kalerkantho


গল্প

বাবুর একাকিত্ব ও প্রবাসীর ঈদ পুনর্মিলনী

মঞ্জু সরকার

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বাবুর একাকিত্ব ও প্রবাসীর ঈদ পুনর্মিলনী

অঙ্কন : অয়ন ভট্টাচার্য

আইওয়ায় সিলেটি বাবুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হওয়াটা নিজের কাছেও ছিল অকল্পনীয়, যা অনেকটা কাকতালীয় ঘটনা। আমি আইওয়ায় গিয়েছি সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রগ্রামে একজন মনোনীত লেখক হিসেবে। উঠেছি আইওয়া হাউস হোটেলে। থাকব তিন মাস। যাওয়ার পর যখন টানা প্রায় দশ দিন ইংরেজি বলে বলে দাঁতে ব্যথা, ডাল-ভাত ও দেশি মানুষের খোঁজ না পেয়ে আপন বাঙালিত্ব নিয়ে বড্ড মুষড়ে পড়েছি, তখন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য ইন্ডিয়া ক্যাফে নামের একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। ভেবেছিলাম, ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের কর্মীরা ইন্ডিয়ানই হবে, চেহারাও সে রকম। ওয়েটার ও ক্যাশ কাউন্টারের যুবকটি কাস্টমারদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে চোস্ত ইংরেজিতে। কিন্তু ক্যাশে বসা যুবকটির সঙ্গে উর্দি পরা বেয়ারাটির বাংলা কথা শুনে চমকে উঠি। ক্যাশের যুবকটিকে জিজ্ঞেস করি—এই মিয়া, তোমরা কি বাংলাদেশি?

এভাবে বাবুর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রথম। লম্বা একটা ইসলামী নাম তার আছে, কিন্তু ডাকনামেই সে দেশি ও বহু বিদেশির কাছেও পরিচিত। একা সে নয়, এই রেস্টুরেন্টের সাতজন কর্মীই বাংলাদেশি, সিলেটের বিয়ানীবাজারে বাড়ি। মালিক ইন্ডিয়ান-পাঞ্জাবি-আমেরিকান হলেও আমেরিকানদের ইন্ডিয়ান খাবার খাওয়াচ্ছে বাঙালিরাই। মূল দায়িত্বে আছে প্রধান শেফ বড় ভাই। তার আপন ভাই ও ভাগ্নে ছাড়াও দেশি লোকজন একত্র করেই চালু করেছে রেস্তোরাঁটি। সবাই মিলে থাকেও একই বাড়িতে। নিজেদের দুই গাড়িতে করে যাতায়াত, রেস্টুরেন্টের  মালমসলা কেনাকাটা এবং কিচেন থেকে ক্যাশ—সব কিছুই নিয়ম করে সামলায় নিজেরাই।

সেদিনই দুপুরে ক্যাফের ক্লোজিং আওয়ারে বাবু সবার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেয়। প্রধান শেফ বড় ভাই ষাটোর্ধ্ব অভিজ্ঞ মানুষ, ইংরেজি দূরের কথা, শুদ্ধ বাংলাটাও ভালো বলতে পারে না। তার আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়। জোর করে নিজেদের সঙ্গে মরিচ-পেঁয়াজসহ ডাল ভর্তা ও শাক-ভাত খাওয়ায়। রেস্তোরাঁ চালুর পর থেকে দেশি খদ্দের ক্বচিৎ দু-একজনের বেশি পায়নি। আমাকে আগামী দু-আড়াই মাস নিয়মিত পাবে বলে খুশি হয় সবাই। খুশির কারণটা তাদের পক্ষে অর্থনৈতিক নয় মোটেও। প্রথম দিন খাইয়ে সিদ্দিক বিল তো নেয়ই না, স্বয়ং বড় ভাই প্রস্তাব দেয়, ‘ডলার দিয়ে খাইবেন না, ক্লোজিং আওয়ারে আইসা গল্পেসল্পে একলগে খাইতাম। নিউ ইয়র্কে দেশি মানুষের অন্ত নাই, কিন্তু আইওয়ায় বড় আকাল।’

ইন্ডিয়া ক্যাফের দেশিদের মধ্যে বাবুই বয়ঃকনিষ্ঠ। তার সমবয়সী অবশ্য একজন আছে, গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর গত বছর দেশে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে। এখন বাবুই একমাত্র ব্যাচেলর। বাকি সবাই গ্রিন কার্ডহোল্ডার, দেশে সবারই স্ত্রী-সন্তান আছে। আমেরিকান রোজগারে দেশে বাড়ি-সম্পত্তিও করেছে কেউ কেউ। কিন্তু দেশে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিয়েই বাবু সেই যে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছে, দশ বছরেও আর বাড়ি যায়নি। কারণ পাসপোর্টে একটা ভেজাল থাকায় এখনো গ্রিন কার্ড পায়নি সে। ওয়ার্ক পারমিট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তার। নিউ ইয়র্কে থেকে আট বছর নানা রকম কাজ করেছে। বড় ভাই তাকে নিউ ইয়র্ক থেকে ধরে এনে ক্যাফের কাজে লাগিয়েছে। ক্যাশিয়ার, মেসিয়ার, ড্রাইভার, ম্যানেজার—বড় ভাই যখন যে দায়িত্ব দেয় পালন করে সে। দেশিদের মধ্যে আমেরিকান কাস্টমার সামলাতে বাবুর ইংরেজি কাণ্ডজ্ঞানও সহকর্মীদের চেয়ে ঢের বেশি।

অবিবাহিত বাবুর একাকিত্বকে সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে ফেঁসে গেছি। এখন আমেরিকায় থেকে তার বিয়েরও ঘটকালি করতে হবে আমাকে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে, সহকর্মীদের মতো বউ-বাচ্চা দেশে রেখে একা আমেরিকায় থাকবে না। আমেরিকায়ই বিয়ে করে পারিবারিক জীবন শুরু করবে। বাঙালি পরিবারের উপযুক্ত এক পাত্রীর সন্ধান পেয়েছে সে আইওয়ায়। আমেরিকায় জন্ম মেয়ের। এই মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারলে তার গ্রিন কার্ড ও আমেরিকান সিটিজেন হওয়াটাও ত্বরান্বিত হবে। মেয়েকে রাজি করানোর চেষ্টা করবে বাবু, আমাকে ঘটকের দায়িত্ব পালন করতে হবে তার বাপের কাছে।

