kalerkantho


স্মৃতিকথা

পাকিস্তানি শাসন, পহেলা বৈশাখ ও ছায়ানট

সন্জীদা খাতুন

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পাকিস্তানি শাসন, পহেলা বৈশাখ ও ছায়ানট

ছবি : শেখ হাসান

সন্জীদা খাতুন—পঁচাশি বছর পার হয়েও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একাধারে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক। ষাটের দশকে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের অগ্রগণ্য সৈনিক তিনি। রমনার বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজনের পথিকৃৎ। ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, এখন সভাপতি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পেয়েছেন রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও দেশিকোত্তম পুরস্কার। এ ছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি প্রদান করে। একান্ত আলাপচারিতায় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ নিয়ে বলেছেন এই সময়কে। 

অনুলিখন : দীপংকর গৌতম

 

খ্রিস্টাব্দ নয়, হিজরি নয়, সন নয়; বাংলা অব্দের পহেলা বৈশাখ যখন বাঙালির আবিষ্কারের অঙ্গ হিসেবে উৎসব হয়ে উঠতে চাইছে, তখন পাকিস্তানের রমরমা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পাকিস্তান হলো। গানে গানে ‘চাঁদতারা সাদা আর সবুজ নিশান’ মিল জুড়ে কওমি নিশানটিশান ওড়ানো হলো। কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হলো না তখনো। কলকাতায় থাকতে যেসব মুসলমান বাঙালি জাতিকে ‘কওম’, ধনীকে ‘মালদার’, প্রদীপকে ‘চেরাগ’, ডিমকে ‘আণ্ডা’—এসব বলার ধ্বনি তুলেছিলেন, তাঁরাই নতুন রাজধানী ঢাকায় এসে ‘কলিজার খুনে ওয়াতানের ধূলি করিয়া লাল/আজাদীর তরে শহীদ হলে যে বীর দুলাল’ বা ‘পাকিস্তানের গুলিস্তানে আমরা বুলবুলি/...মোরা সালওয়ার পরি মোরা ওড়না ওড়াই’—এ রকম গানের ফোয়ারা ছোটালেন। নতুন স্বাধীনতার আনন্দে আমরা সেই সব গান গাইছি। কিছু কিছু আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করা হলে দোষের কী-ই বা আছে। বাংলা ভাষার নদীতে কত শব্দই তো মিশেছে এসে, নানা সংস্পর্শের পরিচয় অঙ্গে ধরে। তবে বাড়াবাড়ি হচ্ছিল। ‘মাহে নও’ (পত্রিকার নামেই বাড়াবাড়ি!) পত্রিকার এক গল্পে লেখা হয়েছিল, ‘লেবাসের অন্দরে তার তামাম তনু পোষিনায় তরবর্ত’। এই উদ্ভট ভাষার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র আন্দোলনের দরকার হয়নি। ভাষার বেগবান প্রবাহই সেই জঞ্জাল ফেলে এসেছে সেকালের আস্তাকুঁড়ে।

ওসবের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন বোঝা গিয়েছিল ক্রমে ক্রমে। বিশেষ করে যখন ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা হলো; এই ঘোষণা আমাদের আপন সংস্কৃতি থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট করে দিল। প্রিয় বাংলা ভাষা আর বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে চোখ পড়ল তখন ভালো করে। মুসলমান হওয়া যেমন অসত্য নয়, বাঙালি হওয়াও নয় তেমনি অসত্য! কিন্তু শুধু মুসলমান হতে হবে, এবং বাঙালি সত্তাকে সম্পূর্ণ নিধন করে, আপন ভাষা ভুলে, তবেই হওয়া যাবে খাঁটি পাকিস্তানি—এ কেমন কথা! ফলে মুসলমান আর বাঙালিতে বা পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বিরোধের কিছুমাত্র কারণ না থাকলেও, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বেধে গেল দ্বন্দ্ব্ব।

