kalerkantho


এত্ত বড় অ্যাকোয়ারিয়াম!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অ্যাকোয়ারিয়ামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টার জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়ামকে। ৫০০ প্রজাতির এক লাখ ২০ হাজার সামুদ্রিক প্রাণী আছে এখানে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এত্ত বড় অ্যাকোয়ারিয়াম!

ক্রিস্টাল আর জাস্টিনের প্রেমের শুরুটা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। আর শুরু হতে না হতেই প্রেম এমন গভীর হয়ে গেল, মাস তিনেকের মধ্যেই তারা বিয়েটাও সেরে ফেলল।

তবে আসল খবর সেটা নয়। তাদের বিয়েটা ঐতিহাসিক হয়ে আছে অন্য কারণে। তাদের বিয়েতে শুধু মানুষই নয়, অতিথি ছিল রাজ্যের সব সামুদ্রিক মাছও! অতিথির লম্বা তালিকায় তিমি আর হাঙরও ছিল।

না, তারা সাগরতলে গিয়ে বিয়ে করেনি। বিয়ের কাজটা সেরেছে একটা অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে। কিন্তু সাধারণত ঘরের ভেতর যে ছোটখাটো অ্যাকোয়ারিয়াম দেখা যায়, এটা মোটেই সে রকম কিছু নয়। এই অ্যাকোয়ারিয়াম ঘরের ভেতর থাকে না; বরং কয়েক শ ঘর এর ভেতর সেঁধিয়ে যাবে। অ্যাকোয়ারিয়ামটির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে। নামও রাখা হয়েছে ওই অঙ্গরাজ্যের নামেই জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়াম। আর ওটা এতই বড় যে ৮৫ লাখ গ্যালন পানি আটে! আছে ৫০০ প্রজাতির প্রায় এক লাখ ২০ হাজার সামুদ্রিক প্রাণী। আর তাদের দেখার জন্য অ্যাকোয়ারিয়ামে যে জানালাগুলো আছে, শুধু সেগুলোরই দৈর্ঘ্য ১২ হাজার বর্গফুট! যখন বানানো হয়েছিল, তখন এটিই ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম অ্যাকোয়ারিয়াম। এখন অবশ্য চীনের চিমেলং ওশেন কিংডমের বদৌলতে জর্জিয়া চলে গেছে দুইয়ে।

এই জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়ামের অধিবাসীদের মধ্যে আছে তিমি, হাঙর, ইলেকট্রিক ইল, পেঙ্গুইন, ভোঁদড়, রে মাছ, সিহর্স, সি-স্টার, কাঁকড়া আর দুনিয়ার নানা জাতের মাছ। এখন প্রশ্ন হলো, এই সামুদ্রিক প্রাণীগুলো অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতর থাকে কী করে? সে জন্য অ্যাকোয়ারিয়ামটিতে লবণ-পানি দেওয়া হয়। ৮০ লাখ গ্যালন সাধারণ পানি দেওয়া হলে তাতে ১৫ লাখ গ্যালন লবণ মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই এত পরিমাণ পানি পরিষ্কার করাটাও একটা বিশাল ঝক্কি। সে জন্য অ্যাকোয়ারিয়ামটিতে আছে ২১৮টি পাম্প, ১৪১টি বালুর ফিল্টার আর ৭০টি প্রোটিন স্কিমার। এগুলো দিয়ে প্রতি মিনিটে দুই লাখ ৬১ হাজার গ্যালন পানি বিশোধন করা যায়। এর পরও পুরো অ্যাকোয়ারিয়ামের পানি পরিষ্কার করতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে যায়।

অ্যাকোয়ারিয়ামটির অধিবাসীদের জন্য শুধু বিপুল পানিই নয়, অন্য প্রায় সব কিছুরই ব্যবস্থা আছে। তাদের খাবারদাবার সংরক্ষণের জন্য আছে প্রায় ১০ হাজার কেজি ধারণক্ষমতার ফ্রিজার, সঙ্গে একটা তিন হাজার কেজির রেফ্রিজারেটর। এমনকি ওরা অসুস্থ হয়ে পড়লে সেবাযত্ন করার জন্য নিজস্ব ভেটেরিনারি সার্ভিসও আছে। শুধু তা-ই না, ওদের সেবা-শুশ্রূষা করা হয় পাঁচ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটা আলাদা ইউনিটে। হাসপাতালের বেডের মতো সেখানে আছে ২৬টি ট্রিটমেন্ট ট্যাংক। এমনকি রেডিওগ্রাফি, অ্যান্ডোস্কোপি ও এক্স-রের ব্যবস্থাও আছে। শুধু এ ইউনিটেই কাজ করে ১৫ জন। আর পুরো অ্যাকোয়ারিয়ামটির লোকবল ১০০ জনেরও বেশি। আর সব বাদ দিলেও এত বড় অ্যাকোয়ারিয়ামের ট্যাংকগুলোতে পানির মাত্রা ঠিক রাখা, তাপমাত্রা পরিমাণমতো রাখা বা পানির প্রবাহ ঠিকঠাক রাখা—এগুলোর কোনোটাই তো আর মুখের কথা না।

