kalerkantho


মিশন ইমপসিবল

সত্যজিৎ বিশ্বাস

১০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মিশন ইমপসিবল

হাঁপাতে হাঁপাতে ফজলু ভাই ধপাস করে সামনের চেয়ারে বসে পড়লেন। প্যান্টের পকেটে হাতিয়ে খুঁজে না পেয়ে বললেন, ‘একটা টিস্যু দিবি?’

তাকিয়ে দেখলাম, তার কপাল থেকে দরদরিয়ে ঘাম ঝরছে। তাড়াতাড়ি টিস্যুর বক্সটা এগিয়ে দিলাম। ‘কী হয়েছে, ফজলু ভাই? কেউ দৌড়ানি দিল নাকি?’

কৌতূহলী প্রশ্নে ফজলু ভাই যে দৃষ্টিতে তাকালেন, সে দৃষ্টিতে নায়করা ভিলেনের দিকে তাকায়।  

সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে শুধরে নিলাম—‘না, মানে আপনার নায়কের মতো ফরসা গাল লাল হয়ে গেছে, চুল এলোমেলো, টপটপিয়ে ঘাম পড়ছে; তাই জিজ্ঞেস করলাম।’

এবার ফজলু ভাই খুশি হয়ে বললেন, ‘তোকে বলব বলেই তো এলাম। একগ্লাস পানি খাওয়া তো।’

ফজলু ভাই আমাদের পাড়ার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন, অমায়িক ব্যক্তি। বিকেলে যে যার কাজ সেরে বাড়ি ফেরে, অথচ আমরা ফিরি শুকতারা রেস্টুরেন্টে ফজলু ভাইয়ের কাছে। লোকটি অমায়িক হলে হবে কী, সমস্যা কখনো তার পিছু ছাড়ে না। একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে। সেই সমস্যার সমাধান করে বৈকালিক নাশতা শেষে তবেই বাড়ি ফিরি। আমাদের আপ্যায়ন না করে লোকটা ছাড়তেই চায় না। যারা আমাদের গ্রুপটাকে দেখতে পারে না, তাদের কথা অবশ্য উল্টো। আপ্যায়ন না করানো পর্যন্ত নাকি আমরা ফজলু ভাইকে ছাড়তে চাই না। আমাদের অন্তঃপ্রাণ ফজলু ভাই দুষ্টুলোকদের কানকথায় বিশ্বাস করেন না।

বর্তমানের সমস্যাটা বড় অদ্ভুত। কার বদদোয়ায় যেন তার বিয়েটা হয়ে হয়েও হচ্ছে না। সব ঠিকঠাক থাকা অবস্থায় কোনো না কোনো আলগা গিট্টুতে বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। আমরা অবশ্য মিশন ঠিক করে ফেলেছি—ফজলু ভাইয়ের বিয়েটা দিয়েই ছাড়ব। আর সেটি এই ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই।

পানি খাওয়া শেষ করে একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলা শুরু করলেন ফজলু ভাই...

—সর্বনাশ তো হয়ে গেছে।

—কার সর্বনাশ হয়েছে ফজলু ভাই?

—কার আবার, আমার।

—দূর, কী যে বলেন! আপনি তো পুরুষ মানুষ, আপনার সর্বনাশ করবে কে?

—ফাজলামি রাখ। টিনা বেঁকে বসেছে।

টিনা হলো ফজলু ভাইয়ের দেখা সর্বশেষ পাত্রী। তার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা মোটামুটি পাকা না, পেকে আমসত্ত্ব হয়ে আছে। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু না হলে বিয়েটা হয়েই যেত। এখন ফাইনালি ঠিক হলো—বিশ্বকাপ ফাইনালের সঙ্গে সঙ্গে বিয়েও ফাইনাল হয়ে যাবে। ফজলু ভাই আমাদের সবাইকে তার মোবাইলের ওয়ালপেপারে রাখা টিনা ভাবির ছবি দেখিয়েছে। টিনা ভাবি যথেষ্ট সুন্দরী ও মডার্ন। শেষের কথাটা অবশ্য ফজলু ভাইয়ের।

এই মেয়ে কেন ধনী বাপের একমাত্র ছেলে আমাদের লাল্টুস ফজলু ভাইকে বিয়ে করতে বেঁকে বসবে বুঝতে পারলাম না।

—কেন বেঁকে বসেছে বলবেন তো, ফজলু ভাই?

