kalerkantho

উপন্যাস

মৃত্যুভূমি

শাহ্‌নাজ মুন্নী

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মৃত্যুভূমি

অঙ্কন : বিপুল শাহ্

‘পবিত্র আত্মার ফল হলো ভালোবাসা, আনন্দ, শান্তি, সহ্যগুণ, দয়ার স্বভাব, ভালো স্বভাব, বিশ্বস্ততা, নম্রতা ও নিজেকে দমন। এসবের বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই।’ (গালাতীয় ৫.২২.২৩)

 

বাইবেলের এই অংশ পাঠ করে তপন কুমার বর্মণ তাঁর সকাল শুরু করেছিলেন।

কিন্তু তিনি জানতেন না, কিছুক্ষণের মধ্যেই সকালের সেই অমলিন পবিত্রতা রূপান্তরিত হবে ভয়, তিক্ততা আর বিরক্তিতে। কোনো কিছু নিয়েই সহজে ভয় পান না তিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে খানিকটা ভয় লাগছে তাঁর। ভয়ের সঙ্গে মিশেছে দুশ্চিন্তা। মনে হচ্ছে, মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। সময়টা ভালো নয়, জানেন তিনি। কারণ চারদিকে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা তাঁর এত বছরের জীবনে আগে কখনো ঘটতে দেখেননি। তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ একটি চিঠি। চিঠিটি কিছুক্ষণ আগে ডাকপিয়ন দিয়ে গেছে। তপন কুমার চিঠিটা হাতে নিয়ে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলেন। তাঁকে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার মতো তেমন কেউ নেই আজকাল। অথচ খামের ওপর বাংলায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে তাঁরই নাম-ঠিকানা লেখা আছে।

 

রেভারেন্ট তপন কুমার বর্মণ

চার্চ অব গড মিশন হাউস।

ঈশ্বরের মণ্ডলী উপাসনালয়

স্টেশন রোড, লালমনিরহাট।

 

খামটা খুলে এর ভেতরে ভাঁজ করা কাগজটা খুললেন তিনি। সাদা কাগজে অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখা। তপন কুমার চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। পড়তে গিয়ে তাঁর চেহারায় পরিবর্তন ঘটল, কপাল কুঞ্চিত হলো। মনে হলো রেগে গেছেন। সবশেষে একটা উদ্বেগের ছাপ ছড়িয়ে পড়ল মুখমণ্ডলে। চিঠিটা কুিসত আর কুরুচিপূর্ণ ভাষায় লেখা।

 

ফাদারগণ, যাজকগণ (তপন বর্মণ)

তোমার যা খেতে মন চায়, তৃপ্তি করে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে খেয়ে নাও। আর স্ত্রীর কাছে বিদায়টুকু নিতে ভুলিয়ো না।

সিরিয়ার আইএসের কমান্ডার তোমার মস্তক চেয়ে আমাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। শিগগিরই তোমার মস্তক সিরিয়ায় উপহারস্বরূপ পাঠানো হবে। আর যারা লালমনিরহাট জেলায় খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করে তাদের গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যথাশীঘ্র তাদের হত্যা করা হবে। কান্তজির মন্দিরে আমরা বোমা ফাটিয়েছি। ক্ষমতা আছে কি না, সময়ে বুঝিয়ে দেব। পেপার-পত্রিকায় যত লেখালেখি করেন না কেন, প্রশাসন আমাদের একটি বালও ছিঁড়তে পারবে না।

কমান্ডার আইএস

বাংলাদেশ শাখা, দিনাজপুর।

 

কোনো সন্দেহ নেই, চিঠির প্রেরকের উদ্দেশ্য ভীতি তৈরি করা। আর সাম্প্রতিক সময়ে ভীতি উত্পাদন অনেক সহজ। চিঠিটা টেবিলে রেখে তিন মাস আগে ঈশ্বরদীর প্যাস্টর লুক সরকারের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে পড়ে তপন কুমার বর্মণের। পাবনার ঈশ্বরদী থেকে লালমনিরহাটের দূরত্ব কতটুকু? লুক সরকারের মতো তিনিও কি তবে আক্রান্ত হবেন, নিজের জন্মভূমি, এই প্রিয় বাংলাদেশে?

ঈশ্বরদীর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ‘ফেইথ বাইবেল চার্চ অব গড’-এর পাদ্রি লুক সরকার সরল, সহজ, গোবেচারা টাইপের ভালো মানুষ। চার্চের কাজের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিরও চর্চা করেন তিনি। এলাকার গরিব-গুর্বো মানুষকে নামমাত্র মূল্যে ওষুধ দেন। অন্তত বিনা চিকিৎসায় মরার চেয়ে ফাদারের দেওয়া দুই ফোঁটা ওষুধ যে তাদের মুখে পড়েছে—এই সান্ত্বনা নিয়েই হয়তো সন্তুষ্ট থাকে মানুষগুলো।

প্রতি সকালেই পবিত্র বাইবেল পাঠ করে দিন শুরু করেন লুক সরকার। তারপর চার্চে যান। বিকেলের দিকে রোগীরা আসে, তিনি ওষুধ দেন। গল্পগুজব করেন। এর মধ্যে হয়তো কোনো দিন ছেলে ফ্রান্সিস ঢাকা থেকে ফোন করে, কোনো দিন সাতক্ষীরা থেকে ভাইপো ফোন করে খোঁজখবর নেয়। এর মধ্যে একদিন একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। গলাটা চিনতে পারেন না লুক সরকার।

‘কে?’

‘আমরা কয়েকজন আপনার কাছে খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে জানতে চাই।’ অচেনা কণ্ঠটি বলে।

ধর্ম আলোচনা করতে লুক সরকারের আপত্তি তো নেই-ই, বরং খুশিই হন। আমার ধর্মবিশ্বাস আরেকজন যদি জানতে চায় আমি কেন বলব না, ভাবেন তিনি। গম্ভীর গলায় টেলিফোনকারীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তা আপনাগের বাড়ি কোথায়?’

‘সুজানগর। পাবনা।’ ছেলেটা বলে।

লুক সরকার বলেন, ‘ধর্মকথা শুনতে চাইলে একবার সময় করে আপনারা আসতে পারেন। আমার বলতে তো আর দোষ নেই, বলব। আপনারা শুনতে চাইলে শুনবেন।

‘আচ্ছা, আপনি কি খ্রিস্টান বানান না?’ অন্য প্রান্ত থেকে জানতে চায় ছেলেটি। লুক সরকার হাসেন।

‘না ভাই, খ্রিস্টান বানানোর কোনো মেশিন আমার কাছে নাই। আমরা শুধু প্রচার করতে পারি, এইটুকুই আমাদের কাজ।’

তো ছেলেগুলো এলো দিন কয়েক আগে। বলল, ‘আমরাই ফোন করেছিলাম। আপনাদের আল্লাহ ঈশ্বর সম্বন্ধে বলেন।’

লুক সরকার দেখলেন ছেলেগুলোকে। ভালো পোশাক-আশাক পরা, চেহারা-ছবিও ভালো। তিনি বাইবেল বের করলেন, ‘এটা আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। মুসলমানদের যেমন কোরআন, হিন্দুদের যেমন গীতা, তেমনি আমাদের বাইবেল।’

এরপর বাইবেল থেকে পাঠ করে শোনালেন তিনি, ‘কারণ ঈশ্বর এই জগেক এতই ভালোবাসেন যে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দিলেন, যেন সেই পুত্রের ওপর যে কেউ বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয়, বরং অনন্ত জীবন লাভ করে।’

‘আপনাদের এই ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত, ঈশ্বরের আবার পুত্র হয় কিভাবে? আল্লাহর কোনো পুত্র-কন্যা নাই।’

একটা ছেলে বলে। লুক তখন বিষয়টা নিয়ে তর্ক না করে আবারও বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। বলেন, ‘যিশু বলেছেন, আমিই পথ, আমিই সত্য ও জীবন। পিতার কাছে যাওয়ার আমিই একমাত্র পথ।’

ভেতর থেকে লুক সরকারের স্ত্রী পদ্মা সরকার একটা ট্রেতে করে চা-বিস্কুট নিয়ে এলে ছেলেগুলো আর তর্ক না করে সেসব খেয়ে বিদায় নেয়।

কয়েক দিন পর আবার এক সকালে, লুক সরকার তখন সবে প্রার্থনা শেষ করেছেন। তখনো সকালের নাশতা খাননি, ছেলেগুলো আবার এসে হাজির।

‘এবার তো আর মোবাইল করেনি ওরা। কোনো খবর না দিয়েই আসছে। তা আসছে যখন তাড়িয়ে তো আর দেওয়া যাবে না। আমি এসে ওদের কাছে বসলাম। বসার পরে ওদের সঙ্গে আমি কথা বলছি।’ লুক সরকার পরে পুলিশকে বলেছিলেন।

‘তখন তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে আমাকে ওঠাতে। বলছে, আরেকটা বই বের করেন। আমি বলি, না, এই বই দিয়েই হবে, এই বাইবেলই যথেষ্ট। আর লাগবে না, এটাই আমাদের বিশ্বাস। এটার মাধ্যমেই আমরা ঈশ্বর বিশ্বাস করি, আল্লাহকে বিশ্বাস করি। এভাবে বলতে বলতেই অতর্কিতে ওদের মধ্যে স্বাস্থ্যবান যে ছেলেটা সে আমার মুখ চাইপে ধরল। যখন মুখ চাইপে ধরে তখন চিন্তা করছি, এর বোধ হয় মৃগী রোগটোগ বা কিছু একটা আছে। এত সুন্দর চেহারা, এত সুন্দর কথা বলছে, তাদের ভেতর কোনো খারাপ চিন্তা আছে বলে বুঝতে পারছি না।’

ততক্ষণে আরেকটা ছেলে লুক সরকারের হাত দুটি ধরে ফেলেছে, আরেকজন জামার ভেতর থেকে বের করে এনেছে ধারালো ছুরি, আর সেটা বসিয়ে দিয়েছে লুক সরকারের গলায়। মুখ চাপা দিয়ে ধরায় জোরে চিৎকারও করতে পারছেন না তিনি। বুঝতে পারছেন, গলায় কেটে বসছে ছুরির ধার। এদিকে ভেতরের ঘর থেকে ধস্তাধস্তির বিষয়টা অনুমান করতে পেরে দরজায় জোরে ধাক্কা দিচ্ছেন পদ্মা সরকার। ছেলেগুলো এতে একটু বিভ্রান্ত হয়ে গেল, কোন দিক সামাল দেবে যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। আর সেই ফাঁকে যে ছেলেটা মুখ চেপে ধরেছিল তার আঙুলে পুরো শক্তি দিয়ে জোরে একটা কামড় বসালেন সন্ত্রস্ত ফাদার। ‘আহ্’ বলে ফাদারের মুখ ছেড়ে দিল ছেলেটা। ছুরির নিশানা গেল সরে। লুক সরকার চিৎকার করে উঠলেন, ‘বাঁচাও, বাঁচাও, মাইরে ফেলল...’

শেষমেশ দরজা খুলে মোটরসাইকেলে চড়ে পালাল ঘাতকরা। ডাক্তার সাহেব গলার আঘাত পরীক্ষা করে জানালেন, ক্ষত খুব বেশি গভীর হয়নি, তাই এ যাত্রা বেঁচে গেলেন লুক সরকার। ঘটনার পর পুলিশ এলো। সাংবাদিক এলো। পাড়া-প্রতিবেশী এলো। সবার সামনে মুখস্থ পড়ার মতো বারবার ঘটনার বর্ণনা দিলেন লুক সরকার। ‘ওরা আসলো, বইসলো, ধর্ম নিয়ে জানতে চাইলো...’

একসময় এই গল্প শেষ হলো। লুক সরকারের স্কুল রোডের সেমিপাকা ভাড়া বাড়িটা খালি করে সব মানুষ চলে গেল। দুই পুলিশ শুধু পাহারায় রইল দরজার বাইরে।

পদ্মা এসে স্বামীকে বলল, ‘অনেক ধকল গেছে, এবার একটু বিশ্রাম নেও। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, বড় বাঁচা বেইচে গেছো...’

স্ত্রীর কথায় হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন প্রৌঢ় ফাদার। গলার ক্ষতস্থানে যেখানে ডাক্তার ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়েছেন সেখানে হাত বুলালেন তিনি। তারপর হঠাৎ হু হু কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

‘ওরা আমাকে মারতে চাইল কেন, বলো দিনি? কী অপরাধ করিছি আমি? কেন মারতে চাইল? আমার তো কোনো শত্রু ছিল না, ওরা কেন আমার শত্রু হইল?’

পদ্মা ছুটে এসে স্বামীকে জড়িয়ে ধরল। ধরা গলায় সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বলল, ‘কুকুরের কাজ কুকুর কইরেছে, তোমার দোষটা কী? কানছো কেন তুমি, এ্যাঁ? শুয়ে পড়ো তো, শুয়ে বিশ্রাম নেও।’

পরদিনই ছাত্রশিবিরের এক কর্মী ওবাইদুলকে ধরল পুলিশ। ঘটনার এক মাসের মাথায় ধরা পড়ল আরো ছয় আসামি। এদের মধ্যেই একজন রাকিবুল। পুলিশ জানাল, রাকিবুল জেএমবি বা জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ শাখার আঞ্চলিক কমান্ডার।

রাকিবুলের আঙুলে মানুষের কামড়ের দাগ ছিল। দাগটা প্রথমে ছিল কালচে লাল, তারপর ধীরে ধীরে কালো হয়ে ফুলে উঠেছিল। সেই সঙ্গে তীব্র ব্যথাও অনুভব করছিল রাকিবুল। মানুষের দাঁতেও নাকি বিষ থাকে। রাকিবুলের ভয় হলো, লুক সরকারের দাঁতের বিষ আঙুল বেয়ে আবার তার সারা শরীরে না ছড়িয়ে পড়ে! অপারেশন সাকসেসফুল না হওয়ায় এমনিতেই তার মন ভালো নেই। তা ছাড়া ওই ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে চলে এসেছে সে। খুনের নির্দেশদাতা বড় ভাই ফোন করে তিরস্কার করেছেন প্রথম অপারেশনেই ব্যর্থ হওয়ার জন্য। নিজের ব্যর্থতায় নিজেই মরমে মরে যাচ্ছে সে। অথচ পরিকল্পনায় তো কোনো খুঁত ছিল না। বেশ কয়েকবার বৈঠক করে, সব দিক বিবেচনায় রেখে খুনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে তারা। কয়েক দফা রেকি করেছে। আরেকটু যদি সময় পাওয়া যেত। যদি ওই খ্রিস্টান লুক সরকার হঠাৎ ওইভাবে তার আঙুল কামড়ে না ধরতেন, তাহলে হয়তো ওই বিধর্মীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া তেমন কঠিন হতো না। রাকিবুল আবার তার আঙুলের দাগের দিকে তাকায়। মনে হচ্ছে দাগটা বড় হচ্ছে, আগে যা ছিল একটা দাঁতের সমান, এখন সেটা প্রায় জিহ্বার সমান লম্বা হয়ে গেছে। রাকিবুলের হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে যতবার ব্যথা পেয়েছে, যতবার হাঁটু বা কনুইয়ের চামড়া উঠে গেছে, মা ততবারই দূর্বাঘাস চিবিয়ে যত্ন করে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিয়েছেন। নানা রকম বুনো লতাপাতা আর শিকড়বাকড়ের উপকারিতা জানা ছিল মায়ের। আহা, কত দিন মাকে দেখেনি রাকিবুল! কত দিন ঘরছাড়া সে! কত দিন বড় ভাই, বাবা আর ছোট বোনটার সঙ্গে দেখা হয় না! কিন্তু না, এসব ভেবে মনকে দুর্বল করা যাবে না। সে আল্লাহর পথের পথিক। নিজেকে উৎসর্গ করার শপথ নিয়ে এই কঠিন দুর্গম পথে যুক্ত হয়েছে সে। পৃথিবী থেকে বিধর্মী কাফিরদের উত্খাত করার ব্রত নিয়েছে। এই পথে কোনো দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। শক্ত হতে হবে। রাকিবুল দ্রুত চোখের পানি মুছে নেয়। তারপর হাতের কামড়ের দাগটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে, দাগটা কালো হয়ে আরো ছড়িয়ে যাচ্ছে। আগের চেয়ে আয়তনে আরো বেড়েছে। মা হয়তো মানুষের দাঁতের বিষ নামানোর ওষুধ দিতে পারতেন। হয়তো ক্ষতের ওপর কোনো মলম লাগিয়ে দিতেন অথবা কোনো দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন আর তখনই রাকিবুল ভালো হয়ে যেত।

একা এই গোপন আস্তানায় এমন কেউ নেই যার সঙ্গে খোলামনে একটু কথা বলা যায়, যাকে দেখানো যায় আঙুলের এই কামড়ের দাগ। মাকে একবার ফোন দেওয়ার কথা ভাবে রাকিবুল। পরক্ষণেই চিন্তাটা বাতিল করে দেয় সে। পুলিশ পাগলা কুত্তার মতো তাকে খুঁজছে। এখন একটা ভুল পদক্ষেপ নিলেই সর্বনাশ। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা ঠিক হবে না। কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ শব্দ করে ফোন বেজে উঠলে চমকে ওঠে রাকিবুল। তার এই নম্বর শুধু মা জানে। মাকে কসম দিয়ে বলে এসেছিল, যদি খুব বেশি খারাপ কিছু হয়, যদি খুব বড় বিপদ হয়, তাহলেই যেন ফোন করে, না হলে নয়। তাহলে কি সত্যিই খারাপ কিছু হয়েছে?

রাকিবের মায়ের নাম আজমিরা খাতুন। মাজিদপুর গ্রামে নিজেদের বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা ধরে পাথরের মতো মুখ করে টিনের বেড়ায় হেলান দিয়ে এক জায়গায়ই মূর্তির মতো বসে আছেন তিনি। কয়েক দিন ধরেই সকাল-বিকাল বাড়িতে পুলিশ আসা-যাওয়া করছে। তারা আজমিরা খাতুনের মেজো ছেলে রাকিবুলের খোঁজ জানতে চায়। কিন্তু কেমন করে রাকিবুলের খোঁজ দেবেন তাঁরা? বছরখানেক হয়ে গেল, রাকিবুলের সঙ্গে বাড়ির কোনো যোগাযোগই তো নেই। হ্যাঁ বটে, মাজিদপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছিল সে। তারপর তো আটঘরিয়া ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলো এইচএসসি পড়বে বলে। সে সময়ই কেমন একটা পরিবর্তন এসেছিল ওর মধ্যে। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিল, মুখে লম্বা দাড়ি রাখল, দরকার ছাড়া কোনো কথা বলাই বন্ধ করে দিল এবং মোবাইল ফোনে কাদের সঙ্গে যেন গোপনে কথাবার্তা বলা শুরু করল। তারপর হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল। সে কোথায় গেল, কী করছে, কোথায় আছে—কিছু জানেন না তাঁরা।

‘কিচ্ছু জানেন না?’ নাছোড়বান্দা পুলিশ ছাড়ে না। জেরা করতেই থাকে।

‘শেষ কবে বাড়ি এসেছিল সে? কোথায় তাকে সবশেষে দেখা গেছে? ওর বন্ধুবান্ধব কারা? কাদের সঙ্গে মেলামেশা করত? ওর কোনো মোবাইল নম্বর জানা আছে কি না?’

রাকিবের বাবা আবদুল মালেক আর বড় ভাই আমিনুল পুলিশের প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুনে আর তার উত্তর দিতে দিতে নাজেহাল হয়ে গেলেন।

‘আপনারা কি জানেন, কত বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়েছে রাকিবুল? জানেন, অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের চার্জ আছে ওর বিরুদ্ধে? ও রাষ্ট্রদ্রোহী, ও ভয়ংকর অপরাধী, জানেন এসব?’

‘না বাবা, আমরা তো কিছুই জানিনে। আপনেরা বাড়িতে না এলে তো বুঝতেই পারতাম না ও কী করছে না করছে! ও তো হঠাৎ করেই কাউরে কিছু না বলে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, মাঝেমধ্যে ওর মায়ের সঙ্গে নাকি মোবাইলে কথা কইত, এ ছাড়া তো...’

পুলিশ এবার চেপে ধরল আজমিরা খাতুনকে। রাকিবুলের নম্বর দিতেই হবে, নইলে ফ্যামিলিসুদ্ধ চলো হাজতে। কোনো ছাড়াছাড়ি নাই। আইনের চোখে তোমরা সবাই অপরাধী। কান টানলে মাথা আসবে। পরিবার ধরে টান দিলে অপরাধীও নিজেই এসে ধরা দেবে।

রাকিবের বাবা আবদুল মালেক ছাপোষা নিরীহ মানুষ। বড় ভাই আমিনুল ছোট একটা চাকরি করেন ডিসি অফিসে। ছোট বোনটা সবে ক্লাস নাইনে উঠেছে। পুলিশ এখন তাদের সবাইকে বেঁধে যদি জেলখানায় ঢোকায় তাহলে কী হবে, ভাবতেও শিউরে উঠছেন আবদুল মালেক। গ্রামের চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও পুলিশের হয়ে আবদুল মালেককে চাপাচাপি করছেন রাকিবুলের খবর বলে দেওয়ার জন্য। বলছেন, রাকিবুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াতেই সবার মঙ্গল হবে।

এত হট্টগোলের মধ্যে আজমিরা খাতুনের যেন জবান বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি ভাবছেন, ছেলেটা কেন এই ভুল করল? কেন সে মাকে মাঝেমধ্যে ফোন দিত? কেন সে বলেছিল খুব বড় বিপদ হলে মা যেন তাকে এই নম্বরে ফোন দেয়। বিপদ তো এখন তাঁর ছেলের, খুব বড় বিপদ। কারা তাঁর ছেলেটারে এমন বিপদের পথে টেনে নিয়ে গেল? কেমন করে তাঁর ছেলে জেনেবুঝে আগুনে ঝাঁপ দিল?

