kalerkantho


গ ল্প

মরচুয়ারি কুলার

অদিতি ফাল্গুনী

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মরচুয়ারি কুলার

অঙ্কন : পূজা দাশগুপ্ত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর বারবার দরখাস্ত পাঠাচ্ছি। লাভ হচ্ছে না।

প্রতিটি দরখাস্তে ঘুরেফিরে একই কথা লিখতে হচ্ছে। মহাত্মন, আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে গত পৌনে দুই বছর কর্মরত। বিগত প্রায় এগারো মাস হয় আমাদের একমাত্র ‘মরচুয়ারি কুলার’ বা মৃতদেহ সংরক্ষণের ফ্রিজটি নষ্ট হওয়ায় মৃতদেহগুলোর যথার্থ ময়নাতদন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি, মোহাম্মদ ইলিয়াস শাহ, পিতা-মৃত সেকেন্দার আলী শাহ, সাং-মণিরামপুর, যশোর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হৃদয় দয়ার্দ্র করার জন্য দরখাস্তে বিশদভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একমাত্র মৃতদেহ রাখার ফ্রিজটি গত এগারো মাস ধরে নষ্ট হওয়ার কারণে কী কী সমস্যা হচ্ছে, তার একটি যথাসম্ভব কষ্টদায়ী চিত্র প্রতি দরখাস্তেই জুড়ে দিচ্ছি। যেমন—গত সপ্তাহেই কী যেন লিখেছিলাম দরখাস্তে? হ্যাঁ, মনে পড়ছে : ‘মহোদয়, গত এগারো মাস যাবৎ ডিএমসিএইচের সবেধন নীলমণি একটিমাত্র মরচুয়ারি কুলার বিনষ্ট হওয়ায় ডিএমসিএইচ মর্গের করিডরে নানা অপঘাত, যেমন—সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা কি আত্মহত্যায় নিহত প্রায় বিশটি মনুষ্যদেহ পড়িয়া থাকিতেছে। ইহাতে চারপাশের বাতাসে উত্কট পচা গন্ধ ছড়াইতেছে এবং খুন-ধর্ষণ-সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ মামলার জন্য ভিকটিম মৃতদেহগুলোর যথার্থ শনাক্তকরণ সম্ভবপর হইতেছে না। ’ কিন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তাটি আসলে কে? তিনি কি অসংখ্য ফাইলের সূ্তপে পড়ে থাকা আমার পাঠানো একটির পর একটি দরখাস্ত আদৌ পড়ে বা এমনকি ছুঁয়েটুয়েও দেখেন? দরখাস্ত পাঠাতে পাঠাতে আঙুলে আমার কড়া পড়ে আসে। এই বয়সে এত টাইপ করতে কি ভালো লাগে? আমি তো আর পেশাদার লেখক নই। তা সেই প্রথম তিনবার দরখাস্ত পাঠানোর পর মনে হলো, আমার বাংলা যথেষ্ট ভালো নয়। মেডিক্যালের ছাত্র হিসেবে শুধু ডাক্তারি পরিভাষাই মুখস্থ করেছি। এক সাহিত্যিক বন্ধুকে ধরে সুন্দর বাংলায় দরখাস্ত লিখে এবং পাঠিয়ে বসে থাকলাম পনেরো দিন। কোনো সাড়াশব্দ নেই। তখন মনে হলো, আসলে আমার ইংরেজি তত ভালো নয়। যতই সরকারি সব দপ্তরে এবং সর্বস্তরে মাতৃভাষা প্রচলনের কথা বলা হোক, স্মার্ট ইংরেজিতে লেখা চিঠির গুরুত্বই আলাদা। ইংরেজিতে আমি ডাক্তারি পাস করেছি বটে, তবে যাকে বলে খুব ঝকমকে ইংরেজি আমার নয়। ইংরেজি পত্রিকায় চাকরি করা, প্রতি সপ্তাহে একটি তুখোড় ইংরেজি কলাম লিখে জনপ্রিয় হওয়া আরেক বন্ধুকে ধরলাম পঞ্চম দরখাস্তের জন্য। সে তার সাধ্যমতো ইংরেজি জ্ঞান উপুড় করে পঞ্চম দরখাস্তটি আমার জন্য লিখে দিল। এতেও কাজ হলো না। প্রতিটি দরখাস্ত পাঠানোর পর পনেরো দিন থেকে এক মাস অপেক্ষা করি। এমন অপেক্ষা কৈশোরে প্রথম যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছিলাম, তার কাছে চিঠি পাঠিয়েও করিনি। এমন দুরূহ, ভয়ানক আর উত্তেজনাকর অপেক্ষা যে বলে বোঝানো যাবে না! পরিচিত বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন কেউ কেউ বলছে, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। কোনো জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের সাংবাদিককে ডেকে রিপোর্ট করাতে হবে। তাহলেই কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে। সেটা করব কি না ভাবছি এক মাস হলো। কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করালে কর্তৃপক্ষ ঠিকই আমাকে সন্দেহ করতে পারে যে ভেতর থেকেই আমরা খবর দিয়েছি কি না। তখন এই পোড়ার দেশে আমার বদলি, ডিমোশন, আর্থিক কেলেঙ্কারি থেকে যৌন কেলেঙ্কারি কোনো একটা গসিপে ফাঁসিয়ে দেওয়া—কত কী-ই না ঘটতে পারে ভাগ্যে! এক মাস হয় তাই ‘টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন’-এ ঝুলছি।   শেক্সপিয়ার—সত্যি বলতে, ‘হ্যামলেট’-এর এই বিখ্যাত স্বগতোক্তির পরের লাইনগুলো আমি একটাও জানি না। এই একটা লাইনই যা মনে আছে!

