kalerkantho


দেশকে কিছু দিতে চেয়েছি

বর্ণাঢ্য জীবন তাঁর। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছেন। তার আগে বিভিন্ন জেলায় প্রশাসক হিসেবে ছিলেন। আইডিবি, এসকাপসহ বিভিন্ন বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানেও বাংলাদেশের হয়ে গুরুত্বপূণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ ইনাম আহমদ চৌধুরীর জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দেশকে কিছু দিতে চেয়েছি

রাজনীতিতে ঝুঁকলেন কিভাবে?

১৯৫৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন বোর্ডের পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলাম। তখন আলাদা কোনো বিভাগ ছিল না।

এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। তখন তো উত্তপ্ত সময়। রাজনীতিতে যোগ দিলাম। ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হলাম। কলেজের প্রতিনিধি হিসেবে পুরনো ঢাকার ২২ সোয়ারীঘাটের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কর্মপরিষদের আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিলাম। ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হলে ঢাকা কলেজে ইউনিয়নের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলাম। ১৯৫৩ সালে করাচিতে যে স্টুডেন্টস কনফারেন্স হয়েছিল, তাতে ব্যক্তিগত আগ্রহে ও খরচে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের সঙ্গী হিসেবে গিয়েছিলাম। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৫৩ সালে আমাদের কলেজে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নিলাম। অধ্যক্ষ আপত্তি জানালেন। নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ হলো। আশপাশের বাড়ি থেকে ইট, সুরকি এনে দারোয়ানরা মিনার তৈরির জায়গায় যেতে দিত না, ইডেনের আইএসসির মেয়েরা আমাদের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন, তাঁদের হাতে ইট দিয়ে দিতাম, তাঁরা গাঁথুনি দিয়ে দিতেন। এভাবে মিনারটি করা হলো। গুলিস্তান সিনেমা হলের পেছনে তত্কালীন ব্রিটানিয়া হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করেছিলাম। সেখানে প্রথমেই মায়াকোভস্কির কবিতা আবৃত্তি হলো। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি আমাদের সেই অনুষ্ঠানেই ১৯৫৩ সালে প্রথম গাওয়া হলো। প্রথম সুর দিয়েছিলেন আবদুল লতিফ। এসব সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে আমাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো। গাফ্ফার চৌধুরী, বশির হুসেইনও ছিলেন। কলেজের অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান চৌধুরী আত্মীয় ছিলেন। তিনি ডেকে বললেন, ‘তুমি প্রতিভাবান ছেলে, কেন জীবন নষ্ট করবে? তার চেয়ে এসব ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার যোগসূত্র হয়ে গেছে—নোট দিয়ে দাও, তাহলে সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে তোমাকে টিসি দিয়ে দেব। অন্য কলেজে, কলকাতায় বা লাহোরে পড়তে পারবে। কেউ জানবে না। ’ এর কিছুদিন পরেই নিউ ইয়র্কের হেরাল্ড ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘ইয়ং পিপলস সেমিনার’ নামের একটি সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। সেখানে ভালো ছাত্র, বিতর্কে সেরা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ভালো ইত্যাদি কারণে আমার নামটি প্রস্তাবিত ছিল। তিনি বললেন, ‘সেই সম্ভবনাও থাকবে। ’ তবে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এমন গর্হিত কাজ করতে পারি না বলে জানিয়ে দিলাম। আমার সংসদে এনায়েত উল্লাহ খান সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছেন এমন আরো অনেকে ছিলেন।   আমাদের ছাত্র সংসদ খুব ক্রীড়াশীল ছিল। এরপর কলেজে আন্দোলন হলো এবং কিছুদিন পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো। ফলাফল কোনো দিন খারাপ করিনি। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিলাম বলে মানবিক বিভাগ থেকে ১১তম স্থান অধিকার করেছিলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কী রাজনীতি করেছেন?

অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলাম। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের (এস এম) ছাত্র সংসদের জয়েন্ট সেক্রেটারি নির্বাচিত হলাম। ছাত্র ইউনিয়নেরও সদস্য ছিলাম। তখন একে ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বলা হতো। প্রথম ছাত্র সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাইস প্রেসিডেন্ট, মাহবুব আনাম ও আমি জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলাম। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে না জড়িয়ে আমরা ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতাম। তখন নানা কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ইকনোমিকস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি ছিলাম। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জহির রায়হান। এসএম হলে অনেক নাটক মঞ্চস্থ করেছি। তখনই মেয়েরা মেয়েদের ভূমিকায় অভিনয় করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ফলে মুখ ও মুখোশ ছবিতে মেয়েরা অভিনয় করেছেন। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু খুকি (জহরত আরা) এই ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁরা আমাদের হলের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছেন। আমরা বিতর্ক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতাম। আমাদের হল, কার্জন হলে নাটকের আয়োজন করতাম। এসএম হলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আজীবন সম্মাননা দিয়েছিলাম।

 আইনেও তো পড়েছিলেন?

অর্থনীতিতে অনার্স পাস করেছিলাম। তখন এমএ ও এলএলএম ডিগ্রি একসঙ্গে নেওয়া যেত। আইন পড়ার খুব আগ্রহ হলো। মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। বিএ সিদ্দিকী পরে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তিনি অ্যাডভোকেট জেনারেল থাকার সময় আর্টিকেল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করেছি। পরে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হলে, কামাল উদ্দিন হুসেইনের অধীনে কাজ শুরু করলাম। তিনিও প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। রেকর্ড মার্কস নিয়ে এলএলএম পাস করেছি। তবে পরে রাজনীতি বা আইন কোনোটাকেই পেশা হিসেবে নেওয়া হলো না। তখনকার বামপন্থী রাজনীতি আমাকে আকর্ষণ করেছিল। তবে একদিন ভোরে আমার এক বান্ধবী বাড়িতে এলেন। এখন মারা গেছেন। তিনি বললেন, তোমার চিন্তাধারার মধ্যে রোমান্টিসিজম আছে। তবে এগুলো ঠোকর খেয়ে ভেঙে যাবে। তোমার মতো মেধাবী ছেলে হয় সিভিল সার্ভিসে যোগ দাও বা আইন পেশায় যাও। এভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে তো কিছুদিন পরেই শেষ হয়ে যাবে। এই আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল।

আইন পেশায় এলেন না কেন?  

আব্বা গিয়াসউদ্দিন আহমদ চৌধুরী তখন রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সেখানে রাজস্বসংক্রান্ত মামলাগুলো মিটমাট করা হতো। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের বিখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহির ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি একদিন বাসায় এলেন। বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক সিদ্দিকী সাহেবের কাছে আপনার ছেলের খুব প্রশংসা শুনলাম। আইনে পড়ালেখা শেষ করে সে করাচি এসে আমার সঙ্গে থাকুক। তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইন সম্পর্কে ধারণা দেব। এরপর ব্যারিস্টারি পাস করবে। কথাগুলো শুনে খুব উত্সাহ হলো। তিনি আরেক দিনও এলেন। আম্মাকে (রফিকুন্নেসা খাতুন চৌধুরী) বললাম, ‘কত মাইনে পাব একটু জিজ্ঞাসা করুন। ’ তাঁর প্রশ্নের জবাবে তিনি খুব অবাক হয়ে গেলেন—‘বেতন? সে তো আমার সঙ্গে থাকবে!’ পরে গভীরভাবে চিন্তা করে বললেন, ‘১৩০ রুপি বৃত্তি দেওয়া হবে। ’ মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বন্ধুবান্ধবরা সবাই ৯০০, এক হাজার টাকা বেতনে ব্যাংকে যোগ দিচ্ছে, কেউ উচ্চতর শিক্ষা নিতে বিদেশে যাচ্ছে। আর আমার বেতন এত কম হবে? তখন অনেকে বললেন, সিএসপি অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে তো জুডিশিয়াল ক্যাডারেও যেতে পারবে। ১০ বছরের মাথায় হাইকোর্টের বিচারপতি হতে পারবে। সে আরো নিশ্চিত জীবন। ফলে ১৯৫৯ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিলাম এবং পরের বছর প্রশাসনে যোগ দিলাম। সে বছরই ফুলব্রাইট স্কলারশিপ পেলাম। কিন্তু সেদিকে আর গেলাম না।  

চাকরি জীবনের শুরু?