পুলিশের বড় কর্তারা বাড়িতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সামনেই বড় ছেলে আমিনুল মায়ের কাছ থেকে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে বাটন টিপলেন, আজমিরা খাতুন স্পষ্ট শুনতে পেলেন, আমিনুল ফোনে বলছেন, ‘বাড়ি আয় রাকিবুল, মায়ের খুব অসুখ। মা বোধ হয় আর বাঁচবে না রে।’

আজমিরা খাতুনের চেহারায় সত্যিকারের মৃত্যু এসে বাসা বাঁধে। বুকের ভেতর ভেঙে পড়ে ইছামতী নদীর পার। মুখের মধ্যে মরুভূমির তৃষ্ণা নিয়ে তিনি কাঁদেন, ‘হে দয়াময়, মায়ের হৃদয় ভেঙে পুত্র কেন অপরাধী হয়?’

 

 

দুই.

 

অফিস থেকে দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে মিতালি। সকাল থেকে আট ঘণ্টা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ শেষ করে, রাতে এক ঘণ্টার টক শো সঞ্চালনার পর নিজের দিকে তাকানোর আর কোনো সময় থাকে না। এবার ছুটির অবসরে নিজের মুখোমুখি হতে চায় মিতালি। কিছুদিন ধরে একটা ক্লান্তিময় বিষণ্ন আলস্য যেন তাকে আপাদমস্তক ঘিরে ধরেছে। কাজের চাপে ছেলেটাকেও সময় দেওয়া হয় না। মাকে বড্ড মিস করে ফাইয়াদ। তা ছাড়া নিজের জীবন নিয়েও একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায় মিতালি। এ রকম ছন্নছাড়া, সিদ্ধান্তহীনতায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ জীবন আর বয়ে বেড়াতে ইচ্ছা করছে না। মা এখনো চায়, মিতালি যাতে ইকরামের কাছে ফিরে যায়। মিতালি যখন বাসায় থাকে না তখন ইকরাম মাকে ফোন করে, মিতালির গতিবিধি সম্পর্কে জানতে চায়, আর মা-ও গড়গড় করে ইকরামকে খুঁটিনাটি সব তথ্য জানায়, এ কথা মিতালি জানে। মাঝেমধ্যে এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার বাগিবতণ্ডাও হয়েছে।

‘নিজের মেয়ের চেয়ে পরের ছেলে কি আপনের কাছে বড়, আম্মা? তাও যেই লোকের সঙ্গে আপনের মেয়ে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না, সেই লোকের সঙ্গে আপনের খাতির রাখতে হবে?’

‘এখন ও যদি ফোন করে কথা বলতে চায়, তখন কী বলব? আমি কি আর নিজে থেইক্যা তারে ফোন করি?’

‘না, ফোন করলেও কথা বলবেন না। আপনে জানেন না, ও আমার সঙ্গে দিনের পর দিন কী আচরণ করছে? আপনের সামনেও তো আমার গায়ে হাত তুলছে, তুলে নাই? বলছে না টিভির চাকরি ছাইড়া দিতে...বলে নাই?’

মিতালির ঝাঁজালো কণ্ঠস্বরের সামনে মা মিনমিন করেন, ‘এখন নাকি আর সেসব বলবে না। আগের আচরণের জন্য এখন তো সে মাফ চায়। বলছে, আর এই রকম হবে না।’

‘এসব মিষ্টি কথা আমি বিশ্বাস করি না। এইগুলা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। আমি ওর ঘর করব না। এইটা ফাইনাল।’ মিতালি চিৎকার করে বলে।

অতীতের দুঃসহ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তার। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই হঠাৎ করে ১৬-১৭ বছর বয়সে ইকরামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মিতালির। আসলে ইকরামের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ওর চাচাতো বোন বুলবুল আপার সঙ্গে। বুলবুল আপা তখন ইডেন কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ে, আর ইকরাম সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে পেট্রোবাংলায় চাকরি নিয়েছে। বিয়ের দিন-তারিখ সব ঠিকঠাক, ধুমসে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে, তখন হুট করে গায়েহলুদের আগের দিন বুলবুল আপা কাউকে কিছু না বলে মিতালির গৃহশিক্ষক খায়রুল স্যারের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালাল। মিতালির বাবা-চাচাদের মুখে তখন চুনকালি পড়ার অবস্থা। ইকরামের বাবা বললেন, ‘কথা যখন দিছি, এই বাড়ির সঙ্গেই সম্বন্ধ করব, আপনেদের বাড়ির ছোট মেয়ের সঙ্গেই ইকরামের বিয়ে হবে।’

আব্বা আমতা আমতা করলেন, ‘আমার মেয়ে তো অনেক ছোট, এখনই বিয়ে...’

কিন্তু বাকি কেউ কোনো আপত্তি করল না। বরং ‘এত ভালো ছেলে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না’, বলল আত্মীয়-স্বজন। বিনা মেঘে মিতালির মাথায় বজ্রপাত হলো যেন। মার্চের ১৪ তারিখ এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছিল মিতালির আর ২৮ তারিখ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো তাকে। চোখে, বুকে, মনে তিল তিল করে জমিয়ে রাখা লাল নীল বেগুনি সব স্বপ্ন মিতালির চোখের পানিতে ধুয়ে গেল। বিয়ের রাতে ইকরাম তীব্র কণ্ঠে বলল,

‘তোমাদের বংশটাই খারাপ! ভালো ঘরের মেয়েরা এভাবে বাড়ি ছেড়ে পালায়! তোমার গায়েও তো একই রক্ত, কত আর ভালো হবে তুমি?’

ইকরামের প্রথম সংলাপেই অপমানের একটা কালো দাগ মিতালির আত্মায় স্থায়ী হয়ে বসেছিল। যত দিন গেছে সেই দাগ একের পর এক শুধু বেড়েই চলেছে, কমেনি। লাল কাতান শাড়ির আঁচলে কান্না চেপে কিশোরী কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিল মিতালি, ‘এই বংশে তাইলে বিয়ে করলেন কেন? আমার তো কোনো ইচ্ছাই ছিল না এখন বিয়ে করার।’

ইকরাম দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, ‘শোনো, এভাবে কথা বলবে না। সতীসাধ্বী স্ত্রীরা স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করে না। তারা নম্র ও অনুগত হয়।’

কিন্তু মিতালি কিছুতেই তার কান্না থামাতে পারেনি। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিল, ‘আপনি আমার জীবনটা নষ্ট করে দিলেন, আমার সব স্বপ্ন ধ্বংস করে দিলেন, আপনাকে আমি কোনো দিন ক্ষমা করব না।’

সেই প্রথম ইকরামের হাতের কঠিন পাঁচটি আঙুল তার কুমকুম চন্দনে সাজানো নরম গালে আছড়ে পড়েছিল। হতভম্ব মিতালি কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল। সেই রাতেই জোর করে শারীরিক সম্পর্কও করেছিল ইকরাম। অনেক পরে মিতালি বুঝেছিল, ওই রাতে ধর্ষিতা হয়েছিল সে।

উফ্্, সেসব দুঃসহ স্মৃতি আর মনেও করতে চায় না মিতালি। গত ছয় বছর সে বুকে পাথর বেঁধে, সব কিছু সহ্য করে এক মনে পড়ালেখাটা চালিয়ে গেছে, শুধু কোনো একদিন এই কারাগার থেকে মুক্তি পাবে বলে। এর মধ্যে ও না চাইতেও ফাইয়াদের জন্ম হয়েছে, হঠাৎ করে মিতালির বাবা মারা গেছেন, ইকরামের প্রমোশন হয়েছে কিন্তু ওদের দাম্পত্য সম্পর্ক আগের মতোই রয়ে গেছে, তাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

‘মা শিক্ষিত হলে সন্তান শিক্ষিত হয়, এ জন্য তোমাকে পড়ালেখা করাচ্ছি, বুঝতে পারছ, মিতালি? তোমাকে চাকরি করার জন্য পড়ালেখা করাই না।’

এই কথা বহুবার বলেছে ইকরাম। মিতালি ধৈর্য ধরে চুপ থেকেছে, কারণ এর প্রতিবাদ করলেই মার খেতে হবে তার। দুর্বিনীত, প্রতিবাদী বউ ইকরাম পছন্দ করে না। ভেতরের জমাটবাঁধা বেদনা চাপা দিতেই হয়তো ইকরামকে না জানিয়ে কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিবেটে অংশ নিয়েছে মিতালি। কবিতা আবৃত্তি শিখেছে, রেডিও-টিভিতে টুকটাক প্রগ্রাম করেছে, যতভাবে পারা যায় নিজেকে সব দিক দিয়ে চৌকস করে তোলার সার্বক্ষণিক চেষ্টা চালিয়েছে সে। স্বনির্ভর হতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে—এমন একটা চিন্তা সারাক্ষণ তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে।

‘এত কিছু করার দরকার কী? খামাখা সময় নষ্ট। পরীক্ষার পড়া পড়ো আর সংসারে মন দেও। বিবাহিত মেয়েদের এসব কালচার নিয়ে নাচানাচি মানায় না।’

বরাবরই প্রবল বিরক্তিতে নাক কুঁচকে ইকরাম মিতালিকে নিরুৎসাহ করেছে। আর যতবার ইকরাম এসব মন্তব্য করেছে ততবারই মিতালির সংকল্প আরো দৃঢ়, আরো তীব্র হয়েছে।

ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, অনার্সের সময় যে কম্পানিতে ইন্টার্ন করেছিল, সেখানেই চাকরির অফার পেয়ে গেল মিতালি। পাশাপাশি একটা বেসরকারি টেলিভিশনে খবর পড়ার সুযোগ।

ইকরামের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে এলো তখন। প্রথমে মুখে মুখে সতর্ক করল সে। রাগত ভঙ্গিতে বলল, ‘এসব পাগলামি মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলো। চাকরিও করা লাগবে না, টেলিভিশনে মুখ দেখানোরও দরকার নাই। সংসারী হও। অনেক সহ্য করেছি, আর সহ্য করা হবে না।’

কিন্তু ঘরের চৌহদ্দিতে আটকে থেকে একটা দমবন্ধ জীবন যাপন করার কথা স্বপ্নময়ী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মিতালি ভাবতেও ভয় পায়। সে নিজের সংকল্পে অটল রইল, আর সেই সংকল্প ভাঙতে মিতালির জীবন পুরো বিভীষিকাময় করে তুলল ইকরাম। মুখে কটু বাক্য বলা তো আছেই, সেই সঙ্গে গায়ে হাত তোলা, অন্য পুরুষকে জড়িয়ে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অকথ্য ভাষায় গালাগাল করাসহ কোনো কিছুই বাদ রাখল না ইকরাম। উফ্্, সেসব অসহনীয় দিনের কথা আর মনে করতে চায় না মিতালি। কাজের জায়গায় দিন দিন তার উন্নতি হয়েছে, আর ঘরের ভেতর দিন দিন অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে মিতালি, সেখান থেকে আর নামতে চায় না সে। এখন মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়। কিন্তু ওর ডিভোর্স চাওয়াটা হয়তো ইকরামের পৌরুষে লেগেছে। সে কিছুতেই মানতে পারছে না, মিতালির এভাবে চলে আসাটা। ডিভোর্স দেওয়া নিয়েও এখন টালবাহানা করছে। উকিলের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে মিতালির। যতই চেষ্টা করুক মিতালি চাইলে ডিভোর্স আটকাতে পারবে না ইকরাম।

ছুটির প্রথম দিনে ফাইয়াদকে নিয়ে ঘুরেছে মিতালি, পার্কে নিয়ে গেছে, রেস্টুরেন্টে খাইয়েছে, সন্ধ্যাবেলা      মা-ছেলে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরেছে। তিন-চার মাস হয়ে গেল বাবাকে ছাড়া থাকছে ফাইয়াদ। মিতালি বোঝার চেষ্টা করছিল, ইকরামের জন্য ছেলেটা কোনো রকম শূন্যতা অনুভব করে কি না। কয়েকবার ঘুরিয়েফিরিয়ে জানতে চেয়েছে সে, কিন্তু পরিষ্কার কোনো উত্তর দেয়নি ফাইয়াদ। চাপা স্বভাব পেয়েছে সে। ছেলের জন্যও ইকরামের কোনো টান আছে বলে মনে হয় না মিতালির। মা আর ছেলেকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য ঢাকার বাইরে বেড়িয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় সে।

 

 

তিন.

 

রাজশাহীর বাগমারার গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলে। কথিত আছে, একসময় এই অঞ্চল বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। ব্রিটিশ আমলে সেই বনজঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে মানববসতি। এই মানবরাই হয়তো এখানে গড়েছিল সুশোভিত বাগান। সেই বাগান কেটে ব্রিটিশরা তৈরি করে থানা ভবন, ফলে লোকজন একে ‘বাগান মারা’ বা ‘বাগ মারা’ বলে ডাকতে শুরু করে। আবার ‘বাগ মারা’র সঙ্গে বাঘ মারার কোনো দূরবর্তী সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। কারণ বনজঙ্গলে বাঘ থাকা আশ্চর্য নয়, আর বসতি স্থাপনকারী কারো হাতে বাঘ নিহত হওয়া তথা বাঘ মারার সূত্র ধরেও এই অঞ্চলের নামকরণ হওয়া বিচিত্র নয়। নামকরণের ইতিহাস যা-ই হোক, এমনিতে বাগমারা শান্ত জনপদ।

তবে এলাকাবাসী জানে, ২০০৪ সালে একবার এই অঞ্চলে বাংলা ভাই নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল। সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে সর্বহারা নিধনের নামে এক বছরের ভেতর প্রায় ৩২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বাগমারা তখন তার শান্ত-সুন্দর-সবুজ চেহারা হারিয়ে পরিণত হয়েছিল এক আতঙ্কের জনপদে। বাগমারার বাসিন্দারা আরো জানে, বাংলা ভাইয়ের প্রিয় অভ্যাস ছিল মানুষকে গাছের ডালে উল্টো করে ঝুলিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো। এরও আগে গলা কাটা রাজনীতি আর লাল পতাকা দল যারা করত, তাদের আনাগোনা ছিল বাগমারায়। তারা গোপনে খুন করে গিয়েছিল পৌরসভার মেয়র আলো খন্দকার আর হামিদ চেয়ারম্যানকে। বাংলা ভাই প্রথম লাগল তাদের বিরুদ্ধে। জানা যায়, বাংলা ভাইকে মদদ দিতেন সেই সময়ের সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিরা। বাংলা ভাই আদৌ আছে কি নেই, তা নিয়েও তখন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। মতিউর রহমান নিজামী নামে সরকারের এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি।’

এ নিয়ে সর্বত্র মহা হৈচৈ। তারপর তো ২০০৫ সালে বাংলা ভাইকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশই পুরস্কার ঘোষণা করে। তার এক বছরের মধ্যেই ধরা পড়ে বাংলা ভাই, যার নাম আসলে সিদ্দিকুল ইসলাম। যে নিজে ও তার দল জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (সংক্ষেপে জেএমবি) অনুসারীরা বিশ্বাস করত যে দুই রকমের আইন আছে। একটি মানুষের (সরকারের) তৈরি তাগুতি, অন্যটি আল্লাহর। জেএমবির অনুসারীরা সরকারের করা তাগুতি আইন মানে না। তারা শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর সে জন্যই তারা জিহাদ করতে চায়। যারা আল্লাহর আইন প্রচলনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের শেষ করে দিতে চায়।

বাগমারা থেকে বাংলা ভাই আর তার অনুসারীরা ২০০৪ সালেই ক্যাম্প গুটিয়ে পালিয়ে যায়। তার সহযোগীরাও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ায় গত ১১ বছর আপাতদৃষ্টিতে শান্তই ছিল বাগমারা। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর আবারও আলোচনায় আসে এলাকাটি।

তখন শীতকাল। সকাল দশটা নাগাদ কুয়াশা কেটে সূর্যের ঘোলাটে আলো জানান দিল নিজের উপস্থিতি। মচমইল সৈয়দপুরে শুক্রবার হাটবার। সকাল সকাল হাট সেরে এসে শীতের ঠাণ্ডা পুকুরে দুইটা ডুব দিয়ে পরিষ্কার পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে জুমার নামাজে অংশ নিতে মসজিদে এসেছেন ময়েজ উদ্দিন। চকপাড়া আহমদিয়া মুসলিম জামাতের এই মসজিদকে কাদিয়ানিদের মসজিদ বলেই জানে লোকে। সাদামাটা মসজিদ। টিনের ছাদ, প্লাস্টার ছাড়া ইটের দেয়াল। গ্রামের কয়েক ঘর কাদিয়ানি ছাড়া অন্যরা এই মসজিদে নামাজ পড়তে আসে না। ছোটবেলা থেকেই ময়েজ উদ্দিন দেখে এসেছেন, গ্রামের কিছু মানুষ খুব ঘৃণা করে তাঁদের। তারা নিজেদের সুন্নি আর হানাফি মাজহাবের বলে পরিচয় দেয়। কেউ আবার নিজেদের ওহাবি মতাদর্শের বলে দাবি করে।

তারা বলে, কাদিয়ানিরা মুসলিম না। অমুসলিম, কাফির। কাদিয়ানিদের নেতা মির্জা গোলাম আহাম্মদ নিজেকে নবী দাবি করেন, তাঁর কাছে ওহি নাজিল হওয়ার কথা ঘোষণা করায় তিনি মুরতাদ হয়ে গেছেন। তাঁর অনুসারীরাও মুরতাদ।

ময়েজ উদ্দিনের মনে পড়ে, কিশোর বয়সে তিনি তাঁর আব্বার কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। ‘আমরা বলে মুসলমান না, আব্বা?’

‘কে বলিছে?’

‘এই তো গেরামের লোকজন কওয়াকওয়ি করে।’

আব্বা তখন বলেছিলেন, ‘বড় হয়া নিজে কিতাব পইড়ে বুইজে নিও, আমরা মুসলমান কি না। অন্যের মুখে ঝাল খেয়ে লাভ নেই। আর শুধু একটা কথা শুইনে রাখো, আমি মুসলিম কি না, আমার ঈমান ঠিক আছে কি না, তার বিচারের ভার কার? একজন মুসলমান কি আরেকজন মুসলমানকে কাফির বইলতে পারে? কও।’

খুব বেশি পড়ালেখা করেননি ময়েজ উদ্দিন। তবে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে যা শুনেছেন তাতে কাদিয়ানি মতবাদ সম্পর্কে অল্পবিস্তর একটা ধারণা তৈরি হয়েছে তাঁর। সেই ধারণা অনুযায়ী তিনি দেখেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা বা কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের সঙ্গে তাঁদের কোনো অমিল নেই। তবে কি না, এমনও বলা হয়, ইংরেজ সাহেবরা ভারতবর্ষের মুসলমানদের বিভক্ত করার জন্য কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়েছিল। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না মেনে, পাঞ্জাবের কাদিয়ান গ্রামে জন্ম নেওয়া মির্জা গোলাম আহাম্মদ কাদিয়ানিকে তাঁরা শেষ নবী মানেন। ইমাম সাহেব অবশ্য একান্ত আলাপে ময়েজ উদ্দিনকে বলেছেন, মির্জা গোলাম আহাম্মদ নবী নন, তিনি মুজাদ্দিদ, ইসলাম ধর্মের একজন সংস্কারক। তিনি নতুন কিছুর প্রবর্তন করেননি, বরং পুরনো নিয়মগুলোকে যুগের উপযোগী করেছেন মাত্র। তবে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়তে বাংলাদেশে অনেক ধর্মীয় নেতা ও প্রতিষ্ঠান তত্পর। সুযোগ পেলেই কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তারা।

ময়েজ উদ্দিন দেখলেন, জুমার নামাজ পড়তে ৫০-৬০ জন মুসল্লি এসে মসজিদে জমা হয়েছে। প্রায় সবই চেনা মুখ, আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশী। তবে দুই-তিনজনকে ঠিক চিনতে পারলেন না তিনি। হয়তো গ্রামে নতুন এসেছে, হয়তো হাট করতে আসা পাইকারদের কেউ হবে। অপরিচিত ছেলেগুলোর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ময়েজ উদ্দিন। ছেলে দুটো অল্প বয়সী। একজনের পরনে কালো জ্যাকেট, নীল জিন্সের প্যান্ট; আরেকজন একটা খয়েরি রঙের সোয়েটার পরে আছে। দুই কাতারে নামাজ হচ্ছিল। ময়েজ উদ্দিনের পেছনের কাতারেই দাঁড়িয়েছিল ছেলে দুইটা। শান্ত আর অচঞ্চল দৃষ্টি তাদের।

গ্রামের কয়েকজন জোয়ান বয়সী ছেলে, ময়েজ উদ্দিনের চাচাতো ভাই সাহেব আলীও ছিল তাদের মধ্যে। কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না।

‘আপনেরা কারা? ঠিক চিনতি পারছি না যে! বাড়ি কুটি?’

‘মোহনপুর।’ কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটা নিচের দিকে তাকিয়ে বলে। মোহনপুরের লোক এখানে কী করে, মুসল্লিদের চোখে এমন প্রশ্ন ফুটে উঠলে অন্য ছেলেটি বলে, ‘মচমইলে আমাদের বন্ধুর বাড়ি। পলিটেকনিকের ছাত্র আমরা।’

‘ও, আচ্ছা।’

মুসল্লিদের কৌতূহল নিবৃত্ত হয়। এর মধ্যে ইমাম খুতবা দেওয়া শুরু করলে মুসল্লিরা আর কিছু জিজ্ঞেস না করে নামাজে মন দেয়। প্রথম রাকাত নামাজ ভালোভাবেই শেষ হলো। দ্বিতীয় রাকাতে ‘সামিআল্লা হুলিমান হামিদা, রাব্বানা লাকাল হামদ’ বলে সবে রুকুতে গেছে মুসল্লিরা, তখনই কানের কাছে বিকট শব্দ। এর পরেই দেখা যায়, কালো জ্যাকেট পরা অপরিচিত ছেলেটা রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। ময়েজ উদ্দিনের শরীরেও একটা ধাক্কার মতো লাগল, তারপর আর কিছু মনে নেই তাঁর। জ্ঞান ফিরে দেখলেন, তিনিসহ আরো তিনজন আহত অবস্থায় ভর্তি আছেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই ছেলেগুলো কেন এমন ভয়ানক কাজ করল, নিজের বুদ্ধিতে তার উত্তর খুঁজে পান না ময়েজ উদ্দিন। মসজিদকে তো এত দিন নিরাপদ বলেই জানতেন তিনি। সেই মসজিদে এমন হামলা! কারা করল, কেনই বা করল? যে ছেলেটার প্যান্টে বোমা রাখা ছিল, সে-ও তো প্রাণ দিল। তাহলে কী লাভ হলো তার এভাবে মরে? হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মনের ভেতরে জমতে থাকা প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর না পেয়ে ছটফট করে ওঠেন ময়েজ উদ্দিন।

 

 

চার.

