kalerkantho


বিদ্যাবতীর একদিন

সত্যজিৎ বিশ্বাস

১৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



বিদ্যাবতীর একদিন

বিদ্যাবতী আমার ছয় বছরের কন্যা। অনেক শখ করে নাম রেখেছি বিদ্যাবতী। তবে বিদ্যা অর্জন ছাড়া বাকি সব কিছুতেই মেয়ের আমার অসাধারণ প্রতিভা। নামের সঙ্গে কোনোভাবেই সে সুবিচার করতে পারছে না দেখে নিজেই বিদ্যাবতীকে নিয়ে কিছু বিদ্যা তার মাথায় প্রবেশ করানোর উদ্দেশ্যে বসলাম।      

পড়ার আবহ তৈরি করতে কঠিন পরিবেশ সৃষ্টি করেছি চারপাশে। রুমের দরজা লাগানোর আগে সবাইকে বলে দিয়েছি—কেউ যেন দরজা ধাক্কা না দেয়। তার পড়ালেখায় ফাঁকি দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল জানা থাকায় ব্যবস্থাও নিয়েছি সেই রকম।

পড়া থেকে ওঠার ব্যাপারে তার অজুহাতের শেষ নেই। প্রারম্ভিক অজুহাত—পড়তে পড়তে তার গলা শুকিয়ে আসে। এই ঘন ঘন গলা শুকানো রোধে পরিপূর্ণ জগ আর গ্লাস নিয়ে রেখেছি টেবিলের পাশে। গলা শুকানো মাত্রই গ্লাস এগিয়ে দেব। তার পরের অজুহাত মশা। মশার যন্ত্রণায় নাকি তার অর্ধেক পড়া ভুল হয়ে যায়। রুম আটকানোর আগে অ্যারোসল স্প্রে করে মশার চৌদ্দগোষ্ঠীর ওপর কারফিউ জারি করেছি। মশা তো মশা, ঘরে ঢুকে গন্ধে আমারই মাথা চক্কর দিচ্ছে। 

তার পরের অভিযোগ হলো—লিখতে লিখতে নাকি পেনসিল ভোঁতা হয়ে যায়, সেই পেনসিল কাটতে গিয়ে পড়ার মুড যায় চলে। আর মুড চলে গেলে কি পড়ায় মন আসে? আজ গুনে গুনে চারটি পেনসিল আর একটি কাটার নিয়ে বসেছি। এত অস্ত্র নিয়ে খোদ আমেরিকাও মহড়া দেয় না।   

এবার বিদ্যাবতীকে ডাকলাম—কী রে, পড়তে আয়। পাশের রুম থেকে উত্তর দেয়—দুই মিনিটের মধ্যেই আসছি, বাবা। দুই মিনিট কেন জিজ্ঞাস করতেই বলে—বাসায় কত কাজ, সে খেয়াল কি তোমার আছে? আমি না করলে এ বাসায় কি কেউ কিছু গুছিয়ে রাখে? সংসারে কত কাজ তুমি কী করে বুঝবে? তুমি তো শুধু অফিস যাও আর বাসায় এসে টিভিতে খেলা না হলে খবর দেখেই ঘুমাও। (খুব সম্ভব তার মায়ের কাছ থেকে মোক্ষম অস্ত্রগুলো কপি করেছে) বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে আবার সিংহনাদ করি—আয় বলছি।    

রুমে ঢুকে পড়ার আয়োজন দেখে বিদ্যা খুবই চিন্তিত ও ব্যথিত মনে জিজ্ঞেস করল—কোন বই বের করব?

‘যা খুশি বের করো’ বলতেই খুশিতে লাফাতে লাফাতে অঙ্ক বই নিয়ে এলো। বুঝলাম, অঙ্কের অবস্থান অন্য বইগুলোর তুলনায় ভালো। সূক্ষ্ম হাসি দিয়ে বললাম—ইংরেজি বইটা আন তো। তার কৌশল ধরে ফেলতে পেরেছি বলে এমনভাবে আমার দিক তাকাল, পারলে চোখের দৃষ্টিতে ভস্ম করে দেয়।    

কিছুক্ষণ পড়ার টেবিলে কী যেন খোঁজাখুঁজি করল। তারপর বিজয়ের হাসি হেসে বলল—বাবাই, বই তো মনে হয় স্কুলে। ক্লাস মিস রেখে দিয়েছে বইয়ের মধ্যেই পড়া দেবে বলে।  

‘এটা আবার কী সিস্টেম’-বলেই চরম সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালাম। তা দেখে বিদ্যা কোমরে হাত রেখে বলল, বিশ্বাস করলে না তো? আমার ক্লাস মিসকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করো।

বুঝলাম, এভাবে হবে না। দেখি তো তোর পড়ার টেবিলে কী বই আছে? আন তো তবে ছড়ার বইটা। বিদ্যা দেখি চোখ দুটি গোল গোল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবাই, একটুও নড়ো না তো। শক্ত হয়ে বসলাম। কী ব্যাপার? বিদ্যা এগিয়ে এসে বলে—বাবাই, তোমার গাল কাটল কী করে? সেভ করার সময় খেয়াল করোনি? মলম দিয়ে দিই?    

হাসতে হাসতে বললাম—মলম বাদ দিয়ে ছড়ার বইটা দে। সহজটা দিয়ে শুরু করি।

বিদ্যা রাগে গজগজ করতে করতে বলল—কে বলছে তোমাকে ছড়া সহজ?

না শোনার ভান করে বললাম—কী রে, বই বের করছিস না কেন?  

বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বই পাওয়া গেল না। —বাবাই, এটাও তো খুঁজে পাচ্ছি না।

নাহ, এ মেয়ে তো দেখি জ্বালিয়ে খাবে। এবার নিজে উঠে খোঁজা শুরু করলাম। কিসের কী? বই নেই, নেই, নেই-ই।  

অনেক চিন্তাভাবনা আর অভিনয় শেষে হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল—বাবাই, আমাদের ক্লাসের ফারিয়া আছে না, খুব দুষ্টু। ক্লাসের সবার বই, পেনসিল, রাবার যা পায় তার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। মনে হয়, সে-ই নিয়েছে ছড়ার বইটা। কাল ওর কাছ থেকে নিয়ে আসব।

শুনে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। মাথা ঠাণ্ডা করে বললাম, কোনো অসুবিধা নেই, বাংলা বইটা আনো। সেটি আছে তো?  অনেক কাঁচুমাচুর পর বাংলা বই বের হলো।  

বইয়ের পাতায় আঙুল রেখে শুরু হলো পড়া। কত কসরত করে যে একেকটি শব্দ উচ্চারণ করছে, দেখে মনে হচ্ছে  বিদেশি ভাষায় লেখা কিছু পড়ছে। কোনো যুক্তাক্ষর পেলে তো কথাই নেই, ওটা বাদ দিয়েই পড়া এগোচ্ছে। রাগে গা জ্বলতে থাকলেও অনেক কষ্টে মাথা ঠাণ্ডা করে কিছু যুক্তাক্ষর বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

বলো তো দেখি—অন্ধকার। স্বরে অ, তারপর দন্তন্য-এর নিচে ধ, তারপর ক আকার ও বয়ে শূন্য র=অন্ধকার। বারদুয়েক প্র্যাকটিস করিয়ে বইয়ের মধ্যে তার আঙুল চেপে ধরিয়ে দিয়ে বললাম—নে এবার, ১০ বার বানান করে করে বল—অন্ধকার। সে আঙুল ঠেসে ধরে পড়েই যাচ্ছে—অন্ধকার, অন্ধকার, অন্ধকার ...।

হঠাৎ কেন জানি একটু সন্দেহ হলো। অক্ষরগুলো ঠিক চিনতে পারছে তো? আচ্ছা বলো তো অন্ধকারের ‘ধ’ কই? বইটা চোখের সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে ‘ধ’ খোঁজা শুরু করল বিদ্যা।  অনেক খুঁজেও না পেয়ে ফিক করে হেসে বলল—তাইতো বাবাই, ‘ধ’ কই? আমার মুখের কঠিন অবস্থা দেখে আরো কিছুক্ষণ গভীর পর্যবেক্ষণ করে মত দিল—অন্ধকারের মধ্যে কোনো ‘ধ’ নেই।      

চোখ বন্ধ করে দুই সেকেন্ড চুপ থেকে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বললাম—তাহলে ‘ন’ কই? চটপট উত্তর দিল—‘ন’ মনে হয় অন্ধকারের মধ্যেই আছে। এতগুলো অক্ষর একসঙ্গে ঠাসাঠাসি করে আছে তো—বোঝা যায় না। এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলাম গালে। আজ তোর খাওয়া, ঘুম সব বন্ধ। ১০০ বার আঙুল দিয়ে প্রতিটি অক্ষর ধরে ধরে উচ্চারণ করে পড়— অন্ধকার।  

বিদ্যা এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়ই ছিল। খুব ভালো করেই সে জানে, একমাত্র কান্নাকাটিই তাকে এই পড়াশোনার আক্রমণ থেকে মুক্ত করতে পারে।

চোখের জলের স্রোত বড় মারাত্মক। বন্যার জল তবু বাঁধ দিয়ে ঠেকানো যায়, চোখের জল ঠেকানো কার সাধ্য? কোনো বাঁধেই বাধা মানে না। সেই বাঁধ ভাঙা চোখের জল টপ টপ করে পড়া শুরু হলো। তার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার কাঁপা সুরে দমকে দমকে লেখাপড়া। এ যেন ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বন্যা।  

কোনো দিকে না তাকিয়ে পাশে রাখা একটা গল্পের বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম। কী করব, তাকালেই যে কান্নার আওয়াজ বেড়ে যায়। হঠাৎ খেয়াল হলো, কী ব্যাপার, পড়ার আওয়াজ নেই কেন? বিদ্যার দিকে তাকিয়ে দেখি, একমনে বইয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। আমি তাকাতেই সুর করে কাঁদতে কাঁদতে বলে—বাবাই, নেই। আমি আরো অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। কী নেই?

বিদ্যাবতী তার বইটা তুলে ধরে দেখাল। যেখানে ‘অন্ধকার’ কথাটা লেখা ছিল, তার চারপাশের অনেকটা জায়গাজুড়ে গোল হয়ে খাদের সৃষ্টি হয়েছে। গোল বলয় সৃষ্টির রহস্যটা হলো—তার চোখ থেকে গড়ানো তপ্ত ফোঁটা যখন বইয়ের ওপর পড়েছে, তার সঙ্গে আঙুল দিয়ে ডলে ডলে সেই পৃষ্ঠা তো বটেই, আরো কয়েক পৃষ্ঠার ছাল-চামড়াও উঠিয়ে ফেলেছে। সেটি দেখিয়ে বিদ্যা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল—বাবাই, অক্ষরগুলো নেই।

অবাক হয়ে পৃষ্ঠাটা মেলে ধরলাম দুজনের চোখের মাঝখানে। বইয়ের ফুটোর মাঝখান দিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বললাম—তবে আর কি? আজকের মতো পড়া এখানেই শেষ।


মন্তব্য