kalerkantho


গ ল্প

বিদায়বেলার গান

আহমাদ মোস্তফা কামাল

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



বিদায়বেলার গান

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই—কবিতার এই পঙিক্তটি কবে, কতকাল আগে মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, মনে নেই রাজিবের। কিন্তু মনে আছে, কবিতাটি পড়তে গেলে এই অংশে এসে শরীর-মন শিউরে উঠত।

মনে হতো, মানুষের নিঃস্বতা আর অপ্রাপ্তিকে তীব্রভাবে প্রকাশ করার জন্য এতটা নিষ্ঠুর না হলেই কি চলত না? তখন জানা ছিল না তার নিজের জীবনেই এ রকম ঘটনা ঘটবে, বাবা অন্ধ হয়ে যাবেন আর তাঁকে মনে মনে অন্তহীনভাবে আউড়ে যেতে হবে, ‘বাবা এখন অন্ধ...বাবা এখন অন্ধ। ’ কিন্তু ‘আমাদের দেখা হয়নি কিছুই’ কথাটা বলা যাচ্ছে না। দেখা তো হয়েছেই, অনেক কিছু দেখা হয়েছে। এই যেমন বাবার অন্ধ হওয়ার ব্যাপারটা! কী করে হলেন তিনি? একজন মানুষ তো হঠাৎ করে অন্ধ হয় না! এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি অন্ধ হয়ে গেছি—ব্যাপারটা মোটেই এ রকম নয়। অন্ধ হওয়ার পথও দীর্ঘ, অন্তত বাবার ক্ষেত্রে দীর্ঘই ছিল। সে প্রায় ছোটবেলা থেকে বাবার চোখের সমস্যার কথা শুনে এসেছে। শিক্ষকতা করতেন তিনি, হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, সবার সম্মানের ও শ্রদ্ধার পাত্র, অজস্র ছাত্র-ছাত্রী দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। তাদের অনেকেই ডাক্তার, তাদের কাউকে জানালেও তো হতো! আর তাদের কেন বলতে হবে, বাবার বড় ছেলেই তো ডাক্তার, চক্ষু বিশেষজ্ঞ নন বটে, কিন্তু তাতে কি! তিনি চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই দেশসেরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসাটা পেতে পারতেন বাবা। এমনকি প্রয়োজন পড়লে বিদেশেও নিয়ে যাওয়া যেত, তার সব ছেলে-মেয়েই তো প্রবাসী, দুজন ছাড়া। বাবার চিকিৎসা ঠিকমতো হলো না, অন্ধ হয়ে গেলেন তিনি, এসব তো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হলো। রাজিবের কি কিছু করার ছিল? না, তেমন কিছু ছিল না। সে ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট, বড় হয়ে উঠতে উঠতেই বাবার অন্ধত্ব স্থায়ী হয়ে গেছে। অন্যরা? বড় ভাই খ্যাতিমান চিকিৎসক, শহরে থাকেন, সর্বদা মহাব্যস্ত। বাকিরা সবাই এক এক করে পাড়ি জমিয়েছে আমেরিকায়, স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল আমেরিকাপ্রবাসী পাত্রের সঙ্গে। সে-ই জানিয়েছিল, মাকে সে নিয়ে যেতে পারবে। মা যদি নিয়মিত বিরতিতে যাওয়া-আসা করেন, গিয়ে বেশ কিছুদিন করে সেখানে থাকেন, তাহলে গ্রিন কার্ড পেয়ে যাবেন। গ্রিন কার্ডই তো? নাকি পিআর, মানে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি? নাকি সিটিজেনশিপ মানে নাগরিকত্ব? রাজিব এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, কোনটা কী, বলতে গেলেই প্যাঁচ লেগে যায়। তো, মা যদি গ্রিন কার্ড বা পিআর বা সিটিজেনশিপ পেয়েই যান তাহলে তাঁর অন্য ছেলে-মেয়েও মায়ের আঁচল ধরে যেতে পারবে ওই দেশে। এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? এই সুবর্ণ সুযোগ? স্বর্গে যাওয়ার সুযোগ? ছাড়ে না। আর তাই মা নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে অনিয়মিত হয়ে গেলেন। হয়তো কিছু একটা পেয়েও গেলেন আমেরিকায়, গ্রিন কার্ড বা পিআর বা সিটিজেনশিপ, নইলে তার অন্য ভাইয়েরা গেল কিভাবে? ওই দেশে তো সহজে যাওয়া যায় না। ইহকালে বা পরকালে স্বর্গে যাওয়া কি এতই সহজ? সারা জীবন ভালো ভালো কাজ করেও যেমন পরকালে স্বর্গে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করে ঈশ্বরের মর্জির ওপর, কাকে ক্ষমা করবেন কাকে করবেন না, কাকে স্বর্গে পাঠাবেন কাকে নরকে, তার কিছুই ঠিক নেই; কোনো কিছু করেই নিশ্চিত হওয়া যায় না, কেবল তার দয়া আর করুণার ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়; তেমনই পৃথিবীর স্বর্গ আমেরিকায় যেতে হলে কোনো যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়। তাদের মনমর্জির ব্যাপার আছে। কার পাসপোর্টে যে ভিসার সিল পড়বে, কার পড়বে না, আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। মা নিশ্চয়ই সেই স্বর্গ-তোরণের চাবি পেয়েছেন, তাঁর ছেলে-মেয়েরা এক এক করে চলে গেল সেই সূত্রেই। গিয়ে আর কেউই ফেরেনি। ফিরবেই বা কেন? এ দেশে আছেটা কী? একটা পচা-গলা নষ্ট দেশ, একটা সম্ভাবনাহীন অন্ধকার দেশ, একটা ভোগান্তিময় দেশ। এ দেশে মানুষ থাকে? বাবা যে থাকেন! হ্যাঁ, থাকেন, তিনি থাকেন বলে এই দেশ স্বর্গ হয়ে গেল নাকি? তিনিই কি সর্বশেষ আদর্শ, এরপর কি কোনো কথা নেই, তাঁকেই মেনে চলতে হবে সবাইকে, কারো জীবন অন্য রকম হতে পারবে না? না, তা পারবে না কেন? নিশ্চয়ই পারবে, সবার জীবনই তো অন্য রকম হয়েছে। ভাইদের সঙ্গে এসব তর্ক করতে গিয়ে এভাবেই হার মেনেছে রাজিব। এখন আর তর্কটর্ক করে না। কিন্তু সে কেন পারে না অন্য সবার মতো করে ভাবতে? কেন বাবাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না? সে অবশ্য সার্বক্ষণিকভাবে বাবার কাছে থাকতেও পারে না। পড়াশোনা তো করতে হবে, জীবন তো থেমে থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হয়েছে বিপদ। তাদের গ্রামের বাড়িটা, যে বাড়িতে বাবা একা থাকেন, ঢাকা থেকে অনেক দূরে। দেশের এক প্রান্তবর্তী গ্রাম ওটা। দীর্ঘ সময় লেগে যায় যেতে। তবু সে সপ্তাহ দুয়েক পর পর ছুটে যায় বাড়িতে। যেকোনো ছুটি পেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি তো খুবই সহজলভ্য, সে বাড়িতে এসে দিনগুলো কাটিয়ে যায়। তার বন্ধুরা দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়, সে যায় না। মনে হয়, বাবা একা একা অপেক্ষা করছেন। একা অবশ্য নন, কেয়ারটেকার আছে, কাজের মানুষ আছে কয়েকজন, তবু আপনজন তো কেউ নেই! বুড়ো মানুষ, অন্ধ, অন্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, সেই অন্যরা কেউ তাঁর আপন নয়, আহা, না জানি কত কষ্ট হয় তাঁর! এসব মনে হলেই দম বন্ধ হয়ে আসে রাজিবের। অবশ্য যারা বাড়িতে থাকে, কেয়ারটেকার ও কাজের মানুষরা, তারা যথেষ্টই যত্ন করে বাবার। অন্তত তাঁর মুখে কোনো দিন কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি এদের বিরুদ্ধে। বাবা অবশ্য অভিযোগ করার মানুষও নন, কারো বিরুদ্ধেই তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। এই যে তাঁর স্ত্রী বছরের বেশির ভাগ সময় দেশের বাইরে থাকে, এই যে তাঁর ছেলে-মেয়েরা চলে গেল আর ফিরল না, আটটা ছেলে-মেয়ের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া কেউ তাঁর কাছে রইল না, এ নিয়েও তাঁর কাছ থেকে কখনো অনুযোগ-অভিযোগ শোনা যায়নি। মনঃকষ্ট আছে কি না তা-ও বোঝার উপায় নেই। চুপচাপ থাকেন তিনি, রাজিব বাড়ি গেলে খুব খুশি হন। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন, চোখ-মুখে হাত বুলিয়ে কী যেন খুঁজে দেখেন! রাজিবের অবাক লাগে। বাবা এমন রাশভারি মানুষ যে ছোটবেলায় তাঁর কাছে ভিড়তেই ভয় লাগত। তাদের যাবতীয় আহ্লাদ-আবদার ছিল মায়ের সঙ্গেই। অথচ সেই বাবা এখন কী কোমল, কী মায়াময়! হাত দিয়ে যখন তার চোখ-মুখ-ঠোঁট-চিবুক পরখ করেন, তখন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন শিউরে ওঠে। বাবার আদরস্পর্শ যে এত মধুর, সে হয়তো কোনো দিন জানতেই পারত না যদি অন্য ভাই-বোনের মতো দূরে চলে যেত। কিন্তু ইদানীং একটা দুশ্চিন্তা তাকে দখল করে রাখে। কত দিন সে থাকতে পারবে বাবার কাছে? বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হয়ে এলো বলে। এত দিন পর্যন্ত ছাত্রজীবনের সুবিধা সে ভোগ করেছে, ভাই-বোনই তার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে, হাতখরচ দিয়েছে। হয়তো তার জন্য এত কিছু করার পেছনে তাদের নিজেদের গ্লানি মোচনের কিছু ব্যাপারও থেকে থাকবে, বুড়ো বাপটাকে তো দেখে রাখছে একা এই ভাইটিই, সবার ছোট হিসেবে তার প্রতি সবার একটা বিশেষ স্নেহও আছে, সে বোঝে। কিন্তু এরপর? পড়াশোনা শেষ হলে কি ভাই-বোনদের কাছ থেকে টাকা নিতে ভালো লাগবে তার? আত্মসম্মানে লাগবে না? আবার চাকরিবাকরি করলে তো এত ঘন ঘন ছুটিও পাবে না, বাবার কাছে যখন-তখন ছুটে আসাও যাবে না। বড় ভাইয়ের মতো অবস্থা হবে তারও। তিনি বাড়িতে আসেন মাসখানেক পর পর এক দিন, প্রধানমন্ত্রীর মতো সংক্ষিপ্ত সফরে। বেফাঁস কথা বলেন না একটাও, সুচিন্তিত শব্দচয়নে অল্প কথায় বলে যান—কী করা উচিত, কিভাবে চলা উচিত ইত্যাদি। সকালে এসে বিকেলেই ফিরে যান তিনি, খুব ব্যস্ততা তাঁর—সময় নেই, সময় নেই। বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও ঠিক সহজ নয়, একটু দূরে বসে কথা বলেন, শারীরিক অবস্থা জানতে চান, পালস দেখেন, রক্তচাপ মাপেন ইত্যাদি। ওটুকুই। রাজিব কখনো দেখেনি, বাবা তাকে যেভাবে আদর করেন, সেভাবে বড় ভাইকেও আদর করেন কি না। সম্ভবত করেন না। সম্পর্কটাই অন্য রকম, একটু দূরের, একটু ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার কিংবা বিরক্তিরও হতে পারে। বাবার রাশভারি গাম্ভীর্য বড় ভাইয়ের কাছে কখনো টাল খায় না, যেমনটা ঘটে ছোট ছেলের কাছে। দুই সন্তানের কাছে তিনি দুই রকম।

