kalerkantho

চিত্রকলা

শিল্প ও সমাজ

শরীফ আতিক-উজ-জামান

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শিল্প ও সমাজ

পাবলো পিকাসোর Girl before a Mirror

শিল্প ও সমাজের সম্পর্ক

শিল্পের ভেতর দিয়ে জীবনের বহুমাত্রিক প্রকাশ খুঁজে পাওয়া আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। যখন শিল্প ছিল ধর্মের মূর্ত প্রকাশ এবং সমাজকে ধর্মের ছাঁচে ফেলে গড়া হতো, তখন শিল্প গির্জার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আর আপাতদৃষ্টিতে তা ছিল প্রায় সবার। যে সমাজ অল্পবিস্তর স্বাধীন শাসক কর্তৃক পরিচালিত হতো সেখানে সমাজ ও শিল্পের সম্পর্ক অনেকটাই নির্ভর করত সেই শাসকের মর্জির ওপর। পোপ ও মেডিসি পরিবারের সঙ্গে মাইকেলেঞ্জেলো কিংবা বেটোভেনের সঙ্গে লোবকোভিেসর রাজকুমারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁদের সৃষ্টিশীলতাকে গতি দিয়েছিল। আবার অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী মারিয়া তেরেসার পৃষ্ঠপোষকতায় মোজার্ট কিংবা সম্রাট আকবরের সাহচর্যে তানসেনের সংগীতচর্চা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। তখন শিল্পীরা তাঁদের বিশেষ গুণাবলির কারণে অন্য মানুষের থেকে আলাদাভাবে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়ে উঠতেন, যেভাবে পত্রপল্লবের মাঝ থেকে ফুল উঁকি দিয়ে থাকে। কিন্তু আধুনিক সমাজে সমস্যাটা ভিন্ন।

বর্তমান সমাজ রাজতন্ত্র বা যাজকতন্ত্রশাসিত নয়। শিল্প এখন সম্রাট বা পাদ্রিদের নির্দেশনা বা পৃষ্ঠপোষকতায় কিংবা শিল্পীর নিজস্ব উদ্যোগে চর্চিত হয় না। এখন প্রাতিষ্ঠানিক বা জন-উদ্যোগ শিল্পচর্চার বিষয়টিকে বেশ সহজ করেছে। কিন্তু পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। এর ফলে কি শিল্পের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে? শিল্পচর্চা ভিন্নতর মাত্রায় বিকশিত হচ্ছে? নাকি তা শিল্পীর সহজাত ও প্রকৃত শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে? যদি আমরা ধরেও নিই যে খাঁটি শিল্পচর্চার প্রবণতা মানুষের সহজাত বা প্রকৃতিসিদ্ধ গুণ, তাহলে বর্তমানে শিল্পচর্চার মানের যথেষ্ট অবনমন ঘটেছে আর সেই সমস্যা সম্পর্কে এখনকার সমাজ সুস্পষ্ট কোনো ধারণা যেমন রাখে না; তেমনি তার সন্তোষজনক সমাধানকল্পে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপও নিতে পারে না। যেমন—কোনো জাতির নিজস্ব সৃষ্টিশীল শিল্পের ঐতিহ্য না থাকলে দূরবর্তী বা অপরিচিত কোনো জাতির শিল্প প্রকাশভঙ্গি দিয়ে কি তার জাতীয় আত্মপ্রকাশের ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব? যদি না হয় তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সেই জনগোষ্ঠীর কী করা উচিত?

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত Parnassus পত্রিকায় Art and Society শিরোনামের নিবন্ধে শিল্প সমালোচক ইউজিন জি স্টেইনহফ কিছু মৌলিক প্রশ্ন রেখেছিলেন, যা আজও গুরুত্বসহ ভাবা উচিত। মানুষের পেশি গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেই সঙ্গে সাংগঠনিক নজরদারি; মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য বিদ্যালয় রয়েছে, কিন্তু সব শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মনস্তাত্ত্বিক কার্যক্রমের চালিকাশক্তি যে আবেগ, তাকে আনুষঙ্গিক ও গুরুত্বহীন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কেন? চিকিৎসা ও অপরাধ মনস্তত্ত্ব বাদ দিলে, শিল্প প্রসঙ্গে এক ধরনের বেঢপ ও তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব দিয়ে মানুষের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিচার চলছে এবং শিল্প প্রকৃত অর্থে জীবন থেকে বেশ দূরেই অবস্থান করছে বলে তিনি মনে করতেন। তিনি আরো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে শিল্প একদিন বিজ্ঞান কর্তৃক আত্মীভূত হবে। আজ ৭৮ বছর পর তাঁর সেই অনুমানের অনেকটাই কি সত্য মনে হচ্ছে না? 

