kalerkantho


বৈশাখ এবং স্মরণীয় দুঃখগাথা

আফরীন সুমু

১০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বৈশাখ এবং স্মরণীয় দুঃখগাথা

বাঙালির জীবনে বৈশাখ আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও আমাদের রাব্বি ভাইয়ের কপালে আজ পর্যন্ত ঝোড়ো হাওয়া ছাড়া তেমন কিছু জোটেনি। তবু প্রতি বৈশাখে তিনি আশায় বুক বাঁধেন। আমরা চার বছর ধরে একসঙ্গে মেসে আছি। প্রতি বৈশাখের পহেলা দিনটি আমাদের কাটে যেমনতেমন। কিন্তু রাব্বি ভাই একটি করে স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকেন।

এই গেল বছরের কথা। পহেলা বৈশাখের কয়েক দিন আগে থেকেই আমরা ভাবছিলাম, কে কী করব। আজাদ জানাল, ছুটির দিনটির এক মুহূর্তও সে অপচয় করতে চায় না। যথাযথভাবে ঘুমিয়ে কাটাবে পুরো দিন। মেসে সেই একমাত্র সফল চাকরিজীবী ও ব্যর্থ প্রেমিক। রাজিবের সারা দিনের প্ল্যান বাইরে কাটাবে। আমি দারুণ কিছু বই জোগাড় করেছি। এবার কিছু ভালো খাবার জড়ো করার চেষ্টা করছি, অবশ্যই লুকিয়ে। বই পড়ব আর খাব। নো ক্লাস, নো টিউশনি। আর রাব্বি ভাই, মেসের প্রফেশনাল বেকার, ওনার কী এক উদ্ভট শখ হলো। উনি ওই দিন কয়েকজন দরিদ্রকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়াবেন। তাঁর মতে, দরিদ্রদেরও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের অধিকার আছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। প্রথমেই আজাদকে নেয়া হলো। মাসের মাঝখানে হাতে টাকা নেই, এই মাসে অনেক খরচ গেছে, সামনে অনেক খরচ আছে ইত্যাদি বলে আজাদ জানাল, সে কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারবে না। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও রাব্বি ভাই কিভাবে কিভাবে আজাদকে ম্যানেজ করে ফেললেন। ধার পেয়ে আশ্বস্ত রাব্বি ভাই ছুটলেন নেমন্তন্ন করতে। পাঁচজন সৌভাগ্যবান পহেলা বৈশাখের দাওয়াত পেল।

পহেলা বৈশাখের আগের দিন। আটঘাট বেঁধে আয়োজন চলছে। প্রথমে রাব্বি ভাই গেলেন বাজারে। দেখার মতো চেহারা করে বাজার থেকে ফিরলেন। সঙ্গে বাচ্চা সাইজের একটা ইলিশ। তার চোখ-মুখ টকটকে লাল, কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটছে, মাথা রুটি ছেঁকার তাওয়ার মতো গরম। পানিটানি খেয়ে ধাতস্থ হওয়ার পর জানতে চাইলাম, ঘটনা কী? এত ছোট একটা ইলিশ মাছই বা উনি কী মনে করে আনলেন? এতগুলো মানুষ। উনি জানালেন, মাছের বাজারে ডাকাত পড়েছে। ডাকাতের দল ইলিশ মাছ নিয়ে বসে আছে। উনি পকেটের সব টাকা খরচ করে, বহু কষ্টে, অনেক অনুনয়-বিনয় করে এই একটি মাত্র মাছ আনতে পেরেছেন।

যা-ই হোক, বাকি সব আমরা কোনোমতে ম্যানেজ করলাম। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল সকাল অতিথিরা হাজির। একজন বলল—‘কই, কোনো সুবাস পাইতাছি না দেহি? কী খাওয়াইবেন? বচ্ছরের পয়লা দিন ভালো-মন্দ কিছু খাইলে সারা বচ্ছর কপাল ভালো থাকব। দেন দেহি কী আছে? তেহারি, না কাচ্চি?’

আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। রাব্বি ভাই ওনাদের কী বলে দাওয়াত দিয়েছেন কে জানে। খাবারের মেন্যুর সঙ্গে ওনাদের কথাবার্তার কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবু আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজি এবং বোনাস আইটেম হিসেবে আলুভর্তা পরিবেশন করলাম। সঙ্গে ফ্রেশ কাঁচা মরিচ। পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে পয়সা খরচ করে মাটির সানকিও কেনা হয়েছে। তারপর ফলাফল যা হলো, তার সম্পূর্ণ বর্ণনা না দেওয়াই ভালো। রাব্বি ভাইয়ের সঙ্গে আমাদেরও মান-ইজ্জতের বারোটা বেজে গেল। অথিতিরা চেঁচিয়ে পাড়ার লোক জড়ো করে ফেলল। রাব্বি ভাই তাদের ডেকে এনে অপমান করেছেন, সে কথা সবাইকে শোনানো হলো। উত্সুক জনতাকে কুইজ জিজ্ঞেস করা হলো, গরিব বলে কি তাদের মান-সম্মান নেই? বাড়িওয়ালা পর্যন্ত এসে জানিয়ে গেলেন, তাঁর বাড়িতে গরিবের এমন অপমান তিনি মেনে নিতে পারেন না। আমার বই পড়া, আজাদের ঘুম এবং রাব্বি ভাইয়ের মহৎ উদ্যোগ—সব ভেস্তে গেল। এই অপমান থেকে রেহাই পেতে ঘরে তালা দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম যে যার মতো। সারা দিন রোদে রোদে ঘুরে রাতে চুপিসারে বাসায় ঢুকলাম। পরবর্তী এক মাস আমাদের এলাকায় মুখ লুকিয়ে চলাফেরা করতে হলো। সে কারণে এবারও রাব্বি ভাইকে নিয়ে আতঙ্কে আছি। কী করবেন বলা যায় না।


মন্তব্য