 

‘তাহলে কি অন্ধ ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা বাবা ভাঙার বাণীই সত্যি হতে চলেছে? বড় ধরনের যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানরা ইউরোপ দখল করতে চলেছে? ইসলামিক স্টেট আইএসের উত্থান কি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে?’

ডিসেম্বরের সকালে হালকা হিম বাতাসে পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ভাবলেন নূরুল কবির। তিনি যেন কল্পনায় দেখতে পেলেন মাথায় স্কার্ফ বাঁধা, মুখে অজস্র বলিরেখা ভরা সাদা চুলের এক চক্ষুহীন বৃদ্ধাকে। বালিকা বয়সে মরুভূমির ঝড়ে উড়ে আসা শুকনা বালু যার চোখের পাতায় জমে গিয়েছিল। আর কিছুতেই ধুলার আঘাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই চোখ খুলতে পারল না সে। সেই দুর্ঘটনাই তাকে দিল অলৌকিক শক্তি, রোগ উপশম করার আর ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার ক্ষমতা। বুলগেরিয়ার এই অন্ধ ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা কাঁপা কাঁপা গলায় বলছিল, ‘শীতল অঞ্চল উষ্ণ হবে, আগ্নেয়গিরিগুলো জ্বলে উঠবে।’

‘স্টিলের পাখির আঘাতে আমেরিকান ভাইয়েরা পতিত হবে। ঝোপের আড়ালে নেকড়ে হুংকার দেবে আর নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরবে।’

বাবা ভাঙার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলে ২০৪৩ সালে বড় ধরনের যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপ দখল করবে মুসলমানরা। তারপর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে আর তার রাজধানী হবে রোম।

ইসলামী রাষ্ট্র বিষয়টি ঠিক বুঝতে পারেন না নূরুল কবীর।

তাঁর কথা হচ্ছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের ধর্ম মানবতা। সব মানুষের রক্তই লাল, তাহলে কেন ধর্ম নিয়ে এত বিভেদ, হানাহানি? আজকে কেন আমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি? প্রতিটা ধর্মই তো শান্তির কথা বলে। কিন্তু শান্তির চর্চা কয়জন করে? সবাই তো অশান্তির চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত।’

কিন্তু বাংলাদেশকে তো ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে। নূরুল কবিরের মনে পড়ে, শুরুতে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের কোনো বিধান ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল রাষ্ট্রের মূলনীতি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরশাদ ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচয়ে পাল্টে দেয়। কিন্তু সে তো কাগজে-কলমে। অন্তত নূরুল কবিরের এই পাল্টানোতে কোনো কিছু যায় আসেনি। বাংলাদেশের ধর্ম নির্ধারণের আগে ও পরে তেমন কোনো পার্থক্য বুঝতে পারেননি নূরুল কবির। তবে যাদের ধর্ম ইসলাম নয়, তারা নিশ্চয়ই এই ইসলামী রাষ্ট্রে থাকতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করেছে।

আর কেউ কেউ নিশ্চয়ই এই রাষ্ট্রিক ধর্মের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের বদ মতলব হাসিল করে নিয়েছে।

নূরুল কবিরের মনে পড়ে, ১৯৯০ সালে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার গুজব ছড়িয়ে কিভাবে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছিল, অনেকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট হয়েছিল, অনেকের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। অনেক হিন্দু পরিবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। দৈনিক ইনকিলাবে তিনি নিজে দেখেছেন প্রথম পাতায় বড় হরফে বাবরি মসজিদ ভাঙার খবর। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনের পরও তো শুনেছেন সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, লুটপাটের খবর। যেকোনো ধরনের নির্বাচন বা রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রথম শিকার হয় মাইনোরিটির মানুষজন।

নূরুল কবির ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দেওয়ার কথা চিন্তা করেন। আবার ভয়ও হয়, কার না কার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়। আর এই বয়সে তিনি বিপদে পড়েন। মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব তাঁকে পীড়া দেয়।

নূরুল কবির তাঁর স্ট্যাটাসে গুরু নানকের একটি বাণী তুলে দিলেন, ‘ঈশ্বর আর মানুষ আলাদা নয়। মানুষকে ভালোবাসলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।’

একটু পরে নূরুল কবির লেখাটা আবার কী মনে করে যেন ডিলিট করে দিলেন। ফেসবুক হচ্ছে একটা বাজারের মতো। কত ধরনের কত রকমের মানুষের আনাগোনা এই বাজারে, কে বিষয়টা কিভাবে নেবে কে জানে। তার চেয়ে নীরব থাকাই ভালো। নীরবে থেকে অন্যদের পর্যবেক্ষণ করা। নূরুল কবির নিউজ ফিডে যান। অল্পবয়সী মেয়েরা নানা ভঙ্গিতে, নানা রকমের কাপড় পরে ছবি দিয়েছে। এটাই হয়তো বয়সের ধর্ম। কিংবা ওরা হয়তো আত্মপ্রেমী, নার্সিসাস। তাঁর বন্ধু মাহবুব আলী ইদানীং খুব ধর্মের দিকে ঝুঁকেছেন, ফেসবুক স্ট্যাটাসেও সেই ছাপ, ‘আসসালামু আলাইকুম’ না বলে এখনকার ছেলে-মেয়েরা যে স্লামালেকুম বলে দায় সারছে তার সমালোচনা করেছেন মাহবুব। স্মার্টনেসের নামে সালামকে বিকৃত করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

এর বাইরে ফেসবুকে কেউ কবিতা লিখছে, কেউ গুণী মানুষজনের সাম্প্রতিক কথাবার্তার উদ্ধৃতি দিচ্ছে। একটা উদ্ধৃতি ভালো লাগল নূরুল কবিরের, ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক ভয়াবহ ঘটনাগুলো গভীরতর অসুস্থতার লক্ষণ। বর্তমান অবস্থা বর্ণনার জন্য অসহিষ্ণুতা শব্দটির ব্যবহার যথার্থ নয়। কাউকে পিটিয়ে, গুলি করে বা পুড়িয়ে হত্যার মতো ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশের জন্য অসহিষ্ণুতা শব্দটি অপর্যাপ্ত। জীবনও এখন নরকে রূপান্তরিত হয়েছে। ’

নূরুল কবির লাইক বাটনটি প্রেস করলেন। কথাটা পছন্দ হয়েছে তাঁর। সত্যিই তো সমাজ আর আগের মতো নেই। যদিও অরুন্ধতী রায় ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করেই এমন মন্তব্য করেছেন। তবু এই উপমহাদেশজুড়েই এমন অসহিষ্ণুতার নজির রয়েই গেছে। কোথায় সমাজ সুস্থ যুক্তিবাদ আর সহনশীলতার পথ ধরে এগিয়ে যাবে তা নয়, বারবার যেন পেছনের দিকেই হেঁটে যাচ্ছে।

নূরুল কবিরের এক পুরনো কলিগ তাঁর নাতনির ছবি পোস্ট করেছেন। এত মিষ্টি একটা হাসি বাচ্চাটার মুখে। এতেও লাইক দিলেন তিনি। আনন্দময় পারিবারিক ছবিও পোস্ট করেছে অনেকে। মানুষের আনন্দ দেখলে ভালো লাগে, আনন্দ বোধ হয় আনন্দ পুনরুত্পাদন করে। মানুষের জীবনে আনন্দ খুব দরকার।

 

এক ছোকরা কোমর বাঁকা করে হাস্যকর ভঙ্গিতে পোজ দিয়ে সিলেটের জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে। নূরুল কবিরের ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে যায়।

এক মেয়ে নিজের উদাস করা একটা ছবির নিচে ক্যাপশন দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে, ‘...আমার মন কেমন করে, কে জানে কাহার তরে, মন কেমন করে...’। স্বভাবতই তার বন্ধুরা এর নিচে নানা রকম মজার কমেন্ট করেছে।

হাবিবা অনেকক্ষণ ধরেই সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে ছিলেন স্বামীর দিকে। তাঁর মুখভঙ্গি লক্ষ করছিলেন মনোযোগ দিয়ে। একবার হাসেন, একবার মুখে আনন্দ খেলা করে তো আরেকবার বিষাদ। ব্যাপারটা কী? কলেজের ছাত্রীদের যেভাবে ধমকাতেন সেই সুরেই ধমকে ওঠেন তিনি।

‘সারাক্ষণ ফেসবুকে কী করো? কম বয়সী মেয়েদের সঙ্গে বান্ধবী পাতাইছ নাকি?’

নূরুল কবির স্ত্রীর কথার আক্রমণাত্মক উত্তর দেওয়াকেই বাঁচার জন্য ভালো উপায় বলে ঠিক করলেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি সারাক্ষণ টিভির সামনে বসে কী করো? ফালতু সব সিরিয়াল দেখে সময় নষ্ট করো...’

‘আমি তো একটা নির্দিষ্ট টাইম ধইরা দেখি, তুমি তো দিন নাই, রাত নাই, চব্বিশ ঘণ্টাই মোবাইলের পর্দায় চোখটা লাগায়া রাখো...’

নূরুল কবির ঝগড়া বন্ধ করতে স্মার্টফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে স্ত্রীর দিকে ঘুরে তাকান।

‘এই রাখলাম তোমার ফোন। এবার বলো, কিছু বলবা? প্রিয়তার কোনো খবর আছে?’

এই প্রশ্নে হাবিবার কপালে চিন্তার ছাপ পড়ে।

‘ওদের ব্যাপারস্যাপার তো বুঝি না কিছু! ভাবগতিক দেখে মনে হয়, সংসারটা টিকবে না...’

‘তোমাকে কিছু বলে না?’ নূরুল কবির জিজ্ঞেস করেন।

‘নাহ্্, বললে তো ভালোই ছিল...আমি আগেই বুঝছিলাম, ছেলেটা সুবিধার না...আর পরের ছেলেরই বা কী দোষ দেই, আমার মেয়ে তো নিজের পছন্দেই বিয়ে করেছে। এখন কী এমন ঘটল যে পছন্দটছন্দ সব শেষ? সংসারে একসঙ্গে থাকতে গেলে কত কিছু হয়...মন খুলে একটু বলতেও তো পারে...’

হাবিবা আপন মনেই বলতে থাকেন। নূরুল কবির তাঁকে বাধা দেন না। পাঞ্জাবির ওপরে চাদরটা টেনে দিতে দিতে টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দেন তিনি।

ডিসেম্বর মাস, তবু তেমন হাড় কাঁপানো শীত পড়েনি ঢাকায়। তবে ধোঁয়ার মতো কুয়াশার হালকা আচ্ছাদন আছে। নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে নূরুল কবিরের। গ্রামে এই সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ত। আগুনের পাশে বসে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করত গ্রামের মানুষ। কুয়াশা কেটে রোদ উঠলে উঠানে চাটাই পেতে পিঠে রোদের ওম লাগানোর সেই সকালগুলো আর ফিরে আসবে না।

‘তুমি কি শুনছ আমার কথা?’

হাবিবা আবার তাঁর মাস্টারি কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘সাড়া দিচ্ছ না যে...’

নূরুল কবির এবার রাগ করার বদলে হেসে ওঠেন, ‘সাড়া দেওয়া কি খুব জরুরি? কী হয় সাড়া না দিলে, তোমার সব কথার কি উত্তর আছে আমার কাছে? উত্তরও নাই, সাড়াও নাই। নীরব আছি, নীরবতাটাই সাড়া বলে ধরে নাও।’

‘তুমি তো ভাবের জগতে বাস করো। আমি ভাবছি আমার মেয়েটার সংসার নিয়ে...’

‘ভেবে কোনো লাভ নাই হাবিবা। যার যার ক্রুশ তাকেই বহন করতে হয়। যিশুখ্রিস্টও করেছিলেন।’

পাঁচ.

 

৩১শে ডিসেম্বর ২০১৫।

ব্রিটেনের সাউথ ওয়েলসের রেডিফেলন অঞ্চল। শীতের ঠাণ্ডা জমাট সকালে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডোনা ও নাইজেল দম্পতি ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে টিভি দেখছিলেন। কিছুদিন আগে চলে যাওয়া ক্রিসমাসের রেশ তখনো কাটেনি, তাঁদের টেবিলে এখনো ডোনার নিজ হাতে বানানো ক্রিসমাস কেকের শেষ কয়েকটি টুকরা। সামনেই নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন। ২০১৬। আরেকটা নতুন বছর আসছে। নিজেদের ছোট ব্যবসাটাকে আরেকটু বড় করার জন্য একটা ব্যাংক লোন নেওয়ার কথা চিন্তা করছেন নাইজেল। এ ব্যাপারে ডোনার কী মত, তা-ই জানতে চাইছিলেন তিনি। মুখে পোরা কেকের টুকরাটা চিবিয়ে শেষ করে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট কত জানতে চাইলেন ডোনা।

উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন নাইজেল। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ডোনাকে থামতে বললেন তিনি। তাঁর চোখ তখন আটকে গেছে টিভির পর্দায়, যেখানে সরাসরি কথা বলছেন পেন্টাগনের মুখপাত্র আর্মির ইউনিফর্ম পরা সাদা চুলের কর্নেল স্টিভ ওয়ারেন।

‘...দ্য নেক্সট ডে অন ডিসেম্বর টেন্থ, সিরিয়া বেইসড বাংলাদেশি নেমড সিফুল হক সুজন কিলড ইন রাক্কাহ অব সিরিয়া। সুজন ওয়াজ অ্যান এক্সটারনাল অপারেশন  প্ল্যানার, হু ইজ এডুকেটেড অ্যাজ এ কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার ইন ইউনাইটেড কিংডম। হি সাপোর্টেড আইএসএস হ্যাকিং ইফোর্টস...’

‘হোয়াট?’

এটা কার কথা বলছেন কর্নেল? আঁতকে ওঠেন ডোনা। ইজ দ্যাট সুজন? আমাদের প্রতিবেশী ওই বাংলাদেশি ছেলেটা? হ্যাঁ, সে রকমই তো বলছে। নাইজেল কর্নেলের কথার পুনরাবৃত্তি করেন, ‘হি সাপোর্টেড আইএসএস হ্যাকিং ইফোর্টস অ্যান্টিসার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি অ্যান্ড দেয়ার উইপন ডেভেলপমেন্ট। নাউ হি ইজ ডেড, আই স ইট অ্যাজ লস্ট কি লিংক ফর আইএসএস।’

‘কালো স্যুট পরত ছেলেটা। একটা বিএমডাব্লিউ গাড়ি চালাত। মনে আছে তোমার?’

ডোনা স্মৃতি হাতড়ান। কর্নেলের বক্তব্য শেষ হয়ে গেলে নাইজেল রিমোট টিপে টিভিটা বন্ধ করে দেন।

‘ইট ওয়াজ এ হেল অব শক, চার বছর ধরে পাশাপাশি আছি, অথচ কিছুই জানি না। ভালোই তো মনে হতো ওকে। বেশ ভদ্র, নম্র। বেশির ভাগ সময় রাতের বেলা ওর সঙ্গে দেখা হতো আমার। ওর বউ-বাচ্চা হয়তো খুব একটা বাড়ি থেকে বের হতো না। ওদের তেমন একটা দেখিনি আমি।’

পরে সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন ডোনা।

২০০৫ সালে পন্টিপ্রিডের কাছে রেডিফেলনে রবার্ট রসের কাছ থেকে ডোনাদের পাশের বাড়িটা কিনেছিল সুজন। তখন সে ইউনিভার্সিটি অব গ্লেমর্গানের ছাত্র। বাড়ি কেনার পর বাংলাদেশ থেকে স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে এসেছিল সে। রসের সঙ্গে প্রায়ই কথা হতো সুজনের। রসের মনে হয়েছিল, সুজন খুব হার্ড-ওয়ার্কিং ছেলে, যে কিনা সারা রাত ট্যাক্সি চালাত আর দিনের বেলা পড়াশোনা করত। আসলে ট্যাক্সি চালিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করত সে। সুজনের সঙ্গে কথা বলে রসের আরো মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের ভালো একটা ফ্যামিলির ছেলে সে। তার বাবা ডেন্টিস্ট, পরিবারের সবাই শিক্ষিত। রসের চোখে, সুজন ছিল কম্পিউটার জিনিয়াস। রসের মেয়ে ইসাবেলের প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া একটা পুরনো কম্পিউটার নিয়ে সেটাকে নানা রকম লেটেস্ট সফটওয়্যার ইনস্টল করে ফেরত দিয়েছিল সুজন। এত পুরনো একটা কম্পিউটার, যেন জাদু দিয়ে পুরোই নতুন বানিয়ে দিয়েছিল সে। ইন্টারনেটে জনৈক সিফুল হকের মৃত্যুর খবর শুনেছিল রস। কিন্তু এটা যে সুজন, প্রথমে বুঝতেই পারেনি। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য যে ওর মতো ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে এভাবে জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।

তবে কার্ডিফের ব্যবসায়ী সাইফুল যে নিজে একাই আইএসের সঙ্গে জড়িয়েছিল তা নয়, বরং পুরো পরিবারকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছিল সে। সাইফুলের বাবা আবুল হাসনাতের জীবনটা তেমন গোছানো ছিল না। পড়ালেখা শেখেননি খুব বেশি, তবে দূরসম্পর্কীয় এক আত্মীয়ের তদবিরে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে দাঁতের ডাক্তার সারওয়ার আলমের ডেন্টাল কেয়ার ক্লিনিকে সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন অনেক দিন। পরে নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাকুরতিয়া গ্রামের বাজারে ‘নিরাময় ডেন্টাল’ নামে একটা ক্লিনিক খুলে নিজেই দাঁতের চিকিৎসা শুরু করেন। দাঁত তোলা, দাঁতে পুটিং করা, দাঁত বাঁধানো, দাঁত ওয়াশের কাজ সবই ডাক্তার সারওয়ারের সঙ্গে থেকে শিখে নিয়েছিলেন হাসনাত। বেশি টাকা না, গরিব মানুষ যারা কম টাকায় চিকিৎসা চায় তাদের কাছেই হাসনাতের কদর ছিল। পাকুরতিয়া গ্রামেই ১৯৮৪ সালে সাইফুলের জন্ম। হাসনাতের বড় ছেলের নাম আতাউল হক সবুজ। দুই বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় ছেলে জন্মালে হাসনাত তার ডাকনাম রাখেন সুজন আর ভালো নাম সাইফুল হক।

গ্রামে ডাক্তারি করে যৎসামান্য যে আয় হতো তাতে একটু টানাটানি থাকলেও দিনকাল ভালোই চলে যেত হাসনাতের। কিন্তু একবার বড় একটা বিপদে পড়ে এলাকাছাড়া হতে হলো তাঁকে। গ্রামেরই এক মুদি দোকানদারের ছয়-সাত বছরের মেয়ে এলো রোগী হয়ে, দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে। হাসনাত দেখলেন, মেয়েটার চাপার দাঁতটা ক্ষয়ে একেবারে কালো হয়ে গেছে।

এর একটাই চিকিৎসা জানা আছে তাঁর, সেটা হলো ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতটা তুলে ফেলা।

‘ওই মাইয়া, ভালোমতো হাঁক্কর!’ মেয়েটাকে চেয়ারে বসিয়ে বললেন হাসনাত।

তারপর দাঁতের গোড়ায় মাড়িতে ইনজেকশন দিয়ে জায়গাটা অবশ করে সাঁড়াশি দিয়ে টেনে দুর্বল দাঁতটা তুলে ফেললেন তিনি। এ পর্যন্ত ভালোই ছিল, দাঁত তোলার পরই বিপদের সূচনা হলো। কিছুতেই মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয় না মেয়েটার, রক্ত ঝরছে তো ঝরছেই। বাচ্চা মেয়েটাও প্রায় নিস্তেজ হয়ে এসেছে, শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন হাসনাত। এদিকে এলাকায় ততক্ষণে উত্তেজনা শুরু হয়ে গেছে। কারা যেন রটিয়ে দিল, হাসনাত ডাক্তারের কাছে দাঁত তুলতে গিয়ে মুদির ছোট মেয়েটা মরে গেছে।

‘হাসনাত হইল মানুষ মারা ডাক্তার। হাতুইড়া ডাক্তার।’ লোকজন বলাবলি শুরু করল। গ্রামেরই কয়েকটা মাস্তান টাইপের জোয়ান ছেলে মারমুখী হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে হাসনাতের দোকান ভাঙতে এলো। শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে বউ-বাচ্চা নিয়ে দাঁতের ডাক্তার হাসনাত পালিয়ে গেলেন তাঁর ফুফুর বাড়ি বরিশালের গৌরনদীতে। মুদির মেয়েটা পরে অবশ্য জানে বেঁচে গিয়েছিল। জেলা হাসপাতালে ওকে বেশ কয়েক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর লজ্জা কিংবা অপমানে হাসনাত আর এলাকায় ফেরেননি। প্রথমে কিছুদিন গৌরনদীতে ছোটখাটো ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতে সুবিধা করতে না পেরে চলে এসেছিলেন বরিশাল। পরে বরিশাল সদরের কাঠপট্টিতে আবার সেই পুরনো পেশা অর্থাৎ দাঁতের ডাক্তারি শুরু করতে ‘আধুনিক দন্ত চিকিৎসালয়’ নাম দিয়ে ক্লিনিক খুলে বসেছিলেন তিনি। দুই ছেলে সবুজ আর সুজন দ্রুতই বড় হচ্ছিল। কিন্তু ডাক্তারিতে কেন যেন আর আগের মতো পসার জমাতে পারছিলেন না হাসনাত। হয়তো আত্মবিশ্বাস কমে গিয়েছিল তাঁর। কেমন একটা অপরাধী ভাব চলে এসেছিল আচার-আচরণে। দাঁত তুলতে গিয়ে হাত কাঁপত, প্রেসক্রিপশন লিখতে কলম চলত না। এরই মধ্যে তৃতীয় সন্তান গালিবের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলেন হাসনাতের স্ত্রী খায়রুন। জীবনটা আরো এলোমেলো হয়ে গেল যেন। একে তো আর্থিক টানাটানি, তার ওপর মাতৃহারা নবজাতক গালিব আর দুই কিশোর পুত্র সবুজ আর সুজনকে নিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়ে যান হাসনাত। এ সময় তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন খায়রুনের ছোট বোন কামরুন।

‘গালিবরে আমি পালমু। দুলাভাই, আপনে চিন্তা কইরেন না, ওর দায়িত্ব আমার।’ বোনের সদ্যোজাত ছেলেকে নিজের বুকে তুলে নিয়ে বললেন কামরুন। কামরুনের বিয়ে হয়েছে খুলনায়। গালিবকে নিয়ে খুলনা চলে এলেন তিনি।

‘দুলাভাই, একা একা পুরুষ মানুষের বেশিদিন চলে না। একজন সঙ্গী-সাথি লাগে...’ বলে কিছুদিনের মধ্যে নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাঁর দূরসম্পর্কীয় এক নিঃসন্তান বিধবা ননদের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে হাসনাতের বিয়েও দিয়ে দিলেন কামরুন। নিজের ছেলে, শালি আর নতুন বউ মমতাজের সূত্রে এভাবেই খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ল হাসনাতের। কিন্তু দাঁতের ডাক্তারিতে পসার আর বাড়ল না তাঁর। শহরে একজন ডিগ্রিধারী তরুণ ডেন্টিস্ট ক্লিনিক খুলে বসার পর আরো খারাপ হয়ে পড়ল হাসনাতের ব্যবসা। আর্থিক অনটন নিত্যসাথি হয়ে পড়ল তাঁর। সবুজ আর সুজন তত দিনে বিজ্ঞান বিভাগে ভালো জিপিএ নিয়ে এসএসসি পাস করেছে। শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী ছেলে দুটি শুকনা মুখে টিউশন ফি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে কলেজে যায়। দ্বিতীয় স্ত্রী মমতাজের গর্ভেও এরই মধ্যে আরেক ছেলে জন্ম নিয়েছে হাসনাতের। সংসারের নতুন অতিথি, দুই ছেলের কলেজের খরচ আর জীবনধারণের ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা। মমতাজই তখন একটা উপায় বাতলে দেন। প্রথমে প্রস্তাবটা মনঃপূত হয় না হাসনাতের। প্রবল আপত্তি জানান তিনি।

‘না, না। এইটা ঠিক হবে না। আমার কাছে এই কথা আর বলবা না।’

স্ত্রীকে রাগত স্বরে বলেন তিনি।

‘কেন, আপনে চান না সবুজ আর সুজন লেখাপড়া করুক? আর এই যে আরেকজন দুনিয়ায় আসছে, সে মানুষ হোক, তা চান না আপনে?’

