kalerkantho


অনুবাদ উপন্যাস

দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে

কাজুও ইশিগুরো
অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

প্রবেশক : জুলাই ১৯৫৬

ডার্লিংটন হল

 

বেশ কয়েক দিন ধরে আমার মাথার ভেতর একটা ভ্রমণের কথা ঘুরছে। সত্যিই হয়তো এই ভ্রমণে আমাকে যেতে হবে। যাওয়ার সম্ভাবনাটা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এই ভ্রমণকে একটা অভিযানই বলব। আমাকে একাই যেতে হবে এ অভিযানে। মি. ফ্যারাডে’স ফোর্ডের মন রক্ষার্থে যেতে হবে। দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি, ইংল্যান্ডের পল্লী এলাকার অনেকখানি পার হয়ে এই ভ্রমণ আমাকে ওয়েস্ট কান্ট্রির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ভ্রমণ আমাকে ডার্লিংটন হল থেকে পাঁচ-ছয় দিনের জন্য দূরে নিয়ে যাবে। উল্লেখ করা দরকার, সপ্তাহ দুয়েক আগে একদিন বিকেলবেলা আমি লাইব্রেরির ছবিগুলো পরিষ্কার করছিলাম। মি. ফ্যারাডে সদয় হয়ে আমাকে এই ভ্রমণের কথাটা বললেন। আমি একটা মইয়ের ওপরে উঠে ভিসকাউন্ট ওয়েবার্লির একটা পোর্ট্রেট পরিষ্কার করছিলাম। কয়েকটা বই হাতে মি. ফ্যারাডে এলেন। মনে হয়, বইগুলো তাকে তুলে রাখার জন্য আমাকে দিতে এসেছিলেন। আমাকে দেখতে পেয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানানোর সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলেন। তিনি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মাঝে পাঁচ সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে চান।

তাঁর পরিকল্পনার কথা জানানোর পর বইগুলো একটা টেবিলে রেখে আমার মনিব দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে একটা আরাম চেয়ারে বসলেন। তারপর আমাকে বললেন—স্টিভেনস, তুমি বুঝতে পারছ তাহলে, আমার বাইরে থাকার পুরোটা সময় তুমি এই বাড়িতে বন্দি থাকো তা আমি আশা করি না। গাড়িটা নিয়ে কোথাও চলে যাও না কেন? কয়েক দিন থেকে আসো কোথাও! তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি ছুটি পেলে ভালোই কাজে লাগাতে পারবে।

তাঁর কথাগুলো একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে শুনে তাত্ক্ষণিক বুঝতে পারি না, কী জবাব দেব এ রকম পরামর্শের। মনে পড়ছে, তাঁর সুবিবেচনার জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম। তবে সুনির্দিষ্ট অন্য কোনো কথা বলিনি মনে হয়। কারণ আমার মনিব আবার বলা শুরু করলেন— আমি কিন্তু সিরিয়াস, স্টিভেনস। আমি আসলেই চাই, তোমার একটা ছুটি নেওয়া উচিত। আমি গ্যাসের বিল দিয়ে দেব। তোমার মতো মানুষ এ রকম বড় বড় বাড়িতে আটকে থেকে বাসিন্দাদের শুধু সাহায্য-সহযোগিতা করে যাও। কোথাও বের হও না। তোমার নিজের এই সুন্দর দেশটা কী করে দেখতে পারো, বলো তো!

তিনি যে এবারই প্রথম এ রকম প্রসঙ্গ তুললেন, তা নয়। এ প্রসঙ্গ তাঁকে সত্যিই ভাবায় মনে হয়। এইবার তাঁর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমার তরফ থেকে একটা উত্তর মনে হয় তৈরি হয়ে যায়। মইয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে করতে আমার মনে হয়, আমার মতো পেশায় যারা কাজ করে তাদের একদিক থেকে দেশ দেখা হয়েই যায়। যদিও আমরা পল্লী এলাকা ঘুরে বেড়াতে পারি না, কিংবা ছবির মতো সুন্দর সব জায়গা দেখতে বের হতে পারি না; তবু ইংল্যান্ডকে আমরা অনেকের চেয়ে বেশিই দেখতে পারি। কারণ আমরা যেসব বাড়িতে কাজ করি, সেখানে দেশের মহান নারী-পুরুষরা জমায়েত হয়ে থাকেন। অবশ্য মি. ফ্যারাডের কাছে এ বিষয়টা এভাবে তুলতে পারি না; কেননা এ রকম কথা বললে বোধ হয় আমার খানিক অহম প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে।

আমি এটুকু বলেই নিজেকে সন্তুষ্ট রাখি, এই বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যেই এত বছর ধরে আমি ইংল্যান্ডের মহান যা কিছু আছে, সব দেখে ফেলেছি। এটা আমার জন্য বিরাট মর্যাদার বিষয়, স্যার।

মি. ফ্যারাডে আমার কথা বুঝতে পারলেন বলে মনে হলো না। কারণ তিনি আগের কথার রেশ ধরে বলতে থাকলেন— আমি সত্যি বলছি, স্টিভেনস। কেউ তার নিজের দেশের সৌন্দর্য দেখতে পারবে না, এটা তো অন্যায়। তুমি আমার উপদেশ শোনো। এই বাড়ির গণ্ডি থেকে বের হয়ে কয়েক দিনের জন্য কোথাও থেকে বেড়িয়ে এসো।

আপনাদের যেমন মনে হতে পারে, আমারও তেমনই মনে হয়েছিল। ওই দিন বিকেলে মি. ফ্যারাডে যা যা বললেন আমি মোটেই সত্যি বলে নিইনি। ইংল্যান্ডের মানুষ সাধারণত কী করে, কী করে না—সে বিষয়ে আমেরিকার কোনো ভদ্রলোকের জানার কথা নয়। সে রকম অজানারই একটা উদাহরণ তাঁর প্রস্তাবটাও। তখন আমার আপাতত তা-ই মনে হলো। তাঁর এই পরামর্শের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী দিনগুলোতে বদলে যায়। সত্যিই ক্রমবর্ধমানভাবে আমার চিন্তাভাবনার অনেকখানি দখল করতে থাকে ওয়েস্ট কান্ট্রিতে ভ্রমণে যাওয়ার প্রসঙ্গটি। একেবারে গোপন না করেই বলা যায়, মিস কেন্টনের চিঠি আসার সঙ্গে এ প্রসঙ্গও একাত্ম হয়ে যাচ্ছে। ক্রিসমাসের কার্ড বাদ দিলে গত সাত বছরে তাঁর পাঠানো এটিই প্রথম চিঠি। তবে এখনই এই মুহূর্তে বিষয়টি আমাকে পরিষ্কার করে বলতে হবে, মিস কেন্টনের চিঠি সম্পর্কে আমি কী বলতে চেয়েছি। আমি আসলে বলতে চেয়েছি, মিস কেন্টনের চিঠি আসার সঙ্গে এখানকার, মানে ডার্লিংটন হলের, কিছু পেশাগত কর্মপ্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

সত্যটা হলো, কয়েক মাস ধরে আমার কর্তব্য পালনে বারবার বেশ কয়েকটা ভুলত্রুটি করেছি। বলা দরকার, এই ভুলগুলো ব্যতিক্রমহীনভাবেই একেবারে মামুলি পর্যায়ের। তবু আশা করি, আপনারা বুঝতে পারবেন, যার এ রকম ভুলত্রুটি করার অভ্যাস নেই, তার কাছে বারবার এ রকম ভুল করা একটা বিব্রতকর ব্যাপারই বটে। ভুলগুলোর কারণ নিয়ে আমি সতর্কতামূলক সব রকমের তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখার চেষ্টাও করেছি। এ রকম ক্ষেত্রে সচরাচর যা হয়ে থাকে, আমার বেলায়ও তা-ই হয়েছে। আসল কারণের দিকে আমার নজরই যায়নি। মিস কেন্টনের চিঠির একটা ইঙ্গিত নিয়ে আমি গভীর চিন্তাভাবনায় মগ্ন হয়ে যাই। সেখান থেকেই একটা সরল সত্যের দিকে আমার চোখ খুলে যায় : আমার সাম্প্রতিক ভুলগুলোর পেছনে আসলে মারাত্মক কোনো অশুভ কারণ নেই। আসল কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ স্টাফ-প্ল্যান।

অবশ্য প্রত্যেক বাটলারেরই দায়িত্ব হলো স্টাফ-প্ল্যান তৈরিতে তার সর্বোচ্চ সতর্কতা ঢেলে কাজ করা। কে জানে কত ঝগড়াঝাঁটি, কত মিথ্যা অভিযোগ, অপ্রয়োজনীয় কর্মী ছাঁটাই, কত সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার হ্রস্ব হয়ে যাওয়ার পেছনে একজন বাটলারের স্টাফ-প্ল্যান তৈরির গড়িমসি থাকতে পারে? অনেকেই বলে, একজন মার্জিত বাটলারের দক্ষতার মূল ভিত্তি হলো ভালো স্টাফ-প্ল্যান তৈরি করা। সত্যিই বলতে পারি, আমি তাদের সঙ্গে একমত। এত বছর ধরে আমি নিজে কত কত স্টাফ-প্ল্যান তৈরি করেছি!

ঘটনা ছিল এ রকম : ডার্লিংটন পরিবারের দুই শ বছরের মালিকানার পর তাদের কাছ থেকে ফ্যারাডে সাহেবের মালিকানায় হস্তান্তরপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ফ্যারাডে সাহেব জানালেন, তিনি এখনই এই বাড়িতে বসবাস শুরু করছেন না। তাঁর আমেরিকার কাজকর্ম শেষ করতে মাস চারেক সময় লাগবে। তিনি বেশ জোর দিয়েই চাইলেন, তাঁর আগের মালিকের আমলে যারা ডার্লিংটন হলে কর্মচারী ছিল, তাদেরই যেন রেখে দেওয়া হয়। তিনি অবশ্য এরই মধ্যে এখানকার কর্মচারীদের সম্পর্কে অনেক প্রশংসা শুনেছেন। কর্মচারী বলতে অবশ্য মাত্র ছয়জনের একটা ক্ষুদ্র দল; তাদের লর্ড ডার্লিংটনের আত্মীয়রাই রেখেছেন। মালিকানা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত এবং মালিকানা হস্তান্তর করতে যত দিন সময় লাগে, তত দিন পর্যন্ত বাড়ির সব কিছু দেখাশোনা করার জন্য আগের মতোই রাখা হয়েছিল সবাইকে। দুঃখের সঙ্গেই জানাতে হচ্ছে, যখন বাড়িটা কেনা শেষ হয়ে গেল, তখন কর্মচারীদেরও ছাঁটাই হওয়ার সময় এসে গেল। তখন শুধু মিসেস ক্লিমেন্টের অন্য কর্মসংস্থানের উদ্দেশে চলে যাওয়া ঠেকানো ছাড়া আর কারো জন্য কিছু করতে ফ্যারাডে সাহেবকে বলার মতো আমার তরফ থেকে আর কিছু ছিল না বললেই চলে। ওই পরিস্থিতিতে আমার অনুতাপের কথা জানিয়ে আমার নতুন মনিবকে চিঠি লিখলাম। উত্তরে তিনি নতুন স্টাফ নিয়োগের আদেশ পাঠালেন। ‘পুরনো আলিশান ইংরেজ’ বাড়িটা দেখভাল করার মতো উপযুক্ত স্টাফ নিয়োগ করার কথা তিনি জানালেন আমেরিকা থেকে। অনতিবিলম্বে আমি ফ্যারাডে সাহেবের ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাতে লেগে গেলাম। কিন্তু সবারই জানা আছে, ইদানীং সন্তোষজনক মানের নিয়োগদান অত সোজা কাজ নয়। আর যদিও মিসেস ক্লিমেন্টের সুপারিশক্রমে রোজমেরি ও অ্যাগনেসকে পেলাম, গত বছর বসন্তে ফ্যারাডে সাহেব সংক্ষিপ্ত সফরে যখন আটলান্টিক পেরিয়ে আমাদের পারে চলে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে আমার কাজকর্ম উপলক্ষে সাক্ষাৎ হলো সে সময় পর্যন্ত আর কাউকে তেমন পেলাম না। ওই সময়ই প্রথম তিনি ডার্লিংটন হলের অদ্ভুত রকমের প্রায় ফাঁকা স্টুডিওতে আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। তবে ওই মুহূর্তে আমরা একজন আরেকজনের কাছে অপরিচিত নই। কর্মচারী নিয়োগের প্রসঙ্গ ছাড়াও বেশ কয়েকবার কিছু গুণের কথা আমার নতুন মনিব উল্লেখ করলেন, যেগুলো আমার মধ্যে পেলে তাঁর পক্ষে নির্ভরযোগ্য হবে। আমার জন্য সৌভাগ্যের হবে। সুতরাং আমার মনে হয়, তিনি আমার সঙ্গে তখন থেকেই বাস্তববাদী ভঙ্গিতে বিশ্বাস নিয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। কথাবার্তা শেষে এখানে সব কিছু তাঁর বসবাসের উপযোগী করে সাজানোর জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক কর্ম সম্পাদনের জন্য আমাকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিলেন তা নেহাত অল্প নয়। যা-ই হোক, আসল কথা হচ্ছে, ওই সাক্ষাতের একপর্যায়ে আমি কথাটা তুলতে সমর্থ হলাম যে ইদানীং উপযুক্ত স্টাফ নিয়োগ দেওয়া বেশ কঠিন। কিছুক্ষণ ভাবার পর ফ্যারাডে সাহেব আমাকে অনুরোধ করেই বললেন, আমি যেন আমার সাধ্যমতো স্টাফ-প্ল্যান তৈরি করি।

আমাদের অনেকের মতোই আমারও এখানকার পুরনো নিয়ম-নীতি বদলানোর ব্যাপারে অনিচ্ছা। তবে এ কথাও ঠিক, অনেকে ঐতিহ্যকে এমনি এমনি ধরে রাখার চেষ্টা করে থাকে। এ রকম চেষ্টার মধ্যে তেমন মহান কোনো ব্যাপার কিছু নেই। এখনকার আধুনিক সময়ে বিদ্যুৎ ও হিটিং সিস্টেম চালু হয়ে গেছে। কাজেই এক প্রজন্ম আগে যেসংখ্যক কর্মচারী ছিল, এখন আর তেমনটি দরকার নেই। সত্যিই আমার নিজের মনেই বেশ কিছুদিন এ রকম একটা ধারণা জাগ্রত ছিল : শুধু ঐতিহ্যের খাতিরে আগের মতো বিপুলসংখ্যক কর্মচারী কাজে লাগানো হলে তাদের হাতে খুব বেশি অলস সময় থাকবে এবং সেটা তাদের নিজেদের জন্যই অস্বাস্থ্যকর হবে। সেটা পেশাগত মানেরও অবনতি ঘটার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে থাকবে। তা ছাড়া ফ্যারাডে সাহেব পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, ডার্লিংটন হলে আগে যেমন ঘন ঘন অনেক মানুষজন নিয়ে সামাজিক জমায়েতের মতো অনুষ্ঠান হতো, তেমনটা তিনি করবেন না। তিনি পরিকল্পনা করেছেন, তেমন সামাজিক অনুষ্ঠান কালেভদ্রে হতে পারে। তারপর ফ্যারাডে সাহেব আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটা ঠিকমতো করার জন্য মনোনিবেশ করি।

এমনকি এখনো আমি বলব না, এটা একটা খারাপ স্টাফ-প্ল্যান ছিল। মোটের ওপর এ রকম পরিকল্পনার কারণেই তো মাত্র চারজন মানুষের পক্ষে এত এত দায়দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। তবে আপনারা একমত হবেন, যে স্টাফ-প্ল্যানে দু-চারটি ভুলত্রুটির কথা বিবেচনায় রাখা হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো স্টাফ-প্ল্যান, বিশেষ করে যখন কোনো কর্মী অসুস্থ হয় কিংবা কোনো না কোনো কারণে সাধারণ মানের চেয়ে নিচে হয়ে থাকে তার সার্বিক যোগ্যতা। অবশ্য এই বিশেষ ক্ষেত্রে আমাকে খানিকটা অসাধারণ কাজ সম্পাদন করতে হয়েছে। তবু যত দূর সম্ভব ভুলত্রুটির মাত্রা কমিয়ে রাখার ব্যাপারে মোটেও অমনোযোগী ছিলাম না। আমি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলাম, আগের দায়দায়িত্ব পালনের চেয়ে অতিরিক্ত দিতে গেলে যেকোনো রকম জোরাজুরিতে মিসেস ক্লিমেন্ট ও মেয়ে দুটির মনে জটিল ধারণা তৈরি হতে পারে, তাদের কাজের চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। স্টাফ-প্ল্যান নিয়ে কাটানো দিনগুলোতে এ রকম একটা বিষয়ে আমি বেশ অনেকটা চিন্তা খরচ করেছি যে মিসেস ক্লিমেন্ট ও মেয়ে দুটিকে যে অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে—এমন ধারণা থেকে যদি একবার সরিয়ে আনতে পারি তাহলে এই দায়িত্ব বণ্টনকেও তারা উত্তেজনাকর ও লঘু মনে করবে।

বর্তমান পরিস্থিতির এ রকম বিশ্লেষণ তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যারাডে সাহেবের কয়েক দিন আগের মহানুভব পরামর্শটা আবার আমার মাথায় চলে এলো। আমার মনে হলো, ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ভ্রমণটাকে একটা পেশাগত কাজে লাগানো যেতে পারে। মানে আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে ওয়েস্ট কান্ট্রিতে চলে যেতে পারি। আমি সশরীরে মিস কেন্টনের সঙ্গে দেখা করতে পারি। এখানে ডার্লিংটন হলে কাজ করতে আসার যে ইচ্ছা তাঁর আছে, সেটা কতখানি বাস্তব তা-ও ঠিক ঠিক জেনেবুঝে আসতে পারি।

এসব কারণে বেশ কয়েক দিন আমি কিছুতেই ফ্যারাডে সাহেবের সামনে প্রসঙ্গটা তুলতেই পারছিলাম না। আমি বুঝতে পারছিলাম, সামনে এগোনোর আগে আমার নিজের কাছে ভ্রমণ সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি বিষয় খোলাসা করা দরকার। যেমন—প্রথমেই বলা যায় খরচের কথা। আমার মনিবের ‘গ্যাসের বিল দিয়ে দেওয়া’ সংক্রান্ত উদারতার কথা মাথায় রাখলেও অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তো বিরাট অঙ্কের খরচের কথা আসেই। যেমন ধরা যেতে পারে থাকার খরচ, খাওয়ার খরচ, তারপর রাস্তায় হালকা কোনো নাশতা খেলে তার খরচ। তারপর এ রকম ভ্রমণে কোন ধরনের পোশাক মানানসই হবে, সে প্রসঙ্গেও ভাবতে হবে। আমার নিজের পক্ষে পোশাকের জন্য কিছুটা খরচ করা উচিত কি না, সে কথাও মাথায় রাখতে হবে। আমার বেশ কয়েক সেট দারুণ স্যুট আছে। যে রকম ভ্রমণের কথা ফ্যারাডে সাহেব বলেছেন, তেমন ভ্রমণে আমার স্যুটগুলোর বেশ কয়েকটা অতিরিক্ত ফরমাল হয়ে যাবে মনে হয়। কিংবা সেগুলো এখনকার সময়ের জন্য বড্ড সেকেলেও হয়ে যেতে পারে। আমি যে গেস্টহাউসে থাকব, সেখানকার সান্ধ্য লাউঞ্জ কিংবা ডাইনিংরুমের জন্য বেশ মানানসই হতে পারে ব্লেয়ার সাহেবের দেওয়া স্যুট। আমার যেটা নেই, সেটা হলো ভ্রমণের পোশাক। মানে গাড়ি চালানোর সময় আমার পরনে যে পোশাক মানানসই হতে পারে। শেষে আমি হিসাব করে দেখলাম, নিজের ঘাড়ে সব খরচ নিলে আমার জমানো টাকা দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। আর বাড়তি হিসাবে পোশাকের খরচও চালানো যাবে ওই টাকার মধ্যেই। আশা করি, শেষের এই বিষয় সম্পর্কে আপনারা আমাকে অস্বাভাবিক রকমের বেকুব মনে করবেন না। কেউ যদি জাহির করতে চায়, সে ডার্লিংটন হল থেকে এসেছে, তার পক্ষে নিজের এ রকম বেকুবির কথা না বোঝাটাই স্বাভাবিক। আরো বড় কথা হচ্ছে, এ রকম কাজের সময় নিজের অবস্থানের সঙ্গে মানানসই পোশাকই পরিধান করা উচিত।

এইবার আমি আরেক কাজেও সময় বেশ খরচ করলাম : রাস্তার ভূচিত্রাবলি খুঁটিয়ে দেখতে এবং মিসেস জেন সিমোনসের ‘দ্য ওয়ান্ডার অব ইংল্যান্ড’ বইটির প্রাসঙ্গিক ভলিউম পড়তে ভালোই সময় ব্যয় করলাম। মিসেস সিমোনসের বইটি সাত খণ্ডে লেখা। একেক খণ্ড ব্রিটিশ ভূখণ্ডের একেকটা অংশ নিয়ে লেখা হয়েছে। আপনি যদি মিসেস সিমোনসের বইপত্র সম্পর্কে না জানেন, তাহলে আপনাকে আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব পড়ে দেখতে। তাঁর বইগুলো লেখা হয়েছে ত্রিশের দশকে। কিন্তু তাঁর লেখার বেশির ভাগই এখনো প্রাসঙ্গিক। মোটের ওপর, আমি নিজেও মনে করি না, জার্মানদের ফেলা বোমা ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলের চেহারার খুব একটা পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে। বাস্তব কথা হলো, যুদ্ধের আগে মিসেস সিমোনস এই হাউসে প্রায়ই আসতেন। এই হাউসে আসা মেহমানদের মধ্যে যাঁরা এখানকার স্টাফ সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। কর্মচারীদের কাছে তিনি জনপ্রিয়ও ছিলেন। আমাদের প্রশংসা করার সময় তিনি মোটেও রাখঢাক করতেন না। তাঁর প্রতি সহজাত শ্রদ্ধাবোধ ও প্রশংসা থাকার কারণেই আমি সেই দিনগুলোতেই যখনই একটু অবসর পেতাম, লাইব্রেরিতে গিয়ে তাঁর লেখা বইগুলো পড়তাম। আমার পরিষ্কার মনে আছে, ১৯৩৬ সালে মিস কেন্টন কর্নওয়ালে যান। আমি কখনো ওই দিকে যাইনি। তাঁর চলে যাওয়ার পরপরই আমি মিসেস সিমোনসের তৃতীয় খণ্ডের পৃষ্ঠাগুলোতে প্রায়ই চোখ বোলানোর চেষ্টা করতাম। ওই খণ্ডে তিনি পাঠকদের জন্য ডেভন ও কর্নওয়ালের আনন্দের বর্ণনা দিয়েছেন। সঙ্গে এলাকার ছবিও দিয়েছেন। আমার এখনো মনে ভাসছে, বিভিন্ন শিল্পীর করা ওই এলাকার স্কেচও রয়েছে তাঁর বইয়ে। ওই বই থেকেই কিছুটা ধারণা পেয়েছিলাম, মিস কেন্টন তাঁর বিবাহিত জীবন কাটানোর জন্য কেমন জায়গায় গেছেন। তবে সময়টা ছিল ত্রিশের দশকের। 

তারপর শেষমেশ মনে হলো, ফ্যারাডে সাহেবের কাছে সত্যি সত্যি বিষয়টা তোলা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আবার এটাও মনে হলো, দুই সপ্তাহ আগে তোলা তাঁর পরামর্শটা তো শুধু একটা খেয়ালও হতে পারে, মুহূর্তের আবেগের বশে বলে ফেলেছেন। এখন হয়তো তিনি আর ওই বিষয়ে বাস্তবসম্মত কিছু ভাবতেই চান না। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তাঁকে যেভাবে দেখে আসছি, তিনি ওই সব মনিবের মতো নন, যাঁদের স্বভাবে বিরক্তিকর রকমের অসংগতি দেখা যায়। এমন কোনো কারণ আমার চোখের সামনে দেখিনি যে তিনি আমার মোটর ভ্রমণ নিয়ে আগের চেয়ে কম উৎসাহী হবেন।

শেষে আমি ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো বিকেলবেলা তাঁর চা খাওয়ার সময়, ড্রয়িংরুমে তাঁকে চা দেওয়ার সময় কথাটা তুলব। বাইরে হাঁটাহাঁটি করে তিনি ফিরে আসবেন। সন্ধ্যায় তিনি পড়াশোনা কিংবা লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিকেলবেলা সে রকম ব্যস্ত থাকেন না। আসলে বিকেলবেলা যখন তাঁর চা নিয়ে আসি, তিনি কোনো বই কিংবা ম্যাগাজিন পড়া অবস্থায় থাকলে সাধারণত সেটা সরিয়ে রাখেন। পড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে হাত ছড়িয়ে দেন; মনে হয়, তিনি আমাকে কিছু বলতে চান।

আমার বিশ্বাস, সময় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আমার চিন্তাভাবনা মনে হয় ঠিকই ছিল। কথাটা তোলার পর যা হলো সেটার জন্য সময় নির্ধারণের বিষয়টা দায়ী নয়, অন্য একটা বিষয় দায়ী হয়ে থাকতে পাারে, মানে অন্য বিষয়ে আমার ভুল বিবেচনা। বলা দরকার, আমি মনে হয় ভালো করে ভেবে দেখিনি, ফ্যারাডে সাহেব বিকেলের ওই সময়টাতে হালকা মেজাজের হাস্যরসাত্মক কথাবার্তায় অভ্যস্ত। গতকাল বিকেলে যখন তাঁর চা নিয়ে এলাম, তাঁর এ রকম মনমানসিকতার কথা এবং আমার সঙ্গে ওই সময় তাঁর ঠাট্টার সুরে কথা বলার ধরন মনে রাখলে মিস কেন্টনের নামটা তোলা মোটেই উচিত ছিল না। সুতরাং মিসেস সিমোনসের বইয়ে উল্লেখ করা কিছু  লোভনীয় বর্ণনা বাদ দিয়ে আমি যে ভুলটা করলাম সেটা হলো, আমি ফস করে বলে ফেললাম, ডার্লিংটন হলের একজন সাবেক হাউসকিপার ওই এলাকায় থাকেন। সে জন্যই আমি ওয়েস্ট কান্ট্রি বেছে নিয়েছি। সম্ভবত আমি ফ্যারাডে সাহেবের কাছে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলাম, আমাদের বাড়িতে বর্তমানের ছোটখাটো সমস্যা দূর করার মতো আদর্শ উপায় বের করার জন্য ওই দিকে যাওয়াটা কতটা ভালো হতে পারে। মিস কেন্টনের কথা উল্লেখ করার পরই শুধু হঠাৎ আমার মাথায় এলো, আমার উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে এগোনোর জন্য কতটা অযথার্থ কথা বলে ফেলেছি। যা-ই হোক, ফ্যারাডে সাহেব আমার দিকে আকর্ণ হাসি দেওয়ার সুযোগটা গ্রহণ করেন এবং খানিকটা বিচক্ষণতার সঙ্গে বলেন—আমার, আমার স্টিভেনস। একজন বান্ধবী। তোমার সমবয়সী।

এটা প্রচণ্ড রকমের একটা বিব্রতকর অবস্থা। ডার্লিংটন সাহেব কোনো কর্মচারীকে কখনোই এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতেন না। তবু আমি ফ্যারাডে সাহেবের কোনো ব্যাপারই ছোট করে দেখতে চাই না। মোটের ওপর তিনি তো একজন আমেরিকান ভদ্রলোক। তাঁর অনেক কিছুই অনেক সময় আলাদা হতেই পারে। প্রশ্নই ওঠে না, তিনি খারাপ কিছু করতে চেয়েছেন।

তিনি বললেন—আরে স্টিভেনস, তুমি যে এতটা নারীঘেঁষা তা তো আগে ভেবেই দেখিনি! হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, নারীদের কাছাকাছি থাকলে মন সতেজ থাকে। তবে তোমাকে এ রকম গোপন সংকেতের জায়গায় যেতে সহযোগিতা করা আমার জন্য ঠিক হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না।

আমার মনিব আমার ওপরে যে ইঙ্গিত আরোপ করছেন সেটা স্বাভাবিকভাবেই এবং সোজাসাপটাভাবেই আমি অস্বীকার করার মতো মানসিকতায় প্রলুব্ধ হলাম। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম, তাতে তো ফ্যারাডে সাহেবের টোপ গিলে ফেলা হবে এবং পরিস্থিতি ক্রমাগত বিব্রতকরই হতে থাকবে। সুতরাং আমি বিব্রতকর চেহারা নিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই রইলাম, অপেক্ষা করতে থাকলাম, আমার মনিব আমাকে মোটর অভিযানে যাওয়ার অনুমতি দেবেন।

ওই মুহূর্তগুলো আমার জন্য বিব্রতকর হলেও কিছুতেই মনে মনে হলেও ফ্যারাডে সাহেবকে দোষ দিতে পারলাম না। তিনি তো এতটা নির্দয় নন যে আমি তাঁকে কোনো দিক থেকে দোষী মনে করতে পারি। আমি নিশ্চিত, তিনি ঠাট্টা উপভোগ করছিলেন। এ রকম ঠাট্টা আমেরিকায় মনিব আর কর্মচারীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভালো বোঝাপড়ার লক্ষণ। তাঁদের দেশে এ রকম ঠাট্টাকে স্নেহপূর্ণ খেলাচ্ছলে প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে থাকে। আসলে ঘটনা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরিয়ে আনার জন্য আমার উল্লেখ করা উচিত যে আমার মনিবের পক্ষে এ রকম ঠাট্টা করা আমাদের গত কয়েক মাসের সম্পর্কের পরিচায়ক। অবশ্য আমাকে স্বীকার করতেই হবে, তাঁর ঠাট্টার সঙ্গে আমি কিভাবে সাড়া দেব তা মাঝেমধ্যে বুঝতে পারি না। আসলে ফ্যারাডে সাহেবের অধীনে প্রথম কয়েক মাস আমাকে বলা তাঁর কিছু কথাবার্তা শুনে দু-একবার একেবারে হতবাক হয়ে গেছি। যেমন—একবার ডার্লিংটন হলে এক ভদ্রলোকের আসার খবর শুনে ফ্যারাডে সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি সস্ত্রীক আসছেন কি না।

উত্তরে ফ্যারাডে সাহেব বললেন, যদি লোকটা সস্ত্রীক এসেই থাকেন তাহলে ঈশ্বর যেন আমাদের রক্ষা করেন। ভদ্রমহিলা এলে তোমাকেই পুরো দায়িত্ব দেওয়া হবে, আমাদের কাছে আর তাঁর কোনো তদারকিই রাখব না। স্টিভেনস, তুমি মহিলাকে মরগান সাহেবের খামারের আশপাশে যেসব আস্তাবল আছে, সেগুলোর কোনো একটাতে নিয়ে যেতে পারো। মহিলাকে খড়বিচালি খাইয়ে আপ্যায়ন করতে পারো। মহিলা হয়তো তোমার মতোই হবেন।

আমার মনিব কী বলছেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি কিছুই বুঝতে পারি না। তারপর আমার মাথায় আসে, তিনি তো মজা করছেন। শেষে তাঁর মজার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসার চেষ্টা করি। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আমার মুখের ওপর তখনো আহত ভাব না হলেও বিস্ময়ের ভাবটা লেগেই থাকে।

অবশ্য পরের কয়েক দিন আমার মনিবের এ রকম কথায় বিস্মিত না হওয়ার কায়দা শিখে ফেলি। তারপর তাঁর কথার মধ্যে ঠাট্টার সুর বুঝতে পারলেই সঠিক কায়দায় হেসেও ফেলি। তার পরও এ রকম পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা কখনোই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারি না। সম্ভবত তিনি চেয়েছেন, আমি যেন প্রাণ খুলে হাসি, কিংবা আমার মতো করে তাঁর কথার মধ্যে মানানসই কোনো মন্তব্য জুড়ে দিই। আমার তরফে মন্তব্য জুড়ে দেওয়ার সম্ভাবনাটাই গত কয়েক মাসে আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে রেখেছে। আমি এখনো দ্বিধায় পড়ে যাই, এ রকম পরিস্থিতিতে কী করব না করব। কারণ আমেরিকায় হয়তো এমনটা হরহামেশা হয়ে থাকে, পেশাগত সেবার ক্ষেত্রে মনিব তার কর্মচারীকে আমুদে ঠাট্টার মধ্যে ফেলেন। সত্যিই প্লাউম্যানস আর্মসের মালিক সিম্পসন সাহেবের কথা আমার মনে আছে : একবার তিনি বলেছিলেন, তিনি যদি একজন আমেরিকান সৌরিক হতেন তাহলে তিনি আমাদের সঙ্গে এ রকম বন্ধুত্বপূর্ণ ও শিষ্টাচারসুলভ সুরে কথা বলতেন না।

তাহলে এটাই সম্ভবত ঠিক যে আমার মনিব পুরোপুরিই আশা করেন, আমি তাঁর ঠাট্টার সঙ্গে ঠিক তাঁর মতো করেই সাড়া দিই। আর সেটা যদি করতে না পারি তাহলে তিনি মনে করবেন আমার তরফে অমনোযোগ আছে। এই বিষয়টাই আমাকে খুব ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আমাকে বলতেই হবে, আমি এই ঠাট্টার কাজটাকে আমার দায়িত্ব পালনের মতো করে উৎসাহের সঙ্গে নিতে পারি না। পরিবর্তনের এই সময়ে কাজকে কারো নিজের আয়ত্তের মধ্যে প্রচলিত ধারায় না নিয়ে কাজের পরিবর্তিত অবস্থার প্রতি মনোযোগ দেওয়াটাই ভালো লক্ষণ। তবে ঠাট্টা জিনিসটা দায়িত্বের পুরোপুরিই আলাদা একটা দিক। যেমন—কোনো বিশেষ মুহূর্তে কর্মচারী কী করে বুঝবে এখন কোন ধরনের সাড়া দিতে হবে? কোন ধরনের সাড়া আশা করছেন মনিব? কোন ঠাট্টার জবাবে কী বললে ঠিক হবে—এ নিয়ে কেউ আগে থেকে ভেবে কিছুই করতে পারবে না। কেননা এত ভেবেচিন্তে হয়তো নিজের মতো করে সাড়া দেওয়া হলো, কিন্তু দেখা গেল, সেই সাড়াটা পুরোপুরিই অযথার্থ হলো এবং সেটা একটা বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই আনতে পারল না।

অবশ্য একবার আমি খুব সাহস সঞ্চয় করে কাঙ্ক্ষিত জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ব্রেকফাস্ট রুমে ফ্যারাডে সাহেবকে চা দিচ্ছিলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—স্টিভেনস, আজ সকালে যে কাকের মতো শব্দের হৈচৈ শুনলাম, সেটা নিশ্চয় তুমি করোনি, তাই না?

বুঝতে পারলাম, আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে দুজন জিপসি পড়ে থাকা লোহালক্কড় কুড়ানোর সময় সচরাচর তারা যে রকম হাঁক দিয়ে থাকে, তেমন শব্দ করেছে। যেমনটা ঘটেছিল, সেই সকালে আমি ভাবলাম, আমার মনিব মনে হয় আমার কাছ থেকে তাঁর নিজের মতো করে ঠাট্টার সুরের কোনো জবাব চাইছেন। চিন্তায় পড়ে গেলাম, বারবার তাঁর কথার জবাবে যদি ব্যর্থই হই তাহলে তিনি কী ভাববেন আমাকে নিয়ে। সুতরাং ভাবলাম, তীক্ষ বুদ্ধির কোনো জবাব দেওয়া যেতে পারে। আমি পরিস্থিতিটাকে ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও যাতে আমার তরফে তাঁকে আক্রমণ করা না হয়ে যায়, এমন জবাব দিতে হবে। দু-এক মুহূর্ত ভেবে বললাম— স্যার, আমি বরং বলতে চাই, শব্দটা কাকের মতো নয়, বরং আবাবিল পাখির মতো। ভ্রাম্যমাণ বৈশিষ্ট্য থেকে সে রকমই মনে হয়।

কথাগুলো বলার পরে আমার মুখে বিনয়ের হাসি ছড়িয়ে দিলাম। দ্বিধাহীন মনে নিশ্চিত হলাম, তাত্ক্ষণিক বুদ্ধির প্রমাণ দিতে পেরেছি। কারণ আমি চাইনি, ফ্যারাডে সাহেব আমার সশ্রদ্ধ তবে বেভুল মন্তব্যে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের লাগাম টেনে ধরুন।

যা-ই হোক, ফ্যারাডে সাহেব শুধু মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন—মাফ করো, স্টিভেনস।

শুধু তখনই আমার মাথায় এলো, জিপসিদের যাওয়া তিনি দেখেননি; তাঁর পক্ষে আমার বুদ্ধির প্রমাণ বুঝতে পারা সম্ভব নয়। এই ঠাট্টার প্রসঙ্গ কিভাবে চালিয়ে যাওয়া যায় আমার মাথায় এলো না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম, এ প্রসঙ্গে এখন ইতি টানা দরকার। হঠাৎ কোনো জরুরি বিষয় মনে পড়ে গেছে, এমন ভাব দেখিয়ে ওখান থেকে সরে এলাম। আসার মুহূর্তে দেখলাম, আমার মনিব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই আছেন আমার দিকে।

আমার কাছ থেকে যে নতুন ধরনের ডিউটি আশা করা হয়েছিল, তার শুরুটা আমার এই মুহূর্তের পারফরম্যান্সের কারণে একেবারেই হতাশাজনক হয়ে গেল। এতটাই হতাশাজনক হলো যে আমি আর ওই পথে পা বাড়ানোর সাহস করলাম না। স্বস্তিও পেলাম না। কারণ ফ্যারাডে সাহেব তাঁর নানা পদের ঠাট্টার পিঠে আমার প্রতি-উত্তর আশা করেন এবং আমি কিছুই বলতে পারি না দেখে নিশ্চয় তিনি অসন্তুষ্টই থেকে যান। সত্যিই ইদানীং তাঁর ক্রমবর্ধমান নাছোড় ভাব দেখে মনে হয়, আমার ক্ষমতা যা-ই হোক না কেন, আমি যেন তাঁর মতো মন নিয়ে তাঁর ঠাট্টার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই। জিপসিদের সম্পর্কে আমার বুদ্ধির ঝলক দেখানোর চেষ্টাটার পর থেকে আমি ওই রকম আর কোনো উপস্থিত বুদ্ধির প্রমাণ দেখানোর চেষ্টা করি না।

এ রকম অসুবিধা আজকাল আরো বেশি মনে পড়ে। কারণ আগে যেমন নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করা যেত, পছন্দ হলে সমর্থন করা যেত, এখন তেমন করা যায় না। খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়, তখন দায়িত্ব পালন সম্পর্কে কোনো দিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিলে যার মতামত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হতো, এমন কেউ মনিবের কাছে বিষয়টা নিয়ে যেত এবং সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনার ব্যাপক সুযোগ পাওয়া যেত। আর অবশ্যই লর্ড ডার্লিংটনের সময় যখন ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ দীর্ঘ সময়ের জন্য বেড়াতে আসতেন, তাঁদের সঙ্গে আসা সহকর্মীদের সঙ্গেও ভালো বোঝাপড়ার মতো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেত। আসলেই ওই দিনগুলোতে ইংল্যান্ডের পেশাগত জীবনের সবচেয়ে ভালো মানুষরা একত্র হতো এবং একসঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের পাশে বসে গল্পগুজব করতে দেখা যেত তাদের। আপনাদের এ প্রসঙ্গে আরো বলে রাখতে চাই, ওই সময়ের কোনো এক সন্ধ্যায় যদি আপনারা কেউ আমাদের গৃহকর্মীদের হলে এসে থাকতেন তাহলে শুধু গল্পগুজবই শুনতেন না, বরং দেখতেন আমরা বড় বড় বিষয় নিয়ে বিতর্কে মেতে আছি। আমাদের বিতর্কের বিষয় হিসেবে থাকত ওপরতলায় আমাদের মনিবদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিংবা খবরের কাগজের কোনো প্রতিবেদন ইত্যাদি।

কিছুক্ষণ আগে স্যার জেমস চেম্বারের পরিচারক বাটলার হ্যারি গ্রাহাম সাহেবের কথা বলেছি। আসলে মাস দুয়েক আগে আমি জেমস সাহেবের ডার্লিংটন হলে বেড়াতে আসার কথা শুনেছিলাম। ফ্যারাডে সাহেবের মহল জেমস সাহেবের বন্ধুমহল থেকে স্বাভাবিকভাবেই বেশ আলাদা। জেমস সাহেবের আসার সংবাদে খুশি হয়েছিলাম এই কারণে নয় যে লর্ড ডার্লিংটনের সময়কার আগন্তুকরা সচরাচর কম আসছেন ইদানীং; বরং আশা করেছিলাম, স্যার জেমসের সঙ্গে আগের মতোই গ্রাহামও আসবেন। তাহলে মনিবের ঠাট্টা সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জেনে নিতে পারব। কিন্তু তাঁর আসার আগের দিন যে খবর শুনলাম তাতে বিস্মিত হলাম, হতাশও হলাম : স্যার জেমস একাই আসছেন। তিনি আসার পরে আরো শুনলাম, গ্রাহাম আর স্যার জেমসের অধীনে কাজ করেন না। আসলে স্যার জেমস এখন আর পূর্ণ সময়ের জন্য কোনো পরিচারক রাখেন না। আমার জানার ইচ্ছা হলো, গ্রাহাম কী করছেন, তাঁর কী হয়েছে।

যা-ই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি : গতকাল বিকেলে চায়ের সময় ফ্যারাডে সাহেবের সামনে আমাকে আরো কয়েক মিনিট বিব্রতকর অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। তিনি ঠাট্টা যথারীতি চালিয়ে গেলেন। মাঝেমধ্যে তাঁর কথার সঙ্গে তাল মেলাতে হালকা হাসির রেখা ছড়িয়ে রাখলাম আমার মুখের ওপর। বোঝাতে চাইলাম, তিনি নিজে যেমন খোশমেজাজে ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, আমিও সে রকম তাঁর ঠাট্টার হাস্যরস উপভোগ করে যাচ্ছি। এভাবে আমার সম্ভাব্য ভ্রমণ সম্পর্কে আমার মনিবের কাছ থেকে কোনো অনুমতি আসে কি না। যেমন অনুমান করেছিলাম, খুব বেশিক্ষণ দেরি করতে হলো না, তিনি সদয় অনুমতি দিলেন এবং যথারীতি তাঁর মনে আছে এমন উদার ভঙ্গিতে জানালেন, তিনি ‘গ্যাসের বিল’ দিয়ে দেবেন।

সুতরাং ওয়েস্ট কান্ট্রিতে আমার ভ্রমণ করা হবে না, এমন কোনো কারণ আর রইল না। আমি অবশ্যই মিস কেন্টনকে জানিয়ে দেব, ভ্রমণের সময় তাঁর ওখানে আসতে পারি। পোশাকের ব্যাপারটারও একটা সমাধান বের করতে হবে। আমার অনুপস্থিতিতে এখানে কোন কাজ কেমন করে চালাতে হবে, সেসবও ঠিক করে নিতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমার ভ্রমণ না হওয়ার তো কোনো কারণ দেখছি না।

 

প্রথম দিন : সন্ধ্যা

সলসবারি

 

আজ রাতে সলসবারি শহরের এক গেস্টহাউসে আমিই এক মেহমান। আমার ভ্রমণের প্রথম দিনটা শেষ হলো। সব মিলিয়ে বলতে গেলে আমি সন্তুষ্ট। আমার এই অভিযান শুরু হয়েছে আজ সকালে। আমার পরিকল্পনার চেয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়েছে। অবশ্য সকাল আটটার আগেই আমার সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফেলেছিলাম এবং প্রয়োজনীয় জিনিসসহ আমার ফোর্ডটাও লোড করে ফেলেছিলাম। মিসেস ক্লিমেন্ট ও মেয়ে দুটিকে সপ্তাহখানেক কী কী করতে হবে না হবে, সব ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই। আমার মনে একটা বিষয় বেশ জোরালোভাবেই জাগ্রত ছিল : আমি বাইরে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডার্লিংটন হল শূন্য হয়ে যাবে, এই শতকে এবারই প্রথম। মানে ডার্লিংটন হল তৈরি হওয়ার পর থেকে এই প্রথম ফাঁকা হচ্ছে। বিষয়টা কেমন বেখাপ্পা মনে হচ্ছিল। এ জন্যই আমার বের হতে খানিকটা দেরি হয়ে যায়। বাড়ির চারপাশে ঘুরে ঘুরে শেষবারের মতো দেখলাম সব কিছু ঠিকঠাক আছে কি না।

রওনা হওয়ার মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করা খুব কঠিন। গাড়ি চালানোর প্রথম বিশ-পঁচিশ মিনিট আমার মধ্যে তেমন কোনো উত্তেজনা কিংবা বিরাট প্রত্যাশা ছিল বলে মনে হয় না। এর কারণ হলো, যদিও বাড়ি থেকে ক্রমেই দূরের দিকে যাচ্ছিলাম তবু মনে হচ্ছিল, চারপাশের পরিবেশ আমার বেশ চেনা চেনা লাগছে। এখন বুঝতে পারছি, এত দিন মনে করেছি আমি খুব কম ভ্রমণ করেছি; কেননা আমাকে বাড়ির নানা রকম দায়িত্বে থাকতে হয়েছে। তবে সময়ের আবর্তে কোনো না কোনো পেশাগত কারণে মানুষকে তো ভ্রমণ করতেই হয়। এই জন্যই মনে হলো, আশপাশের ডিস্ট্রিক্টগুলো যতটা কম চিনি বলে মনে করতাম, এখন দেখছি তার চেয়ে বেশিই চিনি। বলতে চাইছি, ঝলমলে রোদের নিচে গাড়ি চালিয়ে বার্কশায়ার সীমান্তের দিকে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম চারপাশের এলাকার চেনা চেহারা দেখে আমার বিস্ময় ক্রমে বেড়েই যাচ্ছিল।

তবে একসময় চারপাশের পরিবেশ অচেনা হয়ে আসতে থাকে এবং তখন বুঝতে পারি, আমার আগেরকার চেনা গণ্ডির বাইরের দিকে চলে এসেছি। জাহাজে উঠে পাল তুলে দেওয়ার পর আস্তে আস্তে স্থলভাগ দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার মুহূর্তের বর্ণনা শুনেছি মানুষের মুখে। এ রকম মুহূর্তে আনন্দের উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার অস্বস্তি মিলে যে মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে, সেটা কল্পনা করতে পারি। আমার ফোর্ড গাড়ি চালিয়ে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, আমার চারপাশের পরিবেশ ক্রমেই ততই অচেনা হয়ে আসতে থাকে। আমার ভেতরও তেমন অনুভূতিই তৈরি হলো। এ রকম অনুভূতি তৈরি হলো যখন একটা পাহাড়ের পাশের মোড় ঘুরে রাস্তার বাঁকে এগিয়ে গেলাম তখন। টের পেলাম, আমার বাঁ পাশে খাড়া ঢাল আছে। কতটুকু গভীর তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না রাস্তার পাশের ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের কারণে। ঝড়ের মতো একটা অনুভূতি আমাকে আক্রমণ করল : সত্যিই তাহলে ডার্লিংটন হল পেছনে ফেলে চলে এলাম! স্বীকার করতেই হবে, আমার ভেতর একটা আতঙ্কের অনুভূতিও নাড়া দিয়ে গেল—মনে হয় আসল রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরেছি। একদম জনমানবহীন প্রান্তরের দিকে ছুটে যাচ্ছি। এ অনুভূতিটা একমুহূর্তের জন্য আমাকে পেয়ে বসলেও আমার গতি কমিয়ে আনতে বাধ্য হলাম। তারপর ঠিক রাস্তায়ই আছি বুঝতে পারার পরও কয়েক মুহূর্তের জন্য গাড়ি থামাতে বাধ্য হলাম, কিছু রসদ নিতে হবে।

গাড়ি থেকে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। বের হয়ে এসে হাত-পা ছড়িয়ে দেওয়ার সময় আমার ভেতর একটা ধারণা আগের চেয়ে আরো পরিষ্কার হয়ে এলো : আমি তো পাহাড়ের এক পাশে বসে আছি। রাস্তার এক পাশে গাছপালা আর ঝোপঝাড় খাড়া ওপরের দিকে উঠে গেছে। আরেক পাশে গাছের পাতার ভেতর দিয়ে দূরের পল্লী এলাকা দেখতে পেলাম।

রাস্তার পাশ ধরে খানিকটা হেঁটে এগিয়ে গেলাম। গাছপালার ঘন পাতার ভেতর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, আরো ভালো দৃশ্য দেখা যায় কি না। ঠিক তখনই আমার পেছনের দিকে একটা লোকের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত ভেবেছিলাম, এদিকটায় আমি ছাড়া আর কোনো মানুষই নেই। লোকটার কণ্ঠ শুনে খানিক বিস্মিতই হলাম। রাস্তার উল্টো পাশে ওপরের দিকে চলে যাওয়া একটা পায়ে চলা পথের শুরু দেখতে পাচ্ছি। ওপরের দিকের ঝোপঝাড়ের মধ্যে পথটা মিলিয়ে গেছে। ঠিক সে জায়গায়ই একটা বড় পাথরের ওপরে বসে আছে লোকটা। হালকা চেহারার সাদাচুলো লোকটার মাথায় কাপড় দিয়ে তৈরি ক্যাপ, মুখে পাইপ। লোকটা আবার আমাকে ডাক দিল। যদিও তার কথা এত দূর থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না, তবু দেখতে পেলাম, আমাকে তার দিকে এগিয়ে যেতে ডাকছে। একমুহূর্ত মনে হলো, লোকটা ভবঘুরে টাইপের কেউ হবে। পরে বুঝলাম, এই এলাকারই সাধারণ কোনো মানুষ, মুক্ত বাতাস আর গ্রীষ্মের সূর্যালোক উপভোগ করতে এসেছে। তার ডাকে সাড়া না দেওয়ার কোনো কারণ দেখলাম না।

আমি তার দিকে এগিয়ে গেলে লোকটা বলল—এমনি বেড়াতে বের হয়েছেন, স্যার? আপনার পা জোড়া কতখানি শক্ত আছে?

মাফ করবেন। বুঝতে পারলাম না।

পায়ে চলা পথটার দিকে ইঙ্গিত করল সে, আপনার দুটি শক্ত পা আছে, আপনার ফুসফুস জোড়াও ভালো। তাহলে ওখানে যেতে পারেন। আমার কোনোটাই অতটা শক্ত নয় বলে এখানে নিচে বসে আছি। ওখানে ওপরে একটা ছোট সুন্দর জায়গা আছে। একটা বেঞ্চ পাতা আছে; সবই আছে ওখানে। ওখানকার চেয়ে চমৎকার দৃশ্য গোটা ইংল্যান্ডে আপনি আর কোথাও পাবেন না।

আমি বললাম, আপনি যা বলছেন তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমার বরং এখানেই থেকে যাওয়া উচিত। মোটরগাড়ি নিয়ে একটা ভ্রমণে বের হয়েছি। গাড়ি নিয়ে যেতে যেতে দারুণ সব দৃশ্য দেখার ইচ্ছা আমার। আমার যাত্রা এখনো ভালো করে শুরুই করিনি। তার আগেই সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য দেখে ফেলা বেশি আগে হয়ে যায় না?

লোকটা আমার কথা বুঝতে পারল বলে মনে হলো না। সে সোজাসাপটা আবার বলা শুরু করে দিল, আপনি ইংল্যান্ডের কোথাও এত সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাবেন না। তবে বলছি, আপনার পা দুটি শক্ত হতে হবে; আপনার ফুসফুস জোড়াও শক্ত হতে হবে। আপনি দেখছি আপনার বয়সের তুলনায় বেশ শক্ত আছেন, স্যার। আপনার চেহারা দেখেই বলে দিচ্ছি, আপনি ওপরে ওই জায়গাটাতে চলে যেতে পারেন; কোনো সমস্যাই হবে না। মানে বলছি, ভালো কোনো দিন হয়তো আমি নিজেও ওখানে যেতে পারব।

ওপরে পথটার দিকে তাকালাম। বেশ খাড়া, অমসৃণও বটে।

আপনাকে নিশ্চিত করে বলছি স্যার, আপনি ওখানে না গেলে পরে আফসোস করবেন। আপনি বুঝতেই পারবেন না, কী হারালেন। আর দুই বছর পরে এলে বুঝবেন, খুব বেশি দেরি হয়ে গেছে। কথাগুলো বলে লোকটা খ্যাকখ্যাক করে রুচিহীনভাবে হাসতে হাসতে বলল, তার চেয়ে বরং এখন আপনি সবল আছেন, গিয়ে দেখে আসেন জায়গাটা।

এখন আমার মনে হচ্ছে, লোকটা হাস্যরসের বশে এভাবে কথাগুলো বলেছে। মানে, ঠাট্টার ছলে বলছে আর কি। তবে বলতেই হয়, আজ সকালে তার কথাগুলো প্রথমে আমার কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছিল এবং তার কৌশলী কথাগুলো কতখানি বোকামিপূর্ণ সেটা প্রমাণ করার জন্যই পায়ে চলা পথে পা বাড়ালাম।

তার কথা যেমনই হোক না কেন, তার কথামতো কাজটা করেছিলাম বলে ভালোই লাগছে। এক শ গজের মতো আঁকাবাঁকা পথে ওপরের দিকে ওঠা নিশ্চয়ই বেশ কষ্টকর। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, পথের কষ্ট আমাকে কোনো সমস্যায় ফেলতেই পারেনি। তারপর ছোট একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেলাম।

আমার দৃষ্টির সামনে শুধু মাঠ আর মাঠ দেখতে পেলাম। বহুদূর চলে গেছে মাঠের বিস্তার। মাঠের ভূমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সামান্য উঁচু-নিচু। মাঠের চারপাশে ঝোপঝাড় আর গাছপালা। দূরের মাঠের কোথাও কোথাও বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। আমার মনে হলো, ওগুলো ভেড়া। আমার ডান পাশে একেবারে দিগন্তছোঁয়া গোলাকার গির্জার চূড়া দেখতে পাই।

ওই অবস্থায় ওখানে দাঁড়িয়ে থাকাও খুব আনন্দের। চারপাশে গ্রীষ্মের শব্দ, মুখে মৃদু বাতাসের ছোঁয়া। আমার বিশ্বাস, ওই দৃশ্যের দিকে তাকিয়েই শুধু প্রথমবারের মতো সামনের ভ্রমণ সম্পর্কে আমার মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল। কারণ তখনই শুধু সামনের দিনগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক উচ্ছ্বাস অনুভব করলাম : আমার সামনে নিশ্চয় আনন্দের অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে। আসলেই শুধু তখনই এই ভ্রমণে আমার পেশাগত কাজ সম্পর্কিত যে দায়িত্বটা নিয়েছি, সেটা সম্পাদন করতে ভয় পাব না—এমন অনুভূতির ছোঁয়া পেলাম, মানে মিস কেন্টন সম্পর্কে এবং আমাদের বর্তমান কর্মচারী ব্যবস্থাপনার সমস্যা সম্পর্কে।

ওই অভিজ্ঞতাটা ছিল আজ সকালের। আর এখন, এই সন্ধ্যায় একটা আরামদায়ক গেস্টহাউসে আছি। এটা যে রাস্তায় অবস্থিত সেটা সলসবারির কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মনে হচ্ছে, এই গেস্টহাউসটা মোটামুটি মধ্যম মানের। তবে পরিবেশ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আমার প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট সুন্দর। গেস্টহাউসের মালিক মহিলার বয়স চল্লিশের আশপাশে হবে। ফ্যারাডে সাহেবের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা বুঝতে পেরে তিনি ধরে নিয়েছেন, আমি একজন হোমরাচোমরা অতিথি। আমার স্যুট সম্পর্কেও তাঁর ধারণা বেশ উঁচু। আজ বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সলসবারিতে এসে পৌঁছেছি। তার রেজিস্টারে আমার ঠিকানা হিসেবে যখন ডার্লিংটন হলের নাম লিখলাম, আমার দিকে তাঁর চাহনিতে চকিত ভাব দেখতে পেলাম। তিনি হয়তো ভাবলেন, আমি রিটস কিংবা দ্য ডরসেস্টারের মতো জায়গায় নিয়মিত যাতায়াত করা কোনো ভদ্রলোক, আমার রুম দেখিয়ে দেওয়ার পরে হয়তো আমি তাঁর গেস্টহাউস থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাব। তিনি জানালেন, সামনের দিকের একটা ডাবল রুম খালি আছে, তবে আমার কাছ থেকে তিনি সিঙ্গল রুমের  ভাড়া নেবেন।

তারপর আমাকে আমার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। দিনের ওই সময়টায় রুমের ভেতরে জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো ওয়ালপেপারের ওপরে পড়ে পাতার মতো চমৎকার নকশা তৈরি করছে। দুটি বিছানা এক করে জোড়া লাগানো হয়েছে। বড় জানালা দুটি দিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বাথরুমের কথা জিজ্ঞেস করায় মহিলা ক্ষীণ কণ্ঠে জানালেন, দরজার সামনে। তবে রাতের খাবারের আগে গরম জলের ব্যবস্থা হবে না। আমি এক পাত্র চায়ের কথা জানালে মহিলা বাইরে চলে গেলেন। তখন রুমের ভেতরটা আরো ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। বিছানা দুটি বেশ সুন্দর করে সাজানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোনায় সেট করা বেসিনটাও দারুণ ফিটফাট। জানালা দিয়ে রাস্তার ওপারে দেখা যাচ্ছে একটা বেকারিতে বিভিন্ন রকমের পেস্ট্রি সাজিয়ে রেখেছে; পাশে একটা ওষুধের দোকান; আরেকটা নাপিতের দোকানও আছে। রাস্তা বরাবর আরো দূরে দৃষ্টি ফেললে একটা ব্রিজ দেখা যায়। আরো দূরের দিকে তাকালে দেখা যায় পল্লী এলাকা। বেসিনের ঠাণ্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে এসে জানালার পাশে রাখা একটা শক্ত চেয়ারে বসে চায়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

বিকেল চারটার পরে গেস্টহাউস থেকে বের হয়ে সলসবারি শহরের রাস্তায় নেমে আসার সাহস পেলাম। রাস্তাগুলো প্রশস্ত; অঢেল বাতাস খেলে যেতে পারে। রাস্তার চেহারা দেখেই যে কেউ অনুভব করতে পারে এই শহরের চমৎকার পরিসর। সুতরাং মৃদু উষ্ণ সূর্যালোকের নিচে কয়েক ঘণ্টা হেঁটে বেড়ানোর জন্য মনস্থির করলাম। তা ছাড়া বুঝতে পারলাম, এ শহরও তো একটা বিস্ময়কর জায়গা : হেঁটে এগিয়ে যাওয়ার সময় বারবার চোখে পড়ল দেখতে সুন্দর বেশ কিছু পুরনো বাড়ি, যেগুলোর সামনের পাশ কাঠের তৈরি। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট ছোট স্রোতস্বিনী। সেগুলোর ওপরে পাথরের তৈরি ফুটব্রিজ। আর অবশ্যই বিশপের এলাকাধীন প্রধান গির্জাটা ঘুরে দেখতে ভুল হয়নি আমার। মিসেস সিমোনসের বইয়ে এটার দারুণ প্রশংসা করা হয়েছে। এই সুমহান ভবনটা খুঁজে পেতে আমার মোটেও বেগ পেতে হয়নি। সলসবারি শহরের যেখানেই যাওয়া যাক না কেন এই গির্জার বিশাল চূড়া দৃষ্টিতে থাকবেই। সত্যিই, যখন সন্ধ্যার আগে আগে এই গেস্টহাউসের দিকে ফিরে আসছিলাম, পেছনের দিকে বারবার তাকিয়ে গির্জার বিশাল চূড়ার পেছনে অস্ত যাওয়া সূর্যটা দেখছিলাম।

তবু আজ রাতে এই নিস্তব্ধ রুমে এখন মনে হচ্ছে, প্রথম দিনের ভ্রমণে যা যা দেখলাম, সেগুলোর মধ্যে মনে রাখার মতো বিষয় কিন্তু সলসবারির গির্জা নয়, এই শহরের চমকপ্রদ অন্য কোনো দৃশ্যও নয়; মনে রাখার মতো বিষয় হলো, আজ সকালে পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য। এখন আমি বিশ্বাস করতে প্রস্তুত যে অন্য কোনো দেশ হয়তো আরো বেশি নয়নাভিরাম দৃশ্য উপহার দিতে পারে। আসলেই আমি বিশ্বকোষ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের পাতায় বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্ময়কর সব ফটোগ্রাফ দেখেছি। চমকপ্রদ গিরিখাত, জলপ্রপাত ও বন্ধুর সুন্দর পর্বতমালা দেখেছি। সেগুলো সরাসরি গিয়ে দেখে আসার সুযোগ আমার হয়নি। তার পরও একটি কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলার সাহস দেখাতে চাই, আজ সকালে যেমনটা দেখেছি, ইংল্যান্ডের স্থলভাগের দৃশ্যাবলি যে সুন্দর গুণের অধিকারী, সেটা অন্য কোনো দেশের স্থলভাগের দৃশ্যে অবধারিতভাবে নেই, সে দেশ বাহ্যিকভাবে যতই নাটকীয় গুণের অধিকারী হোক না কেন। আমি বিশ্বাস করি, নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে কেউ দেখলে বুঝতে পারবে, বিশ্বের মধ্যে ইংল্যান্ডের স্থলভাগের দৃশ্য সবচেয়ে গভীরভাবে তৃপ্তি দিতে পারে। আর গুণের কথাই সম্ভবত সংক্ষেপে বলা হয়েছে ‘গ্রেটনেস’ বা ‘বিশিষ্ট গুণ’ কথার মাঝে। কারণ আজ সকালে যখন ওই চূড়ার ওপরে দাঁড়ালাম এবং আমার দৃষ্টির সামনের দৃশ্য দেখলাম, আমার মনের ভেতর সেই বিরল ও ধ্রুব অনুভূতিটা এলো, যেটা বিশিষ্ট গুণের অধিকারী কোনো কিছুর সামনে দাঁড়ালে যেকোনো মানুষের মনেই আসতে পারে। আমাদের এই দেশটাকে আমরা গ্রেট ব্রিটেন বলি।

এখানে যে প্রসঙ্গটি এসেছে সেটাই আমাদের পেশাগত জীবনেও প্রাসঙ্গিক হয়েছে একই রকমভাবে এবং এত বছর ধরে বিতর্ক তৈরি করে আসছে : বিশিষ্ট গুণের বাটলার কী? আমার মনে আছে, দিনের শেষে গৃহকর্মীদের হলের আগুনের পাশে বসে এই বিষয়ে আনন্দঘন আলাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি আমরা। আপনারা খেয়াল করে থাকবেন, আমি কিন্তু বিশিষ্ট গুণের বাটলার ‘কী’ বলেছি, ‘কে’ বলিনি। কারণ আমাদের প্রজন্মের মধ্যে যারা এ বিষয়ে বাছবিচারের মানদণ্ড তৈরি করে তাদের পরিচয় নিয়ে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো বাদ-বিবাদ ছিল না। মানে, আমি শার্লভাইল হাউসের মি. মার্শাল কিংবা ব্রাইডউডের মি. লেইনের মতো ব্যক্তিদের কথা বলছি। আপনাদের যদি এঁদের মতো ব্যক্তির সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আমি যেসব গুণের কথা ইঙ্গিত করেছি তাঁদের মধ্যে সেসব গুণ সম্পর্কে জেনে থাকবেন। তবে এই গুণ বলতে যা বোঝায় তার সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন—আমার এ কথাটাও অবশ্যই বুঝে থাকবেন।

 

ঘটনাক্রমে ওই বিষয়টা নিয়েই আরো খানিক চিন্তা করে বুঝলাম, কারা মহান বা বিশিষ্ট গুণের অধিকারী বাটলার ছিল সে বিষয়ে যে একেবারে কোনো বাদ-বিবাদ নেই সেটা সত্যি নয়। আমার আসলে বলা উচিত ছিল, গুণসম্পন্ন পেশাজীবীদের মধ্যে মারাত্মক বিবাদ নেই, মানে এ রকম বিষয়ে যাদের উপলব্ধি করার আগ্রহ আছে। অবশ্য ডার্লিংটন হলের গৃহকর্মীদের হল অন্য যেকোনো হলের মতো বিভিন্ন ধরনের বোধবুদ্ধির কর্মচারীদের গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল। আমার মনে আছে, বহুবার এ রকম হয়েছে, মি. জ্যাক নেইবারের মতো কাউকে নিয়ে কোনো কর্মচারী সাংঘাতিক রকমের উচ্চ প্রশংসা করার সময় আমি বিস্ময়ে জিব কেটেছি। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, ওই রকম বক্তাকে আমার সহকর্মী ভাবতেই আফসোস হয়েছে।

দুঃখজনক হলো, মি. জ্যাক নেইবার যুদ্ধে নিহত হন। তাঁকে নিয়ে আমার আপত্তির কিছু নেই। তাঁর কথাটা তুললাম একটা সাধারণ উদাহরণ হিসেবে। মধ্য ত্রিশে দু-তিন বছরের জন্য দেশের গৃহকর্মীদের সব হলে আলোচনার প্রধান বিষয় ছিলেন জ্যাক নেইবার। যেমনটি বলছিলাম, ডার্লিংটন হলে বেড়াতে আসা কর্মচারীরাও অনেকেই মি. জ্যাক নেইবারের সর্বশেষ অর্জনের গল্প নিয়ে আসত। সুতরাং মি. গ্রাহামের মতো ব্যক্তিরা এবং আমি তাঁর সম্পর্কে কাহিনির পর কাহিনি শোনার মতো হতাশার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে বাধ্য হতাম। যারা অন্য সব ক্ষেত্রে নম্র-ভদ্র বলে পরিচিত, তারাও ওই সব কাহিনির শেষে বিস্ময়ে মাথা দুলিয়ে বলত, মি. নেইবারই হলেন সেরা। তাদের এ রকম প্রতিক্রিয়া দেখাটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয়।

এখন আর আমার কোনো সন্দেহ নেই, মি. নেইবারের ভালো সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল। তাঁর সুস্পষ্ট নিজস্ব কেতায় বেশ কয়েকবার বড় বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলেন তিনি, আমার মনে আছে। কিন্তু তাঁর কাজের কোনো পর্যায়েই তিনি মহান কোনো বাটলারের মর্যাদা নিয়ে এগোননি। তাঁর সুনামের একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়েও এ কথাটা বলতে পারতাম। তাঁর পাদপ্রদীপের নিচে থাকা অবস্থায়ই আমি ভবিষ্যৎ বলেছিলাম।

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই তাঁর পতন শুরু হয়।

নিজের প্রজন্মের সেরা হিসেবে যে বাটলারের নাম সবার মুখে মুখে সে-ও কয়েক বছরের ব্যবধানে একেবারে বিস্মৃত হয়ে গেছে—এ রকম উদাহরণ প্রায়ই শুনেছেন নিশ্চয়! আবার যারা কারো নামে এ রকম প্রশংসার স্তূপ খাড়া করে, তারাই নতুন কোনো কর্মচারীর গুণকীর্তন করে থাকে অতি তাড়াতাড়ি; তার গুণের বিচার করার মতো ক্ষমতা নিজেদের আছে কি না ভেবে দেখে না। কোনো বাটলার এলে হঠাৎ করে গৃহকর্মীদের হলের মুখরোচক আলাপের বিষয় হয়ে থাকে যখন সে নামকরা কোনো হাউসে নিয়োগ পায় এবং যখন সে দু-তিনটা বড় অনুষ্ঠান খানিক সফলতার সঙ্গে আয়োজন করতে পারে। তারপর সারা দেশের গৃহকর্মীদের হলের বহুল উচ্চারিত গুজব ছড়িয়ে পড়বে, তাকে ওই অমুকতমুক নামকরা ব্যক্তিত্ব নিয়োগ দেওয়ার জন্য আগ্রহী হয়েছে, কিংবা তার সেবা পাওয়ার জন্য লাগামহীন মজুরি হাঁকিয়ে সবচেয়ে অভিজাত হাউসগুলোর কয়েকটা রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। তারপর কয়েক বছর পার হওয়ার আগেই কী হলো? ওই অজেয় ব্যক্তিই মারাত্মক কোনো ভুল করে ফেলল, কিংবা অন্য কোনো কারণে তার নিয়োগকর্তার অনুগ্রহ থেকে ভূপাতিত হয়ে গেল। তারপর যে হাউসে সে নাম কামানোর জন্য এসেছিল, সেই হাউস ছেড়ে চলে গেল। তার নাম আর শোনাই গেল না।

তবে খুব তাড়াতাড়িই বলতে হচ্ছে, আরো অনেক পরিচারক আছে, যারা এ রকম ভুল স্বপ্ন দেখে না। পেশাগত দিক থেকে তাদের সবার উচ্চপর্যায়ের উপলব্ধি করার আগ্রহ থাকে। আমাদের ডার্লিংটন হলের গৃহকর্মীদের হলে এ রকম যোগ্যতার দু-তিনজন ব্যক্তি একত্র হলেই আমাদের পেশা সম্পর্কে উৎসাহ জাগানোর মতো বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক শুরু হয়ে যেত। এ রকম যোগ্যতার বলতে আমি মি. গ্রাহামের পর্যায়ের ব্যক্তিদের বুঝিয়েছি; দুঃখজনক হলো, তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বাস্তবিকই, ইদানীং মনে হয়, আমার প্রিয় স্মৃতি হয়ে আছে সেসব সময়ের প্রিয় সান্ধ্য আলোচনার আসরগুলো।

আচ্ছা ঠিক আছে, এবার তাহলে আসল প্রসঙ্গে ফিরে আসি, কৌতূহলোদ্দীপক ওই বিষয়টাতে। আমাদের পেশা সম্পর্কে যাদের তেমন কোনো মৌলিক ধারণা নেই এমন কেউ যদি বকবক না করত তাহলে আমরা ওই সব বিতর্ক খুব উপভোগ করতাম। কৌতূহলের ওই বিষয় হলো, বিশিষ্ট গুণের অধিকারী বাটলার কী? অর্থাৎ বিশিষ্ট বাটলারের বৈশিষ্ট্য কী?

