kalerkantho


পুষ্টিকথা

জেনে খান মাংস

শামছুন্নাহার নাহিদ মহুয়া
প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পুষ্টি বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা

২৭ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



কোরবানির ঈদে প্রায় সবারই মাংস খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ওবেসিটি ও হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে মাংস খাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটা বাড়ে।

তাই গরু বা খাসির মাংস খেলে তাদের অবশ্যই নিয়ম মেনে লিন মিট বা চর্বিবিহীন অংশটাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

 

সঠিক উপায়ে মাংস রান্না

রান্নার আগে মাংস থেকে দৃশ্যমান চর্বি কেটে বাদ দিতে হবে। বড় বড় টুকরা না করে মাংস স্লাইস (পাতলা টুকরা) করে কেটে ফুটন্ত গরম পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে রাঁধতে হবে। মাংস রান্নায় ঘি বা ডালডা ব্যবহার বাদ যাবে। ভাজা (ডিপ ফ্রাই) মাংস পরিহার করতে হবে। অল্প পরিমাণে সয়াবিন বা জলপাই তেলে মাংস রান্না করা ভালো। গ্যাসের চুলায় অল্প আঁচে সময় নিয়ে মাংস রান্না করতে হবে। উচ্চতাপে মাংসের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়। তেমনি সঠিকভাবে সিদ্ধ না হলে মাংস শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

মাংস রান্নার সঠিক পদ্ধতি হলো অল্প তেল-পানিসহ এবং অবশ্যই ঢাকনা দিয়ে ঢেকে মাংস রান্না করা। মাংস হাত দিয়ে ছেঁড়া যায় এমন হলে বুঝতে হবে সঠিকভাবে রান্না হয়েছে। প্রেসার কুকারে রান্না করলে মাংসের পুষ্টিমান পুরোটাই অটুট থাকে। লাল মাংস রোস্টিং অ্যান্ড লিকিং পদ্ধতিতে রান্না করা স্বাস্থ্যকর। এই পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের রোস্টিং প্যানে মাংস রান্না করা হয়, যাতে রান্নার সময় মাংসের ক্ষতিকর তেল-চর্বি আলাদা হয়ে যায়। এতে রান্নার তাপমাত্রা ৩০০ থেকে ৪৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে রেখে আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাংস রান্না করা যায়। ওভেনে বেক করে মাংস রান্নাও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এতে মাংসের উপকারী উপাদান ভিটামিন ‘বি’ খুব অল্প পরিমাণে নষ্ট হয়। অন্যদিকে চুলায় উচ্চতাপে রান্না করলে ৪০ শতাংশ বেশি ভিটামিন ‘বি’ নষ্ট হয়ে যায়। গ্রিল করা মাংস বেশ জনপ্রিয় হলেও এতে বেশ উচ্চতাপে রান্না হয় বলে মাংসের বেশ কিছু উপকারী উপাদান নষ্ট হয়ে ক্ষতিকর জটিল যৌগ উৎপন্ন করে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

মাংসের ক্যালরিমূল্য

প্রতি ১০০ গ্রাম মাংস থেকে রকমভেদে ৪৯৮ থেকে ৫১৪ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। তাই শক্তির জন্য মাংস খাওয়া যায় সপ্তাহে এক বা দুই দিন। যাঁদের ওজন কম তাঁরা ওজন বাড়াতে, যদি কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকে, নিয়মিত মাংস খেতে পারেন।

 

বিভিন্ন অঙ্গ থেকে প্রাপ্ত পুষ্টি উপাদান

গরু অথবা খাসির বিভিন্ন অঙ্গের আছে নানা রকমের পুষ্টিগুণ। লিভার,  কিডনি ও মগজ নানা রকমের ভিটামিন ও খনিজ লবণে বেশ সমৃদ্ধ।

♦    সব রকমের অর্গান মিটে ভিটামিন ‘বি-১২’ আছে প্রচুর পরিমাণে। প্রতি ১০০ গ্রাম অর্গান মিট প্রতিদিনকার ভিটামিন ‘বি-১২’-র চাহিদার শতভাগ পূরণ করতে সক্ষম।

♦     লিভার আমিষ, আয়রন, ফলিক এসিড, জিংক, রিবোফ্লাভিন, নায়াসিন ও ভিটামিন ‘এ’র উত্তম উৎস।

♦     কিডনি আমিষ, আয়রন, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন ও ফলিক এসিডের ভালো উৎস।

♦     সব অর্গান মিটে প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরল আছে; বিশেষত মগজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

কোন বয়সে কতটুকু মাংস

বয়স, কাজের ধরন এবং শারীরিক অসুস্থতা ও অবস্থা অনুযায়ী পুরুষ বা নারী পুষ্টি চাহিদার তারতম্য থাকে। শারীরিক বৃদ্ধির জন্য শিশুদের পুষ্টির চাহিদা বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের (১৯ থেকে ৬০ বছর) মধ্যে গর্ভাবস্থায় এবং প্রসূতি মায়েদের এবং অধিক শারীরিক পরিশ্রমকারীদের জন্য বেশি পুষ্টির দরকার হয়। প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ বয়সে এই চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। সাধারণভাবে বাড়ন্ত শিশুদের দৈনিক মোট প্রোটিনের চাহিদা তার প্রতি কেজি ওজনের জন্য দুই থেকে আড়াই গ্রাম। অর্থাৎ শিশুর ওজন ১৫ কেজি হলে দৈনিক প্রোটিনের দরকার হয় ৩০ থেকে ৩৭ গ্রাম। খাওয়ার তেল, দুধ, মাখন বা মাংস—যেকোনো কিছু থেকে এই প্রোটিনের জোগান হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের এই প্রোটিনের চাহিদা তার প্রতি কেজি ওজনের জন্য দেড় থেকে দুই গ্রাম এবং প্রৌঢ়দের জন্য এক থেকে দেড় গ্রাম। বিভিন্ন উৎসব, বিশেষ করে কোরবানির সময় বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই ওজন মেপে মাংস খাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বেশি খাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মাংসের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার, যেমন—সালাদ, সবজি, ফল রাখতে হবে প্রতি বেলার খাদ্যতালিকায়। মাংসের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এবং অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। কোমল পানীয়র পরিবর্তে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর পানীয়, যেমন—তাজা ফলের জুস, জিরাপানি, টক দইয়ের লাচ্ছি, রায়তা বা বোরহানি পান  করতে হবে।

ফিচার


মন্তব্য