kalerkantho


রহস্যজট

টাইম ক্যাপসুল

শেখ আবদুল হাকিম

১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টাইম ক্যাপসুল

অঙ্কন : মানব

টাইম ক্যাপসুল নিয়ে মহা আলোড়ন শুরু হয়ে গেছে কক্সবাজারে, এর আগে এ রকম কখনো দেখা যায়নি।

কয়েক মাস ধরে শিশু আর বড়রা চিন্তাভাবনা করছে, কী ভরা যায় ওটায়! বিশেষ ধরনের এনভেলপ কিনেছে তারা সবাই, খেলনা থেকে শুরু করে কক্সবাজারের দৃষ্টিনন্দন ফটো দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে সেগুলো।

ওই ক্যাপসুল হাজার হাজার এনভেলপে ভরাট করার পর নামানো হবে পৃথিবীর গভীরে, ওখানে সেটি বহু বহু বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকবে। তারপর কোনো এক সুদূর ভবিষ্যতে কোনো নতুন প্রজন্মের মানুষ এই টাইম ক্যাপসুল খুঁজে পাবে, জানতে পারবে দূর অতীতে কেমন ছিল কক্সবাজারের মানুষজন।

অনুষ্ঠানের দিন লব্ধ সৈকত আর নিষ্ঠা নিরবধি, দুই শিশু গোয়েন্দা, যে যার সাইকেলে প্যাডেল মেরে পৌঁছে গেল শহরের গলফ কোর্সে।

সবুজ ঘাসে মোড়া সমতল জায়গায় বড় একটা গর্ত খোঁড়া হয়েছে। গর্তের পাশেই খাড়া করে রাখা হয়েছে টাইম ক্যাপসুল, একটা ডেরিকের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে আটকানো। ডেরিক হলো ভারী কোনো জিনিস শূন্যে বা উঁচুতে তোলার যন্ত্র। অনুষ্ঠান উপলক্ষে এক শরও বেশি লোক উপস্থিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শহরের মেয়রও আছেন।

‘একটু সময় লাগবে। ’ বিপুল উদ্যম বলল, সৈকতের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন সে।

‘ক্যাপসুলে এখনো তিন শর মতো এনভেলপের জায়গা খালি পড়ে আছে। তাড়াহুড়া করে গেলে ওদিকের ওই টেবিল থেকে এনভেলপ কিনতে পারো এখনো, প্রতিটির দাম পড়বে তিন টাকা। ’

সস্তাই বলতে হবে। এ ধরনের এনভেলপ পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়।

‘না, ধন্যবাদ। ’ বলল সৈকত। ‘আমি আগেই একটা এনভেলপ ভরেছি। ’

‘ও, আচ্ছা। তা, দোস্ত, কী ভরলে তুমি তোমার এনভেলপে?’ চোখে কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল বিপুল উদ্যম।

‘যার যে বিষয়ে আগ্রহ কিংবা যার যাতে কৃতিত্ব আছে, টাইম ক্যাপসুলে রাখার জন্য সেটিই তার পাঠানো উচিত। ’ বলল সৈকত। ‘আমি আমার এনভেলপে কঠিনতম কেসের রিপোর্ট ভরেছি। ১০০ বছর পর মানুষ জানবে, এমনকি শিশুরাও অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারত, লড়াই করেছে। ’

‘আমারটা পরিবেশদূষণ নিয়ে একটা প্রবন্ধ। ’ বলল নিষ্ঠা। ‘আমি চাই আমাদের নাতি-পুতিদের নাতি-পুতিরা জানবে, শিশুরাও নির্মল বাতাস আর বিশুদ্ধ পানির জন্য যুদ্ধ করেছে। ’

‘সত্যি ভাই, তোমাদের চিন্তাভাবনা খুব সুন্দর। ’ প্রশংসার সুরে বলল বিপুল। ‘আমি আমার এনভেলপে স্কুলের সমাপনী পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ড ভরে দিয়েছি। ’

‘এত কিছু থাকতে রেজাল্ট কার্ড কেন?’ জানতে চাইল নিষ্ঠা। ‘পরীক্ষায় তুমি খুব ভালো করেছ বুঝি?’

‘ভালো করেছি কি খারাপ করেছি, সেটি বাবার মন্তব্য থেকে বুঝে নাও। বাবা বলেছেন, ওই রেজাল্ট কার্ডটার কবর হওয়া উচিত। ’

পা চালিয়ে চলে গেল বিপুল। আরেকটা এনভেলপ কিনবে। চেষ্টা করে দেখবে, তাতে নতুন ও অর্থবহ কিছু ভরা যায় কি না। খুদে গোয়েন্দারা অলস পায়ে টাইম ক্যাপসুলের দিকে এগোল।

‘লব্ধ, ওদিকে তাকাও। দেখছ, মুক্ত আকাশকে কেমন কাতর দেখাচ্ছে? নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছে ওর। ’

‘হুম!’

‘আমার মনে হচ্ছে, বরং বিপুল অসুস্থ। না হলে কেউ টাইম ক্যাপসুলে রেজাল্ট কার্ড দেয়?’

‘না, মানে ঠিক বুঝতে পারছি না। ’ বলল সৈকত।

‘চলো, দেখি তো কী হয়েছে ওর। ’ বলে জোরে পা চালাল নিষ্ঠা।

কক্সবাজারে ‘ধাঁধা এবং সমাধান’ নামে একটা সংগঠন আছে, মুক্ত আকাশ সেটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট।

‘আকাশ, তুমি ভালো তো?’ আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিষ্ঠা। ‘তোমাকে দেখে সুস্থ বলে মনে হচ্ছে না। ’

‘আমার লাঞ্চ চুরি হয়ে গেছে। ’ বলল আকাশ। ