kalerkantho

রহস্য উপন্যাস

অন্ধ কুমারী

শেখ আবদুল হাকিম

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



অন্ধ কুমারী

অঙ্কন : মানব

শুরুতেই বলি, সময়টা মধ্যযুগ, জায়গাটা পশ্চিম ইংল্যান্ড, আর আমি একজন অধম ভবঘুরে গায়ক। যে গল্প এখানে লিখতে বসেছি সেটা বানানো নয়, আমারই জীবনে ঘটেছে এবং মনে করি, ভবিষ্যতের কৌতূহলী পাঠকসমাজ এই সত্য ঘটনা পড়তে উত্সুক হবে, পড়ে মজা ও তৃপ্তি পাবে, বিস্ময়ে স্তম্ভিত না হয়েও তাদের উপায় থাকবে না!

গায়ক ঠিকই, কিন্তু আমি আমার নিজের গলা বা গায়কি নিয়ে খুব একটা যত্নবান নই, গর্বিত তো    নই-ই। ইয়ে, না, মানে আমার গলায় যথেষ্ট সুর আছে এবং আমার সুর পানি খেতে ব্যস্ত শুয়োরগুলোকে ভয় পাইয়ে খেদিয়েও দেয় না। যেসব গায়ক আর বাদক এক হ্যামলেট (ছোট গ্রাম) থেকে আরেক হ্যামলেটে ঘুরে ঘুরে গায়, গানের ডালি নিয়ে চষে বেড়ায় এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে, সুরের মাধুর্য দিয়ে অভিজাত নারী-পুরুষকে মুগ্ধ করতে চায়, আমি তাদেরই একজন। তবে গায়ক হিসেবে নিজেকে যথেষ্ট মেধাবী বলে মনে করতে পারি না। আর সেটা খুব দুঃখজনক, কারণ ইদানীং গান গেয়েই আমাকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।

তরুণ যোদ্ধা হিসেবে আমি ফুর্তি করার জন্য গাইতাম। গলা ছেড়ে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাহিনিকাব্য গাওয়া হতো হয় কোনো দুর্গে, নয়তো রণক্ষেত্রে জ্বলা আগুনের চারপাশে বসে। পরস্পরকে আমোদে ভাসাতাম আর দিতাম নিজেদের সাহসের পরিচয়, যদিও আমি তখনই সবচেয়ে উঁচু গলায় গাইতাম, যখন সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম।

আমার যিনি ওস্তাদ ছিলেন, তিনিও গোটা রাজ্য ঘুরে ঘুরে গান করতেন, আর তাঁর গলায় ছিল মুগ্ধ করার মতো একদম খাঁটি মধু—ঠিক যেন গাঢ়, সমৃদ্ধ, খয়েরি আর কড়া বিয়ার। আমাকে তিনি সংগীতের সূক্ষ্মতম শিল্পরহস্য ব্যাখ্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। পল টিমপানি সাধারণ গায়ক ছিলেন না যে আমাদের অনেকের মতো ব্যারাকের কামরায় বসে গান গেয়ে শ্রোতাদের মন মাতাবেন। আমরা তাঁকে গায়কদের গায়ক হিসেবে চিনতাম, স্বর্গ থেকে পাওয়া সুর নিয়ে মর্ত্যে এসে আমাদের ধন্য করে গেছেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি পদক দিয়ে ইয়র্কের মিনিস্ট্রেল গিল্ড সম্মানিত করেনি।

হাসিখুশি মেজাজের পল টিমপানি অনায়াসে একটা স্বনামধন্য অভিজাত পরিবারে স্থায়ী অতিথির পদ অর্জন করতে পারতেন; কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল পথের রোমাঞ্চ আর বৈচিত্র্য, সরাইখানায় বসে আজেবাজে গীত গাওয়ার বদলে হাত পেতে নিতেন মদ, আর তরুণী মেয়েদের আনুকূল্য।

আমার এই গুরু ও বন্ধুর শেষ পরিণতিটা ভালো হলো না। তাঁকে হত্যা করার পর লোহার একটা খাঁচায় ভরে তুলে দেওয়া হয়েছিল টুইড নদীর তীরে—এক হ্যামলেটের গেটের মাথায়। বেচারার করুণ হাড়ে ঠোকর মেরে মাংসের কণা পর্যন্ত খেতে দেখা গেছে চিল আর শকুনকে। আমার বুড়ি মা মারা যাওয়ার পর আর কখনো কাঁদিনি আমি; কিন্তু পল টিমপানির জন্য আমি চোখের পানি ধরে রাখতে  পারিনি; যদিও আমার জানা ছিল, এই দৃশ্য দেখলে গলা ছেড়ে হেসে উঠতেন তিনি। সত্যি কথাটা যদি বলি, এটাই যে তার পরিণতি হতে যাচ্ছে, সেটা আমাদের দুজনেরই জানা ছিল।

তবে আমি শুধু আমার বন্ধুর জন্য কাঁদিনি। গায়ক হওয়ার বহু বছর আগে আমি একজন সেনা ছিলাম। মৃত্যু আমাকে অনেকবারই ছুঁঁতে ছুঁঁতে না ছুঁয়ে জবাই করেছে আমার প্রিয় বন্ধুদের কিংবা আমার সহযোদ্ধাদের।

আমি তাদের জন্য শোক পালন করেছি; কিন্তু এ রকম অনুভূতি আমার কখনো হয়নি যে তাদের বিদায়ের ফলে পৃথিবীর আলো কমে গেল। একজন সেনার জীবন খুব কমই মূল্য পায়, এমনকি যুদ্ধের সময়ও। লাইনে তার জায়গা দেখতে না দেখতে পূরণ হয়ে যাবে।

কিন্তু পল টিমপানির মতো একজন স্বভাবকবি যখন মারা যান, আমরা তাঁর স্বর হারাই, হারাই তাঁর স্মৃতিতে যত গান জমা করা ছিল তার সব। আর এই অন্ধকার সময়ে, অসমসাহসী (সিংহহৃদয়) রিচার্ড যখন রাজা হিসেবে ইংল্যান্ডে প্রায় থাকছেনই না, কারণ ক্রুসেডের যুদ্ধে তাঁকে খুব বেশি সময় দিতে হচ্ছে, প্রায় পুরোটা সময়ই তাঁকে থাকতে হচ্ছে ফ্রান্সে। এদিকে সিংহাসনে বসেছেন প্রিন্স জন, ওদিকে স্কটল্যান্ডে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন পাঁচজন রাজা, তখন এই দুঃখিনী পৃথিবীর এমন সংগীতের প্রয়োজন, যেটা আমাদের প্রাচীন মর্যাদা আর মূল্যবোধের কথা আরো বেশি করে মনে করিয়ে দেবে।

আমার বন্ধু, গায়করাজ পল টিমপানি, এত বেশি প্রেম আর বীরত্ব নিয়ে রচিত গান জানতেন, আমার দেখা কোনো পথকবি তেমনটি জানতেন না।

এমনকি তার পরও আমি যাদের গান শুনেছি তাদের মধ্যে তিনি সেরা ছিলেন—এমন কথা আমি বলতে পারব না।

 

 

* * *

 

এক সপ্তাহ হতে চলল কালিমাখা স্কটিশ মেঘের নিচে, ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে আটকে আছি, গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি ভাঙাচোরা এইলহাউসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছি। এটা মাঝারি একটা কুঁড়েঘর, নিউক্যাসল ওয়েস্টের কিনারায়। এই কুঁড়েতে আপনি যত খুশি কড়া বিয়ার খেতে পারবেন।

আমরা যে গ্রামের একধারে রয়েছি, তার পথে পথে থকথকে কাদা ছাড়া আর কিছু দেখার নেই। এই কাদাময় গ্রামের আদৌ যদি কোনো নাম থেকে থাকে, সেটা আমি শুনিনি, জানারও চেষ্টা করিনি। আমার একমাত্র চিন্তা, এখান থেকে প্রাণ নিয়ে কিভাবে পালানো যায়।

পড়ো পড়ো সরাইখানার ভেতর খুব বেশি খদ্দের। বোঝাই যাচ্ছে, লাঠির গায়ে লাঠি চড়িয়ে বানানো কাঠামোর গায়ে থাবা থাবা মাটি লাগিয়ে আর রং মাখিয়ে অল্প যে কয়টা ঘরবাড়ি গ্রামে তৈরি করা হয়েছে, সেখানে এই দুর্যোগের মধ্যে কোনো কাজ পাওয়া যাবে না। অথচ তার পরও পথকষ্টে বিধ্বস্ত ছয়-সাতজন দুপেয়ে নেকড়ে আগুনের কাছ থেকে দূরে এক কোণে বসে চোঁ চোঁ করে বিয়ার খাচ্ছে। খরচাপাতি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজেদের তারা ছাদের মিস্ত্রি বলে দাবি করেছে, অর্থাৎ যারা নলখাগড়া আর খড় দিয়ে ছাদ বানায়; কিন্তু নিজেদের শরীরে লড়াইয়ের যে দাগ তারা বহন করছে আর অযত্নে লুকানো ছুরির বাঁট ফাঁস করে দিচ্ছে তারা আসলে কী : বরখাস্ত সেনা। কিংবা বাহিনী থেকে পালিয়ে আসা। এসব লোক একটিমাত্র কাজে দক্ষ, মানুষ খুন করা।

তাদের পেশা ছিনতাই আর ডাকাতি।

এমনিতে অপরাধীরা আমার জন্য কোনো সমস্যা নয়। সবাই জানে, গায়কদের কাছে প্রায় কখনোই কোনো পেনি থাকে না। তা ছাড়া বনে বা পাহাড়ে যারা মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়, তারাও সৎ মানুষের মতো খুব আগ্রহ নিয়ে গান শুনতে ভালোবাসে। যাদের কপালে ফাঁসির দড়ি ঝুলছে তাদের আমি যদি শ্রোতাদের মধ্যে না রাখি, আমার আশপাশে ভিড় বলে সত্যি কিছু থাকবে না। তবে স্কটিশ সীমান্ত বরাবর চোর-বদমাশগুলো অনেক বেশি বেপরোয়া। আর ভাগ্যটা যেহেতু মন্দ, আমার কাছে কিছু টাকা আছে। আর সেটা তারা জানে।

এর আগের শহরে, উৎসবের এক বাড়িতে, রাজকীয় ভোজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে গান-বাজনার আয়োজন করে ছোট থলেভর্তি রুপালি মুদ্রা পেয়েছি আমি। সীমান্ত এলাকার একটা ইঁদুর আমার সঙ্গে ধাক্কা খেল; আমার ধারণা, ইচ্ছা করে। মুদ্রার ঝনঝনানি শুনে দ্রুত ঘুরে আরেক দিকে চলে গেল শয়তানটা, তবে তার চোখে আমার মৃত্যু দেখার আগে নয়।

আর তাই এখানে এই সরাইখানায় বসে ধৈর্যধারণের একটা খেলা খেলছি আমরা, চেষ্টা করছি সময়ের চাকাকে গড়ানোর, অপেক্ষা করছি কখন বৃষ্টি থামবে। তবে আমি শুধু বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় বসে নেই, বসে আছি এই অপেক্ষায়ও যে কখন আমার প্রাণটা থামবে—আমারটা এবং সম্ভবত সরাইখানার মালিকেরও। তাদের মতো গলাকাটার দল অপরাধের কোনো সাক্ষী রাখে না; জানে, সাক্ষীর গান তাদের পৌঁছে দিতে পারে ফাঁসিতে ঝোলানোর গাছে।

আমার জান বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে ঘুম। আমার না, ওদের। আর তাই আমি লুট (গিটারের মতো) বাজাচ্ছি নরম সুরে, বিড়বিড় করে গাইছি চোখ বন্ধ করার ক্ষমতা আছে এমন ঘুমপাড়ানি গান, যেগুলো আমার মনে আছে। আর প্রার্থনা করছি, তারা যেন বেশ কিছুক্ষণ ঘুমায়, আমি যাতে অনেকটা পথ এগিয়ে থাকতে পারি।

আর ঠিক তখন আমি সেটা শুনতে পেলাম। কোনো বাক্য ছাড়া শুধু একটা সুর গুনগুন করছিলাম, এই সময় জানি না কোন সে এক পরি আমার সুরে সুর মিলিয়ে নিখুঁত গুনগুন করতে লাগল। তার গলা এত মধুর যে আমার গায়ের সব লোম দাঁড়িয়ে গেল, উল্লাসে আর পুলকে আমি অবশ হয়ে পড়লাম। আমার ইচ্ছা হতে লাগল ধ্যান করি, ধ্যানের জগৎ থেকে নির্বিঘ্নে আহরণ করি ওই সুরমাধুর্য, পুরো অস্তিত্ব বিনিয়োগের মাধ্যমে উপভোগ করি ঐশ্বরিক এই অমূল্য উপহার।

চমকে উঠে আমি লুট বাজানো বন্ধ করলাম; কিন্তু মেলোডি থামল না, যেমন চলছিল তেমনি চলতে লাগল। তারপর এই স্বর্গীয় নারীকণ্ঠ গলা চড়িয়ে মূল গানটা গাইতে শুরু করল—যেমন পরিষ্কার গলায়, তেমনি নিখুঁত উচ্চারণে। মুহূর্তের জন্য ভাবলাম, এটা অবশ্যই স্বর্গ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ, একা শুধু আমি শুনতে পাচ্ছি, আমাকে আমার সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে বলছে। তারপর সরাইখানার মালিক, ঘন কালো দাড়ির জঙ্গলে ভর্তি মুখ আর নাদুসনুদুস শরীর নিয়ে, কর্কশ গলায় অভিশাপ দিল, সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সেই মধুকণ্ঠ।

‘ওই গান কে গাইছিল?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘আমার ফাটা কপাল,’ অভিযোগের সুরে বলল লোকটা। ‘একজন নান।’

‘নান? কী বলছেন? এই জায়গায়?’

‘বেশ, নবিশ নান বলতে পারেন, মাত্র কিছুদিন হলো ভর্তি হয়েছে।’

‘না, মানে, আমি জানতে চাইছি, যে মেয়ে নান বা নান হতে চলেছে, সে এই জায়গায় কেন? কী করছে এখানে?’

‘ওদের মঠে, ল্যাকলান কালেতে, আগুন লেগেছে। সেটা এখান থেকে ২০ মাইল উত্তরে। প্রায় সবাই মারা গেছে; কিন্তু দুঃসাহসী এক ডাইনি, বুড়ি নান, খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে এসেছেন এখানে নিজের রক্ত-মাংসের দায়িত্ব অর্থাৎ বোঝা নিয়ে, তারপর আমার সরাইখানার চৌকাঠে দেহত্যাগ করেছেন। সেই অসহ্য বোঝা এখন আমার কাঁধে।’

‘অসহ্য বোঝা—?’

‘বললাম না, শিক্ষানবিশ নান! একেবারেই কোনো কাজের নয় ওই মেয়ে। আমাকে যে কী বিপদে ফেলেছে...’

‘কিন্তু তার গলা তো অসম্ভব ভালো।’

‘আমার কাছে নয়। আমার কান গান নিতে পারে না, আমার খদ্দেররাও গুনগুনানি খুব একটা পছন্দ করে বলে মনে করি না। ওই মেয়ে হলো স্বর্গ থেকে পাঠানো আমার ওপর মূর্তিমান অভিশাপ, কসম খেয়ে বলছি। সে অন্ধ, কোনো কাজ জানে না, শেখারও তেমন আগ্রহ নেই।’

‘ওকে আপনি বের করে আনুন, আমি ওর আরো গান শুনতে চাই।’

‘উঁহু,’ বিড়বিড় করল সরাই মালিক, আড়চোখে একবার দেখে নিল এক কোণে বসা গলাকাটার দলটাকে। ‘ওদিকে বসা ওই লোকগুলো জুলুমবাজ। আমার ছাদের তলায় একজন নানের ক্ষতি হবে, সে ঝুঁকি আমি নিতে পারি না। এমনিতেই আমার কপালের চারদিক ফাটতে শুরু করেছে।’

‘আমি বেশ বুঝতে পারছি ওই লোকগুলো সম্পর্কে আপনার ধারণা ভুল,’ গলা একটু তুলে বললাম, বদমাশগুলো যাতে শুনতে পায়। ‘আমার কাছে প্রচুর টাকা আছে, কিন্তু কই, ওরা আমাকে কোনো রকম বিরক্ত করেনি। ওদের আপনি আমার তরফ থেকে বিয়ার খাওয়ান, তারপর মেয়েটিকে বের করে আনুন, আমাদের আরো গান শোনাক সে।’ কাউন্টারে ভাংতি কিছু পয়সা ছুড়ে দিয়ে চোরের দলকে ঝট করে পুরোপুরি সচেতন করে তুললাম।

সরাই মালিক আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, আমার যেন দ্বিতীয় মাথা গজিয়েছে। তবে ছোঁ দিয়ে পয়সা তুলতে মোটেও দেরি করল না। সরাইখানা আর অন্দরমহলের মাঝখানে একটা দরজায় মোটা কাপড়ের নোংরা পর্দা ঝুলছে। একঝটকায় সেটাকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকল লোকটা, তারপর চড়ুই পাখির মতো রোগা-পাতলা এক মেয়েকে ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে বের করে আনল কামরার ভেতর। তার বয়স হবে ষোলো, কিছু কমবেশি হতে পারে। ময়লালাগা গ্রাম্য কাপড়চোপড় পরে আছে, মুখ সরু, শরীর কঞ্চি, তার চোখ গজ ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়া।

‘কী নাম তোমার, মেয়ে?’

‘লাইলাক,’ উত্তর দিল মেয়েটি, গলার আওয়াজ শুনে আমার দিকে ঘুরে গেল তার মুখ। সরাইখানার মালিকের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। না, সে রূপসী নয়; তবে নোংরা দাগ ধুয়ে ফেলার পর নির্ঘাত সুশ্রী হিসেবে উতরে যাবে।

‘লাইলাক? তুমি কি ফরাসি?’

‘না, সিস্টাররা আমাকে বলেছেন, আমি জোলটাইডে জন্মেছি।’

‘ক্রিসমাসকে ঘিরে যে আনন্দ, সেটাকে দিন কয়েক বাড়িয়ে নিয়ে একটা উৎসব করা হয়, জোলটাইড বা ইয়োলটাইড তারই নাম। যা হোক, তোমার গানের গলা আমার কানে অপার্থিব লেগেছে, সেটার জন্য কিছুটা হয়তো আমার আবেগ দায়ী।’

‘আপনি একজন গায়ক, সত্যি কি না?’ মেয়েটি এত সরাসরি প্রশ্নটা করল, আমাকে হকচকিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে লজ্জাবতী ও শান্তশিষ্ট একজন নানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ‘আমি কি আপনার নামটা জানতে পারি?’

‘আমি ম্যাসন, মিস। শ্রুসবারি ও ইয়র্ক, পশ্চিম ইংল্যান্ডের একটা শহর থেকে আসছি, যেখানে ওয়েলসের সঙ্গে সীমান্ত আছে। আমি একজন পথকবি, পথেঘাটে গান গেয়ে বেড়াই, মানুষকে কাহিনিকাব্য শোনাই, বীরত্বের জয়গানও গাই।’

‘কয়েক দিন ধরেই আপনার গান শুনছি। মনে হলো, আপনি অনেক গান জানেন।’

‘ঘুরে বেড়ানোর সময় দু-একটা সুর পেয়ে যাই। ভয় নিয়ে বলি, একজন নানের কানের উপযোগী নয় সেগুলো। এটাও ঠিক নয় যে তুমি একটা এইলহাউসে থাকবে। ওদিকে একটা অ্যাবি আছে, দিন কয়েক পশ্চিমে হাঁটলে পৌঁছানো যায়। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে সেখানে দিয়ে আসতে পারব।’

অ্যাবি হলো চার্চ, সংলগ্ন দালানগুলোতে সন্ন্যাসী (মংক) আর সন্ন্যাসিনীরা (নান) বসবাস করে, অন্য ভাষায় ওগুলোকে মঠ বলা হয়।

‘থামুন, থামুন,’ এইলহাউসের মালিক শুরু করল। ‘আমি তো সে অনুমতি দেব না! আমি...’

‘কথা শুনুন, বন্ধু। মেয়েটি এখানে থাকতে পারে না, এটা হলো এক নম্বর কথা; আর দুই নম্বর কথা হলো, জীবনের বড় একটা অংশ অপব্যয় করেছি, কিছু ভালো কাজ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করার প্রয়োজন আছে আমার। এই সুযোগ পাওয়ার বদলে আমি যথাসাধ্য দাম চুকাতে রাজি আছি।’ আস্তিনবিহীন জারকিনের (জ্যাকেট) ভেতর থেকে থলিটা বের করে উপুড় করলাম, টেবিলে রুপালি মুদ্রার একটা স্তূপ তৈরি হলো। ‘আপনি এই হাড্ডিসার নিঃস্ব শিশুটির প্রতি যে দয়া দেখিয়েছেন, বিবেচনা করুন স্বর্গ থেকে পাঠানো এটা আপনার জন্য তার পুরস্কার। আমরা কি আরো দর-কষাকষি করব?’

সরাইখানার মালিক স্তম্ভিত, আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল, তারপর দ্রুত কোণে বসা দলটাকে একবার দেখে নিল। তাদের চোখ রুপালি টাকার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন একদল নেকড়ে একপাল হরিণকে দেখছে।

‘আরো বেশি পাওয়ার আশা করে লাভ নেই,’ আমি আমার কথা বলে যাচ্ছি। ‘চাইলে আপনি আমাকে সার্চ করে দেখতে পারেন; কিন্তু আমার কাছে একটা ফুটো পেনিও নেই আর। এসো মেয়ে, এখান থেকে আমাদের চলে যাওয়াই ভালো।’

‘কিন্তু বৃষ্টি তো এখনো থামেনি,’ প্রতিবাদ করল মালিক, নেকড়ে ছয়জনকে দেখছে, তাদের সঙ্গে একা থাকতে ভয় করছে তার। ‘মেঘ একটু সরে যাক, তখন গেলে ভালো হতো না?’

‘না, তা হয় না; আপনার সেবা নিয়ে পয়সা দেওয়ার সামর্থ্য এখন আর আমার নেই। দয়া করে যেতে দিন। ওর কিছু জিনিসপত্র আছে কি?’

‘জিনিসপত্র? আরে না, ওই মেয়ে তো...’

‘গাঢাকা দেওয়ার জন্য তাহলে এতেই কাজ চালাতে হবে,’ বলে হ্যাঁচকা টানে দোরগোড়া থেকে পর্দাটা টেনে নিলাম, জড়িয়ে দিলাম মেয়েটির গায়ে। ছোঁ দিয়ে নিজের লুট নিলাম। হাঁটা শুরু করে দোরগোড়ায় একটু থামলাম, শুধু এই কথাটা বলার জন্য : ‘আপনারা যাঁরা এখানে আছেন তাঁদের ওপর ঈশ্বর যেন সদয় হন।’ তারপর মেয়েটিকে টান দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বের করে আনলাম; কিন্তু মাত্র কয়েক পা এগিয়েই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে, ঝাঁকি দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নিজের হাত। হন করে ঘুরে আমার মুখোমুখি হলো, তার সরু চোয়াল সামনের দিকে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে।

‘দয়া করে আপনি আমাকে এখানেই খুন করুন, আপনার দোহাই লাগে।’

‘কী!’

‘আপনার মনে যদি আমাকে নষ্ট করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে এখনই খুন করুন আমাকে, যেখানে আমি একটা ভদ্রোচিত কবর পাব। সিস্টার ডায়ানা আমাকে আপনাদের মতো পুরুষদের সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন।’

‘একেবারে ঠিক কাজ করেছেন; কিন্তু আমাকে তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শোনো মেয়ে, আমার যে বয়স, তোমার বাবা হওয়ার জন্য সেটা যথেষ্ট। আমি একসময় সেনা ছিলাম এবং আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, তোমার ক্ষতি করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। দুর্ভাগ্য, সরাইখানায় যাদের রেখে এলাম তাদের পক্ষ নিয়ে আমি এই শপথ নিতে পারব না। শোনো, এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের সরে যেতে হবে, তা না হলে দুজনের একজনও বাঁচব না।’

‘তাহলে কুকুরছানার মতো আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করুন। আমি হাঁটতে পারি। যদি পারেন আপনি বরং আমাকে একটা সরু লাঠি জোগাড় করে দিন।’

নিজেকে তিরস্কার করে তাড়াতাড়ি বার্চগাছের ডাল কেটে এনে মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিলাম। লক্ষ করলাম, নিজ পথের বাধা অনুভব করতে বেশ কায়দার সঙ্গে ওটা ব্যবহার করছে সে। যদিও মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছে, তবে আমার হাঁটার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। হরিণীর চঞ্চল পা, যেমন তারুণ্যে ভরপুর ও দৃঢ়, তেমনি নমনীয়।

পুরোটা বিকেল একটানা হাঁটলাম আমরা, গর্তে ভরা পথ ধরে উত্তরে যাচ্ছি। এই খানাখন্দভরা পথ তৈরি করেছে ঘোড়ায় টানা গাড়িগুলো। মেয়েটিকে আমি কিছু খেতে দিতে পারিনি, এমনকি এক ঢোক পানিও না। তবে হাঁটার সময় গতি খানিক কমিয়ে এনে আকাশের দিকে মুখ হাঁ করে বৃষ্টির পানি খেয়েছি, আর সেটা তাকে বলেছিও; কিন্তু না সে কোনো মন্তব্য করল, না করল আমাকে অনুকরণ। তারপর একসময় সন্ধে ঘনিয়ে এলো, আর আমরাও ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আশ্রয়ের জন্য কোথাও থামতে হবে—এই চিন্তা মাথায় নিয়ে চারদিকে চোখ রাখছি।

‘আমাদের হাঁটা কমে এলো কেন?’ লাইলাক জিজ্ঞেস করল।

‘সন্ধে হতে আর বেশি দেরি নেই।’

‘আমার কাছে অন্ধকার কিছু না। আপনি চাইলে আবার আগের মতো হাঁটতে পারেন।’

‘দরকার নেই। বৃষ্টি আমাদের পায়ের সব ছাপ মুছে ফেলবে। তা ছাড়া ওরা আমাদের পিছু না-ও নিতে পারে। আমি যদি একসঙ্গে কয়টা দেবদারুগাছ দেখতে পেতাম...’

‘ওদিকে,’ হাত তুলে আমাদের বাঁ দিকটা দেখাল মেয়েটি। ‘ওদিকে বেশ কয়টা দেবদারুগাছ এক জায়গায় জড়ো হয়ে আছে।’

ঠিক বলেছে লাইলাক। ঝিরঝিরে বৃষ্টির ভেতর দিয়ে তাকাতে ঝাপসা লাগল, তবে দেবদারুগাছ চিনতে আমার অসুবিধা হলো না—আমাদের পথ থেকে ২০ কি ২২ গজ দূরে হবে।

‘তুমি জানলে কিভাবে?’

‘গন্ধে। গত এক ঘণ্টায় আমরা কয়েকবার দেবদারুগাছকে পাশ কাটিয়ে এসেছি, যদিও আমাদের চারপাশের জঙ্গলে ওলডার, জলপাই, অ্যাশগাছই বেশি। তবে কিছু বেরিঝোপও আছে, আছে দু-একটা বটও। এগুলোর প্রতিটির স্বাদ আর গন্ধ আলাদা, একটার সঙ্গে আরেকটা মেলে না। মঠে আমার কাজ ছিল জঙ্গল থেকে বেত বা ও রকম সরু আর নমনীয় ডাল সংগ্রহ করে আনা, তারপর ওগুলো দিয়ে বাস্কেট বানানো। কাজটা আমাকে প্রায় সময় একাই করতে হতো।’

‘একা থাকতে তুমি ভালোবাসো?’

