে ছয় হাজার বছর আগেও চিজ ছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। রোমান যুগে চিজ চলত, মিসরেও ছিল। তবে ইন্টারেস্টিং তথ্য হচ্ছে, এক অ্যারাবিয়ান মানে মরুবাসী বেদুইন নাকি প্রথম অ্যাকসিডেন্টালি চিজ বানিয়ে ফেলেছিল, ভেড়ার চামড়ার থলেতে রাখা দুধ মরুভূমির তাপে-চাপে পনির হয়ে গিয়েছিল...’

সৌম্য সব বিষয়ে এত জানে, রায়হান অবাক হয়, সে-ও মোটামুটি পড়ালেখা করে, কিন্তু মনে রাখতে পারে না, ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে মোক্ষম গল্পটিও জুড়ে দিতে পারে না। পরে মনে হয়—আহা, ওখানে তো ওটা বলা যেত। কী যে অক্ষমতা এটা...

মিতালি হক তার বড় বড় চোখ মেলে সৌম্যর দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর আহ্লাদী গলায় বলে, ‘আপনি এত কিছু জানেন, সৌম্যদা...’

রায়হানের তখন মিতালিকে খুব চেনা চেনা লাগে। মনে হয় ওকে আগেও কোথায় যেন দেখেছে, কিন্তু সেটা কোথায়, তা আর মনে পড়ে না তার।

মিতালি আর সৌম্য অন্যদিকে চলে গেলে রায়হান কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থেকে হলের অন্য কোনায় ডেজার্ট নেওয়ার জন্য পা বাড়ালে একটা বিখ্যাত কাগজের প্রবীণ সম্পাদক মহসীন হোসেনের মুখোমুখি হয়ে যায়। রায়হান সালাম দেয়।

ভদ্রলোকের হাতে মদের গ্লাস, তিনি ঢুলু ঢুলু চোখ তুলে তাকান—

‘এই যে, তুমি? তুমি ফটোগ্রাফি করো না...ওই যে সেবার সাইক্লোনের ছবিগুলো তুলেছিলে, খুব ভালো হয়েছিল...কী যেন নাম তোমার?...’

মহসীন ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি প্রখর বলে বাজারে সুনাম আছে, সেই সুনামের সত্যতা প্রমাণ করেই হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে রায়হানের নামটাও বলে ফেললেন তিনি। রায়হান এবার সত্যিই অভিভূত। তার মতো একজন অকিঞ্চিত্কর ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, ব্র্যাকেটে চাকরিহীন, বেকার, ভবঘুরে একটা লোককে শনাক্ত করা...রায়হান কৃতজ্ঞতায় কুঁকড়ে যায়।

‘নাও, নাও, এদের হুইস্কিটা ভালো...’

মহসীন ভাই আদর করে একটা গ্লাস বাড়িয়ে দিলে  রায়হান সেটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মহসীন ভাই ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বলে যান, ‘ওয়ান পিকচার ইজ ওর্থ এ থাউজেন্ড ওয়ার্ডস, ইউ নো। একটা ভালো ফটোগ্রাফি সংগীতের মতো, সাউন্ডলেস মিউজিক। কিন্তু এখন জানো, দুনিয়াজোড়া একটা মেজর ইস্যু হয়ে গেছে ফটো ম্যানিপুলেশন। এখনকার ফাকিং ডিজিটাল ক্যামেরায়...’

‘এফ ওয়ার্ড বলে আবার পরিবেশ দূষিত করছেন কেন, মহসীন ভাই?’

আরেক জাঁদরেল সাংবাদিক এসে মহসীন হোসেনের সামনে দাঁড়ালে রায়হান আস্তে করে সেখান থেকে কেটে পড়ে। দুই চুমুকে হুইস্কির গ্লাস খালি করে, ডেজার্টের সমাহার থেকে পুডিং আর চকোলেট কেক তুলে নিতে নিতে রায়হানের হঠাৎ মনে হয়, এই এলিটদের মধ্যে সে কেন? কোন বিবেচনায়? সচরাচর এসব নিমন্ত্রণ তো তার কপালে জোটে না। এবার কেন জুটল? মনে মনে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আনমনে এক চামচ পুডিং মুখে দেয় সে। আর তখনই চট করে কারণটা খুঁজে পায় রায়হান। কিছুদিন আগে দূতাবাসের একটা প্রগ্রামের ছবি তুলে দিয়েছিল সে, কাজটা ছিল আসলে ফারুকের, কিন্তু ওর হঠাৎ প্যারিসে একটা স্কলারশিপ হয়ে যাওয়ায় সে কাজটা রায়হানের কাঁধে গছিয়ে দিয়ে যায়। বিদেশিদের কাজ করলে অবশ্য মালপানি ভালোই পাওয়া যায়, রায়হানের এক মাস চলার মতো খরচা উঠে গিয়েছিল। সম্ভবত সেই সূত্র ধরেই দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাকে দাওয়াতপত্র পাঠিয়েছে। যাক, কারণটা আবিষ্কার করে স্বস্তি বোধ করে রায়হান।

তবে সত্যি বলতে কি, পার্টির এই ফাঁপা ভাবগম্ভীর পরিবেশে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না সে। বরাবরের মতোই তার মনে হয়, লুকিয়ে পড়ি কোথাও, কোনো ঘন লম্বা গাছে ছাওয়া বনে-জঙ্গলে, হরিণ-বানর-সাপ-বাঘের সঙ্গে কিংবা কোনো অখ্যাত গ্রামে-গঞ্জে-বাজারে, রাস্তার পারের চায়ের দোকানে, কোনো ধু ধু প্রান্তরে, স্বাধীন শূন্যতায়, এসব পার্টিফার্টিকে বড় মেকি আর কৃত্রিম মনে হয় তার, মনে হয় প্রাণহীন কিছু মানুষ মাপা মাপা কথা, মাপা মাপা আচরণ করে যাচ্ছে।

হাতের পুডিংটা শেষ করেই বলরুম ছেড়ে বেরোনোর পাঁয়তারা করে রায়হান। পাশ দিয়ে যেতে যেতে একজন সাদা চামড়ার বিদেশি নারী ভদ্রতাসূচক ‘হাই’ বলে। পাল্টা একটা ভ্যাবাচ্যাকা মার্কা হাসি দিয়ে কাউকে কিছু না বলে সন্তর্পণে বেরিয়ে পড়ে রায়হান। পেছনে পার্টি চলুক। চলতে থাকুক। সে একাই চলে যাবে তার নিজস্ব ভুবনে।

লবিতে আবার সৌম্য আর মিতালির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার। দুজন কী যেন বলাবলি করছিল, রায়হানকে দেখে এগিয়ে আসে সৌম্য।

‘এই যে রায়হান, কোন দিকে যাবে তুমি?’

সৌম্যর এ প্রশ্নে বিপদে পড়ে যায় রায়হান। আপাতত কোথায় যাবে, তা নিয়ে কিছু ভাবেনি সে। কখনোই ভাবে না। মোটরসাইকেলটা চালু করার পর হয়তো ভাববে, কোথায় যাওয়া যায়। তার শূন্য ফ্ল্যাটে, কোনো পত্রিকা অফিসে, বন্ধুদের আড্ডায়, নাকি প্রিয়তাদের বাসায়।

‘প্রেস ক্লাবের দিকে...’ কোনো কিছু না ভেবেই বলে দেয় রায়হান।

‘গুড। তুমি তাহলে মিতালিকে একটু নামিয়ে দিয়ে যাও। ’

‘আমার তো মোটরসাইকেল, সৌম্যদা। ’

‘অসুবিধা নেই, আমি দিব্যি আপনার পেছনে বসে যেতে পারব। ’

এবার চটপটে ভঙ্গিতে বলে মিতালি।

মেয়েদের পেছনে বসিয়ে গাড়ি চালাতে খানিকটা অস্বস্তিই লাগে রায়হানের। প্রিয়তা কখনোই তার মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ত না।

‘ওই রকম বাঁকা হয়ে বসতে ভালো লাগে না আমার। খুব আনকমফোর্টেবল লাগে। ’

বলত প্রিয়তা। মিতালি কিন্তু দিব্যি গ্যাঁট হয়ে বসে গেল রায়হানের সিটের পেছনে, এমনকি এক হাত দিয়ে ওর কাঁধও চেপে ধরে রইল। রাস্তার ঝাঁকুনিতে তাল সামলাতে না পেরে কয়েকবার রায়হানের পিঠে এসে মৃদু ধাক্কাও খেল মিতালি। রায়হান শুধু ভাবছিল, এই দৃশ্য যদি প্রিয়তা দেখতে পায় তাহলে কী প্রতিক্রিয়া হবে তার। কিংবা যদি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ দেখে ফেলে আর প্রিয়তার কাছে গিয়ে রসিয়ে রসিয়ে সেই কথা বলে, তাহলে? অবশ্য এখন বেশ রাত, রাস্তার হালকা আলোয় অনেকেই হয়তো চিনতে পারবে না তাদের।

‘মগবাজার মোড়ে আমাকে নামিয়ে দিয়েন। ’

রাস্তার গাড়ি আর বাতাসের শব্দ এড়াতে রায়হানের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে মিতালি।

মোটরসাইকেলের ঝাঁকুনিতে মিতালির ঠোঁট আলতোভাবে রায়হানের কানের লতি স্পর্শ করলে হঠাৎ গা কেমন শিরশির করে ওঠে তার। প্রথম প্রথম প্রিয়তার স্পর্শ পেলে যেমন শিহরণ লাগত ঠিক তেমন, দেড়-দুই মাস হতে চলল প্রিয়তা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কবে আসবে? আদৌ আসবে কি না, জানে না রায়হান, প্রিয়তা জানায়নি, আসলে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।

‘এখানেই রাখেন, নামব। ’

মিতালির কথায় একটা অন্ধকার গলির সামনে দ্রুত ব্রেক চাপে রায়হান, আর তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটে। গলির ভেতর থেকে একটা রিকশা এসে হুড়মুড় করে মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা খায়। রায়হান শক্ত হাতেই মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে রেখেছিল, কিন্তু নামতে গিয়ে ভারসাম্য রাখতে না পেরে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায় মিতালি। যদিও পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ায় সে, কিন্তু হাঁটতে গিয়েই ঘটে বিপত্তি। কিছুতেই পা ফেলতে পারে না। ব্যথায় সুন্দর মুখটা কুঁচকে যায় ওর।

রায়হান মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে তাড়াতাড়ি মিতালির হাত ধরে—

‘ব্যথা লাগছে বেশি? আমার ওপর ভর দেন...আমি খুব স্যরি যে এ রকম একটা অ্যাকসিডেন্ট হলো...’

‘না না, ঠিক আছে, আপনার কী দোষ বলেন? এটা তো আর আপনি ইচ্ছা করে করেননি। ...আমি পারব, ওই তো এই গলির মুখেই আমার বাসা, একটু চেষ্টা করলেই ঠিক চলে যেতে পারব। ’

রায়হান হাত ছেড়ে দিলে একাই সামনের দিকে পা বাড়ায় মিতালি, কিন্তু এগোতে না পেরে ‘উফ্্’ শব্দ করে থেমে যায় সে। এবার রায়হান আবার এগিয়ে আসে। একটু জোর দিয়েই বলে—

‘ধরেন তো আমার হাত, কিচ্ছু হবে না, চলেন তো, আমি আপনাকে দিয়ে আসছি। ’

মিতালির বাসাটা দোতলায়। পুরনো ধাঁচের বাসা। লিফট নেই। দরজায় বেল টিপলে কঠিন চেহারার এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা এসে দরজা খুলে দেয়, তার পেছনে উঁকি দেয় চার-পাঁচ বছর বয়সী মিষ্টি চেহারার একটা ছেলে।

‘কী হইছে তোমার, মামমাম?’

কচি গলায় উদ্বেগের ছোঁয়া লাগিয়ে জিজ্ঞেস করে বাচ্চাটা।

‘কিছু না বাবা, পায়ে একটু ব্যথা পাইছি, ঠিক হয়ে যাবে। ’ মিতালি আদুরে গলায় বলে।

রায়হান মিতালিকে ধরে এনে সাবধানে সোফায় বসায়। বিশেষ কাউকে উদ্দেশ না করেই বলে—

‘বাসায় একটু বরফ থাকলে ভালো হতো। পায়ে বরফ ঘষলে আরাম হবে। ’

কঠিন চেহারার ভদ্রমহিলাটি ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই এক বাটি বরফ আর একটা গামছা নিয়ে ফিরে আসে। মিতালি গামছায় বরফ পেঁচিয়ে নিজেই তার ফুলে ওঠা পায়ের ওপর চেপে ধরে। ছোট ছেলেটা খুব মনোযোগ দিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। মিতালি বলে—

‘এ আমার ছেলে ফাইয়াদ। আংকেলকে সালাম দাও, বাবা। ’

মায়ের পায়ের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই ফাইয়াদ যান্ত্রিকভাবে বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম, আংকেল। ’

মিতালি মাঝবয়সী মহিলাকে দেখিয়ে বলে, ‘উনি আমার মা। ’

রায়হান ভদ্রতা করে হাত তুলে সালাম দেয়। মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে চোখ সরু করে রায়হানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার তাকানো দেখে রায়হানের নিজের শাশুড়ি, প্রিয়তার মা হাবিবার কথা মনে পড়ে। তিনিও এভাবেই সন্দেহ-ঘৃণা আর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাতেন ওর দিকে, প্রিয়তার সঙ্গে রায়হানের সম্পর্কটা পছন্দ করেননি তিনি, মিতালির মা-ও হয়তো অপছন্দ করছে তাকে।

রায়হানের মনে হয় এবার তার ওঠা উচিত।

‘আচ্ছা, আসি আমি। আশা করি পায়ের ব্যথাটা সেরে যাবে। ’

‘অনেক কষ্ট দিলাম আপনাকে। কিছু মনে করবেন না। ’

মিতালি হয়তো ভদ্রতা করেই বলে।

‘না না, কষ্ট আর কী?’ রায়হান বলে। ফাইয়াদ তখন শেখানো বুলির মতো বলে—

‘আবার আসবেন আংকেল। ’

রায়হান মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে। মিতালিকে এবার চিনতে পেরেছে সে। টেলিভিশনে খুব কড়া কণ্ঠে টক শো করে। আজকালকার মেয়েদের দেখলে বোঝাই যায় না বাচ্চা আছে বা বিয়ে হয়েছে। কচি কচি মিষ্টি চেহারা। বাচ্চা যখন আছে তখন স্বামীও নিশ্চয়ই আছে। মিতালির স্বামী কী করে, কে জানে? যাক গে এসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো।

রায়হান তার মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয়। আর তখনই ফোন বেজে ওঠে। প্রিয়তার ফোন।

‘ডিসটার্ব করলাম? তোমার নতুন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ভালোই আছো, তাহলে? এত অল্প দিনেই অনুরাগী জুটে গেল, অভিনন্দন...’

প্রিয়তার কণ্ঠে শ্লেষ। রায়হান কিছু একটা বলতে যায়, কিন্তু কিছু না শুনেই ফোনটা কেটে দেয় প্রিয়তা। মোটরসাইকেলের সিটে বসে মাটিতে পা রেখে ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকায় রায়হান। তার নির্মলেন্দু গুণের কবিতার কথা মনে পড়ে, প্রিয়জন চলে গেলে মানুষই ব্যথিত হয়, অথচ আকাশ থেকে কত তারা খসে যায়, মহান আকাশ তবু থাকে নির্বিকার, মানুষ কত সহজে দুঃখ পায়, আকাশ কি দুঃখ পায়? হে ঈশ্বর, আমাকে আকাশ করে দাও।

 

৬.

লজ্জিত ঘাস

হেমন্তের মধ্যরাত। মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। রংপুর শহরের সব মানুষ সারা দিনের কাজকর্ম সেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাস্তাঘাটে সুনসান নীরবতা। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের সামনে এসে থামল একটা অ্যাম্বুল্যান্স আর চারটা সরকারি গাড়ি। গাড়িবহরের সামনের সাদা জিপ থেকে দ্রুত নেমে এলেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। অন্য গাড়িগুলোর একটাতে পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আরেকটাতে মেয়র কার্যালয়ের সেক্রেটারি ও আরো কয়েকজন লোক। বাকি গাড়ি দুটিতে আছে গোটা দশেক পুলিশ কনস্টেবল ও দুজন তরুণ মৌলবি।

আগেই হয়তো এখানে খবর দেওয়া ছিল। তাই বেশিক্ষণ সময় লাগল না। একটু পরেই, হিমঘরের বরফঠাণ্ডা কেবিন থেকে মৃত্যুর ১০ দিন পর বের করে আনা হলো পলিথিনে মোড়ানো একজন মানুষের শক্ত-শীতল মৃতদেহ।

মরদেহটা কাঠের কফিনে ভরে দ্রুত তুলে নেওয়া হলো অ্যাম্বুল্যান্সে। দাঁড়িয়ে থেকেই চটপট কয়েকটা প্রয়োজনীয় কাগজে সই করলেন প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। তারপর, চাপাস্বরে কারো কাছে জানতে চাইলেন, ‘হয়েছে?’

নিস্তব্ধ রাতে সেই চাপা কথাটাই খুব জোরে শোনা গেল।  

‘ইয়েস স্যার। ’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন সঙ্গে থাকা কেউ একজন।

‘চলেন, তাহলে রওনা দেওয়া যাক। ’

চারটি গাড়ি আর একটি অ্যাম্বুল্যান্স রংপুর শহরের নীরব রাস্তা চিরে দ্রুতবেগে ছুটে চলল তিন কিলোমিটার দূরের মুন্সীপাড়া পৌর কবরস্থানের দিকে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো আর বড় কবরস্থান এটি। আগে থেকেই নির্দেশনা থাকায় কবর খুঁড়েই রাখা হয়েছিল।

কাঠের কফিনটা সামনে রেখে জানাজা পড়ানোর প্রস্তুতি নিলেন একজন মৌলবি। পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল কয়েকজন মানুষ। তারা মৃতদেহের সঙ্গে আসা পুলিশ ও সরকারি লোকজন, কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক, গোর খোদক, পার্শ্ববর্তী কেরামতিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন ও কবরস্থানে ঘুরতে থাকা দু-একজন ভবঘুরে।

‘আল্লাহু আকবর’ ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তাকবির পড়ে উচ্চ স্বরে জানাজার নিয়ত করলেন মৌলবি সাহেব। তারপর দোয়া পড়লেন, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি হ্যায়্যিনা ওয়া মায়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা...

হে আল্লাহ আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, বালক ও বৃদ্ধ, পুরুষ ও স্ত্রী লোকদিগকে ক্ষমা করো...’

কাতারের একটু পেছনে আলাদা হয়ে একাই দাঁড়িয়ে থাকলেন প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। হাত দুটি শক্ত করে বুকের কাছে বেঁধে, চোখ বন্ধ করে, মনে মনে প্রার্থনা করলেন,

‘অকারণে খুন হয়ে যাওয়া এই ভিনদেশি মানুষটির আত্মার শান্তি দিয়ো ভগবান। ’

কুনিও হোশি ওরফে গোলাম কিবরিয়ার দাফন যখন শেষ হলো, তখন সুবেহ সাদেকের নরম আলো এসে পড়েছে পৃথিবীতে। ছাইরঙা শহরটা সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন এসেছিল তেমনভাবেই দ্রুত ফিরে যাচ্ছে একটা অ্যাম্বুল্যান্স ও চারটা সরকারি গাড়ি।

 

৭.

সাইদুর রহমান যখন প্রথম জাপানে যায়, তখন তার ধারণাই ছিল না যে জাপানের মতো এত ধনী, উন্নত আর আধুনিক দেশেও জীর্ণ, মলিন, পোশাক পরা ভিখারি গোছের মানুষ থাকতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটা দরিদ্র দেশে দরিদ্র মানুষ থাকবে এ তো জানা কথাই। কিন্তু জাপানে এই দরিদ্র মানুষরা কেন?

সে নিজে হতদরিদ্র অবস্থায় সেই ১৯৭৮ সালে বহু ঘাটের পানি খেয়ে শেষ পর্যন্ত জাপানে এসে ঠাঁই নিয়েছিল। টোকিও শহরের সেই হাড় কাঁপানো শীতে একটা অপরিচিত দেশে, আত্মীয়-পরিজনহীন অবস্থায় দয়াপরবশ হয়ে তাকে আশ্রয় দিয়েছিল স্নেহময়ী বুড়ি তানাকা মেগুমি। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত সাইদুর মা ডেকেছিল সেই দয়ালু মমতাময়ী নিঃসন্তান জাপানি বুড়িকে। মা শুধু তাকে আশ্রয়ই দেয়নি, পালিত কন্যা আইকোর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, নিজের ছোট্ট রেস্টুরেন্টের ভারও বিশ্বাস করে তুলে দিয়েছিল সাইদুরের হাতে।

মেগুমির প্রত্যাশা মতোই সাইদুর যত্ন করে ব্যবসা বাড়িয়েছে, তার হাতে সেই ছোট্ট রেস্টুরেন্ট আরো বড় হয়েছে, কিন্তু বুড়ি মেগুমির উপদেশ মতো এখনো সকালবেলা নিজ হাতে দোকান খোলে সাইদুর, কর্মচারীদের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে সে আর আইকো।

ভবঘুরে কুনিও হোশির সঙ্গে তার দেখা হয় একদিন সকালে রেস্টুরেন্ট খোলার সময়। সাইদুর হঠাৎ করে খেয়াল করে, তার রেস্টুরেন্টের দরজা ঘেঁষে ফুটপাতের ওপর কেউ একজন গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। সাইদুর কাছে গিয়ে, ভালো করে তাকিয়ে দেখে লোকটাকে, শতছিন্ন একটা কোট গায়ে এক মাঝবয়সী হতদরিদ্র জাপানি, চোখ দুটো বন্ধ।

‘নানো ওশিতে ইরো নো দেস কা? কি করছ তুমি এখানে?’

