kalerkantho


উ প ন্যা স

কোথায় আমার হৃদয়পুর

ইমদাদুল হক মিলন

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



কোথায় আমার হৃদয়পুর

অঙ্কন : ধ্রুব এষ

এতিমখানার শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ থেকে আমি একটা পাগলাগারদে এসে পড়েছি।

লেবু চেয়ারম্যানের বাড়িটা আসলেই একটা পাগলাগারদ।

মিনি পাগলাগারদ। চেয়ারম্যানের মেয়েটি, অর্থাৎ আমার ছাত্রীটি, বেলি, সুমাইয়া জাহান, পুরোপুরিই পাগল। একটা কাজের মেয়ে আছে, সুন্দরী তার নাম, সেটাও আধাপাগল। কথা শুরু করলে আর থামে না। ‘বিঘ্ন’ বলাটা চেয়ারম্যান সাহেবের মুদ্রাদোষ। তাঁকেও কিঞ্চিৎ পাগল মনে হয় আমার। সুস্থ স্বাভাবিক স্নিগ্ধ মানুষ হচ্ছেন বাড়ির কর্ত্রী। চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী, বেলির মা। আমি আসার তিন-চার দিন পর কাজের লোক হিসেবে ঢুকেছে একটা দাগি চোর। সেটির নাম বদরু। বয়স তেমন বেশি না। তবে অতি ফাজিল।

বেলিকে লেখাপড়া করানোর ফাঁকে তাকে মানসিক চিকিৎসা দেওয়াও আমার কাজ। যদিও মানসিক চিকিৎসার ‘ম’ও আমি জানি না। তবু ভান করছি যে মানুষের মন আমি খুবই ভালো বুঝি। ছোটখাটো ট্রিটমেন্টও জানি। ধীরে ধীরে বেলিকে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে আমি ফিরিয়ে আনতে পারব।

এটা স্রেফ চাপাবাজি। পুরোপুরি একটা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে এই বাড়িতে আমি কয়েক দিন ধরে আছি। আছি অবশ্য রাজার হালে। থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত অসাধারণ। চেয়ারম্যান সাহেব থেকে শুরু করে তাঁর চারপাশের সবাই খুবই শ্রদ্ধা সম্মান করে।

বেলি রহস্যময় চরিত্র। সে আসলে পাগল, নাকি পাগলের ভান করছে, এটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যি সে পাগল; আবার মনে হয়, না, সে পাগল না, ভান করছে। এত চমৎকার করে কথা বলে মাঝে মাঝে! কী সুন্দর উচ্চারণ! ইংরেজি উচ্চারণও দারুণ। দেখতে তো অসামান্যসুন্দর। আর গানের গলা কী, একদিন তার গলায় কয়েক লাইন রবীন্দ্রসংগীত শুনে আমি শুধু মুগ্ধ না, বিস্মিত হয়েছিলাম। প্রায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

এ রকম একটা মেয়ে পাগল?

মনোরোগ চিকিৎসার ভান ধরে বাড়ির কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। চেয়ারম্যান সাহেব, বেলির মা, সুন্দরী আর ওই বদরু চোরা। বদরু কোনো তথ্য দিতে পারল না। শুধু বলল, লেখাপড়া করতে করতে বেলির মাথা ফট্টিনাইন হয়ে গেছে। সুন্দরীও প্রায় তা-ই বলল। লেখাপড়া, গান-বাজনা—এসবের কারণে বেলি এলোমেলো হয়ে গেছে। চেয়ারম্যান সাহেব, তাঁর স্ত্রী—সবাই একই রকম কথা বলছেন। কারো কথাই আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সবাই কী যেন একটা চেপে যাচ্ছে। কোথায় যেন বেলিকে নিয়ে একটা রহস্য আছে। সেই রহস্যের ধার দিয়েও যাচ্ছে না কেউ।

বিষয়টা নিয়ে এখনো বেলির সঙ্গে আমি কথা বলিনি। এমনিতে তার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে, অনেক পাগলামি সে আমার সঙ্গে করেছে, এই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছে, এই বলছে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায়। গান গাইল অসাধারণ কণ্ঠে, তারপর এমন করে কাঁদল, বেলির কান্না দেখে আমার বুক তোলপাড় করে উঠেছিল। সত্যি, মানুষের এ রকম কান্না আমি কখনো দেখিনি। কী কষ্টে অমন করে কাঁদল মেয়েটি?

আমার সব কিছু জানতে ইচ্ছা করে।

এই নিয়ে বেলির সঙ্গে আমি কথা বলব। কতটা লাভ হবে, কতটা জানতে পারব তার মনের কথা, জানি না। হয়তো আমার প্রশ্ন শুনে এলোমেলো কথা বলবে, হাসবে, আমাকে ‘তুমি তুমি’ করে বলবে। তবু চেষ্টা আমি করে যাব। নজরুল ইসলাম নামের যে শিক্ষকের বেলির গৃহশিক্ষক আর মনোচিকিৎসক হয়ে এই বাড়িতে আসার কথা ছিল, তিনি বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। তাঁর জায়গায় আমি নজরুল ইসলাম হয়ে এই বাড়িতে ঢুকেছি। ইচ্ছা করে অবশ্য ঢুকিনি। চেয়ারম্যান সাহেবের লোকেরা, ওই মতি নবু রুস্তম রমজান আমাকে নজরুল মাস্টার ভেবে নিয়ে এসেছে। আমি যেহেতু নিরুদ্দেশযাত্রায় বেরিয়েছিলাম, চান্সটা সঙ্গে সঙ্গে নিলাম। নজরুল মাস্টার হয়ে এই বাড়িতে এসে ঢুকলাম। ঢোকার পর ধীরে ধীরে দেখছি আমি বেলির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছি। এই বয়সী মেয়েটি কেন পাগল হয়েছে, সেই রহস্য উন্মোচন করার জন্য অদ্ভুত এক নেশা তৈরি হয়েছে আমার ভেতরে। সারাক্ষণ সেই নেশায় বুঁদ হয়ে আছি আমি...

গত রাতে ডায়েরিতে এসব লিখেছি। সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর মনে হয়েছে, আজ বাড়ি থেকে বেরোব। যে চারজন লোক আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে, তারা সারাক্ষণ ঘিরে রাখে চেয়ারম্যান সাহেবকে। তাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। তবে এই বাড়িতে বলা যাবে না। আমি যাব তাদের বাড়িতে। কথা বলে দেখি কেউ কোনো তথ্য দিতে পারে কি না। বেলির পাগল হওয়ার পেছনের ঘটনা আমাকে জানতেই হবে।

সেদিন বেলি আমাকে ঠাট্টা করে বলল, সে বিয়ে করেছিল। স্বামী মারা গেছে। সে এখন বিধবা। বলে খুব হাসল। পাগলের হাসি। তার পরও হাসির শব্দটা যে কী সুন্দর! একেবারে জলতরঙ্গের মতো।

এই মেয়ে পাগল?

কেন?

সাত-আট মাস আগে নাকি সে পাগল হয়েছে।

কেন?

আজ সকালে সুন্দরী আমার চা-নাশতা দিয়ে গেছে নিঃশব্দে। একটাও কথা বলেনি। তাতে আমি একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। মেয়েটা এত কথা বলে! কানের পোকা একেবারে খসিয়ে ফেলে। সে আসার আগে আমি একটু অস্বস্তিতে থাকি। চলে গেলে স্বস্তি ফেরে।

আজ নিঃশব্দে চলে যাওয়ার ফলে স্বস্তিতেই নাশতা করলাম। কিন্তু চায়ের মগ হাতে নেওয়ার সময় সুন্দরী এসে হাজির। চোখে-মুখে ভয়াবহ উদ্বেগ। সে স্যার বলতে পারে না, বলে সার। প্রথম দিন তো স্যারের উচ্চারণ করেছিল ভয়াবহ। আমাকে ‘ষাঁড়’ বানিয়ে দিয়েছিল। যা হোক, এখন এসে বলল, সার, সারগো, সব্বনাশ হইয়া গেছে, সার।

চায়ের মগ ধরা হলো না। আমার হাত থেমে গেল। কী হয়েছে?

আগে চার মগ ধরেন। আপনে চা খান, আমি কই।

মগ ধরলাম। এবার বলো।

চায়ে চুমুক দেন, তার বাদে কইতাছি।

চায়ে চুমুক দিলাম। এই যে চায়ে চুমুক দিয়েছি, এবার বলো।

ওই দিন আপনে আর আমি যেই কথা কইছি, বেবাক কথা বেলি আফায় শোনছে।

তুমি-আমি কী কথা বলেছি?

ওই যে পেরেম-পিরিতির কথা কইলেন?

আমি অবাক। প্রেম-পিরিতির কথা মানে?

সুন্দরী খুবই লাজুক একটা ভঙ্গি করল। না না, আমার লগে আপনের পেরেম-পিরিতি, ওইটা কই নাই।

তবে?

ওই যে সেদিন আপনে আমারে জিজ্ঞাসা করলেন না, বেলি আফায় কেউর লগে ওইটা করে কি না...

আমি গম্ভীর। বুঝেছি। তোমার সঙ্গে বেলির ব্যাপারে যেসব কথা বলেছি সেসব কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে সে শুনেছে। এই তো?

সুন্দরী কেলানো হাসিটা হাসল। ঠিক, একদম ঠিক।

তাতে সর্বনাশের কী হলো?

এইডাই তো সব্বনাইশা কথা। এই যে ধরেন আমি আপনার লগে কথা কইতাছি, এইডা যুদি কেউ শুইনা ফালায়...

শুনলে অসুবিধা কী? আমরা তো কোনো গোপন কথা বলছি না।

গোপন কথা না হোক, অন্যে শোনলেই সব্বনাশ!

কেন?

আমি একটা যুবতী মাইয়া, আপনে একটা যুবতী, ধুরো, যুবক পোলা, আমগো কথা অন্যের শোনন তো ভালো না।

চা শেষ করে মগটা আমি সুন্দরীর হাতে ফেরত দিলাম। মেজাজ খুবই খারাপ হয়েছে। ইস্, তুমি এত কথা বলো!

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

সুন্দরীর স্বভাব হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের পেছনে কথা সে একটা বলবেই। এখনো বলল, আমি বেশি কথা কইলে তোর কি রে, বলদা বেডা?

কথাটা পরিষ্কার শুনতে পেলাম। হাসিও পেল খুব, কিন্তু ফিরে তাকালাম না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। গ্রামটা একটু ঘুরে দেখি। মতি নবু রুস্তম রমজান—এদের যাকে যাকে পাই তাদের সঙ্গে একটু কথা বলি। দেখি বেলি-রহস্য কতটা উন্মোচন করা যায়।

রাস্তার বাঁকে একটা চা পান বিড়ি সিগ্রেটের দোকান। দোকানে ছোট টিভি আছে, একটা ফ্রিজ আছে। কোল্ড ড্রিংকস, ঠাণ্ডা পানি—সবই পাওয়া যায়। চানাচুরের প্যাকেট ঝুলছে, চিপসের প্যাকেট ঝুলছে। দুজন লোক বসে চা খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। টিভিতে জসীম অভিনীত বাংলা সিনেমা চলছে। নায়িকাটাকে চিনতে পারলাম না।

আমি গিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। রমজান মিয়ার বাড়িটা কোন দিকে, ভাই?

দোকানি বলল, কোন রমজান?

সেটা বুঝিয়ে বলা মুশকিল। আমি তার পুরো নাম জানি না।

একজন কাস্টমার বলল, রমজান মাতাব্বর?

মাতবর কি না তা-ও জানি না।

অন্য যুবকমতো কাস্টমারটি বলল, লেবু চেরম্যানের চামচা?

‘চামচা’ শব্দটা শুনে আমার হাসি পেল, কিন্তু হাসলাম না। হ্যাঁ হ্যাঁ, চেয়ারম্যান সাহেবের লোক।

দোকানি বলল, এইটা আগে কইবেন না? এইতো কাছেই বাড়ি।

কোন দিকটায়, একটু বলবেন? আমি যাব।

তার আগে আপনের পরিচয়টা দেন। আপনেরে এই গেরামের লোক মনে হইতাছে না। আগে কোনো দিন দেখি নাই।

দুজন কাস্টমারই পয়সা দিয়ে চলে গেল।

আমি বললাম, ভাই, আমি গ্রামের লোক না। চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে মাস্টার হয়ে আসছি।

আমার কথা শুনে দোকানি লোকটা এত ব্যস্ত হলো, লাফ দিয়ে টংঘরের দোকান থেকে নামল। দোকানের সামনের বেঞ্চ গামছা দিয়ে মুছে বলল, আগে বলবেন না, আপনে চেরম্যান সাবের লোক। বসেন বসেন। চা খান এক কাপ।

বসছি, কিন্তু চা খাব না।

ক্যান খাইবেন না, ক্যান?

চা খেয়ে বেরিয়েছি।

তা-ও খান এক কাপ। আমি বহুত ভালো চা বানাই। দেশগেরামে আমার চায়ের বহুত নাম। খান এক কাপ। তার বাদে রমজান মাতাব্বরের বাড়ি দেখাইয়া দিমুনে।

আচ্ছা, ঠিক আছে।

সত্যি অপূর্ব চা। চা খেয়ে মন ভরে গেল। বললাম, ভাই, প্রথমে আপনার চা আমি খেতেই চাইনি। এখন দেখছি দারুণ চা আপনার। দারুণ।

দশ টাকার একটা নোট বের করে তার হাতে দিতে গেলাম। সে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, চায়ের দাম মাস্টার সাব আমি নিব না।

বলেন কি! কেন?

চা আপনে খাইতেই চান নাই। আমি জোর কইরা খাওয়াইছি। এই চায়ের দাম আমি নিব না।

এটা ঠিক হবে না।

অবশ্যই ঠিক হইব। আইজ পয়লা দিন। আপনে আমার মেহমান। এই বজলুর দোকানে এরপর যেদিন চা খাইতে আসবেন, ওই দিন দাম দিয়েন।

আচ্ছা, ঠিক আছে ভাই। তবে আমি মাঝে মাঝেই আপনার দোকানে চা খেতে আসব।

অবশ্যই আসবেন মাস্টার সাব, অবশ্যই আসবেন।

তাহলে এখন রমজান মাতাব্বরের বাড়িটা...

বজলু বিনীত গলায় বলল, আমি মাস্টার সাব একলা দোকান চালাই। নাইলে নিজে গিয়া আপনেরে রমজান মাতাব্বরের বাড়ি দেখাইয়া দিতাম। সেইটা পারলাম না। কিছু মনে কইরেন না।

আরে না না।

বজলু আঙুল তুলে রমজান মাতবরের বাড়িটা দেখাল। ওই যে, ওই দিকে শেষ বাড়িটা দেখতাছেন, ওইটাই রমজান মাতাব্বরের বাড়ি।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

আমি রমজান মাতবরের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।

রমজানের বাড়িটা গ্রামের সামান্য সচ্ছল গৃহস্থবাড়ি। গাছপালা আছে বেশ, বাঁশঝাড় আছে। চৌচালা টিনের বড় একটা ঘর। আর দুটো ঘর মাঝারি সাইজের। জামগাছতলায় রান্নাঘর। বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা খড়ের গাদা। নিকানো, পরিচ্ছন্ন উঠান। বারবাড়ি থেকে ভেতরবাড়িতে ঢোকার মুখে টিনের একটুখানি আড়াল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ডাকলাম, রমজান সাহেব, বাড়িতে আছেন নাকি?

রমজান মাতবর আর তাঁর স্ত্রী রান্নাঘরের দিকে বসে কথা বলছিলেন। আমার গলা শুনে ভদ্রমহিলা বোধ হয় দৌড়ে ঘরে ঢুকলেন। গ্রাম এলাকার মহিলারা যা করে আর কি!

রমজান মাতবর বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখে বেশ অবাক। মাস্টার সাব, আপনে? আপনে আমার বাড়িতে? আসেন, আসেন।

আমি তাঁর পেছন পেছন বাড়িতে ঢুকলাম।

রমজান মাতবর ছোট ঘর দুটোর একটায় ঢুকে দুটো সবুজ রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে এলেন। ঘরের সামনের ছায়ায় চেয়ার রেখে বললেন, বসেন মাস্টার সাব, বসেন।

আমি একটা চেয়ারে বসলাম। আপনি বসুন।

তা তো বসুমই। এই জইন্যই দুইটা চেয়ার আনলাম।

তিনি আমার মুখোমুখি বসলেন। বলেন মাস্টার সাব, বলেন, কী মনে কইরা আমার বাড়িতে আসলেন?

আপনার সঙ্গে কথা বলা দরকার।

কী বিষয়ে বলেন তো? তার আগে চা খান, মাস্টার সাব। আছিয়া...

বুঝলাম তিনি তাঁর স্ত্রীকে ডাকলেন। বাড়িতে আর কেউ নেই নাকি? শুধু দুজনই মানুষ?

এসব প্রশ্ন করলাম না। বললাম, না না, চা খাব না। বজলুর দোকান থেকে চা খেয়ে এসেছি। তার আগে বাড়িতেও খেয়েছি।

রমজান হাসলেন। তাইলে আর কি? তয় বলেন দেখি, কী কথা বলবার জইন্য কষ্ট কইরা আমার বাড়িতে আসলেন?

মোটেই কষ্ট করিনি। প্রথম কথা হলো, এই গ্রামেই যখন থাকব, আপনাদের প্রত্যেকের সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গতা থাকা দরকার। এখন তো আপনারাই আমার আত্মীয়।

রমজান মুগ্ধ। এইটা দামি কথা কইছেন, মাস্টার সাব। হুইনা খুব ভালো লাগল।

আমি হাসিমুখে বললাম, আপনি তো জানেনই চেয়ারম্যান সাহেব কী জন্য আমাকে তাঁর বাড়িতে আনিয়েছেন।

তা জানি। আমাদের চাইরজনরে না বইলা চেয়ারম্যান সাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। বেলি আম্মাজানের এই দশার জইন্যই আপনেরে তিনি আনাইছেন।

কিন্তু বেলির ব্যাপারে তাঁরা কেউ আমাকে তেমন  সাহায্য করছেন না।

কী রকম সাহায্য?

না মানে, বেলি কেন পাগল হলো, ঘটনা কী, কিছুই আমি জানতে পারছি না। রোগের কারণ না জানলে রোগীর চিকিৎসা করা মুশকিল।

রমজান একটু যেন চিন্তিত। আপনি কি এই সব জানার জইন্য আমার কাছে আসছেন?

না মানে, আমাকে একটু  সাহায্য করুন। আপনার যদি জানা থাকে বেলি কী কারণে পাগল হলো...

এ সময় রমজান মাতবরের স্ত্রী আছিয়া বড় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরনে মোটামুটি ভালোই একটা সুতি শাড়ি। মধ্যবয়সী মহিলা। একটু ভারীর দিকে শরীর। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। চেহারায় বেশ একটা মা মা ভাব। আমার দিকে তাকিয়ে সরল গলায় বললেন, মাস্টার সাব, মানুষ পাগল হয় কোনো না কোনো দুঃখে। কোনো না কোনো আঘাতে।

রমজান যেন একটু বিরক্ত হলেন। তুমি আবার এর মইধ্যে আসলা ক্যান?