লাইলাক চুপ করে থাকল।

‘জঙ্গলে একা বেশিক্ষণ থাকলে তোমার গা ছমছম করত না?’

‘জানেন,’ হঠাৎ হড়বড় করে শুরু করল মেয়েটি, ‘জঙ্গলের সঙ্গে আমার না খুব বন্ধুত্ব! আমি প্রতিটি গাছের গা ছুঁতাম, ওদের সঙ্গে কথা বলতাম...’ হঠাৎ নিজের মুখে হাতচাপা দিল, ‘...ধুৎ, বোকার মতো এসব আমি কী বকে যাচ্ছি...’

শুধু হাসি চাপলাম, কিছু বললাম না। হাত ধরে ঝোপের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তাকে, গায়ে গায়ে লেগে থাকা দেবদারু কয়টার দিকে। আমাদের পায়ের নিচে ঝরা আর ভেজা পাতার নরম বিছানা। মাথার ওপর প্রচুর মোটাসোটা কাণ্ড আর ডালপালা থাকায় এদিকের কিছু কিছু মেঝে বেশ শুকনো, কোথাও আবার অল্প একটু ভেজা। ভারী কিছু ডাল আর পাতা কেটে এনে নিজেদের জন্য কোনো রকম একটা বিছানা তৈরি করলাম, তারপর ইস্পাতে ফ্লিন্ট ঘষে শুকনো সরু সরু ডালপালা দিয়ে ছোট একটা আগুন জ্বাললাম।

লাইলাককে গা গরম করতে রেখে এসেছি, প্রায় অন্ধকার হয়ে আসা জঙ্গলের ভেতর দ্রুত এদিক-সেদিক হেঁটে অস্ত্র হিসেবে কী পাওয়া যায় দেখছি। খুঁজতে খুঁজতে একটা মরা অ্যাশগাছ দেখতে পেলাম, যেটার শুকনো খটখটে ডাল আমার কবজির মতো মোটা। ২০ মিনিট লাগল ডালটাকে কেটে নিজের পছন্দমতো সাইজ করতে আর চেঁছে মসৃণ করতে—ব্যস, চাষার মুগুরতুল্য একটা হাতিয়ার তৈরি হয়ে গেল। এটা হাতে থাকায় এখন আমি বুনো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গে লড়তে পারব, ভয় করব না কোনো দুপেয়ের তলোয়ারকেও।

আগুনের কাছে ফিরে আসছি, ওখানে আমার জন্য একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দূর থেকেই আমার নাকে স্বর্গীয় ঘ্রাণ পৌঁছে গেল, আগুনে মাংস সিদ্ধ হচ্ছে। লাইলাককে দেখলাম রক্তাক্ত এক জোড়া সসেজ ধরে আছে আগুনের ওপর, একটা লম্বা লাঠির শেষ মাথায় গাঁথা, ছ্যাতছ্যাত শব্দে ফুটন্ত চর্বি ঝরে পড়ছে আগুনে।

‘তোমার দেখছি ভালো প্রস্তুতি নেওয়া ছিল,’ বললাম তাকে। লম্বা লাঠির মাথা থেকে টান দিয়ে বের করে আনলাম একটা সসেজ, জোরে জোরে ফুঁ দিচ্ছি; জানি, যথেষ্ট ঠাণ্ডা না হলে চিবাতে পারব না।

‘অন্ধদের দেশে মানিয়ে চলাটা শিখে নেয় মানুষ।’

‘কিন্তু কনভেন্টে নিশ্চয় তোমার সঙ্গে ভালো ব্যবহারই করা হতো?’

‘তারা এমনিতে নরম আর ভদ্র; কিন্তু তাদের নিজেদের জীবনে এত বেশি...জ্বালা আর যন্ত্রণা! নবিশ হিসেবে যারা আসত মঠে আমি সব সময় তাদের নতুন গান শেখানোর জন্য বিরক্ত করতাম, তাদের কাছে বারবার জানতে চাইতাম বাইরের দুনিয়ায় কী ঘটছে না ঘটছে। আচ্ছা, আপনি কি অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন?’

‘হ্যাঁ, অনেক দূরে গেছি। লন্ডন থেকে স্কাই পর্যন্ত...’

‘স্কাই—?’

‘উত্তর-পশ্চিম স্কটল্যান্ডের একটা দ্বীপ, দুর্গম আর কর্কশ পাহাড়ি দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। গেছি, ফিরে এসেছি, এ রকম বহুবার—প্রথমে একজন সেনা হিসেবে, তারপর একজন গায়ক হিসেবে।’

‘আপনি অনেক গান জানেন। আমার জন্য একটা গাইবেন নাকি? এমন একটা গান, যেটা বহুদূর কোথাও থেকে শিখেছেন আপনি।’

‘ফ্রান্স কি তোমার জন্য যথেষ্ট দূরে?’ ভেড়ার চামড়া দিয়ে বানানো আমার ব্যাগ থেকে লুটটা বের করলাম, কিছুক্ষণ সুর তুলে আর গলা সেধে নিয়ে ধরলাম ‘সং অব রোল্যান্ড’ গানটা। এটা মহাশক্তিধর শালেমেইন আমলের একটা রণসংগীত। রাস্তার কিনারায় কিংবা শক্ত কোনো ঘাঁটিতে বসে এই গান আমি গলা ছেড়ে গেয়েছি; কিন্তু সন্ধ্যালগ্নের বনভূমিতে আগুনের ধারে বসে আমি আজ নরম সুরে গাইলাম। গাইলাম শুধু লাইলাকের জন্য।

এটা একটা কাহিনিকাব্য, তাই অনেক লম্বা; বারোটা স্তবক শেষ করেছি, এই সময় একটা হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিল সে।

‘এক মিনিট থামুন, প্লিজ।’ তারপর ওই গান আমি যতটুকু গেয়েছি তার সবটুকু হুবহু গেয়ে আমাকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিল—কোথাও এতটুকু সুর ভাঙল না, একটুও কিছু বদলায়নি, উচ্চারণের বিশুদ্ধতা সম্পূর্ণ অটুট থাকল। তার স্বর্গীয় মাধুর্যে ভরপুর গলা আমার চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ। আমি যেখানে শেষ করেছি ঠিক সেখানে এসে থামল।

‘গেয়ে যাও, মেয়ে। তোমার গলা এই গানে জাদু ঢেলে দিয়েছে।’

‘কী করে গাইব। পারব না তো। এর আগে কখনো এই গান আমি শুনিনি। আর প্রতিবারে এক ডজন বা কাছাকাছি স্তবক মুখস্থ করতে পারি, তার বেশি না। তবে শেষে দেখা যায়, আমি সবটুকু মনে রাখতে পারছি।’

‘সত্যি বলছ? পুরো একটা কাহিনিকাব্য তুমি মাত্র একবার শুনে শিখে ফেলবে?’

‘আমার জগতে বই বা রাস্তার ধারে পথচিহ্ন বলে কিছু নেই। স্মৃতিশক্তিই সব। সিস্টার ডায়ানা বলেছেন, হোমার অন্ধ ছিলেন, অথচ তিনি হাজার স্তবকের গান গাইতে পারতেন।’

‘হোমার?’

‘কবি, আমার ধারণা, তিনি একজন গ্রিক।’

‘আমার জানা আছে হোমার কে। ইয়র্কের কিশোর ডিউকের দেহরক্ষী ছিলাম আমি, সে যখন লন্ডনের স্কুলে পড়ত। আমার অবাক লাগছে নানরা হোমার পড়ে, শোনে।’

‘আমি নান নই। আমি ছিলাম মঠে আশ্রয় নেওয়া এক শিশুকন্যা, একজন লজার।’

‘লজার?’

‘লজার। আমার নিজস্ব কোয়ার্টার ছিল, আর সিস্টার ডায়ানাকে রাখা হয়েছিল আমাকে যাবতীয় যা কিছু শেখানোর জন্য, তাঁকে বিশেষ করে নজর রাখতে বলা হয়েছিল সমাজে আমি যাতে ভদ্রভাবে মেলামেশা আর চলাফেরা করতে পারি।’

‘ওখানে তুমি কত দিন ছিলে?’

‘কত দিন আবার কী, ওখানে আমি সব সময় ছিলাম,’ বলল লাইলাক। ‘আমার পুরোটা জীবন।’

‘কিন্তু মঠে কোনো শিশু জন্ম নেয় না। তোমার মা-বাবা কোথায়? তোমার বাড়ি?’

‘মঠই আমার বাড়ি,’ বলল সে, গলায় আকস্মিক রাগ চলে এলো। ‘ওখানে আরো গেস্ট ছিল। এক বোকার হদ্দ মেয়ে, আর এমন পঙ্গু ও বিকৃত এক ছেলে যে তাকে চাকা লাগানো বাক্সে তুলে এখানে-সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো। আমার মা-বাবা যদি কেউ থেকেও থাকে, তাদের সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই, জানার এতটুকু গরজও নেই আমার। অন্ধদের দেশে সব পুরুষ সুদর্শন, সব ভদ্রমহিলা সুন্দর।’

‘কিন্তু সবই অন্ধকারে?’

‘সব না, আমি রাত আর দিনের পার্থক্য যথেষ্ট দ্রুত ধরতে পারি, কিছু রং আর আকৃতিও বুঝতে পারি, তবে সে রকম পরিষ্কার নয়। চোখে এই রিবনটা আমি পরি বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য এবং আমার অন্য ইন্দ্রিয়গুলোকে অভাব পূরণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আর সেভাবেই আমি জেনেছি দেবদারুগুলো কাছাকাছি আছে। একইভাবে বলতে পারছি কেউ একজন আসছে এখন।’

‘কী? কোথায়?’

‘পেছনে, আমাদের ফেলে আসা পথে।’

‘আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।’

‘অন্ধকারে দৃষ্টিশক্তি কোনো কাজে আসে না। লোকটা ঘোড়ার পিঠে, ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।’

‘ঘোড়ার হিসাবটা আমার মাথায় ছিল না,’ বললাম তাকে, আগুনের পাশে উঠে দাঁড়ালাম, শক্ত আর মোটা লাঠিটা হাতে নিয়ে। ‘সরাইখানার ওই বদমাশগুলো...’

‘না,’ জোর দিয়ে বলল লাইলাক, চাপা স্বরে। ‘ওই জায়গায় কোনো ঘোড়া ছিল না। আর আমি এখন মাত্র একটা পশুর আওয়াজ পাচ্ছি।’

তারপর আমিও শুনতে পেলাম, কাদাময় ট্রেইলে খুরের নরম ছলাতছলাত শব্দ। তারপর সেটা থেমে গেল।

নীরবতা। শুধু বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার আওয়াজ।

‘হ্যালোওওও, আগুন,’ একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘আমি একজন পথিক—পুরো ভিজে গেছি; নিজেকে শুকাতে চাই, দিকনির্দেশনাও দরকার। সঙ্গে খাবার আছে, শেয়ার করতে পারব। আমি কি তোমাদের দিকে এগোতে পারি?’

‘চলে আসুন এবং আপনাকে স্বাগত জানাই,’ জবাব দিলাম আমি, সরে ছায়ার ভেতর চলে গেলাম।

সতর্কতার সঙ্গে হেঁটে এলো লোকটা, লাগাম ধরে টেনে আনছে নিজের পশু, চেহারা-সুরত দেখে মনে হলো, ওটাকে দিয়ে জমিতে হাল দেওয়া হয়। আগন্তুক লোকটাকেও ও রকম লাগল। শক্তপোক্ত কাঠামো, খামারে কাজ করায় একটু কুঁজো, কর্কশ উলেন চাদরে ঢাকা থাকায় মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। দেখে নিরস্ত্র মনে হলো, তবে চাদরটা এমনভাবে শরীরে জড়ানো, আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না।

‘আপনারা এখানে যাঁরা আছেন তাঁদের সবার ওপর ঈশ্বরের দয়া উপচে পড়ুক। আমি মেনটিথ-এর মাইকেল, লর্ড ডামাস্কির জমিদারবাড়িতে আছি, ওখানকার গোমস্তা হিসেবে। তোমার হাতে ওই লাঠি রাখার কোনো প্রয়োজন নেই, বন্ধু। আমি কোনো মানুষের ক্ষতি করার লোক না।’

‘আপনি মেনটিথ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছেন।’

‘হ্যাঁ।’ মাথা ঝাঁকাল সে, আগুনের ওপর হাত সেঁকছে। ‘যাচ্ছি গ্রাহামসবির মেলায়। আশা, এই কাতর বুড়োটাকে বেচে তরুণ একটা ষাঁড় আর দু-এক কাপ বিয়ার কিনব। তোমরা ঠিক কে, বলো তো? কোত্থেকে আসছ? যাচ্ছই বা কোথায়?’

‘আমি ইয়র্কের ম্যাসন,’ বললাম তাকে। ‘মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি স্ট্র্যাথক্লাইডে।’

জায়গাটা মধ্য স্কটল্যান্ডে, গ্লাসগো শহরসহ।

‘মেয়ে কি অন্ধ—ঘটনাচক্রে?’

আমি কিছু বলার আগেই একঝটকায় গায়ের চাদর খানিকটা সরাল সে, ভোঁতা পাতসহ লুকানো তলোয়ারটা দেখা যাচ্ছে। যেকোনো ব্যারাক থেকে সেনাদের ইস্যু করা হয় এগুলো। লোকটার দাড়ি ফাঁক হয়ে গেল, বেরিয়ে পড়ল ভাঙা দাঁতসহ নীরব হাসি। ‘ভালো চাও তো হাতের ওই লাঠি ফেলে দাও, হে। তা না হলে আমি তোমাকে এক কোপে দুই টুকরো করব।’

সে যদি ভেবে থাকে আমি ট্রাউজার ভিজিয়ে ফেলব, কিংবা পালানোর জন্য খিঁচে দৌড় দেব, তাকে নিরাশ হতে হবে। আমি এর আগেও তলোয়ার দেখেছি; এমনকি এক কি দুবার তলোয়ারের সামনেও দাঁড়িয়েছি, হাতে ঘাম ছাড়া আর কিছু ছিল না। এখন আমার হাতে মোটা লাঠি আছে, আর মেনটিথের বাচ্চাকে দেখে চাষা বলে মনে হচ্ছে, প্রকাণ্ডদেহী, তবে আড়ষ্ট আর আনাড়ি। আমি অপেক্ষায় থাকলাম।

সে-ও তা-ই থাকছে। তার দৃষ্টি আমার আর লাইলাকের মধ্যে বার কয়েক ছোটাছুটি করল। জিব চাটল, আমাদের স্থির ভাব দেখে নার্ভাস বোধ করছে, চেষ্টা করছে সাহস সঞ্চয়ের। তারপর প্রচণ্ড একটা গর্জন ছেড়ে আমাকে লক্ষ্য করে লাফ দিল, তলোয়ারটা ঘোরাল ক্ষেতের একটা কাস্তের মতো।

তলোয়ারের বদলে হাতে একটা কাস্তে থাকলে ভালো করত লোকটা। লাঠির ডগার দিকটা তার দুই হাঁটুর নিচের লম্বা দুটি হাড়ের মাঝখানে ঢুকিয়ে দিলাম আমি, তারপর চাড় দিতেই ছিটকে আগুনের মধ্যে পড়ে গেল সে। অত বড় কাঠামো, সে তুলনায় দারুণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে শরীরটাকে গড়িয়ে দিয়ে আগুনের কাছ থেকে সরে গেল, দূর কোণে পৌঁছে গুড়ি মেরে বসে থাকল। হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে।

কী ঘটছে বুঝতে না পেরে পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে লাইলাক, ওদিকে এরই মধ্যে আবার দাঁড়িয়েছে মেনটিথ, আগুনটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে, অর্থাৎ লাইলাকের দিকে এগোচ্ছে। আমি ভাবলাম তাকে ধরতে চাইছে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। আমার ভুল হয়েছে। চোখে উন্মত্ততা, আবার হামলা করল সে, এবার লাইলাককে লক্ষ্য করে।

আমার মেয়েটির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে সে, তলোয়ার মাথার ওপর তুলে ফেলেছে, এবার তির্যক রেখা তৈরি করে নামিয়ে আনবে তার ঘাড়ে, ঠিক তখন মোটা লাঠিটা মেনটিথের পেটে গেঁথে দিলাম আমি, তার শরীরটাকে দুই ভাঁজ করে দিলাম। হাঁপাচ্ছে, হোঁচট খেতে খেতে পিছু হটল, এবার তলোয়ার চালাল আমাকে লক্ষ্য করে। এটা তার একটা ভুল। লাঠির এক মাথা দিয়ে তার তলোয়ারের বাড়ি ঠেকালাম, আরেক প্রান্ত ঘোরালাম পুরো শক্তিতে, আঘাত করল বৃষস্কন্ধে, ঠিক তার কানের নিচে।

এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকল সে, বিস্মিত। তারপর কোটরের ভেতর তার চোখ উল্টে গেল হুকে বেঁধা শুয়োরের মতো। সটান পেছন দিকে পড়ে যাচ্ছে, সরাসরি আগুনে। তার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকলাম, ঠিক যেন ধনুকের টান টান ছিলা, একটু নড়তে দেখলে প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেওয়ার জন্য তৈরি; কিন্তু আশ্চর্য, কমলা শিখাগুলো পর্যন্ত তাকে জাগাতে পারল না।

লাথি মেরে তার মুঠো থেকে তলোয়ারটা খসালাম, তারপর লাঠির গুঁতো মারতে মারতে আগুন থেকে বের করে আনলাম তাকে।

‘ম্যাসন? কী ঘটছে এখানে?’

‘আমাদের অতিথি ভব্যতা জানে না, আর তার পরিণতি বেচারার জন্য মোটেও ভালো হয়নি। তোমার কোনো ধারণা আছে, কে হতে পারে সে?’

‘আমি তার গলা আগে কখনো শুনিনি। কেন?’

‘ঠিক নিশ্চিত নই, তবে লোকটা চোরও হতে পারে। তার কাছে একটা জোমেন তলোয়ার ছিল; কিন্তু সেনা সে হতেই পারে না।’

‘বলছিল, সে একজন লর্ডের গোমস্তা, হয়তো সত্যি কথাই বলছিল। তবে আমি তার গা থেকে গবাদি পশুর গন্ধ পাচ্ছি।’

‘লড়লও সেভাবে, পুরোপুরি ষাঁড়, দক্ষতা কাকে বলে একেবারেই জানে না। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সে আমাদের খোঁজেই এসেছিল। জানত তুমি অন্ধ, অথচ আমাদের দুজনের কাউকেই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল না।’

‘ব্যাপারটা আমার মাথায় আসছে না।’

‘মাথায় আমারও আসছে না, এখনো। ঘুম ভাঙলে আমি তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য চাপ দেব।’

কিন্তু সে জাগল না। হাত বাঁধার জন্য যখন তার বেল্ট খুলছি, দেখলাম তার মাথাটা নড়বড় নড়বড় করছে। একেবারেই স্বাভাবিক নয়। আমি তার চোখের পাতা পরীক্ষা করলাম। এমন মরা পাতা জীবনে দেখিনি।

‘ঈশ্বরের ভোঁতা সুঁই,’ বিড়বিড় করলাম।

‘কী হয়েছে?’

‘হারামজাদা মরে ভূত হয়ে গেছে। আমার মাথায় বাজ পড়ুক, মারার সময় মনে হয়নি অত জোরে মারছি। ও ব্যাটাও নরকে যাক, আমাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করতে আসার জন্য। সে যে শুধু নিজের গোপনীয়তা চেপে গেছে তা নয়, এখন আমাকে তার অকেজো ধড়টাকে বনভূমির গভীরে টেনে নিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই না আমাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি পাওয়া যাক তাকে।’

মরা মানুষকে খুব বেশি ভারী লাগে, হাঁপাতে হাঁপাতে মনে হলো যেন এক মাইল টেনে এনেছি। তারই তলোয়ার দিয়ে অগভীর একটা কবর খুঁড়লাম। গোমস্তা মহোদয়কে গড়িয়ে এনে ফেললাম তাতে, তলোয়ারটাও তার পাশে থাকল। স্কটল্যান্ডে সাধারণ মানুষের জন্য অস্ত্র নিষিদ্ধ। গোমস্তার তলোয়ার কী উপকারে লাগল? তার পার্সে কয়েকটা মাত্র শিলিং পাওয়া গেল, কাউকে কবর দেওয়ার জন্য ন্যায্য মজুরি।

রাতে আমার ভালো ঘুম হলো না, লড়াই আর গোমস্তার মৃত্যুর ঘটনা মন থেকে তাড়াতে পারছি না। হতে পারি আমি একজন সেনা; কিন্তু কেউ আমাকে বীর বলবে না। আমি আমার নিজের আর বন্ধুদের প্রাণ রক্ষার জন্য লড়াই করেছি, যখন প্রয়োজন হয়েছে খুন করেছি; কিন্তু খুন করে কখনো আনন্দ পাইনি। যুদ্ধের সময় আমি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আর তারপর, যদিও প্রাণে বেঁচে গেছি, তবু জানতাম শত্রুর জায়গায় রক্তক্ষরণে মৃত্যুটা আমারও হতে পারত, আর আমি যখন রক্তক্ষরণে মারা যাচ্ছি তখন আমার জিনিসপত্র নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত হয়ে উঠত তারা, আমার ভাগ্যের ওপর বাজি ধরে ঢকঢক করে মদ খেত।

গোমস্তা মেনটিথের মৃত্যু দ্বিগুণ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল আমাকে। সে ভবঘুরে ডাকাত টাইপের মানুষ ছিল না। বোকা একজন মানুষ ছাড়া এ দেশে কেউ রাতে রাস্তায় থাকে না, অথচ সন্ধের অনেক পরে আমাদের ক্যাম্পে হাজির হলো সে। লোকটা নিঃসন্দেহে আমাদের শিকার করবে বলে খুঁজছিল; কিন্তু সেটার কী কারণ, আমার কল্পনায় তা ধরা পড়ছে না।

সরাইখানার গলাকাটার দল কি তাকে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিল? সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। যে কাজ তারা নিজেরা করতে পারে, করে অভ্যস্ত, সেটা তারা অন্য কাউকে দিয়ে কোন দুঃখে করাতে যাবে? এটা তাদের রোজগারের পথ।

আরো বড় রহস্য হলো, লড়াইয়ের মাঝখানে লাইলাকের দিকে ঘুরে গেল লোকটা, যখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে মেয়েটি তার জন্য কোনো হুমকি নয় এবং লাইলাককে আহত করতে চায়নি, চেয়েছে মেরে ফেলতে। তার এই আচরণের কোনো অর্থ করা যাচ্ছে না। তবে সে যদি মেয়েটিকে মেরে ফেলার জন্য এসে থাকে, তাহলে আলাদা কথা। সে ক্ষেত্রে আমি ছিলাম তার জন্য একটা বাধা। কিন্তু অন্ধ একজন শিক্ষানবিশ নানকে কেন কেউ খুন করতে চাইবে?

‘ম্যাসন? আপনি কি জেগে আছেন?’

‘হ্যাঁ, ঘুম আসছে না।’

শিখা নিভে গেছে, জ্বলছে শুধু কাঠকয়লা, তার মুখ ছায়ার ভেতর অস্পষ্ট একটা আকৃতি। ঠিক যেমনটি তার দুনিয়ার সব মুখ।

‘আমি চিন্তা করছিলাম। আপনি আমাকে কোনো মঠে দিয়ে আসতে পারবেন না।’

‘সেকি, কেন?’

‘আমার লজিংয়ের জন্য টাকা না দিলে তারা আমাকে গ্রহণ করবে না।’

‘এর আগে তোমার খরচ কিভাবে মেটানো হতো?’

‘আমার ঠিক জানা নেই, সম্ভবত কোনো স্বজনের মাধ্যমে বলে ধারণা করি। মঠের যিনি অধ্যক্ষা ছিলেন তাঁর সঙ্গে একটা ব্যক্তিগত আয়োজন করা হয়েছিল; কিন্তু ওই আগুনে পুড়ে মারা গেছেন তিনি। এখন তো কেউ জানেও না যে কোথায় আছি আমি। সেই স্বজন যিনিই হোন, আমাকে সাহায্য করতে যদি চানও, কিভাবে আমার খোঁজ পাবেন তা তাঁর জানার কোনো উপায় নেই। তবে আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।’

‘যেমন?’

‘আমাকে আপনি নিজের সঙ্গে নিয়ে চলুন,’ আবেগের বশে দ্রুত কথা বলছে মেয়েটি। ‘আমি আমার খরচ চালাতে পারব। খুব একটা খারাপ গাই না আমি, আর আপনি আমাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন...’

‘প্রশ্নই ওঠে না। পথের জীবন অসম্ভব কষ্টের, এর মধ্যে একটা মেয়ের জন্য একেবারেই কিছু নেই।’

‘অন্ধদের দেশে সব রাস্তাই অসম্ভব কষ্টের। আজ বিকেলে আপনাকে আমি বেশ জোরে জোরে হাঁপাতে শুনেছি, আমি যেখানে আরো পুরো একটা দিন ক্লান্ত না হয়ে হাঁটতে পারতাম। আমি বোঝা বইতে পারি, কাপড় কাচতে জানি, যদি চান আমি আপনার মেয়েমানুষও হতে পারি।’

‘আমার কী? হে মহান ঈশ্বর, লাইলাক, মেয়েমানুষ হওয়া বলতে কী বোঝো তুমি?’

‘মঠের নবিশরা খুব কমই আর কিছু নিয়ে আলাপ করত এবং এ রকম কিছু ভাববেন না যে দু-একটা প্রেমের গান আমি জানি না।’

‘আমি ড্রাগনদের গান জানি, খুকি, কিন্তু নিজের নিঃশ্বাসে আমি আগুন আনতে পারি না। তা ছাড়া তোমার জন্য আমি অনেক বুড়ো হয়ে যাই।’

‘আমি সেটা জানব না।’

‘হ্যাঁ, জানবে। এ ব্যাপারে আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো।’

‘আপনি আমাকে চান না? আমি খুব বেশি সাদামাটা, সেটাই কি কারণ? নাকি আমার অন্ধত্ব আপনাকে বিব্রত করছে?’

‘ওসব কিছু না, কিন্তু...’

‘তাহলে কী? আপনি দু-দুবার আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আমাকে যদি দূরে সরিয়ে দেওয়ারই ইচ্ছা ছিল, তাহলে এত সব ঝামেলায় জড়াতে গেলেন কেন?’

