kalerkantho


বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের আমি সংগঠিত করতে পেরেছি

১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের আমি সংগঠিত করতে পেরেছি

অভিনেতা হিসেবে অসাধারণ মেধা ও সম্ভাবনা থাকলেও সেদিকে মনোযোগ দেননি; বরং এ দেশের নাট্যদলগুলোকে সংগঠিত করেছেন। নাট্যকর্মীদের শিক্ষিত ও পেশাগত উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করে নাট্যকর্মীদের অধিকার আদায় করেছেন। বাংলাদেশের একমাত্র নিয়মিত নাটকের পত্রিকা ‘থিয়েটার’ ও নাট্যদল ‘থিয়েটার’র প্রধান রামেন্দু মজুমদারের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান 

 

নাট্যদল থিয়েটারের শুরু কিভাবে হয়েছিল?

১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির তদানীন্তন পরিচালক কবীর চৌধুরী সাহেবের কক্ষে বসে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক নাট্যকর্মী—আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসী মজুমদার, আমি, ইকবাল বাহার চৌধুরী, আহমেদ জামান চৌধুরী, নিতুন কুণ্ডু মিলে ‘থিয়েটার’ করলাম। আমাদের দুটি উদ্দেশ্য ছিল—দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক করা, অন্যটি নাটকের পত্রিকা প্রকাশ।

 

পত্রিকা প্রকাশ করতে পারলেও নাটক করতে দেরি হলো কেন?

আমরা কাজে এগিয়ে গেলেও নাটক করতে দেরি হওয়ার কারণ আবদুল্লাহ আল মামুনের অনুপস্থিতি। তিনি আমাদের মূল নির্দেশক হয়েও সিনেমা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে আমরা এগোতে পারলাম না। ১৯৭৪ সালের একুশে বইমেলায় এখন যেখানে প্যান্ডেল টানিয়ে একুশের অনুষ্ঠানমালা করা হয়, সেখানে মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত ‘কবর’ নাটক দিয়ে আমাদের শুরু হলো। একুশের আবেদন প্রচণ্ড, ‘কবর’-এরও আলাদা আবেদন আছে, খোলা মাঠের মধ্যে নাটকটি হয়েছিল বলে প্রচুর দর্শকের সমাগম হলো। এর পর থেকে থিয়েটারের নিয়মিত নাটকের প্রদর্শনী শুরু হলো। আর দলের প্রথম নাটকটি ছিল আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’।

 

এই পর্যন্ত আপনাদের কত নাটক প্রদর্শিত হয়েছে?

থিয়েটার এ পর্যন্ত ৪৬টি নাটক করেছে, সেগুলোর এক হাজার ছয় শর বেশি প্রদর্শনী হয়েছে। বাংলাদেশের ২০-২৫টি জেলা শহরে আমাদের দল নাটক নিয়ে গিয়েছে। এখনো আমরা নিয়মিত নাটক করে চলেছি। আমাদের বেশির ভাগ নাটকই মৌলিক, সমসাময়িক জীবন নিয়ে ঘেরা। তবে বিদেশি নাটকের অনুবাদ, রূপান্তর করেও আমরা নাটক করেছি। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসকে নাট্যরূপ দিয়েছি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছি। বিভিন্ন সময় বিদেশে নাটকের প্রদর্শনী করেছি। যেমন—এ বছরের ১৬ মার্চ থিয়েটার অলিম্পিকসে আমাদের নাটকের প্রদর্শনী হয়েছে। প্রথমে আগরতলা ও পরে দিল্লিতে নাটকের প্রদর্শনী করেছি। আগেও কলকাতা, দিল্লিতে নাটক করেছি।

 

বাংলা নাটক জনপ্রিয় করতে থিয়েটারের এই আসাধারণ ভূমিকার নেপথ্যের নায়ক কে?