ভদ্রমহিলাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। তাঁর কথাও খুব মূল্যবান। বললাম, না না, তাঁকে বলতে দিন, রমজান সাহেব। খুব ভালো কথা বলেছেন।

আমি আছিয়ার দিকে তাকালাম। আপনি বলুন।

ভদ্রমহিলা বড় ঘরের পৈঠায় বসলেন। আমার চাইরটা ছেলে হইছিল, মাস্টার সাব। বাঁইচা থাকলে দশ বারো চৌদ্দ ষোলো হইত একেকজনের বয়স। এই যে আমারে আপনে দেখতাছেন, আমিও আসলে পাগল। ছেলেদের জইন্য পাগল। দুনিয়ার বেবাক মানুষই কোনো না কোনো কারণে পাগল। কেউ টাকার পাগল, কেউ ক্ষমতার পাগল, কেউ কামের পাগল, কেউ দুঃখে পাগল। কারো পাগলামি দেখা যায়, কারোটা দেখা যায় না।

আমি বিস্মিত। আপনি তো অসাধারণ কথা বললেন। দারুণ, দারুণ!

রমজান মাতবর বললেন, জি মাস্টার সাব, সে কথা ভালো বলে। আমগো কপাল সত্যই খারাপ। পোলা চাইরটা বাঁচল না। আছিয়া পোলাপান এত ভালোবাসে, পোলাপানের জইন্য পাগল।

আছিয়া বললেন, মাস্টার সাব, আমার কথা বলারও মানুষ নাই। সবার লগে কথা কইতেও আমার ভালো লাগে না। আপনেরে দেইখা মনে হইল, আপনের লগে একটু কথা কই।

জি জি, বলুন। আপনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে। বলুন।

মাতবরে তো চেরম্যানের লগে দিন কাটায়, আমি থাকি একলা বাড়িতে। আমার তখন খালি মনে হয়, আমার ছেলে চাইরটা মরে নাই। কোথায় য্যান লুকাইয়া আছে! আতকা আইসা আমারে মা মা বইলা ডাকব।

ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আমি অপেক্ষায় থাকি, আমার পোলারা আসে না।

রমজান বললেন, আহা, আবার কান্নাকাটি লাগাইলা?

বললাম, না না, তাঁকে কিছু বলবেন না। মায়ের মন, কাঁদবেই।

আমি তখন উদাস হয়ে আছি। আমার মনে পড়ছে এতিমখানায় ফেলে আসা আমার পিচ্চিবাহিনীর কথা। বিলুরা তো চারজনই ছিল দলে...

রমজান বললেন, মাস্টার সাব, আপনে যেই কাজে আসলেন সেই কাজ হইল না। আসলে কথা ওই একটাই, চেরম্যান সাবের মাইয়াটা আতকা পাগল হইয়া গেছে। ক্যান এমুন হইল, আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না।

রমজান উঠলেন। চলেন যাই। আমিও চেরম্যানবাড়িতেই যামু।

আমিও উঠলাম। আছিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, যাই।

ভদ্রমহিলা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন। যাই বলতে হয় না, বাজান। বলতে হয়, আসি। যাই বললে সে আর ফিরা আসে না।

এই কথাটাও আমার খুব ভালো লাগল। হাসিমুখে বললাম, আসি।

আমি বেরিয়ে আসছি, দেখি আছিয়া অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কী যে মায়া তাঁর চোখে!

রাস্তায় বেরিয়ে রমজান বললেন, আপনেরে একটা কথা বলতে চাই, মাস্টার সাব।

জি, বলুন।

আমি আপনের লগে চেরম্যানবাড়িতে যাইতে চাই না।

কেন বলুন তো?

তিনি এইটা ভালো চোখে দেখবেন না।

এটা ভালো চোখে না দেখার কী আছে?

সব কথা আমি আপনেরে বুঝাইয়া বলতে পারব না।

কিন্তু সেদিন তো আপনারাই আমাকে স্টেশন থেকে আনলেন।

সেইটা আমরা নিজ থিকা যাই নাই। চেরম্যান সাবে পাঠাইছেন, গেছি। তাঁর কথা ছাড়া আমরা কেউ কিছু করতে পারি না।

বুঝেছি।

আরেকটা কথা। আপনে যে আমার বাড়িতে আসছেন, এইটা শোনলেও চেরম্যান সাবে মাইন্ড করব।

কেন?

আবার আগের কথাটাই কই। সব কথা আপনেরে আমি বুঝাইয়া বলতে পারব না। চেরম্যানবাড়িতে থাকতে থাকতে আপনি নিজেই অনেক কিছু বুইঝা যাইবেন।

আমি চিন্তিত হলাম। তার মানে আমি আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম এটা চেয়ারম্যান সাহেব বা তাঁর বাড়ির অন্য কাউকে জানানো যাবে না?

না জানাইলে আমার উপকার হয়।

আর যদি জানে?

আমার লগে রাগ করব।

কিন্তু আপনি তো আমাকে ডেকে নেননি। আমি নিজেই গেছি।

কোনো কথাই তিনি শোনবেন না। আর যাতে আমার বাড়িতে না যান, চেরম্যান সাব আমারে বলবেন সেই ব্যবস্থা নিতে।

বলেন কি!

জি। তিনি বলবেন, আমি য্যান সোজাসুজি আপনেরে বইলা দেই, আমার বাড়িতে আইসেন না।

কিন্তু আপনার স্ত্রী আমাকে বাজান বলেছেন, তাঁকে আমার মায়ের মতো মনে হয়েছে, আমার তো তাঁর কাছে যেতে ইচ্ছা করবে।

না গেলে আমার উপকার হইব।

আমি অবাক হয়ে রমজান মাতবরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

রমজান বললেন, আমি আগে চইলা যাই। আপনে পরে আসেন, মাস্টার সাব।

আনমনা গলায় বললাম, ঠিক আছে।

রমজান দ্রুত হেঁটে গাছপালার আড়ালে চলে গেলেন।

দুই.

 

বেলির পাগল হওয়ার রহস্য ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল।

আচমকা বেশ বড় একদিকে বাঁক নিল সেই রহস্য। আমি আমার ঘরে বসে রমজান মাতবরের স্ত্রীর কথা ভাবছিলাম। আছিয়া তাঁর নাম। অতি সাধারণ গ্রাম্য মহিলা। খুব মায়া লাগল তাঁর জন্য আমার। কী অদ্ভুত মাতৃত্ববোধ! কতকাল আগে মারা যাওয়া ছেলেদের কথা ভেবে এখনো কাঁদেন। কী সুন্দর করে মানুষের পাগল হওয়া নিয়ে কথা বললেন! বললেন গ্রাম্য ভাষায়, তাঁর মতো করে, কিন্তু একেবারে ফিলোসফারদের মতো কথা। তাঁর কথা শুনতে শুনতে নিজের জীবনের কথা মনে হচ্ছিল আমার।

মাকে নিয়ে আমার কোনো আবেগ-অনুভূতি নেই। বাবাকে নিয়ে তো নয়ই। বরং সেই না-দেখা, না-জানা অচেনা বাবাটি সম্পর্কে অদ্ভুত এক ঘৃণাবোধ আছে। নিশ্চয় সে আমার মায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল।

তবে বাবা কেমন হওয়া উচিত, প্রকৃত বাবা সন্তানের জন্য কী ভাবেন, কী করেন—তেমন একজন আমি পেয়েছিলাম। এতিমখানার হাসান স্যার, যিনি এক দিনের নবজাতক আমাকে এতিমখানার গেট থেকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন। এতটা বড় করেছেন আমাকে। তারপর আমার ভালোর জন্য কিছুটা নিষ্ঠুর আচরণ করে আমাকে এতিমখানা থেকে বের করে দিয়েছেন, যেন আমি আমার জীবনের পথটা বের করে নিতে পারি।

এসব ভেবে একটু হাসিও পেল। জীবনের পথ বের করতে গিয়েই তো আজ আমার এই দশা। একটা পাগলাগারদে এসে ঢুকেছি।

রমজান মাতবরের স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে নিজের না-দেখা, না-চেনা মায়ের কথা মনে এলো আমার। আমাকে যে মা জন্ম দিয়েছিলেন, কেমন ছিলেন তিনি দেখতে? পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করেছিল আমাকে এতিমখানার গেটে ফেলে যেতে। কিন্তু তিনি কি ভুলতে পেরেছেন তাঁর সেই অসহায় শিশুটিকে? তিনিও কি গোপনে সারাটা জীবন কাঁদেননি আমার জন্য? আমার সেই দুঃখিনী মা কি বেঁচে আছেন? থাকলে কোথায় আছেন, কেমন আছেন? কী অদ্ভুত আমার নিয়তি, আমার মাকে কোনো দিন আমি দেখিনি, কোনো দিন দেখবও না। মা-ও দেখেননি আমাকে, আর দেখবেনও না। একই পৃথিবীতে বেঁচে থাকলাম আমরা, মা জানলেন না তাঁর ছেলের কথা, ছেলে জানল না মায়ের কথা!

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

ঠিক তখনই চেয়ারম্যান সাহেব এসে আমার ঘরে ঢুকলেন। চোখে-মুখে আতঙ্ক। মাস্টার সাব, ঘটনা শুনছেন?

না তো। কী হয়েছে?

আমার কন্যা তিন দিন ধইরা ঘুম থিকাই ওঠে না। খালি ঘুমায়, খালি ঘুমায়।

বলেন কি?

জি। আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড। সে ক্যান এইভাবে ঘুমাইতাছে?

এর মধ্যে ওঠেইনি?

না।

খাওয়াদাওয়া?

ঘুমের তালে ওর মায় মনে হয় কিছু খাওয়াইছে। চোখ বন্ধ কইরাই খাইছে, খাইয়াই আবার ঘুম।

আশ্চর্য ব্যাপার। স্লিপিং পিল খেয়েছে নাকি?

হইতে পারে।

ডাক্তার ডাকবেন?

ডাক্তার ডাকতে হইব ক্যান? আপনে আছেন না?

আমি প্রমাদ গুনলাম। আমতা গলায় বললাম, তা আছি। কিন্তু...

কিন্তুমিন্তুর দরকার নাই। চলেন, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেন। তার জাগরণ ভেরি ইম্পরটেন্ট। নাইলে আমার গর্দান থাকব না। বঁটির কোপ পড়ব।

জি?

বেলির মায় কইছে মাইয়ার কিছু হইলে, বুজলেন না, বঁটি দিয়া কোপ দিয়া আমার কল্লা নামাইয়া দিব। চলেন, তাড়াতাড়ি চলেন।

আমি চেয়ারম্যান সাহেবের পেছন পেছন দোতলা ঘরে এসে ঢুকলাম। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় বেলির রুমে এলাম।

বেলির রুম সুন্দর করে গোছানো। চমৎকার খাট, আলমারি, টিভি, বেশ দামি একটা মিউজিক সিস্টেম। এসিও আছে রুমে। স্প্লিট এসি। দরজা-জানালায় সুন্দর পর্দা। দুটো সুন্দর বুকশেলফ ভর্তি বই, সিডি। পড়ার টেবিলের পাশে ডেস্কটপ, টেবিলের একপাশে অ্যাপলের ল্যাপটপ। সুন্দর করে গোছানো বই-খাতা। বেডসাইডে সুন্দর ল্যাম্প। ল্যাম্পের পাশে তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসটি।

বেলির ঘরে এসি চলছে। সে কাত হয়ে ঘুমাচ্ছে। গলা পর্যন্ত সুন্দর চাদর টানা। ঘুমন্ত মুখটা কী অপূর্ব লাগছে! রূপকথার রাজকন্যার মতো।

চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী বেলির পাশে বসে কাঁদছেন।

এই রুমে ঢুকে ভেতরে ভেতরে আমি কী রকম যেন একটু বদলে গেলাম। কোত্থেকে যেন অদ্ভুত এক সাহস এলো মনে। ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে খুবই স্বাভাবিক গলায় বললাম, কাঁদছেন কেন? কান্নাকাটি করার মতো কিছু হয়নি। আপনি সরে আসুন, আমি একটু চেষ্টা করে দেখি ঘুমটা ভাঙাতে পারি কি না।

তিনি চোখ মুছতে মুছতে সরে এলেন। আমি বেলির পাশে বসলাম। বসে খুবই সাধারণ একটা কাজ করলাম। বেলির নাকটা টিপে ধরলাম। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, বেলি নড়েচড়ে উঠল। আমি নাক ধরেই আছি। বেলি একটু ছটফট করল, তারপর চোখ মেলে তাকাল। তাকিয়ে যেন স্বপ্ন দেখছে, বা এমন কোনো মুখ দেখছে, সেই প্রিয়মুখ থেকে চোখ সরাতে পারছে না, এমন করে, ঘোরলাগা এক চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর স্নিগ্ধ মায়াবী অপূর্ব এক হাসি ফুটল তার মুখে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘোরলাগা গলায়, আশ্চর্য মাদকতায় বলল, তুমি এসেছ, মনজু? আমি জানতাম, তুমি অবশ্যই ফিরে আসবে। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কেউ তোমাকে গুম করতে পারবে না, খুন করতে পারবে না। কারণ তুমি তো কোনো দোষ করোনি, কোনো অন্যায় অপরাধ করোনি।

বেলি উঠে বসল। আমি তীক্ষ্ম চোখে তার দিকে খানিক তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দেখি চেয়ারম্যান সাহেব আর তাঁর স্ত্রী দুজনেই কেমন একটু চঞ্চল হয়েছেন, দিশাহারা হয়েছেন। চেয়ারম্যান তাকালেন তাঁর স্ত্রীর দিকে, স্ত্রী তাকালেন স্বামীর দিকে।

চেয়ারম্যান তারপর মেয়েকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলেন। মনজু কে, মা? তুমি কার কথা বলতেছ? ইনি তো তোমার হাউস টিউটর, গৃহশিক্ষক। নজরুল মাস্টার। ঘুমের তালে তুমি মনে হয় স্বপ্ন দেখছ। মনজু নামে তো তুমি কেউরে চিনো না। আমরাও চিনি না।

বেলি কিন্তু আগের মতোই অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও তাকিয়ে আছি তার দিকে। আমার চোখে অদ্ভুত এক চিন্তার ছায়া।

মনজু কে?

আমাকে মনজু ভাবছে কেন বেলি?

তাহলে কি এই নামের কোনো একজনের জন্য সে পাগল হয়েছে?

বেলি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে, এটা চেয়ারম্যান সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই খেয়াল করছেন। খেয়াল না করারও কোনো কারণ নেই। তাঁদের চোখের সামনেই তো বেলি ওভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, এইভাবে চাইয়া রইছ ক্যান, মা? ইনারে চিনতে পারতাছ না? তোমার স্যার মা, তোমার স্যার। নজরুল স্যার। ঢাকা থিকা আসছেন। কয়েক দিন ধইরা এই বাড়িতেই আছেন। তুমি তাঁর সঙ্গে কথাবার্তাও বলছ। এখন চিনতে পারতাছ না ক্যান?

তিনি স্ত্রীর দিকে তাকালেন। বেলির মা, আমার কন্যারে খাওয়াদাওয়া করাও। আমরা যাই। চলেন মাস্টার সাব।

আমাকে নিয়ে কাছারিঘরে এলেন চেয়ারম্যান সাহেব।

আমার চোখজুড়ে তখন বেলির ঘুমভাঙা মুখ, অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং আশ্চর্য ঘোরলাগা গলায় সেই প্রশ্ন, এসেছ মনজু?

তাহলে মনজু নামের কাউকে নিয়েই বেলির পাগল হওয়া?

কী রহস্য এই নামে?

চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, মনজু কে?

তিনি অবাক, বিস্মিত। জি? মনজু? না না, এই নামে তো কাউরে চিনি না। আজই ফার্স্ট টাইম নামটা শোনলাম।

তাই?

জি জি, তাই।

এ সময় সুন্দরী দুমগ চা নিয়ে এলো। আমি খেয়াল করিনি, বোধ হয় এই ঘরে আসার আগেই তাকে চায়ের জন্য ইশারা করেছিলেন চেয়ারম্যান সাহেব।

কাছারিঘরে সব সময়ই দু-চারজন লোক থাকে। হয় ঘরের ভেতরে থাকে, নয়তো বাইরে বারান্দায়, সামনের মাঠটায়। এখনো কয়েকজন আছে। তবে ঘরের ভেতরে না, বাইরে, বারান্দায়, মাঠে। বদরু আছে তাদের সঙ্গে।

চায়ের মগ আমাদের সামনে নামিয়ে রাখতে রাখতে সুন্দরী তার স্বভাব অনুযায়ী বলল, এই যে দুই কাপ, না না, দুই মগ চা। ইসপেসিয়াল কাপখান চেরম্যান সাব আপনের আর অন্যটা হইল ষাঁড়ের।

চেয়ারম্যান যেন একটু বিরক্ত। আমার মগের মতন মগ বাড়িতে আর নাই?

সুন্দরী অবাক। কন কি, চেরম্যান সাব? থাকব না মাইনি? এই পদের মগ বহুত আছে।

আমি আর মাস্টার সাবে যখন চা খামু তখন দুইজনরে এক পদের মগে চা দিবি। ঠিক আছে?

ঠিক আছে।

ওই মগে আর অন্য কেউরে দিবি না। বুজছস?

বুজুম না ক্যা, বহুত ভালো বুজছি। আপনে আর ষাঁড়ে হইলেন এক রকম।

এখন যা, ভাগ। আমার কথার যেন বিঘ্ন না হয়।

সুন্দরী তার বিখ্যাত কেলানো হাসিটা হাসল। হি হি হি, হইব না, কোনো বিঘ্ন হইব না।

এবার চেয়ারম্যান সাহেব সুন্দরীকে একটা ধমক দিলেন। যা ভাগ। হি হি করবি না।

সুন্দরী ভয় পেল। আইচ্ছা, যাইতাছি।

সুন্দরী বেরিয়ে যাওয়ার পর চায়ে চুমুক দিলেন চেয়ারম্যান সাহেব, আমার দিকে তাকালেন। বলেন, মাস্টার সাব, কী জানি বলতে চাইলেন?

আমিও চায়ে চুমুক দিলাম। আমি একটু চিন্তিত।

চিন্তার রিজন কী?

রিজন হচ্ছে বেলি। আপনার কন্যা।

সেইটা বুজছি।

ঘুম ভাঙার পর ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বেলি যেসব কথা বলল, ওসব নিয়ে চিন্তিত।

চিন্তার কোনো কারণ নাই। আমার কন্যা হইল পাগল। পাগলে কি না বলে..., হে হে হে। নভেল পড়ে, টিভিতে নাটকফাটক দেখে, সিনামা দেখে, গান-বাজনা শোনে, নিজে গান গায়, এই পদের মাইয়ারা পাগল হইলে নাটক সিনামা টাইপের ডায়লগই দেয়। আমি মনে করি, এইটা কোনো বিঘ্ন না।

কিন্তু আমি চিন্তিত। তিনটা কথা আমার মাথায় ঢুকেছে।

যেমন?

