kalerkantho


হিরো নেই বলে খুব কষ্ট হয়েছে

বাল্যবন্ধু সালমান শাহর সঙ্গে প্রথম ছবিতেই সুপারস্টার। দ্বিতীয় ছবিতে জীবনে এলেন নায়ক স্বামী ওমর সানী। তারকা নায়িকা ‘মৌসুমী’র সঙ্গে কথা বলছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন মহসিন আহমেদ কাওসার

৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হিরো নেই বলে খুব কষ্ট হয়েছে

আপনার ও সালমান শাহর পরিচয়?

খুলনা রেসিডেনসিয়াল স্কুলে আমি ও সে একসঙ্গে পড়তাম। স্কুলে তার নাম ছিল ‘ইমন শাহরিয়ার’, এটি ওর ভালো নাম। আমাকে মূল নামের প্রথম অংশ ‘আরিফা’ নামে সে ডাকত। তাদের বাসা স্কুলের উল্টো দিকে ছিল। আমি ফুফুর সঙ্গে স্কুলে যেতাম। তিনি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমরা প্লে গ্রুপ বা নার্সারিতে পড়তাম। দুপুরের আগে ছুটি হয়ে যেত, ফুফু ওপরের ক্লাসে পড়াতেন বলে ১টা কী দেড়টায় তাঁর ছুটি পর্যন্ত আমায় অপেক্ষা করতে হতো। বাসা থেকে টিফিন নিয়ে যেতাম। মিসের ভাতিজি বলে আয়া-বুয়ারা যত্ন করতেন, সঙ্গে খেলতেন। আমি একা থাকতাম। আরেকটি ছেলে আমার জন্য বাসায় গিয়ে গোসল, খাওয়া সেরে ফিরে আসত, আমার সঙ্গে খেলত। সে ইমন। সেই থেকে আমরা খেলার সাথি। কখনো তাদের বাসায় আমি খেলতে যেতাম।

 

সালমানের কথা বলতে গেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কেন?

একেবারে শিশুকাল থেকে বন্ধু, গায়ের চামড়া কেটে গেলে ক্ষত শুকিয়ে গেলেও যেমন দাগ থেকে যায়, তেমনি তার মৃত্যুর বহু বছর পরও ওর কথা মনে পড়লে কান্না পায়।

 

তো আলাদা হয়ে গেলেন কিভাবে?

ওর বাবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন; তিনি আমাদের আসার বছরখানেক আগে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে গেলেন। ক্লাস ফাইভে উঠে আমরা ঢাকায় চলে এলাম। আমার বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন। আমরা খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। ঢাকায় এসে কলেজের কোচিংয়ে তাকে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখেছি, কিন্তু কথা হয়নি। বহু বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে সব সময়ই ফরসা ছেলেটির কথা মনে পড়েছে। পরে তার কাছে শুনেছি, সে-ও ভেবেছে, আরিফা বোধ হয় আমায় মনে রাখেনি। প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামতে’ অভিনয় করার সময় আবার আমাদের দেখা।

 

তার আগে মডেলিংয়ে কিভাবে এলেন?

ঢাকায় এসে এসএসসি পাস করে ধানমণ্ডির উইমেন্স ফেডারেশন কলেজে ভর্তি হলাম। উঠতি বয়সের মেয়েদের মতো আমার শরীর-চেহারায় গ্ল্যামার এলো। সিম্পলের মধ্যে তখন থেকে আমি দেখতে গর্জিয়াস। তখন আজকের মতো এত মডেল পাওয়া যেত না, উল্টো মডেল জোগাড় করা হতো। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মেয়েদের মডেলিংয়ে আসতে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারত না। আমি কলেজে যাই, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াই। প্রায়ই কেউ না কেউ অফার করে, কিন্তু এত অন্তর্মুখী ছিলাম যে তেমনভাবে কথাই বলতে পারতাম না। সে বয়সেই মানসিকভাবে পূর্ণ নারী হয়ে গিয়েছিলাম। তবে যেখানেই যেতাম সবাই জিজ্ঞেস করতেন, তুমি কি মডেল? মিডিয়ায় কাজ করো? মেয়েরাও জিজ্ঞেস করত—তুমি এত কিউট কেন? একটু ছুঁয়ে দেখি? সেই থেকে প্রশ্ন তৈরি হলো—আমি কি খুব সুন্দরী? আয়নায় অন্যদের সঙ্গে নিজেকে মেলাতাম, আমি তো শ্যামলা, বোন ইরিন জামানের মতো অত ফরসা নই। রোদে পুড়ে কালো হওয়া তখন আবার আমার কাছে ফ্যাশন ছিল। স্কুলে এমন কোনো খেলা নেই, খেলিনি। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হলেও খেলেছি। ঘুরেছি।

 

মডেলিংয়ের শুরু?