দ্বন্দ্ব্ব ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। বাঙালির বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদেরই চিনে নিতে হলো। কয়েকটি বিষয় ঘিরে বাঙালি মানস পরস্পর সন্নিহিত হলো। প্রথমটি হলো ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মারক শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে একত্র হলো বাঙালি। দ্বিতীয় বিষয় পহেলা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ বাংলা নতুন বছরের উৎসব আয়োজনটি বাঙালিকে আরেকটি মিলনবিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করল। পহেলা বৈশাখ ছিল আমাদের বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হতো সেদিন। বাঙালির কবিতা, বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির নৃত্যগীতে আমাদের অধিকার চিরন্তন—এসব কথা বলতে, বুঝে নিতে, বুঝিয়ে দিতে বটমূলের প্রভাতি সমাবেশ। সাতষট্টির সেই পাকিস্তান আমলে বছরের প্রথম দিনের এই উপলব্ধি যে কত জরুরি ছিল তা তাঁরাই মনে করতে পারবেন, যাঁরা বাঙালিত্ব ভোলানোর জন্য পাকিস্তানি নিগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছেন। পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরুন, কলেজ শিক্ষকদের বেতন সে সময় কমই ছিল। তবু সাংবাদিকদের চেয়ে ঢের বেশি। তুলনা করে দেখা যায়, সরকারি মর্নিং নিউজের সাব-এডিটর যেখানে পেতেন ৮০ টাকা বেতন+৪০ টাকা সানডে অ্যালাউন্স, কনভেন্স ছিল কুড়ি টাকা; কলেজ শিক্ষক সেখানে পেতেন ২৪৮ টাকা বেতন+৫০ টাকা ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স। যত দূর মনে পড়ে, সাতান্ন সাল থেকে নিয়ে ষাট সালের পর পর্যন্ত সাংবাদিক ও কলেজ প্রভাষকদের বেতনের এই পার্থক্য বহাল ছিল। অবস্থা বদল হলো ক্রমে। খবরের কাগজের সব রকমের সংবাদ দেশের ভেতর চাউর করে দেয়। তাই সাংবাদিকদের হাতে রাখার পন্থা উদ্ভাবন হতে লাগল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সস্তায় মোটরগাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হলো তাদের। সরকারি জমি বরাদ্দের সুবিধা এলো। তারপর বেতনও বৃদ্ধি হলো। সে এমনই বৃদ্ধি যে শিক্ষকদের আসন একধাক্কায় সাংবাদিকদের চেয়ে কয়েক হাত নিচে নেমে গেল। সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড চালু হয়েছিল।

বৈশাখের প্রথম দিনের এই উৎসব বাঙালি জাতিসত্তার ধারায় স্নাত হয়ে আমাদের স্বরূপ সন্ধানের সহায়ক হয়েছে। বহুকাল ধরে প্রচলিত গ্রামীণ বৈশাখী মেলা কি দোকানি-পসারিদের হালখাতা অনুষ্ঠানের সঙ্গে নগরীর বর্ষবরণ এক রকম নয়। এটা সমালোচনার বিষয়ও নয়। মনে রাখতে হবে, এর প্রয়োজন আমাদের জাতীয় সংকট থেকে সঞ্জাত।