জীবনে ঘটকালি না করলেও সিদ্দিকের প্রস্তাবে সরাসরি না করতে পারি না। সব ব্যবধান সত্ত্বেও বাবুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এরই মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো হয়ে গেছে। ক্যাফের ল্যান্ডফোন কিংবা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে প্রতিদিনই আমার হোটেলরুমে ফোন করবে, রুমে না থাকলে মেসেজ দিয়ে রাখবে। কোনো দরকারি কথা নেই, তবু কথা বলাটাই যেন জরুরি। ‘কী লেখক ভাই, রুমে মাছি মারেন, না হাত মারেন? আইজ বড় ভাই বিফ রাঁধছে, চইলা আসেন। কাল আপনারে নিয়া আইওয়া নদীতে মাছ ধরতে যাইয়াম। দেশে পেপারে লেইখা দিয়েন বাঙালিরা আমেরিকায় আইসাও কেমনে মাছ ধরে। প্রগ্রামের নামে সারা দিন বান্ধবী লইয়া কই কই ঘোরেন? দেইখা ফেলাইছি কিন্তু। ডিনারে চইলা আহেন, আমেরিকান মাল দেখামু একটা।’

সাপ্তাহিক ছুটির দিন, এমনকি দুপুরের বিরতির সময়ও সুযোগ পেলে বাবু গাড়ি হাঁকিয়ে আমার হোটেলে আসে। সরাসরি আমার রুমে এসে নক করে। আমি সময় দিলে আমাকে গাড়িতে নিয়ে আইওয়ার পার্ক কি নিকটস্থ কাউন্টির ফার্ম, ভুট্টাক্ষেত, বন দেখাতে নিয়ে যায়। রুমে বসলে ফ্রিজ থেকে বিয়ার অথবা অল্পস্বল্প হুইস্কি নিয়ে পান করি দুজনে, মন খুলে গল্প করি। বাবু যেন দশ বছরে আমেরিকায় তার একাকিত্ব, অভিজ্ঞতা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব, বিয়ের স্বপ্ন—সব কিছুই শেয়ার করার উপযুক্ত বন্ধু পেয়েছে এত দিনে। বয়সে অন্তত পনেরো বছরের কনিষ্ঠ যুবকটিকে প্রশ্রয় দিয়ে কতটা ভুল করেছি জানি না, তবে ইন্ডিয়া ক্যাফের দেশি খাবার স্বল্প মূল্যে, অনেক সময় বিনা মূল্যে খেয়ে যে তৃপ্তি লাভ হচ্ছে, তার বিনিময়ে এটুকু তো করতেই হবে।

ক্যাফেতে গেলে অবশ্য অন্য সবার সঙ্গে আমি খাতিরের সম্পর্কটা বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমার আবাসিক হোটেল থেকে পাঁচ-সাত মিনিট হাঁটা দূরত্বে ইন্ডিয়া ক্যাফে। খেতে এবং অবসর পেলে অনেক সময় এমনিতেই কিচেনে ঢুকে কর্মরত বড় ভাই ও অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। ওরাও খুশি হয়, কাজের ফাঁকে খোশগল্প জমাতে চেষ্টা করে।

বড় ভাইকে বলি, সারাটা জীবন ভালো খাবারের গন্ধ শোঁকেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় রোজগার বাড়ে, কিন্তু চুপচাপ থাকলে কী চিন্তা করেন, বলেন তো বড় ভাই।

‘জাগন থাকলে মনের মইদ্যে কত কী ভাবের উদয় হয়! ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখি।’

আমি জানতে চাই, মনের মধ্যে দেশ না বিদেশ, আমেরিকার কী বিষয় খেলা করে?

‘আমেরিকায় মদ, মেয়েমানুষ ছাড়া ফুর্তি করার কী আছে? এই হারামখোরগো দেশের চেয়ে পরকালের চিন্তা করা সওয়াবের।’

চুপচাপ থাকলে দেশের কথা মনে পড়ে না?

‘তা তো মনে হয়ই। নিজের দেশ-পরিবার ছাড়া সুখের জায়গা আর কী আছে?’

‘ও জার্নালিস্ট ভাই, আমাদের ধড়টা পইড়া আছে আমেরিকায়, কিন্তু মন ঘুইরা বেড়ায় দেশে। মোবাইলে ফ্যামিলির সঙ্গে কানেকশন না থাকলে বিদেশে থাকলেও ধড়ফড়ানি ছাড়া আর কিছু থাকত না। মোবাইল-ইন্টারনেটের জমানা আসার আগে দেশে বউয়ের কাছে একটা চিঠি লিখতে গিয়া কত রাত জাইগা ছিলাম। সেই সময়ে আপনার মতো লেখক এ দেশে আইলে আমার মতো প্রবাসীর চিঠি লেইখা দিয়াও মেলা ডলার কামাইতে পারতেন, ভাই।’

মুরশিদের কথায় মনে পড়ে, কলেজে উঠেও এক বন্ধু পছন্দের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার জন্য আমার কাছ থেকে প্রেমপত্র লিখে নিয়েছিল একদিন। আসলে মিথ্যা বলেনি মুরশিদ, তথ্য-প্রযুক্তি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটলে লেখক হিসেবে হয়তো দাম কিছুটা বেশি থাকত। তার পরও দেশি মানুষ ও দেশের সঙ্গে সংযোগের একটা মাধ্যম ভেবেই হয়তো দেশি ভাইয়েরা আমাকে বেশ খাতির দেখায়।

মোট সাতজন মানুষ একই হোটেলে কাজ করে, একই বাড়িতে থাকে; তার পরও এই সাতজনের মধ্যে গ্রুপিং-কোন্দল লক্ষ করি। বাবু ও মুরশিদের মধ্যেও যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও হিংসার সম্পর্ক বেশ সক্রিয়, সেটা মুরশিদই প্রথম বুঝিয়ে দেয়। আমার প্রতি বাবুর টান ও বিশেষ পক্ষপাত সহকর্মীদের চোখেও ধরা পড়েছে এবং সবার তা ভালো না লাগাই স্বাভাবিক। অপছন্দকারীদের মধ্যে যে মুরশিদও আছে, ভাবতে পারিনি। মুরশিদও আমার বেশ ভক্ত। সে-ই একদিন প্রস্তাব দিয়ে তার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমার সুবিধামতো সময়ে গাড়ি নিয়ে আমার হোটেলে আসে। উদ্দেশ্য আমাকে নিয়ে বেড়াবে এবং তার পছন্দমাফিক ইতালির পিত্জা আর টার্কিশ কফি খাওয়াবে।

গাড়িতে তুলে মুরশিদ বাবু সম্পর্কে আমাকে কানকথা লাগায়, ‘আপনারে একটা কথা বলা দরকার, জার্নালিস্ট ভাই। বাবু কিন্তু ক্যারেক্টারলেস ছেলে, হোটেলে আমেরিকান মেয়ে কাস্টমাররা আইলে কী রকম লুক দেয়, দেখেন নাই?’

আমি হেসে বাবুর পক্ষ নিয়ে কথা বলি, ‘এটা বয়সের দোষ। বিয়ে-শাদির আগে আমরাও কি মেয়ে দেখলে কম লুক দিছি, কন? পরিবার দেশে আছে বলে সুযোগ পাইলে আমি তো এখনো দেই। আপনি দেন না?’

খালি মেয়েমানুষের দোষ না, আপনাকে বিশ্বাস করে একটা সিক্রেট কথা বলি। বাবুরে বলবেন না। বড় ভাই ওরে বিশ্বাস কইরা ক্যাশে বসাইছে, ওরে দিয়াই হোটেলের ম্যাক্সিমাম কেনাকাটা করায়। কিন্তু ওর কারণে ইন্ডিয়ান মালিকের মনেও হোটেলের আসল লাভ-ক্ষতি নিয়া ডাউট দেখা দিছে। দেশি মানুষ পাইলে কারে যে কখন ফায়ার করব!

বাবু আমার রুমে মদ্যপানের সময় ওয়াদা করিয়ে নিয়েছে, মদ্যপানের বিষয়টি কিছুতেই যেন বড় ভাইয়ের কানে না যায়। আর তার ব্যাংক ব্যালান্সের গোপন খবর বন্ধু হিসেবে একমাত্র আমি জেনেছি, সহকর্মীদের কাছে বলে দিয়ে যেন তাদের মনে ঈর্ষার আগুন না জ্বালি।

আমি বাবুর প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে মুরশিদের সঙ্গেও বন্ধুত্বের সম্পর্কটা বজায় রাখার চেষ্টা করি। দেশে আমার মেয়ের বয়সী মেয়ে আছে তার, পড়েও আমার মেয়ের ক্লাসেই। মুরশিদও পরিবার আমেরিকায় নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখে। আমার চেয়ে বয়সে বড়জোর বছর দশেকের ছোট মুরশিদের সঙ্গেই তো আমার বন্ধুত্ব হওয়ার সুযোগ বেশি।

মুরশিদের গাড়িতে থাকতেই তার মোবাইলে বাবুর ফোন আসে। কথা বলে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দেয় মুরশিদ। বেহুদা ফোন করেনি, জরুরি প্রয়োজনে আমাকে খুঁজছে সে। ইন্ডিয়া ক্যাফেতে বাংলাদেশি ভিআইপি মেহমান শাহবাজ সাহেব এসেছে। আমার সঙ্গে আলাপের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি যেন আধাঘণ্টার মধ্যেই চলে আসি, মুরশিদকেও বলে দিয়েছে সে।

বাবু তার হবু শ্বশুর এবং আইওয়ায় এই ভিআইপি বাংলাদেশির খবর আমাকে আগেই জানিয়েছিল। আমেরিকায় থেকে ইনস্যুরেন্স কম্পানির চাকরি করে এত ডলার কামিয়েছে যে দেশে ফিরে নিজেই একটা ইনস্যুরেন্স কম্পানি খুলেছে। পরিবার তার আইওয়ায় থাকে। দেশে থাকার কারণে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেনি। দুদিন আগে দেশ থেকে আইওয়ায় এসেছে সে, ইন্ডিয়া ক্যাফেতে এসে আমার খবরও জেনেছে।

দেশের এ রকম ভিআইপির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ আমার দিক থেকে প্রায় জিরো, কিন্তু পরিচয় করানোর জন্য বাবুর উৎসাহ প্রবল। কারণটা মুরশিদও জানে।

শাহবাজ সাহেব তার কম্পানি পরিচালনায় বেশির ভাগ সময় দেশে থাকলেও স্ত্রী দুই কন্যাকে নিয়ে আইওয়ায় থাকে একা। বড় মেয়ে আইওয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ছোট মেয়েও এখানকার স্কুলে। স্ত্রী আইওয়ায় কী করে বাবু বা মুরশিদ ঠিক জানে না। আগে দীর্ঘদিন বোস্টনে ছিল তারা। শাহবাজ সাহেব আইওয়ায় এলে ইন্ডিয়া ক্যাফেতেও আসে। কিন্তু পরিবার নিয়ে দেশি ভাইদের হোটেলে খেতে আসে না কখনো। একদিন ওয়ালমার্টে শপিং করার সময় শাহবাজ সাহেবের পরিবারকে দূর থেকে দেখেছে বাবু। তার ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেয়েকে বাপকে আব্বু ডেকে বাংলায় কথা বলতেও শুনেছে। স্বামী বেশির ভাগ সময় দেশে থাকে বলে দুই মেয়েসহ সংসার স্ত্রী একাই সামলায়। বাবুর সঙ্গে পরিচয় থাকলে, তাকে ফোন করলেও সে কতভাবেই একলা মেয়েমানুষের সংসারকে সাহায্য করতে পারে। এই চিন্তা থেকে শাহবাজ সাহেবের জামাই হওয়ার প্রস্তাবটা প্রথমে ঠাট্টার ছলে মুরশিদকে দিয়েই দিতে চেয়েছিল।

মুরশিদ এই ঘটনাকেও বাবুর চরিত্রদোষ প্রমাণের জন্য আমাকে বলে, ‘চিন্তা করেন, কোটিপতি মানুষের ইউনিভার্সিটিপড়ুয়া আমেরিকান মাইয়া, তোর মতো গ্র্যাজুয়েট হোটেল ওয়ার্কাররে জামাই বানাইব! কিছু ডলার জমাইয়া ওর মাথাটা বিগড়ায় গেছে। তুই কী, আর শাবাজ সাব কী। তা-ও যদি গ্রিন কার্ডটা থাকত!’