মনজু নামটা, তার সঙ্গে গুম এবং খুন।

চেয়ারম্যান সাহেব ফুরুক শব্দে চায়ে চুমুক দিলেন। মুখে হাসি। ওই যে বললাম, নাটক নভেল সিনামা। পাগল মাইয়া নাটক সিনামার ডায়লগ দিছে। আর কোনো বিঘ্ন নাই। আপনে এইটা নিয়া থিংক কইরেন না।

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে আমি উঠলাম। আমি তাহলে উঠি?

জি জি, ওঠেন। নো প্রবলেম।

বেরিয়ে এলাম ঠিকই, কিন্তু মনজু নামটা মাথায় রয়ে গেল। গুম আর খুন শব্দ দুটো রয়ে গেল। খুব সহজ প্রশ্ন মনে এলো। মনজু নামের কাউকে কি ভালোবাসত বেলি? তার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল গোপনে? গরিব ঘরের ছেলে বা চেয়ারম্যান সাহেবের স্ট্যাটাসের সঙ্গে যায় না দেখে তিনি কি ছেলেটিকে গুম করে ফেলেছেন? নাকি খুন করে ফেলেছেন? আর সেই কারণেই কি বেলি পাগল হয়েছে?

সারাটা রাত এই নিয়ে ভাবলাম।

সকালবেলা সুন্দরী এসেছে নাশতা দিতে, নাশতা দিয়ে আজ আর সে কোনো কথা বলছিল না, চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে, ডাকলাম তাকে। সুন্দরী, শোনো।

সুন্দরী মুগ্ধ চোখে তাকাল। মুখে কেলানো হাসি। কন ষাঁড় কন, শোনতাছি। আহা কী সোন্দর কইরা আমার নামখান ধইরা ডাকছেন। কইলজাডা জুড়াইয়া গেল।

সুন্দরীর এই প্রকারের কথাবার্তায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। প্রথম প্রথম বিরক্ত হতাম কিংবা মজা লাগত, এখন আর কোনো অনুভূতিই হয় না। খুবই স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলাম, মনজু কে?

সুন্দরীর পায়ে যেন বিষাক্ত গোখরা সাপ এইমাত্র ছোবল দিয়েছে, এমন ভঙ্গিতে চমকাল সে। হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখ শুকিয়ে গেল। আমি পরিষ্কার তাকে একটা ঢোক গিলতে দেখলাম। কী নাম কইলেন?

মনজু।

মজনু?

না না, মনজু, মনজু।

নিজেকে ততক্ষণে সামলে নিয়েছে সুন্দরী। বলল, হ বুজছি, মজনু। না না, মজনু নামে আমি কেউরে চিনি না। এই নাম ছোডকালে হুনছি। লাইলি মজনু।

বুঝলাম সুন্দরী চালাকি করছে। আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে। বলল, লাইলির পেরেমে দিওয়ানা আছিল মজনু। বড় হইয়া তার নাম আর শুনি নাই। মনে হয় সে আর বড় হয় নাই। ছোডই রইয়া গেছে। হি হি। অর্থাৎ আমার ছোডকাল থিকা বড়কালে সে আর আসে নাই। হি হি...

গম্ভীর গলায় বললাম, আমি মজনু বলিনি...

তয় আপনে কী বলছেন?

মনজু।

বুজলাম তো মজনু। আমি বয়রা না, কানে পষ্ট শুনি। কইলাম যে ছোডকালের পর তার নাম আমি আর শুনি নাই। আমি গেলাম, আমার কাম আছে।

বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, এত আল্লাদ কইরা ডাক দিল, তার বাদে খালি কয় মজনু মজনু। ধুরো ব্যাডা। লাইলি কইতে পারেন না?

পরিষ্কার বুঝলাম সুন্দরী তার চালিয়াতি দিয়ে আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেল। ওই লাইনে এগোলই না। কারণ কী? রহস্যটা কোথায়?

সকাল এগারোটার দিকে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, দেখি সদর দরজার পশ্চিম পাশের বকুলগাছটির তলায় বসে ঘুমে ঢলে ঢলে পড়ছে বদরু। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বদরু।

বদরু চমকে তাকাল। জে।

তারপর যেন আমাকে চিনতে পারল। জে, মাস্টার সাব?

বসে বসেই ঘুমাচ্ছ নাকি?

না না, ঘুমাই না। ওই যে ঢুলুনি কইছিলাম না, ওই ঢুলুনি আর কি। রাতের জীবের দিনে তো ঢুলুনি আসবই।

বুঝলাম। এখন আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।

বদরু বিরক্ত। মাস্টার মাইনসেগো এইডা হইল বড় সমস্যা। খালি প্রশ্ন করে, খালি উত্তর জানতে চায়। আইচ্ছা কন, কী প্রশ্ন?

মনজু কে?

সুন্দরীর মতো অতটা চমকাল না বদরু, তবে চমকাল। সুন্দরীর অবস্থা যেমন হয়েছিল, পায়ে গোখরা সাপ ছোবল দিয়েছে, বদরুর হলো, যেন এইমাত্র পায়ে একটা বাবলা কাঁটা ফুটেছে। জীব হিসেবে সে তো সুন্দরীর চেয়েও চতুর, পাতিশিয়াল টাইপ, সেই লাইনেই এগোল। ভুরু কুঁচকে বলল, কী নাম কইলেন?

মনজু, মনজু।

এই নামডা মাস্টার সাব জিন্দেগিতে আমি শুনিই নাই।

বলো কী?

জে।

এটা খুবই কমন নাম।

হইলে কী হইব, আমি শুনি নাই। চিনোন তো দূরের কথা। এইডা কে?

তুমি আমাকে উল্টো প্রশ্ন করছ কেন?

যেই নাম কইলেন হেই নামের মানুষটারে না চিনলে জিগামু না?

তুমি কি আমার সঙ্গে চালাকি করছ?

বদরু যে কখন উঠে দাঁড়িয়েছে আমি খেয়ালই করিনি। বোধ হয় আমি এসে ডাক দেওয়ার পরপরই উঠেছিল। আমার খেয়াল নেই। আমার প্রশ্ন শুনে বলল, জে, চালাকি করতাছি।

কী?

কইলাম আমি আপনের লগে চালাকি করতাছি।

তার মানে মনজু নামের কাউকে তুমি চেনো?

না, চিনি না, তয় নাম শুনছি।

কিছুক্ষণ আগে না বললে শোনোনি?

জে বলছি। এখন আর বলতেছি না।

তার মানে শুনেছ?

জে।

কোথায় শুনেছ?

বদরু ফিচকে টাইপের একটা হাসি হাসল। এই যে আপনে কইলেন, আপনের মুখে শোনলাম।

এত বিরক্ত লাগল আমার! কোন ফাজিলদের সঙ্গে পড়েছি? বদরুর দিকে তাকিয়ে বললাম, ধুৎ। অযথা তোমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললাম।

বললেন ক্যান, কে আপনেরে বলতে বলছে?

বদরু আবার তার জায়গায় বসে পড়ল। আমি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছি, পরিষ্কার শুনলাম বদরু বলছে, মাথা খারাপ হইছে আমার, নাকি পেট খারাপ? এই নাম শুনছি কইয়া মরুমনি? চেরম্যান সাবে দুনিয়ার বিঘ্ন ঘটাইয়া ফালাইব।

আমি বদরুর কাছে ফিরে এলাম। কী বললে?

না, কিছু কই নাই তো।

আমি যেন শুনলাম তুমি বলছ...

ঢুলুনির তালে বিড়বিড় করছি। এইডা আমার স্বভাব।

না, তুমি যেন বললে এই নাম শুনছি কইয়া মরুমনি? চেরম্যান সাবে বিঘ্ন ঘটাইয়া ফালাইব...

বদরু এবার আর উঠে দাঁড়াল না। আমাকে একটা ঝাড়ি দিল। ওই মিয়া, আপনে মাস্টার না পুলিশ? এত কথা কন ক্যান?

এই আচরণের পরও বদরুর ওপর আমার কিন্তু রাগ হলো না। একটা সন্দেহ ভেতরে খেলা করছে। মনজু নামটা সুন্দরীও জানে, বদরুও জানে। চেয়ারম্যান সাহেব, তাঁর স্ত্রী, বাড়ির অন্য কাজের লোকজন—সবাই জানে। চেয়ারম্যানের ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। তার মানে রহস্য অতি গভীর।

আমি আর বাড়ি থেকে বেরোলাম না। চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য দোতলা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। তিনি তখন দোতলা থেকে নেমে আসছিলেন। তার মানে বেলির সঙ্গে ছিলেন এতক্ষণ।

আমি তাঁকে সালাম দিলাম। স্লামালেকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম।

কেমন আছেন আপনি? ভালো?

জি বাবা, ভালো আছি।

বেলি ভালো আছে?

আছে। এখন ভালো আছে। আমাদের বাড়িতে আপনার কোনো, না না, তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?

না না, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমি খুবই ভালো আছি। তবে আপনাদের কাজটা ভালোভাবে করতে পারছি না।

কোন কাজটা, বাবা?

এই যে আমার ছাত্রী বা রোগী, বেলি, বেলিকেই তো স্বাভাবিক করতে পারছি না!

কিছু কিছু তো পারছ। মেয়েটার ঘুম ভাঙালে কত সহজভাবে। আমরা তো বুঝতেই পারছিলাম না কী করব। ওটা তুমি একটা বড় কাজ, ভালো কাজ করেছ।

আপনার সঙ্গে আমি দু-একটা কথা বলতে চাইছিলাম।

আসো, ঘরে আসো।

তিনি আমাকে দোতলা ঘরের নিচতলার বসার ঘরে নিয়ে বসালেন। বলো, কী বলবে?

না মানে, বলতে চাইছিলাম আপনারা যদি আমাকে একটু সাহায্য করতেন, আমার মনে হয় বেলিকে আমি ভালো করে তুলতে পারতাম।

ভদ্রমহিলা চিন্তিত হলেন। আমাদের তো সাহায্য না করার কিছু নেই। আমরা চাই আমাদের মেয়েটা সেরে উঠুক, ভালো হয়ে যাক। সেই জন্যই তোমাকে এই বাড়িতে আনা।

জি, তা তো বটেই।

তার পরও বলো, কী সাহায্য তুমি আমাদের কাছে চাও?

একটা বিষয় একটু ক্লিয়ার হওয়ার দরকার। ঘুম ভাঙার পর বেলি আমাকে মনজু বলে ডাকল। এই নামে কেন সে ডাকল? এই নামে কাউকে কি সে চিনত বা আপনারা কি চেনেন?

প্রশ্নটা করেই আমি তীক্ষ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিশ্চিত ছিলাম তিনি চমকাবেন এবং প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে যাবেন।

ঠিক তা-ই হলো। একটু বিচলিত গলায় বললেন, না না, এই নামে কাউকে আমরা চিনি না। বেলিও চেনে না।

তাহলে নামটা সে বলল কেন?

পাগল মেয়ে, হয়তো কোনো বইতে পড়েছে বা নাটক সিনেমায় পেয়েছে। ঘুমের ঘোরে ছিল, তাই বলে ফেলেছে। ওটা কিছুই না। মাঝে মাঝে এ রকমই ঘুমায় সে। ঘুম ভাঙার পর এ রকমই কারো কারো নাম বলে।

তিনি উঠলেন। আমি একটু রান্নাঘরের দিকে যাই। দেখি সুন্দরী কী করছে।

জি, নিশ্চয়।

আমিও উঠলাম এবং ক্লিয়ার হয়ে গেলাম, মনজু নামটার মধ্যে বিরাট রহস্য লুকিয়ে আছে।

 

 

 

 তিন.

 

চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো বিকেলবেলা।

তিনি বাইরে থেকে ফিরলেন। সঙ্গে বদরু আছে। আমাকে দেখে উচ্ছল গলায় বললেন, বুজলেন মাস্টার সাব, এই চোট্টাটা এখন হইল আমার সারভেন্ট আর বডিগার্ড। যদিও বডিগার্ড মডিগার্ড আমার লাগে না। অতি, অতি পপুলার চেয়ারম্যান। আমার কোনো শত্রু নাই। আমার কোনো আওয়ামী লীগ বিএনপি নাই। সব দলই আমার। সব লোকই আমার। তা-ও বাড়ি থিকা বাইর হইলে চোট্টাটারে লগে লইয়া বাইর হই। ওই চোট্টা, যা আমারে আর মাস্টার সাবরে বিকালের চা-নাশতা দিতে ক। খিদা লাইগা গেছে।

বদরু বলল, যাইতাছি সাহেব। তয় কী খাইবেন, অর্থাৎ বৈকালের নাশতা হিসাবে কী খাইবেন, সেইটা বলবেন না? নাশতায় যদি কোনো বিঘ্ন ঘইটা যায়...

বিকালবেলা আমি কী খাই ওইটা সুন্দরী আর অন্য বুয়ারা জানে। বেলির মায় তো জানেই। তুই গিয়া কইলেই হইব। সব সময় আমার মতন বিঘ্ন বিঘ্ন করিস না।

আমার খুবই হাসি পাচ্ছিল। বদরুটা দুনিয়ার ফাজিল। ইচ্ছা করে চেয়ারম্যান সাহেবের ‘বিঘ্ন’ শব্দটা যখন-তখন উচ্চারণ করে।

চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনে বদরু খুবই বিনয়ী ভঙ্গিতে চলে গেল। তখন চেয়ারম্যান সাহেব তাকালেন আমার দিকে। বলেন মাস্টার সাব, না ঠিক আছে, পরে বলেন। আগে চলেন আমার অফিস রোমে গিয়া জম্পেশ কইরা বসি। তারপর আলাপ-আলোচনা...

চেয়ারম্যান সাহেবের পেছন পেছন কাছারিঘরে এসে ঢুকলাম। মতি নবুরা বসে ছিল ঘরে। ঢুকেই চেয়ারম্যান তাদের বের করে দিলেন। এই, বাইরে গিয়ে বয় তোরা। আমি ডাকলে আসবি।

কেউ কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, আপনের মুখ দেইখাই বুজছি, আপনে কিছু বলবেন।

জি।

বলেন, বইলা ফালান। তবে আপনে যে ডাক্তার হিসাবে মোটামুটি ভালো, এইটা আমি এবং আমার পরিবার অর্থাৎ বেলির মায়, আমরা দুইজনেই বুইঝা ফালাইছি।

কিভাবে?

এত সহজে আমার কন্যার ঘুম ভাঙ্গাইলেন, এইটা তো আমি নিজ চোক্ষে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। নাক টিপা ধরলেন আর কন্যায় চোখ মেইলা চাইল। ভোজবাজি, একদম ভোজবাজি। বড় ডাক্তার না হইলে এইটা সম্ভব না।

আমি বললাম, এটা কোনো ডাক্তারি না। অতি সহজ একটা পন্থা। নাক টিপে ধরলে ঘুম মানুষের ভাঙবেই। কমন সেন্সের ব্যাপার।

তাই নাকি? ভালো ভালো। একটা ডাক্তারি আপনের কাছ থিকা শিখলাম।

কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব, বেলির ব্যাপারে আপনারা কেউ আমাকে কোনো সাহায্য করছেন না।

চেয়ারম্যান আকাশ থেকে পড়লেন। বলেন কি!   সাহায্য করতেছি না? হোয়াট ডু ইউ মিন? কোন ধরনের হেল্প আপনেরে আমরা করি নাই, বলেন?

না মানে, আপনাদের কাছ থেকে যে রকম সাপোর্ট পাওয়া দরকার সেটা আমি পাচ্ছি না।

বুঝাইয়া বলেন, বুঝাইয়া বলেন।

তার পরই কথা ঘোরালেন তিনি। সেদিনের পর থিকা আপনের কোশ্চেনগুলি নিয়া আমি ব্যাপক চিন্তাভাবনা করছি।

কী রকম?

নাটক সিনেমা নভেলের কথা বললাম না? তারপর আমার অবশ্য অন্য আরেকটা কথা মনে হইছে।

কী কথা?

আমার কন্যা ড্রিমের মধ্যে আছিল।

মানে? কিসের ড্রিম?

ড্রিম ড্রিম। স্বপ্ন, খোয়াব।

জি, তা বুঝেছি।

স্বপ্নে সে ওই নামের কাউরে দেখছে। জাগরণের পর মনে করছে তার ঘুম ভাঙ্গে নাই। সে ওই স্বপ্নের মধ্যেই আছে। আপনেরে তার পাশে বইসা থাকতে দেইখা স্বপ্ন আর জাগরণ গোলাইয়া ফালাইছে। আপনেরে মনে করছে ওই নামের মানুষ। স্বপ্নের ঘোরে আছিল দেইখা এইটা সে করছে।

‘মনজু’ নামটা নিয়ে যে যা-ই বলছে, আমি শুনে যাচ্ছি। বিশ্বাস করছি না একজনের কথাও। তবে সেটা বুঝতে দিচ্ছি না কাউকে। আমি নিশ্চিত, রহস্য এই মনজুর মধ্যেই। তার পরও চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনে আমি একটু চিন্তিত হওয়ার ভান করলাম। তাই নাকি?

একদম তাই। একদম। আর কোনো বিঘ্ন নাই। এই নামের কাউরে আমরা চিনি না। বাপের জন্মে এই নামই শুনি নাই।

সব বুঝেও বললাম, এটা খুবই কমন নাম। না শোনার কারণ নেই।

তিনি ঠোঁট বাঁকালেন। আপনে বলতাছেন কমন নাম, কিন্তু আমি শুনিই নাই।

এ সময় বদরু ঢুকল। কিন্তু খালি হাত। চা-নাশতা নেই।

চেয়ারম্যান সাহেব অবাক। কি রে, চা-নাশতা আনলি না?

সুন্দরী কইল, অহন দিতে পারব না।

কচ কি! দিতে পারব না ক্যান?

কইতে পারি না।

বিঘ্নটা কী?

ব্যস্ত।

কে ব্যস্ত?

সুন্দরী। আমারে কইল, তর সাহেবরে গিয়া ক, আমি ব্যস্ত।

বুঝলাম বদরু কিছু একটা ঝামেলা করে এসেছে। সুন্দরীকে ফাঁসানোর চেষ্টা, চোট্টাটা যে পরিমাণ ফাজিল।

চেয়ারম্যান সাহেব তীক্ষ্ম চোখে বদরুর দিকে তাকালেন। এইটা কইছে?

হ।

এত বড় সাহস?