কোলের সন্তান এহসানকে দেখিয়ে গলা উঁচিয়ে বলেন মমতাজ। নিরুপায় হাসনাত তখন আর কোনো উত্তর দিতে পারেন না। তাঁর বড় শখ, দুই ছেলের মধ্যে অন্তত একটা ছেলেকে ডেন্টাল কলেজে পড়ান, সত্যিকারের ডিগ্রিধারী দাঁতের ডাক্তার বানান। সম্ভবত সারা জীবন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার যে গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে, সেই গ্লানির ক্ষতি পূরণ করতে মনের মধ্যে ওই ইচ্ছা গোপনে লালন করতেন হাসনাত। কিন্তু ডাক্তারি পড়ার খরচের কথা চিন্তা করলে শখ বা স্বপ্ন দুটোই উবে যেত তাঁর। অসহায় লাগত নিজেকে। মমতাজ এবার গলার স্বর নরম করে বলেন, ‘প্রস্তাবটা তো খারাপ না। সোলায়মান শেখ নিজে থেকে বলছে। উনার তো টাকা-পয়সার অভাব নাই। বলেন, ওর বউ আনজুমান আরা আমার সেই ছোট্টকালের বন্ধু। আপনি রাজি হয়ে যান। ছেলেগুলোর একটা গতি হবে। অন্তত তাদের পড়াশোনাটা তো মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাবে না। ’

সবুজ একটু গাঁইগুঁই করে, ‘টাকার জন্য আমাদের বিক্রি করে দিচ্ছে বাবা। আমাদের কি এখন বিয়ের বয়স হইছে? আমাদের ক্লাসমেট, বন্ধু কেউ-ই তো বিয়ে করে নাই। সবাই হাসাহাসি করবে না আমাদের নিয়ে? বিদ্রূপ করবে। খোঁচাবে। মান-মর্যাদা সব যাবে। মুখ দেখাতে পারব না মানুষকে। কিছু করবি না তুই? বাবার ইচ্ছার বলি হবি? সবার কাছে হাসির পাত্র হবি?’

সবুজ তার ছোট ভাই সুজনকে খেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

‘যারা হাসাহাসি করবে তারা তোর পড়ার খরচ দেবে?’

সুজন ঠাণ্ডা স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করলে ছোট ভাইয়ের কথার কোনো উত্তর দিতে পারে না সবুজ। সে তোতলায়, ‘তোর আত্মসম্মানে লাগবে না? শ্বশুরের টাকায় পড়বি?’

‘সবার আগে আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, ভাইয়া। সম্মান-অসম্মান নিয়ে এখন ভাবার সময় না। কে কী বলল না বলল, তাতেও কিছু আসে যায় না।’

ফলে খুলনা শহরের বসুপাড়ার সোলায়মান শেখের যমজ দুই মেয়ে শায়লা আক্তার হীরা আর সায়মা আক্তার মুক্তার সঙ্গে আবুল হাসনাতের পিঠাপিঠি দুই ছেলে আতাউল হক সবুজ আর সাইফুল হক সুজনের শুভ বিবাহ অনাড়ম্বর পরিবেশে একপ্রকার নিঃশব্দেই সম্পন্ন হয়ে যায়।

মমতাজের অনুমান ভুল ছিল না। বিয়ের পর দুই জামাইয়ের পড়াশোনার খরচ দিতে কোনো রকম কার্পণ্য করেননি সোলায়মান শেখ। আবুল হাসনাতের ইচ্ছা অনুযায়ী এইচএসসি পাসের পর আতাউলকে ঢাকার একটি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সব খরচ জোগান দেন তার শ্বশুর। সাইফুলের পরিকল্পনা অবশ্য ভিন্ন। সে বিদেশে গিয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়।

‘কোনো অসুবিধা নাই। তুমি লাইনঘাট বের করো, টাকা-পয়সা যা লাগে আমিই দিবানি। সেটা নিয়ে চিন্তা কোরো না।’

সোলায়মান শেখ পান চিবাতে চিবাতে উদার কণ্ঠে বলেন।

লাইনঘাট বের করতে খুব বেশি দেরি হয় না মেধাবী সাইফুলের। ২০০৩ সালে ইউকেতে কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ইউনিভার্সিটি অব গ্লেমর্গানে ভর্তি হয়ে দেশ ছাড়ে সাইফুল। নতুন পরিবেশ, অচেনা দেশ, অপরিচিত মানুষজন, কিন্তু সাইফুল তো দমে যাওয়ার বা থেমে যাওয়ার ছেলে নয়। তার লক্ষ্য স্থির, তার উদ্দেশ্য দৃঢ়, তার মনোবল কঠিন, তার আত্মবিশ্বাস প্রবল। সে পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, কর্তব্যপরায়ণ ও বুদ্ধিমান। আর সে জন্যই বছরখানেকের মধ্যেই পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইন অর্ডারিং সিস্টেম দেওয়ার উপযোগী নিউ পোর্টভিত্তিক কম্পিউটার ফার্ম গড়ে তোলা তার জন্য খুব বেশি কঠিন হয় না।

তরুণ উদ্যমী উদ্যোক্তা হিসেবে কার্ডিফে সাইফুলকে চিনত সবাই, ভালোবাসত।

মানুষজন বলেছে, সাইফুল মানুষকে সাহায্য করতে পছন্দ করত, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল তার, ধর্ম বা সংস্কৃতির ব্যবধান মানত না সে। অনেকেরই ব্যাবসায়িক ওয়েবসাইট তৈরি করে দিয়েছিল সাইফুল। পরিচিতদের প্রায়ই মনে হতো, সব সময় বুঝি নতুন নতুন আইডিয়া খেলা করে তার মাথায়। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ই-ব্যাকস। কিছুদিনের মধ্যেই ই-ব্যাকস খুব ভালো ব্যবসা করতে শুরু করে।

ইউকে আসার দুই বছরের মধ্যে স্ত্রী মুক্তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে সুজন। ওদের প্রথম সন্তান নোমানের জন্মও হয় কার্ডিফে। মুক্তার যমজ বোন, সবুজের বউ হীরারও গর্ভবতী হওয়ার খবর আসে কিছুদিন পর।

কার্ডিফ থেকে ফোনে বোনকে নানা রকম পরামর্শ দেয় মুক্তা, ‘সাবধানে থাকবি, নিজের যত্ন নিবি। ভারী জিনিস তুলবি না। ডাক্তারের কথামতো চলবি। আয়রন, ক্যালসিয়াম ঠিকমতো খাবি।’ বোনের সিরিয়াস ভাবভঙ্গি শুনে ফোনের অন্য পাশে হি হি করে হাসে হীরা।

ওর খামখেয়ালিতে মুক্তা রেগে গেলে সুজন ফোনটা নেয়। বলে, ‘হাইসো না হীরা, মুক্তা যেইগুলি বলছে, সেইগুলি দরকারি কথা। তোমার তো এমনিতেই রক্তশূন্যতা আছে, আমরা কিন্তু দুশ্চিন্তা করি তোমাকে নিয়া।’ ‘দুশ্চিন্তা করে লাভ কী? আল্লাহ হায়াত দিলে বাঁচব, না দিলে মরে যাব।’

‘এইটা কোনো কথা হইল?’

‘হা হা হা...’ হীরা হাসে। ‘শোনো, আমার যদি কিছু হয়, মানে যদি ধরো মরে যাই, তাহলে কিন্তু আমার বাচ্চাটা তোমরা নিয়ে যেয়ো। নিজের সন্তানের মতো মানুষ কোরো। ঠিক আছে?’

‘কী যে আজেবাজে কথা বলো না তুমি...’ সুজন বিরক্ত হয়, ‘এসব বাজে কথা একদম ভাবা যাবে না। ভালো ভালো চিন্তা করো। সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখো। বাচ্চাসহ তুমি আর ভাই এখানে এসে বেড়ানোর প্ল্যান করো।’

‘আচ্ছা, তা-ই করব। আমি তো কখনো তুষার পড়া দেখিনি, তোমাদের ওখানে যখন তুষার পড়বে, তখন বেড়াতে আসব। বরফ দেখব।’ হীরা বলেছিল।

কার্ডিফে খুব শীত পড়েছিল সে বছর। প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছিল। অবিরাম বরফ জমে বেশির ভাগ রাস্তাই প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল। শহরটাকে মনে হচ্ছিল অনুভূতিশূন্য, নির্বাক আর হিমশীতল। সুজনদের বাড়ির সামনের ছোট্ট সবুজ পার্কটাও সাদা হয়ে গিয়েছিল বরফ জমে। সকালবেলা অফিসে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে সুজন দেখল, পার্কের সেই বরফঢাকা ধু ধু সাদা প্রান্তরে একটা সাদা নারীমূর্তি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। একটু অবাক হয়ে মূর্তিটির দিকে এগোনোর পর সে বুঝতে পারল, ওটা অপরিচিত কেউ নয়। ওখানে হিম ঠাণ্ডায় একা দাঁড়িয়ে আছে হীরা, মুক্তার যমজ বোন। হীরার আট মাসের উঁচু হয়ে ওঠা পোয়াতি পেট, দূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

‘হীরা আর বদলাল না! আসলেই কাণ্ডজ্ঞানের অভাব আছে ওর, নইলে এই হাড় জমানো শীতে গর্ভবতী কোন মেয়ে এভাবে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে!’

মনে মনে ভাবে সুজন। ‘এই হীরা, এই, এইখানে একা একা কী করছ তুমি? জমে পাথর হয়ে যাবে তো! চলো, আমার সঙ্গে ঘরে চলো!’ বলতে বলতে দ্রুত পায়ে বরফমূর্তির দিকে আগায় সে। আর তখনই একটা তীব্র তীক্ষ আলোকশিখা কোথা থেকে বেরিয়ে ঝলসে দেয় চারপাশ। সুজনের চোখের সামনে হীরার বরফমূর্তি পানির মতো গলে যায়। সে দৌড়ে গিয়ে দেখে, সেই গলিত বরফজলে হাত-পা নেড়ে খেলা করছে একটা ছোট্ট শিশু।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে সুজন। পাশেই ওদের ছেলে নোমানকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মুক্তা।

হীরার মৃত্যুর খবর আসে ঠিক তার এক মাস পর। পুত্রসন্তান জন্ম দিয়ে কী এক বিরল সংক্রমণে ডেলিভারির পরদিনই মারা গেছে সে।

মৃত্যু তবে এমনই? প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। ‘কুল্লু নাফসিন জা—ইকাতুল মাউত’, মৃত্যু থেকে কেউই রক্ষা পাবে না। একবার যে মৃত্যুবরণ করে সে আর কোনো দিন ধোঁকায় পূর্ণ এই দুনিয়ায় ফিরে আসবে না। কোনো চিঠিপত্র, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টারনেট কোনোভাবেই তার খবর আর পাওয়া যাবে না।

মুক্তা ও সুজনের মনটা ভারী হয়ে থাকে কষ্টে, বেদনায়। সেই বেদনাকীর্ণ সময়েই কি কোনোভাবে জুনায়েদের সঙ্গে পরিচয় হয় সুজনের? তার দুঃখে ভেজা নরম মনে তখনই কি সুযোগ বুঝে পুঁতে দেওয়া হয় বিনাশের বীজ? অন্তর্গত টানাপড়েনে বিপর্যস্ত সাইফুল হক সুজন কি তখনই নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয় সন্ত্রাসবাদের বলিকাঠে? জীবনের এ পর্যায়ে এসে কেন কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকেছিল সে? কোন পরিস্থিতিতে নিজের মেধা ব্যবহার করেছিল সর্বনাশা পথে?

এসব প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। কেউ জানে না, শুধু ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এলে তাকে দেখে চমকে যায় আত্মীয়-স্বজন। গালভর্তি দাড়ি রাখা, পাগড়ি মাথায়, লম্বা জোব্বা পরা সাইফুলকে অচেনা লাগে তাদের কাছে।

‘ব্যাটা, তুমি তো দেখছি পুরাই বদলে গেছ, মনে হচ্ছে বিরাট দরবেশ হয়ে গেছ...’

আত্মীয়রা বিস্ময় প্রকাশ করে।

‘চাচা, আমার এখন অল্প বয়স। এই বয়সের ইবাদত আল্লাহ দ্রুত কবুল করবেন। কে কখন মারা যাই, তার তো ঠিক নাই। তাই মৃত্যুর আগেই তওবা করে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমাদের কাজ করা দরকার।’

‘তা ঠিক। তা ঠিক।’

আত্মীয়রা সমীহ করার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেয়। সাইফুল বলে, ‘আখেরাতের ভালোর জন্য আমাদের সবার ইবাদত করা দরকার। এই দুনিয়া কয় দিনের, বলেন!’

পুত্রের ধর্মে মতি হয়েছে, ভেবে বিষয়টি ভালোভাবেই নেন আবুল হাসনাত। শুধু তো ধর্মীয়ভাবেই নয়, আর্থিকভাবেও তাঁর টানাটানির সংসারে সচ্ছলতা এনেছে সাইফুল। লন্ডনে ওর যে কম্পানি ই-ব্যাকস, তার একটা শাখাও খোলা হয়েছে ঢাকায়। বিদেশ থেকে আনা কম্পিউটারের প্রিন্টার আরো কী কী জিনিস বিক্রি হয় এখান থেকে। দুঃখ একটাই, সবুজ ডেন্টালে পড়াটা শেষ করল না। ছেলেকে দাঁতের ডাক্তার বানানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন হাসনাত, তা অপূর্ণই থেকে গেল। একে তো ওর বউটা মারা গেল (আহা! বড় ভালো মেয়ে ছিল হীরা। কিভাবে যে কী হয়ে গেল। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক)। যদিও সবুজ আর হীরার মাতৃহীন বাচ্চাটাকে লালন-পালনের ভার সুজন আর মুক্তা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। নিজের সন্তানের মতোই সঙ্গে করে বিলেত নিয়ে গেছে, তবুু সবুজের জীবনটা আর স্বাভাবিক ছিল না। পড়াশোনায় মন নেই, কেমন উদাসীন সব কিছুর প্রতি। সব শেষে সুজন বলল, ‘ওর আর পড়াশোনা করে কাজ নেই, বরং ব্যবসাটা দেখুক।’

কাজ শিখতে সবুজকে কয়েক দিনের জন্য বিলেতেও নিয়ে গেছে সুজন। শুধু সবুজকে নয়, ছোট ভাই এহসানকেও বিলেত নিয়ে গিয়েছিল সুজন। ছয় মাস রেখে কম্পিউটারের কাজ শিখিয়েছে।

আবুল হাসনাত আল্লাহর কাছে শোকর করেন সাইফুলের মতো পুত্র পেয়ে। কত জ্ঞানের কথা বলে ছেলে, ইসলামের কথা বলে, ধর্মের কথা বলে। হাসনাতের অবাক লাগে, এই কি সেই ছোট্ট সুজন? ঠিক সময়ে স্কুলের বেতন পরিশোধ করতে না পারায় যে কেঁদে বুক ভাসাত? এখন সেই সুজনের হাতে কত টাকা! হাজার হাজার পাউন্ডের মালিক সে। কয়েক দিন আগে বিলেত থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পাউন্ড পাঠাল সুজন। বলল, তার কোন এক পার্টনার আছে, তাকে দিতে হবে। তো ছেলে যেভাবে বলেছে, সেভাবেই কাজ করেছেন হাসনাত। যে টাকা নিতে এসেছে, সে কোনো একটা সাংকেতিক শব্দ বলেছে, সেই অনুযায়ী তার হাতে টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ রকম বেশ কয়েকবার হয়েছে। সুজন পাউন্ড পাঠিয়ে বলেছে, দাতব্য কাজে টাকাটা দিয়ে দিতে হবে। সুজনের নির্দেশনা অনুযায়ী লোক এসে টাকা নিয়ে গেছে, নয়তো লোক দিয়ে পাঠানো হয়েছে।

শেষ যখন ২০১৪ সালে ঈদের সময় সুজন তার বউ-বাচ্চা নিয়ে দেশে আসে তখনো সে বলেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে কাজ করছে। ধর্মের পথে চলছে। এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরকাল চিরস্থায়ী। সেই চিরস্থায়ী জীবন যাতে সুখের হয় সে জন্য জীবনের মতোই মৃত্যুকে ভালোবাসতে হবে, আল্লাহর পথে কাজ করতে হবে। সেই কাজ করতে গেলে যদি মরণ আসে তবে তা হবে শহীদের মৃত্যু। বিনা হিসাবে বেহেশত পাওয়া যাবে তখন।

সুজনের ওপর ভরসা থাকলেও ওর কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে তখন খানিকটা খটকা লেগেছিল আবুল হাসনাতের মনে। ঢাকার বাসায় সুজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল কয়েকজন লোক। ফিসফিস করে কথা বলছিল তারা। কেমন যেন সতর্ক ভাব, ত্রস্ত দৃষ্টি তাদের। এমনকি আবুল হাসনাতের সঙ্গে ভদ্রতা করে তাদের পরিচয়ও করিয়ে দেয়নি সুজন।

‘আসছিল যে...উনারা কারা? তোমার বন্ধু?’ আবুল হাসনাত একবার ইতস্তত করেন, গলা খাঁকারি দিয়ে ছেলেকে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে ফেলেন।

সুজন তার ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করছিল। পিতার প্রশ্নের উত্তরে সে বলে, ‘হ্যাঁ, বন্ধু বলতে পারেন। আসলে উনারা আমাদের লাইনেরই লোক। আল্লাহর পথের সৈনিক। উনারা একটু গোপনে থাকতে পছন্দ করেন।’

‘বাবা, তুমি ঠিক কী কাজের সঙ্গে যুক্ত, আমারে একটু খুলে বলো তো বাবা। আমার কেমন ভয় লাগতেছে...ভালো ঠেকতেছে না...’

আবুল হাসনাত কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে পুত্রকে জিজ্ঞেস করেন। সুজন হাসে।

‘আপনে ভয় পেয়েন না আব্বা, ভয়ের কিছু নাই। আমরা ঠিক পথেই আছি। মুসলমান হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব তা-ই পালন করছি আমি আর আমার বন্ধুরা। আপনিও আল্লাহর পথে আমাদের সহযোগিতা করছেন, শুধু এইটুকু জেনে রাখেন।’

আবুল হাসনাত ছেলের কথায় স্বস্তি পান। তিনি জানেন, আল্লাহর পথ হচ্ছে পবিত্র পথ, শান্তির পথ। সুজন যদি সত্যিই সেই পথে গিয়ে থাকে তাহলে তো দুশ্চিন্তার কিছু নেই। হাসনাত নিজেও ধর্মপ্রাণ মানুষ। নামাজ-কালাম পড়েন, যারা ইসলামের কথা বলে তাদের সমর্থন করেন।

‘কিছুদিনের মধ্যে অনেক কিছুই বদলে যাবে, আব্বা। সামনে একটা নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত হবে। ধার্মিক আর বিশ্বাসীদের দুনিয়া,’ সুজন আবার বলে। তার চোখে খেলা করে দূরের স্বপ্ন, কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, ‘সেইখানে শরিয়াহ আইন কায়েম হবে, ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে। সব অন্যায়, অবিচার, অনাচার দূর হবে। যারা এত দিন মুসলমানদের নির্যাতন করেছে, তারা সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’

সেবার খুব বেশি দিন দেশে ছিল না সুজন। অন্তঃসত্ত্বা বউ আর দুই নাতিকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ব্রিটেনে। অন্তত তা-ই জানত সুজন ও মুক্তার আত্মীয়-স্বজন। বিদেশ থেকে নিজের মায়ের সঙ্গে ফোনে কয়েকবার কথাও হয়েছিল মুক্তার। হতে পারে সুজনও ফোনে কথা বলেছিল আবুল হাসনাতের সঙ্গে। জানিয়েছিল, তাদের সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা, যার নাম রাখা হয়েছিল ওসমান।

সুজন বা মুক্তা কেউ আত্মীয়-স্বজনকে জানায়নি যে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ মেয়াদে থাকার জন্য আবেদন করেছিল তারা। কিন্তু সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছিল যুক্তরাজ্য সরকার।

স্ত্রী-সন্তানসহ সুজন দেশ থেকে চলে যাওয়ার ছয় মাস পরেই সবাই জানতে পেরেছিল ব্রিটেনে নয়, বউ-বাচ্চা নিয়ে তুরস্ক হয়ে আসলে সিরিয়ার রাক্কাহ শহরে চলে গিয়েছিল সুজন।

মৃত্যুই মূলত চিহ্নিত করে তার অবস্থান, মৃত্যুই তাকে পরিচিত করে বিশ্ববাসীর কাছে, আইএসএস নামের একটি কুখ্যাত সহিংস সংগঠনের কম্পিউটার অপারেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে।

 

ছয়.

