kalerkantho


প্রতিবেশী সমাচার

সত্যজিৎ রানা

১০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিবেশী সমাচার

যে চৌধুরী সাহেব সকাল-বিকাল খবর নিতেন, হঠাৎ করে তিনি সব ধরনের যোগাযোগ নেওয়া বন্ধ করে দিলেন। আদনান সাহেবকে ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলল। অসুখটসুখ করল না তো আবার? গিন্নিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চৌধুরী সাহেব আমাদের বাসায় কদিন হলো আসছে না। ওদের বাসায় কারো অসুখ নাকি? ভাবি আসেনি?’

‘আমাকে চার্জ করছ কেন? আমি কী জানি?’ গিন্নির নির্বিকার মুখঝামটায় আদনান সাহেবের আশঙ্কা আরো বাড়ল। তার মানে গিন্নিই সব জানে। বিবাহত—থুক্কু, বিবাহিত জীবনের দুই যুগ অতিবাহিত করে এটুকু বুঝে গেছেন—একবার মুখে কুলুপ আঁটলে গিন্নি প্রজাতিকে আর কোনো প্রশ্ন করে লাভ নেই।

দিন দু-এক পর আদনান সাহেব নিজেই গেলেন চৌধুরী সাহেবের কাছে। কলিংবেলে চাপ দিয়ে ঝাড়া দুই মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন। কী ব্যাপার, এমন তো হয় না কখনো? বাসায় কি সবাই অসুস্থ, নাকি কেউ নেই? অবশেষে দরজা খোলার পর সামনে চৌধুরী সাহেবকে দেখে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন। আধবুড়ো বয়স একটা জটিল সময়। এ সময় কেউ বন্ধু হলে টানটাও সেই রকম হয়। আদনান সাহেব টানটান করে টানতে গিয়ে অবাক হলেন। চৌধুরী সাহেব হাত শক্ত করে সটান দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু তা-ই না, ভেতরেও ঢুকতে দিতে চাইছেন না। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটু বাইরে আসুন তো।’

অবাক হয়ে আদনান সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার, কদিন যাবৎ হাঁটতে আসছেন না যে? অসুস্থ নাকি?’

‘না। আমি না। ও একটু অসুস্থ তো, তাই।’ চৌধুরী সাহেবের দায়সারা উত্তর।

‘ভাবি অসুস্থ? আর আপনি আমাকে বাইরে নিয়ে এলেন? চলেন, চলেন, ভাবিকে দেখতে যাব।’

এবার চৌধুরী সাহেব আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আপনাকে যেতে হবে না। অসুখের কারণটা তো আপনার স্ত্রী।’  

আদনান সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন যেন, ‘আমার স্ত্রী? কী করেছে ও?’

—সেটি আপনার স্ত্রীকেই জিজ্ঞেস করে দেখেন।

হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ফিরে আদনান সাহেব জেরা শুরু করলেন স্ত্রীকে, ‘কী বলেছ তুমি চৌধুরী ভাবিকে?’

—কই, তেমন কিছু না তো। আমি শুধু বলেছি—আপা, আপনি তো দিন দিন মুটিয়ে যাচ্ছেন। সে কথা বলার পরেই দেখি ওনার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সামান্য এক কথায় কারো এমন অবস্থা হয় বাপের জনমেও শুনিনি, দেখিওনি।

—তুমি এ কথা ভাবিকে বলতে গেলে কেন? মহিলা মুটিয়ে হাতি হয়ে যাক কিংবা শুকিয়ে শুকনা মরিচ হয়ে যাক, তাতে তোমার কী?

—মোটাকে মোটা বলব না?

