kalerkantho

গ ল্প

হয় হচ্ছে হবে

হামীম কামরুল হক

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



হয় হচ্ছে হবে

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

—কী নাম?

—মেহদাদ ফেরদৌস।

—কদিন ধরে এমন বোধ করছেন?

—অনেক দিন।

—মানে কত মাস বা বছর?

—এই তো মাস ছয়েক।

—নিজে কোনো কারণ বের করতে পেরেছেন?

—হ্যাঁ। সেটা তো আমি জানি। দুম করে চাকরিটা চলে গেল। ঠিক তার আগে আগে নিরুপমার সঙ্গে সম্পর্কটা চলে গিয়েছিল প্রায়। আমার চাকরি গেছে শুনে সবার আগে যে পাশে দাঁড়িয়েছে, সে হলো নিরুপমা। কিন্তু আমি এটাকে, মানে নিরুপমার এই ফিরে আসাকে একদম পছন্দ করিনি। আবার সে চলে যাক, তা-ও চাইছি না। কারণ নিরুপমার টাকায় বলতে গেলে আমি এখন চলছি।

বাড়িতেও টাকা দেওয়া বন্ধ করিনি। জানাইওনি যে আমার চাকরি নেই। আসলে নিজেকে খুব ছোট লাগছে বা লাগে। আমার অযোগ্যতায় যদি চাকরিটা যেত, আমি মেনে নিতাম। কোনো অন্যায় কিছু করছি, তা-ও মেনে নিতাম। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া চলে গেল, এটা একদম মানতে পারিনি।

—তাহলে মামলা করলেন না যে?

—ও, বলা হয়নি, ওটা আসলে চুক্তিভিত্তিক কাজ ছিল। ঠিক চাকরিও বলা যাবে না। বছর দুই হয়েছিল। এর ভেতরে আমার সরকারি চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে। এ জন্য আফসোস হচ্ছে। আসলে ভেবেছিলাম এই তো মাত্র কটা দিন, এরপর পার্মানেন্ট হয়ে যাব। তারপর তো এ নিয়ে আর ভাবনা থাকবে না; যদিও জানি না তখন ইনক্রিমেন্ট-প্রমোশনের ইঁদুরদৌড়ে আমিও দৌড়াতে শুরু করে দেব কি না। জন্মগতভাবে তো কোনো প্রতিভা নিয়ে আসিনি যে নিজের একটা জগৎ থাকবে। তাতে জীবিকাটা ছোট থাকলেও জীবনটা ছোট হবে না। তবে জানি না, আমার এক বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স পাস করে একটা পত্রিকায় কাজ নিয়েছে। এডিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। আসলে প্রুফ রিডার। তার ইচ্ছা জীবিকাটা ছোট রাখলে জীবনটাকে সময় দেওয়া যাবে। অফিসের কাছেই বাসা। অফিসের কাজ বাদে গান নিয়ে পড়ে থাকে। গান লেখে, সুর দেয়। এ পর্যন্ত শখানেক গানে সুর দিয়েছে, নিজের গান; কিন্তু কই, তার তো কোনো ব্যবস্থা হলো না? রেডিও, টিভিতে, সিনেমায়—কোথাও তো কেউ ডাকল না?

মেহদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আবার টেনে একটু দম নেয়। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আবার বলতে শুরু করে।

