kalerkantho


বিজ্ঞাপন আমার প্রেম

লিখতে ভালো লাগত বলে করাচিতে থাকার সময় বিজ্ঞাপনের অফিস ঘুরে ঘুরে অন্যদের কপি লিখে দিতেন তিনি। দেশে ফিরে হঠাৎ যোগ দিলেন বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিল বাংলাদেশের একমাত্র নারী প্রধান নির্বাহীর বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘অ্যাডকম’। ঢাকা ক্লাবের তিনি তিন মেয়াদের প্রেসিডেন্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১১ মে, ২০১৮ ০০:০০



বিজ্ঞাপন আমার প্রেম

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হয়েও কিভাবে বিজ্ঞাপনের জগতে চলে এলেন?

বিয়ের পরপরই স্বামী নাজিম কামরান চৌধুরীর আইসিআইতে (ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ) চাকরির সূত্রে করাচি চলে গেলাম। এক অনুষ্ঠানে ‘শি’ নামের এক ইংরেজি নারীবিষয়ক ম্যাগাজিনের সম্পাদকের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী থাকার সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখা পড়েছিলেন। তাঁর পত্রিকাটিতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানালেন। নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য নানা ধরনের লেখা প্রকাশ করত ‘শি’। পত্রিকাটিতে পরে সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে আমাকে। করাচি গিয়েই নিজের চোখে দেখলাম, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের কিভাবে দাবিয়ে রাখছে, শোষণ করছে। সত্তরের নির্বাচনের আগের কথা। মনে হলো, নারী হিসেবে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করি, তাহলে তো নারীরা তাঁকে ভোট দেবেন, সেই ভাবনায় বঙ্গবন্ধু, বিখ্যাত পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো ও মাওলানা মমতাজের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করতে পেরেছি। ‘শি’র কর্মীরা সবাই আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, শুধু একটি মেয়েই সমবয়সী। দুপুরের খাবারের বিরতিতে আমরা দুজন ঘুরে বেড়াতাম। তার বন্ধুবান্ধবরা সবাই বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোতে কাজ করতেন। আমি দেখতাম, তাঁরা সব সাজগোজের গল্প করেন। আমি তো সাজগোজ করি না, লিপস্টিক দিই না, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল বাঁধতে পারি না বলে খোলা রাখি; শুধু বাঙালি পরিচয়বাহী লাল টিপ, সাদা সুতি শাড়ি পরি। রাস্তা দিয়ে আমাকে এই বেশে চলতে দেখে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বলত, ‘হিন্দু যা রাহা হ্যায় (হিন্দু যাচ্ছে)।’ তার পরও বাঙালি হিসেবে এভাবেই আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি। তো সেই মেয়েদের সাজগোজ, ফ্যাশনের গল্প শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগত না। তাঁরা সবাই কপিরাইটার। ছোটবেলা থেকে লিখতে ভালো লাগে বলে আমি তাঁদের কাছ থেকে পণ্যগুলো সম্পর্কে অল্প-বিস্তর জেনে বিজ্ঞাপনের কপিগুলো লিখে দিতাম। পরদিন কোনো না কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। দেখে খুব ভালো লাগত। তাঁরাও গেলে পরে বলতেন, ‘এই বাঙালি মেয়ে, শোনো, তোমার হাতে জাদু আছে, ক্লায়েন্টরা তোমার কপি খুব পছন্দ করেছেন।’ এভাবেই বিনা পারিশ্রমিকে আমার ইংরেজি কপি রাইটারের জীবন শুরু হলো।

 

 

চাকরির শুরু?

পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে দেখেছি, পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই; শিল্প-সাহিত্যসহ সর্বক্ষেত্রেই যে আমরা তাঁদের চেয়ে অনেক উন্নত, এগিয়েও আছি, সেসব তাঁদের জানানোর জন্য ‘শি’র সম্পাদক জোহরা কোরাইশিকে প্রস্তাব দিলাম, ‘পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে একটি সংখ্যা করতে চাই।’ তিনি রাজি হলেন, কিন্তু শর্ত দিলেন—সে জন্য আড়াই হাজার টাকার বিজ্ঞাপন জোগাড় করে আনতে হবে। তখনকার দিনে আড়াই হাজার টাকা অনেক। ঢাকায় এলাম এই কাজ নিয়ে। ঘুরে ঘুরে আমাদের ফ্যাশন, জামদানির নানা ঐতিহ্যের ওপর ভিন্ন ভিন্ন লেখা লিখলাম। বিজ্ঞাপন জোগাড়ের জন্য এরপর নানাজনের কাছে ধরনা দিতে হলো। আমার করুণ অবস্থা দেখে নাজিম তাঁর কাছের এক আত্মীয় এনায়েত করিমের কাছে আমকে নিয়ে গেলেন। ইন্টারস্পিডের কর্ণধার তিনি। বললেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের ম্যাগাজিনে পূর্ব পাকিস্তানের বিজ্ঞাপনদাতারা কেন বিজ্ঞাপন দেবেন? আমাদের এখানে তো তেমন কোনো শিল্প-কারখানাই ওরা গড়তে দেয়নি, আমরা বিজ্ঞাপন দেব কেন?’ তার পরও তাঁর পরামর্শে নিজের ও দেশের মানসম্মান রক্ষার দায়ে তাঁর বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে ঘুরে ১৫ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন জোগাড় করে ফেললাম। তিনি খুব অবাক হলেন, আমার প্রতি তাঁর খুব আস্থা জন্মাল। তিনি করাচি যাওয়ার পর এজেন্সিগুলোর কর্মীরাও জানালেন, গীতিআরা চমত্কার কপি লেখে। তখন তো লেটার প্রেসের যুগ, ব্লকে বিজ্ঞাপন তৈরি করে করে কাগজে ছাপতে হয়;  কুরিয়ার খরচ বাঁচাতে তাঁর কাছে ব্লকগুলো দিয়ে দিলাম। ফলে আমি যে খুব হিসেবি, তিনি টের পেয়ে গেলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে শেষ ফ্লাইটে ঢাকা চলে এলাম। পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাটি হয়েছিল এবং সেটি খুব সাড়া ফেলেছিল। দেশ স্বাধীন হলো। আমি তো বসে থাকার মানুষ নই, স্বাধীন দেশে উদ্যম আরো বেড়ে গেছে। এক বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মতিঝিলে এনায়েত করিম সাহেবের সঙ্গে আবার দেখা। তিনি ‘ইন্টারস্পিড’-এ ‘কপি রাইটার’ পদে যোগদানের অনুরোধ করে বসলেন। ফলে তখনকার দিনেই সাড়ে ৩০০ কি ৪০০ টাকায় যোগ দিলাম। আমার কাজে তিনি ও তাঁর প্রতিষ্ঠান পরে এত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে জেনারেল ম্যানেজার, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেছি। তবে এক টাকাও বেতন বাড়েনি। এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালেও কিন্তু কপি লিখেছি। দুই বছর কাজ করার পর ব্যক্তিগত কারণে এক মাসের নোটিশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দিতে হলো।

 

তখনকার দিনে তো আজকের মতো এত গণমাধ্যম ছিল না, প্রতিদিন কপিও লিখতে হতো না?

তখনকার দিনে এত পণ্য, ব্র্যান্ড ছিল না সত্য, শুধু বিশেষ দিবসগুলোর ক্রোড়পত্র হিসেবে পত্রিকা-ম্যাগাজিনগুলোতে একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হতো। সেগুলোতে আমাদের বিজ্ঞাপনগুলো ছাপা হতো। রেডিওতে খুব কম বিজ্ঞাপন যেত, টিভিতে তো আরো কম। তখনকার দিনে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা সবাই বিদেশি ছিলেন। একবারের ঘটনা বলি, একুশে ফেব্রুয়ারির কপি লিখেছি, ক্লায়েন্টের পছন্দ হলো না। একে একে ১৭টি কপি লিখলাম, একটিও পছন্দ করলেন না। তিনি আমাদের অফিসে এলেন, এনায়েত করিমও তখন আছেন। তাঁর সামনেই ক্লায়েন্টকে বললাম, ‘আমাদের একুশের যে আবেদন, সেটি নিয়ে আমাদের যে অনুভূতি, তা আপনি বুঝতে পারবেন না; একমাত্র আমরা বাঙালিরাই সেটি অনুভব করতে পারি। বাংলা ভাষায়ই সে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা সম্ভব।’ এনায়েত করিম সাহেব তো হতভম্ভ। সেই বিদেশি ভদ্রলোক কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ঠিক আছে, বাংলায় লিখুন।’    

                         

নিজের প্রতিষ্ঠান কেন চালু করতে হলো?