যেকোনো শৈল্পিক প্রকাশে শিল্পীর আবেগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা উপভোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আবেগ। শিল্পীর সঙ্গে ব্যক্তির আবেগের সাদৃশ্য যেমন থাকতে পারে, তেমনি একটি দ্বান্দ্বিক অবস্থাও তৈরি হতে পারে। সংবেদনশীল মানুষ ভেতরের যন্ত্রণা সম্পর্কে সচেতন এবং সেই যন্ত্রণাটি সে জীবনভর বহন করে চলে, যদি শিল্পী হয় তাহলে নিজস্ব শৈল্পিক প্রকাশের ভেতর দিয়ে, আর ব্যক্তি হলে সৃষ্টির আবেগের সঙ্গে একাত্মতা অনুভবের মধ্য দিয়ে। সমাজের শিল্প সৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গির চারিত্র্য নির্মাণ প্রয়োজন, যাতে খাঁটি শিল্প নির্মাণ সম্ভব হয়, যা একটি জাতির আন্তর-অনুভূতির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ১৯০৭ সালে প্রাচ্য শিল্প সভা গঠিত হয়েছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। ভারত শিল্পের কৌলীন্য রক্ষার জন্য তাঁরা কিছু অনড় বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বড় আপত্তি ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। তাঁর মনে হয়েছিল যে ভারত শিল্পের আধুনিক ও আন্তর্জাতিক চারিত্র্য পেতে হলে তাঁকে প্রতীচ্যের শিল্পবৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করতে হবে। তাঁর হাত ধরেই ইউরোপকেন্দ্রিক যে আধুনিকতা ভারতে প্রবেশ করেছে সেই পথে অনেকেই হেঁটেছে, হাঁটছে এবং ভবিষ্যতে হাঁটবে। এই সাংস্কৃতিক মিশ্রণের ফলে একটি জাতির আত্মপ্রকাশের বৈশিষ্ট্যের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয় বলে অনেকে মনে করলেও আজকের দিনে এই মিশ্রণ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে সময় ও যুগ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সম্পর্কে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে যায়। খেয়াল করলে দেখা যায় যে বিভিন্ন সময়ে মানবচৈতন্য থেকে বিস্ময়কর ঘটনাপ্রবাহের উত্পত্তি হয়েছে এবং তার ফলে এমন আবেগ তৈরি হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়া ঐক্ষিক জগতের ওপর পড়েছে। ব্যক্তি বা সমষ্টির সুখানুভূতিকে পূর্ণতা দিতে যার অনুভব অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক আবেগকেও জাতির আবেগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে। যেমন চিত্রকলার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে বিভিন্ন যুগে তার বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের পেছনে শুধু শিল্পী নয়, জাতির আবেগ জড়িয়ে ছিল। একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে ধর্মীয় কাহিনিনির্ভর ছবি আঁকা হয়েছে, যার সঙ্গে মানুষের আধ্যাত্মিক অনুভূতির যোগসূত্র ছিল বলে ধরে নেওয়া হয়; আবার চতুর্দশ লুইয়ের জীবনাচরণের কারণে ফ্রান্সে খেয়ালি, পরিশীলিত ও কৌতুকপূর্ণ এক ধরনের চিত্রশৈলীর উদ্ভব হয়েছিল, যা রোকোকো নামে পরিচিত।

তাহলে বলা অসংগত নয় যে প্রতিটি যুগেই মানুষ প্রায় একই ধরনের প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশীলতা নিয়ে বিকশিত হয়েছে। জটিল বিষয়গুলো খুঁজে বের করে সমাধান করেছে, আবার চমৎকার হৃদয়গ্রাহী চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছে। তবে প্রতিটি যুগেই দেখা গেছে আবেগ উপলব্ধির ভিন্ন ভিন্ন ধরন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের মান প্রমাণ করে যে তা পরবর্তী সময়ের জত্তো, দ্য ভিঞ্চি প্রমুখের ছবি থেকে মানে ন্যূন ছিল না। এ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে যদি আমরা মন থেকে মানুষের চিন্তা ও আবেগের বিবর্তন সম্পর্কিত ভূতের আছর তাড়িয়ে দিতে পারি, খামখেয়ালিপূর্ণ দায়িত্ববোধের জোয়াল কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতে পারি, তাহলেই শুধু খাঁটি শিল্প নির্মাণের পথটি খুলে যাবে। ভ্যান গঘ যে অসামান্য চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছেন তার পেছনে কোনো সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল না, ছিল সৃষ্টির উন্মাদনা ও আনন্দ। তাই একটি জাতি শিল্পীর স্বতঃস্ফূর্ততাকে লালন করবে তাঁর সৃষ্টিশীলতা বিকাশের জন্য।