এইচএসসি পরীক্ষার আগে কোচিংয়ে ভর্তি হলাম, ঢাকার বশির উদ্দিন রোডে থাকি। যে বাসায় ভাড়া থাকি, সে বাড়ির মালিকের মেয়ে ইয়ারমেট; আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। তাদের বাসায় খুব যাই, সে-ও আসে। জন্মদিনে দাওয়াত করল। সন্ধ্যায় তিন বোন গেলাম। ওর মামা-মামি এলেন, পরিচয় করিয়ে দিল। মামা সাকিব লোহানী, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ক্যাসেন্ডা লিমিটেডের মালিক। এই ১৯৯১ সালের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আমার জীবনটা বদলে গেছে। সাকিব সাহেব আমার অনেক ছবি তুললেন। অনুষ্ঠানে আমার দিকে বেশি খেয়াল রেখে ভিডিও করলেন। ছবিগুলো প্রিন্ট করে দেখে বান্ধবীকে টেলিফোন করলেন, ‘তোদের দোতলার মেয়েটিকে কী ওর মা-বাবা মডেল হতে দেবেন?’ ‘ওর বয়স খুব কম।’ ‘সে খুব ভালো কাজ করবে, খুব সুইট, চেহারাও ক্যামেরা ফেস খুব ভালো আসে, নানা অ্যাংগেলে নানা রকম মনে হয়। এই মেয়েটির সঙ্গে ব্রুক শিল্ডসের খুব মিল আছে।’ শেষ কথাটি কমন পড়ে গেল। তখন ব্রুক শিল্ডসকে খুব পছন্দ করি। এত অনুসরণ করি যে চুলের কাট থেকে শুরু করে সবই তাঁর মতো হয়। তাঁর মতো আমার ভ্রু তখন খুব ঘন, কাটতাম না। আমাদের লম্বা চুলের হেয়ার স্টাইল ছিল। তিনি বেশির ভাগ সময় পার্পল লিপস্টিক দিতেন। আমিও জোগাড় করে দিতাম। তাঁর মতো সাদা নেইল পলিশ দিতাম। কাজল ব্যবহার করতেন না, মাশকারা আর অল্প লাইনার ব্যবহার করতেন। ভ্রু শেড দিতেন না। বাংলাদেশের কোনো তারকা অভিনেত্রীর সঙ্গে ফ্যাশনের এই মিল ছিল না। তাঁর ফ্যাশন আমার সঙ্গে পুরো মানাত। বান্ধবী বলল, মামা স্কয়ার ট্রয়লেট্রিজ লিমিটেডের তিনটি নতুন পণ্যের বিজ্ঞাপন তৈরির কাজ পেয়েছেন। আমার ছবি অঞ্জনদাকে (অঞ্জন চৌধুরী) দেখানো হয়েছে, তিনি পছন্দ করেছেন। তিনি হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি আমাকে মিডিয়ায় কাজ করতে সমর্থন দিলেন। তিনি বলেও দিলেন চঞ্চল মাহমুদকে দিয়ে যেন আমার ফটোসেশন করা হয়। ফলে সাকিব সাহেব বললেন, এই কাজ না করলেও অন্তত ফটোশুট করো। আগের ছবিগুলো বাসায় বসে সবাই মিলে দেখে সিদ্ধান্ত নাও। উত্তেজনায় মা-বাবাকে না বলে আমি, মেজো বোন ইরিন ও সেই বান্ধবীকে নিয়ে মামার বাড়িতে গেলাম। তাঁর স্ত্রীই আমাকে জীবনের প্রথম মেকআপ করিয়ে দিলেন। বাড়ির লনে চঞ্চলদা অনেক ছবি তুলে সার্টিফিকেট দিলেন, আহামরি সুন্দরী না হলেও এই মেয়েটির ভেতরে খুব এক্সপ্রেশন আছে। তার চোখ, মুখ, ঠোঁটসহ অনেক কিছুই কথা বলে। তিনি আমার ভেতর থেকে এক্সপ্রেশনগুলো বের করে নিয়ে বললেন, মডেলিং করলে ভালো করবে। পরে ছবিগুলো নিয়ে বাসায় নিজেকে নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। অঞ্জনদা আমাকে নিয়ে কাজ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলেন। তিনি তিন মাসের জন্য বিদেশে গেলেন। আমিও ঠাণ্ডা মাথায় এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। ছুটি শুরু হলো। সাকিব মামা মা-বাবাকে বললেন, ‘এই প্রথম ও শেষ। কাজের পরিবেশ ভালো না লাগলে কোনো দিন ওকে দেবেন না। এবার তার শখটি পূরণ করতে দিন।’ আম্মু বললেন, ‘তাহলে তো আর মুখ দেখাতে পারব না।’ তখন বললাম, ‘কক্সবাজারে শাবানা ম্যাডামের শুটিং তো দেখেছ? আমিও তাঁর মতো সেখানে শুটিং করব। ভালো না লাগলে আর দিয়ো না।’ রাজি হলেন। আব্বু আমায় সমর্থন দিয়ে গেলেন। সাকিব মামা এমনও বললেন, ‘টাকা গেলে আমার যাবে, ভালো না লাগলে শুটিং ফেলে চলে আসবে। তার আগে চুক্তি হবে না।’ পুরো পরিবার শুটিংয়ে গেলাম। বাইরের মানুষ, এমনকি অঞ্জনদাও সেটে নেই। সাইদুল আনাম টুটুল ও আনোয়ার হোসেন বুলু আমার কাজ ক্যামেরাবন্দি করলেন। এফডিসির বিখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট খলিলুর রহমান মেকআপ দিলেন। পুরো কাজটি এক্সপ্রেশনের ওপর ছিল বলে বেঁচে গেছি। বিটিভিতে সেই মেরিল স্কিন কেয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হলো। মডেল হলাম। অঞ্জনদাও খুব পছন্দ করলেন। আমাকে দেখতে বাসায় মানুষ আসতে লাগল। লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হলাম। বান্ধবীদের চোখে তারকা! পরে মেরিল শ্যাম্পুর অ্যাড হলো। প্রথম বিজ্ঞাপনে বোধ হয় ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। ওয়ার্ডরোব কিনেছি, আত্মীয়দের উপহার দিয়েছি, প্রচুর খেয়েছি, ঘুরেছি, খরচ করেছি। স্কয়ারের পর পর তিনটি বিজ্ঞাপন তারকা বানিয়ে দিল। তার পর আফজাল হোসেন ভাইয়ের সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপন করলাম।