চাকরি ছাড়ার পর কিন্তু কোনো ক্লায়েন্টকে না জানিয়েই বাসায় চলে এসেছিলাম। তখন অপারেটরের মাধ্যমে টেলিফোন করার যুগ। শ্বশুর আবদুল মোমেন চৌধুরী ও শাশুড়ি শাহেদা চৌধুরীর সঙ্গে থাকি। ঘরের সামনের টেবিলে টেলিফোন বাজছে, গিয়ে ধরলাম। বাটা শু কম্পানির তত্কালীন কর্তাব্যক্তি ওপাশ থেকে বললেন, ‘আপনি এখন কী করছেন?’ বললাম, ‘কিছু করছি না, কিন্তু ইন্টারস্পিড থেকে চলে এসেছি।’ তিনি বললেন, ‘সে তো জানি, কিন্তু করছেনটা কী?’ ‘বাসায় আমার ছেলের দেখাশোনা করছি।’ তিনি খুব নাখোশ হলেন, ‘এখন ছেলেকে দেখাশোনার সময় নয়, আমাদের কাজ করার সময়, দরকার হয় আপনি নিজেই প্রতিষ্ঠান চালু করুন।’ কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার দুই হাত কাঁপতে লাগল। এসব কী বলছেন তিনি? টেলিফোন রেখে শাশুড়ির কাছে দৌড়ে গেলাম। আবার টেলিফোন বাজছে। আরেক বিদেশি ক্লায়েন্টও আমার পদত্যাগের খবর শুনে টেলিফান করে প্রতিষ্ঠান চালুর তাগিদ দিলেন। কী করব? শাশুড়ি বললেন, “তোমার আব্বা (এ এফ এম সফিউল্লাহ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ছেলে) সব সময় বলতেন ‘জাস্ট ডু ইট’। প্রতিষ্ঠান গড়ো, চিন্তা কোরো না, ফারহানকে আমিই দেখব।” আমার আম্মাও (জাহানারা বেগম) বললেন, ‘মামণি, সাহস করে শুরু করে দেখো। তুমি পারবে।’ শেষ পরামর্শের জন্য কামরানকে ফোন করলাম। সে তো জানে, কিভাবে আমাকে দিয়ে কাজ করাতে হয়। তাই সে আমাকে রাগিয়ে দিল, ‘আব্বা খামকা বলেন, তোমাকে ছেলে হিসেবে মানুষ করেছেন। আসলে তো তুমি একটি মেয়ে। তুমি কী পারবে? কোনো ছেলে তো এই সুযোগ পেলেই লুফে নিত।’ আমি ওকে দেখিয়ে দেব যে আমি কী পারি! রেগে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম।

 

এর পরই অ্যাডকমের শুরু?

খবর নিয়ে জানলাম, বিজ্ঞাপনী সংস্থা চালু করতে হলে সংবাদপত্র পরিষদের অনুমতি লাগে। সে জন্য ৫০ হাজার টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়, কিন্তু আমার কাছে তো অত টাকা নেই। জেদ ধরেছি, স্বামী বা অন্য কারো কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেব না, মেয়ে হয়েও আমি কী পারি তাঁদের দেখিয়ে দেব। একে একে ছয়-ছয়টি ব্যাংকে গেলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুসারে সবাই ডিপোজিট চাইলেন। কাজের জন্য ক্লায়েন্টরা ওদিকে পাগল করে দিচ্ছেন। অবশেষে উত্তরা ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সালেহীন সাহেবের কাছে যখন গেলাম, আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘আপনার সেই দুই ক্লায়েন্টের কাছ থেকে চিঠি আনুন, তাঁরা আপনার কাজের বিপরীতে যে টাকা দেবেন, তা আমাদের ব্যাংকে আপনার অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এখন যা পারেন, জমা রাখুন।’ বাসায় ফিরে অনেক খুঁজে জন্মদিন, ঈদের সালামি হিসেবে পাওয়া ১০ হাজার টাকা পেলাম, জমা দিলাম। ফিরে গিয়ে ক্লায়েন্টদের পুরো ঘটনা বললাম। তাঁরা তো কাজের বিনিময়ে পয়সা দেবেন, একপায়ে খাড়া। ১৯৭৪ সালের ৪ জুলাই মতিঝিলে কামরানের অফিসের ভেতরে এক ছোট্ট ঘরে আমার পুরনো প্রতিষ্ঠানের পাঁচ সহকর্মী, যাঁরা আমার সঙ্গে নিজে থেকেই যোগাযোগ করে কাজ করতে আগ্রহী হলেন, বেতনেরও পরোয়া করেননি, তাঁদের নিয়ে ‘অ্যাডকম’ শুরু হলো। আসলে করাচিতে ‘অ্যাডকম’ নামের একটি এজেন্সি ছিল, তাদের শাখা আমার মাধ্যমে বাংলাদেশে চালু করার কথাও ছিল, সময়ের অভাবে সেটি হয়নি, সময়ের অভাবে আমিও নাম পাইনি। তবে তাঁদের নামের বানান ছিল ‘এডিসিওএম’। আর আমার বানান ‘এডিসিওডাবলএম’। আমার আরেকটি ক্লায়েন্ট সিবা-গেইগি। এটিও বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান; তারা সার, কীটনাশক, পোকা-মাকড় দমনের ওষুধ তৈরি করে।