আমিও ওর সাহস দেইখা অবাক মানছি।

তোর কথা আমার বিশ্বাস হইতাছে না। তুই একটা হাড়ে হারামজাদা।

বিশ্বাস না হইলে আপনে নিজে গিয়া জিজ্ঞাসা করেন। দরকার হইলে মাস্টার সাবরেও লগে লইয়া যান।

তুই যা, আমি দেখতাছি।

বদরু চলে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, মাস্টার সাব, আপনে বসেন। সুন্দরীর বিঘ্নটা আমি একটু বুইঝা আসি।

পা বাড়িয়েই আবার ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। না না, ঠিক আছে, আপনেও যান। পরে এই সব বিষয়ে ডিসকাস করব। সুন্দরীর বিঘ্নটা দেইখা আসি।

জি, আচ্ছা।

আমি চেয়ারম্যান সাহেবের পেছন পেছন বেরোলাম। কাণ্ডটা কী হয় দেখার বা বোঝার ভারি লোভ হলো। মজা নেওয়ার জন্য আমি আমার ঘরে গেলাম না, পুব দিককার ঘরের ওদিক দিয়ে রান্নাঘরের পেছন দিকটায় এসে পায়চারি করতে লাগলাম। এখানটায় গাছপালা ঝোপঝাড় বাগান। রান্নাঘরের দিকটা পুরোপুরি দেখা যায়, লোকজনের কথাবার্তাও শোনা যায়।

এদিকটায় এসেই আমি দেখি ট্রেতে দুজন মানুষের চা-নাশতা নিয়ে সুন্দরী রান্নাঘর থেকে বেরোচ্ছে। চেয়ারম্যান সাহেব এসে ওর সামনে দাঁড়ালেন। গম্ভীর। এই চা-নাশতা কার?

আপনের আর মাস্টার সাবের।

তয় চোট্টা যে কইল তুই অহন নাশতা দিতে পারবি না।

হায় হায়, কন কি!

হ। তুই বলে ব্যস্ত।

সুন্দরী হাস্যকর ভঙ্গিতে কেঁদে ফেলল। একদমই আমাদের এতিমখানার মন্টুর তরিকা। এইডা আমি কইতে পারি, কন? এত বড় কইলজা আমার হইব, কন? আপনে নাশতা চাইবেন আর আমি দিমু না, কমু ব্যস্ত, এইডা হইতে পারে? এত দিন ধইরা এই বাড়িতে আছি, কোনো দিন এমুন হইছে?

কান্দিস না, কান্দিস না। ঘটনা খুইলা বল।

ওই চোট্টা আমারে খালি খোঁচায়। বহুত আবোলতাবোল কথা কয়।

কেমুন খোঁচান খোঁচায়? কী আবোলতাবোল কথা কয়?

কয়, ও বলে আমার ভাশুর।

তোর বিয়া হইল কবে যে তোর ভাশুর হইব?

হেইডাই তো বুজলাম না। দেওর হইলে নাইলে একটা কথা আছিল। ভাশুর হয় কেমনে?

চেয়ারম্যান বিরাট একটা ধমক দিলেন। চোউপ, ফাজিল ছেমড়ি। তোরে আর চোট্টারে দুইজনরেই আমি চিনি। তুই হইলি বান্দরনি আর ওইডা হইল বান্দর। তগো দুইডারেই সাইজ করন লাগব। নাইলে তোরা খালি বিঘ্ন ঘটাবি। যা চা-নাশতা কাছারিঘরে দিয়া আয়।

আইচ্ছা, যাইতাছি।

সুন্দরী কাছারিঘরের দিকে চলে গেল। চেয়ারম্যান সাহেবও গেলেন তার পেছন পেছন। কিন্তু আমি আর গেলাম না। কিছু ভালো লাগছে না।

পরদিন সকালবেলা সুন্দরী এসে বলল, বিরাট আমোদের খবর আছে গো, ষাঁড় গো।

ষাঁড় না স্যার, স্যার।

হ হ, ঠিকই আছে। ষাঁড়। আমোদের খবরডা কী জানেন, ষাঁড়?

বললাম না, ষাঁড় না, স্যার।

আমিও তো ষাঁড় কইতাছি। আমি কি ষাঁড় ভুল কইতাছিনি, ষাঁড়?

আমি বিরক্ত হয়ে বসে রইলাম। না, এই জিনিসের সঙ্গে কথা বলে পারব না। ওর সঙ্গে কথা না বলে ষাঁড় হয়ে থাকাই ভালো।

সুন্দরী বলল, শোনেন ষাঁড়, বেলি আফায় একদম ভালো হইয়া গেছে।

তাই নাকি?

হ ষাঁড়, একদম ভালো হইয়া গেছে, ষাঁড়।

কী করে বুঝলে?

কথা কইয়া বুজছি, ষাঁড়। আপনে তার লগে কথা কইলে ষাঁড় লগে লগে আপনেও বুইজা যাইবেন, ষাঁড়। যান ষাঁড়, বেলি আফার ঘরে যান।

তার ঘরে যাব মানে?

সে আপনেরে ষাঁড় তার ঘরে যাইতে কইছে, ষাঁড়। যান ষাঁড়, তাড়াতাড়ি যান। তয় দোতলায় না ষাঁড়, সে দোতলা ঘরের নিচতালায় আছে, ষাঁড়।

আমি তারপর সেই ঘরে গেলাম।

দরজা খোলা, তবু দরজায় টোকা দিলাম।

বেলি দাঁড়িয়ে ছিল বাগানের দিককার খোলা জানালার সামনে। পরনে হালকা বেগুনি রঙের সালোয়ার-কামিজ। লাল ওড়না পরিপাটি করে রাখা জায়গামতো। টোকার শব্দে ঘুরে তাকাল। মুখটা উদাস, বিষণ্ন।

আসব?

আসুন।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। সুন্দরী বলল আপনি আমাকে এই ঘরে আসতে বলেছেন?

জি, বলেছি। বসুন।

আমি একটা চেয়ারে বসলাম। ধন্যবাদ।

বেলি আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসল। আমাকে আপনি করে বলবেন না।

বলতে চাইনি।

তাহলে বলছেন কেন?

আপনার কারণেই বলছি।

আর বলার দরকার নেই।

ঠিক আছে। কী জন্য ডেকেছেন বলুন।

আবার আপনি?

স্যরি। বলো, কী জন্য ডাকলে?

আপনি আমার টিচার। ছাত্রীকে পড়াবেন না?

পড়াতে তো চাই। কিন্তু...

আর কোনো কিন্তু নেই।

গুড, ভেরি গুড। তাহলে আজ থেকেই শুরু করো।

করা যায়। আমি এইচএসসি পরীক্ষাটা দিতে পারিনি। পরীক্ষাটা দিতে চাই।

নিশ্চয় দেবে।

আপনাকে বলেছি কি না জানি না, সায়েন্স কমার্স না, আমি আর্টস পড়তাম। ইচ্ছা ছিল ইংলিশ লিটারেচার পড়ব। সাহিত্য আমার খুব ভালো লাগে। গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক সিনেমা ভালো লাগে।

নাচ ভালো লাগে না?

নাচ তেমন ভালো লাগে না।

আমি ভেবেছিলাম...

কথাটা শেষ করি না।

বেলি বলল, কী ভেবেছিলেন বলুন? কথা শেষ করুন।

না, আমি ভেবেছি তুমি রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো গানের সঙ্গে নাচতেও পারো।

তা পারি। কিন্তু নাচতে আমার ভালো লাগে না।

একটু থামল বেলি। উদাস গলায় বলল, লেখাপড়ায় আমার দেরি হয়ে গেছে। মনে হয় সময় চলে গেছে।

তা যায়নি। এখনো সময় আছে। ঠিকঠাকমতো লেখাপড়া শুরু করলে তুমি পারবে। তুমি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। তোমার সময় লাগবে না।

তাহলে তো ভালোই।

আজকের আগে বেলির সঙ্গে এ রকম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার কখনো কথা হয়নি। খুবই ভালো লাগছে কথা বলতে। যদিও মেয়েটি খুবই বিষণ্ন। তবু ভালো লাগছে তার কথা বলার ধরন, উচ্চারণ, আই কন্টাক্ট।

তোমাকে একটা প্রশ্ন করব?

করুন।

সেদিন ঘুম ভাঙার পর তোমাকে যেমন স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, আজও তেমন মনে হচ্ছে।

প্রশ্নটা করুন।

আমি সরাসরি বেলির চোখের দিকে তাকালাম। উত্তর দেবে তো?

দেব।

মনজু কে?

প্রশ্ন করা মাত্রই বদলে গেল বেলি। চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠল তার। লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কঠিন রাগী মুখে বলল, কী কইলি?

আমিও উঠে দাঁড়িয়েছি। একেবারেই অপ্রস্তুত।

বেলি বলল, এই মাস্টারের পো মাস্টার, তুই আমারে পড়াইতে আইছস না খাজুইরা আলাপ করতে আইছস? যা, বাইর হ, বাইর হ ঘর থিকা। গেলি? নাকি মাইরা বাইর করুম?

আমি ভয়ার্ত দিশাহারা গলায় বললাম, যাচ্ছি যাচ্ছি।

বারান্দায় বেরিয়েছি, শুনি বেলি শিশুর মতো কাঁদছে। জড়ানো গলায় বলছে, কেন কেউ এই নাম আমার সামনে উচ্চারণ করে? কেন? কেন?

বেলির এই কথায় আমি নিশ্চিত হলাম, রহস্য যা কিছু তা অবশ্যই মনজুকে নিয়ে।

 

 

চার.

 

মাঠের ধারে বিশাল এক শিরীষগাছ।

কত বছরের পুরনো গাছ কে জানে। এত সুন্দর ছায়া ফেলে রেখেছে চারপাশে! তলার ঘন ঘাস কালচে সবুজ। আমি সেই ঘাসে বসে আছি। নিজের ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবছি। এতিমখানা, হাসান স্যার, মায়া খালা, মন্টু আর বিলুরা, মানে আমার পিচ্চিবাহিনী। আমি মন্টুকে একটা চিঠি দিয়ে এসেছিলাম। শুক্রবার অতি ভোরে আমি বেরোলাম, বিলুর হাতে মন্টুর চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কথা দশটায়। মন্টু আমার কথার অন্যথা করবে না। সে ঠিকই সময়মতো চিঠিটা বিলুর হাতে দিয়েছে। চিঠি পড়ে বিলুরা দিশাহারা হয়েছে। মন খারাপ করেছে, কান্নাকাটি করেছে। কয়েক দিন নিশ্চয় চলেছে সেই অবস্থা। তারপর ধীরে ধীরে কমে এসেছে শোক।

আমি চাইনি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করি বা হাসান স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার সঙ্গে একটা মোবাইল ফোন আছে। এতিমখানার ফোন নম্বর, হাসান স্যার কিংবা আলতাফ ভাইয়ের মোবাইল নম্বর আছে। ইচ্ছা করলেই তাঁদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে পারি, খোঁজখবর নিতে পারি সবার। সেটা আমি করিনি। করবও না।

আমি ভুলে যেতে চাই।

পেছনের জীবনটা আমি ভুলে যেতে চাই।

কিন্তু যে মিথ্যা পরিচয়ে যে ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িয়েছি, এর পরিণতি কী? আমি তো নিজেকে ভুলে বেলির জীবন এবং তার পাগল হওয়ার রহস্য নিয়ে মেতে আছি। পাগল আধাপাগল কতগুলো মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছি। কী দরকার আমার এসবের মধ্যে থাকার? বেলি পাগল না ভালো, মনজু নামের কাউকে নিয়ে গভীর রহস্য—এসব নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর দরকার কি? যেকোনো সময় এ নিয়ে একটা বড় প্যাঁচে পড়ে যেতে পারি। একদিকে জনৈক নজরুল মাস্টারের বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছি, অন্যদিকে হয়ে উঠছি গোয়েন্দা। বেলির পাগল হওয়ার রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত। মনজু নামের একজনের ব্যাপারে উঠেপড়ে লেগেছি।

আমার কি এসবের দরকার আছে?

কাল ভোরবেলা উঠে ব্যাগ কাঁধে পলান দিই। ঢাকায় চলে যাই। টুলুর হেল্প নিয়ে ওদের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়ে কোনাবাড়ীর ওদিকে চলে যাই। এই রিস্কের মধ্যে থাকার দরকার কি?

এ সময় দেখি রমজান মাতবর এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে। মাস্টার সাব, আপনে এখানে একলা একলা বইসা রইছেন? ঘটনা কী?

তেমন কিছু না। এমনিতেই বসে আছি।

না, আপনের মন দেখতাছি খারাপ।

রমজান মাতবর আমার পাশে বসলেন। আইজ আমার মনও খারাপ।

কী হলো?

বাড়িতে মন-খারাপ পরিবেশ। বাড়ির মানুষটা যদি দিন-রাইত চব্বিশ ঘণ্টা খালি কান্দে, কার মন ভালো থাকে, কন?

বুঝেছি। সেদিন আপনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভেবেছিলাম আপনাকে একটা প্রশ্ন করব, করা হয়নি।

কী প্রশ্ন, বলেন তো?

আপনি মোটামুটি অবস্থাপন্ন মানুষ। একটা ছেলেবাচ্চা দত্তক নেননি কেন?

একটা মানে? আমি পারলে চাইরটা ছেলেবাচ্চা দত্তক নেই। ম্যালা চেষ্টা করছি, কিন্তু জোগাড় করতে পারি নাই, মাস্টার সাব।

তাই নাকি?

জি। এখনো চেষ্টা চালাইয়া যাইতাছি। তয় খাপে খাপে মিলে না। আমি যদি মাস্টার সাব চাইরটা পোলা পাইতাম, দশ এগারো বারো তেরো এই রকম বয়সের, চাইরটারেই দত্তক নিতাম। আমার জায়গা-সম্পত্তি চাইরজনরে সমান ভাগে ভাগ কইরা দিতাম। লেখাপড়া শিখাইয়া পোলাগুলিরে ভালো মানুষ বানাইতাম। আমি আমার পরিবারের হাসিমুখটা দেখতে চাই, মাস্টার সাব। চাইরটা পোলার মার হাসিখুশি মুখটা দেখতে চাই।

আমার মনে পড়ছিল বিলুদের কথা। বিলু জনিরা চারজন ছিল এতিমখানায় আমার সাগরেদ। রমজান মাতবর যে রকম বয়স চাইছেন, ওদের বয়স ও রকমই। চারজনের অবস্থাই আমার মতো। দুনিয়াতে কেউ নেই। ওই চারজনকে যদি রমজান মাতবরের বাড়িতে নিয়ে আসা যেত।

রমজান বললেন, কী ভাবতাছেন, মাস্টার সাব?

না, কিছু না। চলুন উঠি।

আমার সঙ্গে মাতবর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, সেদিনের পর আমার পরিবার কিন্তু কয়েকবার আপনার কথা আমারে জিজ্ঞাসা করছে।

কী জিজ্ঞেস করেছেন?

এইতো, আপনের বাড়িঘরের কথা, মা বাপ ভাই বোনের কথা। আপনের মতন ছেলে ফালাইয়া আপনের মায় কিভাবে থাকে, এই সব কথা।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার মা বাবা ভাই বোন কেউ নেই। এই পৃথিবীতে আমি একা।

মাতবর থতমত খেলেন। কন কি? আপনের কেউ নাই?

আমি দুঃখী ম্লান মুখে হাসলাম। না। তবে যার কেউ নেই তার সবাই আছে। এইতো, এই যে আপনারা আছেন, আপনারাই এখন আমার আপনজন।

আমি দ্রুত হেঁটে শিরীষতলা থেকে চলে এলাম। কোন দিকে যাব ঠিক করতে পারছি না। এলোমেলোভাবে হাঁটছি। রমজান মাতবর চেয়ারম্যানবাড়ির দিকে রওনা দিয়েছেন। ভাবলাম, আমি যাব রমজান মাতবরের বাড়ি। সেই অসামান্যা মায়ের সঙ্গে একটু গল্প করে আসি। একটু দেখে আসি তাঁকে।

এলাম মাতবরের বাড়িতে। এসে দেখি ভদ্রমহিলা উদাস হয়ে বসে আছেন বারান্দায়। আমাকে দেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। বাজান, আপনে আতকা আমগো বাড়িতে?

আপনাকে দেখতে এলাম।

কন কি?

জি।

খুব খুশি হইলাম বাজান, খুব খুশি হইলাম।

আপনি আছেন কেমন?

তিনি অদ্ভুত একটা কথা বললেন, বাজান, বাঁইচা আছি আর কি! শরিলটা বাঁইচা আছে, মনটা বাঁইচা নাই। যেই শরিল লইয়া ঘুইরা বেড়াই, রান্নাবান্না করি, ভাত-পানি খাই, ঘুমাই, এইটা একটা মরা মানুষের শরিল। মন বাঁইচা না থাকলে শরিলের কোনো দাম নাই।

আমি হতবাক। আপনি এত সুন্দর করে কথা বলেন, আমার খুব ভালো লাগে আপনার কথা শুনতে। আমি আসলে আপনার কথা শোনার জন্যই এলাম।

ওই দেখো, আমি তো আপনেরে খাড়া করাইয়া রাখলাম। একটু খাড়ান বাজান, একখান চেয়ার আইনা দেই।

না না, দরকার নেই। আমি এখানেই, এই মাটির পৈঠায়ই বসতে পারব। আপনি ব্যস্ত হবেন না।

তিনি যেখানে বসে ছিলেন আমি তাঁর পাশের জায়গাটায় বসলাম। পরনে জিন্স থাকলে যেকোনো জায়গায় বসা যায়। বসে আমি তাঁর দিকে তাকালাম। বসুন, আপনার সঙ্গে কথা বলি।

সেইটা বলেন। তয় একটু গুড়-মুড়ি আইনা দেই, বাজান? খান, আমার সামনে বইসা খান। খাইতে খাইতে কথা বলেন। মা বাপ ভাই বোইন বেবাক ছাইড়া এই গেরামে পইড়া রইছেন, বাপ আর ভাই বোইনের মন আপনের লেইগা কান্দে কি না জানি না, তয় মার মন যে কান্দে, এইটা কইতে হইব না, এইটা আমি বুঝি।

তিনি ঘরে ঢুকলেন। দু-তিন মিনিটের মধ্যে সুন্দর একটা রেকাবিতে লালচে ধরনের মুড়ি আর বিলুদের হাতের মুঠো সাইজের খেজুরে গুড়ের একটা টুকরা নিয়ে এলেন। আমার হাতে দিয়ে গভীর মমত্বের গলায় বললেন, খান বাজান, খান।

আমি গুড়-মুড়ির রেকাবিটা নিলাম। খেতে লাগলাম। তিনি আমার পাশে বসলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দুনিয়ার একেকজন মানুষের দুঃখ একেক রকম, বাজান। আমার দুঃখ এক রকম, আপনের দুঃখ আরেক রকম। আমার অন্তর পোড়ে আমার হারায়া যাওয়া চাইর পোলার জইন্য, আপনের অন্তর পোড়ে মা বাপের জইন্য। ভাই বোইনের জইন্য।

বাবার জন্য পোড়ে না।

ক্যান, বাজান? বাবার জইন্য অন্তর আপনের পোড়ে না ক্যান?