‘লাইলাক—’

‘একবার এক পথকবি এসেছিলেন আমাদের মঠে। সঙ্গে একটা ছোট্ট কুকুর ছিল, তিনি বাঁশি বাজালেই সেটা নাচতে শুরু করত। আমি নাচতে জানি না, তবে এক-আধটু গাইতে পারি এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনাকে আমি ওই ছোট্ট কুকুরের চেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলব না। প্লিজ, ম্যাসন।’

‘যথেষ্ট হয়েছে!’ বললাম আমি, হাত ছুড়ছি। ‘সূর্য উঠতে যাচ্ছে, ভালো হয় এখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে যেতে পারলে। এটা নিয়ে পরেও আমরা আলাপ করতে পারব।’

তবে তা আমরা করিনি। তার বদলে আমরা গান করেছি। গোমস্তা মেনটিথের ঘোড়ায় চেপে পালা করে গেয়েছি দুজন, পরস্পরকে আনন্দ দিয়েছি—আমার গাওয়া প্রতিটি গান মুখস্থ করে নিয়েছে লাইলাক, তারপর সেটাকে অনেক উন্নত করেছে নিজের অসাধারণ মিষ্টি গলার সাহায্যে।

পরবর্তী সময়ে কয়েকটি হ্যামলেটকে আমি পাশ কাটিয়ে গেলাম, ভয় পাচ্ছি মেনটিথের ঘোড়াটাকে যদি কেউ চিনে ফেলে। তবে প্রথম যে শহরটা সামনে পড়ল, আকার-আয়তন যা-ই হোক, একজন দরজিকে খুঁজে নিলাম, নির্দেশ দিলাম—লাইলাকের জন্য বেড়ানোর উপযোগী একটা পোশাক তৈরি করে দাও।

মাপ নিয়ে কাজে লেগে গেল দরজি। একপর্যায়ে লাইলাক আর দরজির স্ত্রী বাড়ির অন্দরমহলে গায়েব হয়ে গেল, আধাতৈরি পোশাক কেমন ফিট করছে দেখার জন্য। দরজি লোকটার সঙ্গে বাড়ির সামনের অংশে অপেক্ষা করছি আমি, শহর আর পথের খবরাখবর বিনিময় করছি তার সঙ্গে। খানিক পর ফিরে এলো লাইলাক, একেবারে নতুন একটা মেয়ে হয়ে।

পোশাকটা ফ্যাশন গোছের কিছু নয়, কারো চোখও ধাঁধাবে না। তার আসলে কোনো দরকারও নেই। ম্লান নীল উলসি দিয়ে তৈরি একেবারে সাধারণ পোশাক। তবে মুখে খুব করে কিছু ঘষা হয়েছে, ময়লা সব সাফ, তাই সেটা চাঁদের মতো আভা ছড়াচ্ছে, আর জাদুটা ওখানেই—সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে আমার আবিষ্কারকে। আর তাকে দেখে আমি নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেললাম।

দরজির স্ত্রী পট্টির বদলে নীল একটা রিবন পরিয়ে দিয়েছে লাইলাকের চোখে, পোশাকের সঙ্গে এখন সেটা ভালো ম্যাচ করল। সব মিলিয়ে হাজার কাহিনিকাব্যে সমৃদ্ধ এই কুমারীকে সৌন্দর্যের একটা আধার মনে হচ্ছে; কিন্তু কোনো আয়না কথাটা তাকে কোনো দিন জানাতে পারবে না।

আমার গলা বুজে এলো, শব্দ বেরোচ্ছে না। আমার নীরবতাকে অসন্তোষ ধরে নিয়ে দরজির স্ত্রী ভ্রু কোঁচকাল। ‘রংটা যদি আপনার বেশি গাঢ় বলে মনে হয়...’

‘না,’ কোনো রকমে বলতে পারলাম। ‘এটা একেবারে নিখুঁত। খুব ভালো। এত সুন্দর কন্যা আর কারো নেই উপলব্ধি করে আমার ভারি গর্ব হচ্ছে।’

তখন সে রকমই মনে হচ্ছিল। জন্ম থেকে অস্থির একজন মানুষ, আমার কখনো কোনো পরিবার ছিল না, সেটার অভাবও কখনো সেভাবে অনুভব করিনি। অথচ লাইলাকের সঙ্গে মাত্র কয়টা সপ্তাহ ঘোরাফেরা করেই ভয় পাচ্ছি, ওকে ছাড়া আমার জীবন কাটবে কিভাবে। যখনই ভাবছি তার একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে, যতক্ষণ না সেটা পারছি ততক্ষণ আমার ছুটি নেই, তখনই আমার বুক খালি হয়ে যাচ্ছে, সেখানে বেদনাভরা হাহাকার ছাড়া আর কিছু অনুভব করছি না।

গ্রীষ্ম ফুরিয়ে গিয়ে যখন শরৎ শুরু হতে যাচ্ছে, আমরা নিজেদের দিক বদলে দক্ষিণ-পুবমুখো হয়ে হাঁটা ধরেছি, এগোচ্ছি সীমান্তের দিকে, বিকেলের নাশতা কিংবা রাতের খাবারের বিনিময়ে এখানে-সেখানে থেমে গান গাইছি। এভাবে নিজেদের গুণ আর নৈপুণ্য আরো নিখুঁত করার সুযোগ পাচ্ছি। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে একসঙ্গে গান করায় আমাদের দুজনেরই অনেক উপকার হচ্ছে, নানাভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছি আমরা।

আমার পারফরম্যান্স সব সময় প্রশংসা কুড়ায়, তবে যেসব গান আমি আমার অর্ধেক জীবন ধরে গাইছি, লাইলাক সেগুলোতে তাজা ভাব আর উজ্জ্বল ফুলকি ঢেলে দিল। তার চাঞ্চল্য, তরতাজা তারুণ্য আর প্রবল উৎসাহ আমার গাঢ় ও গম্ভীর উপস্থিতির সঙ্গে মিলেমিশে প্রাণবন্ত এবং দারুণ উপভোগ্য একটা আলাদা মাত্রা যোগ করল। ফলে দেখা গেল, যেখানে আমরা যাচ্ছি সেখানেই আগের চেয়ে আকারে বড় দেখছি লোকসমাগম।

শ্রোতারা লাইলাকের আবেদনে সাড়া দিচ্ছে। শ্রোতাদের প্রবণতা আর রুচি বোঝার চেষ্টা করছে লাইলাকও, যাতে তাদের আরো খুশি করার মতো কিছু গাইতে পারে। গাছে রোদ লাগলে যেমন ফুল ফুটতে থাকে, পথে বেরোলেই তেমনি ঝুড়ি ভর্তি করে হাততালি আর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা কুড়াচ্ছে আমার মেয়ে। কনভেন্টের হাড্ডিসার শিশু এখন হয়ে উঠছে হাসি, আনন্দ আর আলোয় উদ্ভাসিত এক রূপসী এবং পরে আর যদিও সেই পুরনো প্রসঙ্গটা তোলেনি সে যে আমি তার বাবার চেয়ে বেশি কিছু, তবু বোঝা যায় আমার মেয়েমানুষ হওয়ার খুব ইচ্ছা তার এবং আরো লক্ষ করলাম, তরুণ ছেলেদের ব্যাপারে তার মধ্যে এতটুকু আগ্রহ বা কৌতূহল নেই, যারা আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও কাছাকাছি ঘুরঘুর করে লাইলাকের সঙ্গে গল্প করার লোভে।

লাইলাক সব সময় সবার সঙ্গে বিনয়ী আর ভদ্র আচরণ করে, এমনকি ওই তরুণদের চলে যেতে বলার সময়ও সে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করে না বা মেজাজ দেখায় না। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেদের ব্যাপারে তোমার কৌতূহল নেই কেন, সে উত্তর দিল—ওরা ওই জিনিসই।

মানে? জিজ্ঞেস করলাম আবার। সে বলল, ওরা ছেলেমানুষ, তার বেশি কিছু না। আপাতত নিজের সংগীতজগৎ আর নতুন জীবনের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক সন্তুষ্ট লাইলাক। জীবনে এত সুখী কখনো ছিল না সে।

তা আমিও ছিলাম না। শেষ যে শহরে আমরা কাজ করেছি সেটার নাম ছিল স্ট্র্যাথক্লাইড। ওখানকার জমিদার আর তাঁর পরিবার আমাদের অনেক খাতির-যত্ন করেছে, প্রাসাদতুল্য বাড়িতেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে জমিদারের স্টুয়ার্ড আমাদের একটা প্রস্তাব দিল—তাঁরা চাইছেন আমরা যেন আগামী একটা বছর আবাসিক শিল্পী হিসেবে তাঁদের সঙ্গে থেকে যাই...

এক মাস আগে হলে আমি লাফ দিয়ে লুফে নিতাম এই লোভনীয় প্রস্তাব; কিন্তু এখন না। এখন আমরা অনেক সুখে আছি।

স্কটদের সঙ্গে সব সময় আমি স্বস্তি আর শান্তি বোধ করি। তাদের কর্কশ রসবোধ আর রণসংগীতের প্রতি ভালোবাসা, দুটিই আমার শিল্পবোধ আর মন-মেজাজের সঙ্গে ভালো মানিয়ে যায়। তবে লাইলাক সেটা বদলে দিচ্ছে।

লাইলাকের মেধা আর দক্ষতা যত উন্নত হচ্ছে, তত বেশি করে আমার চোখে ধরা পড়ছে গ্রাম্য শ্রোতাদের ওপর তার গানের জাদুকরী প্রভাব এবং আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে রোমান প্রাচীরের দক্ষিণে সত্যিকার বোদ্ধাদের জন্য অনেক বড় আয়োজন করা হলে সেখানেও সবাইকে এত সহজেই মুগ্ধ করতে পারবে সে। নিউ ক্যাসলে, ইয়র্কে, এমনকি হয়তো বা লন্ডনেও।

বহু বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো নিজেকে আমি ভবিষ্যৎ বিবেচনা করার সুযোগ দিলাম। আমরা হতে পারি ওস্তাদ পথগায়ক, পেতে পারি সমাজের সর্বস্তরের স্বীকৃতি, উঠে যেতে পারি এতটা ওপরের বৃত্তে, যেটা আমাদের দুজনের কেউ আগে কখনো জানিনি।

কিন্তু ভবিষ্যতে পৌঁছতে হলে আমাদের প্রথমে বর্তমানে টিকে থাকতে হবে। আপনাকে কান পাততে হবে না, স্কটল্যান্ডের পাহাড়ে পাহাড়ে যুদ্ধ লাগার গুজব সব সময় শুনতে পাবেন। তবে এবার যেন পরিস্থিতি বেশ খানিক অন্য রকম লাগছে আমার। এসব অঞ্চলে সাধারণত যে ধরনের যুদ্ধ বাধে, এবার ব্যাপারটা যেন সে রকম হতে যাচ্ছে না। আমার এ রকম মনে হওয়ার পেছনে কারণ আছে। পথে পথে আমি অনেক ধরনের যোদ্ধা দেখেছি, তারা শুধু স্কটিশ আর তাদের চাচাতো-মামাতো ভাই আইরিশ নয়, তাদের সঙ্গে সাতঘাটের পানি খাওয়া ভাড়াটে সেনাদেরও দেখতে পাচ্ছি, তারা এসেছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডস থেকে।

ভ্রাম্যমাণ গায়ক হিসেবে প্রথম দিকে বাড়ি ছেড়ে বহু দূরে চলে আসা সেনাদের আনন্দদানের সুযোগ পেলে ভারি খুশি হতাম আমি, তাদের পার্স হতো ফোলা আর ভবিষ্যৎ ঝরঝরে। নিঃসঙ্গ সেনা শ্রোতা হিসেবে অমায়িক ও বিনয়ী, সহজেই সন্তুষ্ট করা যায়, প্রশংসা পাওয়া যায় অঢেল, তারা পয়সাও ছড়ায় খোলামকুচির মতো। বাড়িতে ফেলে আসা স্বজনদের জন্য তাদের মন কেমন করে; কিন্তু আমরা খুশি হই—বিষণ্ন এই লোকগুলোকে যদি আনন্দ দিতে পারি, দুটি বেশি পয়সা জুটবে কপালে।

কিন্তু এখন আমাকে আমার মেয়ের কথা ভাবতে হবে। তাকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। কাজেই স্টুয়ার্ডের অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করার পর আবার আমরা পথে নেমে পড়েছি, যাচ্ছি দক্ষিণ দিকে, যেদিকে সীমান্ত আর ইংল্যান্ড। বলা যায় না আমরা হয়তো শ্রুসবারিতে আমার পরিবারের সঙ্গেও দেখা করতে যেতে পারি—দীর্ঘ বহু বছর পর।

ভ্রমণ এখন নির্ভেজাল আনন্দ, গলায় গান নিয়ে সমতল ভূমি ধরে এগোচ্ছি; এলাকার মানুষ, তাদের জীবনধারা আর চারদিকের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি মেয়েটিকে, আর লাইলাক ভারি দামি ওয়াইনের মতো তারিয়ে তারিয়ে গিলছে আমার প্রতিটি বর্ণনা। থামার জো নেই, তাগাদার পর তাগাদা আসতে থাকে—থামলেন কেন? তারপর কী হলো? ওরা সত্যি এত ভালো? ওরা সত্যি এত খারাপ? আমার একমাত্র মনোবেদনা হলো লাইলাক তার অন্ধদের দেশে থেকে যাচ্ছে, আমি জানি তার পথটাকে আলোয় ভরিয়ে তুলতে হবে, অথচ কিছুই করতে পারছি না।

তবে অন্ধ হয়ে জন্মানো এক তরতাজা কুমারী মেয়ে আর স্বপ্ন দেখে বিভ্রান্ত এক বোকার মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। যদিও সেসব দিনে জীবনের সবচেয়ে বেশি সুখ পেয়েছিলাম বলে মনে করতে পারি আমি, তার পরও কিছু কিছু দিক থেকে আমি আমার নতুন পাওয়া মেয়ের চেয়েও বেশি অন্ধ ছিলাম।

 

* * *

 

হেমন্তের প্রথম তুষার গায়ে মেখে অনবরত দক্ষিণে যাচ্ছি আমরা, যাচ্ছি শুধু দক্ষিণে নয়, বিপদের মধ্যেও। এবার আমরা সত্যিকার সীমান্তপ্রভুদের এলাকায় ঢুকতে যাচ্ছি, তাঁরা সবাই অভিজাত বংশের হোমরাচোমরা, টুইড নদীর দুই ধারেই তাঁদের বিপুল সয়সম্পত্তি আর স্বজনরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, আছে নিজস্ব অনুগত বাহিনী, যাদের আনুগত্য সমতল ভূমির বাতাসের মতোই পরিবর্তনশীল। টিমপানি একবার স্কটিশ সীমান্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন: থ্যাবড়ানো একটা রক্তাক্ত রেখা, যেটা কখনো শুকায় না।

ওই দাগ বোধ হয় আবার কেউ বদলাতে চাইছে।

আমরা যখন লিডেসডেল পৌঁছতে যাচ্ছি, এক হ্যামলেটে গেয়ে আরেক হ্যামলেটের পথ ধরছি, সেনাদের এড়ানোর জন্য প্রায়ই বাপ-বেটিকে জঙ্গলে গাঢাকা দিতে হচ্ছে, কারণ কাণ্ডজ্ঞানই বলে দিচ্ছে ওদের চোখে ধরা পড়াটা বোকামি হবে, যেহেতু আমার সঙ্গে একটা অসহায় মেয়ে রয়েছে। এসব সেনা তাগড়া ঘোড়ার পিঠে বুক ফুলিয়ে বসে আছে, প্রত্যেকের কাছে প্রচুর অস্ত্র।

টাইন আর রিড নদীতে নরম্যান নাইটসদের মধ্যে সারাক্ষণ যুদ্ধ লেগে আছে, আর অসহিষ্ণু স্কটরা লড়তে থাকে লিডল ওয়াটার বরাবর—লড়াই করার জন্য তাদের সংগত কোনো কারণ দরকার হয় না। এ রকমই আসলে হওয়ার কথা, বিশেষ করে যে দেশে হামলা চালিয়ে গবাদি পশু নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে গানের মাধ্যমে বীরত্ব বলে অভিহিত করা হয়, আর সেই সব হানাদারের করা হয় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। যা হোক, বাতাসে যেহেতু যুদ্ধের গন্ধ, সীমান্ত পার হওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এই দল বা ওই দল আমাদের দুজনকেই গুপ্তচর বলে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিলে কারো কিছু করার নেই। নদীর পানি যেমন থেমে থাকে না, এসব এলাকায় গলায় ফাঁস পরানোও চলতেই থাকে।

তবে আমাদের সৌভাগ্য আরো প্রসারিত হলো। আমরা তখন রেডজুফে পৌঁছতে যাচ্ছি, পরিচিত একটা ওয়াগন চোখে পড়ল, টকটকে লাল গাড়ি, দুদিকের গায়ে ওয়েলশ ড্রাগন আঁকা।

ভ্রমণের কাপড়চোপড় বদলে আমরা আমাদের পারফরমিং পরিচ্ছদ পরলাম, তারপর লাইলাককে ঘোড়ায় বসালাম। লাগাম ধরে হাঁটছি আমি, যাচ্ছি বেশির ভাগ মানুষের কাছে অপরিচিত অন্য রকম একটা জগতে, যে জগতের নাম ভ্রাম্যমাণ সার্কাস।

আমার মেয়ের কৌতূহল আর প্রশ্ন থামতে চাইছে না। তার সংগত কারণও আছে। কেউ আমাদের গান গাইতে অনুরোধ করেনি, তাহলে আমরা আনুষ্ঠানিক পোশাক পরলাম কেন? আপনি কি এই সার্কাসের কাউকে চেনেন, নাকি ওদের দলে যোগ দিতে চাইছেন?

ভবঘুরে প্রায় সব গায়কই, বিশেষ করে উত্তরে, বিপত্সংকুল পথে একাই চরে বেড়ায়, তা না হলে কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়ায় ছোট পরিবারের বোঝা—হয়তো স্ত্রী আর একটা বাচ্চা। তবে অল্প কিছু গায়ক বিপুল দর্শক-শ্রোতাকে টানতে পারে এমন একটি দলে ভিড়ে যায় এবং সেখানে গান গেয়ে প্রচুর প্রশংসা কুড়ায়। ওই দলে আরো থাকে মিউজিশিয়ান, জাগলার আর অ্যাক্রোব্যাট—ওদের উপস্থিতি একটা শহরে উৎসব ঘোষণা করার জন্য যথেষ্ট। আর বাচ্চারা তো না চাইতেই আকাশের চাঁদ পেয়ে যায় হাতে।

ও রকম একজন পর্যটক গায়ক হলো জো ফিশবল, নিজেকে সে ওয়েলশ আর ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের তুখোড় ছোকরা বলে দাবি করে থাকে। মানুষটা ছোটখাটো; কিন্তু কাঠামো খুব মজবুত, শরীরের মাংস আর পেশি যেমন নিরেট, তেমনি শক্ত। তার সোনালি দাড়ি আর সুদর্শন চেহারা দেখে কে না তাকে বদমাশ ডেভিলের কাজিন বলবে। সীমান্তের দুদিকেই ফিশবল খুব নামকরা গায়ক, আসলে এরই মধ্যে গোটা মহাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে তার খ্যাতি, সেটা কারো পছন্দ হোক বা না হোক। জন্মসূত্রে ওয়েলশ ভবঘুরে গায়কদের নাতি এবং ছেলে সে, এই শিল্পের একজন ওস্তাদ শিল্পী এবং এ ব্যাপারে সে খুবই সচেতন।

তার ক্যাম্পে মৌচাকের ব্যস্ততা লক্ষ করলাম, রান্নার চুলা নিভিয়ে ফেলা হয়েছে, ঘোড়াগুলোকে কাদাময় মাঠে টেনে এনে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফিশবলকে আমি চারদিকে হাঁটাহাঁটির অবস্থায় পেলাম, একাই সব কিছু তদারক করছে, খুঁটিনাটি সব দিকে তার কড়া নজর, অথচ তার হাত বা চোখ-ধাঁধানো বেশভূষা এতটুকু নোংরা হচ্ছে না। পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে কেউ তাকে পথকবি বা গায়ক বলবে না, মনে হবে তরুণ একজন লর্ড। আজ সে লাল ভেলভেট জ্যাকেট পরেছে, কোমরে ব্রিচিস (হাঁটু না ছাড়ানো ট্রাউজার), খরগোশ কিংবা নরম করা হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি সেটা, তার মসলিন শার্টে রয়েছে ঢোলা ইতালিয়ান আস্তিন, একে শুধু ফ্যাশন বলা যাবে না।

একটা আস্তিনে কিংবা হয়তো দুটিতেই, ছুরি লুকিয়ে রাখে ফিশবল। আমি তাকে একবার এক লোকের গলা দুই ভাগ করতে দেখেছি, কাজটা সে এমন দক্ষতার সঙ্গে করেছিল, বেচারা লোকটার আত্মা নরকে পৌঁছানোর আগে টের পায়নি যে সে মারা গেছে। কাপড়চোপড় দেখে আর কথাবার্তা শুনে ভাঁড় আর বাচাল বলে মনে হতে পারে; কিন্তু কেউ যেন ভুলেও ফিশবলকে হালকাভাবে না নেয়।

আমার সঙ্গে কয়েক বছর পর পর কিভাবে যেন ঠিকই তার দেখা হয়ে যায়, সাধারণত বন্ধুত্বের সম্পর্ক ধরেই। অন্তত সেটাই আমি আশা করি, কারণ তাকে এখন আমার প্রয়োজন।

ঘোড়াটাকে টানতে টানতে তার দিকে এগোচ্ছি, নাটকীয় ভঙ্গিতে ভেংচাল আমাকে।

‘তাঁর (ঈশ্বরের) চোখের কিরে, আমার বিশ্বাস, ম্যাসনকে আমি দেখতে পাচ্ছি, ইয়র্কের ঘ্যানরঘ্যানর কর্কশ ব্যাঙ। কোনটা বেশি কুিসত বোধগম্য হচ্ছে না—তুমি, নাকি বিধ্বস্ত ঘোড়াটা। এখানে এসেছ নিশ্চয়ই দু-এক টুকরো রুটি ভিক্ষা চাইতে?’

‘মোটেও না। পেছনের শহরে একটু থেমেছিলাম, ওখানকার লোকজন বলল ওয়েলশের ছোট্ট এক ছটফটে মেয়ে, বোকার মতো কাপড় পরা, নিজের নাম বলছে জো ফিশবল দ্য পোয়েট। কাছেপিঠে আছে  নাকি সে?’

‘হ্যাঁ, আছে কাছেপিঠে, তোমার হাঁড়িপানা মুখে থাবা মারতে যাচ্ছে,’ বলল ফিশবল, হাসিতে শব্দ নেই। আমার হাতটা এমন প্রচণ্ড জোরে চেপে ধরল যে বিস্মিত হয়ে ভাবলাম, ছোট্ট এই শরীরে এত শক্তি সে পায় কিভাবে? ‘কেমন আছ হে তুমি, ম্যাসন?’

‘আছি আর কি, তবে তোমার মতো ভালো না। কয় বছর দেখা হয়নি, দেখতে পাচ্ছি সময় তোমার প্রতি বেশ সদয় ছিল।’

‘মিথ্যাবাদী হিসেবে তুমি চিরকাল ব্যর্থ। পথের খবর বলো।’

‘আমরা তো ভালোই করছি। অরমিসটন, স্টবসহ আরো আধাডজন ইঁদুরে কামড়ানো হ্যামলেটে অনুষ্ঠান করেছি, বেশ সাড়া পেয়েছি।’

‘আমরা?’

ফিশবলকে হকচকিয়ে যেতে দেখলাম, যদিও জানি যে ওটা তার অভিনয়—অত বড় একটা ঘোড়ার পিঠে আনুষ্ঠানিক পরিচ্ছদ পরা স্বাস্থ্যবতী এক মেয়ে তার চোখের সামনে বসে আছে, এটা তার দেখতে না পাওয়ার কথা নয়। এই যে জো ফিশবল আমার মেয়েকে দেখেও না দেখার ভান করল, এটাকে আমার মোটেও ভালো লাগল না। আমার মনটা কু গাইতে শুরু করল।

‘এসো, আমার মেয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই—লাইলাক, এই অঞ্চলের বা অন্য যেকোনো অঞ্চলের সেরা গায়িকা।’

‘এক শ বার সেরা গায়িকা সে,’ নাক দিয়ে বিচ্ছিরি শব্দ বের করল ফিশবল, তারপর আমার চোখে বিপদ পড়তে পেরে দ্রুত নিজের সুর শুধরে নিল। ‘যেহেতু, যেমনটি আমি বলেছি, তোমার বাবা মিথ্যা বলার ব্যাপারে একেবারে অযোগ্য, মাই ডিয়ার লেডি। মাত্রা ছাড়ানো সেলাক।’

স্বাভাবিক ভব্যতা আর সৌজন্য দেখিয়ে লাইলাকের হাত নিজের হাতে তুলে নিল ফিশবল, তারপর তাতে এমন কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে চুমো খেল যে আমি ঈর্ষা না করে পারলাম না। তারপর আমার মেয়ের উদ্দেশে এত সুন্দর করে হাসল, যেটা এক জোড়া মহাদেশের সব হৃদয়কে মাখনের মতো গলিয়ে দেবে। লাইলাকের অন্ধত্ব তার চোখে ধরা পড়ল কি না, আচরণ দেখে কিছু বুঝলাম না। জো ফিশবল যদি ডিমের সাদার মতো পিচ্ছিল আর চতুর না হয় তাহলে স্রেফ শূন্য সে।

‘আমি তোমাকে খুশি মনে আমার ক্যাম্পে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করতাম, ম্যাসন; কিন্তু আমরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন যদি হতো যে...’

‘তা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। বেশ, এখন আর ওই শহরে আমাদের অনুষ্ঠান করার প্রশ্নই ওঠে না। ফিশবল দ্য পোয়েট পারফরম করার পর নিচু মানের ভবঘুরে গায়কের গান আর কেউ শুনতে চাইবে কেন।’

‘এমনকি নির্লজ্জ মিথ্যা প্রশংসাও অনেক সময় একটা গসপেল সত্যের সমান হয়ে উঠতে পারে।’ ফিশবলের নীরব হাসিতে সতর্কতা ও কৌতুক দুটিই রয়েছে। ‘আচ্ছা, ম্যাসন, সত্যি করে বলো তো, আমাদের এই দেখা হওয়াটা কাকতালীয়, নাকি আমি কোনো সেবায় লাগতে পারি, তোমার আর তোমার...মেয়ের?’

‘আমাদের দেখা হওয়ার মধ্যে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ পাচ্ছে, ওয়েলসম্যান। কয়েক সপ্তাহ ধরে পথে পথে সেনাদের ভিড় শুধু বাড়তেই দেখছি। আমি আশা করছি, তোমার সার্কাস পার্টির সঙ্গে সীমান্ত পেরোতে পারব আমরা। খরচ দেওয়ার সামর্থ্য আমার আছে।’

‘গাধা হয়ো না, আমাদের সঙ্গে চলো, স্বাগত জানানোর সুযোগ দাও। যদিও আমাদের গন্তব্য সরাসরি সীমান্তের দিকে নয়। গ্যারিস্টনে, লর্ড টাফায়েলের ওখানে, অল সেইন্টস ডেতে অনুষ্ঠান করার চুক্তি আছে আমাদের। আমার তরফ থেকে সব বলা হয়ে গেল, তার পরও কি তুমি আসতে চাও? তুমি এবং তোমার...মেয়ে?’