এ ছাড়া পহেলা বৈশাখ নিয়ে একটা ভালো লাগা আছে। এদিন বাঙালি আন্তরিকভাবে একে অপরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বাঙালি বলে বাঙালির সঙ্গে বুক মেলাতেই এ অনুষ্ঠানের সার্থকতা। প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি কথা বলি, পহেলা বৈশাখে রমনার মাঠে যারা আসে তারা গ্রামগঞ্জের মানুষ না নগরসমাজের, তারা কে কোন পোশাক পরে আসে, রমনার মাঠে গিয়ে শখ করে পান্তা খায়, না লুচি-তরকারি খায়—এই প্রশ্ন অবান্তর। এগুলো বৈশাখের মূল অনুভবের ধারাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারে না। সেই ভোরে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ যদি বুক ভরে শ্বাস নিয়ে একবার মনে করতে পারে আমি বাঙালি, তবেই এ উৎসব সার্থক। তবে এমন অনুষ্ঠান তো এক দিনে শুরু হয়নি, ছায়ানটে প্রথমে শ্রোতার আসর হতো। প্রথম আসরে গাইলেন ফিরোজা বেগম। দ্বিতীয়টায় গাইল আমার বোন ফাহমিদা। এরপর বারীন মজুমদার, ইলা মজুমদার। কখনো সেতার বাজালেন খাদেম হোসেন খান। এ রকম হয়েছে। এগুলো হওয়ার পর একসময় অনুভব করলাম, আর বিশেষ শিল্পী নেই, যাঁদের দিয়ে গান গাওয়াব। আমি কিন্তু কখনো গাইতাম না। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা করতাম। ওয়াহিদুল হক বলে বসলেন, ‘আমরা একটা স্কুল করব।’ এ কথা সভায় পাস করানো কঠিন। হাতে তো নেই কানাকড়ি। চলে সিধু ভাইয়ের টাকায়। ওয়াহিদুল হক বললেন, ‘আমরা সবাই চাঁদা দেব।’ আস্তে আস্তে কে কত দেবেন, কথা হলো। প্রস্তাবটা পাস হয়ে গেল। এভাবে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন হলো। সেই সংগীত বিদ্যায়তনে আমরা যে শুধু রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করেছি, তা নয়। তত দিনে আমরা বুঝেছি, বাঙালি সংস্কৃতিটাই একটা বিপদের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানিরা আমাদের পাকিস্তানি মুসলমান বানাতে চায়, বাঙালি বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। এটা বুঝতে পেরে আমরা আমাদের স্কুলে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নানা রকম যন্ত্র, রাগসংগীত শুরু করলাম। স্বাধীনতার পর শুরু করলাম পল্লীগীতি। গণসংগীতেরও চর্চা করতাম। শেখ লুত্ফর রহমান আমাদের এখানে এসে অনেক গণসংগীত শিখিয়েছেন। একাত্তরের ২৫শে মার্চের পর আমরা তো পালিয়ে ভারতে চলে গেলাম। ওখানে যাওয়ার পর আমরা কিন্তু লুত্ফর ভাইয়ের শেখানো গান ‘জনতার সংগ্রাম’, ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা’, ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’—এই গানগুলোর চর্চা করি। তারপর শিল্পী রফিকুল আলম, ওর বড় ভাই সারওয়ার জাহান এলো। তখন ওরাও গান করল। এমনি করেই পুরো দেশের রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতিকে মিলিয়ে একটা নতুন জিনিস দাঁড়াল। কলকাতায় আমরা একটা দল করেছিলাম। ‘রূপান্তরের গান’ নামের একটা গীতি আলেখ্য হয়েছিল। লিখেছিল শাহরিয়ার কবির। জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেই আলেখ্য অনেক পরিবর্তিত হয় পরে। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করি। আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র—সবাই গেয়েছেন। এই করে আমরা কিছু টাকা তুলি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেখানেই গান গাইতাম, সেই টাকা এনে কেন্দ্রীয়ভাবে জমা দিতাম। এভাবে চলছিল। রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শাসকরা যখন বন্ধ করতে চাইল, তখন বাফা রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা ভালোভাবেই চালিয়ে গেছে সেই সময়। এমনকি শান্তিনিকেতন থেকে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের দল নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠান করেছে। কলকাতা থেকে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষদের নিয়ে এসে অনুষ্ঠানে গান গাইয়েছে। বাফার ভূমিকাটা তখন খুবই ভালো ছিল। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের পরই গড়ে ওঠে সমমনা সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে ‘ছায়ানট’। ঢাকায় রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের আবাহনী অনুষ্ঠান শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান আমলে এগুলো ছিল প্রতিবাদেরই প্রকাশ। এই প্রতিবাদের শরিক হয় ছোট-বড় আরো সাংস্কৃতিক সংগঠন। ‘সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছে মিছিলে। অনুষ্ঠান হলে সেখানে ‘সার্থক জনম আমার’ গাওয়া হয়েছে। একটি গান আমরা আবিষ্কার করেছিলাম। ‘কে এসে যায় ফিরে ফিরে আকুল নয়ননীড়ে। কে বৃথা আশা ভরে চাহিছে মুখ ’পরে, সে যে আমার জননীরে।’ তার পরের কথাগুলো ইম্পর্ট্যান্ট। ‘কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি। কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায়, সে যে আমার জননীরে।’ এই যে গানটা, এটা রবীন্দ্রনাথ বহু আগে বাংলায় যে বক্তৃতা হতো না তা নিয়ে দুঃখ করে লিখেছিলেন। আর আমরা ভাষা আন্দোলনের পরে এই গানটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এই গান আমরা তখন গাইতাম। তা ছাড়া পাকিস্তান আমলে আমরা যেটা করেছি, যখনই কোনো একটা বিরূপ ব্যাপার হতো, তখনই আমরা রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে আমাদের মনের ব্যথাটা প্রকাশ করতাম। যাঁরা দর্শক হয়ে আসতেন তাঁরা কিন্তু বুঝতে পারতেন।

একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেয়েছিলাম ‘কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো! বিরহানলে জ্বালোরে তারে জ্বালো’। অন্ধকারের মধ্যে গানটা শুরু করা হয়েছিল এবং সেটা বিশেষভাবে মানুষের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তা ছাড়া একবার পাকিস্তান আমলে, আইয়ুবের আমলে চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের গ্রামে শিশু-নারী-নির্বিশেষে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। সেই সময় বৌদ্ধরা কয়েকজন আমাদের কাছে এসেছিলেন। বললেন, আমরা কিছু তো করতে পারছি না, কিছু বলতে পারছি না। আমরা রবীন্দ্রসংগীতের একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’, বুদ্ধকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান আছে, সেই গানগুলো সে সময় তাঁরা আমাদের কাছে দেখে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন। এটাও আন্দোলনই হলো। মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা উদ্দীপক গানের সঙ্গে প্রচারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান।

তবে পাকিস্তান আমলে ঘরোয়াভাবে নববর্ষ উদ্যাপনের চল হয়েছিল সংস্কৃতিমনা কিছু মানুষের ভেতর। তখন কৃষ্ণচূড়ার ডাল দিয়ে সাজানো সান্ধ্য আসরে মিলিত হতেন তাঁরা। এককথায় বলা যায়, কারো বাসার ড্রয়িংরুমে, কারো বাসার আঙিনায় প্রাণপ্রাচুর্যের সঙ্গে পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। ইংরেজি ১৯৬৭ তথা ১৩৭৪ থেকে পহেলা বৈশাখে রমনার অশ্বত্থগাছটির তলায় প্রথম খোলামেলাভাবে হলো বাংলা নববর্ষের উৎসব। আমন্ত্রণলিপিতে পরিচয় লেখা হলো ‘রমনার বটমূল’। এর পেছনে একটি ঘটনা আছে : গাছটির পাতা বটের পাতার মতো নয়। তবু ‘বটমূল’ শব্দটি শুনতে ভালো লাগে। ‘অশ্বত্থমূল’ বা ‘অশ্বত্থতলা’ পছন্দসই শোনায় না। শেষ পর্যন্ত অনেক চিন্তাভাবনা করে ‘বটমূল’ই স্থির হলো।

তবে এ জায়গাটি যে সহজে পাওয়া গেছে এমনও নয়। এর পেছনেও একটা কাহিনি আছে। খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান করার জন্য জায়গা খুঁজছিলাম আমরা বহুদিন ধরে। বন্ধুবর নওয়াজীশ আলী খান তখন ফিলিপাইনে। দেশে এলে তাঁর চিত্রগ্রাহক সত্তার তাগিদে ঘুরে বেড়ান নানা দিকে। দেখে রাখেন প্রকৃতির নানা রূপছবি। আমি ও ওয়াহিদুল হক তাঁকে বলেছিলাম একটা জায়গা খুঁজে দিতে। তারই একখানা ছবির পটে তিনি বসিয়ে দিলেন ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব। তবে জায়গাটি তাঁর পছন্দ হলেও প্রথমে তিনি আমাদের বলেননি। একদিন তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন রমনা রেস্তোরাঁয়। সেখান থেকে বটমূলে। বটমূলে তখন বড় বড় ঘাস, গোবরের মধ্য দিয়ে চলতে হয় এমন অবস্থা। তার মধ্য দিয়ে হেঁটে চললাম আমরা।