 

আনন্দ বিচিত্রায় ফটোসুন্দরী হওয়াও তো ইতিহাস?

আমাকে না জানিয়েই চঞ্চলদা ছবিগুলো পত্রিকাটিতে জমা দিয়েছেন। জীবনের প্রথম দিকে তিনি ও সাকিব মামা আমাকে তুলেছেন। তাঁরা ভেবেছেন, আমাদের এত সম্মান দিয়ে মেয়েটি কাজ করেছে, তাকে যেন ফিরে যেতে না হয়, যেন এগিয়ে যেতে পারে। সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী ছবি দেখে চঞ্চলদাকে বললেন, ‘মেয়েটি তো ভালো, আমাদের নতুন মুখ প্রয়োজন; ছবিগুলো জমা দাও। প্রতিযোগিতাটির সঙ্গে লিভার ব্রাদার্স আছে। ফলে ভালো প্ল্যাটফর্ম পাবে।’ আমি এসবের কিছুই জানি না। পাঠক ভোটে পুরো দেশের সেরা ৫০ জন হওয়ার খবরও হঠাৎ আমাদের বাসায় আসা চিঠিতে পেলাম। কিন্তু আমি তো ভয়ে বেঁকে বসলাম, কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমি যাব না। বুঝতে পারিনি বলে ভয়ে এগোতে রাজি হলাম না। পাঠকের ভোটে সেরা ২০ হলাম। এবার বিচারকরা নির্বাচিত করবেন। তাঁরা ফটোসেশনের কথা বলে রাজি করালেন। রফিকুর রহমান রেকু ভাই মেকআপ ছাড়া সিম্পলভাবে, ডি ফোকাস করে কিছু ছবি তুললেন। তিনি আমার চোখ, হাসি ও উপস্থিতি—তিন বিষয়ে পোর্টেট করলেন। আমি যতই সাজি, তিনি সব মুছে দেন। তখন ভেঙেচুরে যাচ্ছি—লোকটি তো আমি ভালো করি তা মোটেও চান না; তাহলে তো বিশের মধ্যেই থাকব না। তিনি সাদা-কালো ছবিও তুললেন। অনেক ছবির ভিড়ে খুব হাসছি—এমন একটি ছবি পেয়ে গেলেন। সেটিই নির্বাচিত করে দিলেন। শাহাদত ভাইসহ বিচারকমণ্ডলীরা বললেন, মেয়েটির হাসি সুন্দর, চোখের এক্সপ্রেশন ভালো। দেবী ধরনের নয়, জঙ্গলি টাইপের, একেবারেই আলাদা। সেরা সুন্দরী নির্বাচনের জন্য রেকু ভাই কিছু ছবি তুললেন, ইচ্ছামতো সাজলাম। তবে সেগুলো জমা না দিয়ে তিনি শাহাদত ভাইয়ের নির্দেশনায় তোলা আগের ছবিগুলোর মধ্য থেকে ছবি জমা দিলেন। সেটিই সেরা তিনে নিয়ে এলো। বিচারকরা ইন্টারভিউর পর দ্বিতীয় সুন্দরী নির্বাচন করলেন। ঠিক দুই সপ্তাহ পর সারা দেশে নিয়মানুসারে ভোট হলো। পাঠকদের ভোটে ৩৪ হাজারের ব্যবধানে সেরা হলাম। আনন্দ বিচিত্রার ইতিহাসে আমি একমাত্র পাঠক ভোটে নির্বাচিত।

 

সিনেমায় শুরু?