ফিশবলের শেষ কথাটা গায়ে মাখলাম না। সে যে বারবার লাইলাকের দিকে তাকাচ্ছে সেটাও আমি খেয়াল না করার ভান করলাম। ‘যেতে না চাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি।

‘কারণ? কারণ হলো, পথে পথে তুমি যাদের হাঁটতে দেখেছ তারা লর্ড টাফায়েল কিংবা তাঁর শত্রুদের সেনা। কী নিয়ে সংকট জানি না, তবে আমরা সবাই মহানন্দে সেটার হৃদপিণ্ডে ঢুকতে যাচ্ছি, পুরোটা পথ সংগীতচর্চায় মগ্ন হয়ে।’

‘তার পরও আমরা একা ভ্রমণ করার চেয়ে তোমাদের সঙ্গে গেলে বেশি নিরাপদে থাকব।’

‘তা হয়তো ঠিক,’ গম্ভীর হয়ে স্বীকার গেল ফিশবল। ‘কিন্তু আমি এর মধ্যে খুব একটা আরাম দেখতে পাচ্ছি না। যত তাড়াতাড়ি টুইডের দক্ষিণে পৌঁছতে পারব তত বেশি স্বস্তি বোধ করব আমি। তাতে বদমাশ ডেভিল সবার পেছনে পড়বে।’

পরের কয়টা দিন অনবরত চলার মধ্যে থাকল ফিশবলের কম্পানি, থামল শুধু রাতে পশুদের বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। পরিস্থিতি যে প্রতি ঘণ্টায় খারাপ হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পথে পথে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সেনা দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু মুশকিল হলো সঙ্গে ওয়াগন থাকায় রাস্তা ছেড়ে আমরা সরতে পারছি না। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে একসময় দেখতে পেলাম, আমাদের চারপাশেই মার্চ করছে সেনারা।

ফিশবলের জনপ্রিয়তা এমনই যে যারা তাকে পারফরম করতে দেখেনি তারাও উচ্ছ্বসিত হয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। যদিও মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আছে এমন এক ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বেশ সময় নিয়ে আলাপ করার পর ওয়েলসম্যানের গাম্ভীর্য আর উদ্বেগ এত প্রবল হয়ে উঠল যে তা যেন স্পর্শ করা যাবে।

‘কী সমস্যা?’ আমার ঘোড়াকে ছুটিয়ে তার ঘোড়ার পাশে নিয়ে এলাম, তার গতি ধরে রাখছি। এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে লাইলাক নেই। তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা ওয়াগনে, সেখানে সে ফিশবলের স্ত্রীর সঙ্গে আছে। বললাম বটে ফিশবলের স্ত্রী, আমার আসলে জানা নেই তিনি তার স্ত্রী, নাকি মিসট্রেস। তাঁর দুই সঙ্গিনী আমার চোখে একই রকম দেখতে—ছোটখাটো রূপসী তাঁরা, গায়ের রং গাঢ়, মাথায় কোকিলের পালকের মতো কালো চুল। হয়তো দুই বোন। যমজ হওয়াও বিচিত্র নয়। কিছু প্রশ্ন আপনি উচ্চারণ করেন না।

‘আশ্চর্য, এ রকম একটা প্রশ্ন তুমি করতে পারছ?’ যেন অনেক কষ্টে নিজের রাগ সামলে রাখতে হচ্ছে ফিশবলকে। ‘তুমি না একজন সেনা? নিজে বুঝতে পারছ না?’

নিজেকে একটু বোকা বোকা লাগল। ঠিক কী বলতে চাইছে সে? ‘না, ফিশবল। তোমার কথা...’

‘অদ্ভুত এই ব্যাপারটা তোমার চোখে ধরা পড়ছে না?’ জিজ্ঞেস করল ফিশবল। ‘সেনাদের মধ্যে, যাদের সামনে আমরা পড়ছি?’

‘বেশির ভাগই তারা স্কট, অল্প কিছু মার্সেনারিও আছে। কেন?’

‘আমি অন্য কথা বলতে চাইছি। ওরা যেদিকে যাচ্ছে।’

এক মুহূর্ত চিন্তা করলাম। আরে, সত্যিই তো! ‘ওদের কাউকে আমাদের দিকে আসতে দেখিনি, অন্তত গত কয়েক দিন। ওরা সবাই আমাদের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে।’

‘একেবারে ঠিক।’ শব্দ করে শ্বাস ছাড়ল ফিশবল। ‘আমরা যেদিকে যাচ্ছি তারাও সেদিকে যাচ্ছে, আর এই রাস্তা ধরে এগোলে শুধু একটা ঘাঁটি পাওয়া যাবে, আর সেটা হলো লর্ড টাফায়েলের ঘাঁটি। কিন্তু আমি যখন শেষ গ্রুপটার ক্যাপ্টেনকে জানালাম, উৎসবে পৌঁছে তাকে আমি বিয়ার কিনে খাওয়াব, রাজি হলো না। বলল তখন ওখানে থাকবে না সে।’

‘তো?’

‘ও রে গর্দভ, কী বলতে চাইছি বুঝতে পারছ না? এই পথ মাত্র একটা গন্তব্য অফার করছে—গ্যারিস্টন; তাই ক্যাপ্টেনকে ওখানেই যেতে হবে। কিন্তু সে যদি উৎসব করতে গ্যারিস্টনে যাওয়ার নিয়ত না করে থাকে...’ ফিশবল তার বাকি চিন্তা ঝুলিয়ে রাখল।

‘সুইট জিসাস,’ অস্ফুটে বললাম।

‘একেবারে ঠিক,’ একমত হলো ফিশবল।

‘তারা সম্ভবত রক্ত ঝরাবে দেরি করে, ছুটির দিন পার করে।’

‘হতে পারে, যেহেতু ব্যাপারটার সঙ্গে ধর্মীয় আবেগ জড়িয়ে আছে। ওরাও তো ক্রিশ্চিয়ানই,’ ভারী গলায় বলল ফিশবল। ‘তবে ধর্মের কথা, বিশেষ করে যখন ক্রিশ্চিয়ানিটির কথা উঠল, তখন তোমাকে একটা কথা বলার তাগিদ এড়িয়ে যেতে পারছি না। তার আগে জানিয়ে রাখি, এটা আমার শোনা কথা, তবে মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই হয়।’

নিজেকে শক্ত করলাম। ‘কী কথা?’

‘পবিত্র ভূমিতে, ক্রিশ্চিয়ান ক্রুসেডাররা, জ্যান্ত শিশুদের শরীর থেকে নাড়ি-ভুঁড়ি ছিঁড়ে বের করে আনে, পরে গিলে ফেলা মূল্যবান পাথর উদ্ধার করার জন্য ওগুলো ছিন্নভিন্ন করতে থাকে। এখন তুমি আমাকে বলো, তারা কি সেই মহান নবীর বৈধ শিষ্য, যে নবী বলে গেছেন কেউ তোমার এক গালে চড় মারলে তার দিকে তুমি অন্য গালটা বাড়িয়ে দেবে?’

আমার দম বন্ধ হয়ে এলো। ‘যত বয়স হচ্ছে ততই তুমি কদর্যতার দিকে ঝুঁকছ, ফিশবল। এসব বলে তুমি কী আনন্দ পাও, আমি বুঝি না।’

‘সত্যকে ভয় পাওয়ার বা ঘৃণা করার তো কিছু নেই। ক্রিশ্চিয়ানদের সব কাজ ভালো, এটা তো নির্জলা মিথ্যা, কেউ মানুক বা না মানুক।’

আমি জানি, ফিশবল ঠিক কথাই বলছে। আমাকে চুপ করে থাকতে হলো।

‘আর বয়সের কথা যদি বলো, শিকড়বিহীন গায়ক, এমনকি গাছও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানী হয়। তা ছাড়া বুড়ো বয়সের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন নই, বুঝলে। আমাদের মধ্যে কেউই সেটা দেখে যেতে পারব বলে মনে করছি না।’

আরো চার দিন পর গ্যারিস্টনে পৌঁছলাম আমরা; কিন্তু ফিশবলের চেহারা থেকে থমথমে ভাব গেল না। নদী এখানে টুইডের শাখা, তার কিনারায় এটা একটা সীমান্ত শহর, মাটির উঁচু পাঁচিল ঘিরে রেখেছে, আর সেই পাঁচিলকে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করছে গাছের সারি সারি কাণ্ড। শহরের গেট খোলা, তবে কড়া  পাহারার ব্যবস্থা আছে।

আমরা শহরে ঢুকতে যাচ্ছি। সার্কাস পার্টির একেবারে সামনে রয়েছে আমার লাইলাক, সঙ্গে ফিশবল, লাইলাকের আরেক পাশে আমি—একই গতিতে ঘোড়া ছোটাচ্ছি তিনজন।

‘দেখে কী বুঝছ, ম্যাসন?’ জিজ্ঞেস করল ফিশবল, জিনের উঁচু অংশের ওপর ঝুঁকে, চোখ বোলাচ্ছে শহরের ওপর।

‘এত বেশি লোককে ভাড়া করা হলো, সে তুলনায় শহরটা বেশ ছোটই বলব।’ আমি সত্যি সত্যি বিস্মিত।

‘হ্যাঁ, স্বীকার করতে হবে, তোমারও চোখ আছে। ব্যাপারটা সত্যি মেলানো কঠিন। যদিও লর্ড টাফায়েলের পারিবারিক স্টুয়ার্ড কিছুমাত্র দ্বিধা না করে বেশ ভালো টাকা অগ্রিম দিয়েছে আমাকে।’

‘এই শহর কি ছিমছাম, সুন্দর?’ মাঝখান থেকে জানতে চাইল লাইলাক। ‘আমার অনুভূতি বলছে...’ কথাটা শেষ না করে হঠাৎ চুপ করে গেল।

 চোখে প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকাল ফিশবল।

মেয়েকে বললাম, ‘লাইলাক, কী বলতে চাইছিলে, বলো। হঠাৎ তুমি থেমে গেলে কেন?’

‘না, মানে, আমার অনুভূতি বলছে, এই শহর আমার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।’

আবার আমার দিকে তাকাল ফিশবল, এবার তার চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে কৌতুক। ‘ওহ্, অন্ধদের জগতে বেঁচে থাকার মানে, বুঝলে মেয়ে, প্রতিটি জলাভূমি একটা করে স্বর্গীয় উদ্যান—ইডেন। হ্যাঁ, তোমাকে জানাচ্ছি, এই শহর ভারি সুন্দর—আকাশে মাথা তুলে রয়েছে চকচকে তামা-পিতলে মোড়া টাওয়ার, দুর্গের প্রতিটি প্রাচীরে পতপত করে কত রকমের পতাকা উড়ছে বাতাসে! তবে তোমার উচিত হবে মহিলাদের সঙ্গে ক্যাম্পের ভেতর থাকা, আমি আর তোমার বাবা স্বাদ নিই যে স্টুতে নিজেদের আমরা নিয়ে এসে ফেললাম। ও, আরেকটা কথা, চোখ-কান খোলা রাখবে...’

ফিশবলকে আমি আঁতকে উঠতে দেখলাম। সেটা কৃত্রিম কি না সত্যি, আমি বলতে পারব না। কৃত্রিম হলেই বরং তার প্রকৃতির সঙ্গে এই আচরণ মেলে। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিল সে, ক্ষমা প্রার্থনা করল।

‘স্লিপ অব টাং, আই অ্যাম ভেরি ভেরি স্যরি, অ্যান্ড আই অ্যাম ভেরি ভেরি স্যাড অলসো। আমি তোমাকে চোখ খোলা রাখার কথা বলতে চাইনি।’

‘আমি কিছু মনে করিনি,’ বিশেষ প্রয়োজন না থাকলেও জবাব দিল লাইলাক, আর তার জবাব একেবারে ছোটও হলো না। ‘তা ছাড়া, আপনি না বললেও আমি চোখ খোলা রাখব।’

এবার ফিশবল হকচকিত, ঝট করে আমার দিকে তাকাল।

আমি বললাম, ‘লাইলাক একেবারে কিছু দেখতে পায় না, ব্যাপারটা সে রকম নয়। রাত আর দিনের পার্থক্য করতে পারে। কিছু কিছু রংও বুঝতে পারে।’

এখানে যেন ঈশ্বরের অপার মহিমার ভূমিকা আছে, এ রকম একটা ভাব করল ফিশবল। ‘আমার ভুল ভেঙে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, বুঝলে মেয়ে,’ বলে জুতার ডগা দিয়ে ঘোড়ার পেটে গুঁতো মারল।

শহরের ভেতর ঢোকার আগে ফিশবল তার স্ত্রীদের নির্দেশ দিল গ্যারিস্টন থেকে উজানে, গভীর বনভূমিতে ক্যাম্প ফেলবে তারা। তারপর আমরা তিনজন আবার ঘোড়া ছোটালাম—ফিশবল, আমি আর নিকোলাস ক্লড। ক্লড উত্তর আর পশ্চিম বেলজিয়ামের লোক, ফ্লেমিশ ভাষায় কথা বলে, তবে ইংলিশও জানে, সার্কাস পার্টিতে জাগলার গ্রুপের লিডার।

এ রকম পিছিয়ে পড়া জায়গায় সুন্দর পোশাক পরা ঘোড়সওয়ার এতটাই বিরল দৃশ্য যে লোকজন আমাদের অভিজাত হিসেবে সম্মান করতে লাগল। গেটে দাঁড়ানো প্রহরীরা প্রথমে মাথা নোয়াল, তারপর স্যালুট করল, সবিনয়ে জানাল জমিদারবাড়ির স্টুয়ার্ডকে মার্কেটেই কোথাও পাওয়া যাবে।

গ্যারিস্টন অনেক পুরনো শহর, সম্ভবত ফ্রান্সের উত্তর থেকে নরম্যানরা এসে এই দেশ দখল করার আগে থেকেই এটা একটা হ্যামলেট ছিল। ১০৬৬ সালে হ্যাস্টিংয়ের যুদ্ধে ইংরেজ রাজা দ্বিতীয় হ্যারল্ডকে হারিয়ে উইলিয়াম দ্য কংকারার ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। এই ঘটনা ইংল্যান্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষার ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল; শাসকশ্রেণির প্রধান ভাষা হিসেবে চালু হয়ে গিয়েছিল ফরাসি।

বাড়িঘর বলতে লাঠি বা গাছের ডাল, মাটি আর রং দিয়ে তৈরি চৌকো বা লম্বাটে কাঠামো; কাদাভরা পথের ধারে যার যেখানে খুশি বানিয়ে নিয়ে বসবাস করছে, শৃঙ্খলা বা ছক বলতে কিছু নেই। আজ হাটবার, বাতাস ভারী হয়ে আছে টিন পেটানোর শব্দে আর ফেরিওয়ালাদের চেঁচামেচিতে। টিনমিস্ত্রিরা ছোট কৌটা থেকে শুরু করে বড় স্যুটকেস পর্যন্ত এমন কোনো জিনিস নেই, যা বানাচ্ছে না। কসাইরা শুয়োরদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে, ওগুলো জবাই হতে রাজি নয়, গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কামারের একচালার ভেতর হাতুড়ির অনবরত নাচানাচিতে পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে গেছে একটা মিল হুইলের বিকট গর্জন।

এক মাস আগে হলে এত সব শব্দ আমি খেয়াল করতাম না; কিন্তু লাইলাকের সঙ্গে পথ চলতে শুরু করার পর শ্রবণশক্তি অনেক বেড়ে গেছে আমার, দুনিয়ার স্বাদ তার মতো করে নিতে চেষ্টা করায়।

শহরের উত্তর প্রান্তে শক্ত একটা ঘাঁটি ঝুলে থাকতে দেখলাম আমরা। দৃষ্টি কাড়ার মতো কিছু নয়, তবে তৈরি করা হয়েছে বেশ মজবুত করে, নরম্যান ধাঁচে চৌকো একটা ব্লকহাউস। পুরো কাঠামোই টিম্বার কাঠ দিয়ে বানানো, সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এগুলো এখন এভাবেই বানানো হয়—দুই পাশে গোল আকৃতির ফাঁক রাখা হয়েছে গোলাবারুদ ছোড়ার জন্য। এই ব্লকহাউস ছোট একটা পাহাড়ের মাথায়, কাঠামোর কোণগুলো বাইরের দিকে খানিকটা করে বেরিয়ে আছে, ওখানে দাঁড়িয়ে তীরন্দাজরা যাতে ব্লকহাউসের দেয়াল ঘেঁষে থাকা শত্রুপক্ষকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়তে পারে। শুধু যে যুদ্ধের সময়, তা নয়, শান্তির সময় দিনের বেলাও যার যার দায়িত্ব পালন করার জন্য লোকজন থাকে টাওয়ারে।

পথটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে খোলাবাজারের দিকে, সেটা শহরের চৌরাস্তার ওপর। মাটির তৈরি জিনিস, চামড়া, জুতা, জামাকাপড় প্রতিটির জন্য আলাদা দোকান। আছে মদের দোকান, আর একেবারে কাছেই পাথরের তৈরি একটা চ্যাপেল। লর্ড টাফায়েলের পারিবারিক স্টুয়ার্ডকে খোঁজাখুঁজি করছে ফিশবল, তার নাম গুইসেপি বার্নেট। তাকে কসাইদের সঙ্গে পাওয়া গেল, উৎসবের দিন রান্না করার জন্য গরুর মাংস খুঁজছে।

লম্বা-চওড়া মানুষ, শুয়োরের মতো ছোট ছোট চোখ, অতিভোজন এবং অল্প পরিশ্রমের কারণে লালচে আর ফোলা ফোলা হয়ে আছে মুখ। কিনারায় ফার লাগানো দামি পোশাক এবং সময়ের সঙ্গে প্রচলিত অলংকার পরে আছে বার্নেট—এটাকে বাহুল্য বা লোক-দেখানো কিছু বলা যাবে না, পদ ও পদবি অনুসারে এগুলোই তার পরার কথা, আর পরিবেশ-পরিস্থিতিও সেটা দাবি করে। ইঁদুরমুখো এক কর্মচারী সব সময় তাকে অনুসরণ করছে, প্রভু ভালো-মন্দ যা-ই বলুক না কেন প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিচ্ছে বা সমর্থন ব্যক্ত করছে। কিংবা দূষিত বাতাস ত্যাগ করছে, সম্ভবত।

একা শুধু ফিশবলের সঙ্গে কথা বলল বার্নেট, ফ্লেমিং ক্লড আর আমাকে গ্রাহ্য করার উপযোগী বলে মনে করল না। তবে দর আর শর্ত নিয়ে তর্ক করার সময় বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে সে। ভাব দেখে মনে হলো, আমাকে আগে কোথাও দেখেছে।

দুজন যখন সব বিষয়ে একমত হলো, হাত মেলাল তারা, তারপর হাতছানি দিয়ে আমাকে কাছে ডাকল বার্নেট।

‘এই যে, তুমি ওখানে! যে ঘোড়াটা ধরে আছ, ওটা তুমি কোথায় পেলে?’

‘ওরনিস্টনের উত্তরের এক খামারির কাছ থেকে।’

‘আর খামারি ওটা কোত্থেকে পেয়েছিল?’

‘আমি যতটুকু মনে করতে পারছি, সে বলেছিল একটা গরুর বদলে। কেন?’

‘কিছুদিন আগে আমাদের যে ঘোড়াটা হারিয়ে গেছে তার সঙ্গে মিল দেখতে পাচ্ছি। ওটাকে আমরা জমিতে হাল দিতে ব্যবহার করতাম।’

‘আমি নিশ্চিত ম্যাসন তার ঘোড়া ন্যায়পথে সংগ্রহ করেছে,’ মন্তব্য করল ফিশবল, আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে। ‘তোমার যদি কোনো সমস্যা থাকে, বার্নেট, সেটা ওই লোকের সঙ্গে।’

‘ওই লোকের সঙ্গে মানে?’ বার্নেট গম্ভীর।

‘যে লোক তোমার ঘোড়াটা নিয়েছে।’

‘যদি না তুমি মনে করো আমিই সেই লোক,’ বলে বার্নেটের মুখের সামনে চৌকো হয়ে দাঁড়ালাম, তারপর একচুল না নড়ে অপেক্ষা করছি। তবে তার গায়ে যতটা মাংস ততটা তেজ নেই।

‘সম্ভবত আমার ভুল হয়েছে,’ বলল বার্নেট, চোখ সরিয়ে নিয়ে আরেক দিকে তাকাল। ‘বুড়ো ঘোড়াগুলো চেনা মুশকিল, সব একই রকম দেখতে। ব্যাপারটা ছেড়ে দিলাম, এখনকার মতো।’ ঘুরে নিজের পথ ধরল সে, মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তার পিছু নিল কর্মচারী।

‘এটা কী হলো ঠিক বুঝলাম না,’ আমার দিকে ফিরে বলল ফিশবল। ‘তবে ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবে সামলানো গেছে।’

‘মানে?’

‘মানে হলো,’ শব্দ করে শ্বাস ফেলল ফিশবল, ‘ব্যবসার সময় মেজবানকে সব সময় উত্তেজিত করে রাখতে হয়, টাকা-পয়সা পাওয়ার আগে। সে যা-ই হোক। তাহলে? ঘোড়াটা কি তুমি সত্যি সত্যি ওরনিস্টন থেকে পেয়েছ?’

আমি জবাব দিলাম না। সেটা জবাব হিসেবে যথেষ্ট।

                       

* * *

 

গরম চাদরের মতো সন্ধ্যা নামল আমাদের ক্যাম্পে, শহরের লোক আর আশপাশের খামার থেকে খামারিরা আমাদের দিকে আসতে শুরু করেছে। যারা নিজের সেরা কাপড়চোপড় পরেছে তারা লাউয়ের শুকনো খোলের ভেতরে রাখা মোমবাতির আলোয় পথ চিনে নিচ্ছে, সঙ্গে করে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটখাটো উপহার নিয়ে আসছে—এক ফ্লাস্ক বিয়ার, একটা রুটি, ভিনেগার আর লবণ দিয়ে সুরক্ষিত কিছু ফল, মানুষের মগজ আকৃতির বাদাম, এমনকি দু-একটা হাঁস বা মুরগিও।

কোলাহলের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে মহিলাদের তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো লাইলাক। আমি তাকে পথ দেখিয়ে আগুনের ধারে নিয়ে এলাম, আরেক পাশে সার্কাস দেখতে আসা লোকজনকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত ফিশবল, সে তার দরাজ গলায় ইতালিয়ান প্রেমের গান ধরেছে, যেহেতু তার দর্শক-শ্রোতারা কেউ ইংরেজি প্রায় বোঝে না বললেই চলে। এভাবে খুব সহজেই উপস্থিত সবার মন জয় করে নিল সে।

‘কী ব্যাপার, ম্যাসন?’ ফিসফিস করল লাইলাক।

‘আমাকে বলবেন, কী ঘটছে?’

‘লর্ড টাফায়েলের দুর্গে কাল পারফরম করার জন্য আমাদের ভাড়া করা হয়েছে, উপলক্ষ অল সেইন্টস ডে; কিন্তু কেলটিক লোকজনের কাছে আজকের রাতটা আরো প্রাচীন একটা উৎসব হিসেবে পরিচিত, আর সেটার নাম হলো অল হ্যালোমাস ইভ বা সাউইন—এটাকে আসলে মৃতদের উৎসব হিসেবে উদ্যাপন করা হয়।’

‘আপনি বলছেন মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত? কিন্তু আমি তো হাসি-তামাশা শুনতে পাচ্ছি, গানগুলোও তো আনন্দ...’

‘সীমান্ত এলাকার গ্রাম্য জীবন এত কঠিন যে মৃত্যুকে খুব একটা ভয় পায় না কেউ। বাকি আমাদের কাছে সাউইন হলো যারা চলে গেছে তাদের স্মরণ করা। আর সেটা উদ্যাপন করতে এখনো আমরা তাদের সঙ্গে যোগ দিইনি।’

‘ফিশবল খুব ভালো গান করেন, তাই না?’

‘হ্যাঁ, গায়ক হিসেবে খুব ভালো। ফিশবল কিন্তু ভারি আকর্ষণীয় একজন পুরুষও বটে, তোমার তা মনে হয়নি?’

‘ফিশবল?’ নাক দিয়ে বাতাস ছাড়ার শব্দ করল লাইলাক। ‘আপনি কি আমার সঙ্গে কৌতুক করছেন? তিনি একটা সাপ। আমি বলব, বিষাক্ত সাপ। ওই ব্যক্তির জিবের কোনো দাম নেই, যেটা বলেন সেটা বোঝাতে চান না, আর তাঁর নরম হাত ইডেনে চরে বেড়ানো সরীসৃপের কথা মনে করিয়ে দেয় আমাকে। আপনার শোনা উচিত ফিশবলের স্ত্রীরা বিছানায় স্বামীর আচরণ সম্পর্কে কী সব কথা বলে বেড়াচ্ছেন।’

‘ওসব তোমার একেবারেই শোনা উচিত নয়।’

‘আমরা যখন একা থাকি, তখন কী নিয়ে তাঁরা আলাপ করেন, আপনার কোনো ধারণা আছে?’

‘থাক থাক, এসব আমি শুনতে চাইছি না।’

‘ওঁরা সারাক্ষণ কী নিয়ে কথা বলেন, সেটা না হয় না-ই শুনলেন; কিন্তু ওঁরা আপনার ব্যাপারে আমাকে কী জিজ্ঞেস করেন, সেটা শুনবেন না? জানতে চান, আমাদের আসল সম্পর্কটা কী? বাপ-মেয়ে? এটা ওঁরা কেউ বিশ্বাস করেন না। পাল্টা প্রশ্ন করেন, তাহলে দুজনের চেহারায় একটুও মিল নেই কেন?’

‘উত্তরে তুমি ওঁদের কী বলেছ?’

‘আমি একেবারে সত্যি কথা বলেছি। বলেছি, একমাত্র বাবা হিসেবে আপনাকেই আমি চিনি এবং আপনি আমার বেচারি মায়ের প্রসঙ্গ নিয়ে ভুলেও কখনো আলাপ করেন না।’

‘বেশ কাব্যিক, স্বীকার করতে হবে। তবে সামান্য ভুল বোঝার ভয় আছে।’

‘ধন্যবাদ। আমি ভাগ্যবতী, ভালো একজন শিক্ষক আছেন আমার। এখানে এখন কী ঘটছে?’

‘ক্লড আর ফ্লেমিশ অ্যাক্রোব্যাটরা মেঝেতে নানা রকম শারীরিক কসরত দেখাচ্ছে। অভিজাত পরিবারের সামনে যে ব্যায়াম আর খেলাগুলো দেখায়, এগুলো ততটা সুন্দর বা চমকপ্রদ নয়, তবে এখানকার দর্শকরা এতেই আনন্দে আত্মহারা। আশা করি, তুমি ওদের উল্লাস শুনে সেটা ধরতে পারছ।’

‘তা পারছি।’

‘মেয়েদের হাসাহাসির আওয়াজ পাচ্ছ? ওখানে বাদাম ভাঙা চলছে। ওগুলো ভেঙে ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছে মেয়েরা।’

‘ভবিষ্যৎ ওরা দেখতে পায়? সত্যি?’

‘অবশ্যই। একজন চাষার ভবিষ্যৎ হলো তার অতীত, আর কোনো বোকা যদি একটা বাদামকে বিশ্বাস করে তাহলে তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

গ্রাম্য লোকজন ভিড় আরো বড় করছে, এরপর তাদের সঙ্গে যোগ দিল শহরের মানুষ—তাদের মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ী, জমিদারবাড়ির চাকরবাকর, এমনকি আমি একজন নাদুসনুদুস প্রিস্টকেও দেখতে পেলাম, নিজের বাছাই করা গ্রুপে ভিড়ে গেল, তারা সবাই অল্প সময়ের ভেতর কে কত বেশি বিয়ার খেতে পারবে তার প্রতিযোগিতায় মেতে আছে। প্রিস্ট মহোদয়ের ভাব দেখে মনে হলো, বাকি সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে। ইঁদুরমুখো সহকারীকে নিয়ে স্টুয়ার্ডও একবার নিজের চেহারা দেখাতে চলে এলো, সবার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বোলাচ্ছে, চেহারা নির্লিপ্ত।

‘অনেক ঘোড়া,’ শান্ত গলায় বলল লাইলাক।

‘কী?’