এ প্রসঙ্গটা এত বছর ধরে যত আলাপ-আলোচনার জন্ম দিয়েছে তা থেকে আমার যতটুকু জানা আছে সে মোতাবেক বলতে পারি, বাটলারের পেশার ভেতর থেকে এ প্রশ্নের কোনো অফিশিয়াল উত্তর তৈরি করার চেষ্টা খুব কমই হয়েছে। উল্লেখ করার মতো একটি চেষ্টা দেখা গেছে হায়েস সোসাইটির পক্ষ থেকে। হায়েস সোসাইটির মানদণ্ডে সদস্য হিসেবে ভর্তির যেসব পূর্বশর্ত দেওয়া হয়েছিল সেগুলো থেকে কিছুটা আঁচ করা যায়। হায়েস সোসাইটি সম্পর্কে আপনাদের তেমন ধারণা না-ও থাকতে পারে। কারণ ইদানীং এই সোসাইটি সম্পর্কে লোকমুখে আলাপ-আলোচনা তেমন একটা শোনা যায় না। কিন্তু বিশ কিংবা ত্রিশের দশকে লন্ডনের অনেকাংশে এবং হোম কাউন্টিতে হায়েস সোসাইটির যথেষ্ট প্রভাব ছিল। আসলে অনেকেই মনে করে, হায়েস সোসাইটি অনেক ক্ষমতা অর্জন করেছিল এবং জোরপূর্বক এই সোসাইটি বন্ধ করে দেওয়ার কাজটা খারাপ হয়নি। সেটা সেই ১৯৩২-৩৩ সালের কথা।

হায়েস সোসাইটি শুধু উঁচুপর্যায়ের বাটলারদের সদস্য হিসেবে ভর্তির কথা জানায়। এ সোসাইটির ক্ষমতা অর্জনের পেছনে ছিল একটা কড়া নীতি : সব সময় সদস্যসংখ্যা কম রাখা। সদস্যসংখ্যা কম রাখার কারণে সোসাইটির নীতিও সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। অনেক সোসাইটিই জন্ম নেয় আবার শেষ হয়েও যায় তাড়াতাড়িই। কিন্তু হায়েস সোসাইটি এদিক থেকে আলাদা ছিল। সদস্যসংখ্যা কখনো ত্রিশের ওপরে ওঠেনি। বেশির ভাগ নয়-দশজনেও থাকত।

তবে কিছুদিন ধরে সোসাইটি যে বিষয়টা প্রচার করা থেকে বিরত থাকে সেটা হলো সদস্য পদ সম্পর্কে সোসাইটির নিজস্ব মানদণ্ড। এ বিষয়টি বারবার প্রচার করার জন্য চারপাশ থেকে বিরতিহীনভাবে চাপ বাড়তে থাকে। ‘আ কোয়ার্টারলি ফর জেন্টলম্যানস জেন্টলম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত ধারাবাহিক চিঠিপত্রের জবাবে সোসাইটি স্বীকার করে, সদস্য পদ লাভের পূর্বশর্ত হলো, ‘আবেদনকারীকে কোনো বিশেষভাবে সম্মানিত হাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে।’ সোসাইটি আরো জানায়, ‘অবশ্য এটাই সদস্য পদ লাভের একমাত্র শর্ত নয়।’ সোসাইটি আরো পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, কোনো ব্যবসায়ীর কিংবা নব্য ধনী লোকের হাউসকে সোসাইটি ‘বিশেষভাবে সম্মানিত হাউস’ মনে করে না। আর আমার মতে, সোসাইটি আমাদের পেশার ওপর ইচ্ছামতো মানদণ্ড ব্যবহার করার যেটুকু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারে সেটা এ রকম সেকেলে চিন্তার কারণে অনেকটাই খর্ব হতে পারে। আ কোয়ার্টারলিতে প্রকাশিত আরো কিছু চিঠিপত্রের উত্তরে সোসাইটি নিজের দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থানের সমর্থনে জানায়, কোনো কোনো চিঠিপত্রের বরাতে সোসাইটি যখন জানতে পেরেছে কোনো কোনো ব্যবসায়ীর হাউসেও চমৎকার গুণসম্পন্ন কিছু বাটলার আছে, ঠিক তখনই ‘এ কথাটাও ধরে নিতে হবে যে সত্যিকারের ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ তাদের সেবা পাওয়া থেকে খুব বেশি দীর্ঘ সময় বিরত থাকতে চান না’। সোসাইটি আরো যুক্তি দেখায়, সত্যিকারের ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণের বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। নইলে ‘আমাদেরও বলশেভিক রাশিয়ার নীতি অনুসরণ করতে হবে’। সোসাইটির এ রকম কথায় বিতর্ক আরো বেড়ে যায়। চিঠিপত্র আরো আসতে থাকে।

হায়েস সোসাইটি সম্পর্কে আমার কৌতূহলের ঘাটতির কারণে আমার বিশ্বাস হলো, সোসাইটির এই বিশেষ ঘোষণাটার ভিত্তি অন্তত একটা তাত্পর্যপূর্ণ সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যাঁদের আমরা মহান গুণসম্পন্ন বাটলার বলি, মানে মি. মার্শাল কিংবা মি. লেইন যেমন, তাঁদের দিকে কেউ নজর ফেললেই বুঝতে পারবে, চরম মাত্রায় যোগ্য বাটলারদের থেকে তাঁরা যে আলাদা, এই আলাদা হওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করে থাকে একটি শব্দ : সেটা হলো ‘মর্যাদা’। আমার নিজেরও তেমনটাই মনে হয়।

অবশ্য এর পরে আরেকটা প্রশ্ন চলেই আসে : মর্যাদা তৈরি হয় কোন কোন উপাদানে? মি. গ্রাহামের মতো মানুষদের সঙ্গে আমার যে মজার বিতর্ক হতো সেসব তো এই প্রসঙ্গ নিয়েই। মি. গ্রাহাম সব সময় মনে করতেন, এই মর্যাদা জিনিসটা হলো কোনো নারীর সৌন্দর্যের মতো। সে জন্যই এটাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র। অন্যদিকে আমি আবার যুক্তি দেখাতাম, এ রকম তুলনা করলে মি. মার্শালের মতো মানুষদের বরং খাটো করে ফেলা হয়। তা ছাড়া মি. গ্রাহামের তুলনায় আমার প্রধান আপত্তি হলো, তিনি যে ইঙ্গিত করেছেন এই মর্যাদা প্রকৃতির দান হিসেবে কেউ পেয়েছে কিংবা পায়নি—এ রকম ইঙ্গিতে। আর যদি কেউ সুস্পষ্টভাবে এটা না পেয়ে থাকে, তাহলে এটা পাওয়ার চেষ্টা করা, মানে কোনো কুিসত চেহারার নারীর সুন্দর হওয়ার চেষ্টার মতো বৃথা।

সে যা-ই হোক, আমি এখনো স্মরণ করতে পারি, মি. গ্রাহামের সব সংশয়বাদ সত্ত্বেও মর্যাদার গঠন সম্পর্কে আমরা দুজনে আমাদের নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করে কত সন্ধ্যা পার করেছি। আমরা কখনো একমত হতে পারিনি। তবে আমার দিক থেকে বলতে পারি, আমার নিজস্ব চিন্তাধারা এবং কিছুটা বিশ্বাস, যেটা এখন আমি ধারণ করতে পারি, এগুলো অর্জন করেছি তাঁর সঙ্গে ওই সব আলোচনার মাধ্যমে। মর্যাদা সম্পর্কে যতটুকু জানি এখানে বলার চেষ্টা করব, বলব।

ধরেই নিচ্ছি, আপনারা দ্বিমত পোষণ করবেন না, শার্লেভাইল হাউসের মি. মার্শাল এবং ব্রাইডউডের মি. লেইন সাম্প্রতিক সময়ের দুজন মহান বাটলার। অবশ্য কেউ হয়তো আপনাদের বুঝিয়ে থাকতেও পারে, ব্র্যাডবেরি ক্যাসলের মি. হেন্ডারসনও ওঁদের এই বিরল শ্রেণিতে পড়েন। তবে আমি যদি বলি আমার নিজের বাবাকেও বিভিন্ন কারণে উনাদের কাতারে বিবেচনা করা যেত, তাহলে আপনারা আমাকে পক্ষপাতী বলতে পারেন। ‘মর্যাদা’র সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে আমার বাবার পেশাগত জীবন নিয়ে অনেক চুলচেরা হিসাব-নিকাশ করে দেখেছি। আপনারা যা-ই বলুন না কেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লাফবোরো হাউসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুবর্ণ সময় কাটিয়েছেন। সে সময় মর্যাদার মূর্ত রূপ ছিলেন আমার বাবা।

উপলব্ধি করতে পারি, মর্যাদার বিষয়টি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে মহান বাটলারদের মধ্যে যেসব গুণের কথা প্রত্যাশা করা হয় সেগুলোর ঘাটতি আমার বাবার মধ্যে থাকলেও যে কেউই সহজে মেনে নেবে। তবে জোরালো যুক্তি দিয়ে বলব, ওই সব গুণ আসলে ওপরের এবং শোভাবর্ধক মাত্র। আসল ও অপরিহার্য গুণের মধ্যে পড়ে না ওগুলো। যেমন—কেকের ওপরে বরফের কাজ করা। ভালো উচ্চারণ এবং ভাষার ওপরে দখল, বাজপাখিকে প্রশিক্ষণের বিদ্যা কিংবা গোসাপের যৌনমিলনসংক্রান্ত জ্ঞানের মতো বড় পরিসরের বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান—এগুলোর কথা বলতে পারি। তবে তিনি কখনো এসব বিষয় নিয়ে অহংকার করতন না।

যদিও শেষ পর্যন্ত যেসব দায়িত্ব আমাদের নিজেদের ওপরেই বর্তায় সেগুলো কিছুতেই যেন অস্বীকার করা না হয় সেদিকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, তবু এ কথাও বলতেই হয়, এ রকম প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে যথেষ্ট চেষ্টা করেন কোনো কোনো মনিব। এ রকম কথা বলতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বড় বড় কুল-পরিচয়ওয়ালা এ রকম বেশ কিছু বাড়ির কথা বলা যায়, যেগুলো বুকে অন্যের প্রতি প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করে। সেসব হাউসের মালিকরা অতিথিদের সামনে বাটলারদের তুচ্ছ গুণের প্রদর্শন করার জন্য যে রকম মানসিকতার দরকার হয় সেটার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি।

আমি যেমনটা বলে থাকি, আমাদের পেশাগত মূল্যবোধের সব রকমের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে সৌভাগ্যক্রমে মুক্ত একটা প্রজন্মে জন্ম হয়েছিল আমার বাবার। ওই কথার সুরেই বলতে চাই, ইংরেজির ওপরে তাঁর সীমিত দক্ষতা এবং তাঁর সীমিত সাধারণ জ্ঞান সত্ত্বেও একটা বাড়ির দেখভাল করার সব কিছুই জেনেছিলেন। তা ছাড়া জীবনের প্রারম্ভেই তিনি হায়েস সোসাইটির মানদণ্ডে যেমন ‘পেশার সঙ্গে মানানসই মর্যাদা’র কথা বলা হয়েছে, সেটাও অর্জন করেছিলেন। আমার বাবা কোন গুণের কারণে বিশেষ হয়েছিলেন সেটা যদি আপনাদের কাছে বর্ণনা করে বলার চেষ্টা করি তাহলে মর্যাদা সম্পর্কে আমার যে ধারণা সেটাই বলব।

আমার বাবার খুব পছন্দের একটা গল্প ছিল। তিনি বারবার বলেছেন, বহু বছর ধরেই বলেছেন সেটা। আমার ছেলেবেলায় অতিথিদের সামনে বলতে শুনেছি। তাঁর তত্ত্বাবধানে যখন খানসামার কাজ করা শুরু করি, তখনো শুনেছি। এমনকি অক্সফোর্ডশায়ারের অ্যালিশটে মি. ও মিসেস মগারিজের কিছুটা সাধারণ মানের বাড়িতে বাটলার হিসেবে প্রথম পদবি পাওয়ার পর বাবার সঙ্গে যখন দেখা করতে আসি, তখনো শুনেছি। যেকোনো ব্যাপারে আমাদের প্রজন্ম আলাপ-আলোচনা ও বিশ্লেষণে অভ্যস্ত। কিন্তু আমার বাবার প্রজন্ম সে রকম ছিল না। আমার বিশ্বাস, নিজের পেশার যত নৈকট্যে পৌঁছেছেন তাঁর গল্পটাও ততটাই প্রাসঙ্গিক হয়েছে। তিনি এটাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন। সে জন্যই বারবার বলেছেন। গল্পটা থেকে তিনি চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পেয়েছেন।

গল্পটা একজন বাটলারকে নিয়ে। শুনে আপাতসত্যিই মনে হয়। এ গল্পের বাটলার তাঁর মনিবের সঙ্গে ভারতে যান। ইংল্যান্ডে থাকাকালে তাঁর অধীন অন্য কর্মচারীদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, ওখানে গিয়েও তেমন নিয়ন্ত্রণেই রাখতে পেরেছিলেন ওই বাটলার। এক বিকেলের ঘটনা : রাতের খাবারের সব আয়োজন ঠিক আছে কি না দেখার জন্য তিনি ডাইনিংরুমে ঢোকেন। দেখেন, ডাইনিং টেবিলের নিচে একটা বাঘ ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছে। সতর্কতার সঙ্গে দরজা দন্ধ করে দিয়ে ডাইনিংরুম থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। খুব ধীরস্থির পায়ে তিনি ড্রয়িংরুমের দিকে যান। ড্রয়িংরুমে তাঁর মনিব মেহমানদের নিয়ে চা পান করছিলেন। বিনয়ের সঙ্গে গলা খাঁকারি দিয়ে তিনি মনিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর ফিসফিস করে মনিবের কানে কানে বলেন—আমি খুব দুঃখিত, স্যার। ডাইনিংরুমে মনে হয় একটা বাঘ শুয়ে আছে। আপনার টুয়েলভ বোরের বন্দুকটা ব্যবহার করার অনুমতি দেবেন আশা করি।

তারপর গল্পের কাহিনি অনুযায়ী, কয়েক মিনিট পরে মনিব ও তাঁর অতিথিরা তিনবার বন্দুকের আওয়াজ শুনলেন। চায়ের পাত্রে আরো চা দিতে একটু পরে বাটলার ফিরে এলেন। মনিব জিজ্ঞেস করলেন সব ঠিকমতো হয়েছে কি না।

বাটলার বললেন, একেবারে ঠিকমতো হয়েছে। আপনাকে ধন্যবাদ, স্যার। ডিনার ঠিক সময়েই দেওয়া হবে। আশা করি, একটু আগে যা ঘটেছে চোখে পড়ার মতো তার কোনো চিহ্ন থাকবে না তখন।

‘চোখে পড়ার মতো কোনো চিহ্ন থাকবে না তখন’—এই কথাগুলো বারবার বলতেন বাবা। বলার সময় হাসতে হাসতে প্রশংসাসূচক মাথা ঝাঁকাতেন। ওই বাটলারকে তিনি চিনতেন কি না বলেননি কখনো। অন্য কেউ চিনত কি না তা-ও জানতেন না। তবে যে ঘটনার কথা তিনি জানতেন সেটা খুব জোর দিয়ে বলতেন। গল্পটা সত্যি কি না সেটা বড় কথা নয়। এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, বাবার আদর্শের মতো যে জিনিসটা তিনি পেয়েছেন সেটা। বাবার পেশাগত জীবনের পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, তিনি গল্পের ওই বাটলারের মতো হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আমার দৃষ্টিতে, আমার বাবা তাঁর পেশার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার সময় তাঁর উচ্চাশা পূরণ করতে পেরেছিলেন। কারণ যদিও তিনি ডাইনিং টেবিলের নিচে বাঘ দেখার সুযোগ পাননি, তবু জীবনে অনেকবার ওই বাটলারের গুণাবলি প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন এবং প্রকাশও করেছেন। তাঁর কাজ সম্পর্কে যা যা শুনেছি, জেনেছি সেসবের ভিত্তিতে জোর দিয়ে বলতে পারি তাঁর গুণের কথা, যোগ্যতার কথা।

এ রকম একটা ঘটনার কথা চার্লস অ্যান্ড রেডিং কম্পানির মি. ডেভিড চার্লস আমাকে বলেছিলেন। লর্ড ডার্লিংটনের সময়ে তিনি প্রায়ই ডার্লিংটন হলে আসতেন। সে রকম এক সন্ধ্যায় মি. চার্লসের দেখাশোনা করছিলাম আমি। তিনি বললেন, বেশ কয়েক বছর আগে একদিন তিনি মি. জন সিলভার্সের লাফবোরো হাউসে অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। তখন আমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। তাঁর পেশাগত জীবনের সুবর্ণ সময়ে পনেরো বছর বাবা কাজ করেন লাফবোরো হাউসে। মি. চার্লস জানান, একটা ঘটনার কারণে আমার বাবার কথা তিনি কখনো ভোলেননি।

একদিন বিকেলে তাঁর সমকক্ষ দুজন মেহমানের সঙ্গে মি. চার্লস খানিক নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের দুজনকে অবশ্য মেহমান না বলে ভদ্রলোক বলাই উচিত; আমি বরং তাঁদের মি. স্মিথ ও মি. জোনস বলব। কোনো মহলে হয়তো তাঁদের এ রকম নামেই পরিচিতি আছে। যা-ই হোক, পরে মি. চার্লসের কাছে ব্যাপারটা লজ্জার ও আফসোসের মনে হয়েছে। তাঁদের মদপানের দু-এক ঘণ্টা পর ওই দুজন ভদ্রলোকের ইচ্ছা হয়, তাঁরা বিকেলবেলা ড্রাইভে বের হবেন আশপাশের গ্রামের দিকে। ওই সময় মোটরগাড়ি বেশ অভিজাত বিষয় ছিল। তাঁরা দুজন মি. চার্লসকেও রাজি করান এবং যেহেতু ওই সময় গাড়ির চালক ছুটিতে ছিলেন, তাঁরা আমার বাবাকে নিয়ে যান গাড়ি চালানোর জন্য।

মি. স্মিথ ও মি. জোনস তখন মধ্যবয়সী দুজন মানুষ। তবে রওনা হওয়ার পরপরই স্কুলবালকদের মতো অচরণ করা শুরু করেন। হেঁড়ে গলায় রুচিহীন গান শুরু করে দেন। এমনকি আরো রুচিহীন মন্তব্য করতে থাকেন জানালা দিয়ে যা দেখেন তাতেই। তারপর তাঁরা দুজন মানচিত্র দেখে আশপাশের তিনটা গ্রামের অবস্থান বের করেন : একটার নাম মরফি, আরেকটা সল্টাশ এবং আরেকটার নাম ব্রাইগুন। আমি অবশ্য এখন আর পুরোপুরি নিশ্চিত নই, নামগুলো সঠিক ছিল কি না। তবে নামগুলো দেখে মি. স্মিথ ও মি. জোনসের মারফি, সল্টম্যান ও ব্রিজিট দ্য ক্যাট নামের মিউজিক হলের কথা মনে পড়ে যায়। ওই মিউজিক হলগুলোর নাম আপনারাও শুনে থাকবেন নিশ্চয়। এ রকম কাকতালীয় ব্যাপার লক্ষ করে ভদ্রলোক দুজন শখের বশে মনস্থির করে ফেলেন, মিউজিক হলের বিখ্যাত গায়কের সম্মানে তাঁরা ওই গ্রামগুলোতে বেড়াতে যাবেন। মি. চার্লসের বর্ণনা অনুসারে, আমার বাবা একটা গ্রাম পার হয়ে দ্বিতীয় গ্রামের কাছাকাছি গাড়ি আনতেই মি. স্মিথ কিংবা মি. জোনস খেয়াল করলেন, ওই গ্রামটা হলো ব্রাইগুন, মানে তৃতীয় গ্রাম। অর্থাৎ মানচিত্রে তাঁরা ওই গ্রামটিকে তৃতীয় গ্রাম হিসেবে দেখেছেন। সুতরাং তাঁরা রাগান্বিত হয়ে আমার বাবাকে হুকুম করলেন গাড়ি ঘোরাতে; মানচিত্রে যে গ্রামটি আগে দেখেছেন সেটি তাঁরা আগে দেখবেন। মানচিত্রে শেষে দেখা গ্রামটা তাঁরা শেষে দেখবেন, ‘ধারাবাহিক ক্রমানুসারে’। ঘটনাক্রমে দেখা গেল দ্বিগুণ রাস্তা পার হতে হচ্ছে। তবে মি. চার্লস আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, তাঁদের আদেশ মেনে নিলেন যেন তাঁদের কথায় যুক্তি আছে। সাধারণভাবেই তিনি অকলঙ্ক শিষ্টাচারের সঙ্গেই আচরণ করতে লাগলেন।

কিন্তু এবার মি. স্মিথ ও মি. জোনস দৃষ্টি ফেরালেন আমার বাবার দিকে এবং যথরীতি বাইরের দৃশ্য দেখে তাঁদের একঘেয়ে লাগতে লাগল। তাঁরা আমার বাবার ‘ভুলের’ কারণে তাঁকে যা-তা বলতে শুরু করলেন। মি. চার্লস বিস্মিত হলেন, আমার বাবা মোটেও অস্বস্তি কিংবা রাগ দেখালেন না দেখে। ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং মেনে নেওয়ার মানসিকতার মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করে তিনি গাড়ি চালাতেই লাগলেন। আমার বাবার মন-মেজাজের প্রশান্ত ভাবটাও বজায় রাখতে দেওয়া হলো না। কারণ যখন তাঁরা আমার বাবার উদ্দেশে গালাগাল কটুকাটব্য ঝেড়ে শেষ করে ফেলেছেন তখন তাঁরা অকথা বলা শুরু করলেন তাঁদের আতিথ্যকর্তা সম্পর্কে, মানে আমার বাবার মনিব মি. জন সিলভার্স সম্পর্কে। তাঁদের কথাবার্তা একেবারে অকথ্য পর্যায়ে চলে গেলে মি. চার্লস মাঝখানে এগিয়ে আসতে বাধ্য হন এবং ভদ্রলোক দুজনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তাঁদের কথাবার্তা খারাপ রুচির পরিচয় প্রকাশ করছে। তাঁর এ মন্তব্যে ওই দুজন আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং মি. চার্লস বুঝতে পারেন, এখন তাঁদের আক্রমণের শিকার হবেন তিনি নিজে। এমনকি তাঁর শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হওয়ারও আশঙ্কা আছে। কিন্তু তাঁর মনিবের নামে ঘৃণ্য কথা শোনার পর আমার বাবা হঠাৎ করে গাড়ি থামিয়ে দেন। তারপর যা ঘটে তার জন্যই মি. চার্লস আমার বাবার ব্যক্তিত্বটা চিরদিন এভাবে মনে রেখেছেন।

গাড়ির পেছনের দরজা খুলে গেল; দেখা গেল গাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন আমার বাবা। তিনি গাড়ির ভেতরে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মি. চার্লস যেমন বর্ণনা করেছেন, গাড়ির ভেতরের তিনজনই আমার বাবার শারীরিক অবয়ব দেখে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। আমার বাবার চেহারাটা তখন তাঁদের কাছে খুব শক্তিশালী ও ভয়াবহ মনে হচ্ছিল। আসলেই বাবার উচ্চতা ছিল ছয় ফুট তিন ইঞ্চির মতো। তাঁর মুখের চেহারা দেখলে যে কেউ বলে দিতে পারত, তিনি হুকুম পালনের জন্যই যেন প্রস্তুত আছেন। কিন্তু অন্য কোনো পরিস্থিতিতে দেখলে বোঝা যেত, ওই মুখের মধ্যেই যেন নিষেধের কোনো জোর প্রভাব আছে। মি. চার্লস যেমন বলেছেন, আমার বাবা কোনো রকম বাহ্যিক রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। মনে হলো, তিনি শুধু দরজাটা খুলে দিয়েছেন। তবু তাঁর চাহনির মধ্যে বকুনি দেওয়ার মতো খুব শক্তিশালী কিছু একটা ছিল এবং একই সময় তাঁদের তিনজনের সামনে আমার বাবার শারীরিক অবয়বটা বিরাট হয়ে দেখা দেয়। ফলে মাতাল দুজন ভয়ে গাড়ির ভেতরে সেঁটে বসে থাকেন। তাঁদের চেহারা হয়ে যায় আপেল চুরি করতে এসে বাগানের মালিকের হাতে ধরা পড়া বালকদের মতো।

আমার বাবা মুখে কিছুই না বলে ওইভাবে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। শেষে মি. স্মিথ অথবা মি. জোনস ক্ষীণস্বরে মন্তব্য করেন, আমরা কি ভ্রমণ শেষ করব না?

আমার বাবা কিছু না বলে নীরবে দাঁড়িয়েই রইলেন। তাঁদের নামার কথা বললেন না, কিংবা তাঁর কিছু চাওয়ার বা বলার আছে এমন কোনো আচরণও করলেন না। গাড়ির খোলা দরজার সামনে সেদিন আমার বাবাকে কেমন দেখাচ্ছিল আমি কল্পনায় দেখতে পারি—গাড়ির দরজার কাছে তাঁর উপস্থিতিটা যেন একটা কালো ও কঠিন অবয়ব, যেন তাঁর পেছনের হার্টফোর্টশায়ারের দৃশ্যের সব প্রশান্ত ভাবটা মুছে ফেলছেন। মি. চার্লস বলেন, ওই মুহূর্তগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের ভয় জাগিয়ে দেওয়ার মতো। যদিও খানিক আগের অভদ্র আচরণে তিনি অংশগ্রহণ করেননি, তবু তখন তিনিও অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। নীরবতা এমনভাবে জেঁকে বসে, যেন আর কখনো শেষ হবে না। তারপর মি. স্মিথ কিংবা মি. জোনস বিড়বিড় করে বলেন, আমরা বোধ হয় খানিকটা বেমানান কথাবার্তা বলে ফেলেছি। এ রকম আর হবে না।

কথাটা একমুহূর্ত ভেবে দেখে আমার বাবা আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের আসনে এসে বসলেন। সামনের তিনটা গ্রাম ভ্রমণ করার জন্য গাড়ি সামনে এগিয়ে চলল। মি. চার্লস বলেন, ভ্রমণের বাকি পথটা প্রায় পুরোপুরি নীরবতায় কাটে।

এই ঘটনাটা বলার পর ওই সময়ের কাছাকাছি আমার বাবার জীবনের আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। পরের ঘটনাটা আরো পরিষ্কার করে দেয় বিশেষ গুণটির কথা। আমাকে বলতেই হচ্ছে, দুই ভাইয়ের একজন আমি। আমার বড় ভাই যখন আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধে নিহত হন তখন আমি ছোট এক বালক মাত্র। স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবা ছেলে হারানোর বেদনা তীব্রভাবেই অনুভব করেন। তবে এ রকম ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায়, কোনো বাবার মধ্যে গর্বের একটা বোধ থাকে, তাঁর ছেলে রাজা কিংবা রাজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে জীবন দিয়েছে। তবে আমার বাবার মধ্যে এ রকম বোধটা আসতে পারেনি। কারণ আমার ভাইয়ের জীবন গেছে একজনের বেকুবি সিদ্ধান্তের কারণে। আমার ভাইয়ের গৌরবটার ওপরে কালির দাগ ফেলে দিয়েছে একজন জেনারেলের ভুল পরিচালনা। লোকটার আচরণ একেবারেই অব্রিটিশসুলভ ছিল; কেননা তাঁর হুকুমে বয়ার বসতির সাধারণ মানুষদের আক্রমণ করা হয় এবং আরো বিস্ময়কর তথ্য বের হয়ে আসে, প্রাথমিক সামরিক সতর্কতাও মানেননি ওই জেনারেল। সুতরাং আমার ভাইসহ যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের মৃত্যু কোনো কাজেই আসেনি। আমি যে প্রসঙ্গে কথা বলছি সেটার সঙ্গে ওই জেনারেলের সৈনিক চালনার বিষয়টি সরাসরি আসে না। তবে যদি উল্লেখ করি, ওই ঘটনাটি ওই সময়ে অনেক হৈ-হট্টগোলের জন্ম দেয়, তাহলে বুঝতে পারবেন কোন ঘটনার কথা বলছি।

জেনারেলের প্রতি আমার বাবার অনুভূতি স্বাভাবিকভাবেই ঘৃণার অনুভূতি ছিল। তবে তিনি এটাও বুঝতে পারলেন, তাঁর মনিবের বর্তমানের ব্যাবসায়িক অভিলাষের সফলতা নির্ভর করছে হাউস পার্টিটা ঠিকমতো পরিচালনা করার ওপর। আঠারোজনের মতো কর্মচারী মিলে পার্টি আয়োজন করা খুব তুচ্ছ ব্যাপারও নয়। আমার বাবা বুঝতে পারলেন, তাঁর অনুভূতির মূল্যায়ন করা হয়েছে; সে জন্য তিনি মি. সিলভার্সকে জানালেন, তিনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, অন্য সময়ের মান বজায় রেখেই মেহমানকে সেবা দেওয়া হবে।

ঘটনা যেভাবে গড়াতে লাগল তাতে আমার বাবার সহিষ্ণুতার পরীক্ষা আগে যেমন ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে আরো কঠিন হয়ে গেল। যেমন একটা বিষয়, বাবা হয়তো ভেবেছিলেন জেনারেলকে সামনাসামনি দেখার পর তাঁর প্রতি বাবার সহজাত ক্ষোভের বিপরীতে হয়তো করুণা অথবা সম্মানবোধ জাগতে পারে। তাঁর ক্ষোভ খানিকটা কমেও যেতে পারে। কিন্তু তাঁর এ রকম ভাবনার কোনো ভিত্তিই পাওয়া গেল না। লোকটার চেহারা গোলগাল, কুিসত। আচরণ পরিশীলিত নয়। আর পরিষ্কার বোঝা গেল, কথায় কথায় যেকোনো বিষয়ে সামরিক তুলনা উপমা ব্যবহার করতে থাকেন। আরেকটা খারাপ খবর হলো, লোকটার পরিচারক সঙ্গে আসেনি। নিয়মিত যাকে পরিচারক হিসেবে রাখেন তার নাকি অসুখ হয়েছে। এতে একটা সমস্যাও দেখা দিল : হাউসের আরেকজন অতিথিরও পরিচারক আসেনি। তখন কোন অতিথির জন্য বাটলারকে পরিচারক হিসেবে দেওয়া হবে এবং কোন অতিথির জন্য খানসামা দেওয়া হবে—এমন একটা বিষয় সামনে চল এলো। তাঁর মনিবের অবস্থান বুঝে আমার বাবা অনতিবিলম্বে জানালেন, তিনি জেনারেল সাহেবের সেবায় আছেন। যে লোকটাকে তিনি ঘৃণা করেন তাঁর খুব কাছে একটানা চার দিন থাকার মতো কষ্টটাই বেছে নিলেন। আমার  বাবার অনুভূতি সম্পর্কে একেবারে কিছুই না জানার কারণে জেনারেল সাহেব তাঁর সামরিক জীবনের সব অর্জন সম্পর্কিত ঘটনার কথা বলার সুযোগ পেলেন। নিজেদের রুমের ভেতরে অবস্থানকালে প্রায় সব সামরিক কর্তাই পরিচারকদের কাছে এ রকম আত্মকৃতিত্বের ইতিহাস শুনিয়ে থাকেন। তবু আমার বাবা তাঁর অনুভূতি এতটা দক্ষতার সঙ্গে আড়াল করে রাখলেন, তাঁর দায়িত্ব এতটাই পেশাগত দক্ষতায় পালন করলেন যে বিদায়ের সময় জেনারেল সাহেব মি. জন সিলভার্সের কাছে তাঁর বাটলারের গুণের প্রশংসা করলেন এবং বড় অঙ্কের বকশিশ রেখে গেলেন। তাঁর মনিবকে আমার বাবা নির্দ্বিধায় সে বকশিশ কাউকে দান করে দিতে বললেন।

আশা করি, আপনারা একমত হবেন, আমার বাবার পেশাগত জীবনের এই দুটি উদাহরণ উল্লেখ করলাম; আমি দুটি ঘটনার জন্যই তাঁর প্রশংসা করি এবং যথাযথ বলে জোর সমর্থন করি। ‘বাটলারের অবস্থানের সঙ্গে মানানসই মর্যাদা’ বলতে হায়েস সোসাইটি যা বুঝিয়েছে আমার বাবার ঘটনা দুটির মধ্যে সেটা প্রকাশ পেয়েছে। বাবা সেই গুণেরই মূর্ত রূপ হয়ে উঠেছেন। এই দুটি ঘটনার মাধ্যমে আমার বাবার যে প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে মি. জ্যাক নেইবার্সের (তাঁর সর্বোত্তম প্রায়োগিক দক্ষতা সত্ত্বেও) যে পার্থক্য নিরূপিত হয় সেটা নিয়ে ভাবলে যে কেউ বুঝতে পারবে, একজন বিশেষ গুণসম্পন্ন বাটলার এবং একজন সাধারণ যোগ্য বাটলারের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। আমরা এখন তাহলে আরো ভালো করে বুঝতে পারি, ডাইনিং টেবিলের নিচে বাঘ দেখেও যে বাটলার আতঙ্কিত হন না সেই বাটলার আমার বাবার কাছে এত প্রিয় কেন। কারণ তিনি সহজাতভাবেই বুঝতে পারেন, এই গল্পের কোথায় যেন সত্যিকারের ‘মর্যাদা’ বলতে যা বোঝায় সেটা লুকিয়ে আছে। এবার তাহলে প্রস্তাবনা হিসেবে বলতে চাই : বাটলার যে পেশাগত অস্তিত্বের মধ্যে বাস করেন সেটা তিনি ছেড়ে যেতে পারেন না। এই অস্তিত্বের মধ্যে থাকার ক্ষমতাটা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে ‘মর্যাদা’। গুণের দিক থেকে নিম্ন অবস্থানে থাকা কোনো বাটলার সামান্যতম উসকানিতেই পেশাগত অস্তিত্বটা ছেড়ে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েন।

মাঝেমধ্যে বলা হয়, বাটলারদের অস্তিত্ব শুধু ইংল্যান্ডেই আছে। যে নামেই তাদের পরিচয় দেওয়া হোক, অন্যান্য দেশে শুধু চাকর আছে। আমার মনে হয়, কথাটা সত্যি। উপমহাদেশের লোকেরা বাটলার হতে পারে না। কারণ জন্মগতভাবেই তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। শুধু ইংরেজ জাতিই পারে। আপনারা একমত হবেন, কিছুটা যেমন কেল্টরা তেমন উপমহাদেশের লোকেরা প্রচণ্ড আবেগের সময় নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না এবং পেশাগত আচরণ বজায় রাখতে পারে না; বড়জোর অল্প চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পারে। আমি আগের তুলনাটাতে ফিরে যেতে চাই। এই অমার্জিত তুলনায় যাচ্ছি বলে মাফ করবেন। সামান্য উসকানির পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি পোশাক খুলে ফেলে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিলে যা হয় তাদের ক্ষমতাটাও সে রকম। ‘মর্যাদা’ বিষয়টাই এদের আয়ত্তের বাইরে। আমরা ইংরেজরা বিদেশিদের ওপরে এই বিষয়ে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। সুতরাং আপনারা যখন গুণসম্পন্ন বাটলারের কথা ভাবেন সংজ্ঞাগতভাবে অবশ্যই তাকে একজন ইংরেজ হতে হবে।

অবশ্য আপনারাও মি. গ্রাহামের মতো প্রতিবাদ করতেই পারেন। আগুনের পাশে বসে আমাদের উপভোগ্য আলোচনায় আমি যখনই কথাবার্তায় এ রকম পথ ধরতাম মি. গ্রাহাম প্রতিবাদ করতেন। আমার প্রস্তাবনার কথাটা হলো, আমার কথা যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে যে কেউ একজন মহান গুণের অধিকারী এ রকম বাটলারকে খুঁজে পাবেন শুধু কঠিন কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে। তার পরও সত্য হলো, যদিও আমরা মি. মার্শাল ও মি. লেইনের মতো মানুষকে কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে যাচাই-বাছাই করে দেখিনি তবু তাঁদের আমরা মহান বলেই গ্রহণ করি। মি. গ্রাহামের কথার একটা বিষয় আমাকে স্বীকার করতেই হবে, তবে শুধু এটুকুই বলতে পারি, কেউ অনেক দিন একটি পেশায় কাজ করে থাকলে নিজের সজ্ঞা দিয়েও কোনো পরিস্থিতির চাপের বাইরের অবস্থা দেখেও অন্য আরেকজনের পেশাগত গুণের গভীরতা বিচার করে দেখতে পারে। আসলেই কোনো পরীক্ষার জন্য সন্দেহবাদী তাড়নার অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেউ মহান কোনো বাটলারের দেখা পেয়ে যেতে পারে। যে পেশাগত গুণকে কোনো বাটলার নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো শক্তির সঙ্গে বজায় রেখে চলেছেন সে গুণকে পরাহত করতে পারে এমন পরিস্থিতি কল্পনায় আনার চেষ্টা করা মানে বিমূঢ় হয়ে যাওয়া, সহজে সম্ভব নয়।

উপলব্ধি করতে পারি, এমন অনেকেই আছে যারা জোর গলায় দাবি করবে, মহান হওয়ার গুণকে আমি যেভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি সেটা একটা বৃথা কাজ। মি. গ্রাহামের যুক্তি সব সময় এ রকম ছিল : ‘শোনো, যার মধ্যে এই গুণ আছে তাকে দেখলেই বোঝা যায়, কিংবা যার মধ্যে এই গুণ নেই তাকে দেখলেও বোঝা যায়। এর বাইরে তোমার বলার মতো কিছু নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই ব্যাপারে পরাজিতম্মনা না হওয়ার একটা কর্তব্য আছে আমাদের। নিশ্চিতভাবেই এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার পেশাগত একটা দায়িত্ব আছে আমাদের সবার, যাতে আমাদের প্রত্যেকে আরো ভালো করে আমাদের নিজেদের জন্য মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করে যেতে পারি।’

 

দ্বিতীয় দিন : সকাল

সলসবারি

 

নতুন বিছানায় আমার ঘুম ভালো হয় না। কষ্টকর সংক্ষিপ্ত পাতলা ঘুমের পর ঘণ্টাখানেক আগে জেগে উঠেছি। সারা দিনের সকাল আমার সামনে পড়ে আছে ভেবে আবার ঘুমানোর চেষ্টায় ফিরে গেলাম। কিন্তু চেষ্টাটা ব্যর্থই হলো। তারপর যখন উঠে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম তখনো বেশ অন্ধকার। কোনার সিংকে দাড়ি কামানোর জন্য আমাকে বিদ্যুতের আলো জ্বালাতেই হলো। তবে দাড়ি কামানো শেষে বাতির সুইচ অফ করে দেখলাম, পর্দার কোনায় ভোরের আলোর আভা দেখা যাচ্ছে।

একমুহূর্ত আগে পর্দা একটু সরিয়ে দেখলাম, বাইরের আলো তখনো ফিকে হয়ে আছে। কুয়াশার কারণে রাস্তার পাশের বেকারি আর বিপরীত পাশের ওষুধের দোকানের দিকে স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছি না। রাস্তা বরাবর সামনের দিকের ছোট বাঁকা ব্রিজটার কাছে নদী থেকে কুয়াশা ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। তখনো ব্রিজের ওপরের একটা খুঁটি কুয়াশায় ঢেকে আছে। কোথাও জনমানুষের চিহ্নমাত্র নেই। দূরে কোথায় যেন হাতুড়ির শব্দ হচ্ছে। বাড়ির পেছনের একটা রুম থেকে কার যেন কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই কোথাও। বাড়ির মালিক মহিলা এত আগে ঘুম থেকে ওঠেননি নিশ্চয়। আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছেন, সকাল সাড়ে সাতটার আগে নাশতা দেবেন না।

এই মুহূর্তে জগৎ-সংসার জেগে ওঠার অপেক্ষায় আছি। ঠিক এ সময়ই মিস কেন্টনের চিঠির কয়েকটা প্যাসেজের কথা মনে পড়ে গেল। ঘটনাক্রমে এখন আমার নিজের কাছেই মিস কেন্টনের কথা ব্যাখ্যা করে বলতে হবে। সঠিক করে বললে, মিস কেন্টন হলেন মিসেস বেন। বিশ বছর ধরে তো তিনি মিসেস বেন হয়েই ছিলেন। তাঁর অবিবাহিত অবস্থা থেকে আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে চিনি এবং তাঁর বিয়ের পর মিসেস বেন হয়ে তিনি সেই যে ওয়েস্ট কান্ট্রিতে চলে গেলেন, তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখাই হয়নি। আমি তাঁকে আগে যেমন করে চিনতাম, তাঁর নামটা তেমন করে উল্লেখ করে বেমানান কিছু করে থাকলে মাফ করবেন আপনারা। তাঁর চিঠি পড়ে মনে হয়েছে, তাঁকে মিস কেন্টন বলার আরো কারণ আছে : দুঃখজনক হলো, তাঁর বিয়েটা আর টিকল না। তাঁর চিঠিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। এ রকম সময়ে মানুষ সাধারণত তেমন কিছু বলতেও চায় না। তবে মিস কেন্টন স্পষ্ট করে জানিয়েই দিয়েছেন, তিনি মি. বেনের হেলস্টনের বাড়ি থেকে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি লিটল কম্পটনের কাছে একটা গ্রামে পরিচিত একজনের বাড়িতে আছেন।

তাঁর বিয়েটা ভেঙে যাচ্ছে—বিষয়টা আসলেই ট্র্যাজিক। সন্দেহ নেই, ঠিক এই সময়টাতেই তাঁর সুদূর-অতীতে নেওয়া সিদ্ধান্তটা সম্পর্কে মনে মনে আফসোস করছেন। সেই সিদ্ধান্তটা তাঁর এই মধ্যবয়সে তাঁকে একাকী বানিয়ে গেল, নিঃসঙ্গ বানিয়ে গেল। খুব সহজেই বোঝা যায়, মনের এ রকম অবস্থায় ডার্লিংটন হলে তাঁর ফিরে আসার চিন্তাটা তাঁর জন্য অবশ্যই স্বস্তিদায়ক হবে। অবশ্য স্বীকার করতে হবে, চিঠির কোনোখানেই তিনি সরাসরি পরিষ্কার করে তাঁর ফিরে আসার কথাটা বলেননি, তবে চিঠির অনেক প্যাসেজে তিনি যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তার ভিত্তিতে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, ডার্লিংটন হলে কাটানো দিনগুলোর জন্য তাঁর গভীর স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য এই পর্যায়ে এখানে ফিরে এসে মিস কেন্টন তাঁর আগের বছরগুলো আর ফিরে পাবেন না।

আমার পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, ডার্লিংটন হলে আমাদের চারপাশে বর্তমানে যে সমস্যাগুলো রয়েছে এত বছরের বিরতির পর মিস কেন্টনের ফিরে আসাটা সেগুলোর সঠিক সমাধান হওয়ার প্রমাণ রাখতে পারে। আমি মনে হয়, ‘সমস্যা’ বলে খানিকটা অতিরঞ্জন করে ফেললাম। মোটের ওপর আমি আমার সাম্প্রতিক কিছু ভুলত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করেছি এবং কোনো সমস্যা সত্যি সত্যি উদ্ভূত হওয়ার আগেই সেটাকে সমস্যা বলে ফেলছি। এ কথা সত্যি, এসব তুচ্ছ ভুলত্রুটি প্রথমে আমার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। তবে যখনই সেগুলোকে কর্মচারী স্বল্পতার লক্ষণ বলে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছি তখনই সেগুলো নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করা বাদ দিয়েছি। আমার মতে, মিস কেন্টনের আগমন এই সমস্যার স্থায়ী সমাপ্তি ঘটাবে।

যা-ই হোক, এবার তাঁর চিঠির প্রসঙ্গে ফিরে আসি। চিঠিতে তাঁর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বেশ কয়েকবার হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। বেশ চিন্তার বিষয়। চিঠিতে তিনি একটা বাক্য এ রকম শুরু করেছেন, ‘যদিও বাকি জীবনটা কী দিয়ে পরিপূর্ণভাবে পূরণ করব সে সম্পর্কে এখন আমার কোনো ধারণাই নেই...।’ আবার অন্যখানে তিনি লিখেছেন, ‘বাকি জীবনটা আমার সামনে একেবারে শূন্য পাথার।’ আগে যেমন বলেছি, চিঠির বেশির ভাগ জুড়ে তাঁর কথার সুর স্মৃতিকাতরতায় ভরা। একটা জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘এই পুরো ঘটনাটা আমাকে এলিস হোয়াইটের মানসিক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এলিস হোয়াইটের কথা আপনার মনে আছে? আসলে আমার মনেই হয় না, আপনি ওর কথা ভুলতে পারেন। আর আমি নিজের কথা যদি বলি, ওর সেই স্বরধ্বনি আর ওর স্বপ্নের অনন্য ব্যাকরণহীন বাক্যগুলো এখনো আমার স্মৃতিতে বারবার হানা দেয়। ওর কী হয়েছিল সে ব্যাপারে আপনার কোনো ধারণা আছে?’

সত্যি বলতে কি, ওর সম্পর্কে আমার তেমন স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। ও আমাদের হাউসমেইড ছিল। ওর কথা মনে করে খানিক হাসিও পাচ্ছে, তবু একটু মনে আছে, ও বেশ খানিকটা অধৈর্য ছিল। শেষে ও আমাদের খুব ভক্ত হয়ে ওঠে। মিস কেন্টন তাঁর চিঠিতে আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘তিনতলার বেডরুমগুলো থেকে যে দৃশ্য দেখা যেত তা আমার খুব প্রিয় ছিল। দূরে ঢালু লন দেখা যেত। এখনো কি সে রকমই আছে? ওই দৃশ্যে গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় জাদুর মতো রূপ ধারণ করত জায়গাটা। আমি আপনার কাছে এখন স্বীকার করছি, অনেক অনেক মূল্যবান ঘণ্টা ওখানকার জানালাগুলোর কোনোটাতে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। দৃশ্যটা আমাকে দারুণ মুগ্ধ করে ফেলত।’

তারপর তিনি আরো লিখেছেন, ‘এই স্মৃতিটা খুব বেদনাদায়ক, মাফ করবেন, কিন্তু আমি কখনো ভুলতে পারব না। আমরা দুজনে আপনার বাবাকে সামার হাউসের সামনে এদিক-ওদিক হাঁটতে দেখলাম। মাথা নিচু করে কী যেন খোঁজার মতো করে পায়চারি করছেন, যেন তাঁর হাত থেকে কোনো মূলবান অলংকার নিচে পড়ে গেছে, খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।’

ত্রিশ বছর আগের যে স্মৃতিটা আমার মনের ভেতর জেগে আছে সেটা মিস কেন্টনের মনেও তেমনি স্পষ্ট হয়ে আছে। এখানে কোনো বিষয়ের গুপ্ত প্রকাশ আছে মনে হয়। সত্যিই তিনি যে গ্রীষ্ম সন্ধ্যাগুলোর কথা বলছেন সে রকম কোনো সন্ধ্যায় ওই ঘটনা ঘটেছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে উঠে দেখি, সূর্যাস্তের গোলাপি রঙের আভা করিডরের আবছা অন্ধকার ভেদ করে ঢুকে পড়ছে। করিডরের সামনের প্রতিটি বেডরুম হাঁ করে খোলা। বেডরুমগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা জানালার পাশে মিস কেন্টনের শরীরের ছায়া দেখতে পেলাম। তিনি কোমল গলায় ডাক দিয়ে বললেন—মি. স্টিভেনস, আপনার যদি একমুহূর্ত সময় হয়।

আমি যখন ঢুকলাম মিস কেন্টন জানালার কাছে ফিরে গেলেন। নিচে পপলারগাছের ছায়া পড়েছে লনে। আমাদের দৃষ্টির ডান পাশে লনটা একটা বাঁধের সঙ্গে ওপরের দিকে মিশে গেছে। ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে সামার হাউসটা। হাউসের সামনে আমার বাবার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এদিক-ওদিক পায়চারি করছেন। মিস কেন্টন যেমন বলেছেন, মনে হয় হারিয়ে ফেলা কোনো মূলবান অলংকার খুঁজছেন।

এই স্মৃতিটা আমার মনে এত দিন ধরে অমলিন থাকার প্রাসঙ্গিক কিছু কারণ আছে। ব্যাখ্যা করা দরকার মনে করছি। তা ছাড়া যে স্মৃতিটা নিয়ে ভাবছি, মিস কেন্টনের মনের ওপরে সেটা বিশেষ ছাপ ফেলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা ডার্লিংটন হলে তাঁর কাজের প্রথম দিকে আমার বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেরও কিছু ব্যাপার ছিল।

মিস কেন্টন এবং আমার বাবা ডার্লিংটন হলে প্রায় একই সময়ে এসেছিলেন—১৯২২ সালের বসন্তে, আমার পূর্ববর্তী হাউসকিপার ও আন্ডার-বাটলার চলে যাওয়ার ফলস্বরূপ তাঁদের আনা হয়। এ রকম ঘটার কারণ হলো আগের দুজন একজন আরেকজনকে বিয়ে করে পেশা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমার মতে, এ রকম যোগসাজশের সম্পর্ক কোনো হাউসের স্বাভাবিক চলমানতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ওই সময় থেকে এ রকম পরিস্থিতিতে আমি অসংখ্য কর্মচারী হারিয়েছি। অবশ্য পরিচারিকা আর খানসামাদের মধ্যে যে এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে সেটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। আর একজন বিচক্ষণ বাটলার এ বিষয় মাথায় রাখবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মচারীদের মধ্যে এ রকম বিয়ে কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। অবশ্য দুজন কর্মচারী যদি প্রেমে পড়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় তাদের দোষ দেওয়া হবে ছোটলোকি কাজ। কিন্তু পেশার প্রতি যাদের দায়বদ্ধতা নেই এবং যারা রোমান্সের খোঁজে এক পদবি থেকে আরেক পদবিতে ঘুরে বেড়ায় তাদের আমার বিরক্তিকর মনে হয়। এখানে বিশেষ করে হাউসকিপাররাই দায়ী। এ রকম কোনো ব্যক্তি ভালো পেশাদারির ওপরে কলঙ্কের দাগ। তবে বিলম্ব না করে বলেই ফেলি, ওপরের কথাগুলো বলার সময় মিস কেন্টনকে বিবেচনায় আনিনি। অবশ্য তিনিও বিবাহিত জীবন শুরু করার জন্যই আমার স্টাফ থেকে বের হয়ে যান। তবে জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার অধীনে হাউসকিপার হিসেবে কাজ করার সময় তিনি মোটেও কম নিবেদিত ছিলেন না। পেশার কাজকর্ম থেকে তাঁর মন কখনো অস্থির হয়ে উঠতে দেখিনি।

মনোযোগ অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। বলছিলাম, আমাদের একজন হাউসকিপার এবং একজন আন্ডার-বাটলার দরকার ছিল এবং ওই সময় মিস কেন্টন আসেন হাউসকিপার হিসেবে যোগদান করতে। তাঁর পেছনে অস্বাভাবিক রকমের ভালো রেফারেন্স ছিল, আমার মনে আছে। ওই একই সময়ে মি. জন সিলভার্সের মৃত্যু হওয়ার কারণে আমার বাবারও লাফবোরো হাউসের কাজ শেষ হয়ে যায়। তাঁর জন্য কাজ এবং ভালো বাসস্থানের দরকার ছিল। যদিও তখনো তিনি তাঁর পেশার একেবারে উচ্চতম পর্যায়ে ছিলেন। তাঁর বয়স তখন সত্তরের ঘরে, বাত ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

যত দূর মনে পড়ে, আমার বাবা ও মিসেস কেন্টন যোগদান করার পরই একদিন সকালে আমার ভাঁড়ারঘরে বসে কাগজপত্রের ভেতর মনোযোগ দিয়ে কী কী যেন দেখছিলাম। ওই সময় দরজায় শব্দ শুনলাম। তাঁকে ঢোকার কথা বলার আগেই মিস কেন্টনকে ঢুকে পড়তে দেখে কিছুটা অবাক হলাম। তিনি বিরাট একটা ফুলদানি নিয়ে এসেছেন। হাসতে হাসতে বললেন—মি. স্টিভেনস, ভাবলাম এটা আপনার বারান্দার শোভা বাড়াবে।

মাফ করবেন, মিস কেন্টন।

মি. স্টিভেনস, বাইরে যখন এত রোদের আলো আপনার রুম এত অন্ধকার, এত ঠাণ্ডা! কেমন যেন বেমানান লাগে। ভাবলাম আপনার রুমের প্রাণ আসবে এটা এখানে রাখলে।

আপনার দয়া, মিস কেন্টন।

লজ্জার কথা, আপনার এখানে আরো আলো কেন যে ঢোকে না। এখানকার দেয়ালগুলোও কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে, তাই না, মি. স্টিভেনস?

আমার হিসাব-নিকাশের দিকে ফিরে যেতে যেতে বললাম, তরলের সঙ্গে শুধু মেশেনি মনে হয়, মিস কেন্টন।

ফুলদানিটা আমার টেবিলের ওপর রেখে রুমের চারপাশটা ভালো করে দেখে তিনি বললেন—মি. স্টিভেনস, আপনি চাইলে আমি আরো কিছু গাছের কলম আনতে পারি আপনার জন্য।

মিস কেন্টন, আপনার দয়ার প্রশংসা করছি। তবে এটা বিনোদনের রুম নয়। কাজের সময় মনোযোগ যত কম নষ্ট হয় ততই ভালো।

কিন্তু মি. স্টিভেনস, আপনার রুমটা এত সাদামাটা রংহীন রাখাটা নিশ্চয় দরকার নেই।

আপনার চিন্তাভাবনা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, বুঝতে পারছি। এত দিন যাবৎ এই রুমটা এভাবেই ভালো কাজে দিয়ে আসছে। আসলে আপনি যেহেতু এখানে এসেছেন আমি একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই আপনার সঙ্গে।

ওহ্, সত্যি, মি. স্টিভেনস!

হ্যাঁ, মিস কেন্টন। সামান্য একটা বিষয়। গতকাল রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলাম, আপনি কাকে যেন উইলিয়াম বলে ডাকছিলেন।

তাই নাকি, মি. স্টিভেনস?

সত্যি, মিস কেন্টন। বেশ কয়েকবার শুনলাম আপনি উইলিয়াম বলে ডাকছেন। আপনি কাকে ওই নামে ডাকছিলেন, জানতে পারি?

কেন, মি. স্টিভেনস, আমি তো মনে হয় আপনার বাবাকে ডাকছিলাম। এ বাড়িতে উইলিয়াম নামে আর তো কেউ নেই, আমি নিশ্চিত।

অল্প একটু হাসি ছড়িয়ে বললাম, এখানে খুব সহজে ভুল হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা রয়ে গেছে। মিস কেন্টন, আপনাকে ভবিষ্যতে আমার বাবাকে ‘মি. স্টিভেনস’ বলে ডাকতে অনুরোধ করতে পারি? আপনি তৃতীয় কারো কাছে তাঁর কথা বলতে গেলে ‘মি. স্টিভেনস সিনিয়র’ বলে উল্লেখ করতে পারেন। তাহলে তাঁর এবং আমার মধ্যে পার্থক্যটাও বোঝা যাবে। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব, মিস কেন্টন।

এই বলে আমার কাগজপত্রের দিকে মনোযোগ দিলাম। কিন্তু আমার জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার, মিস কেন্টন ওখান থেকে গেলেন না। একমুহূর্ত পরই তিনি আবার বললেন, এক্সকিউজ মি, মি. স্টিভেনস।

বলুন, মিস কেন্টন।

আমার মনে হয়, আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। এত দিন অধীন কর্মচারীদের এভাবে তাদের খ্রিস্ট নাম ধরে সম্বোধন করতেই অভ্যস্ত। এই হাউসে তার ব্যতিক্রম কিছু করার কথা ভাবিনি।

মিস কেন্টন, এটা মারাত্মক একটা বোঝার ভুল। যা-ই হোক, আপনি যদি পরিস্থিতিটা একমুহূর্ত বিবেচনা করে দেখেন তাহলে আমার বাবার মতো একজন ব্যক্তিকে এভাবে হেয় করে সম্বোধন করার অযথার্থটা বুঝতে পারবেন।

মি. স্টিভেনস, এখনো পরিষ্কার বুঝতে পারছি না, আপনি কী বলছেন। আপনি আমার মতো একজনের কথা বলছেন। তবে যতটুকু বুঝি, আমি তো এখানকার হাউসকিপার। আর আপনার বাবা তো একজন আন্ডার-বাটলার।

আপনি যেমনটা বলছেন, তিনি অবশ্যই একজন আন্ডার-বাটলার। কিন্তু বিস্মিত হচ্ছি, আপনার বোধশক্তি এখনো আপনার কাছে পরিষ্কার করতে পারেনি যে বাস্তবে তিনি ওই পরিচয়ের অনেক ঊর্ধ্বে। অনেক বেশি।

মি. স্টিভেনস, আমার বোধশক্তি দুর্বল। আমি শুধু বুঝেছি, আপনার বাবা একজন আন্ডার-বাটলার এবং তাঁকে সে অনুযায়ীই সম্বোধন করেছি। আমার মতো একজনের কাছ থেকে এভাবে সম্বোধন পাওয়াটা তাঁর জন্য নিশ্চয় তিক্ত অনুভূতির।

মিস কেন্টন, আপনার কথার সুর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আপনি আমার বাবাকে ভালো করে দেখেননি। যদি দেখতেন তাহলে আপনার মতো বয়সের একজন মানুষের অযথার্থতা কোথায় বুঝতে পারতেন এবং তাঁকে সরাসরি উইলিয়াম বলে সম্বোধন করাটাই আপনার নিজের ভুলের প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারতেন।

মি. স্টিভেনস, হাউসকিপার হিসেবে আমার কাজের অভিজ্ঞতা হয়তো অনেক দিনের নয়; কিন্তু আমি বলতে চাই, যখন হাউসকিপার হয়ে গেছি তখন থেকে তো উদার মন্তব্য পেয়েছি।

আপনার যোগ্যতা নিয়ে একমুহূর্তের জন্যও সন্দেহ পোষণ করছি না, মিস কেন্টন। কিন্তু আপনার সামনে শত ইঙ্গিত আছে, আমার বাবা তাঁর পেশার একজন বিশেষ ব্যক্তি, যাঁর কাছ থেকে আপনি অনেক কিছু শিখতে পারেন, যদি আপনি চোখ-কান খোলা রাখার পক্ষপাতী হন।

আপনার উপদেশের জন্য আপনার কাছে ঋণ স্বীকার করছি, মি. স্টিভেনস। তাহলে আমাকে বলুন, আপনার বাবাকে দেখে কী কী মহান গুণ শিখতে পারি।

মিস কেন্টন, চোখ-কান খোলা রাখা যেকোনো মানুষের কাছ থেকেই আমরা আশা করতে পারি তিনি কী কী শিখতে পারেন।

আমরা তো প্রমাণ পেলামই, আমার ওই দিকটাতে ঘাটতি আছে, তাই না?

মিস কেন্টন, আপনি যদি মনে করে থাকেন, এই বয়সেই আপনি আপনার পেশার সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন তাহলে আপনার সত্যি সম্ভাবনা যত দূর আছে আপনি কোনো দিনও তত দূর উঠতে পারবেন না। আমি উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, আপনি এখনো জানেন না, কী করলে কী হয়, কোনটার অবস্থান কোথায়।

এইবার মনে হলো, মিস কেন্টন কিছুটা চুপসে গেলেন। একমুহূর্তের জন্য তাঁকে বিপর্যস্ত মনে হলো। তারপর বললেন, এখানে আসার পর সব কিছু ঠিকমতো বুঝে উঠতে আমার সমস্যা হয়েছে। তবে সেটা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক।

এইতো, বুঝতে পারছেন, মিস কেন্টন। আমার বাবা আপনার এক সপ্তাহ পরে এখানে যোগ দিয়েছেন। আপনি আমার বাবাকে ভালো করে দেখে থাকলে বুঝতেন, এই বাড়ি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান একেবারে নিখুঁত, ডার্লিংটন হলে তিনি যখন প্রথম পা রাখেন ঠিক তখন থেকে এ রকমই ছিল তাঁর জ্ঞান।

মিস কেন্টন এ বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন বলে মনে হলো। তারপর খানিক গোমড়া মুখে বললেন, মি. স্টিভেনস সিনিয়র তাঁর কাজে খুব দক্ষ এবং চমৎকার, আমি নিশ্চিত। কিন্তু মি. স্টিভেনস, আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমি নিজেও আমার কাজে ভালো। ভবিষ্যতে আপনার বাবাকে তাঁর পুরো নাম ধরেই সম্বোধন করার কথা মনে রাখব। এখন আমার ভুলটা মনে রাখবেন না, আশা করি।

এই ঘটনার পর থেকে মিস কেন্টন আর আমার ভাঁড়ারে ফুল নিয়ে আসার চেষ্টা করেননি। আর মোটের ওপর সব কিছু তিনি ঠিকমতো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন দেখে খুশি হয়েছিলাম। তারপর পরিষ্কার হয়ে যায়, তিনি তাঁর কাজকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং বয়স অল্প হলেও তাঁর সহকর্মীদের সম্মান পেতে তাঁর সমস্যা হচ্ছে না।

খেয়াল করে দেখলাম, তিনি আমার বাবাকে ‘মি. স্টিভেনস’ বলেই সম্বোধন করা শুরু করেছেন। যা-ই হোক, আমার ভাঁড়ারে আমাদের ওই দিনের কথাবার্তার পর একদিন বিকেলে লাইব্রেরিতে কাজ করছিলাম। তখন মিস কেন্টন এলেন। তিনি বললেন, এক্সকিউজ মি, মি. স্টিভেনস। আপনি যদি আপনার ডাস্টপ্যানটা খুঁজে থাকেন তাহলে বাইরে পাবেন, হলরুমে।

বুঝতে পারছি না, মিস কেন্টন।

আপনার ডাস্টপ্যান, মি. স্টিভেনস। আপনি ওটা বাইরে রেখে এসেছেন। আমি কি আপনার জন্য ওটা ভেতরে নিয়ে আসব?

মিস কেন্টন, আমি তো ডাস্টপ্যান ব্যবহারই করি না।

ও আচ্ছা, আমাকে মাফ করবেন, মি. স্টিভেনস। আমি ভেবেছিলাম, আপনি ডাস্টপ্যান ব্যবহার করেন এবং মনের ভুলে বাইরে রেখে এসেছেন। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।

চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও আবার ফিরলেন তিনি। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ওহ্ মি. স্টিভেনস, আমি নিজেই ওটা এখানে এনে দিতাম। কিন্তু আমাকে এখনই ওপরতলায় যেতে হচ্ছে। আপনি যদি ডাস্টপ্যানটার কথা মনে রাখেন!

অবশ্যই, মিস কেন্টন। জিনিসটা সম্পর্কে আমাকে বলার জন্য ধন্যবাদ।

ঠিক আছে, মি. স্টিভেনস।

হল পার হয়ে বড় সিঁড়ির দিকে তাঁর পায়ের আওয়াজ শুনলাম। তারপর নিজেই দরজার সামনে এগিয়ে গেলাম। লাইব্রেরির দরজা থেকে প্রবেশপথের হল পার হয়ে বাড়ির প্রধান দরজা পর্যন্ত সব কিছু পরিষ্কার দেখা যায়। আপাতত শূন্য এবং চমৎকার করে পলিশ করা মেঝের একেবারে মাঝখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মিস কেন্টন যে ডাস্টপ্যানটার কথা এইমাত্র বলে গেলেন, সেটা।

কাজটাকে একটা তুচ্ছ তবে বিরক্তিকর ভুল বলেই মনে হলো আমার। হলের দিকে খোলা নিচতলার পাঁচটা দরজা থেকেই নয় শুধু, বরং সিঁড়ি থেকে এবং দোতলার ব্যালকনি থেকেও পরিষ্কার দেখা যায় এমন জায়গায় রয়েছে ডাস্টপ্যানটা। জিনিসটা আসলে কী ইঙ্গিত করছে সেটা বোঝার আগে হল পার হয়ে বিরক্তিকর ডাস্টপ্যানটা সরিয়ে ফেললাম। আমার স্মরণে এলো, আধাঘণ্টার মতো আগে আমার বাবা প্রবেশপথের হল পরিষ্কার করেছেন। প্রথমে এ রকম একটা ভুল আমার বাবার নামে দেখতে কষ্ট হলো আমার। তারপর নিজেকে বোঝালাম, এ রকম তুচ্ছ ভুল যখন-তখন হতে পারে। তারপর মিস কেন্টনের প্রতি আমার বিরক্তি তৈরি  হলো : এ রকম একটা তুচ্ছ ভুলকে কেন্দ্র করে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়াবাড়ি করে ফেললেন তিনি!

তারপর আরেক দিন, এক সপ্তাহ পার হয়নি; আমি রান্নাঘর থেকে পেছনের করিডরের দিকে আসছিলাম। তখনই মিস কেন্টন তাঁর পার্লার থেকে বের হয়ে এসে একটা খবর জানালেন। শুনে বুঝলাম, এটা বলার অনুশীলন করেছেন আগে থেকে। তিনি বললেন, আমার স্টাফদের কারো ভুলের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করানো তাঁর অস্বস্তির ব্যাপার, তবু যেহেতু আমরা সবাই একই দলের মতো কাজ করি, তাই আমি যেন কোনো নারী কর্মচারীর ভুলত্রুটি দেখলে তাকে বলতে দ্বিধা না করি।

এ রকম আরো দু-চারটি উদাহরণ ছিল; তবে কতক ভুলে গেছি। যা-ই হোক, সবচেয়ে বেশি নাড়া দেওয়ার মতো একটা ঘটনা ছিল এক ধূসর হালকা বৃষ্টির বিকেলবেলার। বিলিয়ার্ড রুমে লর্ড ডার্লিংটনের স্পোর্টসের ট্রফিগুলো পরিষ্কার করছিলাম। মিস কেন্টন এসে দরজা থেকেই বললেন—মি. স্টিভেনস, বাইরে একটা জিনিস দেখে বিমূঢ় হয়ে গেছি।

জিনিসটা কী, মিস কেন্টন?

এটা কি লর্ড সাহেবের ইচ্ছা যে ওপরতলার ল্যান্ডিংয়ের চীনামাটির পাত্রটার সঙ্গে এই দরজার পাশেরটার অদলবদল করতে হবে।

চীনামাটির কোন পাত্রটার কথা বলছেন, মিস কেন্টন?

হ্যাঁ, মি. স্টিভেনস। যেটা সাধারণত ল্যান্ডিংয়ের ওখানে দেখেন, সেটা এখন দেখতে পাবেন এই দরজার সামনে।

মিস কেন্টন, আমার মনে হয়, আপনি কিছুটা গুলিয়ে ফেলেছেন।

আমার মোটেও বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি গুলিয়ে ফেলেছি, মি. স্টিভেনস। কোন হাউসে কোন জিনিসটা কোথায় থাকে না থাকে সে বিষয়ে জানার চেষ্টা করছি। চীনামাটির পাত্রগুলো কে যেন পলিশ করার দায়িত্বে ছিল এবং পরে ভুল জায়গায় রেখেছে। মি. স্টিভেনস, আপনার যদি সন্দেহ হয় আপনি কয়েক পা এগিয়ে এসে নিজ চোখে দেখে যেতে পারেন।

মিস কেন্টন, আমি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছি।

মি. স্টিভেনস, মনে হচ্ছে, আমার কথা আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সে জন্যই আপনাকে বাইরে এসে নিজের চোখে দেখে যেতে বলছি।

মিস কেন্টন, আমি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছি, একটু পরে এসে দেখব। এটা এমন কোনো জরুরি বিষয় নয়।

আপনি তাহলে স্বীকার করছেন, মি. স্টিভেনস, যা বলছি ভুল বলছি না।

মিস কেন্টন, নিজে এসে না দেখা পর্যন্ত কিছুই বলছি না। যা-ই হোক, আসল কথা হলো, আমি এখন খুব ব্যস্ত আছি।

আমি নিজের কাজে ডুবে গেলাম আবার। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে মিস কেন্টন আমার কাজ করা দেখতে থাকলেন। শেষে আবার বললেন, বুঝতে পারছি, আপনার কাজ শিগগিরই শেষ হবে, মি. স্টিভেনস। আপনার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাইরে অপেক্ষা করছি, যাতে আপনি বাইরে এলে বিষয়টার সুরাহা করা যায়।

মিস কেন্টন, আমার মনে হয়, আপনি এ বিষয়টাতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলছেন।

মিস কেন্টন আপাতত চলে গেলেন আমার সামনে থেকে। তবে কাজ করতে করতে বুঝতে পারলাম, বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে তিনি বাইরে ঘোরাফেরা করছেন। বিলিয়ার্ড রুমে আরো কিছু কাজকর্ম করার জন্য ব্যস্ত রইলাম। ভাবলাম, তিনি নিজের লঘু আচরণের কথা, হাস্যকর ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন এবং চলে যাবেন। আরো কিছুক্ষণ সময় চলে গেল এবং যে কাজ কোনো হাতিয়ার দিয়ে করার কথা এমন কিছু কাজ আমি এমনিতেই শেষ করে ফেললাম। তখনো বুঝতে পারলাম, মিস কেন্টন বাইরে আছেন। তাঁর এ রকম বালখিল্য বিষয়ে সময় নষ্ট না করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ফরাসি জানালা দিয়ে বাইরে বের হওয়ার কথা চিন্তা করলাম। এই পরিকল্পনার সমস্যা হলো আবহাওয়া, মানে এখান থেকে বের হতে গেলে বাইরের পথে জমাট পানির খানাখন্দে পড়তে হতে পারে; কাদাও আছে দেখা যাচ্ছে। আবার যে জানালা দিয়ে বের হব সেটা তো ভেতর থেকে বন্ধ করতে হবে। তাহলে আবার কাউকে রুমের ভেতর ঢুকতেই হবে জানালা বন্ধ করার জন্য। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, হঠাৎ খুব দ্রুত এবং বড় বড় পা ফেলে এখান থেকে বের হব। এরপর তিনি যা করলেন খুব দ্রুততায়ই করলেন : পরের মুহূর্তে দেখলাম, তিনি আমাকে পার হয়ে এগিয়ে গেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে আমার সামনে আমার পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন। তারপর তিনি বললেন—মি. স্টিভেনস, আপনি একমত নন, চীনামাটির পাত্রগুলো ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে?

মিস কেন্টন, আমি খুব ব্যস্ত আছি। আমি বিস্মিত হচ্ছি, সারা দিন করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আপনার আর কোনো কাজ নেই!

মি. স্টিভেনস, আপনি বলুন, চীনামাটির পাত্রটা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে কি না।

মিস কেন্টন, আমি অনুরোধ করছি, আপনার গলা নামিয়ে কথা বলুন।

আর আমি আপনাকে এসে দেখে যেতে বলছি, জিনিসটা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে কি না।

মিস কেন্টন, আবারও বলছি, আপনার গলা নামিয়ে কথা বলুন। নিচতলার কর্মচারীরা আমাদের চিৎকার শুনতে পারে। তারা মনে করবে, কোন জায়গায় কোনটা ঠিক না বেঠিক এ রকম তুচ্ছ বিষয়ে আমরা এত জোরে কথা বলছি।

মি. স্টিভেনস, সত্যি কথা হচ্ছে, এই হাউসের চীনামাটির পাত্রগুলো বেশ কিছুদিন ধরে নোংরা হয়ে আছে। আর এখন সেগুলো ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে।

মিস কেন্টন, আপনার আচরণ এখন একেবারেই হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে। আপনি কি দয়া করে আমাকে যেতে দেবেন?

মি. স্টিভেনস, আপনি কি দয়া করে আপনার পেছনের পাত্রটার দিকে একটু নজর দিয়ে দেখবেন?

যদি আপনার কাছে এটা এতই গুরুত্বের হয়ে থাকে তাহলে আমার পেছনের পাত্রটা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি তো পুরো হতবুদ্ধি হয়ে গেছি, আপনি এসব তুচ্ছ ভুলত্রুটি নিয়ে এত মাথা ঘামানো শুরু করলেন!

মি. স্টিভেনস, এই ভুলগুলো তুচ্ছ হতে পারে; কিন্তু আপনার নিজের থেকেও তো এগুলোর বৃহত্তর তাত্পর্য বুঝতে হবে।

মিস কেন্টন, আপনার কথা বুঝতে পারছি না। এখন দয়া করে আমাকে যেতে দিন।

মি. স্টিভেনস, বাস্তব কথা হচ্ছে, আপনার বাবার বয়সের তুলনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। তিনি তাল মেলাতে পারছেন না।

মিস কেন্টন, আপনি যা ইঙ্গিত করছেন সে বিষয়ে আপনার ধারণা খুব অল্প।

আপনার বাবা একসময় কী ছিলেন না ছিলেন সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে, তাঁর ক্ষমতা এখন মারাত্মক রকমের নিচে নেমে গেছে। এ জন্যই এসব ভুলকে আপনি ‘তুচ্ছ ভুল’ বলছেন। আপনার এ রকম বলার ভেতরও তাত্পর্য আছে। আপনি যদি সেগুলোর দিকে নজর না দেন তাহলে আপনার বাবার দ্বারা খুব বড় ভুল হওয়ার খুব বেশি দেরি নেই।

মিস কেন্টন, আপনি নিজেকে শুধুই খেলো বানিয়ে ফেলছেন।

আমি দুঃখিত, মি. স্টিভেনস। কিন্তু আমাকে বলে যেতেই হবে। আমি বিশ্বাস করি, বেশ কিছু দায়িত্ব আছে, যেগুলো থেকে আপনার বাবাকে এখন মুক্তি দেওয়া উচিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারী ভারী ট্রে বহন করার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া উচিত নয় আর। ডিনারে তিনি যখন ট্রেগুলো নিয়ে যান তখন তাঁর হাত যেভাবে কাঁপে তাতে বড় বিপদের সংকেত থাকে। আর খুব বেশি দেরি নেই, দেখবেন, কোনো ভদ্রমহোদয় কিংবা ভদ্রমহিলার কোলের ওপরে তাঁর হাত থেকে ট্রে পড়ে গেছে। আরো আছে, মি. স্টিভেনস। বলতে খুব খারাপ লাগছে, আমি আপনার বাবার নাকের দিকে খেয়াল করে দেখেছি।

সত্যিই দেখেছেন, মিস কেন্টন?

বলতে খারাপ লাগছে, মি. স্টিভেনস। কিন্তু সত্যিই দেখেছি। গত সন্ধ্যার আগের সন্ধ্যায় তাঁকে ট্রে নিয়ে আস্তে আস্তে ডাইনিংরুমের দিকে যেতে দেখলাম। বলতে খারাপ লাগলেও বলছি, আমি পরিষ্কার দেখলাম, তাঁর নাকের একেবারে প্রান্তে স্যুপের বাটির ওপরে এসে ঝুলছে তরলের একটা বড় ফোঁটা। ক্ষুধা জাগানোর জন্য এ রকম ওয়েটিংয়ের কথা চিন্তাও করা যায় না।

তবে এখন আবার ওই বিষয় নিয়ে ভাবতে বসে আমার মনে হচ্ছে, মিস কেন্টন সেদিন এতটা জোরের সঙ্গে বলেননি। এত দিন একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা কত প্রসঙ্গেই তো খোলাখুলি কথা বলেছি। তবু যে বিকেলের কথা বলছি তখন তো আমাদের সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায় ছিল বলা যায়। এখন মনে হয় না, মিস কেন্টন এতটা অগ্রসর হয়ে কথা বলেছেন। ‘এই ভুলগুলো তুচ্ছ হতে পারে; কিন্তু আপনার নিজের থেকেও তো এগুলোর বৃহত্তর তাত্পর্য বুঝতে হবে’, এই কথাটা বলার মতো অগ্রসর তিনি ছিলেন বলে আমি নিশ্চিত নই।

বড় সিঁড়ি বেয়ে কেউ নেমে এলে পড়ার ঘরের দরজা থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। এখনকার দিনে পড়ার ঘরের বাইরে মি. ফ্যারাডের অনেক রকমের অলংকার রাখা আছে একটা কাচের আলমারিতে। কিন্তু লর্ড ডার্লিংটনের সময়ে ওই জায়গাটাতে একটা বইয়ের তাক ছিল। সেটাতে নানা রকমের বিশ্বকোষ ছিল। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একেবারে পুরো সেটই ছিল ওখানে। যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতাম আমাকে দেখে মি. ডার্লিংটন একটা ছলনার আশ্রয় নিতেন : আমার নেমে আসার সময় তিনি তাকের ভেতরে রাখা বিশ্বকোষগুলোর পেছনের পাশটা পড়ছেন এমন ভাব করতেন। এরপর সেখান থেকে একটা কপি বের করে মনোযোগ দিয়ে পড়ার ভান করতেন। তাঁর সঙ্গে হঠাৎ করে আমার দেখা হয়ে গেছে এমনভাবে আমাকে ডাক দিতেন—ও স্টিভেনস, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা বলার ছিল। এই বলে তিনি পড়ার রুমের ভেতরে ঢুকে পড়তেন।

ঘটনাক্রমে যেটা আপনাদের কাছে বর্ণনা করছি সেটা আসলে মি. ডার্লিংটনের বিনয়ী ও লাজুক স্বভাবের অনেক অনেক উদাহরণের একটা। তাঁর সম্পর্কে ইদানীং অনেক আজেবাজে অর্থহীন কথা বলা হয়েছে, লেখা হয়েছে। বড় বড় বিষয়ে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন সেগুলো সম্পর্কেও এমন কথাবার্তা বলা হয়েছে। কোনো কোনো অজ্ঞ প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়েছে, তিনি আত্ম-অহংকার কিংবা অজ্ঞতার দ্বারা চালিত হতেন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, তাঁর সম্পর্কে বলা এসব কথা সত্য থেকে অনেক অনেক দূরে।

যে বিশেষ বিকেলের কথা বলছি তখন তাঁর বয়স মধ্যপঞ্চাশে। তবে আমার মনে হচ্ছে, তাঁর সব চুল পেকে গেছে তখনই। তাঁর হালকা-পলকা শরীরটাও খানিকটা সামনের দিকে ঝুঁকেছে; তাঁর জীবনের শেষের দিনগুলোতে ঝুঁকে পড়া ভাবটা আরো স্পষ্ট হয়েছিল অবশ্য। সেদিন বিকেলে তিনি বই থেকে দৃষ্টি প্রায় না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবার অবস্থা আগের চেয়ে ভালো, স্টিভেনস?

বলতে ভালো লাগছে, তিনি পুরোপুরি সেরে উঠেছেন, স্যার।

খুব ভালো লাগছে শুনে, খুব ভালো লাগছে।

ধন্যবাদ, স্যার।

শোনো, স্টিভেনস। এ রকম কোনো লক্ষণ পাওয়া গেছে? মানে তোমার বাবার পক্ষে কাজকর্মের বোঝা কিছুটা লাঘব হয়েছে—এ রকম কিছু তাঁর তরফ থেকে বলার মতো আছে? বলতে চাইছি, তাঁর পড়ে যাওয়ার বিষয়টা ছাড়া আর কিছু?