সোহানুর রহমান সোহান তখন উঠতি পরিচালক, ভালো কাজ করেন। দুটি ছবি হিট হওয়ায় প্রযোজকদের আস্থা লাভ করেছেন। আনন্দ মেলা মুভিজ তাঁকে বলল, নতুন মুখ হলে আপনার ছবি প্রযোজনা করব। তারা আগেই ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর কপিরাইট নিয়ে এসেছেন। ছবিটি হাতে পেয়ে তিনি নতুন নায়ক-নায়িকা খুঁজতে লাগলেন। দেখতেও যাঁরা আমির খান ও জুহি চাওলা। নানাভাবে খুঁজলেন, বাছলেন। হঠাৎ ‘সিনেমা’ পত্রিকার সাংবাদিক মুশফিকুর রহমান গুলজার আমার কথা তাঁকে বললেন। গুলজার ভাইয়ের প্রতি এই কৃতজ্ঞতায় প্রথম দিকে তাঁর ছবি কোনো আপত্তি ছাড়াই করেছি, কখনো না বলিনি। তিনি আমার সাক্ষাৎকার নিতে আলোকচিত্রীসহ বাসায় এলেন। কিছু কথা বলে জানালেন, ‘তোমাকে বলা হয়নি, এক বন্ধু অনেকক্ষণ ধরে তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।’ মায়ের অনুমতি নিয়ে তাঁকে বাসায় এনে বসালাম। সোফার এক কোনে তিনি বসে রইলেন। কথাই বলেন না। আসলে তিনি আমাকে ভালো করে দেখছেন। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি সিনেমায় অভিনয় করতে অফার করা হয়, রাজি হবেন?’ সোজাসুজি বললাম, ‘আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে মেয়েদের সিনেমায় অভিনয় করা এখনো ভালোভাবে দেখা হয় না। আমার মা-বাবা রাজি হবেন না।’ কেন এই প্রশ্ন জানতে চাইলে এড়িয়ে বললেন, ‘সিনেমা দেখেন?’ ‘দেখি। তবে ছবিতে অভিনয় করার আগ্রহ আমার নেই।’ খুব হতাশ হয়ে গেলেন। পরে বলেছেনও, ‘এত বছর পর একটি মেয়েকে খুব পছন্দ হলো আর সে কি না মুখের ওপর না বলে দিল। অথচ সে আমার নায়িকা হিসেবে পারফেক্ট।’ তার পরও বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আম্মুকে বললেন, ‘খালাম্মা, এক পরিচালক নতুন নায়িকা নিয়ে ছবি করতে চাচ্ছে, তাকে চিনি। আপনার মেয়েকে তো ভালো করে দেখলাম, ভালো লেগেছে। নায়িকা হিসেবে কাস্ট করলে অভিনয় করতে দেবেন?’ আম্মু নাকচ করে দিলেন—‘প্রশ্নই আসে না, যাও তো বাবা।’ তিনি শেষ চেষ্টা করলেন, ‘এক ভদ্রলোকের নম্বর দিচ্ছি, টেলিফোন দিলে প্লিজ কথা বলবেন।’ লোকটিই সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, আনন্দ মেলা মুভিজের অন্যতম পার্টনার, দিলখোলা মানুষ। তাঁর সঙ্গে আলোচনার পর আমারও তীব্র আগ্রহ জন্মাল। সোহান ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, নায়িকা হতে হলে কী করতে হয়? বললেন, ‘কিছুই করতে হবে না, মা-বাবাকে রাজি করাও।’ মা-বাবা, আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনায় কয়েক মাস কেটে গেল। পাঁচ-ছয় মাস যোগাযোগ নেই। বাসায় বলেছি, ‘গল্পটি খুব পছন্দ হয়েছে, জুহি চাওলার চরিত্রও খুব ভালো। এ ছবিই করব আর নয়, মডেলিংয়ে থাকব।’ বাবা সমর্থন দিলেন, ‘আমার মেয়ে কোনো খারাপ কাজ করে না, মডেলিং করেছে, খারাপ হয়েছে?’ শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে নায়িকা হতে আম্মুকে রাজি করালেন।

 

অন্য পরিচালকরা নতুন সম্ভাবনাময়ী নায়িকাকে নিয়ে ছবি করতে চাননি?