তো, পড়াশোনা তো শেষের পথে, এরপর কী হবে—এসব ভেবে ভেবে কূল পায় না রাজিব। বাড়ি এসে বসে থাকবে? তাই কি কখনো হয়? জীবন কি থেমে থাকে কারো জন্য? তাকেও তো নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে! ভাই-বোনের কাঁধে চেপে আর কতকাল? কিন্তু দাঁড়াবেই বা কী করে? চাকরি পাওয়া কি এত সহজ? প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়ার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না, ওটা তার ধাতেই নেই। প্রাইভেট ফার্মে বা করপোরেট হাউসে চাকরি পাওয়াও তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হয়। অতটা কেতাদুরস্ত তো সে নয়! তাহলে? সব ভাই-বোনের মতো সে-ও চলে যাবে আমেরিকায়? ওখানে গেলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, সব স্বপ্ন হাতের মুঠোয় ধরা দেয়, অল্প চেষ্টাতেই নাকি বড় বড় প্রাপ্তি ঘটে? ওখানে বাড়ি-গাড়ি-নারী সবই নাকি মেলে সহজেই, হাওয়ায় নাকি উড়ে বেড়ায় ডলার আর ডলার, একটু কষ্ট করে হাত বাড়ালেই নাকি ধরা যায় সেসব ঐশ্বরিক কাগজ? এগুলোই তো শোনে সে! এত সহজ সব কিছু ওই দেশে? এও বিশ্বাসযোগ্য? হলে হোক, সে যাবে না। বাবাকে এ অবস্থায় ফেলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এ বিষয়ে সে আপসহীন, স্থির, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু কী করবে সে, ভেবেই পায় না।