—তবে কি জানেন, আমার এই অবস্থার ভেতরে একটা দারুণ সুখের ব্যাপারও আছে। আর সেটা হলো নিরুপমা। আমি উপমা বলে ডাকি। ওর সত্যিই কোনো তুলনা নেই। কোনো সংস্কার নেই। কোনো পিছুটান নেই। একেবারে স্বনির্ভর মেয়ে। আমার দেহ-মন, আত্মসত্তা—সব সে সুখে সুখে ভরিয়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, নিরুপমা যত দিন থাকবে, তত দিন আমার আর কিছু করাই হয়ে উঠবে না। বলে না, মানুষ একটা হারালে আরেকটা ফিরে পায়। প্রকৃতি অদ্ভুত একটা ব্যালান্স তৈরি করে দেয় তার জন্য। নিরুপমা তেমন করেই ফিরে এসেছিল যেন। যেদিন হাতে চাকরিচ্যুত হওয়ার চিঠি নিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে কেমন যেন পানি জমেছে, পায়ের তলা ফুলে গেছে, পা ফেলতে মনে হচ্ছিল ঠিক মাটির ওপর হাঁটছি না, পা ফেললেই ব্যালান্স রাখতে পারব না, এদিকে চোখ ফেটে বুক ফেটে একটা কান্নার প্রচণ্ড দমক সব কিছু ভেঙে ছুটে আসতে চাইছে কিন্তু পারছে না, ঠিক সেই সময় আমি নিরুপমার একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলাম। আমার ভেতরটা তখন এমন দুম করে ঠাণ্ডা মেরে গেল। হয়তো মুখ থেকে রক্তই সরে গিয়েছিল।

—তুমি? হঠাৎ এখানে?

—আমার কথা বাদ দাও। তোমার কি শরীর খারাপ করছে? চেহারার এই দশা?

আমার তখন জানি কী হয়। নিরুপমার কথার ভেতরে এমন একটা মায়া ছিল। দুম করে আমার মনে হয়—না, হারানোর কিছু নেই। হারালেও ফিরে পাওয়ার আছে। সব কিছু হারিয়ে যায় না। আসলে কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না। সবই ফিরে ফিরে আসে। আচমকা এমন সুস্থ বোধ করি যে একেবারে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলি—চলো, এককাপ চা খাই। খেতে খেতে বলছি।

টিএসসির ওখানে আমরা আমাদের পরিচয়ের শুরু থেকেই আড্ডা মারি। আমি ও নিরুপমা। নিরুপমার গায়ের রংটা একটু চাপা, সানবাথ নেওয়ার পর ফরসা মানুষের যেমন রং হয়। সবচেয়ে বড় হলো নাকটা এমন চোখা, বড় বড় চোখ, শুধু হনু দুটির কারণে ভালোমতো খেয়াল করলে তবে একটু ধরা যায় ও বাঙালি মেয়ে না। নাট্যকলা থেকে অনার্স-মাস্টার্স করে এনজিওতে কাজ করছে। ঢাকার বাইরেই বেশির ভাগ চাকরি। এখন আছে শেরপুরে। ঢাকার হেড অফিসে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তবে ওখানের ঘনিষ্ঠ একজন বলছে, ওখানে যেয়ো না; গেলেই পলিটিকসের ভেতরে পড়বে; যা যা দেখবে সহ্য করতে পারবে না।

নিরুপমার মধ্যে শুধু একটা জিনিস আছে খারাপ, এ ছাড়া মানুষ হিসেবে ওর সত্যিই কোনো তুলনা নেই। খারাপ যেটা, সেটাও আসলে ভালো। কোনো রকম উল্টাপাল্টা কিছু দেখলে সে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। রেগেমেগে অস্থির হয়ে যায়। বিশেষ করে যেটা যার সঙ্গে যায় না, ওর পরিচিতদের ভেতরে তেমন কিছু কেউ করে বসলেই হলো, সে যে-ই হোক, নিরুপমা তাকে দু-তিন কথা শুনিয়ে ছাড়বে। কোনো মাফ নেই। আবার স্যরি বললেই সাত খুন মাফ, নিরুপমার কোমল মনেরও কোনো তুলনা নেই। ফেসবুকে উপমা অনিন্দিতা নামে ওর পেজটাও বন্ধ করেছে কয়েকজনের ওপর রাগের কারণে। বলে, সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে ইচ্ছা করে, শুধু তুমি আছ বলে আমি মোবাইলটা রেখেছি, নইলে মোবাইলটাও ছেড়ে দিতাম।

