kalerkantho


সন্ধ্যার পর কেউ আসেনি

ধ্রুব নীল

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সন্ধ্যার পর কেউ আসেনি

অঙ্কন : মানব

আগস্টের এক তারিখ রাতে পঁচিশ বছরের তরুণী বীথি যখন নিজের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে খুন হয় তখন কক্সবাজারের পাঁচতলা বাড়িটির নিচতলায় কেউ ছিল না। দোতলায় বাড়িওয়ালা ও তার পরিবার, তিনতলায় থাকত বীথি, চারতলার স্বামী-স্ত্রী ও তাদের এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এবং পাঁচতলার দুই বাসিন্দা মোরশেদ আলম ও তার স্ত্রী নুসরাতের নাম পুলিশ অফিসার আবুল কালামকে তাই নোটবুকে টুকে নিতে হয়।

সন্দেহের তালিকায় আছেন বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা আজগর মুনশি থেকে শুরু করে চারতলার আঠারো বছর বয়সী মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরী শিউলি। শিউলিকে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ছুরি হাতে দেখেছে বাড়ির মালিকের বাসার গৃহপরিচারিকা লাভলি। বয়স কম হলেও শারীরিক বৃদ্ধিতে সে নাকি যথেষ্ট শক্তিশালী।
বাসায় একা থাকতেন বীথি। আত্মীয় কেউ নেই। মাঝেমধ্যে দুয়েকজন এলেও ঘটনার আগে-পরের এক সপ্তায় কাউকে আসতে দেখেনি কেউ। খুন হওয়া তরুণী বীথি পেশায় চিত্রশিল্পী ও ডিজাইনার ছিলেন। অনলাইনে বসে বাইরের প্রতিষ্ঠানের কাজ করতেন।
রাত দশটার দিকে সিঁড়ি দিয়ে নিজের বাসায় যাওয়ার সময় বীথির সামনের দরজা খোলা দেখে ডাকাডাকি করেন রোকেয়া বেগম। মধ্যবয়সী এ গৃহিণী তারপর বীথির ঘরে ঢোকেন। ভেতরে শোবার ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত লাশ দেখে চিত্কার করে সবাইকে ডাকেন। এরপর পুলিশে ফোন করেন বাড়িওয়ালা আজগর মুনশি। মুনশির বাসায় আছে তার অসুস্থ স্ত্রী ও ক্লাস এইটে পড়া নাতনি লতা। কালামের সন্দেহের তালিকায় এ দুজন নেই।
ইন্সপেক্টর কালাম চোখ বুলিয়ে নিলেন ঘটনাস্থলে। প্রাথমিক রিপোর্টে যা লিখলেন তার মধ্যে রয়েছে—লাশের শরীরে আংশিক ধস্তাধস্তি ও ছুরির আঘাতের চিহ্ন। আঘাত অগভীর (এক দেড় ইঞ্চি)। লাশ উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ঘাড়ে ও গলায় এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে। মুখে দাগ দেখা গেছে। কাপড় বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে বাঁধা ছিল। পোশাক পরা অবস্থাতেই ছুরিকাঘাত করে আততায়ী। পাশেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটি অসমাপ্ত পেইন্টিং। হাত দিয়ে একবার উল্টে দেখেছেন কালাম। শুধু মুখটা আঁকা হয়েছে। তাতেই শিউলির মুখ বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। মনে মনে ভাবলেন কালাম, মেয়েটার আঁকার হাত তো বেশ!
পুলিশ সদস্যদের কয়েকজন এখনো ক্রাইম সিন থেকে আলামত সংগ্রহ করে চলেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সুবিধার জন্য সবাইকে বীথির ফ্ল্যাটের সাজানো-গোছানো ড্রয়িং রুমেই বসতে বলেছেন এসআই কালাম।
বাড়ির গেটের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সন্ধ্যায় রোকেয়া বেগমকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বের হতে ও দশটার দিকে ঢুকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ফুটেজে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাউকে আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়নি। গেটের তালাও যেমন ছিল তেমনই আছে।
‘এখন বাজে রাত একটা। খুনটা হয়েছে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দশটার মধ্যে। আর এটাও পরিষ্কার যে এই বাড়িরই কেউ একজন সম্ভবত খুনটা করেছে। এখন বলুন ওই সময় আপনারা কে কোথায় কী করছিলেন। ’
সাধাসিধেভাবে কথাগুলো বলার সময় ইন্সপেক্টর কালাম খুব দ্রুত আসলে প্রত্যেকের চোখ দেখলেন। বহু দিনের প্রশিক্ষিত চোখ তাঁর। রীতিমতো স্ক্যানারের কাজ করে। অনেকগুলো চোখেই অস্বাভাবিকতা টের পেলেন। তবে এর মাঝে খুনি একজনই।