যে রকম বলছিলাম, স্যার, দেখে তো মনে হয়, আমার বাবা পুরোপুরি সেরে উঠেছেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর ওপরে পুরোপুরি ভরসা রাখা যায়। তাঁর দায়িত্ব পালনে সম্প্রতি দু-একটা ভুলত্রুটি পাওয়া গেছে; তবে সেগুলো অবশ্য খুব নগণ্য ধরনের।

কিন্তু আমরা কেউই চাই না, আগের মতো কিছু ঘটুক, তাই না? মানে আমি তোমার বাবার পড়ে যাওয়া বা ওই রকম সমস্যার কথা বলছি।

অবশ্যই চাই না, স্যার।

আর শোনো, দুর্ঘটনাটা লনে ঘটেছে যেহেতু, অন্য যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময়েও তো ঘটতে পারে।

অবশ্যই, স্যার।

শোনো, স্টিভেনস। প্রতিনিধিদলের প্রথম অতিথিরা পনেরো দিনের মধ্যেই এসে পড়বেন।

আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত, স্যার।

এই বাড়িতে যা যা ঘটবে তার তাত্পর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া কিন্তু তৈরি হবে পরবর্তী সময়ে।

বুঝতে পারছি, স্যার।

আমি বলেছি তাত্পর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া। গোটা বিষয়ে কিন্তু ইউরোপেরই অংশগ্রহণ থাকবে, বুঝতে হবে। যারা উপস্থিত থাকবে সবারই দায়িত্ব থাকবে। আমি বাড়িয়ে বলছি না।

না স্যার, বাড়িয়ে বলেননি।

বিপদের ঝুঁকি নেওয়ার সময় কিন্তু নেই।

অবশ্যই নেই, স্যার।

শোনো, স্টিভেনস। তোমার বাবার অবসরে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। শুধু তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টা খেয়াল রেখো।

আমার মনে হয়, ঠিক ওই মুহূর্তে লর্ড ডার্লিংটন তাঁর বইয়ের পাতার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে তাকালেন এবং পৃষ্ঠার ভেতরে বিব্রতকর আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, এই ভুলগুলো তুচ্ছ হতেই পারে, স্টিভেনস। কিন্তু তোমাকে সেগুলোর বৃহত্তর তাত্পর্য বুঝতে হবে। তোমার বাবার ওপরে নির্ভর করার সময় এখন চলে যাচ্ছে। তাঁকে এমন জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে বলা যাবে না, যেখানে সামান্য একটা ভুলের কারণে আমাদের সামনের কনফারেন্সের সফলতা  বিপন্ন হতে পারে।

অবশ্যই বলা যাবে না, স্যার। আমি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি।

ঠিক আছে, ভালো। তাহলে তোমাকে বিষয়টা ভালো করে ভেবে দেখার দয়িত্ব দিলাম, স্টিভেনস।

আমার বলা দরকার, তার এক কিংবা দুই সপ্তাহ আগে লর্ড ডার্লিংটন নিজে আমার বাবার পড়ে যাওয়া দেখেছিলেন। তখন সামার হাউসে এক ভদ্রলোক ও এক ভদ্রমহিলাকে আপ্যায়ন করছিলেন লর্ড ডার্লিংটন। হালকা নাশতার ট্রে সাজিয়ে আমার বাবা লন পার হয়ে তাঁদের দিকেই যাচ্ছিলেন। সামার হাউসের সামনে লনটা কয়েক গজ একটু উঁচু ছিল। এখনকার মতো তখনো ঘাসের মধ্যে পুঁতে রাখা ছিল চারটা পতাকাদণ্ড, চারটা সিঁড়ির মতো ছিল, যাতে ওপরের দিকে ওঠার বিষয়টা চোখে পড়ে। ওই সিঁড়িগুলোর সামনে এসেই আমার বাবা পড়ে যান। সিঁড়িগুলোর ওপরের ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ট্রের ওপরকার সব কিছু—চায়ের পাত্র, কাপ, সসার, স্যান্ডউইচ, কেক ইত্যাদি। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি ছুটে যাওয়ার আগেই মি. ডার্লিংটন নিজে এবং তাঁর অতিথিরা বাবাকে তুলে কাত করে বসিয়ে সামার হাউস থেকে কুশন ও ন্যাকড়া দিয়ে বালিশ আর কম্বলের কাজ চালিয়েছিলেন। বাবার তখনো জ্ঞান ফেরেনি। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। মি. মেরেডিথকে খবর পাঠানো হয়েছে।

পুরো ঘটনাটা আমার বাবার জন্য বিব্রতকর হয়েছিল। পড়ার ঘরে লর্ড ডার্লিংটনের সঙ্গে আমার কথা বলার দিন আসতে আসতে আবার তিনি আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে গেছেন। তখনকার দিনে কারো দায়িত্ব লাঘবের কথা বলা খুব সহজ ছিল না। আমার জন্য সমস্যাটা আরো বেশি হওয়ার কারণ হলো, বেশ কয়েক বছর ধরে আমার বাবার সঙ্গে কথা বলা দিন দিন কমে আসছিল। কী কারণে তা অবশ্য খুঁজে পাইনি। এতটাই কমে এসেছিল যে ডার্লিংটন হলে তাঁর যোগদানের পর আমাদের কাজের প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের সময়টাও উভয়ের জন্যই বিব্রতকর মনে হতো।

শেষে অন্যদের থেকে আলাদা করে তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর রুমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, যাতে তাঁর সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে তাঁকে চিন্তাভাবনা করে দেখার সুযোগ দেওয়া যায়। এ রকম একটা সময়ের কথা ভাবতে গিয়ে বুঝতে  পারলাম, তাঁর রুমে তাঁকে পাওয়া যেতে পারে প্রথমত ভোরে, দ্বিতীয়ত রাতে। ভোরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সময়টাই বেছে নিলাম এবং একদিন ভোরে গৃহকর্মীদের কোয়ার্টার্সের চিলেকোঠায় তাঁর ছোট রুমের সামনে উঠে গিয়ে দরজায় মৃদু টোকা দিলাম।

এর আগে আর কখনো বাবার রুমে আসার দরকার পড়েনি। রুমটার ক্ষুদ্র আকার আর আসবাবহীন অবস্থার জন্য নতুন করে ধাক্কা লাগল আমার মনে। এখনো মনে আছে, রুমটাতে ঢোকার পরই মনে হলো আমি যেন জেলখানার কোনো সেলে ঢুকলাম। আমার এ রকম মনে হওয়ার কারণ শুধু রুমের ক্ষুদ্র আকারই নয়, বরং ভোরের ফ্যাকাসে আলো এবং দেয়ালের ফাঁকা অবস্থাও। বাবা দাড়ি কামিয়ে পুরোপুরি ইউনিফরম পরা অবস্থায় রেডি হয়ে বিছানার কোনায় বসে রুমের পর্দা সরিয়ে রাতের আকাশটা ভোরে রূপান্তরিত হওয়া দেখছিলেন। তিনি যে আকাশ দেখছিলেন, কমপক্ষে তা তো বলা যেতেই পারে। কারণ ওখান থেকে তাঁর ছোট জানালা দিয়ে ছাদের টাইলস আর কিনারায় লাগানো পানি নিষ্কাশনের নালা ছাড়া অন্য কিছুই দেখা যায় না। তাঁর বিছানার পাশের তেলের বাতিটা নেভানো হয়েছিল আগেই। ভাঙা নড়বড়ে সিঁড়ি দিয়ে পথ দেখার জন্য একটা বাতি এনেছিলাম হাতে করে। বাবা আমার বাতিটার দিকে যেভাবে তাকালেন মনে হলো, এটার আর দরকার নেই। সে জন্য আমার বাতিটার সলতে নামিয়ে দিলাম। তারপর দেখলাম, রুমের ভেতর বাইরে থেকে হালকা আলো এসে ঢুকছে। সেই আলোতেই বাবার অবয়বের অসমান রেখাগুলো দেখতে পেলাম।

আহ্, বলে অল্প একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, আমি হয়তো জানতাম, দিনের কাজকর্ম শুরু করার জন্য বাবা এতক্ষণ ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়েছেন।

আমাকে পুরোপুরি একনজর ঠাণ্ডা চোখে দেখে নিয়ে বাবা বললেন, তিন ঘণ্টা ধরে জেগেই আছি।

আশা করি, বাবার বাতের ব্যথার জন্য জেগে থাকতে  হচ্ছে না।

আমার যতটুকু দরকার ততটুকু ঘুম হচ্ছে।

রুমের একমাত্র চেয়ার, কাঠের চেয়ারটার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটার পেছনে হাত রেখে পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়ালেন। বাবাকে আমার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারলাম না, কী কারণে তিনি এভাবে দাঁড়ালেন : হয়তো কিছুটা শারীরিক দুর্বলতার জন্য এবং কিছুটা মাথার ওপরের ছাদের ঢালু অবস্থার জন্য।

তোমার কাছে একটা কথা বলার জন্য এখানে এসেছি, বাবা।

তাহলে সোজাসুজি সংক্ষেপে বলে ফেলো। সারা সকাল তো আর তোমার প্যাচাল শুনতে পারব না।

তাহলে, বাবা, আমি সরাসরি মূল কথায় চলে আসি।

ঠিক আছে, সরাসরি মূল কথায় চলে এসে তাড়াতাড়ি শেষ করো। আমাদের কারো কারো কাজ শুরু করতে হবে এখনই।

খুব ভালো। যেহেতু আমাকে সংক্ষেপে বলতে বলছ, আমি সে রকমই চেষ্টা করছি। আসলে কথা হচ্ছে, বাবা তো ক্রমেই কিছুটা শারীরিক দুর্বল হয়ে পড়ছেন। এমনকি একজন আন্ডার-বাটলারের দায়িত্ব পালন করাও তাঁর সামর্থ্যের বাইরে। লর্ড ডার্লিংটন এবং আমি নিজেও মনে করি, বাবার বর্তমান অবস্থায় দায়িত্ব পালন করাটা এই বাড়ির কাজকর্ম ঠিকমতো চালানোর জন্য হুমকিস্বরূপ। আর বিশেষ করে সামনের সপ্তাহের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অতিথি সমাবেশ ঠিকমতো চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

হালকা আলোয় দেখা গেল, বাবার মুখে লুকানোর মতো আবেগের ছাপ নেই।

আমি বলে চললাম, প্রধানত আশা করা হচ্ছে, বাবা যেন টেবিলের দায়িত্ব পালন না করেন, টেবিলে অতিথি থাকুক আর না-ই থাকুক।

বাবা মন্তব্য করলেন, আমি বিগত চুয়ান্ন বছর ধরে টেবিলে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বাবার কণ্ঠ খুব ধীরস্থির মনে হলো।

আরো কথা হচ্ছে, বাবা যেন ভারী ট্রে বহন না করেন, একেবারে নিকটতম দূরত্বেও না। এই সব সীমাবদ্ধতা এবং যথার্থতার কথা বিবেচনা করে পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা দায়িত্বের তালিকা তৈরি করে এনেছি। তিনি এখন থেকে এই তালিকা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।

আমার হাতে ধরা কাগজটা বাবার হাতে দিতে ইতস্তত করছিলাম। এ জন্য তাঁর বিছানার কোনায় নামিয়ে রাখলাম কাগজটা। বাবা কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর মুখভঙ্গিতে এবারও আবেগের কোনো প্রকাশ দেখলাম না। চেয়ারের পেছনে বাবার হাত শিথিল হয়েই ফিরে গেল। যেভাবেই দাঁড়ান না কেন তাঁর শরীরের অবয়ব দেখে আগের সেই স্মৃতিটা মনে না করে উপায় নেই—তাঁর যে চেহারাটা দেখে গাড়ির ভেতরের দুজন মাতাল ভদ্রলোক চুপসে গিয়েছিলেন। শেষে বাবা বললেন, আমি সেদিন পড়ে গিয়েছিলাম ওই সিঁড়িগুলোর কারণে। সিঁড়িগুলো সমান নয়। আরো কেউ ওখানে পড়ে যাওয়ার আগেই সিমাসকে বলে ঠিক করে নিতে হবে।

হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি কি নিশ্চিত হতে পারি, বাবা, কাগজটা পড়ে দেখবেন?

সিমাসকে বলে সিঁড়িগুলো ঠিক করে নিতে হবে। অবশ্যই ইউরোপ থেকে ভদ্রলোকদের আসার আগেই।

আচ্ছা, ঠিক আছে, বাবা। গুড মর্নিং।

মিস কেন্টন তাঁর চিঠিতে গ্রীষ্মের যে সন্ধ্যার কথা উল্লেখ করেছেন সে সন্ধ্যাটা বাবার সঙ্গে কথা বলার পরপরই চলে আসে। হতে পারে, ওই একই দিন। আমার এখন আর স্পষ্ট মনে নেই, কী কারণে ওপরের তলায় গিয়েছিলাম। ওই তলায় করিডরের দুই পাশে অতিথিদের অনেক রুম। তবে যেমন বলেছি, আমার একটা জিনিস স্পষ্ট মনে আছে : খোলা দরজার পথ বেয়ে করিডরজুড়ে গোলাপি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল শেষ মুহূর্তের সূর্যের আলো। অব্যবহূত ওই বেডরুমগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা জানালার পাশ থেকে ছায়ার মতো দেখলাম মিস কেন্টনের অবয়ব। তখনই তিনি আমাকে ডাক দিলেন।

এসব নিয়ে ভাবতে গেলে, ডার্লিংটন হলে আসার কিছুদিন পর মিস কেন্টন আমার বাবাকে নিয়ে বারবার যেভাবে কথা বলেছেন সেসব মনে পড়ে গেলে আর বিস্ময়ের কিছু থাকে না, এত দিন যাবৎ মিস কেন্টনের মনে ওই সময়ের স্মৃতি রয়ে গেছে। আমরা দুজন যখন জানালা থেকে নিচে লনে আমার বাবার অবয়ব দেখছিলাম তখন নিশ্চয় মিস কেন্টনের মনে অনুশোচনা চলছিল। লনের বেশির ভাগ জুড়ে তখন পপলারগাছের ছায়া পড়েছে। তবে সামার হাউসের দিকে উঠে যাওয়া দূরে ওই কোনায় ঘাসের অংশে সূর্যের আলো তখনো ছিল। ওই চারটি সিঁড়ির কাছে আমার বাবার অবয়ব দেখা যাচ্ছিল। এত দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল তিনি গভীর মনোযোগে কী যেন ভাবছেন। হালকা বাতাস তাঁর চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। তারপর তিনি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। একেবারে ওপরের সিঁড়িতে আস্তে আস্তে উঠে আবার নামতে লাগলেন।

তবে আমার তো মনে হচ্ছে, এসব স্মৃতির ভেতর আমি একেবারে ডুবে যাচ্ছি, এটা তো বোকামি। আমার বর্তমান ভ্রমণ মোটের ওপর পরিপূর্ণ উপভোগ করার মতো ইংলিশ পল্লী এলাকার চমৎকারিত্বের প্রতিনিধি হয়ে এসেছে। আমি জানি, যদি বিনা কারণে অন্যদিকে মনোযোগ দিয়ে এই সৌন্দর্য উপভোগ না করি তাহলে পরে আমার মনে মারাত্মক রকমের আফসোস তৈরি হবে। দেখতে পাচ্ছি, আমার ভ্রমণের একেবারে শুরুতে ওই পাহাড়ের পাশে থামা ছাড়া এই শহর ভ্রমণের যেকোনো কিছুই রেকর্ড করে রাখতে হবে।

আমার সলসবারি ভ্রমণ খুব যত্ন করে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। শুধু প্রধান সড়কগুলো পুরোপুরি বাদ রাখা হয়েছে পরিকল্পনা থেকে। যাত্রাপথ আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় রকমের ঘোরানো মনে হয়েছে। তারপর একটা রাস্তা অনুসরণ করে মিসেস জে সিমোনসের চমৎকার ভলিউমে দেখানো কয়েকটা জায়গা পছন্দ করি। আমাকে বলতেই হবে, তাঁর বইটা আমার জন্য ভালো কাজে দিয়েছে। বেশির ভাগ সময় ক্ষেতখামারের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। দুই পাশের মাঠঘাটের ঘাসের সুগন্ধ উপভোগ করতে করতে যাচ্ছি। কোথাও ছোট নদী কিংবা উপত্যকা পার হওয়ার সময় আরো ভালো করে দৃশ্য উপভোগ করার জন্য ফোর্ডের গতি একেবারে হামাগুড়ির পর্যায়ে নামিয়ে আনছি। তবে সলসবারির কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত কোথাও নামিনি।

দুই পাশে প্রশস্ত ঘাসের জমির মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ একটা সোজা রাস্তায় চলার সময় থামতে হলো। আসলে ওখানকার মাঠঘাট অনেকটা খোলা আর সমতল। চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি চলে যেতে পারে। সামনের দিকে দিগন্তে সলসবারির গির্জার চূড়া দৃষ্টির মধ্যে পাওয়া যায়। একটা প্রশান্ত ভাব আমাকে ছেয়ে ফেলে এবং খুব ধীরে চালাতে থাকি, সম্ভবত ঘণ্টায় পনেরো মাইলের বেশি নয়। গাড়ির এ রকম গতির আরেকটা কারণ হলো, একটা মুরগি হেলেদুলে রাস্তা পার হচ্ছিল। মুরগিটার একেবারে দু-এক ফুট দূরে থাকতে ফোর্ড থামিয়ে দিই। মুরগিটা আসলে ওখানে একেবারে থেমেই যায়। একমুহূর্ত অপেক্ষা করে গাড়ির হর্ন বাজাতে বাধ্য হই। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না। মুরগিটা রাস্তার ওপরে কী যেন ঠোকর দিয়ে তুলতে থাকে। কিছুটা বিরক্ত হয়ে নামার চেষ্টা করি। এক পা রানিং বোর্ডে থাকতেই এক মহিলার কণ্ঠ শুনতে পাই, মাফ করবেন, স্যার!

চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, রাস্তার পাশের একটা খামারি কুটির পার হয়ে এসেছি। ওখান থেকে অ্যাপ্রন পরা এক অল্পবয়সী মহিলা দৌড়ে চলে আসছে। তার মনোযোগ এদিকে এসেছে আমার গাড়ির হর্ন শুনে। সে গাড়ির সামনে এসে মুরগিটাকে ছোঁ মেরে হাতে তুলে নিয়ে আদর করার ভঙ্গিতে দোলানো শুরু করল এবং আবারও আমার কাছে মাফ চাইল।

তাকে আশ্বাস দিলাম, মুরগিটার কিছু হয়নি। সে বলল, গাড়ি থামানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। নেলি গাড়িচাপা পড়েনি। নেলি খুব ভালো মেয়ে। আমাদের জন্য বড় বড় ডিম দেয় ও। এত বড় ডিম আপনি কোথাও দেখেননি। গাড়ি থামিয়ে আপনি খুব বড় কাজ করেছেন। মনে হয় আপনার অনেক তাড়া ছিল।

আমি একটু হেসে বললাম, না না। আমার মোটেও তাড়া নেই। অনেক বছরের মধ্যে এই প্রথম একটু সময় পেলাম বের হওয়ার। এ অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ্য। শখের বশে গাড়ি চালাচ্ছি, বুঝতে পারছেন।

বাহ্, ভালো তো, স্যার! আশা করি, আপনি নিশ্চয় সলসবারির দিকে যাচ্ছেন।

সত্যিই তাই। ওই যে দেখা যাচ্ছে, ওটা সলসবারির গির্জা না? শুনেছি গির্জাটা নাকি চমৎকার একটা ভবন।

হ্যাঁ, স্যার। ঠিকই শুনেছেন। খুব সুন্দর। সত্যি বলতে, আমি সলসবারিতে খুব একটা ঢুকিনি। এ জন্য খুব কাছ থেকে কেমন দেখায় বলতে পারছি না। তবে আপনাকে বলতে পারি, স্যার, দিনের পর দিন আমরা এখান থেকে খাড়া গির্জাটা দেখতে পাই। মাঝেমধ্যে ঘন কুয়াশার কারণে দেখা যায় না। তখন মনে হয়, গির্জাটা পুরোপুরি নাই হয়ে গেছে। তবে আজকের মতো সুন্দর দিনে স্পষ্ট দেখা যায়। দারুণ একটা দৃশ্য!

খুব ভালো লাগছে।

আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, স্যার, আপনি নেলির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেননি। তিন বছর আগে আমাদের একটা কচ্ছপ গাড়িচাপা পড়ে মারা গিয়েছিল। ঠিক এই জায়গাটাতেই। আমরা সবাই খুব দুঃখ পেয়েছিলাম।

আমি গম্ভীরভাবে বললাম, কী ভয়নাক, ট্র্যাজিক!

আহা, কী বলব, স্যার! সত্যিই দুঃখজনক। কিছু মানুষ বলে আমরা খামারের লোকেরা জীবজন্তুর আহত হওয়া কিংবা মারা যাওয়া দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু তাদের এ কথা সত্যি নয়। কচ্ছপটা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট ছেলেটা কত দিন কাঁদল। আপনি অনেক ভালো মানুষ, স্যার, আপনি নেলির জন্য গাড়ি থামিয়েছেন। আপনি যেহেতু গাড়ি থেকে নেমেছেন, যদি কষ্ট করে এক কাপ চা খেয়ে যেতেন, ভালো লাগত। যাত্রাপথে আরো খুশি মনে এগোতেন।

আপনার দয়ার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমার এখন যাত্রা শুরু করা দরকার। সলসবারি পৌঁছে ওখানকার আরো সব সুন্দর জিনিস দেখতে হবে।

তা অবশ্যই, স্যার। ধন্যবাদ আপনাকে।

আবার যাত্রা শুরু করলাম, আগের মতো ধীরগতিতে। দেখতে চাইছিলাম, খামারের আরো কোনো প্রাণী আমার গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হয় কি না। একটা কথা বলতেই হচ্ছে, একটু আগের অভিজ্ঞতাটার কারণে প্রফুল্ল বোধ করছি। সামান্য সুবিবেচনা দেখানোর জন্য আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া হলো; বিনিময়ে আমাকেও যে দয়া দেখানো হলো—এগুলো আমার সামনের দিনগুলোর প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমাকে দারুণ উদ্বেলিত করেছে। তারপর প্রফুল্লচিত্তে সলসবারির দিকে যেতে থাকলাম।

তবে অল্প একটু সময়ের জন্য আমার বাবার প্রসঙ্গে ফিরে যেতে চাই। কারণ মনে হচ্ছে, তাঁর অক্ষমতা নিয়ে কথা বলার মাধ্যমে এ রকম একটা ধারণা দিয়ে ফেলেছি, তাঁর সঙ্গে আমি কাঠখোট্টা আচরণ করেছি। আসলে বিষয়টা নিয়ে যেভাবে এগিয়েছি তার কোনো বিকল্পও ছিল না। ওই সব দিনের পুরো পরিপ্রেক্ষিত যদি ব্যাখ্যা করে বলি, তাহলে আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন। তার মানে, ডার্লিংটন হলে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক কনফারেন্স তখন আমাদের সামনে বড় একটা বিষয়। তখন আর কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে আবেগের প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা এলোপাতাড়ি কিছু করার আবকাশ ছিল না। স্মরণ রাখা দরকার, যদিও ডার্লিংটন হল তার পরবর্তী প্রায় পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে এ রকম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন দেখে এসেছে, তবু ১৯২৩ সালের ওই কনফারেন্সটাই ছিল প্রথম। তাহলে ওই সময়ে তো আমার কথা বললে, আমি ছিলাম খানিকটা অনভিজ্ঞ। এ জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা যাতে ঘটে যেতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। আসলে আমি প্রায়ই অতীতের ওই কনফারেন্সের স্মৃতিচারণা করি এবং মনে করি, একাধিক কারণে সেটাই ছিল আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যেমন একটা কারণ হতে পারে, বাটলার হিসেবে ওই সময়টাই আমার পরিণত হওয়ার কাল ছিল। অবশ্য তার মানে এই নয় যে আমি বিশেষ গুণের কোনো বাটলার হয়ে গেলাম। সে রকম বিচার করার মতো আমার কোনো অর্জন তখন পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু এ রকম যদি হয়, কেউ আমার পেশাগত জীবন সম্পর্কে জানতে চায়, আমি বাটলার হিসেবে বিশেষ গুণের সামান্য অধিকারী হয়েছি কি না, তাহলে তিনি ১৯২৩ সালের কনফারেন্সের দিকে দৃষ্টি দিতে পারেন। অবশ্য কনফারেন্সটা অন্যান্য কারণেও স্মরণীয় হয়ে আছে। সেগুলোর কথাও বলা দরকার।

১৯২৩ সালের কনফারেন্স ছিল মি. ডার্লিংটনের তরফে দীর্ঘ পরিকল্পনার সর্বশেষ অবস্থা। তিনি শেষের ওই অবস্থায় পৌঁছতে দীর্ঘ তিন বছর কী রকম চেষ্টা করেছেন তা সবাই দেখেছে। আমার যতটা মনে আছে, মহাযুদ্ধের পরে যখন শান্তিচুক্তি তৈরি করা হয় তখন তিনি এই বিষয়টা নিয়ে এতটা মগ্ন ছিলেন না। আমার মনে হয়, চুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নয়, বরং হার কার্ল হাইনজ ব্রেমানের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের কারণে চুক্তির প্রতি তিনি এতটা ঝুঁকেছেন।

হার ব্রেমান ডার্লিংটন হলে প্রথমবার আসেন মহাযুদ্ধের ঠিক পরপরই। তখনো তাঁর পরনে সামরিক পোশাকই ছিল। যারা দেখেছে, সবাই বুঝেছে, তাঁর এবং লর্ড ডার্লিংটনের মধ্যে দ্রুতই বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এতে অবশ্য আমি বিস্মিত হইনি। কারণ একনজরেই বোঝা যেত, হার ব্রেমান চমৎকার আদব-কায়দাওয়ালা এক ভদ্রলোক। জার্মান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর আরো অনেকবার আসেন। পরবর্তী দুই বছর সমান বিরতিতে আসেন তিনি। সে সময় তাঁর চেহারার অবনতি কারো চোখ এড়ানোর মতো ছিলই না। একবার যে চেহারা নিয়ে এসেছেন, পরেরবার তার চেয়ে আরো খারাপ চেহারায় এসেছেন। তাঁর পোশাক-আশাক ক্রমে মলিন হতে থাকে; তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য আগের চেয়ে আরো কৃশ হতে থাকে; তাঁর চোখে চলে আসে ত্রস্ত চাহনি। তাঁর শেষের ভ্রমণগুলোতে দেখা যেত, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। লর্ড ডার্লিংটনের সামনেও এ রকম করতেন।

১৯২০ সালের শেষের দিকে লর্ড ডার্লিংটন নিজেই বেশ কয়েকবার বার্লিন সফরে যান। আমার এখনো মনে আছে, ওই সব সফরের গভীর প্রতিক্রিয়া পড়ে তাঁর ওপর। ফিরে আসার পরে বেশ কিছুদিন ধ্যানমগ্নতা চেপে থাকে তাঁর ওপর। একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সফর কেমন উপভোগ করলেন? উত্তরে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—বিরক্তিকর, স্টিভেনস, বিরক্তিকর। পরাজিত শত্রুকে আমরা যে সমাদর করেছি সেটা আমাদের জন্য মারাত্মক বদনামেরই হয়েছে। এই দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কটাই যেন ছিন্ন করা হয়েছে।

এই বিষয়ে আরো একটা স্পষ্ট স্মৃতি আছে আমার মনে। এখনকার দিনের ডাইনিংরুমে তো কোনো টেবিল নেই। উঁচু ছাদওয়ালা প্রশস্ত রুমটা মি. ফ্যারাডের জন্য এখন গ্যালারির মতো কাজ করছে। কিন্তু লর্ড ডার্লিংটনের সময়ে এই রুমটা প্রতিদিনই দরকার হতো। এখানে লম্বা টেবিলে জনা ত্রিশেক বা তার চেয়েও বেশি অতিথির ডিনারের আয়োজন করা হতো। আসলে ডাইনিংরুমটা অনেক বড় হওয়ায় প্রয়োজনের সময় আরো টেবিল সেট করে পঞ্চাশজনের মতো অতিথির ডিনার পরিবেশন করা হতো। অন্যান্য দিনে লর্ড ডার্লিংটন এখনকার দিনের মি. ফ্যারাডের মতো ডাইনিংরুমের অপেক্ষাকৃত নিভৃতে খাওয়াদাওয়া করতেন। ডাইনিংরুমটা বড়জোর এক ডজন অতিথির জায়গা দিতে পারে। কিন্তু আমি যে বিশেষ শীতের রাতের কথা বলছি সে রাতে কী কারণে যেন ডাইনিংরুমটা ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল এবং লর্ড ডার্লিংটন শুধু একজন অতিথি নিয়ে ডিনার করছিলেন ডাইনিংরুমের বিশাল ফাঁকা পরিবেশে। আমার যত দূর মনে পড়ে, তিনি ছিলেন স্যার রিচার্ড ফক্স। বিদেশে কর্মরত অবস্থায় তাঁরা একে অন্যের সহকর্মী ছিলেন। আপনারা নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন, ডিনারে ওয়েটারের কাজ করা সবচেয়ে কঠিন হলো যখন মাত্র দুজন মানুষ খেতে বসে। দুজনের জন্য ওয়েটারের কাজ করার চেয়ে আমার কাছে বরং একজনের জন্য সহজ মনে হয়, তিনি একেবারে অপরিচিত কেউ হলেও। আর যখন মাত্র দুজন মানুষ খেতে বসেন, তাঁদের মধ্যে মনিব নিজে থাকলেও তাঁদের জন্য ওয়েটারের কাজ করা কঠিন।

ওই রাতে ডাইনিংরুমের অনেকটাই ছিল অন্ধকারে। আর তাঁরা দুজন পাশাপাশি বসেছিলেন বড় টেবিলের মাঝামাঝি স্থানে। দুজন মানুষের মুখোমুখি বসার জন্য টেবিলটা একটু বড়ই হয়েছিল। তাঁদের সামনে তখন মোমবাতির আলো টেবিলের বিপরীত পাশ থেকে আসা ক্রমাগত পটপট শব্দ করতে থাকা অগ্নিকুণ্ডের আলো। সাধারণত যতটা দূরে অবস্থান করে থাকি তার চেয়ে একটু বেশি দূরে গিয়ে ছায়ার ভেতর দাঁড়ানোর মনস্থির করি, যাতে আমার উপস্থিতি আরো কমিয়ে রাখা যায়। কিন্তু এতে আবার আরেক সমস্যা দেখা যায় : প্রয়োজনে দূর থেকে এগিয়ে আসার সময় টেবিল পর্যন্ত পৌঁছার আগে বিশাল ফাঁকা রুমে আমার পায়ের শব্দের দীর্ঘ ও উচ্চ প্রতিধ্বনি হতে থাকে। আমার আসন্ন উপস্থিতির জানান দেওয়া হতে থাকে এভাবে। তবে বেশি দূরে না গিয়ে ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকায় সুবিধা হয়। আড়ালে থাকলেও দূরে যেহেতু নয়, আমি তাঁদের দুজনের কথা বেশ স্পষ্ট শুনতে পাই। আগের মতোই প্রশান্ত ও ভদ্র কণ্ঠে লর্ড ডার্লিংটন কথা বলতে থাকেন, বিষয় হার ব্রেমান। লর্ড ডার্লিংটনের কণ্ঠ বিশাল রুমের দেয়ালে বাধা পেয়ে খানিকটা মৃদু প্রতিধ্বনিও তোলে।

লর্ড ডার্লিংটন বলে যান, তিনি আমার শত্রু ছিলেন। অথচ তিনি সব সময় ভদ্রলোকের মতো আচরণ করেছেন। আমাদের এক দেশ আরেক দেশের ওপর গোলা ফেলার ছয় মাস আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করেছি। তিনি ভদ্র মানুষ ছিলেন এবং আমিও তাঁর প্রতি কোনো রকম ঈর্ষা পোষণ করিনি। আমি তাঁকে বলেছি—শুনুন, এখানে আমরা শত্রু এবং আমার যা কিছু আছে তাই নিয়ে আমি লড়াই করব। কিন্তু যখন এই হতভাগার কাজটা শেষ হয়ে যাবে আমরা আর একে অন্যের শত্রু থাকব না। আমরা একটা পানীয় দুজনে পান করব।

ওই রাতেই কিছুক্ষণ পর মাথা ঝাঁকিয়ে কিছুটা গাম্ভীর্যের সঙ্গে লর্ড ডার্লিংটন বললেন, আমি ওই যুদ্ধে লড়াই করেছি পৃথিবীতে ন্যায় সুরক্ষার জন্য। যতটুকু বুঝেছি, জার্মান জাতির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসায় অংশ নিচ্ছিলাম না।

আর আজকাল লর্ড ডার্লিংটন সম্পর্কে যেসব কথাবার্তা শোনা যায়, তাঁর ওই সময়ের মনোভাব সম্পর্কে প্রায়ই যেসব কথা শোনা যায় তখন আমার সুখস্মৃতির মতোই মনে পড়ে যায় ওই প্রায় ফাঁকা ডাইনিংরুমে বলা তাঁর ওই আন্তরিক কথাগুলো। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর কাজকর্ম নিয়ে যেসব জটিলতা তৈরি হয় আমার মতো মানুষের তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না, তিনি যা যা করেছেন সব কিছুর মূলে ছিল পৃথিবীতে ন্যায়বিচার দেখতে চাওয়ার ইচ্ছা।

ওই রাতের কিছুদিন পরই দুঃসংবাদটা আসে, হামবার্গ থেকে বার্লিনে যাওয়ার একটা ট্রেনে হার ব্রেমান গুলি খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই মি. ডার্লিংটন বিপন্ন বোধ করেন এবং ফ্র ব্রেমানের জন্য টাকা-পয়সা ও সমবেদনা পাঠানোর পকিল্পনা করেন। যা-ই হোক, কয়েক দিনের চেষ্টায় লর্ড ডার্লিংটন কিছুতেই হার ব্রেমানের পরিবারের কোনো ঠিকানা খুঁজে পেলেন না। তাঁকে আমিও যথাসাধ্য সহযোগিতা করলাম ঠিকানা খোঁজার কাজে। মনে হলো, কিছুদিনের জন্য হার ব্রেমানের বাড়িঘর ছিল না। তাঁর পরিবারের লোকজনও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে।

আমার বিশ্বাস, ওই ট্র্যাজিক খবরটা ছাড়াই লর্ড ডার্লিংটন তাঁর কাজ যেমন সেভাবেই চালাতেন; অন্যায় ও দুর্ভোগের পরিসমাপ্তি দেখতে চাওয়াটা তাঁর মনের গভীরে নিবদ্ধ ছিল। তারপর যেমন দেখা গেল, হার ব্রেমানের মৃত্যুর পরের কয়েক সপ্তাহে মি. ডার্লিংটন আরো বেশি সময়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে লাগলেন জার্মানির সংকট নিয়ে। আমাদের হাউসে ক্ষমতাধর ও বিখ্যাত লোকজন নিয়মিত আসা শুরু করলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের কথা আমার মনে আছে। যেমন লর্ড ডানিয়েলস, প্রফেসর মেনার্ড কেয়ানেস, বিখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলস এবং আরো অনেকে। বাকিদের পরিচয় গোপন রাখা হতো। কাজেই তাঁদের নাম এখানে উল্লেখ করা উচিত হবে না। দেখতাম ডার্লিংটন সাহেব এবং তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁদের মধ্যে অনেকেই গোপনীয়তা এত কঠোরভাবে মেনে চলতেন, আমাকে মি. ডার্লিংটন বলতেন, কোনো স্টাফ যেন তাঁদের পরিচয় না জানে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের দিকে যেন না তাকায়। যা-ই হোক, আমি গর্বের সঙ্গেই বলতে চাই, লর্ড ডার্লিংটন কখনোই আমার চোখ-কান থেকে কোনো কিছু আড়াল করতে চাননি। এ রকম অনেক সময় হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আলোচনায় কথা বলছেন এমন সময় হয়তো আমি ঢুকে পড়লাম; তিনি বাক্যের মাঝখানে থেমে গেলেন। এ রকম মুহূর্তে লর্ড ডার্লিংটন বলতেন, আরে, ঠিক আছে। আপনি স্টিভেনসের সামনে সব বলতে পারেন, আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি।

তারপর হার ব্রেমানের মৃত্যুর দুই বছর পর্যন্ত একটানা মি. ডার্লিংটন ও স্যার ডেভিড কার্ডিনাল অনেক বড় বড় মিত্রকে একাত্ম করেছেন। তত দিনে অবশ্য স্যার ডেভিড মি. ডার্লিংটনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা সবাই দৃঢ় বিশ্বাসে একমত হয়েছেন, জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না। তাঁদের এই সমাবেশগুলোতে শুধু ব্রিটেন ও জার্মানরাই ছিলেন না, ছিলেন বেলজিয়ান, ফরাসি, ইতালীয় ও সুইস প্রতিনিধিরাও। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট যাজক, আবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, লেখক ও চিন্তাবিদ। মি. ডার্লিংটনের নিজের মতো কোনো কোনো ভদ্রলোকের মতামত ছিল, ভার্সেইয়ে ন্যায়নীতি অনুসরণ করা হয়নি। তাঁরা আরো মনে করেন, শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধে পরাজিত দেশকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা অনৈতিক। অন্যরা জার্মানি কিংবা জার্মানির বাসিন্দাদের ব্যাপারে খুব বেশি মাথা ঘামাননি। তবে তাঁদের মতামত ছিল, জার্মানির অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা থামানো না গেলে সেটা আশঙ্কাজনক দ্রুততায় বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

১৯২২ সালের শেষের দিকে মি. ডার্লিংটন একটা বিশেষ ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছিলেন। লক্ষ্যটা হলো আন-অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী যে ভদ্রলোকদের সমর্থন পাওয়া গেছে তাঁদের ডার্লিংটন হলের এক ছাদের নিচে জড়ো করা। সেই কনফারেন্সে ভার্সেই চুক্তির সবচেয়ে কঠিন শর্তগুলো পুনরায় আলোচনা করা যাবে। যেকোনো মূল্যেই হোক, এ রকম কনফারেন্স যথেষ্ট তাত্পর্যপূর্ণ হতে হবে, নইলে অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রভাব ফেলা যাবে না। এ রকম বেশ কয়েকটা অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক কনফারেন্স এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে, যেগুলোতে চুক্তির পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু সেসব কনফারেন্সে শুধু দ্বন্দ্ব ও তিক্ততা বাড়ানো ছাড়া আর কিছু অর্জন হয়নি। আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ১৯২২ সালের বসন্তে ইতালিতে পরবর্তী মহাকনফারেন্স ডেকেছেন। আর সামনের কনফারেন্সে যাতে সন্তোষজনক ফল অর্জন করা যায় সে লক্ষ্যে মি. ডার্লিংটন তাঁর ডার্লিংটন হলে সমাবেশের আয়োজন করতে চেয়েছেন।

ওই সময়ের একটা সকালের কথা আমার মনে আছে। আমি মি. ডার্লিংটনের জন্য সকালের কফি নিয়ে যাই ব্রেকফাস্ট রুমে। তিনি দ্য টাইমস পড়ছিলেন। ভাঁজ করে রেখে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেই বললেন—ফরাসিরা, আসলেই ফরাসিরা। আমি তাদের কথাই বলতে চাইছি, বুঝলে স্টিভেনস।

জি, স্যার।

সারা বিশ্বের লোক যদি তাদের সঙ্গে আমাদের হাত ধরাধরি করে বেড়াতে দেখে তাহলে সবাই স্বস্তি বোধ করবে।

ঠিক বলেছেন, স্যার।

শেষবার যখন বার্লিনে গেলাম, আমার বাবার পুরনো বন্ধু ব্যারন ওবেরাথের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, তোমরা আমাদের সঙ্গে এ রকম করছ কেন? তোমরা বুঝতে পারো না, আমরা এভাবে চলতে পারি না? আমি সানন্দে তাঁকে বলতে পারতাম, আমাদের কারণে এ রকম হচ্ছে না, হচ্ছে ফরাসিদের কারণে। ইংরেজরা এ রকম অবস্থা চলতে দিতে পারে না; তাদের স্বভাবে এটা নেই, আমি বলতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু জার্মানদের ভার্সেই চুক্তির নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে ফরাসিরা যে সবচেয়ে বেশি আপসহীন সে বিষয়টাই অন্তত একজন ফরাসিকে ডার্লিংটন হলের সমাবেশে আনার প্রয়োজনীয়তাটা বাড়িয়ে দেয়, এমন একজনকে আনতে হবে, যার নিজের দেশের ওপর স্বচ্ছ প্রভাব আছে। মি. ডার্লিংটনকে বেশ কয়েকবার বলতে শুনেছি, এ রকম একজন ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া জার্মানি সম্পর্কিত কোনো আলোচনা শুধু আবেগের প্রশ্রয় বৈ আর কিছু হবে না। তিনি ও মি. ডেভিড তাঁদের প্রস্তুতির এই সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা যথাযথভাবে ঠিক করে ফেললেন এবং পৌনঃপুনিক হতাশার সামনে তাঁরা যে ধৈর্য নিয়ে কাজ করলেন সেটা ছিল তাঁদের জন্য নিজেদের ছোট করার অভিজ্ঞতা। অসংখ্য চিঠি ও টেলিগ্রাম পাঠানো হয় এবং লর্ড ডার্লিংটন নিজে দুই মাসের মধ্যে তিনবার আলাদা প্যারিস সফরে যান। শেষে একজন বিশাল গুরুত্বের ফরাসির অনুমতি পাওয়ার পর কনফারেন্সের দিন ধার্য করা হয়। ভদ্রলোকের নাম শুধু এম দুপোঁ বলতে চাই। তিনি সমাবেশে আসার সম্মতি দেন শুধু তাঁর পরিচয় গোপন রাখা হবে—এমন প্রতিজ্ঞায়। কনফারেন্সের দিন ঠিক হলো ১৯২৩ সালের স্মরণীয় মার্চে।

যদিও লর্ড ডার্লিংটনের চাপ উচ্চপর্যায়ের এবং আমার চাপ অতি সাধারণ, তবু দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল আমার ওপরে চাপও তত বাড়তে লাগল। আমার সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় ছিল, যদি কোনো অতিথি মনে করেন ডার্লিংটন হলে অবস্থানকালে তাঁর আরাম-আয়েশের খানিকটা কমতি হয়েছে তাহলে সেটার ফলাফল হবে অকল্পনীয় পর্যায়ের বিশালত্বে। তা ছাড়া আমার পরিকল্পনায় জটিলতা পাকাতে থাকে অতিথিদের নির্দিষ্ট সংখ্যা। কনফারেন্স যেহেতু অতি উচ্চপর্যায়ের, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকার কথা আঠারোজন ভদ্রলোক ও দুজন ভদ্রমহিলার। মহিলাদের মধ্যে একজন জার্মান কাউন্টেস এবং আরেকজন হলেন সেই ভয়ানক মিসেস এলিনর অস্টিন, যিনি তখনো বার্লিনেরই বাসিন্দা। তবে সংখ্যা নিয়ে চিন্তার আরো কারণ হলো, অতিথিদের প্রত্যেকেই যুক্তিসংগতভাবেই সেক্রেটারি, পরিচারক, দোভাষী ইত্যাদি নিয়ে আসবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, খোদ অতিথিরাই ঠিক ঠিক কতজন আদৌ আসবেন তারও একটা ব্যাপার ছিল। এ জন্য সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন ছিল।

সামার হাউসের সামনে আমার বাবা যেদিন পড়ে গিয়েছিলেন সে সময় ডার্লিংটন হলের চারপাশের আবহাওয়া কেমন ছিল বুঝতে পারবেন আপনারা। কনফারেন্সের প্রথম দিকের অতিথিদের আসার কথা ছিল যখন, ঠিক তার দুই সপ্তাহ আগে ঘটেছিল ঘটনাটা। এ জন্যই তখন বলেছিলাম, এলোপাতাড়ি কিছু করার বা বলার সময় নেই। তাঁর সমালোচনা করে বলা হয়েছিল, ভারী বোঝাই ট্রে বহন করা নিষেধ তাঁর জন্য। সেই কঠোর সমালোচনার মধ্যে বাবার যে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছিল বাবা সেটা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাসনকোসন, ন্যাকড়ার ঝাড়ু, পরিষ্কার তবে এলোমেলো করে সাজানো ব্রাশ, চায়ের পাত্র, কাপ, সসারবোঝাই তাঁর ট্রলি ঠেলার দৃশ্যটা হাউসের চারপাশের পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়। রাস্তার হকারের ঠেলাগাড়ির মতো একটা চেহারা। ডাইনিংরুমে ওয়েটারের দায়িত্ব পালন থেকে সরে যেতে হয়েছে তাঁকে; কিন্তু ট্রলি ঠেলতে গিয়ে তাঁকে বিস্ময়কর রকমের ভারী জিনিসই টানতে হচ্ছে। মনে হলো, কনফারেন্সের দিন যত এগিয়ে আসছে আমার বাবার ওপর লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যেন তাঁর ওপর অতিপ্রাকৃত শক্তি ভর করেছে। তিনি বিশ বছর বয়স ঝরিয়ে ফেলেছেন।

মিস কেন্টনের কথা বলতে গেলে, সেই সময়ের ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ তাঁর ওপরও চোখে পড়ার মতো প্রভাব ফেলে। একদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, পেছনের করিডরে তাঁর সঙ্গে হঠাৎ দেখা। ডার্লিংটন হলের স্টাফ কোয়ার্টার্সের মেরুদণ্ডের মতো ছিল পেছনের করিডর। তখনকার দিনের নিরানন্দের বিষয় ছিল; ওখানকার অনেকখানি জায়গায় দিনের আলো আসত না। এমনকি পরিষ্কার রোদের দিনেও ওখান দিয়ে হেঁটে যেতে মনে হতো সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। সেই দিন আমার দিকে আসার সময় তক্তার ওপর মিস কেন্টনের পায়ের আওয়াজ না পেলে আমি শুধু তাঁর ছায়া দেখে তাঁকে চিনে থাকতাম। তক্তার ওপর যে জায়গাগুলোতে আলোর টুকরা পড়ে তেমন একটা জায়গায় থামলাম। মিস কেন্টন যেহেতু এগিয়ে আসছিলেন, আমি বললাম, ও আচ্ছা, মিস কেন্টন।

হ্যাঁ, মি. স্টিভেনস।

মিস কেন্টন, আমি কি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারি, ওপরের তলার জন্য বেড লিনেনগুলো আগামী পরশুর মধ্যে রেডি রাখতে হবে?

ব্যাপারটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণেই আছে, মি. স্টিভেনস।

বাহ্, শুনে ভালো লাগল। আপনাকে দেখে কথাটা মাথায় এলো; তাই বললাম আর কি। এর বেশি কিছু নয়।

আমি চলেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু মিস কেন্টন নড়লেন না। তারপর তিনি এককদম আমার দিকে এগিয়ে এলেন; একফালি আলো এসে পড়ল তাঁর মুখের ওপরে। তখনই তাঁর মুখের ওপর ক্ষোভের প্রকাশ দেখলাম।

দুর্ভাগ্যের কথা, মি. স্টিভেনস, আমি এখন প্রচণ্ড ব্যস্ত; একমুহূর্ত নষ্ট করার মতো নেই। আপনার মতো যদি আমারও অতিরিক্ত সময় থাকত তাহলে আমিও এই হাউসের চারপাশে ঘুরে বেড়ানোর সময় হৃষ্টচিত্তে আপনার হাতের কাজের কথা মনে করিয়ে দিতাম।

মিস কেন্টন, এখন এত মেজাজ গরম করার দরকার কী? আপনার মনে আছে, সেটা জেনে আমি নিজের সন্তুষ্টির জন্যই জিজ্ঞস করেছি।

মি. স্টিভেনস, গত দুই দিনে এ রকম তিন-চারবার আপনি জিজ্ঞেস করেছেন। আপনি হাউসের চারপাশে ঘুরে ঘুরে বিনা মূল্যে সবাইকে তাদের কাজের কথা জিজ্ঞেস করে বেড়ানোর এত সময় পাচ্ছেন—এটা একটা কৌতূহলের বিষয়।

মিস কেন্টন, আপনার যদি বিশ্বাস হয়ে থাকে, আমার হাতে অঢেল সময়, তাতে আপনার অনভিজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। আমার বিশ্বাস আছে, ভবিষ্যতে আপনি পরিষ্কার দেখতে পাবেন এসব হাউসে কী কী কাজকর্ম চলে।

আপনি সব সময় আমার মহা অনভিজ্ঞতাই দেখে যাচ্ছেন, মি. স্টিভেনস। তার পরও আপনি আমার কাজের কোনো ত্রুটি ধরতে পারছেন না। আপনার ক্ষমতা থাকলে হয়তো ধরেই ফেলতেন। এখন আমার ব্যস্ত থাকার মতো অনেক কাজ আছে। খুশি হব আপনি আমাকে অনুসরণ না করলে, কাজের ব্যাঘাত না ঘটালে। আপনার যদি নষ্ট করার অঢেল সময় থাকে তাহলে আপনাকে আমি মুক্ত বায়ু সেবনের পরামর্শ দিতে পারি।

তিনি আমার সামনে থেকে দম্ভভরা পায়ে করিডর বেয়ে চলে গেলেন। আমিও ভাবলাম, এ বিষয়টাকে আর এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। আমি আমার রাস্তায় চললাম। প্রায় কিচেনের দরজার পথে পৌঁছেই গিয়েছিলাম, ঠিক তখনই তাঁর পায়ের ভারী আওয়াজ শুনতে পেলাম। তিনি আমার দিকে ফিরে আসছিলেন।

তিনি জোরে জোরে বলা শুরু করলেন, আসলে, মি. স্টিভেনস, আমি আপনাকে অনুরোধ করব, এখন থেকে আপনি আর আমার সঙ্গে মোটেও সরাসরি কথা বলবেন না।

মিস কেন্টন, আপনি কী প্রসঙ্গে কথা বলছেন?

আমাকে কোনো বার্তা দেওয়ার বিশেষ দরকার হলে আপনি কোনো বার্তাবাহকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে পারেন। আপনি কোনো চিরকুট লিখে পাঠিয়ে দিতে পারেন। আমি নিশ্চিত, তাতে আমাদের পেশাগত সম্পর্ক আরো অনেক  সহজ হবে।

মিস কেন্টন...

আমি খুব ব্যস্ত, মি. স্টিভেনস। আপনার বার্তা যদি বিশেষ জটিল হয়ে থাকে তাহলে একটা লিখিত চিরকুট পাঠাতে পারেন। অথবা আপনি মার্থা কিংবা ডরোথির সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কিংবা কোনো পুরুষ সহকর্মী, আপনার যাকে বিশ্বস্ত মনে হয়, তার সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। এখন আমার কাজে ফিরে যেতে হবে। আপনি আপনার বিচরণবিলাস চালিয়ে যেতে পারেন।

মিস কেন্টনের আচরণ বিরক্তিকর মনে হওয়ায় আমি আর এ বিষয়ে মাথা ঘামাতেই চাইলাম না। কারণ এরই মধ্যে প্রথম দিকের অতিথিদের একজন চলে এসেছেন। পরের দু-তিন দিনের মধ্যে বিদেশি প্রতিনিধিরা আসবেন—এ রকমই আশা করা গেল। তবে আলোচনার ক্ষেত্র যতটা সম্ভব পুরোপুরি প্রস্তুত করার জন্য লর্ড ডার্লিংটনের ভাষায় তাঁর ‘হোম টিম’-এর তিনজন সদস্য—দুজন বিদেশি অফিসের প্রতিনিধি ও মি. ডেভিড আগে আগে চলে এলেন। ওই দুজন অবশ্য আন-অফিশিয়ালি এলেন। তাঁদের কোনো নাম-পরিচয় রেকর্ডে থাকবে না। আগের মতোই এই ভদ্রলোকরা বিভিন্ন সময়ে যেসব রুমে বসে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত থাকলেন এবং তাঁদের সামনে আমার যখন-তখন যাওয়া-আসার কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলো না। কাজেই এই পর্যায়ে তাঁদের অগ্রগতি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা পাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারলাম না। অবশ্য লর্ড ডার্লিংটন এবং তাঁর সহকর্মীরা আসন্ন অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে একে অন্যকে যত দূর সম্ভব যথাযথ ধারণা দিতে থাকলেন। তবে হতবাক করার মতো ব্যাপার হলো, তাঁদের সবার চিন্তা শুধু একজনকে নিয়ে। তিনি হলেন ফরাসি প্রতিনিধি এম দুপোঁ। এঁরা তাঁর পছন্দ-অপছন্দ নিয়েও আলোচনা করলেন।

তাঁদের ধূমপানের রুমে ঢুকতে ঢুকতে একজনকে বলতে শুনলাম, এই প্রসঙ্গটাতে আমাদের পক্ষে দুপোঁকে রাজি করানোর ওপরই ইউরোপের ভাগ্য নির্ভর করছে।

তাঁদের এ রকম প্রারম্ভিক আলোচনার মধ্যে মি. ডার্লিংটন আমাকে একটা বিশেষ মিশনের দায়িত্ব দিলেন। এ রকম অস্বাভাবিক দায়িত্ব আমি আর কোনো দিন পেয়েছি কি না আজ পর্যন্ত মনে পড়ে না। ওই বিশেষ সপ্তাহে আরো সব অবিস্মরণীয় ঘটনাও ঘটবে; তার মধ্যে এটাও চালাতে হবে। লর্ড ডার্লিংটন আমাকে তাঁর পড়ার ঘরে ডেকে নিলেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, তিনি বেশ উত্তেজনার মধ্যে আছেন। তাঁর ডেস্কে বসে আগের মতো একটা বই খুলে ধরলেন। এবারের বইটার নাম ‘হুজ হু’। বইটা খুলে একটা পৃষ্ঠাই এদিক-ওদিক করতে লাগলেন।

উদাসীনতার একটা বানানো ভান করে তিনি শুরু করলেন, শোনো, স্টিভেনস। কিন্তু এটুকু বলার পর মনে হলো, তিনি বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। আমি ওখানে চুপ করে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম তাঁকে প্রথম সুযোগেই স্বস্তি দেওয়ার জন্য। তিনি আরো একমুহূর্ত পৃষ্ঠাটা ওল্টানোয় ব্যস্ত রইলেন। বইয়ের একটা এন্ট্রি যেন পরীক্ষা করে দেখছেন, এমন ভঙ্গিতে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। তারপর বললেন— স্টিভেনস, আমি বুঝতে পারছি, তোমাকে এই কাজটা করতে বলা একটা অস্বাভাবিক বিষয়।

বলুন, স্যার।

এই মুহূর্তে একজনের মনের ওপর আরেকজনের অনেক গুরুত্ব।

আমি কোনো কাজে লাগলে খুব খুশি হব, স্যার।

এ রকম একটা বিষয় তোলার জন্য আমি দুঃখিত, স্টিভেনস। আমি জানি, তোমাকে এমনিতেই ভয়ানক ব্যস্ত থাকতে হবে। কিন্তু আমি এই কাজটা করার আর কোনো পথই দেখতে পাচ্ছি না।

আমি একমুহূর্ত অপেক্ষায় থাকলাম। তখন মি. ডার্লিংটন ‘হুজ হু’র পাতায় মনোযোগ দিয়েছেন। তারপর ওপরের দিকে না তাকিয়েই তিনি বললেন, আমি ধরেই নিয়েছি, জীবনের অনেক বাস্তব বিষয় সম্পর্কে তুমি অবগত।

স্যার?

জীবনের বাস্তব বিষয়াদি, স্টিভেনস। এই ধরো পাখি, মৌমাছি। এসব সম্পর্কে জানো, তাই না?

আপনি কী বোঝাতে চান, ধরতে পারছি না, স্যার।

আমার কার্ডটা টেবিলে রাখি, স্টিভেনস। স্যার ডেভিড তো অনেক দিনের পুরনো বন্ধু। বর্তমানের কনফারেন্স আয়োজনে তাঁর অবদান অমূল্য। তাঁকে ছাড়া আমরা এম দুপোঁর সম্মতিই হয়তো পেতাম না।

অবশ্যই, স্যার।

অবশ্য, স্টিভেনস, স্যার ডেভিডের মজার দিকও আছে। তুমি নিজেও দেখে থাকতে পারো। তাঁর ছেলে রেজিনাল্ডকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করানোর জন্য। কথা হচ্ছে, তার বাগ্দান হয়ে গেছে। মানে রেজিনাল্ডের।

জি, স্যার।

পাঁচ বছর ধরে স্যার ডেভিড তাঁর ছেলেকে জীবনের বাস্তব বিষয়াদি সম্পর্কে বলার চেষ্টা করছেন। ছেলেটার বয়স এখন তেইশ বছর।

আসলেই, স্যার।

এবার আসল কথায় আসি, স্টিভেনস। ঘটনাক্রমে আমি তার ধর্মপিতা হয়েছি। সে মোতাবেক স্যার ডেভিড আমাকে অনুরোধ করেছেন রেজিনাল্ডকে জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে।

আসলেই, স্যার।

স্যার ডেভিড বুঝতে পারছেন, কাজটা বেশ কঠিন এবং রেজিনাল্ডের বিয়ের আগে তিনি শেষ করতে পারবেন না।

আসলেই, স্যার।

স্টিভেনস, এখন আসল কথা হচ্ছে আমি তো ভয়ানক ব্যস্ত। স্যার ডেভিড সেটা জানেন; তার পরও তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন।

বুঝতে পারছি, স্যার। আপনি চান, আমি যেন নবীন ভদ্রলোককে জীবন সম্পর্কে তথ্য জানাই।

যদি তুমি কিছু মনে না করো, স্টিভেনস। আমার মন থেকে বোঝাটা নামতে পারে। স্যার ডেভিড ঘণ্টা দুয়েক পর পরই জিজ্ঞেস করছেন, কাজটা আমি করেছি কি না।

আমি বুঝতে পারছি, স্যার। বর্তমানের চাপের মধ্যে আমি অবশ্যই চেষ্টা করব।

অবশ্যই, স্টিভেনস। এটা তোমার দায়িত্বের চেয়েও অনেক বেশি।

আমি আমার সাধ্যের সর্বোচ্চটা করব, স্যার। এ রকম তথ্য উনাকে জানানোর সঠিক মুহূর্তটা পেতে হয়তো একটা সমস্যা হতে পারে।

তার পরও তুমি চেষ্টা করলে কৃতজ্ঞ হব, স্টিভেনস। তোমার অনেক সহনশীলতা। শোনো, এটা এত আহামরি মজার কিছু বানানোর চেষ্টা করার দরকার নেই। শুধু জীবনের মৌলিক বিষয়াদি জানিয়ে দিয়ো। আর কিছু না। শোনো, স্টিভেনস, আমার উপদেশ হলো, সহজ-সরল পদ্ধতিতে এগোনোই ভালো।

ঠিক আছে, স্যার, আমার সর্বাত্মক চেষ্টা করব।

খুশি মনে কৃতজ্ঞ হলাম, স্টিভেনস। কেমন হচ্ছে, আমাকে জানিয়ো।

আপনারা যেমন বুঝতে পারছেন, তাঁর এই অনুরোধ শুনে কিছুটা অবাক হলাম। ব্যাপারটা এমন যে এটা নিয়ে বেশ চিন্তা করেও দেখতে হবে। এই দায়িত্বটা আমার ব্যস্ততম একটা সময়ে এলো বলে ঠিক বুঝে গেলাম, যথাযথ চিন্তাভাবনা খরচ করতে পারব না এর জন্য। তাই আগে আগে শেষ করে ফেলতে পারলেই ভালো। যতটা মনে পড়ছে, এই কাজের দায়িত্ব পাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরই নবীন ভদ্রলোকের দেখা পেলাম লাইব্রেরিতে। লেখার একটা টেবিলে বসে আছেন, সামনের কী কী সব কাগজপত্র নিয়ে মগ্ন হয়ে আছেন। তাঁকে ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়, লর্ড সাহেব কী সমস্যায় পড়েছেন তাঁকে নিয়ে এবং অবশ্যই তাঁর বাবাকে নিয়ে। আমার মনিবের ধর্মপুত্রকে মনে হলো খুব মনোযোগী, পণ্ডিত পণ্ডিত ভাব আছে চেহারায়। যা-ই হোক, যত দ্রুত সম্ভব গোটা বিষয়ের একটা সন্তোষজনক সমাপ্তি আনার প্রতিজ্ঞায় লাইব্রেরির ভেতরে এগিয়ে গেলাম এবং তাঁর লেখার টেবিল থেকে একটু দূরে থাকতেই থেমে গলা পরিষ্কার করার মতো শব্দে হালকা একটা কাশি দিলাম।

এক্সকিউজ মি, স্যার। আপনার কাছে আমার একটা কথা বলার আছে।           

 

সামনের কাগজ থেকে মুখ তুলে তিনি বললেন—ও, তাই নাকি? আমার বাবার তরফে, না?

জি, স্যার।

নবীন ভদ্রলোক তাঁর পায়ের কাছে রাখা অ্যাটাচি কেস থেকে একটা নোটবুক আর পেনসিল বের করলেন। তারপর বললেন, বলে যান, স্টিভেনস।

আমি আরেকবার কাশি দিয়ে আমার গলাটা যত দূর সম্ভব নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করলাম, স্যার ডেভিড চান আপনি যেন জানেন, নারী ও পুরুষের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে।

পরের বাক্যাংশে কী বলব ঠিক করার জন্য আমাকে একটু থামতেই হলো। কারণ মি. কার্ডিনাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি তো এ বিষয়ে দরকারের চেয়েও বেশি জানি, স্টিভেনস। আপনি কি আসল কথাটায় আসবেন?

আপনি জানেন, স্যার?

বাবা সব সময় আমাকে খাটো করে দেখে আসছেন। এই পুরো বিষয়ে আমার ব্যাপক পড়াশোনা ও পটভূমিগত প্রস্তুতি আছে।

তাই নাকি, স্যার?

আরে গত মাসে তো আমি অন্য কিছু নিয়ে ভাবিইনি।

সত্যিই, স্যার। তাহলে তো আমার বার্তা অনাবশ্যক।

আপনি বাবাকে নিশ্চিত করতে পারেন, এ বিষয়ে আমাকে আসলে অনেক বলা হয়েছে। পা দিয়ে অ্যাটাচি কেসটা নাড়া দিয়ে তিনি বললেন, এই যে এটা কানায় কানায় বোঝাই করা আছে সম্ভাব্য সব নোটে।

ও আচ্ছা, তাই নাকি, স্যার?

আমার মনে হয়, মানুষের মন যত রকমের বিন্যাস পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে সব নিয়ে গবেষণা করা আছে। আপনি বাবাকে এ বিষয়েও বলবেন।

অবশ্যই বলব, স্যার।

মি. কার্ডিনাল একটু থামলেন। তিনি আবারও অ্যাটাচি কেসটা নাড়া দিলেন। কেসটার দিক থেকে আমার দৃষ্টি সরিয়ে রাখা উচিত হলো। তিনি বললেন, আপনি নিশ্চয় ভাবছেন, আমি কেসটা হাতছাড়া করি না কেন, তাই না? তাহলে শুনুন। করি না, তার কারণ হলো, যদি কোনো ভুল ব্যক্তি এটা খুলে ফেলেন—এই আশঙ্কায়।

সে রকম হলে তো চরম বিব্রতকর হবে, স্যার।

হঠাৎ করে আবার উঠে বসতে বসতে তিনি বললেন, অবশ্য আমার ভাবার জন্য বাবা যদি আবার পুরোপুরি নতুন কোনো বিষয় পেয়ে না যান।

আমার মনে হয় না, তিনি তেমন কিছু পেয়েছেন।

পাননি? এই দুপোঁ মশাইয়ের পরে আর পাননি?

আমার মনে হয় না, স্যার।

দেখলাম যে কাজটা আমার পেছনে ফেলে এসেছি ভেবেছি সেটা আসলে সামনে পড়ে আছে। তখন সর্বাত্মক চেষ্টা করলাম, এ নিয়ে আর উত্তেজনা খরচ করব না। মনে হয়, নতুন করে চেষ্টা করার জন্য চিন্তাভাবনা জড়ো করছিলাম; ঠিক তখনই তিনি হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং তাঁর অ্যাটাচি কেসটা জড়িয়ে ধরে বললেন—ঠিক আছে, আমার মনে হয়, মুক্ত বাতাসের জন্য এখন বের হওয়া দরকার। আপনার সহায়তার জন্য ধন্যবাদ, স্টিভেনস।

আমার ইচ্ছা ছিল অনতিবিলম্বে তাঁর সঙ্গে আরেকবার সাক্ষাতের। কিন্তু দেখা গেল সেটা অসম্ভব। কারণ ওই দিন বিকেলেই নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে আমেরিকার সিনেটর মি. লিউস চলে এলেন। আমার ভাঁড়ারে বিছানার চাদরের সরবরাহের দেখভাল করার সময় তখন উঠানের কোথাও মোটরগাড়ির আওয়াজ শুনতে পাই। দ্রুত ওপরের তলায় যাচ্ছিলাম, তখনই পেছনের করিডরে মিস কেন্টনের সঙ্গে আমার দেখা হলো। এই জায়গাটাই আমাদের দ্বিমতের সর্বশেষ দৃশ্য। সম্ভবত এই অশুভ কাকতালীয় ঘটনাটার কারণে তিনি আগেরবারও কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করেন। কারণ আমি যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কে এসেছেন, তিনি আমাকে পার হয়ে যেতে যেতে শুধু বললেন, একটা বার্তা, যদি জরুরি হয়ে থাকে, মি. স্টিভেনস। আমার কাছে প্রচণ্ড বিরক্তিকর মনে হলো; তবু আমার ওপরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

মি. লিউসের যতটা মনে পড়ে, তাঁর চারপাশে উদারতার ছড়াছড়ি, মুখে সব সময় হাসি লেগে আছে। তাঁর আগে আগে এসে পড়ায় লর্ড সাহেব এবং তাঁর সহকর্মীদের খানিক সমস্যাই হলো মনে হলো। তাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁদের প্রস্তুতির জন্য আরো দু-এক দিন গোপনীয়তার সুযোগ পাবেন। অবশ্য মি. লিউসের অত্যন্ত অনানুষ্ঠানিক আচরণ দেখে মনে হলো, লর্ড ডার্লিংটনের হোম টিমের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারবেন তিনি। প্রথম রাতের ডিনারেই তিনি বললেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে এবং ভার্সেই চুক্তিতে যে ভুল হয়েছে সেটাও মানতে আপত্তি নেই। ডিনার যত এগিয়ে যেতে লাগল, তাঁদের আলোচনা মি. লিউসের জন্মস্থান    পেনসিলভানিয়ার নানা রকম সুবিধার কথা থেকে কনফারেন্স পর্যন্ত চলে এলো। তারপর ভদ্রমহোদয়রা যখন তাঁদের চুরুট জ্বালাতে লাগলেন, তাঁদের কোনো কোনো অনুমান মি. লিউসের আসার আগের অনুমানগুলোর মতোই আন্তরিক মনে হতে লাগল। একপর্যায়ে মি. লিউস উপস্থিত সবাইকে বললেন— জেন্টলমেন, আমি আপনাদের সঙ্গে একমত, আমাদের এম দুপোঁ সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই বলা যায় না। তবে আমি বলতে চাই, তাঁর সম্পর্কে একটা বিষয়ে আপনারা নিশ্চিত হতে পারেন। এটুকু বলে মি. লিউস তাঁর কথার জোর বাড়ানোর জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন এবং তাঁর চুরুটটা একটু এদিক-ওদিক করলেন। এরপর তিনি বললেন, দুপোঁ জার্মানদের ঘৃণা করেন। তিনি যুদ্ধের আগেও জার্মানদের ঘৃণা করতেন, এখনো করেন। তাঁর ঘৃণার গভীরতা আপনাদের বুঝতে অসুবিধাও হতে পারে। এই বলে মি. লিউস পেছনের দিকে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন এবং তাঁর মুখের প্রাণবন্ত হাসিটা পুরোপুরি ফিরে এলো।

মি. লিউস টেবিলের সবার দিকে যখন তাকান, এক ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন। তারপর লর্ড ডার্লিংটন বললেন, স্বাভাবিকভাবে কিছু তিক্ততা থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা ইংরেজরাও তো জার্মানদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কঠিন যুদ্ধ করেছি।

মি. লিউস বললেন, তবে পার্থক্যটা হলো, আপনারা ইংরেজরা আর মনে হয় জার্মানদের ঘৃণা করেন না। কিন্তু ফরাসিরা মনে করে, জার্মানরা এখানে ইউরোপের সভ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছে। কোনো শাস্তিই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। অবশ্য আমাদের আমেরিকায় তাদের এ রকম দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবতাবর্জিত মনে করা হয়। কিন্তু আপনারা ইংরেজরা কেন ফরাসিদের মতো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না, সেটাই আমাকে বিমূঢ় করে দেয়। মোটের ওপর আপনারাও তো বলে থাকেন, যুদ্ধে ব্রিটেনের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

আবারও খানিক বিব্রতকর নীরবতা নেমে আসে। শেষে স্যার ডেভিড কিছুটা অনিশ্চয়তার সুরে বলেন—মি. লিউস, আমরা ইংরেজরা এসব বিষয়ে ফরাসিদের থেকে আলাদা দৃষ্টি পোষণ করি।

আহ্, আপনি হয়তো বলতে পারতেন, মনমেজাজগত পার্থক্য, কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে মি. লিউসের হাসিটা আরেকটু ছড়িয়ে পড়ল। তিনি নিজের জন্যই মাথা নোয়ালেন, যেন অনেক বিষয় তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে এসেছে। তারপর চুরুটে জোরসে একটা টান দিলেন।

আমার স্মৃতি এখানে হয়তো আমার অতীতমুখী কল্পনার একটু রং মেখেছে; কিন্তু আমার অনুভূতি স্পষ্ট বলছে, ওই মুহূর্তে আমি অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করলাম, আপাত আকর্ষণীয় আমেরিকান ভদ্রলোকের চাতুরীর একটা আভাস। কিন্তু আমার নিজের সন্দেহ যদি তখন জেগেও থাকে, মি. ডার্লিংটন শেয়ার করেননি। কারণ বিব্রতকর দু-এক সেকেন্ড পর মনে হলো, তিনি একটা সিদ্ধান্তে এলেন। তিনি বললেন— মি. লিউস, আমরা ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষ ফরাসিদের বর্তমান মনোভাবটাকে নিন্দনীয় মনে করি। আপনি এটাকে মনমেজাজগত পার্থক্য বলতে পারেন। কিন্তু আমি বলতে চাইছি, আমরা এখানে আরো অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছি। দ্বন্দ্ব যখন মিটেই গেছে তখন কোনো শত্রুকে এভাবে ঘৃণা করে যাওয়া বেমানান। যাকে পরাস্ত করা হয়ে গেছে তাকে আর লাথি মারার দরকার কী? আমাদের কাছে ফরাসিদের আচরণ ক্রমান্বয়ে অমার্জিত মনে হয়।

তাঁর কথা যেন মি. লিউসের মনে কিছুটা সন্তুষ্টি এনে দিল। সমবেদনা জানিয়ে তিনি বিড়বিড় করে কী যেন বললেন এবং তৃপ্তি নিয়ে টেবিলের ওপর জমে থাকা ধোঁয়ার মেঘের ভেতর দিয়ে তাঁর আশপাশের ডাইনারদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

পরদিন সকালে আরো দুজন এলেন তাঁদের নির্ধারিত সময়ের আগেই। জার্মানির দুজন মহিলা, তাঁদের পটভূমিগত বিশাল বৈপরীত্য থাকলেও তাঁরা একসঙ্গেই এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে এনেছেন বিশাল বহরের সঙ্গিনী, পরিচারক এবং অনেক ট্রাংক। তারপর বিকেলের দিকে এলেন ইতালির এক ভদ্রলোক। তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন একজন পরিচারক, একজন সেক্রেটারি, একজন এক্সপার্ট এবং দুজন দেহরক্ষী। আমি কল্পনা করতে পারি না, দেহরক্ষী আনার সময় ওই ভদ্রলোকের মনে কেমন জায়গায় আসার কথা ছিল। তবে আমাকে বলতেই হবে, ইতালির ভদ্রলোক যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই কয়েক গজ দূর থেকে সব কিছুর দিকে সন্দেহের দিকে তাকাচ্ছে তাঁর দেহরক্ষীরা। ডার্লিংটন হলে বিশালদেহী নির্বাক এই দুজনকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা অস্বাভাবিক মনে হলো। ঘটনাক্রমে পরের কয়েক দিনে যে রকম জানা গেল, দেহরক্ষী দুজনের কাজের ধরন অনুসারে তারা একজন অসময়ে ঘুমাতে যায়; অন্যজন ডিউটিতে থাকে, যাতে নিশ্চিত করতে পারে, অন্তত একজন রাতে ডিউটিতে থাকতে পারে। কিন্তু যখন তাদের কাজের এই ধরন সম্পর্কে জানার পর আমি মিস কেন্টনকে এ বিষয়ে জানাতে গেলাম, তিনি আবারও আমার সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। কাজেই সব কিছু সময়মতো জানানোর জন্য চিরকুট লিখে তাঁর পার্লারের দরজার নিচ দিয়ে চালান দিতে বাধ্য হলাম।

পরের দিন আরো কয়েকজন অতিথি এলেন। তবে তখনো কনফারেন্স শুরু হওয়ার আরো দুই দিন বাকি। ডার্লিংটন হল বিভিন্ন জাতির লোকজনে ভরে উঠল; রুমের ভেতর তাঁদের কথাবার্তা চলছে, এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেউ কেউ, আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে উদ্দেশ্যহীন, হলরুমে, করিডরে, ল্যান্ডিংয়ে, ছবি কিংবা এটা-ওটা পরীক্ষা করে দেখছেন কেউ কেউ। অতিথিরা একজন আরেকজনের প্রতি অতিশয় শিষ্ট আচরণ করছেন। ওপরে ওপরে এত কিছু সত্ত্বেও মনে হচ্ছে, পরিবেশ চাপা উত্তেজনার নিচে আছে; সবার মনে অবিশ্বাস বিরাজ করছে এই পর্যায়ে এসে। মনিবদের মতো অস্বস্তি ছড়িয়ে অতিথিদের পরিচারক ও খানসামারাও একজন আরেকজনকে যেন চিহ্নিত শীতলতা নিয়ে দেখছে। আমার স্টাফরা যেন খুশি হয়েছে, তারা অতি ব্যস্ততার কারণে অন্যদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতেই পারছে না।

এ রকম একটা সময়ে আমি চারদিকের আদেশ পালনে ব্যস্ত ছিলাম, ঠিক তখনই একটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, মি. কার্ডিনাল জুনিয়র সামনের খোলা লনে মুক্ত বাতাস সেবন করছেন। তখনো তিনি অ্যাটাচি কেসটা বগলদাবা করেই আছেন এবং মৃদু গতিতে লনের অন্য প্রান্তের দিকে যাচ্ছেন। তাঁর অবয়ব দেখেই বোঝা গেল, তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন আছেন। তাঁকে নিয়ে আমার মিশনের কথাটা মনে পড়ে গেল। তখনই আমার মনে হলো, বাইরের পটভূমিতে, প্রকৃতির এত কাছে, বিশেষ করে একেবারে হাতের কাছে রাজহাঁসও আছে; এ রকম পরিবেশ তাঁকে আমার বার্তা জানানোর খুব অনুপযুক্ত হবে না। আরো একটা পরিকল্পনা এলো আমার মাথায় : আমি যদি দ্রুত বাইরে গিয়ে পথের পাশে রডোডেনড্রন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকি তাহলে খুব বেশি দেরি করতে হবে না; মি. কার্ডিনাল চলে আসবেন ওখানে। তখন ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে তাঁকে বার্তাটা জানিয়ে দেওয়া যাবে। অবশ্য এ রকম পরিকল্পনা খুব সূক্ষ হলো,   তা-ও বলা যায় না। তবে আপনারা বুঝতে পারবেন, কাজটার নিজস্ব ধরনের মধ্যে খানিক গুরুত্ব ছিল, তবু এ রকম একটা কাজ ওই সময় খুব বেশি প্রাধান্য দেওয়ার মতো নয়।

লনের ঘাস আর গাছপালার পাতার ওপরে একপ্রস্ত তুষার পড়েছে। তবে বছরের ওই সময়ের জন্য দিনটা ছিল নমনীয় আবহাওয়ার। ঘাসের লন পেরিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। খুব বেশি দেরি করতে হলো না, মি. কার্ডিনালের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। দুঃখজনক হলো, ওখান থেকে বের হয়ে আসার সময়-মাত্রায় একটু ভুল হয়ে গেল আমার : আমার পরিকল্পনা ছিল, মি. কার্ডিনাল একটু দূরে থাকতেই বের হয়ে পড়ব, যাতে তিনি আমাকে আগে থেকেই দেখতে পান এবং মনে করেন, আমি সামার হাউসের দিকে যচ্ছিলাম, কিংবা মালির ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম। তাহলে তাঁকে হঠাৎ দেখে ফেলার ভান করতে পারতাম এবং তাঁকে উপস্থিতমতো আলোচনায় নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু ঘটল অন্য রকম : আমার বের হতে দেরি হয়ে গেল এবং আমি ভদ্রলোককে একেবারে চমকে দিলাম। চমকে গিয়ে তিনি আমার দিক থেকে তাঁর অ্যাটাচি কেসটা অন্য পাশে নিয়ে দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলেন।

আমি খুব দুঃখিত, স্যার।

মাই গুডনেস, স্টিভেনস! আপনি আমাকে চমকে দিয়েছেন। আমি ভাবলাম, ওখানে সব কিছু উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমি খুব দুঃখিত, স্যার। তবে যে জন্য এসেছিলাম, স্যার, আপনাকে আমার একটা বিষয় জানানোর আছে।

মাই গুডনেস, আপনি তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।

স্যার, আমি যদি সরাসরি আসল কথায় চলে আসি, আপনি কাছেই রাজহাঁস দেখতে পাবেন।

তিনি একটু বিমূঢ় হয়ে আশপাশে তাকালেন। ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, এগুলো তো রাজহাঁসই।

তারপর দেখুন ফুল, লতাগুল্ম। বছরের এই সময়টায় এগুলোর উজ্জ্বলতম রূপ দেখা যায় না। তবে আপনি বুঝতে পারবেন, স্যার, বসন্তের শুরুতেই আমরা একটা পরিবর্তন দেখব। একটা খুব বিশেষ পরিবর্তন, এই পরিসরের মধ্যেই।

হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত, মাটি এখন ভালো অবস্থায় নেই। কিন্তু স্টিভেনস, আমি এখন প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে ভাবছিলাম না। দুশ্চিন্তার কথা হচ্ছে, এম দুপোঁ এসে হাজির হয়েছেন একেবারে মারাত্মক বিশ্রী অবস্থায়। এর চেয়ে বিশ্রী অবস্থা কল্পনাই করা যায় না।

এম দুপোঁ এই হাউসে এসে গেছেন, স্যার?