প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সিরাজগঞ্জের এসডিও হিসেবে আমাকে নিয়োগ করা হলো। ‘যমুনা’ নামের একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। কল্পনার যমুনা ব্রিজের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করা হতো। সেখানে পৌর মিলনায়তন নামে ঘূর্ণায়মান মঞ্চ তৈরি করেছি। নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করেছি। সিরাজগঞ্জের প্রথম শহর রক্ষা বাঁধটিও আমার সময়ে করা। হাটিকমরুল সড়কটি তৈরি করলাম। এসব কাজের ফলে সিরাজগঞ্জের পুরনো লোকেরা এখনো আমার কথা মনে করেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগও আছে। গভর্নর মোনেম খাঁর আমলে আবদুর রশীদ তর্কবাগিশকে একটি ডাকাতি মামলার আসামি করে গ্রেপ্তার করা হলো। আমি নিজেই তাঁর জামিন লিখে জামিন দিয়ে দিলাম। এরপর তো প্রশাসনে হুলুস্থুল শুরু হয়ে গেল। মনে আছে—জামিন আদেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টেলিফোন করা হলো। এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তখন টেলিফোন আসত। ফলে টেলিফোনের কর্মকর্তারাও কথাবার্তা শুনতে পারতেন। বাংলোতেই ছিলাম। বলা হলো—স্বয়ং গভর্নর কথা বলবেন। তিনি বললেন, ‘তাঁকে মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আপনি তাঁকে জামিন দিয়ে দিলেন?’ বললাম, ‘স্যার, জামিনের নিয়মকানুন মেনেই বিচারক হিসেবে জামিন দিয়েছি। সরকার পক্ষ যদি মনে করে সুবিচার হয়নি, তাহলে তো কোর্টে অনায়াসেই জামিনের বিপক্ষে আবেদন করতে পারেন, উচ্চ আদালতেও যেতে পারেন। তাঁর তো পালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার সিদ্ধান্ত আদালত বিচার করবেন। ’ টেলিফোনের এই বক্তব্য, গভর্নরের সঙ্গে এমন সাহসী কথাবার্তা, রাষ্ট্র হয়ে গেল। মনে হয়েছিল, এই বিখ্যাত রাজনৈতিক দলের প্রধানকে পাকিস্তান সরকার অযৌক্তিক মামলায় আসামি করে কিছুদিন হাজতে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসনের তখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। বাবা তখন ঢাকার প্রথম বাঙালি মুসলমান বিভাগীয় কমিশনার। তিনিও বললেন, ‘যা করেছ, ঠিকই করেছ। ’ সরকার এই জামিনের বিপক্ষে কোর্টে আপিল করল। তবে সেটি খারিজ হয়ে গেল। সরকার মামলা তুলে নিতে বাধ্য হলো। তিনি সসম্মানে মুক্তি পেলেন। আমার বিপক্ষে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে মনে হলো—সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। সেখানে দুই বছর ছিলাম।

এরপর কোথায় বদলি হলেন?