অবশ্য ভাবাভাবির একটা চূড়ান্ত সময় এলো।

পরীক্ষা শেষে বাড়িতেই বসে ছিল সে। অখণ্ড অবসর, কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, কিছু করার তাড়া নেই, কেবল শুয়ে-বসে আলস্য করা। আহা, এমন আরামদায়ক সময় আর আসেনি জীবনে, হয়তো আসবেও না আর কখনো। শুয়ে-বসে বই পড়া, টিভি দেখা, ভোরে মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বিকেল আর সন্ধ্যাটা নদীর পারে বসে কাটিয়ে দেওয়া, আর মাঝেমধ্যে কবিতা লেখা। লেখা মানে চেষ্টা করা আর কি! কিছু হয় কি না, কে জানে! এই অফুরন্ত অবসর ভারি সুন্দর, আহা! বাকিটা সময় বাবার কাছে বসে কাটিয়ে দেয়। একদিন রাতের বেলা, বাবাকে ঘুম পাড়িয়ে সে নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। মধ্যরাতে কলিংবেল বাজল। বাবার হাতের কাছেই ওটা রাখা আছে, যেন কোনো প্রয়োজন হলেই ডাকতে পারেন। হ্যাঁ, বাবাই ডাকছেন। হয়তো বাথরুমে যাবেন, ভেবে রাজিব উঠল। গিয়ে দেখল, বাবা উঠে আধশোয়া হয়ে আছেন। বললেন, আমার কাছে এসে বসো।

সে গিয়ে বসল।

তিনি তার মাথায় হাত বোলালেন, চোখ-মুখ-চিবুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, তুমি খুব নরম মনের ছেলে, তবু তোমাকেই বলতে হচ্ছে, মনটা শক্ত করে শোনো।

বলুন, বাবা।

আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। অনেক দিন থাকলাম, অনেক কিছু দেখলাম। খোদাতায়ালা আমার চোখের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়ে অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছিলেন, সে জন্যই অনেক অদেখাকে দেখা হলো, অজানাকে জানা হলো।

কী দেখলেন, বাবা? কিছু বলবে না ভেবেও সে জিজ্ঞেস করে ফেলল।

সেটা তোমাকে বলা ঠিক হবে না। জীবনের শেষে এসে যা দেখা হয়, বোঝা হয়, জানা হয়, তা একজন যুবকের কাছে না বলাই ভালো। বললে তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হবে। তা ছাড়া সত্যের কোনো চূড়ান্ত রূপ নেই। সত্য হয়তো একটা নয়ও, হয়তো অনেক। আমি যা দেখলাম-বুঝলাম, যাকে সত্য বলে জেনে গেলাম, তুমি হয়তো তার চেয়ে ভিন্ন কোনো একটা সত্যের দেখা পাবে।   কিংবা এমনও হতে পারে, সত্য আসলে একটাই, কিন্তু কারো কাছেই এর সমগ্রটা ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে অংশত। সেই অংশটাকেই সমগ্র ভেবে বিভ্রান্ত হয় মানুষ। সবার কাছে আবার একই অংশ ধরা পড়ে না, একেকজনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। কেউ যদি তার নিজেরটাকেই সঠিক ভাবে, তাহলে ভুল হবে। আমারটা আমার কাছেই থাকুক, তোমারটা তুমিই খুঁজে পাবে। হয়তো আজকে পাবে না, কালকে পাবে না, কিন্তু একদিন না একদিন পাবেই। যা হোক, তোমাকে যে কথা বলার জন্য ডেকেছি, তা হলো আমার কবরটা কোথায় হবে, ভেবেছ কিছু?

এ রকম একটা বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে? কিন্তু না বললে বাবা তো ছাড়বেন না। সে বলল, না, আমি কিছু ভাবিনি।

তোমার মাকে জিজ্ঞেস করো, ভাই-বোনদের জিজ্ঞেস করো।

জনে জনে জিজ্ঞেস করার কী আছে, বাবা? আপনি যেখানে বলবেন, সেখানেই হবে।

আমি তো এই বাড়িতেই ঘুমাতে চাই, তোমাদের পায়ের শব্দ শুনতে চাই, হাসির শব্দ শুনতে চাই।

তাহলে তা-ই হবে।

তুমি একা বললে তো হবে না বাবা, সবার মতামতের ব্যাপার আছে।

সবার মতামতের দরকার নেই বাবা, আপনার বাড়ি আপনি এখানে ঘুমাবেন, কার কী বলার আছে তাতে?

কিন্তু আমি যখন থাকব না, তখন তো আর আমি বাড়ির মালিক থাকব না, তখন এটা তোমাদের হয়ে যাবে।

তা হোক, আপনার ইচ্ছাটাই চূড়ান্ত।

এভাবে ভাবতে হয় না, বাবা। যুক্তি দিয়ে ভাবো।

আচ্ছা, ভাবছি। বাড়িটা আমাদের হয়ে যাবে?

হ্যাঁ।

সেখানে আপনার কবরের ব্যাপারে সবার সম্মতি থাকবে কি না এ নিয়ে আপনার সংশয় আছে?