শিল্পের প্রতি ব্যক্তি, দেশ, জাতি বা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে যেমন বিস্তর বিতর্ক রয়েছে, তেমনি শিল্পীর আবেগ ও ভাবনাকে নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোতে বন্দি করলে তার শিল্পীসত্তার সঠিক বিকাশ হয় কি না সে বিষয়েও সন্দেহ রয়েছে। বিশ্বকে আধ্যাত্মিকভাবে অবয়ব প্রদানের প্রচেষ্টা থেকে নানা দার্শনিক প্রতর্ক নির্মিত হয়েছে। আগে দর্শনের সামগ্রিক ক্ষেত্রই মানুষের আধ্যাত্মিক কৌতূহলের বিষয় ছিল। এখন বিমূর্ত ভাবনা, মানুষের পার্থিব জগৎ ইত্যাদি সবই দার্শনিক আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের চেতনাসৃষ্ট ধারণা প্রকাশের সমস্যাগুলোই শিল্পে মূর্ত হয়ে ওঠে শিল্পকর্মে ব্যবহৃত উপাদানের মাধ্যমে।

গোঁড়া মতবাদের প্রতীকায়নের সঙ্গে বৈশ্বিক ধারণার একটি যোগসূত্র শিল্পে স্থান পেয়ে এসেছে। পিরামিড, ডেলফি বা জেহবার মন্দির যেমন এর দৃষ্টান্ত তেমনি গোথিক ক্যাথিড্রাল এই ধারণারই মরমি স্থাপনা। এরপর পরিবর্তন এলো। যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কৃত হলো তখন প্রকৃতি সম্পর্কে শুধু অনুমান করতে নিরুৎসাহ জোগানো হলো। পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বেড়ে গেল এবং প্রকৃতির কাঠামোগত উপাদান অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হলো। এটাই চিন্তার আধুনিক ধরন। বিজ্ঞান সব ভাবনার খোলনলচে পাল্টে দিল বটে, কিন্তু শিল্পকে আধ্যাত্মিকতার নিরিখে বিশ্লেষণের প্রবণতাটি অক্ষুণ্ন থেকে গেল। এমনকি প্রাচীন ভাবনা, প্রাচীন হাতিয়ার, প্রাচীন উপাদান ইত্যাদির প্রতি শিল্পী তখনো আকৃষ্ট রয়ে গেলেন। আধুনিক সমাজের দায়িত্ববোধ তাঁকে সেভাবে জাগাতে পারল না। দেখা গেল, একই যুগে যে ধারায় শিল্পচর্চা হচ্ছে, ভাবনার ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণ তার বিপরীত। বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা, ভাবনা ও চর্চা যখন ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন শিল্পে প্রকাশিত আবেগে সেই প্রাচীনপন্থার প্রকাশ। সমগ্র আধুনিক প্রযুক্তিতে গতিশীলতা সৃষ্টিশীল চিন্তার নিয়ামক। কিন্তু শিল্পে তার অবস্থান কী?

