kalerkantho


আমার পারফরম্যান্সের ওপর সব নারীর মর্যাদা নির্ভর করছে

এসএসসি ও এইচএসসিতে ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম এবং দ্বিতীয় হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএমে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে অনেক উল্লেখযোগ্য মামলা লড়েছেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় জয়িতাসহ আরো উদ্যোগ নিয়েছেন। এ দেশের প্রথম নারী ও সবচেয়ে কম বয়সের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মুখোমুখি হলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আমার পারফরম্যান্সের ওপর সব নারীর মর্যাদা নির্ভর করছে

আপনার জন্ম তো নোয়াখালী?
আমি ১৯৬৬ সালের ৬ অক্টোবর জন্মেছি। আমার দাদার বাড়ি চাটখিল উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে।

নানাবাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ইনয়নগর গ্রামে। আমার জন্ম ঢাকায়। ঢাকায় ধানমণ্ডির ২৭ নম্বরে আমাদের বাড়ি ছিল। সেখানেই বড় হয়েছি। আমরা দুই বোন। ছোট বোন নায়রা নওরীন চৌধুরী আমার সাড়ে ৯ বছরের ছোট। দুই বোনই হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ছিলাম। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বিবিএ, এমবিএ করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে। কিছুদিন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ছিল। বিখ্যাত জাহাজ কম্পানি ‘মার্কস’-এ মানবসম্পদ বিভাগে জেনারেল ম্যানেজার ছিল। এখন অনেক বছর ধরে দুবাই থাকে। তার স্বামী দুবাই ব্যাংকে চাকরি করেন। তার দুটি ছেলে, একজনের বয়স ১১, অন্যটির ১০।

আপনার মা-বাবা দুজনেই তো কীর্তিমান।
অনেক ভাই-বোনের একটি পরিবারে আমার বাবা রফিকুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম। দাদা মাদরাসা শিক্ষক ছিলেন। সাধারণ পরিবার থেকে বাবা উঠে এসেছেন। তিনি চাটখিল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স, মাস্টার্স করেছেন। আমার বাবা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্কুলজীবন থেকে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তিনি প্রথম নির্বাচিত সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতি করেছেন। তাঁর নির্দেশেই ১৯৬১ সালে সিএসপি পরীক্ষায় পাস করে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পরে তিনি বঙ্গবন্ধুর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যানসহ সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর তাঁকে চাকরিজীবনে নানা বৈরী আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরশাদ সরকার গঠনের পর পরই তাঁকে চাকরিজীবনের ২৫ বছর পূর্তির কারণে মার্শাল ল’র এমএলও নাইন-এর অধীনে অবসর দিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মা?
আমার মা অধ্যাপক নাইয়ার সুলতানা আজীবন শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নানা সিলেটের মানুষ হলেও মা ঢাকায়ই বড় হয়েছেন। তিনি ঢাকায় পড়ালেখা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে এমএসসি করেছেন। এরপর ইডেন কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ইডেনের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ঢাকা কলেজের প্রথম নারী অধ্যক্ষ ছিলেন। শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি ছিলেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য থাকার সময় ২০০৫ সালে ৬২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাজনীতির প্রতি আপনার আগ্রহ কী মা-বাবার সূত্রে?
অবশ্যই। স্বাভাবিকভাবেই আমার জীবনে মা-বাবার প্রচণ্ড প্রভাব আছে। যেহেতু আমি তাঁদের বড় সন্তান এবং ৯ বছর একমাত্র সন্তান ছিলাম, কাজেই আমার বেড়ে ওঠা, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ গঠনসহ সব কিছুই মা-বাবার কাছে শেখা। আমার বাবা সারা জীবন রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। পরে যদিও সরকারি চাকরি করায় সক্রিয় রাজনীতি করতে পারেননি; তার পরও তাঁর ভেতরে রাজনৈতিক সত্তাটি সব সময় খুব উজ্জীবিত ছিল। আমাদের বাড়িতে অনেক রাজনীতিবিদের আসা-যাওয়া, দেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে দেখেছি। বয়স কম হলেও সেসব আলোচনায় যতটুকু সম্ভব অংশ নিয়েছি। এসব কারণেই বোধ হয় রাজনীতির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়েছে।