‘আমি ঘোড়সওয়ারদের আসার আওয়াজ পাচ্ছি। দু-চারজন নয়, অনেক। ধীরগতিতে আসছে।’

একবার মনে হলো, লাইলাক ভুল করছে; কিন্তু তার পরই ওদের দেখতে পেলাম আমি, জঙ্গল থেকে একজোট হয়ে বেরিয়ে আমাদের আগুনের দিকে এগিয়ে আসছে। অশ্বারোহী একদল যোদ্ধা, চেহারা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের ঘোড়ার মুখে ফেনা উঠে গেছে, নিস্তেজ ও ধীর। ওগুলোর পিঠে বসা লোকগুলোরও একই অবস্থা, ঢুলছে, একটা শিরদাঁড়াও সোজা নয়, জিনের ওপর নেতিয়ে আছে, কারো কারো জখম গুরুতর।

ওদের লিডার তরুণ, বয়স বিশও হয়নি, তবু তাকে ছেলেমানুষ বলা যাবে না। কালো ব্রেস্টপ্লেট পরে আছে, টুকরো টুকরো ধাতবের পাত দিয়ে তৈরি পোশাক, হাতে আরো আছে ঢাল, সে তার ঘোড়ার পিঠে বসে আছে ঠিক একটা সেন্টারের মতো—মাথা, বুক আর হাত মানুষের, শরীরের বাকি অংশ ঘোড়ার। তার ধাতব ঢাল আর বন্ধনীগুলোতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে, সে রক্ত তার নিজের নয় এবং একটা ভাঙা তীর গাঁথা রয়েছে তার জিনে।

কালো একরাশ চুলের কেশর ঝাপসা আর আড়াল করে রেখেছে তার চোখ দুটিকে, তবে সে যখন ক্যাম্পের চারদিকে চোখ বোলাচ্ছে, আমার সন্দেহ আছে এমন কিছু বাকি থাকল কি না, যা সে দেখতে পায়নি। তার মধ্যে লাইলাকও আছে। তার সচল দৃষ্টি মাত্র পলকের জন্য দেরি করল, তবে ওই দৃষ্টি আগেও আমার দেখা আছে। রণক্ষেত্রে। আমরা চিহ্নিত হয়ে গেলাম।

‘তাঁর (ঈশ্বরের) চোখের কিরে,’ বলল ফিশবল, পা টিপে টিপে এবং শব্দ না করে টেরও পাইনি কখন আমাদের পাশে চলে এসেছে। ‘আমি যদি কখনো বিপদ দেখে থাকি তো এটাই সেটা।’

মেয়েটির কথা ভেবে বুকটা আমার ছ্যাঁৎ করে উঠল। ‘কেন, তুমি এ কথা বলছ কেন?’

‘নিজের চোখেই দেখতে পাবে। অপেক্ষা করো।’

‘ওরা কারা, ফিশবল?’

‘মিলর্ড টাফায়েলের লোক ওরা। ওটা তার বড় ছেলে, থ্র্যাশ লুট। ব্ল্যাক লুট বলে ডাকা হয় তাকে; তার চেহারা আর তার পাপ, দুটির জন্যই।’ গলা আরো খাদে নামাল ফিশবল, ‘ওই মনস্টারকে তোমরা কেউ হালকাভাবে নিয়ো না।’

‘পাপ? কী পাপ?’

‘গবাদি পশু ছিনতাই স্কটল্যান্ডে একটা জাতীয় স্পোর্টস; কিন্তু মারধর বা মুক্তিপণ না চাওয়ার পরিবর্তে চোরদের ধরে এনে পেট কেটে দেয় লুট, নাড়িভুঁড়িগুলো যাতে চিল-শকুনের সহজপ্রাপ্য খোরাক হতে পারে।’

‘বেশ, গরুচোরদের কাছে কেন সে জনপ্রিয় নয়, সেটা বুঝতে পারলাম; কিন্তু এটা তো অনুশোচনায় দগ্ধ হওয়ার বা শোকে কাতর হওয়ার মতো কোনো বিষয় হতে পারে না।’

‘ব্ল্যাক লুুট মারাত্মক বদরাগী। টাফায়েলের জমিতে কাউকে পাওয়া গেলে হয় শুধু, হয় তার কাছ থেকে খিঁচিয়ে খাজনা আদায় করবে, নয়তো তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, এমনকি প্রতিবেশীদেরও ছাড় দেবে না। মাত্র একটি মারপিটে তিনজন মানুষকে খুন করার রেকর্ড আছে তার, কেউ জানে না সাধারণ মারামারি আর তর্কের মধ্যে আরো কতজনের জান নিয়েছে। তাকে নিয়ে এখনই গান লেখা শুরু হয়ে গেছে।’

‘গানের বিষয় হওয়ার বয়স এখনো হয়নি তার।’

ফিশবলকে দেখে মনে হলো, কী যেন স্মরণ করতে চাইছে; তার পরও চোরা চোখে অশ্বারোহী যোদ্ধা আর তাদের কমান্ডারের দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারছে না।

‘তুমি যেন কিছু একটা আশঙ্কা করছ। কী সেটা, ফিশবল?’

‘কাহিনি আছে। সেটা আগে শোনো। লোকমুখে জানা যায়, সময়ের আগে দু-দুটি মৃত সন্তান প্রসব করার পর তার মা ক্রিসমাস উপলক্ষে প্রার্থনায় বসে ঈশ্বরের কাছে স্বাস্থ্যবান একটা পুত্রসন্তান উপহার চেয়েছিলেন; কিন্তু তা তিনি পাননি, অর্থাৎ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। পরিবর্তে ডেভিল একটা দানব শিশুকে পাঠাল, যে শিশু পুরোদস্তুর পরিণত একজন পুরুষ হয়ে মায়ের গর্ভ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো এবং ঘোড়া ছুটিয়ে রওনা হয়ে গেল র্যামসির সঙ্গে লড়াই করতে। তাকে আসতে দেখলে হ্যামলেটের লোকজন যার যার শিশুকে লুকিয়ে ফেলত।’

‘তারা তো বাজ পড়ার ভয়েও লুকায়,’ হালকা সুরে বললাম; কিন্তু বাস্তবে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি। আমার উদ্বেগের কারণ হলো স্টুয়ার্ড গুইসেপি বার্নেটের সঙ্গে কী নিয়ে যেন গভীর আলাপ করছে ব্ল্যাক লুট এবং দুজনেই তারা মাঝেমধ্যে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।

মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল। বুঝতে পারছি, একটা বিপদ আসছে, কিন্তু সেটা কী ধরনের বিপদ বুঝতে পারছি না, সেটার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তা-ও আমার জানা নেই। হঠাৎ মনে হলো, বিপদটা সবচেয়ে বেশি লাইলাকের। তাই ফিশবলের দিকে তাকালাম। ‘ভালো হয় তুমি যদি লাইলাককে নিয়ে এখান থেকে সরে যাও,’ শুরু করলাম আমি। তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্টুয়ার্ড বার্নেটকে দ্রুতপায়ে আমাদের দিকে হেঁটে আসতে দেখলাম, তার চেহারায় সন্তুষ্টির ছাপ।

‘আমি শুনলাম এই মেয়েটি নাকি তোমার সঙ্গে, ভবঘুরে গায়ক,’ বিদ্রূপের সুরে আমাকে বলল সে। ‘তার জন্য কত দাম চাও তুমি?’

‘কী?’

‘মেয়েটার কথা বলছি। তরুণ টাফায়েল ইচ্ছা করেছেন রাতের জন্য ওকে কিনবেন। তিনি দাম দিতে ইচ্ছুক; তাই বলে এটা ভেবে বোসো না...’

তারপর একেবারে মাটিতে লোকটা। বিস্ময়ে স্তম্ভিত, থেঁতলানো ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে। ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গেছে যে আমি এমনকি এও বুঝতে পারিনি যে তাকে আমি আঘাত করেছি।

‘সর্বনাশ,’ ফিশবলকে নিচু গলায় বলতে শুনলাম। ‘এবার আমাদের কপাল সত্যি ফাটল।’

প্রচণ্ড রাগে খেপে গিয়ে আমাদের দিকে প্রায় ছুটে এলো থ্র্যাশ লুট, হাত তলোয়ারের হাতলে। ‘আমি জানতে চাই, এখানে এটা কী ধরনের পাগলামি হচ্ছে? এত বড় স্পর্ধা, আমার বাবার স্টুয়ার্ডকে তুমি আঘাত করলে!’

 ‘ওই লোকটা আমার মেয়ের দাম জানতে চাইছিল, তার কিছুটা আমি তাকে দিয়েছি। তুমি কি বাকিটা নিতে এসেছ?’

থ্র্যাশ লুট চোখ মিটমিট করল, আমাকে দেখছে যতটা না রাগের সঙ্গে, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়ের সঙ্গে। ‘তুমি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছ, সাধারণ?’

‘সে দাম জিজ্ঞেস করেছে। আমি শুধু তোমাকে সেটা জানাচ্ছি। তোমার জীবন। নয়তো আমার। আমার কথা যথেষ্ট পরিষ্কার নয়?’

একে বলে সরাসরি মৃত্যুর মুখে দাঁড়ানো। তরুণ হোক বা না হোক, সে একজন সাহসী ও অভিজ্ঞ যোদ্ধা, তার পেছনে রয়েছে ছোট একটা আর্মি। তার তুলনায় আমি শূন্য। এটা আমি শুধু একা জানি না, সে-ও জানে। সে তার মাথাটা একদিকে কাত করল, আমার চোখ পড়ছে। মৃত্যুর গন্ধ পেলাম নাকে। কিছু ভাবতে পারছি না। মনে হলো, পৃথিবীতে আমার থাকা আর না থাকার মাঝখানে ফাঁকটা এত সরু হয়ে গেছে যে কারো গোঁফের একটা চুলও গলবে না। তবে মনে যা-ই চলুক, আমি কিন্তু টান টান হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে।

‘তুমি জানো আমি কে?’ শান্ত গলায় প্রশ্ন করল সে।

‘আমি শুধু জানি তুমি আমার লোক নও, আর মাটিতে পড়ে থাকা ওই শুয়োরের এদিক থেকে কোনো আনুগত্য পাওনা হয়নি।’

‘আমি একজন নাইট। স্যার থ্র্যাশ টাফায়েল...’

‘ও মিথ্যা কথা বলছে!’ লাইলাকের গলায় তীব্র ঝাঁজ, ঝাঁকি দিয়ে ফিশবলের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল, আমি তাকে সশব্দে হাঁপাতে শুনছি।

‘কী?’ ব্ল্যাক লুট ও আমি, দুজন একযোগে মুখ খুলেছি।

‘যেকোনো টাফায়েল মহৎ হবেন,’ নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে যাচ্ছে লাইলাক। ‘মঠে ওরা আমাকে বলত মহত্ত্বের আভাস পাওয়া যায় তাদের সুবাসে আর মনকাড়া আচরণে। তুমি একটা ঘোড়ার গন্ধ ছড়াচ্ছ, নিজের বংশপরিচয় প্রকাশ করছ আমার বাবাকে অপমান করে, যিনি তোমার জন্মের আগে থেকে একজন যোদ্ধা। অথচ নিজেকে তুমি একজন নাইট বলে দাবি করছ? আমার একেবারে সত্যি বলে মনে হচ্ছে না।’

উপলব্ধি করলাম আমি একা না, লাইলাকও নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করল। ব্ল্যাক লুটের চোখের রং গাঢ় হয়ে উঠতে দেখলাম আমি। বুঝতে পারলাম গ্রামের লোকজন কী কারণে যার যার শিশুকে লুকিয়ে ফেলে। তবে রাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, যেন একটা স্বপ্ন দেখার পর জাগছে।

‘তুমি মঠে মানুষ হয়েছ, মিস? তাহলে এটা পরিষ্কার যে আমি...পরিস্থিতিটা ভুল বুঝেছি। আমাকে বাধ্য হয়ে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। আজ আমি দু-দুটি খণ্ডযুদ্ধে লড়েছি, সম্ভবত বয়সের কারণে আগের মতো অত শক্তি পাই না। তোমার প্রতি আমার কোনো বিরূপ মনোভাব নেই; কিন্তু তোমার ব্যাপারে বলব,’ বলল সে, ঘুরে গেল আমার দিকে। ‘এরপর যদি কখনো দেখি তুমি আমার লোকের গায়ে হাত তুলেছ, তোমাকে আমি বল্লমে গাঁথার ব্যবস্থা করব।’

ঝুঁকল সে, টান দিয়ে স্টুয়ার্ড বার্নেটকে দাঁড় করাল। ‘এসো, গুইসেপি। চলো দেখা যাক কোথায় দুই ঢোক বিয়ার পাওয়া যায়।’

‘ওই বেজন্মাটা আমাকে মেরেছে,’ বলল বার্নেট, রাগে কাঁপছে।

‘ওই লোক তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে,’ থ্র্যাশ টাফায়েল বলল, বার্নেটকে নিয়ে আরেক দিকে চলে যাচ্ছে। ‘মেয়েটা তোমার কলজে দুই টুকরা করত। ওটা কী জানো? বাঘিনী।’

‘বাঘিনী তো কী হয়েছে...,’ হঠাৎ প্রায় আঁতকে উঠল বার্নেট। ‘মেজো কর্তা? তোমার কী হয়েছে বলো তো? সামান্য একটা মেয়ে...’

দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় ওদের কথা আর শোনা গেল না।

‘শালা গর্দভ!’ রেগেমেগে বলল ফিশবল, আমাকে ধরে নিজের দিকে ঘোরাল। ‘আমাদের সবাইকে তুমি মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলে! আমরা স্রেফ ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছি।’

‘আর মেয়েটি যদি তোমার হতো? তুমি তাকে বেচতে?’

কথাটা বলার পরই মনে হলো, আমি কি সীমা ছাড়ালাম? তারপর দেখলাম—না, ফিশবল যদি দ্রুত সব কিছু হজম করে নিতে না পারে, সে তাহলে কিছুই না, একেবারে শূন্য। ‘সুইট জিসাস, ম্যাসন। তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়ক না হতে পারো, কিন্তু তুমি তো কখনো ভোঁতা ছিলে না। আর এই যে মেয়ে, তুমি! তুমি আমার আতিথেয়তা যথেষ্ট লম্বা একটা সময় ধরে উপভোগ করছ। এবার বেঁচে থাকার জন্য কিছু আয়-রোজগার করো। এসো, গান গাও আমাদের জন্য। তোমার সম্ভ্রম রক্ষার জন্য আমাকে যদি জবাই হতে হয়, তোমাকে তাহলে তার উপযুক্ত হতে হবে। দেখা যাক, কী পারো তুমি।’

আমি চাইছি লাইলাককে সহায়তা করার জন্য আমার লুটটা খুঁজে আনি, কিন্তু তাকে চোখের আড়াল করতে ভয় করছে আমার, এমনকি একমুহূর্তের জন্যও। ব্ল্যাক লুট ক্যাম্পের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কথা বলছে পর্যটক আর ফেরিওয়ালাদের সঙ্গে। খানিক পর পর একবার করে দেখে নিচ্ছে আমাকে। একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারবেন কী চলছে তার মনে।

অদূর ভবিষ্যতে আমি নিজেদের ভালো কিছু দেখছি না। কুখ্যাতি আছে এমন সব লোকজন কিভাবে যেন ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, আবার সেটাকে বদলে ফেলতেও পারে। নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি তার অনুগত লোকজনই তার কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে চাইছে, পারলে আড়াল নিচ্ছে বা পালাচ্ছে, সে যেন একটা কুষ্ঠরোগী। আমার খুব ভালো করে জানা আছে, ব্ল্যাক লুট যদি লাইলাককে ছিনিয়ে নেয়, আমি ছাড়া আর কেউ তাকে বাধা দেবে না বা প্রতিবাদ করবে না।

কাজেই আমি উত্তেজনায় টান টান হয়ে দেখছি লাইলাককে নিয়ে আগুনের বৃত্তাকার আভায় গিয়ে দাঁড়াল ফিশবল, তার পরিচয় জানাল, তারপর তাকে ওখানে রেখে পিছিয়ে এলো। এটা একটা অসম্ভব পরিস্থিতি। মাতাল লোকেরা গলা চড়িয়ে কৌতুক বা ভাঁড়ামি করছে, অকারণে হাসছে, যার যার মেয়ের গায়ে হাতও দিচ্ছে। জোকার সেজে একদল লোক আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সিংহের কেশরে; কিন্তু তাতেও মাতালরা সন্তুষ্ট হতে পারছে না।

অথচ এক মেয়েশিশু যখন গান ধরল, ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো ভিড়টা, সবাই শুনছে। অতি সাধারণ একটা ফরাসি ঘুমপাড়ানি গান গাইছে লাইলাক; কিন্তু সেটা সে গাইছে এমন এক নিখাদ গলায় আর অন্তরের সবটুকু নির্যাস ঢেলে, আমার বুক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ভরাট হয়ে উঠল, শুধু লাইলাককে পাওয়ার জন্য নয়, আমার জীবনে আমি যা কিছু হারিয়েছি সেগুলো ফিরে পাওয়ার জন্যও এবং যা কিছু আমি হারাব।

লাইলাক শেষ করল, লম্বা একটা মুহূর্তজুড়ে নীরবতা নিরেট পাথর হয়ে থাকল। তারপর গর্জন আর করতালিতে বিস্ফোরিত হলো দর্শক। আরেকটা, আরেকটা, বলে চেঁচাতে লাগল তারা; কাজেই আবার শুরু করতে হলো লাইলাককে, এবার গাইছে সহজ ভাষায় লেখা অনেক লম্বা একটা আইরিশ যুদ্ধের গান। এই গান আমিই তাকে শিখিয়েছিলাম। মুগ্ধ শ্রোতাদের তৃষ্ণা তাতেও মিটল না, লাইলাককে এরপর একটা বিয়োগান্ত প্রেমের গান ধরতে হলো, যে গান শুনে ব্রোঞ্জের তৈরি পুতুলেরও চোখ ভিজে আসবে।

বাকি সবার মতো আমিও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি, তারপর যখন সংবিৎ ফিরল দেখলাম আমার বাঁ দিকে মাত্র কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্ল্যাক লুট। লাইলাকের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন খিদে পাওয়া একটা সিংহ; কিন্তু লাইলাকের গান যদি তাকে এতটুকুও নাড়া দিয়ে থাকে, সে তার কোনো আভাস দিল না, এমনকি লাইলাক গান শেষ করার পর বাকি সবার সঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশেও শামিল হলো না। তার বদলে আমার দিকে ঘুরে গেল।

‘ওই মেয়ে যে অন্ধ সেটা আমার জানা ছিল না।’

‘তাতে কী এমন পার্থক্য তৈরি হলো?’

‘কী পার্থক্য আমি জানি না। তবে কিছু একটা তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পের চারপাশে আমি প্রশ্ন করেছি। লোকজন বলছে, আপনি একসময় সত্যি একজন সেনা ছিলেন। কার অধীনে যুদ্ধ করেছেন?’

‘নিজের জমিতে আমি ছিলাম পুরোপুরি স্বাধীন একজন মানুষ, তারপর ইয়র্কের ডিউক আমাকে ডেকে একটা চাকরি দেন, তাঁর ছেলের দেহরক্ষী হিসেবে। পরে আমি স্যার ফিলবার্টের অধীনে যুদ্ধ করি।’

‘অলন ফোর্ডে?’

‘ছিলাম আমি ওখানে, ছিলাম আরো এক শ ছোটখাটো যুদ্ধে, যেগুলোর নাম তুমি কখনো শোনোনি।’

‘তাহলে তো আপনি ট্রুপস চেনেন। এখানে আসার পথে কার লোকজনকে পাশ কাটিয়ে এসেছেন আপনি? তাদের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র কেমন ছিল?’

‘আমি সেনা ছিলাম অতীতে, আর এখন আমি একজন গায়ক। কিন্তু গুপ্তচর? তা আমি কখনো ছিলাম না।’

‘পর্যটক গায়ক, আপনি আমার সহিষ্ণুতার পরীক্ষা নিচ্ছেন খুব বাজে একটা সময়ে। আমার বাবার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, আর তার সুযোগ নিয়ে পুরনো শত্রুরা ছাড়াও প্রতিবেশীরা পর্যন্ত আমাদের গবাদি পশুর বিপুল সম্পদে থাবা মারতে চেষ্টা চালাচ্ছে, গায়ের জোরে আমাদের প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে নিয়ে যাচ্ছে। বাবা দুর্বল বলে এটা আমরা চলতে দিতে পারি না। আমি যখন নিজস্ব পদ্ধতিতে তাদের হামলার জবাব দিতে শুরু করলাম, তারা চোখের পানি নিয়ে এডিনবরায় ছুটল, আমার নামে ছাপ মারল—আউটল। আমি নাকি ক্রিমিনাল, কর্তৃপক্ষের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার বাবা তাদের কিছু লোককে এই চলতি উৎসবে দাওয়াত দিয়েছেন এই আশায় যে যদি একটা সমঝোতায় আসা যায়; কিন্তু আমি খুব ভালো করে জানি, তারা নিজেদের ট্রুপস নিয়ে উৎসবে আসবে। হতে পারে তারা ভয় পাচ্ছে, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। হতে পারে তারাই ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। যেটাই ঘটুক, আপনি কী দেখেছেন বলে ফেলাটাই ভালো হবে।’

‘ধরো, আমরা আপস করলাম এবং যা আমি দেখিনি তাই দেখেছি বলে জানালাম তোমাকে, তখন? রাস্তায় আমরা ভারী কিছু দেখিনি, দেখিনি ঘোড়সওয়ার বা যান্ত্রিক কিছু, চোখে পড়েনি সাপ্লাই লাইনও। সেনারা দু-চার দিনের রসদ বহন করছিল, তার বেশি না।’

‘তাহলে তারা দখল বা কবজা করার কোনো প্ল্যান করেনি; তারা স্রেফ এসকর্ট ট্রুপস। বেশ, মন্দ নয়। কত লোককে দেখেছেন আপনি এবং তারা কাদের লোক?’

‘আমার গোনা হয়নি, তা ছাড়া এদিকের জীবনধারা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা না থাকায় তাদের পরিচয় সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারব না।’

‘এবং বলতে পারলেও আপনি বলতেন না?’

‘তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি, টাফায়েল। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝগড়া নেই।’

‘ঝগড়া তাদের সঙ্গে আমারও নেই। এখন পর্যন্ত।’ পুরো ক্যাম্প কান-ফাটানো গর্জনের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল, এতক্ষণে নিজের গান শেষ করল লাইলাক, তার পাশে দাঁড়িয়ে তুমুল তালি দিচ্ছে ফিশবলও।

‘আপনার মেয়ে ভালো গায়।’

‘হ্যাঁ, তা গায়।’

ব্ল্যাক লুট আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু তার গলা চাপা পড়ে গেল লাইলাক আর ফিশবলের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করা ভক্তদের কোলাহলে—লাইলাককে আমার কাছে ফিরিয়ে আনছে ফিশবল। ঘুরে দাঁড়াল টাফায়েল, দ্রুতপায়ে ফিরে যাচ্ছে নিজের লোকদের সঙ্গে যোগ দিতে।

‘ম্যাসন, শুনেছেন আপনি?’ লাইলাকের মুখ আলোয় ঝলমল করছে, আর ফিশবলের হাসি রিড নদীর মতোই চওড়া।

‘তোমার গলা, কী বলব, তোমার গলায় জাদু আছে, জাদু!’ আমার চোখে পানি চলে এলো। ‘এবং লাইলাক, সেটা ওরাও এখন জানে। ভালো কথা, ওই ফরাসি ঘুমপাড়ানিটা কী? আগে এটা আমি শুনিনি।’

‘আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন এক মহিলা আমাকে শুনিয়েছিল। জানি না, আজ রাতে কেন গানটা আমার কাছে ফিরে এলো। ওটা গেয়ে আমি কি বোকামি করে ফেলেছি?’

‘অ কনটর, শেরি! একেবারে উল্টোটা! তুমি একেবারে মাতিয়ে দিয়েছ,’ বলল ফিশবল। ‘তুমি নরম গলায় শুরু করলে বলেই তো ভালো করে শোনার জন্য চুপ করতে বাধ্য হলো তারা। আজ রাতে তুমি অনেক হৃদয় জয় করেছ, ছোট্ট লাইলাক, আমারটাসহ।’

‘আপনার হৃদয়ও?’ মিষ্টি করে জানতে চাইল লাইলাক। ‘আপনার হৃদয়ের সবটুকু, নাকি শুধু ওটুকু, আপনার স্ত্রীরা যে অংশটুকু আপাতত ব্যবহার করছেন না?’

‘নিজের ক্যাম্পে ফিরে যাও, পাজি মেয়ে,’ বলল ফিশবল, ফোতফোত করে নাক টানল। ‘কসম খেয়ে বলছি, তোমার চেহারায় এতটা মিষ্টি ভাব না থাকলে আমি হয়তো বিশ্বাস করতাম তুমি সত্যি ম্যাসনের মেয়ে। তোমার জিব ওর মতোই ধারাল।’ হাসিতে বেসামাল হয়ে ফিরে যাচ্ছে লাইলাক; কিন্তু আমি তার পিছু নিতে পারলাম না, তার আগেই আমার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল ফিশবল।

‘কী চাইছে ব্ল্যাক লুট? আরো ঝামেলা?’

‘সে নিজেই অনেক সমস্যার মধ্যে আছে,’ থ্র্যাশ লুট আমাকে কী বলেছে সেটা ফিশবলকে জানালাম।

‘আমি শুনেছি প্রবীণ লর্ডের মানসিক শক্তি কমে গেছে।’ মাথা ঝাঁকাল ফিশবল। ‘আর শকুনের দল বেশ আগেভাগে সীমান্ত বরাবর জড়ো হতে শুরু করেছে। তোমার কী ধারণা, উৎসবের মধ্যে ঝগড়া বা অন্য কোনো রকম ঝামেলা বেধে যাবে?’

‘আশা করি, সে রকম কিছু ঘটবে না। ছেলেটার বয়স কম হতে পারে; কিন্তু এরই মধ্যে একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধায় পরিণত হয়েছে। মায়ের গর্ভ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে জিনের দিকে দৌড় দিয়েছিল, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে র্যামসির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল—তার সম্পর্কে এই অর্থহীন গল্প আমি অর্ধেকটা বিশ্বাস করি।’

‘কাল তাকে খুব বেশি ঘোড়া ছোটাতে হবে না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফিশবল। ‘যে সম্মানী কর্তাদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে র্যামসিও আছেন। তেরোজনের একটা গ্রুপ, হু হু। আর গতকাল যে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, মনে আছে? লোকটা সম্ভবত এই মুহূর্তে পাহাড়ের মাথা থেকে আমাদের ওপর নজর রাখছে। সে কে, জানো?’

‘কে?’

‘র্যামসির লোক।’

মাথার চুলে আঙুল চালাচ্ছি আমি। ‘তুমি নরকে পচবে, ফিশবল। আমাকে তোমার সাবধান করা উচিত ছিল না, বলো?’

‘ওই দেখো, ভবঘুরে অকর্মাটা বেমালুম ভুলে গেছে। মনে করে দেখো, ম্যাসন, আমি তোমাকে সাবধান করেছি কি না। তা ছাড়া এই জায়গা তোমার লাইলাকের খুব পছন্দ। তার ধারণা, এই অভিশপ্ত জায়গা তার জন্য নাকি লাকি।’

‘তার কথা ঠিকও হতে পারে; কিন্তু আমি ভাবছি গুড লাক না ব্যাড লাক?’