 

এ দেশের বিজ্ঞাপনশিল্পের প্রথম নারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান আপনি। শুরুর দিকে কাজ করতে অসুবিধা হয়েছে?

তখন শুধু প্রিন্টিংয়ের কাজ ছিল। কাজের জন্য যেখানেই যেতাম, তাঁরা আমাকে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে যেতেন। এরপর জিজ্ঞেস করতেন, ‘অনেক রাত পর্যন্ত প্রেসে থাকতে পারবেন?’ তখন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তারাও সব বিদেশি ও ইংরেজি ভাষী। এমনকি মাঝারি সারির বাঙালি কর্মকর্তারাও নিয়মানুসারে ইংরেজিতে কথা বলেন। আমার ইংরেজি তো বরাবরই ভালো। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘সিনিয়র কেমব্রিজ’ পরীক্ষা দিই এবং আমি ইংরেজিতে ‘ডিসটিংশন’ মানে ৮০ শতাংশের ওপর নম্বর পেয়েছি। ফলে ভাষা নিয়ে আমার কোনো অসুবিধা নেই। আর কাজ করতে তো কোনো দিনই ক্লান্তিবোধ করিনি। এ প্রসঙ্গে বলি—একবার এক ক্লায়েন্ট আমাদের বাড়িতে টানা ১৭ বার টেলিফোন করলেন, কিন্তু প্রতিবারই কাজের ছেলেটা উত্তর দিল, ‘মেম সাহেব বাসায় নেই।’ তিনি আমাকে অফিসে ফোন করেও পান না। সাড়ে ৫টার পর তো অফিস শেষ, সবাই বাড়ি চলে গেছেন। অবশেষে রাত সাড়ে ১২টায় তিনি বাসায় ফোন করে কামরানকে পেলেন। তখন সে ফিরেছে। সে বলল, ‘গীতিআরা সারা দিন প্রেসে কাজ করে এইমাত্র অফিসে গেছে।’ তার কাছ থেকে তিনি আমার ব্যক্তিগত টেলিফোন নম্বর নিয়ে আমাকে টেলিফোন করলেন। আমি তো এসবের কিছুই জানি না। কাজ করতে করতে টেলিফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলার পর ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই! একটু পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি অফিসে?’ বললাম, ‘হ্যাঁ’। তখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবারও আমি কি অফিসে—জিজ্ঞেস করলেন। সারা দিন কাজ করেছি বলে উত্তরটি একটু রুক্ষ হয়ে গেল, ‘আমিই তো কথা বলছি, নাকি?’ আমার কর্মস্পৃহা দেখে পরদিন তিনি নিজেই একটি বিরাট কেক নিয়ে চলে এলেন। এখনো, এই বয়সেও আমি জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করি, এতটুকুও ফাঁকি দিই না।

 

তখনকার দিনে সাধারণ মানুষের চোখে আপনি কেমন ছিলেন?