আমি ঠিক জানতাম না নিরুপমার সঙ্গে আমি কত দূর কী করব, কত দূর যাব, আমাদের সম্পর্কটা ঠিক প্রেম না, আবার বন্ধুত্বও না। কারণ সম্পর্কটা বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি কিছু। নিরুপমা বলে, তার জীবনে একটা স্বপ্ন ছিল, দেশজুড়ে এমন একটা লাইব্রেরি করবে, যেখানে মাত্র ১০০ বই থাকবে। নিরুপমা বলে যাচ্ছিল, মাত্র ১০০টা বই। তালিকাটা খুব সোজা, জানো—চারটি ধর্মগ্রন্থ বা দার্শনিক গ্রন্থ—বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরআন বা রিপাবলিক; পলিটিকস, দ্য ক্যাপিটাল, দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস; চারটি মহাকাব্য, চারজন প্রধান চিন্তকের প্রধান বইগুলো— ডারউইন, মার্ক্স, ফ্রয়েড, আইনস্টাইন; ১০টি নাটকের বই, ২০টি কবিতার বই, ১০টি ক্লাসিক বিশ্ব-উপন্যাস, ১০টি আধুনিক বিশ্ব-উপন্যাস, ২০টি বাংলা উপন্যাস—ক্লাসিক ও আধুনিক মিলিয়ে, ১০ লেখকের গল্পগ্রন্থ, চারটি বিজ্ঞান নিয়ে আধুনিক চিন্তার বই, আর চারটি নন্দনতাত্ত্বিক, সৌন্দর্য কী, শিল্প কী, আর্ট কী—এজাতীয় গ্রন্থ। প্রতিটি বইয়ের ১০টা কপি থাকবে। তাহলে মাত্র এক হাজার বই। কিন্তু এই এক হাজার বই দিয়ে মানুষ তার ভেতরের মানুষকে চিনতে পারবে, তার সমাজ, ভাষা ও আশপাশের মানুষদের চিনতে পারবে। এই ১০০ বই মানুষকে হাজার কি ১০ হাজার বইয়ের দিকে নিয়ে যাবে। বিজ্ঞানের ভেতর দিয়ে মানুষ নিজেকে, বিশেষ করে যার যার শরীরটাকে চিনতে পারবে। আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর কোথাও কি বায়োলজিটা ঠিকমতো পড়ানো হয়, বলো? জীবের ইতিহাস, জীবনের, প্রাণের ইতিহাস সত্যিকারভাবে পড়ানো হয় কোথাও? তুমি জানো, শরীরটা চিনতে পারলেই মানুষ সব রকমের সংস্কার ভেদাভেদ থেকে, এবং যা কিছু মানুষকে বিভক্ত করে, তার হাত থেকে মুক্তি পাবে। এরপর সে একটা অদ্ভুত কথাও বলেছিল, শরীর নিজে একটা ধর্মহীন বিষয়, এটা আমি প্রথম কোথা থেকে টের পাই জানো? কোথা থেকে? আমি ছোট্ট করে জানতে চাই। বলে, পর্নো দেখে। সেখানে কোনো রেসিজম নেই। সাদা-কালো ভেদ নেই। এশিয়ান, আফ্রিকান, ইউরোশিয়ান, ইউরো-আমেরিকান ভেদ নেই। এমনকি ইনসেস্টেও। আমি বিষয়গুলো খুব খেয়াল করে দেখেছিলাম। শরীর ও জৈবিকতার বাধ্যগত কোনো স্বভাব নেই। এটা বোঝার শুরুটা সেখান থেকে, পরে আমি নানা কিছু দেখে যতটুকু জানা যায় পড়ে, এই সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি, যত তুমি তোমার শরীরকে জানবে, তত তুমি মুক্তির দিকে যাবে। ’

নিরুপমা একসময় খুব জেনচর্চা শুরু করে। ওর কাছে শুনেছিলাম জেনচর্চার জন্যই সে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিল। বলে, দুটি জিনিস আমার এত তীব্র—একটা হলো রাগ, আরেকটা হলো শরীরী ক্ষুধা। নইলে রাগের ঠেলায়, আর কামের জ্বালায় আমি মরেই যেতাম। মজার ব্যাপার হলো, এ দুটিকে আমি ‘কু’ থেকে ‘সু’র দিকে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিলাম। তাই হয়তো নিজে বেঁচেছি, আমার খপ্পর থেকে অন্যরাও বেঁচে গেছে। হি হি হি হি!’

—অন্যরা মানে?

—আছে। বলা যাবে না।

—তার মানে তোমার সঙ্গে যাদের সঙ্গ-অনুষঙ্গ হয়েছিল? মেহদাদ চোখে-মুখে একটা বিশেষ ভঙ্গি করে জানতে চায়।

নিরুপমা মেহদাদের বাহুতে একটা ঘুষি দিয়ে বলে, সেটা হলো কি না হলো তোমাকে বলব কেন?

 

দুই.

মাকে ফোন করতে ভয় করে। ফোন করলেই মা কথা বলতে বলতে কাঁদে। আর শুধুই বলে বাড়িতে চলে আসতে। ঢাকায় থেকে এসব চাকরিবাকরি করে কী হবে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আয়। যত দিন বেঁচে আছি, কাছে থাক। তারপর মরে গেলে যেখানে খুশি চলে যাবি, কেউ তোকে ধরে রাখবে না। বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠে। মায়ের এসব কথা এখন আর ভালো লাগে না। দেশে যা জমি-জায়গা আছে, তাতে আমাদের চিন্তা করার কিছু নেই। বড় ভাই একটা বেসরকারি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। আয়-রোজগার ব্যাপক। কয়েক শিফটে ছাত্র-ছাত্রী পড়ায়। সব মিলিয়ে তো মনে হয় শখানেক হবে। নিজের আলাদা বাড়ি করেছে ঝিনাইদহ শহরে। তাই বাড়ির জন্য আমি ভাবি না; যদিও বড় ভাইয়ের হাতটা তত খোলা না, খুব হিসাব করে চলেন।

আমি নিরুপমাকে এসব বলেছিলাম আমাদের প্রথম দিকে আলাপের সময়। নিরুপমা খুব সন্দীপনের কথা বলত। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর লেখা তাঁকে প্রবলভাবে শরীরসচেতন করেছে। এমন শরীরী লেখক কবি জীবনানন্দ দাশ ছাড়া বাংলায় আর নেই।

—এসব আমাকে বলে কী লাভ?

—আমি আমার মজায় বলি।

—কিন্তু তুমিই তো বলো, বলনেওয়ালা ঝুটা, শুননেওয়ালা সাচ।

—সেটা গল্প যে বলে, লেখে বা পড়ে, তাদের বেলায়।

বলেছিলাম, আমার দিন যাচ্ছে দৌড়ের ওপর। দৌড়ের ওপর কোনো ভালো কিছু নেওয়া ও দেওয়া যায় না। নিলেও চট করে দিয়ে দিতে হয়। ভারী লাগে। ছোট জিনিসও তখন ভারী লাগে।

—এখন তো না হয় দৌড়ের ওপর, আগে কী করেছ? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়? তোমরা মানুষ, না পাথর? পাথরের মতো জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে গড়িয়ে পড়েছ, তারপর গড়াতে গড়াতে একদিন কবরে উঠবে। এই তো জীবন।

আমি নিরুপমার কথা শুনে হো হো করে হাসি। ভালো বলেছ হে নিরুপমা, করিয়ো ক্ষমা। খুরশিদ আলমের সেই গানটা প্রায়ই গাইতাম নিরুপমার সঙ্গে দেখা ও আলাপ জমে ওঠার পর থেকে—‘ওগো নিরুপমা, করিয়ো ক্ষমা। ’ কারণ নিরুপমার সত্যিই রাগটা বেশি। এমন রাগী মেয়ে আমি কম দেখেছি। অন্তত আমার চেনা-পরিচয়ের ভেতরে।

নিরুপমা জানতে চায়, আর তোমার চেনা-পরিচিত লোকজন তোমার জন্য কী বলে? ঢাকা এসে তাহলে কেমন যোগাযোগ তৈরি করতে পারলে বলো তো? হয় তুমি ১০টা লোককে চিনবে, নয়তো তোমাকে ১০টা লোকে চিনবে। আর দুটি দিকে যদি এক হয়, মানে তুমিও দশজনকে চেনো, তোমাকেও দশজন চেনে, তাহলে তো কেল্লাফতে। আসলে যতই যা বলো, মানুষ মানুষের কাছে ছাড়া আর কোথাও কি ঠিক আশ্রয় পায়? বইপত্র, গান, সিনেমা-নাটকও আশ্রয় দেয়, কিন্তু সেটা হলো ধীরে। অনেক দিনের অভ্যাসের ফলে কেউ সেটা পায়। সাধারণ মানুষের জন্য মানুষ ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই। তবে সবচেয়ে ভালো হয় নিজেকেই নিজের আশ্রয় হিসেবে তৈরি করতে পারলে।

—কিন্তু চাকরির জন্য আর কারো কাছে যেতে ইচ্ছা করে না। কোথায় যে এমন বাধে! ঠিক তা-ও বুঝতে পারি না। যদিও জানি মানুষের কাছেই যেতে হবে। আমার পরিচিতরা কী আর বলবে। তুমি জানো চাকরির বাজার এখন ভীষণ খারাপ।

নিরুপমা বলে, চাকরির বাজার চিরকালই খারাপ। এর ভেতরেই মানুষ নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করে নেয়। তোমার মতো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না।

নিরুপমার কথা শুনে ওর সঙ্গে রাগের ঘটনাটা মনে পড়ে। সেটা আমার ওই সুযোগ তৈরির একটা ব্যাপার ছিল। আসলে আমি একটু মরিয়া ছিলাম। নিরুপমার জন্য প্রবল একটা আকর্ষণবোধ তো ছিল। মনের সঙ্গে সেটা শরীরেও ছড়ায়। তাই একদিন নিজের এসব কথা বলছিলাম। নিরুপমা চুপ করে শুনছিল। আমি ওর শরীর নিয়ে কোনো সংস্কার নেই জানি। সেই সাহসেই ভর দিয়ে বলি, আমার সঙ্গে শোবে, নিরুপমা? নিজের কণ্ঠটা এত করুণ আমার কাছে শোনায়নি কোনো দিনও। নিরুপমা শুনেই হি হি করে সে কী হাসি হাসে! আমার ইচ্ছা করে তক্ষুনি নিরুপমাকে জড়িয়ে ধরি। ধরে আচ্ছাসে চুমু খাই। তার বদলে নিরুপমার হাতটা শক্ত করে ধরি। বেশ কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে বলে, তোমার কী শোয়াটা খুব দরকার? এবার নিরুপমার কণ্ঠে কী যেন ছিল, তীক্ষ একটা কিছু। মনে হচ্ছিল, ওর এই অতি সাধারণ কথার ভেতরে এমন একটা ধার ছিল, আমাকে কেটে দুভাগ করে দিতে রামদার মতো উদ্যত হয়েছে। আমি একটু ভড়কে গিয়ে বলি, ঠিক তা না। একটু উতলেও উঠি। আর তক্ষুনি নিরুপমা রেগে ওঠে। সে কী রাগ! ভদ্র ভাষায় আমাকে এমন ধোয়া ধুয়েছিল সেদিন! আমি নিজেকে ধন্যবাদ দিই, নিজেকে সামাল দিতে পেরেছিলাম। নিরুপমা বলেছিল, এ জন্য আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ভেতরে ম্যান্দামারা এই আমতা আমতার জন্যই আসলে আমার চাকরিটা গেছে। প্রাণ খুলে বুক উজাড় করে জীবনে আমি কিছু করেছি? কোনো কিছু জোর গলায় বলার-চাওয়ার মুরোদ নেই। পুরুষ নামের কলঙ্ক... ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর ধাঁ করে উঠে চলে যায়। আমি আসছি! আমার তখন আবার খুব রাগ হয়। এমন রাগ হয় যে আমার, কোনো দিন ওর সঙ্গে কথা বলব না। বলিওনি। প্রায় কুড়ি দিন আমি ওকে কোনো ফোন করিনি। ওও আমাকে কোনো ফোন করেনি। আগে হলে হয়তো ফেসবুকে কিছু লিখতাম বা সে লিখত। তখন তো নিরুপমা নিজের ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভেট করে রেখেছে।

 

তিন.