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের চাহিদার যত কাছাকাছি দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে, সেখানে শিল্প কি পিছিয়ে পড়ছে? বৈশ্বিক ধারণা শিল্পের জন্য কী গুরুত্ব বহন করে? আগে নক্ষত্র, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, মানুষের পশুরূপ ইত্যাদি প্রাকৃতিক গড়নকে সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রাকৃতিক গড়নকে সত্য ব্যতিরেকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ধর্ম বা লোকাচারে নিষিদ্ধ ছিল। তাই আগেকার শিল্পীরা এই বৈশ্বিক ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাকৃতিক গড়নকে সত্য হিসেবে দেখতেন এবং প্রয়োজনে তাঁদের শৈল্পিক উপস্থাপনায় প্রয়োগ করতেন। প্রাকৃতিক গড়ন উপস্থাপনের দুটি কারণ ছিল : ১. শিল্পী প্রাকৃতিক গড়নের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশের নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরতেন; ২. বাস্তবসম্মত উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিক গড়নের পুনর্নির্মাণ করতেন। আমাদের দৃষ্টির সামনে যে প্রাকৃতিক গড়ন, তার প্রকৃত উপস্থিতির যথাযথ মূল্যায়নই লক্ষ্য হওয়া উচিত। শিল্পে প্রয়োগ করা এই মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পের একটি ধারণা তৈরি করেছে, যার প্রকাশ প্রকৃতির প্রতি শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। ওই শিল্পী প্রকৃতির সৌন্দর্য দ্বারা প্রকৃতির কাছে নিজের অবস্থানকে বিকল্প রূপে উপস্থাপন করছেন। এই ধারণা একটি বিষয়কে উপেক্ষা করেছে, আর তা হলো প্রকৃতির নিজস্ব কোনো প্রতীক নেই, তা একটি অবস্থা মাত্র। কিন্তু আমাদের একটি আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা প্রকৃতির মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে উৎসাহ জোগায়। বৈশ্বিক ধারণার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যেটুকু পার্থক্য তা হলো, অতীতে প্রকৃতির দৃশ্যগ্রাহ্য রূপ অনুযায়ীই শিল্পী তাকে দেখতেন, আর বর্তমানে কাঠামোর নিরিখে তাকে দেখা হয়।

 

সমাজে শিল্পের প্রায়োগিক দিক

সমাজে তিন ধরনের কল্যাণকর বিষয় রয়েছে, যার একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক খুবই গৌণ : চিত্তচমৎকারী বা প্রশংসনীয়, প্রয়োজনীয় ও উপকারী। একটি বিষয় একই সঙ্গে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না; যদিও এই বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। শিল্পের বেলায় অনেকে মনে করে যে চিত্তচমৎকারী হলেও তার উপকারী কোনো দিক নেই। যা প্রশংসনীয় তা শ্রেষ্ঠ, আর যা উপকারী তা দাসোচিত। শিল্প সমাজের ফুল ও অলংকারের মতো এবং এর থেকে চূড়ান্ত কল্যাণ মানুষকেই খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু কেউ কেউ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় যে চূড়ান্ত কল্যাণ হিসেবে শিল্প কী সুবিধা আমাদের দিয়ে থাকে? মানুষের একটি ধারণা রয়েছে যে যা কিছু ভালো তা-ই উপকারী। এমন ধারণাও রয়েছে যে শিল্প ব্যক্তি ও সমষ্টিকে পরিতৃপ্ত করে। ন্যায়পরায়ণ মানুষ যেমন তার কাজের যথাযথতা নিয়ে সন্তুষ্ট, প্রাজ্ঞজন তেমনি সন্তুষ্ট তার প্রজ্ঞা নিয়ে। পাশাপাশি বিবেচনাহীন মানুষ তার বিবেচনাহীনতা এবং নির্বোধ তার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।

এ ক্ষেত্রেও ভিন্নমতাবলম্বীরা অনড় অবস্থানে। কারো মতে শিল্পের কোনো হিতকারী ক্ষমতা নেই, আবার কেউ কেউ মনে করে প্রতিটি জিনিসে এবং প্রতিজনের কাছেই শিল্প হিতকারী। একজন ছুতার বা রাজমিস্ত্রি, নরসুন্দর বা মুচির কাজে যে শিল্প রয়েছে, তার হিতকারী ক্ষমতা নিয়ে প্রথম গোষ্ঠী সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এর সৌন্দর্য মন টানলেও উপকারী কোনো দিক নেই। তারা সৌন্দর্য ও উপযোগিতাকে সম্পর্কযুক্ত মানলেও সৌন্দর্য সব সময় উপযোগিতাকে অতিক্রম করে যায় বলে মত দিয়েছে। যেমন ছুরি একটি হাতিয়ার, তাকে নানা আকার-আকৃতিতে তৈরি করা হলেও তার কাজ হলো কর্তন। এখন সুন্দর করে একটি ছুরির ছবি আঁকা হলো, তখন এর সৌন্দর্য উপযোগিতাকে অতিক্রম করে যায়। আর তাই সৌন্দর্য ব্যাবহারিক নয়। সৌন্দর্য ও উপযোগিতা পারস্পরিক সাংঘর্ষিক।