ঢাকায় সমবায় সমিতিতে ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলি করা হলো। তবে বেশি দিন ছিলাম না। ১৯৬৪ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামে এডিসি জেনারেল (এডিশনাল ডেপুটি কমিশনার) হিসেবে চলে গেলাম। তখনকার নিয়মানুসারে সেখানেও সিরাজগঞ্জের মতো পৌরসভার প্রশাসক ছিলাম। কক্সবাজারও চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় চীন ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত চট্টগ্রামে গিয়ে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আক্রান্ত হলে আমরা তোমাদের পাশে থাকব। ভয় নেই। ’ তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। সেটির প্রথম দিকের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সাইফার কোড বা গোপন সংবাদের মাধ্যমে একদিন জানলাম, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অতিথি হিসেবে একজন ভিভিআইপি আসবেন, সার্কিট হাউসে থাকবেন। পরে দেখলাম, তত্কালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী চিফ অব স্টাফ কে এম কারিয়াপ্পা এসেছেন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে তিনি কেন এলেন বোধগম্য হলো না। তবে শুনেছিলাম, তাঁর ছেলে প্যারাট্রুপার হিসেবে যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছে এবং সে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আছে। তবে সেটিকে পিডাব্লিউডির জায়গা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই দুই ফিল্ড মার্শালের মধ্যে খুব হূদ্যতা ছিল। আমাদের ওপর তাঁকে সমাদরের নির্দেশ ছিল। তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম ক্লাবে যেতেন এবং সবার পানীয়ের বিল নিজে দেবেন বলতেন। আমরা বিল দিয়ে সেটির কপি প্রেসিডেন্টের বরাবরে পাঠিয়ে দিতাম। তিনি ডা. খস্তাগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনে যেতে চাইলেন। সেখানে ঘুরে ঘুরে টিচার্স কমনরুমে গিয়ে বসলেন। মেয়েরা তাঁর অটোগ্রাফ নিল। একজন চিঠি লিখবে বলার পর তিনি ঠিকানা দিলেন—কারিয়াপ্পা, রওশন আরা, কুর্গ, ভারত। বহু বছর পর এক সাংবাদিককে এই ঘটনা বলার পর তিনি খোঁজ নিয়ে জানিয়েছিলেন, এই নামে এক শিক্ষিকা স্কুলটিতে শিক্ষকতা করতেন। তিনি আজীবন বিবাহ করেননি। হয়তো তাঁদের মধ্যে কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল।  

পরে তো ঢাকায় বদলি হলেন?

ব্রিটিশ আইসিএস অফিসার এইচ বি হ্যাচ বার্নাল ইস্ট পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের ইপি, এডিসি ছিলেন। তিনি বললেন, ‘অনেক দিন হয়ে গেল, ঢাকায় আসবে?’ ‘খুশি মনেই আসব স্যার’, বললাম। তিনি আমাকে তাঁর সচিব নিয়োগ দিলেন। তিনি থাকতেন মিন্টু রোডে, অফিস মতিঝিলে। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতেন না। সাইকেল চালিয়ে অফিসে যেতেন। পেছনে পেছনে গাড়িটি আসত। কিছুদিন পর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে এক বছরের উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে গেলাম। তখন সরকারি কর্মচারীদের অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠানোর নিয়ম ছিল। ফিরে এসে ইস্ট পাকিস্তান প্ল্যানিং বোর্ডে যোগ দিলাম। পদ ডেপুটি চিফ। ১৯৬৭ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ডিসি হিসেবে আমাকে যশোর বদলি করা হলো। এক বছরের বেশি সময় সেখানে ছিলাম। যশোর স্টেডিয়ামটি আরো বড় করেছি। জিকে প্রজেক্টেও আমার অবদান আছে। তখন আইয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। ছয় দফার বিক্ষোভ চলছে। রাশিয়ার জাতীয় দল বাংলাদেশে খেলতে এলো। তবে হরতালের কারণে ঢাকায় খেলার আয়োজন সম্ভব হলো না। বাবা তখন ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বললেন, ‘কী করি?’ এরপর যশোরের স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে খেলার আয়োজন করলাম। খেলার আগে যাঁরা শহীদ হয়েছেন এক মিনিট নীরবতা পালন করে তাঁদের শ্রদ্ধা জানানো হলো। সেই প্রথম যশোর স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক খেলা হলো। সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে জেলা প্রশাসক হিসেবে খুলনায় বদলি করা হলো।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কী ঢাকায় ছিলেন?