বাবা আমি একজন পেয়েছিলাম।

অর্থ কী কথাটার, বাজান?

ছোট ছোট ভাইও পেয়েছিলাম। বোন পাইনি।

আমি একটু উদাস হলাম। আর পাইনি মাকে।

এ রকম কথা শোনলে আমার পরানটা বাজান কান্দে। মা পান নাই ক্যান?

আমার জীবনের কথা পুরোপুরি খুলে বলতে ইচ্ছা করল তাঁকে। এমন একজন মানুষের কাছে জীবনের সব কথা বলা যায়।

তার পরও সব দিক বিবেচনা করে সব কথা আমি বললাম না। বললাম শুধু এতিমখানার কথা। হাসান স্যারের কথা বললাম, বিলুদের কথা বললাম। মা বাবা নেই, এসব বললাম। এতিমখানায় কিভাবে এসেছিলাম সেসব বললাম না।

শুনে তিনি মায়াবী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাইলে তো বাজান আপনেও এক দুঃখী মানুষ। আপন মা বাপ পান নাই, ভাই বোইন পান নাই। দুনিয়াতে একলা মানুষ।

জি। কিন্তু নিজেকে আমি একলা ভাবি না। এই যে কত মানুষ চারপাশে! এলাম আপনাদের গ্রামে, কত মানুষ পেলাম এখানে। এখানে না এলে আপনার মতো একজন মানুষ কোথায় পেতাম বলুন?

এই রকম কথা শোনলে আমার পরানটা বাজান কান্দে, খুব কান্দে। পোলা চাইরটার কথা মনে হয়। পোলা চাইরটা আমারে ছাইড়া কোথায় চইলা গেছে! আর কোনো দিন ফিরত আসব না!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আতকা এই বাড়ির চাইর দিক থিকা, এই ঘরের চাইর দিক থিকা পোলা চাইরটা একদিন দৌড়াইয়া আসব। আইসা মা মা বইলা আমারে জড়ায়া ধরব।

আমি গুড়-মুড়ি চিবাতে চিবাতে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। মনের মধ্যে একটা চিন্তা খেলা করছে। সেই চিন্তার কথা মনেই চেপে রাখলাম। মুখে বললাম, যদি সত্যি ও রকম কোনো দিন ঘটে? আপনি যেভাবে ভাবছেন ঠিক সেইভাবে আপনার ছেলে চারটা ফেরত এলো। বাড়ির চারদিক থেকে, ঘরের চারদিক থেকে ছুটে এসে আপনাকে ওভাবে ডাকল, আপনাকে জড়িয়ে ধরল। তখন আপনি কী করবেন?

পোলা চাইরটারে আমি আমার বুকে জড়াইয়া রাখুম, বাজান। কোনো দিন আমারে ছাইড়া যাইতে দিমু না। কোনো দিন না।

তাঁর চোখ দুটো ছলছল করতে লাগল। মইরা গেলেও যাইতে দিমু না।

আর যদি একটা ছেলে আসে? আমার বয়সী একটা ছেলে? তখন কী করবেন?

তারেও বুকে জড়ায়া ধরুম, বাজান। মনে করুম চাইর পোলা না, আমার আসলে একখানই পোলা। ছোটকালে হারায়া গেছিল, বড়কালে ফিরত আইছে।

তাঁর চোখ ছলছল করতে দেখেছি, এখন দেখছি চোখ ভরে গেছে পানিতে। গাল বেয়ে নামার আগেই তিনি আঁচলে চেপে চেপে চোখ মুছলেন। আপনের জইন্যও এখন মায়া লাগতাছে, বাজান। খুব মায়া লাগতাছে। দুনিয়ায় কেউ নাই আপনের, না মা না বাপ, না ভাই বোইন আত্মীয়-স্বজন। আপনে একলা একজন মানুষ। আইজ থিকা আপনের কথা ভাইবাও মনটা আমার কানব। আপনেরে দেখতে ইচ্ছা করব, আপনের লগে কথা কইতে ইচ্ছা করব। আপনে বাজান আমার কাছে আইসেন মাঝে মাঝে। মা মনে কইরা আইসেন।

রমজান মাতবরের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকে বারবার শুধু ওই ভদ্রমহিলার কথা মনে পড়ছে। পৃথিবীর সব মা কি এ রকম হন? সন্তান বলতে পাগল। এক দেখছি চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রীকে, আরেক দেখছি রমজান মাতবরের স্ত্রীকে। এই দুজন মানুষকে দেখে খুব মনে পড়ে নিজের সেই না-দেখা মাকে।

কেমন ছিলেন তিনি?

কার মতো দেখতে?

আমার মায়ের মুখের ছায়া কি আছে আমার চেহারায়?

বাবার? নাকি আমি পেয়েছি বাবার চেহারা?

ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে এসব ভাবছি, দরজার কাছে মৃদু গলা খাঁকারি। চমকে তাকালাম। বেলি দাঁড়িয়ে আছে। এই মনোরম বিকেলে তাকে খুব সুন্দর লাগছে। হালকা হলুদ কামিজ পরা, সাদা সালোয়ার। ওড়নাও সাদা। মুখটা কী নির্মল, চোখ দুটো কী অপূর্ব! এই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কে বলবে, মেয়েটির মাথার ঠিক নেই। সে পাগল।

আপনি হঠাৎ এই ঘরে?

বেলি ভেতরে ঢুকল। শান্ত স্নিগ্ধ গলায় বলল, আপনি না, তুমি।

আমি হাসলাম। সেটা খুব রিস্কি হবে না?

কেন?

এই যে আপনি পারমিশন দিলেন তুমি করে বলার, দেখা গেল এই পারমিশনের কথা আপনার মনে থাকল না। ভুলে গেলেন। আমি আপনার পারমিশনের কারণে তুমি করে বলতে গিয়ে যা-তা একটা অপমানকর পরিস্থিতিতে পড়লাম। আপনি আমাকে মাস্টারের পো মাস্টার বলে একটা গাল দিয়ে দিলেন।

বোধ হয় আর হবে না।

আমি আসলে এখানে এসে খুব বড় রকমের একটা যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছি।

সেটা ঠিক। যন্ত্রণার মধ্যেই পড়েছেন। পাগল তো যন্ত্রণা আপনাকে দেবেই।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমার ছাত্রী কিংবা রোগীটিকে আমি বুঝতেই পারছি না। সে একেকবার একেক রকম।

তা-ই তো হওয়ার কথা। পাগল ছাত্রী এ রকমই হবে। এই ভালো, এই খারাপ। বর্ষাকালের আকাশের মতো। এই মেঘ, এই রৌদ্র।

তুমি যখন এইভাবে কথা বলো, আমি ভাবতেই পারি না, এই তুমিই আবার ও রকম ভাষায় কথা বলতে পারো। ও রকম ব্যবহার করতে পারো।

আমার ওই ভাষাটা খুব পচা, না?

হ্যাঁ, খুবই পচা। তোমার মুখে একদমই মানায় না।

আমার তাহলে কী রকম ভাষায় কথা বলা উচিত?

এই যে এখন যেভাবে বলছ। তার ওপর তুমি হচ্ছ রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। তাঁর গান করো। তোমার কথা শুনলেই মানুষের মনে হবে একজন রবীন্দ্র-অনুরাগিণী কথা বলছেন, একজন শিল্পী কথা বলছেন। তোমার কথা শুনে দুপুরবেলার মানুষদের মনে হবে,

কুয়ার ধারে দুপুরবেলা তেমনি ডাকে পাখি

তেমনি কাঁপে নিমের পাতা, আমি বসেই থাকি।

তোমার কথা শুনে মানুষ স্থির হয়ে বসে থাকবে। তোমাকে দেখে সকালবেলা মনে হবে,

এই তো ভালো লেগেছিল

আলোর নাচন পাতায় পাতায়।

বেলি হাসল। বাহ্, আপনিও দেখি রবীন্দ্রনাথ কম জানেন না। মানুষকে ভালোই ইমপ্রেস করতে পারেন। ভাষার কথা তো বললেন, এবার ব্যবহারের কথা বলুন।

ব্যবহার ভাষার সঙ্গে রিলেটেড। সুন্দর ভাষায় মানুষকে গাল দিলেও সেটা শুনতে ভালো লাগে।

তাহলে এখন থেকে সুন্দর ভাষায় আপনাকে আমি গালও দিতে পারব?

দরকার হলে দেবে। শুনতে নিশ্চয় খারাপ লাগবে না।

বেলি উদাস হলো। বিষণ্ন গলায় বলল, কী করব বলুন। আমার মাথার ঠিক থাকে না। মনটা এলোমেলো হয়ে যায়।

তা আমি বুঝি। আচ্ছা শোনো, সেদিনের পর থেকে একটা ব্যাপারে আমি খুবই ভয় পাচ্ছি।

কোন ব্যাপারে বলুন তো?

তুমি স্লিপিং পিল কোথায় পেয়েছিলে?

আমার কাছে থাকে তো!

কত দিন ধরে?

সাত-আট মাস ধরেই থাকে।

তার মানে তুমি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে?

হ্যাঁ।

ডাক্তার তোমাকে সাবধান করেননি?

আমাকে তো করেছেনই, মা-বাবাকেও করেছেন।

কী বলেছিলেন?

বলেছিলেন মেন্টাল পেশেন্টদের হাতের কাছে কোনো ওষুধ রাখতে নেই। রাখলে যখন-তখন বিপদ হতে পারে।

তাহলে? তোমরা এটা মানোনি? তোমার বাবা না হয় চেয়ারম্যান মানুষ, সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন, তাঁর হয়তো অনেক কিছু খেয়াল থাকে না; কিন্তু তোমার মা? তিনি তো সারাক্ষণ তোমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখেন। তিনি কী করে এই ভুলটা করলেন?

মা কোনো ভুল করেননি। আমার ওষুধ সব তাঁর কাছেই থাকে। তিনিই আমাকে ওষুধ খাইয়ে দেন।

তাহলে তুমি সেদিন স্লিপিং পিল কোথায় পেয়েছিলে?

বেলি হাসল। আমার কালেকশনে কিছু স্লিপিং পিল আছে। আমি জোগাড় করে রেখেছি।

কিভাবে?

চাইলেই অনেক কিছু সম্ভব। মা হয়তো ঘরে নেই, আমি আমার ওষুধের বাক্স থেকে একটা দুটো করে ওষুধ সরিয়ে রাখলাম। এইভাবে করেছি। আমার কালেকশনে এখনো বেশ কিছু ট্যাবলেট আছে।

খুবই বিপদের কথা।

তা ঠিক। মাথা এলোমেলো হলে, পাগল পাগল লাগলে যেকোনো সময় আমি একমুঠো ট্যাবলেট মুখে দিয়ে ফেলতে পারি।

সর্বনাশ!

বেলি চুপ করে রইল।

সেদিন কী ট্যাবলেট খেয়েছিলে?

ওটা তেমন কিছু ট্যাবলেট না। সেডিল।

কয়টা খেয়েছিলে?

বেশি না। তিনটা না চারটা যেন।

আমি বেলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, আর কখনো এটা কোরো না।

বেলি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আপনার কথা আমি কেন শুনব?

আমি একটু থতমত খেলাম। না মানে...

পরিষ্কার করে বলুন, আপনার কথা আমি কেন শুনব?

আমি তোমার টিচার, ডাক্তার...

আমি আপনার কাছে অন্য রকম কোনো কথা আশা করেছিলাম।

আমি আবার বেলির চোখের দিকে তাকালাম। ধীর শান্ত গলায় বললাম, আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী। এখানে আসার পর থেকে প্রতিটা মুহূর্তে তোমার মঙ্গল কামনা করছি। তোমার ভালো চাই। চাই তুমি ভালো হয়ে ওঠো, ভালো থাকো। যে আনন্দময় জীবন তোমার ছিল, লেখাপড়া, গান শোনা, সিনেমা নাটক দেখা, রবীন্দ্রনাথে মগ্ন হয়ে থাকা; আমি চাই তুমি সেই জীবনে ফিরে যাও। ফিরে পাও তুমি সেই জীবন। অন্তর থেকে চাই। অন্তর থেকে তোমার শুভ কামনা করি।

বেলির চোখ ছলছল করে উঠল। আমি কি আপনার কথা বিশ্বাস করব?

আমি দৃঢ় গলায় বললাম, এক শ ভাগ।

তাহলে আপনি আমাকে একটু সাহায্য করুন না! আমাকে একটু বাঁচার পথ করে দিন না! আমি বাঁচতে চাই, আমি সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। আমার মন ঠিক করে আমি বাঁচতে চাই। আরেকজন মানুষকেও বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আপনি আমাকে দয়া করুন। প্লিজ, প্লিজ।

বেলি হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ল। চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল আমার ঘর থেকে।

বেলির এত কথার একটি কথাই আমার মাথায় তখন খেলা করছে। সে আরেকজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। সেই মানুষটা কে? বেলি সেদিন ঘুমভাঙা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে যে মানুষটার নাম উচ্চারণ করেছিল, এই কি তাহলে সেই মানুষ? মনজু?

রহস্য আরো দানা বাঁধতে লাগল।

মনজু নামটা নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব, তাঁর স্ত্রী, সুন্দরী, বদরু—সবাই আমার সঙ্গে এক ধরনের চালাকি করেছে। কেউ স্বীকারই করেনি এই নামের কাউকে তারা চেনে। নানা ধরনের কথায় আমাকে ভোলানোর চেষ্টা করেছে। সুন্দরী মনজু নামটাকে অবিরাম মজনু মজনু বলে গেল। লাইলির সঙ্গে জড়াল। বদরু করল ফাজলামো। চেয়ারম্যান সাহেব আর তাঁর স্ত্রী এড়িয়ে গেলেন। আজ বেলি যে ইঙ্গিত দিল তাতে আমার মনে হচ্ছে ঘটনা ওই মনজুকে নিয়েই। বেলির পাগল হওয়ার কারণও মনজুই।

মনজু কে?

কোথায় আছে সে?

মনজুর জন্য বেলি কেন পাগল হলো?

বেলি সেদিন বলল সে বিবাহিতা। পাগলামি করেই বলল। স্বামী মারা গেছে, সে বিধবা ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে কি সেই পাগলামির ছলেই এসব বলেছে, নাকি সত্য কথা বলেছে পাগলামির ভান ধরে? অথবা তার ওসব কথাবার্তার আড়ালে আছে অন্য রকমের কোনো ইঙ্গিত? আমি যা সন্দেহ করেছি, প্রেম-ভালোবাসা বা গোপনে বিয়ে করে ফেলা—এই ধরনের কোনো বিষয় নেই তো বেলির কথার মধ্যে? আজ যে নিজের এবং আরেকজন মানুষের বাঁচার আকুতি প্রকাশ করল, সেই মানুষটা কে? মনজু?

 

 

পাঁচ.

 

এখানে এসে চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আমার।

চরিত্রটা কখন কোন ফাঁকে যেন বদলে গেল। অথবা আমি নিজেই নিজের অজান্তে বদলে ফেলেছি। কোথায় সেই হাসি-আনন্দ করা, ঠাট্টা-মসকরা করা রবি আর কোথায় এখনকার আমি?

এখানে আমি অবশ্য আগের আমি নই। নামটাই বদলে গেছে। আমি এখন আর রবিউল হাসান নই, আমি হচ্ছি নজরুল ইসলাম। নজরুল মাস্টার। বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়া জনৈক নজরুল ইসলাম ওরফে নজরুল মাস্টার হয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে বিরাজ করছি। এক দিনও পড়াইনি এমন পাগল ছাত্রীর গৃহশিক্ষক, সেই ছাত্রীর আবার মানসিক ডাক্তারও। লেখাপড়া তাকে করানোর চান্স এখনো পাইনি। এক দিন শুধু নাক টিপে ঘুম ভাঙিয়েছিলাম, ডাক্তারি বলতে ওটুকুই। তাতেই বাড়িতে আমার কিছুটা সুনাম বৃদ্ধি হয়েছে।

অন্যদিকে নিজের অজান্তে আমি একজন গোয়েন্দার চরিত্র ধারণ করেছি। বেলির পাগল হওয়ার রহস্য নিয়ে সারাক্ষণ ভেতরে ভেতরে ভাবছি। পেঁয়াজের খোসার মতো একটা একটা করে পর্দা সরছে চোখের সামনে থেকে। মনজু নামের একটা নাম এসেছে বেলির মুখ থেকে। কাল ইঙ্গিত পেলাম বেলি একজনকে বাঁচাতে চাইছে, সে নিজেও সুস্থ হতে চাইছে, বাঁচতে চাইছে। তাতে রহস্য আরো ঘনীভূত হচ্ছে। তাহলে কি মনজুকেই সে বাঁচাতে চাইছে?

মনজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? প্রেমের? তারা প্রেমিক-প্রেমিকা? নাকি স্বামী-স্ত্রী?

গোয়েন্দাদের জীবন একটু গুরুগম্ভীর ধরনের। আমি তেমন হয়ে উঠছি। সারাক্ষণ ওই রহস্য উন্মোচনের খেলা চলছে মাথায়। বোধ হয় এ কারণেই চরিত্র বদলে গেছে। সঙ্গে বোধ হয় অন্য কারণও আছে। এই বাড়িতে এসে পুরো পাগল, আধাপাগল, বদরু টাইপের ত্যাঁদড়, এই টাইপের মানুষের সারাক্ষণের হাস্যকর কার্যকলাপ দেখতে দেখতে আমি বোধ হয় নিজের রসবোধটা হারিয়ে ফেলেছি।

কিন্তু নিজের চরিত্র বদলানো কি ঠিক? মানুষের চরিত্র কি আসলে বদলায়? স্বভাব যায় না ম’লে—কথাটা কতটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

নাকি আমি আসলে এই রকমই। এতিমখানা থেকে বেরিয়ে আসার পর কি আমার আসল চরিত্র প্রকাশিত হচ্ছে? এতিমখানায় বিলুদের সঙ্গে যা করতাম, সেটা হয়তো পরিবেশের কারণে করতাম। এই বাড়িতে এসেও হয়তো পরিবেশের কারণেই আমি নিজের অজান্তে বদলাচ্ছি। পরিবেশ অনুযায়ী মানুষ যে বদলায় এটা অতি সত্য। আমি তার প্রমাণ।

এসব ভাবতে ভাবতে বাগানের দিকে যাচ্ছি। আমার ঘরের পেছন দিক দিয়ে যাচ্ছি, দেখি রাস্তার দিক থেকে একজন লোক হেঁটে আসছে। এই বাড়িতে চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে যখন-তখন নানা পদের মানুষ আসে। এই ইউনিয়নেরই লোকজন সবাই। আশপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের লোক। নারী-পুরুষ অনেকেই। তারা নানা রকম প্রয়োজন, নানা রকম বিচার সালিস অভিযোগ নিয়ে আসে। চেয়ারম্যানের কাছে লোক আসবে—এটাই স্বাভাবিক। আমি তেমন খেয়াল করে কাউকে দেখি না।

এই লোকটাকেও দেখছিলাম না। মুখোমুখি পড়ে যাওয়ার ফলে মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী যেভাবে তাকায়, সেভাবে তাকালাম। তাকিয়ে একটু অবাকই লাগল। খুবই নিরীহ গোবেচারা ধরনের চেহারা। ছোটখাটো, বেঁটেমতন একটা লোক। পরনে ছাই রঙের পুরনো ময়লা প্যান্ট আর গেরুয়া রঙের ফতুয়া। মুখে মাথায় ঘন চুল দাড়ি। দাড়ি ছোট ছোট করে ছাঁটা। চুলও তা-ই। তবে চুল দাড়িতে সে মেহেদি লাগায়। কালোর ফাঁকে ফাঁকে লালচে চুল দাড়ি। গায়ের রং রোদে পোড়া, কালো। শরীর বেশ শক্তপোক্ত বোঝা যায়। চোখ দুটো অদ্ভুত। চোখে যেন পলক পড়ে না। অতি শীতল ধরনের অন্তর্ভেদী একটা দৃষ্টি আর ভাটার মতো চোখ। এই রকম চোখের দিকে তাকালে বুক কী রকম হিম হয়ে আসে। বয়স হবে চল্লিশের কোঠায়।

মুখোমুখি পড়ার ফলে আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু যেন কেঁপে উঠলাম। কেন এমন হলো ঠিক বুঝতে পারলাম না। নিজের অজান্তেই যেন বললাম, আপনি কে? কাকে চান?