প্রধানত আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনিই আমাদের দলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন। সমসাময়িক বিষয় নিয়েই তিনি বেশি নাটক লিখেছেন। আমাদের নাট্যকর্মীরা নাটকগুলো আগ্রহের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন। মামুনের আরেকটি বড় গুণ ছিল, তিনি দ্রুত নাটক লিখতে পারতেন। দলের শক্তি অনুযায়ী আমরা যে ধরনের নাটকে অভিনয়ে আগ্রহী, তিনি আমাদের জন্য সে ধরনের নাটক লিখেছেন। নিজে অভিনেতা ছিলেন, মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে নারী চরিত্র, সেট ইত্যাদি বিষয়ের প্রতিও খুব খেয়াল রাখতেন। বাহুল্য যেন না থাকে, কোথাও নাটক করতে যেন অসুবিধা না হয়—সেসব দিকেও খুব মনোযোগী ছিলেন। সে কারণে আমাদের অভিনীত বেশির ভাগ নাটকই তাঁর লেখা। ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ ইত্যাদি বিখ্যাত নাটক তো তাঁরই রচনা। বাংলাদেশের আনাচকানাচে তাঁর নাটকের প্রচুর প্রদর্শনী হয়েছে। তাঁর লেখা, অভিনয়, নির্দেশনার গুণে থিয়েটারের নাটকগুলো ১৯৭০, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এত জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁকে হারিয়ে আমরা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। বলতে গেলে, এখন আমাদের দলে নাটক লেখার মতো নাট্যকার নেই, বাইরের নাট্যকারদের নাটক করতে হয়। তবে আস্তে আস্তে পরবর্তী প্রজন্মের নির্দেশক তৈরি হচ্ছেন। মামুন টেলিভিশন, মঞ্চ, সিনেমা, রেডিও—সব কিছু মিলিয়ে বহুমুখী শিল্পপ্রতিভা ছিলেন। সব সামাল দিয়ে নিজে অভিনয় করেছেন। মঞ্চই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা, নাট্যকার হিসেবে পরিচিত হতেই তিনি সবচেয়ে পছন্দ করতেন। ক্রিয়েটিভ মানুষরা একসঙ্গে থাকতে গেলে বিরোধ ঘটে। তবে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। এ কারণেই থিয়েটারে তিনি নাট্যকার ও নির্দেশক ছিলেন। আমি সাংগঠনিক ও অন্যান্য দিক সামলেছি। এভাবেই থিয়েটার চলেছে।

 

বাহাত্তরে থিয়েটার পত্রিকার শুরু কেন মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে করেছিলেন?

১৯৭২ সালের নভেম্বরে আমরা বাংলাদেশের প্রথম নাটকের পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। মুনীর চৌধুরীকে আমরা ‘নাট্যগুরু’ হিসেবে মানি। সে সময়ে আমরা যাঁরা নাটক করতাম, তাঁদের কাছে তিনি ‘আদর্শ’ ছিলেন। তাঁর ওপর সংখ্যা করলে পত্রিকাটি যুগোপযোগী হবে মনে করে আমরা তাঁর ওপর আগে ছাপা হয়েছে, এমন লেখা নিলাম, বিজ্ঞজনদেরও তাঁকে নিয়ে লিখতে আহ্বান জানালাম। এভাবেই ‘মুনীর চৌধুরী স্মারক সংখ্যা’ প্রকাশিত হলো। এর পর থেকে আজতক নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

 

ব্যক্তিগত মুনীর চৌধুরীকে আপনি কিভাবে দেখেন?

শেষের দিকে তিনি আমার প্রায় বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও আমি তাঁর ছাত্র, তবে সরাসরি নই। তিনি বাংলার নামকরা অধ্যাপক, আমি ইংরেজির ছাত্র। আমার প্রতি তিনি খুবই স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর বিভিন্ন কাজকর্মে তিনি আমাকে সঙ্গে নিতেন, কোথাও যেতে হলে নিয়ে যেতেন। আমি তাঁর আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলাম। নতুন নাটক লিখলে তিনি পড়ে শোনাতেন। মুনীর চৌধুরীর এবং তাঁর স্ত্রী লিলি চৌধুরীর পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে আমি চলে এসেছিলাম।

 

বিটিভির প্রথম নাটকের নায়ক হয়েও কেন সাংগঠনিক দিকে জড়িয়ে গেলেন?

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অভিনয়, সাংগঠনিক কাজ—দুটি কাজই বেশি পরিমাণে করেছি। কিন্তু এই থিয়েটার দল গঠনের পর দেখেছি, যেসব নবীন ছেলে-মেয়ে মঞ্চে আসেন, তাঁরা শুধু অভিনয় করতে চান। দলের কাজ করতে চান না। তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে সাংগঠনিক দিকে জোর দিলাম। নিজে কাজ করতাম, আমাকে দেখে অন্যরাও কাজ করতেন। তবে সাংগঠনিক কাজ করতে করতে অভিনয়ের প্রতি আমার মনোযোগ কমে গেল, অভিনয় কম করেছি।

 

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করলেন কেন?

সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়েই নাট্যকর্মীদের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চেয়েছি। অনেকেই তখন বলেছেন, এত দলের সমন্বয়ে সংগঠন টিকবে না। কিন্তু আমি বলেছিলাম, চেষ্টা করে দেখব। ‘থিয়েটার’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে এ দেশের নাট্যদলগুলোর সভা আহ্বান করলাম। প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হলো—এ ধরনের আরেকটি সংগঠন হতে পারে। আরো বড় পরিসরে দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের জন্য আরেকটি বড় সভা আহ্বান করলাম। সে দ্বিতীয় সভার মাধ্যমে ১৯৮০ সালে আমরা ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’ গঠন করলাম। ১৯৮১ সালে আমরা ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলন করলাম। তখন বোধ হয় ৬২টি দল সদস্য হয়েছিল। আমি প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ সেক্রেটারি জেনারেল। এভাবেই ফেডারেশনের যাত্রা। এখন ফেডারেশনে প্রায় ৩০০টি সদস্য নাট্যদল রয়েছে। ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদে চার বছর দায়িত্ব পালন করেছি।

 

সেখানে আপনার অবদান?

আমি মনে করি, বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের আমি সংগঠিত করতে পেরেছি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লাসহ দেশের যেসব স্থানে নাট্যকর্মীদের সংগঠিত করতে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, আমি গিয়েছি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন যেন এ দেশের নাট্যকর্মীদের শক্তি হয়ে উঠে, সে জন্য আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করেছি। বাস্তবেও তা-ই হয়েছে। ‘অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন’ ছিল। এই আইনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলেছি। এ দেশের নাটকের ওপর ‘প্রমোদ কর’ আরোপ করা হতো। এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন গড়ে তুলে খুব সফলভাবে আমরা এই দুটি কালাকানুন তুলে দিতে পেরেছি। নাট্যকর্মী, নাট্যামোদীদের জন্যই নয়, এ দেশের সংস্কৃতির বিকাশের জন্যও প্রয়োজনীয় এই অর্জনগুলো মূলত গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের মাধ্যমে হয়েছে।

 

আইটিআইতে আমাদের যাত্রা কিভাবে শুরু হলো?

১৯৮১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে থিয়েটার ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক নিয়ে গেল। সেখানেই ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো। তারা সেই তৃতীয় বিশ্ব নাট্যোৎসবের আয়োজক ছিল। আইটিআইয়ের মহাসচিবকে আমি বলেছিলাম, “আমার দেশে ‘আইটিআই’র কেন্দ্র করতে চাই।” তিনি বললেন, ‘আপনারা তো আইটিআইয়ের কেন্দ্র করতে পারবেন না। কারণ এটি পেশাদারদের সংগঠন, আপনারা তো অপেশাদার, শৌখিন নাট্যকর্মী।’ উত্তরে বললাম, ‘আমরা অপেশাদার, শৌখিন নাট্যকর্মী ঠিকই, কিন্তু আপনাদের পশ্চিমা সংজ্ঞার অপেশাদার নই; ভালোবাসা থেকে আমরা পেশাদারি নিয়ে অভিনয়সহ অন্যান্য কাজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসুবিধার কারণে একে পেশা হিসেবে নিতে পারি না।’ তার পরও আমার আগ্রহে তাঁদের সঙ্গে মাস ছয়েক পত্র বিনিময় হলো। অবশেষে আইটিআই কর্তৃপক্ষ রাজি হয়ে সিদ্ধান্ত দিল, বাংলাদেশে আইটিআই সেন্টার করতে পারেন। প্রথম পাঁচ বছর আমরা অ্যাসোসিয়েট সেন্টার (সহযোগী কেন্দ্র) হিসেবে কাজ করেছি। তারপর থেকে পূর্ণ সদস্য। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমি প্রায় ৩০ বছর আইটিআইয়ের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলাম।

 

নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে আপনার ভূমিকা?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ‘পারফরমিং আর্টস অর্গানাইজেশনে’ ৯২টি দেশ আছে। মঞ্চ, নৃত্য ব্যক্তিত্বদের এই সংগঠনের সঙ্গে ইউনেসকোও জড়িত আছে। এই দেশগুলোর পারফরমিং আর্টসের নানা সমস্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, সাংগঠনিক কাজ করেছি। দুই বছর পর পর আইটিআইয়ের বিশ্ব কংগ্রেস হয়। ১০টি কংগ্রেসে বাংলাদেশের হয়ে আমি যোগ দিয়েছি। আইটিআইয়ের কর্মসূচিগুলো নিয়ে আলোচনা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি। আমাদের কাজগুলো মূলত সাংগঠনিক ছিল। এ ছাড়া আমি আইটিআইয়ে তিন মেয়াদে সহসভাপতি ছিলাম। দুই মেয়াদে সভাপতি ছিলাম। এখন আইটিআইতে ‘অনারারি প্রেসিডেন্ট (সাম্মানিক বিশ্ব সভাপতি)’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

 

বাংলাদেশ সেন্টারে আপনারা কী কী কাজ করতে পেরেছেন?

বাংলাদেশ সেন্টার (কেন্দ্র) থেকে আমরা ১১টি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও নাট্যোৎসব করেছি। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো, বাংলাদেশ সেন্টার থেকে আমরা অনেক প্রকাশনা করেছি। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—আমরা ‘ওয়ার্ল্ড অব থিয়েটার’ নামে ১০ বার বিরাট ভলিউমের গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। সেসব ভলিউমে আগের দুই বছর আইটিআইয়ের সদস্য দেশগুলোর কোথায় কী নাটক হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রবন্ধ আছে। তা ছাড়া আমাদের আমন্ত্রণে যেসব বিখ্যাত নাট্যকর্মী ও গবেষক সেমিনার উৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁরা এ দেশের নাট্যকর্মীদের সঙ্গে মিশেছেন, আমাদের দলগুলোর নাটক দেখেছেন। আমাদের অভিনয়সহ সব কিছু তাঁদের মুগ্ধ করেছে। আশ্চর্য হয়ে তাঁরা প্রশ্ন রেখেছেন—অর্থ উপার্জন ছাড়া কিভাবে দিনের পর দিন আমরা এত চমৎকার নাটক করে যাচ্ছি? বিশ্বও জানতে পেরেছে, বাংলাদেশে ভালো নাটক হয়। সে কারণেও আইটিআইয়ে আমাদের ভালো অবস্থান হয়েছে।

 

আমাদের নাট্যকর্মীদের কী উন্নয়ন হয়েছে?

অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের বিরাট আকারের যোগাযোগ ঘটেছে। আমরা আইটিআইয়ের উৎসবে কিছু নাটক নিতে পেরেছি। আমাদের যাঁরা তরুণ নাট্যকর্মী আছেন, তাঁরা বিদেশের বিশ্বমানের কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। আমরা এখানে কর্মশালা করেছি, সে জন্য নামকরা বিদেশি নাট্য পরিচালকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এনে আমাদের অভিনেতা, অভিনেত্রী ও কলাকুশলীদের নিয়ে নাটক প্রযোজনা করেছি। আইটিআইয়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বের নাট্যকর্মীদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ঘটেছে। আইটিআই ‘২৭ মার্চ’ বিশ্বজুড়ে বিশ্ব নাট্যদিবস চালু করেছে। আমরাও দিবসটি পালনে নানা আয়োজন করি।

 

কেন ‘থিয়েটার স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করলেন?