সহকর্মীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও শাহবাজ সাহেবের সঙ্গে খাতিরের সম্পর্ক বজায় রাখতে মুরশিদের আগ্রহও কম নয়। গাড়ি ঘুরিয়ে আমাকে নিয়ে কর্মস্থলের দিকে ছুটে চলে।

বিকেলে ক্যাফের একটি খালি টেবিলে শাহবাজ সাহেব চায়ের কাপ নিয়ে একা বসে ছিল। চেহারা দেখেও বাঙালি আমেরিকান সাহেবকে আন্দাজ হয়। বাবু ক্যাশ কাউন্টারে বসা এবং ব্যস্ত, মুরশিদই আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়।

শাহবাজ সাহেব বলে—‘হ্যাঁ, আপনার কথা শুনেছি। আমার মেয়ে আইওয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, ইউনিভার্সিটির সব বিগ প্রগ্রামের খবর রাখে। তা ছাড়া আমার ওয়াইফও কালচারাল মাইন্ডের, আপনার লেখাও পড়ে থাকতে পারে। ঢাকায় গেলে অনেক লেখক-শিল্পী বাসায় আসে।’

শাহবাজ সাহেব আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও ব্যস্ততার পরোয়া না করে আমাকে নিয়ে একটা প্রগ্রাম ফাইনাল করে ফেলেছে। দুদিন পরেই ঈদ হবে। এখানে তো ঈদের কোনো লক্ষণই থাকবে না। তবে এই স্টেটের নানা সিটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশিরা এবার সপরিবারে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নিয়েছে। আমি সময় দিলে পরিবারের সঙ্গে আমাকে নিয়েও শাহবাজ সাহেব যেতে চায় সে অনুষ্ঠানে। গেলে এ দেশে ওয়েল এস্টাব্লিশড বাংলাদেশি-আমেরিকান অনেকের সঙ্গে দেখা হবে।

বাবু ক্যাশে বসে আমার উদ্দেশে সহাস্য চোখ টিপে কী বলতে চায় বুঝি না। আমি তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে আমার হোটেলের ফোন নম্বর জেনে উঠে দাঁড়ায় শাহবাজ সাহেব। মুরশিদ আর আমি হোটেলের বাইরে পার্কিংয়ে তাকে তার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিই। দেশে একাধিক ড্রাইভার, কিন্তু আমেরিকায় এলে নিজেই গাড়ি চালায়, সে দেশে থাকলে স্ত্রী চালায় গাড়ি।

শাহবাজ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় আমার কাছেও মনে হয় এত দিন যেন জাতে ওঠার একটি সিঁড়ি পেয়ে যাওয়া। উপযুক্ত দেশি মানুষের অভাবে এত দিন হোটেলের বয়-বাবুর্চিদের সঙ্গে মিশে দেশীয় সংস্কৃতির অভাব ঘোচাতে চেয়েছি। শাহবাজ সাহেব তাই দেশের একজন সম্মানিত লেখককে আসল দেশি আমেরিকানদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ধরে নিয়ে যাবে। ঘরের সংস্কৃতিমনা স্ত্রী-কন্যার সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দেবে। ইন্ডিয়া ক্যাফের কোনো দেশি ভাইকেই শাহবাজ সাহেব ঈদ পুনর্মিলনীর অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়নি। আমি দাওয়াত পাওয়ায় বাবু আমার চেয়েও খুশি। তার বিয়ের জন্য আমি ঘটকালি করছি, সুখবরটা সে বড় ভাইকেও জানিয়ে দেয়।

বাবু যদি ওয়ালমার্টে একবার মাত্র দেখে শাহবাজকন্যার প্রেমে পড়ে থাকে, তাকে দোষ দেওয়া যায় না। প্রথম দেখার মুগ্ধতাবোধ ভুলতে পারছে না সে। আমাকে মেয়ে সম্পর্কে বলেছে শুধু, ‘আমেরিকায় জন্ম নিছে এক বাঙালি মাইয়া, সারা জীবন মনে থাকব।’ এই মেয়েকে সারা জীবনের জন্য স্ত্রী হিসেবে কাছে পেলে বাবু সুখী হবে অবশ্যই, মেয়েও সুখী হবে। কারণ ব্যাংক ব্যালান্সের দিক থেকে এখনই বাবু প্রায় কোটিপতি। কাজেই শাহবাজ সাহেব তাকে জামাই বানালে মেয়েজামাইকে আইওয়ায় রেখেও সে সস্ত্রীক দেশে থাকতে পারবে। বছরে ছয়-সাতবার আইওয়া-বাংলাদেশ করতে হবে না। নিউ ইয়র্কে তাদের বাড়িও আছে, সেখানেও থাকতে পারবে। আর বাবুকে জামাই বানালে তার মেয়ে যে কোনো দিক দিয়ে অসুখী হবে না, তার ষোলো আনা গ্যারান্টি বাবুর হয়ে আমি শাহবাজ সাহেবকে দিতে পারি। বিয়ের পর শাহবাজকন্যা যত খুশি লেখাপড়া করুক, চাকরিবাকরি করুক, বাধা দেবে না বাবু। শুধু পরিবারে নিজেদের ধর্ম ও কালচারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমি বাবুকে আগাম হতাশ করার জন্য বলেছি অবশ্য, ‘দেখো, ঘটক হিসেবে আমি দেশে একটাও শুভ বিবাহ ঘটাতে পারি নাই। বাস্তবে তো নয়ই, এমনকি লেখার মধ্যেও পারি না। সফল হব এমন আশা না করাই ভালো।’