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামতে’ সাইনের পর একে একে অফার আসতে লাগল। মমতাজ আলী, এহতেশাম, শেখ নজরুল ইসলাম, দিলীপ সোম, এ জে মিন্টুর মতো পরিচালকরা তাঁদের ছবিতে নায়িকা হওয়ার জন্য অফার করলেন। মিন্টু সাহেব তাঁর প্রথম প্রেমের ছবির জন্য অফার দিয়েছিলেন; কিন্তু আমি শর্ত ভঙ্গ করিনি। অবশ্য পরে বিখ্যাত এই পরিচালকদের সবার ছবিতেই নায়িকা হয়েছি। সোহান ভাই নায়ক হিসেবে নোবেল ভাই বা তৌকীর (আহমেদ) ভাইকে ফাইনাল করলেন। পরে জানলাম, নোবেল ভাই, তৌকীর ভাই চাকরি, পড়ালেখা ফেলে সময় দিতে পারবেন না।

 

সালমান শাহ কিভাবে এলেন?

সোহান ভাই ‘হিরো’ না পেয়ে খুব হতাশ হয়ে হিরো খুঁজতে লাগলেন। পরে বললেন, ‘তোমার জন্য একজনকে পেয়েছি, চলো, তাকে দেখবে।’ ‘ছেলেটি সুন্দর?’ ‘হ্যাঁ আমার কাছে ভালো লেগেছে, তোমার কেমন লাগে দেখব।’ তিনি আমাকে তাঁর কোনো বিবরণ দিলেন না, নামও বলেননি। ধানমণ্ডির প্রথম স্থাপিত হওয়া চায়নিজ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বললেন, “এখানে যেসব ছেলে আসবে, তাদের মধ্যে তোমার নায়ক কে দেখে আমাকে বলবে, তাহলে বুঝব সে ‘হিরো’ হতে পারবে।” সেই বিকেলে আমি, আম্মু, গুলজার ভাই, সোহান ভাই গল্প করলাম। সবাইকে দেখে ধারণা করছি। হঠাৎ একজন ঢুকল, আমারও চোখে পড়ে গেল। কাছে আসতে লাগল, সোহান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি যেন চেনেনই না, গল্প করছেন। ছেলেটিকে কোথায় যেন দেখেছি—‘সোহান ভাই, আপনার হিরো আসছে।’ তিনি হেসে বললেন, ‘ওয়েল ডান।’ ‘আপনি দেখেন’ কথা বলার পর তিনি তাকালেন। সে এলো। তিনি বসতে বললেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন, “মৌসুমী, তোমার হিরো ‘ইমন’।” হাই-হ্যালো হলো। সোহান ভাই ফটোসেশনের সময় ঠিক করে বললেন, “ছবিতে যদি দুজনকে মানায়, তাহলেই কিন্তু ‘হিরো-হিরোইন’ হবে। আপত্তি আছে?” নেই। ফটোসেশনে আবিষ্কার হলো, আমরা ছোটবেলার বন্ধু! আনন্দ মেলা মুভিজ আমাদের তিনটি ছবিতে কন্ট্রাক্ট করল। ওর নাম দেওয়া হলো ‘সালমান শাহ’।

 

আপনারা কি আগে অভিনয় করেছিলেন? 

সালমানের নানা, বাবাও অভিনয় করতেন। ছোটবেলায় সে-ও অভিনয় করেছে। অল্প-বিস্তর অভিনয় জানে, বিজ্ঞাপন করেছে, কিন্তু ফিল্ম ক্যামেরার সামনে, অন্য কোথাও অভিনয়ের অভিজ্ঞতাই তো আমার নেই। ফলে খুব ভয় হলো। সালমান খুব সাহায্য করল।

 

সালমান শাহর ফ্যাশন ট্রেন্ড এখনো অনন্য কেন?

ছবিটি সুপারহিটের এ-ও অন্যতম কারণ। আমাদের দুজনের কস্টিউম সেন্স, ফ্যাশন ভাবনা খুব মিলেছে। সালমান শাহর ভেতরে আমির খান ও সালমান খানের ফ্যাশন ট্রেন্ডের সমন্বয় ছিল। সে তাঁদের দুজনের চলাফেরা, অ্যাকটিং, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক মিলিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। তাতে ওকে খুব মানিয়েছেও। ফ্যাশনের বিষয়ে সে নিজের ভাবনাকেই সব সময় গুরুত্ব দিয়েছে। সালমানের কপাল খুব চওড়া বলে অনেকে শুটিংয়ে সময় পরামর্শ দিয়েছেন, উইগ পরলে তাকে ভালো লাগবে, কিন্তু সে তাতে রাজি না হয়ে বলেছে, ‘আমি কেন উইগ পরব?’ সে কারো পরামর্শে কখনো পোশাক পরেনি, ভালো লাগা থেকে পরেছে। ইচ্ছা হলে ব্যান্ডানা পরেছে। অন্যদের মতো নয়, নিজের মতো করে ট্রেন্ড চালু করায় সে ‘আইকন’ হয়েছে।

 

আপনার স্টাইলও তো সুপার হিট?