—না, বলবে না। জানো না, কানাকে কানা বললে যেমন দুঃখ পায়, মোটাকে মোটা বললেও দুঃখ পায়। যে যা খুশি হোক, তাতে তোমার কী? আমি পরচর্চা একেবারে পছন্দ করি না।

দিন সাতেক পরের কথা। আদনান সাহেব অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন সন্ধ্যাবেলায়। বাসার নিচেই দেখা হয়ে গেল চারতলার টুটুল সাহেবের সঙ্গে। ভদ্রতার কারণে হাত বাড়িয়ে দিলেন—‘ভালো আছেন, ভাই?’

সেই হাত প্রত্যাখ্যান করে টুটুল সাহেব বললেন, ‘ভালো আর থাকতে দিচ্ছেন কই? অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সেই বিকেল থেকে দাঁড়িয়ে আছি আপনার অপেক্ষায়। আপনার বউয়ের সমস্যাটা কী বলবেন?’ 

—কী বলেন এসব? ওর তো অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়ার লক্ষণ দেখিনি কোনোকালে। কী করেছে ও?

—কী করেছে মানে? আমার স্ত্রীকে চায়নিজ বলেছে। আমার স্ত্রী নাকি দেখতে অবিকল চায়নিজদের মতো। তার চোখ দুটি নাকি একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে আছে। নাক চ্যাপ্টা হয়ে নাকি ভেতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এসব কী? আমার স্ত্রীকে চায়নিজ বলার সাহস তাঁকে কে দিল? এত অধিকার পেল কোথা থেকে? এত বড় স্পর্ধা হয় কী করে? 

রেগে আগুন হয়ে বাসায় ফিরে গিন্নিকে ইচ্ছামতো শাসালেন আদনান সাহেব। প্রতিবেশীদের নিয়ে সব ধরনের কথাবার্তার ওপর কড়া সেন্সরশিপ জারি করলেন। এ বাসায় প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কোনো অবস্থায়ই প্রতিবেশীদের দুঃখে কাঁদা যাবে না, হাসাও যাবে না। সমালোচনার তো প্রশ্নই ওঠে না। অন্য কারো সমালোচনা কোনো ভালো মানুষ করে? ছি ছি ছি...!    

এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল বিশ্বকাপ ফুটবল। আদনান সাহেবের প্রিয় খেলা ফুটবল। নিয়মিত দেখেন। খেলা দেখে চব্বিশ ঘণ্টা ঘরের মধ্যে লাফালাফি, উহ-আহ করেন। গত পরশু মধ্যরাতে যখন খেলা শেষ হলো, তখন বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি শুরু করে দিলেন।   

‘কী ব্যাপার, খেলা দেখে এসে এখন কী বিছানার মধ্যে নিজেই খেলা শুরু করে দিলে নাকি’—গিন্নির ঝাড়ি শুনে উঠে বসলেন।  

‘তা কেন করব; কিন্তু জাপান এটা কী করল’—অভিমানী কণ্ঠস্বরে বললেন আদনান সাহেব।

—কী করেছে জাপান?

—কী না করেছে তা-ই বলো? আগে দুটি গোল দিয়েও বেলজিয়ামের কাছে এভাবে হারে?

—তোমার আত্মীয়-স্বজন কেউ কি জাপান থাকে? 

—না, কেন?

—তবে তুমি ওদের জন্য আহ-উহ করছ কেন?

—কী বলো তুমি! ওরা আমাদের প্রতিবেশী দেশ। শুধু কি তাই, আমাদের দেশের কত বড় বন্ধুদেশ জানো? এই জাপানকে আমি সাপোর্ট করতে পারব না? কিছু বলতে পারব না? 

—না, পারবে না। সেদিন প্রতিবেশীকে ভালোবেসে কাছের মনে করে মোটা বলেছি বলে কত কথা শোনালে। আরেক প্রতিবেশীকে নাকটা একটু চ্যাপ্টা বলেছি বলে কড়া নিয়ম করলে—এ বাসায় এসব বন্ধ। কারো সমালোচনা চলবে না। এখন তুমিই বলো, অন্য কারো সমালোচনা কোনো ভালো মানুষ করে? ছি ছি ছি!



মন্তব্য