ছেলেবেলা থেকেই আপনি অসাধারণ মেধাবী।
আমরা যাতে সব সময় লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হই, মা-বাবা দুজনেই তা খুব গুরুত্বের সঙ্গে বলতেন। তাঁরা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন, আমার বেশির ভাগ আত্মীয়ই চাকরিজীবী ছিলেন। ফলে লেখাপড়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়—এ ধরনের পরিবেশে আমরা বড় হয়েছি। বিষেশত মা লেখাপড়ার প্রতি বেশি জোর দিতেন। মেয়েসন্তান বলে কোনো দিন শিক্ষার সুযোগ থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়নি। ফলে ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছি। হলিক্রস থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছি। সারা জীবন বৃত্তি নিয়েই আমি পড়ালেখা করেছি। পরে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

১৯৮৩ সালে এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম ও ১৯৮৫ সালে এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হয়েছেন।
একেকজনের পড়ার স্টাইল একেক রকম। কেউ সারা বছর নিয়মিত পড়ে। প্রতিদিন ক্লাস করে, নোটগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে। আমি বোধ হয় তেমন ছিলাম না। যদিও নিয়মিত ক্লাস করেছি। তবে যে অর্থে ‘পড়ুয়া’ বলা হয়, আমি তা ছিলাম না। বেশ কেয়ারলেস ছিলাম। বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতাসহ স্কুলের সব ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আয়োজন ও সেগুলোতে অংশ নিতাম। স্কুলে দলগত কাজ করতে হতো। পিকনিক আয়োজন, মেলায় অংশ নিতে হতো। এসব কাজ করতে গিয়ে কখনো লেখাপড়ার ক্ষতি হয়নি। নবম শ্রেণির আগে আমার কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। নাইনে ওঠার পর একজন শিক্ষক বাড়িতে এসে আমাকে অঙ্ক দেখিয়ে দিতেন। এসএসসিতে কোথাও কোচিং পড়িনি। এইচএসসিতে ভূগোল, ইংরেজি কয়েক মাস কোচিং করেছি। তবে পরীক্ষার আগে তীব্র মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। টেস্টের পর থেকে এসএসসির আগের তিন-চার মাস খুব সিরিয়াসলি পড়েছি। প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা পড়তে হয়েছে। সেভাবে এইচএসসিতেও ভালো করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি।

আইনে ভর্তি হলেন কেন?
সব সময় আমার আগ্রহ ছিল আইন নিয়ে পড়ব, আইন পেশায় আসব। এটি স্বাধীন পেশা। এই পেশায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ আছে বলে ভালো লাগত। বাবা রাজনীতি করতেন বলে আমিও ভাবতাম, আইন পেশায় থাকলে পরবর্তী জীবনে রাজনীতিতে আসা যাবে। মেধাবী মানেই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, আমি তা মনে করি না। ফলে ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হলাম। আমরা ১৯৮৯ সালের অনার্স (এলএলবি) ব্যাচ। তবে ১৯৯০ সালে পাস করেছি। রোকেয়া হলের অনাবাসিক ছাত্রী ছিলাম।

এর মাঝে তো ১৯৯১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিয়ে হলো।
অনার্স পরীক্ষার পর আমার বিয়ে হলো। বিয়ের পরে এলএলএম (মাস্টার্স) পাস করেছি। আমার মা-বাবা ও শ্বশুর-শাশুড়ি পারিবারিকভাবে পরিচিত ছিলেন। শ্বশুরবাড়ি কিশোরগঞ্জ। আমার শ্বশুর সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন আনন্দমোহন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক, রেজিস্ট্রার ছিলেন। তিনি লেখালেখিও করতেন। আমার স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসাইন পেশায় ফার্মাসিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগ থেকে বিফার্ম, এম ফার্ম করে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানিতে কাজ করেছেন। নোভারটিসে হেড অব প্রডাকশন ছিলেন। এখন ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। তিনি আমার চেয়েও সংস্কৃতিমনা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ‘পদাতিক নাট্যসংসদের’ ভাইস প্রেসিডেন্ট। এই দলে তিনি খুবই সক্রিয়।

তিনি আপনাকে কেমন সহযোগিতা করেন?
বরাবরই তিনি আমাকে খুব সহযোগিতা করেন। বিয়ের পর স্বাচ্ছন্দ্যেই আমি এলএলএম পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে সাড়ে তিন বছর পিএইচডি করেছি। আমার মেয়ের বয়স তখন দুই। তখন এটি আমাদের জন্য বড় সিদ্ধান্ত ছিল যে তিনি আমার সঙ্গে বিদেশে যাবেন কি না? চাকরিতে ছুটি নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে গেলেন। ফলে আমরা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলাম। আমরা তিনজনই একসঙ্গে ছিলাম বলে আমি খুব নিশ্চিন্তে কাজ করতে পেরেছি। পিএইচডি করা খুব কঠিন অধ্যবসায়। দীর্ঘ সময় লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করতে হয়েছে, গবেষণা করতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পিএইচডি করেছি। তখন ইন্টারনেট এতটা প্রসারিত ছিল না। বইপত্র, নথি পাওয়া যেত না বলে লাইব্রেরিতে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে। তখন এবং সব সময় আমার স্বামী আমাকে মানসিকভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন। আমার কাজের প্রতি তিনি সব সময় উদার মনোভাব পোষণ করেন। বাচ্চারাও কিন্তু আমাকে সহযোগিতা করে। তারা তো ছোট থেকেই মাকে ব্যস্ত দেখতে অভ্যস্ত। ওরাও জানে, মা তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন। রাজনীতির আগে আইনজীবী হিসেবেও দীর্ঘ সময় আমাকে পেশাজীবনে দিতে হয়েছে। বেশিক্ষণ কোর্টে থাকতে হয়েছে। পরে চেম্বার করতে হয়েছে। কাজেই সব সময়ই আমার জীবনটা খুব ব্যস্ত কেটেছে।

ইংল্যান্ডের এসেক্স ইউনিভার্সিটিতে কোন বিষয়ে পিএইচডি করেছেন?
আমার বিষয় ছিল ‘রাইট টু লাইফ (জীবনের অধিকার)’। আমি সাংবিধানিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে পিএইচডি করেছি। বিখ্যাত প্রফেসর শেলডেন লিডার আমার পিএইচডির সুপারভাইজর ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান না করে ২০০০ সালে আইন পেশায় এলেন কেন?
এলএলএম পাস করার পর ইচ্ছা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর সুযোগ থাকলে শিক্ষকতা করব। তবে আমরা পাস করার পর সেখানে শূন্য পদে শিক্ষক নেওয়া হয়নি, বিজ্ঞাপন ছিল না। দেশে ফেরার পর আমি আর সে জীবনে ফিরতে চাইনি। কারণ ১৯৯০ সালে এলএলবি পাস করেই তো ইন্টার্নশিপ করেছি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে এনরোল্ড হয়েছি এবং কোর্ট প্র্যাকটিসও শুরু করেছি। কাজেই মোটামুটিভাবে আইন পেশায় চলে এসেছি। আমার তো ইচ্ছাই ছিল, নিজেকে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নিজের মতো করে প্র্যাকটিস করব, রাজনীতিতে আসব। তবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ যখন যেখানে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছি, গ্রহণ করেছি।

আইনজীবীর জীবন?