হ্যাঁ, আছে এবং কেউ আপত্তি করলে সেটা যুক্তিসংগতই হবে। বাড়িতে একটা কবর থাকলে পরে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করতে অসুবিধা হয়।

জি, বুঝলাম। এই বাড়ির কিছু অংশ তো আমিও পাব, নাকি?

তা পাবে। তোমার প্রাপ্য অংশ তুমি পাবে।

তাহলে সেই অংশে আপনি ঘুমাবেন, বাকি অংশটুকুর দাবি আমি ছেড়ে দেব।

শুনে তিনি চুপ করে রইলেন, রাজিব দেখল বাবার দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। বললেন, আমার কাছে এসো।

রাজিব কাছেই বসা, আরো একটু কাছ ঘেঁষে বসল। তিনি হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন ছেলেকে, ফিসফিসিয়ে বললেন, তুমি খুব আবেগপ্রবণ, নরম মনের ছেলে। আমার অন্য সব ছেলে-মেয়ের চেয়ে আলাদা। তুমি কেন অন্য সবার মতো চলে যাওনি, আমি তা জানি, বাবা। জানি, বুঝি। তোমাকে শুধু একটা উপদেশ দিয়ে যাব আমি—জীবনে যা সত্য ও সুন্দর বলে জানবে, তা-ই কোরো। কখনো হেরে যেয়ো না।

বাবা মারা গেলেন এর দুদিন পর।

যথারীতি তাঁর কবরের স্থান নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। রাজিব আপসহীনভাবে বাড়ির সীমানার ভেতরেই কবরের জন্য গোঁ ধরে রইল, বোনরা সমর্থন করল তাকে, কিন্তু ভাইয়েরা কেউই রাজি হলো না। তাদের একটাই কথা, বাড়ির ভেতর কবর থাকলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে ওঠে। তা ছাড়া কবরস্থানে অনেক মানুষের যাতায়াত থাকে, আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করার জন্য অনেকে আসে, তখন সেই জায়গার সব কবরবাসী দোয়া পায়, বাবাও পাবে!

বাবা ভুল বলেননি, সত্যিই তাঁর মানসচক্ষু খুলে গিয়েছিল। রাজিব বুঝে পেল না, সবাই আমেরিকা গিয়ে স্থায়ী হওয়ার বাসনায় উদ্গ্রীব, চলেও গেছে প্রায় সবাই, তাহলে এই বাড়ি নিয়ে আর কী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকতে পারে? অবশ্য মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বড় ভাই ছাড়া আর কেউই আসেনি, আমেরিকা থেকে আসা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়, তবে ফোন করে মতামত দিতে উদ্গ্রীব সবাই! শেষ পর্যন্ত রাজিবের জেদের কাছে হার মানল অন্যরা, বাড়িতেই কবর হলো।

মা এলেন দিন সাতেক পর। দীর্ঘ সময়ের জন্য। এবার এই পাট চুকানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে চান তিনি। তার আগে অবশ্য আরো কিছু দায়িত্ব আছে। কুলখানি-চেহলাম করতে হবে, জমিজমার একটা বিধি-ব্যবস্থা করতে হবে, বাড়িতে কেয়ারটেকার থাকবে কি না, নাকি পুরো বাড়িই তালাবদ্ধ থাকবে, তা নিয়ে বড় ছেলের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইত্যাদি। রাজিব অবাক হয়ে দেখল, মায়ের চিন্তার মধ্যে কোথাও সে নেই। বাড়ি তালাবদ্ধ থাকবে কি না, এটা শুধু বড় ভাইয়ের ব্যাপার হবে কেন? সে নিজে তো এখানে আছে! ব্যাপারটা বোঝা গেল দু-চার দিন পরই। মা বললেন, ঢাকায় যাও, পাসপোর্টটা করে ফেলো, কাগজপত্র রেডি করো। এগুলো তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার!

পাসপোর্ট করব কেন?

কেন আবার! তুমি যাবে না?

কোথায় যাব?

কোথায় আবার? তোমার সব ভাই-বোন যেখানে থাকে, সেখানে।

না মা, আমি ওখানে যেতে চাই না।

চাও না মানে?

মানে, আমি দেশেই থাকতে চাই।

দেশে থাকবে? এখানে তুমি কী করবে?

কবিতা লিখব, মা।

কবিতা লিখবে? কবিতা? যেন এ রকম কথা জীবনেও শোনেননি এমন ভঙ্গিতে বললেন মা।

হ্যাঁ, মা।

কবিতা লিখে তোমার পেট চলবে? খাবে কী?

চাকরিটাকরি কিছু একটা খুঁজে নেব।

এত সহজ?

সহজ না, কিন্তু কিছু একটা পেয়ে যাব নিশ্চয়ই।

কিছু একটা পেলেই চলবে? জীবনকে এত সহজ মনে করো কেন?

