kalerkantho


বিশেষ রচনা

সবার জন্য কোরবানি

মিলেমিশে কোরবানি দেওয়া ও মাংস বিতরণের নানা চিত্র দেখা যায় আমাদের দেশে। যশোরের ভাতুড়িয়ার দাড়িপাড়া আর দিনাজপুর চিরিরবন্দরের পুরাতন ভুষিরবন্দর গ্রামের এ রকম দুই গল্প জানালেন ফখরে আলম ও সালাহ উদ্দিন আহমেদ

২৭ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



সবার জন্য কোরবানি

দাড়িপাড়া গ্রাম

যশোর

গ্রামের মসজিদের মাঠে সবাই মিলে গরু-ছাগল জবাই করে কোরবানি দেওয়া হয়। এরপর কোরবানির মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ গ্রামের সব মানুষের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।

বাড়ি গিয়ে কোরবানির মাংস আর ‘হক দানা’ খেয়ে গাদি খেলা, হাডুডু খেলায় অংশ নেয় গ্রামের মানুষ। কিন্তু তার আগে চোখে সুরমা দিয়ে সবাই নতুন কিংবা ‘কাচা কাপড়’ পরে ঈদের নামাজে অংশ নেয়। যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া গ্রামে এই নিয়ম যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। গ্রামের ১২২ বছরের অতি প্রাচীন ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া জামে মসজিদকে ঘিরেই গ্রামজুড়ে সবাই মিলেমিশে প্রতিবছর এই কোরবানি দিচ্ছে। কি গরিব, কি বড়লোক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কোরবানির মাংসের স্বাদ পাচ্ছে।

যশোর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর দাড়িপাড়া গ্রাম। এখন এই গ্রামে ২৮৮টি পরিবারের ৯৬০ জন মানুষ বসবাস করছে। গ্রামবাসীর বেশির ভাগের পেশা কৃষিকাজ। এ ছাড়া চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী ছাড়াও অন্য পেশার কিছু লোক রয়েছে।

গ্রামের আয়তন দুই বর্গকিলোমিটার। প্রাচীন এই গ্রামের একমাত্র মসজিদটি ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত।

গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি মিনহাজ বিশ্বাস। তাঁর বয়স ৮৭ বছর। তিনি বলেন, ‘আমার দাদার দাদা আকেজ উদ্দিন ছিলেন চাঁচড়ার রাজা জ্ঞানদা কণ্ঠ, মানদা কণ্ঠ ও হেমদা কণ্ঠর পেয়াদা। তিনি ঘোড়ায় চেপে রাজাদের পেয়াদাগিরি করতেন। আকেজ উদ্দিনই দাড়িপাড়া গ্রামের আদি বাসিন্দা। ১৮৯৫ সালে আমাদের গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার বসবাস করত। গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মুক্তেশ্বরী নদীতে পানির চেয়ে মাছই বেশি ছিল। নদীতে কোনো সেতু ছিল না। সে জন্য যশোর শহরের সঙ্গে যাতায়াত খুবই কঠিন ছিল। গ্রামজুড়ে ছিল বন। গ্রামে নামাজ পড়ার কোনো জায়গা ছিল না। আকেজ উদ্দিন চাঁচড়ার রাজাদের অনুমতি নিয়ে দানশীল বুধোই মোড়লের জমিতে নামাজ পড়ার জন্য একটি মাটির মসজিদ নির্মাণ করেন। দশ গ্রামের মধ্যে এটিই প্রথম নির্মিত মসজিদ। দূর-দূরান্ত থেকে এই মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে আসত। ’