এখন যেমন বাণিজ্য মেলা হয়, তখনো ছোটখাটো মেলা হতো। তেমনই একটি মেলায় কাজ করছি। আইসিআই মেলাটির আয়োজন করেছিল। পরদিন মেলা শুরু হবে, তাই আগের রাতে দেড়টা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হলো। এখনকার মতো স্টিলের মই তো তখন ছিল না, কোনোমতে বাঁশের মই বানিয়ে সেটি বেয়ে ওপরে উঠে কাজ করতে হতো। মই বেয়ে উঠে সব ঠিক করছি, হঠাৎ কেমন যেন লাগল। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলল, কেউ হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, ঠিকই ৩০ জনের মতো নানা বয়সের পুরুষ হাঁ করে আমাকে দেখছেন। তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, কোনো একটি মেয়ে এত রাত পর্যন্ত একা একা বাইরে কাজ করতে পারে! তখন আমিও একটু ভয় পেয়েছি। বাবার একটি কথা তত্ক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল—‘মা, সাহসই লক্ষ্মী।’ ফলে সাহস করে জোর গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কী দেখছেন আপনারা? যান, সরে যান।’ সবাই সরে গেল। কিছুক্ষণ পর কাজ শেষ করে নামব, দেখি লম্বা দাড়িওয়ালা, মাথায় গোল টুপি পরা হুজুর তখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভয়ে তো আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল—নামলেই তো এখন চুল খোলা রেখে, বেপর্দা হয়ে কাজ করছি বলে আমাকে বকবে। সাহস নিয়ে বললাম, ‘যাননি কেন? কী দেখছেন দাঁড়িয়ে? যান, চলে যান।’ তখন তিনি বললেন, ‘মা গো, রাগ করিয়ো না মা, কোনো দিনও আমি মাইয়া লোক কন্ডাক্টর দেহি নাই।’

 

ব্রেকথ্রু?