জীবন সহজ না, কিন্তু খুব কঠিনও না, মা।

অবশ্যই কঠিন। তুমি জীবনের কতটুকুই বা দেখেছ? ভাই-বোনের ওপর বসে বসে খাচ্ছ বলে বোঝো না...

রাজিব এই কথাটা মায়ের কাছ থেকে আশা করেনি। এতটা রূঢ় নন তিনি, কিন্তু এখন কেন এমন করছেন, সে ভেবে পেল না। তার হয়তো আত্মসম্মানে লেগেছিল, তাই বলে উঠল, তুমি আমাকে খোঁটা দিচ্ছ, মা?

তিনি নিজেও কথাটা বলে একটু বিব্রত, তার ওপর ছেলের মুখে এই কথা শুনে আরো তেতে উঠলেন, এ আবার কেমন কথা? খোঁটা দেওয়া আবার কী জিনিস?

খোঁটাই তো! ভাই-বোনের ওপর বসে বসে খাচ্ছি বললে যে! তা তো আমার খেতে হতো না যদি মা-বাবার ওপর বসে খেতে পারতাম। জন্ম দিয়েছ, পড়াশোনা করিয়ে স্বাবলম্বী করানোর দায়িত্ব তো তোমাদের। আমি তো আর নিজে থেকে জন্মাতে চাইনি। দায়িত্ব পালন করতে পারোনি, এখন আবার খোঁটাও দিচ্ছ!

দায়িত্ব পালন করিনি! এই কথা তুই আমাকে বলতে পারলি! তোদের জন্য সারাটা জীবন বিলিয়ে দিলাম, শেষ সময়ে তোর বাবার পাশে থাকতে পারলাম না, বছরের পর বছর ধরে বিদেশে পড়ে আছি, আজ এখানে তো কাল ওখানে, নিজের হাতে গড়া সংসার অন্য লোকের হাতে ছেড়ে দিয়ে...

একনাগাড়ে বলতে বলতে কাঁদতে লাগলেন মা। রাজিবের ইচ্ছা করছিল কঠিন কিছু কথা শোনাতে। মনে হচ্ছিল বলে, তুমি ইচ্ছা করলেই আসতে পারতে মা, আসোনি। গ্রিন কার্ড না পিআর না সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্যই তো তোমার এত দৌড়ঝাঁপ, তা তো পেয়েই গেছ কয়েক বছর আগে, তবু তোমার ওখানেই পড়ে থাকতে হয় কেন? গত এক বছরে তুমি একবারও দেশে আসোনি, বাবার কাছে থাকোনি, কেন থাকোনি? তোমার চোখে রং লেগেছে মা, আমেরিকার রং; তোমার কণ্ঠ বদলে গেছে, ওখান থেকে আর আদর চুইয়ে পড়ে না; তোমার মন বদলে গেছে, নইলে বলতে, তুই এখানে থাকলে আমিও থাকব। তোকে একা রেখে আমি কোথাও যাব না।

বলল না সে। বিবাদ বাড়িয়ে লাভ নেই। তা ছাড়া কথার মধ্যে কান্নাকাটি শুরু হলে যুক্তিবোধ ভেঙে পড়ে, তখন আর কথা বলার কোনো মানেই থাকে না।

মা গুম হয়ে রইলেন এর পর থেকে, কথাই বলেন না ঠিকমতো। সে-ও আগ বাড়িয়ে আলাপ করতে যায় না। এমনিতেই বাবার অনুপস্থিতিটা বুকে বাজছে, মন খারাপ হয়ে থাকছে, কারণে অকারণে জলে ভরে উঠছে চোখ, ছোটদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতেও ইচ্ছা করছে, পারছে না। বড় হয়ে যাওয়ার তো অনেক জ্বালা, মন খুলে কাঁদাও যায় না, তার ওপর মায়ের এই আচরণ! তাকে তো একটু সময় দেওয়া উচিত, সে-ই তো এত দিন বাবার কাছে ছিল, তার বুকেই তো শূন্যতাটা সবচেয়ে বেশি! কিন্তু এসব ভাববে কে?