আগেই বলেছি, বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের সূচনাসাল ১৯৬৭। এর চার বছর আগে মানে ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন চালু হয়। প্রথম প্রথম পহেলা বৈশাখের মঞ্চে বিদ্যায়তনের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রায় সকলকেই বসার জায়গা দেওয়া যেত। একক গানের জন্য শিল্পী সংগ্রহ করতে হতো বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস, নাসিরুদ্দীন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, পাকিস্তানের শেষ দিকে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সরকারের বিরাগভাজন আমলা শামসুর রহমানের পত্নী আফসারী খানম...আরো কতজন! প্রথম যখন রমনা বটমূলে অনুষ্ঠান শুরু করি, তখন বটমূলের গোড়া ঘিরে বাঁধানো বেদিটুকুই ছিল সম্বল। পরে চৌকি জুড়ে খানিকটা বাড়িয়ে নেওয়া হয়। মনে পড়ে, প্রথমবার অনুষ্ঠানে গাছ থেকে শুয়োপোকা ঝরে ঝরে পড়েছে যত্রতত্র। মেয়েরা ভয় পেলেও গুরুজনের ভয়ে বসে থেকেছে মাথা গুঁজে। দ্বিতীয়বার ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পোকা সরানোর জন্য কাঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

একাত্তরের এপ্রিল মাস। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলছে। ঢাকা শহরের ঘরে ঘরে তখন শোক আর সন্ত্রাসের বুকচাপা কান্না। একাত্তরের পহেলা বৈশাখে কোনো গান বাজেনি রমনা বটমূলে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এমন কখনো হয়নি। সাভারের জিরাবো গ্রামে তখন নিরাপত্তার কারণে চলে গিয়েছিলাম। মাটির ঘরে থাকি। সন্তানদের নিয়ে ঘরে বসে গান গেয়ে বটমূলের প্রভাতি পরিবেশের কথা স্মরণ করেছি। এর পরে এক সময় আমাদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে গিয়ে আমরা ‘রূপান্তরের গান’ নামে একটি গীতি আলেখ্য তৈরি করেছিলাম। তাতে ‘সার্থক জনম আমার’ ছিল, ‘সোনার বাংলা’ তো ছিলই। আরো অনেক গান ছিল। একটা গান ছিল এমন, যার অর্থ চাঁদকে বলা হচ্ছে মুখ ঢেকে ফেলো, বড় লজ্জার দিন, বড় কষ্টের দিন, দুঃখের দিন। এই গানগুলো আমরা নতুন করে আবিষ্কার করে তখন গাইতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থীদের শিবিরে এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষকে আমাদের বেদনার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আমরা এই গানগুলো গাইতাম। কাজেই রবীন্দ্রসংগীত আমাদের আন্দোলনের মস্ত বড় একটা হাতিয়ার ছিল এবং এখনো আছে। এখনো আমরা বলি, রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

১৯৭৫ সালের কথা ভুলিনি। সে আরেক দুঃসময়। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গিয়েছিল, ভিন্ন এক পরিবেশ জেঁকে বসছে। তখন হঠাৎ করে জাতীয় সংস্কৃতির হোতা হওয়ার আবেগ জাগল কিছু তরুণের চিত্তে। যত দূর মনে পড়ে, ১৯৭৮ সালের কথা। ছায়ানট তো সব সময় ভোরবেলা অনুষ্ঠান করে, তাই চৈত্রশেষের রাত ১২টায় অনুষ্ঠান করে জাতীয় সংস্কৃতির দিশারি হতে চাইল ওরা। শুধু তা-ই নয়, তারা সিদ্ধান্ত নিল, তাদের অনুষ্ঠানও ওই রমনা বটমূলেই করবে। তো সোফা, গদি-চেয়ারটেয়ার সাজিয়ে অনুষ্ঠান করল ওরা। শুধু কি গান, সঙ্গে ঝালমুড়ি, বাদাম খেয়ে সব ঠোঙা ফেলে রেখে গেল বটমূলের আশপাশে। সে বছর ওই বাসি বাসি চেহারার মাঠে হলো আমাদের অনুষ্ঠান। এর মধ্যেও আমরা পহেলা বৈশাখের আনন্দ করে এসেছি নিজেরাই পথ খুঁজে পাব বলে, নিজেদের চিনে নেব বলে। সংস্কৃতিচর্চায় অন্য সবাইকে পথ দেখাতে হবে বা প্রথম হতে হবে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতার ভাব আমাদের ছিল না, এখনো নেই।