বার কাউন্সিলে এনরোল্ড হয়ে সর্বমোট ১৫ বছর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেছি। পিএইচডি করার আগে ও পরে দেশে ফিরে ২০০৯ সালে মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছি। এই সময়ে অনেক উল্লেখযোগ্য মামলায় আইনজীবী হিসেবে আমার ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়েছে। ২০০১ সালের পরবর্তী সময় অনেকগুলো রাজনৈতিক মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যেমন ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মামলা, বাহাউদ্দিন নাছিম, শাহরিয়ার কবিরের পক্ষে মামলা। মিগ ক্রয়, ফ্রিগেট ক্রয় মামলায় কাজ করেছি। তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ১/১১-এ গ্রেপ্তারের পর তাঁর আইনজীবী প্যানেলে আমি একজন আইনজীবী ছিলাম। তখন পার্লামেন্ট ভবনের চত্বরে আদালত বসত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এখানে আনা হতো। তাঁর সঙ্গে তো আমার অনেক আগে থেকে পরিচয়। যেহেতু আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সেহেতু খুব ছোট বয়স থেকে তাঁদের দেখেছি। তাঁর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় আমাদের পরিস্থিতি খুব বৈরী ছিল। তার পরও যেহেতু এটি শেখ হাসিনার বিষয় এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় হয়রানির পরিকল্পনা করা হয়েছে, ফলে আইনজীবীদের মহল থেকে আমরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি। কিভাবে তাঁকে সহযোগিতা করা যায় সে ব্যাপারে নানা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি।

সংসদ সদস্যের জীবনের শুরু?
২০০৯ সালের মার্চে সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হলাম। আগে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপিদের নির্বাচনী এলাকা ছিল। আমরা নির্বাচিত হওয়ার আগে সে বিধান তুলে দেওয়া হলো। তবে আমরা বিভিন্ন এলাকার দায়িত্ব পেলাম। মহিলা এমপি হিসেবে আমাকে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ি) আসনের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এলাকার উন্নয়নে কাবিখাসহ উন্নয়ন বরাদ্দগুলো বণ্টন করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছি। বিশেষত মেয়েদের স্কুলগুলোতে কমনরুম তৈরি, টয়লেট তৈরির দিকে নজর দিয়েছি। এলাকার মানুষ যেসব চাহিদার কথা জানিয়েছে, এমপি হিসেবে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও উন্নয়নসহ তাদের সেসব সমস্যার সমাধানে সাহায্য করেছি।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর জীবন?
২০০৯ সালের জুলাই মাসে আমাকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলো। এই পদে সাড়ে চার বছর ছিলাম। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে পারা আমার জন্য সত্যিই বিরল সুযোগ ছিল। এই কাজটি শুধু আমার দায়িত্ব ছিল না, প্যাশনও ছিল। যেহেতু নিজে নারী, ফলে নারীদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করায় নারীরা কী ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করে, সেগুলো আমি জানি। নারীরা আমাদের সমাজে খুব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। তাদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা আছে, কীভাবে সেগুলো দূরীভূত করা যায়—এসব বিষয়ে আমার ভালোই ছিল। আইনজীবী হিসেবে অনেক নারী সংগঠনের সঙ্গেও কাজ করেছি। আমরা সব সময় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, তাদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে চাইতাম। কাজেই প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আমার সেসব কাজ করার সুযোগ হলো। ১৯৯৭ সালে প্রথমবার ক্ষমতার আসার পর শেখ হাসিনার করা ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা’টিকে পরে বদলে ফেলা হয়েছিল, সেটিকে ২০১০ সালে আমরা আবার তৈরি করলাম। এটি নারীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা। সেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রই আছে। ২০১২ সালে গৃহে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে আমি ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করেছি। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। জয়িতা আমাদের একটি বড় কাজ। এটির মাধ্যমে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নারী যেসব পণ্যসামগ্রী উত্পাদন করে, আমরা ‘জয়িতা’র মাধ্যমে তাদের সেসব পণ্যসামগ্রী বাজারজাত করার সুযোগ করে দিয়েছি। সেই জয়িতা এখন ফাউন্ডেশন হয়ে বিরাটাকার লাভ করেছে। সরকারের কাছ থেকে আমরা জমি পেয়েছি। সেখানে জয়িতার নিজস্ব ভবন হবে, আমরা সারা দেশে জয়িতাকে ছড়িয়ে দেব। জাতীয় সংসদ ভবনে জয়িতার ক্যান্টিন চালু করেছি। সেটিও নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। তৃণমূল পর্যায়ে হতদরিদ্র নারীদের জন্য সামাজিক কার্যক্রমের অধীনে মাতৃদুগ্ধদানকারী মায়েদের ভাতা চালু করেছি, মাতৃত্বকালীন ভাতা পরিচালনা করেছি, ভিজিডি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিটি হতদরিদ্র নারীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এই শ্রেণির নারীদের প্রশিক্ষিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’-এ নির্যাতনের শিকার নারীকে চিকিত্সা, আইনি, পুলিশি সহায়তা দেওয়া হয়। একে আমি আরো শক্তিশালী করতে কাজ করেছি। নানা জেলায় ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ ইউনিট খুলেছি। নারীর বিপক্ষে সহিংসতা প্রতিরোধে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জন্য ট্রমা সেন্টার আমার সময়ে চালু করা হয়েছে। নারীদের জন্য এই কাজগুলো করে খুব সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হয়েছি।