মা যে তার এই ঔদ্ধত্যের কথা সবাইকে বলে বেড়িয়েছেন, বোঝা গেল দু-চার দিন পরই। বড় ভাই এসে অহেতুক একপ্রস্ত বকে গেলেন তাকে, আমেরিকা থেকে ভাই-বোনদের ফোন আসতে লাগল একের পর এক, মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে সে যে মহা অন্যায় করে ফেলেছে, তা তাকে শতকণ্ঠে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। রাজিব কারো সঙ্গেই আর তর্কে গেল না। তার অবস্থা যে সবচেয়ে বেশি নাজুক এই পরিবারে, সেই কথা বুঝতে আর বাকি নেই। চুপ করে থাকাই ভালো।

মাসখানেক পর সবাই বাড়িতে এলো বাবার চেহলাম করার জন্য। আটটা ভাই-বোন, ভাবিরা, ভগ্নিপতিরা, ভাই-বোনের ছেলে-মেয়েরা মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক মানুষ! বড়িঘর গমগম করতে লাগল। বেশ একটা উৎসবের আমেজ বাড়িজুড়ে। কত দিন পর যে সবাই এ রকম একসঙ্গে হলো, মনে পড়ে না। সবাই আছে, শুধু বাবা নেই। সবাইকে একসঙ্গে দেখার সৌভাগ্য তাঁর আর হয়নি। যে বিশাল পরিবার তিনি তৈরি করেছিলেন, তার সদস্যরা অনেক আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। মেয়েদের বিয়ের পর তারা চলে গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি; বড় ছেলে সেই যে বাড়ি ছেড়েছিল ডাক্তারি পড়ার জন্য, আর ফেরেনি; অন্য ছেলেরাও এক এক করে চলে গেছে দেশের বাইরে। একেক সময় একেকজন এসেছে বটে, নিজেদের সুযোগ-সুবিধামতো, কিন্তু একসঙ্গে আসা হয়নি কখনো। বাবার শেষ সময়ে কেউই আসেনি। হয়তো এদের কাছে বাবা ছিলও না, বহু আগেই তাঁর মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল ছেলে-মেয়েদের কাছে। তাঁর না থাকাটা হয়তো তেমন কাউকে ভাবালও না। প্রথম দু-এক দিন চোখের পানি ফেলল কেউ কেউ, তারপর ভুলে গেল। কত সহজেই না মৃত্যুকে মেনে নিতে শিখেছে এরা, ভেবে রাজিবের ঈর্ষা হলো। সে কেন পারছে না?

চেহলামের জন্য বিশাল এক আয়োজন করা হলো। আশপাশের কয়েক হাজার মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হলো,  রান্নাবান্না, হৈচৈ, সে এক এলাহি ব্যাপার। বিয়েবাড়িতেও এত বড় আয়োজন হয় না, এত জাঁকজমক হয় না। এই এত এত মানুষ, এত বিপুল আয়োজন, এত কথা, এত হুল্লোড়—এসবের মধ্যে কোথাও বাবাকে খুঁজে পেল না রাজিব। এতসব কিছুর কোনো অর্থও খুঁজে পেল না সে। মনে হলো, স্কুল মাস্টারের ছেলে-মেয়েদের যে এখন অনেক টাকা, একটা উপলক্ষ তৈরি করে সেটাই সবাইকে দেখিয়ে দেওয়া হলো!

এবার যাওয়ার পালা, অতিথি পাখিরা যেমন এসেই চলে যায়। তার প্রতি প্রচুর হিতোপদেশ বর্ষণ করে সবাই চলে গেল সময়মতো। তার যে যথাসম্ভব দ্রুত এই দেশ ত্যাগ করা উচিত, সেটাও জানাতে ভুলল না কেউই। সে কারো সঙ্গেই কোনো তর্কে গেল না। সবাইকেই বলল, হ্যাঁ, আসব। আরো কটা দিন থাকি, গেলে তো আর ফেরা হবে না।

