kalerkantho


দরজার ওপাশে

ইনকাদের পথ কাপাকনান

ইনকাদের কাপাকনান রাস্তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল ৩০ হাজার কিলোমিটারজুড়ে। আন্দিজ পর্বতমালা থেকে আমাজন পর্যন্ত ছয়টি দেশ ছুঁয়ে গেছে এই পথ। কোথাও কোথাও ১৮ মিটার পর্যন্ত চওড়া। এখন অবশ্য বেশির ভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ট্র্যাকার স্ট্যানজিয়ানো সম্প্রতি ইকুয়েডর থেকে পেরু পর্যন্ত এ পথের দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ইনকাদের পথ কাপাকনান

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যযুগের যে সভ্যতা মানুষকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে, সেটি দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতা। বিশেষ করে পেরুর কুসকোর এক পর্বত শিখরে অবস্থিত ইনকা শহর মাচুপিচু নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ পেরু যায় শুধু মাচুপিচু ঘুরে দেখতে। তবে এটাই ইনকা সভ্যতার একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। ইনকাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আর স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে আরো অনেক নিদর্শন। কাপাকনান তেমনই এক নিদর্শন। ২০১৪ সালে এটি ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবেও ঘোষিত হয়েছে। আর এই সাইট নিয়ে মানুষকে সচেতন করার ব্রত নিয়ে মাঠে নেমেছেন নিক স্ট্যানজিয়ানো।

সব মিলিয়ে ইনকা সভ্যতা নিতান্ত ছোট ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছিল এর বিস্তার। ছিল আন্দিজের আকাশছোঁয়া পর্বতমালা, আতাকামা মরুভূমির বিরান অঞ্চল, আমাজন অববাহিকার গহিন অরণ্যও।

ফলে ইনকাদের রাজধানী কুসকোর সঙ্গে বাকি সাম্রাজ্যের যোগাযোগ রক্ষা করাটা ভীষণই দুরূহ হওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবতা ছিল বিপরীত। কুসকো থেকে ইনকাদের সব বড় শহরে যাতায়াতের রাস্তা তো ছিলই, সে রাস্তা দিয়ে সবচেয়ে দূরের শহরেও মোটামুটি এক সপ্তাহের মধ্যেই চলে যাওয়া যেত। এমনকি ইনকাদের পতনেরও একটা বড় কারণ ছিল এই সহজ ও সুবিন্যস্ত যাতায়াতব্যবস্থা। ইনকাদের এই যে যোগাযোগব্যবস্থা বা রাস্তার নেটওয়ার্ক, সেটিরই নাম কাপাকনান।

ইনকা ভাষায় ‘কাপাকনান’ অর্থ ‘রাজকীয় পথ’। এই পথের ব্যাপ্তি থেকে ইনকা রাজ্যের বিশালত্বের সত্যিকারের ধারণাটি পাওয়া যায়। কাপাকনানের রাস্তার জাল ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার ছয়টি দেশজুড়ে—কলম্বিয়া থেকে শুরু হয়ে ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা হয়ে চিলিতে এসে শেষ হয়েছে। বেশ কয়েকটি পথ জোড়া লেগে এই কাপাকনান। সব মিলে পাড়ি দিয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার। চওড়ায় কোথাও কোথাও ১৮ মিটার পর্যন্ত। এই পথের দুটি ভাগ ছিল। একটি পাহাড়-পর্বতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, আর আরেকটি গিয়েছিল উপকূল ধরে। এই কাপাকনান ইনকাদের সব বড় শহরকে যুক্ত করেছিল। আর শহরের ভেতরকার রাস্তগুলো এসে যুক্ত হয়েছিল মূল সড়কের সঙ্গে। এভাবে শুধু বড় শহরগুলোই নয়, ইনকাদের সব জনবসতিই এক সুতায় গেঁথেছিল কাপাকনান।

ইনকারা এই রাস্তাগুলো বানিয়েছিল মূলত তাদের পূর্বসূরিদের ব্যবহৃত পথগুলোকে ভিত্তি করে। কয়েক শ বছর ধরে গড়ে তোলা হয় রাস্তার এই দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক। কোথাও সে পথ গেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুট ওপর দিয়ে, কোথাও জলাশয়ের ভেতর দিয়ে, কোথাও ভীষণ গরম জঙ্গল দিয়ে, কোথাও আবার একদম নিষ্প্রাণ মরুভূমির বুক চিরে। এই বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য রাস্তা বানাতে গিয়ে ইনকাদের নানা কারিকুরি করতে হয়েছিল। কোথাও গিরিখাদ আর উপত্যকা এড়াতে রাস্তাকেও চলতে হয়েছে এঁকেবেঁকে। জলাশয়ের ভেতর দিয়ে বানাতে হয়েছে বাঁধের মতো উঁচু রাস্তা। আবার কোথাও কোথাও এসবেও কাজ হয়নি, বানাতে হয়েছে সেতু। দড়ি দিয়ে বানানো ইনকাদের একেকটা সেতু ৯০ হাজার কেজি পর্যন্ত ওজন নিতে পারত। ওগুলো ক্ষয়ে গিয়ে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রতিবছর সেতুগুলো নতুন করে বানানো হতো।