 

চুয়াডাঙ্গায় টাউন মাঠের পেছনে ওদের পুরনো দালানবাড়িতে প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়ে ঢাকায় ফিরল মিতালি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নানা গাছগাছালিতে ছাওয়া সবুজ বাড়িটাতে বেশ ভালোই কাটল কয়েকটা দিন। মিতালির চাচাতো ভাইদের এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে ভরপুর সংসার। চাচা মারা যাওয়ার পর বুলবুল আপাও এখন দিব্যি এই বাড়িতে যাতায়াত করে। খায়রুল ভাইয়ের সঙ্গে ভালোই সংসার চলছে তার। নিজে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে। তিনটা বাচ্চা হয়েছে।

‘তোমার জন্যই আমার কপালটা পুড়ল গো বুবু। ইকরামের মতো লোকের সঙ্গে সংসার করে আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেল।’

মিতালি বুলবুলকে একা পেয়ে বলেছিল।

‘সবই কপাল রে বোন, আমি কি আর জানতাম এই রকম ঘটবে, বল? আমার তো বাড়ি ছাইড়ে পালানো ছাড়া সেই সময় কোনো উপায় ছিল না।’

বুলবুল আপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল। ‘তবু তো তুই এরই মধ্যে জীবনটা নিজের মতো গুছায়ে নিছিস। এইটাই বা কয়জন পারে, বল?’

এটাকে কি গোছানো জীবন বলে? কে জানে, মনে মনে ভাবে মিতালি। তার মনে হয়, মানুষের জীবনে দুই ধরনের বেদনা আছে, এক বেদনা শুধু আঘাত করে, অন্য বেদনা জীবনকে বদলে দেয়। মিতালি আঘাত পেয়েছে বটে, তবে সেই আঘাতই হয়তো তাকে সামনে এগোনোর প্রেরণা দিয়েছে, তাকে পাল্টে দিয়েছে। শেষ বিকেলের দিকে ছাদে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবা দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যে মনটা খারাপ হয়ে যেত মিতালির। মনে হতো, খামাখাই একটা পরিত্যক্ত জীবন বহন করে চলছে সে। মনে হতো, সামনের দীর্ঘ পথ তার একা থাকা শিখতে হবে, জীবনের খারাপ সময়গুলো আসলে একাই কাটাতে হয়। বিয়ের পর থেকেই তো আসলে ও একা হয়ে গেছে। একটা অসুখী অনিচ্ছুক দাম্পত্য জীবনের ভার একাই বহন করে চলেছে।

এর মধ্যে সৌম্য একদিন ফোন করেছিল।

‘কার ওপর অভিমান করে তুমি বনবাসে গেলে, ওগো রূপবান কন্যা?’

‘অভিমান না, একটু রিলাক্স করতে চুয়াডাঙ্গা এলাম। ঢাকায় ভালো লাগছিল না আর।’

‘গ্রিক ইতিহাসবিদরা তোমাদের ওই এলাকাকে গঙ্গারিড্ডি বলত, খ্রিস্টের জন্মের তিন শ বছর আগে, সেটা জান? ওটা অবশ্য বিরাট রাজ্য ছিল, যশোর-খুলনা-পশ্চিমবঙ্গ সব মিলিয়ে...৪৭-এর আগে পর্যন্ত তোমরা নদিয়া জেলার অংশ ছিলে। আচ্ছা, তোমার বাড়ি থেকে কি নবগঙ্গা বা মাথাভাঙ্গা নদী দেখা যায়?’...

 

কত তথ্য, কত প্রশ্ন সৌম্যর।

‘না, নদী চলে গেছে দূরে, বহুদূরে। নদী নেই, শুধু নদীর গন্ধমাখা বাতাস আছে।’

‘বাহ্্ ভালোই বলেছ।’

‘তোমার কাছ থেকে কবিতা করা শিখেছি। হা হা হা ’

মিতালি কি ভালোবাসে সৌম্যকে? সৌম্য কি ভালোবাসে মিতালিকে? সৌম্যর কাছে মিতালির কোনো প্রত্যাশা নেই, কোনো অঙ্গীকার নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি, কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এমন সম্পর্ককে কি ভালোবাসা বলা যায়? মিতালি তো জানে, তাকে একাই লড়তে হবে। ফাইয়াদের দায়িত্ব তাকে একাই বইতে হবে।

সৌম্যর দায়িত্ববোধ অন্যখানে, তার ঝকঝকে স্মার্ট স্ত্রী আর ফুটফুটে বাচ্চাদের কাছে। মিতালি হয়তো সৌম্যর জীবনে একঘেয়েমি কাটানোর একপশলা বৃষ্টি মাত্র। সেই বৃষ্টিময় সম্পর্ককে স্থায়ী রূপ দেওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা তার নেই।

মিতালিও হয়তো আর চায় না বাঁধনে জড়াতে। এই ভালো, এই হুটহাট বেরিয়ে পড়া।

মিতালির এই চুয়াডাঙ্গার বেড়ানোটা হয়তো সাধারণ একটা বেড়ানোই থেকে যেত, যদি আবদুল আলীর ঘটনাটা না ঘটত। আবদুল আলীর বাবা জব্বার মিয়া অনেক দিন ধরেই মিতালিদের গ্রামের বাড়ির জমিজমা বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে। বর্গাদার ফসলের অর্ধেক পায়, বাকি অর্ধেক পায় জমির মালিক। জব্বার মিয়ার গোটা পাঁচেক ছেলে-মেয়ে আছে, তাদের সবার খোঁজখবর জানে না মিতালিরা। তবে জব্বার মিয়ার সবচেয়ে বড় ছেলে আবদুল আলীকে চেনে ওরা। আবদুল আলী বাবার মতো চাষাবাদে না গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ শিখেছিল। প্রথমে ছিল রাজমিস্ত্রির জোগালি, পরে নিজেই কাজ শিখে হয়ে ওঠে রাজমিস্ত্রি।

 

চুয়াডাঙ্গা সদরে তার কাজের সুনাম ছিল। পয়সাকড়িও মন্দ কামাত না। বছর পাঁচেক আগে হঠাৎ করেই এক দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তারপর লাখ দুয়েক টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুরে চাকরি নিয়ে চলে যায় সে।

জব্বার মিয়া খুব তৃপ্তির সঙ্গে সেই খবর জানিয়ে গিয়েছিল মিতালির চাচাতো ভাইদের। আট ঘণ্টা কাজ করলে দিনে ১৫ থেকে ১৮ ডলার পাওয়া যায়, মাস গেলে প্রায় আড়াই হাজার ডলার বেতন, থাকা-খাওয়ার খরচ দেয় কম্পানি। খারাপ না। যাওয়ার সময় এর-ওর কাছ থেকে ঋণ করে গিয়েছিল, দুই বছরে সেই ঋণও শোধ হয়েছে। এখন যে টাকা-পয়সা আয় হয়েছে তা দিয়ে নতুন বাড়ি তুলেছে, সামান্য জমিজমাও কিনেছে। বলা যায়, সবে সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছে জব্বার মিয়ার পরিবার। এমন সময় নেমে এলো বিপর্যয়।

বুড়া জব্বার মিয়া এক সকালে এসে হাউমাউ করে কেঁদে পড়ল মিতালির চাচাতো ভাইদের সামনে। সবাই মিলে নাশতা সেরে তখন সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিল। তখনই জব্বার আলী এই হাউমাউ কান্নাসহ আছড়ে পড়ে।

‘আরে বাবা, কী হয়েছে?’

‘আবদুল আলীকে পুলিশে ধরেছে।’

‘সেকি কথা, আবদুল আলী না সিঙ্গাপুরে! গত বছরই তো দেশে ঘুরে গেল। ওকে পুলিশ পেল কই? কোন দেশের পুলিশ?’

জব্বার মিয়ার জড়ানো কান্না থেকে বোঝা গেল, সিঙ্গাপুরের পুলিশ প্রথমে ওদের প্রায় ২৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে ধরে। তারপর দুই মাস আটকে রেখে দেশে পাঠিয়ে দেয়। পরে আবার বাংলাদেশের পুলিশ তাদের আটক করে।

‘তো কী করেছিল আবদুল আলী? মারামারি করে নাই তো কারো সঙ্গে? ওসব দেশে তো আবার আইনের খুব কড়াকড়ি শুনছি।’

‘না বাবা, আমার বেটা তো শান্তশিষ্ট, নরমসরম, মারামারি করার মানুষ না...’

‘তাহলে? কিছু একটা অপরাধ তো করিছে, নয়তো খামাখা তারে পুলিশ ধরবে কেন?’

কিন্তু সেই অপরাধটা যে কী সেটাই জব্বার মিয়া কিছুতেই বলতে পারল না। চোখের পানি মুছে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।

যদিও পরদিনই সব দৈনিকে প্রকাশিত ছবি ও খবরে আবদুল আলীর অপরাধ নির্ণয় করতে কারো কোনো অসুবিধা হলো না। পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ছিল এমন—

‘সিঙ্গাপুরে বসে বাংলাদেশে জিহাদের ছক’, কেউ লিখল ‘দেশে সশস্ত্র জিহাদের ভাবনা’

জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুই মাস আগে গ্রেপ্তারের পর ফেরত পাঠানো ২৬ বাংলাদেশি নিজের দেশের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুর। তারা বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে টাকাও পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ওই বাংলাদেশিরা উগ্র মতাদর্শী একটি গোষ্ঠীর পাঠচক্রে যুক্ত ছিল। সিঙ্গাপুরের মোস্তফা নামের একটি মার্কেটের কাছে এক মসজিদে সপ্তাহে এক দিন তারা একত্র হতো এবং বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা করত। তবে সিঙ্গাপুরে জঙ্গি হামলার কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না।

‘এবার বুঝছ, তোমার ছাওয়ালের অপরাধ কী ছিল?’

জব্বার মিয়ার সঙ্গে এবার আবদুল আলীর বউ আর চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সী ছেলেও ছিল। ছেলেটার চেহারা হতবিহ্বল। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা পাঞ্জাবি, গোড়ালির ওপর পর্যন্ত ঢাকা পায়জামা, মাথায় সাদা টুপি পরে মলিন মুখে উবু হয়ে বসে ছিল সে। আবদুল আলীর বউটা তার ছাপা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘আমার স্বামী সরল-সোজা ভালো মানুষ। কেউ নিশ্চয় তারে ভুল বুঝায়া ফান্দে ফেলিছে। আগে তো তেমন ধর্মকর্ম করার সময় পেত না। গত বছর যখন বাড়ি এলো তখন তার অন্য চেহারা। দাড়ি রেখেছে, পাঁচ অক্ত নামাজ-কালাম পড়ে। ছেলেটাকে সরকারি স্কুল ছাড়িয়ে মাদরাসায় ভর্তি করায়ে দিল। বইললো, আল্লাহর পথে চইলতে হবে।’

জব্বার মিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আবদুল আলী জঙ্গি হতে পারে না। সে ধর্মকর্মে মন দিয়েছে বটে, কিন্তু...’

ছেলে বলল, ‘আব্বা তো জাকির নায়েক আর জসিমউদ্দীন রাহমানীর ভিডিও দেখত, আমাকেও দেখতি কতো, উনাদের কথা শুনতি কতো।’

 

 

সাত

 

ছবি তোলা মানে শুধু ক্যামেরার বোতাম টেপা নয় রায়হানের কাছে। ক্যামেরার ফ্রেম একটা ক্যানভাসের মতো, যেখানে আলো-ছায়ার তুলিতে একটা মুহূর্তকে আটকে ফেলা যায়। যে মুহূর্তটা হয়তো কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, শুধু অবলোকনের আনন্দ তৈরি করে। সৌম্যর সঙ্গে শাহবাগে দাঁড়িয়ে এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল রায়হানের।

‘ক্যামেরা আসলে একটা গল্প বলে, ফটোগ্রাফি দর্শকদের গল্প শোনায়। তবে ফটোগ্রাফিকে শিল্প বলব কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে আমার। ফটোগ্রাফিতে ক্যামোফ্লেজ তৈরি করা যায়, কিন্তু সত্য লুকানো যায় না। শিল্পে সত্যের চেয়ে মিথ্যা সুন্দর...’

সৌম্য বলছিল। বলতে বলতেই আইডিয়াটা মাথায় এলো ওর। বলল, ‘এইবার একটা এক্সিবিশন করো, রায়হান। তোমার তোলা ৩০-৪০টা বেস্ট ছবি বেছে নেও, তিন দিনের এক্সিবিশন, ভেন্যু আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ।’

রায়হান কিছু বলার আগেই আলিয়ঁসে ফোনটোন করে একাকার করে ফেলল সৌম্য। এমনকি তাকে নিবৃত্ত করার জন্য রায়হান টাকা-পয়সার সংকটের কথা বলাতে কিভাবে যেন একজন স্পন্সরও জোগাড় করে ফেলল সৌম্য।

প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু : শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ।

প্রদর্শনীর নাম ‘বিক্ষুব্ধ রাত-দিন’।

রায়হানের মরচে পড়া, ঝিমধরা, অবসাদগ্রস্ত, ক্লান্ত দিনগুলো হঠাৎ এই প্রদর্শনীর ব্যস্ততায় চকচকে আর ঝলমলে হয়ে উঠল। ছবি নির্বাচন, সেগুলোকে এনলার্জ করা, বাঁধাই করা, প্রদর্শনীর কার্ড ছাপানো, বিতরণ...। প্রিয়তার কথা মনে পড়ে তার। প্রায়ই আহ্লাদী গলায় বলত, ‘তোমার ফটোগ্রাফি নিয়ে একটা এক্সিবিশন করব। অনেক বড় করে, জাঁকজমক করে।’

প্রিয়তার উদ্যোগে না হোক, অন্য কারো উদ্যোগে, যেমনই হোক, একটা এক্সিবিশন তো হচ্ছে। অন্যের কাছ থেকে জানার চেয়ে প্রিয়তার নিশ্চয়ই রায়হানের কাছ থেকে বিষয়টা জানলে ভালো লাগবে। যদিও মাস তিনেক যোগাযোগ নেই, তবু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে নিজে থেকেই প্রিয়তাকে ফোন করে রায়হান। রিং বেজে যায়, ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করে না কেউ। হয়তো সাইলেন্ট করে রেখেছে, হয়তো জরুরি কোনো মিটিংয়ে ব্যস্ত বা ক্লাসে পড়াচ্ছে, কিংবা হয়তো (এ রকম ভাবতে চায় না    রায়হান) ইচ্ছা করেই ফোনটা ধরেনি, আসলে রায়হানের সঙ্গে কথা বলতে চায় না।

‘দেখা করতে চাই,’ লিখে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দেয় রায়হান। আধাঘণ্টা পরে রিপ্লাই আসে।

‘কালকে বিকেলে আমাদের বাসায় আসো।’

আমাদের বাসা মানে প্রিয়তার বাবার বাড়ি, যেখানে গেলে এখনো ঠিক স্বস্তি পায় না রায়হান। একে তো এমন ঝকঝকে তকতকে সাজানো বাড়ি, মনে হয় কোনো বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শোরুমে ঢুকেছে। এই বুঝি অসাবধানে কোনো ভুল হয়ে গেল। তার ওপর প্রিয়তার মায়ের সন্দেহভরা চোখের দৃষ্টি, যেন রায়হান ক্লাস ফাঁকি দিতে গিয়ে ধরা পড়া কোনো ছাত্র। তা-ও না হয় সহ্য করা যায়, কিন্তু প্রিয়তার বাবা নূরুল কবির যখন তার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে গল্প করতে চান, তখন দৌড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে রায়হানের। কিন্তু প্রিয়তার সঙ্গে দেখা হওয়া সত্যি দরকার। কলাবাগানে ওদের তিন রুমের বিশাল বাসাটা আর রাখতে পারছে না রায়হান। এত টাকা ভাড়া টানার সামর্থ্য তার আর নেই। গ্রামের বাড়িতে বাবা আর বড় ভাইকে প্রতি মাসে কিছু না কিছু টাকা পাঠিয়ে একার উপার্জনে এত বেশি ভাড়া দিয়ে বিরাট বাড়ি রাখা বিলাসিতা।

প্রিয়তা আসলে কী চায়, সেটাও জানা দরকার। এ রকম ঝুলন্ত না ঘরকা, না ঘাটকা সম্পর্কটাও আর বইতে পারছে না রায়হান। সব কিছু যখন প্রিয়তার সিদ্ধান্তেই হয়, তখন সম্পর্কটা নিয়ে প্রিয়তাই না হয় সিদ্ধান্ত নিক।

লম্বা চুলগুলো পরিপাটি করে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে নিজের বাইকে চেপে প্রিয়তাদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় রায়হান। প্রিয়তা বসার ঘরে আসে হালকা বেগুনি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে। ভারি সুন্দর আর স্নিগ্ধ দেখায় তাকে। রায়হান চোখ ফেরাতে পারে না। কিছু কিছু তসবিহ আছে না, যেগুলো অন্ধকার ঘরেও জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে, প্রিয়তার সৌন্দর্যও রায়হানের কাছে মনে হয় তেমন, উজ্জ্বল আর জ্বলন্ত। খানিকক্ষণ চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে দুজন, শেষ পর্যন্ত রায়হানই চোখ নামিয়ে পকেট থেকে তার এক্সিবিশনের একটা কার্ড বের করে প্রিয়তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

‘আমার এক্সিবিশন।’

প্রিয়তার কপালে চকিতে হালকা ভাঁজ পড়ে, কার্ডটা খুলে চোখ বোলায় সে।

‘ভালো। অভিনন্দন! এইটা দিতেই এসেছ?’

‘না, মানে তুমি তো কিছু জানালে না, মানে তুমি কী ঠিক করলে? ফিরবে না আর?’

কিছুক্ষণ সাদা কাগজের মতো শব্দহীন নীরবতা।

‘আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি আমি। পিএইচডি করতে। দুই বছরের ছুটি নিচ্ছি ইউনিভার্সিটি থেকে।’ নীরবতা ভেঙে বলে প্রিয়তা। কিছুক্ষণ রায়হানের মুখে কোনো কথা আসে না। চুপচাপ বসে থাকে দুজন।

কাজের লোক এসে চা-নাশতা দিয়ে যায়। রায়হান চায়ের কাপটা তুলে চুমুক দেয়। বলে, ‘বাসাটা ছেড়ে দিচ্ছি, আগামী মাসে। একা, অত বড় বাসা, দরকার তো নেই। তোমার জিনিসগুলো...’

‘একদিন গিয়ে নিয়ে আসব। চাবি তো একটা আছে আমার কাছে।’

কথা আর কিছুতেই আগায় না। একটা চাপা, গুমোট বাধা, অস্বস্তি। মাথার ওপর হালকা শব্দে ফ্যান ঘোরে। ঘরের পর্দার ওপাশে প্রিয়তার মায়ের নিঃশব্দ শীতল উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

‘আচ্ছা, উঠি তাহলে। তুমি এক্সিবিশন দেখতে যেয়ো কিন্তু।’

‘যাব।’

প্রিয়তা ছোট্ট করে বলে।

বাইরে বেরিয়ে বাইকে স্টার্ট দেবে মাত্র, এমন সময় নূরুল কবিরের মুখোমুখি হয়ে যায় রায়হান। ভদ্রলোক বাড়িতে ছিলেন না, বৈকালিক হাঁটা সেরে সবে বাড়িতে ফিরেছেন। রায়হানকে দেখেই হৈহৈ করে উঠলেন, ‘আরে মিয়া, কখন আসলা? চলে যাচ্ছ নাকি?’

‘জি। একটু কাজ আছে।’

‘প্রিয়তা? কথা হয়েছে প্রিয়তার সঙ্গে?’

‘জি।’ ছোট্ট করে উত্তর দেয় রায়হান। আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেটে পড়তে চায় শ্বশুরের সামনে থেকে। পকেট থেকে দ্রুত স্মার্টফোন বের করে আনেন নূরুল কবির।

‘তোমার ফেসবুক আইডিটা বলো তো তাড়াতাড়ি, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাব।’

মনে মনে প্রমাদ গোনে রায়হান। এই বৃদ্ধকে বন্ধু বানানোর কোনো খায়েশ আপাতত নেই তার।

‘জি, আপনি তো রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারবেন না, আমার পাঁচ হাজার বন্ধু হয়ে গেছে।’

‘অ, তাই নাকি? পাঁচ হাজার হয়ে গেছে? নাহ্, ফেসবুকের এই নিয়মটা একদম ভালো না। বন্ধু হবে আনলিমিটেড, যার যত ইচ্ছা সে তত বন্ধু করতে পারবে। জাকারবার্গকে একটা চিঠি লিখতে হবে। এক কাজ করো রায়হান, তুমি একজন বন্ধু কমিয়ে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাও। বুঝছ?’

