kalerkantho


খেলিছ এ বিশ্বলয়ে

সত্যজিৎ বিশ্বাস রানা

১২ জুন, ২০১৮ ০০:০০




খেলিছ এ  বিশ্বলয়ে

প্রতিবার বিশ্বকাপ এলেই মনটা আনচান করে ওঠে আনন্দে। ১০ দোকান ঘুরে মুলামুলি করে জার্সি কেনে নিজাম। তারপর সেই জার্সির ভেতরে নিজেকে ঢুকিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়। কেউ টিটকারি করবে, সেই সাহস আছে? বুঝতে হবে, সে কোনো গণটিমের সাপোর্টার নয়। ইতালির সাপোর্টার। স্মার্ট, ফ্যাশনেবল, স্টাইলিশ, কিউটের ডিব্বা মার্কা চেহারার প্লেয়ারদের নিয়ে গড়া টিমের নাম ইতালি। ইতালি মানে ইন্টারন্যাশনাল তালি। কিন্তু এবার যে কী হলো! একেবারে ইসের ওপর তালি। বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই রাউন্ড থেকেই বাদ!   

দুর্মুখেরা অনেক কথাই বলবে। তবে আসল কথা বলে দিয়েছেন ইতালিয়ান এক মনীষী। বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগেই মনীষী জোড়া (সান্ত্বনা) বাণীতে বলেছেন, বিশ্রাম কাজেরই অংশ—অর্থাৎ বিশ্রামের দরকার আছে। আর লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু—অর্থাৎ চার-চারবার বিশ্বকাপ পাওয়ার পর আর লোভ করা ঠিক নয়। যারা কখনো বিশ্বকাপ পায়নি, তাদের কি স্বাদ-আহ্লাদ বলে কিছু নেই?     

এবার নিজাম তাই ভাড়াটে সাপোর্টার। ভাড়াটে সাপোর্টার হওয়ার মধ্যে দোষের কিছু দেখে না সে। মেসি, নেইমার, রোনালদো...বিশ্বখ্যাত সব খেলোয়াড় যদি ভাড়ায় বিভিন্ন দলে খেলতে পারে, তবে দর্শক হয়ে সে কেন পারবে না?   

চারতলার পাগলা ব্রাজিল ফ্যান হিমু ভাই বারান্দায় ব্রাজিলের পতাকা টানিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে দেখছিল কার বাসার বারান্দায় কোন দেশের পতাকা ওড়ে। নিজামকে দেখে ডাক দেয়, ‘কী রে, কোন টিম? তোদের বারান্দায় কোনো দেশের ফ্ল্যাগ তো দেখি না।’

নিজাম ভালো করে চারপাশে তাকিয়ে কনফার্ম হয় কেউ আছে কি না। তারপর মুখ ফুলিয়ে বলে, ‘ভাই, আপনার সঙ্গে কোনো কথা নাই। আপনে তো জানেনই না, আমি কোন টিমের সাপোর্টার।’

ঘোর সমর্থক হিমু ভাই সঙ্গে সঙ্গে নিজামের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় রমিজের টং দোকানে। কিছু মনে করিস না, না জেনে তোকে হার্ট করলাম। আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত রে।

অনেক কষ্টে হাত ছাড়িয়ে নেয় নিজাম, ‘না ভাই, থাক। যে জানেই না, আমি ব্রাজিলের কী টাইপের ফ্যান, তার সঙ্গে কী বলব?’ হিমুভাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলে—‘কী টাইপের ফ্যান, ছোট ভাই?’

‘আমি টেবিল ফ্যান নয়, এগজস্ট ফ্যান না, সিলিং ফ্যানও না। এফডিসির প্যাডাস্টাল ফ্যান চেনেন? আমি সেই ফ্যান।’

নিজামের বর্ণনায় হিমুভাই যেন দিব্যচোখে সেই ফ্যানের সুশীতল বাতাস খেতে লাগল। চোখ বুজে সেই প্যাডাস্টাল ফ্যানের বাতাস খাওয়া শেষ হতেই কথা দিল, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ব্রাজিলের জার্সি আর ব্রেসলেট পেয়ে যাবে নিজাম। তবে শর্ত একটাই, ব্রাজিলের সব মিটিং, সেমিনারে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে।

খুশিতে নিজাম গর্জে উঠল, ‘চিল্লান মারব এখানে, কাপ পড়বে ব্রাজিলে।’

হিমু ভাই নিজামকে বুকে টেনে নিয়ে রমিজকে ঝাড়ি দেয়, ‘কী রে ব্যাটা! হাঁ করে কী দেখিস, এখনো দুই কাপ চা দিলি না?’

লাজুক নিজাম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে, ‘ভাই, আপনি যদি বিস্কুট না নেন, তাহলে কিন্তু আমিও নেব না।’  

চা-বিস্কুট শেষ করে হিমু ভাইকে বিদায় দিয়ে সামনে এগোতেই মোড়ে দেখা দুর্ধর্ষ আর্জেন্টিনার সমর্থক রিমন ভাইয়ের সঙ্গে। আর্জেন্টিনার জার্সি পরা রিমন ভাই ভ্রু কুঁচকায়, ‘কী রে, কোন টিম?’

চারপাশে নজর বুলিয়ে নিজাম উত্তর দেয়—‘কোন টিম জানি না, ভীষণ গরম পড়েছে—সেভেন আপ খাওয়াবেন কি না বলেন, না হলে চললাম।’

রিমন ভাই লাফ দিয়ে সামনে এসে বলে, ‘তুই দেখি আর্জেন্টিনার সেইরাম ফ্যান।’

নিজাম ঠোঁট উল্টায়, ‘আমি আর্জেন্টিনার ফ্যান হতে যাব কেন?’

—তবে?

—তবে কী?

—তুই আর্জেন্টিনার ফ্যান না?  

—এটা তো সবাই হয়, আমি আর্জেন্টিনার দুইটনি এসি।   

রিমন ভাই তাড়াতাড়ি পাশের দোকান থেকে সেভেন আপের বোতল হাতে উঠিয়ে দিয়ে বলে, ‘এমন ফ্যান—থুক্কু, এসিই তো চাই। শোন, তোর আর্জেন্টিনার জার্সি আর মাথার ব্যান্ড কিন্তু আমি গিফট করব। তুই কিন্তু না করতে পারবি না। আর আর্জেন্টিনার খেলার দিন কিন্তু একসঙ্গে বসেই খেলা দেখব।’ নিজাম সেভেন আপের বোতল ঢকঢক করে গেলা শেষ করে ঢেকুর দিতে দিতে বলে, ‘আপনার কথা অমান্য করব—আমি কি সেই ছেলে?’

রিমন ভাই পিঠ চাপড়ে দেয়, ‘এই তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো কথা।’

নিজাম লাজুক হাসি দিয়ে বলে—‘এখন তবে আসি, রিমন ভাই?’

‘খেলিছ এ বিশ্বলয়ে বিরাট শিশু...’—আনমনে গান গাইতে গাইতে বাসার পথে রওনা দেয় নিজাম।


মন্তব্য