আমরা দেখলাম, বাংলাদেশে নাটক শেখার জন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে বটে, নাটকের দলগুলোতে যাঁরা কাজ করতে চান এবং করেন তাঁদের সে রকমভাবে শেখার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ১৯৯০ সালে ‘থিয়েটার স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হলো। আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে এক বছরের কোর্স হিসেবে সিলেবাস তৈরি হলো। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন, মামুন উপাধ্যক্ষ, আমি সম্পাদক। এভাবেই বাংলাদেশে কোনো দলের মাধ্যমে অভিনয়ের সার্টিফিকেট কোর্স চালু হলো। প্রথম দিকে প্রতি সপ্তাহে শুক্র-শনিবার ক্লাস হতো। স্কুলটি পাঁচ-ছয় বছর চলার পর ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদল আমাদের সম্পর্কে জেনে আমাদের স্কুল ঘুরে দেখল। তারপর তারা আমাদের ডেকে বলল, স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমের পরিসর আরো বড় করলে আমাদের পক্ষে অনুদান দেওয়া সম্ভব হবে। তখন আমরা অনুদানের জন্য দুই দিনের বদলে তিন দিনের ক্লাস এবং ঢাকার বাইরে ১২টি স্থানে থিয়েটার স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেগুলোতে তিন মাসের অভিনয়বিষয়ক কোর্স পরিচালনার প্রস্তাবনা জমা দিলাম। ফাউন্ডেশন স্কুলকে তিন বছর মেয়াদি অনুদান দিল। সে টাকায় কোর্সগুলো পরিচালিত হয়েছে। তাদের অর্থায়নে আমরা স্কুলে নাটকসংক্রান্ত লাইব্রেরি করেছি। সব মিলিয়ে স্কুলটিকে বড় করেছি। থিয়েটার স্কুল এখন ২৭ বছরে পড়েছে। গত বছর থেকে এক বছর মেয়াদি কোর্সটিকে বন্ধ করে ছয় মাসের কোর্স চালু করেছি। এভাবেই এগোতে চাই, যাতে আরো বেশি নাট্যাগ্রহী ছেলে-মেয়ে এই কোর্সে অংশ নিতে পারে।

 

সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে আপনার অভিনয়সত্তার প্রতি অবিচার হয়নি?

তা হয়েছে। তবে সাংগঠনিক দিক থেকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় আমি কিছুটা অবদান রাখতে পেরেছি বলে মনে করি। রেডিওতে অল্প নাটকে অভিনয় করেছি। ১৯৬২ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন রেডিওতে নাটক করা শুরু করেছিলাম। স্মৃতিতেও নেই যে কী নাটক করেছি। থিয়েটারের এত নাটকের মধ্যে গোটা ১০ কি ১৫টি নাটকে অভিনয় করেছি। তবে আমাদের দলের রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’ নাটকের মূল চরিত্র ‘শশাঙ্ক’র ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছি। সে চরিত্র করতে আমার ভালো লাগে। ইদানীং ‘মেরাজ ফকিরের মা’ নাটকে অভিনয় করে আনন্দ পাচ্ছি। সেখানে এক টাউট চরিত্রে অভিনয় করছি। আসলে আমি যে ধরনের মানুষ নই, সেটির বিপরীত ধরনের কোনো চরিত্র করতে আমার বেশি ভালো লাগে। সে জন্য এই চরিত্রে খুব আনন্দ নিয়ে অভিনয় করি।

 

নাটক লিখেছেন?

সে অর্থে লিখিনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘কমেডি অব এররস’র বাংলা গদ্য করেছিলেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’। তার নাট্যরূপ দিয়েছি। এটি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিলাম। তবে মূলত নাটকবিষয়ক প্রবন্ধ নিয়ে আমার মৌলিক ও সম্পাদিত প্রায় ২৫টি বই আছে।

 

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপনার ভূমিকা?

আমাদের জীবনের সুবর্ণ সময়, যৌবনের ৯টি বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কেটেছে। আমাদের মূল কেন্দ্র ছিল টিএসসি, নেতা ছিলেন ফয়েজ আহমেদ। তিনি প্রথমে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক এবং পরে সভাপতি ছিলেন। আমরা মনে করি, গণতন্ত্রের জন্য এই সংগ্রামে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আমরা শিল্পীরা রাজনীতিবিদদের চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিনি। সে জন্যই আমরা মানুষের সমর্থন ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছি। এই ৯ বছরের আন্দোলনে আমরা অনেকবার নিগৃহীত হয়েছি, পুলিশের ধাওয়া খেয়েছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করে গেছি। আমাদের ছয়-সাতজনের একটি কোর কমিটি ছিল। সেই কমিটির মাধ্যমে আন্দোলন করতাম। ফয়েজ ভাই যখন হঠাৎ গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন, আমি তখন আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছি, সেটি ১৯৮৯ সাল। সে সময় আমাদের দল থেকে আমরা দুটি পথনাটক করেছি। একটি ‘কুরসি’, অন্যটি ‘বিবিসাব’। দুটিতেই আমি অভিনয় করেছি। ফয়েজ ভাইয়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আমি সভাপতি ছিলাম। সংগঠনের চলমান কাজগুলো করতে হয়েছে।

 

এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে আপনার পরিচয়?

মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালে আমাদের পরিচয়। আমরা দুজনেই সেই নাটকে অভিনয় করেছি। সাত বছর প্রেমের পর আমাদের বিয়ে। ফেরদৌসী অনেক বড় মাপের অভিনেত্রী। সে যখন যা করে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে করে। সে জন্যই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। সে অবশ্যই এ দেশের নারীদের অভিনয়ের পথপ্রদর্শক। আমাদের দেশের শিক্ষিত মেয়েরা যখন নাটকে আসতে চাইত না, সেই সময় সে সাহস করে এগিয়ে এসেছে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের চরিত্রের মধ্যে ডুবে থেকে নিজেকে অনেক বড় অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ ও বিদেশে সবাই খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে তার নাটক দেখে। তবে স্বামী-স্ত্রী অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সুবিধা-অসুবিধা দুই-ই আছে। সুবিধাটি হচ্ছে, আমিও যেহেতু নাটকের লোক, ফলে আমরা একসঙ্গে দলে কাজ করতে গিয়েছি, টেলিভিশনে, মঞ্চে কাজ করেছি, করছিও। অসুবিধাটি হলো আমাদের সন্তান ত্রপা যখন ছোট ছিল, ওকে ফেলে তার অভিনয়ে যাওয়ায় আমাদের সংসারের অসুবিধা হতো, সে অসুস্থ হলে অসুবিধা হতো। কিন্তু আমি মনে করি, সুবিধাই বেশি হয়।

 

স্ত্রী হিসেবে তিনি কেমন?

আমি যে বাইরে এত কাজ করে বেড়াই, সে সংসারটি সামলায় বলেই আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আমি তো সংসারের কোনো কাজ করি না। তার দোষ—সে আবেগনির্ভর, অনেক সময় যুক্তি মানতে চায় না, আবেগতাড়িত হয়ে চলে। তবে গৃহিণী হিসেবে ভালো, শিল্পী হিসেবে সে কেমন সেটি তো সারা দেশের মানুষ জানে।

 

ত্রপা মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিলেন কেন?

সে প্রথম শ্রেণিতে ভালো ফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতায় যুক্ত হয়েছিল। সে বলতে চায় যে আমাদের আগ্রহের কারণে সে শিক্ষকতা পেশাটি বেছে নিয়েছিল। ত্রপা বলেছিল, ‘আমি যদি শিক্ষকতা করতে চাই, তাহলে আমাকে আরো পড়তে হবে, পিএইচডি করতে হবে। সেটি আমি আর করতে চাই না। বিজ্ঞাপনী সংস্থায় (এক্সপ্রেশন) একসঙ্গে কাজ করছি, সেটিই করতে চাই।’ সবাই তাকে বলেছিল, ‘তুমি তো ইউনিভার্সিটির চাকরি রেখেও বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতে পারো।’ তখন সে উত্তর দিয়েছে, ‘সেটি খুব অনৈতিক কাজ হবে।’ সুতরাং এক বছর চাকরি করে সে ছেড়ে দিল।

 

তাঁর স্বামী আপন আহসানকেও আপনি খুঁজে নিয়ে এসেছেন?

তখন আপন আহসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একটি অনুষ্ঠান করতে আমি রাজশাহীতে গিয়েছিলাম। তখন বিটপিতে কাজ করতাম। নাজিম মাহমুদ সাহেব তার সঙ্গে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই ছেলেটি সাংগঠনিক দিক ভালো পারে। তখন আমাদের একটি কাজ আপন করেছিল। এরপর আপনকে বলেছিলাম, পাস করলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। ১৯৯৩ সালে আমি এক্সপ্রেশনস অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সি শুরু করলাম, আপন আমাদের প্রথম দিককার কর্মী হিসেবে যোগ দিল, এখনো আছে। তারা পরস্পরের ভালো লাগার মাধ্যমে বিয়ে করেছে।

(২৮ জানুয়ারি, বনানী, ঢাকা)



মন্তব্য