স্টুয়ার্ট ম্যাথিসন (ফাইসন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের) ‘পেপস জেল’ নামের একটি টুথপেস্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। বয়স্ক ভদ্রলোক, মূল অফিস লন্ডনে। তিনি টুথপেস্টটি বাজারে আনার আগে স্যাম্পল পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজে অফিসে রাখা ব্রাশ দিয়ে দাঁত মেজে সেটি থেকে কোনো গন্ধ বের হচ্ছে কি না, ব্যবহার করে কেমন লাগছে, তা তাঁকে জানাতাম। আমার আন্তরিকতা দেখে তিনি আমাকে খুব বিশ্বাস করে ফেললেন। তাদের এর পরের পণ্যটি ছিল ‘জেনিসল শ্যাম্পু’। লন্ডন থেকে তিনি প্রতি মাসে বাংলাদেশে আসেন। টুথপেস্টের মতো তিনি আমাকে শ্যাম্পুটি সম্পর্কেও মতামত দিতে অনুরোধ করলেন; কিন্তু আমার তো বিরাট লম্বা চুল, চুল পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমি আর সেই শ্যাম্পু ব্যবহার করলাম না। বললাম, ‘আমি তো এটি ব্যবহার করিনি।’ আর তখনকার দিনে উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা বিদেশ থেকে পরিচিতদের বা লাগেজ পার্টির মাধ্যমে শ্যাম্পু আনিয়ে নিতেন। আমিও সেভাবেই শ্যাম্পু আনিয়ে ব্যবহার করতাম। দেশে তৈরি শ্যাম্পুর ওপর কারোই ভরসা ছিল না, দু-একটি দোকান বাদে কোথাও শ্যাম্পু পাওয়াও যেত না। তিনি কেন ব্যবহার করছি না জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, নতুন শ্যাম্পু ব্যবহারের পর আমার চুল পড়ে যেতে পারে। এ কথা শুনে কিচ্ছু না বলে তাঁর স্টেনোগ্রাফারকে ডেকে বললেন, “আপনি লিখে রাখুন ‘জেনিসল’ ব্যবহারের পর মিসেস চৌধুরীর চুল পড়ে গেলে আমাদের কম্পানির খরচে তাঁর হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করে দেওয়া হবে।” শুনে খুব লজ্জা লাগল। পরে জিজ্ঞেস করলাম, কয় ধাপ পেরিয়ে ‘জেনিসল’ তৈরি করা হয়েছে? কম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার বললেন, ‘২৭টি ধাপে টেস্ট করে জেনিসল শ্যাম্পু তৈরি করা হয়েছে।’ সন্দেহ, অবিশ্বাস দূর হয়ে গেল। যে শ্যাম্পুর মান ২৭টি পেরিয়ে বিচার করা হয়েছে, সে তো খুব উন্নতমানের। মাথায় আইডিয়া এলো—পত্রিকা তো শিক্ষিত মানুষরা পড়েন, তাতে এই ২৭টি ধাপের কথা লিখে বিজ্ঞাপন দিলে তো অবশ্যই তাঁরা শ্যাম্পুটি কিনবেন, ব্যবহার করবেন। আমার পরিকল্পনা শুনে তিনি খুব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, ‘কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও তো আমরা মাসে ২০০ বোতলের বেশি শ্যাম্পু বিক্রি করতে পারি না। মিসেস চৌধুরী এভাবে অন্তত আড়াই শ বোতল শ্যাম্পু বিক্রি করতে পারবেন?’ ‘নিশ্চয়ই!’ কথাটি ম্যাথিসন সাহেবকে বলার পর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে চুক্তিপত্র লিখতে বললেন। তাতে লেখা ছিল—আমাদের প্রচারণার মাধ্যমে ২৫০ বোতলের বেশি শ্যাম্পু বিক্রি করতে না পারলে তাদের সঙ্গে অ্যাডকমের চুক্তি বাতিল করা হবে। তিনি আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, আমার অন্যতম প্রধান ক্লায়েন্ট। তার পরও সাহস করে স্বাক্ষর দিলাম। এরপর পত্রিকায় ২৭টি ধাপের বর্ণনা লিখে বিজ্ঞাপন দিলাম। তখন বিটিভিতে ৩০ সেকেন্ডের নিচে কোনো স্পট বিজ্ঞাপন যেত না। আমিই যুদ্ধ করে ১০ সেকেন্ড হিসাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া চালু করলাম। তাতে বলা হতো—“তৈলাক্ত চুলের জন্য জেনিসন ‘এগ’ ব্যবহার করুন।” এভাবে কয়েকটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে প্রচার করা হলো। মাস দেড়েক কেটে গেল। তত দিনে অ্যাডকমের অফিস ইস্কাটনে চলে এসেছে। হঠাৎ একদিন সেই কম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার আমাদের অফিসে এলেন। তখন ভিসিআরের যুগ ছিল। তিনি একটি টেলিভিশন, ভিসিআর ও একটি টু-ইন-ওয়ান রেডিও আমার রুমে রেখে বললেন, ‘ফেরার পথে নিয়ে যাব।’ আমিও সরল মনে বললাম, ‘ঠিক আছে।’ চলে যাবেন, এমন সময় ঘুরে তাকিয়ে বললেন, ‘ম্যাথিসন সাহেব দেশে ফিরেছেন, আজ দুপুরে আপনাকে তাঁর অফিসে যেতে বলেছেন।’ গেলাম। তাঁর ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হৈচৈ শুরু করে দিলেন, ‘মহাব্যবস্থাপক, মার্কেটিং ম্যানেজার, বিক্রয় ম্যানেজারদের ডাকো।’ এরপর আমার দিকে একটি খাম এগিয়ে দিলেন। আমি নিশ্চিত, প্রচারণাটি কাজে লাগেনি, বিক্রি বাড়েনি বলে আমার এজেন্সির সঙ্গে তিনি চুক্তি বাতিল করে দিয়েছেন। কষ্টে চোখে পানি চলে এলো; কিন্তু তিনি হাসছেন, ‘খাম খোলো।’ চোখে জল নিয়ে খাম খোলার সঙ্গে সঙ্গে দেখি আমার নামে টিভি, ভিসিআরের লাইসেন্সের কপি ইস্যু করা হয়েছে। আরেক চিঠিতে তাঁর অভিনন্দনপত্র। সেখানে লেখা, অ্যাডকমের প্রচারণায় জেনিসল শ্যাম্পুর বিক্রি ২৭৫ গুণ বেড়েছে! সেই অফিসের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মিলে আমাকে অভিনন্দন জানালেন।

 

বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন?