৮৫ বছর বয়সী আব্দুল লতিফ বলেন, ‘তখন কোরবানি দেওয়ার অবস্থাসম্পন্ন লোক ছিল না। দু-একটি গরু-খাসি কোরবানি দেওয়া হতো। যশোরে এস কে বিশ্বাস নামের একটি কাপড়ের দোকান ছিল। আমরা সেই দোকান থেকে লং ক্লথ, ক্যারোলিনের কাপড় কিনতাম। চাঁচড়া এলাকার একমাত্র দর্জি আরশাদ আলী ঈদের জন্য আমাদের হাওয়াই শার্ট তৈরি করে দিতেন। তখন বিলাতি সাবান উঠলেও আমাদের কেনার সৌভাগ্য হয়নি। মাটি দিয়ে কাপড় কেচে, কিংবা কলার শুকনা পাতা পুড়িয়ে ক্ষার তৈরি করে পোশাক পরিষ্কার করতাম। ’ গ্রামের আরেকজন প্রবীণ গয়েজউদ্দিন বলেন, ‘ঈদের মাঠেই গুড় দিয়ে ক্ষীর রান্না হতো। আমরা চোখে সুরমা দিয়ে নামাজ শেষে ক্ষীর খেয়ে হাডুডু, বুুড়িচু কিংবা গাদি খেলায় মেতে উঠতাম। পরে বাড়ি গিয়ে হক দানা খেতাম। এই হক দানা এখনো সগৌরবে টিকে আছে। আমাদের গ্রামের সব বাড়িতেই ঈদের দিন হক দানা রান্না হয়। ’

গ্রামবাসী জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের মাঠে কোরবানি দেওয়া হয়। গ্রামের কোরবানির মাংস বণ্টনের জন্য ১০ সদস্যের একটি বণ্টন কমিটি রয়েছে। এই কমিটির নেতা শাহেদুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা কোরবানির আগের দিন গ্রামে কে কে কোরবানি দিচ্ছে তার একটি তালিকা করি। এর চার-পাঁচ দিন আগে আমরা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস বণ্টনের তালিকা প্রস্তুত করি। কোরবানির দিন জবাই করা পশুর সব মাংস একসঙ্গে ওজন করে তিন ভাগ করা হয়। এরপর এক ভাগ মাংসের কিছু অংশ উপস্থিত গরিব মানুষদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। যাঁরা কোরবানি দেননি, বিশেষ কারণে মাঠে আসতে পারেননি, যাঁরা সচ্ছল অথচ কোরবানি দিতে পারেননি, সংকোচে মাংস নেওয়ার জন্য উপস্থিত হননি, আমরা ক্যালকুলেটরে মাংসের হিসাব করে তালিকা অনুযায়ী তাঁদের বাড়ি মাংস পৌঁছে দিই। ’

দাড়িপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি সেলিম রেজা পান্নু। তিনি বলেন, ‘গত বছর গ্রামে ১২টি গরু ও ২২টি খাসি কোরবানি দেওয়া হয়েছিল। বণ্টন তালিকা অনুযায়ী গ্রামের সবার ভাগে দুই কেজি করে মাংস বরাদ্দ হয়। তাতে আমরা লক্ষ করেছি, গ্রামের গরিব, বড়লোক—সব শ্রেণির মানুষ কোরবানির মাংস খেতে পারে। আর আমাদের এই মাংস বণ্টনের কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হয়, সৌহার্দ্য বাড়ে। ’

গ্রামবাসী জানায়, বণ্টন কমিটি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোরবানির পশুর চামড়া ছিলে মাংস কেটে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। গ্রামবাসী সবাই একই পরিমাণ মাংস ভাগে পায়। এ জন্য কারো কোনো দুঃখবোধ থাকে না। ঈদের নামাজে সবাই সুরমা আর আতর ব্যবহার করে ঈদকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। আর বিশেষ খাবার হক দানা ঈদের উৎসবকে পুরো দাড়িপাড়া গ্রামে ছড়িয়ে দেয়।