আধাঘণ্টা আগে প্রায়। বিশ্রী মেজাজে আছেন তিনি।

এক্সকিউজ মি, স্যার। আমাকে এখনই তাঁর সেবায় চলে যেতে হবে।

অবশ্যই, স্টিভেনস। আমার সঙ্গে কথা বলতে বাইরে আসার জন্য ধন্যবাদ।

প্লিজ, মাফ করবেন, স্যার। চলে যেতে হচ্ছে; কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার দু-একটা কথা ছিল। বিষয় হলো, আপনি যেমন বললেন, প্রকৃতির মহিমা। আপনি আমার কথা শোনার মতো উদারতা দেখালে চিরকৃতজ্ঞ থাকব, স্যার। কিন্তু তার জন্য তো আমাদের আরেকবার দেখা হওয়া দরকার।

ঠিক আছে, স্টিভেনস। আমি দেখব। যদিও আমি নিজেও ফিশম্যান, আমি কিন্তু মিঠা পানি নোনা পানির সব মাছ সম্পর্কে জানি।

প্রাণ আছে এমন সব কিছুই থাকবে আমাদের সামনের আলোচনায়। স্যার, আমাকে যে এবার যেতেই হবে। আমি বুঝতেই পারিনি, এম দুপোঁ চলে এসেছেন।

আমি হাউসের দিকে দৌড়ে আসতে থাকি। একটু পরেই প্রথম খানসামার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। সে বলে, আমরা আপনাকে সবখানে খুঁজছি, স্যার। ফরাসি ভদ্রলোক এসে গেছেন।

এম দুপোঁ দীর্ঘকায়, রুচিশীল চেহারার মানুষ। মুখে সাদা দাড়ি আর চোখে একচোখো চশমা। মহাদেশীয় লোকজন ছুটির দিনে যেমন পোশাক পরে, তেমন পোশাকে চলে এসেছেন তিনি। ডার্লিংটন হলে যে কয়েক দিন থাকবেন, কষ্ট করে হলেও এ রকম পোশাক পরেই থাকবেন এবং গোটা সময় তিনি বন্ধুত্ব বজায় রাখবেন আর আনন্দ করে কাটাবেন। মি. কার্ডিনাল যেমন বলেছেন, এম দুপোঁ খোশমেজাজে আসেননি। কয়েক দিন আগেই তিনি ইংল্যান্ডে আসেন এবং তাঁর আসার পর থেকে কোন বিষয় তাঁর এত বিরক্তির কারণ হয়েছিল আজ আর আমার মনে নেই। তবে মনে আছে, লন্ডনের আশপাশে দৃশ্য দেখতে গেলে তাঁর পায়ে কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়। তাঁর আশঙ্কা, ওই সব জায়গায় পচন ধরতে পারে। আমি তাঁর পরিচারককে মিস কেন্টনের কাছে পাঠালাম। কিন্তু তাতে তাঁকে দমানো গেল না; তিনি যখন-তখন আমার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, বাটলার! আমার আরো ব্যান্ডেজ দরকার।

মি. লিউসকে দেখে এম দুপোঁর মেজাজ প্রফুল্ল হলো। তিনি এবং আমেরিকান সিনেটর একজন আরেকজনকে পুরনো বন্ধুর মতো সম্ভাষণ জানালেন। দিনের বাকি সময়ের বেশির ভাগই তাঁরা একে অন্যের সান্নিধ্যে কাটালেন। স্মৃতিচারণা করলেন আর স্মৃতি নিয়ে হাসাহাসি করলেন। দেখা গেল, এম দুপোঁর চারপাশে মি. লিউসের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির কারণে লর্ড ডার্লিংটনের মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে। মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগে তিনি এম দুপোঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈকট্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন। আমি বেশ কয়েকবার দেখলাম, মি. ডার্লিংটন একান্তে তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য এম দুপোঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার আগেই মি. লিউস তাঁদের মাঝখানে নিজেকে হাজির করছেন এবং কোনো মন্তব্য করছেন, যেমন মাফ করবেন, জেন্টলমেন, একটা বিষয় আমাকে খুব বিমূঢ় করেছে, বুঝলেন? সঙ্গে সঙ্গে মি. ডার্লিংটন দেখলেন, তাঁকে এখন মি. লিউসের কোনো আমুদে কাহিনি শুনতে হবে। মি. লিউস অন্য অতিথিদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সম্ভবত ভীতি কিংবা বিরোধিতার কারণে এম দুপোঁর কাছ থেকে সতর্কতামূলক দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন, এতটা প্রহরা থাকা পরিবেশে সেটা খুব স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। তাঁর জন্য সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, আলোচনার ফলাফলের চাবিকাঠি এম দুপোঁর হাতেই আছে।

১৯২৩ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহের এক বৃষ্টিমুখর সকালে কনফারেন্স শুরু হলো। বসার জায়গাটা একটু অস্বাভাবিক পটভূমির হলো—ড্রয়িংরুমে শুরু হলো কনফারেন্স। যোগদানকারীদের অনেকেই ছিলেন রেকর্ডের বাইরে; মূলত তাঁদের কারণেই এ রকম একটা জায়গায় বসা হলো। আসলে আমার দৃষ্টিতে অনানুষ্ঠানিকতার চেহারা হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলো। অস্বাভাবিক হলেও দেখা গেল, মহিলাদের রুমে গাদাগাদি করে বসে আছেন কালো জ্যাকেট পরা কঠিন চেহারার পুরুষরা, কোনোখানে হয়তো এক সোফায় তিন-চারজন বসেছেন। কারো কারো স্থির সিদ্ধান্ত এ রকমই ছিল, যেন অনুষ্ঠানের অনানুষ্ঠানিক চেহারায় সামাজিক অনুষ্ঠানের চেয়ে বেশি কিছু না থাকে। এমনকি তাঁদের কারো কারো হাঁটুর ওপরে খোলা জার্নাল কিংবা পত্রিকাও ছিল।

প্রথম সকালের কনফারেন্স চলাকালে আমাকে রুমের বাইরে যেতে-আসতে হচ্ছিল অবিরত। সুতরাং সেখানে আলোচনায় কী কী তোলা হচ্ছে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারিনি। তবে মনে আছে, লর্ড ডার্লিংটন অতিথিদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। ভার্সেই চুক্তির বিভিন্ন দিক শিথিল করার মতো নৈতিক বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার আগে তিনি জার্মানিতে যে মানব দুর্ভোগ দেখেছেন সেটার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অবশ্য এসব ভাবালু কথাবার্তা তাঁকে আগেও অনেকবার বলতে শুনেছি। তবে এই মহিমান্বিত পটভূমিতে তাঁর বলার মধ্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের গভীরতা। সে কারণে আমি পুনরায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। তারপর কথা বললেন স্যার ডেভিড কার্ডিনাল এবং যদিও তাঁর কথার অনেকটাই শুনতে পাইনি তবু মনে হলো, তাঁর কথার মধ্যে অনেক কৌশল আছে; খোলাখুলি বললে, তাঁর কথার অনেক কিছুই আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল।

যতটুকু দেখতে পেলাম, এম দুপোঁ আলোচনায় কিছুই যোগ করলেন না। তাঁর গোমড়ামুখো চেহারা দেখে বোঝা মুশকিল, আলোচনায় অন্যরা যা বলছেন তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, নাকি অন্য চিন্তায় মগ্ন আছেন। জার্মান ভদ্রলোকদের একজনের আলোচনার একপর্যায়ে যখন রুম থেকে আবারও বের হলাম, এম দুপোঁও রুম থেকে বের হয়ে আমাকে অনুসরণ করলেন।

যখন আমরা হলরুমে চলে গেছি, তিনি বললেন—বাটলার, আমার মনে হচ্ছে, আমার পা বদলে ফেলি। এত যন্ত্রণা দিচ্ছে, ভদ্রলোকদের কারো কথাই ভালো করে শুনতে পাচ্ছি না।

যেটুকু মনে পড়ছে, হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে প্রথম খানসামা এসে যখন জানাল, আমার বাবা দোতলায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তখন একজন বার্তাবাহক দিয়ে মিস কেন্টনের কাছে একটা আবেদন পাঠালাম, আর এম দুপোঁকে রেখে গেলাম বিলিয়ার্ড রুমে; নার্সের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি।

আমি দ্রুত দোতলার দিকে ছুটলাম এবং ল্যান্ডিংয়ের ওখানে পৌঁছেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম : করিডরের শেষ প্রান্তে, বড় জানালার প্রায় সামনে ধূসর আলোয় প্লাবিত হয়ে আমার বাবার অবয়ব মনে হলো একটা ভঙ্গিমায় চুপ হয়ে আছে, যেন তিনি কোনো আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। একটা হাঁটু পড়ে গেছে এবং মাথা নিচু হয়েছে; মনে হচ্ছে, তাঁর সামনের ট্রলি ঠেলছেন এবং ট্রলিটা কোনো কারণে আটকে গেছে, আর নড়ছে না। সম্মানজনক দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে দুজন পরিচারিকা; ভীত দৃষ্টিতে আমার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে তারা। বাবার কাছে পৌঁছে তাঁর হাতের মুষ্টি ট্রলি থেকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং কার্পেটের ওপরে তাঁকে আরাম করে শুইয়ে দিলাম। তাঁর চোখ বন্ধ; মুখের রং হয়ে গেছে ছাইয়ের মতো বিবর্ণ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। আরো সাহায্যের জন্য ডাকাডাকিতে একটা বাথ-চেয়ার চলে এলো সঙ্গে সঙ্গে। বাবাকে তাঁর রুমে নিয়ে যাওয়া হলো।

বাবাকে তাঁর বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কারণ বাবাকে এ অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া যায় না। আমি মি. মেরেডিথকে ডেকে পাঠাচ্ছি। তিনি বিশেষ কিছু বলতে চাইলে আপনাকে ডেকে জানাব।

আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলাম।

আমি যখন ড্রয়িংরুমে ফিরে এলাম, একজন যাজক বার্লিনে শিশুদের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন। দ্রুতই আমি চা-কফি দিয়ে আপ্যায়ন করার কাজে মগ্ন হয়ে গেলাম। ভদ্রলোকদের কয়েকজন স্পিরিট সেবন করছিলেন, কয়েকজন আবার মহিলাদের উপস্থিতিতেই ধূমপান শুরু করে দিয়েছেন। ড্রয়িংরুম থেকে হাতে চায়ের একটা খালি পাত্র নিয়ে বের হয়ে এলাম। বাইরে মিস কেন্টন আমাকে থামালেন, মি. স্টিভেনস, ড. মেরেডিথ এখনই বের হবেন।

মিস কেন্টনের কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখলাম, বর্ষাতি গায়ে চড়াতে চড়াতে মাথায় হ্যাট পরে হলরুমের দিকে এগিয়ে আসছেন ড. মেরেডিথ। আমি এগিয়ে গেলাম। চায়ের পাত্র তখনো আমার হাতে। ড. মেরেডিথ কিছুটা বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে বললেন, আপনার বাবার অবস্থা তেমন ভালো নয়। আরো খারাপের দিকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকবেন।

 ঠিক আছে, স্যার। ধন্যবাদ, স্যার।

 আপনার বাবার বয়স কত, স্টিভেনস?

 বাহাত্তর বছর, স্যার।

 ড. মেরেডিথ কী যেন ভাবলেন; তারপর বললেন, আরো খারাপের দিকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকবেন।

 আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে দিলাম।

 

সেদিন সন্ধ্যায় ডিনারের কিছুক্ষণ আগে মি. লিউস ও এম দুপোঁর আলাপ খানিকটা শুনে ফেলি। কী একটা কাজে যেন এম দুপোঁর রুমে যাওয়ার দরকার হলো; দরজায় কড়া নাড়তে যাওয়ার আগে দরজার সামনে একটু দাঁড়ালাম ভেতরের কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় কি না। ভেতরে ঢোকার আগে সব সময়ই আমি এ রকম করে থাকি। আপনারা হয়তো এ রকম সতর্কতা অবলম্বন করার সঙ্গে অভ্যস্ত নন; তবে একেবারে অনুপযুক্ত মুহূর্তে হঠাৎ ভেতরে ঢুকে পড়ার চেয়ে এ রকম সতর্কতা নিয়ে এগোনো যায়, আমি সব সময় এটাই করে আসছি; কারণ আমাদের মতো অনেক পেশাদারই এভাবে কোনো অতিথির রুমে ঢোকে। বলা যায়, এর মধ্যে কোনো রকম চাতুরী নেই। ভেতরের মানুষদের কথাবার্তা শুনে ফেলার কোনো ইচ্ছাও থাকে না। তবে সেই সন্ধ্যায় অল্প কিছু কথা শুনে ফেলেছিলাম। যা-ই হোক, এম দুপোঁর দরজায় কান লাগিয়ে মি. লিউসের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। যদিও তাঁর প্রথম দিকের কথাগুলো শুনতে পাইনি, তবু তাঁর কথার সুরেই আমার মনে কেমন যেন সন্দেহ চলে আসে। তাঁর এখানে আসার পর থেকে সবাইকে তাঁর যে আমুদে এবং ধীরস্থির কণ্ঠে মুগ্ধ করেছেন সেই কণ্ঠই শুনলাম।

ডার্লিংটন হলের বেডরুমগুলোর দরজা বেশ মোটা। এ জন্য তাঁদের দুজনের কথা বিনিময়ের পুরোটা ভালো করে শুনতে পারলাম না। ফলে এখন আমার পক্ষে বলা মুশকিল ঠিক কী কী কথা শুনেছিলাম তখন। যা-ই হোক, যেটুকু শুনেছিলাম সেটুকুই ওই সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ পর লর্ড ডার্লিংটনকে জানালাম। পরিষ্কার না শুনে থাকলেও ভেতরে কী হচ্ছিল সে সম্পর্কে একেবারেই ধারণা পাইনি, তা নয়। আসলে আমেরিকান ভদ্রলোক এম দুপোঁকে যেসব বিষয়ে জানাচ্ছিলেন সেগুলো হলো, এম দুপোঁকে লর্ড ডার্লিংটন এবং কনফারেন্সে অংশ নিতে আসা অন্যরা প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন; এম দুপোঁকে ইচ্ছা করেই দেরিতে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যাতে অন্যরা তাঁর অনুপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে ফেলতে পারেন এবং এমনকি তাঁর আগমনের পরও দেখা গেছে মি. ডার্লিংটন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে গোপন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এম দুপোঁকে না ডেকেই। তারপর মি. লিউস এখানে আসার প্রথম রাতের ডিনারে এম দুপোঁ সম্পর্কে লর্ড ডার্লিংটন এবং অন্যরা কে কী বলেছিলেন সেসব কথাও দুপোঁকে জানানো শুরু করলেন।

মি. লিউসকে বলতে শুনলাম—খোলাখুলি বললে, স্যার, আপনার দেশের মানুষদের প্রতি উনাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পেরে আমি তো মর্মাহত। উনারা আপনার দেশের মানুষের জন্য ‘বর্বর’, ‘ঘৃণ্য’—এসব শব্দ ব্যবহার করেছেন। আসলে কয়েক ঘণ্টা পর ওই কথাগুলো আমার ডায়েরিতে লিখে রেখেছি।

এম দুপোঁ সংক্ষেপে কী যেন বললেন, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। মি. লিউস আবার বললেন, আপনাকে আবারও বলছি, স্যার, আমি তো মর্মাহত। কয়েক বছর আগে আপনারা যাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মিত্রদের সম্পর্কে কি এসব কথা বলা যায়?

এরপর আর আমি দরজায় কড়া নেড়েছিলাম কি না মনে নেই। তবে স্বাভাবিক হলো, এ রকম কথাবার্তা শুনে আমি বোধ হয় আর আদৌ ভেতরে ঢুকিনি। যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, মি. লিউসের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এম দুপোঁ কী বললেন তা শোনার জন্য আর দেরি করলাম না। কেননা যা শুনলাম সেটাই তখন লর্ড ডার্লিংটনকে জানানোর তাগিদ বোধ করলাম।

পরের দিন সকালে ড্রয়িংরুমের আলোচনা তীব্রতার নতুন মাত্রায় উঠে গেল। দুপুরের খাওয়ার সময় আসতে আসতে মতামত বিনিময় মোটামুটি উত্তপ্ত পর্যায়ে চলে গেল। আমার এখন মনে হয়, প্রত্যেকের কথার মধ্যে অন্যকে অভিযুক্ত করার বিষয়টা চলে এলো। অন্যদের সাহসী উচ্চারণ ক্রমাগত বেড়েই চলল এবং তাদের উদ্দেশ্য হাতলওয়ালা চেয়ারে বসা এম দুপোঁর দিকে। তিনি দাড়ির ভেতর আঙুল চালানোয় ব্যস্ত, কথাবার্তা অল্পই বলছেন। যখনই কনফারেন্স আপাতত মুলতবি ঘোষণা করা হচ্ছে, খেয়াল করে দেখেছি এবং আমার মনে হয়, লর্ড ডার্লিংটনও খেয়াল করে থাকবেন, মি. লিউস এম দুপোঁকে একোনায়-ওকোনায় ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন, যাতে   নিরিবিলি পরামর্শ করতে পারেন। দুপুরের খাবারের পর আরেকবার তাঁদের লাইব্রেরির দরজার ভেতরের পাশে ইঙ্গিতপূর্ণ আলাপ করতে দেখলাম। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, আমাকে আসতে দেখে তাঁরা কথা থামিয়ে দিলেন।

এরই মধ্যে আমার বাবার অবস্থা খারাপ-ভালো কোনো দিকেই পরিবর্তন হয়নি। যতটুকু বুঝলাম, তিনি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে আছেন। অল্প একটু অবসর পেলে মাঝেমধ্যে তাঁর চিলেকোঠায় গিয়ে দেখে এসেছি, সব সময়ই ঘুমের মধ্যে দেখেছি। এ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি। তাঁর অসুস্থতার দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় একটু সুযোগ পেলাম কথা বলার।

তখনো রুমে ঢুকে দেখলাম, বাবা ঘুমাচ্ছেন। তবে মিস কেন্টনের পাঠানো পরিচারিকা আমাকে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল এবং বাবার কাঁধে নাড়া দিয়ে ডাকতে লাগল।

বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম—আরে, বোকা মেয়ে করে কী! তুমি কী করছ বুঝতে পারছ?

স্যার, আপনি আসলে উনাকে ডেকে দিতে বলেছেন।

উনাকে ঘুমাতে দাও। ক্লান্তি থেকেই তো তাঁর অসুখ হয়েছে।

উনি বলেছেন, আমি যেন অবশ্যই ডেকে দিই। মেয়েটা আবার আমার বাবার কাঁধে নাড়া দিয়ে ডাকা শুরু করল।

আমার বাবা চোখ খুলে তাকালেন এবং বালিশের ওপরে মাথা একটু উঁচু করলেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন।

আমি বললাম—আশা করি, বাবা এখন ভালো বোধ করছেন।

আরো একমুহূর্ত তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, নিচে সব কিছু ঠিক আছে তো?

পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বদলে যাচ্ছে। একটু আগে ছয়টা পার হয়েছে; তাহলে বাবা ভালো করে কল্পনা করতে পারছেন, কিচেনের অবস্থা এখন কেমন হতে পারে।

বাবার মুখে অধৈর্যের একটু ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, তবে সব কিছু ঠিক আছে তো?

হ্যাঁ, এ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না তোমাকে, নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও। আমার খুব ভালো লাগছে, বাবা আগের চেয়ে ভালো আছেন।

বিছানার চাদরের নিচ থেকে চেষ্টা করে হাত বের করলেন এবং ক্লান্ত দৃষ্টিতে হাতের পেছনের পাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে তাকিয়ে রইলেন।

আমি আবারও বললাম, আমার খুব ভালো লাগছে, বাবা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। এখন আমাকে যেতে হবে। যেমন বললাম, পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বদলে যাচ্ছে।

হাতের দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বাবা ধীরে ধীরে বললেন—আশা করি, বাবা হিসেবে তোমার কাছে ভালোই ছিলাম।

অল্প একটু হেসে বললাম, আমার খুব ভালো লাগছে, তুমি আগের চেয়ে ভালো আছ।

তোমাকে নিয়ে আমার গর্ব হয়। ছেলে হিসেবে তুমি খুব ভালো। আশা করি, বাবা হিসেবে ভালোই ছিলাম তোমার কাছে।

আমরা এখন তো খুব ব্যস্ত আছি। আমরা সকালে আবার কথা বলতে পারি।

বাবা আবারও হাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন হাত দুটি নিয়ে তিনি কিছুটা বিরক্ত।

আমার খুব ভালো লাগছে, তুমি আগের চেয়ে ভালো আছ, বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম।

কিচেনে নেমে এসে দেখলাম, একেবারে কানায় কানায় বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে সেখানে। মোটের ওপর সব স্টাফের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যা হোক, ভেবে ভালো লাগছে, ঘণ্টাখানেক পরে যখন ডিনার পরিবেশন করা হলো, আমার দলের সবার মধ্যে দক্ষতা আর পেশাগত প্রশান্ত ভাব ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পেল না।

জাঁকজমকপূর্ণ ডাইনিংরুম পরিপূর্ণরূপে কাজে লাগানো স্মরণে রাখার মতো একটা দৃশ্য। আর সেদিন সন্ধ্যায় এ রকম করেই সাজানো হয়েছিল রুমটা। অবশ্য স্বল্পসংখ্যক নারী প্রতিনিধির উপস্থিতির পাশে সান্ধ্য স্যুট পরা ভদ্রলোকদের সারি একটু চোখে লাগার মতোই ছিল। তবে তার পরও সেসব দিনে টেবিলের ওপরে ঝুলন্ত তখনো গ্যাসচালিত দুটো বিরাট ঝাড়বাতি গোটা রুমে এক রকমের কোমলতা ছড়িয়ে বিশেষ সূক্ষ পরিবেশ তৈরি করত। বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার পরে যেমন চোখ-ধাঁধানো উজ্জ্বল আলো ছড়াত, সে সন্ধ্যায় তেমন ছড়ায়নি। যেহেতু বেশির ভাগ অতিথি পরের দিন দুপুরের পরই চলে যাবেন, কনফারেন্স উপলক্ষে দ্বিতীয় এবং শেষ ডিনারে আগের কয়েক দিনের রক্ষণশীল আচরণ আর বজায় রাখার দরকার মনে করলেন না তাঁরা। তাঁদের কথাবার্তা শুধু বাধাহীন আর উচ্চৈঃস্বরের হলো না, আমরাও খেয়াল করে দেখলাম, মদ পরিবেশনের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। পেশাগত তেমন কোনো সমস্যা ছাড়াই ডিনার পর্ব শেষের দিকে নিয়ে আসতে পারলাম আমরা। ডিনারের শেষে লর্ড ডার্লিংটন দাঁড়ালেন অতিথিদের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য।

উপস্থিত সবার প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। গত দুই দিনের আলোচনা প্রাণপ্রাচুর্যপূর্ণ, মুক্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ আবহে শেষ হয়েছে এবং সবার জন্য মঙ্গল বিরাজ করবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয়েছে; এ জন্য তিনি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। দুই দিনে তাঁর প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ঐক্য দেখতে পেয়েছেন সবার মধ্যে। তিনি আশা করেন সকালের সমাপ্তি পর্বও সবার প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হবে; সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আগেই তাঁরা প্রত্যেকে কে কী করবেন সে সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি থাকবে। এ পর্যায়ে লর্ড ডার্লিংটন তাঁর প্রয়াত বন্ধু হার হাইনজ ব্রেমানের কথা স্মরণ করলেন। অবশ্য এ প্রসঙ্গ তিনি আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন কি না জানি না। প্রসঙ্গটাতে তাঁর অন্তরের ছোঁয়া থাকায় তিনি কোনো এক পর্যায়ে সেটা সবিস্তারে ব্যক্ত করতে চেয়েছিলেন। বলা দরকার, জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার স্বভাবগত গুণ কিছু মানুষের থাকে; লর্ড ডার্লিংটন তাঁদের মতো ছিলেন না। তাঁর কথা বলার সময় দর্শকদের ওই সব অস্থিরতার মৃদু শব্দ রুমের মধ্যে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। শেষে তিনি অতিথিদের উঠে ইউরোপের শান্তি ও ন্যায়বিচারের নামে পান করতে বলেন।

শেষে আতিথিরা আবার আসন গ্রহণ করেন এবং আলোচনা আবার শুরু হয়। এ সময় কাঠের টেবিলে আঙুলের উল্টো পিঠের কর্তৃত্ব জাহির করার মতো আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। এম দুপোঁ উঠে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে রুমের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। বিশিষ্ট ভদ্রলোক অনেকটা কঠিন চোখে তাকান তাঁর টেবিলের চারপাশে। তারপর তিনি বলা শুরু করেন : দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উপস্থিত আছেন। তবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বে আমি অযাচিতভাবে উপস্থিত হচ্ছি না। কিন্তু এ পর্যন্ত আমাদের আতিথ্যকর্তা বিশেষভাবে সম্মানিত সদয় লর্ড ডার্লিংটনের নামে কেউ সুখ-সাফল্য কামনা করলেন না। শ্রোতাদের মধ্যে অনুমোদনের বিড়বিড় শব্দ ওঠে। এম দুপোঁ আবার শুরু করেন, গত কয়েক দিনে অনেক আকর্ষণীয় বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরপর তিনি থামলেন এবং রুমের ভেতরে চূড়ান্ত স্থিরতা নেমে এলো।

এবার আবার শুরু করলেন : অনেক কিছুর সরাসরি কিংবা পরোক্ষে সমালোচনা হয়েছে। সমালোচনা শব্দটা খুব বেশি শক্ত কোনো কথা নয়। আমার দেশের বিদেশনীতির সমালোচনা করা হয়েছে। তিনি আবার থামলেন। এবার তাঁর চাহনি আরেকটু কঠিন মনে হলো। যা-ই হোক, বলে তিনি একটা আঙুল তুললেন, এখন এ রকম বিতর্কে যাওয়ার সময় নয়। আসলে এই কয়েক দিন ইচ্ছা করেই আমি এ রকম বিতর্কে জড়ানো থেকে বিরত থেকেছি। কারণ আমি এসেছি প্রধানত শুনতে। কাজেই আমি বলতে চাই, এখানে কিছু যুক্তিতর্ক শুনে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু কতটা মুগ্ধ হয়েছি, আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন। তার ওপরে দৃষ্টি ফেলে রাখা প্রতিটি মুখের ওপর দিয়ে আস্তে-ধীরে বিচরণ করে নেয় এম দুপোঁর নিজের দৃষ্টি। তারপর তিনি বলেন, ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, মাফ করবেন, এসব বিষয়ে অনেক চিন্তা করে দেখেছি এবং এখানে আপনাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে চাই, ইউরোপে বর্তমানে যা যা ঘটছে সেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে এখানে উপস্থিতজনদের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও এখানে উত্থাপিত প্রধান আলোচ্য বিষয়ে বিচারক্ষমতা ও বাস্তবতাবোধ সম্পর্কে একমত। তাঁর টেবিলের চারপাশ থেকে স্বস্তি ও বিজয়ের গুঞ্জন উঠল এবার। তবে এম দুপোঁ এবার তাঁর কণ্ঠ একটু চড়ালেন, এখানে আপনারা যাঁরা উপস্থিত আছেন সবাইকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এখানকার আলোচনার সঙ্গে মিল রেখে ফরাসি নীতিতে কিছু পরিবর্তনের জন্য আমার সাধ্যের মধ্যে মোটামুটি প্রভাব ফেলার মতো চেষ্টা করব। আর সময়মতো সুইস কনফারেন্সের জন্য একই রকম চেষ্টা করব।

মৃদু করতালির ঢেউ বয়ে যায়। আমি দেখতে পাই, লর্ড ডার্লিংটন স্যার ডেভিডের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করেন। এম দুপোঁ হাত উঁচু করে ধরেন, তবে করতালির সমর্থন দিয়ে, নাকি করতালি থামানোর জন্য, বুঝতে পারি না।

এম দুপোঁ আবার শুরু করেন, তবে আমাদের আতিথ্যকর্তা লর্ড ডার্লিংটনকে ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়ার আগে আমার বুক থেকে ছোট একটা জিনিস নামিয়ে হালকা হতে চাই। আপনাদের কারো কারো মতে ডিনার টেবিলে বুক থেকে কিছু নামিয়ে হালকা হওয়াটা ভালো আচরণের লক্ষণ না-ও হতে পারে। তাঁর এই কথায় শ্রোতাদের মধ্যে কৌতূহলী হাসি ছোটে। তিনি বলে যান, যা-ই হোক, এসব বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলা পছন্দ করি। লর্ড ডার্লিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এবং সবার সামনে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হবে; তিনি এখানে আমাদের সবাইকে একত্রিত করেছেন এবং আমাদের মধ্যে ঐক্য আর সদিচ্ছার মানসিকতা তৈরি করেছেন। অন্যদিকে যদি কেউ আতিথ্যকর্তার আতিথেয়তার অপব্যবহার করে তাঁর শক্তি খরচ করে আমাদের মধ্যে অসন্তোষ আর সন্দেহের বীজ বুনতে এসে থাকেন, তাঁকে খোলাখুলি নিন্দা জানাতে হবে।

তাঁর বক্তব্যের সময় এম দুপোঁ একবারও মি. লিউসের দিকে তাকাননি। আর সবাই দাঁড়িয়ে লর্ড ডার্লিংটনের উদ্দেশে শুভ কামনা জানিয়েছেন এবং নিজেদের আসনে বসে পড়েছেন। মনে হচ্ছে, সবাই ইচ্ছা করে সচেতনভাবে আমেরিকান ভদ্রলোকের দিকে তাকানো বাদ দিয়েছেন। একমুহূর্তের জন্য অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। শেষে মি. লিউস দাঁড়ালেন। সচরাচর যেমন হাসেন তেমন মিষ্টি হাসি আছে তাঁর মুখে।

প্রত্যেকেই যেহেতু বক্তব্য দিচ্ছেন, আমিও একটু সুযোগ নিতে পারি, বলে তিনি শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠ শুনে বোঝা গেল, তাঁর অনেক বেশি মাত্রায় পান করার দরকার হয়েছিল। আমাদের ফরাসি বন্ধু যেসব অর্থহীন কথা উচ্চারণ করলেন সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। শুধু তাঁর কথাগুলো সংক্ষেপে নাকচ করে দিলাম। অনেকেই অনেকবার প্রতারণার মাধ্যমে কিছু কিছু বিষয় চাপানোর চেষ্টা করেছেন; ভদ্রমহোদয়গণ, তাঁদের নগণ্যসংখ্যকই শুধু সফল হয়েছেন। নগণ্যসংখ্যক সফল হয়েছেন, বলে থেমে গেলেন তিনি। মনে হলো, কথা খুঁজে পাচ্ছেন না; কিভাবে এগোবেন বুঝতে পারছেন না। তারপর আবার একটু হাসলেন এবং শুরু করলেন : আমাদের ফরাসি বন্ধুর কথার রেশ ধরে সময় নষ্ট করতে চাইছি না। তবে আমার একটা বিষয়ে কিছু বলার আছে। আমরা এখন সবাই খোলাখুলি কথা বলছি। আমিও তাহলে সেভাবেই বলি। ভদ্রমহোদয়গণ, মাফ করবেন, আপনারা সবাই হলেন একদল সহজ-সরল স্বাপ্নিক। পৃথিবীকে যেসব বিষয় প্রভাবিত করে তেমন বড় বড় কিছু বিষয়ে যদি আপনারা মাথা না ঘামাতেন তাহলে আপনারা চমৎকার মুগ্ধকরই থাকতেন। আমার সুন্দর আতিথ্যকর্তার কথাই ধরা যাক। তিনি কে? তিনি একজন নিপাট ভদ্রলোক। এখানে উপস্থিত কেউই সে কথা অস্বীকার করবেন না। তিনি একজন ক্লাসিক ইংরেজ ভদ্রলোক। সভ্য, সৎ, তাঁর কাজকর্মের উদ্দেশ্যও সৎ। কিন্তু লর্ড সাহেব এখানে একটা বিষয়ে অপেশাদার। মি. লিউস থামলেন এবং টেবিলের চারপাশে তাকালেন। এরপর আবার শুরু করলেন : তিনি একজন অপেশাদার; আন্তর্জাতিক বিষয়-আশয় আর ভদ্রলোক অপেশাদারদের জন্য নয়। আপনারা ইউরোপের লোকেরা এ সত্যটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন তত ভালো। আপনারা অপেশাদার ভদ্রলোকেরা, সভ্য মানুষেরা আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন প্লিজ—আপনাদের চারপাশের জগৎ কেমন স্থানে পরিণত হচ্ছে সে বিষয়ে আপনাদের কোনো ধারণা আছে? আপনাদের মহান প্রবৃত্তি নিয়ে কাজ করার দিন শেষ। এ কথা  শিগগিরই না বুঝলে আপনাদের সামনে বিপর্যয় আছে। ভদ্রমহোদয়গণ, শুভ কামনা। পেশাদারির জন্য শুভ কামনা।

বিমূঢ় নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। কেউ নড়াচড়া করলেন না। মি. লিউস কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিয়ে তাঁর গ্লাসটা ওপরের দিকে তুলে পানীয়টুকু গলায় চালান দিয়ে বসে পড়লেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লর্ড ডার্লিংটন উঠে দাঁড়ালেন।

লর্ড ডার্লিংটন বলা শুরু করলেন : আমাদের এই সর্বশেষ সান্ধ্য আয়োজনে কোনো রকম বিবাদে জড়ানোর ইচ্ছা নেই আমার। এ অনুষ্ঠান আমাদের বিজয় আর আনন্দের অনুষ্ঠান। আপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, মি. লিউস, দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করার সময় মনে রাখা দরকার, সেটা যেন এতটাই একপেশে না হয়ে যায়, যাতে খ্যাপাটে লোকের লোক-দেখানো সস্তা বক্তব্য হয়ে পড়ে। এবারে আসল কথায় আসি, আপনি অপেশাদারি বলতে যা বুঝিয়েছেন আমরা এখানে সবাই সেটাকে সম্মান বলি।

তাঁর কথা শুনে শ্রোতারা সম্মতি প্রকাশ করে একযোগে শাবাশ শাবাশ বলে করতালি দিতে থাকেন।

তিনি আবার শুরু করেন : তারপর আরো বলছি, আপনি যেটাকে পেশাদারি বলেছেন, আমার বিশ্বাস সে বিষয়েও আমার ধ্যানধারণা আছে। আপনার মতে, এই গুণ মানে হলো প্রতারণার মাধ্যমে কিংবা কাউকে কৌশলে ব্যবহার করে সিদ্ধি লাভ করা। তার মানে লোভ এবং সুবিধা অনুযায়ী কারো প্রাধান্য বজায় রাখা, পৃথিবীতে মঙ্গল ও ন্যায়ের অস্তিত্ব দেখার মতো কোনো ইচ্ছা বলতে যা বোঝায় তা নয়। স্যার, পেশাদারি বলতে আপনি যদি এ রকমই বুঝিয়ে থাকেন তাহলে এই গুণের জন্য আমার কোনো রকম মাথাব্যথা নেই, এটা অর্জনের কোনো ইচ্ছাও আমার নেই।

শ্রোতারা সর্বোচ্চ শব্দে সমর্থন দেন লর্ড ডার্লিংটনের কথায়। তারপর ধীর ও উষ্ণ সমর্থন আসে। আমি দেখলাম, মি. লিউস তাঁর মদের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে হাসছেন এবং ক্লান্তভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। এই মুহূর্তে প্রথম টের পেলাম, প্রথম খানসামা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ফিসফিস করে বলল, মিস কেন্টন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান, স্যার। তিনি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে বের হলাম। লর্ড ডার্লিংটন তখনো দাঁড়িয়ে আছেন। আরেকটা বিষয়ের দিকে যাচ্ছেন। মিস কেন্টনকে খানিকটা বিপর্যস্ত দেখা গেল। তিনি বললেন— মি. স্টিভেনস, আপনার বাবার অবস্থা বেশি খারাপের দিকে চলে গেছে। আমি ড. মেরেডিথকে ডেকেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি, তাঁর আসতে কিছুটা দেরি হবে। আমাকে মনে হয় খানিক দ্বিধান্বিত দেখা গেল। কারণ মিস কেন্টন তখন বললেন—মি. স্টিভেনস, তাঁর অবস্থা আসলেই খুব খারাপ। আপনার এসে তাঁকে দেখা উচিত।

আমার হাতে একমুহূর্ত সময় আছে। ভদ্রলোকেরা যেকোনো মুহূর্তে ধূমপানের রুমে ঢুকতে পারেন।

অবশ্যই, কিন্তু মি. স্টিভেনস, আপনাকে এখনই আসতে হবে। না হলে পরে আফসোস করতে হবে।

মিস কেন্টন ততক্ষণে এগিয়ে যাওয়া শুরু করেছেন। তারপর আমরা দ্রুত আমার বাবার চিলেকোঠার ছোট রুমে পৌঁছে গেলাম। বাবুর্চি মিসেস মর্টিমার বাবার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পরনে তখনো অ্যাপ্রন।

আমাদের ঢোকার মুহূর্তে তিনি বললেন—ওহ্, মি. স্টিভেনস, উনার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে।

আসলেই আমার বাবার মুখ ফ্যাকাসে লালচে হয়ে গেছে। কোনো জীবিত মানুষের মুখের রং এ রকম দেখিনি। আমার পেছনে দাঁড়ানো মিস কেন্টনকে বলতে শুনলাম, উনার পালস খুব দুর্বল। একমুহূর্তের জন্য বাবার মুখের দিকে তাকালাম, কপালে আস্তে করে হাত রাখলাম। তারপর হাত সরিয়ে আনলাম।

মিসেস মর্টিমার বললেন, আমার মনে হয়, উনি স্ট্রোক করেছেন। আমি এ রকম দুজনকে দেখেছি এবং আমার মনে হয় উনার স্ট্রোক হয়েছে। কথাগুলো বলেই তিনি কান্না শুরু করলেন। খেয়াল করলাম, তাঁর গা থেকে চর্বি আর রোস্ট রান্নার কড়া গন্ধ আসছে। আমি মিস কেন্টনের দিকে ঘুরে তাঁকে বললাম, খুব কষ্টের অবস্থা। তবু আমাকে নিচের দিকে যেতে হবে।

অবশ্যই, মি. স্টিভেনস, ডাক্তার এলে কিংবা অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলে আমি আপনাকে খবর দেব।

ধন্যবাদ, মিস কেন্টন।

আমি দ্রুত নিচে নেমে এলাম। দেখলাম ভদ্রমহোদয়গণ ধূমপানের রুমের দিকে যাচ্ছেন। আমাকে দেখে খানসামারা স্বস্তি পেল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের যার যার অবস্থানে যাওয়ার সংকেত দিয়ে দিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে ডাইনিংরুমে যা-ই হয়ে থাক না কেন অতিথিদের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ দেখতে পেলাম। ধূমপানের রুমের সবখানে অতিথিরা গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে গল্প করছেন, হাসছেন, একে অন্যের কাঁধে চাপড় মারছেন। যতটুকু মনে করতে পারছি, মি. লিউস তখন আর তাঁদের মধ্যে নেই। আমি অতিথিদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে ট্রে হাতে এগিয়ে যাচ্ছি; আমার ট্রেতে এক বোতল পোর্ট। আমি একজনের খালি গ্লাস ভরে দিয়েছি মাত্র, তখনই আমার পেছনে একজনের কণ্ঠ শুনতে পেলাম—মি. স্টিভেনস, আপনি তো বলেন, মাছ সম্পর্কে আপনার আগ্রহ আছে।

তাকিয়ে দেখি, নবীন মি. কার্ডিনাল। আমার দিকে তাকিয়ে খুশিতে জ্বলজ্বল করছেন। আমিও হাসলাম এবং বললাম—মাছ, স্যার?

ছোটবেলায় আমি একটা ট্যাংকে উষ্ণমণ্ডলীয় সব রকম মাছ রাখতাম। সেটা ছোটখাটো একটা অ্যাকোয়ারিয়াম ছিল। আচ্ছা, মি. স্টিভেনস, আপনি ঠিক আছেন তো?

আমি আবার হাসলাম, পুরোপুরি ঠিক আছি। ধন্যবাদ, স্যার।

আপনি যে রকম বললেন, আসলেই আমার এখানে বসন্তে আসা উচিত। ডার্লিংটন হল নিশ্চয় তখন খুব চমৎকার দেখাবে। আগেরবার এখানে এসেছিলাম যখন, সেটাও শীতকালই ছিল। আবারও বলছি, মি. স্টিভেনস, সত্যিই আপনার কিছু হয়নি তো?

একেবারে ঠিক আছি, স্যার।

খারাপ লাগছে না তো?

মোটেই না, স্যার। একটু এদিকটায় যাই, স্যার।

অতিথিদের আরো কয়েকজনের পোর্ট ঢেলে দিতে এগিয়ে যাই। আমার পেছনে জোরে হাসির শব্দ শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখি, বেলজিয়ামের যাজক মহাশয় আবেগী কণ্ঠে বলছেন, সেটা তো প্রচলিত কথা, ইতিবাচক প্রচলিত কথা। তারপর তিনি নিজেই জোরে জোরে হাসলেন। আমার কনুইয়ে কারো ছোঁয়া অনুভব করে পেছনে তাকিয়ে দেখি লর্ড ডার্লিংটন নিজে।

তিনি বললেন—স্টিভেনস, তুমি ঠিক আছ তো?

ঠিক আছি, স্যার। একেবারে ঠিক।

কিন্তু মনে হচ্ছে, তুমি কাঁদছ!

আমি হাসার চেষ্টা করে রুমাল বের করে তাড়াতাড়ি মুখ মুছে ফেলে বললাম—দুঃখিত, স্যার। ব্যস্ত দিনের ধকল।

হ্যাঁ, সত্যিই কঠিন পরিশ্রম যাচ্ছে।

কে যেন তাঁকে ডাক দিল এবং তিনি সাড়া দিতে ওই দিকে ঘুরলেন। ট্রে হাতে রুমের ভেতরে আরো এগিয়ে যাচ্ছিলাম প্রায়, তখন খোলা দরজায় মিস কেন্টনকে দেখলাম। আমাকে ইশারায় ডাকছেন। আমি দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম; কিন্তু দরজায় পৌঁছার আগেই এম দুপোঁ আমার হাত চেপে ধরলেন।

তিনি বললেন—বাটলার, দেখো তো, আমার জন্য নতুন ব্যান্ডেজের ব্যবস্থা করতে পারো কি না। পায়ের অবস্থা আবার অসহ্য হয়ে গেছে।

অবশ্যই, স্যার।

আমি দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করতে পারি, এম দুপোঁ আমার পেছন পেছন আসছেন। তাঁর দিকে ফিরে আমি বলি, আমি এসেই আপনাকে খুঁজে নেব, স্যার। এই একটু পরেই, কাজটা সেরে আসছি।

প্লিজ, তাড়াতাড়ি এসো, বাটলার। আমার খুব ব্যথা হচ্ছে।

ঠিক আছে, স্যার। দুঃখিত, স্যার।

মিস কেন্টন তখনো হলরুমে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাঁকে প্রথম দেখেছি। আমি তাঁর সামনে পৌঁছলে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে তেমন তাড়া দেখতে পেলাম না। তারপর তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন—মি. স্টিভেনস, আমি খুব দুঃখিত। আপনার বাবা আর নেই। প্রায় চার মিনিট আগে তিনি চলে গেছেন।

বুঝতে পারছি।

তিনি নিজের হাতের দিকে তাকালেন, তারপর আমার মুখের দিকে। মি. স্টিভেনস, আমি খুব দুঃখিত। আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।

দরকার নেই, মিস কেন্টন।

ড. মেরেডিথ এখনো আসেননি। কথাগুলো বলার পর তিনি মাথা নিচু করলেন। বুঝলাম, কান্না চাপা দিতে পেরেছেন। তারপর তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, আপনি কি ওপরে এসে উনাকে দেখবেন?

এই মুহূর্তে আমি খুব ব্যস্ত। একটু পরে আসতে পারব হয়তো।

তাহলে আপনি কি আমাকে উনার চোখ বন্ধ করে দেওয়ার অনুমতি দেবেন?

মিস কেন্টন, আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে লাগলেন। কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, এই মুহূর্তে আমার বিদেহী বাবাকে দেখার জন্য ওপরে আসতে পারছি না বলে আমাকে অযথা অশোভন ভাববেন না। আপনি জানেন, এ রকম মুহূর্তে দায়িত্ব পালন করে যেতেই বলতেন আমার বাবা।

অবশ্যই, মি. স্টিভেনস।

দায়িত্ব পালন না করা মানে তাঁকে ছোট করা।

অবশ্যই, মি. স্টিভেনস।

আমি ফিরলাম। তখনো আমার হাতে পোর্টের বোতলওয়ালা ট্রে। তারপর ধূমপানের রুমে ঢুকলাম। রুমটা অপেক্ষাকৃত ছোট; সেখানে কালো জ্যাকেটের জঙ্গলের মধ্যে সাদা মাথা আর চুরুটের গন্ধ ভরে আছে। ভদ্রলোকদের ভিড়ের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে যেতে কার গ্লাস খালি আছে দেখছিলাম। আমার কাঁধে টোকা দিয়ে এম দুপোঁ বললেন—বাটলার, আমার ব্যান্ডেজের কী ব্যবস্থা হলো, দেখেছ?

আমি দুঃখিত, স্যার। তবে ঠিক এই মুহূর্তে কোনো কিছু থেকেই সহযোগিতা পাচ্ছি না।

বলো কী, বাটলার? তোমার মৌলিক মেডিক্যাল সরবরাহ শেষ হয়ে গেল!

ঘটনাক্রমে, স্যার, ডাক্তার রাস্তায় আছেন।

আহ্, বাঁচালে। খুব ভালো। তুমি ডাক্তার ডেকেছ?

জি, স্যার।

ভালো ভালো।

এম দুপোঁ তাঁর কথাবার্তা আবার শুরু করলেন এবং আমি আরো কয়েক মুহূর্ত রুমের ভেতরে আমার কাজ চালিয়ে গেলাম। একসময় জার্মান কাউন্টেস ভদ্রমহোদয়দের ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন এবং আমি তাঁর গ্লাসে পোর্ট ঢেলে দেওয়ার আগেই তিনি নিজে ঢেলে নিলেন।

তিনি বললেন—স্টিভেনস, আমার পক্ষে বাবুর্চিকে শুভেচ্ছা দিয়ে দিয়ো।

অবশ্যই, ম্যাডাম। ধনবাদ, ম্যাডাম।

তুমি নিজে এবং তোমার দলের সবাই খুব ভালো করেছ।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম।

আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ডিনারের একটা পর্যায়ে দেখলাম, তুমি একাই তিনজনের কাজ করছ, বলেই তিনি হাসলেন।

আমিও সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললাম, আপনাদের সেবা করতে পেরে আমি খুব আনন্দিত, ম্যাডাম।

একমুহূর্ত পরে দেখলাম, মি. কার্ডিনাল জুনিয়র একা দাঁড়িয়ে আছেন। খুব বেশি দূরে নয়। মনে হলো, বর্তমান মুহূর্তের জমায়েতের সামনে কিছুটা শঙ্কায় আছেন। তাঁর গ্লাসও ফাঁকা দেখে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার আসা দেখে তিনি খুব উত্ফুল্ল হলেন এবং তাঁর গ্লাস এগিয়ে ধরলেন।

আমি তাঁর গ্লাসে যখন পোর্ট ঢেলে দিচ্ছি, তিনি বললেন, আপনি একজন প্রকৃতিপ্রেমিক; এটা তো নিশ্চয় একটা প্রশংসার বিষয়। আমি সাহস করে বলতে পারি, লর্ড ডার্লিংটনের জন্য একটা বড় সুবিধা হলো, মালির কাজকর্মের ওপর নজর রাখার জন্য আপনার মতো একজন বিশেষজ্ঞ পেয়েছেন।

স্যরি, স্যার। বুঝতে পারছি না।

প্রকৃতি, স্টিভেনস। আমরা সেদিন প্রাকৃতিক জগতের বিস্ময় নিয়ে কথা বলছিলাম। আপনার সঙ্গে একমত, আমরা অতিমাত্রায় আত্মতুষ্ট, আমাদের চারপাশে মহান সব বিস্ময় আছে; সেগুলো দেখার সময় ও মানসিকতা আমাদের নেই।

জি, স্যার।

মানে আমরা এত সব বিষয় নিয়ে এত কথা বলছি; চুক্তি, সীমানা, ক্ষতিপূরণ, দখল—এসব। কিন্তু প্রকৃতি মা তার নিজের মতো চলে। ভাবলে মজার মনে হয় না?

অবশ্যই, স্যার।

আমার মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা যদি আমাদের গাছপালার মতো করে সৃষ্টি করতেন তাহলে কেমন হতো! বুঝতে পারতেন তাহলে আমরা সবাই মাটিতে অটল হয়ে থাকতাম। তখন এই যে এসব যুদ্ধ, সীমানা—এগুলো আর প্রাধান্য পেত না।

নবীন ভদ্রলোক মনে হলো এ রকম চিন্তা করতে পেরে মজা পাচ্ছেন। তিনি জোরে হেসে উঠলেন। তারপর চিন্তা আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলে আরো মজা পেলেন, আরো হাসলেন। তারপর তিনি কনুই দিয়ে আমাকে মৃদু স্পর্শ করে বললেন, কল্পনা করতে পারেন, স্টিভেনস? তারপর আবার হাসলেন।

আমিও হাসতে হাসতে বললাম, ঠিক, স্যার। সেটা দারুণ একটা বিকল্প হতো।

তবে আপনার লোক দরকার হতো বিভিন্নজনের বার্তা আনা-নেওয়া, চা দেওয়া এবং ওই রকম কাজ করার জন্য। না হলে কাজকর্ম আমরা কিভাবে করে নিতাম? কল্পনা করতে পারেন, স্টিভেনস? আমরা সবাই মাটিতে গাছের মতো আটকে আছি। কল্পনা করে দেখুন তো!

তখন দেখি একজন খানসামা এসে দাঁড়িয়েছে আমার পেছনে। সে জানাল, মিস কেন্টন আপনার সঙ্গে একটা কথা বলতে চান, স্যার।

আমি মি. কার্ডিনালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এম দুপোঁ। আমি এগিয়ে গেলে তিনি বললেন—বাটলার, ডাক্তার কি এখানে আছেন?

আমি এখনই যাচ্ছি তাঁকে খুঁজতে। একমুহূর্তও লাগবে না।

আমার পায়ে ব্যথা হচ্ছে।

আমি খুব দুঃখিত, স্যার। ডাক্তারের দেরি হওয়ার কথা নয়।

এবার এম দুপোঁ দরজার বাইরে চলে এলেন আমার পিছে পিছে। মিস কেন্টন আরেকবার হলরুমে দাঁড়িয়ে আছেন।

মিস কেন্টন বললেন—মি. স্টিভেনস, ড. মেরেডিথ এসে ওপরে গেছেন।

তিনি নিচু স্বরে কথা বলেছেন। কিন্তু আমার ঠিক পেছনে থাকার কারণে এম দুপোঁ তাঁর কথা শুনে ফেলেছেন। তিনি জোরে বলে উঠলেন—আহ্, ভালো হয়েছে!

আমি তাঁর দিকে ফিরে বললাম, আপনি যদি দয়া করে আমার পিছে পিছে আসেন, স্যার।

আমি তাঁকে বিলিয়ার্ড রুমে নিয়ে গেলাম। সেখানে আমি আগুনে আরো কয়লা দিলাম। তিনি একটা চামড়ার চেয়ারে বসলেন। তারপর জুতা খুলতে লাগলেন।

আমি দুঃখিত, স্যার। এখানে ঠাণ্ডা একটু বেশি। ডাক্তার আসতে খুব দেরি হবে না।

ধন্যবাদ, বাটলার। ভালো করেছ।

মিস কেন্টন তখনো আমার জন্য হলরুমে অপেক্ষা করছেন। আমরা নীরবে ওপরে উঠতে লাগলাম। ওপরে গিয়ে দেখি, ড. মেরেডিথ কী কী যেন লিখছেন। মিসেস মর্টিমার হাউমাউ করে কাঁদছেন। তখনো তাঁর পরনে অ্যাপ্রন। অ্যাপ্রন দিয়ে তিনি অশ্রু মুছছেন। সে জন্য তাঁর সারা মুখে আঠালো দাগ লেগে গেছে। তাঁকে দেখা যাচ্ছে চারণদলের কোনো সদস্যের মতো। আমি ভেবেছিলাম, রুমের ভেতরে মৃত্যুর গন্ধ পাব। কিন্তু মিসেস মর্টিমার কিংবা তাঁর অ্যাপ্রনের কারণে রুমের ভেতরটা ভরে আছে রোস্টের গন্ধে।

ড. মেরেডিথ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তোমাকে সমবেদনা জানাচ্ছি, স্টিভেনস। কঠিন স্ট্রোক করেছিলেন তিনি। তোমার স্বস্তির জন্য বলছি, তিনি খুব বেশি কষ্ট ভোগ করেননি। তাঁকে বাঁচানোর জন্য কিছু করার ছিল না।

ধন্যবাদ, স্যার।

আমাকে এখনই বের হতে হবে। বাকি সব ব্যবস্থা করে নিয়ো, ঠিক আছে?

ঠিক আছে, স্যার। আরেকটা কথা, স্যার, একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক নিচে অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য। যদি একটু দেখে যান।

জরুরি?

আপনার সঙ্গে দেখা করার তাঁর আকূল ইচ্ছা, স্যার।

আমি ড. মেরেডিথকে নিচে বিলিয়ার্ড রুমে পৌঁছে দিয়ে তাড়াতাড়ি ধূমপানের রুমে ফিরে গেলাম। ওখানকার পরিবেশ আরো উল্লাসমুখর হয়ে উঠেছে।

অবশ্য আমার পক্ষে এ রকম ইঙ্গিত করাও মানায় না, মি. মার্শাল কিংবা মি. লেইনের মতো আমাদের প্রজন্মের মহান বাটলারদের কারো পাশে আমাকে স্থান দেওয়া যেতে পারে। অবশ্য এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা বেভুল উদারতায় এ রকম ভেবে থাকেন। তাহলে আরো পরিষ্কার করে বলি, যখন আমি বলি ১৯২৩ সালের কনফারেন্স এবং বিশেষ করে সেই রাত আমার পেশাগত উন্নয়নে ক্রান্তিলগ্ন তৈরি করেছে, তখন আসলে আমার নিজের অতি সাধারণ মানদণ্ডের নিরিখে বলে থাকি। এমনকি আপনারা যদি সে রাতে আমার ওপরে পতিত আকস্মিক চাপের কথা বিবেচনা করেন, তাহলে মনে হয় না, আমি নিজের সঙ্গে অযথা প্রতারণা করেছি, বলতে পারবেন, বিশেষ করে যদি আমি এ রকম ইঙ্গিত দিয়ে থাকি যে পরিস্থিতির মুখে আমি সামান্য মাত্রায় হলেও মি. মার্শাল কিংবা কমপক্ষে আমার বাবার মতো ‘মর্যাদা’ প্রদর্শন করেছি। বাস্তবিক অর্থেই, আমি অস্বীকার করব কেন? দুঃখজনক সব অনুষঙ্গসহই সেই সন্ধ্যার কথা যখনই স্মরণ করি, বুঝতে পারি, আমি বিজয়বোধ নিয়েই স্মরণ করছি।

 

দ্বিতীয় দিন : বিকেল

মর্টিমার্স পন্ড, ডরসেট

 

‘মহান বাটলার’ বলতে কী বোঝায়? এই প্রশ্নটার চারপাশ থেকে পরীক্ষা করে দেখা দরকার বলে মনে হলো আমার। এ পর্যন্ত আমি এই প্রশ্নটা সম্পর্কে ভালো করে ভেবেই দেখিনি। বলতেই হবে, এ প্রসঙ্গে উপলব্ধি করার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতার অভিজ্ঞতা চলে আসে। কেননা আমার জন্য এত কাছের একটা বিষয় এটা। আমি এত বছর ধরে এই বিষয়েই কত চিন্তাভাবনা খরচ করেছি। কিন্তু আমার এখন মনে হচ্ছে, হায়েস সোসাইটির সদস্য পদ লাভের যেসব নিয়ম-কানুন আছে, সেগুলোর দু-চারটি বাদ দেওয়ার মধ্যে আমার তরফে খানিক তাড়াহুড়া করা হয়েছে। আরো পরিষ্কার করে বলি, ‘মর্যাদা’ সম্পর্কে আমার যেসব ধারণা আছে সেগুলোর ভেতর থেকে দু-চারটি প্রত্যাহার করার ইচ্ছা আমার মোটেও নেই। ‘মহানুভবতা’র সঙ্গেও মর্যাদার যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে সে বিষয়েও আমার নিজের কিছু ধারণা আছে। সেগুলোরও কোনো পরিবর্তন ঘটানোর ইচ্ছা আমার নেই। তবে হায়েস সোসাইটির অন্য একটা ঘোষণা সম্পর্কে আমার ভাবনা বেশ সজাগ হয়েছে, মানে ভর্তিসংক্রান্ত বিষয়ে। ভর্তির শর্তের মধ্যে একটা ছিল : আবেদনকারীর জন্য একটা পূর্বশর্ত হলো তাঁকে কোনো একটা সম্মানিত বা নামকরা হাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে। এই শর্তের প্রতি আমার আগেও যেমন অনুভূতি ছিল, এখনো তেমনই আছে : সোসাইটির পক্ষে এটা একটা অর্বাচীন এবং নাক উঁচু স্বভাব। যা-ই হোক, আমার মনে হয়, সম্ভবত ভর্তির শর্তের সাধারণ অর্থে যা বোঝানো হয়েছে তার চেয়ে সম্মানিত হাউস বলতে যা বোঝায় সেটাতেই যেকোনো মানুষের আপত্তি থাকতে পারে।

আসলে হায়েস সোসাইটি ‘একটি সম্মানিত হাউস’ বলতে যা বুঝিয়েছে আর আমি যা ব্যাখ্যা করতে পারি—তুলনা করলে এ দুইয়ের মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। মানে আমাদের প্রজন্মের বাটলার আর আমাদের পূর্বের প্রজন্মের বাটলারদের মধ্যে মূল্যবোধের পার্থক্য। এ কথা বলার সময় আমি অবশ্য বোাঝাতে চাইছি না, আমাদের প্রজন্মের বাটলারদের নাক উঁচু ভাবটা কম আছে। মানে, কার মনিব জমিদারি সম্প্রদায় থেকে এসেছে, আর কার মনিব ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে এসেছে—এ বিষয়ের প্রতি আমাদের হামবড়া ভাবটা কম নয়। আমি যে মন্তব্যটা করতে চাইছি সেটা মোটেও অন্যায় কিছু নয়; বলতে চাইছি, আমাদের প্রজন্ম অনেক বেশি আদর্শবাদী প্রজন্ম। আমাদের মুরব্বিদের কাছে বড় কথা ছিল, তাঁদের মনিবরা কত ‘বড় বংশের’ পরিচয় বহন করেন, কিংবা তাঁরা ‘পুরনো পরিবারের’ কেউ কি না। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখার বিষয় হলো, আমাদের মনিবদের ‘নৈতিক’ দায়দায়িত্বের পরিচয় বা প্রমাণ আছে কি না; তাঁদের নৈতিক অবস্থান কত উঁচুতে। এ কথায় আমি অবশ্য বোঝাতে চাইছি না যে আমাদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ নিয়ে আমরা ভাবনায় ডুবে থাকতাম। আমি বোঝাতে চাইছি, আমরা হলাম উচ্চাভিলাষী। এক প্রজন্ম আগেকার মানুষের কাছে এ রকম চিন্তাভাবনা অস্বাভাবিক মনে হয়ে থাকতে পারে। যাঁরা মানবতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এমন মনিবের সেবা করতে পারা আমাদের কাছে গর্বের মনে হলেও আগের প্রজন্মের বাটলারদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।

বাস্তবে, অবশ্য অভিজাত পরিবারের অনেক ভদ্রলোক বর্তমান সময়ের বড় বড় সমস্যা দূর করার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার পক্ষপাতী। সে জন্য একনজরে দেখা গেছে, আমাদের প্রজন্মের উচ্চাভিলাষ আমাদের আগের প্রজন্মের উচ্চাভিলাষের চেয়ে খুব বেশি আলাদা নয়। তবে হলফ করে বলতে পারি, মনোভাবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। একই রকম পেশার লোকদের একে অন্যের কাছে বলার সময় তাদের কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় এই পার্থক্য। আবার আমাদের সময়ের অনেক সামর্থ্যবান ব্যক্তিকেও এক পদবি ছেড়ে আরেক পদবিতে চলে যেতে দেখা যায়। এ রকমের পদবি বদল শুধু মজুরির কারণে হতে পারে, তা নয়। কারো অধীনের কর্মচারীদের সংখ্যা, কিংবা পারিবারিক নামের চাকচিক্য—এসবের কারণেও পদবি বদল করা হয়ে থাকে। আমাদের প্রজন্মের জন্য এমন কথা বলা যেতেই পারে : পেশাগত মর্যাদা খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে নিহিত আছে মনিবের নৈতিক যোগ্যতায়।

আমার বিশ্বাস, আমি শাব্দিক অর্থে না বুঝিয়ে অন্যভাবে খোলাসা করে বলতে পারি আন্ত প্রজন্মের পার্থক্যের কথা। বলতে চাই, আমার বাবার প্রজন্মের বাটলাররা জগেক দেখতে চাইতেন মইয়ের মতো ওপর-নিচ ধাপের চিত্রকল্পে। যেমন রয়াল পরিবার, ডিউকদের পরিবার, পুরনো পরিবারের লর্ড—এদের তাঁরা ধাপের একেবারে ওপরের দিকে রাখতেন। তারপর যাঁরা নতুন টাকাওয়ালা হয়েছেন তাঁদের আরো নিচের দিকে রাখতেন। তারপর মর্যাদার ধাপ নিচে যতই আসুক তাঁরা শুধু সম্পদের হিসাব থেকে ওই সব ধাপের মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করতেন। যেকোনো বাটলারই চেষ্টা করতেন যতটা পারা যায় মইয়ের ধাপের ওপরের দিকে থাকতে। মোটের ওপর যত ওপরের দিকের পরিবারে তিনি যেতে পারতেন তাঁর পেশাগত মর্যাদাও তত ওপরে উঠে যেত। হায়েস সোসাইটির বর্ণনায় ‘সম্মানিত পরিবার’ বলতে যা বুঝিয়েছে ঠিক সেটাই হলো আগের দিনের বাটলারদের মূল্যবোধের মাপকাঠির মূর্ত রূপ। ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এ রকম মূল্যবোধের কথাই তারা প্রচার করে আসছিল বলেই হায়েস সোসাইটির বিলুপ্তি অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

আমার ধারণা হলো, আমাদের প্রজন্ম একটা বিষয় প্রথম খেয়াল করে দেখতে পেয়েছে, যেটা আমাদের আগের কোনো প্রজন্মেরই নজরে আসেনি। সেটা হলো, বিশ্বের বড় বড় সিদ্ধান্ত আসলে জনসমক্ষের কোনো দপ্তরে কিংবা জনগণের চোখের সামনে এবং প্রচারমাধ্যমের দৃষ্টির সামনে সামান্য কয়েক দিনের সম্মেলনে গ্রহণ করা হয় না। বরং বিতর্ক চলতে থাকে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে এই দেশের অভিজাত হাউসগুলোর নিরিবিলি শান্ত পরিবেশের গোপনীয়তায়। ব্যাপক জাঁকজমক আর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনসমক্ষে যা দেখা যায় সেটা হলো, এ রকম অভিজাত কোনো হাউসের চার দেয়ালের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ কিংবা মাসের মধ্যে যা ঘটেছে তারই সমাপ্তি কিংবা অনুসমর্থন। আমাদের কাছে তাহলে বিশ্বজগৎ হলো চাকা। এসব অভিজাত হাউসই হলো নাভিগোলক, যাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এই চাকা। তাদের সিদ্ধান্তগুলো বাইরের বাকি সবার কাছে ছড়িয়ে পড়ছে : ধনী-দরিদ্র যারা চাকার চারপাশে ঘুরছে তাদের কাছে। আমাদের প্রজন্মের যাদের মনে পেশাগত উচ্চাভিলাষ ছিল তাদের প্রত্যেকেই এই নাভিগোলকের যতটা কাছাকাছি থাকা যায় চেষ্টা করেছে। কারণ আমরা হলাম একটা আদর্শ প্রজন্মের প্রতিনিধি।

কৌতূহলের বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত আমি এসব বিষয় নিয়ে তেমন ভেবে দেখিনি। সত্যিই, যদিও আমাদের গৃহকর্মীদের কোয়ার্টার্সে আগুনের পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি মি. গ্রাহামের মতো বিশিষ্ট গুণের অধিকারী হওয়ার কথা আলোচনা করে। তবে এত দিক নিয়ে কথা বলিনি কখনো। মর্যাদা সম্পর্কে আগে যা যা বলেছি সেসব কথা ফিরিয়ে না আনলে আমাকে একটা যুক্তি স্বীকার করে নিতে হবে, এ রকম গুণ কোনো বাটলার যতটুকুই অর্জন করে থাকুক না কেন, যদি তার অর্জনকে কাজে সঠিকভাবে প্রকাশ করে দেখাতে না পারে তাহলে তার সহকর্মীরা যে তাকে বিশিষ্ট বলে গণ্য করবে, সেটা তো আশা করতে পারবে না সে। নিশ্চিত করে বলা যায়, মি. মার্শাল কিংবা মি. লেইনদের মতো ব্যক্তি যাঁদের সেবা করেছেন তাঁদের নৈতিক উচ্চতা নিয়ে তো কোনো রকম প্রশ্ন উঠতেই পারে না।

এত বছর তো এ বিষয়টা নিয়ে এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। এ রকম একটা ভ্রমণে এসেছি বলেই মনে হয় সম্ভব, যে বিষয়ে অনেক দিন ধরেই আগাগোড়া গভীরে ভেবেছি বলে মনে হয়েছে, সে বিষয়ে তো এ রকম কোনো দৃষ্টিভঙ্গি আগে আমার মনে পড়েনি। এই ভ্রমণে এসেছি বলেই এই দিকগুলো চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে ভাবার অবকাশ তৈরি হচ্ছে। এ দিকগুলো নিয়ে ভাবার পেছনে উপলক্ষ হিসেবে কাজ করেছে ঘণ্টাখানেক আগে ঘটে যাওয়া ছোট ওই ঘটনা। সেটা আমাকে কিছুটা অস্থির করেও তুলেছে।

চমৎকার আবহাওয়ায় সকালে গাড়ি চালিয়ে এবং পল্লী এলাকার একটা পান্থশালায় সন্তুষ্টির সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে আমি এইমাত্র ডরসেটের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়েছি। ঠিক তখনই বুঝতে পারি, গাড়ির ইঞ্জিনের ভেতর থেকে একটা গরম গন্ধ বের হচ্ছে। আমার মনিবের ফোর্ড গাড়িটার কোনো ক্ষতি করে ফেললাম—এই চিন্তা আমার ভেতরে প্রচণ্ড ভয় জাগিয়ে দেয় বলে গাড়িটা এক জায়গায় থামাই।

দেখতে পাই, আমি একটা সরু গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছি। দুই পাশের গাছপালার পাতা ঘন হয়ে নেমে এসেছে বলে চারদিকে কিছু দেখতে পারছি না। কোথায় আছি বুঝতে পারছি না। সামনেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। গলিটা বিশ গজের মতো সামনে হঠাৎ করেই বাঁক নিয়েছে। আমার আশঙ্কা জাগতে থাকে, এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। কারণ অন্য কোনো যানবাহন এসে আমার মালিকের ফোর্ডটাকে ধাক্কা দিতে পারে। অবহেলায় নিজের ওপরে বিপদ ডেকে আনার দরকার নেই। আবার ইঞ্জিন চালু করি এবং দেখতে পাই, গন্ধটা আগের মতো অতটা জোরালো নয়। তারপর কিছুটা স্বস্তি পাই।

বুঝতে পারি, আমার এখন প্রধান কাজ হলো একটা গ্যারেজ খুঁজে বের করা কিংবা কোনো ভদ্রলোকের একটা বড় বাড়ির খোঁজ করা, যেখানে একজন ড্রাইভার পাওয়ার খুব জোর সম্ভাবনা আছে। সে আমার গাড়ির কী সমস্যা হয়েছে বুঝতে পারবে। তবে গলিটা বেশ কিছুদূর আঁকাবাঁকা হয়েই এগিয়েছে, দেখছি। আমার দুই পাশের উঁচু ঝোপঝাড়ের কারণে আশপাশে ভালো করে দেখতে পারছি না। যদিও কয়েকটা গেট পার হয়ে এসেছি এবং গেট থেকে ভেতরের দিকে গাড়ি ঢোকার রাস্তাও চোখে পড়েছে, তবু আমি বাড়িগুলোর চেহারাই ভালো করে দেখতে পারিনি। আরো আধামাইলের মতো এগিয়ে যাই। সামনে একটা খোলা রাস্তা দেখতে পাই। ততক্ষণে গাড়ির ভেতরের কড়া গন্ধটা আরো বেশি মাত্রায় বের হচ্ছে, মনে হয়। এবার সামনের দিকে বেশ দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি; সামনে আমার বাঁ পাশে একটা ভিক্টরিয়ান চেহারার বাড়ি দেখতে পাই। বাড়িটার সামনে বেশ লম্বা একটা লন আছে। আগেকার ঘোড়ার গাড়ি চলার একটা রাস্তা মোটরগাড়ি চলার মতো অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাড়িটার দিকে আরো এগিয়ে যেতে যেতে মূল বাড়ির সঙ্গে লাগানো গ্যারেজের খোলা দরজার ভেতর দিয়ে একটা বেন্টলে কম্পানির গাড়ি দেখতে পাই।

গেটটা খোলা পেয়ে আমার ফোর্ডটা ভেতরের দিকে খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যাই। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে যাই। দরজাটা খুলে দেয় একজন শার্ট পরা লোক, গলায় টাই নেই। তবে এ বাড়ির কোনো ড্রাইভারকে পাওয়া যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে লোকটা খুশি হয়ে জানায়, আমি একেবারে প্রথমবারে ঠিক ব্যক্তিকেই জিজ্ঞেস করেছি। আমার গাড়ির সমস্যার কথা শুনে আমার ফোর্ডের দিকে এসে বনেট খুলে কয়েক সেকেন্ড পরীক্ষা করে দেখে আমাকে জানায়, পানি লাগবে, জনাব। আপনার রেডিয়েটরে পানি লাগবে। গোটা পরিস্থিতি নিয়ে লোকটা আমোদেই আছে বলে মনে হলো। তবে সাহায্য করার মানসিকতাও আছে। বাড়ির ভেতর ফিরে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা জগে করে পানি আর একটা চুঙ্গি নিয়ে এলো। ইঞ্জিনের ওপর মাথা নিচু করে রেডিয়েটরে পানি ভরতে ভরতে আন্তরিক ভঙ্গিতে কথাবার্তাও বলতে লাগল। এই এলাকায় মোটর ভ্রমণে বের হয়েছি শোনার পর পরামর্শ দিল, আমি যেন এখানকার একটা স্থানীয় বিউটি স্পট দেখে যাই। জায়গাটা আধামাইলের মধ্যেই মূলত একটা পুকুর।

এরই মধ্যে বাড়িটা আরো ভালো করে দেখার সুযোগ পেয়েছি। যতটুকু জায়গাজুড়ে আছে তার তুলনায় বেশ উঁচু বাড়িটা। চারতলা বাড়ির সামনের পাশটা ঢালু ছাদের বাইরের অংশ পর্যন্ত আইভি লতায় ঘেরা। জানালার চেহারা থেকে বুঝতে পারলাম, অর্ধেকটা ধুলার আস্তরণে ভরে আছে। রেডিয়েটরে পানি ভরে বনেট বন্ধ করে তার মাথা ওঠানোর পর আমি বিষয়টা ইঙ্গিত করে লোকটার কাছে এ অবস্থার কারণ জানতে চাইলাম।

সে বলল, আসলেই একটা লজ্জার কথা। এটা পুরনো একটা সুন্দর বাড়ি। সত্যি কথা হলো, কর্নেল সাহেব এই জায়গাটা বিক্রি করে দিতে চাইছেন। এখন এত বড় বাড়ির দরকার নেই তাঁর।

বাড়ির কর্মচারীদের সংখ্যা জিজ্ঞেস না করে পারলাম না। সে যা বলল তাতে অবশ্য বিস্মিত হইনি আমি : সে নিজে এবং একজন বাবুর্চি—এই হলো স্টাফ। বাবুর্চি লোকটা সন্ধ্যার দিকে আসে। মনে হলো, সে একাই বাটলার, পরিচারক, ড্রাইভার এবং সব কিছু পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও তারই। লোকটা খুলে বলল, যুদ্ধের সময় সে কর্নেল সাহেবের ব্যাটম্যান ছিল। জার্মানরা যখন আক্রমণ করে তখন তারা বেলজিয়ামে ছিল। তারপর মিত্রবাহিনীর অবতরণের সময়ও তারা একসঙ্গেই ছিল। তারপর লোকটা আমাকে ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, এতক্ষণ আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। এখন চিনতে পারছি। আপনি উঁচু অবস্থানে থাকা বাটলারদের একজন। বড় অভিজাত জেল্লাদার হাউসগুলোর একটাতে থাকেন আপনি।

আমি তাকে জানালাম, সে-ও খুব নিচের দিকের কেউ নয়। তখন সে বলল, আপনাকে না চেনার কারণটা এবার বুঝতে পারছি : আপনি একেবারে ভদ্রলোকদের মতো করে কথা বলেন। আর আপনি এই গাড়িটা চালিয়ে এলেন বলে মনে হলো, (বলে সে আমার ফোর্ডটার দিকে ইঙ্গিত করল।) আপনি চকচকে চেহারার কোনো বাতিকওয়ালা শৌখিন মানুষ। আপনি আসলেই একজন শৌখিন মানুষ, জনাব। বলতে চাইছি, সত্যিই জেল্লাদার ব্যক্তিত্বের মানুষ। এ রকম চেহারা বানানোর কিছুই শিখিনি আমি, দেখতেই পাচ্ছেন। আমি সাদামাটা পুরনো আমলের বাটলারদের মতো একজন, ইউনিফর্ম ছাড়াই কাজ করছি আর কি।

তারপর সে জিজ্ঞেস করল আমি কোথায় কাজ করি। আমার কাজের স্থান ডার্লিংটন হল বলায় সে মাথাটা এক দিকে কাত করে আমার দিকে হালকা পরিহাসের দৃষ্টিতে তাকাল।

ডার্লিংটন হল! নিজেকেই যেন শোনাল কথাগুলো। ডার্লিংটন হল তো সত্যিই একটা জেল্লাদার জায়গা। আপনার মতো একজন বোকা মানুষকে দেখেও আবছা আবছা মনে পড়ছে। ডার্লিংটন হল মানে আপনি লর্ড ডার্লিংটনের বাড়ির কথা বলছেন না নিশ্চয়ই, তাই না?

তিন বছর আগে তিনি মারা যান। হাউসটা তাঁরই ছিল। মালিক এখন মি. জন ফ্যারাডে। তিনি একজন আমেরিকান ভদ্রলোক।

আপনি উঁচু অবস্থানে থাকা বাটলারদের একজন। আপনি ওই রকম একটা অভিজাত জায়গায় কাজ করেন। আপনার মতো বাটলার খুব কম আছে, তাই না? এবার তার কণ্ঠ লক্ষণীয় রকমের বদলে গেল। সে আবার জিজ্ঞেস করল, তার মানে, আপনি লর্ড ডার্লিংটনের জন্য কাজ করেছেন, না?