এই পথচলায় কতবার বাধা এসেছে তার ঠিক নেই। অনেকবার এসেছে। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর একবার আমাদের মঞ্চের পাশে উঠল জগদ্দল চেহারার মঞ্চ। লোকজন জায়গাই পায় না। দুটি মঞ্চের পর আর কতটুকু জায়গা থাকে। তামাশা দেখার ভাব নিয়ে গাছের ওপর উঠল অনেক লোক। আমাদের মঞ্চের ওপর ছুড়ে ফেলা হলো মরা কাক। কিছুক্ষণ পর মোড়ের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। ফলে মাইক্রোফোন অচল হয়ে গেল। জেনারেটর চালু করতে করতে সময় ব্যয় হলো। অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেবার অনুষ্ঠান শেষে আলমগীর কবির এসে বলেছিলেন, ‘আপনি চালিয়ে যান...থামবেন না...আমরা আছি।’

আরেকবার বিকেল থেকে টেলিফোন আসতে শুরু হলো আমাদের কাছে—যাবেন না, মঞ্চে যাবেন না, নিচে টাইমবোমা রাখা আছে। সাবধান! পুলিশে খবর দিলাম। টাইমবোমা আছে কি না তা চেক করে দেখার দায়িত্ব পুলিশের। ফোন করে হয়রান হয়ে জানা গেল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে শিশুদের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকবেন বলে পুলিশ ফোর্স সব সেখানে নিয়োজিত রয়েছে। আমাদের জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তাদের ওপর বর্তাবে বলে ঘটাং করে ফোন রেখে দিলাম। ভোরে ছায়ানট সম্পাদকের সঙ্গে কথা হলো। এত ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নেবে কে? তিনি নিষেধ করলেন ‘বটমূলে’ যেতে। কিন্তু মনকে মানাব কী করে! গুটি গুটি গিয়ে হাজির হলাম সকালে। মজার কথা, গিয়ে দেখি সম্পাদক নিজেই আমার আগে গিয়ে সেখানে বসে আছেন! ছেলেমেয়েদের ঘুণাক্ষরেও কিছু বুঝতে দিলাম না। মঞ্চে গিয়ে বসলাম। নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান শেষ হলো। অনুষ্ঠান শেষে সম্পাদককে বললাম—দেখলেন তো, ভয় না করে ভুল হয়নি।

সামরিক শাসনের সময় একবার এমন হলো, মনে হলো অনুষ্ঠানই করা যাবে না। ও বছর মঞ্চের তলায় বোমা রাখা আছে বলে  ভয় দেখানো হলো। তার পরের বছর মার্চের শেষে জারি হলো সামরিক আইন। নববর্ষ উৎসবের মহড়া চলছে। কিন্তু সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি পাওয়া যাবে কোত্থেকে! পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছিল না কিছু। শেষ পর্যন্ত অনেক ঘুরে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে ৯টার সময় অনুমতি মিলল। সেই নববর্ষে অনেক রাজনৈতিক নেতা রমনায় উপস্থিত হয়েছিলেন। জমায়েত হওয়ার এমন সুযোগ পাওয়া যাবে কেউ ভাবতে পারেননি। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা আমাদের কয়েকবার বিব্রত করেছে। কখনো ছাত্ররা, কখনো নেতৃস্থানীয়রা ঝামেলা বাধিয়েছেন। এখন মনে হয় সবাই বুঝেছে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সমবেত হওয়াটাই বড় কথা। এদিন বাঙালিত্বের শপথ নেওয়াটাই জরুরি। আসলে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই কিছু বিষয় দেখে আসছি।  আমাকে ফলো করা হতো। রিপোর্ট করত গোয়েন্দারা। অনেকে আমার কাছে গান শিখত গোয়েন্দাগিরি করতে। আমি ওসব আমলে নিইনি।

ছোটবেলা থেকেই সংগঠন করতাম। তাই রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হইনি।

ছোটবেলায় চাঁদের হাট করতাম। একসময় কমিউনিস্ট পার্টি করতে বলা হয়েছে। আমি সদস্য হইনি। রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে পাড়ি দিতে চাই বাকিটা সময়।


মন্তব্য