চাকরি হারানোর চিঠি হাতে নিয়ে বিধ্বস্ত অবস্থার ভেতরে নিরুপমার সঙ্গে দেখা। সেদিন প্রথমে টিএসটির বাইরে চা খাই। পরে টিএসসির ভেতরে গিয়ে বসি। সেই আগের দিনের মতো দেয়ালে হেলান দিয়ে, একটা কোনা বেছে নিয়ে। হঠাৎ ঝড়ের ভেতর সেদিন এমন শান্ত হয়ে উঠি। নিরুপমা তো অদ্ভুত রকমের শান্ত ছিল সেদিন। সেদিন শেষ দিকে বলেছিল, তারও আজকে একটা ভয়ংকর দিন। কারণ তার বহু দিন ধরে যে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, সেটা সম্ভবত শেষ। সম্ভবত বলছি, কারণ অ্যাবসলিউট বলে কোনো কিছু আমি বিশ্বাস করি না। ভাঙা যেকোনো কিছুই আবার যেকোনো সময় যেকোনো মানুষের সঙ্গে নতুন করে শুরু হতে পারে। কারণ ওই যে তুমি জানো, মন তো মাটির হাঁড়ি বা কাচের পাত্র নয়। তার পরও আমি অনেক দিন ধরে আভাস পাচ্ছিলাম। আসলে আমাদের সম্পর্কটা মানসিকের চেয়ে শারীরিকই বেশি ছিল। দোষটা আমারই। আমিই শুরু থেকে এটা বলেছিলাম যে আমি ওই সব রোমান্টিকতায় বিশ্বাসী মানুষ নই। আমি গ্রাফিক্যালি, ফিজিক্যালি সব কিছু দেখি। যা এখানে এখন নেই, তা দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। ভাবালুতায় ভোগা মানুষ নই। কিন্তু দেখো, আমি তো কষ্ট পাচ্ছি! কথাটা বলতেই নিরুপমার চোখ দিয়ে হঠাৎ এক্কেবারে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢেকে ফেলে। সত্যিই আমি এই নিরুপমাকে চিনতাম না। ওর ভেতরে দুর্বলতা বলে কিছু ছিল না। অসম্ভব একটা তীব্রতা আর প্রখরতার মেয়ে। নাকটা কী তীক্ষ, চোখ, দৃষ্টিতে কী ধার! হাসিতে কথায়! সেই মেয়ে সেদিন অমন করল? আমি নিরুপমার হাতের ওপর হাত রাখতেও ভয় পাচ্ছিলাম। যদি রেগে যায়। কারণ কারো করুণা নিয়ে কোনো দিন বড় হয়নি সে। যা করেছে নিজের চেষ্টায় করেছে। নিজের জন্য সুযোগগুলো তৈরি করেছে। স্কুলজীবন থেকে কবিতা লিখত। গান গাইত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শুরুর দিনগুলোতে ছোটগল্প লিখতে শুরু করে। ওর ইচ্ছা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেটা চেয়েছিলেন, চাকমা উপন্যাস, তেমন একটা উপন্যাস লিখবে। যদিও জানে না সেটা সম্ভব কি না।

একদিন বলেছিল, আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি জানো। সেটা হলো প্রথম দিকে বিশ্বজুড়েই আধুনিক লেখার অন্যতম দিক ছিল পেটের খিদা। ন্যুট হামসুন যেমন। শরীরী খিদাও ছিল, কিন্তু অভাব-দারিদ্র্যটাই বেশি। এখন যেটা হয়েছে, সেটা হলো শরীরী খিদাটাই বেশি, দারিদ্র্য-অভাব যে নেই তা নয়। কিন্তু সেক্স ছাড়া তুমি আধুুনিক কোনো লেখাই পাবা না। তো, এই পেটের ক্ষুধা, চ্যাটের ক্ষুধা উতরে গিয়ে আমাদের লেখা যখন মস্তিষ্কের ক্ষুধা নিয়ে আলাপ করবে, সেটাই হলো আমাদের মানুষের উত্তরণের প্রধান লক্ষণ হয়ে দেখা দেবে। লেখাকে আলাপ ছাড়া আর কী বলা যায়? বাখতিন আসলে এক্কেবারে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিয়েছেন। ইলিয়াসের উপন্যাসের বাখতিনের তত্ত্বের কী সব লক্ষণ নিয়ে একটা গবেষণা প্রবন্ধের কথা বলে নিরুপমা। সেদিন দেখা হওয়ার সময় দেখি খুব মন দিয়ে টিএসসির বারান্দায় একটা থামের পাশে কী পড়ছে। আমি বসতে বসতে বলি, কী পড়ো? বলে, জটিল জিনিস।