শিশুদের জন্য নেওয়া উদ্যোগ?
আমি শিশু মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে ছিলাম। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রণীত ‘শিশু আইন ১৯৭৪’  পর্যালোচনা করে ‘জাতীয় শিশু নীতি ২০১১’ প্রণয়ন করা হয়েছে। শিশু একাডেমিকে আরো গতিময় করে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে হতদরিদ্র শিশুদের নগদ অর্থ দেওয়ার জন্য প্রকল্প চালু করেছি। আমার সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের আরো বেশি স্কুলমুখী করতে ‘প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষানীতি’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সেটি এখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাপক আকারে গ্রহণ করেছে।

নবীন এক রাজনীতিবিদকে স্পিকার করা নাকি আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতাই মেনে নিতে পারেননি। শুরুতে অসুবিধায় পড়েছিলেন?
আমাকে স্পিকার করা হবে—এ খবরটি যখন পত্রিকা, টিভির মাধ্যমে অলোচনায় এলো, অনেক তোলপাড় হয়েছে, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। বলা হয়েছে—প্রথম নারী স্পিকার, তার ওপর বয়স কম, অভিজ্ঞতা নেই, কিভাবে সংসদ চালাবেন? তবে ব্যক্তিগতভাবে এই আলোচনা-সমালোচনাকে আমি খুব যৌক্তিক ও প্রত্যাশিত মনে করেছি। রাগ, কষ্ট কিছুই আমার হয়নি। ৬৮ বছরের পুরনো দল আওয়ামী লীগে অনেক সংসদ সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিবিদ আছেন। একজন নবীন এমন এক দায়িত্বে আসবেন—এ নিয়ে তো সেখানে আলোচনা হতেই পারে। এই সমালোচনাগুলোকে মাথা পেতে নিয়েই দায়িত্ব নিয়েছি। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমাকে স্পিকার নির্বাচনের যে সিদ্ধান্ত এসেছে, সে গুরুদায়িত্বের প্রতি মনোযোগ দিয়ে আমি সব সময় দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। সমালোচনা যা-ই থাকুক না কেন, স্পিকার হওয়ার পর কোনো অসুবিধার মোকাবেলা করিনি। সবার কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। সে জন্য তাঁদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

স্পিকার হিসেবে প্রথম মেয়াদকাল?
২০১৩ সালের এপ্রিলে যখন দায়িত্ব নিই, জুন মাসের প্রথম অধিবেশনটিই ছিল বাজেট অধিবেশন। সে জন্য মাসখানেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমি স্পিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত তত্কালীন বিরোধী দল বিএনপি সংসদে আসত না। দীর্ঘ সময় তারা সংসদ বর্জন করেছিল। মধ্যবর্তী এক মাসে নানা মিডিয়া থেকে আমাকে প্রশ্নই করা হয়েছে—সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলকে আনতে পারবেন? তারা আসবে? আপনি তাদের আহ্বান জানাবেন? আমি তাদের আহ্বান জানিয়েছি, ‘আপনারা সংসদে আসুন। আমি আপনাদের সমান সুযোগ দেব। কোথাও সমস্যা হবে না। ’ আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর কিন্তু বিএনপি বাজেট অধিবেশনে এসেছিল। ৯ মাস দায়িত্ব পালনের পর তো নির্বাচনে যেতে হলো। এরপর ২০১৪ সালে আমি আবার দশম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হই। এই মেয়াদে প্রায় চার বছর জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছি।