‘আপনি চেষ্টা করেন, বাকিটা আল্লার ইচ্ছা।’

আমেরিকায় এসে পুরো রোজার মাসটা থেকেছি, টেরই পাইনি যে রোজা কখন এলো-গেল। দেশে যেমন রোজার পবিত্রতা রক্ষার দায়ে কেউ রাস্তায় প্রকাশ্যে ধূমপান করে না, ছোটখাটো চায়ের দোকানও পর্দাঘেরা, এ দেশে সে রকম কিছুই নেই। এমনকি ইন্ডিয়ান ক্যাফেতেও ইফতারের টাইম বলে কিছু নেই, রোজাদাররা কিচেনের ভেতরে কাজ করতে করতেই ইফতার করেছে। রোজা না রেখেও তাদের ইফতারে একদিন শরিক হওয়ার পর এ সময়টা এদের অ্যাভয়েড করে চলেছি নিজের বেরোজদারি চরিত্র আড়াল করার জন্যই। রোজার মাসে সিদ্দিক রেস্তোরাঁয় দুপুরের লাঞ্চ খেতে দেয়নি আমাকে, প্যাকেট করে দিয়ে বলেছে, ‘হোটেলে গিয়া খান। রোজা রাখেন না জানলে বড় ভাই মাইন্ড করব।’ বড় ভাইয়ের ভয়ে রোজাদারের ভান করাটা ভালো লাগেনি। রোজার দিনে দুপুরে ওদের হোটেলে লাঞ্চ করাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

ঈদের দিনটাও আলাদাভাবে টের পেতাম না। কিন্তু সকালে শাহবাজ সাহেব হোটেলে ফোন করে ঈদ মোবারক জানায়। আমাকে বাসায় এবং ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিকেল চারটায় হোটেলের সামনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে সে। আমিও রাইটিং প্রগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করে স্বদেশিদের ঈদ পুনর্মিলনীতে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকি।

আমেরিকানদের মতো সময়সূচি মেনে শাহবাজ সাহেব ঠিক চারটায় গাড়ি নিয়ে আসে। তার গাড়িতে চড়ে টুকটাক কথার মধ্যে পরিচয়টা বিস্তৃত হয়। বয়সে আমার চেয়ে দু-চার বছরের বড় কিংবা ছোট হতে পারে। যৌবনে ছাত্রাবস্থায়ই আমেরিকায় এসেছে সে। এখানে পড়াশোনা করার আগে ট্যাক্সি চালিয়েও রোজগার করেছে। ইনস্যুরেন্সের ওপর ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে আমেরিকায় একাধিক কম্পানিতে চাকরি করেছে। আমেরিকান সিটিজেন হয়েছে এ দেশে আসার পাঁচ বছর পরই। বিয়ের পর বোস্টনে ছিল অনেক দিন। বাড়িও কিনেছিল একটা। সে বাড়ি বেচে দিয়ে নিউ ইয়র্কে বাড়ি কিনেছে। ভাড়া দিয়েছে সে বাড়ি। নিউ ইয়র্কে তার এক ভাইও আছে। তার দুই মেয়েরই জন্ম আমেরিকায়। বড় মেয়ে গত বছর আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ছে। ছোট মেয়ে স্কুলে। মেয়েদের কারণে আইওয়ায় বাসা নিতে হয়েছে। স্ত্রী শিল্পী মানুষ, আইওয়ায়ও পরিচিত সার্কেল গড়ে উঠেছে তার। সে-ই সামলে রাখছে আমেরিকার সংসার। শাহবাজ সাহেবকে দেশে বেশি সময় থাকতে হয়। কারণ বছর দশেক আগে, বিএনপির শাসনামলে, তার আত্মীয় অর্থমন্ত্রীর উৎসাহে দেশে একটা ইনস্যুরেন্স কম্পানি খুলেছে। সেই কম্পানির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সে, মতিঝিলে হেড অফিস। দেশে থাকলে অফিসে ও গুলশানে ভাড়া বাড়িতে দিনে-রাতে কম্পানির কাজ নিয়েই আছে। প্রতিবছর স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে দেশে যায় কিছুদিনের জন্য। মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে-শাদি করলে শেষ বয়সটা দেশেই কাটাবে—এ রকম ইচ্ছা।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছাকাছি এক আবাসিক এলাকার চারতলা লম্বা ফ্ল্যাটবাড়ির পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে লিফটের বদলে সিঁড়ি ভেঙে আমাকে নিয়ে দোতলায় ওঠে শাহবাজ সাহেব। চাবি দিয়ে দরজা খুলতেই সাজানো ড্রয়িংরুমে ঢুকে বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের সুর শুনতে পাই।

এ দেশে আসার পর এই প্রথম একজন শাড়ি পরা বাঙালি রমণীকে দেখে ভালো লাগে। একটু স্থূল গড়ন হলেও বেশ স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। পরিচয়ের পরই তাকে ভাবি ডাকি এবং তার শাড়ি পরা দেখে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করি। ইন্ডিয়ান বেশ কিছু মহিলা আছে, যারা শাড়ি পরে। বাসায় ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সুর বাজার কারণটিও জানতে দেরি হয় না। মিসেস শাহবাজ নিজেও ক্লাসিক্যাল সংগীতের শিল্পী। কিছু আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রী আছে তার, তাদের শেখায়। ড্রয়িংরুমেই স্কুল চলে।

মেয়ে দুটির সঙ্গে আলাপ হয়। বড়টি শোভা, মায়ের মতো মুটকি গড়নের দিকে যায়নি। বাপের মতো লম্বা ধারালো চেহারা পেয়েছে। মায়ের মতো কালো চুল, স্কার্ট পরেছে আজ। (মনে মনে ভাবি, বাবুর প্রেমে পড়াটা স্বাভাবিক; কিন্তু সে কি এই মেয়ের পার্টনার হওয়ার যোগ্য?) ছোটটি আমার মেয়ের চেয়েও ছোট। ইংরেজিতে বলে, নাইস টু মিট ইউ। জানতে চায়, আমি রাইম লিখি কি না।