* * *

অল সেইন্টস ডের সন্ধ্যাকালীন ভোজ অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে শুরু হলো। দেখা গেল আয়োজনের কোথাও কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি, অতিথিদের খুব খাতির-যত্ন করা হচ্ছে; হতে পারে গত রাতের মাতলামি, হৈ-হাঙ্গামা আর অন্যায় আচরণের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। তবে এই উৎসব উপলক্ষে লর্ড টাফায়েলের ধন-দৌলত আর ক্ষমতা প্রদর্শন করার সুযোগও হাতছাড়া করা হচ্ছে না। অঢেল খাবার রুপার ডিশে করে পরিবেশন করা হলো, সঙ্গে আছে সব ধরনের বিয়ার আর মদ। ডিশ আর প্লেট থেকে ধোঁয়া উঠছে। হরিণের মাংস আছে, টুকরা করে রান্না, আবার গোটাও—রোস্ট। আছে বুনো পাখি, পরিজ, মসলাসহ আরো নানা পদ। অবশ্য গরু আর খাসির মাংসের চাহিদাই বেশি। সবাইকে একই রকম পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছে না, অতিথির প্রভাব-প্রতিপত্তির একটা ভূমিকা আছে।

তবে গ্রেট হল নামেই শুধু গ্রেট। বেশ বড় একটা জায়গা, অযত্নে ফেলে রাখা একটা গোলাঘর, একপাশে রান্নার অনেক আগুন জ্বলছে, ফলে ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আছে পুরো ঘর। দেয়ালে ছবিসহ মোটা কাপড়ের যে পর্দা ঝুলছে ওগুলো সম্ভবত এক প্রজন্ম আগে টাফায়েলরা যখন এই জমিদারিতে প্রথম এসেছিলেন তারও আগে থেকে আছে এখানে।

লিনেনে মোড়া উঁচু টেবিলের মাঝখানে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে বসেছেন লর্ড টাফায়েল। আমি যতটা ধারণা করেছিলাম, তাঁকে আমার তার চেয়ে বেশি বয়স্ক বলে মনে হলো—আশি যদি না-ও হয়, কাছাকাছি হতে বাধ্য। হাড্ডিসার আর অত্যধিক লম্বা, পাকা দাড়ি এখানে একটু ওখানে একটু। বলা হয়, তরুণ বয়সে বীর যোদ্ধা ছিলেন, খুব কম লোকেরই তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করার সাহস হতো। তবে তাঁর ডুয়াল লড়ার দিন অনেক আগে পার হয়ে গেছে। তাঁকে দেখে মানুষের মনে এখন শুধু করুণাই জাগবে। জীবনের রস বলতে তাঁর মধ্যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, পড়ে আছে শুধু খোসাটা।

স্ত্রীর বয়স তাঁর চেয়ে এক প্রজন্ম কম। ভদ্রমহিলা রোগা আর লম্বা, সবুজ ভেলভেট পরেছেন, নড়াচড়ায় সাবলীল, নাক-চোখ যেন দক্ষ ভাস্করের কীর্তি, সাদা সিল্ক ক্যাপের নিচে লালচে-খয়েরি চুল। তাঁর ছোট ছেলে, মাইটি, নয় কি কাছাকাছি, মায়ের চেহারা আর সৌন্দর্য পেয়েছে; আর ব্ল্যাক লুট, তাঁর বড় ছেলে, কালো দাড়ি আর জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো চোখ নিয়ে টেবিলে বসে আছে, যেন শিকল পরানো নেকড়ে, সব কিছু দেখছে। একই সঙ্গে গ্লাসে গ্লাস ঠেকানোর জন্য তৈরি আবার এক পায়ে খাড়া এই মুহূর্তে একটা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেও।

বার্নেট, লম্বা-চওড়া স্টুয়ার্ড, স্ত্রীকে পাশে নিয়ে উঁচু টেবিলের অনেকটা দূরে বসেছে, তার আরেক পাশে বসেছেন সেই নাদুসনুদুস প্রিস্ট, আমি যাঁকে সাউইন উৎসবে দেখেছিলাম। বারনেন, কে যেন বলেছে, একজন স্থানীয় মানুষ, যিনি ক্ষেতমজুর হিসেবে জীবন শুরু করলেও সেখান থেকে উঠে এসেছেন, হয়েছেন গির্জার পুরোহিত, একই সঙ্গে টাফায়েল জমিদারবাড়ির চ্যাপলিনও।

দুটি নিচু টেবিল, ওগুলোতেও লিনেন, উঁচু টেবিলের কোণ থেকে বিস্তৃত, পেয়েছে ঘোড়ার খুরের আকৃতি, সেটাকে মানানসই বলা চলে, কারণ যেহেতু ওদিকের যুদ্ধবাজ অতিথিরা রুপার কাঁটাচামচের চেয়ে ঘোড়ার জিন বেশি চেনেন।

লর্ড টাফায়েলের তিন প্রতিবেশী, পরিবারসহ, সব মিলিয়ে প্রায় ত্রিশজন—র্যামসি, ডেরিক আর বাদেন—মর্যাদা অনুসারে একের পর এক বসেছেন। তাঁদের সবার চোখে কঠিন দৃষ্টি, প্রত্যেকে ডাকাতের মতো সতর্ক, কেউ তাঁরা সঙ্গে করে স্ত্রী বা বাচ্চাদের নিয়ে আসেননি। তাঁরা এমনকি মেজবানকে সম্মান দেখিয়ে নিজেদের সেরা পোশাক পরেও আসেননি, তার বদলে পরেছেন কর্কশ উল, যে কাপড় উৎসবের চেয়ে যুদ্ধের ময়দানেই বেশি মানায়।

মর্যাদার দিক থেকে ম্যান্ডেল র্যামসি তাঁদের মধ্যে সবার বড়। নর্স হানাদারের বংশধর, মুখে লাল দাড়ি, অমায়িক ভাবভঙ্গি নিয়ে তাঁর মেজবান এবং বাকি সব অতিথির সঙ্গে আলাপ করছেন র্যামসি, তবে থ্র্যাশ লুটের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন তিনি, সেটা লক্ষ করে তরুণ লুটও নিজের ঠাণ্ডা দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে দেরি করছে না।

সমাজে যার যে রকম অবস্থান, তাকে সে রকম মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারটা ইংল্যান্ডে কঠোরভাবে মেনে চলা হয়, তবে সীমান্ত এলাকায় স্কট আর তাদের ইংলিশ কাজিনরা মিত্রপক্ষের সেনা সদস্যদের মতো আচরণ করে অভ্যস্ত। এখানেও দেখা গেল উঁচু-নিচু দুই টেবিল থেকেই উঠে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ বা কৌতুক করছে তারা। তবে আমি লক্ষ করলাম এটা তারা করছে খুবই সাবধানে, ভব্যতা নম্রতা বজায় রেখে। এর কারণ সামান্য একটা বেফাঁস কথা বা অজায়গায় একটু খোঁচা বিস্ফোরণ আর রক্তপাত ঘটিয়ে বসতে পারে।

ফিশবল ঝুঁকি নিয়ে তার আনন্দদানের অনুষ্ঠান যতটা পারা যায় দেরিতে শুরু করতে চাইছে। টেবিলে স্কটরা, তার মানেই কপালে বদরাগী দর্শক জুটেছে। আর আগুনে যে মাংস ঝলসানো হচ্ছে, টাফায়েল হলের উত্তেজনার গন্ধ ছড়াচ্ছে হুবহু সে রকম। পরে, পেট যখন সুস্বাদু খাবারে ভরা থাকবে, আর বিয়ারের প্রভাবে মনে থাকবে ফুর্তি, টাফায়েলের অতিথিদের গ্রহণক্ষমতা তখন হয়তো আরো বাড়বে।

না, তা নয়। নিকোলাস ক্লড যখন তার ফ্লেমিশ অ্যাক্রোব্যাট গ্রুপ নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করল, তাদের ঘাম-ঝরানো নৈপুণ্য গ্রহণ করা হলো নগণ্য করতালির মাধ্যমে।

এরপর এক জাগলার আর জিপসি নারী আগুনের শিখা গিলেও যখন দর্শকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রশংসা পেল না, ফিশবল তখন ষাঁড়ের শিং ধরে কামরার মাঝখানে হাজির হলো। ওখানে একমুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে, নিজের একক উপস্থিতির দ্বারা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। তারপর গান শুরু করার পরিবর্তে শোনাতে লাগল ওয়েলশ রূপকথার একটা গল্প, আবৃত্তির মাধ্যমে। সেটা একসময় শেষ হলো, তার পরও গান ধরল না, এবার বলছে হাইল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডের ভৌতিক সব গল্প। এসব কাহিনিকাব্য এমন আবেগ, উৎসাহ আর নাটকীয়তার সঙ্গে পরিবেশিত হলো যে এমনকি নিচু টেবিলের রক্তপিপাসু যোদ্ধারা পর্যন্ত সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল ভালো করে শোনার জন্য।

ওটা ছিল গর্ব করার মতো শিল্পসমৃদ্ধ, নিখুঁত আর উঁচু মানের একটা পারফরম্যান্স। টাফায়েল এবং একই সঙ্গে তাঁদের প্রতিবেশীর অন্তরেও, প্রবেশ করার অনুমোদন পেয়ে গেল ফিশবল, প্রায় এক ঘণ্টা তাঁদের সবাইকে মোহমুগ্ধ করে রাখল। সে থামতে শ্রোতারা শুধু উচ্ছ্বাসে বিস্ফোরিত হলো না, প্রায় সবাই নিজের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রাপ্য সম্মান জানাল তাকে—আজ রাতে প্রথম উৎসাহভরা প্রতিক্রিয়া।

‘যদি পারো তো ওটার মতো কিছু করে দেখাও,’ নীরব হাসির সঙ্গে ফিসফিস করল ফিশবল, দোরগোড়ায় আমাদের পাশ কাটানোর সময়।

পথগায়করা মুক্ত-স্বাধীন জীবন উপভোগ করে; তার পরও তাদের কিছু প্রটোকল মেনে চলতে হয়। ফিশবলের গ্রুপে আমি আর লাইলাক যেহেতু সবার শেষে নাম লিখিয়েছি, কে কখন পারফরম করবে তার তালিকায় আমাদের নাম তাই সবার শেষে রাখা হয়েছে, আর ওটাই হলো সবচেয়ে কঠিন জায়গা।

সাধারণত সহজ আর হালকা ধরনের এক-আধটা কাহিনিকাব্য শুনিয়ে শ্রোতাদের প্রস্তুত করে নিই আমি, তারপর লাইলাককে ডেকে নিই; কিন্তু গতকাল সাউইনে হুল্লোড়বাজদের মন জয় করার পর তাকে আমি প্রথমেই শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম, তারপর নিজের লুট বাজাতে শুরু করলাম, নরম সুরে, একেবারে নরম সুরে, আশা করছি ভিড়টা চুপ করবে।

অদৃশ্য অডিয়েন্সের দিকে মুখ, ফরাসি ঘুমপাড়ানি গান ধরল লাইলাক, তার গলা এমনকি গত রাতের চেয়েও মধুর লাগল আমার কানে। সে রকম প্রতিক্রিয়াও হলো। কামরার ভেতর কোথাও এতটুকু শব্দ নেই, সবাই যেন বসে আছে মর্মরমূর্তি, সবার চোখ লাইলাকের ওপর স্থির; আর লাইলাক তার ভঙ্গুর, হতাশায় ডোবা জীবনের সব বেদনা, আমাদের জীবনের সব আকাঙ্ক্ষা অনর্গল ঢেলে দিচ্ছে ওই গানে। স্বর্গের দেবীরাও তার চেয়ে এককণা ভালো গাইতে পারবে না। তাকে সহায়তা করতে বাজাচ্ছি আমি, আমার চোখও ভিজে গেল এবং শুধু আমার একার চোখ না।

চোখ ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাচ্ছি, কামরার পরিবেশ পড়ার চেষ্টা করছি। লক্ষ করলাম লর্ড র্যামসির চেহারা থেকে ডাকাতসুলভ তীব্র রোষ নিস্তেজ হয়ে এসেছে, নরম হয়ে এসেছে মুখের রেখা। লেডি টাফায়েলকে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখছি। তাঁর স্বামী চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে...হাঁটা ধরেছেন।

লর্ড টাফায়েল আবার আমার দৃষ্টি কেড়ে নিলেন। নিজের টেবিল পেছনে ফেলে এসেছেন, নিচু টেবিলকে পাশ কাটাচ্ছেন, হেঁটে আসছেন আমাদের দিকে।

তিনি যে আসছেন, লাইলাক তা জানে না, সে নিজের গানে মগ্ন। লর্ড টাফায়েলের উদ্দেশ্য আমি আন্দাজ করতে পারছি না, তবে তাঁর চেহারায় রাগ আর খেপাটে একটা ভাব দেখতে পাচ্ছি। আমার গায়ে ঘষা খেয়ে এগোলেন প্রবীণ লর্ড, খপ করে লাইলাকের হাত ধরলেন। চমকে উঠে গান ছেড়ে দিল লাইলাক।

‘মাই ডিয়ার, এটা মানাচ্ছে না। তুমি বরাবরের মতো ভারি সুন্দর গাইছ; কিন্তু আমার স্ত্রী হয়ে তোমার জন্য এটা ঠিক নয় যে...’

‘আপনি আমাকে ছাড়ুন!’ চেঁচিয়ে উঠল লাইলাক, নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হাত ঝাঁকাচ্ছে। ‘ম্যাসন!’

‘তুমি আমার সঙ্গে টেবিলে ফিরে চলো, মাই লেডি, আমরা...’

‘মিলর্ড অ্যালিসডায়ার টাফায়েল!’ উঁচু টেবিলের ওদিক থেকে লেডি টাফায়েলের চিত্কার চাবুকের মতো শব্দ করল, থামিয়ে দিল তাঁর স্বামীর প্রলাপ। লর্ড টাফায়েল ঘাড় ফিরিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন, বিস্ময়ে হকচকিয়ে গেছেন। তারপর আবার লাইলাকের দিকে ফিরলেন, বিহ্বল দৃষ্টিতে দেখছেন তাকে, কী যেন খুঁজছেন তার মুখে।

‘আমি...কিন্তু তুমি তো আমার মাই লেডি নও,’ ধীরে ধীরে বললেন তিনি। ‘আমি ভাবলাম...তোমার গলা শুনতে লাগল ঠিক যেমন একসময় ওঁর গলা ছিল। অ-নে-ক আগের কথা। আমি দুঃখিত। আমি তোমার গানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি...’

আর ঠিক তখন ব্ল্যাক লুটকে তার বাবার পাশে দেখা গেল। দৃঢ় চাপ দিয়ে বাবার হাত থেকে লাইলাকের হাত ছাড়াল, লর্ড টাফায়েলকে কামরা থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে প্রবীণ লর্ড থামলেন, ঘাড় ফেরালেন আরেকবার লাইলাককে দেখার জন্য, চেহারায় রাজ্যের বিভ্রান্তি।

‘কে তুমি?’ জানতে চাইলেন তিনি, এত নিচু গলায় যে শুনতে হলে কান পাততে হবে। ‘কে তুমি...কার মেয়ে?’

অবাক করার মতো নরম ভঙ্গিতে বাবাকে সামলাচ্ছে থ্র্যাশ লুট, পেছনে পাথুরে নীরবতা রেখে বৃদ্ধকে নিয়ে রেরিয়ে গেল কামরা ছেড়ে।

‘কী ঘটে গেল ওটা?’ লর্ড র্যামসি প্রশ্ন করলেন, চেয়ার ছাড়ছেন। ‘তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে আমাদের মেজবান পাগল হয়ে যাচ্ছেন?’

‘ঘটনা হলো, তিনি একটু বেশি ওয়াইন নিয়ে ফেলেছেন, তার বেশি কিছু না,’ ঠাণ্ডা সুরে জবাব দিলেন লেডি টাফায়েল। ‘এটা একটা উৎসব, র্যামসি, আর তুমি পিছিয়ে পড়ছ। বাজনা আবার শুরু হোক, পথগায়ক। অনুষ্ঠান চলতে থাকুক!’

আবার শুরু করলাম আমি। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরপুর একটা স্কটিশ রিল ধরলাম আমার লুটে। বাজালাম এমনভাবে, যেন তারে আগুন ধরে গেছে; কিন্তু বৃথাই। লাইলাকের গান পরিবেশে যে মোহ আর মুগ্ধতার জাদু তৈরি করেছিল সেটা ছারখার হয়ে গেছে, আর অতিথিরা এখন পরস্পরের সঙ্গে শুধু একটা বিষয়ে মনোযোগ দিতে আগ্রহী—মেজবানের উদ্ভট আচরণ।

লাইলাককে চুপচাপ কামরা থেকে বের করে নিয়ে গেল ফিশবল। আমাকে একা কিছুক্ষণ সংকট মুখে ছেড়ে দিলেও, তারপর সে তার পুরো কম্পানিকে কামরায় নিয়ে এসে শেষ গানটা গাইল, মাথা নত করে সম্মান জানাল সবাইকে, তারপর আমরা সবাই দ্রুত পিছু হটে বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে, কানে অতি সামান্য করতালি নিয়ে।

বাইরের হলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লাইলাক। ‘ম্যাসন, কী ঘটল ওখানে? ওই লোকটা কে?’

‘আমাদের হোস্ট, আমার কোকিল,’ জবাব দিল ফিশবল। ‘ওই ব্যক্তির কাল আমাকে পেমেন্ট করার কথা। যদি না তিনি ভুল করে একটা গাছ বলে মনে করেন আমাকে, তারপর লোকজনকে দিয়ে কেটে ফেলেন।’

‘সেটাই কি ঘটেছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘লাইলাককে তিনি অন্য কেউ বলে মনে করেছেন?’

‘অন্য কেউ মানে তাঁর স্ত্রী, আমার বিশ্বাস। সামান্য একটু সাদৃশ্য হয়তো আছে, আবছামতো, আর বয়সের কারণে মানসিক বিপর্যয়ের শিকার একজন মানুষ তাদের চিনতে ভুল করতেই পারেন। তার পরও, লর্ড টাফায়েলের প্রতিবেশীরা যদি তাঁর মাপ নিতে বা হিসাব চুকাতে এসে থাকেন, তাঁরা এইমাত্র দেখলেন তাঁদের প্রতিপক্ষ প্রায় একটা মড়ায় পরিণত হয়েছেন, ভূত হতে মাত্র কয়েকটা শ্বাস বাকি। উঁহু, এখানকার পরিবেশ আমাকে ভালো কিছুর আভাস দিচ্ছে না। আমরা ভোরের প্রথম আলোতেই ক্যাম্প তুলে ফেলব। আমি...’

‘ভালো মানুষ স্যাররা, এক মিনিট থামুন, প্লিজ।’ ইনি সেই কুমড়া আকৃতির লালমুখো প্রিস্ট, হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের পিছু নিয়ে চলে এসেছেন। ‘আমি ফাদার বারনেন, মিস্টার ফিশবল, টাফায়েল পরিবারের চ্যাপলিন। মিলেডি টাফায়েল একটু আলাপ করতে চান এবং একা শুধু আপনার সঙ্গে না, এই দুজনের সঙ্গেও—অন্ধ বালিকা এবং তার বাবার সঙ্গে।’

আমার খুব বিরক্ত লাগল। ‘এখন অনেক রাত হয়ে গেছে,’ বললাম। ‘লাইলাকের এখন বিশ্রাম...’

‘না, খুব বেশি রাত হয়নি,’ বলল ফিশবল। ‘আমাকে কাল সকালে রওনা হয়ে এখান থেকে দশ মাইল দক্ষিণে পৌঁছতে হবে। বলতে চাইছি, কাল সময় পাব না। এখন কোনো সমস্যা নেই। সামনে থাকুন, ফাদার।’

‘আপনি নিশ্চয়ই অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ,’ বলল লাইলাক, ফাদারের পিছু নিয়ে এরই মধ্যে আমরা ফিরতি পথে রওনা হয়ে গেছি। ‘ব্ল্যাক লুুট সম্পর্কে আমরা যা শুনতে পাচ্ছি, একজন প্রিস্ট খুবই দরকার তার। নাকি তার জন্য ব্যাপারটা অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে?’

‘উদ্ধার পাওয়ার সময় কখনো ফুরোয় না, মিস,’ ফাদার বারনেন বললেন, দৃষ্টিতে কৌতূহল নিয়ে দেখছেন লাইলাককে। ‘ফরাসি ভাষায় খুব ভালো গাও তুমি। কোত্থেকে শিখেছ গো?’

‘আমি শুধু ওই একটা গানই জানি। আমি ল্যাকলান কালের মঠে বড় হয়েছি, নিশ্চয় ওখানেই শুনেছিলাম।’

‘আচ্ছা,’ কঠিন সুরে বললেন ফাদার বারনেন। একটু যেন বেশি কঠিন সুরে, ভাবলাম আমি। কী জানি কেন। গানটা ভালো লাগেনি তাঁর? নাকি মঠের কথা শুনে খারাপ লাগল? আমার মনটা খুঁতখুঁত করছে। এখানকার প্রতিটি জিনিস আমাকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

আলো-ছায়া মেশানো একটা করিডর ধরে প্রিস্টকে অনুসরণ করছি আমরা, ছাদের কাছাকাছি দুই সারি মোমদানিতে মোমবাতি জ্বলছে। দুর্গের পশ্চিম প্রান্তের একটা কামরায় পৌঁছলাম, দেখলাম ঘরে কোনো জানালা নেই। দেয়াল ঢাকা পড়ে আছে কাঠের তৈরি র্যাকে, র্যাকের গায়ে অসংখ্য কবুতরের খোপ, খোপের ভেতর গুটানো দামি কাগজ—দলিল-দস্তাবেজ, লেজার, বইপত্র ইত্যাদি হবে।

‘এটা লাইব্রেরি নাকি?’ লাইলাক জিজ্ঞেস করল। ‘তিসি বীজ আর কাঠকয়লা। কালির গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। ওটা আমার কাছে জ্ঞানের সুবাস বলে মনে হয়।’

‘না, এটাকে বলে কাউন্টিং রুম,’ ফিসফিস করলাম আমি। যদিও এ রকম একটা জায়গা স্টুয়ার্ডের দখলে থাকার কথা; কিন্তু এই মুহূর্তে এখানে একা একটা ডেস্কে বসে রয়েছেন লেডি টাফায়েল, তাঁর সামনে একটা খোলা লেজার।

‘বার্নেটের হিসাব অনুসারে এই টাকায় চুক্তি হয়েছিল,’ কোনো ভূমিকা ছাড়াই সংক্ষেপে এবং দ্রুত বললেন তিনি, কিছু রুপার মুদ্রা ঠেলে দিলেন ফিশবলের দিকে। ‘ইচ্ছা হলে গুনে নিন।’

‘তার কোনো প্রয়োজন নেই, মিলেডি,’ বলল ফিশবল, কপালে নেমে আসা চুলের কুণ্ডলী ছুঁল। ‘আমি সত্যি খুব দুঃখিত যে...’

‘আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে, মিস্টার ফিশবল। ফাদার বারনেনের সঙ্গে বাইরে অপেক্ষা করুন, প্লিজ। এই দুজনের সঙ্গে আমি নিরিবিলিতে কথা বলতে চাই।’

‘আপনি যেমনটি চান, মিলেডি,’ বলল ফিশবল, তার মাথা নুইয়ে সম্মান দেখানোটা হলো দায়সারা গোছের, তারপর ফাদার বারনেনের পিছু নিয়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন ফাদার।

লেডি টাফায়েল একমুহূর্ত দেখলেন আমাকে, তাঁর ঠোঁট পরস্পরের সঙ্গে চেপে আছে, তারপর আমার দিকে ছোট একটা পার্স ঠেলে দিলেন। ‘এটা তোমার জন্য, পথগায়ক। তোমার জন্য আর তোমার মেয়ের জন্য।’

‘আমি বুঝলাম না।’

‘এটা পথখরচ। যত বেশি পথ পাড়ি দিতে পারো তত ভালো। আর তোমাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য। আমার স্বামী এখন আর তরুণ নন, বিয়ার তাঁর শরীর আর নিতে চায় না; তার পরও তিনি আমার স্বামী। তাঁকে নিয়ে কেউ মজা করুক এটা আমি চাই না।’

‘হাসি পায় এমন কিছু আমি দেখিনি, মিলেডি, আর লাইলাক তো একেবারেই কিছু দেখেনি। আপনার আমাদের টাকা দিতে হবে না।’

‘মেয়েটা তাহলে আসলেই অন্ধ? আমি ভেবেছিলাম ওই রিবন সম্ভবত একটা চালাকি। কাছে এসো, খুকি। তোমার গলা সত্যি ভারি সুন্দর।’

‘ধন্যবাদ। আপনি আমাকে চেনেন, লেডি?’

‘মাফ করবে?’

‘আমাদের কখনো দেখা হয়েছে? আপনাকে মনে হচ্ছে...আপনাকে আমার পরিচিত লাগছে, যদিও বলতে পারব না কেন। আপনি কি কখনো ল্যাকলান কালের মঠে গিয়েছিলেন?’

‘না, আমি নিশ্চিত, আমাদের কখনো দেখা হয়নি। তুমি ভারি আকর্ষণীয়। আমার মনে থাকত।’

‘তাহলে আমারই ভুল হয়েছে। আমাকে মাফ করবেন, যে দেশে আমি বাস করি সেখানে শুধু ছায়াময় একটা জায়গা। এটা মাঝেমধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। তবে ম্যাসন ঠিক বলছেন, আপনাকে আমাদের নীরবতা কিনতে হবে না।’

‘তাহলে মনে করো এটা তোমার গানের পেমেন্ট।’

‘গান যে শুনবে তার জন্য, একা আপনার জন্য নয়। সে জন্য আপনাকে দাম দিতে হবে না এবং কোনো ব্যাপারে আমাদের আপনার ভয়ও পেতে হবে না। আমরা আর কখনো আপনাকে বিরক্ত করব না।’

এত দ্রুত ঘুরে দরজার দিকে হাঁটা ধরল লাইলাক, আঘাত পাবে ভেবে খপ করে আমি তার হাত ধরে ফেললাম। শুভ বিদায় জানানোর জন্য পেছন দিকে তাকালাম একবার, কিন্তু দেখলাম লেডি টাফায়েল কিছুই লক্ষ করেননি। ডেস্কের সামনের দিকে ঝুঁকে রয়েছেন তিনি, মুখটা ঢেকে রেখেছেন দুই হাতে।

‘ব্যাপারটা কী?’ করিডরে দেখা হতে জানতে চাইল ফিশবল। ‘কী চাইছেন ওই লেডি?’

‘বেশি কিছু না,’ বললাম আমি। ‘তিনি আমাদের সাবধানে কথা বলতে বলেছেন।’

‘বুঝেশুনে কথা বলা সব সময় বুদ্ধিমানের কাজ,’ ফাদার বারনেন সায় দিলেন। ‘সময়টা আমরা ভয়ে ভয়ে পার করছি।’

‘ওই লেডির ভয় পাওয়ার কিছু নেই,’ তীক্ষ সুরে বলল লাইলাক। ‘তাঁর ছেলেকে নিয়ে এখনই কাহিনিকাব্য লেখা হয়ে গেছে। আমাকে বলুন তো, ফাদার, থ্র্যাশ লুট কি সত্যি সত্যি ওই যুদ্ধগুলো লড়েছে, নাকি গায়ক আর কবিদের ঘুষ দিয়েছে, তারা যাতে ওর সুনাম গায়?’