সংসদ পরিচালনা করা কতটা চ্যালেঞ্জের?
আমি এ পর্যন্ত পাঁচটি বাজেট সেশন পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছি। অন্যান্য সেশন তো ছিলই। কাজেই প্রথমদিকে যতটা না অভিজ্ঞতা ছিল, সময়ের প্রবাহে বা সংসদ পরিচালনা করতে করতে অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি। যত অভিজ্ঞই হোন, যত বয়স্কই হোন না কেন, যেকোনো স্পিকারের জন্য সংসদ পরিচালনা করা কিন্তু চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ এটি খুব স্পর্শকাতর একটি রাজনৈতিক ফোরাম। সরকারি, বিরোধী, স্বতন্ত্রসহ নানা রাজনৈতিক বর্ণের মানুষকে এখানে এক জায়গায় সমন্বয় করে সংসদ পরিচালনা করতে হয়। ফলে মতপার্থক্য থাকেই। তাঁরা সবাই একমত হয়ে এখানে কখনোই কাজ করেন না। সেগুলোকে সমন্বয় করে সংসদ পরিচালনা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তার পরও আমার মনে হয়, স্পিকারের ধৈর্য লাগে, সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধির ওপর ভালো দক্ষতা থাকতে হয়। তা না হলে ন্যায্যভাবে সংসদ পরিচালনা করা যায় না। অনেকের ক্ষেত্রে অন্যায় করে ফেলার আশঙ্কা থাকে। একজন স্পিকারকে সবার আগে নিরপেক্ষ থাকা খুব জরুরি। সংসদ পরিচালনার সময় সদস্যরা স্পিকারকে কিভাবে বিচার করছেন, সেটিও আরেকটি মূল্যায়ন। তাঁরা যখন দেখেন সময় বরাদ্দ বা কথা বলতে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সমতা বজায় রাখছেন, তখন আস্তে আস্তে স্পিকার তাঁদের আস্থা অর্জন করেন। এই কাজটিই সবচেয়ে কঠিন। সহকর্মীদের ঠিকভাবে বুঝতে পেরে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে তাদের ফ্লোর দিতে হয়। এখানে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ নেই। কাউকে পছন্দ হলো না, বক্তৃতা ভালো লাগল না, মাইক অফ করে দিলাম—এটি সঠিক আচরণ নয়। স্পিকার তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়বস্তুকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন না। প্রথম মেয়াদে এই কাজটি আমার জন্য এই কারণে আরো বেশি চ্যালেঞ্জের ছিল যে নারী হিসেবে প্রথমবারের মতো এ দায়িত্বে আসার পর আমার পারফরম্যান্সের ওপর সব নারীর মর্যাদা নির্ভর করছে—এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়েছে।

আপনি সিপিএর প্রথম নির্বাচিত চেয়ারপারসন।
২০১৪ সালের অক্টোবরে কনমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ারপারসন পদে নির্বাচিত হয়েছি। এই দায়িত্বে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত থাকব। এখানেও আমি প্রথম নারী স্পিকার। কমনওয়েলথভুক্ত ৫২টি দেশের সংসদ ও বহু দেশের প্রাদেশিক পার্লামেন্ট মিলে সিপিএতে ১৮০টি সংসদের সদস্যরা আছেন। এই সংস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা অনেক ধরনের অনেক কাজ করি। বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান, তাঁরা কিভাবে তাঁদের সংসদকে আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করবেন, গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জগুলো কিভাবে মোকাবেলা করবেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ অনেক কিছুতেই আমাকে নেতৃত্ব দিতে হয়। কাজ থাকলে সিপিএর সদর দপ্তর লন্ডনে যেতে হয়। আফ্রিকা, জিব্রালটারসহ বিভিন্ন অঞ্চল, অস্ট্র্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশ, ভারতের ইন্দোর, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন প্রদেশে সিপিএর কাজের সূত্রে আমি গেছি।