নিশ্চয় চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে এসেছে, তার পরও প্রশ্নটা আমি করলাম। লোকটা বিনয়ী গলায় বলল, আমার নাম আবদুর রব। চাই চেরম্যান সাবরে। তিনায় তো বোধ হয় বাড়িতেই আছেন।

জি, বাড়িতেই আছেন। খানিক আগে দেখেছি। ভেতরবাড়িতে আছেন। কাছারিঘরে আসেননি।

আপনি কে, বাজান? আপনেরে চিনলাম না।

আমি চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ের টিচার।

আলহামদু লিল্লাহ। আম্মাজান তাইলে ভালো হইয়া গেছে? লেখাপড়া শুরু করছে? খুশি হইলাম, খুব খুশি হইলাম।

কথা বলার ফাঁকে দেখি তার ওই শীতল ধরনের বুক হিম করা চোখে পানি। লোকটা নিঃশব্দে কাঁদছে। আমি অবাক। আপনি কাঁদছেন কেন?

হাতের চেটোয় চোখ মুছল সে। কান্দি না, বাজান। এইটা আমার স্বভাব। টাইমে-বেটাইমে চোখে পানি আসে। যাই, চেরম্যান সাবের লগে দেখা করি। তিনায় আমার বহুত দিনের চেনা। ভালো জানেন আমারে। এই বাড়িতে ঢোকতে আমার কোনো অসুবিধা নাই।

লোকটা বাড়িতে ঢুকল। আমি আর বাইরে গেলাম না, আমিও বাড়িতে ঢুকলাম। কেন যেন ইচ্ছা করছে লোকটাকে একটু খেয়াল করি। ওই গোয়েন্দা মনটা বোধ হয় চাগা দিয়ে উঠেছে।

বাগানের দিককার পুকুর থেকে গোসল করে এসেছে সুন্দরী। হাতে ভেজা শাড়ি ছায়া। রব লোকটার মুখোমুখি পড়ল সে। এখন নিশ্চয় মজার কোনো কাণ্ড ঘটবে। আমি আড়ালে চলে গেলাম। দেখি কাণ্ডটা কী হয়।

রবকে দেখেই থতমত খেল সুন্দরী। একটু আড়ষ্টও যেন হলো। লোকটা আমার দিকে যেভাবে তাকিয়েছিল, সেভাবে সুন্দরীর দিকেও তাকিয়েছে।

সুন্দরী বলল, আপনে কেডা? এমনে চাইয়া রইছেন ক্যান?

আশ্চর্য ব্যাপার, লোকটা বলল, আমার নাম মোতালেব। এমনে চাইয়া রই নাই মা, এইটা আমার চোখের দোষ।

আমি খুবই অবাক হয়েছি। লোকটা আমাকে বলল তার নাম আবদুর রব আর সুন্দরীকে বলছে তার নাম মোতালেব। ঘটনা কী?

সুন্দরী তখন হাসিমুখে তার সঙ্গে কথা বলছে। ও, আপনের চোখের দোষ? আগে কইবেন না?

আগে কেমনে কমু, মা? তোমার লগে তো দেখাই হইল অহন?

জে, হেইডা ঠিক। তয় আপনের চোখ দুইখান বিরাট সোন্দর। চাইলে খালি চাইয়াই থাকতে ইচ্ছা করে। আমি বাঘ দেখি নাই। তয় মনে হয় বাঘের চোখ আর আপনের চোখ এক রকম। চাইয়া থাকলে মনে হয় থাবা দিয়া খাইয়া ফালাইবেন।

সুন্দরীও রব কিংবা মোতালেব নামের লোকটার চোখের ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। কিন্তু লোকটা আমাকে এক নাম আর সুন্দরীকে আরেক নাম বলছে কেন?

রব বা মোতালেব নামের লোকটা সুন্দরীর মুখে তার চোখের কথা শুনে বলল, মাগো, মা জননী, আমি ওই পদের মানুষ না। আমি মানুষ হিসাবে বহুত ভালো। মনটা কাদার মতন নরম।

আড়াল থেকে দেখছি লোকটা চোখ মোছে। চোখ মুছতে মুছতে বলল, কথায় কথায় খালি কান্দন আসে। এই যে দেখো না, এখনো কানতাছি।

হায় হায়, সত্যই দেখি কানতাছেন। কাইন্দেন না, কাইন্দেন না। আমি আবার অন্যরে কানতে দেখলে নিজেই কাইন্দা ফালাই।

সুন্দরীর কাঁদো কাঁদো ভঙ্গি। এই যে দেখেন, আপনেরে কানতে দেইখা আমার কান্দন আইসা পড়ছে।

সুন্দরী চোখ মুছতে লাগল।

লোকটা বলল, তোমারে দেইখা খুশি হইলাম, মা জননী। নিজের মতন মানুষ দেখলে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার লগে আমার অনেক মিল। কথায় কথায় আমরা খালি কান্দি।

তয় এইখানে খাড়াইয়া আপনে আমি কান্দাকান্দি করলে বাড়ির মাইনসে উল্টাপাল্টা চিন্তা করতে পারে। যান, আপনে আপনার কামে যান, আমি আমার কামে যাই।

আইচ্ছা মা জননী, যাইতাছি।

তয় আসল কথাডা তো কইলেন না?

আসল কথা কোনডা, মা?

আইছেন কার কাছে?

এই বাড়িতে মানুষ কার কাছে আসে?

চেরম্যান সাবের কাছে আসে। তয় অন্য মানুষজনও তো বাড়িতে আছে। তাগো কাছেও আইতে পারে। মানুষের আত্মীয়-স্বজন থাকে না? আত্মীয়র কাছে আত্মীয় আইতে পারে না?

হ মা, সেইটা পারে।

তয়?

আমি আইছি আসলে মানুষটার কাছে।

বুজছি, চেরম্যান সাবের কাছে। তয় চেরম্যান সাবে অহন ভাত-পানি খাইয়া ঘুম দিছে। আপনে গিয়া কাছারিঘরে নাইলে ওই ঘরের বারান্দায় বইসা থাকেন গিয়া। আমি আপনেরে এক কাপ চা পাডামু নে। কেউরে দিয়া পাডামু না, নিজেই দিয়া আসুম নে।

আইচ্ছা মা। তয় খালি চা দিয়ো না, দোফর পার হইয়া গেছে, ভাত খাই নাই, না না, ভাত দেওন লাগব না, চার লগে বেশি কইরা নাশতাপানি দিলেই হইব। বহুত খিদা লাগছে।

লোকটা কাছারিঘরের দিকে চলে গেল। আর সুন্দরী তার স্বভাব অনুযায়ী যেকোনো লোকের পেছনে করা মন্তব্যটা করল। গোলামের পোয় তো মনে হয় রাক্ষস। চক্ষু দিয়া খায়, মুখ দিয়াও খায়।

চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রীকে দেখা গেল এ সময়। এই বাড়িতে আসার পর আজই প্রথম তাঁকে দেখলাম কাছারিঘরে গিয়েছিলেন। তিনি খুবই পরিচ্ছন্ন ধরনের মানুষ। চেয়ারম্যান সাহেব ঘুমাচ্ছেন দেখে নিশ্চয় কাছারিঘরে ঢুকে দেখে এলেন ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আছে কি না। আমার ঘরেও একদিন এসেছিলেন ওসব দেখতে। ময়লা নোংরা তিনি একেবারে সহ্য করতে পারেন না।

লোকটার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হলো তাঁর। লোকটা তাঁকে সালাম দিল। আসসেলামালাইকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম। আপনি কে?

আমি কিন্তু লোকটার পেছনে লেগে আছি। সে মুভ করার সঙ্গে সঙ্গে আমিও আড়াল থেকে প্রায় তার পাশাপাশি আছি। আপনি কে প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, আমার নাম গফুর। আবদুল গফুর।

আমি আরেকটা ধাক্কা খেলাম। একি? এখন দেখি আগের নাম দুটোর কোনোটাই বলছে না। বলছে তার নাম গফুর। ঘটনা কী? খুবই রহস্যময় চরিত্র মনে হচ্ছে।

চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, আসছেন কোথায় থিকা?

বাড়ি হইল নয়নপুর।

সে নিশ্চয় তার ওই পলক না পড়া চোখে তাকিয়ে আছে, আমার মনে হলো চেয়ারম্যানস্ত্রী একটু আড়ষ্ট। বললেন, কী কাজ করেন?

লোকটার চোখে বোধ হয় পানি এলো। সে চোখ মুছল। গরিব মানুষ, মালকিন। খেতখোলার কাম করি। তয় পেট চলে না। বউ পোলাপান লইয়া কষ্টে থাকি।

চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে আসছেন কী কাজে?

কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল, আসছি মালকিন সাহায্যের আশায়। চেয়ারম্যান সাহেব বহুত দয়ালু মানুষ। সাহায্য চাইলেই করেন। এই জইন্য আসছি।

সে আবার চোখ মুছল। আপনে আমার জইন্য একটু দোয়া কইরেন, মালকিন। চেয়ারম্যান সাবে য্যান আমারে সাহায্যটা করেন।

ঠিক আছে। এখন যান। কাছারিঘরের বাইরের দিককার বারান্দায় গিয়ে বসে থাকেন।

আইচ্ছা মালকিন, আইচ্ছা।

লোকটা ওদিক পানে চলে যাওয়ার পরও একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন চেয়ারম্যানস্ত্রী। কী যেন ভাবলেন।

আমি লোকটার পেছনে লেগেই রইলাম। তিনজন মানুষের কাছে তিনটা নাম বলেছে সে। তার নাম-রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।

কাছারিঘরের সামনের দিককার বারান্দায় এসে সে পড়ল বদরুর পাল্লায়। বদরু অবশ্য প্রথমে তাকে দেখেনি। বারান্দায় বসে সে ঘুমে ঢুলছে। লোকটা এসে তার কাঁধে হাত দিল। বদরু থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াল। এ রকম একটা লোক তার কাঁধে হাত দিয়েছে এটা বোধ হয় তার পছন্দ হলো না। খেঁকুরে গলায় বলল, তুই কে রে?

আচমকা এ রকম কথা শুনলে যে কারো ভড়কে যাওয়ার কথা। লোকটা ভড়কাল না। বলল, আপনে তো ভাই মহা ট্যাটন। কথা নাই বার্তা নাই একটা মানুষরে তুই তুই কইরা কইতাছেন? আমার চেহারা কি চোরচোট্টার লাহান যে আমারে তুই কইরা কইলেন?

বদরু বলল, না, তোর চেহারা চোরচোট্টার লাহান না। তোর চেহারা গিরস্তের মতনই, তয় চোখ দুইটা ডাকাইতের মতন। ডাকাতি করছনি?

ধুরো মিয়া, আমি চোর ডাকাইত না।

তয় তুই কী?

আমি হইলাম সেই মানুষ, অর্থাৎ আমার স্বভাব হইল যে আমার লগে যেমুন ব্যবহার করব, আমিও তার লগে সেই ব্যবহারই করি।

বুজছি...

তরে আর আপনে কইরা কইতাছি না। তুই কইরাই কই। তুই কে?

চেহারা দেইখাই চিনন উচিত আছিল। দিনে বইয়া বইয়া ঘুমে ঢুলে কারা?

চোরচোট্টারা।

এত খারাপ ভাষায় কইচ না। ক দিনে ঘুমে ঢুলে রাইতের জীবরা। আমি হইলাম রাইতের জীব।

আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের সব কথাই শুনছিলাম। হাসি পাচ্ছিল, জোর করে হাসি চেপে রাখলাম। তখন দেখি লোকটার সেই কায়দা। চোখে পানি। চোখ মুছতে মুছতে বলল, রাইতের জীব? তুই রাইতের জীব?

জে।

না, তয় তো আমি চোখের পানি ধইরা রাখতে পারতাছি না। তোর লেইগা আমার কান্দন আসতাছে।

লোকটা চোখ মুছতে লাগল।

বদরু অবাক। আরে, সত্যই দেখি কান্দে। আরে না না মিয়াভাই, কাইন্দেন না, কাইন্দেন না। আমি আপনের লগে একটু মসকরা করলাম। নাম কী আপনের?

আমি উদ্গ্রীব হলাম। এ পর্যন্ত তিনটা নাম তিনজনকে সে বলেছে। আমাকে বলল, তার নাম আবদুর রব, সুন্দরীকে বলল মোতালেব। চেয়ারম্যানস্ত্রীকে বলল আবদুল গফুর। বদরুকেও অন্য একটা নাম বলে কি না...

তা-ই করল সে। বদরুর কথা শুনে বলল, এই তো লাইনে আইছেন। আমার নাম হইল কুদ্দুস। আবদুল কুদ্দুস।

ভালো নাম। কুদ্দুস। কদুর মতন।

কথাটা গায়ে মাখল না সে। বলল, এই বাড়িতে আইসা বাড়ির বেবাকতের লগে পরিচিত হইলাম। আগে পরিচয় আছিল খালি চেরম্যান সাবের লগে। এইবার মতলব কইরা আইছি, ঘুইরা ঘুইরা বাড়ির বেবাকতের লগে পরিচিত হমু।

হইছেন?

হইছি। বেবাকতের লগে পরিচিত হইয়াই খুশি হইছি।

আমার লগে?

পয়লা তুই-তুকারি শুইনা বেজার হইছিলাম। এখন খুশি।

তয় যান, রাস্তা মাপেন।

আপনে কী করবেন?

আর কী, একটু ঢুলি।

ঢুলেন ভাই, মনের সাধ মিটাইয়া ঢুলেন। আমি এই দিকেই আছি। চেরম্যান সাবের জইন্য অপেক্ষা করতে হইব।

সেইটা করেন। তয় একটা ব্যাপারে সাবধান করি। বেবাকতের লগে পরিচিত হইছেন ভালো কথা, খালি চেরম্যানের মাইয়ার লগে পরিচিত হইতে যাইয়েন না...

জানি।

বদরু অবাক। জানেন?

হ। চেরম্যান সাবের মাইয়ার লগে পরিচিত হইতে গেলে দাও দিয়া কোবও দিতে পারে।

একদম ঠিক।

তয় দাওয়ের কোবরে আমি ডরাই না। কোব খাওনের অভ্যাস আমার আছে।

কী?

না, কিছু না।

লোকটা মাঠের দিকে চলে গেল। বদরু চিন্তিত গলায় বলল, শালায় ডাকাইত নি?

আমি আমার ঘরের দিকে চলে এলাম। ওদিকটায় পায়চারি করতে লাগলাম। আসলে চেয়ারম্যান সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছি। কখন ঘুম থেকে ওঠেন তিনি, কখন কাছারিঘরে যান, সেই জন্য অপেক্ষা। তিনি কাছারিঘরে গেলেই ওই চার নামঅলা লোকটা সেই ঘরে এসে ঢুকবে। চেয়ারম্যান সাহেবের পরিচিত হলে চেয়ারম্যান সাহেব তাকে প্রকৃত নামে ডাকবেন। আমি আড়াল থেকে শুনতে চাই লোকটার প্রকৃত নাম কী। ওর বিভিন্ন নাম ধরার কারণ কী? তবে সে যে সহজ লোক না, বোঝা গেল বদরুকে সাইজ করতে দেখে। বদরু শুরু করেছিল তুই-তোকারি দিয়ে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, ভাটার মতো চোখের পানিতে ভেসে সে ঠিকই বদরুর সমীহটা আদায় করে নিল। ভালো রসবোধও আছে দেখলাম। সব মিলিয়ে রহস্যময় চরিত্র। বোঝা দরকার লোকটা কে।

চেয়ারম্যান সাহেব কাছারিঘরে এলেন মিনিট বিশেক পর। লোকটা চলে গিয়েছিল মাঠের দিকে। চোখ ছিল কাছারিঘরে। চেয়ারম্যান সাহেবকে ঢুকতে দেখে দ্রুত হেঁটে এলো। আমিও নিরাপদ একটা আড়াল দেখে দাঁড়ালাম।

কাছারিঘরে ঢুকেই চেয়ারম্যান সাহেবকে লম্বা একটা সালাম দিল লোকটা। আসসেলামালাইকুম।

চেয়ারম্যান সাহেবের ঘুম ভাঙা গম্ভীর গলা। ওয়ালাইকুম সালাম। আসছস নাকি খবির? আয়, বয়।

আচ্ছা, তাহলে চার নামঅলার আসল নাম হচ্ছে খবির। এবার দেখা যাক ওর নাম-রহস্যটা কী।

চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনে খবির বলল, আপনে ডাকছেন আর আমি না আইসা পারি, মালিক?

হ, এইটাই আমি তোর কাছে আশা করি। আমার অর্ডার পাইলেই তুই দৌড়াইয়া আসবি।

জি, মালিক।

তয় কোথাও কোনো বিঘ্ন হয় নাই তো?

আগে একটু বসি, মালিক?

বয় বয়। সিট ডাউন।

চেয়ারম্যান সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে বসল খবির। বহুত দূর হাঁইটা আইছি। আপনের পায়ের কাছে বইসা আরাম পাইলাম, মালিক।

তোর এই স্টাইলটা আমার ভালো লাগে।

কোনটা, মালিক?

এই যে কথায় কথায় মালিক মালিক করছ। আই লাইক ইট।

খবিরের চোখে বোধ হয় পানি এলো। মালিকরে মালিক বলুম না তয় কী বলুম? আপনে না থাকলে মালিক বউ-পোলাপান লইয়া না খাইয়া মরতাম। আপনে একটা কাম দিয়া আমারে বাঁচায় রাখছেন।

তোর খালি ওই একটাই কাম নাকি? অনলি ওয়ান কাম?