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা আহত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেলেন। ইস্ট পাকিস্তান ইলেকশন অথরিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। আমিও সেই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলাম বলে খুলনা থেকে বদলি নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। তখন আমরা নজরদারির মধ্যে অফিস করতাম এবং অফিসে আছি কি না প্রায়ই খোঁজ নেওয়া হতো। বেশির ভাগ পাকিস্তানি বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা পাকিস্তানীদের গণহত্যার বিপক্ষে ছিলেন, বাঙালিদের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১১ বা ১২ মার্চ আমরা ইস্ট পাকিস্তান সিএসপি অ্যাসোসিয়েশনের সভা করেছিলাম। নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তাতে অংশ নিয়েছি। রুহুল কুদ্দুসও সঙ্গে ছিলেন। সেখানে আমাদের প্রস্তাবপত্রও গৃহীত হয়েছে—আমরা মনে করি, দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। সাধারণ নির্বাচন হয়েছে এবং দেশের সংবিধান বা শাসনতন্ত্র অনুযায়ী এখানকার প্রধান রাজনৈতিক দল বিজয়ী হয়েছে, সেই দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা করা হোক। এই ক্ষমতা হস্তান্তরে যা করণীয় তাতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। আমাদের এই সাহসী প্রস্তাব বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তাতে তিনি খুব প্রীত ছিলেন। সিএসপিদের প্রতি তাঁর আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি কর্মকর্তারা দেশে ফিরে এলেন। রুহুল কুদ্দুস ফিরে এসে ১৯৭১ সালের শেষ সপ্তাহে আমাকেই প্রথম যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ দিলেন। নিয়োগপত্রটি হাতে লেখা হয়েছিল।

শিল্প ও বাণিজ্যদুই মন্ত্রণালয়েরই কাজ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের আমলে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আলাদা করা হলো। আমাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দিলেও তত্কালীন শিল্পমন্ত্রী সিরাজগঞ্জের নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ভালোভাবেই চিনতেন বলে তিনি তাঁর মন্ত্রণালয়েও কাজ করতে অনুরোধ করলেন। ফলে দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই পালন করেছি। অফিসারও তখন কম ছিলেন। তাজউদ্দীন প্রথম মিটিংয়ে বাংলাদেশের অর্থের নাম ‘টাকা’ দিয়ে সেটির মূল্যমান নির্ধারণ করলেন। স্বর্ণ বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হলো। সেই মিটিংয়ে আমরা মাত্র কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৭২ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আলোচনা, প্রয়োজনীয় খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি ছোট দল ভারত সফরে গেল। সেই দলে আমি ও আমার বড় ভাই ফারুক চৌধুরী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কিভাবে দেশে ফিরবেন সেটি নির্ধারিত হলো। এরপর তো সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করা হলো। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় আমার সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ ছিল। পাকিস্তানিদের যেসব সম্পত্তি ছিল, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—সে এলাকার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বাঙালি অফিসারকে সেটির প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। আমার কাছে সে জন্য সাইকোস্টাইলের অনেক কাগজ ছিল। সেগুলোতে লিখে দিতাম। তখন আদমজী জুট মিল ও বিভিন্ন মিলের অনেক পাট জমেছিল। আর্জেন্টিনা আদমজীর পাট কিনত। তাদের প্রতিনিধি এসে সেগুলো কিনলেন এবং আমরা কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনলাম। আগে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে ছিলাম বলে কিভাবে বাণিজ্য চুক্তি করতে হয়, সেই নিয়মও আমাদের জানা ছিল না। তখন অনেক নিয়ম-কানুন দ্রুত সব সরকারি কর্মচারীকে শিখতে হয়েছে। এম আর সিদ্দিকী বাণিজ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কাজ আরো বেড়ে গেল। তখন আমরা শুধু পাট, চামড়া, দিয়াশলাই, চা রপ্তানি করতে পারতাম। সেগুলোর বিনিময়ের সমান দরের দ্রব্য আনতে পারতাম। বিশেষত পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের এই বার্টার অ্যাগ্রিমেন্ট হতো। সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, ডিজিআর (জার্মান ডেমক্রেটিক রিপাবলিক)—এই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব চুক্তি করত। প্রায় প্রতিটি চুক্তিই আমাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের স্বীকৃতির পেছনেও আপনার অবদান আছে।