‘প্রশ্নই ওঠে না,’ বললেন ফাদার, বিস্মিত দেখাল তাঁকে। ‘আমি যেহেতু তার পাপ স্বীকার শুনি, আমি তোমাকে আশ্বস্ত করতে পারি, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে তার অর্ধেকও ওই গানে বলা হয়নি এবং আমরা জানি ওই গানকে অবজ্ঞার চোখে দেখে সে। এক প্রহরীকে এমন ঘুষি মেরেছিল, লোকটা অজ্ঞান হয়ে যায়—ওই গানটা গাওয়া ছিল তার অপরাধ।’

‘আমি অবাক হচ্ছি বেচারিকে সে ফাঁসিতে ঝোলায়নি শুনে,’ লাইলাকের গলায় তীব্র ঝাঁজ। ‘সংগীতের জন্য এই শহর দুর্ভাগা, বুঝলেন ম্যাসন। এখান থেকে চলে গেলে আমরা ভালো করব।’

চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল ফিশবল, উঁচু করল একদিকের ভ্রু। উত্তরে আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। আমার কোনো ধারণা নেই, লাইলাক কেন এত রেগে আছে। কিংবা কী কারণে ও রকম হতাশায় ভেঙে পড়লেন লেডি টাফায়েল। মেয়েরা সব সময় আমার কাছে এলিয়েন জাতি ছিল, বিড়ালের মতো বিহ্বল করার ক্ষমতা রাখে ওরা এবং ওরা কখন কী করবে আগে থেকে তা বলা অসম্ভব।

তবে লাইলাক একটা কথা ঠিক বলছে। গ্যারিস্টন আমাদের জন্য অপয়া। এটাকে যত তাড়াতাড়ি পেছনে ফেলতে পারব তত ভালো।

অনেক রাত হয়ে গেছে, এ কথা বলে প্রিস্ট আমাদের তাড়াহুড়া করে চাপেলে নিয়ে গেলেন, সেখান থেকে টাউন হল হয়ে বাইরে বেরোনোর একটা রাস্তা আছে। তাঁকে আমি খুব অস্বস্তিতে ভুগতে দেখলাম, আমরা চলে গেলে তিনি যেন বাঁচেন।

‘শুভ বিদায়, যাত্রা যেন নিরাপদ হয়,’ প্রার্থনা করলেন আমাদের জন্য, চাপ দিয়ে ভারী দরজা খুলছেন। ‘এবং মনে রাখবেন, কথা বলতে হবে সাবধানে!’ ইস্পাতের দরজা বিকট ধাতব শব্দ তুলে বন্ধ হলো, ওটা যেন নরকের ফটক।

‘আমাদের পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিয়েছে,’ গম্ভীর একটা ভাব নিয়ে বলল ফিশবল, নিজের পার্সের ওজন অনুভব করছে। ‘ব্যবসার দিক থেকে দেখলে, একটা সাফল্য, বলতেই হবে। অন্তত এ দফায় আমরা লাভের মুখ দেখলাম।’

কিন্তু গ্যারিস্টনে আমাদের কাজ শেষ হয়নি, আমাদের নিয়ে গ্যারিস্টনেরও কিছু কাজ বাকি আছে। আমরা মাত্র নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে তাঁবুতে মাথা গলিয়েছি, এই সময় শহরকে ঘিরে রাখা প্রাচীরের পেছনে একটা শোরগোল শুরু হলো। চিত্কার-চেঁচামেচি চলছে, ছোটাছুটি করছে লোকজন। হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়ল? নাকি টাফায়েল আর তাঁদের অতিথিদের মধ্যে গোলমাল বেঁধেছে?

পা থেকে জুতা খুলতে যাচ্ছি, এই সময় আমাদের ক্যাম্পে কিছু ঘোড়সওয়ার ঢুকে পড়ল, তাদের পিছু নিয়ে ছুটে আসছে পদাতিক বাহিনীর সদস্যরা। চিত্কার করে আমাদের তাঁবু থেকে বেরোতে বলছে, টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলছে তাঁবু আর ওয়াগনের ত্রিপল। আমার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এলো, লাইলাককে নিরাপদ কোথাও সরিয়ে ফেলতে হবে; কিন্তু তাঁবু থেকে আমি বেরোনো মাত্র কিছু লোক আমাকে ধরে ফেলল।

‘ধরো ওকে! সে-ও ওদের একজন!’ এ হলো সেই ইঁদুরমুখো, স্টুয়ার্ড বার্নেটের কর্মচারী, ঘোড়ায় চড়ে এসেছে, হাতে ছোরা, তল্লাশি তদারক করছে। সাহসের পরিচয় দিয়ে নিজের তাঁবু থেকে বুক চিতিয়ে বেরিয়ে এলো ফিশবল, কী ঘটছে তার ব্যাখ্যা চাইল ওই লোকের কাছে। কর্মচারী ব্যাখ্যা না দিয়ে নিজের লোকদের হুকুম করল, ‘ধরো, ধরো! অ্যাই, কোনো কথা নয়!’ তারপর লাইলাককেও বের করে আনল তারা, সবাইকে মার্চ করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘাঁটিতে, সরাসরি গ্রেট হলে।

ওখানে এখন লিনেন নেই, উঁচু টেবিলটা দখল করে রেখেছে বার্নেট, ব্ল্যাক লুট, তার ছোট ভাই মাইটি এবং প্রতিটি পরিবারের প্রধানরা—ম্যান্ডেলা র্যামসি, টিমোথি ডেরিক, অ্যালফ্রেড বাদেন। সবার চোখ লাল, চুল আর কাপড়চোপড় এলোমেলো, ভূরিভোজে বসে যে সোমরস পান করেছেন তার প্রভাবে এখনো আধমাতাল হয়ে আছেন সবাই। এই মুহূর্তে তাঁদের চিন্তা-চেতনা আর মেজাজ অশুভ, একপাল নেকড়ের মতো আমাদের সবাইকে পালা করে দেখছেন, আমরা যেন আহত বাছুর।

সশস্ত্র প্রহরীরা পুরো কামরার দেয়াল ঘেঁষে খানিক পর পর দাঁড়িয়ে। বাতাসে রক্তের গন্ধ, সত্যিকার রক্ত। কামরার মাঝখানে অস্থায়ী একটা টেবিল, পায়ার ওপর তক্তা পাতা, তার ওপর ভেজা একটা চাদর, পাথরের মেঝেতে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।

‘এর মানেটা কী?’ শান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে, ঠাণ্ডা সুরে জানতে চাইল ফিশবল। ‘আমাদের বেআইনিভাবে আটক করা হলো কেন?’

‘আপনাদের এখানে আনা হয়েছে উত্তর দেওয়ার জন্য, মিস্টার জো ফিশবল,’ একই রকম ঠাণ্ডা গলায় বললেন লর্ড ম্যান্ডেল র্যামসি। ‘খুন সম্পর্কে।’

‘খুন? কার খুন...মানে কে খুন হলো?’

‘নিজের চোখেই দেখুন।’ চৌকো এক সেনা লাইলাককে ধরে রেখেছে, টান দিয়ে মেয়েটিকে একরকম ছুড়ে ফেলল লাশের ওপর। চাদরে মোড়া লাশের ওপর গিয়ে পড়ল লাইলাক, তারপর আতঙ্কে স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে পিছু হটল। তাকে আবার যেই ধরতে গেল সেনা, নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পেছন থেকে বদমাশটার ঘাড়ে পড়লাম, মেঝেতে ফেলে দিয়েছি তাকে, তার পাশে নিজেও পড়েছি, পড়ার পর তার মুখটা ধরে মেঝেতে ঠুকে দিলাম—একবার, দুবার...তারপর বাকি সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। টেনে সেনার ওপর থেকে সরিয়ে আনল আমাকে, তারপর লাথি মারতে লাগল।

‘যথেষ্ট হয়েছে!’ ব্ল্যাক লুটের চিত্কারের সঙ্গে সঙ্গে মারধর থামল। ‘এটা একটা কোর্ট, শুঁড়িখানা নয়; কোনো রকম ঝগড়াঝাঁটি বা মারপিট এখানে চলতে পারে না!’

‘কী ধরনের কোর্ট এটা, শুনি?’ ফিশবলের গলা আগের মতোই ঠাণ্ডা আর দৃঢ়। ‘আমি শহরের কোনো লোকজন দেখছি না, যারা জুরির আসনে বসবে।’

‘এখানে নষ্ট বিয়ার বিক্রির বিরুদ্ধে শুনানির আয়োজন করা হয়নি,’ র্যামসি বললেন। ‘অপরাধটা যেহেতু অভিজাত পরিবারের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, তাই শুধু সমকক্ষরাই বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’

প্রহরীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে টেবিল ও লাশের দিকে এগোল ফিশবল, মাথা উঁচু করে। আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করছে লাইলাক, ওদিকে লাশের ওপর থেকে চাদরটা সরাল ফিশবল। তার মুখ সরু হয়ে গেল, তবে তার চেহারা থেকে আর কোনো সংকেত পাওয়া গেল না।

‘কে খুন হয়েছে?’ ফিসফিস করে জানতে চাইল লাইলাক। ‘স্টুয়ার্ড বুঝি?’

‘ঈশ্বর তাকে বিশ্রাম আর শান্তি দিন,’ শান্ত গলায় বলল ফিশবল, লাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘ফাদার বারনেনকে ভালো একজন মানুষ বলে মনে হয়েছিল; কিন্তু তিনি শুধু একজন প্যারিস প্রিস্ট ছিলেন, নিরক্ষর। আমার সন্দেহ আছে তাঁর জন্ম অভিজাত পরিবারে কি না।’

‘একা বারনেন আক্রান্ত হননি,’ র্যামসি বললেন। ‘গ্যারিস্টনের লর্ডও জখম হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন এবং তাঁর সেরে ওঠার সম্ভাবনা...’

‘তিনি এখনো মারা যাননি,’ ধমকের সুরে বলল লুট। ‘এর চেয়ে খারাপ আঘাত সামলে নিয়েছেন তিনি।’

‘তখন তিনি তরুণ ছিলেন, সম্ভবত,’ পাল্টা যুক্তি দেখালেন র্যামসি। ‘তা ছাড়া কিছুদিন থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ গ্রামের পর গ্রাম তছনছ করার জন্য তোমার লাগামে ঢিল দিত না।’

‘ভদ্র সব লোককে বলছি, দয়া করুন,’ বাধা দিল ফিশবল। ‘আপনারা কি নিজেদের ব্যক্তিগত ঝগড়া আরো সুবিধামতো সময়ের জন্য তুলে রাখতে পারেন না? আমাকে আর আমার বন্ধুদের বিছানা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, অথচ তার কোনো সংগত কারণ আমি বের করতে পারছি না। এখানে বহু মানুষকে পাওয়া যাবে, যাদের লর্ড টাফায়েলের ক্ষতি করতে চাওয়ার কারণ আছে; কিন্তু আমাদের তাঁর ক্ষতি করতে চাওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনারা যদি আমাদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে থাকেন, কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করুন।’

তার এই দৃষ্টিভঙ্গি উদ্ভট লাগল, স্তম্ভিত হয়ে গেল তারা সবাই, কামরায় নীরবতা নেমে এলো।

‘সাক্ষ্য?’ স্টুয়ার্ড গুইসেপি বার্নেটের গলা থেকে পটকা ফাটার মতো আওয়াজ বেরোল। ‘আপনাদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে!’

‘কিসের ভিত্তিতে?’

‘এখানে আপনারাই শুধু আগন্তুক এবং আপনাদেরই শেষবার দেখা গেছে প্রিস্টের সঙ্গে। ওই তাঁবু থেকে টাকাও পাওয়া গেছে।’

‘ওই টাকা জমিদারের মাননীয়া স্ত্রী, লেডি টাফায়েল, আজ রাতে আমরা যে অনুষ্ঠান করেছি তার পারিশ্রমিক হিসেবে দিয়েছেন আমাকে,’ উত্তর দিল ফিশবল। ‘আর প্রিস্টের প্রসঙ্গে বলতে চাই, তাঁকে শেষবার আমরা যখন দেখি তখন তিনি জীবিত এবং পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। তিনি আমাদের চ্যাপেলের পেছন দিকের একটা দরজা দিয়ে বাইরে বের করে দেন, তারপর সেটা ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়। একবার আমরা পাঁচিলের বাইরে বেরিয়ে আসার পর আবার ভেতরে ফেরার উপায় ছিল না এবং আপনি তাঁবুতে আমাকে আমার স্ত্রীর বিছানায় পেয়েছেন, তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শপথ নিয়ে বলবেন তাঁবুতে ফেরার পর আমি আর একবারও বাইরে বের হইনি...

‘আপনার স্ত্রী শপথ নেবেন,’ খেঁকিয়ে উঠল বার্নেট।

একমুহূর্ত চুপ করে থাকল ফিশবল, তার দৃষ্টি স্টুয়ার্ডের দৃষ্টিকে ধরে রাখল, যতক্ষণ বার্নেট চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে না তাকাল। ‘এখানে উপস্থিত ভদ্রলোকদের বলছি, আমার বিরুদ্ধে খুনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই সত্যতা দিয়ে সেটার জবাব দিয়েছি। আমি আধাঘণ্টার মধ্যে এই কামরা থেকে ছয়জন স্বাধীন মানুষকে জোগাড় করতে পারব, যারা আমার বক্তব্য সমর্থন করবে। তবে আরো অনেক সহজ একটা উপায় আছে। আপনি আমার স্ত্রীর সততা ও সম্মানের ওপর আঘাত করেছেন, মিস্টার বার্নেট। ধরুন আমি বলছি, বিষয়টা যাচাই করার জন্য উঠানে নিয়ে যাওয়া হোক। যেকোনো অস্ত্র বাছাই করার সুবিধা আপনার থাকবে।’

এটা একটা দৃঢ় ও দুঃসাহসী প্রস্তাব এবং নিখাদ ধাপ্পা। জো ফিশবল একজন প্রেমিক, যোদ্ধা নয়। যদিও ছুরি হাতে বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র সে, তবু অস্ত্র চালানোর সত্যিকার দক্ষতা তার নেই। তবে যেকোনো উপস্থিত ভিড়কে পাঠ করতে তার মতো ওস্তাদ লোক খুব কমই দেখা যায়। স্কটিশ লর্ডরা ক্লান্ত আর খিটখিটে, যুদ্ধের মাধ্যমে বিচার করার কথা শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। বার্নেটকেও একেবারে সঠিকভাবে পড়তে পেরেছে ফিশবল। জমিদারির উঁচু পদ দখলে থাকায় ক্ষমতার দাপট আছে তার; কিন্তু কারো সঙ্গে লড়াই করার মনোবল নেই।

‘আপনার স্ত্রীকে অপমান করার কোনো ইচ্ছা কারো ছিল না,’ বিড়বিড় করল সে।

‘আপনি তাহলে আমার কথা আর আমার ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছেন?’ চাপ বাড়াল ফিশবল।

‘আপনার, হ্যাঁ; কিন্তু আরেকজন পান্থসখার ব্যাপারটা? সে-ও তো আপনার মতো একজন ভবঘুরে গায়ক। সে কার বিছানায় ছিল? তার মেয়ের?’

আমার দিকে সতর্ক চোখে তাকাল ফিশবল, দৃষ্টির সাহায্যে আমাকে আমার রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে বলল; কিন্তু একা শুধু ফিশবল মানুষকে পড়তে পারে না। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমার পক্ষে মিথ্যা কথা বলতে যাচ্ছে সে; কিন্তু আমি তা হতে দেব না। সত্যি ছাড়া অন্য কিছু এখন আর আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।

‘আমার মেয়ে ফিশবলের পরিবারের সঙ্গে ছিল। আমি একেবারে একা ছিলাম।’

‘তাহলে তুমি ফিরে এসে থাকতে পারো,’ আমার দুর্বলতা টের পেয়ে বার্নেটের উৎসাহ বেড়ে গেল। ‘ফটকের প্রহরী স্বীকার গেছে তার চোখে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। ক্রাইমটা করার জন্য খুব সহজে তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারো তুমি।’

‘কী কারণে? আমার উদ্দেশ্য কী? এখানে কারো সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই।’

‘তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে লর্ড টাফায়েলের শত্রুরা,’ গলা চড়িয়ে বলল বার্নেট। ‘তুমি এখানে পৌঁছেছ চুরি করা একটা ঘোড়ায় চড়ে। আমার সহকারী সাক্ষ্য দেবে ওই ঘোড়া আমাদের এখানকার, গ্যারিস্টনের।’

‘তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমার কথা মেনে নিয়ে বলছি, হ্যাঁ, ঘোড়াটা গ্যারিস্টনের। আর যে গোমস্তা ওটায় চড়ে আমাদের কাছে গিয়েছিল সে-ও কি গ্যারিস্টনের একজন লোক?’

প্রশ্নটা বিস্মিত করল তাকে। আমি নিজেও কম অবাক হলাম না। কিন্তু এখন আর ফেরার পথ নেই। এখানে একটা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই কাউকে না কাউকে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এ ধরনের বিচারব্যবস্থায় হরহামেশা যেটা ঘটতে দেখা যায়, নির্দোষ ব্যক্তিকে লটকে দেওয়া হচ্ছে কাছাকাছি একটা গাছে। এখানে নিয়তির ভূমিকা বিশাল।

অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই; যা সত্যি তা-ই বলতে হবে। যদি মনে হয় সত্যি বললে বিপদ হবে, তবু। শুধু তাহলেই খানিকটা আশা থাকে যে মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। আমার পক্ষে কোনো সাক্ষী নেই, কোনো বন্ধু নেই, যে বলবে আমি সত্যি কথা বলছি। থাকার মধ্যে আমার শুধু আছে পথে পথে সংগ্রহ করা আক্কেল আর একটা আইডিয়ার ক্ষীণ একটু ঝলক।

‘হ্যাঁ,’ স্বীকার করল বার্নেট। ‘গোমস্তা আমাদের এই গ্যারিস্টন এলাকারই। কেন?’

‘কারণ ওরনিস্টনের পথে যাওয়ার সময় এক জঙ্গলে সে আমার ওপর হামলা চালিয়েছিল। আমি তাকে ওখানেই কবর দিয়েছি।’ এটা তাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

‘তুমি এইমাত্র একটা খুনের কথা স্বীকার করলে? গোমস্তা তোমার হাতে খুন হয়েছে?’

‘আত্মরক্ষা করতে গিয়ে, হ্যাঁ।’

‘একজন গোমস্তা কী জন্য আপনার ওপর হামলা করতে যাবে?’ ব্ল্যাক লোগান জানতে চাইল। ‘আপনাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল?’

‘না, আমাদের মধ্যে প্রায় কোনো আলাপই হয়নি। আরেকটা কথা, তার আচরণ দেখে আমার মনে হয়েছিল যতটা না আমাকে তার চেয়ে বেশি সে আমার মেয়ে লাইলাককে খুন করতে আগ্রহী।’

‘একই প্রশ্ন : কী কারণে তিনি আপনার মেয়ের ওপর হামলা চালাবেন?’

‘স্বীকার করতে যতই আমার কষ্ট হোক, এই পরিস্থিতিতে এখন আর আমি বিষয়টা গোপন রাখতে পারছি না। লাইলাক আমার মেয়ে নয়। ল্যাকলান কাল নামে এক মঠের মেয়ে সে, ওখানেই মানুষ হয়েছে। আগুন লেগে ওই মঠ পুড়ে যাওয়ায় সে তার ওই একমাত্র ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে।’

‘পুড়ে সব একেবারে ছাই হয়ে গেছে,’ এই প্রথম মুখ খুলল লাইলাক। ‘এক সিস্টার আমাকে তাঁর নিজের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু জখম গুরুতর হওয়ায় পথেই মারা যান তিনি। ম্যাসন আমাকে রক্ষা করেন।’

‘স্পর্শকাতর একটা কাহিনি, তবে অপ্রাসঙ্গিক,’ বার্নেট খেঁকাল। ‘আর প্রাসঙ্গিক হলো গোমস্তাকে খুন করার পর তুমি সম্ভবত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গ্যারিস্টনে এসেছ।’

‘কাণ্ডজ্ঞান আর যুক্তি কী বলে? আমি যদি জানতাম ওই বদমাশটা গ্যারিস্টনের লোক, তার ঘোড়ায় চড়ে এখানে আসার সাহস হতো আমার? এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা যে আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি, কিংবা হয়তো এটা আমাদের কপাল।’

‘বল ফাটা কপাল,’ নাক দিয়ে ফোতফোত করে নিঃশ্বাস ছাড়ল বার্নেট। ‘তুমি এক লোককে খুন করে তার ঘোড়ায় চড়ে এখানে চলে এসেছ, অথচ বলছ আমাদের লর্ড আর তাঁর চ্যাপলানের ওপর হামলা সম্পর্কে কিছুই জানো না?’

‘আমি তা বলিনি। আজ রাতে যা ঘটেছে তাতে আমার কোনো ভূমিকা নেই; তবে আমি বিশ্বাস করি, কারণটা হয়তো আমরাই তৈরি করে থাকতে পারি।’

‘আপনি কথা প্যাঁচাবেন না, ভ্রাম্যমাণ গায়ক,’ লর্ড র্যামসি বললেন, ‘যা বলছেন বুঝে বলুন। কী বলছেন আপনি?’

‘আমার ধারণা, আজ রাতে যা ঘটেছে সেটা আসলে অন্য এক অপরাধের প্রতিধ্বনি, যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বহু বছর আগে।’

‘কী অপরাধ?’ ব্ল্যাক লুটের প্রশ্ন।

‘উত্তর দেওয়ার আগে আমার নিজের একটা প্রশ্ন আছে।’ ঘুরে লাইলাকের দিকে তাকালাম। গলা খাদে নামিয়ে তাকে একটা বিষয়ে প্রশ্ন করলাম, যেটা আমাকে খুব ভোগাচ্ছিল। তারপর আমি আবার আদালতের দিকে ফিরলাম। ‘সুধীবৃন্দ, আমার বিশ্বাস, এর ব্যাখ্যা নিহিত আছে একটা কাহিনিকাব্যে, যেটা আমি এই শহরে আসার পথে শুনেছি...’

‘এটা কী ধরনের ননসেন্স?’ রাগে ফেটে পড়ল বার্নেট। ‘তোমাকে খুনের অভিযোগে এখানে ধরে আনা হয়েছে, আর তুমি কিনা আমাদের কাব্য আর গান শুনিয়ে ভোলাতে চাইছ?’

‘ওকে কথা বলতে দাও,’ লর্ড র্যামসি বাধা দিলেন বার্নেটকে। ‘তাঁর জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে মনে রাখবেন, পথের গায়ক, আপনার এই কাহিনিকাব্য আমরা যদি অগ্রাহ্য করি, তারপর আর আপনি আরেকটা শোনাতে পারবেন না। এটাই আপনার শেষ সুযোগ। নিন, শুরু করুন।’

“এই গানটা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন, সবাই শুনেছেন, ‘ব্ল্যাক লুট কাহিনিকাব্য’। এক কিশোর যোদ্ধার গৌরবগাথা। বেশির ভাগ গানের মতো এও আংশিক বানানো, আংশিক সত্যি।”

কামরার ভেতর নীরবতা গাঢ় হচ্ছে।

‘উদাহরণ হিসেবে বলি,’ আবার শুরু করলাম আমি, ‘এতে ক্রিসমাসে তার জন্মের কথা বলা হয়েছে। তা কি সত্যি? সত্যি কি সে ইউলটাইডে জন্মগ্রহণ করেছে?’

‘কবে জন্ম নিয়েছেন না নিয়েছেন তার সঙ্গে কী?’ শুরু করল বার্নেট।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা একেবারে সত্যি,’ আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন গোষ্ঠীপ্রধান লর্ড টিমোথি ডেরিক, তালগাছের মতো লম্বা, রোগা, নড়াচড়ায় আড়ষ্ট ভাব। ‘এই দেশের জন্য সেবারের ক্রিসমাস ছিল কালো অন্ধকার। তবে বাকি সব মিথ্যা। শিশু লুুট কক্ষনো তার দোলনা থেকে লাফ দিয়ে লর্ড র্যামসির জমিদারিতে হামলা করতে ছোটেনি। সে যখন অপরাধী হয়ে ওঠে তখন তার বয়স ছিল অন্তত এক বছর।’

তৃতীয় লর্ড, আলফ্রেড বাদেন, হেসে উঠলেন, তাঁর দাঁতবিহীন মাড়ি দেখা গেল। তবে না লুট, না র্যামসি, দুজনের কারো মুখেই হাসি ফুটল না।

‘ওই কাহিনিকাব্য তাহলে আংশিক সত্যি। আর বাকিটা, এই মিথ যে শিশুটি ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতে গেল, এমন একটা কিছুর ব্যাখ্যা দেয়, যা চোখে দেখতে পাওয়া গেলেও বোধগম্য হয় না।’

‘কী দেখতে পাওয়া গেছে?’ জবাব চাইল লুট।

‘এখানে বলছি কী ঘটেছিল বলে বিশ্বাস করি আমি। সতেরো বছর আগে, তরুণী এক স্ত্রী, যিনি দুবার দুটি মৃত সন্তান প্রসব করেন, ভয় পাচ্ছিলেন তৃতীয়বার তিনি যদি তাঁর লর্ডকে উত্তরাধিকার উপহার দিতে না পারেন তাহলে হয়তো তাঁকে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হবে। কাজেই আবার যখন সন্তানসম্ভাবনা হলেন, তিনি একটা পুত্রসন্তান সংগ্রহ করার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন। তারপর যখন তাঁর নিজের সন্তান জন্ম নিল, ভঙ্গুর একটা অস্তিত্ব, জন্মান্ধ, ওটাকে তিনি সংগ্রহ করা শিশুর সঙ্গে বদলে ফেললেন এবং নিজের মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন একটা আশ্রমে। সেটা ল্যাকলান কাল।’

দম নিচ্ছি। ভয়ে ভয়ে অপেক্ষাও করছি, আমাকে যদি গল্পের মাঝখানে থামিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমি কী করব?

‘ওই ছেলে হয়ে উঠল ভয়ংকর এক যোদ্ধা। তবে জন্মের সময় তার যে আকার-আকৃতি ছিল, তা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে কেউ বিরত থাকেনি আর ওগুলো থেকেই স্থানীয় কিংবদন্তি তৈরি হয়ে যায়। একটা কাহিনিকাব্য, যেটা তার কীর্তিকলাপের সঙ্গে তাল বজায় রেখে আরো বড় হতে লাগল।’

‘আপনি একটা মিথ্যুক,’ ঠাণ্ডা গলায় বলল লুট। ‘নোংরা কথা বলে কেউ যদি আমার পরিবারকে অসম্মান করতে চায়, আমি কিন্তু সেটা সহ্য করব না।’

‘থামো, থামো তুমি, বাচ্চা লুট,’ বললেন লর্ড  র্যামসি, তাঁর মুখে চওড়া হাসি ফেটে পড়ছে। ‘পুরো ব্যাপারটার মধ্যে গূঢ় একটা অর্থ আছে, তার সবটুকু বোধ হয় তুমি ধরতে পারোনি। এই ভ্রাম্যমাণ গায়কের গল্প যদি মিথ্যা হয়, প্রাণটা আমরা তাঁর কেড়ে নেব। তবে এই গল্পের অংশবিশেষ অন্তত সত্যি এবং বাকি অংশটুকুও যদি সত্যি হয়, তাহলে কাউকে হুমকি দেওয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই, এমনকি এই টেবিলের একটা আসনকেও নয়। যেকোনো একটা বোকাও দেখতে পায় যে তুমি তোমার বাবার কাছ থেকে কিছুই পাওনি—না চোখ, না কান, না কপাল, না ঠোঁট, না চুল, না চিবুক; তুমি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি লম্বা, তোমার গায়ের রং তাঁর চেয়ে অনেক বেশি গাঢ়—এ রকম আরো অনেক অমিলের কথা আমি বলতে পারি। অন্যদিকে মেয়েটার চেহারা লেডি টাফায়েলের সঙ্গে এত বেশি মেলে যে তাঁর নিজের স্বামী আজ রাতের প্রথম ভাগে ওই মেয়েটাকে নিজের স্ত্রী বলে ভুল করেছিলেন।’

‘আমার বাবা সুস্থ নন, ইদানীং তাঁর এ রকম ভুলভাল...’