রাজিবের মনে ছিল অন্য কথা। এখনই হার মানতে চায় না সে। দেশেই থাকার চেষ্টা করে যেতে হবে। কিছু একটা কাজ খুঁজে বের করতে হবে। একটা চাকরি কি পাওয়া যাবে না? যাবে বোধ হয়। বন্ধুরা তো পাচ্ছে! সবাই চলে যাওয়ার পর সে-ও বেরিয়ে পড়ল। আবার ঢাকা। এই শহরে অনেক বছর কাটিয়ে গেছে সে, বেশ উদ্যাপনমুখর সময় ছিল সেটি, যেহেতু তখন জীবিকার দুশ্চিন্তা ছিল না, মায়াময় ক্যাম্পাসে বন্ধুরও অভাব ছিল না। বন্ধুরাই এ শহরে তার আপনজন। এখন তারাও বিচ্ছিন্নপ্রায়, একে অপরের কাছ থেকে। যারা হলে থাকত, তাদের বিপদই বেশি। ঢাকায় বাসা ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য প্রায় কারোরই নেই, ব্যাচেলরদের কেউ বাসা ভাড়া দিতেও চায় না, তবু পরিচিত বা স্বল্পপরিচিত কাউকে অনুরোধ করে কয়েকজন মিলে একেকটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকছে তারা। সে-ও তেমনই এক দলে গিয়ে ভিড়ল। সবাই ছোটখাটো কোনো না কোনো কাজ করছে, টিউশনি বা ছোট চাকরি, প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষার জন্য। রাজিবের এসবের কিছুই ভালো লাগে না। টিউশনি সে কোনো দিন করেনি, ছোটখাটো চাকরির কথাও সে ভাবতে পারে না, ন্যূনতম সম্মান না পেলে চাকরি করা যায় নাকি? বুঝতে পারে রাজিব, ভাই-বোনদের টাকায় বসে বসে খেয়ে তার স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে। তার এই বন্ধুরা, এ শহরে যারা বহিরাগত, ছাত্রাবস্থায়ই টিউশনি করত, নিজের খরচ নিজেই চালাত, এমনকি যারা বাড়ি থেকে টাকা পেত তারাও বসে থাকত না। সে কখনো ও পথে হাঁটেনি। এখন ভাই-বোনদের কাছ থেকে টাকা নেবে না বলে যে পণ সে করেছে সেটা রাখে কিভাবে? বাবা নেই যে তাঁর কাছে চাইবে, মায়ের সঙ্গে ও রকম বিশ্রী কথা-কাটাকাটির পর তাঁর কাছে চাইতেও আত্মসম্মানে লাগে। কী করা যায়? সে নানা পত্রিকা অফিসে ধরনা দিল, অনলাইন পোর্টালগুলোতে কাজ চেয়ে ই-মেইল করল, কোথাও কিছু জুটল না। বন্ধুদের কাছে প্রায় চেয়েচিন্তেই দিন কাটতে লাগল তার। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? বন্ধুরাই তো নানা সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে, তাকে আর কত দিন দেখবে? সে নিজেই মাঝেমধ্যে অবাক হয়। তার এই অলস-অকর্মণ্য-চেষ্টাহীন জীবনটাকেও বন্ধুরা যেভাবে টেনে নিচ্ছে এত দিন ধরে, যদিও বকাবাজি কিছু কম করছে না, কিন্তু বন্ধুদের বকাবাজি তো মধুরই হয়। শেষ পর্যন্ত খোঁটাটা সেখানে থাকে না, তাতে সে অবাক না হয়ে পারে না। সে অবশ্য বুঝতে পারছে, তার দিন শেষ হয়ে আসছে, এভাবে আর টেকা যাবে না। তাহলে কি তাকেও যেতে হবে? আমেরিকায়? যেতেই হবে? না গেলে হয় না?

বছরখানেক পর মা আবার এলেন। বললেন, অনেক তো হলো, এবার চলো।

এবার আর আগের মতো জোর পেল না রাজিব। সত্যিই তো! অনেক তো হলো, আর কত? কবিতা লিখতে চেয়েছিল সে, গত এক বছরে একটা কবিতাও লেখা হয়নি। আর কত দিন অপেক্ষা করা যায়? এবার হার মানা যাক।

পাসপোর্ট তৈরি করল সে, কাগজপত্র করল, মায়ের কথামতো। মা আসার পর বাড়িতেই থেকেছে সে বেশির ভাগ সময়, খুব একটা বাইরে বেরোয়নি। মনে হয়েছে, যতটুকু সময় বাবার কাছে থাকা যায়, ততটুকুই প্রাপ্তি। কী-ই বা করার আছে তার? শেষ পর্যন্ত তো যেতেই হচ্ছে!

তার মন খারাপ হয়ে থাকে প্রায় সব সময়। আর কোনো দিন আসব না ভেবেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চলে যাব, চলে যাব, বুকের ভেতর গুনগুনিয়ে ওঠে কে যেন। সত্যিই চলে যাব? কোনো দিন আসব না আর? এই লতায়-পাতায় জড়ানো জীবন, এই নদী, এই বৃক্ষ ফুল পাতা মানুষ—কত আপন সব! ঘাসগুলো পা জড়িয়ে ধরে, গাছের শাখাগুলো মাথা নাড়িয়ে না না বলে প্রতিবাদ করে, সর্বত্র যেয়ো না যেয়ো না ধ্বনি। মনের ভেতর গুনগুনিয়ে ওঠে কত গল্প, কত গান! একদা সে গল্পকার হতে চেয়েছিল, একবার চেয়েছিল শিল্পী হতে, শেষ পর্যন্ত চেয়েছিল কবি হতে। কত গল্প কত গান কত কবিতা জমা হয়ে ছিল তার বুকের ভেতর! লেখা হলো না, গাওয়া হলো না। এখন সব হেজেমজে গেছে। সব গেছে, সব।

বাবার কবরের কাছে মাঝেমধ্যে গিয়ে বসে সে, ফিসফিসিয়ে বলে, আমি হেরে গেলাম বাবা, হেরে গেলাম, আমার আর কিছুই হলো না, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। বলতে বলতে অঝোরে কাঁদে সে, একা একাই।


মন্তব্য