একটু উঁচু গলায় জানতে চায় সাইদুর। ধড়ফড় করে উঠে বসে শুয়ে থাকা জাপানি লোকটা। ভয় পাওয়া গলায় বলে, ‘নানিমো নাইন। ইয়েকোতে তোয়ত্তে মাস। কিছু করছি না, শুয়ে আছি শুধু। ক্ষমা করো। ’

সাইদুরের হঠাৎ কেমন মায়া হয়, লোকটার অসহায় শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে, কেন যেন নিজের মৃত বাবার মুখটা মনে পড়ে যায় তার। বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা তীব্র ধাক্কা খায় সে। নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,

‘তাবে মাস তাকা? খেয়েছ কিছু?

শুকনো মুখে মাথা নাড়ে লোকটা। ‘ইয়ে। ’

ভবঘুরে লোকটাকে রেস্টুরেন্টের ভেতর নিয়ে বসায় সাইদুর। আইকোকে ডেকে বলে কিছু খাবার দিতে। বুভুক্ষুর মতো গোগ্রাসে খাওয়া শেষ করে লোকটা। এর মধ্যেই সাইদুর প্রশ্ন করে জেনে নেয়, ওর নাম কুনিও হোশি, ধনী দেশের এক গৃহহীন দরিদ্র নাগরিক সে। হিনোহারা গ্রামে বাপের সামান্য জমি পেয়েছিল কুনিও, চাষাবাদও করত। একটা সময় কুসঙ্গে পড়ে মদ আর জুয়ার নেশায় ডুবে যায়। জমি হারায়, একদিন বউও ছেড়ে চলে যায় তাকে। এর পর থেকে কপর্দকহীন অবস্থায় জাপানের শহরগুলোতে ঘুরে বেড়ায় হোশি। মানুষের বারান্দায়, পার্কে, রেলস্টেশনের বেঞ্চে রাত কাটায়। মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে দিনমজুরি করে, কদিন ধরে জ্বরে ভুগে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে সে, কাজকর্মও করতে পারছে না। তাই অসুস্থ শরীরে রাতে এসে শুয়ে পড়েছে এখানে।

কুনিও হোশিকে আশ্রয় দেয় সাইদুর।

ওষুধ খাওয়ায়, সুস্থ করে তোলে। হোটেলের টুকটাক কাজে এখন সাহায্য করতে পারে বুড়ো লোকটা। কিন্তু সাইদুর তাকে পছন্দ করলেও আইকোর দুচোখের বিষ যেন কুনিও হোশি। সারাক্ষণই গজগজ করে, ‘বুড়োটা একটা মিচকা শয়তান, ভালো মানুষের মতো মুখ করে থাকে এখন, কিন্তু সুযোগ পেলেই দেখবে সব চুরি করে পালাবে, এদের একেবারে বিশ্বাস করি না আমি। ’

সাইদুর বউকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘দেখো, গরিব মানুষ ও। বেচারা থাকুক না আমাদের সঙ্গে...’

‘ইয়ে...না। থাকতে পারবে না ও। তাড়াতাড়ি বিদায় করো ওকে। ’

গৃহের এই অশান্তির ব্যাপারটা ঠিকই টের পেয়ে যায় বুড়ো। একদিন নিজে থেকেই বলে—

‘মেলা দিন তো থাকলাম বাবা, শরীরটাও ঠিক হয়েছে, এবার বিদায় দাও। অন্য কোথাও যাই। ’

‘কই যাবা তুমি?’ সাইদুর জিজ্ঞেস করে।

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর চোখ তুলে বলে, ‘পথের মানুষ পথেই ফিরে যাব। ’

সাইদুরের মাথায় হঠাৎ করেই অন্য একটা চিন্তা খেলে যায়। সাত-পাঁচ না ভেবেই সে জিজ্ঞেস করে, ‘ওয়াতামিনু কুনিনি ইকো না দারোকা? আমার দেশে যাবা?’

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত এক অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ যেন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। একটুও ইতস্তত করে না সে। বলে, ‘হাইয়ি। ইকি মাস। ’

কুনিওর কাছে বাংলাদেশ মানেই সাইদুরের দেশ। যেহেতু সাইদুর ভালো মানুষ, তাই তার দেশের মানুষগুলোও ভালো হবে বলে বিশ্বাস তার। কুনিওর মতামত পেয়ে সাইদুর আর দেরি করে না, বাংলাদেশে, রংপুরের মুন্সীপাড়ায় তার বন্ধু মিশনকে ফোন করে সে। পরবর্তী ঘটনাগুলো বেশ দ্রুতই ঘটে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়ে প্লেনের টিকিট কেটে এক মাসের মধ্যেই কুনিও হোশি চলে আসে বাংলাদেশে।

ঢাকায় তাকে রিসিভ করে রংপুর নিয়ে যায় মিশন। মুন্সীপাড়ায় দুই রুমের একটা বাসা ঠিক করে দেয়। শরীফ মিয়া নামের এক কিশোরকে ঠিক করে দেয় তার দেখাশোনা আর রান্নাবান্না করে দেওয়ার জন্য।

কুনিও হোশির চেহারাটা হাসি হাসি। আর গড়পড়তা জাপানিদের মতোই খুব বিনয়ী একটা ভঙ্গি আছে তার। সাইদুর আগে থেকেই তাকে ‘কেমন আছেন?’ ‘ধন্যবাদ’ ‘ভাত খাব’ ‘পানি খাব’—এমন কিছু সাধারণ বাংলা শিখিয়ে দিয়েছিল। বাকি কথা শেখানোর দায়িত্ব নিল শরীফ মিয়া। মুন্সীপাড়ার লোকজন প্রথম প্রথম কুনিও হোশির ব্যাপারে বাড়তি কৌতূহল দেখালেও ধীরে ধীরে সেটা কমে গেল। এলাকায় জাপানি বুড়ো হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল হোশি। তবে সবাই জানত তার নাম হিতা কুচি। মুন্সীপাড়ার শিশুরা হিতা কুচির বাংলা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ত। তারা ওকে নিয়ে ছড়া কাটত—

‘হিতা কুচি, গুচি পুচি,

খাও শুধু আলু, লুচি। ’

ওদের কথা শুনে হিতা কুচি ওরফে কুনিও হোশিও দাঁত বের করে, চোখ ছোট ছোট করে হাসত। বাচ্চাদের চকোলেট কিনে দিত সে।

মিশন ব্যস্ত মানুষ। তবু নিয়মিত কুনিওর খোঁজখবর করে। হাজার হলেও সাইদুরের অতিথি সে। একদিন মিশনের কাছে একটা আবদার করে বসে কুনিও, ভাঙাচোরা বাংলায় বলে, ‘বসে থেকে সময় কাটে না, আমাকে একটুকরো জমির ব্যবস্থা করে দাও, চাষাবাদ করব। ’

মিশন একটু চমকিত হয়। বলে, ‘কী চাষ করতে চাও তুমি?’

হোশি একটু ভাবে। তারপর বলে, ‘এক ধরনের বীজ আছে আমার কাছে। সেই বীজ দিয়ে ঘাস চাষ করতে পারি। ’

‘ঘাস? ঘাস তো এমনি এমনিই জন্মায়। কেউ আবার ঘাস চাষ করে নাকি?’

‘না না, এটা অন্য জাতের ঘাস। খুব ভালো জিনিস। ’

কুনিওকে আর কিছু বলে না মিশন। জাপানে সাইদুরের সঙ্গে কথা বলে সে।

‘দোস্ত, তোর অতিথি তো দেখি চাষবাস করতে চায়। কী করি?’

সাইদুর বলে, ‘কাজ ছাড়া বসে থাকতে হয়তো বেচারার ভালো লাগছে না। দেখ, যদি আশপাশে খালি জমি পাস, তাহলে লিজটিজ নিয়ে দে। চাষাবাদ করতে চাইলে করুক। অসুবিধা কী? টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করিস না, আমি পাঠাব। ’

মিশন তার লোকজনকে দিয়ে খোঁজ লাগায়। শেষ পর্যন্ত কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে ১২ কাঠার একখণ্ড জমি লিজ নিয়ে দেয় হোশিকে। জমি পেয়ে বুড়ো তো বেজায় খুশি। নিজেই খালি পায়ে মাটিতে নেমে পড়ে, মুঠো ধরে মাটি তুলে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোঁকে, কোদাল দিয়ে মাটি কোপায়, কী করে না করে! আলুটারি গ্রামের শিশু-কিশোররা সেই দৃশ্য দেখে দাঁত বের করে হাসে। বয়স্করাও হাঁটাচলার পথে বুড়োর কাণ্ড দেখে মুচকি হাসে।

চায়ের দোকানে নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করে, ‘বুড়োটা বোধ হয় পাগলা কিসিমের মানুষ! নাইলে কেউ জাপান দেশ ছাইড়া এই গেরামে আসে!’

চা-পানকারীরা মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়। ‘ঠিক কহিছো, বাহে। ’

মিশন দুজন দিনমজুর ঠিক করে দেয় হোশির সঙ্গে কাজ করার জন্য। দেখতে দেখতে জমিটার চেহারা পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রথমে হালকা সবুজ আবরণ, তারপর দিনে দিনে মাঠে সবুজের উঁকিঝুঁকি বাড়তে থাকে, হোশির উৎসাহও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, মজুরদের সঙ্গে সে-ও বসে যায় আগাছা বাছতে, পাইপ দিয়ে ক্ষেতে পানি ছিটায়। গরু-ছাগল, পাখপাখালির হাত থেকে বাঁচতে চারদিকে জাল দিয়ে জমি ঘিরে রাখার বন্দোবস্ত করে।

দিনমজুরদের পিঠ চাপড়ে ভাঙা বাংলায় বলে, ‘কুব বালো, কুব্বালো। ’

প্রতিদিন সকালবেলা শরীফ মিয়া কুনিওর নাশতা বানিয়ে দেয়। নাশতা শেষ করে একটা রিকশায় চড়ে আলুটারি গ্রামে রওনা দেয় হোশি। সারা দিন জমিতে কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে আগে মুন্সীপাড়ায় নিজের ডেরায় ফিরে আসে।

এ দেশের সব কিছু নিয়েই ব্যাপক কৌতূহল কুনিওর। ছোট ছোট চোখ দুটো মেলে হাসি হাসি মুখে সব কিছু দেখতে থাকে সে। কান পেতে বুঝতে চেষ্টা করে আশপাশের মানুষ কী বলছে, নিজের সামান্য বাংলা জ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সেসব কথার মর্মার্থ।

বাড়ির পাশের কেরামতিয়া মসজিদ থেকে প্রতিদিনই পাঁচবার ভেসে আসে আজানের শব্দ। হোশি কান পেতে শোনে সেই সুরেলা আওয়াজ। একদিন শরীফকে বলে, ‘এই বাংলা কথাগুলো আমি বুঝতে পারি না। কী কথা এইগুলো?’

শরীফ প্রথমে কুনিওর কথা বুঝতে পারে না। যখন বোঝে তখন সে হেসেই কুটিপাটি।

‘আরে, ওগুলা কি বাংলা কথা যে বুঝতে পারবা? ওগুলা আরবি কথা গো, আরবি কথা...’

শরীফ তাকে বুঝিয়ে বলে কাকে বলে আজান, কাকে বলে নামাজ। কুনিও চোখ দুটো বড় বড় করে শোনে। কিছু হয়তো বোঝে কিছু বোঝে না।

‘তোমার কী ধর্ম? খিরিস্টান?’

শরীফ টেবিলে ভাত বেড়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে। কুনিও হোশি সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তার হয়তো বলতে ইচ্ছা হয়, পুথিবীজুড়েই গরিব মানুষের ধর্ম শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করা। সেই সংগ্রাম এতটাই তীব্র যে প্রচলিত ধর্মবোধ হয়তো তাকে আচ্ছন্ন করে না। যেমনটি হয়েছে তার নিজের বেলায়। ছোটবেলা মা কুনিওকে বলেছিল, ওদের ধর্মের নাম শিন্টো আর দেবতার নাম কামি। ধর্ম মানে তাই কুনিওর কাছে মায়ের কাছে শোনা কয়েকটা গল্প।

সূর্য দেবী ‘আমাতেরাসু’র গল্প বলত মা।

আমাতেরাসু একদিন তার ভাই ঝড়ের দেবতা সুসানুর ওপর রাগ করে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল, আর তখন সূর্যের অভাবে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল পৃথিবী। প্রাণিজগৎ পড়ল মহা বিপাকে। স্বর্গের দেব-দেবীরা অনেক চেষ্টা করল আমাতেরাসুকে ঝোপের অন্ধকার আড়াল থেকে বের করে আনতে, কিন্তু কিছুতেই বেরিয়ে এলো না আমাতেরাসু। তখন সুসানুর স্ত্রী, আমে-নো-উজুমি, যিনি আনন্দ ও ভোরের দেবী, তিনি উদ্দাম নৃত্য শুরু করলেন, সেই নাচে এমন শব্দ তৈরি হলো যে লুকিয়ে থাকা আমাতেরাসু কামির কাছে জানতে চাইল, ‘এ কিসের শব্দ? কী ঘটছে স্বর্গরাজ্যে?’

কামি বলল, ‘স্বর্গে তোমার চেয়ে ভালো আরেকজন সূর্য দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। এ তারই অভিষেকের উল্লাসধ্বনি। ’

এ কথা শুনে আমাতেরাসু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে রাগ-অভিমান ভুলে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তাতেই আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ আর পৃথিবী রক্ষা পেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে।

ছোটবেলায় শোনা এসব গল্পও এত দিন কিভাবে যেন কুনিও হোশির মনের অতলে চাপা পড়ে ছিল। ধর্মের প্রসঙ্গ উঠে আসায় মনে পড়ল সেই সব, উঠে এলো মনের ওপরের স্তরে।

মা কিছু কিছুু ধর্মাচার পালন করত হয়তো, বউও করত, কিন্তু কুনিও হোশি নিজে কখনো সেইভাবে কোনো আচার-অনুষ্ঠান পালন করেনি, হয়তো ধর্ম তাকে সেভাবে প্রাণিত করতে পারেনি।

‘তুমি কি তাইলে হিন্দু?’ কুনিওকে চুপ থাকতে দেখে আবারও শরীফের নির্দোষ জিজ্ঞাসা। কুনিও বলে—

‘না। আমি শিন্টো ছিলাম। এখন কিছুই না। ’

শরীফ তার স্বল্প জ্ঞানে কুনিওর কথার মাজেজা বুঝতে পারে না। শিন্টো ব্যাপারটা কী, সেটাও ঠিকমতো বুঝতে না পেরে সে ফ্যালফ্যাল করে বুড়ো লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘আমাকে তুমার মসজিদে নিবা?’ শরীফকে জিজ্ঞেস করে কুনিও।

শরীফ এবার সমস্যায় পড়ে। মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষকে কি মসজিদে নেওয়া যায়? ইমাম সাহেব তো বলেন, এরা কাফের। কাফেরকে মসজিদে নিয়ে আবার কোন পাপ করে ফেলবে কে জানে?

‘আমি মসজিদে যাইতে চাই। শুককুরবারে যাইব। ’ কুনিও বলে।

শুক্রবার শুনে একটু আশ্বস্ত হয় শরীফ। হাতে দুই দিন সময় আছে। এর মধ্যে চট করে ইমাম সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেওয়া যাবে।

শরীফের কাছ থেকে কুনিওর মসজিদে আসার আগ্রহের কথা শুনে ডান হাত দিয়ে নিজের লম্বা দাড়িতে বিলি কাটেন ইমাম সাহেব। তারপর বলেন, ‘নিয়া আসিস। বিধর্মীরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়া মসজিদে আসলে ক্ষতি নাই। ’

পরের জুমাবারে নামাজ শুরু হওয়ার আগেই পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে হোশি গিয়ে হাজির হয় কেরামতিয়া মসজিদে। ইমাম সাহেব তাকে হাতে ধরে ভেতরে নিয়ে বসান। একে একে মুসল্লিরা জমা হতে থাকে। তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়— এই বিদেশি বিধর্মী এখানে কী করছে? এই প্রশ্ন সবার মধ্যে।

নামাজ শেষে গোমর ফাঁস করেন স্বয়ং ইমাম সাহেব। তিনি মাইকে ঘোষণা দেন, ‘প্রিয় মুসল্লিগণ, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাইতেছি যে জনাব কুনিও হোশি জাপান দেশের শিন্টো ধর্মের মানুষ। তবে তিনি অদ্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়াছেন। ’

‘মারহাবা, মারহাবা। সুবহান আল্লাহ। সুবহান আল্লাহ। ’

রোল পড়ে যায় মসজিদে। কেউ একজন এসে কুনিওর মাথায় একটা টুপি পরিয়ে দেয়। সবার সামনে কলেমা পড়িয়ে কুনিও হোশিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন ইমাম সাহেব। তার নতুন নাম রাখা হয় গোলাম কিবরিয়া। কয়েকজন তরুণ মুসল্লি অতি উৎসাহে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে নও-মুসলিম কুনিওর ছবি তোলে। সম্ভবত একজন বিধর্মীকে নিজ ধর্মে দীক্ষিত করার স্বর্গীয় উন্মাদনায় তারা উদ্বেলিত হয়।

কুনিও হোশি বা গোলাম কিবরিয়ার আলুটারি গ্রামের ক্ষেতে ঘাস কিংবা ঘাসসদৃশ গুল্মগুলো বড় হতে থাকে। কুনিওর চেহারায় হাসি আরো বিস্তৃত হয়। সে হাত দিয়ে গাছের উচ্চতা মাপে আর মাথা ঝুলিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। কখনো কখনো দিনমজুর আবেদ আলীর পিঠ চাপড়ে দেয় আর আকাশের দিকে দুই হাত তুলে ভাঙা বাংলায় বলে, ‘পেরেছি, পেরেছি, আমি পেরেছি। ’

তারপর আসে সেই দিন। ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর, শনিবার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কুনিও হোশি সকালের নাশতা সেরে বাসা থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে সামনে গিয়ে একটা রিকশা নিয়েছে। চমত্কার রোদ উঠেছে। বাংলাদেশে এটা শরত্কাল চলছে, জাপানে শরৎ নেই, শরতের সোনালি রোদ গায়ে মেখে কুনিও হোশির রিকশা মাহিগঞ্জ-হারাগাছ সড়ক ছেড়ে আলুটারি মহিষওয়ালা মোড়ে এসে পৌঁছল।

পর পর তিনটা গুলির শব্দ হলো। হিতা কুচি, কুনিও হোশি বা গোলাম কিবরিয়ার হঠাৎ মনে হলো, তার চোখের ওপর কেউ যেন ঝপ করে কালো একটা পর্দা টেনে দিয়েছে, সূর্য দেবী আমাতেরাসু আবার বুঝি তার ভাইয়ের ওপর রাগ করে চলে গেছে কোনো অন্ধকার ঝোপের আড়ালে, ফলে পৃথিবীতে আচমকা নেমে এসেছে এক আশ্চর্য আঁধার।

...আততায়ীরা সড়কের পাশে মোটরসাইকেলটা দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল, কেউ বলে, তারা মুখোশে তাদের মুখ ঢেকে রেখেছিল।

‘দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে তাকে তিনটি গুলি করে। একটি গুলি তার বুকে, একটি ডান হাতে এবং আরেকটি কাঁধে বিদ্ধ হয়। ’ কাউনিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে এসব কথা জানান।

তখন শরতের উজ্জ্বল রোদের ওপর একখণ্ড কালো মেঘ হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে ম্লান করে দিল সব আলো, ভয়ের বিষণ্ন কুয়াশা ঢেকে দিল আলুটারি গ্রামের মাঠে বেড়ে ওঠা ঘাসগুলোর সতেজ মুখ, কিছু ঘাস তখন লজ্জায় মাটিতে মুখ লুকাতে চাইল, কিছু ঘাস মুষড়ে পড়ল ক্ষোভ ও ঘৃণায়।

 

৮.

মিতালি হক—একটা টক শো

মেকআপ রুমের আয়নায় ডানে-বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট হয় না মিতালি হক। তার খাড়া নাকের এক পাশটা কুঁচকে যায়।

‘আজকে চোখটা ভালো করে আঁকো নাই, কায়েস। কেমন বসা বসা লাগতেছে। দূর...’

‘নাহ্, ম্যাডাম, ঠিকই তো আছে। দেখি...আরেকটু...’

তুলি দিয়ে চোখের ওপরের শ্যাডোকে আরেকটু মিশিয়ে দেয় সিনিয়র মেকআপ আর্টিস্ট কায়েস। মিতালির চেহারায় অসন্তোষ তবু দূর হয় না। সে আবার কিছুক্ষণ আয়না দেখে, তারপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলে—

‘এবার চুলটা ঠিক করো। ’

কায়েস এবার মিতালির চুল নিয়ে পড়ে। একেকটা গোছা লম্বা করে ওপরে টেনে ধরে চিরুনি দিয়ে গোছার নিচের দিকে আঁচড়াতে থাকে। এতে চুলটা বেশ ফাঁপানো দেখায়। মাথাটা মেকআপম্যানের হাতে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে আলোচনার জন্য প্রডিউসারের দেওয়া কাগজগুলোতে চোখ বোলায় মিতালি। আজকের বিষয়, দুই বিদেশি খুন।

ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালীয় নাগরিক খুন হওয়ার পর এবার রংপুরের গ্রামে এক জাপানি নাগরিক খুন হলো। দুটি খুনের ঘটনায় খুনিরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছে এবং কাছ থেকে গুলি করে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পেরেছে। ঢাকায় কিছু দূতাবাস বিদেশিদের চলাফেরায় সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছে। ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার উচ্চ ঝুঁকির আশঙ্কা করছে। তারা বলছে, পশ্চিমা নাগরিকদের ওপর নির্বিবাদে গুলিবর্ষণের আশঙ্কা আছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

মিতালি এবার গেস্ট লিস্টে চোখ বোলায়। হ্যাঁ, সবাই আছে, সরকারদলীয়, বিরোধীদলীয়, নিরপেক্ষ সুধীসমাজ, বিশিষ্ট সাংবাদিক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান... বাহ্, মনে হচ্ছে শো জমে যাবে। মিতালি খুশি হয়। রিসোর্স পারসনরা বেশ রিসোর্সফুল।

মঞ্চে আলো পড়ে। ক্যামেরা পজিশন নিয়ে ফোকাস করে। কানের টকব্যাকে প্রযোজকের নির্দেশনা শুনে দর্শকদের অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিষয়বস্তুটা সংক্ষেপে বলে দেয় মিতালি। তারপর প্রশ্ন করে।

সরকারি নেতা গাল ফুলিয়ে বলে যায়, ‘বিরোধী দল বিদেশিদের হত্যা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। দেশে-বিদেশে সরকারকে বিব্রত ও হেয় করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। ’

বিরোধী দল উত্তরে বলে, ‘সরকার বিদেশিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধীদের ওপর দায়ভার চাপাচ্ছে। এটা সরকারের পুরনো খেলা। যা খুশি তা-ই বলা সরকারের স্বভাবের অংশ হয়ে গেছে। এর পরিবর্তন করতে হবে। ’

সুধীসমাজের প্রতিনিধি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই বাংলাদেশকে আমরা শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নত, সমৃদ্ধ ও সমতাভিত্তিক দেশ হিসেবে দেখতে চাই। সবাই মিলে মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী তথা অন্ধকারের শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। এসব খুন যারা করছে, তাদের চিহ্নিত করে অপরাধের বিচার করতে হবে। ’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান জানান, ‘পুলিশের চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হচ্ছে। কূটনৈতিক পাড়াসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও চেকপোস্টগুলোতে সতর্কতামূলক তল্লাশি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুরো রাজধানী ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কূটনৈতিক জোনকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’

বিশিষ্ট সাংবাদিক বলেন, ‘এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশের সুনাম রক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখার স্বার্থেই বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া জরুরি। ওই সব এলাকার নিরাপত্তায় নিশ্চয়ই শৈথিল্য ছিল, নইলে কেমন করে প্রকাশ্যে মানুষ খুন করে খুনিরা পালিয়ে যেতে পারল?