‘জি, জি।’

‘তাড়াতাড়ি পাঠাবে। তাহলে তোমার সঙ্গে ফেসবুকেই কথাবার্তা বলতে পারব। জগত্টাই এখন ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। সামনাসামনি দেখা নাই, কথা নাই, অন্তর্জালে সব যোগাযোগ।’

‘জি, জি।’ বলে মাথা ঝাঁকিয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ে রায়হান।

 

 

আট

 

চিরবিদায়ের শিখা দাউদাউ করে জ্বলে

চরাচরজুড়ে তার লেলিহান আক্রমণে কত দ্রুত পুড়ে যায়

তোমার শরীরজোড়া গৃহস্থালি গান, মাটি পূর্ণ ভালোবাসা

শুধু পড়ে থাকে ছাই, যেন জ্ঞান, যেন শেষ কালো অট্টহাসি...

—রণজিৎ দাশ

 

সূর্যাস্তের সময় করতোয়া নদীর তীরে শ্মশানে দাউদাউ করে জ্বলছিল মহারাজা যজ্ঞেশ্বর রায়ের চিতা। আগুন আর ডুবন্ত সূর্যের আভায় রঙিন হয়ে উঠেছিল পশ্চিমের আকাশ। নির্মলের চোখে তখন শুধু ভাসছিল মহারাজার জীবন্ত চেহারাটা। গোলগাল ফর্সা শান্ত, কিন্তু হাসিখুশি একটা চেহারা, কপাল আর নাকজুড়ে শ্বেতচন্দনের তিলক আঁকা, সাদা ধুতি পরা মহারাজা মঠের ভেতর আসন পেতে বসে ভক্তদের গীতার ব্যাখ্যা পাঠ করে শোনাচ্ছেন, ‘কৃষ্ণ বলেছেন, মানুষ যেমন তার পুরনো কাপড় ছেড়ে নতুন কাপড় পরিধান করে, আত্মাও তেমনি তার পুরনো দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করে। দেহ একটি খোলসের মতো, এর ভেতরের আত্মা অপরিবর্তনীয় এবং অবিনশ্বর এবং এই আত্মা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ভিন্ন দেহ ধারণ করে থাকে।’

হায়, গুরুজির আত্মা কি তবে ধারণ করার মতো অন্য কোনো দেহ পেয়েছে? নাকি উনি যে মোক্ষ লাভ করার কথা বলতেন, বলতেন, এই ত্রিতাপদগ্ধ পৃথিবীতে    জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পেয়ে পরমাত্মার সান্নিধ্যে চলে যাওয়া, সেই কাঙ্ক্ষিত মোক্ষ কি শেষ পর্যন্ত লাভ করেছেন তিনি? প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অচিন অনন্ত স্বর্গলোকে? দূর থেকে তখনো মহারাজার ছোট বোন দীপালি রানীর আহাজারি শোনা যাচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে তার ভাইয়ের কথাই বলছিল দীপালি, ‘ও সোনার ভাই রে, তোক কোনঠে পাইম। পাইম না রে আর। ভেতরটা পুড়িয়া যায় রে, ও সোনা ভাই আজি ছাড়িয়া গেছে রে...’

দীপালি রানীর সোনা ভাই, নির্মলদের মহারাজা প্রভু গুরুজি যেভাবে সব কিছু ছেড়ে চলে গেলেন কিংবা তাঁকে যেতে বাধ্য করা হলো, তার মধ্যে স্বর্গীয় কোনো সুষমা ছিল না, বরং মহারাজা যাকে বলতেন দানবিক প্রবৃত্তি, সেই প্রবৃত্তির নির্মম বর্বরতার বলি হলেন তিনি। মহারাজার এমন মৃত্যু হবে, তা কি কেউ স্বপ্নেও ভেবেছিল?

একদিন আগের ফাল্গুন মাসের ঠাণ্ডা শান্ত সকালটার কথা মনে পড়ে নির্মলের। দেশের অন্য জায়গা থেকে শীত চলে গেলেও পঞ্চগড়ে তখনো সকাল আর রাতে হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা হালকা শীতের বাতাস বইতে থাকে। সেই আরামদায়ক বাতাসের মধ্যেই সোনাপাতা গ্রামে, দেবীগঞ্জ-বোদা সড়কের পাশে শ্রীশ্রী সন্ত গৌড়ীয় মঠের ছোট্ট মন্দিরে প্রতিদিনের মতো নিত্যপূজার প্রস্তুতি চলছিল। মহারাজার শরীরটা অবশ্য কয়েক দিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না। সর্দি, জ্বর, খুসখুসে কাশি। তবু সূর্যোদয়ের আগে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে ঈশ্বরের নাম জপ করে আবার হয়তো একটু শুয়েছিলেন তিনি। গোপাল এসে দরজায় একবার উঁকি দিয়ে দেখে আর মহারাজাকে ডাকেনি। মহারাজার জন্য রুটি তৈরি করতে প্রতিদিনের মতো রান্নাঘরে চলে গিয়েছিল। আটা নিতে গিয়ে দেখল, টিনের তলানিতে পড়ে আছে এক দিন চলার মতো আটা। কালই কিনতে হবে। এমনিতেই মঠ চালাতে মহারাজার কত টানাটানি হয়! ভক্তদের দানের টাকা আর কতই বা ওঠে? মঠের জমা-খরচের হিসাব রাখতে গিয়ে মহারাজা যে খানিকটা চিন্তিত, সেটা বুঝত গোপাল। মহারাজা অবশ্য মুখে বলতেন, ‘অর্থকষ্ট বড় কষ্ট নয় রে, মনের কষ্ট হচ্ছে বড় কষ্ট।’

টিন মুছে আটা থালায় ঢেলে পানি দিয়ে মাখতে শুরু করে গোপাল। গোপাল সংসারী মানুষ, স্ত্রী-পুত্র আছে, মহারাজার মতো গৃহত্যাগী, সংসারত্যাগী নির্লোভ চিরকুমার সন্ন্যাসী নয় সে। তবে ধর্মে মতি আছে তার। মহারাজার কাছে ধর্মকথা শুনতে ভালো লাগে। তাই স্বেচ্ছায় প্রভুর সেবা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। মহারাজার সকাল-বিকালের জলখাবার, দুপুরের নিরামিষ নিজের হাতে রেঁধে দেয় গোপাল। তার ভালো লাগে। মহারাজা কী সুন্দর করে বলেন, ‘ধার্মিক হতে চাও? সাধু হতে চাও? তাহলে মনের মলিনতা দূর করো। পেটে মল নিয়ে ভগবানের সেবা করা যায় কিন্তু মনে মল নিয়ে ভগবানের সেবা করা যায় না, আস্তিকতা দূর-অস্ত্। সাধু হওয়া তো আরো দূরের কথা...’

গোপাল জোরে জোরে আটা ডলতে থাকে। মহারাজা বলেন, যেকোনো কাজের শুরুতে কৃষ্ণ নাম জপ করতে হবে। কৃষ্ণ নামেই সব কার্য সিদ্ধি হবে। গোপাল আটা মাখা শেষ করে বেলন দিয়ে রুটি বেলতে শুরু করে আর জোরে জোরে গায়, ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ, শ্রী অদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ’। রুটি বেলতে বেলতে শরীরে একরকম জোশ এসে যায় গোপালের। তার গলার স্বরও মিষ্টি, মহারাজা পছন্দই করেন।  গোপাল গলা ছেড়ে আপন মনেই গাইতে থাকে ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু দয়া করো মোরে, তোমা বিনা কে দয়ালু        জগৎ-সংসারে...’

হঠাৎই কেমন একটা আর্তচিৎকারের শব্দ এসে কানে ধাক্কা খেলে গান থামিয়ে বাতাসে কান পাতে গোপাল। এই সকালবেলা কে এমন চেঁচায়? কান পেতে গলাটা চেনার চেষ্টা করে সে। এবার আবার সেই রকম একটা প্রচণ্ড মরণ চিৎকার। এবার সত্যিই চমকে উঠল গোপাল। এ তো মনে হচ্ছে মহারাজার গলা। শরীরটা খারাপ করল? রুটি বেলা বন্ধ করে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো সে। তখনই দেখতে পেল তাদের। দুইটা অপরিচিত লোক। কালো প্যান্ট পরা, গায়ে টুপিওয়ালা জ্যাকেট, মাথাটা ঢাকা। কারা এরা? এ গ্রামের কেউ তো নয়। গোপাল দেখতে পায়, একটা লোক টিনের ঘরের বারান্দায় ফেলে চাপাতি দিয়ে মহারাজাকে কোপাচ্ছে, আরেকটা লোক পিস্তল উঁচিয়ে ধরেছে গোপালের দিকে। মুখ বিকৃত করে বলছে, ‘খুব আনন্দে আছস? গান গাইস? কিষণো? কিষণো?’

গোপালের মুখে আর রা সরে না। পা দুটোও যেন পাথর হয়ে জমে গেছে। কী হচ্ছে এসব? হাতে পিস্তল ধরে রাখা লোকটা এবার সত্যিই ট্রিগারে টিপ দেয়। ‘গুড়ুম’ ‘গুড়ুম’ শব্দ হয়। গোপাল বুঝতে পারে, লোকটা সত্যি সত্যিই গুলি ছুড়েছে তার দিকে। এবার হয়তো আত্মরক্ষার তাগিদেই চট করে হাত দুটো দিয়ে মাথা আড়াল করে নিচু হয়ে বসে পড়ে গোপাল। বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে তখন কেমন একটা ধাক্কার মতো লাগে। তারপর মনে হয়, দুই হাতে যেন কোনো সাড়া নেই তার। অচেনা লোকটা আবার পিস্তল উঁচু করে ধরে তার দিকে। ট্রিগারে টিপ দেয়, কিন্তু এবার আর পিস্তল থেকে কোনো গুলি বের হয় না। মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপারটা ধরতে পেরে উল্টা দিকে খিঁচে দৌড় দেয় গোপাল। সামনের বাজারে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে সে, ‘মাইরে ফেলল রে, মহারাজারে কোপায়ে মাইরে ফেলল...’

হৈচৈ শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল নির্মলের। সে মন্দিরের দিকে ছুটে এসে দেখতে পায় দুটো লোক দৌড়ে সড়কের দিকে যাচ্ছে। সেখানে একটা মোটরসাইকেলে বসে ছিল একজন। মন্দির থেকে দুজন দৌড়ে এসে মোটরসাইকেলের পেছনে বসলে এক টানে মোটরসাইকেলটা পঞ্চগড়-বোদা সড়কের দিকে চলে যায়। যাওয়ার আগে রক্তমাখা চাপাতিটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে যায় ওরা। নির্মল মঠে এসে দেখতে পায় ছোপ ছোপ রক্তের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন তাদের সবার প্রিয় মহারাজা অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়। বাজারের লোকজন এসে গেছে তখন। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশও এলো। আরো কত কত বড় বড় অফিসার এলেন। মহারাজার লাশ নিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে এলাকার এমপিও এলেন। গম্ভীর হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বললেন তিনি, ‘কিছুসংখ্যক সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে, যারা ষড়যন্ত্র করছে। না, ধর্মের কথা ভেবে এসব করছে বলে মনে হয় না। আসলে তারা দেশে অশান্তি করতে চায়। বিদেশিদের কাছে আমাদের সুনাম নষ্ট করতে চায়।’

মহারাজার চিতার আগুন প্রায় নিভে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাহ শেষের অবশিষ্টাংশ করতোয়ার জলে বিসর্জন দিতে হবে। এভাবেই হয়তো মহারাজার দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে। নির্মলের মনে হয়, মহারাজার দেহের না হয় মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর অবিনাশী আত্মা নিশ্চয়ই আশপাশেই আছে। সেই আত্মা কি খুনিদের অভিশাপ দিচ্ছে? খুনিরা কি কোনো দিন ধরা পড়বে? নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে? কখনো কি জানা যাবে, এই খুন করে তাদের কী লাভ হলো?

‘অকল্যাণের মৃদু হাওয়া বয়ে চলেছে, টের পাই। অস্থির পাতা ও ফুলেদের প্রবোধ দিয়েছে সেই অন্ধকারের হাওয়া, যেন তারা আকুল না হয়, যেন তারা বুঝতে পারে, যেকোনো গৃহ থেকে শ্মশান খুব দূরের পথ নয়।’ —গৌতম বসু

 

নয়

 

আলিয়ঁসে বিকেল ৪টায় ছিল রায়হানের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রদর্শনীর নামটা একটু পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ‘জাগরণের দিনগুলি’। সৌম্য আলিয়ঁসের ডিরেক্টরকে বলে রেখেছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। রায়হান কোনো রাজনৈতিক লোককে এখানে রাখতে চায়নি। তাই সে তার ফটোগ্রাফির গুরু স্বল্পভাষী নিভৃতচারী মিজানুর রহমান ভাইকে প্রধান অতিথি করেছিল, আর এখন যে দৈনিকে সে ফ্রিল্যান্স করে, সেই পত্রিকার সম্পাদক মহসীন হোসেন ছিলেন বিশেষ অতিথি। সবাই বলে, মহসীন ভাইয়ের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই, যেদিকে বৃষ্টি পড়ে সেদিকেই চমৎকার করে ছাতা ধরতে পারেন তিনি। মহসীন ভাই সব সময় বলেন, প্রফেশনালদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে নেই। যদিও সবাই জানে, পর্দার আড়ালে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মহসীন হোসেনের ভালোই বোঝাপড়া আছে, যদিও তিনি কখনোই তা প্রকটভাবে প্রকাশ করেন না। সে যাকগে, ভদ্রলোক নিজে যেচে রায়হানকে তাঁর কাগজে কাজ দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতাবশত তাঁকে এই সম্মানটুকু দেওয়া যায় বৈকি। ছোট্ট অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তারপর ফিতা কেটে হলে ঢোকা। সৌম্য মিতালিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সে এলো চারটা বাজার কিছুটা আগেই। বেশ সেজেগুজে এসেছে, সেলিব্রিটিরা যেমন কোথাও আসে তেমন ভাবভঙ্গি চেহারায় ফুটিয়ে। প্রিয়তাও এলো, খোলা চুল, মেরুন রঙের একটা শাড়ি পরে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর।

অতিথিদের তিনজনই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেন। একটা ছবি যে হাজারটা শব্দের চেয়েও বেশি মূল্যবান, সেই পুরনো কথাটাই বললেন। বললেন, একটা উত্তাল সময়কে ফটোগ্রাফির মাধ্যমে চমৎকারভাবে ধরে রাখা সম্ভব।

সব শেষে রায়হান বলল ছবিগুলোর পটভূমি নিয়ে, ‘গণজাগরণ মঞ্চ বাংলাদেশের তরুণদের কাছে হয়তো একটা অভিনব জাগরণই ছিল। কারণ শাহবাগের এই জমায়েতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিল লাখো মানুষ, যা সত্যিই ছিল অভূতপূর্ব। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাই যদিও এর মূল লক্ষ্য ছিল, তবু আরো গভীর অর্থে এটি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সাম্যের দাবিকে সামনে তুলে এনেছিল। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, আর আমার মতো একজন ফটোগ্রাফারের জন্য এই ব্যতিক্রমী সময়কে বিষয় হিসেবে ধরে রাখার একটা সুযোগ।’

অতিথিরা ফিতা কেটে গ্যালারিতে কিছুক্ষণ ছবি দেখেটেখে কফি খেয়ে বিদায় নেওয়ার পর রায়হানের ফুরসত হলো প্রিয়তার খোঁজ নেওয়ার।

‘থ্যাংক ইউ, তুমি এসেছ, খুব খুশি হলাম...’ গলা নামিয়ে প্রিয়তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল রায়হান।

উত্তরে মৃদু হাসল প্রিয়তা, ‘সবই তো আমার দেখা আর চেনা ছবি।’

‘হুম।’

‘আচ্ছা, ওই ছবিটা রাখো নাই? ওই যে একই ফ্রেমে একটা বাচ্চা, একটা ইয়াং ছেলে আর একটা বয়স্ক লোকের ছবি ছিল...আমার ফেভারিট’, প্রিয়তা বলল।

‘রাখছি তো, ওই যে...’, রায়হান দেখাল।

‘আরেকটা আছে, ওই যে, যেদিন সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো হলো, হাজার হাজার আলোর বিন্দু...’

‘ওটাও আছে। ওই দিকে দেখো...’

কাকতালীয়ভাবে সৌম্য আর মিতালি তখন ওই বিশেষ ছবিটার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। আর সেদিকে চোখ পড়তেই চেহারাটা কেমন শক্ত হয়ে উঠল প্রিয়তার। কিন্তু সৌম্য আর মিতালি হাসিমুখেই এগিয়ে এলো ওদের দিকে। সৌম্যকে প্রিয়তা আগে থেকেই চিনত। কুশল  বিনিময় করল তারা।

‘মিতালির সঙ্গে পরিচয় নেই বোধ হয়’, সৌম্য বলল। তারপর পরিচয় করিয়ে দিলো দুজনকে। প্রিয়তা ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক হাসি ঝুলিয়ে মাথা ঝাঁকাল। মিতালি বলল, ‘খুব সুন্দর ছবি তোলেন রায়হান ভাই, আমি অত কম্পোজিশন, লাইট, কালার বুঝি না, তবু হৃদয় দিয়ে যেটা বুঝলাম, সত্যি অপূর্ব।’

‘যেকোনো শিল্প হৃদয় দিয়ে বোঝাটাই আসল। হৃদয়ে দাগ না কাটলে তুমি কোনো কাজ মনে রাখবে কিভাবে?’ সৌম্য বলল।

‘আসলে চেষ্টা করেছি। সত্যি বলতে কি এই কাজটাকে খুব ভালোবাসি আমি, মন দিয়ে করি’, রায়হান বলে।

‘না, দেখো, আজকাল অনেকেই ফটোগ্রাফি করে, কিন্তু শুধু করলেই তো হবে না, ফটোগ্রাফি করতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়, সাবজেক্টের ওপর মনোযোগ দিতে হয়। লাইট, ফোকাস, ক্যামেরার সেটিংস, অ্যাঙ্গেল—এসব বুঝতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, একটা নান্দনিক বোধ থাকতে হয়’, সৌম্য বলে।

হঠাৎই ছটফট করে উঠল প্রিয়তা। বলল, ‘আমার এক্ষুনি যেতে হবে। একটা কাজ আছে।’

‘বলেন কী? এমন একটা স্পেশাল দিনেও আপনার কাজ? আজকে দুজন মিলে সেলিব্রেট করেন! কী কাজ, পরীক্ষার খাতা দেখবেন নাকি?’ সৌম্য ঠাট্টার সুরে বলল। কিন্তু তার কথার কোনো উত্তর দিল না প্রিয়তা। বরং ‘না। আমার যাওয়াই লাগবে, যাই’, বলে হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল সে। সৌম্য আর মিতালি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল একবার, একটু অপ্রস্তুতই হলো রায়হান। কিন্তু কীই-বা করবে সে? প্রিয়তা বরাবরই এ রকম।

‘মান-অভিমান চলছে নাকি?’ সৌম্য জিজ্ঞেস করলে রায়হান হাত নেড়ে বলল, ‘বাদ দেন তো। চলেন, কফি খাই।’

কফি শেষ করতে করতে রাত প্রায় ৯টা, গ্যালারি বন্ধ হওয়ার সময় এসে গেল। সৌম্য আর মিতালি বিদায় নেওয়ার পর, যদিও আজ তার ডে অফ তবু অফিসে একটা ঢুঁ মারার কথা ভাবল রায়হান। ওর পত্রিকার রিপোর্টার এসেছিল। নিশ্চয়ই প্রদর্শনীটার ওপর লিখেছে, কী লিখল, একটু দেখে আসা যাবে। এই কথাটা ভেবে একটু লজ্জাই লাগল রায়হানের। প্রিয়তা যে বলে, ‘বাইরে তুমি যতটা নির্লিপ্তর ভাব দেখাও, ততটা নির্লিপ্ত বা নির্মোহ আসলে নও তুমি। ভেতরে ভেতরে তুমিও লিপ্ত হতে চাও, তুমিও মোহগ্রস্ত হও। বাইরের চেহারাটা তোমার মুখোশ। তুমি আসলে দুই চেহারার মানুষ।’

রায়হানের চরিত্র নিয়ে আরো কত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল তার। বলত, ‘তোমার সমস্যা হচ্ছে, তুমি গভীর হীনম্মন্যতায় ভোগো। সব কিছুতে যে উদাসীনতা দেখাও, সেটা আসলে তোমার পরাজিত মনোভাবের প্রকাশ। সব সময় পালাতে চাও, নিজেকে প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করো।’

প্রিয়তার কথা মনে হওয়ায় কিছুক্ষণ আগে তার নাটকীয় চলে যাওয়ার কথাও মনে পড়ে, আর মনটা খারাপ হয়ে যায় রায়হানের। এত অশান্তি করতে পারে মেয়েটা! এই যে এত মানুষের সামনে তাকে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে গেল সে, কাজটা কি ঠিক করল? ‘অশান্তি আজ হানল এ কী দহন জ্বালা, বিঁধল হৃদয় নিদয় বাণে বেদন-ঢালা’, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার গানটা মনে পড়ে তার।

অফিসের ক্রাইম রিপোর্টার রিয়াজের ফোনটা আসে তখনই।

‘ফ্রি আছেন নাকি, রায়হান ভাই?’

‘আছি। কেন?’

‘লক্ষ্মীবাজারের দিকে আসেন, আমিও যাইতেছি। একটা মার্ডার হয়েছে, কিছুক্ষণ আগে...’

‘মার্ডার?’

‘হুম, জগন্নাথ ভার্সিটির ছাত্র। এই পর্যন্তই জানি।’

 

 

দশ

 

শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই সুমি রান্নাঘরে ঢুকল। আপা-দুলাভাই ছোট ভাগ্নেটাকে নিয়ে অফিসের পিকনিকে গেছে। বাসায় শুধু সুমি আর জুলেখা। আগে থেকেই জুলেখাকে পাঠিয়ে বাজার থেকে চ্যাপা শুঁটকি আনিয়ে রেখেছিল রুমি। এখন নিজ হাতে সেটা রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। নাজিম বলেছে, ওদের সিলেটে চ্যাপা শুঁটকিকে হিদল শুঁটকি বলে। আর সেই হিদল শুঁটকি নাকি ওর খুব প্রিয় খাবার। সুমি ঠিক করেছে, নাজিমকে নিজ হাতে হিদল শুঁটকি ভর্তা আর হিদল আলু রান্না করে খাওয়াবে। নাজিম খুব চমকে যাবে নিশ্চয়ই। সুমি তো তাকে চমক দিতেই চায়। জুলেখা একটু অবাকই হয়েছে সুমির কাজ-কারবার দেখে। সে রান্নাঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে বলে, ‘ও ছুট্টুপা, আপনে পারবেননি রানতাইন? আমারে কইন, আমি রাইনদা দেই।’

‘না, আমিই রানমু। তুমি চাইর-পাঁচটা শুঁটকি নিয়া ভালো কইরা ধুইয়া দেও। একটা আঁইশও যাতে না থাকে। পরিষ্কার করে ধুবা।’

‘আপনের কিতা আতকা হিদল খাওনের মন চাইছেনি ছুট্টুপা?’

