kalerkantho


মুকুট ক্যামেরুনের

মাজহারুল ইসলাম

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুকুট ক্যামেরুনের

ফুটবলে তাদের সোনালি ঐতিহ্য। সাত সাতবার প্রতিনিধিত্ব করেছে তারা ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার আসর বিশ্বকাপে।

বৈশ্বিক এ আসরে অংশগ্রহণে আফ্রিকান কোনো দেশের যা সর্বোচ্চ। মহাদেশের প্রথম দল হিসেবে খেলেছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৯০ সালের সেই আসরে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে থেমেছিল সেই স্বপ্নযাত্রা।

আফ্রিকান নেশনস কাপেও তাদের রঙিন পদচারণ। পাঁচ পাঁচবার তারা শিরোপা উৎসব করেছে মহাদেশীয় এ শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে। তাদের চেয়ে শুধু বেশিবার ট্রফি জিতেছে মিসর। সেই স্বপ্নযাত্রায় হঠাৎ করেই যেন লাগে ভাটার টান। এক যুগেরও বেশি সময় কেটে যায় কিন্তু শিরোপা উৎসব আর করা হয় না ক্যামেরুনের। হঠাৎ যেন খাঁচাবন্দি হয়ে পড়েছিল ‘অদম্য সিংহ’।

সুযোগই পায়নি ২০১২ ও ২০১৩ সালের নেশনস কাপে। গতবার ফিরলেও ছিটকে গিয়েছিল প্রথম পর্বে। সেই ‘অদম্য সিংহ’ গর্জে উঠল আরেকবার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবার মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফিতে চুমু আঁকল ক্যামেরুন। যে শিরোপা পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ১৫টি বছর।

গ্যাবনের আসরে ঠিক ফেভারিট ছিল না ক্যামেরুন। বরং আসর শুরুর আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছিল তারা একঝাঁক তারকা খেলোয়াড় খেলতে অস্বীকৃতি জানালে। লিভারপুল ডিফেন্ডার জোয়েল ম্যাটিপ, শালকে স্ট্রাইকার এরিক চুউফ-মটিংসহ নিয়মিত একাদশের আট আটজন ফুটবলার যে নাম প্রত্যাহার করে নেন প্রাথমিক স্কোয়াড থেকে। অগত্যা অনভিজ্ঞ ও তারুণ্যনির্ভর একটি দল নিয়ে গ্যাবনের মিশনে নামতে হয় বেলজিয়ান কোচ হুগো ব্রুসকে। ফুটবল বোদ্ধারা তাই টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই শিরোপা জয়ে অনেকটা বাতিলের খাতায় ফেলে দেয় ক্যামেরুনকে। তাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত করে ব্রুসের তারুণ্যনির্ভর অনভিজ্ঞ দলটিই গ্যাবনের রাজধানীতে উড়িয়েছে ক্যামেরুনের বিজয় কেতন।

অনেকটা ‘দ্বিতীয় সারি’র দল নিয়েও মিসরের বুক ভেঙে ১৫ বছর পর নেশনস কাপের শিরোপা জিতল ‘অদম্য সিংহ’রা। ফাইনালে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের জয়ে শেষ হাসি হেসেছে তারা। এরপর মাঠে বাঁধভাঙা উল্লাসে মাতে ক্যামেরুনের তরুণ তুর্কিরা। গ্যাবনের রাজধানী লিবরেভিল থেকে উচ্ছ্বাসটা ছড়িয়ে পড়ে যেন ক্যামেরুনের প্রতিটি শহর ছাপিয়ে অলিগলিতে। অনেক দিনের অপেক্ষার পর যে এলো ট্রফিটা। উচ্ছ্বাসটা তো অমন বাঁধনহারা হবেই।