‘এই, শুনছ?’ বউ ঘরে ঢুকল।

‘কী ব্যাপার?’

‘রাত-দিন তো হাসপাতাল নিয়েই পড়ে থাকো। ঘরে এসেও অফিসের চিঠিপত্র টাইপ করা...এদিকে আমাদের ফ্রিজটা গত কয়েক দিন হয় নষ্ট হয়ে আছে, সে খেয়াল রাখো? শসা টমেটো লাউ চালকুমড়া—কিছুই রাখা যাচ্ছে না। মাছ মাংস—সব কিছু পচে যাচ্ছে। হাসছ যে?’

‘কী বলি বলো তো? আমার যেখানে কাজ—সেই মর্গের ফ্রিজটা আজ বেশ কয়েক মাস হয় নষ্ট! মানুষের লাশ পচে যাওয়ার গন্ধ কেমন সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে?’

‘না, থাক—ধারণা করতেও চাই না। উফ্, তুমি কেমন? মাত্র নাশতা করলাম আর তুমি মর্গের পচা লাশের কথা বলছ? কয়েক মাস হয় তোমার মুখে তো এ ছাড়া কোনো কথা নাই!’

‘ঠিক আছে চলো, দেখি তোমার ফ্রিজ। এই ফ্রিজ তো ঠিক করা তেমন কঠিন বিষয় না। আসল সমস্যা তো...’

‘প্লিজ, রাত-দিন ওই মর্গের ফ্রিজের আলাপ বাদ দাও। আগে বাসার ফ্রিজটা তো দেখো!’

এই বলে সুরাইয়া, মানে আমার স্ত্রী, আমাকে ঠেলতে ঠেলতে ডাইনিংরুমে গিয়ে ফ্রিজের ডালা খুলে দেখাতে থাকে :

‘দ্যাখো, কুমড়াটা অনেক বড় আর গতকালই বাজারে একদামে কিনে ফেললাম। ফ্রেশ লাগছিল কিনা দেখতে! বরবটি কিনলাম আর ঝিঙা, আজ সকালে উঠে দেখি সব এর মধ্যেই কেমন পচে যাচ্ছে। ডিপ ফ্রিজ থেকে মুরগি বের করছিলাম আর মাছ—সব! কেমন গন্ধ করছে! হবে না? যা গরম!’

 

দুই.

Charme profond, magique, dont nous grise

Dans le présent le passé restauré!

Ainsi l'amant sur un corps adoré

Du souvenir cueille la fleur exquise.