আমার হেয়ার স্টাইল, সাজগোজ মেয়েরা খুব পছন্দ করেছে। আমি খুব হাসিখুশি মেয়ে, তারা সেটিও খুব অনুসরণ করত। এই নিষ্পাপ চেহারাটি ছেলে-মেয়ে দুই শ্রেণির কাছে আমাকে নিয়ে গেছে, নবীন হিসেবে অভিনয়ে খুব সাহায্য করেছে। ফলে এই ছবিতে আমাকে অভিনয় করতে হয়নি, আমি নিজেকে তুলে ধরেছি। সোহান ভাই বলেছিলেন, ‘মৌসুমী, অভিনয় করতে যেয়ো না, যেভাবে কথা বলো, চলাফেরা করো, করো। মনে করো, ক্যামেরা বলে কিছু নেই।’ সত্যি বলি—আমি কিন্তু অভিনয়ের চেষ্টা করেছি। তাতে ২০-২২টি শট নেওয়ার পরও তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছেন, ‘শটটি হয়নি।’ আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যেত। তিনি বিশ্রামের অনুমতি দিতেন। ফিরে এলে বলতেন, ‘এখন রিহাসার্ল করছি, তুমি ও সালমান কথা বলো।’ ফলে স্বাভাবিক আচরণ করতাম। বারবার রিহার্সালে যখন দৃশ্যটি ভালো হতো, তার আগে তিনি অন্যদের রেডি করে ফেলতেন। তিনি কিভাবে দৃশ্যটি ধারণ করে ফেলতেন নিজেদেরও খেয়াল হতো না। পরে ক্যামেরায় শট দেখে বুঝতে পারতাম, পরিচালক দৃশ্যটি এভাবে চেয়েছেন। আমি পুরো সিনেমায় শিখতে শিখতে কাজ করেছি, চলচ্চিত্রে আমার অভিনয় শিক্ষা এভাবে হয়েছে।

 

সালমানের সঙ্গে প্রথম ছবিতেই কেন দূরত্ব হলো?

ছবির ডাবিংয়ের সময়ই সালমান সামিনার সঙ্গে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে গেল। সেই ঘটনা আমরা ছোটবেলার বন্ধুরা জানতাম।  সে গোপনে বিয়ে করল, এমনকি তাদের দুই পরিবারও জানল না। ছবির স্বার্থে সেসব সোহান ভাই, সাংবাদিকদের বলিনি। টিনএজ বয়সের ছেলে, হিরো হিসেবে প্রথম ছবিতে অভিনয়ের সময়ই বিয়ে করল, ভক্তরা জেনে গেলে তার ক্যারিয়ারের বিশাল ক্ষতি হবে ভেবে আমরা ধামাচাপা দিলাম। বিয়ে নিয়েই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে মান-অভিমান হলো। বাধা দেওয়ার পরও সে কথা কানে নেয়নি বলে আমার সঙ্গে ওর দূরত্ব তৈরি হতে লাগল। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হলো। প্রথম ছবিতেই ‘সালমান শাহ-মৌসুমী’ জুটির ভাঙন শুরু হলো। ছবিটি সুপারহিট হওয়ার পর সালমান নিজেই বিয়ের ঘোষণা দিল।

 

তাঁর প্রতি আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল?

সেই বয়সে, সেই অবস্থায় আগ্রহের বিষয়টি মাথায়ই আসেনি। ছোটবেলা থেকে আমরা খুব ভালো বন্ধু—এই ভেবেছি। সেই অবস্থায় খেয়াল করে উঠতে পারিনি—আগ্রহটি অন্য দিকে যাওয়া উচিত। তখন আমরা এত ভালো বন্ধু ছিলাম যে এক দিন একজনের সঙ্গে অন্যের দেখা না হলেই খুব খারাপ লাগত। সেই দিনগুলো, মজার সময়গুলো এখনো খুব মিস করি। শুটিংয়ের বাইরেও আমরা একসঙ্গে চলাফেরা করতাম, বন্ধুদের দল ছিল। সালমানের বিয়ের পর দলটি ভেঙে যেতে লাগল।

 

আপনি প্রেম করেননি?

কলেজে পড়ার সময় পারিবারিকভাবে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তখন ধানমণ্ডির উইমেন্স ফেডারেশন কলেজে পড়ি। বাবা নেই, মা-বোন; বড় ভাই-ভাবি-সন্তানরা আছে। এটি ছোট এবং ভালো পরিবার ছিল। সবাই খুব আদর করতেন। তবে আমাদের পরিবার ভাবল, ছেলে তো প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে খুব ভালো হলেও তারা আগ্রহ দেখাল না। ছেলেটির আমার প্রতি খুব খেয়াল ছিল, সম্পর্কেও সৎ ছিল। পরিবার চায়নি বলে এগোতে পারিনি। আমাদের দুজনেরই সংসার হয়েছে। তাই নামটি বলতে চাই না। সেটিই প্রথম। গভীর প্রেম ওমর সানীর সঙ্গেই হয়েছে, অন্য কারো সঙ্গে নয়।  

        

পরের ছবির নাম কেন ‘মৌসুমী’?