এই মেয়ে সেদিন যেমন দুম করে কান্না শুরু করেছিল, তেমন মিনিটখানেকের ভেতরে টিস্যু দিয়ে মুখটুক মুছে ঠিক হয়েছিল; যদিও মুখটা তখনো লালাভ দেখাচ্ছিল।

আমরা দুজনেই যথেষ্ট বড় হয়েছি। তা-ও আমরা কী বাচ্চা, তাই না! আসলে বিপদে পড়লে সবাই প্রায় বাচ্চা হয়ে যাই। এত দ্রুত একটা আশ্রয় পেতে চাই, কোথাও কারো কাছে, তাই না? চলো উঠি। সেদিন আর কোনো কথা হয়নি। নিরুপমা রিকশায় ওঠার সময় বলে, আমি ফোন করব। ঠিক আছে। ভালো থেকো।

নিরুপমা চলে যাওয়ার পর নির্ভার মনে হয়। কেমন যেন শান্ত লাগে। ঝড়ের পর সব যেমন ফের শান্ত হয়ে যায়, তেমন একটা শান্তি। মনে হলো সত্যি, সুখের ভেতরে দিয়ে নয়, বেদনার ভেতর দিয়ে মানুষ অন্য মানুষের গভীর গহনের মানুষটিকে পায়, এমনকি নিজের ভেতরে থাকা গহিন মানুষটাকেও। নিরুপমা আমাকে অনেকবারই বলেছে, তুমি যথেষ্ট সেনসিটিভ মানুষ। কিন্তু শিল্প-সাহিত্য নিয়ে তোমার কোনো আগ্রহ নেই। তোমার ওই সেনসিটিভিটির জন্যই তোমাকে ভালো লাগে। আর রাগ লাগে তোমার কোনো আগ্রহ নেই আর্টের প্রতি। আর্টের প্রতিও নেই, ধর্মের প্রতিও নেই, বিজ্ঞানের প্রতিও নেই। তুমি কী নিয়ে বাঁচো বল তো?

আমি হেসে বলেছিলাম, চাকরি নিয়ে। সাধারণ মানুষের এ ছাড়া আছে কী?

—কিন্তু সাধারণ মানুষের তো ধর্মটা থাকে। তোমার তো তা-ও নেই।

—তার মানে আমি তো ধর্মহীন মানুষ নই।

—বাব্বা, এই টুকুই কিন্তু অনেক। তুমি শুধু সেসসিটিভই নও, সেনসিবল মানুষও।

আমি বলি, এসব তো তোমার কাছেই শিখেছি। শুনেই নিরুপমা আমার বাহুতে ঘুষি মারে।

 

 

চার.

 

ঠিক তিন দিনের মাথায় ফোন করে নিরুপমা। হ্যালো, কেমন আছো? কণ্ঠটায় এমন একটা খুশির আভাস ছিল, যেন হাসতে হাসতে কথা বলছে।

—এই তো আছি। ভালোই আছি। এখন পর্যন্ত ভালো আছি।

—তোমার মন ভালো?

—ছিল না। এইমাত্র হয়ে গেল।

—ঢং। যা হোক, শোনো, তুমি কোথায় আছ?

—কেন?

—একটু আসতে পারবে?

—সদরঘাটে।

—সদরঘাটে! সে কি, কেন?