—ও যে আর্জেন্টিনার ভক্ত, জানিসই তো। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে টেনশন করছে দেখে আমি শুধু বলেছিলাম, মেসি যদি একবার ভালো খেলতে পারে, আর্জেন্টিনার আর কোনো টেনশনই থাকবে না।

—সত্যি কথাই তো বলেছেন। 

—সেটাই তো কাল হলো রে ভাই। ও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলে, ‘মেসি খেলতে পারে না, আপনি খেলতে পারেন?’

—এহে রে ভাই, হলুদ কার্ড খেয়ে গেলেন শুধু শুধুই।

—শুধু কী তা-ই? তারপর যা-ই বোঝাই, তা-ই ভুল বোঝে। বললাম, ‘কিচ্ছু ভেবো না, সামনের খেলা নিশ্চয়ই ভালো খেলবে।’ টিনা বলে, ‘কী করে খেলবে? আপনার মতো ছুপা ব্রাজিলের সাপোর্টারদের বদদোয়ায় আমার মেসি তো খেলতেই পারছে না।’ যখন বললাম, ‘ফুটবলের কোনো দলই সাপোর্ট করা তো দূরের কথা, ফুটবল খেলাই দেখি না’—তখন শুরু হলো আরেক বিপত্তি।

—কী বিপত্তি, ভাই?

—বলে, ‘খ্যাত কোথাকার। যে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখে না, এমন ম্যান্দামারা ছেলেকে আমি কখনো বিয়ে করব না’—এই বলে পেনসিল হিলে খরমের মতো খটখট শব্দ করতে করতে চলে গেল। এখন কী করি?

বিকেলে শুকতারা হোটেলে চিকেন গ্রিল খেতে বসলাম আমরা সবাই। বিখ্যাত খাদ্যবিজ্ঞানী বলেছেন—চিকেন গ্রিলে চিকন বুদ্ধি আসে। ফজলু ভাই হাঁ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন—এই বুঝি কেউ কোনো বুদ্ধি বাতলে দেয় এই আশায়। খাওয়া শেষ করে ঠাণ্ডার গ্লাসের বুদ্বুদের দিকে তাকিয়ে বুদ্ধি খুঁজতে লাগলাম। যদি বুদ্বুদের সঙ্গে বুদ্ধি উঠে আসে। তুখোড় বুদ্ধিবাজ মিঠু আমাদের উদ্ধার করল এ যাত্রা। বুদ্ধিজীবীদের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘ফজলু ভাই, আপনি এক কাজ করেন। কবিদের মতো ওর রূপের প্রশংসা শুরু করে দেন। পৃথিবীতে এমন কোনো মেয়ে নেই, যে রূপের প্রশংসায় গলে যায় না।’ হঠাৎ যেন জিরো পাওয়ারের ডিমলাইট থেকে এনার্জি লাইটের তীব্র আলোতে ঝলসে উঠল ফজলু ভাইয়ের মুখ। 

পরদিন দুপুরে বিধ্বস্ত ফজলু ভাই আবার আমার অফিসে।

—কী হয়েছে, ভাই? বুদ্ধিতে কাজ হয়নি?

—হয়েছে তো। বিয়ে ভাঙাটা কনফার্ম হয়েছে। 

—কী সব অলক্ষুনে কথা বলেন? খুলেই বলেন না, ভাই।

—অনেক হাতে-পায়ে ধরে টিনাকে ভালো একটা রেস্টুরেন্টে ডেকে যেই না বললাম, ‘তোমার চোখ দুটি গাছের ডালের ওই পাখির বাসার মতো সুন্দর!’ অমনি বলে—‘কী বললেন? আমার চোখ দুটি এত নোংরা? তা ছাড়া চোখ কি গাছের ডালে থাকে? পাখির বাসা বললেন কেন, জবাব দেন।’

—তো, কী জবাব দিলেন ভাই?

—তাড়াতাড়ি কিছু খাবারের আইটেমের অর্ডার দিয়ে বললাম—তোমার নাক বাঁশির মতো সুন্দর। টিনা বলে, ‘কোন বাঁশি? রেফারির বাঁশি নাকি রাখালের বাঁশি?’ আবেগে চোখ বুজে যেই বললাম, ‘রাখালিয়া বাঁশি।’ অমনি চিত্কার দিয়ে বলে, ‘আমার নাকে কি ছয়টা ছিদ্র?’

—তারপর?

—তারপর আর কি? আমাকে লাল কার্ড দেখিয়ে বলে গেল, আর কোনো দিন যেন তার সামনে যাওয়ার চেষ্টা না করি। 

আমি পলকহীন দৃষ্টিতে ফজলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি, ফজলু ভাইও আমার দিকে। বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হতে আর এক সপ্তাহও বাকি নেই। মিশন পসিবল হবে কী করে?



মন্তব্য