আরে না। আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন একজন আমেরিকান ভদ্রলোক, মি. জন ফ্যারাডে। তিনি ডার্লিংটন পরিবারের কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছেন।

ও আচ্ছা, তার মানে আপনি লর্ড ডার্লিংটনকে দেখেননি। আমার জানার খুব ইচ্ছা ছিল, তিনি দেখতে কেমন ছিলেন। তিনি কেমন পুরুষ ছিলেন।

লোকটাকে বললাম, আমাকে এখন বেরিয়ে পড়তে হবে। তার সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ দিলাম। মোটের ওপর সে বন্ধুবৎসল মানুষ, কষ্ট করে গেট পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিতে এলো। আমি বিদায় নেওয়ার আগে খানিক মাথা নুইয়ে আবারও জানাল, আমি যেন স্থানীয় পুকুরটা দেখে যাই। কিভাবে যেতে হবে ওখানে, তা-ও বারবার বলে দিল।

খুব সুন্দর একটা জায়গা। এবারে না দেখে গেলে নিজের গায়ে নিজেই লাথি মারবেন। আসলে এই মুহূর্তে কর্নেল সাহেবও ওখানে মাছ ধরছেন।

ফোর্ডটা এখন বেশ ভালো অবস্থায় চলছে বলেই পুকুরটা খানিকটা ঘোরানো পথে হলেও ব্যাটম্যানের পরামর্শ রক্ষা করার চেষ্টা করলাম। তার কাছ থেকে পথনির্দেশ শোনার সময় পরিষ্কারই মনে হলো; তবে তার পরামর্শ অনুসারে প্রধান রাস্তা ছেড়ে এগিয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারলাম, যে গলিতে চলার সময় গাড়ির মধ্যে অদ্ভুত গন্ধ পেলাম, সেটার মতো সরু আর আঁকাবাঁকা এই ছোট রাস্তাটাও। দুই পাশের ডালপালার পাতা এমন ঘন হয়ে নেমে এসেছে, সূর্যের আলোও যেন মাঝেমধ্যে পুরোপুরি মুছে ফেলছে। পালাক্রমে ঘন ছায়া আর সূর্যের আলো সামনে আসতে থাকার কারণে সামনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চোখের কসরত করতে হচ্ছে। অবশ্য আরো খানিক খোঁজাখুঁজির পর একটা সাইনপোস্ট দেখতে পেলাম। লেখা আছে ‘মর্টিমার্স পন্ড’। আমি এই স্পটটাতে আধাঘণ্টা আগে পৌঁছে গেছি।

এখন আমার ব্যাটম্যানের কাছে ঋণ স্বীকার করতেই হচ্ছে। আমার ফোর্ড ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি সে আমাকে এ রকম তুলনাহীন মোহনীয় একটা স্পট দেখতে পরামর্শ দিয়েছে। সে আমাকে এভাবে পরামর্শ না দিলে সম্ভবত আমি এ রকম সুন্দর একটা জায়গা কোনো দিন দেখতেই পেতাম না। পুকুরটা খুব বেশি বড় নয়—চারপাশের দৈর্ঘ্য মিলে মনে হয় পোয়া মাইল হবে। সুতরাং পারের যেকোনো একটা জায়গায় উঠে দাঁড়ালে পুকুরটাকে পুরোপুরি দেখা যায়। চারপাশে দারুণ নীরবতা বিরাজ করছে। পানির চারপাশে এত কাছাকাছি পাছপালাগুলো লাগানো হয়েছে পুকুরের পারে আরামদায়ক ছায়া দেওয়ার জন্য। পানির উপরিভাগের একাত্মতা আর পানির ওপরে আকাশের ছায়া মাঝেমধ্যে যেন ভেঙে দিয়েছে থোকা থোকা নলখাগড়া আর শর। আমার জুতার কারণে পুকুরের চারপাশ ঘুরে আসতে পারছি না। আমি এখন যেখানে বসে আসি এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি, সামনের দিকে যাওয়ার পথটা কাদার ভেতরে মিশে গেছে। তবে বলতে পারি, এখানকার মুগ্ধকর পরিবেশটা এমন, প্রথম মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, কাদা থাকুক আর যা-ই থাকুক, সোজা নেমে যাই।

সন্দেহ নেই, চারপাশের নীরব পরিবেশই আমার মনের ভেতর এসব ভাবনার জন্ম দিয়েছে; এগুলো এইতো আধাঘণ্টাখানেক আগেই আমার মনের ভেতর তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমানের এই পটভূমির নীরবতার কারণে হতে পারে, কিছুক্ষণ আগে ব্যাটম্যানের সঙ্গে আমার আচরণের কথা নিয়ে গভীর কিছু ভাবছি না। তার মানে, আমি লর্ড ডার্লিংটনের অধীনে কখনো ছিলাম না বলে যে ধারণাটা আমি তাকে দিলাম তার বাইরে আর কিছুই হয়তো ভাবছি না। যা বলা হয়েছে তার বেশি কোনো সত্য নেই; সন্দেহও নেই হয়তো। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলতে চাইছেন আপনি লর্ড ডার্লিংটনের অধীনে কাজ করেছেন, তাই না? আর আমি তাকে একটা উত্তর দিয়েছি, যেটার মানে ‘আমি তাঁর অধীনে কাজ করিনি’র বাইরের কিছুও হতে পারে। হয়তো একটা সাধারণ অর্থহীন খেয়াল আমাকে পেয়ে বসেছিল ওই মুহূর্তে। তবে এ রকম অস্বাভাবিক আচরণের ব্যাখ্যা হিসেবে সেটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। যা-ই হোক, আমি স্বীকার করছি, এ রকম ঘটনা শুধু ব্যাটম্যানের সঙ্গেই প্রথম ঘটেছে, তা নয়। কয়েক মাস আগে ওয়েকফিল্ডসদের ভ্রমণের সময় যা ঘটেছিল তার সঙ্গে এখানকার ঘটনার খানিক যোগসূত্র আছে বলে একটা সন্দেহ হচ্ছে। অবশ্য এ রকম ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে আমি খুব পরিষ্কারভাবে নিশ্চিত নই।

ওয়েকফিল্ডসরা আমেরিকান দম্পতি। তাঁরা ইংল্যান্ডের কেন্টের কোথায় যেন বসতি শুরু করেছেন, প্রায় বিশ বছর হয়ে গেল। বোস্টন সোসাইটিতে তাঁদের এবং মি. ফ্যরাডের কিছু পরিচিত বন্ধুবান্ধব আছে। সে সূত্রেই তাঁরা একদিন অল্প সময়ের জন্য ডার্লিংটন হলে এলেন বেড়াতে। দুপুরের খাবার খেলেন এবং বিকেলে চা পর্বের আগেই চলে গেলেন। যে সময়ের কথা বলছি সেটা হলো মি. ফ্যারাডে বাড়িতে আসার কয়েক সপ্তাহ পরে। সে সময় পরিচিতজনদের প্রতি তাঁর আগ্রহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। তারা বেড়াতে আসার এক পর্যায়ে মি. ফ্যারাডে বাড়ির প্রাঙ্গণের মধ্যে সব কিছু ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য বের হলেন। বাড়ির যে অংশগুলো ধুলা থেকে বাঁচানোর জন্য ঢেকে রাখা হয়েছিল সেগুলোও দেখালেন। মি. ফ্যারাডের মতোই মি. ও মিসেস ওয়েকফিল্ডসকেও খুব কৌতূহলী মনে হলো। বাড়ির বিভিন্ন অংশে তাঁরা বিচরণ করার সময় বিভিন্ন বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। আমার নিজের কাজকর্মের মধ্যে ব্যস্ত থেকেও তাঁদের আমেরিকান পদ্ধতির উচ্ছ্বাস শুনতে পাই। মি. ফ্যারাডে বাড়ির একেবারে ওপরের তলা থেকে শুরু করলেন তাঁর অতিথিদের দর্শন। ওপর থেকে দেখাতে দেখাতে নিচতলার বিভিন্ন জিনিসের বিশালত্ব নিয়ে মন্তব্য করছিলেন মি. ফ্যারাডে। মনে হলো, তিনি আবেগের একেবারে তুঙ্গ অবস্থায় আছেন; হাত দিয়ে বিভিন্ন জিনিস দেখাচ্ছেন, যেমন—কার্নিসের কারুকাজ, জানালাগুলোর আকার ইত্যাদি।

তাঁদের ঘোরাফেরার একপর্যায়ে আমি হলরুম পার হয়ে যাওয়ার সময় মনে করলাম, তাঁরা হয়তো সামনের মাঠের দিকে গেছেন। ঠিক তখনই খেয়াল করে দেখলাম, মিসেস ওয়েকফিল্ডস তখনো পেছনে পড়ে আছেন। তিনি ডাইনিংরুমের প্রবেশমুখে তৈরি পাথরের খিলানটা পরখ করে দেখছেন। খুব নিচু স্বরে ‘এক্সকিউজ মি, ম্যাডাম’ বলে আমি পার হয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন—শোনো স্টিভেনস, মনে হয় তুমিই বলতে পারবে। এই খিলানটার চেহারা দেখে মনে হয় সপ্তদশ শতকের। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, এটা খুব সম্প্রতি তৈরি, তাই না? সম্ভবত লর্ড ডার্লিংটনের সময়কার, ঠিক না?

হতে পারে, ম্যাডাম।

দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু জিনিসটাতে যে সময়ের চেহারা দেওয়া হয়েছে, সেটা নকল। এই কয়েক বছর আগের তৈরি। ঠিক বলেছি না?

আমি নিশ্চিত নই, ম্যাডাম। তবে সে রকম অবশ্যই হতে পারে।

তারপর তাঁর কণ্ঠ নিচু করে মিসেস ওয়েকফিল্ডস বললেন— আচ্ছা, আমাকে বলো তো, স্টিভেনস, লর্ড ডার্লিংটন দেখতে কেমন ছিলেন! তুমি তো মনে হয় তাঁর অধীনে কাজ করেছ।

না, ম্যাডাম। আমি তাঁর অধীনে কাজ করিনি।

ও, তাই? আমি তো ভেবেছি, তুমি তাঁর অধীনে কাজ করেছ। কেন যে এমন মনে হলো, বুঝতে পারছি না।

মিসেস ওয়েকফিল্ডস খিলানটার কাছে এগিয়ে গিয়ে সেটার গায়ে হাত রেখে বললেন, তাহলে আমরা নিশ্চিত করে জানি না। তবু আমার মনে হচ্ছে, জিনিসটা নকল। দারুণ দেখতে, কিন্তু নকল।

সম্ভবত মিসেস ওয়েকফিল্ডসের সঙ্গে কথাবার্তার প্রসঙ্গটা ভুলে গিয়েছিলাম। যা-ই হোক, তাঁদের বিদায়ের পর বিকেলে ড্রয়িংরুমে মি. ফ্যারাডের চা নিয়ে গেলাম। দেখলাম, তিনি মগ্ন হয়ে কী যেন ভাবছেন। খানিক চুপ করে থেকে তিনি বললেন, বুঝেছ, স্টিভেনস। মিসেস ওয়েকফিল্ডস বাড়ি দেখে যতটা মুগ্ধ হবেন ভেবেছিলাম ততটা হননি তিনি।

তাই নাকি, স্যার?

আসলে তিনি মনে করেছেন আমি এই জায়গাটার কুলজি সম্পর্কে সব কিছু বাড়িয়ে বলেছি। তিনি মনে করেছেন, এখানকার সব কিছুই আমি কয়েক শ বছর পেছনে নিয়ে গেছি।

সত্যি, স্যার?

তিনি বলছিলেন, সব কিছু নকল। এটা নকল, সেটা নকল। তিনি মনে করেছেন এমনকি স্টিভেনস, তুমিও নকল।

আসলেই তাই নাকি, স্যার?

আসলেই স্টিভেনস, আমি তাঁকে বলেছি, তুমি হলে খাঁটি। তুমি বয়সী এক খাঁটি ইংরেজ বাটলার। বলেছি, তুমি এ বাড়িতে ত্রিশ বছরের বেশি সময় কাজ করছ, একজন খাঁটি ইংরেজ লর্ডের সেবা করেছ। কিন্তু মিসেস ওয়েকফিল্ডস এই বিষয়টাতেও আমার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। আসলে আমার বিরুদ্ধাচরণ করার সময় তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল।

তাই, স্যার?

স্টিভেনস, মিসেস ওয়েকফিল্ডস মনে করেছেন, আমি তোমাকে এখানে নিয়োগ দেওয়ার আগে তুমি কখনো এখানে কাজ করোনি। আসলে তাঁর ভাবেসাবে মনে হলো, তিনি একেবারে সরাসরি তোমার নিজের মুখ থেকেই এমন তথ্য পেয়েছেন। কল্পনা করতে পারো, তাঁর কথার জোরে আমাকেই যেন বোকা বানিয়ে ফেললেন।

খুব দুঃখের কথাই, স্যার।

আমি সত্যিই বলতে চাই, স্টিভেনস, এটা তো অনেক পুরনো জাঁকজমকপূর্ণ একটা বাড়ি, ঠিক না? সে জন্যই তো এত দাম দিয়ে বাড়িটা কিনেছি আমি। আর তুমিও পুরনো দিনের কায়দা-কানুন মেনে চলা অভিজ্ঞ খাঁটি বাটলার। তুমি তো আর সামান্য ওয়েটার নও যে বাটলারের ভান করে আছ। তুমি তো খাঁটি বাটলার, তাই না? আমি তো খাঁটি একজনকেই চেয়েছিলাম। আমি তোমার মতো খাঁটি বাটলার পাইনি?

আমি সাহস করে বলতে চাই, অবশ্যই পেয়েছেন, স্যার।

তাহলে আমাকে খুলে বলো তো, মিসেস ওয়েকফিল্ডস কী বলতে চাইছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বড় রহস্যজনক মনে হচ্ছে।

স্যার, আমার ক্যারিয়ার সম্পর্কে সম্ভবত আমিই মিসেস ওয়েকফিল্ডসকে কিছুটা ভুল কথা বলেছি। সে কারণে যদি কোনো বিব্রতকর কিছু হয়ে থাকে, আমি ক্ষমা চাইছি, স্যার।

আমি বলব, বিব্রতকর অবস্থাই তৈরি হয়েছে। তারা তো আমাকে মিথ্যাবাদী, চাপাবাজ মনে করেছে। যা-ই হোক, সম্ভবত তুমিই মিসেস ওয়েকফিল্ডসকে কিছুটা ভুল কথা বলেছ, মানে কী?

আমি খুব দুঃখিত, স্যার। আমি বুঝতে পারিনি, এতটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হবে।

আরে রাখো তো তোমার দুঃখ প্রকাশ, স্টিভেনস! উনাকে তুমি এ রকম বানানো তথ্য দিলে কেন, বলো তো!

পরিস্থিতি নিয়ে একমুহূর্ত ভাবলাম। তারপর বললাম, আমি খুব দুঃখিত, স্যার। তবে এ দেশের বৈশিষ্ট্যই এ রকম।

আরে, কী যা-তা বলছ তুমি!

বলতে চাইছি, ইংল্যান্ডের নিয়ম হলো, আগের কর্মচারীর তরফে তার আগের নিয়োগকর্তাদের সম্পর্কে কিছু আলোচনা না করা।

ঠিক আছে, স্টিভেনস, সেই কারণে তুমি তোমার অতীতের কোনো কিছু খুলে বলতে চাও না। কিন্তু সেই না করাটা কি এত দূর নিয়ে যেতে হবে যে আমার আগে তুমি আর কারো জন্য কাজ করোনি বলতে হবে?

স্যার, এভাবে দেখলে অবশ্য চরম মনে হতে পারে ব্যাপারটা। তবে কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রায়ই এ রকম আশা করা হয়, তারা যেন এ রকম একটা ধারণাই দিয়ে থাকে। আরেকটু সোজাভাবে যদি বলি, স্যার, এটার মধ্যে বিয়ের মতো একটা ব্যাপারও আছে। কোনো তালাকপ্রাপ্ত মহিলা তার দ্বিতীয় স্বামীর সামনে তার আগের বিয়ের প্রসঙ্গ তুলবে না। আমাদের পেশায়ও একই রকম নিয়ম প্রচলিত আছে, স্যার।

তাঁর চেয়ারে হেলান দিয়ে আমার মনিব বললেন, ঠিক আছে, স্টিভেনস, ভালো হতো যদি তোমাদের প্রচলিত নিয়মটা আমি আগে থেকে জানতে পারতাম। এখন তো নিজেকে মাথামোটা বেকুব মনে হচ্ছে।

আমার কথার মধ্যে সত্য ছিল ঠিকই, কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার ব্যাখ্যাটা মি. ফ্যারাডের কাছে কতটা অপ্রতুল হয়েছিল। তবে চিন্তা করার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলে এ রকম একটা বিষয় নিয়ে কে এত মাথা ঘামায়? আমিও তেমন গভীরভাবে আর চিন্তা করিনি ওই বিষয়ে। আসলেই পুরো ঘটনাটা আমার মন থেকে দূরে রেখে দিলাম। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই পুকুরের চারপাশে নীরবতায় আমার মনে হচ্ছে, সেদিন মিসেস ওয়েকফিল্ডসের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছিলাম ,তার একটা যোগসূত্র আছে আজকে বিকেলে যা ঘটেছে তার সঙ্গে।

অবশ্য ইদানীং অনেক লোকে ডার্লিংটন হল সম্পর্কে অনেক বেকুবি কথাবার্তা বলে থাকে। আপনারা হয়তো ভাবছেন, লর্ড ডার্লিংটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা দেখাতে আমি লজ্জিত কিংবা বিব্রত। এ রকম আচরণের পেছনে কারণ এটাই। তাহলে আরেকটু পরিষ্কার করে বলি, এ রকম ধারণার চেয়ে অবাস্তব আর কিছু হতে পারে না। তাঁর সম্পর্কে ইদানীং যা যা বলা হয় তার বেশির ভাগই প্রচণ্ড অর্থহীন কথাবার্তা। এসব কথাবার্তার ভিত্তি হলো সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা। আমি যে এ রকম অস্বাভাবিক আচরণ করছি তার কারণ হলো, লর্ড ডার্লিংটন সম্পর্কে কারো কাছ থেকে ওই জাতীয় বেকুবি কথাবার্তা যাতে শুনতে না হয়। দুটো সময়েই আমি যে ডাহা মিথ্যা বলেছি তার সোজা কারণ হলো অপ্রীতিকর বিষয়কে এড়ানো। বিষয়টা নিয়ে যতই ভাবি, আমার কাছে ততই বেশি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা বলেই মনে হয় আমার মিথ্যা বলার কাজটাকে। কারণ ইদানীং বস্তাপচা অর্থহীন কথা বারবার শোনার মতো বিরক্তিকর আর কিছু নেই। আসল কথা হচ্ছে, যারা লর্ড ডার্লিংটন সম্পর্কে এসব বাজে কথা বলে বেড়ায় তাদের চেয়ে উনার ব্যক্তিত্ব অনেক উঁচুতে। আমি তখন জোর দিয়ে বলতে পারি, এত সব বাজে কথা বলাবলির পরও তিনি শেষ পর্যন্ত ওই উচ্চতায়ই থেকে যাবেন। আসলেই বুঝতে পারবেন, সেই সব দিনে ডার্লিংটন হলে তাঁর সেবা করা মানে এই জগতের কেন্দ্রে থাকা, যেটা আমার মতো মানুষের স্বপ্নের মতো ছিল। আমি পঁয়ত্রিশ বছর লর্ড ডার্লিংটনের সেবা করেছি। কেউ যদি আমার মতো এ রকম একটা হাউসে ওই সময়ে কাজ করার সুযোগ পেয়ে থাকে এবং জোর গলায় প্রচার করে থাকে তাহলে তার কথা মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। এত দূর থেকে আমার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে আমার সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি হিসেবে দেখতে পাই আমি ওই সময়ে যা যা অর্জন করেছি তা-ই। আর আজ আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ এ রকম কাজ করার সুযোগ পেয়েছি বলে।

 

তৃতীয় দিন : সকাল

টনটোন, সমারসেট

 

গত রাতে আমি ছিলাম কোচ অ্যান্ড হর্সেস নামের একটা স্থানীয় পান্থশালায়। সমারসেটের টনটোন শহর থেকে অল্প একটু দূরে। পড়ন্ত বিকেলের আলো আমার ফোর্ড নিয়ে এদিকটায় এগিয়ে আসার সময় দূর থেকেই চোখে পড়ে রাস্তার পাশের পান্থশালাটা; কারণ এটার ছাদ ঘাসপাতা দিয়ে ছাওয়া। মালিক কাঠের একটা সিঁড়ি বেয়ে আমাকে একটা ছোট রুমে নিয়ে গেলেন। রুমটা অনেকটা ফাঁকা হলেও সাজানো-গোছানো হয়েছে রুচিসম্মতভাবেই। যখন তিনি আমার রাতের খাবার খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করলেন, আমার রুমে স্যান্ডউইচ পাঠাতে বললাম। রাতের খাবারের বিকল্প হিসেবে স্যান্ডউইচটা দারুণ ছিল। কিন্তু তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রুমের ভেতরে আমার অস্থির লাগতে শুরু করে। আমি নিচতলার পানশালায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই : স্থানীয় আপেলের তৈরি সুরা পাওয়া যায় কি না দেখে আসি।

ওখানে মোটের ওপর পাঁচ-ছয়জন লোককে দেখলাম। একটা দলের মতো জড়ো হয়ে বসে আছে তারা। চেহারা দেখে বোঝা গেল, তারা কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তারা ছাড়া ভেতরে আর কেউ নেই। মালিকের কাছ থেকে এক পাত্র সুরা নিয়ে একটু দূরের একটা টেবিলে আলাদা বসলাম। ভাবলাম, এভাবে একাকী বসেই আরামে আজকের দিনটা সম্পর্কে মনের ভেতর কী আছে না আছে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পরই পরিষ্কার মনে হলো, তারা আমার উপস্থিতি নিয়ে খানিক উদ্বিগ্ন, মানে আমাকে তারাও খানিক আতিথেয়তা দেখাতে চায়। তাদের কথাবার্তার মধ্যে যখনই একটু বিরতি আসে তাদের কেউ একজন আমার দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে বোঝাতে চায়, আমাকে কিছু একটা বলার ইচ্ছা তার। শেষে একজন সত্যি সত্যি বলেই ফেলল, মনে হচ্ছে, আপনি ওপরতলায় রাত কাটাবেন, স্যার।

আমি তাকে হ্যাঁ-বাচক উত্তর দেওয়ার পর সে সন্দেহের সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে মন্তব্য করল, মনে হয় না ওপরতলায় আপনার ভালো ঘুম হবে, স্যার। মালিকের দিকে ইঙ্গিত করে সে আরো বলল, আপনি অবশ্য বুড়ো ববের সারা রাত ঘটাংঘটাং শব্দে ওঠা-নামার সঙ্গে অভ্যস্ত হলে আলাদা কথা। তারপর ঘুমালেও ভোর হওয়ার আগেই তার গিন্নির চিৎকারে আপনাকে জেগে উঠতেই হবে।

মালিকের আপত্তি সত্ত্বেও তার কথায় সবার মধ্যে জোরে হাসির রোল উঠল।

আমি বললাম, তাই নাকি? বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় একটা চিন্তা চলে এলো : এই মুহূর্তে মনে হয় কোনো বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য আশা করা হচ্ছে আমার কাছ থেকে। মি. ফ্যারাডের উপস্থিতিতেও অনেকবার এ রকম চিন্তাই আমার মাথায় এসেছে। আসলে এখানকার লোকগুলো আমার কাছ থেকে পরবর্তী মন্তব্য আশা করতে করতে ভদ্রতার নীরবতা লক্ষ করছিল। এভাবে আমার কল্পনার ভেতর হাতড়াতে হাতড়াতে শেষে বলে ফেললাম, তার মানে স্থানীয় ভাষায় যেটা মোরগের ডাক।

প্রথমে সবাই নীরব রইল, যেন আমি আরো বিস্তারিত বলব, এই আশায় আছে। তবে আমার মুখের ওপর হাসি হাসি ভাবটা দেখে তারা জোরে হাসা শুরু করে দিল। তবে তাদের হাসির মধ্যে খানিক বিমূঢ় হওয়ার ভাব লক্ষ করা গেল। এরপর তারা তাদের আগের আলোচনায় ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর বিদায় নেওয়ার সময় তাদের শুভ রাত্রি বলা ছাড়া আমি আর একটা কথাও বললাম না।

আমার মাথায় উপস্থিত বুদ্ধি এসেছে বলে ভালোই লাগল। তবে স্বীকার করতেই হবে, তারা আমার মন্তব্যে ভালো করে সাড়া দেয়নি বলে খানিক মন খারাপও হলো। মনে হয়, আমি বেশ হতাশও হলাম। কারণ আমি তো কয়েক মাস ধরে এই বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তার মানে আমার এই দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, যাতে ঠাট্টা প্রসঙ্গে মি. ফ্যারাডের প্রত্যাশা পূরণের মতো পেশাগত বর্ম তৈরি করতে পারি।

যেমন—সম্প্রতি অবসর পেলে আমার রুমে রেডিও শোনার চেষ্টা করে আসছি, বিশেষ করে যেসব সন্ধ্যায় মি. ফ্যারাডে বাইরে থাকেন। একটা অনুষ্ঠানের নাম ‘টুয়াইস আ উইক অর মোর’; সেটা সপ্তাহে তিনবার প্রচার করা হয়। সে অনুষ্ঠানে মূলত পাঠকদের চিঠিপত্রের ভিত্তিতে দুজন লোক বিভিন্ন বিষয়ে রসাত্মক মন্তব্য করে থাকে। এই অনুষ্ঠান নিয়ে আমার এত ভাবার কারণ হলো, এখানে যে রসাত্মক মন্তব্য করা হয় সেগুলো রুচিসম্মত এবং আমার এমনও মনে হয়, মি. ফ্যারাডে আমার কাছ থেকে যে রকম মন্তব্য আশা করেন সেগুলোর চেয়ে এখানকার মন্তব্যগুলো খুব আলাদা নয়। এই অনুষ্ঠান থেকে ইঙ্গিত নিয়ে আমি একটা সাধারণ অনুশীলন করার চেষ্টা করছি, দিনে কমপক্ষে একবার। আমার সামনে যখনই কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি উদিত হয়, সেই মুহূর্তে আমার চারপাশের পরিবেশ বিবেচনা করে সে পরিস্থিতি থেকে তিনটা রসাত্মক মন্তব্য তৈরি করার চেষ্টা করি। কিংবা এ রকম অনুশীলনের মতো করেই অতীতের একটা সময়ের ওপর ভিত্তি করে আলাদা তিনটা রসাত্মক মন্তব্য তৈরি করার চেষ্টা করি।

আপনারা তাহলে আমার গত সন্ধ্যার রসাত্মক মন্তব্য সম্পর্কে আমার হতাশার কারণ বুঝতে পারছেন। প্রথমত আমার মনে হয়েছে, আমার মন্তব্যের সফলতা না পাওয়ার কারণ হলো, আমি বোধ হয় ভালো করে পরিষ্কার কথায় মন্তব্যটা করিনি। আবার রাতে বিশ্রামের সময় মনে হলো, পান্থশালার লোকগুলো বোধ হয় আমার উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছিল। মোটের ওপর এটাও মনে হতে পারে, আমি বোধ হয় মোরগের সঙ্গে মালিকের স্ত্রীর তুলনা করে ফেলেছি। ওই সময় অবশ্য আমার মাথায় এ রকম কিছু ছিল না। মন্তব্য করার পরও আমার মাথায় ঢোকেনি, কী বলে ফেললাম। এই প্রসঙ্গটা মনে উদিত হওয়ার পর আর কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি, মনের ভেতর খচখচ করতে থাকে। আবার খানিকটা মনস্থির করলাম, আজ সকালে মালিকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু আমাকে সকালের নাশতা দেওয়ার সময় আমার প্রতি তাঁর খোশমেজাজ দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিই, যাক গে, এ ব্যাপারে আর কিছু বলার দরকার নেই।

তবে রসাত্মক মন্তব্য করার বিপদও যে আছে তার প্রমাণ তো এই মন্তব্যটা। এ রকম মন্তব্যের স্বভাবই হলো, মন্তব্য করার আগে সম্ভাব্য নানা রকম প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভেবে দেখার সময় তেমন পাওয়াই যায় না। প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলে অনুপযুক্ত বিষয়ের অবতারণা হওয়ার সমূহ বিপদ থেকে যায়। এমন কোনো কারণ নেই, আমি সময় ও অনুশীলন খরচ করলেও এই ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে পারব না। তবু বিপদ তো আছেই। কাজেই আমার জন্য ভালো হয় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপাতত এখন, ভালো করে অনুশীলন না করে মি. ফ্যারাডের সামনে রসালো মন্তব্য করার চেষ্টা করব না।

দুঃখ প্রকাশ করেই বলছি, গত রাতে রসালো মন্তব্য হিসেবে স্থানীয় লোকগুলো আমার সামনে যে সুযোগ নিয়েছিল সেটা অতি সত্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে—অর্থাৎ আমি রাতটা যে ভালো করে ঘুমিয়ে কাটাতে পারব না তারই আগাম বার্তা। মালিক ও তাঁর স্ত্রী চিৎকার করেননি, তবে সারা রাত তাঁরা বিভিন্ন কাজকর্ম করলেন এবং মহিলার অনর্গল প্যাচাল শোনা গেল প্রায় সারা রাতই। আজ ভোর থেকেও তাঁদের কথাবার্তা শোনা গেল। আমি মনে মনে তাঁদের ক্ষমা করেই দিলাম; কারণ তাঁরা পরিশ্রমী দম্পতি এবং তাঁদের কথাবার্তার কারণ তাঁদের পরিশ্রম। আর আমার হতভাগা মন্তব্যও আমার ঘুমহীনতার কারণ। সে জন্যই সকালবেলা বাজারের শহর টনটোন দেখতে বের হয়ে পড়ার আগে আমি মালিককে ধন্যবাদ দিলাম।

এখন আমি যেখানে বসে মধ্যসকালের চা পান করছি, সেখানে থাকলে মনে হয় আরো ভালো হতো। কারণ বাইরে এদের বিজ্ঞাপন দেখেছি। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু ‘চা নাশতা ও কেক’ নয়, বরং ‘পরিষ্কার, শান্ত ও আরামদায়ক রুম’ও আছে এদের। মার্কেট স্কয়ারের খুব কাছে একটা উঁচু জায়গায় অবস্থিত এটা। উঁচু জায়গার ওপরে যেন অনেকটা সেঁধিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিল্ডিংটা; বাইরের পাশটাতে কাঠের ভারী কালো কড়িকাঠ। আমি এখন বসে আছি বিশাল চা পানের রুমে, ওক কাঠের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। লোকজনের বসার জন্য যথেষ্টসংখ্যক টেবিল আছে। অনুমানে দেখতে পাচ্ছি, দুই ডজনের মতো মানুষ বসেছে; তবে ভিড় হওয়ার মতো অনুভূতি কারো মধ্যে নেই। একটা কাউন্টারের পেছন থেকে দুটো হাসিমাখা মুখের অল্পবয়সী মেয়ে খাবারদাবার, চা দিয়ে যাচ্ছে। কাউন্টারে চমৎকার সব কেক ও পেস্ট্রির ডিসপ্লে করা আছে। মোটের ওপর সকালের চা খাওয়ার জন্য এটা একটা চমৎকার জায়গা।

আমি একেবারে পেছনের দেয়ালের পাশে নিরাপদে আরামদায়ক জায়গায় বসেছি। তবে রুমের অন্য প্রান্ত পার হয়ে সূর্যের আলোধোয়া রাস্তাটাও দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার পাশের ফুটপাতে সাইনপোস্টের লেখাগুলোও পরিষ্কার পড়তে পারছি। বিভিন্ন দিকের গন্তেব্যের পথনির্দেশ দেওয়া আছে। একটা গন্তব্যের নাম মার্সডেন গ্রাম। মার্সডেনের নাম শুনে চেনা চেনা মনে হচ্ছে, না? গতকাল রাস্তার মনচিত্রে নামটা দেখে আমারও এ রকমই মনে হয়েছিল। সমারসেটের মার্সডেনেই তো জিফেন অ্যান্ড কম্পানির কারখানাটা ছিল। জিফেনের তৈরি ভালো কালো মোমবাতির অর্ডার দিতে হলে মার্সডেনেই আসতে হতো; ঝুরঝুরে পরত তৈরি করতে, মোমের সঙ্গে মেশাতে এবং হাত দিয়ে কাজ করতে এদের কালো মোমই দরকার হতো। কিছুদিন পর্যন্ত রুপালি পলিশ দেওয়া মোমের জন্য মার্সডেনই ছিল সবচেয়ে ভালো। যুদ্ধের ঠিক আগে আগে বাজারে আসে নতুন রাসায়নিক পদার্থ। তার ফলে এদের পড়তি শুরু হয়।

যা-ই হোক, ঘটনা যেভাবে গড়াতে থাকে, সেটাই ছিল লর্ড হ্যালিফ্যাক্স এবং ওই সময়ের জার্মান রাষ্ট্রদূত হার রিবেনট্রপের মধ্যে আন-অফিশিয়াল ধারাবাহিক সাক্ষাতের প্রথম দিন। তবে সেদিন লর্ড হ্যালিফ্যাক্স অনেকটা সতর্ক মেজাজে এসেছিলেন। লর্ড ডার্লিংটনের সঙ্গে প্রথম দেখার সময় বলেছিলেন, ডার্লিংটন সাহেব, আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে এলেন। আমি জানি, এর জন্য আমাকে অনুতপ্ত হতে হবে।

হার রিবেনট্রপের আসার কথা আরো ঘণ্টাখানেক পরে। সে জন্য লর্ড ডার্লিংটন তাঁর অতিথিকে একটা পরামর্শ দিলেন ডার্লিংটন হলে বেড়াতে আসার। অনেক অস্থির অতিথিকে এখানে নিয়ে আসার পর তাঁরা স্বস্তি বোধ করেছেন বলেই মি. ডার্লিংটন এই কৌশলটা নিলেন। যা-ই হোক, আমার কাজকর্ম চালানোর সময় আমি যত দূর শুনতে পেলাম, ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরতে ঘুরতে কিছু সময় ধরে হ্যালিফ্যাক্স সাহেব আসন্ন সন্ধ্যা নিয়ে শুধু আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এবং লর্ড ডার্লিংটন বৃথাই তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তারপর হ্যালিফ্যাক্স সাহেবের আনন্দের চিৎকার শুনতে পেলাম, মাই গুডনেস! ডার্লিংটন, এই হাউসের রুপার জিনিসপত্র তো খুবই দারুণ! সে সময় তাঁর এই মন্তব্য শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম।

এখানে হার রিবেনট্রপ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যুক্তিসংগত। ইদানীং অবশ্য সাধারণভাবে মনে করা হয়, হার রিবেনট্রপ ছিলেন একজন চালাক লোক। নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইংল্যান্ডকে যতটা সম্ভব প্রতারণা করে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল হিটলারের। আর এই রিবেনট্রপের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল হিটলারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। আমি বলতে চাইছি, এটাই হলো সাধারণভাবে গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গি। আমি এখানে এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে যাচ্ছি না। আমি বলছি, এখন লোকজন এমনভাবে কথা বলে, যেন ওই সময় তারা হার রিবেনট্রপকে একমুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করেনি, শুধু লর্ড ডার্লিংটনই তাঁকে সম্মানিত ভদ্রলোক হিসেবে বিশ্বাস করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার মতো সম্পর্ক তৈরি করেছেন।

তারপর আরো বলা যায়, এই ব্যক্তিরাই আবার এমনভাবে কথা বলে, লর্ড ডার্লিংটন ওই সময়ে কয়েকবার যে জার্মানিতে গিয়েছিলেন তখন তিনি নািসদের সেবা গ্রহণ করে যেন অস্বাভাবিক কিছু করেছেন। আমার মনে হয়, তারা এভাবে কথা বলতে পারত না যদি দ্য টাইম ন্যুরেমবার্গ র্যালির সময়ে জার্মানদের দেওয়া ভোজের অতিথিদের তালিকা প্রকাশ করত। আসল কথা হলো, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বিশিষ্ট ও সম্মানিত ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলারা জার্মান নেতাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। আমি নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, ওই সব ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলা ফিরে আসার সময় অন্য কিছু নয়, শুধু আতিথ্যকর্তাদের অঢেল প্রশংসা নিয়ে এসেছিলেন। যদি কেউ পরোক্ষেও বলে থাকে, লর্ড ডার্লিংটন চেনাজানা শত্রুদের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখেছিলেন, তাহলে সে নিজের সুবিধার্থে ওই সময়ের অবস্থাটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

যদি কেউ দাবি করে, লর্ড ডার্লিংটন সেমিটীয়দের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন, কিংবা ব্রিটিশ ফ্যাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাহলে তার চেয়ে অশোভন কাজ আর হতে পারে না। তিনি কেমন ভদ্রলোক ছিলেন সে সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞতার পরিচয় হলো এ রকম দাবি করা। লর্ড ডার্লিংটন অ্যান্টিসেমিটীয়দেরই পছন্দ করতেন না। অ্যান্টিসেমিটীয় মনোভাবের সামনে আলাদা সময়েই আমি তাদের প্রতি তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখেছি, শুনেছি। আর তিনি কোনো ইহুদিকে তাঁর হাউসে প্রবেশ করতে দেননি, কিংবা কোনো ইহুদি কর্মচারী নিয়োগ দেননি—এসব কথার কোনো ভিত্তিই নেই। ত্রিশের দশকে শুধু একটা উদাহরণ ছাড়া আর তেমন পাওয়া যাবে না। সেটাকেও ফুলিয়ে বড় করা হয়েছে। আর ব্রিটিশ ফ্যাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের কথা বললে শুধু একটু বলতে পারি, তাঁকে ওই সংগঠনের লোকদের সঙ্গে জড়িয়ে কথা বলা পুরোই হাস্যকর।

যেকোনো রূপেই হোক না কেন, এ দেশের রাজনীতির কেন্দ্রের সঙ্গে এসব সংগঠন ছিল একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারবেন, লর্ড ডার্লিংটন এমন একজন ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি নিজেকে সব কিছুর বাস্তব কেন্দ্রে ব্যস্ত রাখতেন। আর যেসব বড় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল তাঁরা সবাই এ রকম প্রান্তিক সংগঠনের লোকদের থেকে ছিলেন একেবারে কল্পনাতীত দূরে। ডার্লিংটনের সঙ্গে যাঁরা মিশতেন তাঁরা শুধু সম্মাননীয়ই ছিলেন না, বরং তাঁরা ব্রিটিশ জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতেন—রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, সামরিক লোক, যাজক। বাস্তবে তাঁদের কেউ কেউ ইহুদিও ছিলেন; এখানেই প্রমাণ পাওয়া যায়, লর্ড ডার্লিংটন সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয় সেগুলো কতখানি অর্থহীন।

আচ্ছা, আবার তো প্রসঙ্গ ছেড়ে অন্য দিকে যাচ্ছি। আমি তো রুপার জিনিসপত্রের প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম : ডার্লিংটন হলে হার রিবেনট্রপের সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই সন্ধ্যায় লর্ড হ্যালিফ্যাক্স দারুণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন, সে কথাই বলছিলাম। আরেকটু খোলাসা করে বলি, একমুহূর্তের জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আমার মনিবের জন্য সেই সন্ধ্যার শুরুটা ছিল হতাশাজনক। কিন্তু শুধু রুপার জিনিসপত্রের জন্যই সে সন্ধ্যাটা তাঁর জন্য একটা বিজয়ে পরিণত হয়। যেমনটা ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, লর্ড ডার্লিংটন নিজে বুঝিয়েছিলেন, তাঁর অতিথির মেজাজ পরিবর্তন করার জন্য রুপার জিনিসপত্র একটা ছোটখাটো বিষয় হতে পারে। আর এখন ওই সময়ের দিকে সন্তুষ্টির আভা নিয়ে ফিরে তাকালে খুব অবান্তর মনে হবে না।

আমাদের পেশায় এমন কিছু সদস্য আছে, যারা মনে করে, কোন বাটলার কেমন মালিকের সেবা করছে তাতে তেমন কিছু পার্থক্য তৈরি করে না। আমাদের প্রজন্মের বাটলারদের মধ্যে একটা ধারণা প্রচলিত আছে : আমরা অনেকে মনে করি, বাটলারদের উচিত মানবতার প্রগতির জন্য কাজ করছেন যাঁরা, সেই মনিবদের সেবা করার উচ্চাশা পোষণ করা। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে, আমাদের ধারণা একেবারেই বায়বীয়, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা এ রকম সন্দেহবাদী মনোভাব পোষণ করে তারা আমাদের পেশার মধ্যম মানের লোকজন। তারা মনে করে, উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছার ক্ষমতা তাদের নেই। তারা নিজেদের অবস্থানকে যতটা পারে নিচের দিকে নামায়। তাদের এ রকম মনোভাব কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। তবে এত সব সত্ত্বেও সন্তুষ্টির সঙ্গেই কারো নিজস্ব ক্যারিয়ারের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েও দেওয়া যায়, এসব লোক কতটা ভুল ধারণা পোষণ করে। অবশ্য একজন বাটলার তো তার মানিবের জন্য সাধারণ এবং টিকে থাকার মতো সেবা দিয়ে থাকে।

তবে এত বেশি অতীতমুখী হওয়াও উচিত নয়। মোটের ওপর, আমার এখনো সেবাদানের অনেক সময় সামনে পড়ে আছে। আর মি. ফ্যারাডে শুধু একজন দারুণ ভদ্রলোকই নন, তিনি একজন আমেরিকান ভদ্রলোক, যাঁর কাছে খোদ ইংল্যান্ডের সর্বোত্তম সেবা প্রদান করা উচিত। জরুরি কাজটা হলো বর্তমানের ওপর নজর রাখা, যাতে অতীতে যা অর্জিত হয়েছে সেটা নিয়ে অতিসন্তুষ্টি চলে না আসে। কারণ স্বীকার করা উচিত, গত কয়েক মাসে ডার্লিংটন হলে কিছু বিষয় যেমন হওয়ার কথা ছিল তেমন হয়নি। সম্প্রতি দু-চারটি ভুলত্রুটি দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে এপ্রিলের রুপার জিনিসপত্রের বিষয়টিও আছে। বাঁচা গেছে, তখন মি. ফ্যারাডের কোনো অতিথি ছিলেন না। তবু ওই মুহূর্তটা আমার জন্য সত্যিকারের বিব্রতকর অবস্থা ছিল।

ঘটনাটা ঘটেছিল একদিন সকালে ব্রেকফাস্টের সময়। মি. ফ্যারাডে হয় দয়া দেখিয়ে, নয়তো একজন আমেরিকান হওয়ার কারণে ঘাটতিটার বিস্তার বুঝতে পারেননি। তিনি আমার কাছে নালিশ করার মতো করে একটা কথাও বলেননি। টেবিলে বসে তিনি কাঁটাচামচটা তুলে সংক্ষিপ্ত এক সেকেন্ডের মতো ফর্কের শূলগুলো পরীক্ষা করে দেখে আবার খবরের কাগজে মনোযোগ দিলেন। তাঁর অঙ্গভঙ্গির সবই ভুল করে করার মতো মনে হলো। তবে ঘটনাটা দেখে ছুটে এসে জিনিসটা সরিয়ে ফেলি। আমি আসলে আমার বিরক্তির কারণেই কাজটা বেশি ক্ষিপ্রতায় করে ফেলেছি। কারণ মি. ফ্যারাডে সামান্য বিড়বিড় করে বললেন শুধু, আহ্, স্টিভেনস। তার পরও আমি তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে একটুও দেরি না করে আরেকটা সন্তোষজনক কাঁটাচামচ নিয়ে আসি। যখন টেবিলের দিকে ফিরে আসি, নতুন চামচটা নিয়ে আসি, মি. ফ্যারাডেকে মনে হলো খবরের কাগজে মগ্ন হয়ে পড়েছেন। আমার আশঙ্কা হলো, আমার হাত থেকে ওটা টেবিলক্লথের ওপরে পড়েও যেতে পারে। হয়তো মগ্ন মনিব টের না-ও পেতে পারেন। যা-ই হোক, মি. ফ্যারাডে আসলে আমার বিব্রতকর অবস্থা কাটানোর জন্য খবরের কাগজে মগ্ন হওয়ার মতো ভান করছিলেন। চুপি চুপি এ রকম কাজ করে ফেলাটা আমার জন্য সন্তুষ্টির মতো হয়ে থাকতে পারে। কিংবা আমার ভুলটাকেই পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল সেটা।

গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটিগুলো প্রকৃতিগতভাবেই আত্মসম্মানের জন্য ক্ষতিকর। তবে সেগুলো শুধু স্টাফ ঘাটতি ছাড়া আর কোনো অশুভ কারণে হয়েছে বিশ্বাস করার কোনো অবকাশ নেই। স্টাফ ঘাটতিও কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণ নয়; তবে মিস কেন্টন যদি ডার্লিংটন হলে ফিরে আসতে চান তাহলে আমি নিশ্চিত, এ রকম ছোটখাটো ভুলত্রুটি শুধু অতীতের উদাহরণ হয়ে রইবে। তবে মনে রাখার মতো একটা বিষয় হলো, মিস কেন্টন তো তাঁর চিঠির কোনো জায়গায় স্পষ্ট করে লেখেননি, তিনি ফিরে আসতে চান। গত রাতে আলো নেভানোর আগে আবার পড়লাম তাঁর চিঠি, তাঁর আগের পদবিতে ফিরে আসার কোনো দ্বিধাহীন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কি না। তাঁর তরফে এ রকম কোনো ইচ্ছার কথা আসলে বাড়িয়ে দেখা হয়েছে—এ রকম সম্ভাবনাও তো আছে। বলতেই হবে, গত রাতে অমি খানিকটা বিস্মিতই হলাম : তাঁর চিঠির কোনো প্যাসেজে তিনি পরিষ্কার করে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন কি না তা খুঁজে পাওয়া তো কঠিন কাজ!

তবে আবার এ রকম বিষয়ে বেশি চিন্তা করে দেখাটা খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কেননা আমি তো জানি, মিস কেন্টনের সঙ্গে আটচল্লিশ ঘণ্টা পর তো আমার মুখোমুখি কথা হবেই। তবু বলতে হবে, গত রাতে আলো নেভানোর পর অন্ধকারে শুয়ে মালিক ও তাঁর স্ত্রীর নিচতলায় পরিচ্ছন্নতার কাজের শব্দ শুনতে শুনতে তাঁর চিঠির প্যাসেজগুলো মনে মনে পড়তে পড়তে বেশ কয়েক মিনিট কাটিয়ে দিলাম।

 

 

তৃতীয় দিন : সন্ধ্যা

মসকোম্বে টাভিসটকের কাছে, ডেভন

 

আমার মনে হয়, একমুহূর্তের জন্য ইহুদিদের প্রতি লর্ড ডার্লিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল সেদিকটা দেখে আসা দরকার। কারণ অ্যান্টিসেমিটীয় পুরো বিষয়টা ইদানীং স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ডার্লিংটন হলে কর্মরত ইহুদি ব্যক্তি যারা ছিল তাদের প্রতি কথিত বাধার কথাটা পরিষ্কার করা দরকার। এই অভিযোগটা যেহেতু সরাসরি আমার অধীন এলাকায় পড়ে, আমি সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নিয়ে এটা খণ্ডন করতে সক্ষম। লর্ড ডার্লিংটনের অধীনে আমি যত দিন কাজ করেছি, আমার তত্ত্বাবধানে অনেক ইহুদি ব্যক্তিই কাজ করত। আরো বলা দরকার, জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাদের কোনো দিনই আলাদা করে দেখা হতো না। এই অমূলক অভিযোগের কোনো কারণ কেউ কল্পনায়ও পাবে না। শুধু একটা ব্যতিক্রমী, একেবারেই তুচ্ছ সূত্র পাওয়া যেতে পারে। সেই সূত্রের ভিত্তি ছিল সেই সংক্ষিপ্ত তাত্পর্যহীন কয়েক সপ্তাহে যখন মিসেস ক্যারোলিন বার্নেট কিছুটা অস্বাভাবিক প্রভাব খাটাতে পেরেছিলেন লর্ড ডার্লিংটনের ওপর।

মিসেস বার্নেট ছিলেন প্রয়াত মি. চার্লস বার্নেটের বিধবা স্ত্রী। তখন তাঁর বয়স চল্লিশের কোঠায়, দেখতে অনেক সুন্দর, বেশ মোহিনী রূপের অধিকারী। ভয়ানক রকমের বুদ্ধিমতী বলেও তাঁর নামডাক ছিল। এ রকম প্রায়ই শোনা যেত, তিনি ডিনার টেবিলে সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে অমুকতমুক বিজ্ঞ ভদ্রলোককে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন। ১৯৩২ সালে গ্রীষ্মের বেশির ভাগটাই তিনি নিয়মিত উপস্থিত হয়েছেন ডার্লিংটন হলে। তিনি ও লর্ড ডার্লিংটন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক আলাপে। আমার মনে আছে, মিসেস বার্নেটই লর্ড ডার্লিংটনকে লন্ডনের পূর্ব প্রান্তের দরিদ্র এলাকায় ‘নির্দেশিত পরিদর্শনে’ নিয়ে গেছেন। ওই সময়ে যেসব পরিবার চরম দুর্দশায় পড়েছিল তাদের সত্যিকারের বাড়িঘর দেখেছেন লর্ড ডার্লিংটন। তার মানে, এ রকম কাজকর্মের মধ্য দিয়ে মিসেস বার্নেট আমাদের দেশের দরিদ্রদের প্রতি লর্ড ডার্লিংটনের ক্রমবর্ধমান   চিন্তাভাবনায় কিছুটা অবদান রাখেন।

আমি সেগুলোকে ঘটনা বলছি। কিন্তু কোনো কোনোটা ছিল একেবারেই তাত্পর্যহীন। মনে আছে, একদিন সন্ধ্যায় তাদের কথাবার্তার খানিকটা দূর থেকে শুনে ফেলি। তাদের আলোচনায় একটা খবরের কাগজের নাম উঠে আসায় লর্ড ডার্লিংটন মন্তব্য করলেন—ও আচ্ছা, আপনি ওই পচা ইহুদি প্রচারপত্রের কথা বললেন? ওই সময়ের কাছাকাছি আরেকটা দিনের কথা মনে আছে : একটা বিশেষ দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য দিতে নিষেধ করলেন মি. ডার্লিংটন। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিতই আমাদের দরজায় লোকজন সাহায্যের জন্য আসত; তাদের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা কমবেশি সবাই ইহুদি। এসব ঘটনার কথা মনে আছে, কারণ হলো, এসবের আগে লর্ড ডার্লিংটন কখনোই ইহুদিদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন না।

তারপর এলো সেই বিকেল; মি. ডার্লিংটন আমাকে পড়ার ঘরে ডাকলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা বললেন; বাড়ির সব কিছু ঠিকমতো চলছে কি না ইত্যাদি। তারপর শুরু করলেন—স্টিভেনস, আমি অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আর এখানে ডার্লিংটন হলে ইহুদিদের আমাদের কর্মচারী হিসেবে রাখতে পারছি না।

স্যার?

পারছি না এই হাউসের মঙ্গলের জন্যই, স্টিভেনস। অতিথিদের স্বার্থেই আমরা এখানে আছি। বিষয়টা নিয়ে আমি সতর্কতার সঙ্গে গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, স্টিভেনস। এবার আমি তোমাকে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম।

ঠিক আছে, স্যার।

আমাকে বলো তো, স্টিভেনস, আমাদের এখানে তো সামান্য কয়েকজন আছে, তাই না? মানে আমি ইহুদি স্টাফদের কথা বলছি।

আমার বিশ্বাস, বর্তমান কর্মচারীদের মাত্র দুজন এই ক্যাটাগরিতে পড়বে, স্যার।

আহ্, বলে মি. ডার্লিংটন একটু থামলেন। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, তোমাকে অবশ্য ওদের চলে যেতে দিতে হবে।

দুঃখিত, স্যার!

স্টিভেনস, দুঃখজনক অবশ্যই। কিন্তু আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। আমাদের অতিথিদের নিরাপত্তা আর মঙ্গলের কথা ভাবতে হবে তো। শোনো, তোমাকে বলি, আমি এ বিষয়টা নিয়ে আগাগোড়া গভীরভাবে ভেবেছি। আমাদের সবার সর্বোচ্চ মঙ্গলের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

তারা দুজন স্টাফ সদস্যই নারী কর্মচারী, চাকরানি। এই পরিস্থিতিতে মিস কেন্টনকে না জানিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না। সেই সন্ধ্যায়ই তাকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। তার পার্লারে কোকোয়ার জন্য সন্ধ্যায় গেলে জানিয়ে দেব। এখানে আরেকটু ভেঙে বলতে হবে, মিস কেন্টনের পার্লারে প্রতিদিন সন্ধ্যায় যেতাম। যদিও এটা-ওটা নিয়েও আমরা কথা বলতাম কখনো কখনো, তবু মূলত আমাদের কথাবার্তার বিষয় এবং ধরন পুরোপুরিই ছিল পেশাগত। আমাদের আলাপের বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়ার জন্য কারণ ছিল সহজ : একসময় আমরা দেখতে পাই, আমাদের উভয়ের জীবন মাঝেমধ্যে এত ব্যস্ত হয়ে যায়, আমরা একেবারে মৌলিক তথ্য আদান-প্রদান করার সুযোগ পাই না। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের কাজকর্ম ঠিকমতো চালানোই সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাই। এ রকম সমস্যার একমাত্র সোজাসাপটা সমাধান হলো মিস কেন্টনের বারান্দায় দিনের শেষে মিনিট পনেরো দুজনে একসঙ্গে কাটানো, অন্য কেউ থাকার কথা নয়। আমি আবারও বলছি, আমাদের এ রকম আলাপ স্বভাবতই পেশাগত ছিল। মানে যেমন আমরা আসন্ন কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারতাম, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী কেমন করে কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে ইত্যাদি।

ওই মুহূর্তে উত্তরে মিস কেন্টনের কিছু বলার আছে বলে মনে হলো না। সুতরাং আমি শেষ করার জন্য বললাম, তাহলে, মিস কেন্টন, আপনাকে কোকোয়ার জন্য ধনবাদ। এখনই রুমে ঢুকতে হবে। আরেকটা ব্যস্ত দিন শুরু হবে আগামীকাল।

তখনই মিস কেন্টন বললেন—মি. স্টিভেনস, আমার নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। রুথ ও সারাহ আমার স্টাফ হিসেবে কাজ করছে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে। আমি ওদের পুরোপুরি বিশ্বাস করি। ওরাও আমাকে বিশ্বাস করে। ওরা এই হাউসে চমৎকার সেবা দিয়ে এসেছে।

আমিও এ ব্যাপারে নিশ্চিত, মিস কেন্টন। তবু আমাদের বিচারক্ষমতার মধ্যে যেন আবেগ ঢুকে না পড়ে। এখন আপনাকে বিদায় জানাতেই হচ্ছে।

মি. স্টিভেনস, আমি কিছুতেই ধৈর্য ধরতে পারছি না, আপনি এখানে বসে বললেন যেন আপনার ভাঁড়ারের জন্য কিছুর অর্ডার সম্পর্কে কথা বললেন। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আপনি বলছেন, রুথ ও সারাহকে বরখাস্ত করা হবে তাদের ইহুদি পরিচয়ের কারণে?

মিস কেন্টন, এই একটু আগে আপনার কাছে আমি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছি। মি. ডার্লিংটন তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আপনার আমার বিতর্ক করার কিছু নেই তাঁর সিদ্ধান্তের ওপরে।

মি. স্টিভেনস, আপনার কি মনে হচ্ছে না, রুথ ও সারাহকে এ রকম একটা কারণে বরখাস্ত করা অন্যায় হবে? এ অন্যায় আচরণ আমি মেনে নেব না। এ রকম ঘটনা যেখানে ঘটতে পারে সেই হাউসে আমি কাজ করব না।

মিস কেন্টন, আমি আপনাকে উত্তেজিত না হতে বলছি। আপনার অবস্থান অনুযায়ী আচরণ করতে বলছি। এটা সোজা একটা বিষয়। লর্ড সাহেব এ রকম কাজের চুক্তি যদি বাদ দিতে চান তাহলে বলার তেমন কিছু থাকে না।

আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, মি. স্টিভেনস, আমি এ রকম হাউসে কাজ করব না। আমার মেয়েদের বরখাস্ত করলে আমিও কাজ ছেড়ে চলে যাব।

মিস কেন্টন, আপনাকে এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখে আমি বিস্মিত। আমি তো আর আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারি না, আমাদের পেশাগত দায়িত্ব আমাদের দুর্বলতা আর আবেগের অধীন নয়, আমাদের মনিবের ইচ্ছার অধীন।

মি. স্টিভেনস, আমি আবারও বলছি, আপনি যদি আগামীকাল আমার মেয়েদের বরখাস্ত করেন সেটা অন্যায় হবে; সেটা পাপ হবে; অন্য যেকোনো পাপের মতো এটাও একটা পাপ হবে। আর আমি এ রকম একটা হাউসে কাজ করব না।

 মিস কেন্টন, আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, শুনুন। এ রকম একটা উঁচুপর্যায়ের, শক্ত পর্যায়ের বিচারের কাজ করার মতো যথেষ্ট পদে আসীন নন আপনি। আসলে আজকের জগৎ খুব জটিল আর প্রতারণাপূর্ণ। অনেক বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে আপনার আমার অবস্থানে থেকে মাথা ঘামানো চলে না, সেগুলো আমরা বুঝতে পারি না। যেমন—ইহুদি হওয়ার বিষয়। তা ছাড়া আমি আরো বলতে চাই, মি. ডার্লিংটন যে অবস্থানে আছেন সেখান থেকে নির্ধারণ করতে পারেন কোনটা সবচেয়ে ভালো। মিস কেন্টন, এখন আমাকে বিশ্রামে যেতেই হবে। কোকোয়ার জন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ। আগামীকাল সকাল দশটায় তাদের দুজনকে পাঠিয়ে দেবেন, প্লিজ।

পরের দিন সকালে ওই মেয়ে দুজন কাঁদতে কাঁদতে আমার ভাঁড়ারে যখন ঢুকল, আমি বুঝে গেলাম মিস কেন্টন তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি যতটা সম্ভব সংক্ষেপে পরিস্থিতির কথা তাদের বুঝিয়ে বললাম। আরো জোর দিয়ে উল্লেখ করলাম, তাদের কাজ সন্তোষজনক ছিল এবং তারা অন্যখানে কাজ করতে গেলে এখান থেকে ভালো রেফারেন্স পাবে। আমার যতটা মনে পড়ে, তারা দুজন গোটা সময়ে উল্লেখ করার মতো কিছু বলল না। তাদের সঙ্গে তিন-চার মিনিটের বেশি কথা বলতে হয়নি। তারা যেভাবে কাঁদতে কাঁদতে এসেছিল তেমন কাঁদতে কাঁদতেই চলে গেল।

ওই মেয়ে দুজনের অপসারণের পর কয়েক দিন মিস কেন্টন আমার প্রতি একেবারে নীরব হয়ে রইলেন। সত্যিই মাঝেমধ্যে তিনি আমার প্রতি রূঢ় আচরণও করেছেন, এমনকি অন্যান্য স্টাফের সামনেও। যদিও আগের অভ্যাসে সন্ধ্যায় আমরা কোকোয়ার জন্য একসঙ্গে বসলাম। আমাদের বসার সময়টা আগের চেয়ে সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল, বন্ধুত্বের ভাবটা আগের চেয়ে কমে গেল। আপনারা বুঝবেন নিশ্চয়, দিন পনেরো পরেও তাঁর আচরণের কোনো পরিবর্তন না দেখে আমি কিছুটা অধৈর্য হতে শুরু করলাম। সন্ধ্যার এক কোকোয়া আসরে আমি তাঁকে কিছুটা পরিহাসের সুরে বললাম—মিস কেন্টন, আমি আশা করেছিলাম, আপনি এত দিনে আপনার নোটিশটা জমা দেবেন। এ রকম মন্তব্য করার পর একটু হালকা হেসে আমি আশা করলাম, এরপর তিনি খানিকটা নরম হবেন, কিছুটা আপসের মতো সাড়া দেবেন এবং পুরো ঘটনাটা অতীতে রেখে দেবেন। মিস কেন্টন বরং আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন—মি. স্টিভেনস, এখনো আমার ইচ্ছা আগের মতোই আছে, নোটিশটা জমা দিতে পারি যখন-তখন। আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম বলে বিষয়টাতে মনোযোগ দেওয়ারও সময় পাইনি।

আস্তে আস্তে বিষয়টা, মনে হলো, আমরা ভুলে গেলাম। কিন্তু আমার মনে আছে, মেয়ে দুটোর চাকরিচ্যুতির এক বছর পার হওয়ার পর প্রসঙ্গটা আবার এলো।

লর্ড ডার্লিংটনই এক বিকেলে প্রসঙ্গটা তুললেন। তাঁকে আমি ড্রয়িংরুমে চা দিতে গিয়েছিলাম। তত দিনে তাঁর ওপর থেকে মিসেস ক্যারোলিনের প্রভাবশালী সময় শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবেই মহিলা ডার্লিংটন হলে আসা পুরোপুরিই ছেড়ে দিয়েছেন। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ‘ব্ল্যাকশার্টস’-এর সব রকমের সত্যিকারের কদর্য চেহারা দেখার পর লর্ড ডার্লিংটন ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেছেন।

তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন—ওহ্, স্টিভেনস, তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। ওই যে গত বছরের ওই কাজটার কথা বলছি। ওই ইহুদি মেয়ে দুটোর কথা বলছি। মনে পড়ছে তোমার?

অবশ্যই, স্যার।

মনে হয়, ওদের ফিরিয়ে আনার আর কোনো উপায় নেই, তাই না? আসলে ওদের সঙ্গে অন্যায় হয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা উচিত।

আমি বিষয়টা দেখব, স্যার। তবে ওদের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাবে কি না নিশ্চিত বলতে পারছি না, স্যার।

দেখো, কিছু করতে পারো কি না। আমারই ভুল হয়েছে।

আমি ভাবলাম, লর্ড ডার্লিংটনের সঙ্গে আমার এই কথোপকথনের প্রসঙ্গ মিস কেন্টনের মনে আগ্রহ জাগাবে। সুতরাং তাঁর কাছে কথাটা তোলার সিদ্ধান্ত নিই, এমনকি আবার তাঁর রেগে ওঠার বিপদ থাকলেও। যেমনটা দেখা গেল, সেই কুয়াশাঘেরা বিকেলবেলা সামার হাউসে আমার কাছ থেকে প্রসঙ্গটা শুনে তাঁর মধ্যে কৌতূহলই জাগল।

সেই বিকেলে লন পার হওয়ার সময় দেখলাম কুয়াশা তৈরি হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে লর্ড ডার্লিংটন সামার হাউসে কয়েকজন অতিথির সঙ্গে চা খেয়েছেন। তাঁদের টেবিলে পড়ে থাকা জিনিসপত্র গোছানোর জন্য সামার হাউসে যাচ্ছিলাম। আমার বাবা যে সিঁড়িতে পড়ে গিয়েছিলেন সেখানে পৌঁছার আগে দূর থেকে খেয়াল করলাম, সামার হাউসের ভেতরে মিস কেন্টনের অবয়ব ঘোরাফেরা করছে। ওখানে পৌঁছার আগেই তিনি একটা বেতের চেয়ারে বসেছেন। রুমের ভেতরে অনেক চেয়ার ছড়ানো-ছিটানো ছিল। মিস কেন্টন সূচিকর্মে ব্যস্ত। আরো ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, একটা কুশনে মেরামতকাজ করছেন। বেতের আর কাঠের আসবাবের মধ্য থেকে বাসনকোসন গোছাতে থাকি আমি; সে সময় তাঁর সঙ্গে আমার টুকটাক রসিকতার কথা হয়, আমাদের পেশা সম্পর্কিত দু-চারটি কথাও হয়।

শেষে তিনি কথা বললেন—মি. স্টিভেনস, আপনার ধারণাই নেই, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি কতটা সিরিয়াস ছিলাম। যা ঘটতে দেখলাম সেটা আমার মনকে শক্ত আঘাত দিয়ে গেছে। আমি যদি কোনো দিক থেকে যোগ্য কেউ হতাম, আমি জোর দিয়ে বলছি, আমি অনেক আগেই ডার্লিংটন হল ছেড়ে চলে যেতাম। তিনি একটু থামলেন এবং আমি বাইরে দূরে পপলারগাছগুলোর দিকে তাকালাম। তারপর তিনি ক্লান্ত স্বরে বলতে লাগলেন—কাপুরুষতা, মি. স্টিভেনস, মনের দুর্বলতার কারণেই কোথাও যাওয়া হলো না। আর যেতাম কোথায়? আমার তো পরিবার-পরিজন নেই। শুধু খালা আছেন, তাঁকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এক দিনের বেশি থাকা যায় না; মনে হয় জীবনটাই অপচয় হয়ে গেল। নিজেকে বুঝিয়েছি, নতুন কোনো কাজ খুঁজে নেব। কিন্তু আমি তো প্রচণ্ড ভীত ছিলাম, মি. স্টিভেনস। যখনই চাকরি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছি তখনই আমার মনে পড়েছে, কার কাছে যাব, কে আমাকে চিনবে, আমার খেয়াল করবে? আমার সব বড় নীতি ওখানেই শেষ। নিজেকে নিয়ে আমার যে কত লজ্জা! কিন্তু আমি ছেড়ে যেতে পারিনি, মি. স্টিভেনস। নিজেকে কিছুতেই রাজি করাতে পারিনি, প্রস্তুত করাতে পারিনি।

মিস কেন্টন এবার থামলেন এবং মনে হলো, গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। কাজেই আমি ভাবলাম, এখনই উপযুক্ত সময়; যতটা সম্ভব যথাযথভাবে বিষয়টা তুলি। আজকে মি. ডার্লিংটন ও আমার মধ্যে যে কথাগুলো হয়েছে তাঁকে জানাই। তাঁকে জানানোর জন্যই শেষে বললাম, যেটা ঘটে গেছে সেটা আর ফেরানো যায় না। তবু মি. ডার্লিংটনের কথা শুনে ভালো লাগতে পারে; তিনি স্পষ্ট করে ঘোষণা দিয়েছেন, যা ঘটেছে তা বোঝার ভয়ানক ভুল থেকে ঘটেছে। ভাবলাম, শুনলে আপনার ভালো লাগবে, যেহেতু আপনি খুব বিপন্ন হয়ে পড়েছিলেন সে সময়; আমি নিজেও সে রকমই ছিলাম।

যেন এইমাত্র তাঁকে স্বপ্নের ভেতর থেকে কেউ ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে এমন নতুন স্বরে তিনি বললেন, আপনার কথা বুঝতে পারছি না। তারপর আমি তাঁর দিকে ফিরলে তিনি আবার বলা শুরু করেন, রুথ ও সারাহকে গোছগাছ করে পাঠিয়ে দিতে হবে—আপনি এটাই সঠিক ও উচিত বলে জানতেন। আপনি ইতিবাচকভাবে হৃষ্টচিত্ত ছিলেন তখন। মিস কেন্টন, শুনুন। এ রকম ভাবা সত্যিই অন্যায়, ভুল। পুরো বিষয়টা আমাকে গভীর চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। এই হাউসে এ রকম ঘটনা ঘটুক, তা তো দেখতেই চাইনি।

তাহলে, মি. স্টিভেনস, তখন আমাকে এ রকম বলেননি।

আমি বোকার হাসি দিলাম। তবে কী উত্তর দেব খুঁজে না পেয়ে বিমূঢ় হয়ে একমুহূর্ত চুপ করে থাকি। আমার উত্তর তৈরি করার আগেই মিস কেন্টন হাতের সূচিকর্ম রেখে বলেন—মি. স্টিভেনস, আপনি বুঝতে পারছেন, আপনি যদি গত বছর আপনার অনুভূতি আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন তাহলে সেটা আমার জন্য কত বড় পাওয়া হতো? আমার মেয়েদের চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার সময় আমি কতটা আঘাত পেয়েছি আপনি জানতেন। আপনি এখন বুঝতে পারছেন, কতটা ভরসা পেতাম আমি? কেন কেন কেন? আপনাকে সব সময় ভান করতে হবে?

আমি আবার একটা হাসি দিলাম। আলোচনা হঠাৎ হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম—মিস কেন্টন, সত্যিই আপনি কী বলতে চাইছেন, আমি বুঝতে পারছি না। ভান করব? কেন? আসলে...।

রুথ ও সারাহ চলে যাওয়ায় অনেক কষ্ট পেয়েছি। আরো কষ্ট পেয়েছি যখন বুুঝেছি, আমি একা।

ব্যবহৃত বাসনকোসন ট্রেতে তুলতে তুলতে বললাম— সত্যিই, মিস কেন্টন, যে কেউ চাকরি চলে যাওয়া অপছন্দ করে। যে কেউ নিজে থেকে ভাবতে পারে এ রকম।

তিনি কিছু বললেন না। আমি বের হয়ে আসার সময় তাঁকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করলাম। আবারও তিনি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু ততক্ষণে সামার হাউসের মধ্যে অন্ধকার হয়ে এসেছে। ফাঁকা ফ্যাকাসে পটভূমির ওপর শুধু তাঁর একটা পাশ দেখতে পাই। আমি চলে যাওয়ার অজুহাতে বাইরের পথে এগোই।

ওই ইহুদি মেয়ে দুটোর চাকরিচ্যুতির ঘটনা যেহেতু মনে পড়ে গেল, তাদের ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী হলো সেটাও মনে এসে গেল। পুরো ঘটনার ফলস্বরূপ তাদের শূন্যস্থানে আবার নিয়োগ দিতে হলো। তাদের একজনের নাম লিসা।

এই মেয়েটা যখন চাকরির জন্য আবেদন করে, তার রেফারেন্স পরিষ্কার ছিল না। যেকোনো অভিজ্ঞ বাটলারই বুঝতে পারে, এমন ছিল তার রেফারেন্স : সে আগের চাকরিগুলো ছেড়েছে কী কারণে অতটা স্পষ্ট নয়। তারপর মিস কেন্টন এবং আমি যখন তাকে প্রশ্ন করলাম, আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে এলো, মাত্র কয়েক সপ্তাহের বেশি কোথাও কাজ করেনি সে। মোটের ওপর তার সামগ্রিক মনোভাব দেখে মনে হলো, সে ডার্লিংটন হলে নিয়োগ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তার পরও আমরা যখন মেয়েটার সাক্ষাৎকার নেওয়া শেষ করলাম, মিস কেন্টন জোরাজুরি করতে লাগলেন, তাকে নিতেই হবে। আমি প্রতিবাদ জানালে তিনি বললেন, আমি এই মেয়েটার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। সে আমার পুরো তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং সে ভালো করছে কি না আমি নিজে তদারক করব।

আমার মনে আছে, আমরা কিছুক্ষণ মতবিরোধ নিয়েই যার যার মতো যুক্তি দেখিয়ে গেলাম। আগের মেয়ে দুটোর চাকরিচ্যুতির ঘটনাটা তখনো সাম্প্রতিক ছিল; এ জন্য মিস কেন্টনের বিপক্ষে বেশি জুত করে উঠতে পারলাম না। ফলাফল হলো, শেষে আমি তাঁর কথাই মেনে নিলাম; তবে বললাম, মিস কেন্টন, আশা করি আপনি বুঝতে পারবেন, এই মেয়েটাকে নেওয়ার দায়িত্ব প্রকারান্তরে আপনার ওপরেই পড়ে। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে, বর্তমান মুহূর্তে তার অবস্থা কিছুতেই আমাদের স্টাফ হওয়ার মতো নয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার নিয়োগে অনুমতি দিচ্ছি শুধু আপনার কথা মনে করে, আপনি ব্যক্তিগতভাবে তার অগ্রগতির দেখাশোনা করবেন।

মি. স্টিভেনস, আপনি দেখতে পাবেন, মেয়েটা ভালো করবে।

সত্যিই বিস্ময়ের কথা হলো, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দেখলাম, লক্ষণীয় মাত্রায় অগ্রগতি হয়েছে মেয়েটার। দিনে দিনে তার কাজের মনোভাব উন্নত হলো, এমনকি তার হাঁটাচলাও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল। আগে তার দিকে তাকানো যেত না এমন গদাইলশকরি চালে চলত।

আরো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটা অলৌকিকভাবে ভালো করতে করতে আমাদের স্টাফ হওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছে গেল। মিস কেন্টনের বিজয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠল। যেসব কাজ করতে একটু বেশি দায়িত্ববোধের দরকার তেমন কাজও তাকে দিতে মিস কেন্টন যেন আনন্দ পেতে লাগলেন। আর আমি সামনে থাকলে তাঁর পরিহাসমূলক প্রকাশভঙ্গি দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেন। সেই সন্ধ্যায় মিস কেন্টনের পার্লারে আমাদের কোকোয়ার আসরে লিসাকে নিয়ে আমরা যে রকম কথাবার্তা বলতে অভ্যস্ত সে রকমই চলল।

মি. স্টিভেনস, শুনে আপনি নিশ্চয় মারাত্মক হতাশ হবেন, লিসা এখন পর্যন্ত এমন কোনো ভুলত্রুটি করেনি, যেটা নিয়ে আপনি কথা বলতে পারেন।

আমি মোটেও হতাশ নই, মিস কেন্টন। আমি আপনার এবং আমাদের সবার জন্যই খুব আনন্দিত বোধ করছি। এ পর্যন্ত যা দেখছি, এই মেয়েটাকে নিয়ে আপনি মোটামুটি সফলতা অর্জন করেছেন।

মোটামুটি সফলতা মানে? মি. স্টিভেনস, আপনার মুখে ছড়িয়ে পড়া এই হাসিটা দেখুন। যখনই আমি লিসার কথা বলি আপনার মুখে এই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ে। আপনার এই হাসির পেছনে গল্প আছে। খুব মজার গল্প।

 

তাই নাকি, মিস কেন্টন? আমি কি শুনতে পারি সেই গল্প?

খুব মজার গল্প, মি. স্টিভেনস। মজার বিষয় হলো, আপনি লিসার ব্যাপারে সব সময়ই নৈরাশ্যবাদী। কারণ হলো লিসা দেখতে খুব সুন্দর, তাতে সন্দেহ নেই। আমি লক্ষ করে দেখেছি, আমাদের স্টাফে যারা দেখতে সুন্দর তাদের প্রতি আপনার এক ধরনের অনীহ ভাব আছে।

আপনি ভালো করেই জানেন, আপনি পুরোপুরি অর্থহীন কথাবার্তা বলছেন, মিস কেন্টন।

কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি, মি. স্টিভেনস। আপনি আমাদের সুন্দরী মেয়েদের পছন্দ করেন না। কারণটা কি তাহলে কাজে মনোযোগ নষ্ট হবে বলে আমাদের মি. স্টিভেনস ভয় পান? এমনকি হতে পারে, আমাদের মি. স্টিভেনস পুরোপুরিই রক্তমাংসে গড়া এবং সে জন্য নিজের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতে পারেন না?

সত্যিই, মিস কেন্টন, যদি দেখতাম, আপনার কথার সামান্যতম অর্থ আছে তাহলে আপনার সঙ্গে এই আলোচনায় সময় নষ্ট করতাম। যেহেতু আপনি অর্থহীন কথাবার্তা বলছেন, আমি বরং অন্য কোনো কাজে চলে যাই; আপনি বকবক করতেই থাকুন।

আহ্হা, তাহলে আপনার মুখে এ রকম অপরাধীর হাসি কেন, মি. স্টিভেনস?