বিজ্ঞাপনসহ প্রায় এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। অনেক কথা বললেন সবাই মিলে।

‘এগুলো আসলে কাদের কাজ? কারা করছে এসব?’ মিতালি প্রশ্ন করে। ‘ইসলামিক স্টেট—আইএস তো এরই মধ্যে তাদের ওয়েবসাইটে এ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। ’

একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ বললেন, ‘আইএসের কাজের ধরন যত দূর জানা গেছে এ রকম নয়, তারা সাধারণত এ রকম বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ঘটায় না। এখন পর্যন্ত তাদের হামলার ধরন হয় আত্মঘাতী বোমা হামলা টাইপের কিছু, কিংবা অপহরণ করে হত্যা। তবে এসব ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা একেবারেই নেই বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এমনও হতে পারে, বাংলাদেশের উগ্রপন্থী দলগুলো নিজেরাই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ’

বাইরে থেকে একজন দর্শক ফোন করে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলেন। বললেন, প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ এবং দাতাগোষ্ঠী এ বিষয়টি নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের চলাফেরার ওপর সতর্কতা জারি করেছে। বিদেশি বায়াররা তাদের নির্ধারিত সফর বাতিল করেছে। পর্যটকরাও আসছে না। একের পর এক গ্রেনেড, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্রসহ জঙ্গি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ধরা পড়ছে। এর মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা গভীর খাদে পড়ে যাব, কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না। এ জন্য কি আমরা এই দেশকে স্বাধীন করেছিলাম? এ জন্য কি ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল? এই দেশ কি আমার দেশ? এসব খুনখারাবি জঙ্গিরা করছে, নাকি আইএস করছে, জেএমবি নাকি আনসারুল্লাহ করছে—এসব জানতে চাই না।

আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে ভদ্রলোকের।

আলোচকরাও এত আপ্লুত হয়ে যায়। মিতালি মনে মনে খুশি হয়, যে রকম ভেবেছিল সে রকমই হয়েছে। অনুষ্ঠান সফল। স্টেশনের টিআরপি বাড়লে কর্তৃপক্ষ খুশি, আর কর্তৃপক্ষ খুশি হলে নিজের ডিমান্ডও বাড়ানো যায়। অতিথিদের বিদায় দিয়ে মেকআপ তুলতে বসে মিতালি। সৌম্য ফোন করে তখন।

‘দেখলাম। সুশীলটা তো কিছু বলতেই পারল না। এমন ভাসা ভাসা কথার কি মূল্য আছে? না তার ডেলিভারি ভালো, না কনটেন্ট ভালো। একজন তো দেখলাম তোতলাচ্ছে। এই ধরনের লোক আনলে তোমাদের স্টেশন ডুবতে কিন্তু বেশি দেরি লাগবে না...’

সৌম্যর কথাবার্তার ধরনই এ রকম, উল্টাপাল্টা। ‘এরা সব বাক্সর্বস্ব অলস বুদ্ধিজীবী। এদের কাজ শুধু বকবক করা। ‘পলিটিক্যাল তুবড়িবাজি’ করেই শেষ হয়ে যাবে এরা। ’

মিতালি তাই মাইন্ড করে না। বলে—

‘কী যে বলো না! অনেক জম্পেশ হয়েছে আজকে!’

‘হুম্!’ সৌম্য ছোট্ট একটা শব্দ করে।

‘আমার পারফরম্যান্স কেমন ছিল সেটা বলো, দেখতে কেমন লাগছিল?’

‘তুমি তো অসাম, সব সময়ই, নতুন করে বলার কি আছে?’

‘তবু অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা বারবার শুনতে ভালো লাগে। ’

সৌম্য বলে, ‘তোমার মতো কেউ ছিল না কোথাও, কেন যে সবার আগে তুমি চলে যাও, কেন যে সবার আগে তুমি...পৃথিবীকে করে গেলে শূন্য মরুভূমি...হা হা হা,  মিতালি, বাসায় যাওয়ার আগে একবার প্লিজ, আমার এখানে হয়ে যাও না!’

সৌম্য যেন মিনতি করে। এবার বিব্রত হয় মিতালি।

‘কী যে বলো, পাগল! এত রাতে...শোনো, রাখছি। পরে কথা হবে। ’

মিতালি ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে নিচে এসে গাড়িতে চড়ে বসে। রাত একটায় ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলো হয়ে পড়ে অচেনা, নীরব আর কোলাহলমুক্ত। এই নীরবতার অন্য কোনো অর্থ আছে কি না জানা নেই মিতালির। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত এগিয়ে চলা গাড়িতে বসে তার মনে হয়, লাইটপোস্টগুলোর ঝলমলে আলোর নিচে গোটা শহরটা যেন বুড়ো মানুষের মতো ঝিমোচ্ছে। এই ঝিমানো সময়টা মিতালির খুব ভালো লাগে, মানে ভালো লাগত। কিন্তু কিছুদিন হলো কেমন যেন একটা অজানা ভয় লাগে ওর। মনে হয়, মুখোশ পরা কয়েকজন মানুষ যেকোনো সময় অন্ধকার থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পড়বে ওর গাড়ির সামনে। ওদের হাতে থাকবে খোলা পিস্তল কিংবা ধারালো চাপাতি। ওরা চিত্কার করে গাড়ির কাচ ভাঙবে। মিতালির খোলা কাঁধে বসিয়ে দেবে চাপাতির কোপ।

 

৯.

অভিজিৎ খুন হওয়ার পর থেকেই শোক, ক্রন্দন ও কাতরতার পাশাপাশি একটা প্রচণ্ড তীব্র ভয় চেপে বসেছে টুটুলের বুকে। মৃত্যুকে ভয় পায় না টুটুল, কিন্তু খুন হওয়াকে ভয় পায় সে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। অমর একুশে গ্রন্থমেলার সেই দিন বা সেই সন্ধ্যা, সেই রাত বা সেই সময়টার কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না সে। সারাটা সন্ধ্যা একসঙ্গেই তো কাটিয়েছিল ওরা। বইমেলার মাঠে লেখা আর বই নিয়ে আড্ডা, মাঝে মাঝে অভিজিতের ভক্তরা আসছিল, বই কিনছিল, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’, চলছিল অটোগ্রাফ নেওয়া, সেলফি তোলা, চা খাওয়া।

অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে এলে অভিজিৎ বলেছিল, ‘এবার যাই। ’

‘আগান। আমিও বেরোচ্ছি। ’

ওরা চলে যাওয়ার পর টুটুল হয়তো হিসাবের খাতাটায় একটু চোখ বুলিয়ে, তার ছেলেদের স্টল বন্ধ করে দিতে বলে বেরিয়ে এসেছিল, জনস্রোতের সঙ্গে মিশে আলো-আঁধারিতে হাঁটছিল ওরা, তারেক-রুনা-লীনেন আর সে। বাংলা একাডেমির গেট, টিএসসি পেরিয়ে ছবির হাটের সামনে এসে ওরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে মাত্র। তখনই টুটুলের ফোনে আরিফের ফোন।

‘অভিজিৎ রায় কি আপনাদের সঙ্গে? টিএসসিতে একটা অ্যাটাক হয়েছে এক পুরুষ আর এক নারীর ওপর। সন্দেহ হচ্ছে তারা অভিজিৎ আর বন্যা...’

আরিফ তখন শাহবাগ মোড়ে, কেউ একজন বলছে, আক্রান্তদের ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ছবির হাটেই একবার ফোন করেছে টুটুল। আবার চেষ্টা করছে। হঠাৎ মনে হলো রায়হান জানতে পারে। রায়হান হয়তো মোটরসাইকেলে, ফোনটা ধরল না। টুটুল-তারেক-রুনা রিকশায় উঠে রওনা দিল মেডিক্যালের দিকে, লীনেনের বাচ্চাটা অসুস্থ, ওষুধ কিনতে হবে বলে বাড়ির দিকে গেল।

টিএসসির উল্টো পাশের রাস্তায় তখন পড়ে ছিল অভিজিতের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মগজের অংশ, বন্যার কাটা আঙুল আর কালচে লাল রক্তস্রোত।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, এমনই সন্ধ্যায় বইমেলার সামনে নিজের রক্তস্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তাঁর কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল ঘাতকের ধারালো চাপাতির আঘাতে তখন ক্ষতবিক্ষত, সাদা শার্ট ভেসে গেছে লাল রক্তে।

‘...যেন উঁচু এক ঘাড়

 নত হয়ে ঢলে পড়ে পৃথিবীর কোলে

আমাদের সভ্যতার কৃপাণ ছিন্ন করে তার

সবুজাভ বোধের শরীর...’

সেই কবে ১৯৯৫ সালে টুটুল লিখেছিল এই লাইনগুলো। কেন লিখেছিল, কী ভেবে লিখেছিল এখন আর মনে নেই। ‘নীল বিষে শিস কাটে ঠোঁট’ নামে তার কবিতার বইয়ের প্রথম কবিতা ছিল এটা। ‘আমি’ শিরোনামের ওই কবিতাটির শেষ লাইন দুটো ছিল এ রকম—

‘যেনো লাশ এক বরফে মোড়া

ভীষণ শক্ত আর শাদা হয়ে আছি। ’

অভিজিতের মৃত্যুর পর নিজেকে তার সত্যিই মনে হচ্ছিল বরফে মোড়া শক্ত আর শাদা এক লাশ। যেন তার হৃপিণ্ডে জমে আছে ব্যথার ধোঁয়া। ‘দ্রুততালে পাক খেয়ে সরে গেছে পায়ের মাটি, ধ্রুপদী নাচের মতো ঢেউ তুলে পালিয়েছে চোখের স্বপন। প্রাণের সবুজগুলো খসে গেছে পথহারা মাঠে। সবদিকে ঝাঁক বাঁধা শূন্যতা শুধু, বলে দাও পৃথিবী দাঁড়াবো কোথায়?’

টুটুলের মনে হয়, কারা যেন দিন-রাত অনুসরণ করছে তাকে, ছায়ার মতো নিঃশব্দে, তার পিছু পিছু যাচ্ছে, আবার ঘাড় ফেরালেই লুকিয়ে পড়ছে। দেখা যাচ্ছে না কাউকে। প্রতিদিন কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফেরে টুটুল। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়। সারা রাত আর ঘুম আসে না। রুনার পরামর্শে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে একদিন পুলিশের ওসির সঙ্গে দেখা করে টুটুল। নিরাপত্তা চেয়ে থানায় একটা জিডি করায়।

‘নিরাপত্তা কিভাবে দিব, বলেন? নিরাপত্তা কি গাছের গুটা? পুলিশ চান? আচ্ছা, দুইটা কনস্টেবল পাঠায়া দিবনে...’

কয়েক দিন কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে শুকনো মুখে দুজন রোগা-পাতলা পুলিশের লোক টুটুলের বাসার সামনে ঘোরাঘুরি করল।

২০১৫ সালের ৩০ মার্চ খুন হলো ওয়াশিকুর রহমান বাবু। বাবুর সঙ্গে অনেকেরই হয়তো মুখোমুখি পরিচয় ছিল না। কিন্তু ফেসবুক সূত্রে অনেকেই তাকে চিনত। যারা তার ওয়ালে উঁকি দিয়েছে, তারা জানে, ফেসবুকে ওয়াশিকুরের সর্বশেষ প্রফাইল ছবিটি ছিল ‘আই অ্যাম অভিজিৎ’ লেখা একটি পোস্টার। তাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, ‘শব্দের মৃত্যু নেই। ’ ‘ওয়ার্ডস ক্যান নট বি কিলড। ’

অভিজিৎ হত্যার পর বাবু পোস্ট দিয়েছে, ‘এক অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু লাখো অভিজিৎ রায়কে জন্ম দিবে। কলম চলবে, চলতেই থাকবে। ’

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ছেলে বাবু নিজের নাম রেখেছিল হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের রূপকথা থেকে, কুচ্ছিত হাঁসের ছানা। নিজের সম্পর্কে বলেছে, ‘আমার জন্ম গ্রামে হলেও শৈশব কেটেছে ঢাকায়, তবে আট বছর বয়সের সময় বেশ কিছুদিন গ্রামে কাটাতে হয়। তারপর বছর দুয়েক মফস্বল শহরে কাটিয়ে আবার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু মাস ছয়েক না কাটতেই আবার ফিরে যেতে হয় গ্রামে। একটানা ছয় বছর গ্রামে আবার ঢাকায়, সেই থেকে আবার ঢাকায়। ’

নিজের সম্পর্কে বাবু আরো লিখেছে, ‘মানুষ হিসেবে আমি খুব ভালো বা মহৎ কেউ নই, কখনো দাবিও করিনি। স্বল্পভাষী এবং অন্তর্মুখিনতার কারণে পরিচিতরা সে রকম কিছু ভাবে। আমার অন্তর্মুখিনতা ভালো সাজার জন্য না, বরং নিজেকে প্রকাশ করার অপারগতা। আমার ভেতরে স্বার্থপরতা, মোহ, লোভ, প্রেম, কাম, ঘৃণা—সব কিছুই বিরাজ করে, তীব্র মাত্রায় বিরাজ করে। যারা খুব কাছাকাছি আসে তারাই তীব্রতার মাত্রা বুঝতে পারে। ফলাফল, আপাত ভদ্র-সুবোধ বালকের ভিতরটার সঙ্গে মিল না পেয়ে অচিরেই দূরত্ব সৃষ্টি। ’

বাবুর চেয়ে বয়সে দু-এক বছরের বড় হবে তার ভাই ইমরান। ছোট ভাইয়ের আকস্মিক খুনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই হতবিহ্বল। ইমরান খানিকটা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে সাংবাদিকদের জানায়, ‘বাবু আমার দুই বছরের ছোট, কথা কম বলত, একটু আত্মকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সে যে এ ধরনের লেখালেখি করে তা-ই জানতাম না। ’

ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফেসবুক পোস্টে প্রচুর বিরূপ মন্তব্য আছে বাবুর। অথচ বাড়ির কেউ জানত না এ ধরনের লেখা সে লিখতে পারে। এক জায়গায় সে লিখেছে।

এসব কি তাহলে অন্তর্মুখী বাবুর নীরব গোপন বিদ্রোহ? বিশ্বাসের জগতের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের বিদ্রূপ? ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সত্যানুসন্ধান? নাকি ফেসবুকের চলতি বাজারে দ্রুত অন্যদের চোখে পড়ে হিরো হওয়ার ইচ্ছা?

ধর্ম নিয়ে লেখার বাইরেও তো কত কথা ছিল বাবুর।

একবার পোস্ট দিয়েছে, ‘কত প্রেমিকা আদর করে প্রেমিককে ‘বাবু’ বলে ডাকছে, হায়, আসল বাবুকে কেউ চিনল না। ’

কোনো এক বন্ধুকে সে লিখেছে, ‘আমি চাইতেছি প্রেমিকার প্রেমময় বাবু ডাক! পারলে একখানা প্রেমিকা জোগাড় কইরা দেও। ’

‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ একজন আমাকে অন্তত প্রপোজ করুক। ’

মৃত্যুর দেড় মাস আগে বাবুর পোস্ট। প্রেমের জন্য তাহলে এত কাতরতা ছিল এই অন্তর্মুখী শান্ত ছেলেটির মধ্যে! প্রেম পেলে কি সে বদলে যেত? জীবনকে নিয়ে অন্যভাবে ভাবত?

ওয়াশিকুর বাবুকে হত্যা করে পালানোর সময় ধরা পড়া দুজন পুলিশের কাছে বলল, ‘ব্লগ কী বুঝি না। আর তার লেখাও আমরা দেখিনি। হুজুররা বলেছেন, সে ইসলামবিরোধী। তাকে হত্যা করা ঈমানি দায়িত্ব। ঈমানি দায়িত্ব পালন করলে বেহেশতে যাওয়া যাবে। দায়িত্ব পালন করতে ওয়াশিকুর বাবুকে হত্যা করেছি। ’

বাবুর মৃত্যুর পর এপ্রিল মাসে অনেকেই দেখেছে হয়তো, ফেসবুকে বাবুর প্রায় প্রতিটি পোস্টের নিচে ‘নিস্তব্ধ অনুভূতি’ ছদ্মনামের কেউ একজন মন্তব্য করেছে—‘ব্লগার ওয়াশিকুর বাবুকে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য হত্যা করা হয়নি। তাকে ইসলামের স্বার্থে হত্যা করা হয়েছে এবং সেটা আমাদের সকলের কর্তব্য ছিল। আল্লাহ এবং নবীকে যে মুসলমান গালি দেয় সে সঙ্গে সঙ্গে কাফের হয়ে যায়। আর তাকে হত্যা করা তখন প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু আফসোস, কিছু নামধারী মুসলমানের বাচ্চা আজ সেই হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করছে। বিদ্রোহ করছে। তবে তোমরা স্পষ্ট শুনে রেখো, নিঃসন্দেহে ওয়াশিকুর একজন কাফের ছিল আর যে কাফেরকে সাপোর্ট করে, তার মৃত্যুতে বিদ্রোহ করে, সে-ও নিঃসন্দেহে একজন কাফের হয়ে যায়। আজ যারা ওয়াশিকুরের মৃত্যুতে বিদ্রোহ করছ, জেনে রেখো তোমরা তার জন্যই শুধু নয়, ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছ! আর যারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। ’

সেই কবে ১৯৭৩ সালে আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর ‘সত্যের সন্ধানে’ বইয়ের মুখবন্ধে লিখেছিলেন : আমি অনেক কিছুই ভাবছি, আমার মন প্রশ্নে ভরপুর কিন্তু এলোমেলোভাবে। আমি তখন প্রশ্নের সংক্ষেপণ লিখতে থাকি, বই লেখার জন্য নয় শুধুমাত্র, পরবর্তী সময়ে মনে করার জন্য। অসীম সমুদ্রের মতো সেই প্রশ্নগুলো আমার মনে গেঁথে আছে এবং আমি ধীরে ধীরে ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বের হতে থাকি। ’

বাবুর মনেও কি সে রকম অসীম সমুদ্রের মতো অসংখ্য প্রশ্ন জেগেছিল?

কিন্তু আনু মুহাম্মদ আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে লিখতে গিয়ে যেমন লিখেছেন—

“ধর্ম নিয়ে খোলা আলোচনা কিংবা বিশ্লেষণ বাংলাদেশের সমাজ-ক্ষমতা অনুমোদন করে না। কিন্তু আবার সমাজ, মানুষ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, বন্ধন, নিপীড়ন-শৃঙ্খল এবং সেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াইয়ের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে ধর্মের প্রসঙ্গ এসেই যায়। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, একটা পথ পেতে গেলে, ধর্মের প্রসঙ্গ নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া চলে না। এর কারণ কী? কারণ ধর্ম একটা বিশ্বাস হিসেবে যে রূপই ধারণ করুক না কেন, এই ধর্মের মধ্যে আসলে বসবাস করে সমাজ। বসবাস করে সমাজের নানা বিধি, নিয়ম-নীতি, নৈতিকতা, অনুশাসন। সমাজের, রাষ্ট্রের বিধিই উপস্থিত হয় ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে ধর্মরূপে। এই ধর্মের মধ্যেই আবার থাকে, যেভাবে মার্কস বলেছিলেন, ‘হৃদয়হীনের হৃদয়, নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস। ’

ধর্ম নিয়ে বাবুর মনে প্রশ্ন জাগার পেছনে বাস্তব জীবনের বা শৈশবের কোনো ঘটনার কোনো প্রভাব কি ছিল? নাকি তার তরুণ মন মুক্তভাবে চিন্তা করতে শিখেছিল? প্রশ্ন তুলতে শিখেছিল?

 

১০.