না, কামকাইজ আছে বিস্তর। করি না। আপনের ওই এক কাম লইয়াই আছি।

চোখ মোছ। কান্দাকাটি আমি পছন্দ করি না। আর তোর লাহান জিনিসের চোখে পানি মানায় না। ভেরি ব্যাড হেবিট।

খবির দ্রুত হাতে চোখ মুছল। না, তয় আর আপনের সামনে কান্দুম না, মালিক।

গুড, ভেরি গুড। এখন আসল খবর ক। সব ঠিকঠাক আছে তো? কোথাও কোনো বিঘ্ন নাই তো? এনি প্রবলেম?

নো প্রবলেম, মালিক। কোথাও কোনো বিঘ্ন নাই। আপনে যেইভাবে বলছেন ঠিক সেইভাবে সব করতাছি। সেইভাবেই তারে রাখছি।

খবিরের শেষ কথাটা আমার খুব কানে লাগল। চেয়ারম্যান সাহেবের কথামতো কাকে কোথায় রেখেছে সে?

এ সময় ট্রেতে করে নাশতা নিয়ে সুন্দরী এসে ঢুকল। এই যে মোতালেব ভাই, আপনের চা।

চেয়ারম্যান সাহেব অবাক। মোতালেব ভাই? মোতালেব ভাইডা কেডা? হু ইজ মোতালেব ভাই?

এই ভাইয়ের নামই তো মোতালেব ভাই।

হোয়াট?

সুন্দরী কাতর গলায় বলল, আমি আপনের ইংরেজি বুজতাছি না।

খবির বলল, তোমার বোজনের কাম নাই। তুমি চা-নাশতা রাইখা চইলা যাও।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, ওই তুই যা। বিঘ্ন করিছ না। গেটাউট।

যাইতাছি, যাইতাছি।

সুন্দরী বেরিয়ে গেল। আমি আড়াল থেকে সব দেখছি, সব শুনছি।

সুন্দরী বেরিয়ে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব খবিরকে বললেন, চা-নাশতা খা।

খাইতাছি, মালিক।

খবির খেতে শুরু করল।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, সুন্দরী তরে মোতালেব কইল ক্যান?

ওর নাম সুন্দরী নাকি, মালিক?

হ, সুন্দরী।

তয় মাইয়াডা নামের মতন না। বদসুরত।

সুন্দরী বদসুরত না খুবসুরত ওইটা চিন্তা করন তোর কাম না। তোরে যে কোচ্চেন করছি সেইটার জবাব দে। আনসার দে, আনসার।

খবির খেতে খেতে বলল, এই বাড়িতে ঢুইকা আমি মালিক একেকজনরে একেক নাম কইছি।

ক্যান? রিজনটা কী?

আসলে নামটা কেউরে কইতে চাই না। আমার মতন খুনি গুণ্ডাপাণ্ডার নাম যত লুকাইয়া রাখন যায় ততই ভালো।

ভেরি গুড ভেরি গুড। তুই বহুত ইনটেলিজেন্ট। আই লাইক ইট।

খবর দিছেন ক্যান, মালিক?

বোঝছ নাই, ক্যান খবর দিছি?

জি, বুজছি। বহুত ভালো কইরাই বুজছি।

তয় ক।

কইতাছি, মালিক।

খবির শব্দ করে চায়ে চুমুক দিল।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, খবির, তরে কিন্তু আমি বহুত বিলিভ করি। অর্থাৎ বহুত বিশ্বাস করি।

জানি, মালিক। আমি আপনের বিশ্বাস কোনো দিন নষ্ট করুম না।

সেইটা আমি জানি। তয় এই ক্ষেত্রে আমার কথাও আছে।

কী কথা, মালিক?

তর থিকা বহুত বড় মার্ডারার আমি। বহুত বড় গুণ্ডা। আমার লগে বেঈমানি করলে তরেই আমি মার্ডার কইরা ফালামু।

সেইটা আমি জানি, মালিক। এই জইন্য আপনের কাম হাতে নেওনের পর অন্য কাম বেবাক ছাইড়া দিছি। তয় মালিক আমার একখান কথা আছে।

বইলা ফালা। লেট করিছ না। হারি আপ, হারি আপ।

আপনে এককালীন যেই টাকা দিছিলেন সেই টাকা শেষ হইয়া গেছে। অহন চলতে পারি না। খরচ তো আমার ফিমিলির আর আমার একলা না। খরচ তো তারও আছে।

এ সময় বেলিকে দেখি দোতলা ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত হেঁটে এলো কাছারিঘরের পেছন দিককার দরজার সামনে। এই দরজাটা ভেজানোই থাকে বেশির ভাগ সময়। সেখানে কান পেতে দাঁড়াল সে। আমাকে দেখতে পায়নি। আমিও যে এই ঘরের কথাবার্তা সবই শুনতে পাচ্ছি, কল্পনাও করছে না।

ভেতরে চেয়ারম্যান সাহেব তখন বলছেন, এইটা নতুন কইরা বলার দরকার নাই। আই আন্ডারস্ট্যান্ড। তারে রাখছস কই?

সেইটা বলব না।

ক্যান?

আপনেই বলছেন এইটা বলা যাইব না। দেয়ালেরও কান আছে।

কারেক্ট কারেক্ট। দেয়ালেরও কান আছে।

তয় অবস্থা যা করছি, কোনো রকমে বাঁচাইয়া রাখছি আর কি। আপনে অডার দিলেই মাডার। দুনিয়া থিকা উঠাইয়া দিমু।

এই কথা শোনার পর বেলি খুবই দিশাহারা ভঙ্গিতে উঠানে নামল। আমার ঘরের দিকে দৌড় দিল। নিশ্চয় আমাকে কিছু বলবে। আমি ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছি। দ্রুত হেঁটে আমার ঘরে এলাম। বেলি থাবা দিয়ে আমার একটা হাত ধরল। চাপা উতলা গলায় বলল, ওই লোকটা, ওই লোকটা...

বেলি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগেই আমি তাকে ধরে ফেললাম। আরামদায়ক বসার চেয়ারগুলোর একটায় বসালাম। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে রইল তার। আমি দিশাহারা। কী করব এখন? চেয়ারম্যানস্ত্রীকে ডেকে আনব? সুন্দরীকে ডাকব? বলব বেলি ফিট হয়ে গেছে। ওর মাকে ডাকো।

তাহলে এখনই একটা হুলুস্থুল লাগবে বাড়িতে। চেয়ারম্যান সাহেবও ছুটে আসবেন। আমি এটা চাই না। আমি বেলির কাছ থেকে জানতে চাই খবির লোকটা আসলে কে। চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে তার কথাবার্তা সবই আমি শুনেছি। বুঝেছি অনেক কিছু। একেবারে পরিষ্কার বুঝিনি, যেটুকু আঁচ পেলাম তাতে বোঝা গেল কোনো একজনকে চেয়ারম্যান সাহেব খবিরের মাধ্যমে গুম করে রেখেছেন। এখন প্রশ্নটা হলো, সে কে?

লোকটাকে দেখে বেলিই বা ফিট হলো কেন?

বেলি কি তাহলে ঘটনা জানে?

যে গুম হয়ে আছে সে-ই কি মনজু?

এসব ক্ষেত্রে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। আমি মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলাম। একটা পানির বোতল থেকে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে বেলির চোখে-মুখে ছিটা দিলাম। তিন-চারবার দেওয়ার পর সে চোখ মেলে তাকাল। আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

পানি খাবে?

বেলি কথা বলল না।

একটু পানি খাও, ভালো লাগবে।

না, খাব না।

আমাকে বলবে, কেন তুমি ফিট হলে? লোকটা সম্পর্কে কী বলতে চাইলে?

বেলি উদাস চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। কথা বলল না।

 

 

ছয়.

 

 

আমি বুঝে গেছি ঘটনা কী ঘটেছে।

বেলি কারো সঙ্গে প্রেম করত কিংবা কাউকে গোপনে বিয়ে করে ফেলেছিল, চেয়ারম্যান সাহেব সেই ছেলেকে বেলির জীবন থেকে সরানোর জন্য ছেলেটিকে গুম করে দিয়েছেন। এই কাজে তাঁর সহযোগী হচ্ছে ওই খবির লোকটা। ওই লোকটার হাওলায় সেই ছেলে আছে। এবং আমি নিশ্চিত তার নামই মনজু।

ছেলেটার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। ভালোবেসে কোন আজাবের মধ্যে সে পড়েছে। নিজে পড়ে আছে কোথায় কোন বন্দিশালায় আর মুক্ত থেকেও পাগলামির বন্দিশালায়, মানসিক গভীর সংকটে পড়ে আছে বেলি।

আমার মায়া দুজনের জন্যই লাগছে। কী করি? ব্যাপারটার সঙ্গে জড়ানো কি আমার ঠিক হচ্ছে? কেন আমি পড়তে যাচ্ছি এক গভীর জটিলতায়? কোনো রকমে যদি চেয়ারম্যান সাহেব জানতে পারেন যে আমি গোয়েন্দাগিরি করছি, এই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছি, তাহলে তিনি কঠিন পথ ধরবেন। লাগবেন আমার পেছনে। আমার নাড়িনক্ষত্র খুঁজে বের করবেন। আমি যে নজরুল ইসলাম মাস্টার নই, এসব বের করে আমাকে প্রতারণার অভিযোগে জেলে ঢোকাবেন। নয়তো গুম করে ফেলবেন অথবা মার্ডার।

এই সব রিস্কের মধ্যে কেন যাচ্ছি আমি?

কী দরকার আমার গোয়েন্দাগিরির?

বেলির জীবন বেলির। তারটা সে বুঝুক। আমার কী?

তার পরই মনে হয়, একজন মানুষ হিসেবে একটি অসহায় মেয়ের পাশে আমার দাঁড়ানো উচিত। যে ছেলেটি অকারণে ভিকটিম হয়েছে, অকারণে বলছি এই কারণে, প্রেম-ভালোবাসা কোনো অপরাধ না। একজন মানুষ একজন মানুষের প্রেমে পড়বে, তাকে ভালোবাসবে, বিয়ে করবে—এর যেকোনোটাই হতে পারে। সে জন্য মা-বাবা মানসিক চাপে ফেলে মেয়েটিকে পাগল করে তুলবে, মেয়ের প্রেমিক বা স্বামীকে গুম করে ফেলবে, এটা হয় না, হতে পারে না।

সব জেনেবুঝেও সেই মেয়েটি আর তার প্রেমিক কিংবা স্বামীর পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়াবে না? আমার তো কোনো পিছুটান নেই। দুনিয়াতে সত্যিকার অর্থে কেউ নেই আমার। আমি যদি দুজন মানুষের উপকার করতে গিয়ে বা তাদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মারা যাই তাতে কী এমন ক্ষতি হবে? পৃথিবীতে আসার বয়স যখন এক দিন বা এক রাত, তার কয়েক ঘণ্টা পরই তো আমি মরে যেতে পারতাম। এতিমখানার গেটে আমাকে ফেলে রেখে গিয়েছিল আমার মা বা তার পরিবারের কেউ। কাক ঠোকরাতে শুরু করেছিল ভোরের আলো ফুটে ওঠার সময়। ওই কাকের ঠোকরেই তো আমি মরে যেতে পারতাম। তার মানে এই যে আমি বেঁচে আছি, পঁচিশ বছর বয়স হয়েছে আমার, এমএ পাস করেছি, এইভাবে জীবনের একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি, ধরে নিই এটা আমার বাড়তি জীবন। আমার এই বাড়তি জীবনটা আমি দুজন মানুষের উপকারে যদি লাগাতে পারি, তাহলে তো অন্তত এটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে আমি দুজন মানুষের জন্য কিছু করতে পেরেছি।

সারাটা রাত আমি এসব ভাবলাম। ঘুম বলতে গেলে হলোই না। সকালবেলা সিদ্ধান্ত নিলাম, না, আমি পেছাব না। আমি বেলির পাশে আছি। রহস্য উন্মোচন আমি করবই। মনজুকে উদ্ধার আমি করবই। তারপর যা হওয়ার হবে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথমেই ঠিক করলাম, ওই খবির লোকটার খবরাখবর সব বের করতে হবে। সে যে চার-পাঁচ রকম নাম বলেছে এটা আড়াল থেকে আমি শুনেছি। অন্যরা জানে না যে সে নাম নিয়ে এই কাজটা করেছে। যাদের সঙ্গে নাম নিয়ে কাণ্ডটা সে করেছে তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে সব জানার পরও আমার কথা বলা দরকার। প্রয়োজনে প্রমাণ হিসেবে তাদের হাজির করা যাবে।

আমি বেরোলাম সুন্দরীর খোঁজে। আধাপাগলিটির সঙ্গে কথা বলেই কাজটা শুরু করি।

রান্নাঘরের দিকে সুন্দরীকে পাওয়া গেল না। সেখানে অন্য দুজন বুয়া কাজ করছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, সুন্দরী কই?

এই মহিলাটি দেখি সুন্দর করে কথা বলে! বলল, ঘাটপাড় গেছে কাপড় ধুইতে।

ঠিক আছে।

বাগানের দিককার পুকুরঘাটে গেলাম। পুকুরের চারদিকে বিশাল বিশাল গাছ। বাঁশঝাড়, বুনো ফুলের ঝোপ। পাখি ডাকছে, হাওয়া বইছে। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে রোদ পড়ে খুবই সুন্দর দৃশ্য। পানির সঙ্গের সিঁড়িটায় বসে কাপড় কাচছে সুন্দরী আর গান গাইছে।

আমার সোনার ময়না পাখি

কোন দোষেতে গেলি উইড়ারে

দিয়া মোরে ফাঁকি...

আমি গলা খাঁকারি দিলাম। গান থামিয়ে চমকে আমার দিকে তাকাল সুন্দরী। যতটা সম্ভব মিষ্টি একটা হাসি ফোটাল ঠোঁটে। আতকা পুকুরঘাটে আসলেন, ষাঁড়? ঘটনা কী?

ঘটনা আছে। তার আগে বলো, তুমি ‘স্যার’ বলতে পারো না?

না, পারি না, ষাঁড়।

সব কথা পরিষ্কার বলতে পারো, এটা পারো না কেন?

না পারলে কী করুম, কন? সারটা আমার মুখে আসেই না, আসে ষাঁড়। হি হি হি। সারটা আমার জিবলায় আটকাইয়া যায়। হি হি। ঘটনা কন ষাঁড়, ঘটনা কন। খাড়ান ষাঁড় খাড়ান, হাতের কামডা শেষ কইরা লই।

শেষ করার দরকার নেই। কাজ করতে করতেই জবাব দাও।

আইচ্ছা জিগান। পোশনো জিগান, জবাব দিতাছি।

আবদুর রব নামের লোকটার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল?

জানতাম সুন্দরী অবাক হবে। কারণ তাকে তো খবির বলেছে অন্য নাম। মোতালেব।

আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গিতে সুন্দরী বলল, আবদুর রব? রব নামের কেউর লগে আমার দেখা হয় নাই। আমার লগে যার দেখা হইছে তার নাম মোতালেব। বিরাট ভালো মানুষ। মা জননী বইলা কথা কয়। চোখ দুইখান বিরাট সোন্দর, ষাঁড়। কথায় কথায় খালি কান্দে। তার কান্দন দেইখা আমার ভালো লাগে নাই। আমারও কান্দন আইছে। আর ষাঁড়, ওই রকম চোখে পানি কোনো মাইয়াই দেখতে চায় না, বোজলেন ষাঁড়? মাইয়ারা চায় ওই চোখ দিয়া যুবতী মাইয়াগো এমনে কইরা টিপা দেউক। চোখ টিপ।

বলেই সুন্দরী একটা চোখ টিপা দিল। চোখ টেপার ভঙ্গিটা হলো খুবই হাস্যকর।

আমি বিরক্ত। তুমি খুবই ফাজিল টাইপের মেয়ে, সুন্দরী।

হি হি হি। হ ষাঁড়, আমি একটু ফাজিল পদেরই। মাইনসের লগে ফাইজলামি করতে আমার বহুত আরাম লাগে। আপনের লগে আরেকটু ফাইজলামি করুম, ষাঁড়?

থামো।

সুন্দরী আমার ধমক খেয়ে খেপে উঠল। আমারে ধমক দিবেন না, ষাঁড়। আমি আপনের বউ না, ছাত্রীও না।

নিজেকে সামলালাম আমি। না, কাজ আদায় করতে হবে নরম ভঙ্গিতে। গলা নামিয়ে বললাম, পরিষ্কার করে আমার কথার জবাব দাও, সুন্দরী।

আইচ্ছা কন।

তুমি যে লোকটাকে দেখেছ, তার নাম কী বললে? মোতালেব?

হ, মোতালেব। আপনের কাম হইছে না?

হ্যাঁ, হয়েছে।

তয় অহন যান, আমার কাম আছে। আমি আপনের লগে আর প্যাঁচাল পারতে পারুম না।

কাপড় কাচতে কাচতে সুন্দরী আবার ‘সোনার ময়না পাখি’ গানটা ধরল।

আমি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছি, সুন্দরী বলল, খাড়ান ষাঁড়।

আমি দাঁড়ালাম। কী?

আপনে তো খালি মাইনসেরে পোশনো করেন, আপনেরে আমি একখান পোশনো করি?

কী প্রশ্ন?

আপনে এত কথা জানতে চান ক্যান, ষাঁড়? কথায় কথায় খালি পোশনো জিগান। আপনের সমিস্যা কী?

আছে, সমস্যা আছে। পরে একদিন বুঝবে।

আমার বোজনের কাম নাই। আপনেরডা আপনেই বোজেন গিয়া। তয় আইজ থিকা আপনের একখান নতুন নাম দিলাম আমি। আপনের নাম হইল ‘পোশনো সার’। হি হি। ‘আমার সোনার ময়না পাখি...’

আমি আর দাঁড়ালাম না। এই উন্মাদিনীর সঙ্গে আর কী কথা বলব।

তারপর দোতলা ঘরের বারান্দায় এলাম। চেয়ারম্যানস্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। তিনি নিচতলার কামরায় আছেন। দরজার পর্দা সরানো আছে। দেখি বিছানায় বসে তিনি নিঃশব্দে কাঁদছেন।

এই অবস্থায় কি তাঁর সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে?

কিন্তু মায়ের মতো একজন মানুষ কাঁদছেন, এই দৃশ্যটা দেখে মনে হলো তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াই। জিজ্ঞেস করি, কোন দুঃখে এমন করে কাঁদছেন আপনি?

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিলাম। তিনি চোখ তুলে তাকালেন। বিনীত গলায় বললাম, আসব?

আঁচলে চোখ মুছে তিনি বললেন, আসো বাবা, আসো।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে?

আমার সব কান্না মেয়ের জন্য। আর কোনো দুঃখ আমার নেই।

বেলির কোনো অসুবিধা হয়েছে?