মিস কেন্টন, এটা মোটেই অপরাধীর হাসি নয়। অর্থহীন কথা বলার আপনার বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখে আমি খানিক আমোদিত। তার বেশি কিছু নয়।

আপনার মুখে খানিক অপরাধীর হাসি দেখা যাচ্ছে, মি. স্টিভেনস। আমি খেয়াল করে দেখেছি, আপনি লিসার দিকে তাকাতেই পারেন না। এখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আপনি লিসার নিয়োগের সময় কেন এত জোর আপত্তি জানিয়েছিলেন।

আমার আপত্তির শক্ত ভিত ছিল, মিস কেন্টন। আপনি নিজেও ভালো করে জানেন। মেয়েটা যখন আমাদের কাছে আসে, সে পুরোপুরিই অনুপযোগী ছিল।

এখন আপনারা ভালো করে বুঝতে পারছেন, আমরা অন্য স্টাফদের কানে যেতে পারে এ রকম মেজাজে কোনো বিষয়ে কথা বলিনি কখনো। তবে আমাদের কোকোয়া আসরে ওই সময়ে এ রকম নিরীহ কথাবার্তা বলার মতো পরিবেশ পাওয়া যেত এবং অবশ্যই পেশাগত গণ্ডির ভেতরে চলত সেসব কথাবার্তা। সারা দিনের কঠিন ধকলের পর এ রকম কথাবার্তায় মানসিক স্বস্তি পাওয়া যেত।

লিসা আমাদের সঙ্গে ছিল আট-নয় মাসের মতো। তার অস্তিত্বের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এ রকম একটা সময়ে সে দ্বিতীয় খানসামার সঙ্গে পালিয়ে গেল। বড় কোনো হাউসের বাটলারের জীবনে এ রকম ঘটনা দেখা অপরিহার্য বিষয়ের মতো।

এসব ঘটনা প্রচণ্ড রকমের বিরক্তিকর। কিন্তু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মেনে নেওয়ার মানসিকতাও তৈরি হয়ে যায়। সাধারণত সভ্য বাটলাররাই এ রকম ‘চাঁদের আলোয়’ বিদায় হওয়ার ঘটনা মেনে নিয়ে থাকে। সামান্য খাবারদাবার ছাড়া তারা দুজন হাউসের আর কিছুই নেয়নি। আর দুজনই চিরকুট লিখে রেখে গেছে। দ্বিতীয় খানসামার নামই আমার এখন মনে নেই; সে আমাকে উদ্দেশ করে চিরকুটে কিছুটা এ রকম লিখেছে : প্লিজ, আমাদের বেশি কড়া নজরে বিচার করবেন না। আমরা একজন আরেকজনের প্রেমে পড়েছি এবং বিয়ে করতে যাচ্ছি। লিসা একটু বড় চিঠি লিখেছে। হাউসকিপার সম্বোধন করে মিস কেন্টনকে লিখেছে সে। মিস কেন্টন আমার ভাঁড়ারে নিয়ে এলেন তাঁর চিঠি। রাতে তারা পালিয়েছে; সকালবেলা তিনি এলেন আমার রুমে। অসংখ্য ভুল বানানে, অসংলগ্ন বাক্যে সে লিখেছে, তারা একজন আরেকজনের প্রেমে কতটা ডুবেছে। দ্বিতীয় খানসামা কত চমৎকার মানুষ এবং তাদের সামনে কত সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে—এসব লিখেছে। একটা লাইন এ রকম : আমাদের টাকা-পয়সা নেই; কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আমাদের কত ভালোবাসা আছে। ভালোবাসা থাকলে আর কী চাই? আমরা একজন আরেকজনকে পেয়েছি। এটাই তো সবাই চায়। চিঠির দৈর্ঘ্য তিন পৃষ্ঠা হলেও মিস কেন্টন যে তার জন্য এত কিছু করেছেন তার কোনো উল্লেখ নেই, কোনো সম্বোধন পর্যন্ত নেই। আমাদের সবাইকে ফাঁসিয়ে দিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো অনুতাপের একটা কথাও নেই।

মিস কেন্টন যে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন তা পরিষ্কার বোঝা গেল। মেয়েটার চিঠিতে আমি যতক্ষণ চোখ বুলিয়ে গেলাম তিনি আমার সামনে চুপ করে টেবিলে বসে রইলেন; তাঁর দৃষ্টি তাঁর হাতের ওপর। আসলে তাঁর এ রকম অবস্থা দেখে আমার কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। ওই সকালে তাঁকে যে রকম হৃত অবস্থায় দেখেছি তেমন অবস্থায় আর কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আমি চিঠিটা টেবিলের ওপর রেখে দেওয়ার পর তিনি বললেন—তাহলে মি. স্টিভেনস, আপনার কথাই ঠিক হলো, আমার ধারণা ভুল হয়ে গেল। মিস কেন্টন, কোনো কিছু নিয়ে আপনার ভেঙে পড়ার কিছু নেই। এ রকম হয়েই থাকে। এগুলো থামানোর মতো ক্ষমতা আমাদের মতো মানুষের নেই।

আমারই ভুল ছিল, মি. স্টিভেনস। আমি মেনে নিচ্ছি। সব সময় আপনার কথাই ঠিক হয়েছে। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

মিস কেন্টন, আমি সত্যিই আপনার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। আপনি মেয়েটার জন্য বিস্ময়কর কাজ করেছেন। আপনি ওকে নিয়ে যা যা করেছেন তাতে দেখা গেছে, আপনার অনুমানই ঠিক হয়েছে; আমারটা ভুল হয়েছে। মিস কেন্টন, এখন যা ঘটেছে অন্য যেকোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে ঘটতে পারত। আপনি ওর জন্য লক্ষণীয় রকমের ভালো চেষ্টা করেছেন। ওর জন্য আপনার মন খারাপ হতে পারে, কিন্তু নিজেকে আপনি কিছুতেই দায়ী মনে করতে পারেন না।

মিস কেন্টনকে আগের মতোই বিষণ্ন দেখা গেল। তিনি মৃদু কণ্ঠে বললেন, আপনার কোমল মনের কারণে আপনি এ রকম বলতে পারছেন। আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তারপর তিনি ক্লান্ত ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মেয়েটা এত বোকা! ওর সামনে ভালো ক্যারিয়ার ছিল। ওর ক্ষমতা ছিল। ওর মতো অল্পবয়সী অনেক মেয়েই এ রকম সুযোগ হারায়। কিন্তু কী পায়?

আমাদের মাঝখানে রাখা চিঠিটার দিকে আমরা দুজনই একসঙ্গে তাকালাম। তারপর মিস কেন্টন তাঁর চাহনিতে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকালেন।

আমি বললাম, আপনি যেমনটা বলেছেন, কত বড় অপচয়।

বেকুবের বেকুব। মেয়েটা একসময় পস্তাবে। ও যদি ধৈর্য ধরে থাকত তাহলে সুন্দর জীবন পেত ভবিষ্যতে। দু-এক বছরের মধ্যে ওকে আমি প্রস্তুত করে ফেলতে পারতাম। ছোট কোনো হাউসে হাউসকিপারের পদ পেয়ে যেত। আপনি হয়তো অত দূরই ভাবতেন, কিছু করার ক্ষমতা। কিন্তু দেখুন, আমি মাত্র কয়েক মাসে ওকে কত দূর নিয়ে এসেছি। আর ও কী করল? সব কিছু ফেলে দিয়ে চলে গেল, বিনা কারণে।

মেয়েটার বিরাট বোকামি।

আমার সামনের কাগজগুলো গোছানো শুরু করলাম। ভাবলাম, ফাইলবন্দি করে রেখে দিই। রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। তখনই আমার মনে হলো, মিস কেন্টন কি চান, আমিই রেখে দিই চিঠিটা, নাকি তিনি নিজেই রেখে দেবেন? তারপর আমি পৃষ্ঠাগুলো আমাদের দুজনের মাঝখানে রাখলাম। তখনো মনে হলো, মিস কেন্টন ভাবনার ভেতর বহুদূর চলে গেছেন।

তিনি আবার বললেন, ওকে পস্তাতেই হবে। এত বোকা!

কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমি এসব পুরনো স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে গেছি। স্মৃতির ভেতর ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। তবে খুব খারাপ হয়নি। কারণ নইলে অযথাই আজকের সন্ধ্যার ঘটনাগুলোর ভেতর মগ্ন হয়ে যেতাম। আপাতত সেদিকটা এড়ানো গেল। সন্ধ্যার ঘটনাগুলো আমার তরফের কোনো চেষ্টা ছাড়াই একটা পরিণতিতে চলে এসেছে। বলতেই হবে, ওই কয়েক ঘণ্টা ছিল চেষ্টা করে যাওয়ার সময়।

আমি এখন আছি মি. ও মিসেস টেলরের ছোট কটেজের চিলেকোঠার রুমে। বলতে গেলে এটা একটা ব্যক্তিগত বাড়ি। টেলরদের দাক্ষিণ্যে আমি যে রুমটা পেয়েছি সেটাতে একসময় তাঁদের বড় ছেলে থাকত। এখন বড় হয়ে গেছে, এক্সেটারে থাকে। এই রুমটাতে বিরাট বিরাট কড়িবর্গা আর সব কিছু ভারী কাঠের তৈরি। ফ্লোরবোর্ডের ওপর কোনো কার্পেট কিংবা মোটা চাদর নেই। পরিবেশটা বিস্ময়কর রকমের আরামদায়ক। মিসেস টেলর নিজে শুধু আমার বিছানা প্রস্তুত করে দেননি, বরং তিনি সব কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেও দিয়েছেন। শুধু কড়িকাঠের দু-একটা জায়গায় কয়েক টুকরো মাকড়সার জাল ছিল। এই রুমটা যে অনেক বছর কেউ ব্যবহার করেনি তেমন বলার সুযোগ খুব কমই।

আমি যে এখানে আছি এবং নিজের ইচ্ছায় উদ্দেশ্য নিয়ে মি. ও মিসেস টেলরের উদার আতিথ্য গ্রহণ করেছি, তার পেছনে কারণ আমার বেকুবি ও উন্মাদকর সহজ-সরল অসতর্কতা, মানে আমি চালাতে চালাতে ফোর্ডের পেট্রল শেষ করে ফেলেছিলাম। আজকের সমস্যা এবং গতকালের রেডিয়েটরে পানিশূন্যতার ঘটনা থেকে যদি কোনো পর্যবেক্ষক আমাকে সাধারণভাবে বলে থাকে অগোছালো থাকা আমার স্বভাবের দোষ তাহলে তার মন্তব্যে যুক্তিহীনতা থাকে না। অবশ্য উল্লেখ করা যেতে পারে, দূরের যাত্রায় আমি কিছুটা নবিশের মতো; কাজেই এ রকম সোজাসাপটা অসতর্কতা অপ্রত্যাশিত নয়। তবু যখন কেউ মনে করে থাকে, সব কিছু ভালোমতো গুছিয়ে রাখার গুণ ও সতর্কতা যেকোনো পেশারই কেন্দ্রে থাকে, তাহলে কারো ব্যর্থতা তার নিজের ইচ্ছায় হয়ে থাকে—এমন অনুভূতি এড়ানো কঠিন।

কিন্তু সত্যি কথা হলো, পেট্রল ফুরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে অনেকটা বেখেয়াল ছিলাম। পরিকল্পনা করেছিলাম, রাত টাভিনস্টকে কাটাব। সেখানে আটটা বাজার কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেছিলাম। তবে শহরের প্রধান পান্থশালা থেকে আমাকে জানানো হলো, স্থানীয় কৃষি মেলার কারণে সেখানকার সব রুম ভাড়া হয়ে গেছে। আমাকে আরো কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের নামধাম জানিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু সব কটিতে খোঁজ নিতে গিয়ে একই রকম উত্তরের সম্মুখীন হতে হলো; সবাই অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাইল। শেষে গেলাম শহরের প্রান্তে এক বোর্ডিং হাউসে। সেখানকার মালিক মহিলা আমাকে আরো কয়েক মাইল সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বললেন। জানালেন, রাস্তার পাশে একটা পান্থশালা আছে; তাঁর এক আত্মীয় সেটা চালান।  মেলা উপলক্ষে আসা লোকজন সেখানে যাওয়ার কথা নয়।

তিনি আমাকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিলেন; তাঁর সামনে তো আমার কাছে জলবৎ মনে হলো। কিন্তু কার যে ভুল ছিল বুঝলাম না, রাস্তার পাশে এ রকম কোনো প্রতিষ্ঠানই খুঁজে পেলাম না। বরং পনেরো মিনিটের মতো গাড়ি চালিয়ে দেখলাম, আমি একটা দীর্ঘ রাস্তায় পড়ে গেছি; রাস্তাটা আঁকাবাঁকা বিবর্ণ পতিত এলাকার ভেতর দিয়ে চলে গেছে। দুই পাশেই দেখলাম জলাভূমিপূর্ণ মাঠ। আর আমার রাস্তা বরাবর গড়িয়ে যাচ্ছে কুয়াশা। বাঁ পাশে সূর্যের শেষ আভা দেখতে পেলাম। দিগন্তরেখায় এখানে-ওখানে ছেদ ফেলেছে রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে মাঠের ভেতরের গোলাবাড়ি আর খামারবাড়ির অবয়ব। তা ছাড়া তো মনুষ্য বসতির আর কোনো চিহ্ন দেখতে পেলাম না, সব মনে হয় পেছনে ফেলে রেখে এসেছি।

মনে আছে, ওখান থেকে আবার পেছনের দিকে গাড়ি ঘোরালাম। কিছুদূর ফেরার পর রাস্তার এক বাঁক দেখতে পেলাম। সেখান থেকে নতুন একটা রাস্তা ধরে এগোতে গিয়ে দেখলাম, এটা তো আগেরটার চেয়ে আরো নির্জন। রাস্তার দুই পাশের ঝোপঝাড়ের কারণে আপাত-আবছা পরিবেশে আরো কিছুদূর এগোলাম। তারপর দেখলাম, রাস্তাটা খাড়া ওপরের দিকে উঠে গেছে। ততক্ষণে আমি রাস্তার পাশের কোনো পান্থশালা পাওয়ার আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছি। মনস্থির করলাম, সামনে শহর কিংবা গ্রাম যা পাব সেখানেই আশ্রয়ের খোঁজ করব। সেটাই বরং সোজা হবে এবং নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, সকালবেলা আমার পরিকল্পিত পথে এগোব। পাহাড়ি রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত গিয়েছি সবে, তখনই ইঞ্জিনের গড়গড় শব্দ শুনলাম। প্রথমবারের মতো দেখলাম পেট্রল ফুরিয়ে গেছে।

কয়েক গজ উঠেও গেল ফোর্ড। তারপর একেবারে থেমে গেল। আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো করে বোঝার জন্য গাড়ি থেকে বের হয়ে দেখি, আমার জন্য দিনের আলো আর কয়েক মিনিট থাকবে। একটা খাড়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি; গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের সারি রাস্তার ওপরে এসে ঝুঁকে পড়েছে। সামনের দিকে আরো ওপরে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় হালকা হয়ে গেছে। ওখানে একটা তারের গেট দেখা যাচ্ছে, নিচ থেকে মনে হচ্ছে, আকাশের গায়ে লেগে আছে গেটটা। গেট সোজা ওপরের দিকে উঠতে থাকি; ওখান থেকে হয়তো বোঝা যাবে আমি কোথায় আছি। মনের ভেতর হয়তো খানিক আশা ছিল, আশপাশে কোথাও একটা খামারবাড়ির দেখা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে দ্রুত কোনো সহযোগিতাও পেতে পারি। কিন্তু চোখের সামনে যা দেখলাম তাতে মন দমে গেল : গেটের ওখান থেকে নিচের দিকে একটা মাঠ খাড়া হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। এত খাড়া হওয়ার কারণে মাত্র বিশ গজের মতো দূরে গিয়েই আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। মাঠের উঁচু জায়গাটার পরেই দূরে একটা পথ আছে মনে হলো। হয়তো মাইলখানেক দূরে, কিংবা কাক উড়ে যাওয়ার মতো দূরত্বে একটা গ্রামের চেহারা দেখা যাচ্ছে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে গির্জার চূড়া দেখা যাচ্ছে। তার আশপাশে থোকা থোকা কালো স্লেটের ছাদ, এখানে-ওখানে চিমনি থেকে সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওপরে উঠে যাচ্ছে। এত দূরে এসব দেখে কারো মনে হতে পারে, সে হতাশার কাছে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতিটা কিছুতেই একেবারে নৈরাশ্যজনক নয়। ফোর্ড তো নষ্ট হয়ে যায়নি, জ্বালানি ফুরিয়েছে শুধু।

মনমরা হয়ে কিছু পাওয়া যায় না। দিনের আলোর বাকিটা নষ্ট করার কোনো কারণই নেই। আবার ফোর্ডের কাছে হেঁটে ফিরে গেলাম এবং জরুরি কয়েকটা জিনিস একটা ব্রিফকেসে প্যাকেট করে নিলাম। আমার সঙ্গে একটা সাইকেলের ল্যাম্প ছিল; সেটাও নিয়ে সজ্জিত হয়ে নিলাম; ল্যাম্পটা ভালোই আলো দেয়। এরপর পথের সন্ধানে পা বাড়ালাম। এই পথটাই আমাকে ওই গ্রামে পৌঁছে দেবে, এমনটাই আশা। গেট পার হয়ে যদিও পাহাড় বেয়ে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলাম, তবু কোনো পথের দেখা মিলল না। তারপর যখন বুঝতে পারলাম পাহাড়ের ওপরের ওই রাস্তাটা আর ওপরের দিকে যাচ্ছে না, খেয়াল করে দেখলাম একটা বাঁক নিয়েছে রাস্তাটা। দেখলাম ওই গ্রামটা থেকে বেশ দূর দিয়েই রাস্তাটা অন্যদিকে চলে গেছে। কিছুটা দমে গেলাম। গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে থেকে থেকে গ্রামের আলো চোখে পড়ছে। ওই সময় এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, আমার ফোর্ডের কাছে ফিরে যাই, ভেতরে বসে অপেক্ষা করি, কখন আরেকটা গাড়ি আসে। ততক্ষণে অন্ধকার প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। ওই রকম একটা পরিস্থিতিতে কোনো গাড়ির দেখা পেলেও সেটা থামাতে গেলে গাড়ির লোকজন আমাকে ডাকাত কিংবা ওই রকম কিছু একটা মনে করবে। আবার আমি যে এতক্ষণ ফোর্ড থেকে নেমেছি এ পর্যন্ত একটা গাড়িও আসতে দেখলাম না এ পথে। এমনকি টাভিনস্টক থেকে এদিকে আসার সারা পথেও একটা গাড়ি দেখিনি। তারপর মনস্থির করলাম, গেট পর্যন্ত ফিরে যাব, ওখান থেকে সোজা মাঠের ভেতর নেমে পড়ব, যতটা সম্ভব সোজা গ্রামের আলোগুলোর দিকে হাঁটতে থাকব। মাঠের ভেতর পায়ে চলার মতো পথ থাকুক, আর না-ই থাকুক।

ওখান থেকে নেমে যাওয়াটা খুব বেশি কষ্টকর মনে হলো না। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলাম গ্রামের দিকে। প্রতিটা মাঠের প্রান্ত ঘেঁষে নেমে গেলে হাঁটা খুব বেশি হওয়ার কথাও নয়। শুধু গ্রামটার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর দেখলাম, এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ নেই। আমার সামনে এগোনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো ঝোপঝাড়ের কারণে সমস্যা হচ্ছিল বলে ল্যাম্পের আলোর সাহায্য নিতেই হলো। সামনের বাধাটা পার হওয়ার জন্য নিজেকে জোর দিতে হলো; আমার জ্যাকেটের কাঁধ আর ট্রাউজার্সের পা গোটানোর মধ্য দিয়ে বাধাটা পার হলাম। সামনের কয়েকটা মাঠ ক্রমেই কাদাময় দেখা গেল। আমি ইচ্ছা করেই আমার জুতা আর ট্রাউজারের গোটানো অংশে ল্যাম্পের আলো ফেললাম না। নইলে আরো হতাশা জেঁকে বসতে পারে।

আস্তে আস্তে একটা বাঁধানো রাস্তা পেলাম; সেটা গ্রামের ভেতর নেমে গেছে। ওই রাস্তায় এগিয়ে যেতে যেতেই আমার আজকের রাতের আতিথ্যকর্তা মি. টেলরের সঙ্গে আমার দেখা। আমার কয়েক গজ সামনের এক মোড় থেকে বের হলেন তিনি। আমার জন্য শিষ্টাচারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর ক্যাপে হাত রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো সহযোগিতা করতে পারেন কি না। আমার অবস্থা মোটামুটি সংক্ষিপ্তভাবেই জানালাম তাঁকে, আরো জানালাম, আমি খুব খুশি হব যদি তিনি একটা পান্থশালার পথ দেখিয়ে দেন। তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, সে রকম কোনো পান্থশালা আমাদের গ্রামে তো নেই, স্যার। জন হামফ্রে তাঁদের ক্রসড কিজে ভ্রমণের লোকজনের থাকার ব্যবস্থা করে থাকেন। কিন্তু এখন তো তিনি ছাদ মেরামতের কাজ করছেন। এই দুঃখজনক খবরটা আমার ওপরে পুরোপুরি প্রতিক্রিয়া তৈরি করার আগেই অবশ্য মি. টেলর বললেন, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনাকে আমরা একটা রুম এবং থাকার বিছানাপত্রের ব্যবস্থা করতে পারি। তেমন বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নয়, তবে সব কিছু ঠিক আছে কি না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মোটামুটি আরামদায়ক আছে কি না আমার স্ত্রী দেখবেন।

আমার মনে হয়, আমি কয়েকটা কথা বললাম কিছুটা অমনোযোগেই এবং বোঝাতে চাইলাম, তাঁদের এতটা অসুবিধায় ফেলতে চাই না। তার পরিপ্রেক্ষিতে মি. টেলর বললেন—আপনাকে জানাচ্ছি, স্যার, আপনাকে আমাদের কাছে থাকার ব্যবস্থা করতে পারলে আমরা গর্বিত হব। আপনার মতো মানুষকে আমরা মসকোম্বেতে খুব একটা পাই না। আর সত্যি বলছি, আপনি এখন এই মুহূর্তে আর কী ব্যবস্থাই বা করতে পারবেন? আপনাকে এভাবে রাতের বেলা অসহায় অবস্থায় ফেলে গেলে আমার স্ত্রী তো কখনো আমাকে মাফ করবেন না। এভাবেই আমি মি. ও মিসেস টেলরের সদয় আতিথেয়তা পেলাম। তবে আজকের সন্ধ্যার ঘটনা সম্পর্কে কথা বলার সময় গাড়ির পেট্রল ফুরিয়ে যাওয়ার হতাশার কথা এবং গ্রামের ভেতরে আসার পথে আমার গোঁয়ারে সাহসের কথাটা বললাম না। কারণ মি. ও মিসেস টেলর এবং তাঁদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমি খেতে বসার পর যা ঘটল তাতে প্রমাণিত হলো যে অপরিহার্য শারীরিক কষ্ট ভোগ করেছি আমি, তার চেয়ে আমার বুদ্ধির ওপর চাপ পড়েছে বেশি। নিশ্চিত করে বলতে পারি, শেষ পর্যন্ত এই রুমটা পাওয়া এবং অতীতে ফেলে আসা ডার্লিংটন হলে কাটানো এতগুলো বছরের স্মৃতির পাতা ওল্টানো বেশ স্বস্তির ব্যাপার ছিল।

আসল কথা হলো, ইদানীং আমার এ রকম স্মৃতি রোমন্থনে ডুবে থাকতে ভালো লাগে। কয়েক সপ্তাহ আগে মিস কেন্টনের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনাটা দেখা দেওয়ার পর থেকে আমাদের সম্পর্ক এ রকম পরিবর্তনের মধ্যে পড়ল কেন তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় পার করছি আমি। আমাদের সম্পর্ক যে পরিবর্তনের মধ্যে পড়েছিল তা তো একেবারেই সত্যি। সেটা ১৯৩৫ কিংবা ১৯৩৬ সালের দিকের কথা। অনেক দিন ধরে আমরা ধীরে ধীরে যে পেশাগত বোঝাপড়া তৈরি করেছিলাম সেটি ওই সময়ে পরিবর্তনের ভেতর পড়ে যায়। আসলে দিনের শেষে সন্ধ্যায় আমরা যে কোকোয়া পানের জন্য বসতাম, শেষের দিকে সেটাও বাদ হয়ে গেল। এ রকম পরিবর্তন আসলে কী কারণে হলো, কী কী ঘটনা এর পেছনে ছিল আমি ঠিকমতো বের করতে পারিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মনে পড়ে যায়, মিস কেন্টন নিজের ইচ্ছায় আমার ভাঁড়ারে যেদিন সন্ধ্যায় এসেছিলেন সেদিনের ঘটনাটা মনে হয় একটা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি কী কারণে আমার রুমে এসেছিলেন এখন আর আমার পরিষ্কার মনে পড়ে না। আমার মনে হয়, তিনি একটা ফুলদানি নিয়ে এসেছিলেন, বলেছিলেন, আমার রুমটা সাজিয়ে দেবেন। কিন্তু আবার গুলিয়ে দেওয়ার মতো একটা ঘটনাও মনে পড়ে যাচ্ছে, আমাদের পরিচয়ের শুরুতে কয়েক বছর আগে তিনি একই কাজ করেছিলেন। আমার তো সত্যি বলেই মনে হয়, এত বছরে তিনি মোট তিনবার এসেছিলেন আমার রুম ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিতে। তবে আমার পরিষ্কার বিশ্বাস হচ্ছে না, সেদিন ওই বিশেষ সন্ধ্যায় তিনি ওই উদ্দেশ্যেই এসেছিলেন। আমাদের মধ্যে অনেক বছরের সুন্দর পেশাগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও হাউসকিপার সারা দিন আমার রুমে যাওয়া-আসা করছেন—পরিস্থিতি আমি এ রকম হতে দিইনি। আমি যেমনটা চাই, বাটলারের ভাঁড়ার হলো একটা মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কোনো হাউস ঠিকমতো চালানোর জন্য একেবারে কেন্দ্রীয় একটা জায়গা; যুদ্ধের সময় জেনারেলের হেডকোয়ার্টার্সের মতো নয়। এখানকার সব জিনিস ঠিকমতো সাজানো থাকবে, সাজানো রাখতে সহায়তা করতে হবে। মানে যথাযথভাবে, যেটা যেখানে থাকার কথা সেখানেই। যেসব বাটলার সব রকমের মানুষকে তাদের ভাঁড়ারে অহরহ ঢুকতে বের হতে দেয়, এটা-ওটা জিজ্ঞেস করতে দেয়, বিড়বিড় করে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেয় আমি তাদের মতো নই। সব কিছু ঠিকমতো সমন্বিত পদ্ধতিতে করতে চাইলে অবশ্যই বাটলারের ভাঁড়ারটা হাউসের মধ্যে এমন একটা জায়গা হবে, যেখানে গোপনীয়তা ও নির্জনতার নিশ্চয়তা থাকবে।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি যখন আমার ভাঁড়ারে এলেন আমি আসলে পেশাগত কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলাম না। মানে দিনের শেষ সময় তখন; ওই সপ্তাহে বিশেষ কোনো আয়োজনের ব্যস্ততাও ছিল না। আমি বিরল ও দায়িত্বমুক্ত ঘণ্টাখানেক সময় কাটাচ্ছিলাম। যেমন বলছিলাম, মিস কেন্টনের হাতে ফুলদানিটা ছিল কি না আমার স্পষ্ট মনে নেই; তবে তাঁর কথাগুলো মনে আছে। তিনি বললেন, মি. স্টিভেনস, আপনার রুমটা দিনের বেলার চেয়ে রাতে আরো ছোট মনে হয়। বিদ্যুতের ওই বাল্বটা অতিরিক্ত মুদৃ। এত অল্প আলো আপনার পড়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

যথেষ্ট আলো আছে, মিস কেন্টন। আপনাকে ধন্যবাদ।

মি. স্টিভেনস, আপনার রুমটা জেলখানার সেলের মতো। শুধু কোনায় একটা বিছানার ব্যবস্থা থাকলেই কল্পনা করা যেত, এখানে সাজাপ্রাপ্ত কেউ জীবনের শেষ সময় কাটাচ্ছে।

সম্ভবত তাঁর এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি কিছু বলেছিলাম। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না। যা-ই হোক, পড়া থেকে চোখ তুললাম না। কয়েক মুহূর্ত এভাবে কেটে গেল। আশা করলাম, কোনো কাজের অজুহাত দেখিয়ে মিস কেন্টন চলে যাবেন। কিন্তু তখনই তাঁর মুখ থেকে শুনলাম—মি. স্টিভেনস, আপনি কী পড়ছেন, জানতে ইচ্ছা করছে।

একটা বই পড়ছি, মিস কেন্টন।

তা তো দেখতেই পাচ্ছি, মি. স্টিভেনস। কিন্তু কী ধরনের বই পড়ছেন, সেটাই আমার জানার আগ্রহ।

আমি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি, মিস কেন্টন আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি বইটা বন্ধ করে দিলাম। বইটা আমার গায়ের সঙ্গে আটকে ধরে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

এবার বললাম, মিস কেন্টন, আমি সত্যিই আশা করি, আপনি আমার গোপনীয়তাকে সম্মান করবেন।

কিন্তু মি. স্টিভেনস, আপনি বইটা নিয়ে এত লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আমার সন্দেহ হচ্ছে, এটা কোনো রসালো বই।

আপনি যে রকম রসালো বলছেন এ রকম বই লর্ড সাহেবের লাইব্রেরিতে থাকার প্রশ্নই ওঠে না, মিস কেন্টন।

আমি শুনেছি, জ্ঞানগর্ভ বইয়েও অনেক রসালো প্যাসেজ থাকে। অবশ্য আমার দেখার সাহস হয়নি। তাহলে মি. স্টিভেনস, আমাকে দেখতে দেন না আপনি কী পড়ছেন।

মিস কেন্টন, আমি আপনাকে এখান থেকে চলে যেতে বলছি। আমাকে একা থাকতে দিন। আপনি আমার নিজস্ব এই সামান্য সময়টাতে এসে এভাবে জোরাজুরি করবেন—এটা অসম্ভব। কিন্তু মিস কেন্টন আমার দিকে এগোতেই থাকেন। আমার বলা দরকার, ওই মুহূর্তে আমার কী করা উচিত বুঝতে পারি না। একবার মনে হলো, কোনো রকমে ঠেসে বইটা আমার ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে তালা দিয়ে দিই। কিন্তু পরের মুহূর্তে মনে হলো—না, এটা বেশি নাটকীয় দেখাবে। বইটা তখনো আমার হাতে ধরা; আমি কয়েক কদম পিছিয়ে যাই।

আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতেই মিস কেন্টন বলেন, আপনার হাতে ধরা ভলিউমটা দেখতে দিন; তাহলে আমি চলে যাব। আপনি একা একা আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারবেন। কী কারণে আপনি বইটা লুকিয়ে ফেলছেন?

মিস কেন্টন, আপনি বইটার নাম বের করতে পারুন আর না-ই পারুন সেটা আমার কাছে তেমন গুরুত্বের কিছু নয়। কিন্তু একটা নীতির প্রশ্নে আপনার এভাবে আসাটার ঘোর আপত্তি জানাচ্ছি। আপনি আমার গোপনীয়তায় আক্রমণ করছেন।

মি. স্টিভেনস, আমার দেখার ইচ্ছা, এটা সমীহ জাগানোর মতো কোনো বই কি না। নাকি আপনি এর কুিসত প্রভাব থেকে আমাকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।

তারপর তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়েই রইলেন। তখনই পরিবেশটাতে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন চলে এলো—মনে হলো, আমাদের দুজনকে অস্তিত্বের একেবারে ভিন্ন কোনো জগতে ফেলা হয়েছে। আমি এখানে কী বোঝাতে চাইছি, বলা মুশকিল। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমাদের চারপাশের সব কিছু অনড় হয়ে গেল। আমার মনে হলো, মিস কেন্টনের আচরণেও আকস্মিক পরিবর্তন এসে গেছে। তাঁর চেহারায় অদ্ভুত একটা সিরিয়াস প্রকাশ দেখতে পেলাম। আমার মনে হলো, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেছেন।

প্লিজ, মি. স্টিভেনস, আপনার বইটা আমাকে দেখতে দিন।

তিনি আরো খানিক এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে বইটা আমার হাত থেকে বের করে নিতে লাগলেন। আমার মনে হলো, তিনি যতক্ষণ এভাবে বইটা আমার হাত থেকে নিচ্ছেন আমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকব। কিন্তু তাঁর শরীর যেহেতু একেবারে আমার শরীরের কাছাকাছি এসে গেছে, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকাটাও সহজে করতে পারব না, সে জন্য মাথাটা অস্বাভাবিক রকম কাত করে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মিস কেন্টন ধীরে ধীরে বইটা আমার হাত থেকে বের করে নিলেন, যেন লড়াইয়ে জিতে নিলেন বইটা। আমার আঙুল একটা একটা করে বইটার ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারাতে লাগল। এভাবে বই কেড়ে নেওয়ার পর্যায়টা বেশ দীর্ঘ মনে হলো। গোটা সময়ই আমার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অপরিবর্তিত রাখলাম। শেষে তিনি বললেন—বাঁচা গেল, মি. স্টিভেনস। এটা তো মোটেও তেমন লজ্জাজনক নয়। আবেগঘন সামান্য একটা প্রেমকাহিনি।

এই পর্যায়ে এসে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর বেশি সহ্য করা যাবে না। মিস কেন্টনকে তখন কী বলেছিলোম, মনে নেই। তবে মনে আছে, তাঁকে আমার ভাঁড়ার থেকে বের হয়ে যাওয়ার কঠোর আদেশ দিয়েছিলাম এবং ওই পর্ব ওখানেই শেষ করে দিয়েছিলাম।

যে বইটা নিয়ে ওই খুদে পর্বের আবতারণা হয়েছিল সেটা সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। বইটা আসলে একটা ভাবালু রোমান্স। লাইব্রেরিতে এ রকম বই আরো ছিল। অতিথিদের রুমেও কয়েকটা ছিল, বিশেষ করে মহিলা অতিথিদের বিনোদনের জন্য। এ রকম বই পড়তে নেওয়ার পেছনে একটা সহজ কারণ ছিল : ইংরেজি ভাষার ওপরে দখল অর্জন করা এবং বজায় রাখার জন্য এ রকম বই পড়া দক্ষ একটা পদ্ধতি। আপনারা একমত হবেন কি না জানি, তবে আমার মতামত হলো, আমাদের প্রজন্মে পেশাগত চাহিদার ক্ষেত্রে ভালো উচ্চারণ এবং ভাষার ওপরে দখল—এ দুটো বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার মানে, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত গুণের নামে এই উপাদানগুলোর ওপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে কখনো মনে করিনি, ভালো উচ্চারণ এবং ভাষার ওপরে দখল আকর্ষণীয় গুণ নয়; কাজেই সেগুলো রপ্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা আমার কর্তব্য বলে মনে করেছি। সবচেয়ে ভালো ও সোজা পদ্ধতি হলো যখন অবসর পাওয়া যায়, তখন সুলিখিত কোনো বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা। বেশ কয়েক বছর ধরে এভাবেই চালিয়েছি। আর এ রকম পড়ার জন্য সেদিন সন্ধ্যায় মিস কেন্টন আমাকে যে বইটা পড়তে দেখলেন সে রকম বই বেশি পছন্দ করতাম। তার সোজা একটাই কারণ হলো, এসব বই ভালো ইংরেজিতে লেখা। এগুলোতে অনেক অভিজাত সংলাপ পাওয়া যায়, আমার কাছে সেগুলোর বাস্তব মূল্য আছে। একটা ভারী বই, ধরুন একটা পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই সাধারণ অর্থে অনেক বেশি শ্রীবৃদ্ধিকর হতে পারে, অনেক চিন্তাশীল বিষয় ধারণ করতে এবং প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সে বইটা ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকদের সঙ্গে কারো সাধারণ ওঠাবসার ক্ষেত্রে সীমিত কাজে লাগতে পারে।

 

এসব রোমান্স শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার সময় ও মানসিকতা কোনোটাই ছিল না। আমার সীমিত জ্ঞানে যা বুঝেছি, এসব বইয়ের কাহিনিও অবাস্তব, ভাবালুতায় ভরা। এগুলোর ভাষা যদি বাস্তব প্রয়োজনে কাজে না লাগত তাহলে এগুলোর কাহিনি পড়ে একটা মুহূর্তও নষ্ট করতাম না। এ কথা বললাম বলে অবশ্য এখন আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এসব গল্প থেকেও মাঝেমধ্যে হঠাৎ একটু আনন্দ পেয়েছি। এ কথা বলায় লজ্জারও কিছু নেই। সে সময় হয়তো আমি নিজের কাছেও স্বীকার করতাম না। তবে এখন যেমন বুঝি, কী এমন লজ্জা আছে এসব বই পড়াতে? ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলারা প্রেমে পড়লে সবচেয়ে অভিজাত ভাষায় তাদের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে; তাদের নিয়ে লেখা হালকা রসের কাহিনি পড়া যাবে না কেন?

তবে এই কথাগুলো বলার সময় আমি এ রকম ইঙ্গিত করার চেষ্টা করছি না, সেদিন সন্ধ্যায় ওই বইটা নিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছি সেটা অনিশ্চিত ছিল। কারণ আপনারা বুঝতে পারছেন, নীতির একটা প্রসঙ্গ জড়িত ছিল সেখানে। মিস কেন্টন যখন মার্চ করে আসার মতো আমার ভাঁড়ারে আসেন, তখন তো আমি দায়িত্ব থেকে বিরতিতে ছিলাম। আর অবশ্যই যে বাটলার তার পেশার ভেতর গর্ব দেখতে পায়, যে বাটলার (হায়েস সোসাইটিতে যেমন বলা হয়েছে) ‘নিজের অবস্থানের সঙ্গে মানানসই মর্যাদা’ অর্জনের দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, সে নিজের বিশ্রামের সময়টাতে অন্যের উপস্থিতি অনুমোদন করে না। মিস কেন্টন কিংবা একেবারে অপরিচিত কেউ আমার রুমে প্রবেশ করে থাকলে একই কথা প্রযোজ্য হতো। গুণসম্পন্ন কোনো বাটলার তার পেশার মধ্যেই বসবাস করে, পুরোপুরিভাবেই করে এবং চরমভাবেই করে। পেশাকে সে একমুহূর্তের জন্যও পাশে সরিয়ে রাখে না যে পরের মুহূর্তে পরিধান করবে; যদিও এটা তার মূকাভিনয় করার পোশাকের চেয়ে বেশি কিছু নয়। মর্যাদার কথা ভাবে এমন বাটলার নিজেকে তার ভূমিকা থেকে মুক্ত মনে করতে পারে শুধু একটা পরিস্থিতিতেই; সেটা হলো সে যখন একেবারে একা থাকে। তাহলে আপনারা বুঝতে পারবেন, যখন আমি ধরে নিয়েছি, আমি একা আছি, যুক্তির সঙ্গেই ধরে নিয়েছি, আমি একা তখন মিস কেন্টনের আমার রুমে ঢুকে পড়াটা অবশ্যই নীতির প্রশ্নে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মর্যাদারও একটা বিষয় সেটা : আমার পূর্ণ ও সঠিক ভূমিকা থেকে তো নিজেকে মুক্ত করতে     পারলাম না।

যা-ই হোক, অনেক দিন আগের সেই খুদে পর্বের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করার ইচ্ছা আমার ছিল না। এখানে মনে রাখার মতো প্রধান কথা হলো, একটা বিষয়ে সতর্ক হতে  পেরেছিলাম : অনেক মাসের ধীরগতিতে হলেও মিস কেন্টন এবং আমার সম্পর্ক একটা অযথার্থ মর্যাদায় পৌঁছে গেছে। আমার জন্য আশঙ্কার বিষয় ছিল, সেই সন্ধ্যায় তিনি যেমন আচরণ করেছিলেন, তেমন আচরণ তিনি আরো করতে পারেন। আমার ভাঁড়ারের বাইরে তাঁকে দেখে এবং আমার নিজের চিন্তাচেতনা গুছিয়ে এনে আমাদের পেশাগত সম্পর্ক একটা সঠিক ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। আমাদের সম্পর্ক যে বিশাল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেল, সেই পরিবর্তনে ওই ঘটনাটা কতখানি অবদান রেখেছিল সেটা এখন বলা খুব কঠিন। যা ঘটেছিল তার কারণ হিসেবে হয়তো আরো কোনো মৌলিক ব্যাপারস্যাপার ছিল। যেমন মিস কেন্টনের ছুটির দিনগুলো।

ডার্লিংটন হলে তাঁর আসার প্রথম দিন থেকে আমার ভাঁড়ারের ওই ঘটনা পর্যন্ত মিস কেন্টনের ছুটির দিনগুলো ছিল আগে থেকে বলে দেওয়া যায় এমন ছকে বাঁধা। প্রতি ছয় সপ্তাহে দুই দিন ছুটি নিয়ে সাউদাম্পটনে খালাকে দেখতে যেতেন। নইলে আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাধারণত ছুটি নিতেন না। অবশ্য আমরা যখন একেবারেই নিরিবিলি সময় পার করতাম তখন তিনি সামনের মাঠের আশপাশে হাঁটাহাঁটি করে অথবা তাঁর পার্লারে বসে বই পড়ে সময় কাটাতেন। কিন্তু তারপর ওই ঘটনার পর তাঁর ছুটি কাটানোর ধরন বদলে গেল। চুক্তি অনুযায়ী তাঁর ছুটির দিনগুলোর পুরোপুরি সুবিধা নেওয়া শুরু করলেন। এ রকম ছুটির প্রতিদিন সকালবেলা হাউস থেকে বের হয়ে যান, কোথায় যাচ্ছেন, বলে যান না, শুধু ফেরার সময়টা জানিয়ে যান। তবে রাতের বেলার ফেরার সময়টা ঠিকমতোই মেনে চলেন। সে কারণে আমি আর তাঁর এ রকম বাইরে দিনযাপন সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করি না। তবে আমার মনে হয়, তাঁর এ রকম বাইরে যাওয়ার বিষয়টা আমাকে অবশ্যই কিছুটা উত্তেজিত করে। কারণ আমার মনে আছে, মি. গ্রাহাম যখন নিয়মিত ডার্লিংটন হলে আসতেন তখনকার এক রাতে আগুনের পাশে বসে গল্পের সময় মিস কেন্টনের এই বিষয়টা মি. গ্রাহামের কাছেও তুলি। মি. গ্রহাম তখন স্যার জেসম চেম্বারের পরিচারক-বাটলার ছিলেন; খুব ভালো একজন সহকর্মী, তবে এখন কী কারণে যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই আর।

আসলে আমি শুধু এ রকম বলেছিলাম, হাউসকিপার ইদানীং বেশি মাত্রায় অস্থির মেজাজের হয়ে গেছেন। মি. গ্রাহাম যখন মাথা ঝাঁকালেন আমি খানিক বিস্মিত হলাম। তিনি আমার দিকে একটু ঝুঁকে এসে কিছুটা অভিজ্ঞতার সুরে বললেন, আমার জানার আগ্রহ হলো, এ রকম আর কত দিন চলবে।

তিনি কী বোঝাচ্ছেন জিজ্ঞেস করার পর মি. গ্রাহাম বললেন, আপনার মিস কেন্টন, আমার বিশ্বাস, তাঁর বয়স কত যেন? তেত্রিশ-চৌত্রিশ না? মা হওয়ার বয়স তো চলেই যাচ্ছে, তার পরও সময় একেবারে চলে যায়নি।

মি. গ্রাহামকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, মিস কেন্টন তো নিবেদিতপ্রাণ পেশাদার।

কিন্তু মি. গ্রাহাম মাথা ঝাঁকিয়ে একটু হেসে বললেন, কোনো হাউসকিপার যদি বলে থাকে সে পরিবার চায় না, তার কথা বিশ্বাস করবেন না। আসলেই, মি. স্টিভেনস, আপনি আমি এখানে বসেই ডজনখানেক মানুষের নাম বলে দিতে পারি যারা একসময় এ রকম বলেছে, কিন্তু বিয়েশাদি করে পেশা ছেড়ে দিয়েছে।

আমার মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যায় আমি মি. গ্রাহামের কথা বিশ্বাস করিনি; তবে আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি কিছুতেই মিস কেন্টনের রহস্যজনক বাইরে যাওয়ার বিষয়টা মন থেকে সরাতে পারিনি। আমার ধারণা হয়ে যায়, তাঁর বাইরে যাওয়ার অর্থ হলো একজন পাত্রের খোঁজ করা। এটা অবশ্য একটা বিরক্তিকর ধারণা ছিল। কারণ দেখতে পাই, তাঁর এ রকম বাইরে যাওয়ার কারণে অনেকখানি পেশাগত ক্ষতি হতে থাকে। এ রকম ক্ষতি থেকে উঠে আসা ডার্লিংটন হলের জন্য কঠিন হবে। তা ছাড়া আরো কয়েকটা ইঙ্গিত দেখে মি. গ্রাহামের তত্ত্ব মেনে নিতে বাধ্য হলাম। যেমন চিঠিপত্র সংগ্রহ করা আমার অন্যতম দায়িত্ব ছিল। লক্ষ করলাম, মিস কেন্টন নিয়মিত চিঠিপত্র পাওয়া শুরু করেছেন, সপ্তাহে প্রায় একটা করে। চিঠিগুলো একই প্রেরকের তরফে পাঠানো এবং স্থানীয় একটা পোস্ট অফিসের চিহ্ন থাকত। আমার এখানে একটা কথা বলতেই হবে, এ রকম সব চিহ্ন আমার চোখে না পড়ে যাওয়ার কথা নয়; কারণ এই হাউসে থাকাকালে আগে এত বছর ধরে সামান্য কয়েকটা চিঠি পেয়েছেন তিনি।

মি. গ্রাহামের মতামত মেনে নেওয়ার আরো কিছু অস্পষ্ট চিহ্নও ছিল। যেমন যদিও তিনি স্বাভাবিক পরিশ্রমের সঙ্গেই পেশাগত দায়িত্ব পালন যথারীতি চালিয়ে যান, প্রায়ই হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় তাঁর সাধারণ মেজাজমর্জিতে। এ রকম আকস্মিক পরিবর্তন আগে কখনো দেখিনি। আসলে তেমন দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর হঠাৎ করে বেশি উচ্ছল হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য গোমড়ামুখো হয়ে যাওয়া—দুটোই আমার বিরক্তিকর মনে হয়। যেমন বলছিলাম, তিনি পুরোপুরি পেশাদারিই দেখান গোটা সময় ধরে। তার পরও বৃহত্তর নিরিখে হাউসের মঙ্গল সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা তো আমার দায়িত্ব। যদি সব লক্ষণ মি. গ্রাহামের অনুমানকেই সমর্থন করে—মিস কেন্টন রোমান্টিক কারণে বিদায় নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন, তাহলে অবশ্যই পরিষ্কারভাবেই আমার দায়িত্ব হলো বিষয়টার আরো গভীরে দৃষ্টি ফেলা। তারপর আমাদের এক সান্ধ্য কোকোয়ার আসরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, সামনের বৃহস্পতিবারও কি বাইরে যাবেন, মিস কেন্টন? মানে আপনার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে।

আমি কিছুটা ভেবেছিলাম, তিনি রেগে যাবেন আমার প্রশ্ন শুনে। কিন্তু পক্ষান্তরে তাঁর আচরণে মনে হলো, এই বিষয়টা তোলার জন্য তিনি অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় আছেন। কারণ তিনি স্বস্তির সঙ্গেই বললেন—মি. স্টিভেনস, একজনের কথা বলা দরকার। আমি যখন গ্র্যানচেস্টার লজে থাকতাম, একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আসলে সে ওখানকার বাটলার ছিল। চাকরি পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে এখন ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই আশপাশেই থাকে। আমি এখানে আছি জানার পর আমাকে চিঠি লেখা শুরু করে, সে চায় আমাদের পরিচয় আবার ঝালিয়ে নিই। বাইরে যাওয়ার কারণ হলো এই।

আমি জানি, মিস কেন্টন, মাঝেমধ্যে হাউসের বাইরে গেলে মন ভালো হয়ে যায়।

আমারও তা-ই মনে হয়, মি. স্টিভেনস।

এরপর সংক্ষিপ্ত নীরবতা। মিস কেন্টন মনে হয় কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি বলেন, গ্র্যানচেস্টার লজে থাকার সময় আমার পরিচিত এই মানুষটার চমৎকার সব বিষয়ে অভিলাষ ছিল। আমার মনে আছে, তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল এ রকম একটা হাউসের বাটলার হওয়া। আহা রে! কিন্তু তার কিছু পদ্ধতির কথা আমি এখনো ভাবি। সত্যি, মি. স্টিভেনস, আমার কল্পনায় আপনার মুখটাই আসে; আপনার সামনে যদি সেই স্বপ্নগুলো থাকত। খুব স্বাভাবিক, তার স্বপ্নগুলো অপূর্ণই রয়ে গেছে।

আমি একটু হাসি দিয়ে বললাম, আমার অভিজ্ঞতায় অনেক লোককেই দেখেছি, যারা অনেকেই বড় পদে কাজ করতে চায় কিন্তু সেসব পদের জন্য যে চাহিদা দরকার সে বিষয়ে তাদের সামান্য ধারণাও নেই। এ রকম পদ যার-তার জন্য নয়।

অবশ্যই সত্যি বলেছেন, মি. স্টিভেনস। কিন্তু সেই সব দিনে যদি আপনি তাকে দেখতেন তাহলে যে কী বলতেন!

মিস কেন্টন, এই পর্যায়ে এই পেশাটা সবার জন্য নয়। উচ্চ আশা পোষণ করা সোজা; কিন্তু কিছু গুণ ছাড়া একজন বাটলার একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের ওপরে আর উঠতে পারবে না।

এ মুহূর্তে মিস কেন্টন মনে হলো গভীর মনোযোগে কী যেন ভাবছেন।

মি. স্টিভেনস, আমার মনে হয়, আপনি একজন পুরোপুরি সুখী মানুষ। আপনি এখন আপনার পদবির একেবারে চূড়ায় আছেন; আপনার চিন্তাক্ষেত্রের সব দিকই আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে। আপনি জীবনে আর কী আশা করতে পারেন, আমার কল্পনায় আসে না।

তাঁর এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে কী বলব, আমার চিন্তায় আসে না। পরের কিছুটা বিব্রতকর নীরবতার মুহূর্তে মিস কেন্টন তাঁর কোকোয়ার কাপের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে থাকেন, যেন ওখানে কিছু একটা পেয়েছেন, সেটা নিয়ে ভাবনায় ডুবে গেছেন। শেষে আমিই কথা বললাম, আমার কথা বলতে গেলে, লর্ড সাহেব যে মহান কাজে নেমেছেন সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, মানে তাঁর জন্য আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার পেশাগত আশা পূরণ হবে না। যেদিন তাঁর কাজ শেষ হবে; তাঁর কাছে অন্যদের চাওয়া তিনি সম্পাদন করেছেন এমন সন্তুষ্ট মনে যেদিন তিনি পুরস্কারের ওপর বিশ্রাম নিতে পারবেন, শুধু সেদিনই নিজেকে আমি, যেমন আপনি বললেন, পুরোপুরি সুখী মানুষ বলতে পারব, মিস কেন্টন।

আমার কথা শুনে তিনি কিছুটা বিমূঢ় হয়ে থাকতে পারেন, অথবা হতে পারে, আমার কথাগুলো তাঁকে বিরক্ত করেছে। যেটাই হোক না কেন, এই পর্যায়ে তাঁর মনমেজাজ একটু বদলেছে মনে হলো। এতক্ষণ আমাদের কথাবার্তা যে ব্যক্তির সুরের দিকে যাচ্ছিল, সেটা দ্রুতই শেষ হলো।

তাঁর পার্লারে আমাদের কোকোয়া মিটিংগুলো শিগগিরই শেষ হয়ে গেল। আসলে শেষবারের মতো আমরা যে সন্ধ্যায় বসেছিলাম, আমার স্পষ্ট মনে আছে : আসন্ন একটা আয়োজন নিয়ে মিস কেন্টনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। সেটা ছিল স্কটল্যান্ড থেকে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটা সপ্তাহান্তের মিলনমেলা। তবে সত্য, তখনো সে অনুষ্ঠান এক মাসের মতো দূরে ছিল। তবু বেশ আগে থেকেই আমরা সে বিষয়ে কথা বলা শুরু করি। ওই বিশেষ সন্ধ্যায় সে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করি, মিস কেন্টন আলোচনায় তেমন কিছু বলছেন না। আসলেই তাঁর মনোযোগ পুরোপুরিই অন্য কোথাও ছিল। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ কোনো বিষয়ে কথা বলে যাচ্ছিলাম, কয়েকবার বললাম, মিস কেন্টন, আপনার কি আমার কথায় মনোযোগ আছে? যখন এ রকম কিছু জিজ্ঞেস করি তিনি একমুহূর্তের জন্য ফিরে আসেন, পরের মুহূর্তেই দেখতে পাই, তাঁর মনোযোগ অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। আমার কথা বলার সময় তিনি শুধু ‘অবশ্যই, মি. স্টিভেনস’ কিংবা ‘আমারও সে রকমই মত, মি. স্টিভেনস’—এই জাতীয় সাড়া দিয়ে ক্ষান্ত রইলেন দেখে কয়েক মিনিট পর আমার একতরফা কথার দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁকে বললাম, দুঃখিত, মিস কেন্টন, আমার মনে হচ্ছে, আর কথা বলার কোনো দরকার নেই। আপনি এই আলোচনার গুরুত্ব বুঝতেই চাইছেন না।

অল্প একটু নড়েচড়ে বসতে বসতে তিনি বললেন—দুঃখিত, মি. স্টিভেনস। কারণ আর কিছু নেই; আমি আজ সন্ধ্যায় খুব ক্লান্ত।

মিস কেন্টন, আপনি ক্রমাগত ক্লান্তই হচ্ছেন ইদানীং। এ রকম কোনো কারণ না দেখালেও হতো।

আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে মিস কেন্টন প্রতিক্রিয়ায় হঠাৎ করে বলে ফেললেন—মি. স্টিভেনস, আমার একটা খুব ব্যস্ত সপ্তাহ পার করতে হলো। আমি খুব ক্লান্ত। আসলে ঘণ্টা তিন-চার আগে থেকেই আমার বিছানায় চলে যাওয়ার দরকার ছিল। আমি খুব ক্লান্ত, মি. স্টিভেনস। আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না?

আমি তাঁর কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা আশা করিনি; তবে তাঁর উত্তর দেওয়ার দম্ভ আমাকে খানিক বিস্মিত করেছে।   যা-ই হোক, আর কোনো অশোভন যুক্তিতর্কে যেতে চাইলাম না। তার চেয়ে দু-এক মুহূর্ত চুপ থাকার চিন্তা করে বললাম, মিস কেন্টন, আলোচনার ব্যাপারে এ রকম মনে হলে আমাদের সান্ধ্য সাক্ষাতের আর কোনো দরকার নেই। আমি দুঃখিত, এত দিন বুঝতেই পারিনি আমাদের আলোচনা আপনার কতটা অসুবিধা করেছে।

মি. স্টিভেনস, আমি শুধু বলেছি, আমি আজ খুব ক্লান্ত...।

না না, মিস কেন্টন, ভালো করেই বোঝা যায়, আপনার এখন ব্যস্ত জীবন চলছে। আর এসব আলোচনা আপনার বোঝার ওপরে অপ্রয়োজনীয় চাপ। এভাবে আমাদের দেখা না করেও পেশাগত যোগাযোগ স্থাপনের আরো অনেক পথ আছে।

মি. স্টিভেনস, এসবের কোনো দরকার নেই; আমি শুধু বলেছি...।

আমি গুরুত্বের সঙ্গেই বলছি, মিস কেন্টন। আসলে কিছুদিন ধরে ভাবছি, আমাদের এই দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করা যায় কি না। কেননা এসব সাক্ষাৎ আমার দীর্ঘ কর্মদিবস দীর্ঘতর করে ফেলে। আমরা এখানে এত বছর সাক্ষাৎ করেছি বলেই অন্য কোনো সুবিধাজনক ব্যবস্থা বের করা যাবে না, তা নয়।

মি. স্টিভেনস, প্লিজ, আমি বিশ্বাস করি, আমাদের এই সাক্ষাতের দরকার আছে...।

কিন্তু আপনার জন্য তো অসুবিধাজনক, মিস কেন্টন। এসব আলোচনা আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলে। একটা পরামর্শ দিতে পারি, এখন থেকে কর্মদিবসের মধ্যেই আমরা জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করে নিতে পারি। আমরা যদি একজন আরেকজনকে সুবিধাজনক সময়ে না পাই তাহলে তার দরজায় লিখিত চিরকুট রেখে দিতে পারি। আমার কাছে সেটা দারুণ একটা সমাধান মনে হচ্ছে। মিস কেন্টন, আপনাকে এতক্ষণ জাগিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত। কোকোয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

স্বীকার না করার কিছু নেই, স্বাভাবিকভাবেই নিজের কাছেই প্রশ্ন করেছি, পরিণতিতে সব কিছু কেমন হতে পারত যদি আমাদের সান্ধ্য সাক্ষাতের ব্যাপারে দৃঢ় না হতাম; মানে মিস কেন্টন যখন বললেন আমাদের সাক্ষাতের বিষয়টা আবার চালু করা যেতে পারে, তার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন উপলক্ষে যদি আমি ঢিলা দিতাম তাহলে সব কিছু কেমন হতো। ওই বিষয়টি নিয়ে এখনো চিন্তা খরচ করছি; কারণ পরবর্তী ঘটনাগুলোর আলোকে যুক্তি দিয়ে বলা যেত যে সান্ধ্য আসরগুলো চিরতরে সমাপ্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে আমি কিন্তু পুরোপুরি ওয়াকিফহাল ছিলাম না, আমি কী করছি। আসলে এ কথা বলা যেত, আমার ওই ছোট সিদ্ধান্ত একটা প্রধান ক্রান্তিলগ্ন তৈরি করেছে। অর্থাৎ পরবর্তী সময়ে যা ঘটেছে তার সোজা পথ তৈরি করে দিয়েছে আমার সেই সিদ্ধান্ত।

তবু আমার মনে হয়, অতীতের এ রকম ক্রান্তিলগ্ন খোঁজার জন্য পেছনে তাকালে সে রকম লগ্ন অতীতের সবখানেই দেখা যায়। শুধু আমাদের সান্ধ্য সাক্ষাৎ সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্তই নয়, আমার ভাঁড়ারের পর্বকেও সে রকম করে দেখার ইচ্ছা নিয়ে তাকালে ক্রান্তিলগ্নই বলা যায়। যে সন্ধ্যায় তিনি ফুলদানি হাতে আমার রুমে এসেছিলেন তখন যদি একটু ভিন্নভাবে সাড়া দিতাম তাহলে কী ঘটতে পারত? সম্ভবত এই ঘটনাগুলোর কাছাকাছি সময়ে ঘটা আরেকটা ঘটনা—যে বিকেলে মিস কেন্টন তাঁর খালার মৃত্যুর খবর পেলেন তখন তাঁর সঙ্গে ডাইনিংরুমে আমার সাক্ষাৎ—সেটাকেও তো ক্রান্তিলগ্নই বলা যায়।

চিঠিটা তাঁকে দেওয়ার জন্য সেদিন সকালে তাঁর বৈঠকখানার দরজায় যখন টোকা দিলাম তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর খালার মৃত্যুর খবর এসেছিল। কয়েকটা পেশাগত বিষয় তাঁর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আমি ভেতরে পা রেখেছিলাম। মনে আছে, আমরা তাঁর টেবিলে বসলাম এবং আলাপের মাঝখানে তিনি চিঠিটা খুললেন। তিনি একেবারে চুপ হয়ে গেলেন; তবে নিজের ব্যক্তিত্ব অটুট রাখলেন আমার সামনে; চিঠিটা পুরোপুরি দুবার পড়লেন। তারপর তিনি সেটা সতর্কতার সঙ্গে খামের ভেতরে ভরে রাখলেন এবং আমার দিকে তাকালেন।

এটা মিসেস জনসন পাঠিয়েছেন। তিনি আমার খালার একজন সঙ্গী। তিনি জানিয়েছেন, গত পরশু আমার খালা মারা গেছেন। মিস কেন্টন একমুহূর্ত থামলেন এবং এরপর শুরু করলেন, দাফন হবে আগামীকাল। এক দিনের ছুটি পাওয়া যায় কি না ভাবছি।

আমি নিশ্চিত, ছুটির ব্যবস্থা করা যাবে, মিস কেন্টন।

ধন্যবাদ, মি. স্টিভেনস। আমাকে মাফ করবেন। আমার মনে হয়, একটু একা থাকা দরকার এখন।

অবশ্যই, মিস কেন্টন।

আমি তাঁর রুম থেকে বের হলাম। বের হওয়ার পরই মনে পড়ল, আমি তো তাঁকে আমার তরফে কোনো সান্ত্বনা জানালাম না। বুঝতে পারছিলাম, খবরটা তাঁর ওপরে কতখানি আঘাতের হতে পারে। সব দিক থেকে তাঁর খালা তাঁর মায়ের মতোই ছিলেন। আমি করিডরে থামলাম। ভাবলাম ফিরে যাই, দরজায় টোকা দিই, যে সান্ত্বনা দেওয়া হয়নি, দিয়ে আসি। কিন্তু আবার মনে হলো, এখন সান্ত্বনা দিতে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত শোক পালনের ওপরে অনধিকার প্রবেশ হয়ে যাবে। আসলেই এমন হতে পারে, ঠিক ওই মুহূর্তে আমার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে তিনি কাঁদছেন। কথাটা মনে হতেই আমার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি হলো, করিডর ধরে খানিক হাঁটার পর ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মনে হলো, সবচেয়ে ভালো হয় এ রকম আর কোনো পরিস্থিতিতে তাঁকে সমবেদনা জানানো। সুতরাং আমার নিজের পথে এগোতে থাকলাম।

তারপর বেশ কয়েক দিন মিস কেন্টনের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। এক বিকেলে ডাইনিংরুমের সাইডবোর্ডে বাসনকোসন সাজাতে দেখলাম তাঁকে। এ পর্যায়ে তাঁর দুঃখজনক বিষয়টার কথা কয়েক ঘণ্টা ধরে ভেবেছিলাম; তাঁর মানসিক অবস্থা হালকা করার জন্য আমি কী করলে, কী বললে সবচেয়ে ভালো হয়, তা নিয়েও ভেবেছিলাম। আমি হলের মধ্যে কাজ করছিলাম। ডাইনিংরুমের দিকে আসতে তাঁর পায়ের আওয়াজ শুনে মিনিটখানেক অপেক্ষা করি। তারপর আমার কাজ রেখে তাঁর সঙ্গে ডাইনিংরুমে ঢুকি।

আমি বলি—আহা, মিস কেন্টন! আজ বিকেলে কেমন আছেন?

মোটামুটি ভালো। ধন্যবাদ, মি. স্টিভেনস।

আমি অল্প একটু হেসে বললাম, মানে আমি জানতে চাইছিলাম, নতুন নিয়োগ দেওয়া হলো যাদের, তাদের নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো সমস্যা আছে কি না। এত মানুষ একসঙ্গে নিয়োগ দিলে ছোটখাটো অনেক সমস্যা হতে পারে। বলতে চাইছি, এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা সবচেয়ে ভালো কিছু পেতে পারি পেশাগত আলোচনার মাধ্যমে।

ধন্যবাদ, মি. স্টিভেনস। কিন্তু নতুন মেয়েদের কাজকর্ম আমার বেশ সন্তোষজনক মনে হচ্ছে।

নবাগতদের কারণে স্টাফ-প্ল্যানে কোনো পরিবর্তন আনা দরকার মনে করেন?

মনে হয় না এ রকম কোনো পরিবর্তনের দরকার আছে, মি. স্টিভেনস। আর এ ব্যাপারে আমার মনোভাব বদল হলে আমি শিগগিরই আপনাকে জানাব।

তিনি সাইডবোর্ডের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে নিলেন এবং একমুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, ডাইনিংরুম থেকে বের হয়ে যাই। আমার মনে হচ্ছে, আমি দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আবার ফিরে এসে তাঁকে বললাম— তাহলে মিস কেন্টন, আপনি বলছেন, নতুনরা ভালোই করছে।

আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, তারা দুজনই ভালো করছে।

আবারও একটু হাসি দিয়ে বললাম—বাহ্, ভালো খবর শুনতে ভালোই লাগে। আমার জানতে ইচ্ছা করে, তারা তো এত বড় কোনো হাউসে আগে কাজ করেনি।

ঠিকই বলেছেন, মি. স্টিভেনস।

আমি তাঁর সাইডগুলো পূরণ করা দেখলাম এবং অপেক্ষা করলাম, তিনি আর কিছু বলেন কি না। কয়েক মিনিট পরে যখন বুঝতে পারলাম, তিনি কিছু বলবেন না, আমি বললাম, ঘটনা হলো, মিস কেন্টন, খেয়াল করেছি, দু-একটা জায়গায় সম্প্রতি কাজের মান নেমে গেছে। আমার মনে হয়, নতুনদের সম্পর্কে আপনি আরেকটু কম তুষ্ট থাকলে ভালো হতো।

আপনি কী বোঝাতে চান, মি. স্টিভেনস?

আমার দিক থেকে বলতে চাই, মিস কেন্টন, নতুনরা যখন আসে, আমার মনে হয় দ্বিগুণ সতর্কতা নিয়ে দেখা উচিত সব ঠিক আছে কি না। আমি তাদের কাজের সব দিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি এবং অন্য স্টাফদের সঙ্গে তাদের আচরণ কেমন তা-ও দেখি। তাদের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। তা ছাড়া সাধারণ মনোবলের ওপর তাদের প্রভাব কেমন তা-ও দেখা দরকার। দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে, মিস কেন্টন, এসব বিষয়ে আপনি একটু অমনোযোগী হয়েছেন।

এক সেকেন্ডের মতো মিস কেন্টন দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তারপর তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন। তাঁর মুখের ওপরে বাড়তি চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আপনি কী বলছেন, বুঝতে পারছি না, মি. স্টিভেনস।

মিস কেন্টন, ধরুন বাসনকোসন ধোয়া হচ্ছে; কাজের মান বেশ ভালো। কিন্তু সাজিয়ে রাখার সময় এমনভাবে রাখা হচ্ছে, ভবিষ্যতে দু-চারটে ভেঙে যাওয়ার বিপদ থাকতে পারে।

তাই নাকি, মি. স্টিভেনস?

হ্যাঁ, মিস কেন্টন। তা ছাড়া ব্রেকফাস্টরুমের বাইরের কুঠুরিটা কিছুদিন হলো পরিষ্কার করা হয়নি। আপনি কিছু মনে করবেন না, আমি এ রকম আরো কয়েকটা ছোটখাটো বিষয় উল্লেখ করতে পারি।

আপনার যুক্তিতে আর বেশি জোর দিতে হবে না, মি. স্টিভেনস। আপনি যেমন পরামর্শ দেন, আমি তেমন করে নতুন মেয়েদের কাজ পরীক্ষা করে দেখব।

আপনি কিন্তু এসব বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন না।

মিস কেন্টন আবার অন্যদিকে তাকালেন। তাঁর মুখে আবারও একটা চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল, যেন তাঁকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে এমন ধাঁধা জয় করার চেষ্টা করছেন। তাঁকে যতটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে ততটা বিমূঢ় দেখাচ্ছে না। তিনি সাইডবোর্ড বন্ধ করে বললেন, প্লিজ, মি. স্টিভেনস। তারপর তিনি রুম ছেড়ে চলে গেলেন।

অমুকতমুক মুহূর্ত যদি আলাদাভাবে আসত তাহলে কী কী ঘটতে পারত—এসব নিয়ে সব সময় ভেবে কী লাভ? এভাবে ভাবতে থাকলে নিজেকে শুধু অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারি। ক্রান্তিলগ্ন সম্পর্কে কথা বলতে গেলে ওই সব মুহূর্তকে পেছন ফিরে দেখতেই পারি। সাধারণত এ রকম ঘটনার দিকে তাকালে সেগুলো আমার কাছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও অমূল্য মুহূর্ত হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু অতীতে, মানে যখন ঘটেছে তখন এ রকম মুহূর্ত সম্পর্কে এমন ধারণা ছিল না। বরং এমন অসংখ্য দিন মাস বছর পার করে এসেছি, যেগুলোর ভেতর থেকে মিস কেন্টনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের খোশখেয়াল খুঁজে বের করতে হয়। আবার আরো অসংখ্য সুযোগ খুঁজে বের করা যায়, যেখানে অমুকতমুক সময়ে ভুল-বোঝাবুঝির সমাধান খুঁজে দেখা যেতে পারে। কিন্তু ঘটনা যখন ঘটেছে তখন ইঙ্গিত করার মতো তেমন কিছুই ছিল না, যেটা থেকে বোঝা যেত অমুকতমুক আপাততুচ্ছ ঘটনা সব স্বপ্নকে চিরতরে প্রতিকারের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি, অযথাই নিজের ভেতরের চিন্তা আর অনুভূতি পরীক্ষা করা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। তার ফলে অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি। এ রকম হওয়ার পেছনে কারণ হলো ঘণ্টাখানেক আগের ঘটনা আর আজ সন্ধ্যায় যেসব ঘটনার সম্মুখীন হয়ে আমাকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে সেগুলো। সন্দেহ নেই আমার বর্তমান মেজাজ আরো একটা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত : আগামীকাল দুপুরের খাবারের সময় হতে হতে লিটল কম্পটনে পৌঁছে যাব এবং ধরেই নিচ্ছি, মিস কেন্টনের সঙ্গে আবার দেখা হবে এত বছর পরে। অবশ্য এখানকার স্থানীয় গ্যারেজে পেট্রল পাওয়া গেলে যেতে পারব; টেলর পরিবারের কাছ থেকে সে রকম নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। যুক্তিসংগতভাবেই আমাদের সাক্ষাৎ আন্তরিক হবে। বাস্তব অর্থে আমি চাই আমাদের সাক্ষাৎ হোক অনেকাংশেই পেশাদারি। এ রকম পরিস্থিতিতে যেটুকু অনানুষ্ঠানিক বিষয়ের আদান-প্রদান হতে পারে সেটা তো হবে। তার মানে, আমার দায়িত্ব হবে মিস কেন্টনের পুরনো কর্মস্থল ডার্লিংটন হলে ফিরে আসার ইচ্ছা আছে কি না সেটা নির্ধারণ করা; কেননা তাঁর বিয়ে তো মনে হচ্ছে ভেঙে গেছে এবং তাঁর থাকার জায়গা নেই। আমার এখানে বলা দরকার, আজ রাতে তাঁর চিঠি আবার পড়ার পরে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছে, যতটুকু পড়া দরকার তার চেয়েও বেশি কয়েকটা লাইন পড়তে পারতাম। কিন্তু যেটুকু বুঝেছি তাতে বলা যায়, তাঁর চিঠির কয়েকটা জায়গায় শুধু স্মৃতিকাতর আকাঙ্ক্ষার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে, বিশেষ করে যখন তিনি লেখেন : তৃতীয় তলার বেডরুম থেকে দেখা নিচের লন বরাবর বহুদূর পর্যন্ত দৃশ্যটা আমার এত ভালো লাগত!

আচ্ছা, আগামীকাল তো তাঁর নিজের কাছ থেকেই এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাহলে এসব নিয়ে এত  চিন্তাভাবনার কী দরকার? আমি তো একটু আগে আজ সন্ধ্যার ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিলাম। সেগুলো থেকে দূরে চলে গেছি। তাহলে বলি, গত কয়েক ঘণ্টা বেশি অযৌক্তিক রকমের কষ্টকর ছিল। নির্জন পাহাড়ি এলাকায় ফোর্ডটা ফেলে আসা, প্রায় অন্ধকারে এ রকম একটা পথে হেঁটে আসা—একটা সন্ধ্যায় একজন মানুষের ওপরে পতিত অসুবিধা যথেষ্ট কষ্টের ব্যাপার। তবে আমার আতিথ্যকর্তা এবং তাঁর স্ত্রী জেনেশুনে আমাকে যে রকম কষ্ট পার হয়ে এসেছি সে রকম পরিস্থিতিতে পড়তে দেবেন না। আর সত্য হলো, এখানে আসার পর তাঁদের টেবিলে খেতে বসার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের কয়েকজন প্রতিবেশী এসে হাজির হয়েছেন আমাকে দেখতে। আমার জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে।

কটেজের নিচতলার সামনের রুমটা মি. ও মিসেস টেলর ডাইনিংরুম এবং সাধারণ বসার ঘর হিসেবে ব্যবহার করেন মনে হয়। বেশ আরামদায়ক রুমটা, প্রায় অসমান করে কাটা কাঠের তৈরি বড় টেবিল; এ রকম টেবিল দেখা যায় খামারবাড়ির কিচেনে, টেবিলের উপরিভাগটা বার্নিশ করা হয়নি, তরকারি কাটার আর রুটি কাটার ছুরি-চাকুর অনেক দাগ লেগে আছে টেবিলের ওপর। দাগগুলো বেশ পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে, যদিও এক কোনায় রাখা তেলের একটা বাতি থেকে আসা হলুদ আলোয় বসেছিলাম আমরা।

বাতির দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে মি. টেলর একসময় বললেন, আমাদের এখানে বিদ্যুৎ নেই, তা নয়। তবে সার্কিটে কী যেন গোলমাল হলো, তার পর থেকে প্রায় দুই মাস আমাদের এখানে বিদ্যুৎ নেই। সত্যি বলতে কী, আমাদের অবশ্য বিদ্যুতের কথা তেমন মনেও পড়ে না। গ্রামে কতক বাড়ি আছে, যেগুলোতে আদৌ বিদ্যুতের সংযোগই নেই। তেলের বাতি ভালোই আলো দেয়।

মিসেস টেলর আমাদের বেশ স্বাদের ব্রথ খেতে দিলেন। মচমচে রুটি সহযোগে খেলাম আমরা। এ পর্যায়ে বিছানায় যাওয়ার আগে ঘণ্টাখানেকের আনন্দদায়ক গল্পগুজবের চেয়ে আমার জন্য দমনমূলক আর কিছুই ছিল না ওই সন্ধ্যায়।   যা-ই হোক, আমাদের রাতের খাবারের পরে মি. টেলর আমার জন্য তাঁদের প্রতিবেশীদের কারো বাড়িতে বানানো এক গ্লাস সুরা ঢালছিলেন। বাইরে সুরকির রাস্তায় পায়ের আওয়াজ শুনলাম আমরা। বিচ্ছিন্ন এই কুটিরের দিকে অন্ধকারে এগিয়ে আসা পায়ের আওয়াজের মধ্যে আমার কানের কাছে মনে হলো অশুভ কিছু আছে। অবশ্য আমার আতিথ্যকর্তা-কর্ত্রী কোনো বিপদ-আপদের আলামত টের পেলেন না। কারণ সামান্য কৌতূহল নিয়ে বললেন, এখন আবার কে রে?

তাঁর কণ্ঠে আর কোনো কিছুই ছিল না। তিনি এমনভাবে জিজ্ঞেস করলেন, যেন কমবেশি নিজেকেই বললেন কথাগুলো। কিন্তু আমরা শুনতে পেলাম বাইরে থেকে একজনের কণ্ঠ উত্তর দিচ্ছে, আমি জর্জ এন্ড্রুস। এই একটু হাঁটাহাঁটি করছি।

পরের মুহূর্তে দেখা গেল, মিসেস টেলর একজন গাট্টাগোট্টা চেহারার মানুষকে ভেতরে নিয়ে আসছেন। বয়স পঞ্চাশের মতো। পরনের কাপড়চোপড় দেখে বোঝা গেল, সারা দিন কৃষিকাজে ব্যয় করেছেন। প্রবেশ দরজার পাশের একটা ছোট টুলে তিনি যেভাবে বসলেন এবং কষ্ট করে তাঁর ওয়েলিংটন বুট জোড়া খুলতে লাগলেন, বোঝা গেল তিনি এ বাড়িতে নিয়মিত আসেন। তাঁর এসব কাজ করার সময় মিসেস টেলরের সঙ্গে খুব স্বাভাবিক স্বরে এটা-ওটা বলছিলেন। তারপর তিনি টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর টান টান হয়ে দাঁড়ানো দেখে মনে হলো, তিনি কোনো সামরিক অফিসারের সামনে দাঁড়িয়েছেন।

আমার নামটা এন্ড্রুস, স্যার। আপনাকে শুভ সন্ধ্যা। আপনার বিপদে পড়ার কথা শুনে খুব খারাপ লাগল, স্যার। তবে আশা করি, এখানে মসকোম্বেতে রাত কাটাতে এসে আপনি অসুবিধায় পড়েছেন, তা কিন্তু মনে করবেন না।

আমি কিছুটা হতবাক হলাম, আমার বিপদে পড়ার কথা এই জর্জ এন্ড্রুস কিভাবে জানলেন। খানিক হেসে তাঁর কথার উত্তরে জানালাম, আমি মোটেও কোনো বিপদে পড়িনি, বরং যে আতিথেয়তা পাচ্ছি তার জন্য কৃতজ্ঞ। এতক্ষণে আমি মি. ও মিসেস টেলরের সহানুভূতির কথা বারবার বলে যাচ্ছি। তবে মি. এন্ড্রুস নিজেকে এঁদের দুজনের সঙ্গে একাত্ম করেই দেখছেন এবং আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকারের উত্তরে তাঁর বড় বড় দুটো হাত ওপরের দিকে তুলে মোটেও দেরি না করে বলা শুরু করলেন, না না, স্যার। আপনাকে স্বাগত। আপনাকে পেয়ে আমরা খুশি। আপনার মতো মানুষ আমাদের এখানে খুব একটা আসেন না। আপনি এখানে থেমেছেন বলে আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছি।

তাঁর কথা বলার ধরন দেখে মনে হলো, আমার বিপদে পড়া এবং এই কটেজে আশ্রয় নেওয়া সম্পর্কে তাঁদের সারা গ্রামের মানুষই জানে। শিগগিরই আমি সে রকমই বুঝতে পারলাম। কল্পনায় দেখতে পাই, আমাকে বেডরুম দেখিয়ে দেওয়ার কয়েক মিনিট পরে যখন হাত-মুখ ধুচ্ছিলাম এবং আমার জ্যাকেট আর ট্রাউজার্সের ভাঁজ খুলে পরিষ্কার করছিলাম, ততক্ষণে মি. ও মিসেস টেলর মনে হয় আমার খবর পথচারীদের সবাইকে বলেছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরেকজন আগন্তুক চলে এলেন। তাঁর চেহারা জর্জ এন্ড্রুসের মতোই, আকারে আরো একটু বড়, চেহারায় বোঝা গেল কৃষিকাজে ব্যস্ত ছিলেন, তিনিও ওয়েলিংটন বুট পরে এসেছেন এবং এন্ড্রুসের মতো কসরত করে খুলতে লাগলেন। আসলে তাঁদের চেহারায় এত মিল দেখে আমার মনে হলো, একজন আরেকজনের ভাই। কিন্তু নবাগত ব্যক্তি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিলে বুঝলাম আমার ধারণা ঠিক নয়—মরগান, স্যার। আমি ট্রেভর মরগান।

মি. মরগান আমার দুর্ভাগ্যের জন্য আফসোস করলেন এবং নিশ্চয়তা দিলেন, সকালবেলা সব ঠিক হয়ে যাবে। তার পরই তিনি ব্যক্ত করলেন আমি কতটা আন্তরিকতায় স্বাগত তাঁদের গ্রামে। অবশ্য একই রকম ভাবালুতা কয়েক মুহূর্ত আগেও শুনেছি; তবে মি. মরগান আসলে বললেন, আপনার মতো একজন ভদ্রলোককে আমাদের মসকোম্বেতে পাওয়া আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া, স্যার।

তাঁর কথার উত্তরে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বাইরে রাস্তায় আরো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। শিগগিরই মধ্যবয়সী এক দম্পতি এসে হাজির হলেন। আমার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো মি. ও মিসেস হ্যারি স্মিথ বলে। এঁদের দুজনকে কৃষিজীবী বলে মনে হলো না; মহিলার চেহারায় মাতৃকার ছাপ আছে, অনেকটা বিশ-ত্রিশের দশকের ডার্লিংটন হলের বাবুর্চি মিসেস মর্টিমারের মতো দেখতে। মি. স্মিথের চেহারা আলাদা; ছোটখাটো এই মানুষটির চেহারায় আছে তীব্রতার লক্ষণ, ভ্রুর ওপরে বেশ কয়েকটা ভাঁজ। তাঁরা টেবিলের পাশে বসলেন; মি. স্মিথ বললেন, থর্নলি বুশ হিল থেকে দেখা যাচ্ছে যে ফোর্ড গাড়ি, ওটাই তো আপনার গাড়ি, তাই না, স্যার?