১২ মে সিলেটে খুন হলো অনন্ত বিজয় দাশ।

সুবিদবাজারের নূরানী আবাসিক এলাকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রতিদিনই সকালে নিজের অফিস পূবালী ব্যাংকে যেতেন অনন্ত। সন্ধ্যা নাগাদ ব্যাংকের বাঁধাধরা কাজ সেরে ফিরেও আসতেন। তারপর নিজের ঘরে বসে হয়তো লিখতেন বিজ্ঞান ও বিবর্তন নিয়ে। হয়তো পড়তেন নতুন কিছু। হয়তো একমনে নিজের সম্পাদিত বিজ্ঞানভিত্তিক পত্রিকা ‘যুক্তি’র জন্য লেখা সম্পাদনা করতেন। এরই মধ্যে হয়তো সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পোস্ট দিতেন ফেসবুকে। কোনো ঘটনায় হয়তো উত্তেজিত, দুঃখিত বা আনন্দিত হতেন।

হয়তো হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠত তাঁর। হয়তো অচেনা কোনো নম্বর থেকে অচেনা কোনো খসখসে কণ্ঠ বিচ্ছিরিভাবে বলত, ‘আর বেশি দিন পৃথিবীর আলো দেখার ভাইগ্য নাই তুমার, ভালো-মন্দ যা খাইতে চাও খায়া নেও, যা দেখতে চাও প্রাণ ভইরা দেইখ্যা নেও। ’

এসব হুমকিকে মোটেও পাত্তা দিতেন না অনন্ত। অসুস্থ  মা-বাবাকে বা সহজ-সরল বোন-দুলাভাইকে সেসব নিয়ে কিছুই বলতেন না। বরং নিজের কাজ নিয়ে পড়ে থাকতেন মুখ গুঁজে নিজের ঘরে, সিলেট শহরের এককোনায়।

মারা যাওয়ার আগের দিন ফেসবুকে নিজের পোস্টে অনন্ত বিজয় লিখেছেন—

‘অভিজিৎ রায়কে যখন খুন করা হয়, অদূরেই পুলিশ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছিল। খুনিরা নিশ্চিন্তে খুন করে চলে গেল। পরে পুলিশ বলে তাদের নাকি দায়িত্বে অবহেলা ছিল না। বড় জানতে ইচ্ছে করে, তাদের দায়িত্বটা আসলে কী? ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে যখন খুন করে খুনিরা পালিয়ে যাচ্ছিল, তখনো কিন্তু পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু পুলিশের কপাল খারাপ, তারা বলতে পারল না—এ ক্ষেত্রেও তাদের কোনো দায়িত্বে অবহেলা ছিল না। কারণ লাবণ্য নামের তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানবিক মানুষ খুনিদের ধরে ফেলেন। খুনিদের শ্রীঘরে পাঠিয়ে দেন। ’

কে জানত পরদিন অনন্তর মৃত্যু নিয়েই লিখবে দেশের পত্রিকাগুলো, লিখবে তাঁর বন্ধু, স্বজন ও সহযোগীরা। অনন্ত বিজয় দাশের মৃত্যু নিয়ে ব্লগার আরিফ জেবতিক ফেসবুকে লিখলেন—

‘লিখতে, বলতে, ভাবতে কোনো কিছুতেই আগ্রহ পাই না। ৮৪ জনের একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছিল দুই বছর আগে, তালিকা থেকে নবম হত্যা হয়েছে আজকে সিলেটে। তালিকা নিশ্চয়ই চূড়ান্ত নয়, গত দুই বছরে আরো নাম সেই তালিকায় নির্ঘাত যুক্ত হয়েছে। কিন্তু অন্তত এই ৮৪ জনের ব্যাপারে গত দুই বছরে কোনো খোঁজখবর হয়নি, তাঁরা নিয়মিত বিরতিতে খুন হওয়া শুরু করেছেন।

মাসিক কোটায় হত্যা শুরু হয়েছে, হয়তো এটি সপ্তাহান্তের কোটায় উন্নীত হবে। ৮৪ জন যাবে, আরো হাজার চুরাশির নাম তালিকায় আসবে। খানিক আহাজারি হবে, সবখানেই একটা ফিসফিস-চুপ চুপ ভাব, কিছু বিকৃত মানুষের উল্লাস—তারপর পরের হত্যার জন্য অপেক্ষা।

এই দেশে আইনবহির্ভূত সব হত্যাই জায়েজ হিসেবে মেনে নিয়েছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, এখানে সবগুলো খুনই ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’।

অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ স্মৃতিচারণা করলেন—

‘২৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের ওপর আক্রমণের পর অনন্ত প্রমিজ করেছিল, আমি পড়ি কি না পড়ি সে আমাকে প্রতিদিন একটা করে ই-মেইল করবেই। ...‘দিদি কেমন আছ’ বলে ই-মেইল করত অনন্ত। ...

ওকে অনেকবার বলেছিলাম, ‘তুমি তো টার্গেট হবেই, কিছুদিন গাঢাকা দিয়ে থাকো। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ’ শোনেনি। বলেছিল, চাকরি ছেড়ে অসুস্থ বাবাকে ছেড়ে কিভাবে যাবে সে। সেই কোন ছোটবেলা থেকে মুক্তমনায় লেখালেখি করত অনন্ত; আমাকে দিদি ডাকত, ইউনিভাির্সিটিতে পড়ার শুরু থেকেই মনে হয়। দেশে গেলে সিলেট থেকে দেখা করতে চলে আসত ঢাকায়। আমি জোর করে ওর পকেটে বাসের ভাড়াটা গুঁজে দিতাম; বলতাম, ‘পড়ালেখা শেষ করে চাকরি পেলে শোধ করে দিয়ো। ’

কিছু কিছু সম্পর্ক আছে ব্যাখ্যা করা যায় না। জীবনে মাত্র কয়েকবার দেখা হয়েছে অনন্তর সঙ্গে। কিন্তু ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সে রকমই ছিল। কী দেব এর নাম? বন্ধু, ভাই, কমরেড? জানি না। দরকারও নেই বোধ হয়।

অনেকেই ব্লগে লেখালেখি করে, অনেকেই ফেসবুকে অনেক কিছু লেখে। কিন্তু মৌলিক চিন্তার অধিকারী খুব কমই লেখক হয়ে উঠতে পারে। ওর সঙ্গে আমার চিন্তার পার্থক্য ছিল অনেক কিছুতেই, কিন্তু ওর অমায়িকতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারার ক্ষমতায় মুগ্ধ হতাম সব সময়। ’

চৌরাস্তার মোড়ে যেখানে মুখোশ পরা দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে অনন্তকে হত্যা করে রাস্তায় লাশ ফেলে রেখে যায়, সেই রাস্তার অন্য পাশেই পিটিআইয়ের দেয়াল। সেই দেয়ালে লেখা হয়েছে, ‘জ্ঞানের জ্যোতি ছড়াবে অনন্ত/অনন্তকাল। ’

এক বছর পর সেখানে অনন্তর বন্ধুরা নির্মাণ করল স্মৃতিস্তম্ভ। অনন্ত বিজয় দাশ এভাবেই স্মৃতি হয়ে গেল। সেই স্মৃতিস্তম্ভ উন্মোচন অনুষ্ঠানে ১২ মে ২০১৬-তে বক্তারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বললেন, ‘এই হত্যার বিচারে সরকারের কোনো আন্তরিকতা নেই। এ কারণে খুনিরা একের পর এক খুন করার উৎসাহ পাচ্ছে। ’

২০১৫ সালের জুলাই মাসের ৯ তারিখ টুটুল তার ফেসবুকে লিখল, ‘ঘুম থেকে জেগে দেখি খুন হয়ে গেছি! কারা কারা যেন আমার কবজি দিয়ে বানানো কাবাবের দিকে তাকিয়ে কাঁটাচামচ খুঁজছে। কবজির পাশে ওয়াইনে ভিজিয়ে রেখেছে আমার স্বপ্নকাতর চোখ। যেন চোখ দুটো মুখে পুরলেই, আমার স্বপ্ন ইনস্টল হয়ে যাবে ঘাতকদের চোখে। খুলিটা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছে, পরবর্তী ভোজের পরিকল্পনায়। আমার স্নেহাস্পদ ঘাতকরা আমার হৃদয় ধরে টানাহেঁচড়া করেনি আর। আমি নিহত হয়েছি, আমার কবজি চোখ মগজ সব ওদের দখলে...’

এক গভীর বেদনা, এক অদ্ভুত দুর্ভেদ্য বিচ্ছিন্নতা টুটুলকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তার অস্থির লাগে। বারবার মনে হয়, এরপর কার পালা?

রুনা তখন গভীর মমতায় পাশে দাঁড়ায়। বলে, ‘পৃথিবীটা সব সময় আমাদের পছন্দমতো চলে না। জীবনে কি আর সব সময় শুধু ভালো ভালো ঘটনা ঘটে? তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরেও অনেক কিছু ঘটবে, মন খারাপ কোরো না। ’

দুই মেয়ে সম্প্রীতি আর সুপ্রীতি এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

 

১১.

আগস্টের ৮ তারিখে ভরদুপুরে ঢাকার গোড়ানে খুন হলো নিলয় নীল।

পুরো নাম নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীল। বাড়ি পিরোজপুর সদরের চলিশা গ্রামে।

গ্রামের মানুষ তাকে চিনত নান্টু নামে। খুব শান্ত ছেলে ছিল নান্টু। চলিশা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পড়া শেষ করে হয়তো পিরোজপুর শহরে গিয়েছিল নিলয়। সেখানে হাই স্কুল শেষ করে কলেজ। আর কলেজ শেষ করে নিলয় পা রেখেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ছিল জ্ঞানের প্রাচীনতম শাখা দর্শন বিভাগে। সেখানে জগৎ জীবন ন্যায় নীতি ঘেঁটে কী শিখেছিল নিলয়? ভারতীয় দর্শন, ইউরোপীয় দর্শন, মুসলিম দর্শন, গ্রিক দর্শন পড়ে কী বুঝেছিল? সেই পাঠ থেকে অথবা কোনো পাঠচক্র থেকে নিলয় কি প্রশ্ন করতে শিখেছিল?

নিজের মনের ভেতর জেগে ওঠা সেই সব প্রশ্ন, নিজের কাছে নিজের পাওয়া উত্তরগুলোই হয়তো মুক্তমনায় মুক্ত আনন্দে লিখত সে।

যখন অভিজিৎ, অনন্ত আর বাবু পর পর খুন হলো...উফ্, প্রতিটা মৃত্যু শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়েছিল নিলয়। বন্ধুদের খুনের বিচার দাবি করেছে সে। খুনিদের শাস্তি চেয়েছে।

কিন্তু শেষ যেদিন শাহবাগের সমাবেশ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিলয়কে অনুসরণ করছিল অচেনা রহস্যময় মানুষরা, তখন ভয় পেয়েছিল সে। তীব্র ভয়। আশামণিকে নিলয় বলেওছিল সেটা। বলেছিল বন্ধু বড় ভাই তাহসিবকেও। তাহসিব ভাই বলেছিল—

‘একবার থানায় যাও নীল, পুলিশকে জানাও। ’

আশাও একই কথা বলেছিল হয়তো।

তারপর তো সেই এক কাহিনী। বাসার কাছেই প্রথম যে থানাটা, সেখানেই গিয়েছিল নিলয়। রাজ্যের অনীহা নিয়ে ময়লা ডেস্কের সামনে বসে থাকা পুলিশের ইউনিফর্ম পরা, প্রৌঢ় ক্লান্ত লোকটা নিলয়ের কথা খানিকটা শুনেই মাথা নেড়েছিল।

‘আপনার ঘটনা আমাদের থানার অধীনে না। এইটা শাজাহানপুর থানার ঘটনা, শাজাহানপুর যান। ’

নিলয় জানতে চাইছিল শাজাহানপুর থানাটা কোথায়? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা বা অবকাশ কোনোটাই ছিল না লোকটার। সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল মোবাইল ফোনে কথা বলতে। শাজাহানপুর থানার ডেস্কে বসে থাকা শক্তপোক্ত চেহারার পুলিশ ছেলেটি হয়তো নিলয়ের সমবয়সীই হবে। অনুসরণের ঘটনা শুনে সে টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—

‘আপনে কি নাস্তিক বলোগার?’

তার প্রশ্ন করার ভঙ্গি আর প্রশ্ন শুনে রাগ নয়, হাসি পেল নিলয়ের। কী নির্দোষ প্রশ্ন? এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে সে? নাস্তিক ব্লগার কি কোনো মানুষের পরিচয় হতে পারে?

নিলয়কে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা আবার ফিসফিস করে—

‘দিনকাল ভালো না। শোনেন, এই সব জিডিফিডি কইরা বাঁচতে পারবেন না। দেশ ছাইড়া পালান। বিদেশ যান গা। ’

নিলয় হতভম্ব হয়ে ফিরে আসে। কী করবে, কী করা উচিত ভেবে পায় না সে। বাসায় গিয়ে ফেসবুক থেকে নিজের সব ছবি সরিয়ে ফেলে নিলয়। ঠিকানার জায়গায় বাংলাদেশের নাম বদলে লেখে কলকাতা, ভারত।

আশামণি বলে—‘চলো, কয়েক দিন তোমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। ’ নিলয় ম্লান হাসে, ‘তোমারে নিয়া গেলে আমার মা-বোন আর কাকি-মাসিরা বাইন্ধা পিটাবে। তোমার কথা কেউ তো জানে না। ’

‘কত দিন আর লুকায়া রাখবা? জানায়া দেও। বলো যে ভালোবেসে বিয়ে করছ। ’

‘আরো কয়েকটা দিন যাক’, নীল বলে। ‘ওরা এখনো এই খবর গ্রহণ করার জন্য তৈরি না। ’

আশা আর কিছু বলে না। সে চুপচাপ সাংসারিক কাজকর্ম সারে। নিলয় বলে, ‘আমি একাই বরং কয়েক দিন ঘুরে আসি। এখন তো চাকরিবাকরিও নেই, হাতে সময় আছে। ’

আশা জানে নিলয় কিছুদিন আগে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেকটিভের কাজটা ছেড়ে দিয়েছে। আসলে ওর মধ্যে প্রচণ্ড একটা ভয় ঢুকে গেছে। কয়েক দিন জায়গা বদল করে এলে হয়তো ভয়টা কাটবে।

প্রায় আট মাস পর গ্রামে যায় নীল। বোনদের আদরের ভাই নান্টু। কাকি-মাসিরা দেখতে আসে তাদের কোলে-কাঁখে বড় হওয়া গোলগাল শান্তশিষ্ট ছেলেটি এই কদিনে কত্ত পাল্টে গেছে। আর নিলয় ঘুরে বেড়ায় মানুষের ভিড়ে, নিঃসঙ্গ, একাকী, ছায়াচ্ছন্ন, মায়াময় গ্রাম চলিশায়; তার শৈশব, কৈশোর মাখা বাতাসের মমতা আর নদীর কোমলতা ভেদ করে, তবু পেছনে তাড়া দেয় নির্মম বাস্তব। নিলয় চমকে ওঠে, মনে হয় রাতের অদ্ভুত আঁধারে ঝিলিক দেয় আততায়ীর হিংস্র চোখ।

মা বলে, ‘এত দিন পর আইলি, আর দুইটা দিন থাইক্যা যা, বাপ...’

‘না, মা, বিসিএস পরীক্ষা দিমু, পড়ালেখা আছে, যাইগা...’

নীল ফিরে আসে সেই পুরনো, শুকনো, নির্মম শহরে। কী হবে আর গ্রামে লুকিয়ে থেকে? অদৃশ্য আততায়ীর ছায়া তো সেখানেও ধাওয়া করে তাকে। তার চেয়ে যা হওয়ার হোক, নিলয় ভাবে। একবার এক বন্ধু জার্মানিতে যাওয়ার কথা বলেছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ও।

আশা সাহস দেয়, বলে, ‘দূর, কিচ্ছু হবে না। যাও তো, বাজারে যাও। ঘরে কিছু নেই। ’

বাজারের ব্যাগ আর ফর্দর সঙ্গে নীলের হাতে টাকাও ধরিয়ে দেয় আশা। বাজার নিয়ে ঘরে ফিরে আসে নীল। গোসল সেরে শোবার ঘরে বসে ল্যাপটপটা খুলে বসে ও। ইস্টিশন ব্লগে নিজের পুরনো লেখাগুলোর ওপর চোখ বোলায়। ফেসবুকে অন্যদের স্ট্যাটাস দেখে।

আশার দুপুরের রান্না তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ছোট বোন তন্বীকে তরকারি নামানোর কথা বলে কয়েকটা ভেজা কাপড় বারান্দায় মেলে দিতে যায় আশা।

আর তখনই দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ। অসময়ে কে এলো আবার, কাপড়গুলো ছড়িয়ে দিয়ে দরজা খোলে আশা। টি-শার্ট আর জিন্স পরা একটা অল্পবয়সী ছেলে।

‘আমরা কয়েকজন এই বাসাটা ভাড়া নেব, একটু দেখতে চাই। ’ ছেলেটা বলে।

‘কিন্তু আমরা তো এই বাসা ছেড়ে দিচ্ছি না, কিভাবে ভাড়া নেবেন?’

আশা একটু বিস্মিত হয়।

‘না, মানে...নিচের তলাটা ভাড়া নেব...সেটা তো আপনাদেরটার মতোই...সেই জন্য...’

ছেলেটার মধ্যে যেন খুব তাড়া, মনে হলো আশার। সে একটু সরে ওকে ঢোকার জন্য জায়গা করে দিল। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করল না। ভাবল, দুই কামরার এই বাসা দেখতে আর কতক্ষণ লাগবে?  এখনই তো চলে যাবে ছেলেটা।

মোবাইল ফোন টিপতে টিপতেই ঘরটা ঘুরে দেখল ছেলেটা। ঠোঁট উল্টে বলল, ‘বাসাটা ছোট!’

আশা বিরক্ত হলেও কিছু বলল না। ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে ছেলেটাকে দেখল নীল।

‘আপনাদের বাসাটা এত ছোট কেন?’ ছেলেটা মোবাইলে চোখ রেখে বলল। আশা এবারও উত্তর দিল না।

‘আচ্ছা, এর ভাড়া কত?’ আবার প্রশ্ন করল ছেলেটা।

‘বাড়িওয়ালাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন। ’ কণ্ঠে বিরক্তি গোপন করল না আশা। নিলয় এবার বিষয়টা বুঝতে পেরে ল্যাপটপ ছেড়ে উঠে এলো। ছেলেটা যাতে আর কোনো কথা না বলে চলে যায়, সে জন্য ওর পেছন পেছন দরজা পর্যন্ত এলো নীল। আর তখনই হুড়মুড় করে অপরিচিত তিনজন ঢুকে পড়ল খোলা দরজা দিয়ে। একজনের মুখে বড় দাড়ি ছিল। সে-ই ধাক্কা দিয়ে নিলয়কে মেঝেতে ফেলে দিয়ে ‘নারায়ে তাকবির’ বলে চাপাতি দিয়ে কোপাতে শুরু করে।

নিলয় হাত উঠিয়ে বাধা দিতে চাইলে ওর হাতেই কোপ দেয় লোকটা।

আশা যেন চিত্কার দিতেও ভুলে গেছে। ওর চোখের সামনে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। সংবিত ফিরে পেয়েই একঝটকায় দাড়িওয়ালা লোকটার পা জড়িয়ে ধরে আশা। তখন কে যেন পেছন থেকে তার চুল টেনে ধরে ছেঁচড়ে নিয়ে ফেলে বারান্দায়। আটকে দেয় ঘরের দরজা। বোনের চিত্কার শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলে তন্বীকেও আটকে ফেলে ওরা। এবার বারান্দা থেকেই গলায় রক্ত তুলে চিত্কার করতে থাকে আশা।

‘বাঁচাও বাঁচাও, মেরে ফেলল, বাঁচাও। ’

আশার সেই গলা-ফাটানো চিত্কার আরো অনেকের সঙ্গে তিনতলার গৃহবধূ তাসলিমাও শুনতে পেয়েছিল। তার স্বামী তখন বাসায় ছিল না। জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিল মসজিদে। তাসলিমার রান্না একটু আগেই শেষ হয়েছে। গোসলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল সে। আশার চিত্কার শুনে প্রথমে তার মনে হলো, বাড়িতে ডাকাত পড়েছে নাকি? কিন্তু এই দিনদুপুরে ডাকাত আসবে কোত্থেকে? তাহলে কি কারেন্টের তারে পেঁচিয়েছে কেউ? এর আগে এমন একটা ঘটনা তো ঘটেছিল এই পাড়ায়। বাবা-ছেলে কারেন্টের তারে লেগে একসঙ্গে শেষ।

তাসলিমা তাড়াতাড়ি পাশের ফ্ল্যাটের ভাবিকে ডাক দেয়। চিত্কার ওই ভাবির কানেও গেছে। তারপর দুজন মিলে ওপরে গিয়ে দেখে—হায় হায়, কী রক্তারক্তি কাণ্ড, ঘর ভাসছে রক্তে, আর লুঙ্গি পরা এক লোক সেই রক্তের মধ্যে পড়ে আছে মৃত। দুই বারান্দায় আটকে থাকা নারীদের উদ্ধার করে তাড়াতাড়ি বাড়িওয়ালার বাসায় খবর দেয় ওরা।

 

১২.

একটা ই-মেইল ঠিকানা থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নিলয় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আনসার আল ইসলাম।

‘আল্লাহর রাসুলকে (সা.) কটূক্তিকারী নিলয় নীল হত্যার দায়ভার গ্রহণ

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকাল ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।

—সূরা আহযাব ৫৭

আলহামদু লিল্লাহ! আনসার আল ইসলাম (আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ, বাংলাদেশ শাখা)-এর মুজাহিদিনরা হামলা চালিয়ে আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুলের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) দুশমন নিলয় চৌধুরী নীলকে হত্যা করেছে।

মহান আল্লাহর রহমতে এই অপারেশন আজ (৭ আগস্ট ২০১৫) দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় সম্পন্ন হয়। আলহামদু লিল্লাহ।

আমরা আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ আল্লাহর রাসুলের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সম্মান রক্ষার্থে পরিচালিত প্রতিশোধমূলক এই হামলার সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করছি।

এবং আমরা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুলের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) নিকৃষ্টতম দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। আমরা এদের এবং তাদের সাথিদের ধ্বংস করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করব ইনশাআল্লাহ।

আলহামদু লিল্লাহ! এই অপারেশন এই জমিনের আপামর মুসলিম জনসাধারণ ও হক্কানি উলামায়ে কিরামগণের অন্তর প্রশান্ত করেছে এবং মুনাফিক ও কুফফারদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেছে।

হে মুসলিম উম্মাহ, আমরা আপনাদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের এই সন্তানদের ধমনিতে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) এই ধরনের শত্রুদের ওপর আমাদের অপারেশন চলতেই থাকবে, ইনশাআল্লাহ!