এই সূত্রে প্রশ্ন উঠেছে, শিল্প কি তাহলে প্রয়োজনীয় নয়? যদি হয় তাহলে তার ধরনটি কেমন? যেমন পানি সবার জন্য প্রয়োজন হলেও মদ শুধু অভ্যস্তদের জন্য। তাহলে শিল্প কি সবার, নাকি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের প্রয়োজন? সেই মানুষ কারা? আবার প্রয়োজনের সঙ্গে ভালো ও মন্দের প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। ভালোত্ব যেমন ব্যক্তির চাহিদা, তেমনি সমাজের সার্বিক জীবনচর্চায় তার প্রতিফলন থাকা দরকার। ভালোত্ব ব্যক্তির সদ্্গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন ভালো মানুষ একজন দায়িত্বশীল নাগরিক। সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়, নৈতিকতা ওগুলোর ওপর নয়।

একটি নাটকের মঞ্চায়ন দেখার পর যদি কেউ আবেগতাড়িত হয়, তাহলে সে কিছু আনন্দ বা বেদনা অনুভব করেছে বোঝা যায়। কিন্তু সে তা অনুভব করত না, যদি ঘটনাপ্রবাহ তার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে না মিলত। নিশ্চয় কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রয়োজনে চরিত্রগুলোতে ভালো-মন্দ বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয় না। এমনকি হয় যে একজন দর্শক যাকে পছন্দ করছে, আরেকজন তাকে অপছন্দ করছে কিংবা উল্টোটা? কখনোই তেমন ঘটে না, বরং সবাই ভালো চরিত্রগুলোকে পছন্দ করে, খারাপ চরিত্রগুলোকে অপছন্দ করে। এখানে সবাই ভীতি, করুণা, বেদনা, হাহাকার বা আনন্দের আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়; ব্যক্তিগত যুক্তির ভিত্তিতে কোনো চরিত্র পছন্দ করে না। ভালো-মন্দই পছন্দের মাপকাঠি। এখন নাট্যকার চাইলেই যেমন ভালো চরিত্রকে মন্দ বা মন্দ চরিত্রকে ভালো হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন না; নায়ককে খলনায়ক বা খলনায়ককে নায়ক বানাতে পারবেন না, কিংবা সৌভাগ্যকে দুর্ভাগ্য হিসেবে বিভ্রান্ত করতে পারবেন না। দর্শক তা তাত্ক্ষণিক ধরে ফেলবে এবং বিরক্ত হবে। এখানেই শিল্প সত্য ও ন্যায়ানুগ। চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সেখানে ভালোকে মন্দ, দুর্বলকে সবল বা কুিসতকে সুন্দর হিসেবে নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। তাই  সৌন্দর্য নির্মাণে নিয়োজিত শিল্পী অবশ্যই সমাজকে ভালো করার ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন।

 

শিল্পী ও সমাজ

আমেরিকান চিত্রশিল্পী অ্যাডলফ গটলিব ১৯৫৫ সালে ঈড়ষষবমব অত্ঃ ঔড়ঁত্হধষ-এ লিখিত নিবন্ধে জানাচ্ছেন যে তিনি শিল্পকলার ছাত্র থাকাকালীন আধুনিক শিল্পীর সংকট সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর সমাজে একজন শিল্পী শিল্পকলার মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারবেন না, কারণ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া খুব বেশি মানুষের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হন না। যদি তাঁর শিল্প অসামান্য কিছু হয়ও মৃত্যুর আগে তার স্বীকৃতি মিলবে না। তাঁর সামনে ভ্যান গঘের দৃষ্টান্ত ছিল, মৃত্যুর আগে যাঁর মাত্র একটি ছবি বিক্রি হয়েছিল। ছবি আঁকার সামগ্রী কেনার জন্য ছোট ভাই থিওর কাছে প্রতিনিয়ত হাত পাততেন। আত্মহত্যার পেছনে হতাশা কি কারণ ছিল না? শিল্পীদের সমাজবিচ্ছিন্নতার বড় কারণ হিসেবে তাঁদের ব্যতিক্রমী জীবনাচরণকে দায়ী করা হলেও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর শিল্প উপলব্ধির অক্ষমতা বা অনীহা একটি বড় কারণ। দারিদ্র্যই শিল্পীর নিয়তি—সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গির এখনো কি খুব পরিবর্তন হয়েছে? সমাজে বিনোদন দানকারীর চেয়ে শিল্পীর বড় কোনো ভূমিকা আছে, তা মানতে বা বিশ্বাস করতে এখনো অনেকের কষ্ট হয়।