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি, একবার যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছি, বিমানে বসে বসে বিদেশি ম্যাগাজিন পড়ছি। তাতে প্রকৃতি নিয়ে অনেক কিছু লেখা আছে। প্রতিবেদকরা কিভাবে পরিবেশদূষণ করা হচ্ছে, কিভাবে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, অক্সিজেনের পরিমাণ কিভাবে কমে যাচ্ছে, গাড়ি, শিল্প-কারখানা বাড়ছে; তাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড দূষণ কিভাবে বাড়ছে ইত্যাদি লিখেছেন। পরিবেশদূষণ ঠেকাতে বেশি করে গাছ লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন। ১৯৭৮ সালে তো বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন বাদে পরিবেশদূষণ নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কোনো প্রচারণাই হতো না। লেখাগুলো পড়ে আরো বেশি গাছ লাগানোর জন্য মানুষকে সচেতন করতে খুব মন চাইল। এটি কিন্তু আমার কাজ নয়, তবে সারা জীবনই এমন অনেক কাজ করেছি। যেমন—‘কালারস এফএম’ নামে আমাদের একটি রেডিও স্টেশন আছে, সেটির মাধ্যমে আমরা নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করি। বাংলাদেশ অক্সিজেনে পরিকল্পনাটির উপস্থাপনের পর তাঁরা সানন্দে রাজি হলেন। আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলাম, ‘আরো বৃক্ষ রোপণ করুন। কারণ গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়। অক্সিজেনই তো আমাদের জীবনীশক্তি।’ নিজের উদ্যোগেই এভাবে দেশের প্রয়োজনে অনেক সচেতনতামূলক কাজ করেছি।

 

আপনার জীবনে সাফল্যের রহস্য?

আমাকে কেউ শেখায়নি, পরিবার ও বন্ধুদের ছাড়া কাউকেই পাশে পাইনি। আমি সবার কাছ থেকে শিখেছি, বিদেশ থেকে বই আনিয়ে পড়েছি, জেনেছি। এখনো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে কাঁচাবাজারে যাই, কেনাকাটা করি আর প্রচুর পড়ি। সারা বিশ্বে যত ধরনের বিজ্ঞাপনী কনফারেন্স, সেমিনার হয়, এখনো হাজির হই। ১৯৭৪ সালের মতো করে এখনো নোট নেই। এসব কারণেই পাঁচজনের প্রতিষ্ঠান অ্যাডকমে এখন এক শর বেশি কর্মী আছেন। পরিপূর্ণ বিজ্ঞাপনী সংস্থার সব দিক—ডিজিটাল, প্রিন্ট, অ্যাকটিভেশন, কপি, মিডিয়া প্রডাকশন, ক্রিয়েটিভ সবই আমাদের আছে।

 

নারী হয়েও ‘ঢাকা ক্লাবে’র তিন মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হলেন কিভাবে?