হে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দুশমনরা, তোমরা অপেক্ষায় থাকো! কারণ আমরা অচিরেই তোমাদের কাছে আসছি।

যদি তোমাদের বাক্স্বাধীনতা কোনো সীমানা মানতে প্রস্তুত না থাকে, তবে তোমাদের হৃদয় যেন আমাদের চাপাতির স্বাধীনতার জন্য উন্মুক্ত থাকে।

WE DID NOT FORGET AND WE WILL NOT FORGET OTHERS INSHA’ALLAH.

মুফতি আবদুল্লাহ আশরাফ

মুখপাত্র, আনসার আল ইসলাম

(আল-কায়েদা, ভারতীয় উপমহাদেশ, বাংলাদেশ শাখা)

 

১৩.

গোড়ানে, নিলয়ের ঘরের দরজার সামনে জমে থাকা গাঢ় লাল রক্তাক্ত মেঝের ছবিটা বারবার চোখে ভাসছিল রায়হানের। কয়েক দিন হলো একটা দৈনিকের হয়ে ক্রাইম ফটোগ্রাফির কাজ করছে সে। সেই সূত্রেই ছবি তোলা। কী চরম বর্বরতা! শাটার টিপতে টিপতে মনে হচ্ছিল রায়হানের। আশ্চর্য! একেকটি খুন যেন শুধু একজন মানুষ বা একজন ব্লগার খুন নয়, একজন নাস্তিক খুন। যেন কোথাও বলা আছে, নাস্তিকরা রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো দায় রাষ্ট্রের নেই। ‘খুন হয়ে যাওয়া ব্লগারটি নাস্তিক ছিলেন’—এই কথাটি একবার কোনোভাবে প্রচার করে দিতে পারলেই হলো। যেন হত্যাটি বৈধতা পেয়ে গেল। রাষ্ট্র হয়তো মনে করছে, নাস্তিকের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে নাস্তিকদের পক্ষ নেওয়া, নাগরিকের পক্ষ নেওয়া নয়। সব কেমন এলোমেলো লাগে রায়হানের। আর কতজনকে হত্যার পর এই রক্তারক্তি বন্ধ হবে, কে জানে!

রায়হানের মনে পড়ে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীবকে কুপিয়ে হত্যা করার কথা। সেই হয়তো শুরু...মিরপুরের পলাশনগরে নিজের বাসার সামনে পড়ে ছিল রাজীবের রক্তাক্ত লাশ। রাজীবকে নিষ্ঠুরভাবে চিরনিদ্রার জগতে পৌঁছে দিয়েছিল গুপ্তঘাতকরা। থাবা বাবা নামে ব্লগে লিখত রাজীব। রাজীব সেই সময়কার শাহবাগ আন্দোলন, পরে যেটা গণজাগরণ মঞ্চ হিসেবে খ্যাত হয়েছিল, তার সঙ্গে জড়িত ছিল শুরু থেকেই। সে এক সময় কেটেছে বটে, দিন নেই, রাত নেই, সকাল বিকাল দুপুর নেই, শাহবাগেই দিন চলে যেত সবার, মানে রায়হানদের। শুধু কি রায়হানরাই? কে আসেনি শাহবাগে? মায়ের কোলে চড়ে এসেছে সন্তান, বাবার কাঁধে চড়ে শিশুপুত্র, ছাত্র শিক্ষক রাজনীতিবিদ মুক্তিযোদ্ধা সংস্কৃতিকর্মী নারী পুরুষ তরুণ  তরুণী শিশু কিশোর—সবাই।

মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হচ্ছে, কিছু একটা পরিবর্তন আসছে, আলো আসছে, আঁধার হটিয়ে, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে, একটা অদ্ভুত আনন্দের মধ্যে, একটা গৌরবের মধ্যে, অভূতপূর্ব রোমাঞ্চের মধ্যে দিনগুলো গেছে তখন। কে নেতা, কে জনতা—সেই প্রশ্ন ওঠেনি একবারও। সবাই তখন এসেছিল স্বেচ্ছায়, এসেছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের টানে। কেমন করে যেন সবার মনে একটা বিশ্বাস, একটা আস্থা জন্মেছিল যে এই জমায়েত কিছু একটা পরিবর্তন আনবে।

অনেকের মতো সেলিব্রিটি লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালও শাহবাগে এসেছিলেন একদিন। তিনি বলেছিলেন, নতুন প্রজন্ম শুধু ফেসবুকে লাইক দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে বলে মনে করতেন তিনি, এখন তাঁর সেই ধারণা বদলে গেছে। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে দেশকে তারাও তীব্রভাবে ভালোবাসে, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের শেষ দেখতে চায় তারা। কেউ কেউ তখন বলতে শুরু করেছিল, এটা দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ...২০১৩ সাল আসলে আরেকটি ১৯৭১। যারা একাত্তর দেখেনি তারা বলেছে, শাহবাগে মানুষের জেগে ওঠা দেখা ছিল একাত্তর দেখার মতোই স্মরণীয়। এই জনজোয়ারকে তাদের মনে হয়েছিল গণবিপ্লব। তখন প্রতিবাদের নাম ছিল শাহবাগ। তারুণ্যের শপথ নেওয়ার জায়গা ছিল শাহবাগ।

শাহবাগকে বাংলাদেশের ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলেছিল অনেকেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তো বটেই, পাশাপাশি খুব মোটাদাগে উদার ও সেক্যুলার আন্দোলন ছিল এটি। অথচ এই আন্দোলনকে কেবল নাস্তিক আখ্যা দিয়ে এর শত্রুরা ঘায়েল করে দিল খুব সহজেই—আফসান চৌধুরী লিখেছিলেন।

রায়হান তার ডিএসএল ক্যামেরায় প্রচুর ছবি তুলেছিল তখন...বিভিন্ন বয়সী মানুষের মুখের ছবি, গণজোয়ারের ছবি, প্রতিবাদের ছবি, পতাকা, মিছিল ও স্লোগানের ছবি...প্রিয়তাও সেই মানুষের ভিড়েই ছিল। সেখান থেকেই সখ্য, সেখান থেকেই একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত...আর এখন সারা দিনের ক্লান্তি আর মন খারাপের বিষণ্ন সন্ধ্যা কাটিয়ে দীর্ঘ রাত নেমে এলে প্রিয়তাবিহীন একা ঘরে ফিরতে হয় রায়হানের। ঘর তাকে প্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়, কারণ এই ঘর আসলে সবটুকুই প্রিয়তার, সে-ই সাজিয়েছে যতন করে, গুছিয়েছে নিজ হাতে। তারপর সব স্পর্শ, সব সুগন্ধ পেছনে ফেলে রেখে পৃথিবীর দাম্ভিক রাঙা রাজকন্যার মতো চলে গেছে নিজের প্রাসাদে। তার বাগানের সবুজ চারাগুলো শুকিয়ে ম্লান হয়ে গেছে। ঘরের কোনাকাঞ্চিতে ময়লা জমেছে। ঘরে ঢুকলেই একটা খাঁ খাঁ শূন্যতা ঘিরে ধরে রায়হানকে। ভালো লাগে না একটুও। এত বড় বাসা দরকার ছিল না দুজন মানুষের জন্য, কিন্তু জেদ করেই তিন বেডরুমের এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছিল প্রিয়তা। যদিও দিনের বেশির ভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকত বাসাটা।

‘ছোট বাসা আমার পছন্দ না, কেমন দমবন্ধ লাগে...’ প্রিয়তা বলত।

রায়হানের তখন মনে পড়ত তার মায়ের কথা। মা সুচিত্রা সেনের ঠোঁটে গাওয়া সেই গানটার কথা বলতেন, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়...’

‘দূর, আকাশ কি কখনো নিজের হয়? আকাশ যতই বড় হোক, সে তো দূরের জিনিস, হাতের মুঠোয় পাওয়া যায় না। ’

প্রিয়তার মূল সমস্যাই হয়তো তৈরি হয়েছিল হাতের মুঠোয় সব কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। রায়হানকেও সে হাতের মুঠোয় পেতে চেয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর বিস্তৃতি যদি তার হাতের মুঠির মাপের চেয়ে বড় হয়, তাহলে?

রায়হান কোনো রকমে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে পায়ের জুতোসুদ্ধ ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় টান টান করে বিছিয়ে দেয়। বাইরের জামা-কাপড়-জুতো না ছেড়ে এভাবে শুয়ে পড়ার মতো অভদ্রতা কখনোই বরদাশত করতে পারত না প্রিয়তা। খুব বিরক্ত হতো সে, রাগ করত। ইউনিভার্সিটিতে যেভাবে আঙুল উঁচিয়ে অবাধ্য ছাত্রদের শাসন করত, ঠিক সেই ভঙ্গিতে রায়হানকে শাসন করতে চাইত প্রিয়তা।

আজকেও প্রিয়তা এলো তেমনি শাসিকা রূপে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে। তার চোখে জ্বলছে ঘৃণার আগুন, বুকে ভালোবাসাহীনতার হাহাকার। রায়হান দেখল, প্রিয়তা একা আসেনি। তার সঙ্গে এসেছে আরো কয়েকটি অজানা মূর্তি। তাদের চেহারা অস্পষ্ট। শুধু চোখ দুটো স্পষ্ট। সেই চোখে ভয়ংকর হিংস্রতা। এদের মধ্যে কেউ একজন রায়হানের দিকে আঙুল তুলে হিস হিস করে বলল,

‘একেও মারেন... এ-ও একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট। নাস্তিক। ’

প্রিয়তার সঙ্গে আসা লোকগুলো তখন মুহূর্তের মধ্যে চাপাতি আর ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রায়হানের ওপর। চিত্কার করার সময়ও পেল না সে, তার শরীর থেকে গল গল করে নেমে এলো লাল রক্তের ধারা, সেই রক্ত ভাসিয়ে দিল বিছানা, ঘর, মেঝে...। দৌড়ানোর চেষ্টা করল সে, ছুটে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। নিজের রক্তে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল তার প্রাণহীন দেহ। হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল পুলিশ, ঢুকল গলায় ক্যামেরা ঝোলানো একজন ফটোগ্রাফার, রায়হান অবাক হয়ে দেখল সে নিজেই ক্রমাগত শাটার টিপে তার রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবি তুলছে।

আর তখনই ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। ঘড়িতে তখন রাত দুটো বিশ। রায়হানের গলা শুকিয়ে কাঠ। তার পরও উঠে গিয়ে পানি খাওয়ার ইচ্ছা হয় না তার। কেমন বজ্রাহতের মতো এক জায়গায় বসে থাকে সে। কানের কাছে মশারা গুনগুন করে। রাতের নির্জন রাস্তায় বেদম শব্দ তুলে ট্রাক চলে যায়। রায়হান বসেই থাকে যেমন বসে ছিল আগে। কী স্পষ্ট, ভয়াবহ স্বপ্ন সে দেখল এই মধ্যরাতে! কেন দেখল? 

রাত গড়িয়ে যায়, একটা অদ্ভুত বোবা যন্ত্রণা, আতঙ্ক আর নিশ্চুপ কান্না রায়হানের গলায় শক্ত হয়ে আটকে থাকে। তার কেন যেন মনে হয়, এই দুঃস্বপ্ন সে একা দেখছে না, হয়তো পুরো জাতিই একসঙ্গে এরকম ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠছে।

 

১৪.

২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে জগিং করার সময় খুন হলো সিজারে তাভেল্লা। অক্টোবরে রংপুরে খুন হলো কুনিও হোশি। ৩১ অক্টোবর বিকেলে লাঞ্চের পর রণদা, তারেক আর টুটুল মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বরের অফিসে আড্ডা দিচ্ছিল। লাঞ্চের পর পর একটু অবসাদ একটু ঝিমুনির আবেশে রণদার গল্প বলাটাও একটু কেমন যেন স্লো হয়ে গেছিল। তারেক কী যেন একটা অ্যাপ বানানোর চেষ্টা করছিল। টুটুল টেবিলে মাথা রেখে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছিল অথবা চেয়ারে হেলান দিয়ে হয়তো কিছু একটা ভাবছিল।

সবুজ কালো চেকশার্টের একটা ছেলে ঠিক কখন ঘরে ঢুকল তা টের পেল না টুটুল। তার শুধু মনে আছে, অচেনা ছেলেটার হাতে ছোট এক হাতের মতো লম্বা একটা দুদিকেই ধারালো অস্ত্র। সেই অস্ত্রটা উঁচিয়ে চিত্কার করে আল্লাহু আকবর বলল সে। ডান হাত উঠিয়ে হয়তো খামাখাই সেই অস্ত্রের কোপ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিল টুটুল। হয়তো তার গলা দিয়ে আপনাআপনিই বেরিয়ে এসেছিল আর্তচিত্কার। নাহ্, সেই ঘটনার পর আর কিছুই মনে পড়ে না তার। এরপর কেটে গেল অল্প সময় নাকি বেশি সময়, জানে না টুটুল। শুধু পুলিশের গাড়িতে ওঠানোর পর ডান হাত দিয়ে মাথা কান চেপে ধরে গরম রক্তের গড়ানো ধারা অনুভব করছিল সে।

পুলিশ ভ্যানে টুটুলের পাশে তারেক অরেঞ্জ কালার টি-শার্ট পরে ছোপ ছোপ রক্তে ভেসে শুয়েছিল। টুটুলের খুব ইচ্ছা করছিল তারেককে জড়িয়ে ধরে চিত্কার করে কাঁদতে। কিন্তু সে তার মাথা থেকে হাত সরাতে পারছিল না। রক্তের স্রোত তার কান মাথা মুখ বেয়ে পুরো শরীর ভিজিয়ে দিয়েছিল। তারপর সেই রক্তস্রোত টুটুলের শরীর ভিজিয়ে দিতে দিতে এক অদ্ভুত শীতল ঠাণ্ডা স্রোতে পরিণত হলো। হঠাৎ মনে হলো ভেতরে ভেতরে কাঁপছে সে। এই সময়টাতে টুটুল বুঝতে পারছিল না কোথায় আছে সে। পুলিশের ভ্যান থেকে টুটুল, রণদা আর তারেককে নামিয়ে ট্রলিতে শুইয়ে দেওয়া হলো। ওপরের দিকে তাকাতেই টুটুলের চোখ পড়ল জরুরি বিভাগ লেখা লাল অক্ষরগুলোতে।

পাশে শামীমার উদ্বিগ্ন স্নেহময় মুখ। আরো কত        চেনা-অচেনা চেহারা।  

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাসপাতাল সিরিজ লেখে টুটুল।

‘সমবেত ঘাসফুল

মন খারাপ করা হেমন্ত সন্ধ্যার শিশির

আজ বইমেলার পরিবর্তে

শব্দ বাক্য অক্ষরের পরিবর্তে

আমরা আমাদের কেটে আঙুল

দুভাগ হওয়া মাথার খুলি, চোয়াল

রাজীব, অভিজিৎ অনন্ত নীল

মেঝেতে শুকিয়ে থাকা দীপনের রক্ত আজ

আপনাদের চক্ষু, অন্তর্চক্ষুর সমীপে

আপনাদের বেদনার মর্মমূলে

হেমন্তের বইমেলার পরিবর্তে

এই উদ্বোধনের মঞ্চে

এই শূন্য মাইক্রোফোনের সামনে

পাবলিক লাইব্রেরির দেয়ালে দেয়ালে

পাতার মর্মরে

রাজপথে শাহবাগে

দেখুন দয়া করে আপনারা শুধু দেখুন।

 

১৫.

‘হত্যাকারীদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই না। কেননা বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক। বিচার চেয়ে কী হবে? একজনের ফাঁসি দিয়ে কী হবে? না দিলেই বা কী হবে? হয়তো নিয়ম অনুযায়ী আমাকে একটা মামলা করতে হবে। কিন্তু এর বিচার আমি চাই না। ’

সাংবাদিকদের সংবেদনহীন মাইক্রোফোনের সামনে সদ্য পুত্র হারানো পিতা আবুল কাসেম ফজলুল হকের কণ্ঠ অপ্রত্যাশিতভাবে অকম্পিত, স্থির ও দৃঢ় শোনায়। ‘পুত্র হত্যার বিচার চাই না’ এমন কথা এর আগে কেউ কখনো শোনেনি। হয়তো কেউ কখনো বলেনওনি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিল,

‘আপনি ছেলে হত্যার বিচার চান না কেন?’

তিনি বলেছিলেন, ‘বিচার চেয়ে আর কী হবে? এ দেশে রাজনৈতিক সমাধান যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে ততক্ষণ আইনগত কোনো সমাধান সম্ভব না। আমরা শূন্যের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজছি। এটা পাওয়া সম্ভব না। আমার কাছে মনে হয়, আগে এটা আদর্শগত ও রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। ’

‘আপনি কি আবেগ বা ক্ষোভ থেকে বিচার প্রত্যাখ্যান করেছেন?’

‘শোনো, এটা মোটেও আবেগ বা ক্ষোভের বিষয় নয়। আমি এটা ভেবে ও নিজের যৌক্তিক বিবেচনাবোধ থেকে বলেছি। ... শুধু তোমাকে এটুকু বলতে পারি, বিচার দিয়ে বা আইন আদালত দিয়ে আমরা একজনকে জেল ফাঁসি দিতে পারি। কিন্তু যদি দেশের সার্বিক উন্নতি না হয়, সবার বিচার তো আর হবে না। ’ 

আহা, আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার, আপনি সব সময় সবার কথা ভেবেছেন। শুধু ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা ভাবেননি হয়তো। প্রগতি-প্রয়াসী মন নিয়ে জনগণের মুক্তি ও উন্নতির জন্য আপনি স্বদেশ চিন্তা সংঘ করেছেন। ২৮ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছেন। বলেছেন, নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র থেকে বের হতে হবে। তা না হলে সব মানুষের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত হবে না। এমন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে, যারা শুধু মুখে ঐক্যের কথা বলবে না, কাজেও এর প্রমাণ দেবে। আপনি বলেছেন, আমাদের একটি সংকল্প ও কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ওই ঐক্য যেন লুটপাট ও ভাগাভাগির জন্য না হয়।

আপনি কাজী আবদুল ওদুদের কথা, দার্শনিক আবুল হুসেনের কথা বলতেন ছাত্রদের। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কথা বলতেন। ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—এই আপ্তবাক্য আপনার মুখেই হয়তো প্রথম শুনেছিল বাংলা বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী।

আপনি বলতেন, ‘রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি—যে যেখানে আছি সব ক্ষেত্রেই আত্মনির্ভরতা ও আত্মশক্তির চর্চা করা দরকার। আমরা এখনো পরিচালিত হচ্ছি বাইরের শক্তি দিয়ে। এর অবসান ঘটাতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। আমার মনে হয়, যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছে, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে, উভয় পক্ষ দেশের জন্য ভালো করছে না। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধি হওয়া দরকার। ’

কিন্তু স্যার, সেই শুভবুদ্ধির জন্য আর কত অপেক্ষা? সেই শুভবুদ্ধি কি আদৌ আসবে?

সেদিন দুপুরের কথা তো আপনাদের পরিবারের সবারই মনে আছে।

দীপনের স্ত্রী জলিই জানিয়েছিল, সেদিন একটু তাড়াতাড়িই শাহবাগে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছিল দীপন। ওর পুরো নাম ফয়সল আরেফিন দীপন।

পরিচিতরা প্রত্যেকেই একবাক্যে স্বীকার করেছে, দীপনের চেহারা ছিল স্নেহজাগানিয়া, তার মুখে থাকত বিনয়ী হাসি। নম্র-ভদ্র-সুন্দর-শিক্ষিত-প্রগতিশীল একজন মানুষ হিসেবেই দীপনকে চেনে সবাই।

‘ও কারো সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করেছে বলে শোনা যায়নি। টাকা-পয়সার প্রতি মোহ ছিল না। যতটুকু দরকার ততটুকু পেলেই খুশি থাকত। ’—ছেলে সম্পর্কে দীপনের বাবার মন্তব্য ছিল এটা।

দীপন ও জাগৃতি প্রকাশন ছিল একসুরে গাঁথা। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তিনতলায় সেদিন সেই কালো দুপুরে জাগৃতি প্রকাশনের অফিসে অন্যান্য দিনের মতোই হয়তো নিজের চেয়ারে এসে বসেছিল দীপন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাসেম ফজলুল হক, আর রোকেয়া হলের সাবেক হাউস টিউটর ফরিদা প্রধানের সন্তান দীপন। ডাক্তার রাজিয়া রহমান জলির স্বামী, রিদাত আর রিদমার বাবা দীপন।

কেউ জানে না সেদিন কেন এত তাড়াতাড়ি শাহবাগ গেল দীপন?

কেউ জানে না ঘাতকরা কখন এসেছিল? কেউ টের পেল না জলজ্যান্ত একজন মানুষকে খুন করে কিভাবে নিরাপদে চলে গেল তারা?

বিকেল সাড়ে চারটা থেকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না দীপনকে। রিং হচ্ছিল কিন্তু ফোন ধরেনি কেউ। এমনটা সাধারণত হয় না। জলির উদ্বেগ বাড়ছিল। কারণ টিভিতে তখন প্রচারিত হচ্ছিল শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে হামলার কথা। দীপনের প্রকাশনা সংস্থা জাগৃতি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অভিজিৎ রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামের দুটি বই। অভিজিৎ আর দীপন উদয়ন স্কুলে একসঙ্গে পড়ত।

দিনকাল ভলো নয়। জলি শেষ পর্যন্ত তার শ্বশুরকে বলেছিল দীপনের খোঁজ নিতে। আজিজ মার্কেটে ১৩১ নং রুমের কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল দীপনের জাগৃতির কার্যালয়ে আলো জ্বলছে, ফ্যান ঘুরছে। শুধু দরজায় তালা ঝুলছে। তবে কি দীপন বাইরে কোথাও গেল? কিন্তু তাহলে তো লাইট-ফ্যান চলার কথা নয়। শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে পাওয়া গিয়েছিল দীপনের উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নিথর রক্তাক্ত মৃতদেহ।

এই মৃত্যু, এই আকস্মিক থেমে যাওয়া... আহা কেইবা মানতে পারে? জলিও মানতে পারেনি। বারবার মনে হচ্ছিল তার, ‘এটা কি দীপনের অভিমান? আবারও কি রাগ করল অভিমানী দীপন? কেমন করে বাচ্চাদের ছেড়ে, আমাদের সবাইকে ছেড়ে দীপন একা একা থাকবে?’