আমার ইন্টারের সময় বাবা ফুড ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন সেই চট্টগ্রামে। ইন্টারের পর প্রথমে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বাবার ভয়ানক বাসনা যে আমাকে মেডিক্যালে ভর্তি হতেই হবে। দরকারে পরের বছর আরেকবার পরীক্ষা তো দিতেই পারি। ইংরেজিতে এক বছর পড়ার সময় কী মনে ফরাসি ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। এক বছরে তিন মাস করে চারটি সেমিস্টার শেষ হয়েওছিল। চতুর্থ সেমিস্টারে এক শিক্ষক একবার বালজাকের ‘লে ফ্লরস দ্যু মাল’-এর ‘পারফিউম’ বা ‘সুগন্ধি’ কবিতাটা থেকে খানিকটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। সঙ্গে বাংলায় তর্জমা। কবি ভালোবাসেন লাশের গন্ধ। তা সেই বছর পার হতেই চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চান্স হলো আমার। ছেড়ে দিতে হলো ইংরেজি সাহিত্য পড়া, ফরাসি ক্লাস—সব। কদিন হয় পুরনো সেই কবিতার ভুলে আসা ঝংকার মাথায় কাজ করে। সব কিছু যখন পচে আসে...গৃহস্থবাড়ির ফ্রিজের শসা, টমেটো থেকে সদ্য মরে যাওয়া মানুষগুলোর লাশ। আমার অবস্থা পারির বোদলেয়ারের মতো হবে না তো কোনো দিন! লাশের গন্ধই কি ভালো লাগবে? দিন দিন কেমন অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি সকালের চা-ব্রেকফাস্টের পরই, গায়ে খানিকটা পানি ঢেলে অফিস যাওয়ার জন্য দৌড়াতে। আমার অফিস আর কি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্গের পাশেই আমার বসার রুম। গতকালই আমাদের ডোম রমেশকে বকছিলাম আমি পৌঁছানোর আগেই যেন আমার রুমে খানিকটা এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে রাখে, সেই নির্দেশ না মানার জন্য।

‘বাতাস ক্যায়সে ফ্রেশ রহেগি, বাবু? ক্যায়সে?’ হাত নেড়েছিল সে আমার দিকে। দিনে-রাতে সবটা সময়ই যথেষ্ট পরিমাণে কেরু কি বাংলার প্রভাবে সে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। তবে একা ওকে বলে কী হবে? আমি খাই না? আমি হয়তো খাই স্মিরোনফ। তবে মর্গে কাজ করতে হলে কিছু না কিছু একটা খেতেই হবে। হয় কেরু নয় স্মিরোনফ কি বাংলা! এত এত লাশ! নগ্ন নারী কি পুরুষের দেহ। এই যে মেঝের ওপর পরশু থেকে পড়ে আছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ছুরিকাহত এক ব্যবসায়ীর লাশ। নগ্ন দেহ নিয়ে সে এখন নির্বিকার, অচৈতন্য, ঘুমাচ্ছে মর্গের মেঝেতে। গতকালই এক নারী সাংবাদিক এসেছিল। সাতাশ-আটাশ বছরের মেয়ে। সাদা আর বেগুনি ফুলের একটি ছাপা ছাপা কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ আর সাদা ওড়না পরনে। মেয়েটির সাহস দেখে সত্যি বলতে বিস্মিত হচ্ছিলাম। না, টিভি সাংবাদিক না। প্রিন্টেরই মেয়ে। হাতে কাগজ-কলম। একথা-ওকথা খানিকটা বলার পর বলল—‘স্যার, এই যে আপনাদের মৃতদেহ রাখতে পারছেন না বললেন, ফ্রিজটা নষ্ট হয়ে গেছে—একবার মর্গটা দেখতে চাই। ’

‘পারবেন দেখতে? আপনি তো ঢোকার মুখে বাতাসের গন্ধেই খানিকটা বমি করলেন দেখলাম!’ আমি হাসলাম।

‘জি, আসলে বাসা থেকে ব্রেকফাস্ট করে বের হওয়া উচিত হয়নি; বিশেষ করে এখানেই যখন আসব। মাত্রই খেয়ে বের হয়েছি কিনা!’

‘কত সেনসিটিভ, তবে ডাক্তারদের এমন হলে চলে না। আমাদের কত ছাত্রী রাত জেগে ছেলেদের পাশে বসে লাশ কাটে! আচ্ছা, কেন মর্গেই এলেন রিপোর্ট করতে? কেউ জানিয়েছে যে আমাদের ফ্রিজটা নষ্ট?’