গ্রামের গৃহবধূ রাহেলা খাতুন, আছিয়া খাতুনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক ধরনের নরম খিচুড়ি হচ্ছে হক দানা। আতপ চাল, ঠিকরি কলাই এর মূল উপাদান। খাবারটি আরো মুখরোচক করার জন্য চুই ঝাল দেওয়া হয়। দেওয়া হয় খুব ছোট ছোট করে কাটা কোরবানির মাংস। এ ছাড়া তেল, লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ, গরম মসলা, জিরা, হলুদ, আদা, রসুন হক দানা রান্নায় ব্যবহার করা হয়। শেষে হক দানার ওপর জিরা গুঁড়া ছড়িয়ে একে আরো মজাদার    করা হয়।

দিনাজপুর

এখন শহুরে পরিবেশের ছাপ স্পষ্ট দিনাজপুরের গ্রামগুলোতে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও বংশপরম্পরায় দুই শ বছর ধরে পালিত হচ্ছে ধর্মীয় চেতনায় সামাজিক রীতি-রেওয়াজ। জানালেন হামিদুল হক সরকার। সরকার বংশের চতুর্থ প্রজন্ম তিনি। বাস করেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার পুরাতন ভুষিরবন্দরে। পেশায় কৃষিজীবী। হামিদুল হক সরকার জানালেন দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের চিরিরবন্দরের ভুষিরবন্দর বাজারের গোড়ার কথা। রাজাদের শাসনামলে ভূষিরবন্দর বাজার বিখ্যাত ছিল কুশরের (আখের) গুড় আর রসুন বিক্রির কারণে। জীবিকার তাগিদে পণ্য বেচাকেনায় ভুষিরবন্দরের খ্যাতি ছিল। বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা বসতিতে ধনী-গরিব মিলিয়ে বাস করত হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার। দুই শ বছর আগে তৈরি করা মসজিদটি বর্তমানে দোতলা ভবন। আর এই মসজিদকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়রা গড়ে তুলেছেন দশ নামের সামাজিক ব্যবস্থাপনা কমিটি। বিয়ে এবং ধর্মীয় সব উৎসবে আয়োজনে অংশ নিতেন এই দশের সদস্যরা। দুই শ বছর আগে মসজিদভিত্তিক কোরবানির মাংস বিলি-বণ্টনের প্রথা চালু করেছিলেন মোকামি শাহ নামের এক ব্যক্তি। তাঁর বংশধর হামিদুল হক সরকার। তাঁর কাছে জানা গেল ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কোরবানির মাংস ভাগ-বাটোয়ারার ধারাবাহিকতার ইতিহাস। কোরবানির তিন ভাগ মাংসের মধ্যে এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে, এক ভাগ নিজের জন্য রেখে এবং গরিব-মিসকিনদের হক এক ভাগ মাংস সবাই পৌঁছে দিতেন মসজিদে। সেই মাংস একত্র করে গরিব-মিসকিনদের ঘরে পৌঁছে দিতেন মসজিদ কমিটির লোকেরা। পূর্বসূরিদের দেখিয়ে দেওয়া নিয়মে বংশপরম্পরায় এই প্রথা অনুসৃত হচ্ছে ভুষিরবন্দরে। একই নিয়মে প্রায় দুই শ বছর ধরে কোরবানির মাংস বিতরণ করা হয়েছে বীরগঞ্জের ৬ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামেও। সূচনা করেছিলেন জমিদার মোহাজদি সরকার। উত্তরাধিকারী জিল্লুর রহমান জানালেন, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও অনুসৃত হচ্ছে গরিব-মিসকিনদের মাঝে এক ভাগ কোরবানির মাংস বিতরণের রীতি-রেওয়াজ। গ্রামে চার শ পরিবারের মধ্যে একশটি মধ্যম আয়ের। নিম্ন আয় বা দারিদ্র্যসীমায় বাস করে প্রায় তিন শ পরিবার। প্রতিবছর কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে সরকারপাড়া খেজুরতলা জামে মসজিদে পৌঁছে দেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির মাধ্যমে এই মাংস পৌঁছে দেওয়া হয় দরিদ্র-মিসকিনদের ঘরে। বংশগতভাবে চলে আসা এই নিয়ম অনুসরণ করছেন তাঁরা।


মন্তব্য