ছবিটি করেছেন আমার চাচা মোশাররফ হোসেন। তিনি ও আনসার রহমান মিলে ‘অজান্তা কথাচিত্রে’র মালিক। তাঁর কাজ না করে আনন্দ মেলার কাজ করেছি বলে তিনি কিন্তু খুব মাইন্ড করেছেন। তবে প্রথম ছবি সুপারহিট হওয়ার পর খুব খুশি হলেন—ভাতিজি সম্মান রাখতে পেরেছে। আমি প্রথম ছবি হিসেবে আনন্দ মেলায় সাইন করতে চাইনি। সোহান ভাইও উঠতি পরিচালক ছিলেন। বাংলা ছবির সুপারহিট নায়িকাদের আবিষ্কারক এহতেশাম দাদুর ছবিটি করতে চেয়েছিলাম। তবে গল্প পড়ে ফেরত দিতে হয়েছে। চাচাও বলেছেন, ‘আনন্দ মেলার চরিত্র ভালো, অভিনয় করো। এরপর আমার ছবিতে কাজ করো।’ পরে তাঁর ছবির নাম কী হবে—এই প্রশ্ন এলে, তিনি প্রথম ছবিতেই সুপারস্টার ভাতিজির নামে ছবির নাম রাখলেন ‘মৌসুমী’।

 

ওমর সানী নায়ক হলেন কিভাবে?

এ ছবির নায়ক সালমানই ছিল, কিন্তু পরে যখন সে গল্প জানল, বলে দিল—অভিনয় করবে না। হয়তো তাকে পরিবার বা অন্য কেউ বুঝিয়েছিল, আমি জানি না—সে বলেছিল, ‘মৌসুমীর নামের ছবিতে আমি কেন নায়ক হবো? আমার নামে হলে করব। এই ছবিতে আমিই সুপারস্টার হবো।’ ফলে আমাদের আরো দূরত্ব তৈরি হলো। নিজে নাম ঠিক করিনি বলে এই কথায় খুব কষ্ট পেলাম। অভিভাবকদের ওপর তো কোনো কথা বলা চলে না। তাঁরা খেপে গিয়ে বললেন, ‘সালমানকে লাগবে না, সে বাদ; তোমার সঙ্গে প্রথম বিজ্ঞাপনের ছেলেটিকে নায়ক নেব।’ গল্পটি হলো—মেয়েটির জন্য ছেলেটি পাগল হয়ে থাকে, তার জন্য সব কিছু করতে পারে। সেই ছেলেটির নাম ‘ওমর সানী’।

 

আপনার নায়করা?

আমি ও সালমান শাহ তো একসঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দিলাম। এরপর ওমর সানীর সঙ্গেই বেশি কাজ করেছি। তবে যে সময় বেশি কাজ পাচ্ছিলাম, তখন সে এত আনফিট ছিল—(এই পর্যায়ে ওমর সানী বললেন, “মৌসুমীর কাছে আমি ‘স্যরি’ বলছি, তখন শতভাগ ফিট থাকলে এত দিনে আমার ও মৌসুমীর ১৫-২০টি ছবি হয়ে যেত।”) তার পরে বিয়ে হলো, সানীর সঙ্গে কাস্টিংও কমে গেল। এরপর শহীদুল ইসলাম খোকন ভাইয়ের ‘বিশ্বপ্রেমিক’সহ বেশ কয়টি ছবিতে রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু আংকেলের ছবিগুলোতে সানী-বাপ্পারাজ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। ফলে সালমানের সঙ্গে কাজ করা হয়ে উঠল না। আমরা চারটি ছবিতে নায়ক-নায়িকা হয়েছি। এরপর দীর্ঘদিন আর আমরা জুটি হতে পারিনি। শেষদিকে তার সঙ্গে কিছু কাজের কথা হচ্ছিল, কিন্তু শেষ ছবি ‘স্নেহ’ মুক্তি পাওয়ার পর তো সে মরেই গেল। আর আমার হিরোদের সঙ্গে যে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগল। তখন মান্না ভাই নিজের প্রডাকশন থেকে আমাকে নিয়ে কাজী হায়াতের ‘লুটতরাজ’ করলেন। তাঁর অনেক দিনের ইচ্ছা, তিনি প্রযোজনা করলে আমি যেন কাজ করি। তিনি সিনিয়র আর্টিস্ট। এই ছবি হিট করার পর আমরা অনেক কাজ করেছি। তিনি আমার পরিবারের সদস্যের মতো ছিলেন। খুব মিশুক, সবার সঙ্গে এত মিশতেন যে আমরা কেউ তাঁকে এড়িয়ে চলতে পারতাম না। তিনি সবাইকে নিয়ে আটঘাট বেঁধে নামতেন। বেশির ভাগ সময় এফডিসিতে জুমার নামাজ পড়ে ছবির শুটিং শুরু করতেন। শুক্রবার সাধারণত কাজ করতে চাইতাম না, কিন্তু তাঁর নামাজ পড়া শেষ হতে হতে বাসার কাজ সেরে চলে আসতে পারতাম। মান্না ভাই মারা যাওয়ার পর আমার ‘হিরো’ হারিয়ে গেছে। তিনি মারা যাওয়ার পর সমান সমান অভিনয়ের সুযোগ আছে এমন অ্যাকশনধর্মী, সামাজিক অনেক গল্প নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর খুব চুজি হয়ে গিয়েছি। হিরোর সংকট হওয়ার পর থেকে ছবি করা কমিয়ে দিলাম। কিছু গল্পনির্ভর ছবি হয়েছে; নায়কের অত প্রাধান্য থাকেনি, সেগুলোতে অভিনয় করেছি। পরে ফেরদৌসের সঙ্গে কিছু মৌলিক গল্প, উপন্যাস, আর্ট ফিল্ম ধরনের ছবিতে অভিনয় করেছি। আমি এখন যে ধরনের গল্পে অভিনয় করি, সেগুলোর সবগুলোতে ফেরদৌস ‘হিরো’ হিসেবে মানানসই, তাকেই অনেক সময় নেয়। আমরাও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এখন আবার আমরা কিছু কাজ করছি, করব। এভাবে কাজ করতে করতে এই পর্যন্ত এসেছি। শেষ মুহূর্তে এসে দেখা যাচ্ছে, আমার হিরোই থাকছে না (হাসি)। তেমন কিছু গল্পও আমার কাছে এসেছে। যেমন গুলজার ভাইয়ের ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’য় ফেরদৌস একটি গানে অতিথি চরিত্র হয়েছে। সেখানে আসলে আমার কোনো নায়ক নেই। যে ছবিগুলোতে পুরস্কার পেয়েছি, তাতেও আমার হিরো নেই। নায়িকা বয়সের শুরু থেকেই হিরো নেই বলে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।   