‘ঠিক তা নয়। আসলে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ পড়ার পর থেকে অনেক দিনই ভাবনা ছিল যে কখনো সাংবাদিকতা করলে মর্গে আসব। সেই কৌতূহল থেকে এসে এমন যে একটা টাটকা খবর পেয়ে যাব তা ভাবিনি। ’

‘আপনাকে মর্গ দেখাতে নিতে পারি, তবে এখনই রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন না। বোঝেনই তো আমাদের দেশটা কেমন? অথরিটি খেপে গিয়ে আবার না আমার চাকরি খায়! ছাপবেন, তবে আগে রিপোর্টটার মাল-মসলা সব নিয়ে লেখাটা সাজান। আমি একবার পড়ে নেব। তারপর আমি ওকে করলে ছাপবেন, বুঝলেন?’

‘জি, অবশ্যই। এবার তাহলে মর্গের ভেতরে যেতে চাই!’

‘চলেন। ’

আমার কাজের রুম থেকে মর্গের ভেতর ঢুকতেই মেয়েটি হকচকিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল। মর্গের মেঝেতে শায়িত নগ্ন পুরুষটিকে দেখে কি চেঁচিয়ে উঠল? মেয়েটি কি আনম্যারেড? নগ্ন পুরুষ দেখেনি কখনো?

‘আর ইউ আনম্যারেড?’

কেমন না ভেবেচিন্তেই দুম করে প্রশ্নটি বেরিয়ে গেল আমার মুখ থেকে।

‘জি। কী...কী করে বুঝলেন?’

আরে, মেয়েটি তো দেখি ভয়ে রীতিমতো কাঁদো কাঁদো। চোখে জল, আর ফোঁপাচ্ছে কথা বলতে গিয়ে। এবার হাসি পেল আমার, ‘দেখুন, আপনি একে মেয়ে, তাতে আজও যথেষ্ট পরিমাণে নেইভ। মানে সহজ-সরল টাইপের। আপনার বয়সী অনেক মেয়ে অনেক শক্তপোক্ত মনের গড়নের যে হয় না তা নয়। তবে আপনি সে রকমটা না। তাহলে এত কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট করতে আপনাকে কে বলেছে? বের হয়ে আসেন!’

শেষটায় গলা জোরে তুলে রীতিমতো দিলাম এক ধমক। সুড়সুড় করে এক ধমকে সে বের হয়ে এলো মর্গ থেকে। লজ্জায় বেচারির মুখ লাল হয়ে গেছে।

‘স্যরি স্যার, আমি হয়তো আমার পেশার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টাফ এখনো হতে পারিনি। আমি না হয় মর্গের ভেতরে আর না-ই গেলাম! তবু একটা-দুটা পয়েন্ট কি জিজ্ঞেস করতে পারি?’

আমার হাসি পাচ্ছে মেয়েটাকে দেখে। পুরুষ সাংবাদিকের সমান ওকে হতেই হবে। ছেলেদের সমান যোগ্যতা তাকে প্রদর্শন করতেই হবে। নইলে কিসের সমানাধিকার? কিন্তু সেই যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে বেচারির ধকল যাচ্ছে ম্যালা।

‘আমার কাছে কি শুনবেন, বরং আমাদের ডোম রমেশকে ডাকি? ওকে কোট করে লেখা ছাপলে আপনার রিপোর্টের হিট বাড়বে। তার ওপর মেয়ে হয়ে এত সাহসী কাজ করার চেষ্টা...না, আপনার সাহস কম না। তবে আপনি খুব চতুর আর পোক্ত হতে পারেননি এখনো, আর সেটা ভালো। খারাপ না। খুব শক্ত আর খুব পোক্ত এই বয়সেই আপনাকে হতে হবে কেন? রমেশ...’

‘হাঁ, আপ মুঝকো বুলায়ে?’