শিল্পীর অবস্থা আরো করুণ হয়ে পড়ে যদি একটি সমাজে প্রচুর মানুষ শিল্পের খরিদ্দার হয়ে ওঠে। তারা তখন নিজের মতো করে শিল্পের ব্যাখ্যা করে, নিজের রুচিমতো শিল্পকর্ম আকাঙ্ক্ষা করে। যদি শিল্পকে পণ্য হিসেবে খোলাবাজারে ফেলা হয় তখন তা টেলিভিশন সেট, স্পোর্টস কারের মতো প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে ওঠে। তখন তার নান্দনিক মূল্য নিরূপিত হয় বিক্রি হওয়া বা না হওয়ার ওপর। এই অবস্থা একজন শিল্পীর জন্য আর্থিক সমস্যা তৈরি করে। তার সবশ্রেষ্ঠ প্রচেষ্টা মূল্যায়িত না হলে তিনি হতাশায় ভুগতে থাকেন। তবে আজকের দিনে অভিযোগ করা হয়ে থাকে যে শিল্পীরা যেভাবে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করছেন তা বেশির ভাগ মানুষের বোধের অতীত। আবার অজস্র মানুষ শিল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে কি না সে বিষয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এখনো এটাই মনে হয় যে সমাজের স্বল্পসংখ্যক মানুষ শিল্পকে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেন, আর বাকিরা শিল্প ছাড়াই চলতে পারেন।

যদি শিল্পকে চাহিদা বা প্রয়োজন এবং শিল্পীকে উপযোগিতার নিরিখে বিচার করা হয় তাহলে শিল্প উপযোগিতাবাদী বা ফলিত শিল্প ছাড়া আর কিছু নয়। শিল্প-কলকারখানার নকশাবিদরা যন্ত্রপাতি ও বিপণনের প্রয়োজন অনুযায়ী সব কিছু নির্মাণ করে থাকেন। শিল্পীও অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ফরমায়েশকারীর চাহিদা অনুযায়ী বা তাঁর মনস্তুষ্টির জন্য ছবি আঁকেন। ভ্যান ডাইকের ছবি এর প্রমাণ দেয়। রেমব্রান্ট যখন তাঁর মডেলদের মনস্তুষ্টি ছেড়ে দিলেন, তখনই তাঁর কাজে মেধার সঠিক বিচ্ছুরণ ও শৈল্পিক উত্কর্ষ দেখা গেল। তিনি আধুনিক শিল্পীদের আদর্শ হয়ে উঠলেন। আধুনিক শিল্পী জনগণ বা সমাজের চাহিদা অনুযায়ী ছবি আঁকেন না; তিনি ছবি আঁকেন আন্তর তাগিদে। তারপর তিনি আবিষ্কার করেন যে কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষ তাঁর ছবির প্রশংসা করেন। শিল্পীর সামাজিক স্বীকৃতি সমাজের চাহিদা ও উপযোগিতা প্রসঙ্গে নির্ভর করে, কারণ মানুষ শিল্প ঘরানা বা শিল্পশৈলীর খুব কমই উপলব্ধি করতে পারেন। 

 

আধুনিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা

আধুনিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা বেশ জটিল। সমস্ত সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে সেই জটিলতা দৃশ্যমান হলেও চিত্রকলা ও ভাস্কর্যকলায় তার গভীরতা বেশি। গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে শিল্পকলায় যে ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার সবটা মানুষ খুব আত্মস্থ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সেই পরিবর্তনের ধারা এবং আধুনিক শিল্প ঘিরে বিতর্ক এখনো চলছে। তার পরও শিল্পীরা গণতান্ত্রিক সমাজে যে অবদান রেখে চলেছেন তার যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের আগে যে শিল্প সৃষ্টি হতো তা ছিল মূলত যাজকতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের বিষয়-ভাবনা-রুচির ঐক্ষিক প্রকাশ। ফরাসি বিপ্লব ভাবনার এই কঠিন বৃত্ত ভেঙে মুক্তচিন্তার পথে শিল্পীদের উৎসাহ জুগিয়েছিল। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর মানুষের মাঝে নতুন বিভাজন তৈরি করল। শিল্পীদের মাঝেও আদর্শিক বিভক্তি দেখা গেল। শিল্পে অনিবার্যভাবে নানা প্রতিফলন লক্ষ করা গেল। বুর্জোয়ারা আগেকার শাসনামলের মতো শিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য ও বিষয়বস্তুর প্রতি খুব আগ্রহ দেখালেন না। এমনকি শিল্পের প্রাণশক্তির বেশ খানিকটা হারিয়ে গেল।