‘যদি তিনি তোমার বাবা হন।’

‘ঈশ্বরের কিরে, র্যামসি, চলুন উঠানে পা ফেলি, আমরা দেখব আমাদের মধ্যে কে নিজের বাবাকে চিনি না।’

‘আমি রাস্তাঘাটে সাধারণ গুণ্ডাপাণ্ডার সঙ্গে লাগতে যাই না হে ছোকরা। তোমার প্রস্তাব বিবেচনা করার আগে আমি এই গায়ক পথিকের বাকি গল্পটা শুনতে চাই। আপনি এসব কী বলছেন, সুরসাধক? এই কাহিনি সত্যি হলে তার কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’

‘আমার কাহিনি সত্যি কি না লেডি টাফায়েলের চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না,’ বললাম আমি। ‘কারো কাছে প্রমাণের জন্য যেতে হলে তাঁর কাছে যেতে হবে।’

‘আমার মা এখন তাঁর মরণাপন্ন স্বামীর দেখাশোনা করছেন,’ কঠিন সুরে বলল লুট। ‘তাঁর এই কাতর আর শোকের সময় কেউ যদি তাঁকে বিরক্ত করার স্পর্ধা দেখায়, প্রথমে তাকে আমার সামনে দাঁড়াতে হবে।’

‘আমি স্বীকার করছি, এ রকম একটা সময়ে লেডিকে বিরক্ত করা অবিবেচনার কাজ হবে; কিন্তু যে একমাত্র ব্যক্তি সত্যিটা জানেন তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস না করে আমার বিরুদ্ধে রায় দেওয়াটাও অন্যায় হবে।’

‘আমাদের আর কিছু শোনার দরকার নেই,’ ধমকে উঠল বার্নেট। ‘পথের গায়ক স্বীকার করেছে এই শহরের একজন গোমস্তাকে খুন করেছে সে। গ্যারিস্টনের স্টুয়ার্ড এবং এই আদালতের প্রধান হিসেবে আমি বলছি হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা উচিত, উচিত তার বাকি বক্তব্য নির্জলা মিথ্যা হিসেবে অগ্রাহ্য করা। আমরা তার গলায় রশি পেঁচিয়ে এখনই ঝোলাতে পারি, যদি না...উপস্থিত ভদ্র মহোদয়রা কেউ কি লর্ড টাফায়েলের পুত্রসন্তান ও উত্তরাধিকারের জন্মগত অধিকার নিয়ে সত্যি সত্যি বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান?’

স্কটিশ লর্ডরা পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় করছেন এবং আমি তাঁদের চোখে নিজের ভাগ্য পড়লাম : মৃত্যু। তাঁরা ব্ল্যাক লুটের নিজের হলে বসে তাকে চ্যালেঞ্জ করার ঝুঁকি নিতে পারেন না, বিশেষ করে যে হলে গিজগিজ করছে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সশস্ত্র সেনারা। প্রসঙ্গটা তাঁরা অন্য সময় তুলতে পারেন; কিন্তু সেটা আমার জন্য অনেক দেরি হয়ে যাবে।

‘না।’

শব্দটা শোনার পর তাকিয়ে দেখি মুখ খুলেছে আর কেউ নয়, লুট নিজে, অবয়ব যেন ওক খোদাই করে বানানো, পাঠ করা অসম্ভব। ‘আমরা এখানে জড়ো হয়েছি একটা হত্যাকাণ্ড এবং আমার বাবার ওপর হামলার বিচার করতে...যিনি গ্যারিস্টনের লর্ড; কিন্তু না, একজন গোমস্তার মৃত্যু নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই, যিনি মারা গেছেন বহু মাইল দূরে। আমরা যদি গোমস্তাকে খুন করার জন্য গায়কের বিচার করি, বাকি সব অমীমাংসিত থেকে যাবে। আমি চাই না আমার নামে কালি লেগে থাকুক, প্রশ্ন থাকুক আমার উত্তরাধিকার নিয়ে। কাজেই একমাত্র বিকল্পটাই আমাদের বেছে নেওয়া উচিত। আর সেটা হলো : আমরা আমার ছোট ভাই মাইটিকে লেডি টাফায়েলের কাছে পাঠাব গায়কের বক্তব্য সত্যি কি না জিজ্ঞেস করতে। তিনি যদি বলেন সত্যি নয়, গায়ক মিথ্যুক বলে প্রমাণিত হবে, যদি উপস্থিত কেউ লেডি টাফায়েলকে মিথ্যুক বলে সন্দেহ না করেন।’

‘রশির শেষ মাথায় নাচতে হবে সুরসাধককেই, লেডি টাফায়েল যদি আমাদের ভুল পথ দেখান,’ শুকনো গলায় মন্তব্য করলেন লর্ড র্যামসি। ‘কাজেই তাঁর মনেও দু-একটা আশঙ্কা থাকতে পারে।’

বিষয়টা একমুহূর্ত বিবেচনা করলাম আমি। ‘না, বাস্তব পরিস্থিতি হলো মাত্র অল্প দু-একজন জানেন কী ঘটেছিল এবং সঠিক ঘটনা একমাত্র লেডি টাফায়েলই বলতে পারবেন। এই পরীক্ষায় আমি রাজি। ছেলেটা যাক, শুনে এসে বলুক আমাদের।’

‘তবে তা-ই হোক,’ র্যামসি বললেন, চোখে কৌতূহল নিয়ে দেখছেন আমাকে। ‘বাচ্চার সঙ্গে লর্ড ডেরিক যাবেন, যাতে ফিরে এসে তিনি আমাদের জানাতে পারেন সব ঠিকঠাকমতো ঘটেছে।’

‘রাজি,’ মাথা ঝাঁকাল লুট, ‘তবে একটা করারে। আমার মা যদি জানান যে গায়ক ম্যাসন মিথ্যুক, তাঁকে রশিতে ঝোলানো যাবে না। আপনাদের কেউ একজন তাঁকে একটা তলোয়ার ধার দেবেন এবং আমরা আমাদের পার্থক্য ঘোচাব উঠানে। তিনি যদি আমাকে খুন করেন, পরে তাঁকে আপনারা ঝোলাতে পারবেন।’

‘কিংবা তাকে কিছু রুপা আর একটা ক্ষিপ্রগতির ঘোড়া উপহার দেওয়া হবে,’ ভারী গলায় বললেন র্যামসি। ‘ডেরিক, বাচ্চাটাকে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে নিয়ে যাও। কান পেতে ভালো করে শুনবে কী উত্তর দিলেন তিনি।’

 বাচ্চাটার মুখের রং ঠিক যেন ঘোল, তবে তাকে আর সীমান্তপ্রভু ডেরিককে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে। গ্রেট হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই তারা আমার দিকে বারবার তাকাল। ওদের এই দৃষ্টি আমাকে দুর্বল করে ফেলল, শরীরটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। আমার কিছু করার নেই, অসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া। সম্ভবত আমার পুরো বাকি জীবন।

উত্তর চলে এলো আমি যতটা ধারণা করেছিলাম তার অনেক আগে। কামরার পেছন দিকে খানিকটা আলোড়ন উঠল, সেটা বাড়তে বাড়তে পরিণত হলো একটা গর্জনে—বহু মানুষ একসঙ্গে চিত্কার করছে। কানে এলো, কে যেন ধমকে উঠল, ‘ঈশ্বরের দোহাই লাগে, ওঁনাকে ধরো, সাবধানে নিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসাও...’

ঘাড় ফেরালাম। লর্ড টাফায়েল টলতে টলতে হলে ঢুকছেন, তাঁকে সাহায্য করছে মাইটি আর ডেরিক। এখন তাঁকে আগের চেয়েও বেশি প্রাচীন লাগছে, যেন যেকোনো মুহূর্তে ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারেন। তাঁর রাতে পরার মসলিন শার্টে রক্তের দাগ লেগে রয়েছে। একটা পুলটিসের ওপর আলগাভাবে ঝুলছে সেটা।

কাজের এক লোক একটা চেয়ার বয়ে নিয়ে এসে তাঁর পাশে রাখল, ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ধীরে ধীরে তাতে বসলেন লর্ড; কিন্তু তারপর যখন নিজের চারদিকে দৃষ্টি বোলালেন, তাঁর চোখ উজ্জ্বল আর সচকিত হয়ে উঠল।

‘মাই লর্ড,’ শুরু করল লুট, ‘এখানে আসা আপনার উচিত হয়নি।’

‘আমার নিজের মৃত্যুর বিচার হবে আর আমি সেখানে উপস্থিত থাকব না?’ প্রশ্ন করলেন তিনি, তাঁর ফিসফিসে গলা কোনো রকমে শোনা গেল। ‘সম্ভব নয়। হামলা করার অভিযোগ এই লোকের বিরুদ্ধে বুঝি?’ দুর্বল ভঙ্গিতে আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন। ‘ভালো কথা, স্যার, মুখ খুলুন। নিজের পক্ষ নিয়ে কী বলার আছে আপনার?’

‘আমার? কিছুই না!’ বললাম আমি, হতভম্ব। ‘আপনি খুব ভালো করে জানেন আমি আপনাকে আক্রমণ করিনি।’

‘সেই ভয়ই করছি, আপনি বোধ হয় নন। আজকাল আমি স্রেফ একটা মড়ার মতো ঘুমাই, বিশেষ করে ওয়াইন খাওয়ার পর। কেউ একজন আমার মুখে বালিশ চেপে ধরেছিল এবং আমি যখন তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করলাম, সে আমাকে ছুরি মারল। আমার জ্ঞান ফিরল আমার স্ত্রীর বাহুতে। ভারি উপভোগ্য একটা সারপ্রাইজ। আমি আশা করছিলাম ঘুম ভাঙবে নরকে।’

‘স্যার,’ র্যামসি বললেন, ‘সম্ভবত আপনার লেডিই আমাদের প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে দিতে পারতেন। আপনার বিশ্রাম নেওয়া উচিত ছিল।’

‘এইতো, র্যামসি, শিগগিরই বিশ্রামে চলে যাচ্ছি আমি,’ লর্ড টাফায়েল বললেন। ‘আমার লেডি এই মুহূর্তে চ্যাপেলে রয়েছেন, প্রার্থনা করছেন আমার আত্মার জন্য। সময়ের আগে, আশা করি। জখম আমি আগেও সামলে নিয়েছি; ঈশ্বর চাহে তো এটা থেকেও আমি রক্ষা পেয়ে যাব। একজন পুরুষের বোধবুদ্ধি পরিষ্কার করার জন্য খানিকটা রক্তক্ষরণের কোনো বিকল্প নেই এবং তাঁর স্ত্রীরও। শুনুন আপনি। আমি যখন মরে যাব বলে বিছানায় শুয়ে আছি, আমার স্ত্রী তখন বহু বছরের পুরনো নিজের একটা প্রতারণার কথা আমার কাছে স্বীকার গেলেন—মহাবিস্ময়কর এক ঘটনা, এক শিশুকে বিদায় করে দিয়ে আরেক শিশুকে তার জায়গায় নিয়ে আসা।’

‘ওরে আমার ঈশ্বর, ঘটনা তাহলে মোটেও রটনা নয়, ঘটনা তাহলে সত্য?’ আটকে রাখা দম ছাড়লেন র্যামসি। ‘ব্ল্যাক লুট আপনার ছেলে নয়?’

‘আমার পারিবারিক বৃক্ষ আপনার উদ্বেগের কোনো বিষয় নয়, র্যামসি, আপনি শুধু মাথা ঘামান আমার প্রিস্টের মৃত্যু নিয়ে।’

‘কিন্তু দুটির সঙ্গে নিশ্চয়ই সম্পর্ক আছে?’

‘হয়তো, কিন্তু...’ টাফায়েল শিউরে উঠলেন, তারপর ঢোক গিললেন। ‘এটা গায়কের জীবন আর তাঁর গল্প। সেটা শেষ করতে দিন তাঁকে। যদি তিনি পারেন।’

‘আপনি যেমনটি বলেছেন, লর্ড,’ বললাম আমি, ‘শিশুদের ওই বদলাবদলির ঘটনা আজ থেকে অনেক বছর আগে ঘটেছে; কিন্তু যখন ল্যাকলান কালে আগুন লাগার খবর এখানে এসে পৌঁছল, একজন গোমস্তাকে পাঠানো হলো মেয়েটি যে হুমকির প্রতিনিধিত্ব করে সেটার ইতি ঘটাতে। তার সে মিশন ব্যর্থ হয়। পরে আমরা যখন এখানে পৌঁছলাম, কেউ একজন উপলব্ধি করল মেয়েটি আসলে কে।’

‘কে?’ র্যামসি জানতে চাইলেন।

‘একজনের কথা স্পষ্ট করে বলতে পারি, তিনি জানতেন—ফাদার বারনেন। মিলেডির স্বীকারোক্তির একমাত্র শ্রোতা হিসেবে এই কাহিনি অনেক বছর আগেই তিনি শুনেছিলেন বলে ধারণা করি। তবে সত্যিটা যদি বেরিয়ে আসে তাহলে সব কিছু হারানোর ভয় আছে মাত্র একজন মানুষের। তিনি লেডি নন। তিনি প্রতারণা করেছিলেন স্বামীকে ভালোবেসে এবং পরে তিনি তাঁকে দ্বিতীয় একটা সন্তান উপহার দেন।’

‘একমাত্র লুটকে সব কিছু হারাতে হবে,’ লর্ড  র্যামসি বললেন, ঘুরে গেলেন তরুণ যোদ্ধার দিকে। ব্ল্যাক লুট তাঁর দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল, তবে কোনো জবাব দিল না।

‘কথাটা সত্যি, লুটকে সব কিছু হারাতে হবে,’ লর্ড র্যামসির সঙ্গে একমত হলাম আমি, ‘এবং নিজেকে আর পরিবারকে রক্ষা করার জন্য যেকোনো মাত্রার হত্যাযজ্ঞের প্রয়োজন হলে সেটা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা তার আছে। তবে নিজের জন্মের সত্যিটা যদি তার জানা থাকে। তা তার জানা ছিল না।’

‘আপনি সেটা জানলেন কিভাবে?’

‘কারণ আমি এখনো বেঁচে আছি। এইমাত্র খানিক আগে গোমস্তার মৃত্যুর জন্য আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে যাচ্ছিল আপনার স্টুয়ার্ড। লুুট তাতে বাধা দিয়েছে, গিল্টি একজন লোক এই কাজ কক্ষনো করবে না।’

কামরার ভেতর নীরবতা নেমে এলো। আমার কথার সত্যতা হজম করতে সময় নিচ্ছেন সবাই।

‘তাহলে কে?’ অবশেষে নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলেন র্যামসি।

‘আর মাত্র একজন লোক আছে, সত্যি প্রকাশ পেলে সব কিছু হারাবে সে। যে লোক বিকল্পটা জোগাড় করে এনেছিল। নাম-না-জানা পরিত্যক্ত মা-বাবার শিশু এই গ্রাম থেকে আসতে পারবে না, সে রকম কাউকে আনা হলে অনেক মানুষ জেনে যাবে। লর্ডের জমিনে কে নিজের গরজে ঘুরে বেড়াবে এই খবর পেতে যে কোনো বাড়ির লোকজন শিশু বিক্রি করবে? এবং পরে, যখন আগুন লাগার খবর এসে পৌঁছল, কে একজন গোমস্তাকে পাঠাবে ওই মেয়েকে খুন করতে?’

নিজের আসনে ধীরে ধীরে ঘুরে গেলেন র্যামসি, বার্নেটের দিকে মুখ করার জন্য।

‘এসব মিথ্যা কথা,’ বার্নেট শ্বাস ছাড়ল।

‘তাই কি? লর্ড টাফায়েল যদি সত্যিটা জানতেন তিনি তাঁর স্ত্রীকে হয়তো ক্ষমা করতে পারতেন এবং এমনকি নাম-না-জানা মা-বাবার পরিত্যক্ত যে শিশু এখানে এসেছে সে-ও তো নিজের ইচ্ছায় আসেনি, তার তো কোনো দোষ নেই, কাজেই তার ওপর লর্ডের কোনো আক্রোশ থাকতে পারে না; কিন্তু তিনি ওই ব্যক্তিকে কক্ষনো ক্ষমা করতে পারবেন না, যে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে টাকার বিনিময়ে এই প্রতারণার আয়োজন করে। কে তিনি? লর্ডের স্টুয়ার্ড।’

‘কিন্তু নিজের লর্ডকে খুন করলে তার নিরাপত্তা তো সুরক্ষিত থাকে না,’ ঠাণ্ডা সুরে বলল লুট। ‘লেডি নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারতেন কী ঘটেছে, আর তখন তিনি সত্যিটা স্বীকার করতেন।’

‘শুধু যদি তিনি জানতেন যে তাঁর স্বামীকে খুন করা হয়েছে। লর্ড টাফায়েল বললেন যে তাঁর ঘুম ভেঙেছে একটা বালিশের নিচে। মুখে বালিশ চেপে ধরার পর কেউ যদি মারা যায়, তার কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকে না। এ ক্ষেত্রে লর্ড আজ যদি মারা যেতেন সবাই বিশ্বাস করত ঘুমের মধ্যে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে; কিন্তু আসলে কী ঘটেছে? আসলে, প্রিস্ট যখন তাঁকে হতবাক করলেন, মরিয়া হয়ে হামলা চালালেন স্টুয়ার্ড।’

‘সব মিথ্যা,’ বলল বার্নেট, ‘এসব গল্প রাতে শোয়ার সময় শোনানো হয়। এখানে আধাটুকরা প্রমাণও কেউ হাজির করতে পারবে না।’

‘বাস্তবতা হলো, প্রমাণ আছে,’ বললাম আমি। ‘প্রথম যখন আমাকে আর লাইলাককে এই কামরায় নিয়ে আসা হলো, সে আমাকে জিজ্ঞেস করল তুমি খুন হয়েছ কি না, বার্নেট। কারণটা তুমি ওঁকে বলো, সোনা মেয়ে আমার।’

‘সেনা লোকটা আমাকে যখন ধাক্কা দিয়ে ফাদারের লাশের ওপর ফেলল, আমি তখন তিসি বীজ আর কাঠকয়লার গন্ধ পেয়েছিলাম। কালি,’ বলল লাইলাক, সামনে এগিয়ে এসে। ‘গন্ধটা ছিল তীব্র, ভুল হওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই।’

‘লাশের গায়ে কালির গন্ধ কোত্থেকে আসবে, বলুন? ফাদার তো নিরক্ষর ছিলেন,’ বললাম আমি। ‘বাকি আমরা এখানে প্রায় সবাই তা-ই। শিক্ষাগত যোগ্যতা একমাত্র আপনার আছে, বার্নেট। আর কালির গন্ধ পাওয়া যাবে আপনার হাতে। একমাত্র আপনার হাতে।’

‘এটা সত্যি নয়।’

‘স্পর্ধা দেখিয়ে তুমি বলতে চাইছ আমার মেয়ে মিথ্যা কথা বলছে?’ লর্ড টাফায়েল দুর্বল গলায় জিজ্ঞেস করলেন। যদি সুস্থ আর সবল থাকতাম তাহলে শুধু এই একটা কারণেই খুন করতাম আমি; কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা...লুট, ওর দিকটা দেখো।’

‘থামুন,’ বাধা দিলেন লর্ড র্যামসি। ‘লুট যদি আপনার রক্ত না হয়, এই আদালতে তার কোনো অবস্থান বা ভূমিকা নেই, এখানে তার থাকারই কোনো অধিকার নেই।’

‘স্যার,’ বললেন লর্ড টাফায়েল, টলতে টলতে দাঁড়াচ্ছেন। ‘অপরাধ করা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে আমারই হলঘরে, কাজেই বিচারটাও হতে হবে আমার দ্বারা। সুধীবৃন্দ, আপনাদের আমি এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম অল সেইন্টস ডে উৎসবের সঙ্গে পালন করার জন্য, আমরা যাতে পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্কটা নতুন করে একবার ঝালাই করে নিতে পারি। ভূরিভোজ...আর আনন্দদায়ক সব অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে এবং এখন আমি খুব ক্লান্ত।’

লর্ড র্যামসি প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু লুটের দিকে একবার তাকানোর পর সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। সবাই আমরা এখনো টাফায়েল হলে রয়েছি, টাফায়েলের সশস্ত্র লোকজন আমাদের ঘিরে রেখেছে।

‘আপনি যেমনটি চান, মিলর্ড,’ র্যামসি বললেন, আসন ছাড়ছেন। ‘আমার বন্ধুরা আর আমি লোভনীয় আতিথেয়তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং প্রার্থনা করছি, আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। আমাদের সবার স্বার্থে।’

লর্ড ডেরিক আর লর্ড বাদেনকে সঙ্গে নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন র্যামসি, তাঁদের পিছু নিল সঙ্গে আসা যার যার দেহরক্ষী আর স্টুয়ার্ডরা। লুুট একবার মাথা ঝাঁকিয়ে ইঙ্গিত দিতে একজন প্রহরী পথ দেখিয়ে স্টুয়ার্ড বার্নেটকে কামরা থেকে বের করে নিয়ে গেল।

তাদের বিদায়ে লর্ড টাফায়েলের আগুন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল। ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে আবার তিনি চেয়ারটায় বসলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে লুট, তবে এগিয়ে আসছে না।

‘সে কোথায়?’ শান্ত সুরে জানতে চাইলেন টাফায়েল। ‘যে নিজেকে আমার মেয়ে বলে দাবি করছে?’

সাবধানে সামনে বাড়ল লাইলাক। তাকে ভালো করে দেখার জন্য চোখ তুললেন টাফায়েল, তারপর ধীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন।

‘এটা তাহলে সত্যি। তোমাকে দেখতে লাগছে একসময় আমার স্ত্রী যেমনটি দেখতে ছিলেন। বিরাট, বিরাট একটা স্বস্তি।’

‘স্বস্তি?’ প্রতিধ্বনি তুলল লুট।

‘হ্যাঁ, স্বস্তি এই জন্য যে এর মানে হলো কাল রাতে আমি যখন ভুল করে ওদের দুজনকে এক করে ফেলেছিলাম তখন আমার বোধবুদ্ধি পুরোপুরি আমাকে ছেড়ে যায়নি এবং এও আমার জীবনে বিশাল এক স্বস্তি যে আমার মেয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে।’

‘এবং স্বস্তি যে আমি আপনার ছেলে নই?’

‘হ্যাঁ, তা-ও, এক অর্থে। সত্যিটা হলো, আমার একটা অংশ সব সময় জানত তুমি আমার নও, লুট। আমার তরুণী স্ত্রী পর পর দুবার মৃত সন্তান প্রসব করার পর কী হলো? আচমকা অলৌকিকভাবে বিরাট বড় সাইজের এক শিশুর জন্ম দিলেন, যে দেখতে একেবারেই আমার মতো নয়। আমার ভয় হলো আমি যে সন্তান তাঁকে দিতে পারিনি সেটা পাওয়ার জন্য তিনি গোপনে কাউকে ভালোবেসেছেন। সে ভয় মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আমি শান্তি বোধ করছি।’

একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন আহত লর্ড। ‘কিন্তু তুমি যদি আমার সন্তান না-ও হও, তার পরও তুমি আমার সৃষ্টি, যে ছেলে আমি চেয়েছিলাম। যার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। আমার মেয়ের জন্মগত অধিকার কোনো কাজে আসত না, আমাদের জমি যদি না থাকত। এডিনবরা বা লন্ডন থেকে জায়গির দেওয়া হবে; কিন্তু সেগুলো ধরে রাখা সম্ভব শুধু অস্ত্র দিয়ে। তোমার অস্ত্র, লুট। তুমি এখানকার লর্ড হয়েই থাকবে, শুধু নামটা বাদে এবং আপাতত সেটাই যথেষ্ট। আমি ক্লান্ত, বাপ। বিছানায় যেতে সাহায্য করো আমাকে। আমার মেয়ে সম্ভবত পরে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারবে। আমাদের অনেক বিষয়ে কথা বলতে হবে, জানার চেষ্টা করতে হবে হারানো বছরগুলোতে কী ঘটেছে।’

প্রবীণ লর্ডকে পথ দেখিয়ে লুট যখন কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, লাইলাকের হাত ছুঁলাম আমি।

‘আমাকেও এবার তাহলে যেতে হয়, ফিশবল ক্যাম্প তুলে ফেলবে। তবে যদি মন না চায় এখানে তোমার থাকার দরকার নেই। আমরা একটা উপায় বের করে ফেলব, যাতে...’

‘না,’ বলল লাইলাক, আমার ঠোঁটে আঙুলের ডগা ঠেকিয়ে চুপ করিয়ে দিল আমাকে। ‘আমি সব সময় জানতাম কোথাও আমার একটা জায়গা আছে, আমি সেখানকার মেয়ে, তা সেটা খারাপ হোক বা ভালো হোক। সেই জায়গা আমি খুঁজে পেয়েছি। আপনিই আমাকে খুঁজে দিয়েছেন। অন্ধদের দেশে সব জায়গা প্রায় একই রকম, শুধু মানুষগুলো আলাদা। তা ছাড়া আমি যদি আপনার সঙ্গে যাই, আমার পরিণতি হবে ফিশবলের তৃতীয় স্ত্রী হওয়া।’

‘খারাপ পরিণতি আরো অনেক আছে। ওই সীমান্ত নেকড়ের উপলব্ধি করতে খুব বেশি সময় লাগবে না যে সে তার উত্তরাধিকার নতুন করে দাবি করতে পারবে যদি লর্ডের সদ্য খুঁজে পাওয়া মেয়েটিকে তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব হয়।’

‘তা ছাড়া সে কি সত্যি অতটা দানব?’

‘না, কিন্তু...এই, তুমি হাসছ কেন? মাই গড, লাইলাক। তুমি এরই মধ্যে এসব ভেবে রেখেছ, তাই না?’

‘মঠে তরুণী মেয়েরা প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথাই বলত না। প্রথম দর্শনে ভালোবাসা, সেটি আমার কখনো হয়নি; কিন্তু আমি জানি আমি কে তা জানার আগেই লুট আমাকে চেয়েছে।’

‘সে তোমাকে কিনতে চেয়েছিল! আর তুমি বলেছ তার গা থেকে ঘোড়ার গন্ধ বেরোচ্ছে।’

‘আমার সন্দেহ, ওই গন্ধটা চিরকাল থাকবে ওর। ঘোড়া আমি পছন্দ করি।’

‘বেচারা শয়তান,’ আমি বললাম, অবাক হয়ে মাথা নাড়ছি। ‘বাছবিচার করার কোনো সুযোগই নেই তার।’

‘আমি বোধ হয় তার নিয়তি। এখন তার নিজের বলতে শুধু অস্ত্র আর বর্ম, তবে তার একটা গান আছে। আর আপনি বলেছেন আমি বেশ ভালো গাইতে পারি।’

‘তোমার গলার আওয়াজে একটা আশ্চর্য আকর্ষণ আছে, লাইলাক, যেটা আমি আজ পর্যন্ত অন্য কোনো গলায় পাইনি—নিজের সম্মানের কসম খেয়ে বলছি। তোমাকে আমি অনেক মিস করব।’

‘আমরা আবার একসঙ্গে গাইব, যখন বাতাস বা পথ আপনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আমরা হয়তো একদিন আমার সন্তানদেরও গান শোনাব।’

‘সত্যি শোনাব। কথা দিচ্ছি।’

গ্রেট হলে পরস্পরকে বিদায় জানালাম আমরা।

আমি পথের গায়ক পথে বেরিয়ে এসেছি, পথে কুড়িয়ে পাওয়া আমার শিশুটিকে রেখে এসেছি আগন্তুকদের কাছে; তার পরও তার জন্য আমি ভয় পাচ্ছি না। সে তো মানুষ হয়েছে কল্পনা করা যায় না এমন কর্কশ পরিবেশে এবং সেখানে সুন্দরভাবেই লালন করেছে নিজেকে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে তার মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হবে না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

এবং তার থাকবে ব্ল্যাক লুট। তবে সেটা লাইলাকের পরিবার আর পজিশনের কারণে নয়। প্রথম দর্শনে প্রেম কিংবদন্তিরও বাড়া, কিংবা একটা মেয়েলি কল্পনা। এটি কদাচ ঘটতে দেখা যায়, তবে ঘটে।

সাউইনে আমি লুটের চেহারা দেখেছি, সে যখন লাইলাকের জাদুভরা গলার গান শুনছিল। রাজ্যের খোরাক সামনে নিয়ে ক্ষুধার্ত একটা নেকড়ের মতো লাগছিল তাকে—ক্ষুধায় কাতর, ভালোবাসার কাঙাল, লোভে উন্মাদ।

ওই ভয়ংকর আকাঙ্ক্ষার কথা...আমারটা...খুব ভালো মনে আছে আমার। একটা নারীর অভাব নিজের ভেতরেও অনুভব করছি, বহু বছর ধরে।

তবে সেটা অন্য এক কাহিনি...

[বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে]


মন্তব্য