‘এই সাংবাদিক আপাকে বোঝাও তো আমাদের সমস্যা। ’

‘ও, তু কী শুনবি, দিদিমণি? বুঝিস তো, এই জ্যৈষ্ঠ মাসের গরম। বাহার মে মওত আদমিকো কিতনা রিলেটিভ খাড়া হোতা হ্যায়। লেকিন হামকো ফ্রিজ তো বুরা হ্যায়। ’

‘ওর কথা বুঝছেন তো আপনি ঠিকঠাক? বলছে যে আমাদের মরচুয়ারি কুলার, মানে মর্গের ফ্রিজটা তো নষ্ট। তাতে এই গরম যা পড়েছে! চব্বিশ ঘণ্টা পার না হতেই দেহগুলো পচে যাচ্ছে। এখন অপঘাতে মৃত্যু যত—স্বাভাবিক মৃত্যুর লাশ তো আসে না আমাদের এখানে, আসে খুন-ধর্ষণ কি বড় সড়ক দুর্ঘটনার সব লাশ! অনেক সময় একটা মানুষ হুট করে খুন হলো বা আত্মহত্যা করল কি কোনো বউকে পিটিয়ে মারা হলো। কেউ অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজন বা কাছের মানুষ আসার আগেই গরমে লাশ পচে বিকৃত হতে থাকে। তখন আমাদের আর উপায় থাকে না। মৃতের রিলেটিভরা আসার আগেও কত সময় লাশগুলো সব আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের গাড়িতে দিয়ে দিতে হয়!’

‘লাশ পচে গেলে কি তদন্ত করতে সমস্যা হয়?’

‘হ্যাঁ, খুব সমস্যা হয়। ময়নাতদন্ত করাই যায় না প্রায়। দেখবেন আপনি? ফ্রিজের ভেতরেও কয়েকটা লাশ আছে। সেগুলো মেয়েদের লাশ। মেয়েদের বডি দেখলে—ন্যুড বডি দেখলে তো ভয় পাবেন না? কারণ আপনি নিজেই মেয়ে!’

মেয়েটি ইতস্তত করতে থাকে।

‘ফ্রিজের ভেতর কতগুলো লাশ, স্যার?’

‘চারজন নারীর লাশ আছে। দুটা ধর্ষণ-পরবর্তী খুন, যাদের একজন কুমারী, একজন গৃহবধূ আর একটি এক পতিতা নারীকে খুন করেছে তার ক্লায়েন্ট। আরেক নারীকে বোধ হয় যৌতুকের জন্য গলা টিপে, শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ’

‘ফ্রিজ না নষ্ট বললেন?’

‘নষ্ট তো বটেই। এই ফ্রিজটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের দিয়েছিল সেই ১৯৯২-এ। আজ দশ বছরের ওপর হয়ে গেল।

‘স্যার, কিছু মনে করবেন না। কী করে শুরুতেই বুঝে নিলেন যে কে পতিতা, কে গৃহবধূ আর কে কুমারী?’

করিডরে গতকাল সন্ধ্যা থেকে আসা তিনটি নতুন পুরুষ লাশের উত্কট গন্ধে মাথা ধরেছিল। একটি কড়া মার্লবোরো সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম, ‘মুশকিল হলো, আমাদের দেশে যৌন শিক্ষা বলে কোনো বিষয় নেই। কাজেই বিয়ে না করা অবধি লাখ লাখ নর-নারীর, বিশেষত মেয়েদের সেক্স এডুকেশন শিশুর স্তরে থাকে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আপনার চিলড্রেনস বিট করা উচিত, ম্যাডাম!’

‘মানে?’