তখন চিলিতে আংটাড সম্মেলন হচ্ছিল। সেটিই আমাদের জন্য জাতিসংঘের প্রথম সংস্থার প্রথম সম্মেলন ছিল। তখনো আমরা জাতিসংঘের সদস্য নই। বাণিজ্যমন্ত্রী এম আর সিদ্দিকী ও আমি চিলির রাজধানী সান্তিয়াগাতো যাব বলে নিউ ইয়র্কে গেলাম। তবে চিলি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি বলে ভিসা পাওয়া যাচ্ছিল না। সরকারের মন্ত্রী হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে থাকা উচিত নয় বলে বাণিজ্যমন্ত্রী ফিরে গেলেন। তখন আমাদের পাসপোর্টব্যবস্থাও চালু হয়নি। একটি পার্চমেন্ট কাগজে হাতে লিখে ভিসার মতো ব্যবহার করতে দেওয়া হতো। চিলির রাষ্ট্রপতি সালভাদর আয়েন্দেকে লেখা বঙ্গবন্ধুর একটি চিঠি আমার সঙ্গে ছিল। এয়ারপোর্টে সব বুঝিয়ে বলার পর তাঁরা আমাকে চিলিতে প্রবেশের ব্যবস্থা করলেন। রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা সাচেসকে বলার পর তিনি বললেন, চিঠিটি রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করছি। তবে তিনি ভীষণ ব্যস্ত, দুই মিনিটের বেশি থাকবেন না। স্প্যানিশভাষী সমাজতান্ত্রিক এই বিপ্লবী নেতার সঙ্গে দোভাষীর মাধ্যমে আলাপ শুরু হলো। তিনি বঙ্গবন্ধুর ইংরেজি ভাষায় লেখা চিঠিটি পড়লেন। আমাকে বসতে অনুরোধ করে বাংলাদেশের কথা জানতে চাইলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বললাম। তিনিও তাঁকে শ্রদ্ধা জানালেন। এরপর বললেন, ‘আমরা আপনাদের স্বীকৃতি দেওয়া কথাটি গভীরভাবে ভাবছি। আশা করি, ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। ’ তাঁর কর্মচারী পানীয় হিসেবে কী দেবেন জানতে চাইলেন। আমি চিলির জাতীয় পানীয় পিসকো সাওয়ারের কথা বললাম। তাতে রাষ্ট্রপতি খুব অবাক হলেন। বললেন, ‘এই প্রথম চিলিতে এসেছেন?’ ‘হ্যাঁ। ’ তবে চিলিকে পাবলো নেরুদার মাধ্যমে চিনি। তাঁর কবিতা ইংরেজি অনুবাদে পড়েছি। কবিতা আবৃত্তি করে শোনালাম। তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘নেরুদা আমার বিশিষ্ট বন্ধু। ’ নোবেল বিজয়ী এই কবি তখন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত। তাঁর কর্মচারী সাচেসও আমাকে ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের বামপন্থী মন্ত্রিসভায় চীন ও রাশিয়াপন্থী কমিউনিস্ট নেতারা আছেন। রাশিয়াপন্থীরা আপনাদের স্বীকৃতি দিতে কোনো সমস্যা নেই। তবে চীনাপন্থীরা অধিকতর সাবধানী। ’ তিনি এখানে যে চীনা প্রতিনিধিদল এসেছে, তাদের সঙ্গে আলাপ করার অনুরোধ করলেন। তবে চীনারা খুবই সাবধানে ছিলেন। তেমন কোনো কথা না বলে হাত মিলিয়েই চলে গেলেন। তখন বুদ্ধি করে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। কয়েকজন ব্যাচমেটের সঙ্গেও দেখা হলো। তাঁদের সাহায্য চাইলাম। তাঁরা আলোচনা করে জানালেন, চীনের প্রতিনিধিদের কাছে তাঁরা তাঁদের অনাপত্তির কথা জানাবেন। তবে প্রস্তাবটি তোলা হলে টেকনিক্যালি আপত্তির কথা বলবেন। নাম বলতে চাই না এমন অনেক দেশের কাছ থেকে তখন সমর্থন পাইনি। বুলগেরিয়ার পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে লুখানভের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁর সঙ্গে গাঢ় পরিচয় হওয়ার পর তিনি সমর্থনের জন্য নাম প্রস্তাব করলেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের নাম প্রস্তাব করা হলে আয়েন্দে বলেন, ‘কোনো আপত্তি দেখছি না, বাংলাদেশকে আংটাডের সদস্যপদ দেওয়া হলো। ’ এবার পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা জাতীয় পতাকা তুলে এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে—এই বলে আপত্তির কথা নোট করে রাখতে বললেন। আয়েন্দে নোট করার কথা বললেন। চীনও পতাকা তুলে পাকিস্তানকে সমর্থন দিল। এরপর চিলির রাষ্ট্রপ্রধানের অনুরোধে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমি বাংলাদেশের পক্ষে বিবৃতি দিলাম। আমাদের সদস্যপদ গৃহীত হলো। নেরুদার জন্মশত বর্ষ উদযাপনের সময় আমাকে তাঁরা মনে করে আবার আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁদের রাষ্ট্রপতি আয়েন্দের আবক্ষমূর্তি উন্মোচন করা হয়েছিল। তাঁকেও শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হয়েছিল।