                  

নায়িকা হিসেবে কতগুলো ছবিতে অভিনয় করেছেন? কোন চরিত্রগুলোতে অভিনয় করে মজা পেয়েছেন?

২০০ বা তারও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছি। কাজ করার সময় অনেক চরিত্রই মজা লেগেছে, কিন্তু দর্শকদের সেটি ভালো লাগেনি, খুব খারাপ লেগেছে। অনেক চরিত্রে অভিনয় করতে কষ্ট হয়েছে, কিন্তু ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকদের ভালো লেগেছে। তখন সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। তেমন চরিত্রের মধ্যে ‘মোল্লা বাড়ির বউ’-এ আমার চরিত্রটি খুব সাধারণ পরিবারের খুব সাধারণ একটি মেয়ের, কিন্তু অভিনয়ের সময় বুঝলাম—চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে খুব কষ্ট হচ্ছে; শুটিং করাই খুব কষ্টের ছিল। মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকদের ভালো লাগায় কষ্টগুলো ভুলে গেছি। এমন অনেক ছবিতেই কষ্ট করেছি, যেমন ‘গোলাপী এখন বিলেতে’র জন্য অনেক কষ্ট করেছি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছি; কিন্তু দর্শকদের অতটা ভালো লাগেনি। ফলে মনে হয়েছে, গুণী চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন ছবিটির জন্য অনেক কষ্ট করেছেন; আমরাও করেছি। গোলাপী চরিত্রটির সঙ্গে তো বাংলাদেশের দর্শকরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে; এটি ‘প্রতীকী চরিত্র’; এ দেশের প্রতিটি মেয়ে একেকজন ‘গোলাপী’; প্রত্যেকের জীবনে একেক ধরনের সংগ্রাম আছে, সেই সংগ্রামী দৃষ্টিকোণ থেকেও ছবিতে গোলাপীর সংগ্রাম ফুটে উঠতে গিয়েও ফুটে উঠল না। হতে পারে গল্পের কোনো মোচড়ের পর দর্শকদের বাকিটুকু ভালো লাগেনি, তারা গোলাপীকে গ্রহণ করতে পারেনি। ছবিটির কিছু অংশে মজা পেয়েছি; কিছু অংশে পাইনি। প্রথম অংশ খুব ভালো লেগেছে; পরের অংশে সে যখন বিলেতে চলে গেল, কেন জানি আমিই শান্তি পাচ্ছিলাম না। চরিত্রটিও আগের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল, গল্পও। তখনই হচ্ছিল, মনমতো হচ্ছে না। কোথায় যেন ‘গ্যাপ’ থেকে যাচ্ছে। তার পরও পরিচালক অনেক কষ্ট করে ছবিটি শেষ করলেন।

 

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, উত্তরা, ঢাকা) 



মন্তব্য