—আমি একটু বরিশাল যাচ্ছি। তুমি অল্প সময়ের ভেতরে যা যা নিয়ে পারো রওনা দাও। আর কোনো কথা নয়। আমি অপেক্ষা করছি। কাম শার্প। ওকে। রাখছি।

আমি একটু হতভম্ব কি স্তম্ভিত না ঠিক কী তখন বুঝতে পারি না। আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। যদিও কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো কিছু ঘটেনি পরে। সারা রাত আমরা গল্প করতে করতে কাটিয়ে দিয়েছি। শেষরাতের দিকে একটু ঘুমিয়েছি। দুটি খাট দুপাশে। একেবারে ভোরবেলা লঞ্চ থামলে আমার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলতেই দেখি, নিরুপমা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখভরা রহস্য-কৌতুক। আমি তাকাতেই সে বিছানা থেকে নেমে সোজা আমার বুকের ওপর ওঠে। অনেকক্ষণ ধরে আমরা চুমু খাই। আমার সাহস হয় না নিরুপমার বুকে বা পাছায় হাত দিতে। ওকে দলতে-পিষতে কোথায় যেন একটা বাধা পাই। শুধু পিঠ জড়িয়ে ধরে আমি চুমুর উত্তর দিতে থাকি। নিরুপমাকে সেদিন চাইতে পারতাম। কিন্তু চাইনি বলেই পরে নিবিড় করে পাওয়া হয়েছে বোধ হয়। কিন্তু আমার নিজের জন্য তো একটা কাজ দরকার। হয় হচ্ছে হবে করে করে আর তার কোনো দেখা নেই। প্রায়ই মনে হয়, আমার হয়তো আর কিছু চাওয়ার নেই। যা কিছু একজন মানুষ সুখের জন্য পেতে পারে, তার যেন সবই পেয়ে গেছি। সুখে থাকলে যেমন কিছু করা যায় না, আমার সেই দশা। নিরুপমাকে বলেওছি, তোমার জন্যই তো আমার মনে হয় কিছু করা হবে না?

—কেন? আমি কী করলাম?

আমি গান গেয়ে উঠে নিরুপমার দিকে এগিয়ে যাই। আমি বাহু বাড়িয়ে দিতে সে-ও আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমরা একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে গান গাইতে থাকি—‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে/ওগো বন্ধু পাশে থেকো, পাশে থেকো। ’

নিরুপমা আমাকে নিয়ে দুই মাসের অজ্ঞাতবাসে চলে গিয়েছিল। বসিলায় একটা বাসা ভাড়া নিয়ে হাওয়ায় হাওয়ায় তিন মাস পার হয়ে যায়। তারপর একদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে নিরুপমা আমাকে একটা চিঠি দেয়। চিঠিটা তার চাকরিচ্যুত হওয়ার। দিয়ে বলে, অফিস পলিটিকস। আমাকে, শাহনাজদি আর আফরোজাদিকে করেছে। ওরা দুজন তো মামলা করতে চায়।

—এখন?

—চিন্তা কোরো না।

পরের দিন সকালে খাবার টেবিলে একটা চিরকুট চাপা দেওয়া। নিরুপমা লিখেছে, ‘আমি কদিনের জন্য রাঙামাটি যাচ্ছি। ফিরব দ্রুতই। চিন্তা কোরো না। ওয়ার্ডরোবে একটা চেক আছে। কুড়ি হাজার টাকার। আপাতত এটা দিয়ে বাড়িভাড়া ও নিজের খরচ চালাও। আর কদিনের জন্য আমাকে কোনো ফোন কোরো না। আবারও বলি, চিন্তা কোরো না। আমিই সময়মতো ফোন করব। আমি ফিরে আসব, তোমার কাছেই ফিরে আসব। ’

চাকরি চলে যাওয়ার সময় যেমন মনে হয়েছিল, ঠিক তেমন করে বুকটা থমথম করে ওঠে।

আমি কিছুক্ষণ বজ্রাহতের মতো বসে থাকি। যন্ত্রচালিতের মতো ওকে ফোন করি। শুনতে হয়, ‘এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। ’

ভেতরটা এমন চটচটে হয়ে আছে। রাতটা একেবারে রসে চুবিয়ে গিয়েছিল। আশ্চর্য মেয়ে! কে বলবে সে কোনো বিপদে আছে!

বাথরুমে যাই নিজের চেহারাটা দেখতে। তখন আয়নার ভেতরে থাকা লোকটা ভুরু নাচিয়ে প্রশ্ন করে, নাম কী?

আমরা কথা বলতে থাকি।


মন্তব্য