পাহাড়ি যে রাস্তা থেকে এই গ্রাম দেখা যায় সেটার কথাই যদি বলেন, তবে আপনি দেখেছেন শুনে বিস্মিত হচ্ছি।

নিজে দেখিনি, স্যার। কিছুক্ষণ আগে ওর ট্রাক্টরে করে বাড়ি ফেরার সময় ডেভ থর্নটন দেখে এসেছে। আপনার গাড়িটা ওখানে পড়ে থাকতে দেখে ডেভ এত অবাক হয়েছিল যে ট্রাক্টর থামিয়ে নেমে দেখে এসেছে। এবার মি. স্মিথ অন্যদের উদ্দেশে বলতে লাগলেন, গাড়িটা জবর সুন্দর! ডেভ কইছে, এত ছুন্দর গাড়ি নাকি জিন্দেগিতে দেহে নাই। এটার পাশে রাখলে মি. লিন্ডসের গাড়িটা তো এক্কেরে গাড়ির একখান ছায়া অইয়া যাইব গা।

তাঁর কথা শুনে টেবিলের চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। আমার পাশে বসা মি. টেলর ব্যাখ্যা করে বললেন, এই কাছেই একটা বাড়িতে এক ভদ্রলোক থাকতেন, স্যার। টুকটাক এটা-ওটা করে বেড়াতেন। তবে এখানে তেমন কেউ পাত্তা দেয়নি।

তাঁর কথার সমর্থনে সবার মধ্যে গুঞ্জন শোনা গেল। তখনই একটা পানপাত্র উঁচু করে ধরে একজন বলে উঠলেন, আপনার স্বাস্থ্যের নামে, স্যার। এরই মধ্যে মিসেস টেলর সবার মধ্যে সুরা বিতরণ করে ফেলেছেন। পরের মুহূর্তে সবাই মিলে আমার সুখ-সাফল্য কামনা করলেন।

হেসে বললাম, আমি নিশ্চিত করে বলছি, আমি বিশেষ সুবিধা পেয়েছি।

মিসেস স্মিথ বললেন, আপনি অনেক সহানুভূতিশীল মানুষ, স্যার। সত্যিকারের ভদ্র মানুষ তো এমনই হন। মি. লিন্ডসে কোনো ভদ্র মানুষ ছিলেন না। তাঁর টাকা-পয়সা থাকতে পারে, কিন্তু কখনোই ভদ্রলোক ছিলেন না।

আবার চারপাশ থেকে সমর্থনের আওয়াজ উঠল। তখন মিসেস টেলর মিসেস স্মিথের কানে কানে কী যেন বললেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে মিসেস স্মিথ বললেন, তিনি বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন তিনি চলে আসবেন। মিসেস টেলর ও মিসেস স্মিথ সবজান্তা চাহনিতে আমার দিকে তাকালেন এবং মিসেস স্মিথ বললেন, আমরা ড. কার্লিসলের কাছে আপনার কথা বলেছি, স্যার। তিনি আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারলে খুব খুশি হবেন।

মিসেস টেলর ক্ষমা চাওয়ার মতো করে বললেন, আমার মনে হয়, তাঁর আরো রোগী দেখতে হবে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আপনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি আসতে পারবেন কি না।

ঠিক তখনই ভাঁজ পড়া ভ্রু আর ছোটখাটো শরীরের হ্যারি স্মিথ সামনে ঝুঁকে এসে বলা শুরু করলেন, ওই যে মি. লিন্ডসের কথা বলছিলাম না, তার সব কিছুতে ছিল ভান। যা নন তা-ই দেখাতেন। অভিনয় ছিল, অভিনয়। মনে করতেন, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক ওপরের কেউ। আমাদের সবাইকে বোকা মনে করতেন। আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, স্যার, তিনিও টের পেয়েছিলেন, যা ভাবেন তা হয় না। তাঁর সম্পর্কে অনেক কঠিন কথা হয় এখানে। লোকজনের মধ্যে শক্ত শক্ত সব মতামত প্রচলিত আছে তাঁর সম্পর্কে। লোকজন সেগুলো প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। সেটা মি. লিন্ডসেও তাড়াতাড়িই বুঝে গিয়েছিলেন।

তিনি কোনো ভদ্রলোক ছিলেন না, মি. টেলর আস্তে করে বললেন। তিনি কোনো ভদ্রলোক ছিলেন না, মি. লিন্ডসের কথা বলছি।

ঠিক, স্যার, মি. হ্যারি স্মিথ বললেন। তাঁকে দেখলেই আপনি বলতে পারতেন, তিনি ভদ্রলোক নন। ঠিক আছে, তাঁর ভালো একটা বাড়ি ছিল, ভালো পোশাক ছিল। কিন্তু যেকোনোভাবেই তাঁর আসল রূপ সম্পর্কে জানতে পারতেন আপনি। শেষে সময়মতো জানাও গিয়েছিল।

সবার মধ্যে সমর্থনের সাড়া পড়ে গেল। পরের মুহূর্তে মনে হয় উপস্থিত সবাই ভাবছেন, আমার কাছে স্থানীয় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির এত সব গোপন কথা ফাঁস করা ঠিক হবে কি না। তখন মি. টেলর নীরবতা ভাঙলেন, হ্যারি যা বলেছে, ঠিকই। জমকালো পোশাক পরা নকল ভদ্রলোক আর আসল ভদ্রলোকের মধ্যে পার্থক্য করা যায়। আপনার কথাই ধরুন, স্যার। আপনার পোশাকের ধরন দেখে কিংবা আপনার কথা বলার ভঙ্গি দেখে আপনাকে ভদ্রলোক বলা যাবে না। বরং অন্য কিছু আছে, যেটা আপনাকে ভদ্রলোক বলে চিহ্নিত করতে পারে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায় না। যার দেখার চোখ আছে সে ঠিকই দেখে নিতে পারে সেই গুণ।

তাঁর কথার সমর্থনে টেবিলের চারপাশে আরো জোরে আওয়াজ উঠল।

ড. কার্লিসলের আসা খুব দেরি হবে না, স্যার, মাঝখানে বললেন মিসেস টেলর। তাঁর সঙ্গে কথা বললে আপনার ভালো লাগবে।

ড. কার্লিসলের সেই গুণটা আছে, মি. টেলর বললেন। তিনি এটা পেয়েছেন। তিনি সত্যিকার ভদ্রলোক।

মি. মরগান আসার পর থেকে খুব বেশি কথা বলেননি। এবার তিনি আমার দিকে ঝুঁকে এসে বলা শুরু করলেন, এই গুণটা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা, স্যার? মনে হয়, যাঁর এই গুণটা আছে তিনি বলতে পারবেন। এখানে আমরা সবাই বলছি, কার এই গুণ আছে, কার নেই। কিন্তু আমরা যা নিয়ে কথা বলছি সেটা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান আমাদের নেই। সম্ভবত আপনি এ সম্পর্কে আমাদের একটু আলো দিতে পারেন, স্যার।

টেবিলের চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এলো। আমি টের পেলাম, সবার দৃষ্টি আমার দিকে। গলা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বলা শুরু করলাম, এই গুণ আমার আছে কি নেই বলা মুশকিল। যা হোক, যে প্রসঙ্গটা এখানে উঠেছে, যে গুণের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তব দৃষ্টিতে দেখতে গেলে সেটাকে ‘মর্যাদা’ বলা যায়।

এই মন্তব্যটা আর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার দরকার খুব একটা আছে বলে মনে হলো না আমার। তাঁদের সবার আগের কথাগুলো শুনতে শুনতে যে চিন্তাগুলো আমার মাথায় ঘুরছিল, সেগুলোই আপাতত সংক্ষেপে বলে ফেললাম। আর পরিস্থিতির প্রয়োজনে, মানে আমার কাছ থেকে শুনতে চাওয়া না হলে এ বিষয়ে আদৌ কিছু বলতামও না। তবে আমার জবাব মনে হলো তাঁদের মনে যথেষ্ট সন্তুষ্টি এনেছে।

আপনার কথায় অনেক সত্য আছে, স্যার, এন্ড্রুস মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন। অন্যরাও তাঁর সঙ্গে সমর্থনের সুর মেলালেন।

এবার মিসেস টেলর বললেন, মি. লিন্ডসের মধ্যে আরেকটু মর্যাদাবোধ থাকলে তিনি কিছু একটা করতে পারতেন। তাদের মতো লোকের সমস্যা হলো, তারা শুধু যাকে উঁচু আর শক্তিশালী মনে করে তাদের মধ্যে মর্যাদা খুঁজতে যায়।

মনে রাখবেন, স্যার, মি. হ্যারি স্মিথ বলা শুরু করলেন এবার। আপনি যা বললেন তার প্রতি পুরোপুরি শ্রদ্ধা রেখেই আরো যোগ করতে চাই, মর্যাদা তো শুধু ভদ্রলোকদের একচেটিয়া বিষয় নয়। এ দেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করতে পারে এবং মর্যাদা অর্জন করতে পারে। মাফ করবেন, স্যার, যেমন আগে বলেছি, মতামত ব্যক্ত করার সময় আমরা এখানে অতটা আচরণবিধি মেনে চলি না। আমার মতামত সে রকমই। মর্যাদা শুধু ভদ্রলোকদের জন্য নয়।

বুঝতে পারলাম, মি. হ্যারি স্মিথের এবং আমার সামনে পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য; আমার পক্ষে এই লোকগুলোর সামনে আমার কথাগুলো পরিষ্কার করে বোঝানো কঠিন হয়ে যাবে। সেটা ভেবেই শুধু হেসে বললাম, অবশ্যই, আপনার কথাই ঠিক।

একটু আগে মি. হ্যারি স্মিথের কথা বলার সময় রুমের মধ্যে হালকা চাপা অবস্থা তৈরি হয়েছিল; সেটা এখন একেবারে কেটে গেল। আর মি. হ্যারি স্মিথের মন থেকে জড়তা কিংবা দ্বিধা যেটুকু ছিল, সব পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে এসে মন খুলে বলা শুরু করলেন, মোটের ওপর আমরা তো হিটলারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি সে জন্যই। হিটলার যদি জিতে যেতেন, আমরা সবাই ক্রীতদাস হয়ে যেতাম। গোটা পৃথিবীতে কয়েকজন মাত্র মনিব থাকত, আর লাখ লাখ মানুষ হয়ে যেত দাস। এখানে যাঁরা উপস্থিত আছেন তাঁদের তো আর মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই—দাস হয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো মর্যাদা নেই। আমরা এই মর্যাদার জন্যই লড়াই করেছি। আমরা এই মর্যাদাই জয় করেছি। স্বাধীন নাগরিক হওয়ার অধিকার আমরা জয় করেছি। ইংরেজ হওয়ার সুবিধার মধ্যে এটাও একটা। আপনি কে তা বড় কথা নয়, আপনি ধনী না গরিব সেটা বড় কথা নয়; আপনি জন্মগতভাব স্বাধীন, আপনার জন্মই হয়েছে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার জন্য, সংসদ সদস্যের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য—মর্যাদা বলতে এসবই বোঝায়। ঠিক বলেছি না, স্যার? মাফ করবেন, অনেক কথা বললাম।

মি. টেলর বললেন—শোনো, শোনো হ্যারি। বুঝতে পারছি, তুমি তো রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রস্তুতি নিচ্ছ।

মি. টেলরের কথায় সবাই হেসে উঠলেন। মি. হ্যারি স্মিথও একটু লাজুক হাসি হাসলেন; তবে কথায় আবার ফিরে গেলেন—রাজনীতির কথা বলছি না, শুধু বলছিলাম, আপনি দাস হলে তো আপনার মর্যাদা থাকবে না। তবে একটু ভেবে দেখলে সব ইংরেজই এটা বুঝতে পারে। কারণ আমরা সেই অধিকারের জন্যই লড়াই করেছি।

তাঁর স্ত্রী বললেন, আমরা তো এখানে একেবারে নিভৃত স্থানে থাকার মতো আছি, স্যার। কিন্তু অন্য সব কিছুর অনুপাতে যুদ্ধে আমরা ত্যাগ বেশিই করেছি।

তাঁর কথার পরে পরিবেশের মধ্যে গম্ভীর ভাব চলে এলো। শেষে মি. টেলর বললেন, আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধির জন্য হ্যারি এখানে দারুণ সংগঠনের কাজ করে। ওকে আধাঘণ্টা সময় দেবেন, ও সব বলে দেবে, দেশ কোথায় কোথায় ভুল করছে।

আহা, আমি তো বলছিলাম, এই সময়ে দেশ কোথায় কোথায় ঠিক কাজ করছে।

আপনার কি রাজনীতিতে সরাসরি কিছু করার আছে, স্যার? মি. এন্ড্রুস জিজ্ঞেস করলেন।

না, সরাসরি সে রকম নেই। আর বিশেষ করে এখন তো নেই-ই। যুদ্ধের আগে ছিল হয়তো।

আমারও তা-ই মনে হয়, আমার একজন মি. স্টিভেনসের কথা মনে পড়েছে। তিনি দু-এক বছর আগে সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর কথা রেডিওতে দু-একবার শুনেছি। হাউজিং সম্পর্কে তিনি ভালো ভালো কথা বলেছিলেন। কিন্তু আপনি তো আর তিনি নন, তাই না স্যার?

 

না না, খানিক হেসে বললাম। এখন আর নিশ্চিত বলতে পারি না, পরের কথাগুলো কেন বললাম। হতে পারে, পরিস্থিতির কারণেই এ রকম বলেছিলাম। কথাটা হলো : আসলে আমি স্থানীয় বিষয়ের চেয়ে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করতাম। বলতে পারেন পররাষ্ট্রনীতি।

আমার শ্রোতাদের ওপরে এই কথাগুলোর প্রভাব দেখে কিছুটা ভড়কে গেলাম। বলা চলে, তাঁদের ওপরে একটা সমীহমিশ্রিত ভয়ের বোধ চেপে বসল। শেষে তাড়াতাড়ি বললাম, আমি উচ্চপদস্থ কেউ ছিলাম না, মনে রাখবেন। যেটুকু প্রভাব খাটাতে পেরেছি, সব আন-অফিশিয়ালি। কিন্তু পরের কথাগুলো শোনার পরও তাঁদের ওপরে চাপা নীরবতা আরো কয়েক সেকেন্ডের জন্য জেঁকে বসেই রইল।

শেষে মি. টেলর বললেন, মাফ করবেন স্যার, আপনার কি কখনো মি. চার্চিলের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

চার্চিল? হ্যাঁ, তিনি বেশ কয়েকবার আমাদের হাউসে এসেছিলেন। কিন্তু মি. টেলর, খোলাখুলি বললে, আমি যখন বড় বড় বিষয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলাম তখন মি. চার্চিল এত বড় গুরুত্বপূর্ণ কেউ হননি এবং ভবিষ্যতে হবেন এমনটা আশাও করা হয়নি। সেসব দিনে মি. ইডেন ও মি. হ্যালিফ্যাক্স নিয়মিত আসতেন।

কিন্তু আপনি তো সামনে থেকে মি. চার্চিলকে দেখেছেন, স্যার? সেটা বলতে পারাটা কত বড় সম্মানের!

চার্চিলের অনেক কথার সঙ্গে একমত হতে পারি না, মি. হ্যারি স্মিথ বললেন। তবে তিনি একজন মহান ব্যক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর মতো মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা তো নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

ঠিক আছে, আবারও বলছি, মি. চার্চিলের সঙ্গে আমার তেমন কিছু করার ছিলই না। কিন্তু আপনারা যেহেতু ঠিক উল্লেখ করেই ছাড়লেন, তাঁর সঙ্গে কোনো কাজে একত্র হতে পারা আসলেই সন্তুষ্টির বিষয়। আসলে আমি খুব ভাগ্যবান, আমিই প্রথম এটা স্বীকার করলাম। শুধু চার্চিল সাহেব নন, আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক বড় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং নেতার সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আর আপনারা যেহেতু মনে করছেন, ওসব দিনে বহুবার তাঁদের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। হ্যাঁ, যখন অতীতের দিকে তাকাই, আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি। মোটের ওপর বিশ্বমঞ্চে ছোট হলেও একটা ভূমিকা পালন করতে পারা তো একটা বিরাট পাওয়া।

কথার মাঝখানে বলছি বলে মাফ করবেন, স্যার, মি. এন্ড্রুস বললেন, মি. ইডেন কেমন মানুষ? মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে? আমি সব সময় মনে করেছি, তিনি খুব ভদ্র ও হাসিখুশি। ছোট-বড়, ধনী-গরিব—সবার সঙ্গে কথা বলার মতো মিশুক। আমার ধারণা কি ঠিক, স্যার?

আমি বলব, আপনি বিশদ ও যথাযথ বলেছেন। তবে ইদানীং তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আর চাপে পড়ে অনেকটা বদলেও যেতে পারেন তিনি। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছি, সংক্ষিপ্ত কয়েক বছরের মধ্যে কোনো ব্যক্তির জনগণের সামনের জীবন তার আগের জীবনটাকে বদলে  দিতে পারে।

এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, স্যার, বললেন এন্ড্রুস। এমনকি এখানে হ্যারির কথাই বলা যায়, সে রাজনীতির সঙ্গে একবার জড়িয়ে গেল, তো আগের সেই হ্যারির জীবনে আর ফিরে গেল না।

আবার হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল এবং মি. হ্যারি একটু কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে মুখের ওপর খানিক হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলা শুরু করলেন, এ কথা সত্যি, আমি প্রচারাভিযানে অনেক কাজ করেছি। আমার কাজের পরিধি আমাদের এই স্থানীয় পর্যায়ে। আপনার যে রকম মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা, তার অর্ধেক মাত্রার মর্যাদার লোকদের সঙ্গেও আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, স্যার। তবে আমার বিশ্বাস, আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি যেভাবে দেখি, ইংল্যান্ড হলো একটা গণতান্ত্রিক দেশ। ইংল্যান্ডকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে রক্ষা করার জন্য আমরা গ্রামের লোকেরাও সমান লড়াই করেছি, ত্যাগ করেছি। এখন আমাদের দায়িত্ব, আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো আমাদের অধিকার রক্ষা করা। আমাদের সেই সুবিধা রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের গ্রাম থেকেও কিছুসংখ্যক অল্পবয়সী ছেলে জীবন উৎসর্গ করেছে। এখন যেভাবে দেখি, আমাদের প্রত্যেকেরই ঋণ আছে তাদের কাছে। আমাদের যার যার ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের এখানে সবারই শক্ত মতামত আছে; আমাদের দায়িত্ব হলো আমাদের মতামত অন্যের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। আমরা একটা নিভৃত জায়গায়, একটা গ্রামে পড়ে আছি; আমাদের কারো বয়স কমছে না; গ্রামটাও আগের চেয়ে ছোট হয়ে আসছে। আমার দৃষ্টিতে আমাদের যে ছেলেরা জীবন দান করেছে তাদের কাছে আমাদের ঋণ স্বীকার করতে হবে। সে জন্যই, স্যার, আমি এত সময় দিয়ে থাকি, যাতে আমাদের কণ্ঠ উঁচুপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি। তার জন্য যদি আমি বদলে গিয়ে থাকি, গেলাম। তার জন্য যদি আমাকে আগে আগে মরে যেতে হয়, যাব। আমার মনে করার কিছু নেই।

একটু হেসে মি. টেলর বললেন, আপনাকে আগেই বলেছি, স্যার, আপনার মতো প্রভাবশালী কোনো ভদ্রলোক আমাদের গ্রামে আসবেন আর হ্যারির কঠিন কথা শুনবেন না, তা হতেই পারে না।

আবার হাসি পেয়ে যায় সবার। তবে সঙ্গে সঙ্গেই বলে ফেলি, আমি মনে করি, আমি আপনার অবস্থান খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছি, মি. স্মিথ। বুঝতে পারছি, আপনি পৃথিবীটাকে আরো সুন্দর অবস্থায় দেখতে চান এবং সেই লক্ষ্যে আপনি এবং আপনার গ্রামের মানুষ পৃথিবীকে আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় অবদান রাখার সুযোগ পেতে চান। এই আবেগকে জোর সমর্থন দিতে হবে। আমি বলতে চাই, এই একই রকম তাড়না আমাকে যুদ্ধের আগে বড় বড় কর্মযজ্ঞে জড়িত করেছিল। এখনকার মতোই তখনো বিশ্বশান্তি অধরা মনে হতো এবং সেটা পাওয়ার জন্য আমার ভূমিকা পালন করে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

এক্সকিউজ মি, স্যার, হ্যারি স্মিথ বললেন। তবে আমার লক্ষ্যটা অল্প একটু ভিন্ন। আপনাদের মতো মানুষের পক্ষে প্রভাব খাটানো সহজ। দেশের হাতে গোনা সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আপনার বন্ধু হিসেবে গণ্য করতে পারেন। কিন্তু এখানে আমাদের মতো লোকেরা, স্যার, বছরের পর বছর পার করেও ড. কার্লিসলে ছাড়া একজন খাঁটি ভদ্রলোকের দেখা পাই না। তিনি একজন প্রথম শ্রেণির ডাক্তার। তবু তাঁর তেমন যোগাযোগ নেই। আমাদের জন্য নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বের কথা ভুলে যাওয়া খুব সহজ। এ জন্যই আমি এত প্রচারকাজ করে যাই। মানুষ আমার মতামতের সঙ্গে একাত্ম হোক আর না-ই হোক, আপাতত তাদের মনের ভেতর চিন্তা চালু করে দিতে চাই। এই রুমের মধ্যেও হয়তো সবাই আমার সব কথায় একমত হবে না। কমপক্ষে তাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আমরা একটা গণতান্ত্রিক দেশে বাস করি। আমরা গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই করেছি। আমাদের সবার ভূমিকা পালন করা উচিত।

ড. কার্লিসলের কী যে হলো বুঝতে পারছি না, বললেন মিসেস স্মিথ। আমি নিশ্চিত, ভদ্রলোক এখন কিছু শিক্ষিত কথাবার্তা বলতে পারতেন। তাঁর কথাও সবার মধ্যে হাসির উদ্রেক করল।

আমি বললাম, আসলে আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল খুব, তবু আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি...।

অবশ্যই, স্যার, মিসেস টেলর বললেন। আপনি অবশ্যই খুব ক্লান্ত। আরেকটা কম্বল এনে দিচ্ছি আপনাকে। রাতে এখন খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়ছে।

না, মিস টেলর, আমি মোটামুটি আরামেই থাকতে পারব।

কিন্তু আমি টেবিল থেকে ওঠার আগেই মি. মরগান বললেন, আমার একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে, স্যার। রেডিওতে একজনের কথা আমাদের খুব ভালো লাগে; তার নাম লেসলি ম্যানড্রেক। আমার জানার ইচ্ছা, আপনার কি তাঁর সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে, স্যার?

আমি জানালাম, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওঠার জন্য আরেকবার চেষ্টা করলাম ঠিকই, কিন্তু পারলাম না। আমাকে এ রকম আরো প্রশ্নের কাছে আটকে যেতে হলো : বিভিন্নজনকে আমি চিনি কি না, তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কি না। আমি তখনো টেবিলেই বসা। এবার মিসেস স্মিথ মন্তব্য করলেন, এইতো, কে যেন আসছেন। আশা করি, শেষে ডাক্তার সাহেবই আসছেন।

আমি বললাম, আমার এখনই শুয়ে পড়া উচিত।

মিসেস স্মিথ বললেন, আমি নিশ্চিত, ডাক্তার সাহেবই আসছেন। আর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন।

তাঁর কথা শেষ হতে হতেই দরজায় টোকা এবং সঙ্গে কণ্ঠও শোনা গেল, মিসেস টেলর, আমি এসেছি, আমি।

যিনি ভেতরে এলেন, বয়স তাঁর অল্পই, লম্বা পাতলা চেহারা। আসলে ভালোই লম্বা। কারণ দরজা দিয়ে ঢোকার সময় তাঁকে মাথা নিচু করতে হলো। তিনি আমাদের সবাইকে শুভ সন্ধ্যা জানাতে না জানাতেই মিসেস টেলর বললেন, ইনি আমাদের জেন্টলম্যান, ডাক্তার সাহেব। তাঁর গাড়ি থর্নলি বুশের ওখানে আটকে পড়েছে। এ জন্যই স্মিথের বক্তৃতা শুনতে হচ্ছে তাঁকে।

ডাক্তার সাহেব টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

তাঁর হাত স্পর্শ করার জন্য উঠে পড়লাম এবং তিনি নিজেকে পরিচয় করালেন, রিচার্ড কারলিসলে। আপনার গাড়ির ভাগ্যটা খুব খারাপ। তবু আশা করি, এখানে আপনার দেখভাল করা হচ্ছে। হয়তো খুব বেশিই করা হচ্ছে।

আমি উত্তর দিলাম, ধন্যবাদ। সবাই খুব খেয়াল রাখছেন।

ভালো লাগছে আপনাকে আমাদের মাঝে পেয়ে। তিনি টেবিলে সোজা আমার বিপরীত পাশে বসলেন। আপনি কোন এলাকায় থাকেন?

অক্সফোর্ডশায়ার, আমি বললাম এবং ‘স্যার’ কথাটা উচ্চারণ ঠেকানো বেশ কঠিনই মনে হলো।

আমাদের দেশের সুন্দর একটা এলাকা। আমার চাচা থাকেন অক্সফোর্ডের বাইরে। সুন্দর এলাকা।

মিসেস স্মিথ বললেন, ভদ্রলোক আমাদের বলছিলেন, মি. চার্চিলকে তিনি চেনেন।

তাই নাকি? তাঁর এক ভাইপোকে চিনতাম। তবে এখন আর যোগাযোগ নেই তাঁর সঙ্গে। অবশ্য মহান ব্যক্তির সঙ্গে কখনো দেখা করার সুযোগ পাইনি।

মিসেস স্মিথ আবার বললেন, শুধু চার্চিল না, তিনি মি. ইডেন ও লর্ড হ্যালিফ্যাক্সকেও চেনেন।

সত্যি?

আমি টের পাচ্ছিলাম, ডাক্তারের চোখ আমাকে খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করে দেখছে। আমি জুতসই কোনো মন্তব্য করেই ফেলেছিলাম প্রায়। তবে আমার আগেই মি. এন্ড্রুস ডাক্তার সাহেবকে বললেন, ভদ্রলোক আমাদের বলছিলেন, পররাষ্ট্র বিষয়ে তাঁর সময়ে অনেক কিছু করেছেন।

সত্যি তাই?

আমার মনে হলো, ডাক্তার সাহেব অপরিমিত সময় ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তারপর তিনি আমুদে আচরণ ফিরে পেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আনন্দ ভ্রমণে বের হয়েছেন, না?

প্রধানত তা-ই, বলে আমি একটু হাসলাম।

আশপাশে দেখার মতো সুন্দর সুন্দর অনেক জায়গা আছে। ও আচ্ছা, মি. এন্ড্রুস, আপনার করাতটা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দুঃখিত।

তাড়াহুড়ার কিছু নেই, ডাক্তার।

কিছুক্ষণের জন্য তাঁদের মনোযোগ আমার ওপর থেকে সরে গেছে বুঝলাম। সুযোগ বুঝে আমি ওঠার চেষ্টা করলাম এবং বললাম—প্লিজ, এক্সকিউজ মি। দারুণ মজায় কাটল সন্ধ্যাটা; কিন্তু আমাকে এখন বিছানায় যেতে হবে।

মিসেস স্মিথ বললেন, আহা, দুঃখের কথা! এখনই আপনাকে বিছানায় যেতে হবে? ডাক্তার সাহেব তো এইমাত্র এলেন।

মি. হ্যারি স্মিথ তাঁর স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে এসে ডাক্তারকে বললেন, আমি তো আশা করেছিলাম, সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে আপনার চিন্তাচেতনা সম্পর্কে ভদ্রলোক কিছু বলবেন, ডাক্তার। তারপর আমার দিকে ঝুঁকে তিনি বললেন, আমাদের ডাক্তার সাহেব মনে করেন, সব ধরনের ছোটখাটো দেশই স্বাধীন হতে যাচ্ছে। তাঁর মতামত ভুল প্রমাণ করার মতো জানাশোনা আমার নেই; তবে আমি জানি, তাঁর ধারণা ভুল। তাঁর ধারণা সম্পর্কে আপনি কী বলেন শুনতে পারলে ভালোই লাগত, স্যার।

তবু আবারও মনে হলো, কার্লিসলের দৃষ্টি আমার ওপর। তারপর তিনি বললেন, দুঃখের বিষয় হলেও ভদ্রলোককে এখন বিছানায় যেতে দেওয়া উচিত। মনে হয়, সারা দিনের ক্লান্তি লেগে আছে।

আসলেই, অল্প হেসে আমি বললাম এবং টেবিলের পাশ দিয়ে আমার যাওয়ার পথ বের করলাম। আমার জন্য বিব্রতকর হলো, ড. কার্লিসলেসহ সবাই উঠে দাঁড়ালেন।

মিষ্টি হাসি দিয়ে বললাম, আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। মিসেস টেলর, রাতের খাবার দারুণ লেগেছে। আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক শুভ রাত্রি।

উত্তরে তাঁদের তরফ থেকে কোরাসের মতো এলো, শুভ রাত্রি, স্যার। আমি রুম ছেড়ে চলেই গিয়েছিলাম প্রায়, তখন ডাক্তারের কণ্ঠ শুনে দরজার পাশে থামলাম।

আমি বলছিলাম, তিনি বললেন। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি ওখানে দাঁড়িয়েই আছেন। বলছিলাম, স্টানবেরিতে সকালে প্রথম আমার একটা ভিজিট আছে। আপনার গাড়ি পর্যন্ত আপনাকে লিফট দিতে পারলে খুশি হব। আর টেড হারডেকারের ওখান থেকে এক ক্যান পেট্রলও নিয়ে নেওয়া যাবে।

সেটা তো ভালো কথা। কিন্তু আপনাকে কষ্ট দিতে চাইছিলাম না।

কষ্টের প্রশ্নই নেই। সাড়ে সাতটা হলে সমস্যা নেই তো?

খুব উপকার হবে আমার জন্য।

ঠিক আছে, তাহলে সাড়ে সাতটা। মিসেস টেলর, দেখবেন আপনার মেহমানকে তাহলে ঘুম থেকে উঠিয়ে নাশতা করাবেন সাড়ে সাতটার মধ্যে। তারপর আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, তাহলে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকল। অবশ্য আমার অপমান দেখার জন্য হ্যারি উপস্থিত থাকতে পারবে না।

তাঁর কথা শুনে আবার সবাই হেসে উঠলেন এবং আরেকবার শুভ রাত্রি বিনিময় হলো আমার এই নিরাপদ আশ্রয়ের রুমে আসার আগে।

 

 

আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এঁদের ভুল ধারণার কারণে আজ সন্ধ্যায় যে অস্বস্তিটা পার করতে হলো আমাকে সেটার ওপর আর বেশি জোর দেওয়ার দরকার নেই মনে হয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, পরিস্থিতি যেভাবে ভুল পথে চলে গেল সেটা ঠেকানোর জন্য সততার সঙ্গে আমি কিভাবে কী করতে পারি সেটা চেষ্টা করে দেখতে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ যে পর্যায়ে গিয়ে বাস্তব অবস্থাটা বুঝলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওই পর্যায়ে এই মানুষগুলোকে সত্যের আলো দিতে গেলে সবার মধ্যে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হতো। যা হোক, যা হয়েছে তাতে আফসোসের বিষয় থাকলেও কারো জন্য কোনো ক্ষতি তো হয়নি। আর মোটের ওপর সকালবেলা তো তাঁদের কাছ থেকে চলেই যাচ্ছি; সম্ভবত আর কোনো দিন তাঁদের সঙ্গে দেখা হবে না। এই বিষয় নিয়ে আর ভেবে কী হবে?

যা-ই হোক, দুর্ভাগ্যজনক ভুল-বোঝাবুঝি ছাড়াও এই সন্ধ্যায় আরো দু-একটা প্রসঙ্গ ছিল, যেগুলোতে কয়েক মুহূর্তের চিন্তা খরচ করা যেতে পারে, তা-ও যদি ভবিষ্যতে মনের ভেতর খুঁতখুঁত করে। যেমন মর্যাদা সম্পর্কে মি. হ্যারি স্মিথের ঘোষণা। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করার মতো তেমন কিছু অবশ্য নেই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে। আর মানতেই হবে, মর্যাদা কথাটার অর্থে আমি যা বুঝি তার থেকে পুরোপুরি আলাদা করে  ব্যবহার করেছেন তিনি।

মি. হ্যারি স্মিথের দৃষ্টিভঙ্গিতে কী সত্য আছে সেটার বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো একটা দৃষ্টান্ত আমার মনে পড়ে গেল। আমার নিজের অভিজ্ঞতার একটা উদাহরণ। যুদ্ধের আগের একটা ঘটনা, ১৯৩৫ সালের দিকের।

এক রাতে আমাকে বেল বাজিয়ে ডাকা হলো ড্রয়িংরুমে। তখন মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। ডিনারের পর থেকে ওখানে তিনজন অতিথিকে আপ্যায়ন করছিলেন মি. ডার্লিংটন। তাঁদের খাদ্য-পানীয় পুনরায় দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে ওই রুমে আমাকে বেশ কয়েকবার ডাকা হয়ে গেছে। আমি খেয়াল করেছি, তাঁরা খুব গভীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলাপে ডুবে আছেন। শেষবার যখন ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম, তাঁরা সবাই আলাপ থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তখন মি. ডার্লিংটন বললেন—স্টিভেনস, একটু ভেতরের দিকে আসবে? মি. স্পেন্সার তোমার সঙ্গে একটা কথা বলতে চান।

মি. স্পেন্সার হাতলওয়ালা চেয়ারে নেতিয়ে বসে ছিলেন। ওই অবস্থায় বসে থেকেই আমার দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি বললেন, মাই গুড ম্যান, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। একটা বিষয়ে তোমার সাহায্য দরকার আমাদের। আমরা এই বিষয়ে বিতর্ক থেকে বের হতে পারছি না। আচ্ছা, বলো তো, তুমি কি মনে করো, ব্যবসা-বাণিজ্যের এই মন্দা অবস্থায় আমেরিকার ঋণের পরিস্থিতি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়? নাকি মনে করো, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা যায় না এবং সোনার মান ত্যাগ করা এ বিষয়টার একেবারে শিকড়ে রয়েছে?

প্রশ্নের নতুনত্বে বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলাম, এই পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হয়েছে। তার মানে, আশা করা হচ্ছে, আমি যেন প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যাই। একমুহূর্তের মধ্যে তাঁদের উদ্দেশ্য বুঝে ফেলি এবং উপযুক্ত একটা উত্তর তৈরিও করি। মনস্থির করি, আমি বাইরে দেখাব, তাঁদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য আমি আপ্রাণ সংগ্রাম করছি। সত্যি দেখলাম, রুমের সবাই একজন আরেকজনের সঙ্গে মজা পাওয়া হাসি বিনিময় করছেন।

আমি বললাম, আমি খুব দুঃখিত, স্যার। কিন্তু আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না।

ততক্ষণে আমি পরিস্থিতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছি। কিন্তু তাঁরা চাপা হাসি হেসে যাচ্ছেন। তারপর মি. স্পেন্সার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তুমি আমাদের আরেকটা বিষয়ে সাহায্য করতে পারবে। তুমি কী মনে করো, ফরাসি ও বলশেভিকদের মধ্যে অস্ত্রচুক্তি হলে ইউরোপের মুদ্রা সমস্যা বাড়বে, না কমবে?

আমি বললাম, আমি খুব দুঃখিত, স্যার। কিন্তু আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না।

ওহ্ ডিয়ার, মি. স্পেন্সার বললেন। তুমি এবারও আমাদের সাহায্য করতে পারলে না?

এবার আরো বেশি চাপা হাসি টের পেলাম তাঁদের মধ্যে। তবে লর্ড ডার্লিংটন তখনই বললেন—খুব ভালো, স্টিভেনস। আর কিছু লাগবে না।

মি. স্পেন্সার বললেন—প্লিজ, ডার্লিংটন, আমার আরেকটা প্রশ্ন আছে আমাদের এই সুবোধ ব্যক্তির কাছে। বর্তমানে আমাদের অনেককে জ্বালিয়ে মারছে এ রকম একটা প্রশ্ন সম্পর্কে তার সাহায্য দরকার ছিল। আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারি, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কিভাবে ঢেলে সাজাব, সে সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সে প্রশ্নটা। সুবোধ ব্যক্তি, শোনো, আমাদের সহায়তা করতে পারো কি না দেখো। উত্তর আফ্রিকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দেওয়া তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণে এম লেভাল কী বোঝাতে চাইছিলেন? তোমারও কি এ রকম অভিমত যে তাঁর ঘরোয়া দলের জাতীয়তাবাদী নকশাটাই শেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে এটা একটা চাতুরী মাত্র?

আমি খুব দুঃখিত, স্যার। কিন্তু আমি আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না।

তার পরও, মি. স্পেন্সার বলে চললেন, আমরা এ রকম ধারণা পোষণ করেই চলছি, আমাদের জাতির সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিতে হবে আমাদের সামনের এই সুবোধ ব্যক্তি এবং তার মতো লাখ লাখ যারা আছে তাদের ওপর। এটাও কি কোনো বিস্ময়ের বিষয়, আমাদের বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির গদিতে বসে আমরা আমাদের নানা রকম সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে অক্ষম? কেন, আপনারা মাদার্স ইউনিয়নের কোনো কমিটিকে যুদ্ধের প্রচারণা চালাতে বলতে পারেন।

এবার তাঁদের মধ্যে প্রাণখোলা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। হাসি চলাকালেই মি. ডার্লিংটন বিড়বিড় করে বললেন—ধন্যবাদ, স্টিভেনস। এভাবেই তিনি আমাকে ওখান থেকে চলে আসার সুযোগ দিলেন।

যদিও পরিস্থিতিটা কিছুটা অস্বস্তিকর হয়েছিল, তবু মারাত্মক কঠিন হয়নি। কারো দায়িত্ব পালনকালে এ রকম প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়। আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন, সভ্য কোনো পেশাদার ব্যক্তি এ রকম পরিস্থিতি অনায়াসে পার হয়ে যাবে। পরদিন সকালে যখন লর্ড ডার্লিংটন বিলিয়ার্ড রুমে এলেন, আমি তো পুরো ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি মইয়ের ওপরে উঠে ওখানকার পোর্ট্রেটগুলো মোছার কাজ করছিলাম। তিনি বললেন—শোনো স্টিভেনস, পরিস্থিতিটা তো বেশ ভয়াবহ ছিল। মানে গত রাতে তোমাকে আমরা যে অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছিলাম।

আমার হাতের কাজ থামিয়ে দিয়ে বললাম, তেমন কিছু না, স্যার। আমি খুশি যে আপনাদের কাজে লাগতে পেরেছি।

না না, বেশ ভয়াবহ ছিল পরিস্থিতি। আমার মনে হয়, আমরা অতি ভালো ডিনার পর্ব শেষ করেছিলাম। আমি তোমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি গো, স্টিভেনস।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, স্যার। কিন্তু আপনাকে নিশ্চিত করে বলছি, স্যার, আমি কোনো অহেতুক অসুবিধায় পড়িনি।

লর্ড ডার্লিংটন কিছুটা ক্লান্ত পায়ে হাতলওয়ালা চেয়ারের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসলেন। জানালা দিয়ে শীতের রোদ ভেসে আসছিল। মইয়ের ওপর থেকে সেই আলোর নিচে তাঁর দীর্ঘ অবয়ব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার যতটুকু মনে পড়ে, অল্প বয়সেই তাঁর ওপরে জীবনের চাপ খুব বেশি পড়ে। মাঝেমধ্যে সেই চাপ তাঁর ওপরে স্পষ্ট হয়ে উঠত। ওই মুহূর্তটাও সে রকমই একটা সময় ছিল। বরাবরই তাঁর শারীরিক অবয়ব হালকা-পাতলা ছিল। সেই চেহারাটাও আশঙ্কাজনকভাবে আরো বেশি পলকা হয়ে যায়। দুর্ঘটনার মতো তাঁর চুলও অকালে সাদা হয়ে যায়। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ পড়ে; বসে যাওয়া ভাবটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণের জন্য বাগানের দিকের জানালা দিয়ে বাইরে নামার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, পরিস্থিতিটা আসলেই ভয়াবহ ছিল। কিন্তু দেখো, স্টিভেনস, মি. স্পেন্সার স্যার লিওনার্দের কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। সত্যিই সান্ত্বনার জন্য হলেও, তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রদর্শনে সহায়তা করেছ। পুরনো রীতিনীতির পক্ষে অর্থহীন কথাবার্তা বলছিলেন স্যার লিওনার্দ : জনগণই সবচেয়ে জ্ঞানী মধ্যস্থতাকারী। তুমি নিজেও কি এ রকম বিশ্বাস করো, স্টিভেনস?

আসলেই, স্যার।

আমরা কোনো জিনিসের আসল পরিচয় পাই সেটা অচল হয়ে যাওয়ার পরে। আমাদের দেশের সবাই ধীরগতিতে চলে। সব জাতির লোকই জানে, প্রত্যেক প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য পুরনোকে বাদ দিতে হয়। কখনো কখনো অতীতের প্রিয় বিষয়কেও বাদ দিতে হয়। কিন্তু এখানে ব্রিটেনে সে রকম দেখা যায় না। গত রাতে মি. লিওনার্দ যেমন বলছিলেন, তেমন অর্থহীন কথাবার্তা এখনো চলছে। সে জন্যই মি. স্পেন্সার একটা বিষয় প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন। তোমাকে বলে রাখি, স্টিভেনস, যদি স্যার লিওনার্দের মতো লোককে জাগিয়ে দেওয়া হয় এবং চিন্তাভাবনার মধ্যে ফেলা হয় তাহলে তখন মনে করো, তোমার গত রাতের অগ্নিপরীক্ষা বৃথা যায়নি।

আসলেই, স্যার।

লর্ড ডার্লিংটন আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আমরা সব সময় সব কিছুতে পিছে পড়ে থাকি। অচল ব্যবস্থাপনার পেছনে থাকতে থাকতে আমরা এ অবস্থায় পড়ে থাকি। গণতন্ত্র হলো অতীতের বিষয়। কারণ পৃথিবী এখন এত জটিল হয়ে উঠেছে যে বৈশ্বিক ভোটাধিকারের মতো বিষয়ের কথা আর ভাবা যায় না। কারণ বিপুলসংখ্যক সংসদ সদস্যের বিতর্কের জন্য সব কিছু স্থবির হয়ে যায়। সব কিছু হয়তো কয়েক বছর আগে ঠিক ছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে? গত রাতে মি. স্পেন্সার কী করলেন? তিনি ভালো করেই দেখিয়ে দিয়েছেন।

আমার বিশ্বাস, স্যার, তিনি বর্তমানের সংসদীয় ব্যবস্থাকে যুদ্ধের প্রচারণা চালানোর মতো মাদার্স ইউনিয়নের একটা কমিটির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ঠিক বলেছ, স্টিভেনস। আমরা এই দেশের সবাই সময়ের চেয়ে পেছনে পড়ে আছি। প্রগতিশীল মানুষের উচিত এই বিষয়টা স্যার লিওনার্দের মতো লোকদের কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরা।

সত্যিই, স্যার।

শোনো, স্টিভেনস, আমরা একটা চলমান সংকটের মধ্যে পড়ে আছি। মি. হোয়াইট্যাকারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে গিয়ে নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সাধারণ সভ্য মানুষ সাংঘাতিক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জার্মানি ও ইতালি তাদের ঘর গুছিয়ে ফেলেছে। হতভাগা বলশেভিকরাও তাদের নিজেদের মতো করে গুছিয়েছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টও তাঁর জনগণের জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিতে ভয় পাননি। কিন্তু স্টিভেনস, আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে দেখো, বছরের পর বছর চলে যায়, অথচ আমাদের কোনো কিছুই ভালোর দিকে যায় না। আমরা শুধু তর্কবিতর্ক করে কালক্ষেপণ করি। ভালো একটা ধারণা যখন বিভিন্ন রকম কমিটির ভেতর দিয়ে অর্ধেক পথ চলে গেছে, তখন সেটাকেও ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। চারপাশের অজ্ঞ লোকদের বকবকানির কারণে যারা সব কিছু সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তারাও স্থবির হয়ে যায়। এর থেকে কী বুঝতে পারো, স্টিভেনস?

জাতি এখন একটা দুঃখজনক অবস্থায় আছে, স্যার।

শোনো, স্টিভেনস, জার্মানি ও ইতালির দিকে তাকাও। শক্ত নেতৃত্বকে কাজ করতে দিলে কী করতে পারে, দেখো। সেসব দেশে এ রকম বিশ্বজনীন ভোটাধিকারের মতো অর্থহীন জিনিস নেই। তোমার বাড়িতে আগুন লাগলে বাড়ির সবাইকে ড্রয়িংরুমে জড়ো করে এক ঘণ্টা ধরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপায় সম্পর্কে তর্কবিতর্ক করতে পারো না, তাই না? এ রকম পদ্ধতি একবারের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু বিশ্ব তো এখন এক জটিল জায়গায় পরিণত হয়েছে। রাস্তার কোনো লোক রাজনীতি, অর্থনীতি, বিশ্ববাণিজ্য সম্পর্কে জানবে, সেটা আশা করা যায় না। তার জানার দরকারটাই বা কী? তবে তুমি গত রাতে ভালো একটা উত্তর দিয়েছ, স্টিভেনস। তুমি কিভাবে বোঝালে? তুমি বোঝালে, ওই সব জিনিস তোমার জগতের বাইরের বিষয়। আর এগুলো তোমার জগতের হতে যাবেই বা কেন?

 

চতুর্থ দিন : বিকেল

লিটল কম্পটন, কর্নওয়াল

 

শেষে লিটল কম্পটনে পৌঁছে গেছি। এই মুহূর্তে আমি হোটেল রোজ গার্ডেনের ডাইনিং হলে বসে আছি। একটু আগে দুপুরের খাবার শেষ করেছি।

রোজ গার্ডেন হোটেল খুব বিলাসবহুল নয়। তবে ঘরোয়া ও আরামদায়ক। এখানে থাকার জায়গার জন্য বেশি খরচ করার কারণে কাউকে গজগজ করতে হয় না। গ্রামের মাঝের খোলা চত্বরের সুবিধাজনক একটা জায়গায় আছে হোটেলটা। চমৎকার আইভি লতায় ছাওয়া এই কাছারিবাড়িতে আমার অনুমানে ত্রিশজনের মতো মেহমানকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। আমি এখন যে ডাইনিংরুমে বসে আছি এটা পরে তৈরি করে মূল ভবনের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া হয়েছে। মূল ভবনটা হলো একটা লম্বা সমতল রুম, দুই পাশে বড় বড় জানালার সারি। এক পাশে গ্রামের মাঝের খোলা চত্বর দেখা যায়। অন্যদিকে পেছনের বাগান। যে কেউ বুঝতে পারবে, বাগান থেকেই হোটেলের নামকরণ করা হয়েছে। বাগানটা বাইরের বাতাস থেকে সুরক্ষিত; বাগানের ভেতর এখানে-ওখানে অনেক টেবিল পাতা আছে।

আমার টেবিলটা রুমের যে পাশে গ্রামের মাঝের খোলা চত্বর, সেদিকের একটা জানালার পাশে। এ জন্য আমি গত এক ঘণ্টার বেশির ভাগ কাটিয়ে দিয়েছি খোলা চত্বর, আমার ফোর্ড এবং বাইরে রাখা আরো কয়েকটা বাহনের ওপরে বৃষ্টি পড়া দেখে। বৃষ্টি কিছুটা একটানা হচ্ছে; তবে আমাকে বাইরে কিংবা গ্রামের দিকে ঘুরে বেড়াতে যেতে নিরুৎসাহ করা যথেষ্ট কঠিন। আমারও মনে হচ্ছে, মিস কেন্টনের কাছে বেড়াতে যাওয়ার সম্ভাবনাটা এসেছে; আমি বের হয়ে পড়তে পারি। কিন্তু আমার চিঠিতে তো বলেছি, বিকেল তিনটার দিকে তাঁর ওখানে যাব। এত আগে গিয়ে তাঁকে চমকে দেওয়া মনে হয় ঠিক হবে না। বৃষ্টি যদি খুব তাড়াতাড়ি না থামে তাহলে সম্ভাবনা আছে, বের হওয়ার মতো উপযুক্ত সময় না আসা পর্যন্ত আমি এখানে বসে অপেক্ষায় থেকে চা খেয়ে যাব।

এই মুহূর্তের মুষলধারের বৃষ্টিটাও বিস্ময়কর। যেহেতু দিনটা শুরু হয়েছিল ঝকঝকে সকাল দিয়ে, ডার্লিংটন হল ছেড়ে আসার পর প্রতিটি সকালেই আশীর্বাদ পেয়েছি। আসলে দিনটা শুরু হয়েছিল সুন্দরভাবে; খামারের ডিম ও টোস্ট ছিল মিসেস কেন্টনের দেওয়া সকালের নাশতায়। ড. কার্লিসলে ঠিক সাড়ে সাতটায় এসে হাজির হলেন এবং আমি টেলরদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আমার তরফে দেওয়া কোনো রকম সম্মানী তাঁরা নিতেই চাননি। এভাবে কোনো বিব্রতকর কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়, এই ভয়ে পড়েন তাঁরা।

ড. কার্লিসলে তাঁর রোভারের পেছনের সিটে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করে বললেন, আপনার জন্য এক ক্যান পেট্রল পাওয়া গেছে। তাঁর সুবিবেচনার জন্য আমি ধন্যবাদ দিলাম। যখন আমি পেট্রলের দামের প্রসঙ্গ তুললাম তিনিও প্রচণ্ড আপত্তি তুললেন।

এ রকম করার কোনো মানে হয়, ওল্ড বয়? এই একটুখানি পেট্রল আমার গ্যারেজের পেছনে পেয়েছি। এটুকুতে আপনি তো ক্রসবি গেট পর্যন্ত যেতে পারবেন। ওখান থেকে আপনি পুরোপুরি বোঝাই করে নিতে পারবেন।

গতকাল সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওখান থেকে যে গির্জার চূড়া দেখেছিলাম সেটা মসকোম্বে গ্রামের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। গির্জাকে ঘিরেই কিছু দোকানপাট আছে। সকালের রোদে সব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রামটা ভালো করে দেখার সুযোগ খুব একটা পাওয়া গেল না। কারণ ড. কার্লিসলে গাড়িটা দ্রুত মোড় ঘুরিয়ে একটা খামারবাড়ির ড্রাইভওয়েতে ঢুকিয়ে দিলেন।

পথ কিছুটা কমানো যাবে এদিক দিয়ে, তিনি বললেন যখন আমরা ওদিককার গোলাবাড়ি আর দাঁড় করিয়ে রাখা আরো বেশ কয়েকটা খামারি যানবাহন পেছনে ফেলে চলে গেলাম। বাইরে কোনো লোকজন দেখলাম না। যখন আমরা একটা বন্ধ গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম, ডক্টর বললেন, দুঃখিত, ওল্ড চ্যাপ। আপনি যদি নেমে একটু খুলে দেন।

গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে গেট খুলে দেওয়ার সঙ্গে গোলাবাড়িগুলোর একটা থেকে কুকুরের আক্রমণাত্মক ডাকের কোরাস শুনতে পেলাম। তাড়াতাড়ি গেট খুলে ড. কার্লিসলের গাড়ির সামনে এসে স্বস্তি পেলাম।

দুই পাশে গাছপালাঘেরা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমরা আরো কিছু হাস্যরসাত্মক কথাবার্তা বিনিময় করলাম। টেলরদের বাড়িতে আমার ঘুম কেমন হলো ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। হঠাৎ বললেন, আশা করি আপনি আমাকে রূঢ় মনে করবেন না। আপনি তো গৃহকর্মী নন, তাই না?

আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি ওই বিহ্বলকর প্রশ্ন শুনে বরং স্বস্তি পেলাম।

আমি আসলে গৃহকর্মীই, স্যার। আমি অক্সফোর্ডের কাছের ডার্লিংটন হলের বাটলার।

আমিও তা-ই ভেবেছিলাম। উইনস্টন চার্চিলসহ আরো অনেককে যেহেতু দেখেছেন। আমি নিজে নিজে ভেবেছি, এই চ্যাংড়ার মাথার কোনো ঠিকঠিকানা নেই, অথবা তার এ রকম আচরণের পেছনে কোনো সাধারণ ব্যাখ্যা আছে।

খাড়া আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি ওঠাতে ওঠাতে ড. কার্লিসলে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। আমি বললাম, আমি কারো সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি, স্যার। অবশ্য...।

আরে ভাই, এটার আর ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। আমি বুঝতে পেরেছি, বিষয়টা কিভাবে ঘটেছে। আমি বলতে চাই, আপনার চেহারায় অভিজাত লোকদের একটা ভালো নমুনা আছে। এখানকার লোকেরা সহজেই আপনাকে লর্ড কিংবা ডিউক মনে করতেই পারে। কথাগুলো বলে ডক্টর প্রাণ খুলে হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ভুল করে কেউ মাঝেমধ্যে লর্ড মনে করলে ভালোই হয়।

আমরা নীরবে কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। তারপর ড. কার্লিসলে বললেন, আমাদের সঙ্গে এই অল্প একটু সময় কাটালেন; আশা করি, ভালো লেগেছে আপনার।

আমার আসলেই খুব ভালো লেগেছে, স্যার।

মসকোম্বের মানুষ সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন হলো, সহজ মানুষের দল খুব একটা খারাপ না, তাই না?

সবাই খুব নিবেদিতপ্রাণ। আর মি. ও মিসেস টেলর তো অমায়িক মানুষ।

সব সময় আমাকে এত ‘স্যার’ বলবেন না তো, মি. স্টিভেনস। এখানকার লোকেরা খুব খারাপ নয়। আমার কথা বললে, আমি জীবনের বাকি দিনগুলো এখানেই কাটাতে চাই।

আমার মনে হলো, ড. কার্লিসলের কথাগুলো বলার ধরনে কিছু একটা অস্বাভাবিকতা ছিল। তাঁর পরের কথাগুলোতে ইচ্ছাকৃত একটু খোঁচা আছে মনে হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে এখানকার মানুষকে আপনার কাছে নিবেদিতপ্রাণ মনে হয়েছে, না?

হ্যাঁ, ডক্টর। এরা সবাই সমমনা।

তাহলে ওরা সবাই কী বলছিল কাল রাতে? আশা করি, ওরা বোকার মতো গ্রামের মুখরোচক গালগল্প করে আপনাকে বিরক্ত করেনি।

মোটেও না, ডক্টর। আসলে তাদের কথাবার্তার সুরে মনে হলো খুব আন্তরিক। তাদের কথায় দারুণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে।

ও, আপনি হ্যারি স্মিথের কথা বললেন, ড. কার্লিসলে হাসতে হাসতে বললেন। ওর কথা বাদ দিন। ওর কথা শুনে কিছুক্ষণ আনন্দ পাওয়া যায়। তবে ও আসলে একটা নির্বোধ। মাঝেমধ্যে আপনার মনে হতে পারে, ও একজন কমিউনিস্ট। তারপর আবার মনে হতে পারে, ও একজন সত্যিকারের টোরি। সর্বোপরি ও একটা নির্বোধ।

বেশ মজার তো!

গত রাতে আপনার কাছে কী বিষয়ে লেকচার দিল? সাম্রাজ্য সম্পর্কে? নাকি জাতীয় স্বাস্থ্য সম্পর্কে?

মি. স্মিথ সাধারণ বিষয়-আশয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন তাঁর বক্তব্যের গণ্ডি।

ও, তাই নাকি? যেমন?

আমি একটু কাশি দিলাম। মর্যাদার ওপরে মি. স্মিথের নিজের চিন্তাভাবনা আছে।

আমি বলছি, আপনার কথা শুনে মনে হয়, হ্যারি স্মিথের জন্য এটা তো দার্শনিকসুলভ হয়ে গেছে। ও এত দূর গেল কিভাবে?

আমার মনে হলো, মি. স্মিথ গ্রামে তাঁর প্রচারকাজ করার কথা জোর দিয়ে বললেন।

ও, তাই নাকি?

তিনি আমাকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, মসকোম্বে গ্রামের সবাই বড় বড় বিষয় সম্পর্কে শক্ত মতামত পোষণ করে।

হ্যাঁ, এই হলো হ্যারি স্মিথ। আপনি নিজেও হয়তো ওর সম্পর্কে এ রকমই আশা করেছিলেন, ওর এসব কথা অর্থহীন প্যাচাল। অবশ্য হ্যারি সব সময় সবার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলে যায়। তবে হ্যারির কথা বলা শেষ হলে তার শ্রোতারা আগের চেয়ে মনের দিক থেকে হালকা হয়ে যায়।

আমরা আবার দু-এক মুহূর্তের জন্য নীরব রইলাম। তারপর বললাম, জিজ্ঞেস করছি বলে মাফ করবেন, স্যার, মি. স্মিথকে কি কমিক ব্যক্তি বলেই মনে করে সবাই?

হুম্ম্, অত দূর বললে একটু বেশিই হয়ে যায়। এখানকার লোকজনের রাজনৈতিক ধ্যানধারণা আছে খানিক। তারা মনে করে, অমুকতমুক সব বিষয়ে তাদের জোরালো মতামত থাকা দরকার, হ্যারি যেমনটা জোর দিয়ে বলে থাকে তাদের। তবে তারা মূলত অন্য কোনোখানের মানুষ থেকে আলাদা নয়। তারা শান্ত নিরিবিলি জীবন চায়। অমুকতমুক বিষয়ে পরিবর্তন সম্পর্কে হ্যারির অনেক চিন্তাভাবনা আছে। কিন্তু গ্রামের কেউ কোনো রকম বিদ্রোহ বা আন্দোলন চায় না, এমনকি সেখান থেকে কোনো সুবিধা পেলেও না। এখানকার মানুষ চায়, তাদের শান্ত জীবন যাপন করতে দেওয়া হোক। তারা অমুকতমুক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না।

ডাক্তার সাহেবের কণ্ঠে বিরক্তি বুঝতে পেরে বিস্মিত হয়ে যাই। তিনি একটু হাসি দিয়ে নিজেকে সামলে নেন। তারপর বলেন, আপনার পাশ থেকে গ্রামের সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

আসলেই কিছুদূর নিচের দিকে গ্রামটার চেহারা পরিষ্কার হয়ে এসেছে। অবশ্য সকালের সূর্যের আলো গ্রামের চেহারায় আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে দিয়েছে। নইলে কাল সন্ধ্যার বিষণ্নতার আবহে যে চেহারা দেখেছিলাম সে রকমই দেখার কথা। এবার আমার মনে হলো, আমার ফোর্ড যেখানে রেখে গেছি তার কাছাকাছি চলে এসেছি।

এবার আমি কথা বললাম, মি. স্মিথ মনে করেন, কোনো ব্যক্তির মর্যাদা নির্ভর করে তার বড় বড় বিষয়ে জোরালো মতামত থাকার ওপরে।

ও হ্যাঁ, মর্যাদা। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, হ্যারি স্মিথ দার্শনিক সংজ্ঞা নিয়ে কথা বলছিল। আমি কসম করে বলতে পারি, এসব ওর বিকৃতি।

তাঁর শেষের কথাগুলোর জোর সম্মতি চেয়েছেন—তা নয়, স্যার।

ড. কার্লিসলে মাথা ঝাঁকালেন, তবে মনে হলো, তিনি নিজের ভেতর অন্য চিন্তায় ডুবে আছেন। শেষে তিনি বললেন—জানেন, মি. স্টিভেনস, আমি যখন এখানে আসি তখন ছিলাম একজন দায়বদ্ধ সমাজতান্ত্রিক। সব মানুষের জন্য সর্বোত্তম সেবায় বিশ্বাস করতাম। আমি এখানে প্রথম আসি উনপঞ্চাশে। সমাজতন্ত্র মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করতে দিত। এখানে যখন আমি আসি সে রকমই বিশ্বাস করতাম। দুঃখিত, আপনি এসব পচা প্যাচাল শুনবেন কেন? তিনি আমার দিকে তাকালেন, আপনার কথা বলুন, ভাই।

আমি বুঝতে পারছি না, স্যার।

মর্যাদা জিনিসটা কী মনে করেন আপনি?

তাঁর এ রকম সরাসরি প্রশ্ন করা দেখে আমি খানিক বিস্মিত হলাম, বললাম, অল্প কথায় এটার ব্যাখ্যা করাই তো কঠিন, স্যার। তবে আমার সন্দেহ হলো, মর্যাদা জিনিসটা কারো জনসমক্ষে পোশাক না খোলার মতো পর্যায়ে আসতে পারে না।

দুঃখিত, কী করতে পারে না?

মর্যাদা, স্যার।

আহ্, বলে মাথা ঝাঁকালেন তিনি। কিন্তু মনে হলো, কিছুটা বিমূঢ় হয়ে আছেন। তারপর তিনি বললেন, এখন এই রাস্তাটা আপনার কাছে পরিচিত হওয়ার কথা। দিনের বেলায় হয়তো একটু আলাদা দেখাচ্ছে। এই যে এইটা না? মাই গুডনেস, কী সুন্দর বাহন আপনার!

ড. কার্লিসলে ফোর্ডের ঠিক পেছনে গাড়ি থামালেন। গাড়ি থেকে নেমেই আবার বললেন, মাই গুডনেস, কী সুন্দর বাহন! পরের মুহূর্তে তিনি একটা নল এবং এক ক্যান পেট্রল বের করে সদয় হাতে আমার ফোর্ডের ট্যাংক ভর্তি করে দিলেন। আমার মনে তখনো একটা সন্দেহ ছিল, হয়তো ফোর্ডের কোনো সমস্যাও থাকতে পারে। কিন্তু যখন চালু করার চেষ্টা করলাম সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন সামান্য মৃদু আওয়াজে চালু হয়ে গেল। এবার ড. কার্লিসলেকে ধন্যবাদ দিলাম এবং আমরা একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। অবশ্য সামনে আমাদের দুজনের রাস্তা আলাদা হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মাইলখানেক তাঁর রোভারের পিছে পিছে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চললাম।

সকাল নয়টার দিকে আমি সীমানা পার হয়ে কর্নওয়ালে ঢুকে পড়লাম। সেটাও বৃষ্টি শুরু হওয়ার কমপক্ষে তিন ঘণ্টা আগে। মেঘ তখনো জ্বলজ্বলে সাদা। আসলে আজ সকালে যে দৃশ্যগুলো আমার সামনে আসতে লাগল সেগুলোর বেশ কয়েকটি আমার এযাবৎ দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যের অন্যতম। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, দৃশ্যগুলোর দিকে আমার যতটা নজর দেওয়া উচিত ততটা দিতে পারছিলাম না। কারণটা জোর গলায় বলা যায়, আমি তখন একটা গভীর ভাবনার চিত্রকল্পে ডুবে ছিলাম : অজানা কোনো জটিলতা না হলে আজ দিনের শেষেই মিস কেন্টনের সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে। সুতরাং তখন বড় বড় খোলা মাঠ পেরিয়ে, মাইলের পর মাইল কোনো মানুষ কিংবা যানবাহন না দেখে, দু-চারটে পাথরের তৈরি কটেজওয়ালা চমৎকার ছোট ছোট গ্রামের ভেতর দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে স্টিয়ারিং চালিয়ে আমি আবারও অতীতের দিকেই ফিরে যাচ্ছিলাম। আর এখন আমি লিটল কম্পটনের এই আরামদায়ক হোটেলের ডাইনিংরুমে বসে বাইরে গ্রামের খোলা চত্বরে একটানা পড়ে যাওয়া বৃষ্টি দেখছি। আমার হাতে খানিকটা সময় আছে। অতীতের ওই পথে চলে যাওয়া থেকে মনকে ঠেকাতে পারছি না কিছুতেই।

আজ সারা সকাল আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল একটা বিশেষ স্মৃতি, কিংবা বলা যায় স্মৃতির একটা অংশ। এত বছর ওই একটা মুহূর্ত জীবন্ত হয়েই রয়ে গেছে আমার সঙ্গে। পেছনের করিডরে মিস কেন্টনের পার্লারের বন্ধ দরজার সামনে আমার একা একা দাঁড়িয়ে থাকার স্মৃতি সেটা। আমি দরজার একেবারে মুখোমুখি ছিলাম না, তবে কিছুটা দরজামুখো হয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিস কেন্টনের দরজায় টোকা দেব কি দেব না—এ রকম একটা সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। আমার মনে আছে, ওই মুহূর্তে আমি এ রকম একটা ধারণায় আটকে ছিলাম, বন্ধ দরজার পেছনে কয়েক গজ দূরে মিস কেন্টন আসলে কাঁদছিলেন। যেমনটা বলছিলাম, ওই মুহূর্তটা আমার মনের ভেতর শিকড় গেড়ে বসে আছে; যে অদ্ভুত অনুভূতিটা আমাকে ওইভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল সে অনুভূতিটাও একই রকম করে জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে। তবে যে বাস্তবিক পরিস্থিতির কারণে পেছনের করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা সম্পর্কে আমার নিশ্চয়তা কম আছে। আমার মনে হয়, অন্য কোনোখানে এ রকম স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে হয়তো বলে ফেলতে পারি, এই স্মৃতিটা এসেছে মিস কেন্টনের খালার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরের মুহূর্ত থেকে। তার মানে, যখন তাঁর খবরটা পাওয়ার পর আমি তাঁকে একা নিজের মতো করে দুঃখ বোধ করার সুযোগ দিতে তাঁর রুম থেকে বের হয়ে আসি, তখন উপলব্ধি করি, তাঁকে তো আমার পক্ষ থেকে সান্ত্বনা দেওয়া হলো না।

তাঁর বাবা স্যার ডেভিড কার্ডিনাল লর্ড ডার্লিংটনের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকর্মী। কিন্তু আমি যে সন্ধ্যার কথা বলছি তার তিন-চার বছর আগে দুঃখজনকভাবে এক রাইডিং দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। এরই মধ্যে মি. কার্ডিনাল আন্তর্জাতিক বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য করে কলামিস্ট হিসেবে বেশ নাম কামিয়েছেন। স্পষ্টত, তাঁর এসব কলাম লর্ড ডার্লিংটনের তেমন পছন্দ হতো না। এ রকম বেশ কিছু উদাহরণ আমার মনে আছে যখন তিনি জার্নাল থেকে চোখ তুলে এ রকম মন্তব্য করেছেন : ওর বাবা তো বেঁচে নেই, পড়তে হচ্ছে না রেজি  ছেলেটা আবার এসব ছাইভস্ম লেখা শুরু করেছে। কিন্তু তাঁর কলাম লর্ড ডার্লিংটনের পছন্দ না হলেও মি. কার্ডিনাল কিন্তু আমাদের হাউসে নিয়মিতই আসতে লাগলেন। মি. ডার্লিংটনও কখনো ভোলেননি, মি. কার্ডিনাল তাঁর ধর্মপুত্র এবং তাঁকে আত্মীয়ের মতোই দেখতেন। একই সময়ে মি. কার্ডিনালও ডিনারে আসার আগে যথারীতি খবর পাঠাতেন। সে সন্ধ্যায় দরজা খুলে দিতে গিয়ে অবাক হয়েছিলাম তাঁকে দেখে; তাঁর কাছ থেকে তো সেদিন কোনো খবর আসেনি। দরজা খুলে দেখি, তিনি দুই হাতে ব্রিফকেসটা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

ওহ্, স্টিভেনস, কেমন আছেন? আজ রাতে কিছুটা জটের মধ্যে পড়ে গেলাম। ভাবলাম মি. ডার্লিংটন আজকের রাতের জন্য আশ্রয় দেন কি না।

আপনাকে আবার দেখে খুব ভালো লাগছে, স্যার। আমি মি. ডার্লিংটনকে জানিয়ে দেব, আপনি এখানে এসেছেন।

মি. রোল্যান্ডের ওখানে উঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভুল-বোঝাবুঝির আশঙ্কা আছে বলে ওখানে গেলাম না। তা ছাড়া উনারা কোথায় যেন গেছেন। আমি মনে হয় খুব অসুবিধাজনক সময়ে আসিনি, তাই না? মানে আজ রাতে বিশেষ কোনো আয়োজন নেই তো?

আমার মনে হয়, ডিনারের পরে মি. ডার্লিংটনের সঙ্গে দেখা করতে কয়েকজন ভদ্রলোক আসবেন।

ওহেহা, তাহলে তো দুর্ভাগ্য। একটা অনুপযুক্ত রাত বেছে নিলাম। আমার তো আজ একটু আড়ালে থাকতে হবে। আজ রাতের মধ্যেই কয়েকটা কাজ শেষ করতে হবে, মি. কার্ডিনাল তাঁর ব্রিফকেসের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

আমি মি. ডার্লিংটনকে বলব, আপনি এখানে আছেন, স্যার। ইচ্ছা করলে আপনি মি. ডার্লিংটনের সঙ্গে ডিনারে বসতে পারেন।

হলে ভালোই হতো। আমি সে রকমই আশা করেছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় না, মিসেস মর্টিমার আমাকে দেখে খুশি হবেন।

মি. কার্ডিনালকে ড্রয়িংরুমে রেখে পড়ার ঘরের দিকে রওনা দিলাম। মি. ডার্লিংটনকে সেখানে পেলাম; তিনি গভীর মনোযোগে কয়েকটা পৃষ্ঠায় কী যেন কাজ করছেন। আমি তাঁকে মি. কার্ডিনালের আসার কথা জানালাম। বিস্ময়কর বিরক্তির ছাপ পড়ল তাঁর মুখের ওপর। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন, যেন কঠিন কোনো সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করছেন।

তিনি শেষে বললেন, কার্ডিনালকে বলো, আমি কিছুক্ষণ পরই নিচে নামব। অল্প ক্ষণের জন্য সে একাই মজা করুক।

যখন নিচে নামলাম, দেখি, মি. কার্ডিনাল ড্রয়িংরুমের পাশে অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। ড্রয়িংরুমের বিভিন্ন জিনিস গভীর মনোযোগে পরীক্ষাও করছেন, যেগুলো অনেক দিন আগেই তাঁর চোখে পড়ার কথা ছিল। মি. ডার্লিংটনের বার্তা পৌঁছে দিলাম তাঁকে এবং জিজ্ঞেস করলাম, আপাতত তাঁকে কী রিফ্রেশমেন্ট দিতে পারি।

ওহ্, স্টিভেনস, এখনকার জন্য শুধু চা। মি. ডার্লিংটনের কাছে আজ কোনো মেহমান আসার কথা?

স্যরি, স্যার। এ ব্যাপারে আপনাকে হেল্প করতে পারছি না বলে দুঃখিত।

কোনো ধারণাই নেই, না?

আই অ্যাম স্যরি, স্যার।

হুম্ম্, রহস্যজনক। আচ্ছা ঠিক আছে, আজ রাতে আমাকে একটু আড়ালেই থাকতে হবে।

আমার মনে আছে, একটু পরেই মিস কেন্টনের পার্লারে গেলাম। তিনি টেবিলে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে কিছুই ছিল না। তাঁর হাত খালি ছিল। তাঁর চেহারা দেখে বোঝা গেল, আমি তাঁর ওখানে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই ওখানে ওইভাবে বসে ছিলেন।

আমি বললাম, মি. কার্ডিনাল এসেছেন, মিস কেন্টন। তিনি যে রুমটায় থাকেন সেটার দরকার হতে পারে রাতের জন্য।

খুব ভালো, মি. স্টিভেনস, বের হওয়ার আগে আমি সব ঠিক করে যাব।

আহ্, আজ রাতেও আপনি বাইরে যাবেন, মিস কেন্টন?

যেতেই হবে, মি. স্টিভেনস।

আমাকে মনে হয় খানিক বিস্মিত দেখাল। কারণ তিনি বলে চললেন, আপনার মনে থাকার কথা, মি. স্টিভেনস, পনেরো দিন আগে আমরা এ বিষয়ে আলাপ করেছিলাম।

হ্যাঁ, মিস কেন্টন, মাফ করবেন, মিস কেন্টন। এই মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম।

বিশেষ কোনো দরকার আছে, মি. স্টিভেনস?

তেমন না, মিস কেন্টন। আজ রাতে কয়েকজন অতিথি আসার কথা আছে। সে জন্য অবশ্য আপনার উপিস্থিতি জরুরি নয়।

আমার আজ রাতের ছুটির ব্যাপারে আমরা দুজনই পনেরো দিন আগে একমত হয়েছিলাম, মি. স্টিভেনস।

অবশ্যই, মিস কেন্টন। ভুলে যাওয়ার জন্য মাফ করবেন।

আমি চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু মিস কেন্টনের কথা শুনে আবার দরজার সামনে থেমে গেলাম। তিনি বললেন, স্টিভেনস, আপনাকে একটা কথা বলার আছে।

বলুন, মিস কেন্টন।

আমার পরিচিত যার কথা বলেছিলাম তার সম্পর্কে। আজ রাতে আমি তার সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছি।

ঠিক আছে, মিস কেন্টন।

আমাকে তিনি তাঁকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমার মনে হলো, এ বিষয়ে আপনার জানার অধিকার আছে।

অবশ্যই, মিস কেন্টন। সেটা তো ভালো কথা।

সেটা নিয়ে আমি এখনো ভাবছি।

আসলেই।

নিচে তাঁর হাতের দিকে এক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে রইলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর চাহনি আমার দিকে উঠে এলো। তিনি বললেন, আমার পরিচিত ওই ব্যক্তি আগামী মাস থেকে ওয়েস্ট কান্ট্রিতে চাকরি শুরু করতে যাচ্ছেন।

ঠিক আছে।

মি. স্টিভেনস, বিষয়টা নিয়ে আমি আরো ভেবেছি, তবে মনে হয়েছে, আপনাকে জানানো দরকার।

সে জন্য কৃতজ্ঞ বোধ করছি, মিস কেন্টন। আশা করি, আপনার সন্ধ্যা আনন্দে কাটবে। তাহলে এখন যে যেতে হয়।

বিশ মিনিটের মতো পরে মিস কেন্টনের সঙ্গে আমার আবার দেখা হলো। আমি ডিনারের প্রস্তুতির জন্য ব্যস্ত ছিলাম। ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে পেছনের সিঁড়ির প্রায় অর্ধেকটা উঠে গেছি। তখনই ঠিক আমার নিচের দিকে রাগান্বিত পায়ের চটরপটর আওয়াজ শুনলাম। তাকিয়ে দেখি, মিস কেন্টন সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

মি. স্টিভেনস, আমি কি ধরে নেব, আজ সন্ধ্যায় দায়িত্ব পালনের জন্য আমাকে আপনার দরকার?