এই কাপাকনান দিয়ে ইনকাদের এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াত করত ইনকা ব্যবসায়ী, সৈন্য, পথচারী আর ‘চাস্কি’রা। চাস্কিরা ছিল ইনকা সভ্যতার সংবাদবাহক বা ডাকহরকরা। আর চলত লামার ক্যারাভ্যান। লামা নামের এই সাদা রঙের পশুগুলো স্বভাবে ভীষণ গোঁয়ারই বটে। ঘোড়া-গাধার মতো এদের দিয়ে সহজেই কাজ করানো যায় না। একটু মন বেজার হলেই এরা থুথু ছিটায় আর না যাওয়ার জন্য পথের মধ্যেই শুয়ে-বসে পড়ে। তবু ইনকারা তাদের ক্যারাভ্যানে লামাদেরই নিত, কারণ এদের পায়ের তলা বা খুর অন্য মালবাহী প্রাণীদের তুলনায় নরম। তাই রাস্তার ক্ষতিও হতো কম। কাপাকনানের এই যাতায়াতকারীদের জন্য পুরো রাস্তায় প্রায় দুই হাজার অস্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণ করা হয়েছিল। এই আবাসস্থলগুলো খুব হিসাব করে বানানো হয়েছিল, যাতে সকালে একটা থেকে রওনা দিলে রাত হতে হতে আরেকটায় পৌঁছে যাওয়া যায়। এই হিসাবে, কাপাকনান দিয়ে পেরুর কুসকো থেকে ইকুয়েডরের কুইটোতে যেতে ইনকাদের সময় লাগত মাত্র সাত দিন।

ইনকাদের এই রাস্তার নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধির শিখরে উঠেছিল পনেরো শতকে। তত দিনে সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাদের এই সমৃদ্ধ কাপাকনানই তাদের ভীষণ সমৃদ্ধ সভ্যতার পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, অমন দুর্দান্ত রাস্তা না থাকলে স্প্যানিশদের পক্ষে ওই দুর্গম অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করাই কষ্টকর হয়ে যেত। সে পথ দিয়েই স্প্যানিশরা পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম অঞ্চলে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ ইনকা সাম্রাজ্যে আসে এবং একের পর এক ইনকা শহর দখল করে নেয়। ১৫৭২ সালে ইনকাদের দখলে থাকা শেষ নগর ভিলকাবাম্বা দখল করার মাধ্যমে ইনকা সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। কাপাকনান না গড়ে তুললে হয়তো ইনকাদের এভাবে স্প্যানিশদের কাছে পরাজিত হতে হতো না।

ইনকাদের পতনের পর থেকে কাপাকনানও গুরুত্ব হারাতে থাকে। তারপর একসময় এ পথের অস্তিত্বই মুছে যায় মানুষের মন থেকে। কয়েক শতাব্দী কাপাকনান এক রকম হারিয়েই গিয়েছিল। সম্প্রতি আবার ইনকাদের এই রাস্তার মহা নেটওয়ার্ক মানুষের নজরে এসেছে। মোট ২৭৩টা স্থাপনা নিয়ে এটাই এখন ইউনেসকোর সবচেয়ে বড় ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। শুধু রাস্তার টিকে থাকা অংশই নয়, কাপাকনান ঘেঁষে অনেক পুরনো ইনকা শহরও এখনো টিকে আছে। যেমন—দক্ষিণ পেরুতে অবস্থিত পারিয়াচুকো। তবে কাপাকনান এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। একে তো সাড়ে চার শ বছর ধরে রাস্তাটি ক্ষয় হয়ে চলেছে, সেই সঙ্গে আছে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যেমন সম্প্রতি দক্ষিণ পেরুতে যে ভয়াবহ বন্যা হয়ে গেছে, তাতে কাপাকনানের একটা বিশাল অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তার ওপর এখনো পর্যন্ত কাপাকনানের সংরক্ষণের জন্য একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি।

এ কারণেই নিক স্ট্যানজিয়ানো মাঠে নেমেছেন—কাপাকনানের সংরক্ষণ। এ উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে আরো আছেন প্রত্নতাত্ত্বিক কেভিন ফ্লোয়ের্ক ও অভিযাত্রী জন লেইভার্স। কাজটা অবশ্য খুব একটা সহজ নয়। কারণ এটা যেহেতু একটা রাস্তা, ফলে এর বিস্তার অনেক বেশি, সংরক্ষণও কঠিন। একই কারণে জায়গাটা ঘুরতে আসার জন্যও সহজ নয়। তাই ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া এই পথ সংরক্ষণ করা খুব কঠিন। সে জন্য তাঁরা চেষ্টা করছেন এই রাস্তা ধরে একটা ট্র্যাকিং বা পায়ে হাঁটার রুট প্রতিষ্ঠা করতে। ফলে মানুষ এই পথে ট্র্যাকিং করতেও আসবে, আবার রাস্তাটি সম্পর্কে তাদের মধ্যে জনসচেতনতাও সৃষ্টি হবে। এই পথ এমনিতেই বেশ দুর্গম। ফলে অতিরিক্ত ট্র্যাকিংয়ের ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনের খুব বেশি ক্ষতিসাধনের সম্ভাবনাও কম। সে জন্য তাঁরা কাজও শুরু করেছেন। এরই মধ্যে স্ট্যানজিয়ানো এই পথে দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইনকাদের এক শহর থেকে গেছেন আরেক শহরে। ইকুয়েডরে অবস্থিত ইনকা নিদর্শন ইনকা পির্কা থেকে কাপাকনান ধরে পৌঁছেছেন পেরুর কুসকো পর্যন্ত। এখন পরিকল্পনা করছেন স্থানীয় লোকদের সঙ্গে নিয়ে এই পথটুকু সংরক্ষণ করার মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক ট্র্যাকিং রুটটা বানানোর।


মন্তব্য