দীপনকে ছাড়া লম্বা দিনগুলো পাড়ি দেওয়ার কষ্ট এরপর থেকে জলি একাই বুঝেছিল, তার কাছে মনে হয়েছিল, এটা কোনো গল্প নয় যেটা সে বলে যেতে পারবে, এটা কেউ বুঝতে চাইলে তাকে জলির জায়গায় এসে দাঁড়াতে হবে। কারণ এই শূন্যতা অপূরণীয়। জলি তার ফেসবুকে সেই শূন্যতার উপলব্ধি উদ্ধৃত করে—

‘ফিরে যে গিয়েছ তবু

তোমাকে নিয়ে যেতে পারোনি তুমি

তুমিময় হয়ে আছে এখনও

বিনম্র হৃদয় এ অরণ্য এ বিস্তৃত মরুভূমি

চলে যে গিয়েছ তবু চলে কি গিয়েছ তুমি? 

 

১৬.

ব্রিটিশ দূতাবাসের চিফ কমিউনিকেশন অফিসার ফারিয়া ওসমানের গুলশানের বাসা।

তাঁর সাজানো-গোছানো দামি ও শৈল্পিক আসবাবে ভরা ড্রইংরুমে জড়ো হয়েছেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নারী ও পুরুষ। তাঁদের কেউ সংবাদপত্রে, কেউ টেলিভিশনে, কেউ অনলাইনে কাজ করেন। মিতালিও এখানে আমন্ত্রিত। ব্রিটেনের সাউথ এশিয়াবিষয়ক একজন পাতি মন্ত্রীও ড্রইংরুমে উপস্থিত। কুশল বিনিময়ের পর তাঁরা ইংরেজি ভাষায় জানতে চাইছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকরা কী ভাবছেন? নারী সাংবাদিকরা কি কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা বোধ করছেন?

সাউথ এশিয়াবিষয়ক তরুণ মন্ত্রী আরেক কাঠি এগিয়ে জানতে চাইলেন, ‘দেশের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে আইএসের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না?’

এসব প্রশ্নের জবাবে কেউ কেউ বললেন, ২০ অক্টোবর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো  ই-মেইল বার্তায় নাকি নারী কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের কথা কেউ শুনবে কেন?

একজন বললেন, ‘এসব বার্তাকে থোড়াই কেয়ার করি আমরা। আমাদের পত্রিকায় তো এটা ছাপেইনি। ’

‘দেশের কোনো পত্রিকাই ছাপেনি এই ভুয়া ই-মেইল বার্তা। ’

আরেকজন নারী সাংবাদিক বললেন, ‘আমরা ভয় পেয়ে কাজ ছাড়ছি না ঠিকই। তবে দেশে যেভাবে ব্লগার-প্রকাশক হত্যা চলছে, তাতে একটা ভয় থেকেই যায়, কারা কী কারণে এসব করছে, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। ’

ধবধবে সাদা কাপড় পরা সুদর্শন বেয়ারারা ট্রেতে সাজিয়ে লম্বা সাদা কাচের গ্লাসে ঠাণ্ডা ফলের জুস পরিবেশন করছিল।   মিতালি একটা আপেল জুসে ভরা গ্লাস তুলে নিয়ে হালকা করে চুমুক দিতে দিতে অন্যদের কথা শুনছিল।

‘এ রকম অযৌক্তিক হুমকিতে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ’ প্রায় সবাই বলল, ‘এসব দেশের ছিঁচকে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাজ। এদের সঙ্গে আইএস থাকার কোনো কারণ নেই। কোনো প্রমাণও নেই। ’

তরুণ ব্রিটিশ মন্ত্রী এবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটা প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুললেন। অনেকেই সেই প্রতিবেদনটি পড়েছেন।  

‘ফেয়ার অ্যান্ড সাইলেন্স ইন বাংলাদেশ অ্যাজ মিলিট্যান্টস টার্গেট ইনটেলেকচুয়ালস’

প্রতিবেদক এলেন ব্যারি।   নভেম্বর ৩, ২০১৫

ঢাকা, বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের একজন টক শো উপস্থাপিকা একজন লেখক ও একজন নারী সাংবাদিকসহ কয়েকজনের সাক্ষাত্কার নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। সেই উপস্থাপিকা জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী নিজে তাঁকে ড্রাইভ করে প্রতিদিন টিভি অফিসে পৌঁছে দেন, কারণ ড্রাইভার হয়তো খুব সহজেই জঙ্গিদের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদক বলছেন, গত ২০ অক্টোবর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে পাঠানো ই-মেইল বার্তায় নারী কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যেহেতু নারীদের ঘরের বাইরে চাকরি করা, বেপর্দা হয়ে ঘোরাঘুরি করা ইসলামী শরিয়াহ মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তাই যারা এদের চাকরি দিচ্ছেন, করাচ্ছেন, তারাও সমানভাবে দোষী। সব সংবাদমাধ্যমের প্রতি আহ্বান করছি নারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিন। ’

প্রতিবেদনে দেশের একজন জনপ্রিয় নারী সাংবাদিকের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘একটা নীলনকশা তৈরি হয়েছে কোথাও, কোনোখানে... এখন আমি সত্যিই কিছুটা ভীত। আমার মনে হয়, ওরা একজন নারীকে হত্যা করে একটা নতুন অধ্যায় খোলার পরিকল্পনা করতে পারে। এ রকম একটা সময়ে আপনি ধারণাও করতে পারবেন না, কিভাবে আপনাকে ব্যাপারটার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। আপনি কখনোই সেটা জানবেন না। ’

ষোলো কোটি জনগণের মধ্যে চারজন ব্লগার ও একজন প্রকাশকের মৃত্যু হয়তো সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু হুমকি অসংখ্য। ক্রমবর্ধিষ্ণু মানসিক চাপ খুবই গভীর। অবস্থা এমন হয়েছে যে এমনকি খোলা মনে প্রকাশ্যে কেউ এসব সন্ত্রাসী হুমকি নিয়ে কথাও বলতে চাইছেন না।

মে মাসে একজন ব্লগার হত্যার পর, পেন ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ইন প্রিজন কমিটির সভাপতি সলিল ত্রিপাঠী বাংলাদেশি লেখকদের অনেককেই একটি বিবৃতি দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই বিবৃতিতে নিজেদের নাম সংযুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই বলে যে এটা বিপজ্জনক হতে পারে। শেষ পর্যন্ত একজন প্রবাসী লেখক ছদ্মনামে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করেছিলেন।

সলিল ত্রিপাঠীর মতে, বুদ্ধিজীবীদের হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে আপনি মতামত প্রকাশকে থামিয়ে দিতে চাচ্ছেন অথবা নিজেদের পছন্দমতো মত প্রকাশে বাধ্য করছেন। ত্রিপাঠী বলেন, সংবেদনশীলতা এই পর্যায়ে গেছে যে কখনো কখনো বাংলাদেশি বন্ধুরা তাঁকে বলেছেন, ব্লগারদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে ফেসবুক পোস্টে তাদের যেন ট্যাগ না করা হয়। ত্রিপাঠী বলেন, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমার মনে হয় না কোনো বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবী এই বিষয়ক আলোচনায় তাঁদের নাম জড়াতে চাইবেন।

গত মাসে, সোশ্যাল মিডিয়ার অজ্ঞাতপরিচয় অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া হুমকির আওতা বিস্তৃত হয়েছে, বিদেশি নাগরিক, নারী সাংবাদিক এবং দেশের সংখ্যালঘু ও অল্পসংখ্যক শিয়া সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

শনিবার আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ ডিভিশন অব আল-কায়েদা, ভারতীয় উপমহাদেশ ‘এরপর কে?’ শিরোনামে একটি তালিকা প্রকাশ করে যেখানে বিখ্যাত লেখক, কবি, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সম্পাদক, অভিনেতা ও সাংবাদিকদের নামের তালিকা রয়েছে।

ঢাকা লিট ফেস্টের সংগঠকরা বলছেন, তাঁদের নভেম্বরের সম্মেলনে আমন্ত্রিত ৭০ জন বিদেশি লেখকের মধ্যে প্রায় ১০ জনই এই পরিস্থিতিতে আসবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবী জনজীবন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঔপন্যাসিক আহমাদ মোস্তফা কামাল (৪৫) ২০১৩ সালের ‘হিট লিস্টে’ যার নাম ছিল, বলেন, তিনি কদাচিৎ নিজের অফিসের বাইরে যান এবং পাবলিকলি কথা বলার আমন্ত্রণগুলো ফিরিয়ে দেন। ‘আমার জীবন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন’ তিনি বলেন ‘অথচ, একজন লেখকের সব জায়গায় যাওয়া প্রয়োজন। মানুষের সঙ্গে কথা বলা, পাঠকদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। ’

মিস্টার কামাল কখনোই পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে যাননি। কারণ তাঁর ধারণা, পুলিশ হয়তো তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলবে। তিনি বিভিন্ন আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিলেও পর পর ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তাঁর বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

‘গত রাতে আমার ছেলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, হঠাৎ সে বলল, ‘বাবা ওরা কি তোমাকেও মেরে ফেলবে?’ কামাল বলেন, ‘আমার টিনএজার ছেলে, সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে, আমাকে মেরে ফেলা হবে কি না। বলুন, এ ক্ষেত্রে আমার উত্তর কী হতে পারে?’

একই কম্পন বয়ে যাচ্ছে একাত্তর টিভিতেও। চ্যানেলটির প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু অধিকসংখ্যক নারী রিপোর্টার ও অ্যাংকর নিয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন, কারণ তাঁর ভাষায়, ‘নারীরা শক্তিশালী পুরুষদের বিপদে ফেলে দিচ্ছে, বিষয়টা ভালো লাগে আমার...’

বাবু সাহেবের রিপোর্টাররা আরো বেশি সতর্ক। তাঁর টিভির সবচেয়ে পরিচিত মুখ নবনীতা চৌধুরী জুন মাসে আবিষ্কার করলেন, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির ২৫ জন সেলিব্রিটির সঙ্গে তাঁর নামও হিটলিস্টে আছে। নবনীতা এখন কিছুটা স্বাস্থ্যগত কারণ ও পরিবারের অনুরোধে টিভি থেকে দূরে আছেন।

‘আমার ভাই খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল’ নবনীতা বলল, ‘সে বলেছিল, ‘এগুলো থামাও। আমাদের জন্য হলেও বাড়িতে থাকো। ’

3একাত্তরের আরেকজন রিপোর্টার ফারজানা রূপা বলেন, প্রকাশক হত্যার বিষয়ে রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ফেসবুক পাতায় সত্যিকারের হুমকি পাওয়ার পর তিনি নিজের গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেন। কিন্তু যে ড্রাইভারই রাখা হয়, সেই চলে যায়, এ রকম পর পর ছয়বার একই ঘটনা ঘটে। ড্রাইভাররা মনে করে তাঁর সঙ্গে গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি রূপা তাঁর আট বছর বয়সী কন্যা ও পরিবারের অন্য শিশুদের সামনে খোলামেলাভাবেই নিজের বিপদের কথা আলোচনা করেছেন।

‘আমি ওদের বলেছি, এখন যে দিনকাল পড়েছে, মায়ের যে কোনো কিছু হয়ে যেতে পারে। সুতরাং তোমাদের স্বাবলম্বী হওয়া শিখতে হবে। ’

ফারজানা তাঁর বিপদের ঝুঁকি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছিলেন না। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগছিল, যদি তিনি খুন হন, তাহলে মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? ‘আমার মনে হয়, মনের গভীরে যেটা আমি অনুভব করি, তা হচ্ছে, যদি এমন ঘটে, মানুষজন হয়তো বলবে, ‘কেন সে তার সীমা অতিক্রম করল?’ মানুষ হয়তো সত্যিই ভাববে, ‘এই নারীরা কেন ঘোমটা ছাড়া বেরিয়ে এসেছে? কেন এই নারীরা এত কথা বলে? এত ঠোঁটকাটা কেন এই নারীরা? কেন তারা এত স্পষ্টবাদী?’

দূতাবাসে উপস্থিত একজন বয়স্ক সাংবাদিক নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটির সমালোচনা করে বললেন, ‘এখানে যে রকম করে বলা হয়েছে ততটা ভয়াবহ অবস্থা বাংলাদেশে নেই। খুবই একপেশে বক্তব্য। বাস্তবতা ভিন্ন। নারীরা তো এখনো কাজ করছে, কই খারাপ কিছু কি ঘটেছে?’

দূতাবাসে কাজ করছেন এমন একজন বিদেশি কর্মকর্তা তখন ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশে একজন নারী সাংবাদিকের নিগৃহীত হওয়ার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেন।

আরেকজন সাংবাদিক তখন বলেন, ‘এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ’

একজন নারী সাংবাদিক তখন হাত-পা নেড়ে বলেন, ‘ওই ঘটনার কারণে এখন আর নারী রিপোর্টারদের ইসলামী সমাবেশ কাভার করতে পাঠানো হচ্ছে না। কিন্তু এটি তো কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং নারীদের ও রকম জায়গায় পাঠাতে হবে, পাশাপাশি তার নিরাপত্তাটাও নিশ্চিত করতে হবে। ’  

এখানে যাঁরা এসেছেন, সেই তারকা উপস্থাপক ও সাংবাদিকদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চেনে না মিতালি। তবে টিভিতে দেখেছে। সে রুমের এক কোনার সোফায় একটু আলাদা হয়ে চুপচাপ বসে অন্যদের কথা শুনছিল। হঠাৎ তার দিকেই আঙুল তুললেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী। বললেন, ‘হেই লেডি, তোমার কী মত?’

এবার একটু হকচকিয়ে গেল মিতালি। একে তো এসব বিষয় নিয়ে খুব গভীরভাবে সে কখনো ভাবেনি, তার ওপর ইংরেজি বলায় তার দুর্বলতা। রুমের সবাই এখন তাকিয়ে আছে মিতালির দিকে, কিছু না বললেই না, সে হাসি হাসি মুখ করে ভুল-ভাল ইংরেজিতে হড়বড় করে বলল, ‘আমি মনে করি, সমস্যা আছে, তবে সেগুলো সাহস নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। ভয় আমারও হয়, কিন্তু ভয় নিয়ে তো আর বেশিদূর যাওয়া যায় না। ’

ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী অনেকটা ধাঁধার মতো জিজ্ঞেস করেন, ‘বাংলাদেশে কি আইএস আছে?...কারা মনে করো আইএস আছে?’

কেউ তখন কথা বলে না।

‘কারা মনে করো আইএস নেই?’

সকলেই তখন হাত তোলে। কারণ সকলেই মনে করে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলির সঙ্গে আইএস নামের আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনটির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

 

১৭.

হুমকি

বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। প্রিয়তা হঠাৎ করে লাউঞ্জে ঢুকে কী বিষয় নিয়ে আলাপ হচ্ছে তা চট করে বুঝে উঠতে পারল না। সেই সময়ই পাশের চেয়ারে কফির কাপ হাতে বসে থাকা সহকর্মী ড. নাফিস হাসি হাসি মুখে প্রিয়তাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘আপনার নাম তালিকায় নেই? ’

‘কোন তালিকা? প্রমোশনের?’

চেয়ারে বসে শাড়ির কুঁচিগুলো হাত দিয়ে সমান করতে করতে প্রিয়তা চটজলদি পাল্টা প্রশ্ন করে।

‘আরে নারে ভাই, কী বলেন, প্রমোশন?... আনসারুল্লাহর তালিকায়, আমাদের ভিসি স্যার, আহসান স্যার আর সঞ্চিতা ম্যাডামের নাম আছে শুনলাম। ’

‘মানে?’ প্রিয়তার ভ্রূ কুঁচকে যায়।

‘ও আপনি কিছু শোনেননি?’ নাফিস বলে। প্রিয়তা মাথা নাড়লে নাফিস পত্রিকার ভাষায় জানায়,

‘দশ বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি দিয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ডাকে পাঠানো চিঠিতে তারা বলেছে, তোমাদের অবশ্যই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তোমরা মুসলিম জাতির কলঙ্ক। চিঠি পেয়ে ওনারা থানায় জানিয়েছেন, মামলাও হয়েছে শুনলাম। ’ 

‘এটা কেমন কথা? মগের মুল্লুক নাকি?’

প্রিয়তার কণ্ঠে রাগ ও বিরক্তির ছোঁয়া। কেউ কি বাঁচবে না তাহলে ওদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত থেকে? এসব হুমকি কি সত্যি, নাকি শুধুই কথার কথা। কারা করছে এগুলো?

‘আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি বলেছেন, ব্লগারদের হত্যা আর ইনাদের যে হুমকি, তার মধ্যে পার্থক্য আছে। ইনারা তো আর ব্লগার না বা সেই ধরনের লেখালেখি করেন না। এটার হয়তো ভিন্ন কোনো কারণ থাকতে পারে। ’

‘যে কারণই থাকুক, সেটা খুঁজে বের করতে হবে তো! এমন তো কোনো সভ্য দেশে চলতে পারে না!’

প্রিয়তা অস্থির হয়ে বলে। অন্য শিক্ষকরাও এসে এই আলোচনায় যোগ দেন। ‘দিন দিন দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে...’

‘সারাক্ষণ কেমন আতঙ্কের মধ্যে থাকি, ভালো লাগে না!’

‘এই আনসারুল্লাহ কারা? কোথায় থাকে? ওদের ধরে না কেন পুলিশ?’

এমন টুকরো টুকরো প্রশ্ন, মন্তব্য ভেসে আসে। প্রিয়তার আজ আর কোনো ক্লাস নেই। সে ক্লাব থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা নেয়। পাশ দিয়ে সাঁই করে একদম রায়হানের মোটরসাইকেলের মতো একটা নীল রঙের মোটরসাইকেল চলে যায়। রায়হানের কথা ভাবতে না চাইলেও কেমন করে যেন ওর কথাই মনে পড়ে যায় প্রিয়তার। অদ্ভুত একটা মানুষ। ভবঘুরে, খেয়ালি, গন্তব্যহীন, যেন মোটরসাইকেল আরোহী নয়, পোড় খাওয়া কোনো ঘোড়সাওয়ার।

জীবনে একটা বড় ভুল হয়েছিল রায়হানের সঙ্গে নিজেকে জড়ানো। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত আবেগের একটা বিশাল ঢেউ তখন প্রিয়তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, রায়হানই রাইট পারসন, যার জন্য সে সাতাশ বছর অপেক্ষা করেছিল। অথচ সাতাশ তো পরিণত বয়স, এই বয়সে কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে? নাকি নেওয়ার সুযোগ থাকে? নিজেকে খুব বিবেচক মনে করত সে, মনে করত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা আছে তার। অথচ রায়হানের মোহ ভাঙতে এক বছরও লাগল না। কেন এই বিরাগ তৈরি হলো, রায়হানের দোষটা কোথায়, তা নিয়ে খুব জোরালো দৃশ্যমান কারণও দেখাতে পারবে না প্রিয়তা। কিন্তু অদৃশ্যে বুঝতে পারছিল কোথায় যেন তাল কেটে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, দুজন মানুষের পছন্দ-অপছন্দ আলাদা, দুজনের চিন্তাভাবনায় কোনো মিল নেই, সর্বোপরি রায়হান যেন এমনই বিবাগী একটা মন নিয়ে জন্মেছে, যে শুধু মেঘের মতো ভেসে যায়, কোথায়ও থামে না, সংসারের চার দেয়ালে তাকে বাঁধা যায় না। হয়তো রায়হানের কাছে তার প্রত্যাশা আরেকটু বেশি ছিল। এই যে প্রায় তিন-চার মাস হতে চলল সে বাবার বাড়িতে আছে, রায়হান একবারও তো খোঁজ নিল না, প্রথম দিকে দুই-তিনবার বলেছে, ফিরে এসো। তারপর তো ফোনও করল না। কী ধরে নেবে প্রিয়তা? তার ওপর মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে মিতালি নামের ওই ন্যাকা মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেছে। হয়তো ওই মেয়ের সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু তবু... কেন? কেন অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে তার? কত যত্ন করে ঘর সাজিয়েছিল সে, কিন্তু সেই ঘরে রায়হান যেন খাপ খাচ্ছিল না। কেমন আলগা আলগা একটা ভাব তার। স্থায়ী কোনো চাকরি নেই, চাকরির চেষ্টাও নেই, এমন ভবঘুরে মুখচোরা উদাসীন একটা মানুষ। ডিসিপ্লিনহীন, উড়াধুরা তার চালচলন। সারা রাত জেগে দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো! উফ! প্রিয়তার এরকম জীবন একদম পছন্দ নয়। রায়হানও বদলাবার নয়। প্রিয়তা খবর নিয়ে দেখেছে, ওদের বাসাটা এখনো ছাড়েনি রায়হান। প্রিয়তা অবশ্য ছয় মাসের অ্যাডভান্স দিয়ে রেখেছিল। সে জন্যই হয়তো বাড়িওয়ালা কিছু বলছে না। কিন্তু যখন সেটা শেষ হয়ে যাবে, তখন? নিশ্চয়ই বাসাটা ছেড়ে হাওয়া হয়ে যাবে সে। কিন্তু না, সেটা হতে দেওয়া যাবে না। প্রিয়তা ঠিক করল আরো কয়েক মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে রাখবে সে, যাতে রায়হান বাসাটা ছেড়ে যেতে না পারে।

প্রিয়তার কাছে বাড়তি চাবিও আছে, একদিন গিয়ে পুরনো সংসারটা দেখে আসবে কি না ভাবে সে।

রিকশাটা তখনই মগবাজারে ওদের বাসার সামনে এসে থামে। প্রিয়তার ভাবনার সুতা ছিঁড়ে যায়। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিতে গিয়ে লোক দুটোকে দেখে সে। রাস্তার অপর পাশে একটা মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ওর দিকে, অর্থাৎ প্রিয়তার দিকেই। লোক দুটির চেহারা খুবই সাধারণ, সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফ আছে। কোনো কুমতলব আছে কি না কে জানে? পরক্ষণেই চিন্তাটা বাতিল করে দেয় সে। নিজেকে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির কবিতার লাইন শোনায় সে,

‘ওহ আত্মা, তুমি খুব বেশি দুশ্চিন্তা করছ, তুমি দেখেছ তোমার নিজস্ব শক্তি, দেখেছ নিজের সৌন্দর্য, দেখেছ নিজের সোনালি ডানা, কেন তবে দুশ্চিন্তায় মরছ? কেন?’