ফাইনালে মিসরকে হারানোয় উৎসবের রংটা আরো বর্ণিল হওয়ারই কথা। এর আগে নেশনস কাপের ফাইনালে কখনই যে তারা হারাতে পারেনি পিরামিডের দেশটিকে। তাদের বিপক্ষে এর আগে দু-দুবার ফাইনাল খেলে দুবারই হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়েছে ক্যামেরুনকে। সবশেষ ২০০৮ সালের ফাইনালে পেরে উঠেনি স্যামুয়েল এতো, রিগোবার্ত সংয়ের মতো তারকাদের নিয়েও। বেঞ্জামিন মুকান্ডুর নেতৃত্ব হুগো ব্রুসের তরুণ তুর্কিরা সেই আক্ষেপও ঘুচিয়ে দিল অবশেষে। তৃতীয়বারের দেখায় ফাইনালে মিসর জয় করল ‘অদম্য সিংহ’রা।

 উত্তরসূরিদের এ উৎসবে শামিল ছিলেন এতোও। মাঠে বসেই তো ফাইনালটা উপভোগ করেছেন বার্সেলোনার সাবেক তারকা। উত্তরসূরিদের শিরোপা জয়ের আনন্দ সমানভাবে ছুঁয়ে গেছে তাই এতোকেও, ‘আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন আমরা! এবার জিতলাম নেশনস কাপ। পরের লক্ষ্য কনফেডারেশনস কাপ!’

আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় কনফেডারেশনস কাপেও খেলবে ক্যামেরুন। সেখানে পাঁচবারের নেশনস কাপ জয়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, চিলি আর অস্ট্রেলিয়া। রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় ওই টুর্নামেন্ট নিয়ে না ভেবে দলের বেলজিয়ান কোচ হুগো ব্রুস আপাতত উপভোগ করতে চান নেশনস কাপের জয়টা, ‘সবারই জানা সেরা দলটা পাইনি আমরা। তার পরও যাদের পেয়েছি তারা সবাই নিজেদের উজাড় করে খেলেছে বলেই শিরোপা জিততে পারলাম। এটা যতটা না ফুটবল খেলোয়াড়দের দল তার চেয়েও বেশি বন্ধুদের। ’

অবশ্য ফাইনালে মিসরই এগিয়ে গিয়েছিল ২২ মিনিটে। পোস্টের খুব কাছ থেকে বল জালে জড়িয়ে দলীয় দারুণ একটি আক্রমণের সফল সমাপ্তি দেন মোহামেদ এলনেনি। তখন হয়তো কেউ কেউ মনে করছিল অতীতের পুনরাবৃত্তি হবে গ্যাবনের রাজধানীতে; শিরোপা উৎসব করবে শেষ পর্যন্ত মিসর। ক্যামেরুনের হয়ে ৫৯ মিনিটে জোরালো হেডে সমতা ফিরিয়ে অদম্য সিংহদের নতুন লাইফলাইন দেন বদলি খেলোয়াড় নিকোলাস এনকলু। অথচ ফাইনালের আগে এবারের টুর্নামেন্টে মাত্র একটিই ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন লিওর এই ডিফেন্ডার। এরপর বাজিমাত আরেক ‘সুপার সাব’ ভিনসেন্ট আবু বকরের। ম্যাচ শেষের দুই মিনিট আগে ডিফেন্ডার আলী গাবরের মাথার ওপর দিয়ে তিনি বল জালে পাঠালে ২০০২ সালের পর আবার শিরোপার আনন্দে ভাসে ক্যামেরুন। তা-ও আবার নিয়মিত একাদশের আটজনকে দেশে রেখে এসে।

২০০৬, ২০০৮, ২০১০ সাল—টানা তিনবার আফ্রিকান নেশনস কাপের শিরোপা জেতে নীল নদের দেশ মিসর। এরপর সাতবারের চ্যাম্পিয়নদের সুযোগই হয়নি টানা তিন নেশনস কাপে। এবার দাপটে ফাইনালে পৌঁছেও রেকর্ড অষ্টম শিরোপা জেতা হলো না হেক্তর কুপারের শিষ্যদের। মিসরের বিপক্ষে প্রতিশোধ নিয়ে নেশনস কাপে পঞ্চমবার শিরোপা উৎসব করছে এখন হুগো ব্রুসের তরুণ তুর্কিরা।


মন্তব্য