জর্জিয়ার এই অ্যাকোয়ারিয়ামটি বানানোর উদ্যোগ নেন ব্যবসায়ী বের্নার্ড মার্কাস। তাঁর স্বপ্ন ছিল, নিজের শহর আটলান্টাকে এমন কিছু উপহার দেবেন, যেটা আটলান্টার মানুষের জানাশোনার কাজেও লাগবে, আবার ওখান থেকে শহরটায় বেশ ভালো ব্যবসাও জমবে। ভাবতে ভাবতেই তাঁর মাথায় চলে এলো বিশালায়তন অ্যাকোয়ারিয়াম বানানোর ভাবনা। একে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশের বড় বড় সব অ্যাকোয়ারিয়ামগুলোতে। ১৩টি দেশের মোট ৫৬টি অ্যাকোয়ারিয়াম দেশেশুনে এসে, তবেই তিনি এই জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়াম বানানোয় হাত দেন। নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৫ সালে। মোট খরচ পড়েছিল ২৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন মার্কাস একাই। বাকি ৪০ কোটি টাকার জোগান দেয় আটলান্টার বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। আর জায়গাটা দিয়েছিল কোকা-কোলা।

অত বড় অ্যাকোয়ারিয়াম তো পায়ে হেঁটে ঘুরে শেষ করাটা ভীষণ মুশকিলেরই ব্যাপার। তাই দর্শনার্থীদের জন্য আছে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়রবেল্টের ব্যবস্থা। এটিতে চড়ে ১০০ ফুট লম্বা স্বচ্ছ টানেল দিয়ে ট্যাংকগুলোর একদম নিচ দিয়ে ঘুরে আসা যায়। নিচ থেকে দেখে আসা যায় বিভিন্ন ট্যাংকের মাছগুলো। আর বাইরে থেকে অ্যাকোয়ারিয়ামটিতে ঢুকলেই একটি বিশাল রোমান স্থাপত্যের হলঘর পড়ে। তার চারপাশে মোট পাঁচটা পথ; পাঁচ পথে অ্যাকোয়ারিয়ামের পাঁচটি ট্যাংকি বা বলা যেতে পারে গ্যালারি—জর্জিয়া এক্সপ্লোরার, ট্রপিক্যাল ডাইভার, ওশেন ভয়েজার, কোল্ড-ওয়াটার কোয়েস্ট এবং রিভার স্কাউট। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্যাংক ওশেন ভয়েজার। পুরো অ্যাকোয়ারিয়ামের যত পানি লাগে, তার চার ভাগের তিন ভাগই লাগে এই অংশে। হাঙর-তিমির মতো বড় মাছগুলো সব এখানেই থাকে।

ক্রিস্টাল আর জাস্টিনের এমন সাহস, এই ওশেন ভয়েজারের ভেতরেই তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এমনিতে জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে বা বিচ্ছেদ—সবই অহরহই হয়। ওখানে প্রেম নিবেদনের বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার নানা বন্দোবস্তুও আছে। কিন্তু অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে ঢুকে হাঙর-তিমিদের পাশে নিয়ে বিয়ে করা? সে নিতান্তই পাগুলে কাণ্ড! নির্ঘাত ক্রিস্টাল আর জাস্টিন ঘোরতর পাগল দম্পতি। সে জন্যই তো গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেখিয়েছে তারা। এখন তাই তারা রেনল্ডস দম্পতি ক্রিস্টাল রেনল্ডস এবং জাস্টিন রেনল্ডস।

তবে ওশেন ভয়েজার নয়, এই জর্জিয়া অ্যাকোরিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত এখানকার ডলফিন শো। দৈনিক এই ডলফিন শোটার নাম ‘এটিঅ্যান্ডটি ডলফিন সেলিব্রেশন’। তাতে ট্রেইনারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডলফিনের দেখানো নানা কৌশলে দর্শনার্থীদের রীতিমতো তাক লেগে যায়। আর তাক লাগানো এই অ্যাকোরিয়ামটা বছরের ৩৬৫ দিনই খোলা থাকে। প্রতিদিন খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে শনিবারগুলোতে খুলে দেওয়া হয় এক ঘণ্টা আগেই। আর বিশাল এই অ্যাকোরিয়ামটা ঘুরেফিরে দেখার জন্য ৩০-৪০ ডলার খরচ করতে হয়।


মন্তব্য