বাড়িওয়ালা : আমি তো রোকেয়ার চিত্কার শুনেই আসি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হয়। তাই আসতে একটু দেরি হয়। আর তার আগে কী যে করেছিলাম...সম্ভবত রাহেলা মানে আমার স্ত্রী, স্ট্রোক করার পর অনেক দিন ধরে বিছানায়। তাকে ওষুধ দিয়েছিলাম। আর হ্যাঁ, লাভলি, তুই কই ছিলিরে।
লাভলি : আমি আর কই থাকমু। হবায় চুলায় ভাত বহাইসি। হেরপর চিক্কুরবিক্কুর হুনি উইঠা আসি।
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মোরশেদ আলম বললেন, ‘আমি সন্ধ্যা ছটার দিকে একবার নিচে আসি। উনাদের মেয়ে, কী যেন নাম, ও হ্যাঁ, শিউলি। তাকে দেখলাম বেঢপ সাইজের একটা কাস্তের মতো ছুরি হাতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকবার বললাম, ওটা আমাকে দিয়ে দিতে। কিন্তু উল্টো আমাকে ভয় দেখাল। পরে ওকে দেখলাম চারতলা থেকে নিচের দিকে নামছে। মনে হচ্ছে ওই সময় ওর মা-বাবাকে না ডেকে ভুল করেছি।
রোকেয়া বেগমের স্বামী : আমি টিভি দেখছিলাম। রোকেয়া গিয়েছিল পাশের সুপারশপে কেনাকাটা করতে। সে-ই আসার সময়...।
রোকেয়া : আমি বাড়ির মেন গেটের তালা মেরেই বাইরে গিয়েছিলাম। আর এর মাঝে তো কেউ ঢোকেনি। আমি তিনতলায় উঠেই দেখি বীথির দরজা হাঁ করে খোলা। ওই সময় সাড়ে নয়টার মতো বাজে। ভাবলাম ওকে ডাক দিই। ভুল করে হয়তো খোলা রেখেছে। আর তারপর তো...।
কালাম : আপনার মেয়ে তো ওই সময় বীথির বাসাতেই ছিল? ও তখন যে জামা পরেছিল ওটা কি দেখাতে পারবেন?
রোকেয়া : দেখুন, আমার মেয়ে, মানে শিউলি আমার পালিত মেয়ে। তাও মেয়েই। ছোট থেকেই বড় করেছি। ওর একটু সমস্যা আছে, সত্য কথা। কিন্তু ও কখনো কাউকে খুন করবে না। ওর রাগ আছে অনেক। কিন্তু এমনটা তো হবে না। বীথির বাসায় সে মাঝেমধ্যেই যায়। আমরা কখনো না করিনি। আজও হয়তো...। কিন্তু শিউলির পক্ষে কি আদৌ খুন করা সম্ভব, বলুন? ওর জামাটা নোংরা হয়ে গিয়েছিল। আমি ওটা ইয়ে...ধুয়ে ফেলেছি। ও এখন ঘুমাচ্ছে। আপনি আসুন বাসায়, ওর জামা-কাপড়গুলো দেখুন, পরে না হয় জিজ্ঞাসাবাদ...।
রোকেয়া বেগমের স্বামী : শান্ত হও। উনি উনার কাজ করবে। একটু তদন্ত করলেই জানা যাবে শিউলি কিছু করেছে, কী করেনি।
কালাম : ঠিক বলেছেন। আপনি টিভিতে কী দেখছিলেন ওই সময়?
থতমত খেয়ে গেলেন শিউলির বাবা।
শিউলির বাবা : অ্যাঁ, ইয়ে তা তো...খবরই দেখছিলাম। এত এত চ্যানেল।
বাড়িওয়ালা : তা পুলিশ সাহেব, অনেক রাত তো হলো। আর আমরাও কেউ পালিয়ে যাচ্ছি না। গেলেও কোথায় যাব। সবার সব তথ্য তো আছে। এই আমার কাছেই আছে। সকালে না হয়।
কালাম : আপনার ঘুম পেয়েছে? ঘুমাবেন?
বাড়িওয়ালা : না মানে, রাহেলা একা তো। আচ্ছা লাভলি, তুই যা। আমি পরে আসছি।
কালাম : আচ্ছা লাভলি, তুমি যখন রান্না করছিলে, তখন আজগর সাহেব কোথায় ছিলেন।
লাভলি : কইতে পারি না। উনি তো ভাড়ার টাকা নিতে যান সবার কাছে।
আজগর মুনশি : এটা আমার অনেক দিনের অভ্যাস। মাসের এক তারিখে পাঁচতলা থেকে ভাড়া চাওয়া শুরু করি। তবে বীথির কাছে গত পাঁচ মাসে কখনোই দুবার চাইতে হয়নি। মাসের এক তারিখে কলিং বেল চাপলেই ও ভাড়ার টাকা বাড়িয়ে ধরে। খুব ভালো ছিল মেয়েটা। আজও দিয়েছে। ওই টাকা নিয়েই তো বাজার করতে গিয়েছিলাম।
মোরশেদের স্ত্রী : সন্ধ্যা সাড়ে আটটা বাজে। অফিস থেকে তাড়াতাড়িই ফেরা হয়েছিল আজ। রান্নার বন্দোবস্ত করছিলাম। কিন্তু কলে পানি ছিল না। এ জন্য ওকে (স্বামী) বলি মোটরটা ছেড়ে আসতে। এরপর দেখলাম আজগর সাহেব আমার কাছে ভাড়া চাইতে আসেন। আমরা আবার ৫-৬ তারিখের আগে বেতন পাই না। তাই দিতে পারিনি। এরপর উনি চলে যান।
কালাম : হুম! আপনারা সবাই ঘুমুতে যেতে পারেন, তবে (একজনের দিকে নির্দেশ করে) আপনি ছাড়া। আপনার সঙ্গে আমার আরো বাতচিত আছে।
বলুন কাকে নির্দেশ করে কথাটা বললেন ইন্সপেক্টর কালাম। কে সেই খুনি?


মন্তব্য