‘আপনার প্রশ্নের উত্তর দিই। যে মেয়েটিকে কুমারী বলছি, সে সিদ্ধেশ্বরী কলেজের ছাত্রী। ব্যাগে তার আইডেন্টিটি কার্ড ছিল। তবে সেটার ভিত্তিতে তাকে কুমারী বলা হয়নি। তার ভ্যাজাইনায় অস্ত্রের আঘাত ছিল আর আমরা ডাক্তাররা বুঝি কে হ্যাবিচুয়েটেড ইন ইন্টারকোর্স আর কে না? এই মেয়েটি মৃত্যুর আগে সদ্য কুমারীত্ব হারালেও সে রেগুলার ইন্টারকোর্সে হ্যাবিচুয়েটেড না। আপনার—তোমার তথ্যের জন্য আরো জানানো যাক—তুমি আমার ভাগ্নির বয়সী হবে—একজন প্রস্টিটিউট এবং একজন দীর্ঘদিনের বিবাহিতা মহিলা বা এমনকি একজন মা—যে শব্দটা আমরা খুব সম্মান ও ভাবাবেগ নিয়ে বলি—একজন সম্মানিত গৃহবধূর ভ্যাজাইনা পরীক্ষায় ক্লিনিক্যাল তেমন কোনো ডিফারেন্স আসে না। পতিতা মেয়েটি হয়তো অনেক ক্লায়েন্টের সঙ্গে বছরের পর বছর সম্পর্কে যায়। সম্মানিতা গৃহবধূ বছরের পর বছর হয়তো শুধু স্বামীর সঙ্গেই সম্পর্কে যায়। তবে তাদের দুজনের ফিজিক্যাল গড়নই একই কথা বলে—হ্যাবিচুয়েটেড ইন ইন্টারকোর্স। তাহলে আমরা কিভাবে বুঝব কে গৃহবধূ আর কে পতিতা? সে ক্ষেত্রে পুলিশ ডায়েরির কাগজ আমাদের বলে দেবে কে স্ট্রিট বেইসড বা ব্রথেল বেইসড সেক্স ওয়ার্কার যে ক্লায়েন্টের ছুরিতে খুন হয়েছে আর কোন গৃহবধূ তার পরকীয়া প্রেমিকের হাতে বা স্বামীর শত্রুর হাতে ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়েছে? এই, তুমি এখন আসো তো! এই ম্যাচিউরিটি নিয়ে মর্গে রিপোর্ট করতে এসেছ? বাইরে গিয়ে দাঁড়াও আর তোমাদের ফটোগ্রাফারকে ডাকো। সে এসে আমাদের বিকল ফ্রিজ, ফ্রিজে পচতে থাকা চারজন নারী আর ফ্রিজের বাইরে মেঝেতে আর করিডরে পড়ে থাকা পুরুষদের লাশগুলো নিক! যত্ত সব!’

বিরক্তির চোটে সাংবাদিক মেয়েটিকে ভাগিয়ে দিই। শেষ মুহূর্তে ওর সঙ্গে খুব রূঢ় আচরণ করা হয়ে যায় আমার। এত ইমম্যাচিউরড মেয়ে এত কঠিন বিট করতে এসেছে কেন? ওদের পত্রিকার ফটোগ্রাফার ঢোকে অবশ্য। কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে হাসি হাসি, রীতিমতো আদুরে মুখে ছেলেটি ফ্রিজের ভেতরের চার নগ্নিকা, মেঝেতে আর করিডরে শোয়া নিহত পুরুষগুলোর দেহের ছবি এমনভাবে তুলতে থাকে, যেন পুষ্প প্রদর্শনী বা ফ্যাশন শোরই ছবি তুলছে। বাহ্, বাঘের বাচ্চা!

‘মিম আপু একটু নরম-সরম। আর বিয়াশাদি করে নাই তো। তাই এখনো অনেক ভয়-ডর আছে। মিম আপা আপনার মেজাজ দেখে, স্যার, আমাকেই ডিটেইলসে নিতে বলছে। লাশগুলোর নাম? কে কিভাবে মরেছে?’

‘যন্ত্রণা—লিখুন—তিনটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী খুন, একটি যৌতুকের জন্য প্রহার ও শ্বাসরোধ করে বা গলা টিপে খুন, একটি সড়ক দুর্ঘটনা, একটি ক্রসফায়ারে মৃত্যু, একটি চাঁদাবাজির আবদার না মানায় ছুরিকাঘাতে খুন, দুটো সড়ক দুর্ঘটনা...’

আমি নির্বিকার বলে যেতে থাকি মৃতদের ডিটেইলস। বলাটলা শেষ হলে ফটোগ্রাফার ছেলেটি মর্গ থেকে বের হয়ে মর্গের ঘাসে দাঁড়ানো প্রতিবেদক মেয়েটির সঙ্গে যোগ দেয়। ওদের টুকরো কথার আলাপ আমার কানে আসে। মেয়েটি—আশ্চর্য—এখন হাসছে, ‘অনেক থ্যাংকস, তোতা ভাই!’

‘না না, আপা, অনেক সাহস আপনার! সাহস না থাকলে পুরা রিপোর্টটা আজ করতে পারতেন না। তবে আমি সব ডিটেইলস নিয়া আসছি। আপনাকে অফিস গিয়া দিয়া দিব ইনশাল্লাহ্!’

পরের দিন সকালে আমার পত্রিকায় বড় বড় হরফের শিরোনামে একটি প্রতিবেদন আসে : ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একমাত্র মরচুয়ারি কুলার দীর্ঘদিন হয় বিকল। ইমন কল্যাণ। ’

মেয়েটার নাম ইমন কল্যাণ নাকি? আজকাল কত যে বাহারের নাম চারদিকে!