 

১৮.

১৩ নভেম্বর, ২০১৫, রাত সাড়ে আটটা। উইকএন্ডের উৎসবে উচ্ছ্বসিত আলোর শহর প্যারিস। এখানে মানুষ যেমন সারা সপ্তাহ খাটতে পারে, তেমনি সপ্তাহান্তে উচ্ছল আনন্দেও মেতে ওঠে। শহরের বাস্তিলে তরুণ শিল্পীদের একটা প্রদর্শনী দেখে কিছুক্ষণ আগে বাড়ি ফিরে এসেছেন প্যারিসবাসী বাঙালি শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তাঁর বড় মেয়ে চিত্র সিঁথি তখনো বাড়ি ফেরেনি। তবে শাহাবুদ্দিন জানেন, প্রতি উইকএন্ডেই চিত্র বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তিলের দিকে যায়। পানাহার করে, আড্ডা দেয়। ওই রাস্তার পাশের বার, রেস্তোরাঁ আর ক্যাফেগুলোতে তরুণদেরই জয়জয়কার, তারাই ঝাঁক বেঁধে ভিড় করে থাকে ওসব জায়গায়, অনেকটা বাংলাদেশের শাহবাগের মতো। বিদেশি এবং ফরাসি যে মধ্যবিত্ত প্রগতিশীল সমাজটা আছে তারা ওই জায়গাটাতে যায়। চিত্র বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই ওখানে যায়, আজও গেছে, তার ফিরতে রাত হবে, হয়তো ডিনার করেই ফিরবে, জানেন শাহাবুদ্দিন। প্যারিস নিরাপদ শহর। তাই ভুল করেও মনের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা কাজ করেনি তাঁর। চিত্রর মা আনা তখন ডিনার রেডি করছিলেন।

বাস্তিলের রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলে শহরের অ্যারোদিসিমেন্ট এলাকায় বাতাক্ল থিয়েটার। পুরনো ধাঁচের ঐতিহ্যবাহী কনসার্ট হল। বাতাক্লর স্টেজে তখন পারফর্ম করছিল আমেরিকান রক ব্যান্ড ‘ঈগলস অব ডেথ মেটাল’। প্রায় দেড় হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ ওই হলে আরো অনেকের সঙ্গে মাইকেল ও’কনর, ফ্রাংকলিন ক্যাজোনেভেস ও জুলিয়েন পেরেজও সেদিন কনসার্ট শুনছিলেন।     

বাতাক্ল থেকে আরেকটু দূরে স্টেড দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়ামে তখন জার্মানির বিপক্ষে ফ্রান্সের উত্তেজনাপূর্ণ ফুটবল খেলা চলছিল। দর্শক গ্যালারিতে আরো অনেকের সঙ্গে খেলা দেখতে গিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাংক ভালটার।   

নভেম্বরের শীতল আর্দ্র আবহাওয়ায়ও প্যারিস এক উষ্ণ আন্তরিক আলিঙ্গনে বেঁধে রেখেছিল এর নাগরিকদের। কেউ হয়তো তখনো চিন্তাও করতে পারেনি, খানিক পরে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? তারা আন্দাজও করতে পারেনি স্মরণকালের ভয়ংকর সন্ত্রাসী হমলায় বিপর্যস্ত হতে যাচ্ছে প্যারিস।

বাতাক্লঁর স্টেজে ‘ঈগলস অব ডেথ মেটাল’ তখন সবে হেভি মেটালের সঙ্গে তাদের জনপ্রিয় গান ‘কিস দ্য ডেভিল’ গাইতে শুরু করেছে। পুরো হল গমগম করছে সুর, শব্দ ও বাদ্যের ব্যঞ্জনায়।

Who’ll love the devil?

who’ll sing... his song?

Who’ll love the devil and his song?

I’ll love the devil

I’ll sing his song! ...

Who’ll love the devil?

Who’ll kiss his tongue? ...

Who’ll kiss the devil on his tongue?

I’ll love the devil!

I’ll kiss his tongue!

I’ll kiss the devil on his tongue ... 

 

গানটা তখন মাঝপথে, বান্ধবী বারবারাকে সঙ্গে নিয়ে গানের তালে নাচছিলেন মাইকেল। নাচতে নাচতেই হঠাৎ শুনতে পেলেন খুব কাছ থেকে আচমকা কেউ সশব্দে বন্দুক লোড করল। মাইকেলের প্রথম মনে হলো বোধ হয় মঞ্চ থেকেই শব্দটা আসছে। হঠাৎ পেছন ফিরে দুজনকে দেখতে পেয়ে ভুল ভাঙল মাইকেলের। দুই বন্দুকধারীকে দেখে চমকে উঠল সে। তারা হয়তো পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল, মাইকেল জানে না। মুহূর্তের অপেক্ষা। তাদের হাতে গর্জে উঠল কালাশনিকভ। মাইকেলের মনে হলো যেন নরক নেমে এসেছে থিয়েটার হলে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের পলকে শুরু হয়ে গেল বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। আতঙ্কের ঠাণ্ডা একটা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে নামল তার। দৌড়ে বারবারাকে নিয়ে ফায়ার এক্সিটের দিকে ছুটল মাইকেল। আবার গোলাগুলি শুরু হলে দুজনেই মরার ভান করে শুয়ে পড়ল মাটিতে। ততক্ষণে বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিল মাইকেল। মনে হলো, মরার আগে শেষবারের মতো মেয়েটাকে বলা উচিত তার প্রতি নিজের গভীর আবেগের কথা। বারবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে এই গোলাগুলির মধ্যেই ফিসফিস করে মাইকেল বলল, ‘ভালোবাসি। ’

হলের ভেতর আটকা পড়া বেঞ্জামিন পকেট থেকে খুব সাবধানে মোবাইল ফোন বের করে টুইট করল, ‘জীবন্ত জবাই করা হচ্ছে... ভয়াবহ পরিস্থিতি, চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েছে। ’

প্যারিসের আরো অনেক বাসিন্দার মতোই নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ তখনো টের পাননি কী নারকীয় কাণ্ড শুরু হয়েছে প্যারিসের মতো শান্ত শৈল্পিক শহরে। ডিনারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি আর তাঁর স্ত্রী। এমন সময় ফোন বেজে উঠল। ফোনে চিত্রর ত্রস্ত কণ্ঠস্বর।

‘কী হয়েছে? কোয়ে সিস্ট-ইল পাসে?’

‘ওঁ দোওঁজি, খুব বিপদ বাবা, গোলাগুলি চলছে। মনে হচ্ছে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ’

বাস্তিল এলাকার একটি ক্যাফের বেজমেন্টে সে লুকিয়ে আছে আরো অনেকের সঙ্গে। সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয় আর আতঙ্কে জমে পাথর হয়ে গেলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। এত বছর প্যারিস আছেন কিন্তু এমন ভয় কখনো পাননি তিনি। তাঁর বিশ্বাসও হচ্ছিল না, এমন কিছু ঘটতে পারে।

‘আনা, টিভিটা চালাও তো’ স্ত্রীকে চিত্কার করে বললেন তিনি। নিউজ চ্যানেলে যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে হতবাক হয়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী। রীতিমতো যুদ্ধ চলছে।

‘যেখান থেকে একটু আগেই ঘুরে এলাম সেখানে এ কী অবস্থা!’ স্বগতোক্তি করলেন তিনি। সেনাবাহিনী ছোটাছুটি করছে। গোলাগুলি চলছে। জানতে পারলেন, ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে প্যারিস। স্বাভাবিকভাবেই টেনশনে পড়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী। শুধু মনে হতে থাকল ‘মেয়েটাকে কখন দেখতে পাব? আদৌ দেখতে পাব তো?’ আনা কেঁদে ফেললেন। খুব অসহায় লাগছিল শাহাবুদ্দিন আহমেদের। এরই মধ্যে আবার চিত্রর ফোন। ক্যাফেতে ওরা বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারেনি। আলো নিভিয়ে সবাই বেজমেন্টে চলে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু যুদ্ধ এমন ভয়ংকর আকার নিচ্ছিল যে ওরা ভয় পেয়ে যায়। যে রাস্তায় ওই ক্যাফেটা সেই রাস্তাতেই বাতাক্লঁ কনসার্ট হল। ফলে বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, আর্তনাদ, মৃত্যু সবই চলছিল চিত্রদের ঘিরেই। ওদের মনে হচ্ছিল ক্যাফেটাতেও বোমা হামলা হতে পারে। তাই পেছনের দরজা দিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোক্রমে পেছন দিকের একটা গার্ডেনে পৌঁছায় চিত্ররা। রাস্তার পাশে সার সার বাড়ি। কিন্তু সব অন্ধকার। শুধু স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে। হামলার ভয়ে বাড়িঘর, দোকানপাট, ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ। কারো বাড়ির ভেতর লুকিয়ে যে প্রাণ বাঁচাবে তারও উপায় নেই।

কিছুক্ষণ পরেই চিত্রর ফোন এলো। ফোন ধরলেন। প্রায় দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। চিত্র জানাল, ‘এক মহিলা নিজের বাড়িতে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সেখানেই তাদের লুকিয়ে থাকতে হবে আরো কিছুক্ষণ। হতে পারে অনেকক্ষণ। পুলিশ কাউকে বাইরে বেরোতে নিষেধ করেছে।

মেয়েকে সতর্ক করলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বললেন, ‘যেখানে আছো, সেখানেই চুপ করে বসে থাকো। একদম বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করবে না। ’

চিত্র বন্ধুদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রবল আতঙ্কে পালানোর সময় কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে কেউ জানত না।

এদিকে বাতাক্লঁ কনসার্ট হলের কফিবারের পেছনে স্টোর রুমে বসে ভয়ে কাঁপছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের ছেলে তারেক আহমেদ। মানুষের আর্তচিত্কার, এলোপাতাড়ি গুলির আওয়াজের মধ্যে সমানে আল্লাহকে ডাকছিল তারেক। শেফ ক্রিস্তেফো, ওয়েটার মাকু আর ইবন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। মনে হচ্ছিল যমদূত বুঝি মৃত্যু পরোয়ানা হাতে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু কফিবারের মালিক মাঝবয়সী বেখতন তাদের ছোট ছোট বাক্যে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিল, ‘সোয়া প্যাসো সিলতে প্লে, না পাপ্্ পার। ’

‘ধৈর্য ধরো, ভয় পেয়ো না। ’

তারেক প্রায় সাত বছর ধরে এখানে কাজ করছে। প্রতিদিন বিকেলের শিফটে কাজ, বিকেল ৫টা থেকে শুরু, শেষ রাত ১২টা/১টার দিকে। কখনোই এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এখানে। শুক্রবার রাত ৯টা ৪৯ মিনিটে হঠাৎ বোমা আর গুলির শব্দ। উঁকি মেরেই দেখতে পান একটু দূরেই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া নাতালির মৃতদেহ। বেখতন চিত্কার করে ওঠে ‘অন্ত্র দান লো ম্যাগে জা...’

বেখতনের নির্দেশেই দৌড়ে স্টোর রুমে ঢুকে পড়ে সবাই। বেখতন নিজেও ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর সবাইকে শান্ত থাকতে বলে মোবাইল ফোনে পুলিশকে ফোন দেয়। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক উত্কণ্ঠা-উদ্বেগে কাটিয়ে স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। বেঁচে আছে এটা বুঝতেই এখন কষ্ট হচ্ছে তারেকের। কিভাবে যে বেঁচে আছে কিংবা কিভাবে যে বাঁচল সে, নিজেই মনে করতে পারছে না।

রাত ১২টা নাগাদ টেলিভিশন ঘোষণায় পুলিশ জানাল, জঙ্গিরা শেষ। প্রশাসন ও রেড ক্রসের মানুষজন ছাড়া প্যারিসের রাস্তায় কেউ নেই। যারা বিভিন্ন জায়গায় আটকা পড়েছিল, তারা ধীরে ধীরে নিজের বাড়িতে ফিরে গেল, কাউকে কাউকে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দিল। ভোর চারটায় শাহাবুদ্দিন আহমেদের এক বন্ধুর গাড়িতে চিত্রকে অক্ষত অবস্থায় নামতে দেখে বুক থেকে যেন পাথর নামল শাহাবুদ্দিন-আনা দম্পতির।

কিন্তু প্যারিস ততক্ষণে পরিণত হয়েছে এত ভুতুড়ে শহরে। সারা পৃথিবীতে ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে এই বর্বরোচিত হামলার খবর। আতঙ্কের ঘোর যেন কাটছে না প্যারিসবাসীর। এদিকে নিহতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত এই হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩২।

এই হামলায় কেবল ফরাসি নাগরিকরাই প্রাণ হারায়নি, আলজেরিয়া, ইতালি, চিলি, জার্মানি, তিউনিসিয়া, পেরু, বেলজিয়াম, মরক্কো, রোমানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন ও স্পেনের নাগরিকরাও প্রাণ হারিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ এ হামলার জন্য ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসকে দায়ী করেছেন। এক বার্তায় আইএসও এই হামলার দায় স্বীকার করে নেয়।

 

১৯.

সকালবেলা মর্নিং ওয়াক সেরে এসে দিনের পত্রিকা আর এক গ্লাস বেলের শরবত নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসেন নুরুল কবির। এই সময় যত গরমই পড়ুক তার মাথার ওপর ফ্যান বন্ধ থাকে। কারণ বাতাসে উড়ে যাওয়া পাতা ধরে রাখার কসরত করতে গেলে তাঁর মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে। আজকেও ফ্যান বন্ধ করে পত্রিকা পড়ছেন তিনি। প্রথম পাতায় হেডলাইন ‘সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত প্যারিস’। কাল রাতে টেলিভিশনের খবরে খানিকটা দেখেছেন তিনি, এখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটুকু পড়লেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। শিল্পীদের লালন করে যে শহর, এক রাতের ব্যবধানে সেই শহর রূপান্তরিত হয়েছে কান্না ও শোকের শহরে, কিভাবে সম্ভব হয় সেটা? বেলের শরবতের গ্লাসে কয়েকবার চুমুক দিলেন তিনি। কিন্তু কোনো স্বাদ পেলেন না। তাঁর মাথার ভেতর তখন ১৩২ জনের মৃত্যু আর প্যারিসের করুণ দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী চলমান এই সহিংসতার কি কোনো শেষ নেই?

বেলের শরবত শেষ করে কাগজ-কলম নিয়ে বসেন নুরুল কবির।

এ ঘটনায় কী আর করার আছে তাঁর? কিন্তু পত্রিকায় একটা পত্র লিখে প্রতিবাদ তো করতেই পারেন তিনি। নুরুল কবির লিখতে শুরু করেন,

‘চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ফরাসি রম্য ম্যাগাজিন শারলি এবদোর কার্যালয়ে হামলার পর আবারও ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে উঠেছে প্যারিস। প্রথমবার প্রাণ হারায় ১১ জন। আর এবার মারা গেল শতাধিক নিরীহ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স আর কখনো এরকম হামলার শিকার হয়নি। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটরাজনীতির অংশ হিসেবে তারা আইএসকে তৈরি করেছে। আগামী মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর মনোনয়নপ্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স তো বলেছেনই, ‘ইরাকে আগ্রাসী যুদ্ধের ফলেই আল-কায়েদা ও আইএসের উত্থান হয়েছে। এর দায়দায়িত্ব আমরা চাইলেও এড়াতে পারব না। ’ অনেকে বলছেন, নিজের তৈরি ফ্রাংকেনস্টাইনের হাতেই পশ্চিমা বিশ্ব আক্রান্ত হচ্ছে। প্যারিস হামলা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য হতে পারে একটা ওয়েক আপ কল। এ ঘটনা থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারে যে জঙ্গিবাদকে দমন না করে যদি তা নিয়ে রাজনীতি করা হয় তবে এর ফল কারো জন্যই ভালো হবে না। জঙ্গিরা দেশে দেশে শুধু মানুষ হত্যাই করছে না, মানুষের মনে ভয়, সংশয়, সন্দেহ, আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। জঙ্গিরা ভয়ের পৃথিবী কায়েম করতে চায়। মানুষ যদি ভয় পেয়ে পিছু হটে তবেই তাদের স্বার্থসিদ্ধি হয়। আমাদের ভয় পেলে চলবে না, তাদের হুমকির কাছে মাথা নোয়ালে চলবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়াতে হবে। বিশ্বজুড়ে মানবতার বিরুদ্ধে চলা সব বর্বরতার অবসান চাই। চাই শান্তি ও সৌহার্দ্যের পৃথিবী। এ জন্য সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়তে হবে। অজ্ঞতা, অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি ও অন্ধতামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ’

নুরুল কবির লেখা শেষ করে কয়েকবার লেখাটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েন। ছোট হয়ে গেছে লেখাটা, আরেকটু বড় করতে পারলে ভালো হতো। আর কী লেখা যায়, বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা কী এখানে ঢোকানো যায়? আজকাল আবার বেশির ভাগ কাগজেই চিঠিপত্র কলাম থাকে না। সবাই নাকি ফেসবুকে মতামত জানায়, প্রতিবাদ করে। মাঝে মাঝে নুরুল কবিরের ইচ্ছা হয় ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে, তাদের সঙ্গে হাঁটতে আসেন প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়সের শামসুদ্দিন সাহেব, তাঁর নাকি ফেসবুকে দুই-তিনটা অ্যাকাউন্ট আছে। শামসুদ্দিন সাহেব প্রায়ই বলেন, ‘ফেসবুক খুব মজার জগৎ ব্রাদার! এক্কেবারে রঙের হাট-বাজার। ঢুইক্যা পড়েন, বাইরে থাকলে মিস করবেন। ’

নুরুল কবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেন? কী মিস করব?’

‘আরে ব্রাদার, মানুষরে চেনার মোক্ষম সুযোগটা মিস করবেন! ফেসবুকে আসেন, বুঝতে পারবেন। কত্ত আজব দুনিয়া। মানুষের ভেতরের সমস্ত ভালো-মন্দ, ঈর্ষা-হিংসা, নোংরা-আবর্জনা ফেসবুকে প্রবাহিত হয়। ’ শামসুদ্দিন সাহেব মাথা দুলিয়ে হাসেন।

নুরুল কবিরের মাঝে মাঝে কৌতূহল হয়, ভাবেন একটা অ্যাকাউন্ট খুলবেন। কিন্তু আবার বাধো বাধো লাগে, মনে হয় এটা ছেলে ছোকড়াদের কারবার, সেখানে তাঁর মতো বুড়ো মানুষকে কি মানাবে?

‘কেন মানাবে না? আপনি যেসব কথা পত্রিকায় পত্র লিখে জানান দেন, সেসব কথা এখন থেকে ফেসবুকে জানান দেবেন, দেখবেন, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া, নগদ নগদ...’

শামসুদ্দিন সাহেব বলেন। তারপর নিজের স্মার্টফোন খুলে ফেসবুকে তাঁর হোম পেজটা দেখান। সুন্দর সুন্দর ছবি আর কথাবার্তায় ভরা। কেউ প্রকৃতির ছবি দিয়েছে, কেউ দিয়েছে নিজের ছবি, কার বাচ্চার জন্মদিন, কার বাচ্চার অসুখ-বিসুখ, কে কোথায় বেড়াতে গেল সবই আছে এখানে। কেউ কেউ মনের সুখ-দুঃখের কথা লিখেছে, কেউ অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছে, সমাজের অসংগতির কথা লিখেছে কেউ। ভালোই তো, মানুষ তাহলে নিজেকে উজাড় করে প্রকাশ করার একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে।

‘ভাই শোনেন, বৃদ্ধ হওয়াটা কোনো সমস্যা না, একে উদ্যাপন করেন। ’ শামসুদ্দিন বলেন। নুরুল কবিরের কথাটা পছন্দ হয়। গার্সিয়া মার্কেজের আত্মজীবনীতেও আছে, ‘বিগত জীবনের জন্য বিলাপ নয়, স্মৃতিচারণা করলেও হবে না, বার্ধক্যের জয়গান গাইতে হবে। ’

নুরুল কবির বিষয়টা নিয়ে হাবিবার সঙ্গেও আলাপ করতে গিয়েছিলেন। হাবিবা তাঁর শিক্ষিকাসুলভ সতর্ক মতামত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ফেসবুকে ভালো-মন্দ দুটোই আছে, কে কিভাবে ব্যবহার করছে সেটাই দেখার বিষয়। ফেসবুকের নেশায় এখনকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। অযথাই সময় নষ্ট করছে।

‘আমি একটা অ্যাকাউন্ট খুলব নাকি?’ নুরুল কবির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন।

‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি? শুনছি বুড়োগুলা নাকি ফেসবুকে যুবতী মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কইরা খুব মজা পায়। তোমারও সেই শখ হইছে নাকি?’

‘কী যে বলো না...’ নুরুল কবির চুপ মেরে যান।

হাবিবা তাঁকে নিরুৎসাহিত করলেও প্রিয়তা অবশ্য খুব উৎসাহই দিল বাবাকে।

‘করো না বাবা, এটা তো সোশ্যাল মিডিয়ারই যুগ, দেখবা তোমার অনেক পুরনো বন্ধু-বান্ধবকে খুঁজে পাবা। তা ছাড়া এ যুগের ইয়াং ছেলেমেয়েরা কী ভাবে-টাবে তাও জানতে পারবা। অনেক একটিভিজম এখন ফেসবুকেই হয়, তুমি তোমার মতামতও দিতে পারবা। ’

‘নারে মা, চলতি হাওয়ায় গা ভাসানোর ইচ্ছা নাই বরং প্রাচীনপন্থী আছি, তাই থাকি। ’

‘দূর বাবা, তোমারে প্রাচীনপন্থী কে বলছে? শোনো, যত অ্যাকটিভ থাকবা, তত ভালো লাগবে। আচ্ছা দাঁড়াও আমিই তোমাকে একটা স্মার্টফোন গিফট করব। তাইলে ফোনেই ইচ্ছামতো ফেসবুকিং করতে পারবা। ’

                    

২০.