বড়টি এবং সম্ভবত তার মা-ও আইডাব্লিউপির ওয়েব পেজে আমার পরিচয় দেখেছে। মা মুখের সামনে বলে দেয়, আমার কোনো লেখা পড়েনি। তবে বাংলা সাহিত্যের অনেক নামি-দামি উপন্যাস পড়েছে সে। দেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের বই কিছু পড়েছে, অত ভালো লাগেনি। আর আইওয়ায় আসার আগে সুনীল গাঙ্গুলির ‘কত ছবির দেশ’ পড়েছিল।

আমি বলি, এরপর দেখা হলে আমার লেখা বই আপনাকে দেব, ভাবি। আপনার মতো একজন শিল্পী পাঠক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আর আপনার ক্লাসিক্যাল মিউজিকও শুনব একদিন। এখানে আসার পরই সারার পিয়ানো কনসার্টে গিয়েছিলাম, দারুণ লেগেছে। এত হাততালি জীবনেও শুনিনি।

সেই কনসার্টে মিসেস শাহবাজও মেয়েদের নিয়ে গিয়েছিল। আর বোস্টনে রবিশঙ্করের সরোদ শুনতে আইওয়ার চেয়ে বেশি ভিড় দেখেছে এবং দীর্ঘতর আমেরিকান হাততালিও শুনেছে।

শাহবাজ সাহেব তার পরিবারের সঙ্গে খাতির জমানোর সুযোগ দেয় না আর। কারণ দুই ঘণ্টার ড্রাইভ পেরিয়ে যেতে হবে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে। উদ্যোক্তারা বলে দিয়েছে, সবার বাড়িতে যে ঈদের খাবার করবে, তা-ই নিয়ে যেতে হবে অনুষ্ঠানে। মিসেস শাহবাজও খিচুড়ি-মাংস করেছে। শাহবাজ সাহেব নিজেই খিচুড়ির পাতিল নিচে নামিয়ে গাড়িতে তোলে। ব্যস্ততার মধ্যেও বাসায় আমাকে চা-বিস্কুট খেতে দেয়।

ভবিষ্যতে এ বাড়িতে আবারও আসার এবং খাওয়ার আশা নিয়ে শাহবাজ সাহেবের পরিবারের একজন হয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠি। আমি চালক শাহবাজ সাহেবের পাশে, আর দুই মেয়েকে নিয়ে মিসেস শাহবাজ পেছনের সিটে।

এর মধ্যে আইডাব্লিউপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে শরিক হওয়ায় আইওয়ার ভূগোল ও রাস্তাঘাট অনেকটাই চেনা হয়ে গেছে। শাহাবাজ দ্যাস মইনসে যাওয়ার হাইওয়ে ধরে চলতে থাকে। কিন্তু দ্যাস মইনসে যাবে না, তার আগেই এক রাস্তায় টার্ন নিয়ে মাঝামাঝি এক শহরে যাবে। দ্যাস মইনস, আইওয়া সিটি এবং প্রতিবেশী স্টেটের কিছু শহর থেকেও বেশ কিছু বাংলাদেশি আসবে।

রাস্তার দৃশ্য অনেক দেখা হয়ে গেছে বলে আমি বরং নিজের ও বাবুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। শাহবাজ সাহেবের জামাই হতে পারলে তার আমেরিকান নাগরিক কন্যার সুবাদে হতভাগ্য বাবুরও অল্প সময়ে আমেরিকান নাগরিক হওয়াটা নিশ্চিত হবে। আর বাবু আমেরিকায় সুপ্রতিষ্ঠিত হলে প্রগ্রাম শেষে আমাকেও আমেরিকায় রেখে দেওয়ার ব্যাপারে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে। দেশে গুলশান-ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকার বাসিন্দা কোনো পরিবারের সঙ্গে আমার মতো গরিব লেখকের সামাজিক সম্পর্ক নেই সত্য, কিন্তু আমেরিকায় শাহবাজ পরিবারের সঙ্গে অবশ্যই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। শাহবাজ এক সপ্তাহ পরই দেশে চলে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকবে আশা করি। আগে পরিচয় হলে ইতিমধ্যে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারত। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ভাবিকে ঠাট্টাচ্ছলে বাবুর প্রস্তাবটাও দেওয়া যেত। শোভার যদি ছেলেকে পছন্দ হয়, এদের দৃষ্টিতে বাবু বর হিসেবে একেবারে তুচ্ছ না-ও হতে পারে। ব্যাংকে এর মধ্যে লাখখানেক ডলার জমিয়ে ফেলেছে, রেস্টুরেন্টে চাকরি করলেও যথেষ্ট স্মার্ট, নিজে গাড়ি হাঁকিয়ে চলে। সমস্যা, পেছনের সিটে শোভা মা ও ছোট বোনের সঙ্গে ইংরেজিতেই কী বিষয়ে যেন বকবক করছে। মহিলাও মেয়েদের সঙ্গে ইংরেজিতেই কাথাবার্তা বলছে (আমাকে শোনাতেই নাকি?)। বেশিক্ষণ ইংরেজি শুনলে আমার কান-মন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শুনেও শুনি না। বাবুর কাছে এটা মেয়ের গুণ না দোষ হিসেবে বিবেচিত, কে জানে।

আমি বরং শাহবাজ সাহেবের সঙ্গে টুকটাক কথা বলি। ম্যাপ দেখে এবং পথে দু-একবার পুলিশের সাহায্য নিয়ে দুই ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে ছোটখাটো এক শহরের কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে নামি আমরা। ইতিমধ্যে কমিউনিটি সেন্টার অনেকটাই ভরে গেছে। হলের বাইরেও একটি ছোট পার্কে খেলাধুলা করছে কিছু বাঙালি ছেলে-মেয়ে। হলের একটা বড় টেবিলে সেমাই, পোলাও থেকে শুরু করে নানা রকম খাবার। ছোট মঞ্চও রয়েছে। লাউড স্পিকারে বাজছে ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। হলের চেয়ার-টেবিল দখল করে অন্তত শখানেক মানুষ; নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ের সংখ্যাই বেশি। আমরাও দলে যোগ দিই।