 

তিন.

‘অর্ডার, অর্ডার—হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের জন্য একটি নতুন মরচুয়ারি কুলার কিনবার অকশন এখনই শুরু হতে যাচ্ছে!’

যাক, নতুন কুলার কেনা হবে তাহলে? কর্তৃপক্ষকে কোনটা কিনতে বলব? আটটি মৃতদেহ রাখতে সক্ষম, না দশটা বা বারোটা মৃতদেহ রাখতে সক্ষম কুলার? ওয়ান ডোর মরচুয়ারি কুলার, না ডাবল ডোর? ওয়ারেন কম্পানির কুলারগুলো খুব ভালো হয় না? দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কত মরচুয়ারি কুলারের বিজ্ঞাপন উল্টে চলেছি। জাপানে ফরেনসিক মেডিসিনে ডিগ্রি করার সময় একটি পাহাড়ের পেছনে যে বড় হাসপাতালে কাজ করতাম আর পড়তাম আমি, সেখানে মর্গে ছিল দুধ-ধবধবে সাদা রঙের চারটি মরচুয়ারি কুলার। আমাদের দেশের মতো গরম ছিল না সেখানে। পাশেই ছিল একটি শিন্তো মন্দির। চেরির মৌসুমে মর্গ থেকে বের হয়ে ক্যান্টিনে হাত ধুয়ে খেতে যাওয়ার সময় কানে আসত শিন্তো মন্দিরের ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দ। অকশনটা কোথায় হচ্ছে? না, ঢাকা মেডিক্যালে তো না। এ তো জাপানেই। তবে সেখানে ঢাকা মেডিক্যালের সহকর্মীরা আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদা বিরক্ত কর্মকর্তারাও আছে। কিন্তু বাঙালি লোকগুলো সব জাপানিতে কথা বলছে কেন? আর কী আশ্চর্য দ্যাখো, সবার সামনে দাঁড়িয়ে টেবিলে নিলামের হাতুড়ি টিপছে আমার জাপানি প্রফেসর তাকিহিতো। তাকিহিতো উল্টো জাপানি না বলে ভাঙা ভাঙা বাংলায় মুচকি হেসে বলছে, ‘সম্মানিত ভদ্র মহোদয় ও মহিলাগণ, আপনাদের সামনে আমি খুলতে যাচ্ছি সম্পূর্ণ নতুন   প্রযুক্তি ও ডিজাইনের এক অভিনব মরচুয়ারি কুলার। ’

এটুকু বলে তাকিহিতো তার মাথার টুপিটি খুলে অভিবাদনের ভঙ্গিতে মুচকি হেসে আমাদের সবার সামনে খুলে ফেলল পেল্লায় আকারের হালকা ছাই রঙের একটি মরচুয়ারি কুলারের দরজা। একটার পর একটা ড্রয়ার খুলতে খুলতে আমাদের বস্ফািরিত ও বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে মুচকি হেসে তাকিহিতো—কোত্থেকে ব্যাটা সাধু বাংলা শিখল কে জানে—বলতে থাকে, ‘দেখিয়া লও কেমন উত্তম ফ্রিজ! প্রতিটা ডালায় সফল আত্মহত্যাকারী নারী-পুরুষগণ প্রসাধিত শুইয়া রহিয়াছে—নিস্পন্দ ও নগ্ন, যেন বা ড্রয়িং ক্লাসের মডেল। হত্যার শিকার যাহারা হইয়াছে, তাহাদের ঠোঁটেও রক্ত জমা হইয়াছে, যেন সুদৃশ্য ওষ্ঠরঞ্জনী!’

তাকিহিতো একটার পর একটা মর্গের ফ্রিজের ডালা খুলতে থাকে। আর নিস্পন্দ, নগ্ন, শান্ত, সৌম্য ও সুন্দর—আশ্চর্য সফল একপাল নগ্ন নর-নারী পাউডার, রুজ ও লিপস্টিক মাখা ঠোঁটে আমাদের দিকে চেয়ে মুচকি হাসতে থাকে।

...তারা ছিল লাল, নীল, রুপালি ও নীরব!


মন্তব্য