সুমি হাসে। ‘আমি তো খাবই, আরেকজনকে খাওয়াবও। শোনো, তুমি একটু বেশি করে পেঁয়াজ-রসুন কাটো, আর রসুনটা একটু শিল-পাটায় ছেঁচে দেও। সঙ্গে কালাজিরা চালের একটু ভাত রাঁধো তো।’

‘কারে খাওয়াইবাইন গো আফা?’

‘আমার বন্ধু আছে একজন, তারে খাওয়ামু। দুপুরবেলা খাবার নিতে আসবে, তখন দেইখো। এখন সরো, আমি রান্না শুরু করি।’

সুমি চুলায় কড়াই বসিয়ে তেল গরম করে। তারপর তাতে পেঁয়াজ কুচি আর রসুন ছেঁচা ঢেলে অনেকক্ষণ নাড়ে। যখন পেঁয়াজ-রসুন কালচে বাদামি রং ধরে, তখন তাতে হলুদ-মরিচের গুঁড়া আর লবণ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কষায়। সবশেষে সেই বাদামি মিশ্রণে হিদল শুঁটকিগুলো ছেড়ে দেয় সে। এরপর আবার অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করে যখন পুরোটার রং গাঢ় বাদামি হয়ে পেঁয়াজ আর মসলা থেকে তেল আলাদা হয়ে ভেসে ওঠে তখন রান্নাটা চুলা থেকে নামায় সে। চারদিকে তখন শুঁটকির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের আঁচে সুমির নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সেদিকে তাকিয়ে হাসে জুলেখা। বলে, ‘ছুট্টুপা, আপনে স্বামীর আদর পাইবাইন, আপনের নাক ঘামে।’

সুমি একটু লজ্জা পায়। সে জুলেখাকে একটা ধমক লাগায়, ‘এসব আজাইরা কথা বাদ দিয়া, হিদল আলুর তরকারিটা বসাও তো। আমি একটা ফোন করে আসি।’

ঘামটাম মুছে নাজিমকে ফোন করে সুমি। অনেকক্ষণ রিং বাজার পর মহারাজের সময় হয় ফোনটা ধরার।

‘কিবা, ঘুম ভাঙছেনি?’

ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো চোখে সাড়া দেয় নাজিম।

‘শোনেন জনাব, আপনার জন্য লাঞ্চ রেডি করেছি, দয়া করে দুপুরে এসে নিয়ে যায়েন।’

আর কোনো কথা না বলে সুমি ফোন ছেড়ে দিলে আড়মোড়া ভেঙে ঘুমভাব কাটিয়ে বিছানায় উঠে বসে নাজিম। বেশ বেলা হয়েছে, রুমের জানালার পর্দা ভেদ করে রোদের আলো এসে ঢুকছে। নাজিমের চোখে পড়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সময় নির্দেশক ১১-৩০ লেখা ভাসছে। আবার কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে উঠে পড়ে ও। গোসল করবে। তারপর সুমিদের বাসায় যাবে খাবার আনতে। আজকে আর ব্রেকফাস্ট নাই, একেবারে লাঞ্চ অথবা ব্রাঞ্চ।

প্রায় সাত মাস হয়ে গেল লক্ষ্মীবাজারের এই কাজিটুলা মেসে আছে নাজিম। একটা পাঁচতলা বাড়ির ছাদের ওপর দুই রুমে সাতজন মেস করে থাকে। সিলেট থেকে ঢাকা এসে জগন্নাথের আইন বিভাগে ইভিনিং শাখায় ভর্তি হওয়ার পরপরই এই মেসে উঠেছিল নাজিম। ওর বন্ধু সোহেলই খবর দিয়েছিল এই মেসটার। বাসিন্দাদের বেশির ভাগই ছাত্র। দুজন ছোটখাটো চাকরি করে, একজন পড়ালেখা শেষ করে চাকরি খুঁজছে। নাজিমের রুমে চারটা সিট, মানে চারটা বিছানা। নাজিমের সিট জানালার পাশ ঘেঁষে, যে কারণে আলো-বাতাসটা ভালোই আসে। নাজিম দেখল, তার রুমের দুটো বিছানা খালি। অর্থাৎ রুমমেটরা উঠে পড়েছে, শুধু কোনার দিকের সিটে জসিম ঘুমাচ্ছে।

নাজিম উঠে বাইরে গেল। রান্নাঘরে বুয়াকে বলল যাতে ওর জন্য ভাত না রাঁধে। আজ মেসের খাবার খেতে হবে না, এটা ভাবতেই ভালো লাগে ওর। পোড়া ভাত, হলুদের গন্ধযুক্ত মাছের তরকারি, ঝাল-মসলা ছাড়া কাঁচা গন্ধের মুরগির মাংস, ট্যালটেলে পাতলা ডাল, লবণ দিয়ে তিতা বানিয়ে রাখা ভর্তা-ভাজি খেয়ে মুখের টেস্টটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

দুপুরে সুমির বাসা থেকে আনা খাবারটা অমৃতের মতো লাগল। জসিমও ঘুম থেকে উঠে নামাজ শেষে নাজিমের সঙ্গে বসেই খেলো। ঝাল খানিকটা বেশি হলেও স্বাদটা জিভে লেগে রইল নাজিমের।

‘খুব ভালো খাইলাম। সুবাহান আল্লাহ। কে রানছে?’ জসিম জানতে চাইল।

‘আমার বান্ধবী সুমি। খুব ভালো একটা মেয়ে।’

‘মাশাল্লাহ, রান্নার হাত খুব ভালো। ভবিষ্যতে বিয়াশাদি করলে খাবারদাবারে শান্তি পাবেন।’

জসিমের কথার উত্তরে নাজিম আর কিছু বলে না। সুমি খুব আবেগী মেয়ে, ভালো বন্ধুও; কিন্তু বিয়েশাদি নিয়ে কোনো কথা হয়নি ওদের মধ্যে। আসলে প্রচলিত বিয়েব্যবস্থায় আস্থা নেই নাজিমের। যেমন আস্থা নেই প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসেও। কথায় কথায় সুমিকে এসব বলেছেও সে। সুমি চোখ বড় বড় করে জানতে চেয়েছে, ‘তুমি কি তাহলে নাস্তিক?’

‘নাস্তিক? হ্যাঁ, বলতে পারো। দেখো, আমি আসলে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস মানতে পারি না। আমার কাছে মনে হয়, ধর্মগুলো মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, কার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, কারটা সত্য, এসব নিয়ে মানুষে মানুষে হানাহানির শেষ নেই। তুমি তো জানো, আমার অনেক বন্ধু হিন্দু, অনেকে কঠিন মুসলমান, কিন্তু তাদের প্রতি আমার কোনো ঘৃণা নাই। আমি বিশ্বমানবতার পক্ষে। উগ্র ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপক্ষে।’

নাজিমের এসব কথা শুনে অন্য মেয়েরা যেভাবে আঁতকে ওঠে, তাকে এড়িয়ে চলে কিংবা ওয়াজ নসিহত করে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চায় বা ঘৃণার চোখে তাকায়, সুমি সেসব কিছুই করেনি। বরং এর পরও সে খোঁজখবর রাখে, খাবারদাবার পাঠায়। নাজিম সুমির প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা বোধ করে।

আসলে কলেজে পড়ার সময় থেকেই ধর্মের অমানবিক দিকগুলো দেখে বিশ্বাস হারায় নাজিম। বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে মিশে সে-ও শেখে, শোষিত মানুষের কাছে ধর্ম আফিম। ধর্ম শাসকশ্রেণির হাতিয়ার, যা দিয়ে তারা জনগণকে বোঝাতে চায়, বর্তমান দুঃখ-দুর্দশা মেনে নিতে হবে, এর সমাধানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়ার দরকার নেই। নাজিমের মনে হয়, মানুষ যেদিন ধর্ম থেকে মুক্তি পাবে, যেদিন মানুষ প্রকৃত বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের আলোয় ধর্মের অযৌক্তিক-কুযৌক্তিক, অন্ধকারের বিষয়গুলো নিজের ভেতর থেকে দূর করতে পারবে, সেদিনই মানুষ তার ভেতরের কল্পনার সহজ-স্বাভাবিক সুন্দর জীবনকে পরিচালনা ও উপভোগ করতে পারবে।

সুমি মাঝেমধ্যে বলে, ‘তোমার জন্য ভয় হয় নাজিম। একটু সাবধানে থেকো। দেখতেই তো পাচ্ছ, কী হচ্ছে চারদিকে। সাবধানে থেকো।’

নাজিম বলে, ‘ভয় আমার নিজেরও হয়, সুমি। অকালে মরে যাওয়ার ভয়। কিন্তু কী করব বলো। মাথা নত করে চুপ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে এ মরণই বোধ হয় ভালো।’

সুমি বলে, ‘দেখো, আমি জানি তুমি স্রোতের প্রতিকূলে চলতে ভালোবাসো। পরিবর্তন চাও, কিন্তু সময়টা ভালো না। কয়েক দিন ফেসবুক থেকে দূরে থাকো। ফেসবুকে ধর্ম নিয়া লেখালেখি বন্ধ করো। আর ঢাকা থেকে চলে যাও। কয়েকটা দিন গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসো।’

নাজিম নিজেও এমনটাই ভাবছিল। কয়েক দিন ধরেই ওর ইনবক্সে হত্যার হুমকি দিয়ে বিভিন্ন রকম মেসেজ আসছে। অকথ্য গালাগাল তো আছেই। কখনো লিখছে, ‘আগামী কিছুদিনের মধ্যে জাহান্নামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হ শয়তান।’ কখনো লিখছে, ‘ইসলামবিদ্বেষী কাফির, তোর রেহাই নাই। তোর রক্ত দিয়া গোসল করুম।’ ‘ওরে নাস্তিক কুকুর, তোর দিন শেষ হয়ে এসেছে, মৃত্যু অতি সন্নিকটে।’

সত্যি বলতে কি, ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের তো বিশ্বাস নেই। রাজীব, অভিজিৎ, বাবু, নিলয়দের ভক্ত হলেও আপাতত মৃতদের তালিকায় নিজের নাম লেখানোর ইচ্ছা নেই নাজিমের।

বরং এই যে ছয় মাস ধরে সিনিয়র অ্যাডভোকেটের সঙ্গে প্রবেশনারি হিসেবে কাজ করছে, সেটাতে বেশ আনন্দই পাচ্ছে সে। নিজের চেষ্টায় তিনটা মামলা ধরেছে। এখন যদি এমএ ডিগ্রিটা হয়ে যায় আর বার সার্টিফিকেটটা পেয়ে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে নিজেকে আরো দক্ষ করে তোলা সম্ভব হবে। যখন এই পেশায় নাজিম আরো ভালো করবে, আয়-রোজগার বাড়বে, তখন অসহায়-নির্যাতিত মানুষকে আইনগত সহায়তা দেওয়ার ইচ্ছা আছে তার। যদিও ওর দুই ভাই যারা বিদেশে থাকে, মানে লন্ডনে থাকে, তারা ওকে বলেছে বিদেশে যেতে, কিন্তু মা আর ছোট বোনটাকে রেখে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা নেই নাজিমের।

মায়ের কথা মনে হওয়ায় গ্রামের কথা মনে পড়ে। কেমন আছে আমার ছোট্ট গ্রামখানি? নিশ্চয়ই এই বসন্তে পাতাবিহীন গাছগুলোতে ছোট ছোট সবুজ পাতা বেরিয়ে এসে নতুন প্রাণের জন্ম দিচ্ছে।

আহ্ আমার হৃদয়, মন-মগজের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে থাকা গ্রাম! আমার প্রকৃতি মা। কত দিন তোমায় দেখি না!

পরদিনই ‘বিদায় মহানগরী। দেখা হবে বারংবার’ বলে সিলেটের পথে রওনা দেয় নাজিম। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, ‘আর কিছু লিখব না। আর এখানে থাকব না। তোমাদের নরক তোমাদেরই থাক। এই নরকে পড়ে সবাই জ্বলেপুড়ে মরে যাক। তবু কিছু বলব না। তবু কিছু লিখব না। এখানে জীবনের দাম নেই। যেমন নেই ওই অসভ্য জঙ্গিদের কাছে, তেমন নেই এই সভ্য সরকারের কাছে।’

বিয়ানীবাজারে গ্রামের বাড়িতে টানা ১০ দিন কাটিয়ে দিল নাজিম। ফেসবুক ছাড়া। মা অসুস্থ ছিল, নাজিমকে এ কয়েক দিন কাছে পেয়ে যেন একটু সুস্থ হয়ে উঠল। ছোট বোন নাছিমা, বড় আপা পারুল আর তার বাচ্চাকাচ্চা, ফুফাতো-চাচাতো ভাই-বোন, তাদের ছেলে-মেয়ে মানে নানা বয়সী একপাল ভাগ্নে-ভাতিজার সঙ্গে গল্পগুজব করে, কিচ্ছাকাহিনি বলে আর শুনে একেবারে মন্দ কাটল না তার।

মাঝখানে একদিন শুধু সিলেট শহীদ মিনারে গিয়েছিল নাজিম, ওর বন্ধু রাব্বি ফোন করেছিল যাওয়ার জন্য। ওখানে কী একটা অনুষ্ঠান ছিল, তাই। শহীদ মিনার চত্বর বরাবরই খুব প্রিয় জায়গা নাজিমের। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে এখানেই গণজাগরণ মঞ্চের কার্যক্রম শুরু করেছিল ওরা। এর আগে, জানুয়ারিতে শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য বানানো নিয়ে ঝামেলা শুরু হলো। অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তখন ওসব নিয়েও লিখেছিল নাজিম। সিলেট জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিল সে। নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মনে করত সে। তবে ফেসবুকে হয়তো একটু কড়াভাবেই লিখতে পছন্দ করত নাজিম। কোনো রাখঢাক ছাড়াই সে লিখেছিল, ‘জামায়াত-শিবির নির্মূল না হলে এ দেশে কেউ নিরাপদ নয়।’ আর তার পরই কাদের মোল্লার বিচারের রায় হলো। নাজিম তো আগে থেকেই যুদ্ধাপরাধী আর রাজাকারদের বিচারের দাবি নিয়ে ফেসবুকে লিখত। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে এক হওয়ার জন্য নাজিম আর ওর বন্ধুরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শহীদ মিনারে জড়ো হওয়ার ডাক দিয়েছিল। বিকেলে শহীদ মিনারে মিছিল হলো, সমাবেশ হলো। রাতে বাসায় ফিরে অনলাইন আর টেলিভিশন দেখে শাহবাগের ঘটনা জানল নাজিমরা। তার পরই তো ফেসবুকে ইভেন্ট খোলা হলো। পরদিন দুপুর থেকেই    দু-একজন করে মানুষ, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শহীদ মিনার চত্বরে এসে জমা হতে শুরু করে। বিকেল হওয়ার আগেই কোথা থেকে যে এত মানুষ এলো, কে জানে! লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল এই শহীদ মিনার চত্বর। মাইক এলো, স্লোগান শুরু হলো, প্রতিবাদী গান, বক্তৃতা, আবৃত্তি চলতে থাকল। নাজিম মাথায় লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা বেঁধে গিয়াস ভাইকে বলল, ‘বুকে-পিঠে স্লোগান লিখে দেন।’ গিয়াস ভাই লাল রং দিয়ে তার উদোম শরীরে লিখে দিল ‘রাজাকার নিপাত যাক’।

সেদিন রাতেই ফেসবুকে এই ছবি পোস্ট করল নাজিম। কিন্তু তখন সে জানত না, বছর তিনেক পরেই তার এই ছবিটা ফেসবুকে ভাইরাল হবে। আর খুন হওয়া অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে তার নামটাও জুড়ে যাবে।

শহীদ মিনারে রাব্বি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিবা, তুমারে যে ফেইসবুকোত আর দেখি না। বিপ্লব শেষ অইয়া গেল নি?’

‘অয়, অকটু চাপো আছি। অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাকটিভ করি রাখছি।’

কিন্তু খুব বেশি দিন নীরব থাকেনি নাজিমুদ্দিন সামাদ। আসলে তার পক্ষে নীরব থাকা সম্ভব হয়নি। থাকতে পারেনি। অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর সে লিখল, ‘অভিজিৎ, তুমি চোখের আড়ালে তবু মনের আড়ালে নও। এ পৃথিবীতে না থেকেও চুপিসারে কথা কও, রক্তে তুমি বও।’

যখন ওয়াশিকুর বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো, তখনো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নাজিম। লিখেছে, ‘আজকে ফেসবুকে ঢুঁ মেরে দেখি, ওয়াশিকুর বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে মৌলবাদী তথা ধার্মিকরা। আমার সব সংকল্প, সব স্বপ্ন ম্লান হয়ে গেল! যে দেশে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখা, অবস্থান করা, দেশপ্রেম দেখানো বিরাট বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাণী হিসেবে প্রাণ রক্ষাই যদি না হয় তবে মানুষ হিসেবে মান রক্ষা হওয়া তো অসম্ভব।...এভাবে কতজন নাস্তিক তোমরা মারবে? কতটা রক্ত পেলে তোমরা শান্তির ধর্মের মানুষ হবে?’

নিলয় নীলের মৃত্যুতে নাজিমের বক্তব্য, ‘অসভ্য জানোয়ারেরা আজ মরণ কামড় বসিয়েছে সুসভ্যদের ওপর।’

দেখা যাবে নাজিমের মৃত্যুর পর ‘এনিগম্যাটিক জিহাদ’ ছদ্মনামে তার গুণমুগ্ধদের মধ্যে কেউ একজন দুঃখ করে লিখবে, ‘জানি না সামাদ ভাই, তুমি কখনো বিচার পাবে কি না। কেউ পায় নাই। অভিজিৎ দা, বাবু ভাই, নিলয় নীল, অনন্ত বিজয়, রাজীব ভাই—কেউই বিচার পায়নি। এক শ্রেণির মানুষ তোমাদের মৃত্যুর খবর পেয়ে বলে, ভালো হয়েছে। তারা কি মানুষ? আমি তাদের চোখে আঙুল দিয়ে বলে দেই, এই তোমাদের গণতান্ত্রিক মনোভাব, এই তোমাদের মানবতা? আর তোমাকে মেরে যেসব শূকরশাবক নিজেকে খুব পালোয়ান ভাবছে, তারা মোটেও পালোয়ান না, তারা কাপুরুষ। ’

আরো দেখা যাবে, নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার পর আরেক দল সত্য উন্মোচনের নামে লিখবে, ‘কোনো ইসলামপন্থী দল, কিংবা জঙ্গিদের বিরোধিতার জন্য নয়, নিছক নাস্তিক হওয়ার কারণেও নয় বরং ইসলাম অবমাননার কারণেই নাজিমুদ্দিনকে হত্যা করার সম্ভাবনাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এই ইসলামবিদ্বেষী অভিশপ্ত জীবকে হত্যা করেছেন এবং বিশ্বাসীদের অন্তরসমূহকে শীতল করেছেন। শান্তি বর্ষিত হোক ওই নাম না-জানা আল্লাহর সৈনিকদের ওপর, যাদের মাধ্যমে আল্লাহ এই নাজিমুদ্দিনকে হত্যা করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর ওপর শক্তিশালী।’

২৬ বছর বয়সী হতভাগ্য তরুণ নাজিমুদ্দিন সামাদ মৃত্যুর আগের দিন তার সবশেষ স্ট্যাটাসে দেশের   আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সরকারকে সতর্ক করে লিখেছিল, ‘সরকার, এবার একটু নড়েচড়ে বসো বাবা। দেশের যা অবস্থা, আইন-শৃঙ্খলার যা অবনতি, তাতে গদিতে বেশি দিন থাকা সম্ভব হবে না। জনরোষ বলে একটা কথা আছে। এটার চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে না চাইলে এক্ষুনি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। নতুবা দিন ফুরিয়ে আসবে খুব দ্রুত।’

নাজিমুদ্দিন হয়তো জানত না, বাস্তবে তারই দিন ফুরিয়ে এসেছিল।

সেদিন ছিল ৫ এপ্রিল। ১৬ এপ্রিল গাজীপুরে ওদের পিকনিক। ক্লাসের পর তা নিয়েই আলোচনা করছিল সবাই। একটা র্যাফল ড্র রাখা যায় কি না, সেসবের উপহার কী হবে ইত্যাদি। হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একটা চায়ের দোকানে এসে বসেছিল ওরা ১০-১২ জন। চা শেষ হলে আলোচনাও ফুরিয়ে আসে। যে যার বাসার দিকে রওনা দেয়। নাজিম আর সোহেল হাঁটতে থাকে গেণ্ডারিয়ার দিকে।

‘এই মাসে আমাকে মেসের ম্যানেজার বানাইছে। জানস, এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থা মেসে। এর মধ্যে কয়েকজন আছে, ঠিকমতো টাকা দেয় না। কী যে বাজে অবস্থা...’