মোটেই না, মিস কেন্টন। একটু আগে আপনি যেমন বলেছেন, আপনি তো আগে থেকেই আমাকে জানিয়েছিলেন।

কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি, আজ রাতে আমার বাইরে যাওয়া নিয়ে আপনি খুব মন খারাপ করেছেন।

আপনি বাস্তবের ঠিক উল্টো দেখতে পাচ্ছেন।

আপনি কি মনে করেছেন, কিচেনের আশপাশে জোরে জোরে শব্দ করে আর এভাবে আমার পার্লারের সামনে দিয়ে এদিক-ওদিক শব্দ করে হাঁটাহাঁটি করে আমার বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবেন?

মিস কেন্টন, আপনি কিচেনে যে হালকা শব্দ শুনেছেন সেটা হয়েছে মি. কার্ডিনালের আসা উপলক্ষে; তিনি দেরিতে ডিনারে এসেছেন বলে। আজ সন্ধ্যায় আপনি বাইরে যাবেন না কেন, অবশ্যই যাবেন।

বাইরে যাওয়ায় আপনার আশীর্বাদ পাই আর না পাই, তাতে কিছু যায়-আসে না, মি. স্টিভেনস। আমি আপনাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম, আমি দুই সপ্তাহ আগে ছুটির ব্যবস্থা করে রেখেছি।

অবশ্যই, মিস কেন্টন। আপনার জন্য আমি আরো একবার আনন্দময় সন্ধ্যা কামনা করছি।

 

 

ডিনারে দুজন ভদ্রলোকের মাঝে অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করতে লাগল : অনেকক্ষণ তাঁরা নীরবে খেতে থাকলেন। বিশেষ করে লর্ড ডার্লিংটনকে দেখে মনে হলো, তিনি দূরের কোনো কিছু নিয়ে মগ্ন আছেন। একপর্যায়ে মি. কার্ডিনাল বললেন, আজ রাতে বিশেষ কিছু আছে, স্যার?

অ্যাঁ?

আপনার আজ রাতের অতিথিরা কি বিশেষ কেউ?

আমি তোমাকে বলতে পারছি না, বাছা। খুব গোপনীয়।

ওহ্, ডিয়ার, তার মানে, আমি ওখানে বসতে পারব না?

কোথায় বসতে পারবে না বলছ, বাছা?

মানে আজকে রাতে যেটা অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে।

আহা, এটা তো তোমার পছন্দ হওয়ার মতো বিষয় নয়। তা ছাড়া বিষয় যা-ই হোক, এটা তো সর্বোচ্চ গোপনীয়তার ব্যাপার। তোমার মতো কাউকে তো এখানে রাখা যাবে না। আরে না, সে রকম কিছু করার মতো নয়।

ওহ্ ডিয়ার, তার মানে এটা বিশেষ কোনো ব্যাপার।

মি. কার্ডিনাল লর্ড ডার্লিংটনের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু লর্ড ডার্লিংটন চুপচাপ খাওয়া শুরু করলেন আবার।

তাঁরা দুজন ধূমপানের রুমে ঢুকলেন পোর্ট ও চুরুটের জন্য। ডাইনিংরুম পরিষ্কার করতে করতে এবং আসন্ন অতিথিদের জন্য ড্রয়িংরুম সাজাতে সাজাতে আমাকে জরুরি দরকারেই ধূমপানের রুমের দরজার সামনে দিয়ে বারবার যাতায়াত করতে হলো। ডিনারে তাঁরা একেবারে চুপ থাকলেও এখানে তাঁরা জরুরি কথাবার্তা বিনিময় করা শুরু করেছিলেন। পঁচিশ মিনিট পরে তো তাঁদের দুজনের উত্তপ্ত কণ্ঠও শোনা গেল। তাঁদের কথা শোনার জন্য আমি ইচ্ছা করে দরজার বাইরে দাঁড়াইনি। কিন্তু তাঁদের চিৎকার দেওয়া কথা না শুনে উপায় ছিল না। লর্ড ডার্লিংটন যেমন বলছিলেন, এটা তোমার মাথা ঘামানোর মতো কোনো বিষয় নয়, বাছা, তোমার মাথা ঘামানোর মতো নয়।

তাঁরা দুজন শেষে যখন বের হয়ে আসেন আমি তখন ডাইনিংরুমে। তখন মনে হলো দুজনই শান্ত হয়ে গেছেন। তাঁদের হল পার হয়ে যাওয়ার সময় শুধু লর্ড ডার্লিংটনের কথাই শোনা গেল : মনে রেখো, বাছা, আমি কিন্তু তোমার ওপর আস্থা রাখলাম। তাঁর কথার পরিপ্রেক্ষিতে মি. কার্ডিনাল কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি আপনাকে কথা দিলাম। তারপর তাঁদের পায়ের আওয়াজ দুদিকে চলে গেল : লর্ড ডার্লিংটন তাঁর নিজের পড়ার ঘরের দিকে, আর মি. কার্ডিনাল গেলেন লাইব্রেরিতে।

সাড়ে আটটার দিকে মোটরগাড়ির শব্দ শুনলাম, একেবারে উঠান পর্যন্ত চলে এলো গাড়ি। আমি দরজা খুলে দিয়ে প্রথমে দেখলাম ড্রাইভারকে, তার কাঁধের ওপর দিয়ে দেখলাম কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল। তারা নিচতলার বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর দুজন ভদ্রলোককে আমি ভেতরের দিকে এগিয়ে নিয়ে এলাম; তাঁদের সঙ্গে লর্ড ডার্লিংটনের দেখা হলো হলরুমে। তিনি সোজা ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেলেন তাঁদের। মিনিট দশেক পরে আরেকটা গাড়ির শব্দ শুনলাম। দরজা খুলে দিতে গিয়ে দেখলাম, জার্মান রাষ্ট্রদূত হার রিবেনট্রপ, ডার্লিংটন হলে তিনি আর নতুন কেউ নন। লর্ড ডার্লিংটন তাঁকে নিতে এলেন এবং দুজনে গোপনীয় দৃষ্টি বিনিময় করে একসঙ্গে ড্রয়িংরুমে ঢুকে গেলেন। কয়েক মিনিট পরে আমাকে রিফ্রেশমেন্ট দিতে ডাকা হলো। ততক্ষণে চারজন ভদ্রলোক বিভিন্ন ধরনের সসের গুণ সম্পর্কে কথাবার্তা বলছিলেন। আলাপের পরিবেশ ওপরে ওপরে বেশ উল্লাসমুখর মনে হলো।

তারপর বাইরে আমার জায়গামতো হলরুমে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং পরের দুই ঘণ্টায় আর ওখান থেকে নড়ার অধিকার ছিল না আমার। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় আমি সাধারণত প্রবেশপথের খিলানের নিচে দাঁড়াই। দুই ঘণ্টা পর পেছনের দরজার বেল বাজল। নিচে নেমে এসে দেখি, একজন পুলিশ কনস্টেবল মিস কেন্টনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে মিস কেন্টনের পরিচয় নিশ্চিতকরণের জন্য আমার সাহায্য চায়।

শুধু নিরাপত্তার জন্য এ রকম করতে হচ্ছে, মিস, বলে সে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

আমি দরজা আটকানোর সময় দেখলাম, মিস কেন্টন আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি বললাম, আশা করি, সন্ধ্যাটা দারুণ কেটেছে, মিস কেন্টন।

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। সুতরাং কিচেনের ফ্লোরের অন্ধকার পরিসরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে আমি আবার বললাম— আশা করি, আপনার সন্ধ্যাটা সুন্দর কেটেছে, মিস কেন্টন।

ভালো কেটেছে, ধন্যবাদ, মি. স্টিভেনস।

শুনে খুশি হলাম।

আমার পেছনে আসতে আসতে মিস কেন্টনের পায়ের আওয়াজ হঠাৎ থেমে গেল বুঝতে পারলাম। মিস কেন্টন বললেন, আপনার কি একটু জানতে ইচ্ছা করে না, আজ সন্ধ্যায় আমার পরিচিতজনের সঙ্গে আর কী হয়েছে, মি. স্টিভেনস?

মিস কেন্টন, আমার রূঢ় আচরণ করতে ভালো লাগছে না। কিন্তু আমাকে ওপরের তলায় যেতে হবে এখনই। দেরি করাই যাবে না। আসল কথা হচ্ছে, এই বাড়িতে এই মুহূর্তে বৈশ্বিক তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটছে।

এ রকম ঘটনা এ বাড়িতে কখন ঘটে না, মি. স্টিভেনস? ঠিক আছে, আপনার যেহেতু দ্রুত ওপরে যেতে হবে তাহলে বলছি শুনুন, আমার পরিচিত ব্যক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করেছি।

মাফ করবেন, মিস কেন্টন। বুঝতে পারিনি।

তার বিয়ের প্রস্তাব।

ও, তাই নাকি, মিস কেন্টন? তাহলে আমার পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন।

ধন্যবাদ, মি. স্টিভেনস। অবশ্য কাজ ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ আমি দিয়ে দেব। তবে আপনি যদি আমাকে তাড়াতাড়ি মুক্তি দেন আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। আমার পরিচিত ব্যক্তি ওয়েস্ট কান্ট্রিতে দুই সপ্তাহের মধ্যেই তার নতুন চাকরিতে যোগ দেবে।

আপনার স্থলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অন্য কাউকে নেওয়ার চেষ্টা করব, মিস কেন্টন। এবার আমাকে যেতে দিন। আমাকে এখনই ওপরে ফিরে যেতে হবে।

আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম; কিন্তু যখন করিডরের দিকে যাওয়ার দরজার কাছে পৌঁছেছি, মিস কেন্টনকে বলতে শুনলাম, মি. স্টিভেনস। আবার ফিরে তাকালাম। মিস কেন্টন ওখান থেকে একটুও সরেননি। সে জন্য আমার সঙ্গে কথা বলতে তাঁর কণ্ঠ একটু চড়া করতে হয়েছে; তাতে কিচেনের অন্ধকার গুহার মতো এলাকায় তাঁর কণ্ঠ অনুরণন তুলছে।

মিস কেন্টন বললেন, আমি কি ধরে নেব, এখানে আমার এত বছর কাজ করার পর বিদায়ের সময় আপনার তরফ থেকে যে কয়টা কথা এইমাত্র বললেন তার বেশি আর কিছু বলার নেই?

মিস কেন্টন, আপনার জন্য আমার পক্ষ থেকে উষ্ণতম অভিনন্দন। কিন্তু আমি আবারও বলছি, ওপরের তলায় বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে এবং আমার দায়িত্বের ঠিক জায়গায় আমাকে যেতেই হবে।

আপনি কি জানেন, মি. স্টিভেনস, আমার এবং আমার পরিচিতজনের কাছে আপনি কত গুরুত্বপূর্ণ?

তাই নাকি, মিস কেন্টন?

হ্যাঁ, মি. স্টিভেনস। আপনার বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আমরা আনন্দে সময় কাটাই। যেমন—আমার পরিচিতজন সব সময় চান আমি যেন আপনার খাবারে মরিচের গুঁড়া মেশানোর সময় দুই নাকের ফুটোয় চিমটি কাটার অভিনয় করে দেখাই।

আসলেই!

স্টাফদের উদ্দীপ্ত করার জন্য আপনার দেওয়া বক্তৃতারও ভক্ত তিনি। আমার অভিনয় দেখে তিনি খুব হাসেন। আপনার বক্তৃতার কয়েকটা লাইন দরকার হয় আমাদের দুজনের হেসে গড়িয়ে পড়ার জন্য।

আসলেই, মিস কেন্টন? ঠিক আছে তাহলে, আমাকে এখন যেতে দিন।

আমি হলে পৌঁছে আমার জায়গায় দাঁড়ালাম। তবে পাঁচ মিনিট পার হওয়ার আগেই মি. কার্ডিনাল লাইব্রেরির দরজায় এসে দাঁড়ালেন এবং আমাকে ইশারায় ডাক দিলেন।

আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না, মি. স্টিভেনস। আরেকটু ব্র্যান্ডি দেওয়ার জন্য আপনাকে কষ্ট দিতে পারি? আগে যে বোতলটা এনেছিলেন মনে হচ্ছে সেটা শেষ হয়ে গেছে।

আপনার যে রিফ্রেশমেন্ট দরকার অবশ্যই বলবেন, স্যার। তবে আপনার কলাম যেহেতু আজ রাতেই শেষ করতে হবে, সে কথা মনে রেখে আমার মনে হয় আপনার আর খাওয়া উচিত হবে না, স্যার।

আমার কলাম ভালো করেই শেষ হবে, স্টিভেনস। আমার জন্য আরেকটু ব্র্যান্ডি নিয়ে আসুন, প্লিজ। আপনি অনেক ভালো, আমি জানি।

খুব ভালো কথা, স্যার।

একমুহূর্ত পরেই আমি লাইব্রেরিতে ফিরে এসে দেখি, বইয়ের তাকগুলোর পাশে ঘুরঘুর করছেন এবং বইয়ের পেছনের মলাট খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশের একটা লেখার টেবিলে কাগজপত্র এলোমেলো পড়ে আছে। আমি কাছে এগিয়ে গেলে মি. কার্ডিনাল খুশি হওয়ার একটা হালকা আওয়াজ করে হাতলওয়ালা একটা চামড়ার চেয়ারে বসে পড়লেন। তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে খানিক ব্র্যান্ডি ঢেলে এগিয়ে দিলাম।

তিনি বললেন—স্টিভেনস, আমরা অনেক দিন ধরে একে অন্যের খুব কাছের মানুষ, তাই না?

অবশ্যই, স্যার।

আমি যখনই এখানে আসি আমার ইচ্ছা হয়, আপনার সঙ্গে বসে একটু কথা বলি।

ঠিক আছে, স্যার।

ব্র্যান্ডি পানে আমার সঙ্গে যোগ দেবেন একটু?

আপনার মহানুভবতা, স্যার। ধন্যবাদ, স্যার। কিন্তু আমি পারছি না বলে দুঃখিত।

স্টিভেনস, শরীর মন সব ভালো তো?

আমি একটু হেসে বললাম, সব ঠিক আছে। ধন্যবাদ, স্যার।

কোনো দিক থেকে খারাপ মনে হচ্ছে না তো?

এই একটু ক্লান্ত লাগছে শুধু। তা ছাড়া আমি একদম ঠিক আছি, স্যার।

ঠিক আছে, তাহলে একটু বসুন। আচ্ছা, যা বলছিলাম। আমরা একে অন্যের খুব কাছের মানুষ। সুতরাং আপনার কাছে সত্যটা বলা দরকার। নিশ্চয় আপনি অনুমান করতে পারছেন, আমি এমনি এমনি এখানে আসিনি। এখানে এই মুহূর্তে হলরুমের ওই পাশে কী হচ্ছে, কিছুটা ইঙ্গিত পেয়েছি।

জি, স্যার।

আপনি বসুন না, স্টিভেনস। আমি চাই, আমরা দুজনে নিকটজনের মতো কথা বলি একটু। আপনি ওই ফাটা ট্রেটা ধরে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, যেন যেকোনো মুহূর্তে এখান থেকে দৌড়ে চলে যাবেন।

আমি দুঃখিত, স্যার।

আমার হাতের ট্রেটা রেখে মি. কার্ডিনালের ইঙ্গিত করা চেয়ারে ঠিকমতো বসলাম।

মি. কার্ডিনাল বললেন, এই তো, দারুণ! আচ্ছা স্টিভেনস, আমার তো মনে হয় না, প্রধানমন্ত্রী এখন ড্রয়িংরুমে আছেন, তাই না?

প্রধানমন্ত্রী, স্যার?

ও আচ্ছা, ঠিক আছে, আপনাকে বলতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি, আপনি একটা জটিল পরিস্থিতিতে আছেন। মি. কার্ডিনাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্লান্ত দৃষ্টিতে টেবিলের ওপরে ছড়ানো কাগজপত্রের দিকে তাকালেন। তারপর তিনি বললেন, লর্ড ডার্লিংটনকে আমি কেমন চোখে দেখি আপনাকে বলতে চাই না, স্টিভেনস। মানে বলতে চাইছি, আমি তাঁকে আমার দ্বিতীয় বাবা হিসেবে মানি। আমার এসব মুখে বলার ইচ্ছা নেই, স্টিভেনস।

না, স্যার।

তাঁর কথা গভীরভাবেই ভাবি।

জি, স্যার।

আমি জানি, আপনিও তাঁকে নিয়ে ভাবেন, ঠিক না, স্টিভেনস?

অবশ্যই, স্যার। আমিও তাঁকে নিয়ে ভাবি।

ভালো, তাহলে আমরা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানি। তাহলে আসুন, আমরা বাস্তবতার সামনে দাঁড়াই। লর্ড ডার্লিংটন বিপদে আছেন। আমি তাঁকে সাঁতরে ক্রমেই দূরে চলে যেতে দেখতে পাচ্ছি। আপনাকে বলতে চাইছি, আমি তাঁকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। তিনি অথই জলে আছেন, বুঝতে পারছেন, স্টিভেনস?

আসলে কি তা-ই, স্যার?

আপনি কি বুঝতে পারছেন, এই মুহূর্তে কী ঘটছে? এই মুহূর্তে আমরা যে এখানে বসে আছি ঠিক তখনই আমাদের থেকে কয়েক গজ দূরে কী ঘটছে? আপনাকে সুনির্দিষ্ট করে বলার দরকার নেই, ওই রুমে এখন আছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিব ও জার্মান রাষ্ট্রদূত। লর্ড ডার্লিংটন তাঁদের সবাইকে একত্র করার জন্য যথেষ্ট সাধ্যসাধন করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বস্ততার সঙ্গেই বিশ্বাস করেন, তিনি ভালো কিছু করছেন, সম্মানজনক কিছু করছেন। আপনি কি জানেন, লর্ড ডার্লিংটন তাঁদের সবাইকে আজ রাতে কেন এখানে এনেছেন? স্টিভেনস, এখানে আজ কী হচ্ছে?

আমার আশঙ্কা, স্যার, আমি জানি না।

আপনার আশঙ্কার কিছু নেই। বলুন, আপনি বুঝতে চাইছেন না। আপনার জানার আগ্রহ নেই। করুণাময় ঈশ্বর, এই হাউসে অত্যন্ত গুরুত্ববহ কিছু হচ্ছে। আপনার মোটেও জানতে ইচ্ছা করছে না?

আমার অবস্থান থেকে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া মানায় না, স্যার।

কিন্তু আপনি তো লর্ড ডার্লিংটনকে নিয়ে ভাবেন। আপনি তাঁর খেয়াল রাখেন খুব নিষ্ঠার সঙ্গেই। আপনি তো আমাকে সেটাই বলেছিলেন। আপনি যদি তাঁর কথা ভেবে থাকেন, আপনার কি উচিত নয় তাঁকে নিয়ে চিন্তিত হওয়া? কিংবা কমপক্ষে খানিক আগ্রহী হওয়া? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও জার্মান রাষ্ট্রদূতকে আজ রাতের এই গোপন বৈঠকে একত্র করেছেন আপনার মনিবই। আর আপনি বলছেন, আপনি জানতে আগ্রহী নন?

স্যার, আমি আগ্রহী নই বলব না। তবে আমার অবস্থান থেকে এসব বিষয়ে আগ্রহী হওয়া মানায় না।

এটা আপনার অবস্থান নয়? আহা, তাহলে আপনি বিশ্বস্ততায় বিশ্বাস করেন, তাই না? আপনি কি মনে করেন, আপনি এভাবে বিশ্বস্ত থাকতে পারছেন? কার কাছে বিশ্বস্ত থাকছেন? লর্ড ডার্লিংটনের প্রতি, নাকি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি? বুঝতে পারছেন?

আমি দুঃখিত, স্যার। আপনি কি প্রস্তাব করছেন বুঝতে পারছি না।

মি. কার্ডিনাল আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকালেন এবং বললেন, আমি কোনো প্রস্তাব দিচ্ছি না, স্টিভেনস। খোলাখুলি বলছি, আমি জানিই না কী করতে হবে। তবে আপনি তো কিছুটা আগ্রহী হতে পারতেন।

তিনি একমুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে রইলেন। মনে হলো, ওই মুহূর্তে তিনি আমার পায়ের চারপাশের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে আছেন।

শেষে তিনি বললেন, তাহলে স্টিভেনস, আপনি আমার সঙ্গে মদ্যপানে অংশ নিচ্ছেন না?

না। ধন্যবাদ, স্যার।

আপনাকে আমি বলছি, স্টিভেনস, লর্ড ডার্লিংটনকে বোকা বানানো হচ্ছে। আমি অনেক খতিয়ে দেখেছি, আমি জার্মানির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানি, এ দেশের প্রতিটি মানুষ সম্পর্কে জানি। আমি আপনাকে বলে রাখছি, লর্ড সাহেবকে বোকা বানানো হচ্ছে।

আমি তাঁর কথার কোনো জবাব দিলাম না। মি. কার্ডিনাল মেঝের দিকে তাকিয়েই রইলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার বলতে লাগলেন।

লর্ড ডার্লিংটন আমাদের প্রিয় মানুষ, খুব ভালো মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি অথই জলে পড়েছেন। তাঁকে কৌশলে ব্যবহার করা হ্চ্ছে। নািসরা তাঁকে বন্ধক রেখে ফায়দা হাসিল করছে। আপনি নিজেও দেখেছেন, স্টিভেনস। চার-পাঁচ বছর ধরে কী কী হচ্ছে, আপনি দেখেছেন না?

দুঃখিত, স্যার। এ রকম কিছু হচ্ছে, আমি খেয়াল করিনি।

আপনার কখনো সন্দেহ হয়নি? সামান্যতম সন্দেহ হয়নি, আমাদের বন্ধু হার রিবেনট্রপের মাধ্যমে হার হিটলার ডার্লিংটন সাহেবকে বন্ধক হিসেবে ব্যবহার করছেন? যেভাবে তিনি বার্লিনে তাঁর অন্যান্য বন্ধককে ব্যবহার করছেন, আমাদের লর্ড সাহেবকেও সেভাবে ব্যবহার করছেন।

দুঃখিত, স্যার, এ রকম কিছু হচ্ছে, আমি খেয়াল করিনি।

আপনি খেয়াল করেননি; কারণ আপনি আগ্রহী ছিলেন না। আপনি সব কিছু চোখের সামনে দিয়ে যেতে দেন; সামনে দিয়ে কী গেল, দেখার আগ্রহ আপনার থাকে না।

মি. কার্ডিনাল হাতলওয়ালা চেয়ারে ঠিকমতো বসলেন এবং তাতে তাঁর শরীরটা একটু খাড়া উঁচু হয়ে গেল। মনে হলো, একমুহূর্তের জন্য তিনি সামনের টেবিলের অসমাপ্ত কাগজপত্রের দিকে মনোযোগ দিলেন। তারপর বললেন, লর্ড ডার্লিংটন একজন ভদ্রলোক। সেটাই হলো এসবের মূল কারণ। তিনি একজন ভদ্রলোক এবং তিনি জার্মানদের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছেন। তাঁর স্বভাবটাই হলো, পরাজিত শত্রুকেও উদারতা ও বন্ধুত্ব দেখানো। তাঁর এসব বিষয় আপনি নিশ্চয় দেখেছেন, স্টিভেনস। আপনি দেখেননি, কী করে হয়? তাঁর ভদ্রতাকে তাঁরা ব্যবহার করছেন, নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছেন। সুন্দর একটা জিনিসকে তাঁরা অন্য রূপে পরিণত করছেন, খারাপ কিছু বানিয়ে ফেলছেন—যাতে তাঁদের নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। এ বিষয়টা দেখেননি, স্টিভেনস?

মি. কার্ডিনাল আবার মেঝের দিকে তাকালেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরব রইলেন। তারপর বলা শুরু করলেন : অনেক বছর আগে আমার এখানে আসার কথা মনে আছে। তখনো এই আমেরিকান লোকটা ছিলেন। আমরা তখনো একটা বড় কনফারেন্স আয়োজন করেছিলাম। আমার বাবা আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন। এই আমেরিকান লোকটার কথা মনে আছে। আমি আজ যতটা মাতাল হয়েছি, সেদিন এর চেয়েও বেশি মাতাল ছিলেন তিনি। সবার সামনে তিনি ডিনার টেবিলে দাঁড়িয়ে গেলেন। লর্ড ডার্লিংটনের দিকে আঙুল তুলে তাঁকে আনাড়ি বলেছিলেন তিনি, সব কিছু ভুল পাকানো আনাড়ি বলেছিলেন। উল্লেখ করেছিলেন, তিনি বিপদে আছেন। তবে বলতেই হবে, সেদিন ওই লোকটা ঠিকই বলেছিলেন। আজকের এই পচা বিশ্ব মহান ও রুচিশীল প্রবৃত্তির জন্য উপযুক্ত নয়। আপনি নিজে দেখেছেন, স্টিভেনস, তাই না? তাঁরা ভালো বিষয়কে খারাপ অবস্থায় ব্যবহার করেছেন; আপনি দেখেছেন, তাই না?

আমি দুঃখিত, স্যার। কিন্তু দেখেছি, বলতে পারব না।

আপনি বলতে পারবেন না, আপনি দেখেছেন। ঠিক আছে, আমি আপনার সম্পর্কে জানি না। কিন্তু আমি একটা কিছু করতে যাচ্ছি। বাবা বেঁচে থাকলে এসব বন্ধ করার জন্য যা করতেন তা-ই করতে যাচ্ছি আমি।

মি. কার্ডিনাল আবার নীরব হয়ে গেলেন এবং মনে হয় তাঁর প্রয়াত বাবার কথা মনে করে তিনি অত্যন্ত বিষণ্ন হয়ে গেলেন। শেষে তিনি বললেন, মি. ডার্লিংটনকে এভাবে প্রপাতের কিনারায় যেতে দেখেও আপনি সন্তুষ্ট, স্টিভেনস?

আমি দুঃখিত, স্যার। আপনি কী বোঝাতে চান, আমি বুঝতে পারছি না।

আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না, স্টিভেনস? ঠিক আছে, আমরা তো বন্ধুর মতো; তাহলে আমি আরো খুলে বলি। প্রচারের কৌশল হিসেবে হার হিটলার এ দেশে যতজনকে বন্ধক হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন লর্ড ডার্লিংটনকে। তার কারণ হলো, তিনি ভদ্রলোক, সম্মাননীয় ব্যক্তি এবং তাঁকে দিয়ে কী করানো হচ্ছে ধরতে পারেন না। শুধু গত তিন বছরে বার্লিন এবং এ দেশের প্রভাবশালী ষাটজনের বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের এই পরিকল্পনা ভালো কাজে দিয়েছে। হার রিবেনট্রপ কার্যত আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে পেরেছেন, যেন তাঁর জন্য বেকুবি র্যালি ও অলিম্পিক গেমস যথেষ্ট ছিল না। আপনার কি ধারণা আছে, বর্তমানে লর্ড ডার্লিংটনকে দিয়ে কী করাচ্ছেন? কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এখন?

আমি জানি না, স্যার।

আমাদের লর্ড এখন নিজে প্রধানমন্ত্রীকে হিটলারের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। তিনি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেন, বর্তমান জার্মান শাসন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মনে ভয়ানক ভুল ধারণা আছে।

এখানে আপত্তির কী আছে, স্যার, বুঝতে পারছি না। আমাদের লর্ড সাহেব সব সময় জাতিতে জাতিতে ভালো বোঝাপড়ার ব্যাপারে সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন।

এখানেই তো শেষ নয়, স্টিভেনস। যদি আমার ধারণা একেবারেই ভুল না হয়ে থাকে, ঠিক এই মুহূর্তে লর্ড ডার্লিংটন হিটলারের দেশে সফরে যাওয়া সম্পর্কে রাজার নিজের ধারণা আলোচনা করছেন। আমাদের রাজা যে সব সময় নািসদের ব্যাপারে কৌতূহলী সেটা আর এখন গোপন নয়। এখন তিনি আপাতত হিটলারের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে আগ্রহী। স্টিভেনস, এই মুহূর্তে লর্ড ডার্লিংটন এই ভয়ানক বিষয়ের ওপর পররাষ্ট্র দপ্তরের আপত্তি সরাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।

আমি দুঃখিত, স্যার। লর্ড ডার্লিংটন মহত্তম এবং সর্বোচ্চ গুণের মতো কাজ ছাড়া তো কিছু করছেন না। ইউরোপে সব সময় শান্তি বিরাজ করবে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আচ্ছা স্টিভেনস, আমাকে বলুন তো, আপনার মনে কি আমার যথার্থতা নিয়ে সামান্য সন্দেহ হচ্ছে না? কমপক্ষে আমি কী বলছি না বলছি সেসব নিয়ে আপনার মধ্যে একটু আগ্রহও হচ্ছে না?

আমি দুঃখিত, স্যার। কিন্তু আমাকে বলতেই হবে, লর্ড ডার্লিংটনের বিচারক্ষমতার ওপর সব রকমের আস্থা আছে।

রাইনল্যান্ডের পরে হিটলার যা-ই বলুন, তাতে সামান্য বোধশক্তি আছে এমন কোনো ব্যক্তিই তাঁর কোনো কাজ কিংবা কথা বিশ্বাস করবে না। স্টিভেনস, লর্ড ডার্লিংটনের এই গভীরতাটুকু নেই। ওহ্ ডিয়ার, আমি সত্যিই আপনাকে দুঃখ দিয়ে ফেললাম।

মোটেও না, স্যার, আমি বললাম। কারণ আমি তখন ড্রয়িংরুমের বেলের শব্দ শুনেছি এবং উঠে দাঁড়িয়েছি। বললাম, আমাকে মনে হয় যেতে হবে, স্যার। মাফ করবেন।

ড্রয়িংরুমের বাতাস তামাকের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে। বিশিষ্ট ভদ্রলোকরা একটানা চুরুট টেনে যাচ্ছেন, তাঁদের মুখে গম্ভীর ভাব লেগে আছে; কেউ কোনো কথা বলছেন না। এমন সময় লর্ড ডার্লিংটন আমাকে মদের ভাণ্ডার থেকে এক বোতল বিশেষ চমৎকার পোর্ট আনতে বললেন।

রাতের এ রকম মুহূর্তে পেছনের সিঁড়ি থেকে নেমে আসা কারো পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায় এবং সন্দেহ নেই, আমার পায়ের আওয়াজ মিস কেন্টনকে জাগিয়ে থাকতে পারে। কারণ আমি যখন করিডরের অন্ধকার পথে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তাঁর পার্লারের দরজা খুলে গেল এবং তিনি চৌকাঠে এসে দাঁড়ালেন। ভেতরের আলো এসে পড়েছে তাঁর ওপর।

আমি এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, আপনাকে এখনো এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হচ্ছি, মিস কেন্টন।

মি. স্টিভেনস, তখন আমি খুব বোকার মতো কথা বলেছি।

মিস কেন্টন, আমার এখন কথা বলার মতো সময়ই নেই।

মি. স্টিভেনস, আমি তখন যা বলেছি তার জন্য কিছু মনে করবেন না। আমি খুব বোকার মতো কাজ করেছি।

আপনি যা বলেছেন তাতে কিছু মনে করিনি, মিস কেন্টন। আসলে আপনি কী ইঙ্গিত করেছিলেন আমি ভুলেই গেছি। ওপরের তলায় মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ঘটছে। আপনার সঙ্গে এখানে হাসিঠাট্টার গল্প করার অবসর নেই। আমি বরং আপনাকে ঘুমাতে যেতে বলব।

এ কথা বলে দ্রুত হাঁটা দিলাম আবার। আমি কিচেনের দরজার কাছে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারলাম, করিডরে আবার অন্ধকার নেমে এসেছে; মানে মিস কেন্টন তাঁর পার্লারের দরজা বন্ধ করেছেন।

নির্দিষ্ট বোতলটা খুঁজে পাওয়া এবং মদ পরিবেশন করার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য খুব বেশি সময় লাগল না। মিস কেন্টনের সঙ্গে দেখা হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট পরে আবার করিডরের পথেই ফেরত যাচ্ছিলাম, এবারে হাতে একটা ট্রে। মিস কেন্টনের রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রুমের প্রান্ত থেকে ছিটেফোঁটা আলো দেখে বুঝতে পারলাম, মিস কেন্টন জেগে আছেন। এখন আমার মনে হয়, ওই মুহূর্তটাই এত দিন ধরে আমার স্মৃতির ভেতর জেগে আছে। আমি করিডরের আবছা অন্ধকারে খানিক থেমেছিলাম। হাতে ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা ধারণা আমার মনের ভেতর দ্রুত জেগে উঠেছিল : এই কয়েক গজ দূরে, ওই দরজার অন্য পাশে মিস কেন্টন তখন কাঁদছেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে, আমার ওই ধারণা প্রমাণের মতো বাস্তব কোনো প্রমাণ ছিল না। আমি কান্নার কোনো শব্দও শুনিনি। তবু প্রায় নিশ্চিত ছিলাম, দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখতে পেতাম, তাঁর দুই চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছে। কতক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। ওই সময়ে ওই মুহূর্তটাই ছিল খুব তাত্পর্যপূর্ণ। তবে আমার সন্দেহ হয়, বাস্তবে ছিল কয়েক সেকেন্ড মাত্র। কারণ আমি তখন তো দ্রুত ওপরে যাচ্ছিলাম দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আপ্যায়নের জন্য ট্রে নিয়ে; আমার দেরি করার যুক্তিসংগত কারণ ছিল না।

ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে দেখি, ভদ্রলোকেরা তখনো গম্ভীর মুখে বসে আছেন। এর বাইরে পরিস্থিতি সম্পর্কে আর কোনো ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা ছিল না। কারণ আমি ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে লর্ড ডার্লিংটন আমার হাত থেকে ট্রে নিতে বললেন, ধন্যবাদ, স্টিভেনস। এটা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। আপাতত আর কিছু লাগবে না।

হলরুম পেরিয়ে খিলানের নিচে আমার নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘণ্টাখানেক পরে তাঁরা বের হলেন। এর মধ্যে আর এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যার জন্য আমাকে ওখান থেকে সরতে হতে পারত। তার পরও ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার ওই এক ঘণ্টা সময় আমার স্মৃতিতে জেগে আছে এত বছর। আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, প্রথমে আমার মনমানসিকতা ছিল বিষণ্ন। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই আমার ভেতরে কৌতূহল, কিংবা বলা যায়, এক ধরনের বিজয়বোধ জাগতে থাকে। এখন আর আমার মনে নেই, ওই অনুভূতি নিয়ে কত দূর বিশ্লেষণ করেছিলাম; তবে এখন অতীতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, কারণ খোঁজা খুব কঠিন নয়। মোটের ওপর আমি তখন একটা কঠিন সন্ধ্যা পার করছিলাম; সারাক্ষণই আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম আমার কাজের মধ্যে যেন আমার অবস্থানের মর্যাদা বজায় থাকে। আমি বজায় রাখতে পেরেছিলাম এবং এমন সুন্দরভাবেই বজায় রেখেছিলাম, আমার বাবা দেখলেও আমাকে নিয়ে গর্ব বোধ করতেন। আর হলরুমের ওপারের দরজায় আমার দৃষ্টি স্থির হয়েছিল। দরজার পেছনের রুমে আমি দায়িত্ব পালন করছিলাম এবং ওই রুমেই তখন ইউরোপের মহাক্ষমতাধর ভদ্রলোকেরা আমাদের মহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করছিলেন। কে সন্দেহ করবে, কোনো বাটলারের পক্ষে সর্বোচ্চ কল্পনা করার মতো ওই সময় আমি ঘটনার একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছিলাম? আমার মনে হয়, তখন ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে সন্ধ্যা থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়েই ভাবছিলাম। যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে এবং যেগুলো ঘটার পথে—সবই ছিল আমার   ভাবনায়। আমার জীবনে এত দূর পর্যন্ত যা কিছু পেয়েছি, সেগুলোরই সারাংশ ছিল ওই সন্ধ্যার ঘটনাগুলো। সেই রাতে আমার মধ্যে যে বিজয়বোধ জেগেছিল, তার আরো কিছু ব্যাখ্যাও দেখতে পাই।

 

 

ষষ্ঠ দিন : সন্ধ্যা

ওয়েমাউথ

 

বহু বছর ধরে সমুদ্রপারের এই শহরে আসার কথা ভেবেছি। অনেক লোকের মুখেই এখানে আনন্দদায়ক ছুটি কাটানোর কথা শুনেছি। আর মিসেস সিমোনসও তাঁর ‘দ্য ওয়ান্ডার অব ইংল্যান্ড’ বইয়ে বলেছেন, ‘এই শহর পর্যটকদের একটানা অনেক দিন পুরোপুরি বিনোদন দিতে পারে।’ তিনি বিশেষ করে এই পিয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। এটার ওপরে আমি প্রায় আধাঘণ্টা পায়চারি করছি। তিনি বলেছেন, এখানে বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় এলে বেশি ভালো লাগে। তখন রংবেরঙের বাল্ব জ্বলে এখানে। একটু আগে এক কর্মকর্তার কাছে শুনেছি, একটু পরেই বাল্ব জ্বালানো হবে। সে জন্যই এখানে বেঞ্চের ওপর বসে বাল্ব জ্বলার অপেক্ষায় আছি। এখান থেকে সমুদ্রের ভেতর ডুবন্ত সূর্যের দারুণ একটা দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। আজকের দিনটা খুব চমৎকার ছিল; এখনো দিনের আলো অনেকটা আছে। তবু সমুদ্রের তীর বরাবর আলো জ্বলে উঠছে। এতক্ষণও পিয়ার মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত হয়ে আছে। আমার পেছনে তক্তার ওপর অসংখ্য পায়ের বিরতিহীন আওয়াজ বেজে যাচ্ছে।

এই শহরে এসেছি গতকাল বিকেলে। আরো একটা রাত এখানে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে সারা দিন আরাম-আয়েশে ঘুরে বেড়াতে পারি। আর বলা দরকার, গাড়ি চালানোর ঝামেলা থেকেও স্বস্তি পাওয়া যাবে। গাড়ি চালানোর কাজ আনন্দের হলেও কিছু সময় পর ক্লান্তি চলে আসে। যা-ই হোক, আজকের দিনটাও এখানে কাটাতে পারব। আগামীকাল সকাল সকাল রওনা হয়ে গেলেই চা পানের সময়ের মধ্যে ডার্লিংটন হলে পৌঁছে যাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে।

লিটল কম্পটনের রোজ গার্ডেন হোটেলের টি-লাউঞ্জে মিস কেন্টনের সঙ্গে দেখা হওয়ার দুই দিন পূর্ণ হতে যাচ্ছে। হোটেলেই আমাদের দেখা হয়। মিস কেন্টন হোটেলে এসে আমাকে চমকে দেন। দুপুরের খাওয়া শেষ করে আমি চুপচাপ বসে সময় কাটাচ্ছিলাম। আমার টেবিলের পাশের জানালা দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তখন হোটেলের একজন স্টাফ এসে খবর দিল, একজন ভদ্রমহিলা রিসেপশনে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। ওখান থেকে উঠে আমি লবিতে চলে যাই। সেখানে আমার চেনা কাউকে দেখতে পাই না। তখন কাউন্টার থেকে রিসেপশনিস্ট মহিলা বলেন, ভদ্রমহিলা টি-লাউঞ্জে আছেন, স্যার।

টি-লাউঞ্জ লেখা দেখে ঢুকে পড়ি। হাতলওয়ালা বেমানান চেয়ার আর দু-চারটে টেবিল রাখা আছে রুমটায়। দেখতে পাই, মিস কেন্টন ছাড়া আর কেউ নেই রুমে। আমাকে দেখে তিনি হাসিমুখে উঠে হাত বাড়িয়ে দেন আমার দিকে।

আহ্, মি. স্টিভেনস, আপনাকে আবার দেখে কী যে ভালো লাগছে!

মিসেস বেন, কী সুন্দর!

বৃষ্টির কারণে রুমের ভেতরের আলো অনেকটা আবছা হয়ে গেছে। সুতরাং আমরা দুটো হাতলওয়ালা চেয়ার সমুদ্রের দিকের জানালার কাছে নিয়ে যাই। ওখানে বসেই মিস কেন্টন এবং আমি একটানা ঘণ্টা দুয়েক কথা বলি। বাইরের চত্বরে তখন ধূসর আলোর বন্যায় বৃষ্টিও একটানা ঝরে যাচ্ছে।

স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বয়স হয়েছে, বোঝা যায়; তবে আমার চোখে তাঁর এই বয়সী চেহারাটাও খুব সাবলীল মনে হয়। শরীর এখনো পাতলা আছে; বসার ভঙ্গি আগের মতোই ঋজু। আগে তাঁর বসার সময় মাথাটা একটা বিশেষ অবাধ্য ভঙ্গিতে ধরে বসতেন; এখনো সেই অভ্যাস আছে। তাঁর মুখের ওপরে আবছা আলো পড়ার কারণে তাঁর মুখের এখানে-ওখানে ছোট ছোট রেখা দেখতে পাই। তবে এত বছর আমার স্মৃতিতে যে মিস কেন্টনকে দেখে আসছি, তার সঙ্গে সামনে বসা মিস কেন্টনের চেহারায় বিস্ময়কর রকমের মিলই আছে। তার মানে তাঁকে আবার দেখার পর খুব ভালো লাগছে।

অপরিচিত লোকেরা দেখা-সাক্ষাতে যেসব কথা আদান-প্রদান করে তেমন কথা বলে কাটিয়ে দিলাম প্রথম বিশ মিনিটের মতো সময় : বেশ বিনয়ের সঙ্গেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমার এত দূর আসা ভ্রমণের কথা, ছুটি কেমন কাটাচ্ছিলাম, কোন কোন শহর কিংবা বিশেষ জায়গা দেখলাম ইত্যাদি। আমাদের আলাপ আরো এগিয়ে যেতে থাকলে তাঁর মধ্যে কিছু সূক্ষ বিষয় লক্ষ করলাম। এত বছরের ব্যবধানে তাঁর মধ্যে এগুলো তৈরি হয়েছে। যেমন—মিস কেন্টন আগের চেয়ে ধীর হয়ে গেছেন। হতে পারে, বয়সের কারণে মানুষের ওপরে প্রশান্ত ভাব চলে আসে। বেশ কিছুক্ষণ সেটাই মেলানোর চেষ্টা করলাম তাঁর মধ্যে। কিন্তু আমার একটা অনুভূতি এড়াতে পারলাম না : তাঁর মধ্যে যা দেখছি সেটা হলো জীবনের ক্লান্তি। যে দীপ্তি তাঁকে প্রাণবন্ত করেছিল কিংবা কখনো কখনো তাঁকে একজন প্রাণোচ্ছল ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল, সেটা আর এখন নেই।

এই পর্যায়ে এসে আমি তাঁর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে দু-চারটে বিষয় তুলতে চেষ্টা করি। যেমন—আমি জানতে পারি, তাঁর চিঠি পড়ে তাঁর বিয়ের ব্যাপারটা যতটা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে বলে মনে করেছিলাম, বাস্তবে ততটা খারাপ অবস্থায় পড়েনি; তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন যে চার-পাঁচ দিনের জন্য, তখনই লিখেছিলেন চিঠিটা; তিনি আবার বাড়ি ফিরে যান এবং মি. বেন তাঁকে ফিরে পেয়ে খুশি হন। তিনি একটু হাসি দিয়ে বলেন, এসব ব্যাপারে আমরা যেকোনো একজন যথেষ্ট সুবিবেচক।

এবার বুঝতে পারি, তাঁদের এসব ব্যাপার আমার মাথা ঘামানোর বিষয় নয়; আমার নিজের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যেতে হবে, আমি যেন তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়ে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা না করি। অবশ্য যদি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত কারণে করতে হয়, সেটা আলাদা ব্যাপার। যেমন— ডার্লিংটন হলের বর্তমান স্টাফ সংকটের ব্যাপারটা এখানে আসতে পারে। অন্যদিকে মিস কেন্টন অবশ্য তাঁর সমস্যার কথা আমার কাছে বলার ব্যাপারে তেমন কিছু মনে করছেন বলে মনে হলো না। আর আমাদের তো দীর্ঘদিনের শক্ত পেশাগত সম্পর্ক ছিলই। সেই সম্পর্কেরই প্রমাণস্বরূপ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়ের কথা শুনতে ভালো লাগতে থাকে।

কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, মিস কেন্টন তাঁর স্বামী সম্পর্কে সাধারণ কথাবার্তা বলা শুরু করলেন : স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তিনি শিগগিরই অবসরে যাবেন। তাঁর মেয়ের কথা বললেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সামনের শরতে মেয়ের সন্তান হওয়ার কথা। তিনি মেয়ের ডরসেটের ঠিকানাটাও দিলেন আমাকে। বললেন, আমি ফেরার পথে তাঁর মেয়ের সঙ্গে দেখা করলে মেয়ে নাকি অনেক খুশি হবে। আমি জানালাম, যাওয়ার সময় আমি ডরসেটের ওপর দিয়েই যাব, তবে ওখানে ওঠা হবে না। তবু তিনি জোরাজুরি করতেই লাগলেন। বললেন, ক্যাথরিন আপনার সম্পর্কে সব জানে, মি. স্টিভেনস। আপনাকে দেখলে ও দারুণ খুশি হবে।

আমার দিকের কথা বলতে আমি ডার্লিংটন হলের বর্তমান অবস্থার কথা বিস্তারিত তুলে ধরলাম। মি. ফ্যারাডে কেমন প্রাণবন্ত মনিব তা-ও বললাম, হাউসে কতটা পরিবর্তন এসেছে জানালাম, কোন কোন জিনিস বদল করা হয়েছে, ধুলা থেকে বাঁচানোর জন্য কতটা এলাকা মুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানের স্টাফ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও জানালাম। আমার মনে হলো, ডার্লিংটন হল সম্পর্কে আমার কথা বলার সময় মিস কেন্টনকে খুশি দেখা গেল। তারপর আমরা পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে মাঝেমধ্যে জোরে হেসে উঠলাম।

মনে আছে, ডার্লিংটন সাহেবের কথা শুধু একবার উল্লেখ করলাম। কার্ডিনাল জুনিয়রের কথা স্মরণ করে আমরা বেশ মজা পেলাম। কিন্তু মিস কেন্টনকে না জানিয়ে আর পারলাম না, বেচারা যুদ্ধের সময় বেলজিয়ামে নিহত হন। আরো বললাম, মি. ডার্লিংটন তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। কার্ডিনালের মৃত্যুর খবরে তিনি খুব দুঃখ পান।

দুঃখজনক খবর দিয়ে আনন্দের সময়টাকে বিষণ্ন করতে চাইনি বলে আমি এ বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি যেটা আশঙ্কা করেছিলাম সেটাই হলো; তিনি অসফল কুৎসার কথা পড়েছিলেন এবং যথারীতি আমার ভেতরটা দেখে ফেলার চেষ্টাও করলেন। ফলে আমি তাঁর কথার পরিপ্রেক্ষিতে ওই সম্পর্কে কথা না বলার চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না। শেষে আমাকে বলতেই হয় : মিসেস বেন, যুদ্ধের পুরো সময় ধরেই মি. ডার্লিংটনের নামে অনেক ভয়ানক কথা বলা হয়, বিশেষ করে ওই পত্রিকার মাধ্যমে। দেশ তখন বিপদের মধ্যে ছিল বলে তিনি চুপ থেকে সব সহ্য করেন। কিন্তু যুদ্ধের পরও যখন তাঁর নামে বদনাম ছড়ানো চলতেই থাকে, তিনি বুঝতে পারেন, আর নীরব থেকে সহ্য করা যায় না। এখন সব পরিষ্কার বোঝা যায়, সে সময় কত কষ্ট করে আদালতে যেতে হয়েছে তাঁকে। সে সময়ের পরিস্থিতির কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ন্যায়বিচার তিনি পাবেন। কিন্তু পত্রিকার কাটতি আরো বাড়ানো হয় এবং লর্ড ডার্লিংটনের সুনাম চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। আসলেই, মিসেস বেন, এর পর থেকে কার্যত তিনি পঙ্গু হয়ে যান। হাউসটা পুরো নিশ্চুপ হয়ে যায়। ড্রয়িংরুমে তাঁর চা নিয়ে যেতাম...। সে সময়ে তাঁকে দেখাই ছিল একটা ট্র্যাজিক দৃশ্য।

আমি খুব দুঃখিত, মি. স্টিভেনস। অবস্থা এত খারাপ হয়েছিল আমি বুঝতে পারিনি।

ওহ্, মিসেস বেন। এসব কথা থাক না এখন। অনেক হয়েছে। আমি জানি, ডার্লিংটন হলে যখন অনেক লোকসমাগম হতো সে সময়ের কথা আপনার মনে আছে। মানে যখন ডার্লিংটন হল বিশিষ্ট অতিথিদের ভিড়ে সরগরম থাকত। লর্ড ডার্লিংটনকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করলে ওই সময়ের প্রসঙ্গ আনা উচিত।

শেষে লর্ড ডার্লিংটনের কথা উল্লেখ করলাম আমরা। আমাদের স্মৃতিচারণার সময় আমরা প্রধানত সুখস্মৃতির দিকেই তাকালাম বেশি। টি-লাউঞ্জে কাটানো আমাদের দুই ঘণ্টা খুব আনন্দের ছিল। আমাদের কথা বলার সময় আরো মেহমান এলেন, দু-চার মুহূর্ত বসলেন, আবার চলে গেলেন তাঁরা। তবে তাঁদের আসা-যাওয়া কিংবা কথাবার্তায় আমাদের আলাপের ব্যাঘাত হলো না মোটেও। একসময় সামনের তাকের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিস কেন্টন বললেন, এখন তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তখন পর্যন্ত আমরা বুঝতেই পারিনি দুই ঘণ্টা কখন কিভাবে কেটে গেছে। মিস কেন্টন জানালেন, গ্রামের বাইরে বাসস্টপে তাঁকে হেঁটে যেতে হবে। শুনে আমি তাঁকে ফোর্ড গাড়িতে করে পৌঁছে দেওয়ার কথাটা জোর দিয়েই বললাম। তারপর রিসেপশন থেকে একটা ছাতা নিয়ে আমরা বাইরে পা বাড়ালাম।

ফোর্ড যেখানে রেখে গিয়েছিলাম তার চারপাশে পানি জমে খানাখন্দ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে গাড়ির পেছনের দরজা পর্যন্ত মিস কেন্টনকে এগিয়ে দিতে আমাকে যেতেই হলো। খুব তাড়াতাড়িই আমরা গ্রামের বড় রাস্তায় উঠে পড়লাম। দোকানপাট পেছনে ফেলে আমরা পুরো খোলা মাঠ পেয়ে গেলাম। মিস কেন্টন এতক্ষণ পেছনের দিকে চলে যাওয়া দৃশ্য দেখছিলেন। এবার আমার দিকে ফিরে বললেন, মি. স্টিভেনস, কী নিয়ে এত মুচকি মুচকি হাসছেন?

ও না, তেমন কিছু না, মিসেস বেন। আপনার চিঠিতে লেখা কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবছিলাম। চিঠিতে ওই প্রসঙ্গগুলো পড়ার সময় কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। তবে এখন বুঝতে পারছি, আমার চিন্তা করার কিছু নেই।

ও, তাই? কী নিয়ে ভাবছিলেন, মি স্টিভেনস?

না, বিশেষ কিছু না, মিসেস বেন।

না না, মি. স্টিভেনস, আপনাকে বলতেই হবে।

আচ্ছা ঠিক আছে, বলে আমি একটু হাসলাম। চিঠির একটা জায়গায় আপনি লিখেছেন—একটু মনে করে নিই—হ্যাঁ, আপনি লিখেছেন, ‘আমার জীবনের বাকি দিনগুলো আমার সামনে শূন্যের মতো পড়ে আছে।’ এ রকম আরো কিছু কথা।

মিস কেন্টনও খানিক হেসে বললেন, আরে নাহ্। সত্যি, আমি ও রকম কিছু লিখতেই পারি না।

আমি নিশ্চিত বলতে পারি, আপনি লিখেছেন। আমার পরিষ্কার মনে আছে।

আহা, ডিয়ার, ঠিক আছে, মাঝেমধ্যে এ রকম মনে হয়। তবে সে অনুভূতিগুলো আবার তাড়াতাড়ি চলেও যায়। আপনাকে নিশ্চিত করেই বলছি, মি. স্টিভেনস, আমার জীবন আমার সামনে শূন্যের মতো পড়ে নেই। একটা উদাহরণ দিই, আমরা নানা-নানি হতে যাচ্ছি, আপাতত প্রথমবারের মতো।

হ্যাঁ, আপনাদের জন্য বিরাট আনন্দের খবর।

আমরা আরো কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মিস কেন্টন বললেন, আপনার কী খবর, মি. স্টিভেনস? ডার্লিংটন হলে আপনার ভবিষ্যৎ আপনার জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে?

আচ্ছা, শুনুন মিসেস বেন, যা-ই থাকুক না সামনে, আমি জানি, আমার সামনে শূন্যতা নেই। থাকলে থাকত। কিন্তু না, শুধু কাজ আর কাজ।

আমরা দুজনই হেসে ফেললাম। তারপর মিস কেন্টন সামনের দিকে দূরে একটা যাত্রীছাউনি দেখালেন। আমরা ছাউনির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বললেন—মি. স্টিভেনস, আমার সঙ্গে একটু অপেক্ষা করবেন, বাসটা আসতে একটু দেরি হবে।

আমরা যখন গাড়ি থেকে নেমে ছাউনির দিকে যাচ্ছিলাম তখনো বৃষ্টি একটানা পড়েই যাচ্ছে। ছাউনিটা পাথরের তৈরি; ছাদ টাইলসের। ছাউনিটার চেহারা বেশ পাকাপোক্ত। এ রকম একটা নির্জন জায়গায় থাকার জন্য গাট্টাগোট্টা চেহারাই দরকার। চারপাশে ফাঁকা; পেছনে শূন্য মাঠ। ভেতরের দেয়ালের সবখান থেকে রংচং খুলে পড়ে যাচ্ছে। তবে জায়গাটা যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন। মিস কেন্টন বেঞ্চে বসলেন। আমি দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলাম বাস আসছে কি না। রাস্তার বিপরীত পাশে দেখলাম অনেক খামারি মাঠ। মাঠের ওপর দিয়ে টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলো আমার দৃষ্টিকে নিয়ে গেল বহুদূর পর্যন্ত।

কিছুক্ষণ আমরা দুজনই চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম— মিসেস বেন, অনেক দিন হয়তো আর আমাদের দেখা হবে না। আপনি যদি আপনার কিছুটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করতে দিতেন। বেশ কিছুদিন হলো আমাকে অস্থির করে রেখেছে একটা বিষয়।

অবশ্যই, মি. স্টিভেনস। আমরা তো পুরনো বন্ধু।

ঠিকই বলেছেন, মিসেস বেন। আমি শুধু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি...। যদি মনে করেন, উত্তর দেওয়ার মতো নয়, উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। কথা হচ্ছে, এত বছর ধরে আপনার কাছ থেকে যে চিঠিগুলো পেয়েছি, বিশেষ করে আপনার শেষ চিঠিটাসহ, সেগুলো থেকে আমার কেন যেন মনে হয়েছে, আপনি কিছুটা অসুখী। আপনি কোনো দুর্ব্যবহারের শিকার কি না? মাফ করবেন। এ রকম একটা বিষয় আমাকে অস্থির আর চিন্তিত করে রেখেছে অনেক দিন। এত দূর এলাম, আপনার সঙ্গে দেখা হলো, আর যদি বিষয়টা সম্পর্কে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে ফিরে যাই তাহলে নিজেকে বেকুব মনে হবে।

মি. স্টিভেনস, আপনার এত বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। মোটের ওপর আমরা তো পুরনো বন্ধু, তাই না? আপনি আমার জন্য এত ভাবেন, জেনে খুব আপ্লুত আমি। আর এ বিষয়ে আমি আপনাকে পুরোপুরি স্বস্তি দিতে পারি : আমার স্বামী আমার সঙ্গে কোনোভাবেই দুর্ব্যবহার করেন না। তিনি মোটেও নিষ্ঠুর কিংবা বদমেজাজি মানুষ নন।

আমাকে বলতেই হবে, মিসেস বেন, শুনে আমার মন থেকে একটা পাথর নেমে গেল।

আমি বৃষ্টির মধ্যেই সামনের দিকে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করলাম বাস আসছে কি না।

আমার মনে হচ্ছে, আপনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন, মি. স্টিভেনস। মিস কেন্টন বললেন, আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না?

না, মিসেস বেন। বিষয়টা সে রকম নয়। এত দিন মনে হতো, আপনি বোধ হয় সুখী নন। মাফ করবেন, আমি বলতে চাইছি, আপনি আপনার স্বামীকে বেশ কয়েকবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আপনার স্বামী যদি আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করে থাকেন তাহলে রহস্যের ব্যাপার হচ্ছে, আপনি কেন বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। এখানে আপনার অসুখী হওয়ার কারণ থাকতে পারে।

আমি বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি; আমার পেছন থেকে মিস কেন্টন বলেন—মি. স্টিভেনস, আমি কী করে ব্যাখ্যা দিই? আমি নিজেও খুব ভালো জানি না, কেন এমন করি। কিন্তু তিনবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়া হয়েছে এযাবৎ।

তিনি খানিক থামেন। ততক্ষণে আমি রাস্তার ওপারে মাঠের ভেতর তাকিয়ে থাকি। তারপর তিনি বললেন—মি. স্টিভেনস, আমার মনে হয়, আপনি জানতে চাইছেন, আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসি কি না।

সত্যিই, মিসেস বেন, আমি ধরেই নিয়েছিলাম...।

আমার মনে হচ্ছে, আপনার এই প্রশ্নের উত্তরটা এখন দেওয়া দরকার, যেহেতু আপনি বলেছেন আমাদের হয়তো অনেক দিন আর দেখা হবে না। হ্যাঁ, আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসি। প্রথম দিকে ভালোবাসতে পারিনি। এ রকম একটানা অনেক দিন তাঁকে ভালোবাসতে পারিনি। আমি ডার্লিংটন হল ছেড়ে আসার সময় কিছুতেই বুঝতে পারতাম না আমি আসলে ওখান থেকে চলে এসেছি। আমার বিশ্বাস, মি. স্টিভেনস, আপনাকে বিরক্ত করার একটা চাতুরী ছিল এটা। ডার্লিংটন হল ছেড়ে এসে বিয়ে করাটা ছিল আমার জন্য একটা বিরাট আঘাত। অনেক দিন ধরে আমি খুব অসুখী ছিলাম।  তারপর বছরের পর বছর কেটে গেল; যুদ্ধ এলো। ক্যাথরিন বড় হলো এবং আমি একসময় বুঝতে পারলাম, আমার স্বামীকে ভালোবাসছি। কারো সঙ্গে অনেক দিন থাকলে তাকে মেনে নেওয়া হয়ে যায়। তিনি একজন সদয় ব্যক্তি, সহজে বদলে যান না। স্টিভেনস, আমি তাঁকে ভালোবাসতে শিখেছি।

মিস কেন্টন খানিক থামলেন। তারপর আবার বলা শুরু করলেন, কিন্তু তার মানে এই নয়, মাঝেমধ্যে কোনো নির্জন মুহূর্ত আসে না। অবশ্যই আসে; তখন নিজের সঙ্গে কথা বলা চলে, ‘জীবন নিয়ে আমি কী ভুল করেছি!’ তখনই আলাদা একটা জীবনের কথা মনে হয়, আরেকটা অধিকতর ভালো জীবন পাওয়া যেত—এমন মনে হয়। উদাহরণ হলো, আপনার সঙ্গে একটা জীবন কাটানোর কথা আমার ভাবনাজুড়ে থাকে। আপনি-আমি মিলে সে জীবনটা গড়তে পারতাম। তখনই আমি অস্থির হয়ে যাই, সামান্য ব্যাপারে রেগে যাই, বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু প্রতিবারই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরপরই বুঝতে পারি, আমার আসল জায়গা আমার স্বামীর কাছে। মোটের ওপর ঘড়ির কাঁটা আর পেছনের দিকে ফেরানোর উপায় নেই। যা ঘটতে পারত কিন্তু ঘটেনি, তা নিয়ে পড়ে থাকা যায় না। বুঝতে হবে, অন্যরা যা পেয়েছে আমি তার চেয়ে কম পাইনি, বরং বেশি পেয়েছি জীবনে। সুতরাং কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

আমার মনে হয় না আমি তাঁর কথার প্রত্যুত্তরে সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পেরেছি। কারণ মিস কেন্টনের কথাগুলো বুঝতেই আমার দু-এক মুহূর্ত সময় চলে গেল। তা ছাড়া আপনারা বুঝে থাকবেন, তাঁর কথার ইঙ্গিত আমার ভেতর কিছু মাত্রায় দুঃখবোধ জাগিয়ে দেয়। আর আমি স্বীকার করব না-ই বা কেন, ওই মুহূর্তে আমার হূদয় ভেঙে যাচ্ছিল। সামলে নিয়ে তাড়াতাড়িই তাঁর দিকে ফিরে একটু হাসি দিয়ে বলি, আপনি খুব ঠিক কথা বলেছেন, মিসেস বেন। ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরানোর সময় আর নেই। স্বস্তি পেতাম না যদি আমি মনে করতাম এ রকম ধারণাই আপনার এবং আপনার স্বামীর অসুখী হওয়ার কারণ।

আপনার কথা অবশ্যই ঠিক, মি. স্টিভেনস।

আহ্, মিসেস বেন। বাস মনে হয় এসে গেল।

আমি ছাউনির বাইরে পা রেখেই বাস থামানোর ইশারা করলাম। তখন মিস কেন্টন উঠে ছাউনির প্রান্তে এলেন। বাস এসে একেবারে থেমে যাওয়ার পর মিস কেন্টনের মুখের দিকে তাকালাম; দেখলাম, তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে। একটু হেসে আমি বললাম, মিসেস বেন, এখন আপনি নিজের যত্ন নেবেন। অনেকেই বলেন, বিবাহিত মানুষের জন্য অবসরজীবনই সবচেয়ে ভালো সময়। সামনের বছরগুলো আপনার নিজের এবং আপনার স্বামীর জন্য সুখময় করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন। আমাদের আর দেখা না-ও হতে পারে, মিসেস বেন। সে জন্য আমি যা যা বললাম, মনে রেখে সেভাবে চলবেন আশা করি।

অবশ্যই সেভাবে চলব, মি. স্টিভেনস। লিফট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনি কত খেয়াল রাখেন! আপনার সঙ্গে আবার দেখা করতে পেরে খুব ভালো লাগল।

লোকটা তাঁর কথা আক্ষরিক অর্থে বোঝাননি। তবে তাঁর কথাগুলোর এত তাড়াতাড়ি আক্ষরিক স্তরের প্রয়োগ দেখেও মজা লাগছে। আমার মনে হয়, লোকটা আমার পাশে বেশ কয়েক মিনিট আগেই এসে বসেছিলেন। আমি তাঁকে খেয়াল করিনি। দুই দিন আগে মিস কেন্টনের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার স্মৃতির মধ্যে আমি ডুবে ছিলাম। আমি আসলে তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে কিছু টেরই পাইনি। টের পেলাম শুধু যখন তিনি জোরে বলে উঠেলেন, সমুদ্রের বাতাস অনেক উপকারী।

চোখ তুলে দেখি, আমার পাশে একজন শক্তপোক্ত শরীরের মানুষ বসে আছেন। বয়স সম্ভবত ষাটের কোঠার শেষের দিকে। একটা ঢিলা টুইড জ্যাকেট পরেছেন; শার্টের ঘাড়ের কাছে খোলা। তিনি সমুদ্রের পানির দিকে তাকিয়ে আছেন। সম্ভবত দূরের কোনো গাঙচিলের দিকে। সে জন্য পরিষ্কার বোঝা গেল না, কথাগুলো তিনি আমাকে উদ্দেশ করে বলেছেন কি না। যেহেতু আর কেউ তাঁর কথার উত্তর দিল না এবং আশপাশে আর কাউকে দেখা গেল না, আমিই তাঁর কথায় সাড়া দিলাম—হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়।

ডাক্তার এ রকমই বলেন, সমুদ্রের বাতাস উপকারী। এই জন্য আবহাওয়া যত দিন ভালো থাকবে আমি এখানে আসব।

লোকটা তাঁর নানা রকমের কষ্টের কথা আমাকে বলেন। শুধু মাঝেমধ্যে সূর্যাস্তের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আমার দিকে তাকান একটু মাথা ঝাঁকানোর জন্য কিংবা বোকাটে হাসি দেওয়ার জন্য। লোকটা জানান, তিন বছর আগে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এদিকের কোনো একটা হাউসে বাটলার ছিলেন। এই তথ্যটুকু পাওয়ার পরেই শুধু তাঁর দিকে কিছুটা নজর দিই। জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারি, তাঁর হাউসটা মোটামুটি ছোট ছিল এবং সেখানে শুধু তিনিই স্থায়ী নিয়োগ পেয়েছিলেন।

এ পর্যায়ে আমার মনে হলো, লোকটাকে আমার পরিচয় জানানো উচিত। ডার্লিংটন হল নামটা তাঁর কাছে কেমন লাগল জানি না। তবে তাঁকে বেশ মুগ্ধ মনে হলো।

তিনি একটু হেসে বললেন, ও আচ্ছা। আর এখানে আমি আপনাকে এত সব ব্যাখ্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি নিজেকে একটা পুরো বেকুব বানানোর আগেই আপনি আমাকে বলে ভালো করেছেন। আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলার সময় বোঝার উপায় নেই, কার সঙ্গে কথা বলছি। সুতরাং যুদ্ধের আগে আপনার অধীনে কর্মচারী বেশি ছিল।

তিনি বেশ আমুদে লোক। সত্যিকারের আগ্রহী মানুষ। সুতরাং আগের দিনের ডার্লিংটন হল সম্পর্কে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাঁকে সব কিছু ভেঙে বললাম। প্রধানত আমি চেষ্টা করলাম বড় বড় অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় বলার যেমন আমরা মাঝেমধ্যেই আয়োজন করে থাকতাম। আসলে আমি তাঁকে স্টাফদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দায়দায়িত্ব আদায় করে নেওয়ার গোপনীয়তাও খুলে বললাম। বাটলারদের জাদুকরদের মতো ভেলকিবাজির ক্ষমতার কথাও বললাম, যে ক্ষমতা দিয়ে তারা ঠিক সময়ে এবং ঠিক জায়গায় বড় কোনো কাজ করে ফেলতে পারত। অতিথিরা তাদের কৌশল সম্পর্কে কিছু আঁচ করতে পর্যন্ত পারতেন না। যেমন বলছিলাম, আমার পাশের লোকটি বেশ আগ্রহী; তবে কিছুক্ষণ পর মনে হলো, আমি তো তাঁর কাছে অনেক কথা খুলে বলে ফেলেছি। আর না। সুতরাং শেষ কথা হিসেবে বললাম, অবশ্য আমার বর্তমান মনিবের অধীনে অনেক কিছুই আলাদা। তিনি আমেরিকান ভদ্রলোক।

আমেরিকান, তাই নাকি? অবশ্য তাঁরাই এখন এ রকম হাউস চালাতে পারেন। তার মানে আপনি ওই হাউসেই থেকে গেলেন, প্যাকেজের অংশ হিসেবে। এরপর তিনি আমার দিকে ফিরে আকর্ণ হাসি দিলেন।

আমিও খানিক হেসে বললাম, হ্যাঁ, আপনি যেমন বলছেন, প্যাকেজের অংশ হিসেবে।

লোকটা আবার সমুদ্রের দিকে ফিরে তাকালেন, গভীর শ্বাস নিলেন এবং তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমরা ওখানে আরো কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইলাম।

এরপর বললাম, আসলে আমার সবচেয়ে ভালো সেবা দিয়েছি লর্ড ডার্লিংটনকে। আমার যা দেওয়ার ছিল তার সবচেয়ে ভালোটুকু। আর এখন দেখতে পাচ্ছি, আমার আর তেমন কিছু দেওয়ার মতো অবশিষ্ট নেই।

লোকটা কিছু বললেন না, শুধু মাথা ঝাঁকালেন। সুতরাং আবার বললাম, আমার নতুন মনিব মি. ফ্যারাডে আসার পর আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আগের মতো সেবা দিতে। আমি চেষ্টা করেই গেলাম। কিন্তু দেখলাম, আমি যা-ই করি না কেন আমার আগের মানে পৌঁছাতে পারি না। আমার কাজে ক্রমাগত ভুলই বের হচ্ছে। খুব তুচ্ছ পর্যায়ের ভুল। তবু ভুল তো। আর এ রকম ভুল জীবনে কখনোই করিনি। সেগুলোর তাত্পর্য কী, তা-ও জানি। ওপরওয়ালা জানেন, আমি চেষ্টা করেই গেছি, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আমার সাধ্যে যা ছিল দিয়েছি। সব দিয়েছি লর্ড ডার্লিংটনকে।

ও ভাই, আপনার এখন একটা রুমাল দরকার। আমার রুমালটা কোথায় যেন আছে। এই যে নিন। বেশ পরিষ্কারই আছে। আজ সকালে শুধু একবার নাক মুছেছিলাম। নিন না।

না না ভাই, ধন্যবাদ। ঠিক আছে, লাগবে না। দুঃখিত।

আপনি ওই লর্ড সাহেব, কী যেন নাম, উনার খুব ভক্ত ছিলেন। তিন বছর হলো তিনি মারা গেছেন, তা-ই তো বললেন? আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, আপনি উনার খুব ভক্ত ছিলেন, ভাই।

লর্ড ডার্লিংটন খারাপ মানুষ ছিলেন না। মোটেও খারাপ ছিলেন না। জীবনের শেষে কমপক্ষে তিনি বলতে পেরেছেন, তিনি ভুল করেছেন। তিনি সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি জীবনের একটা বিশেষ পথ ধরেছিলেন। দেখা গেছে, সেটা ভুল পথ ছিল। কিন্তু তিনি যে সে পথ অনুসরণ করে ভুল করেছেন সেটা বলতে পেরেছিলেন। আমার কথা বলি, আমি তো সেটাও বলতে পারি না। আপনি বুঝতে পারছেন, আমি বিশ্বাস করেছিলাম। আমি উনার প্রজ্ঞায় বিশ্বাস করেছিলাম। যত বছর আমি উনার অধীনে কাজ করেছি, আমি বিশ্বাস করেছি, আমি মূল্যবান কিছুই করছি। এখনো বলতে পারি না, আমি নিজে আমার ভুলগুলো করেছি। আসলেই নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার, এ রকম করে কি মর্যাদা পাওয়া যায়?

এবার আমার কথা শোনেন, ভাই। আপনি যা যা বলেছেন সব যে শুনেছি তা নয়। তবু আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, বলব, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল, বুঝতে পারছেন? সব সময় অতীতের দিকে তাকাবেন না; আপনার মন খারাপ হবেই। আর আপনি আগের মতো কাজ করতে পারেন না। এটা তো আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য, তাই না? সবাই আমরা একটা জায়গায় পৌঁছতে চাই। আমার দিকে দেখুন। অবসরের দিন থেকে পাখির মতো স্বাধীন হয়ে গেছি। ঠিক আছে, আমরা কেউই আর যৌবনের প্রথম উচ্ছ্বাস ফিরে পেতে পারি না। কিন্তু আপনাকে তো সামনের দিকে তাকাতে হবে।

আমার মনে আছে, তিনি বললেন, আপনার নিজেকে নিয়ে আনন্দে থাকতে হবে। সন্ধ্যা হলো দিনের সবচেয়ে ভালো সময়। আপনি আপনার দিনের কাজ শেষ করেছেন। এখন আপনার আনন্দ করার সময়। বসে থাকার কিছু নেই, আনন্দ করার জন্য সামনে এগিয়ে যান। এসব বিষয় এভাবেই দেখি। সবাইকে জিজ্ঞেস করুন। তারা বলবে, সন্ধ্যা হলো দিনের সবচেয়ে ভালো সময়।

আমি বললাম, আপনার কথা ঠিক। আমি দুঃখিত। আমার ভাবনা অশোভন। আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমি অতি মাত্রায় ক্লান্ত। আমি অনেক ছুটে বেড়িয়েছি, বুঝতে পারছেন।

মিনিট বিশেক আগে লোকটা চলে গেছেন। তবু আমি এখানে বসে আছি। এই মুহূর্তে যে ঘটনাটা ঘটে গেল সেটার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। ঘটনাটা হলো পিয়ারের আলোগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া। যেমন বলছিলাম, আনন্দ অন্বেষণকারীরা এখানে জড়ো হয়ে যে সুখের অনুভূতি নিয়ে এই ছোট ঘটনাকে স্বাগত জানাল, সেটা আমার একটু আগের সঙ্গীর মন্তব্যের সঙ্গে আস্থা প্রকাশ করছে : সন্ধ্যা হলো দিনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়। তাঁর এই উপদেশের মধ্যে মূল্যবান কিছু আছে : আমার এত বেশি অতীতের দিকে তাকানো উচিত নয়, সব কিছু ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত এবং আমার সামনে দিনের যেটুকু আছে সেটুকুরই সদ্ব্যবহার করা উচিত। মোটের ওপর, আমরা নিজেদের যেমন জীবন চেয়ে থাকি তেমন যদি না হয় তাহলে পেছনের দিকে তাকিয়ে আমরা কী এমন পেতে পারি? 

কয়েক মিনিট আগে, আলো জ্বলে ওঠার পরপরই আমার পেছনে বসা হাসি আনন্দ আর গল্প করতে থাকা মানুষকে ভালো করে দেখার জন্য আমার বেঞ্চের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। পিয়ারের সবখানে সব বয়সের মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে : বাচ্চাসহ পরিবার, অল্পবয়সী মানুষ, বয়স্ক মানুষ—হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। আমার পেছনে ছয়-সাতজনের একটা জটলা। তাদের দেখে আমার মনের ভেতর কৌতূহল জাগে : প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা এক দল বন্ধু একসঙ্গে ঘুরতে এসেছে। কিন্তু তাদের কথাবার্তা বিনিময় করা দেখে বুঝতে পারি, এখানে পিয়ারের কাছে বেড়াতে এসে তারা আমার পেছনের এই জায়গাটায় একে অন্যের কাছাকাছি এসেছে। স্পষ্টতই তারা একসঙ্গেই আলো জ্বলে ওঠার আগমুহূর্তে চুপ করে গিয়েছিল। তারপর আলো জ্বলার পর একজন আরেকজনের সঙ্গে কথাবার্তায় জড়িয়ে যায়। আমি এখন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছি; তারা কী সুন্দর করে হাসছে! 

পরে আমার এ রকমও মনে হয়েছে, ঠাট্টা অযৌক্তিক কোনো দায়িত্ব নয় যেটা কোনো নিয়োগকর্তা তাঁর পেশাদারের কথা থেকে আশা করেন। আমি এরই মধ্যে ঠাট্টা করার দক্ষতা অর্জনের জন্য অনেকটা সময় ব্যয় করা শুরু করেছি। তবে এমন হতে পারে, আমি অতীতে এ কাজটার প্রতি দায়বদ্ধতা তেমন দেখাইনি। সম্ভবত তাহলে আগামীকাল যখন আমি ডার্লিংটন হলে পৌঁছব, তখন থেকেই নতুন উদ্যমে ঠাট্টা অনুশীলন করা শুরু করব। মি. ফ্যারাডে আরো এক সপ্তাহ ফিরবেন না। তাহলে আশা করতে পারি, আমার মনিবের ফেরার সময় আসতে আসতে আমি তাঁকে আনন্দের সঙ্গে বিস্মিত করতে পারার মতো অবস্থানে পৌঁছে যাব।


মন্তব্য