kalerkantho


সত্যিই

উষ্ণ লেকের ঔষধি পানি

নাবীল আল জাহান

১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



উষ্ণ লেকের ঔষধি পানি

লেক হেভিজ। হাঙ্গেরির হেভিজ শহরের কাছেই অবস্থিত।

লেকটির একদম কাছেই আছে লেক বলোতোন, যেটি আবার মধ্য ইউরোপের সবচেয়ে বড় লেক। বলোতোনের দক্ষিণের শহর কেসথেই থেকে লেকটির দূরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার। আয়তনেও খুব একটা বড় নয়, মাত্র ৪৭ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। তার পরও লেকটি ভীষণ বিখ্যাত। এমনকি লেক বলোতোনের চেয়ে এই লেকেই মানুষের আনাগোনা তুলনামূলক বেশি। কারণ এটি একটি থার্মাল লেক। বাংলায় বলা যেতে পারে উষ্ণ লেক। আর ওই ধরনের লেকের তালিকায় লেক লেভিজ ইউরোপের সবচেয়ে বড় তো বটেই, পুরো পৃথিবীর মধ্যেই দ্বিতীয় বৃহত্তম।

এ ধরনের উষ্ণ লেকের পানি গরম হওয়ার রহস্য নিহিত এর তলদেশে।

সেখানে সাধারণত কোনো ফাঁকফোকর থাকে, যেখান দিয়ে ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত পানি মূল লেকে চলে আসে। সেই উত্তপ্ত পানি লেকের ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে মিলেমিশে একটা সহনীয় তাপমাত্রায় এসে ঠেকে। এই যেমন লেক হেভিজের ৪০ মিটার গভীরে এমন কিছু গর্ত আছে। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি ধারায় গরম পানি এসে মিশে যায় মূল লেকের ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে। দুই পানি মিলেমিশে লেকের পানির তাপমাত্রা শীতকালে থাকে ২৩-২৫ ডিগ্রির মধ্যে। আর গ্রীষ্মকালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩-৩৬ ডিগ্রির মধ্যে।

উষ্ণতা এই ধরনের লেকের পানির মজার দিক। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশগুলোয় ব্যাপারটা বেশ আরামদায়কও বটে। তবে এ ধরনের লেকের পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাতে মিশ্রিত খনিজ লবণসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের উপস্থিতি। ভূগর্ভস্থ পানি যখন ফোকর দিয়ে লেকের পানিতে ঢুকে পড়ে, সঙ্গে করে প্রচুর পরিমাণ খনিজ পদার্থও নিয়ে আসে। লেক হেভিজের পানিতে যেমন প্রচুর পরিমাণে আছে কার্বনিক এসিড, সালফার, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং হাইড্রোজেন কার্বনেট। এমনকি  সেখানকার পানিতে নাকি সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থও আছে।

আর এই প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থগুলোর কারণেই এই লেকের পানি নাকি শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। আর তাই শরীর সুস্থ-সবল রাখতে এই লেকের পানিতে গোসল করার নিয়ম চালু আছে বহু শতাব্দী আগে থেকেই। এমনকি সে জন্য এখানে সেই আঠারো শতকেই একটা কাঠের হাম্মামখানা বা বিশাল স্নানঘর নির্মাণ করা হয়। ২০০ বছরের বেশি বয়সী এই স্নানঘরটি এখনো সেই আগের চেহারায়ই রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে উনিশ শতকে লেকটিতে লাগানো হয়েছে শাপলা ফুল।

এই শাপলা ফুল অবশ্য এমনি এমনি লাগানো হয়নি। এই লেকের পানির ঔষধি গুণের মূল কারণ এখানকার খনিজ পদার্থগুলো হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়। এই লেকের জৈব উপাদান, তথা ব্যাকটেরিয়া-শৈবাল-শেওলা ইত্যাদিরও তাতে কৃতিত্ব আছে। আর এখানকার জীবজগৎও কম সমৃদ্ধ নয়। এখানে এমনও কতগুলো ব্যাকটেরিয়া আছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। যেমন—মাইক্রোমনোস্পোরা হেভিজিয়েনসিস। আবার এমন কতগুলো শৈবাল-শেওলা আছে, যেগুলো লেক হেভিজ ছাড়া হাঙ্গেরির অন্য কোথাও নেই। লেকের এই ইকোলোজি রক্ষা করার জন্যই এখানে শাপলা ফুল আমদানি করা হয়েছে।

লেকের পানিতে খনিজ পদার্থের প্রাচুর্য, সেই সঙ্গে সমৃদ্ধ জীব জগৎ—এই দুইয়ে মিলে এই লেকের পানি শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী। তাই এই লেকে মানুষের আনাগোনাও তুলনামূলক বেশি। আর একে পুঁজি করে এখানে সেই কয়েক শ বছর আগেই যে হেলথ ট্যুরিজমের যাত্রা শুরু হয়েছিল, শরীর নিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা আরো বেশি করে বিকশিত হচ্ছে।


মন্তব্য