‘মা, মহরমের চাঁদ কবে উঠবো মা?’

সাজ্জাদ হোসেন প্রায় প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করে রাশিদাকে। রাশিয়া আঙুলে গুনে উত্তর দেয়,

‘অহন চলতাছে সাওয়াল মাস, এরপর আছে জিলকদ, জিলহজ, আর শেষে যহন নতুন বছর শুরু হইবো তহন আইবো মহররম মাস। ’

সাজ্জাদ জানে মহররমের চাঁদ দেখা গেলেই শুরু হয়ে যাবে আশুরার উৎসব। মহররমের ১০ তারিখে সবচেয়ে বড় তাজিয়া মিছিল। কালো পাজামা-পাঞ্জাবি পরে লালসালু কোমরে পেঁচিয়ে হাতে লাল-সবুজ জরি লাগানো পতাকা নিয়ে তাজিয়া মিছিলে যাবে সে।

এইবার বড় ভাই-ভাবিদের সঙ্গে মিলে হোসনি দালানে যাবে বলে ঠিক করেছে সে।

সাজ্জাদ হোসনি দালান চেনে না কিন্তু বহুবার এই দালানের নাম শুনেছে সে। বড় ভাইরা আগেও ওইখানে গেছে। এইবার নাকি ভাবির মানত আছে, তাই এবারও যাবে।

‘মা, হোসনি দালান কেমন, জানো তুমি?’ সাজ্জাদ মার কাছেই জিজ্ঞেস করে।  

ছোট ছেলের প্রশ্ন শুনে রাশিদা কৃত্রিম ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘জানুম না কেন? আমার বাপ-দাদারা তো নারিন্দা-বংশালের আদি বাসিন্দা, ছুটুবেলায় আমি কত গেছি হোসনি দালানে...’

সাজ্জাদ মায়ের গলা জড়িয়ে হোসনি দালানের গল্প জানতে চাইলে রাশিদা তার নানা-দাদাদের কাছ থেকে শোনা হোসনি দালানের গল্প শোনায় ছেলেকে।

‘হেই চাইর শ বছর আগে, যখন কিনা সুলতান সুজার শাসনামল, তখন এক পরহেজগার দরবেশ মীর মুরাদ স্বপন দেখে, ইমাম হোসেন তাঁর কাছে আইসা কয়, আমার শাহাদতের স্মৃতি স্মরণীয় কইরা রাখতে একটা মার্সিয়া ঘর বানা। তো তিনি সক্কাল বেলা ঘুম থেইক্কা উইঠাই আমগো বকশীবাজার এলাকায় মার্সিয়া ঘর বানানির কাজ ধরেন। এইটাই হোসনি দালান। ইমামবাড়া। ওইখান থেইক্কা কত্ত বড় বড় মিছিল হইতো আগে, আর কি আছিল তার শানশওকত। আলম বরদার, আশা বরদার, কালা কাপড়ে ঢাকা দেওয়া বিবিকা ডোলা, সিল্কের নিশান, লাঠির ঠোকাঠুকি, তলোয়ারের ঝলসানি, আগুনের চড়কি। অখন তো তার কিছুই নাইক্কা!’

তবু যা আছে তাতেই খুশি সাজ্জাদ। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জঙ্গে কারবালার কত গল্প শুনেছে সে। শুনতে শুনতে সব মুখস্থ হয়ে গেছে তার। কী দুঃখের ঘটনা। কুফার পথে রওনা হয়ে পথ হারিয়ে আত্মীয়-পরিজনকে নিয়ে কারবালায় এসে পড়েন হোসেন। জনমানবশূন্য ময়দানে, একবিন্দু পানি নেই, কোনো গাছের ছায়া নেই, এদিকে ফোরাত নদী ঘিরে রেখেছে এজিদের জালিম সৈন্যবাহিনী, ‘গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতেমা, আম্মাগো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!’

এরপরই তো মর্দ্দে জঙ্গ শুরু হলো, শিশু আজগর শহীদ হলো, তাজা খুনে বুক ভেসে গেল, তবু তাদের পানির নসিব হলো না। ‘পানি পানি’ করে সবার বুক হলো জারে জার, কিন্তু কেউ এক ফোঁটা পানি পেল না। আহারে কী কষ্ট!

বুড়া বয়াতির মুখে কারবালার জারিও বহুবার শুনেছে সাজ্জাদ।

‘এই মতে কাসিম আলী বিচার না করিল, আশি হাজার সৈন্য কেটে খালাস করে দিল।

ঘোড়া চলে, ধুলা উড়ে-উড়ে পাহাড় নদী, চলো আমরা যুদ্ধে যাইমু পাখি হইতাম যদি-ই-’

দুলদুল ঘোড়াকে কতবার স্বপ্নে দেখেছে সাজ্জাদ, ফোরাত নদীর তীরে সেই ঘোড়া ঘাস খায়। মিছিলের সামনে দুলকি চালে চলে, হজরত ইমাম হোসেনের সেই প্রিয় ঘোড়া দুলদুল। মোজাফফর ভাই, আলী ভাই মিছিলের সময় মাথায় কালো কাপড় বেঁধে বুকে-পিঠে যেভাবে জিঞ্জিরের আঘাত করে, যেভাবে ‘হায় হোসেন’ ‘হায় হাসান’ মাতম তোলে, যেইভাবে রক্ত আর ঘামে ভরে যায় তাদের বুক ও পিঠ, সাজ্জাদ চায় একদিন সেও তেমন করবে। ছোট ছোট কাঠের টুকরা দড়ির প্রান্তে বেঁধে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মাতম করার প্র্যাকটিসও করেছে সে। তবে রাশিদা বারবার ছেলেকে সাবধান করেছে, ‘যাই করোছ বাপ, নিজেরে কইলাম জখম করিছ না। আমার সইজ্য হইবো না। ’

সাজ্জাদ মায়ের কথায় মুচকি মুচকি হাসে, কিছু বলে না। মহররমের এক তারিখ থেকেই রোজ চোখে সুরমা পরছে সে। কালো পাঞ্জাবি-পাজামা ইস্ত্রি করে রেখেছে।

৭ মহররম থেকে ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র পুরান ঢাকার হোসনি দালান ইমামবাড়ায় শুরু হয়ে গিয়েছিল আশুরার নানা আয়োজন। মহররমের ৮ তারিখ কারবালায় ইমাম হোসেনের পরিবারকে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা স্মরণ করে প্রতীকী দুলদুল ঘোড়ার পায়ে দুধ ও পানি ঢালা হয়। ৯ মহররম শুক্রবার সন্ধ্যায় শুরু হবে ‘মজলিসে আশুরা’। ইমাম হোসেনের শিশুপুত্র আলী আজগরের শহীদ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরা হবে সেই মজলিসে। মাতম করা হবে তাকে স্মরণ করে। মজলিস শেষে রাত দেড়টায় বের হবে গাহওয়ারা গাশত, ভোর রাতের মিছিল।

শুক্রবার দুপুরে ভাত খেয়েই সেজেগুজে রেডি হয়ে আছে সাজ্জাদ। ভাই-ভাবির সঙ্গে আজকে হোসনি দালানে যাবে সে। সন্ধ্যায় মজলিস শুনবে, রাতে বেরোবে গাশতের মিছিলে।

ভাই-ভাবি-খালা-ভাগ্নি-ভাতিজাসহ সাত-আটজনের দলটা রওনা হতে হতে বিকেল হলো। দুইটা সিএনজিতে করে ওরা যখন হোসনি দালানে পৌঁছাল তখন মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ। অনেক মানুষের ভিড় তখন সেখানে। ইমামবাড়া প্রাঙ্গণে এক কোনায় একটা জায়গা করে নিয়ে বসে গেল সাজ্জাদদের দলটা। কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করা হচ্ছিল, কারবালার যুদ্ধ যে হক ও বাতিলের যুদ্ধ ছিল, তা বলা হলো। অনেকক্ষণ ধরে বাংলা, আরবি, উর্দুতে মজলিসের বয়ান শুনে অধৈর্য হয়ে উঠেছিল সাজ্জাদ। সে একটু একটু করে মানুষের ফাঁকফোকর গলে জায়গা পরিবর্তন করে হোসনি দালানটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। সাদা দালানের দেয়ালে রঙিন কারুকাজ করে আরবি লেখা। দালানের পাশে একটা পুকুরও আছে। ঘুরতে ঘুরতে ইমামবাড়ার ভেতরের কবরস্থানের পশ্চিম দিকে চলে এলো সাজ্জাদ। এখানেই এশার পর দুলদুল ঘোড়াকে সাজাতে বের করল খাদেম নূর হোসেন। ঘোড়ার গলায় ফুলের মালা পরাল, গায়ে চাপাল লাল রক্ত রঙের জড়ির কাপড়, যেন ইমাম হোসেনের রক্তের দাগ লেগে আছে বাহাদুর দুলদুলের গায়ে। সাজ্জাদ দেখল অনেকে ঘোড়ার পা ছুয়ে সালাম করছে, অনেকে পা জড়িয়ে ধরে বসে আছে, কয়েকবার গিয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে এলো সাজ্জাদ, পানি খেলো, তারপর আবার ঘুরেফিরে চলে এলো ঘোড়ার কাছে। কয়েকবার ইমাম হোসেনের প্রিয় ঘোড়া দুলদুলকে ছুঁয়েও দেখল সে। কী যে সুন্দর লাগছে ঘোড়াটাকে! মাইকে এরই মধ্যে ঘোষণা শোনা গেল, কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিল শুরু হবে, তার আগে হবে মোনাজাত। সবার দেখাদেখি দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরল সাজ্জাদ। হঠাৎ আগুনের হলকার মতো কিছু একটা ছুটে এলো, সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ, অনেকে ভাবল বোধহয় বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার পুড়েছে, নয়তো বাজি ফাটাচ্ছে কেউ, কিন্তু এর পরপরই মুহুর্মুহু শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারপাশ। মানুষের মধ্যে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। কে কোথায় যাবে দিশা খুঁজে পেল না কেউ, অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ছোটাছুটিতে হুমড়ি খেয়ে মানুষের পায়ের তলায় পড়ল কেউ কেউ। কান্না-চিত্কার-আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠল কিছুক্ষণ আগের উৎসবমুখর এলাকাটা।

রায়হান যখন তার ক্যামেরা নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাল তখন এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা চেয়ার, স্যান্ডেল, তাজিয়া মিছিলের পতাকা, জরি, রঙিন কাগজ আর মানুষের ছোপ ছোপ রক্ত।

কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় খাটিয়ায় চড়ে শেষবারের মতো নিজের বাড়িতে এলো সাজ্জাদ হোসেন। সাজ্জাদকে একনজর দেখার জন্য চুনকুটিয়ার মানুষ ভিড় জমিয়েছে ওদের বাড়িতে। সাজ্জাদের চোখে গাঢ় সুরমা, ঠোঁটে মৃদু হাসি, পুরো মুখে চিকচিক করছে ছড়ানো ছিটানো জরির চিহ্ন।

রাশিদা ব্যাকুল হয়ে ছেলেকে ডাকছিলেন, ‘ও সাজ্জু, সাজ্জু, বাবা, ব্যথা পাইছ তুমি? বাবা, কই ব্যথা পাইছ? কিচ্ছু হইব না, ওষুধ দিয়া দিমু, সাজ্জু বাবা, তাজিয়া মিছিলে যাইবা না তুমি?... বাপ আমার...’

একসময় জটলার ভেতর থেকে আত্মীয়স্বজনের কাউকে বলতে শোনা গেল, জোহরের নামাজের পর জানাজা। দেরি হইয়া যাইতাছে। মুর্দারে তাড়াতাড়ি নেওন লাগব। ব্যস্ত হাতে কাফনের কাপড়ে মুখ ঢেকে দেওয়া হলো সাজ্জাদের। তারপর চারজন এসে খাটিয়া কাঁধে তুলে নিল। কান্নার রোল উঠল নারীদের মধ্যে। রাশিদা তখনো প্রলাপ বকছেন।

‘আমার সাজ্জু আবার আইবো না? ওরে কই নিয়া যায়, ওরা? আবার কোন সুম দিয়া যাইব? ও সাজ্জু বাবা, আমার, তাজিয়া মিছিলে যাইবা না বাবা...’

সেই সন্ধ্যাতেও পশ্চিমাকাশ প্রতিদিনের মতো হাসান-হোসেনের শহীদী রক্তে লাল হয়ে উঠল, কে জানে হয়তো সেই রক্তে সাজ্জাদ হোসেনের রক্তও একটু-আধটু মিশে ছিল।

 

২১.

হরিপুর বা চককানু গ্রামের কাউকে যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘শিয়া-সুন্নিতে তফাত কী?’

তবে অধিকাংশ লোকই এর কোনো উত্তর দিতে পারবে না। বয়স্ক কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি হয়তো বড়জোর বলবেন,

‘শিয়ারা হলো গে হাত ছাইড়ে দিয়ে নামাজ পড়ে আর সুন্নিরা নামাজ পড়ে হাত বাইন্ধে। শিয়ারা শবেবরাত মানে না সুন্নিরা মানে—এই আর কি...’

যদি প্রাইমারি বা হাইস্কুলের কোনো মাস্টারকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তিনি হয়তো ভেবেচিন্তে বলবেন, ‘শিয়ারা হলো গে ওই হজরত আলী আর হাসান-হোসেনের অনুসারী, ওরা ওই যারা আশুরার দিনে তাজিয়া মিছিল টিছিল করে...’ ইত্যাদি।  

এমনকি চককানু গ্রামে ছয়-সাত বছর আগে তৈরি হওয়া ‘মসজিদুল আল মোস্তফা’ যে শিয়া মসজিদ সেটা গ্রামবাসীর অনেকে তো জানতই না, ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মান্নানেরও জানা ছিল না।

শিয়া মসজিদের পাশের বাড়িটাই রেহানা বেগমের। নভেম্বর মাসের হালকা ঠাণ্ডার সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মালয়েশিয়াপ্রবাসী ছেলের কথা ভাবছিলেন তিনি। ছাওয়ালটা ভিন দেশে গিয়া কেমন আছে, কি বা খালু, কি বা করলু...’

ভাবছিলেন তিনি। কিন্তু সহসাই পর পর দুম দুম করে কয়েকটা শব্দ হতেই ভাবনার ঘোর কেটে গেল তাঁর। রেহানা বেগম হঠাৎ কী করবেন বুঝতে না পেরে প্রথমে দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। আর তখনই মসজিদ থেকে চিত্কার আর কান্নার আওয়াজ আসতে থাকল।

‘মইরা গেনু বারে, মইরা গেনু’

রেহানা বেগম ঘরের শিকল তুলে দ্রুত মসজিদের দিকে দৌড়ে গিয়ে দেখতে পেলেন রক্তারক্তি কাণ্ড। ততক্ষণে রেহানা বেগমের মতো গ্রামবাসী অনেকেই ছুটে এসেছে মসজিদে, হতভম্ব ভাব কাটিয়ে তারা উদ্ধার কাজেও নেমে পড়েছে। রক্তের মধ্যে পড়ে কাতরাতে থাকা মুসল্লিদের ধরাধরি করে তুলে আনছে এলাকার যুবকরা।

‘হামার ক্যাংকা জানি মনে হচ্ছে, ইনার অবস্থা সুবিধের নারে। ’

গুলি খেয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা বয়স্ক মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেনের হাত ধরে বলে ওঠে এক যুবক। গ্রামবাসীই তখন গুলিবিদ্ধ চারজনকে ধরাধরি করে বাইরে এনে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা গেলেন মুয়াজ্জিন সাহেব। ইমাম সাহেব গুলি খেয়েছিলেন কোমরের পেছনের দিকে। গুলি ঢুকে গিয়েছিল হাড়ের মধ্যে। শহীদ জিয়া হাসপাতাল থেকে তাঁকে রেফার করে পাঠানো হলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে।

সেখানে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হলে ঘটনার বিবরণ দেন ইমাম শাহিনুর রহমান।

‘ওই দিন ২৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার শিয়াদের নিয়মমতো মাগরিব আর এশার নামাজ একসঙ্গেই আদায় করতে আমরা মসজিদে ঢুকি। মাগরিবের ওয়াক্তে শেষবারের মতো নামাজের আকামত দেন মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন। আমরা সবাই কাতার সোজা কইরে নামাজে দাঁড়াই। এমন সময় টুপি মাথায় দেওয়া পাঞ্জাবি-পাজামা পরা তিন যুবক মসজিদে ঢোকে। অজু সেরে তারা শেষের কাতারে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। ’

ইমাম সাহেব একবার তাদের দিকে তাকিয়ে নামাজের নিয়ত করেন। তারপর সুরা পড়ে প্রথমে রুকুতে যান। রুকু থেকে উঠে সিজদায় যান। সোবহানা রাব্বিয়াল আলা, সোবহানা রাব্বিয়াল আলা দুইবার মাত্র পড়েছেন এমন সময় সেজদায় থাকা অবস্থায়ই বিকট জোরে কিছু বিস্ফোরিত হওয়ার আওয়াজ, যেন গাড়ির চাকা ফেটে গেছে। দ্রুত সেজদা থেকে মাথা ওঠান ইমাম সাহেব। আশপাশে চিত্কার। ইমাম সাহেব বসা অবস্থা থেকে উঠতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। কোমরের পেছনের দিকে হাত দিয়ে দেখেন, রক্তে সব কিছু ভিজে গেছে। তারপর আর কিছু মনে পড়ে না তাঁর। জ্ঞান ফিরে দেখেন শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়।

‘আমি আমার বয়সে কোনো দিনও শুনিনি কোনো মসজিদে গুলি চলে, তাও আবার নামাজের সময়, হলো কী দেশটার? তবে ভাই, বলে রাখনু, যারাই এটা ঘটাক কাজটা ঠিক করেনি। আল্লাহর কাছে এর জন্যি জবাবদিহি করতে হবে!’

 

২২.

প্রিয়তার কিনে দেওয়া স্মার্টফোনটা সুন্দর। ঝকঝকে, চকচকে, হাতে নিতেও ভালো লাগে। নুরুল কবির অবশ্য ফোনটা হাতে পেয়ে একটু ভড়কে গিয়েছেন, এর আগে ফোনে শুধু কথা বলা বা মেসেজ চেক করা ছাড়া আর তেমন কিছু করা হয়নি। কিন্তু এই ফোনের নানা রকম ঘটনা রয়েছে। ছবি তোলা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। আরো কত কী?

প্রিয়তা বলেছে, ‘হাতে নিয়ে গুঁতাগুঁতি করতে থাকো, দেখবা অনেক কিছু শিখে যাচ্ছ। ’

নুরুল কবির শিশুর মতো আনন্দ ও কৌতূহল নিয়ে মোবাইল ফোন টিপতে শুরু করেছেন, যেন নতুন একটা খেলনা পেয়েছেন হাতে। হাবিবা কয়েকবার নিঃশব্দে মুখ ভেঙচি দিয়েছে শুধু। মুখে কোনো কথা বলেনি। ফেসবুক অ্যাকাউন্টও খুলে দিয়েছে প্রিয়তা। ফ্রেন্ড হিসেবে প্রথমেই শামসুদ্দিন আর প্রিয়তাকে অ্যাড করেছেন নুরুল কবির। তবে মোবাইল ফোনের বাটন টিপে বাংলা লেখাটা এখনো তেমন আয়ত্তে আসেনি তাঁর। কাগজ-কলমে লেখার দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছেড়ে বহু কষ্টে মোবাইলের কিবোর্ড চেপে ফেসবুকে প্রথম স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি,

‘ফেসবুকের ভুবনে এটি আমার প্রথম পদার্পণ। বন্ধুগণ, আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ’

আত্মীয়স্বজনের অনেকেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। এরা কেউ সম্পর্কে তার নাতি-নাতনি, কেউ ভাই-বোন, কেউ পুরনো সহকর্মী। কেউ কেউ আবার একেবারেই অপরিচিত, কেন তারা নুরুল কবিরের মতো বৃদ্ধ লোকের বন্ধুত্ব চায়, সেটাও একটা রহস্য বটে। ছদ্মনামের কয়েকটা রিকোয়েস্টও পেয়েছেন তিনি। যেমন অবুঝ মন, ডায়েরির শেষ পাতা, নীল কষ্ট, হুলো বিড়াল এ রকম। নুরুল কবির মানুষের তার সুন্দর সুন্দর পারিবারিক ছবি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবির নিচে লাইক দিতে থাকলেন। তাঁর কলেজজীবনের বন্ধু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেনকে খুঁজে পেলেন। মোজাম্মেল খুব ধার্মিক মানুষ। সে হাদিস-কোরআন উদ্ধৃত করে স্ট্যাটাস দেয়। জাহানারা বেগম নামের একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা সারাক্ষণ ফুলের ছবি দিতে থাকে। নুরুল কবিরের সময় দ্রুত কেটে যায়।

ফেসবুকে নুরুল কবির তাঁর দ্বিতীয় স্ট্যাটাসটি লিখলেন সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া হিসেবে। মোবাইলের বাটন টিপে লেখার কারণে মনে অনেক কথা থাকলেও ফেসবুকে তিন লাইনের বেশি স্ট্যাটাস দিতে পারলেন না। তিনি লিখলেন,

‘অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দেখলাম, বাংলাদেশে শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পর পর দুটি ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি বিরোধের কোনো নজির নেই। বরং শতাব্দীকাল ধরে তারা শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বাস করছে। তাহলে কারা শিয়া-সুন্নি বিরোধ উসকে দিতে চাইছে? এর পেছনে কি তবে কোনো ষড়যন্ত্র আছে? চিন্তাশীলদের কাছে এই প্রশ্ন রাখলাম। ’


মন্তব্য