নতুন করে আর কিছু হয়নি। ওই যে তোমার ঘরে গিয়ে ফিট হয়ে গেল! হঠাৎ এ রকম ফিট হবে কেন? আমার একমাত্র মেয়ে, মাঝে মাঝে পাগল, মাঝে মাঝে ভালো। রাতের পর রাত ঘুমায় না, আবার দু-তিন দিন শুধুই ঘুমায়। হঠাৎ ফিট হয়ে যায়। ঘুমভাঙা চোখে কার না কার নাম বলে। এ রকম মেয়ের মা কাঁদবে না কী করবে, বাবা?

তাঁর চোখে আবার পানি এলো। তুমি বসো, বাবা।

আমি একটা চেয়ারে বসলাম। আপনার কথাটা একদমই ঠিক। এত ভালো অবস্থা আপনাদের, চেয়ারম্যান সাহেবের এত ক্ষমতা, এই অবস্থায় বাড়ির এত ব্রিলিয়ান্ট মেয়েটি, আপনাদের একমাত্র মেয়েটি যদি মানসিকভাবে অসুস্থ থাকে তাহলে সেই বাড়ির কারোরই ভালো থাকার কথা না।

তিনি চোখ মুছলেন। আমাদের অবস্থা যদি ভালো না হতো, জায়গা-সম্পত্তি টাকা-পয়সা ক্ষমতা যদি কিছুই না থাকত, চেয়ারম্যান সাহেব যদি একজন সাধারণ নিম্নবিত্তের মানুষও হতেন আর আমার মেয়েটা যদি সুস্থ থাকত, আমি খুব খুশি হতাম, বাবা।

আপনি এত হতাশ হবেন না। নিশ্চয় সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। বেলি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

তার পরই যে প্ল্যানে এই ঘরে আসা সেই প্রশ্নটা তাঁকে করলাম। আচ্ছা, বাড়িতে যে লোকটা এসেছিল তার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?

হ্যাঁ বাবা, হয়েছিল।

নাম বলেছিল?

বলেছিল। গফুর না কী যেন নাম বলল। হ্যাঁ হ্যাঁ, আবদুল গফুর।

আমি একটু চিন্তিত হওয়ার ভান করলাম। আবদুল গফুর? দেখতে কেমন লোকটা বলুন তো।

নিরীহ ধরনের মানুষ মনে হলো। শুধু চোখ দুইটা অন্য রকম। সহজে পলক পড়ে না। লোকটা কথায় কথায় কাঁদে।

আমি স্বগত ভঙ্গিতে বললাম, ওই একই লোক।

কিছু বললে, বাবা?

জি না, তেমন কিছু না। আমি তাহলে আসি।

এসো, এসো। আর বাবা, আমার মেয়েটার দিকে খেয়াল রেখো।

জি, নিশ্চয়।

চেয়ারম্যানস্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে আমি বদরুকে খুঁজতে লাগলাম। দেখি ওই ফাজিলটা কী বলে।

তাকে পাওয়া গেল গেটের ডান দিককার বকুলগাছটার তলায়। বসে ফুরুক ফুরুক করে চা খাচ্ছে। হাতে সিগ্রেটও আছে। একচুমুক চা খায়, একটান সিগ্রেট। সিগ্রেট শেষ পর্যায়ে ছিল, আমাকে দেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে দূরে ছুড়ে ফেলল। হাত নেড়ে ধোঁয়া তাড়াল। ফুরুক করে চায়ে একটা বড় চুমুক দিল।

বদরু।

সে উঠে দাঁড়াল। জি, মাস্টার সাব।

একটা কথা বলো তো।

তা তো বলবই। মানুষের কামই তো কথা বলা। বলেন, কী কথা?

বাড়িতে যে একজন লোক আসছিল, তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে?

ওই যে ডাকাইতের মতন চোখ, ওই লোকটা?

হ্যাঁ।

দেখা হইছিল কি না বোঝেন নাই?

বুঝেছি। দেখা না হলে লোকটার চোখ যে ডাকাতের মতন সেটা বলতে না।

ঠিক। আপনে বহুত বুদ্ধিমান লোক। আমার মতন রাইতের জীবদের সরদার হইলে জীবনে বহুত উন্নতি করতে পারতেন।

তার মানে বদরু আমাকে বলছে আমি যদি চোরের সরদার হতাম তাহলে জীবনে অনেক উন্নতি হতো আমার। কত বড় ফাজিল!

মৃদু একটা ধমক দিলাম ফাজিলটাকে। চুপ করো। লোকটার নাম মনে আছে?

বদরু কথা বলল না।

কথা বলছ না কেন?

আপনে না চুপ করতে কইলেন। চুপ করা মানুষ কথা কয় কেমনে?

আমার গলা গম্ভীর। বদরু, আমার সঙ্গে ফাজলামোটা বেশি কোরো না। তোমার চেয়ে অনেক বড় ফাজিল আমি। আমার ফাজলামো তুমি এখনো দেখো নাই। তোমার মতো রাতের জীবকে দিনের জীব বানাতে আমার এক মিনিটও লাগবে না। যা জিজ্ঞেস করছি, পরিষ্কার জবাব দাও।

ঠিক আছে, মাস্টার সাব। মাইনা নিলাম আপনের কথা। অপরিষ্কার জবাব দিমু না।

লোকটার নাম কী?

কুদ্দুস। আর কোনো কথা আছে, মাস্টার সাব?

আপাতত নেই। পরে তোমার সঙ্গে আরো কথা বলব। এখন শুধু এটাই জানা দরকার ছিল, লোকটা তোমাকে কী নাম বলেছে।

আমি কাছারিঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

চেয়ারম্যান সাহেব তখনই কাছারিঘর থেকে বেরোচ্ছিলেন। ভেতর দিককার দরজা মাত্র খুলেছেন, আমি তাঁকে সালাম দিলাম। স্লামালেকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম। আসেন, মাস্টার সাব, আসেন। কাম ইন।

আপনি বেরোচ্ছিলেন...

জি, বাইর হইতেছিলাম। অর্থাৎ এই ঘর থিকা বাইর হইয়া অন্য ঘরে আর কি...। হে হে। এনি প্রবলেম? কোনো বিঘ্ন?

না, তেমন কিছু না।

ভেতরে ঢুকে বললাম, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।

কথা অবশ্যই বলবেন। সিট ডাউন, সিট ডাউন।

আমি তাঁর মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। কথা বলতে চাই বেলির ব্যাপারে।

বুজছি, বুজছি। বেলির ব্যাপারে যে আরেকটা বিঘ্ন হইছে সেই খবর আমার কাছে আছে। মেয়েটারে নিয়া বড় বিঘ্নর মধ্যে আছি।

চেয়ারম্যান সাহেবের কাঁদো কাঁদো ভঙ্গি। আমার একমাত্র মেয়ে। অনলি ওয়ান ডটার।

বাড়িতে গতকাল যে লোকটা এসেছিল তার নাম কী?

চেয়ারম্যান সাহেব চমকালেন। কেন? সে কোনো বিঘ্ন করছে?

আমি আমার গোয়েন্দা লাইনে আছি। মনে হয় ওই লোকটার কারণেই বেলি ফিট হয়ে গিয়েছিল।

খবিরের কারণে বেলি কেন ফিট হইব? তার লগে তো বেলির দেখা হয় নাই! কোনো বিঘ্ন হয় নাই।

তার কারণেই হয়েছে।

বলেন কী?

জি। লোকটার নাম কি খবির?

জি, খবির।

আমাকে বলল তার নাম আবদুর রব, সুন্দরীকে বলল মোতালেব, আপনার স্ত্রীকে বলল আবদুল গফুর, বদরুকে বলল তার নাম কুদ্দুস...

হে হে, বুজছি। ও একটু বান্দর টাইপের লোক। একেকজনরে একেক নাম বলে। আসল নাম খবির। আমার পুরানা লোক। ওরে দিয়া অনেক বিঘ্ন...অর্থাৎ আমার কাজ করে। চেয়ারম্যান মানুষ, নানা পদের কাজ থাকে। নবু রুস্তম রমজান ওরা যেমন কাজ করে, খবিরও করে।

তিনি একটু চিন্তিত হলেন। কিন্তু ওর কারণে বেলি ক্যান ফিট হইব? হোয়াট ইজ দি প্রবলেম?

সে জন্যই আপনার কাছে এলাম।

না, এই বিষয়ে বেলির সঙ্গে কথা বলা দরকার।

তিনি উঠলেন। যাই, মেয়ের লগে ডিসকাস করি। বিঘ্নটা জানার চেষ্টা করি।

চেয়ারম্যান সাহেব বেরিয়ে গেলেন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাঁকে ফলো করে দেখব বেলির সঙ্গে তাঁর কী কথা হয়, শুনতে পারি কি না।

আমার ভাগ্য ভালো। বাপ-মেয়েকে মওকামতো পেয়ে গেলাম।

বেলি বসে ছিল পুকুরঘাটে। কাছারিঘর থেকে বেরিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব গিয়েছিলেন দোতলা ঘরে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার ঘরের জানালায়। চোখে আনমনা দৃষ্টি। কেউ দেখে বুঝবে না যে আমি চেয়ারম্যান সাহেবের গতিবিধি লক্ষ করছি।

বেলিকে ঘরে না পেয়ে তিনি গেলেন রান্নাঘরের দিকে। এদিক-ওদিক মেয়েকে খুঁজে রওনা দিলেন বাগানের দিকে। বোধ হয় কেউ তাঁকে বলে দিল বেলি ওদিকে গেছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে আমি অন্য একটা পথ ধরলাম চেয়ারম্যান সাহেবকে ফলো করার জন্য। আমার ঘরের পেছন দিয়ে, ঝোপঝাড় গাছপালার আড়াল দিয়ে পুকুরের ওদিকটায় গেলাম। ঘাটলার দুপাশে এত ঝোপঝাড়, যেকোনো একটার আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে থাকলে কেউ দেখতে পাবে না।

আমি ও রকম একটা ঝোপের আড়ালে নিঃশব্দে বসলাম।

এখান থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে বাপ-মেয়ে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি তাদের, কথা তো শোনা যাবেই।

পুকুরের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিল বেলি। চেয়ারম্যান সাহেব তার কাঁধে হাত দিলেন। কী চিন্তা করো, মা?

বেলি তাঁর দিকে তাকাল না। আগের মতোই বসে রইল।

কোনো বিঘ্ন হইছে?

বেলি এবারও কথা বলল না। নিঃশব্দে কাঁধ থেকে বাবার হাত সরিয়ে দিল।

ফিট হইয়া গেছিলা ক্যান, মা? বিঘ্নটা কোথায়?

বাবার মুখের দিকে তাকাল বেলি। তুমি জানো না বিঘ্নটা কোথায়?

না, আমি জানি না তো! আই ডোন্ট নো।

জেনেও না জানার ভান করলে আমার কিছু বলার নেই। তুমি যাও। তোমাকে দেখলেই আমার রাগ লাগে। তুমি কথা বললে রাগ আরো বাড়ে।

চেয়ারম্যান সাহেবের মুখে হাসি ফুটল। মুখ হাসিমাখা কিন্তু গলার স্বর কঠিন। এই সব রাগের আমি খেতা পুড়ি। আমি যা চাই সেইটা না হইলে কোনো বিঘ্ন আমি ঘটাইতে পারি সেইটা তুই ভালো কইরাই জানছ।

তোমাদের কথা আমি শুনেছি।

কোন কথা?

খবির আর তোমার কথা।

চেয়ারম্যান চমকালেন, মেয়ের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন। শীতল গম্ভীর গলায় বললেন, তবে তো বিঘ্ন একটা ঘটছেই। ওই সব বিঘ্নের আমি খেতা পুড়ি। শুইনা কী বুঝলি?

যা বুঝেছি তা তোমাকে বলব না।

বলার দরকার নাই। আই হ্যাভ নো প্রবলেম। আমার কোনো বিঘ্ন নাই। বিঘ্ন হইল তোর। বেশি তেড়িবেড়ি করবি, বিঘ্ন সাফা কইরা ফালামু।

বেলি হঠাৎ পাগল হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে দুলে দুলে খিলখিল করে হাসতে লাগল। আদুরে একটা ভঙ্গি ধরল। বিঘ্ন সাফা কইরা ফালাইবা, বাবা? না না, সাফা কইরো না। বিঘ্ন থাকুক। জীবনে কিছু বিঘ্ন থাকা ভালো। বিঘ্ন না থাকলে তুমি বিঘ্ন বলবা কেমনে?

চেয়ারম্যানের আগের মতো হাসিমুখ, ইস্পাতের মতো কণ্ঠ। বুজলাম, এখনকার এই পাগলামিটা তুমি ইচ্ছা কইরা করতাছ। আমার উচিত এখন তোমার গালে বিরাশি সিক্কার একখান চপেটাঘাত করা। এক চপেটাঘাতে বিরাট বিঘ্ন হইয়া যাইব। তুমি আবার ফিট হইয়া যাইবা। সেই বিঘ্নটা আমি ঘটাইতে চাই না। তবে, তবে বেশি বাড়াবাড়ি কইরো না। তাইলে যেই বিঘ্ন এখনো আছে, সেই বিঘ্ন চিরতরে ফিনিশ কইরা দিমু।

বেলি হাসি থামিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ারম্যান সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উপুড় হয়ে বসে দুহাতে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। না বাবা, না। না। আমি আর পাগলামি করব না। আমি ভালো হয়ে যাব। একদম ভালো হয়ে যাব। তুমি, তুমি তার কোনো ক্ষতি কোরো না। সে বেঁচে থাকুক, বেঁচে থাকুক।

তয় আমারে ফাইনাল কথা দিতে হইব তোর।

বলো, কী কথা।

আজকের পর কোনো বিঘ্ন আর ঘটাবি না। নো পাগলামি। শান্ত হইয়া যাবি, মাস্টারের কাছে পড়বি। তার কথা ভুইলা যাবি। চিরতরে ভুইলা যাবি। ভুলেও মনে করতে পারবি না।

আচ্ছা, বাবা।

প্রমিজ কর। আমার কাছে প্রমিজ কর।

করলাম। প্রমিজ করলাম বাবা, প্রমিজ করলাম।

বেলি উঠে দাঁড়াল। তার চোখ ভেসে যাচ্ছে কান্নায়। চেয়ারম্যান সাহেব ফিরেও তাকালেন না। দৃঢ় পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।

আমি তখনো ঝোপের আড়ালেই বসে আছি। এই কয়েক দিনে নানা রকমভাবে অনেক তথ্য আমি পেয়েছি। কেন বেলি পাগল হয়েছে বা পাগল হয়ে থাকার ভান করছে অনেক কিছুই আমার কাছে স্পষ্ট। হ্যাঁ, মানসিকভাবে কিছুটা এলোমেলো সে অবশ্যই হয়েছে, এটা ঠিক। তবে পাগলামির ভানও তার আছে। তার অনেক সময়কার পাগলামি আসলে পাগলামি না। ভান। ইচ্ছা করে কাজটা সে করে। কেন করে তা আমি মোটামুটি বুঝে গেছি। ব্যাপারটা প্রেমেরই। তার প্রেমিক কিংবা স্বামীকে ওই খবিরের মাধ্যমে গুম করে রেখেছেন চেয়ারম্যান সাহেব। এটা জানে চারজন মানুষ। চেয়ারম্যান সাহেব, তাঁর স্ত্রী, বেলি আর খবির। সেই ছেলের নাম মনজু, এটা জানে অনেকেই। সুন্দরী, বাড়ির অন্য কাজের লোকজন, মতি নবু রুস্তম রমজান। কিন্তু চেয়ারম্যানের ভয়ে মুখ খোলা যাবে না। যে খুলবে তার জান খেয়ে ফেলবেন চেয়ারম্যান সাহেব।

বেলির জন্য আমার খুবই কষ্ট হতে লাগল। অচেনা সেই মনজু ছেলেটার জন্য কষ্ট হতে লাগল। ভালোবেসে কোন কষ্টের মধ্যে পড়েছে দুজন মানুষ। আহা, আহা রে! আমি এখন কিভাবে ওদের পাশে দাঁড়াব? কিভাবে উদ্ধার করব মনজুকে? কিভাবে প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সনে...

সন্ধ্যার পর বেলি এলো আমার ঘরে। সুন্দরীকে বলেছিলাম বেলিকে ডেকে দিতে। বেলির চোখ দুটো উদাস, মুখটা খুব বিষণ্ন। ঘরে ঢুকে বলল, ডেকেছেন?

হ্যাঁ, বসো।

বেলি বসল। আমি সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালাম। বেলি, তুমি কি আমার কাছে সত্য কথা বলবে?

না।

কেন?

কোন ভরসায় বলব? আপনি আমার কে?

আমি একটু থতমত খেলাম। কঠিন প্রশ্ন। সত্যিকার অর্থে আমি তোমার কেউ নই। টিচার হিসাবে আছি, মানসিক রোগের হাতুড়ে ডাক্তার হিসেবে আছি, কিন্তু এখনো তোমাকে পড়াচ্ছি না, চিকিৎসা তো...। তবে আমার ওপর তুমি ভরসা রাখতে পারো।

এই পৃথিবীতে আমার সবচাইতে আপন মানুষ আমার মা-বাবা। তাঁদের ওপরই ভরসা রাখতে পারিনি, আর আপনি একজন বাইরের মানুষ, ভালো করে আপনার সম্পর্কে জানিও না, আপনার ওপর কেমন করে ভরসা রাখব?

তোমার কথাগুলো লজিক্যাল। তার পরও আমি যতটা বুঝি, তুমি খুবই ইনটেলিজেন্ট একটি মেয়ে। মানুষের মুখ দেখে অনেক কিছু বুঝতে পারো। ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ চেনার ক্ষমতা আছে। বন্ধু হিসেবে আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারো।

বেলি উঠে দাঁড়াল। দেখা যাক, সময় বলে দেবে কতটা বন্ধু আপনি আমার হতে পারেন। যখন বন্ধু হবেন তখন সব বলব।

বেলি বেরিয়ে গেল।

রাতে আমার আর ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। কয়টা বাজে কে জানে! হঠাৎ শুনি বেলির ঘর থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছে। মিউজিক সিস্টেমে ভারী উদাস নারীকণ্ঠ গাইছে—

দূরে কোথায় দূরে দূরে

আমার মন বেড়ায় ঘুরে ঘুরে

এই গানের একটা জায়গা আছে, ‘যায় রে কোন অচিনপুরে...’। নিশ্চয় বেলির মন এখন চলে গেছে কোনো এক অচিনপুরে। যেখানে গুম করে রাখা হয়েছে তার মনের মানুষটিকে, সেই অচিনপুর হয়ে গেছে বেলির হৃদয়পুর। তার হৃদয়জুড়ে থাকা মানুষটি কোন কষ্টের মধ্যে আছে? কোন জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে? প্রেমের জন্য কঠিনতম শাস্তি ভোগ করছে। হয়তো এই জীবনে প্রেমিকার কাছে তার আর ফেরা হবে না। প্রেমিকা জীবনভর খুঁজে বেড়াবে তার হৃদয়পুরের ঠিকানা।


মন্তব্য