এক শতক ধরে চিত্রকলার মূল ধারা হলো বিমূর্ততা। আজকের দিনে তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা এর প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট। বিমূর্ততাকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন গাঠনিক বিমূর্তায়ন (Organic Abstraction)। এই শিল্প বৈশিষ্ট্যে প্রাকৃতিক গড়নের চেনা প্রতিরূপ একটা পর্যায়ে এসে হারিয়ে গেলেও তার মূল আদল বোঝা যায়। পাশাপাশি পরাবাস্তববাদী বিমূর্তায়ন (Surrealistic Abstraction) সৃষ্টি হয় অবচেতন মনের চিত্রকল্প থেকে এবং এর গড়ন যে আদল তুলে ধরে তা হলো তার মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশভঙ্গি। এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে প্রকাশবাদী বিমূর্তায়ন (Expressive Abstraction) বাস্তবতার সুনির্দিষ্ট সূত্রে ব্যক্তি আবেগ তুলে ধরাই এই শিল্পশৈলীর প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে জ্যামিতিক বিমূর্তায়ন (বেড়সবঃত্রপ অনংঃত্ধপঃরড়হ) কোনো ধরনের ব্যক্তি আবেগ সরাসরি প্রকাশ করে না, ঐক্ষিক সূত্রে বস্তুগত শৃঙ্খলা প্রকাশ করে। তবে যে আবেগই তাঁরা প্রকাশ করুন না কেন শিল্পের উপাদানের মধ্যে এক ধরনের আন্ত সম্পর্ক, ভারসাম্য ও সুসামঞ্জস্য রয়েছে। তবে বর্তমানে যে বিমূর্তায়ন শিল্পে খুব সহজে দেখা যায় তা হলো অনিয়তাকার বা আকারহীন বিমূর্তায়ন (Amorphous Abstraction)। এই ধারার কিছু চিত্রী চিত্রকল্পকেই মুছে দিয়েছেন তাই নয়, বরং গড়ন, নকশা, রসকেন্দ্র, চলন ইত্যাদির প্রথাগত ধারণাও বাদ দিয়ে চিত্রতলকে রং, রেখা ও আলো দিয়ে পূর্ণ করেছেন। এই ধরনের চিত্রকলা কৃচ্ছ্রব্রতী মরমিবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাইরের সংকটপূর্ণ জগেক এড়িয়ে তাঁরা শুদ্ধতা, শান্তি ও এক ধরনের নান্দনিকতার অনুসন্ধান করেছেন। আজ এই শৈলীর ব্যাপকতা দেখে মনে হয়, এটা মানুষের বিক্ষুব্ধ মনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমালোচকরা বিমূর্ত শিল্পকর্মকে অর্থহীন অলংকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবার কেউ কেউ একে ‘পলায়নপরতা’ বলেছেন, কিন্তু তা হলেও তার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে, যাকে রূপকারক শিল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। মানবতাবাদ সামনে আনা হয়েছে বিমূর্ত চিত্রকলাকে আক্রমণ করার জন্য। সমালোচকরা ঢালাওভাবে বলছেন যে আগেকার শিল্প মানবিকতার আদর্শ তুলে ধরত, যা বিমূর্ত শিল্পে অনুপস্থিত এবং কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে একে প্রতি-মানবিক বলছে। কিন্তু যে বিমূর্ত শিল্প মানুষের আবেগ প্রকাশ করে এবং এক ধরনের শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য তুলে ধরে, যা মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি। তাই এই শিল্প যথেষ্ট মানবিক।

শিল্পের এমন কোনো যুগ খুঁজে পাওয়া যাবে না যা এতটা বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ ছিল। গত ৫০ বছরে যোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়নে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশের শিল্প ঘরানার সঙ্গে পরিচয়ের ফলে যে বিনিময় ঘটেছে তা শিল্পের নতুন শৈলী সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে এই সময়ের শিল্প অনেক বেশি বৈচিত্র্যমণ্ডিত আর তাই অনেক বেশি দুর্বোধ্য। সেই দুর্বোধ্যতাই শিল্পীকে দর্শক থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। শিল্পী যে অধ্যবসায় নিয়ে শিল্পচর্চা করেন, সেই একই রকমের অধ্যবসায় নিয়ে দর্শক ছবি দেখার চর্চা করে না। তিনি সহজবোধ্য কিছু চান, কিন্তু এই সময়ে জীবন যেমন জটিল, জীবনের প্রকাশও জটিল। আর তাই তাঁর উপলব্ধি খুব সহজ হবে, এমন সম্ভাবনা কম। এই বাস্তবতা মেনেও বলতে হয় যে দুর্বোধ্য উপস্থাপনার কারণে শিল্পের দর্শক কমে যাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো সহজ সমাধানও নেই।               