সিপিএর আর কোনো কার্যক্রম?
কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, আইনের শাসনকে সুদৃঢ় করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিপিএর জনপ্রিতিনিধিরা কাজ করে থাকেন। সব ধরনের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু বিভিন্ন দেশের সংসদগুলো কিভাবে কাজ করতে পারে, জনগণের জন্য কাজ করা সংসদ সদস্যরা তাঁদের কণ্ঠস্বর কিভাবে বিভিন্ন জায়গায় তুলে ধরতে পারেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের উন্নয়নে তাঁদের ভূমিকাকে সুচারুভাবে তুলে ধরা, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশগুলোকে রক্ষা করার উপায়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, নারী উন্নয়ন, লিঙ্গ সমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সংসদ সদস্যরা কিভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন সে কার্যক্রমগুলোকে আমরা প্রাধান্য দিই। তরুণ সমাজের চিন্তাভাবনাকে সংসদ সদস্যদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে একীভূত করা আমাদের আরেকটি বড় কাজ। সে জন্য আমার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ‘সিপিএ’ শাখা থেকে আমরা প্রথমবারের মতো একটি বিশেষ কর্মসূচি শুরু করেছি। এটির নাম ‘সিপিএ ইয়ুথ রোড শো অন পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসি’। এর অধীনে জাতীয় সংসদে আমি তিনটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের জাতীয় সংসদে এনেছি। সংসদ সদস্যরা তাদের সঙ্গে মতবিনিময়সভা করেছেন। বাংলাদেশে আমি উদ্বোধন করার পর কমনওয়েলথের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। সিপিএতে কার্যক্রমটি চলমান আছে। এ ছাড়া আমার উদ্যোগে সিপিএতে আরো অনেক কার্যক্রম চালু আছে। যেমন ‘লেকচার সিরিজ’-এ নানা দেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সংসদ সদস্যদের সামনে বক্তৃতা করেন। সংসদের কার্যক্রম আরো ভালোভাবে বোঝা, সেগুলোর আরো চর্চার জন্যও আমাদের নানা উদ্যোগ আছে।

বাংলাদেশের স্পিকার ও সিপিএর চেয়ারপারসন হিসেবে নানা দেশে যেতে হয়।
অবশ্যই, সেসব জায়গায় আমি অনেক সম্মান পাই, বিভিন্ন দেশে আমার অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে। স্পিকার হিসেবে দুবার ভারতে গেছি। ২০১৩ সালে তাঁরা আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলেন। মীরাকুমার তখন ভারতের প্রথম নারী স্পিকার। ২০১৪ সালেও গেলাম। তখন সুমিত্রা মহাজন স্পিকার। তাঁর সঙ্গেও আমার খুব হূদ্যতা আছে। সুমিত্রা মহাজনের সঙ্গে আরো অন্তরঙ্গতার কারণ হলো সিপিএতে আমরা একসঙ্গে কাজ করি। হালিমা ইয়াকুব সিঙ্গাপুরের নারী স্পিকার ছিলেন। তাঁর সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক আছে। কয়েক দিন আগে ভিয়েতনামের পার্লামেন্টের আমন্ত্রণে সে দেশে গিয়েছিলাম। সেখানেও নারী স্পিকার। নেপাল, রাশিয়া ও উগান্ডাসহ অনেক দেশেই নারী স্পিকার আছেন। তাঁদের সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক আছে।

আপনার সন্তান?
আমার দুই ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে লামিসা শিরীন হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। এখন সে নিউ ইয়র্কে চাকরি করে। ছেলে সৈয়দ ইবতেশাম রফিক হোসাইন সানবিমস স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

অবসর কিভাবে কাটে?
পুরনো দিনের বাংলা গান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান ভালো লাগে। গানের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলে যাই। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা আমার একজন প্রিয় শিল্পী। শাড়ি কিনতে ও পরতে ভালো লাগে। টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি, জামদানিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অবসরে রান্না করি। পদাতিক প্রতিবছর আমার শ্বশুরের নামে নাট্যোত্সব করে, আমি অতিথি হিসেবে যাই, নাটক দেখি। একসময় খুব কবিতা আবৃত্তি করতাম। এখন সময় পাই না। তার পরও অবসরে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ‘কৃপণ’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ থেকে আবৃত্তি করি।

[২ আগস্ট ২০১৭, স্পিকারের বাসভবন, জাতীয় সংসদ ভবন এরিয়া, আগারগাঁও, ঢাকা]


মন্তব্য