এর পরের দায়িত্ব?

এরপর আমাকে বোর্ড অব এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর প্রধান নিযুক্ত করা হলো। তখন অনেক বাণিজ্য ও রপ্তানি চুক্তি করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে চীনাদের সঙ্গে প্রথম বাণিজ্যচুক্তির দায়িত্ব পেলাম। তবে তখনো তারা আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। সিদ্ধান্ত হলো—চারজনের একটি ছোট প্রতিনিধিদল রেঙ্গুন ঘুরে চীনের ক্যান্টনের বাণিজ্য মেলায় যাবে। কোথাও আমাদের পরিচয় দেওয়া যাবে না। আমিই একমাত্র সরকারিভাবে কথা বলব। বাসায়ও রেঙ্গুন যাচ্ছি বলে গেলাম। রেঙ্গুন থেকে যে পাসপোর্ট পেলাম সেখানে পেশার ঘরে লেখা—আমদানি-রপ্তানি। আমরা মেলায় গিয়ে যোগাযোগ করলাম। প্রথম দিন তাঁরা সাড়া দিলেন না। পরদিন একজন প্রতিনিধি এসে বৈঠক করলেন। তিনি জানালেন, রাজধানী পেইচিং থেকে এসেছেন। আমাদের চুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলাম। তিনি উল্টো প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা তো ভারতের নিয়ন্ত্রণে আছেন। আপনারা কী স্বাধীন দেশ?’ বললাম, ‘আপনার সঙ্গে যোগাযোগের অর্থই হলো আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। বহু দেশ এমনকি জাতিসংঘও আমাদের স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ’ সন্তুষ্ট হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এ বিষয়টি সরকারপ্রধান জানেন?’ ‘নিশ্চয়ই, তাঁর নির্দেশেই তো এসেছি। এ ছাড়া তো আমার আসার ক্ষমতা নেই। ’ তাঁদের সঙ্গে পেইচিং ও ক্যান্টনে চারটি চুক্তি হলো। পণ্যের দাম ও পরিমাণ পরে নির্ধারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এ খবরে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। এটি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে।

লন্ডনেও তো কাজ করেছেন?

১৯৭৫ সালের ১০ বা ১১ আগস্ট রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে টেলিফোন করে জানানো হলো—ইকনোমিক মিনিস্টার হিসেবে আমাকে লন্ডনে বদলী করা হয়েছে। খুব অবাক হলাম। লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসের এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। পরে ফাইলও দেখার সুযোগ হয়েছিল—বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন, ‘ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে আমাদের একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা প্রয়োজন। ইনাম আহমদ চৌধুরীকে ওই পদে নিযুক্ত করা হইল। ’ ছয় বছর ছিলাম। কমনওয়েলথের কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টও হয়েছি। বৈদেশিক বাণিজ্য, ডাক যোগাযোগ দেখতাম। পর পর তিন বছর ইকোনমিক রিপ্রেজেন্টিটিভ ইন লন্ডনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশ বিমান যেন হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে সেই অনুমতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পিটার শোর সঙ্গে দেখা করে আদায় করেছিলাম।

এসকাপের জীবন? 