 

উপসংহার : একুশ শতকে শিল্প    

একুশ শতকে বুর্জোয়া সমাজ কাঠামোর ভেতর প্রযুক্তি, গবেষণা, শিক্ষা, প্রতর্ক ইত্যাদিতে যেমন নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে তেমনি শিল্প ও নন্দনতত্ত্বে নতুন ভাবনাও এসেছে। লাইফ সায়েন্সেস গবেষণায় বায়ো-আর্ট () যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে উসকে দিচ্ছে তেমনি শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে নামে দর্শকদের অংশগ্রহণ ও মতবিনিময়মূলক এক ধরনের নন্দনতত্ত্বের উদ্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ শতকে উত্পত্তি লাভ করা উত্তরাধুনিকতা ও নারীবাদ গুরুত্বপূর্ণ প্রতর্ক হিসেবে রয়ে গেছে। একাধিক মাধ্যম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তাঁদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যোগাযোগ ও প্রযুক্তির কারণে শিল্পের ওপর বিভিন্ন প্রভাবের ধারণাও বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের সব কোণেই শিল্পীরা রয়েছেন যাঁরা স্থানিক বৈশিষ্ট্য ও ভূগোলকে মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্কৃতিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বায়নের প্রভাব একুশ শতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইন্টারনেট, গণযোগাযোগ ও সমসাময়িক শিল্পের প্রাণশক্তি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা ছড়িয়ে পড়ছে। নিজের দেশের মানচিত্রের বাইরে অন্যত্র শিল্পের গতিপ্রকৃতি কী তা সহজেই জানা সম্ভব হচ্ছে এবং ভালো লাগা কোনো বিষয় সহজেই আত্মস্থ করা যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্প সম্প্রসারণের যে বুলি আওড়ানো হচ্ছে তা আসলে বাজার সম্প্রসারণের একটি কৌশল মাত্র। এখানে আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষ তাদের রুচিমতো ছবি কেনে এবং যে ধরনের ছবি বেশি বিক্রি হয় শিল্পীরা সেই ধরনের ছবি নির্মাণের তাগিদ অনুভব করেন। তাতে এক শ্রেণির শিল্পীর পরিচিতি ও কাটতি তৈরি হয় এবং তাঁরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাবশালী ও নেতৃস্থানীয় শিল্পব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তরুণ জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, গোবর্ধন আঁশ যখন বুভুক্ষু মানুষের ছবি এঁকে মানুষের বিবেক জাগিয়ে তুলছেন, তখন যামিনী রায় সাহেব খদ্দেরদের জন্য বাইবেলের কাহিনিনির্ভর ছবি আঁকছেন। বাঙালির জীবনের সেই ভয়াবহ বিপর্যয় তাঁকে স্পর্শ করেনি। তাই তাঁর শিল্পে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এই দুটি ঘটনার প্রথমটি যদি হয়ে থাকে শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব পালন আর দ্বিতীয়টি সেই দায়িত্বে অবহেলা তাহলে অনেকেই সেই দায়িত্ব পালন করেননি। তাতে সমাজের কতখানি ক্ষতির কারণ ঘটেছে তা ভাবনার বিষয়।

একুশ শতকে জনশিল্প ও অংশগ্রহণমূলক শিল্প (Public and participatory art) নামে এক ধরনের শিল্পের কথা জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। শিল্পী, প্রকৌশলী ও স্থপতির অধীত বিদ্যা বিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ম্যুরাল, মনুমেন্ট, গ্রাফিটি ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে। ইনস্টলেশন ও পারফরম্যান্স আর্টকে জনশিল্প (Public art) বলা হচ্ছে এবং এর জনসম্পৃক্তি অধিক বলে দাবি করা হচ্ছে। রোড শো ও নানা রকমের অনলাইন প্রকল্পকে এর আওতাভুক্ত মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে শিল্পীর জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে কি না, অধিকসংখ্যক মানুষ শিল্পের সঙ্গে একাত্ম অনুভবের মধ্য দিয়ে তাকে নিজের বিষয় বলে মনে করছে কি না, সমাজের ব্যাপক অংশের নান্দনিক বোধ নতুন মাত্রায় বিকশিত হচ্ছে কি না, সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ হচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে।


মন্তব্য