নাজিম বলছিল। রাত তখন সাড়ে ৮টা বাজে। হাঁটতে হাঁটতে দুই বন্ধু সূত্রাপুরের একরামপুর মোড়ে চলে আসে। আর কিছুদূর এগোলেই নাজিমের মেস। সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। মানুষজন চলাচল করছিল চারপাশে। ওরা দুজন হৃষীকেশ দাস সড়কে উঠতেই হঠাৎ পাশ থেকে দুই তরুণ হেঁটে তাদের সামনে আসে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন নাজিমের মাথায় বসিয়ে দেয় চাপাতির কোপ। মুহূর্তেই সুবর্ণা টেইলার্সের সামনের রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে নাজিম। সোহেল ভয় পেয়ে দৌড়ে রাস্তার অন্য পারে চলে যায়। মাটিতে পড়ে থাকা নাজিমকে ঘিরে ধরে আরো কয়েকটা ছেলে। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের কিলিং মিশন।

নাজিমের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন করেন সূত্রাপুর থানার এসআই নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাথায় কুপিয়ে ও গুলি করে নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যা করা হয়। মাথায় ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হত্যার ধরন দেখে পুলিশের মনে হয়, এটা পরিকল্পিত।

বেঁচে থাকতে হয়তো মৃত্যুকে নিয়ে ভাবত নাজিম। মৃত্যুর পর তার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরির পাতায় মৃত্যু নিয়েও লিখেছিল সে। লেখার শিরোনাম ছিল ‘মাই উইল, আমার ইচ্ছা’।

‘কবে কখন কোথায় কিভাবে মৃত্যু হয়, কেউ জানে না। মৃত্যু আমার কাছে ভয়ের কোনো বিষয় নয়। এটা জীবনেরই একটা শাশ্বত প্রক্রিয়া। আমার কাছে মৃত্যু একটা গভীর ঘুম। যেখানে কোনো শব্দ, বর্ণ, অনুভূতি ও স্বপ্ন থাকে না। মৃত্যু মানে একটি রূপের চূড়ান্ত ধ্বংস। যদি ধ্বংসের রেসে যেতে পারো তবে প্রাণ চলে যাবে অন্য রূপে। এভাবেই যদি প্রাণ নতুন রূপ লাভ করে, প্রাকৃতিক নির্বাচনে নতুন প্রজাতির উত্পত্তি করে ও লাখ লাখ প্রজাতিতে পৃথিবী মুখরিত হয়। আমার মৃত্যু হলে এই নশ্বর দেহ যেন কোনো মেডিক্যালে দিয়ে দেওয়া হয়। কবরে কীটপতঙ্গ খাওয়ার চেয়ে অথবা আগুনে জ্বলার চেয়ে তা কোনো মানবহিতৈষী কাজে লাগুক। জয় হোক মানবতার।’

নাজিমুদ্দিনের এই ইচ্ছা অবশ্য পূরণ হয়নি। চৈত্র মাসের এক শুক্রবারের ভোরে নাজিমের কফিন সিলেটের বিয়ানীবাজারের টুক ভরাউট গ্রামে পৌঁছে। দুপুরের আগেই জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

ওই দিন গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ ভিড় জমায় নাজিমদের বাড়িতে।

‘তাঈ তিন মাস আগো বাড়িত আই গেছে। আমি একলা থাকতাম পারুমনি, আমার ফুয়ায় জিগাইছে। অহন হেই আমারে একলা ফালাইয়া গেলগি...’ নাজিমের মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল।

নাজিমুদ্দিনের ভাই শামীম উদ্দিনকে বিবিসি বাংলা থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য কাকে দায়ী করেন তিনি?’

শামীম উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেয়, ‘যারা মারছে, তারারেই দায়ী করি। ইসলাম তো নষ্ট হয় না, নষ্ট হয় মানুষ।’

 

 

এগার

 

সম্প্রতি একটা ভিডিও ক্যামেরা কিনেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের গান-বাজনা, নাচ পারা ছাত্র-ছাত্রীরা যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে, তখন কেমন হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব ছবি তোলেন। তাঁকে তখন প্রথম বর্ষের কম বয়সী ছাত্রদের মতো দেখতে লাগে। সাধে কি আর মোজাফফররা আড়ালে তাঁকে ‘ম্যাড স্যার’ বলে ডাকে। এর আগে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে প্রজেক্টর কিনেছিলেন তিনি। কেন? না, বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসিক সব চলচ্চিত্র দেখাবেন। সবাইকে ডেকে ডেকে বলতেন, ‘শোনো, ভালো চলচ্চিত্র দেখলে মন ভালো হয়, অনেক কিছু শেখা যায়। তোমাদের বুঝতে হবে, চলচ্চিত্র একটা আর্ট, এমন একটা শিল্পমাধ্যম যাতে তুমি একসঙ্গে অভিনয়, ফটোগ্রাফি, সংগীত, সাহিত্য, পেইন্টিং—এ রকম সব কিছুর একটা সমাগম দেখতে পাবে। ম্যাক্সিম গোর্কি কী মনে করতেন, জানো? উনি মনে করতেন, চলচ্চিত্র একটা বিশাল গণমাধ্যম আর সাধারণ মানুষের ওপর এর অনেক প্রভাব পড়ে। ’

তাঁর ছাত্র রঞ্জন, প্রতীক, পার্থ ও মোজাফফররা মাঝেমধ্যে স্যারকে আরেকটু উসকে দিতে তর্ক জুড়ে দিত।

‘স্যার, চলচ্চিত্র তো পণ্যও, এটা একটা ইন্ডাস্ট্রি, দর্শককে বিনোদন দিয়ে তাদের পকেট কাটাও তো এর লক্ষ্য, তাই না? কত কোটি কোটি টাকা এখন ফিল্মে ইনভেস্ট করা হয়...’

স্যার হাসতেন, ‘তা ঠিক। ফিল্ম একই সঙ্গে আর্ট আবার ইন্ডাস্ট্রিও।’

এই ম্যাড স্যারই আকিরা কুরোশায়া থেকে বার্গম্যান দেখতে শিখিয়েছিলেন তাঁর ছাত্রদের। অনেকটা জোর করেই, বিকেলে ক্লাস শেষ হওয়ার পর নিজের কেনা প্রজেক্টর চালিয়ে। হিচককও দেখেছিল ওরা ম্যাড স্যারের উৎসাহে। ‘রাশোমন’, ‘বাইসাইকেল থিফ’, ‘সিটিজেন কেন’, ‘পথের পাঁচালি’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’—এসব ক্লাসিক পদ্মাপারের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন সাদামাটা সাধারণ চেহারার শিক্ষক মানুষটি। ছাত্রদের ফিল্ম দেখাতে পেরে কী যে খুশি হতেন তিনি, চোখে-মুখে তখন একটা তৃপ্তি খেলা করত তাঁর।

মোজাফফর তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। স্যার ডেকে ওর হাতে স্ট্যাপলার করা এক তাড়া কম্পিউটার প্রিন্টের কাগজ ধরিয়ে দিলেন। ওপরে সাধারণ হলুদ কাগজের প্রচ্ছদ, তার ওপর লেখা ‘কোমল গান্ধার’।

স্যার বললেন, ‘এই যে দেখো, এই লিটল ম্যাগাজিনটা বের করছি, তোমরা এতে লিখবে।’

মোজাফফর উল্টেপাল্টে দেখে বলল, ‘স্যার, এটা প্রেসে পাঠান নাই? মনে হচ্ছে কম্পিউটার কম্পোজ।’

স্যার পুরনো হাসিটাই হাসলেন। বললেন, ‘ওই যে রোজ কম্পিউটার আছে না, ওটাই আমার প্রেস। ওখান থেকে কম্পোজ করে প্রিন্ট নিয়ে নেই। বেশি তো ছাপি না। ১০০ কপির মতো ছাপি। নামটা কেমন, বলো। ঋত্বিক ঘটকের ছবির নামে নাম। তবে জানো তো, কোমল গান্ধার হচ্ছে শাস্ত্রীয় সংগীতের একটা রাগ।’

মোজাফফর বলে, “রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’তে এই নামের একটা কবিতা আছে, স্যার।”

‘হ্যাঁ।’ স্যার খুশি হয়ে ওঠেন। তারপর কবিতার লাইন আউড়ান, “নাম রেখেছি কোমল গান্ধার, মনে মনে। যদি তার কানে যেত অবাক হয়ে থাকত বসে, বলত হেসে ‘মানে কী?’ মানে কিছুই যায় না বোঝা সেই মানেটাই খাঁটি।”

স্যার মাথা দুলিয়ে বলতেন, ‘বুঝতে পেরেছ, মানে কিছুই যায় না বোঝা, সেই মানেটাই খাঁটি।’

মোজাফফরের তখন কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের কাছে যাওয়া-আসা ছিল। সে নিজে থেকেই তাঁদের একজনের লেখা সংগ্রহ করে নিয়ে এলো স্যারের কোমল গান্ধারে ছাপানোর জন্য। স্যার সেই মৃদু হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললেন, ‘না রে বাবা, এখানে নতুনরাই লিখুক। নতুনদের সুযোগ কম। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে পত্রিকা করি, কারো তো কাজে লাগতে হবে।’

স্যারের বাসায়ও কয়েকবার গেছে মোজাফফর, পার্থকে সঙ্গে নিয়ে। সাপুরা শালবাগান এলাকায়, ১৬১ নম্বর বাড়ি। বাড়িটার দরজায় ছোট্ট একটা নেমপ্লেটে ইংরেজিতে লেখা, প্রফেসর এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। দোতলায় উঠেই সিঁড়ির বাঁ পাশের ছোট্ট ঘরটাতে থাকতেন স্যার। সেটা যেন শুধু ঘর নয়, স্যারের মিনি লাইব্রেরি আর তাঁর সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র। বইপত্র, ল্যাপটপ তো আছেই, সঙ্গে হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি আর এক বিশাল সেতার।

‘কলকাতা থেকে আনিয়েছি এই সেতারটা’, স্যার বাদ্যযন্ত্রটির গায়ে মমতাপূর্ণ হাত বুলিয়ে বলেন।

‘এটা সেতার? আমি ভেবেছি তানপুরা...’ পার্থ বলে।

স্যার হাসেন, ‘অনেকেই তা-ই ভাবে, মিল আছে অবশ্য তানপুরার সঙ্গে, তবে সেতার আলাদা। হজরত আমির খসরুর নাম শুনেছ? ১২৫৩ সালে জন্ম তাঁর। খুব উঁচু মানের কবি, গায়ক, সুরকার, বাজনদার ছিলেন। তাঁর হাতেই বীণা থেকে সেতারের জন্ম। ফার্সি ভাষায় সেহ্্ তার, যার মানে তিন তার। তো শুরুতে তিন তার থাকলেও এখন তো দেখছ সাতটা তার এখানে, আর তরপের জন্য আছে ১৩টা তার। সংগীতগুরু তানসেনের ছেলে বিলাস খানের বংশের একজন মসিদ খাঁ তিন তারের জায়গায় পাঁচ তার লাগিয়েছিলেন, তো আমির খসরুর পর ৮০০ বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে সেতারের তারে আরো কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনো এটা সুরের রাজা।’

স্যারের এই এক বদ-অভ্যাস, সুযোগ পেলেই জ্ঞানের আলাপ শুরু করেন। পার্থ আর মোজাফফর উসখুস করে। স্যার সেটা লক্ষ করেন না, বলেন, ‘তোমরা এসেছ, ভালোই হয়েছে। আমি একটু বাজাই। শুনবে?’

স্যার টুং টাং করে বাজানো শুরু করলে স্যারের স্ত্রী চা আর টোস্ট বিস্কুট নিয়ে আসেন। পার্থ আর মোজাফফর চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট বিস্কুট খায় আর সেতার শোনে। স্যার মগ্ন হয়ে চোখ বন্ধ করে সেতার বাজাতে থাকেন। সেই সেতারের সুরের মর্ম কান বেয়ে তরুণ ছাত্রদের হৃদয়ে পৌঁছায় কি না কে জানে? তারা হয়তো তখন সহপাঠিনীর লম্বা কালো চুলের কথা ভেবে শিহরিত হয়, তারা হয়তো পরীক্ষা পাসের সহজ-সংক্ষিপ্ত কৌশল খুঁজে হয়রান হয়।

আরেক দিন স্যারের বাসায় একাই গিয়েছিল মোজাফফর। তখন তার লেখক হয়ে ওঠার কাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে ‘শাশ্বতিকী’ নামের একটা সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছিল সে, তা-ই নিয়ে কথা বলতে। ওই পত্রিকায় স্যার ফিল্ম নিয়ে একটা লেখা দিয়েছিলেন। ঋতুপর্ণের ‘চোখের বালি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের একটা তুলনামূলক আলোচনা। এটা-সেটা কথার পর স্যার বললেন, ‘একটা গল্প লিখেছি জানো, সত্য ঘটনা নিয়ে। বিষয়বস্তু এ রকম, এক রেললাইনের ধারে জনগণ ছেলেধরা বলে পিটিয়ে এক আধপাগলিকে মেরে ফেলেছে। পাগলি মারা যাওয়ার পর জনগণ জানতে পারে, যে ছেলেটিকে নিয়ে সে ছুটে যাচ্ছিল, সেই ছেলেটি আসলে তার নিজেরই। কেমন হলো?’

‘চমৎকার স্যার! সব সময় সামাজিক বক্তব্যধর্মী লেখা লেখেন আপনি।’

‘শোনো, এটা কিন্তু সত্য ঘটনা। জনগণ সমবেতভাবে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটা তার প্রমাণ।’

‘জি স্যার।’ মোজাফফর ওঠার উপক্রম করলে স্যার তাকে থামান।

‘আরে বসো। একটা ছড়া লিখেছি, এবার তাহলে সেটা শোনো।’ স্যার উচ্চকণ্ঠে পড়তে শুরু করেন,

‘অশ্বত্থ আর বট

গোড়ায় মূলের জট।

লম্বায় হবে পাঁচ ফুট কি ছয়, যত্নে তৈরি বনসাই ঠিক নয়।

একটির কাণ্ড ভাঙা, আরেকটির ভাণ্ড ভাঙা।

ছাদের পরে রোদ বৃষ্টি ঝড়

মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে ফি বছর।

ছিল তাজা প্রথম দিকে

এখন যেন ঝিমায় ধুঁকে।

ধীরে ধীরে মরছে নাকি,

যায় না বোঝা, তাকিয়ে থাকি।

নতুন পাতা গজায় যখন

বুঝি ওদের প্রাণের মতোন

টবের সীমায় বাঁধা জীবন

ভাগ্য ওদের এমন।’

‘বুঝলে মোজাফফর, আমার ছাদে এ রকম দুটো গাছ দেখে লিখলাম। হয়তো কোনো পাখি ঠোঁটে করে বীজ ফেলে গেছে। হয়তো বাতাসে ভেসে এসেছে। জানি না।’

‘খুব রিয়ালিস্ট ধারায় আপনি লেখেন স্যার। আজকালকার তরুণরা এভাবে লেখে না। তারা মনে করে, সাহিত্যে সমাজবাস্তবতা হুবহু তুলে ধরতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এগুলো সেকেলে হয়ে গেছে।’ মোজাফফর মন্তব্য করে।

স্যার হাসেন। বলেন, ‘আমি তো পুরনো দিনের মানুষ। সেকেলে। যা সাদা চোখে দেখি তা-ই লিখি। আচ্ছা, বাকিটা শোনো।’

স্যার চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে দুলে দুলে পড়েন—

‘যদি লাগাতাম পথের ধারে কিংবা নদীর তীরে।

কেমন সতেজ বাড়ত ওরা, যেমন ছোটে পাগলা ঘোড়া।

সারা জীবন একখানেতেই

দাঁড়িয়ে, তবু মুক্তি তাতেই।

পথিকজনে দিত ছায়া, ভরত ফলে বিশাল কায়া।

শাখায় বসে গাইত পাখি গান, চতুর্দিকে জীবন অফুরান।

তলাতে বসত গ্রামের হাট, নয়তো সাধু বাবার পাট।

কুঠার থেকে রক্ষা পেলে

পাঁচ শ বছর হেলেফেলে

যখন ওদের মরণ আসত নামি

বহু আগেই ঝরে গেছি আমি।’

মোজাফফরের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। কে জানে, স্যারের ছাদের বট, অশ্বত্থগুলো হয়তো কুঠার থেকে রক্ষা পেয়ে এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু স্যারই অসময়ে ঝরে গেলেন, রক্ষা পেলেন না রক্তলোলুপ চাপাতির বীভৎস আঘাত থেকে। সেদিনটা হয়তো অন্য সব দিনের মতোই ছিল। স্যার প্রতিদিনের মতো নাশতা সেরে ইস্ত্রি করা সাদা হাফহাতা শার্ট আর একটা কালো প্যান্ট পরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। ৭টা ৪০-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস আসে, তাতে চড়ে চলে যাবেন ক্যাম্পাসে। হয়তো তিনি প্রতিদিনের মতো নিরুদ্বেগে হাঁটছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন বাগমারার দরগামারিয়া গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গানের স্কুলের কথা, পরদিন সকালে তাঁর যেখানে যাওয়ার কথা ছিল, গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে গান-বাজনা শেখানোর কথা ছিল।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দেহটি উপুড় হয়ে পড়ে গেল ‘কাঙ্ক্ষিত’ নামে একটি বাড়ির গেটের সামনে। আর তাঁর চারপাশে বইতে থাকল রক্তের বন্যা। রক্তের দাগ লেগে গেল ওই বাড়ির দেয়ালেও। শ্যামবর্ণের রেজাউল করিম সিদ্দিকীর শরীরে হয়তো এক ফোঁটা রক্তও অবশিষ্ট ছিল না। একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মাথার পেছনে এমন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয়েছে যে ঘাড় কেটে মাথা প্রায় আলাদা হয়ে গেছে। কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগটা তাঁর পাশেই পড়ে ছিল। কালো ফ্রেমের চশমাটাও পড়ে ছিল পাশেই। তখন সকাল প্রায় সাড়ে ৭টা, সূর্য উঠেছে অনেক আগেই। মানুষ চলাফেরাও শুরু করেছে। কিন্তু কেউই কিছু দেখেনি, কেউই বলতে পারছে না বা বলতে চাইছে না কিভাবে ঘটনা ঘটল। যেন সবাই ভয় পাচ্ছে, কেউই যেন কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইছে না, যেন সবাই ওই সময় চোখ বুজে ছিল, কান বন্ধ করে রেখেছিল। হয়তো এভাবেই খুনিরা চারপাশে আতঙ্কের বীজ বুনতে চেয়েছিল এবং তারা সফলও হয়েছিল।

মোজাফফর তত দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরিয়ে গেছে। ঢাকায় বসেই মর্মান্তিক খবরটা শুনল সে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পেজে মোজাফফর লিখল, ‘এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী স্যারের মোটা দাগে দুটি সমস্যা ছিল। আমাদের সমাজে চিহ্নিত সমস্যা। এক. তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতেন না। দুই. তিনি খুব সংস্কৃতিমনা ছিলেন। অভিজিত, নিলয়, রাজীব, দীপন, বাবু এদের মতো কোনো ব্লগ বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল না স্যারের। তাঁর কোনো লেখা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক নয়।’

তাহলে কী সমস্যা ছিল এই সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ মানুষটির?

কোন অপরাধে খুন হলেন তিনি?

এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী কি তবে নাস্তিক ছিলেন? কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছিলেন?

স্যারের মেয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে আরেকটা প্রশ্ন, একজন মানুষ নাস্তিক হলেই কি একটা খুন বৈধ হয়ে যায়? মানুষ কি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তখন বলতে পারে যে সে নাস্তিক, তাই তাকে খুন করা জায়েজ?

‘বাজারের সেরা টাইলস, ইট আর সুরকি দিয়ে বাবা গ্রামে মসজিদ বানিয়েছেন। মসজিদ তৈরির সময় মিস্ত্রিদের সঙ্গে নিজে কাজ করেছেন। গ্রামের ছোট ছোট শিশুকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসতে স্কুল বানিয়েছেন। তাদের মননশীল করে গড়ে তুলতে হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন। বাবার কি এটাই অপরাধ ছিল?’

এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর মেয়ে রেজওয়ানা হাসিন এভাবেই বাবার স্মরণসভায় প্রশ্ন রেখেছিল। বলেছিল, ‘একটু কবিতা আবৃত্তি, গান-বাজনা, সেতার বাজালেই আমরা মনে করি লোকটা খুব খারাপ, লোকটা ভালো না, নাস্তিক—এই মিথ মানুষের সৃষ্টি। কাজেই মুক্ত ও সংস্কৃতিমনা হলেই নাস্তিক হয়—এটা ভুল। এ ভুল আমাদের ভাঙতেই হবে।’

ওই অনুষ্ঠানে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়া আত্মজার পাশে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে ছিলেন রেজাউল করিম সিদ্দিকী স্যার। তাঁর পরিচিত হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে নিশ্চয়ই বলেছিলেন, ‘কাঁদিস না মা, এই ভুল আমাদের ভাঙবেই। আবার ফিরে আসব আমি। তুই তো জানিস, আমি মিথ্যা বলতে পারি না। আমার নামের শেষে যে সিদ্দিকী আছে। সিদ্দিকী অর্থ তো বেশি সত্যবাদী।’

 

 

বার

 

‘খুনের পর খুন। সিরিয়াল কিলিং। একই স্টাইল, একই রকম টার্গেট। জনগণ অসুস্থ বোধ করছে। একটা জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। না সরকারের, না কোনো বাহিনীর, না কোনো রাজনৈতিক দল বা পৃষ্ঠপোষকের।’

আহমেদুর রশিদ টুটুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস

এপ্রিল ২৪, ২০১৬

‘দেশ আমাদের জন্য আর নিরাপদ কোনো ভূমি নয়। দেশ ছাড়ার বন্দোবস্ত করে দিল কিছু বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সব কিছুই হয়েছিল হিউম্যান রাইটসের সংগঠনগুলোর কল্যাণে। তার পরও বন্ধুরা আর শুভাকাঙ্ক্ষীরা যদি পথ করে না দিত আমরা হয়তো এখনো দেশে থাকতাম আর প্রতিদিন অদৃশ্য চাপাতিওয়ালাদের আবার আক্রমণের ভয় নিয়ে দিন কাটাতাম।’

শামীমা রুনা, লেখক, টুটুলের স্ত্রী

‘ভিনদেশ আমার জন্য নয়। টের পাই, খুব টের পাই। শুধু গর্দান বাঁচিয়ে চলাফেরার স্বাধীনতা চাই, নিজের মতো করে হাঁটতে চাই। নইলে মেরে ফেললে দু-চার দিন ফেসবুকে শোক আর ভালোবাসা বইবে। পদ্মা থেকে গঙ্গা হয়ে ভল্গা তক। তারপর? তার আর পর নেই।’

আহমেদুর রশিদ টুটুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস

এপ্রিল ৩, ২০১৮


মন্তব্য