সেখানে বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া আমাকে ইকনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকে (এসকাপ) নিয়ে গিয়েছিলেন। পদবি ছিল সেক্রেটারি অব দ্য কমিশন অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট। তিনি ছিলেন প্রধান, আমি তৃতীয়। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ এসকাপের অনেক সদস্য রাষ্ট্র সফর করতে হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলোতেও গিয়েছি। ভানুয়াটুতে এসকাপের অফিস স্থাপন করেছিলাম। আমরা বাঙালিরা সেখানে ‘পূরবী’ নামের সংগঠন তৈরি করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করতাম। সংগীত সন্ধ্যা, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীসহ নানা উত্সব ও অনুষ্ঠান করেছি। আমি এর উপ-প্রধান ছিলাম। ঢাকায় পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে এসকাপের অফিসও করেছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম, ইন্টারন্যাশনাল জুট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস ঢাকায় করা হোক। বাংলাদেশকে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করতে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলাম। যেখানেই কাজ করেছি, দেশকে কিছু দিতে চেয়েছি। সেখানে সাড়ে পাঁচ বছর ডেপুটেশনে ছিলাম।

এরপর তো ঢাকায় চলে এলেন?

মাস দুয়েক মন্ত্রী পরিষদ সচিব ছিলাম। এরপর পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সচিব হলাম। সেখান থেকে নৌ মন্ত্রণালয়ে। এ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘নৌ’ নামটি আমিই যুক্ত করেছি। লন্ডনে থাকার সময় ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। সেখানে পুরনো ও নতুন নৌ পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। তাঁরা বিবাদ মেটাতে ও সংগঠনটিকে আরো বেগবাগ করতে আমাকে প্রেসিডন্ট হওয়ার অনুরোধ করলেন। ১৯৮৮-৮৯ সাল পর্যন্ত আইএমওর প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেক আইন করার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছি। উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইকোনমিক রিলেশনস ডিভিশনের সেক্রেটারি হিসেবে বদলি করা হলো। তখন বাজেট প্রণয়ন, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বড় বড় সংস্থার সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়েছে। সাড়ে চার বছর ছিলাম।

ঢাকার আইডিবি ভবনটি তো আপনার করা?

এরপর সরকার আমাকে জেদ্দায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্ট, অপারেশনস নির্বাচিত হলাম। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ছিলাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে অনেক মুসলিম দেশের জন্ম হলো। তাদের আইডিবিতে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার ওপর ছিল। সে কাজে সফল হয়েছি। আমার উদ্যোগেই ঢাকার আইডিবি ভবনটি তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তিবিষয়ক কোর্সটিকে আরো সম্প্রসারিত করতেও ভূমিকা রেখেছি। এ ছাড়া আইডিবির টাকায় বাংলাদেশে অনেক সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করেছি। এ দেশের বেশির ভাগ সাইক্লোন শেল্টার আইডিবির টাকায় করা। ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে এলাম। তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল তখন আমার অধীনে কাজ করেছেন। সেটি তিনি মনে রেখেছেন এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে এ দেশ সফরে এসে আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেছিলেন। তখন বলেছিলাম, আমাদের জন্য আপনার দেশের ভিসা সহজ করে দিলে ভালো হয়। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বিমান যোগাযোগ হলে আমরা সহজেই ইউরোপে যেতে পারি। তিনি দেশে ফিরেই সেগুলো বাস্তবায়ন করেছিলেন। বিএনপি সরকারের সময় প্রাইভেটাইজেশনের কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলাম। ৪৬টি প্রধান শিল্প-কারখানাকে বেসরকারি খাতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম। রূপালী ব্যাংককেও বেসরকারি খাতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলাম। ব্যাংকটি তখন খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। সৌদি বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত চড়া দামে ব্যাংকটি কিনতে রাজি হয়েছিলেন এবং নানা ধরণের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তখন হরতাল, ধর্মঘট, সহিংসতা চলছিল। পথে তাঁদের গাড়ি আক্রান্ত হওয়ার পর ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। রিয়াদে গিয়ে জানালেন, অবস্থার পরিবর্তন না হলে আমরা প্রত্যাবর্তন করবো না।

শ্রুতলিখন : রবিউল হোসাইন
(১৩ আগস্ট ২০১৭, বনানী, ঢাকা)


মন্তব্য