শাহবাজ সাহেব ও তার স্ত্রীও পূর্বপরিচিত অনেককেই খুঁজে পায়। তাদের সঙ্গে ঈদ মোবারক ও কোলাকুলি করে। তাদের মেয়ে দুটিও সমবয়সী সাথি পেয়ে গেছে, কিন্তু আমি স্বদেশিদের ভিড়ে পৌঁছেও একা বোধ করি। চিনি না কাউকে। আমার ধারণা হয়েছিল, শাহবাজ সাহেব বাংলাদেশিদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে এক বাঙালি লেখককে উপস্থাপন করবে, আমেরিকার সরকার যার তিন মাসের ব্যয়ভার বহনের দায় নিয়ে এ দেশে অতিথি করে এনেছে। কিন্তু সে রকম কোনো উদ্যোগ তাদের মধ্যে দেখি না। অন্যদিকে মঞ্চে লাউড স্পিকারে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ছোটদের জন্য আনন্দ অনুষ্ঠান শুরু হয়। কয়েকটি বাচ্চা কোরআন তিলাওয়াত করে, কবিতা আবৃত্তি করে। দুটি বালক বাংলা ও ইংরেজিতে ‘আমরা করব জয়, উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে’ গান করে। শাড়ি পরে এক শিশুশিল্পী নৃত্য পরিবেশন করে। প্রচুর হাততালি বাজে। একজন আমেরিকান কায়দায় কুইজ পরিচালনা করে, তাতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিখ্যাত অভিনেতা ও শিল্পীদের সম্পর্কে স্বদেশিদের আগ্রহ জন্মানোর জন্য। হলঘর আটটা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সেলফ সার্ভিসের নিয়ম নিয়ে নিজেদের খাবার নিয়ে খেতে অনুরোধ জানানো হয়।

আমি আপন উদ্যোগে ভিড়ে মিশে অনেকের সঙ্গে আলাপ করি। একজন রিটায়ার্ড জয়েন্ট সেক্রেটারি, আমেরিকায় তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে থাকে, বেড়াতে এসেছেন। আমেরিকা ভ্রমণের ওপর বইও লিখেছেন। আমেরিকার প্রায় সব স্টেটই দেখা হয়েছে। আমি ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রগ্রামে রাইটার হিসেবে এসেছি শুনেও আমার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখান না।

শহবাজ সাহেবও দু-চারজনের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়। এর মধ্যে বাবুর বয়সী এবং চেহারাও অনেকটা সে রকম একজনের, আইওয়ায় ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য এসেছে, বিয়েও করেছে এখানকার এক বাংলাদেশি আমেরিকানের মেয়েকে। দূরে বসা গল্প করা যুবতিকে সে দেখিয়ে দেয় নিজের স্ত্রী হিসেবে। আমি আইওয়া ছাড়ার আগে মঞ্জুরুল আমার হোটেলে গিয়ে আলাপ করার আগ্রহ দেখায়, বাসায়ও আমন্ত্রণ জানাবে বলে।

এইটুকু প্রাপ্তি ছাড়া বাঙালিদের ঈদ পুনর্মিলনী সভায় মনে রাখার মতো আর কিছুই ঘটে না।

খাওয়ার সময় আমি ওয়ান টাইম প্লেটে মিসেস শাহবাজের রান্না করা ভুনা খিচুড়ি ও মাংস নিই, অন্য অচেনা আমেরিকান বাঙালির রান্না পোলাও এবং শেষে সেমাই-পায়েসও নিই একটু। পেপসি-ফান্টার বোতল রাখা হয়েছে, কিন্তু এই কমিউনিটি হলে বার নেই হয়তো, তার জন্য কারো আক্ষেপ আছে বলেও মনে হয় না। কারো কাছে বিদায় না নিয়ে ফেরার জন্য শাহবাজ সাহেবের গাড়িতে গিয়ে উঠি আবার।

প্রায় আড়াই ঘণ্টার ড্রাইভ শেষে মাত্র দু-আড়াই ঘণ্টার অগোছালো এক অনুষ্ঠানে সময় কাটিয়ে এবার ফিরতি যাত্রা। পথে সবাই এত ক্লান্ত থাকি, কারো সঙ্গে তেমন কথা হয় না।

শাহবাজ সাহেব নিজের বাসায় যাওয়ার আগে আমাকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য আমার হোটেলে আসে। ছোট মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। বড়টাও ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে। আমি গাড়ি থেকে নেমে হোস্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, ‘খুব ভালো কাটল আমেরিকান ঈদ। বেশ এনজয় করেছি আপনাদের কম্পানি। ও ভাবি, আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ আপনার খিচুড়ি ও মাংসের জন্য। বেশ লেগেছে। এই যে আমার একটা কার্ড রাখেন, শাহবাজ ভাইকেও দিয়েছি, এখানে আমার ই-মেইল ও হোটেলের ফোন নম্বরও আছে। আপনি যেকোনো প্রয়োজনে ডাকলে বাসায় গিয়ে হাজির হব। শোভা, তোমাকেও শুভ রাত্রি। আশা করি, আবার দেখা হবে।’

শেষের এই গায়ে পড়া খাতির দেখানো কথাবার্তা বাবুর কথা চিন্তা করেই। তার স্বামীর অনুপস্থিতিতেও মহিলার সঙ্গে যদি সম্পর্কটা কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে বাবুর মন রক্ষার জন্য মেয়ের বিয়ে প্রসঙ্গে তার মাকে বলব এবং স্বয়ং মেয়ের মনোভাবটা জানার চেষ্টা করব। কিন্তু মধ্যরাতে গাড়িতে আমার এই গায়ে পড়া ভাবটা শাহবাজ সাহেব কতটা পছন্দ করেন, বুঝতে পারি না।

পরদিন সকালে হোটেল খোলার আগেই সিদ্দিক সরাসরি আমার রুমে এসে পড়ে।

ঝটপট বলে, ‘পুনর্মিলনে আমার মিলনের রাস্তাটা কতটা পরিষ্কার করলেন? দেখছেন তো শাবাজ সাবের বিবি-মাইয়ারে? সুন্দর না?’

