kalerkantho


সেলামির বিড়ম্বনা

ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল

১২ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রহমান সাহেব কৃপণ লোক। পাছে সেলামি দিতে হয় এই ভয়ে তিনি ঈদের দিন কোথাও বের হন না। বউকে শিখিয়ে দিয়েছেন, সেলামি প্রার্থী কেউ এলে বলে দিতে, তিনি বাড়ি নেই।

রহমান সাহেবের কথামতো ঈদের সকাল থেকে কাজ করে যাচ্ছেন তার বউ শিউলি। ভাতিজা, ভাগে²-ভাগি² যে-ই আসুক না কেন, শিউলি নির্দ্বিধায় বলে দেন, ‘রহমান সাহেব বাসায় নেই। সে-ই যে সকালে বের হয়েছেন, এখনো ফেরার নাম নেই।’

সকাল ১১টা ৩০। কলিংবেল বেজে ওঠে। যথারীতি শিউলি বেগম দরজা খুলে দেখেন, তাঁর ছোট দুই ভাই ফারুক ও ফয়সাল এসেছে। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। দরজা খুলতেই ফারুক বলে, ‘দুলাভাই কই? বাবা মিষ্টি কিনে তোমাদের জন্য পাঠালেন। আর বলেছেন, তোমাকে আর দুলাভাইকে সালাম করতে। তা দুলাভাইকে দেখছি না যে?’

শিউলি কনফিউজড হয়ে যায়। সে এখন কী করবে? নিজের ভাই মিষ্টি নিয়ে এসেছে। তাকে তো আর মিথ্যা বলা যায় না। অগত্যা ফারুক আর ফয়সালকে তিনি ঘরে নিয়ে আসেন।

তারা রহমান সাহেবকে দেখেই পায়ে ধরে সালাম করে। ফয়সাল বলে, ‘দুলাভাই, চটপট আমাদের সেলামি বের করুন। আরো অনেক বাসায় যেতে হবে। তাড়া আছে।’

ফয়সালের কথা শুনে রহমান সাহেবের গলা শুকিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আরে বোকা, এ বয়সে টাকা দিয়ে কী করবা? তোমাদের মতো বয়সে টাকা কী জিনিস চিনতামই না। তোমরা বরং দোয়া নিয়ে যাও। এ বয়সে বড়দের দোয়া অনেক কাজে দেয়।’

ফারুক বিরক্ত হয়ে বলে, ‘বাজে কথা বলা বাদ দিন তো দুলাভাই। ২৬০ টাকার মিষ্টি কিনে নিয়ে এসেছি। সেলামি ছাড়া আমরা এখান থেকে যাব না।’

রহমান সাহেব বলেন, ‘ওহ! এ কথা। বুঝতে পেরেছি তোমরা কী চাচ্ছ।’

তিনি শিউলিকে ডেকে ফারুক ও ফয়সালকে একটা মিষ্টি দিতে বলেন। ভাগ করে খাক।

এ কথা শুনে ফারুক ও ফয়সাল অবাক হয়ে রহমান সাহেবের দিকে তাকালে রহমান সাহেব বলেন, ‘আরে, মিষ্টি যত কম খাওয়া যায়, ততই ভালো। এসব বেশি খেলে ডায়াবেটিস হবে। তখন কত খরচ।’

রহমান সাহেবের কথা শুনে ফারুক-ফয়সাল সেখান থেকে রাগ করে চলে আসে আর মনে মনে ঠিক করে, দুলাভাইকে তারা একটা উচিত শিক্ষা দেবে।

বাসায় এসে তারা তাদের ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দেয়—‘আমাদের একমাত্র দুলাভাই রহমান আলী আমাদের দুজনকে সেলামি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন। আমরা অনেক খুশি। থ্যাংকইউ, দুলাভাই।’

শিউলির মাধ্যমে রহমান সাহেব শালাদের স্ট্যাটাসের কথা জানতে পারেন। তিনি বেশ অবাক হলেও মনে মনে অনেক খুশি হন। ভাবেন, যাক ফ্রি ফ্রি নাম কামাতে পারলে মন্দ কী।

এদিকে ফারুক-ফয়সালের স্ট্যাটাসের কথা ধীরে ধীরে রহমান সাহেবের আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে ছোট পোলাপান সবাই জেনে যায়। তারাও মোটা অঙ্কের সেলামির আশায় রহমান সাহেবের বাসায় ভিড় করতে থাকে। শিউলিও ‘রহমান সাহেব বাসায় নেই, রহমান সাহেব বাসায় নেই’ বলে বলে ক্লান্ত। কিন্তু বাচ্চারা রহমান সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতেও রাজি। কয়েকজন অতিউত্সাহী পোলাপান রহমান সাহেবের বেডরুমে এসেও দেখে যায় তিনি ঘরে আছেন কি না। অন্যদিকে রহমান সাহেব সেলামি এড়াতে সবার চোখের আড়ালে খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে বিদ্রোহী মশাদের গান শুনতে থাকেন। কিন্তু মশা মারতেও পারেন না। পাছে মশা মারার শব্দ সেলামিপ্রার্থী পোলাপানের কানে চলে যায়।

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’

নাটক অবলম্বনে লেখা।]

 


মন্তব্য