কামরান তো ঢাকা ক্লাবের সদস্য। স্ত্রী হিসেবে তার সঙ্গে ক্লাবে যেতাম। আমাদের ছেলে-মেয়েরা (নাজিম ফারহান চৌধুরী ও ফাহিমা চৌধুরী) ক্লাবের সুইমিংপুলে সাঁতার কাটত, চিলড্রেনস পুলে খেলত। তাদের নিয়ে শিশুদের অনুষ্ঠানে যেতাম। একবার ক্লাবের নির্বাচনের সময় আমি আর কামরান বসে কথা বলছি, প্রচারাভিযানের জন্য কয়েকজন সদস্য এসে তাঁরা জিতলে ক্লাবের উন্নয়নে কী কী করবেন ওকে বললেন, কিন্তু আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেও তাঁরা আমাকে কিছুই বললেন না। খুব খারাপ লাগল। ফলে সেই পুরনো জেদ জন্মাল, আমি এই ক্লাবের সদস্য হব। গঠনতন্ত্র পড়ে দেখি, সেখানে নারীরা সদস্য হতে পারবে না এমন বিধি-নিষেধ নেই। ক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে গেলাম। আমাকে দেখে ক্লাবের সচিব আঁতকে উঠে বলেও ফেললেন, ‘স্যারের স্ত্রী হিসেবে ম্যাডাম আপনি তো ক্লাব ব্যবহার করছেনই, সদস্য কেন হবেন?’ উত্তর দিলাম, ‘সে কথা সত্য, কিন্তু আমি সদস্য হলে কি আপনাদের কোনো অসুবিধা আছে?’ ‘না, তা নেই।’ আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য ক্লাবের দুই সদস্যের অনুমতি লাগে। যাঁরা আমাকে অসম্ভব ভালোবাসেন, তাঁদের কেউ আমাকে ছোট বোন, ভাইয়ের বউ হিসেবে পছন্দ করেন, তাঁরাও অবাক হয়ে গেলেন। কয়েকজন বললেনও, ‘দূর পাগলী, কেন সদস্য হবি?’ অনেক চেষ্টা করে দুজনকে পেলাম, তাঁদের অনুমোদন নিয়ে আবেদন করলাম। সাক্ষাত্কারের জন্য ডাক এলো, কিন্তু সেখানে লেখা—‘লাউঞ্জ স্যুট পরে আপনাকে ক্লাবে সাক্ষাত্কারের জন্য আসতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’ আমিও কম গোঁয়ার নই, উত্তর দিলাম—‘নির্বাহী কমিটির সামনে লাউঞ্জ স্যুট পরে আমাকে আসতে অনুরোধ করায় আপনাদের ধন্যবাদ। লাউঞ্জ স্যুট বানানোর জন্য আমাকে সাত দিন সময় দিন।’ এবার তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পারলেন। তখন আবার দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি পাঠালেন—‘আপনি যে ধরনের পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেটি পরে চলে আসুন।’ আবেদনপত্র জমা দিলাম। প্রথমে অস্থায়ী, পরে স্থায়ী সদস্যও হয়েছি। এই তিনটি পর্যায়েই তাঁরা এক ধরনের গত্বাঁধা পুরুষালি চিঠি আমাকে দিয়েছেন। আসলে কোনো নারী যে ঢাকা ক্লাবের সদস্য হতে পারেন, সেটি তাঁদের কল্পনায়ও ছিল না। আমিই প্রথম নারী হিসেবে ১৯৭৮ সালে ঢাকা ক্লাবের সদস্য হয়েছি। এরপর এক্সিকিউটিভ কমিটির নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জিতেছি। তবে পুরুষশাসিত ঢাকা ক্লাবে আমাকে নারী ও শিশুদের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ছয় মেয়াদে নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করব। প্রচলিত নিয়ম-কানুন মেনে ক্লাব ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারব কি না—সবার এ সন্দেহ দূর করে ঢাকা ক্লাবের ইতিহাসে আমি প্রথম ‘নারী প্রেসিডেন্ট’ নির্বাচিত হলাম। ভোটের মাধ্যমে দুই মেয়াদে, আরেক মেয়াদে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছি। ক্লাবের উন্নয়নে কাজ করেছি। আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরে আরো অনেক নারী কমিটিতে এসেছেন, কিন্তু এখনো তাঁরা কেউ ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াননি।

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কী কাজ করেছেন?

রাজনীতির ‘র’ও আমি বুঝি না, কিন্তু জন্মভূমি বাংলাদেশকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। কেউ যদি বলেন, গীতিআরা, আপনাকে দেশের প্রয়োজনে মৃত্যুবরণ করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হব। ছোট বোন আমেরিকায় থাকে। অনেক বছর আগে একবার সে অভিভাষণের জন্য আমার কাছে কাগজপত্র চাইল, আমি উত্তর দিয়েছি, ‘উন্নত বিশ্বের একটি দেশে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে তৃতীয় বিশ্বের একটি ছোট্ট দেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকা আমার জন্য পরম আনন্দের।’ দেশের সেবা করা যাবে ভেবে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিলাম। সেখানে শিল্প, বস্ত্র ও পাট, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নারীদের কল্যাণে আমরা ‘নারীনীতি’ প্রণয়ন করেছি। সে জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ইসলামী চিন্তাবিদ—সবার মতামতই আমি গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। শিশুদের কল্যাণের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের গর্ব ‘পাট’ ব্যবহারের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। তবে নির্বাচিত সরকার নই বলে আমরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারতাম না। এক বছরের মাথায় পদত্যাগ করে চলে এসেছি।

 

আপনার এই নামটি কে রেখেছেন?

আমার দাদু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। গীতিআরা মানে (আলো), সাফিয়া আমার বাবার নাম থেকে নেওয়া; বিয়ের পর স্বামীর নামের শেষ অংশ নিজের নামের সঙ্গে যোগ করেছি।      

 

শ্রুতলিখন : ইয়াকুব ভূঁইয়া

(১ জানুয়ারি, ২০১৮, লাভ রোড, তেজঁগাও, ঢাকা)


মন্তব্য