আমি তাকে সান্ত্বনা দিই, ‘মিয়া, তোমার জন্য ওই পরিবারের সঙ্গে খাতির করলাম। তোমার শাবাজ সাহেবের বউরেও কার্ড দিছি, উনি আমারে শিগগির ফোন করে ডাকবেন। অথবা কথা বলার জন্য হোটেলেও মেয়েকে নিয়ে চলে আসতে পারেন।’

‘মেয়ের বিয়ার প্রস্তাব কি তুলতে পারছিলেন?’

‘আরে গর্দভ, প্রথম দিনেই কি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া যায়? আগে তো ভালো করে জানতে হবে, মেয়েরও কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে কি না, ডেট করে কি না, মেয়ে তো দেখলাম ইংরেজি ছাড়া বাংলাটাও ভালো বলতে পারে না।’

‘নো প্রবলেম। আমিও তারে সারাক্ষণ ইংলিশ গাইল দিয়া লাভ মেকিং করতে পারুম।’

‘কিন্তু তার বাপ-মায়ের কী রকম জামাই পছন্দ, জানতে হবে তো।’

‘শুনেন, শাবাজ সাব এ দেশে আইয়া প্রথম ট্যাক্সি চালাইছে। নিজেই হোটেলে আইসা কইছিল আমাগোরে। তার কম্পানির পলিচি নেওয়ার জন্য আমাগোরে বুদ্ধি দিতেছে। কিন্তু বউ-বিবিরে এক দিনও হোটেলে নিয়া আসে নাই। মুরশিদ একদিন বলছিল, ম্যাডাম আর মেয়েরেও ডিনারের দাওয়াত দিছিল। আনে নাই। কারণ কী জানেন? আমরা যাতে চোখ দিতে না পারি। বাঙালির পুনর্মিলনীর দাওয়াতটা আমারে দিলে আপনারে লইয়া আমিও যাইতে পারতাম। দেয় নাই কেন জানেন? দেশে যেমন টাকা আর ক্ষমতা অইলে বড়লোকরা গরিব পাবলিক থাইকা শত হাত দূরে থাকতে চায়, তার হইছে এই অবস্থা।’

‘বোঝোই তো, তার পরও তার জামাই হওয়ার স্বপ্ন দেখতেছ কেন?’

‘মেয়েটারে দেইখা ভালো লাগছে। আর আমার ব্যাংকে যে টাকা জমছে, এইটাও উনি কম্পানিতে খাটাইতে পারবেন। আমেরিকায় জন্ম হইছে মেয়ের, তার মন-মানসিকতা অবশ্যই বাপের মতো হবে না, আমার লগে একদিন আলাপ করায় দেন, দেখি নিজেই একদিন ডেটিংয়ে রাজি করাইতে পারি কি না।’

এরপর দেখা হলেই, দেখা না হলেও ফোন করে সিদ্দিক খোঁজ নেয়, শাহবাজ সাহেবের বউ-মেয়ে ফোন করেছে কি না। তাদের পক্ষ থেকে কেউ আমাকে ফোন করে না। তার বাড়ির ফোন নম্বরও জানি না। নিজের যোগাযোগ করার উপায় নেই।

পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দেখা হওয়া মঞ্জুর একদিন আমার হোটেলে আসে। আমাকে দাওয়াত করে বাসায় নিয়ে খাওয়াতে চায় একদিন। তাকে ইন্ডিয়ান ক্যাফের গল্প বলি, সে-ও চেনে দেশের সিলেটি ভাইদের। স্ত্রীকে নিয়ে খেয়েছে একদিন। মঞ্জুর আমাকে উল্টো সতর্ক করে দেয়, ‘ওদের সঙ্গে বেশি মিশবেন না, অশিক্ষিত ফান্ডামেন্টালিস্ট। শাহবাজ ভাইও সিলেটি মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ওদের ওখানে না বসার জন্য বলেছে। আইওয়ায় আরো দুটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে, ওগুলো বরং ভালো।’

মঞ্জুরকেও বাবুর ইচ্ছাটির কথা বলার সাহস পাই না। ব্যাপারটির সমাপ্তি ঘটিয়ে বাবুকে ফোনে মিথ্যা বলি—‘সম্ভব না, বাবু। একজনের কাছে জানতে পেলাম, আমি তার স্ত্রীকে কার্ড দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছিলাম বলে শাহবাজ সাহেব বউ-বিবিকে আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে নিষেধ করে দিয়েছে। তোমাদের সঙ্গে মিশি বলে আমাকেও অপছন্দ করছে তারা। কাজেই ও মেয়ের চিন্তা বাদ দাও। আমেরিকায় থাকলে আমি তোমার জন্য অন্য মেয়ে খুঁজব, এর মধ্যে তোমার গ্রিন কার্ডটাও হয়ে যাক।’

কয়েক মুহূর্তের নীরবতায় বাবুর হতাশার ভাব টের পাই। তারপর ইংরেজিতে জবাব দেয় সে, ‘শোনেন লেখক ভাই, শাবাজ সাবে তার বাঙালি-আমেরিকান মাইয়া আমারে না দিলেও প্রেসিডেন্ট বুশ এ বছরই আমার গ্রিন কার্ড দেবে ইনশাআল্লাহ। আমি ইমিগ্রেশন অফিসে খোঁজ লইছি, আমারটাও প্রসেস হচ্ছে। আর গ্রিন কার্ড পাইলে হিংসুটে বাঙালিদের লগে পুনর্মিলন নয়। খাঁটি আমেরিকান মাইয়ারে বিয়া কইরা আমেরিকায়ই পার্মানেন্টলি ফ্যামিলি চালাব। শিগগির আমার এক আমেরিকান বান্ধবীর লগেও পরিচয় করাব আপনার।’

এ ধরনের স্বপ্ন ও সংকল্প ছাড়া আমেরিকার মতো দেশে একা ছেলেটা টিকবেই বা কী করে। আমি উৎসাহ দিয়ে বলি, ‘হবে বাবু, আমেরিকায় তোমারও নিজের পরিবার অবশ্যই হবে।’


মন্তব্য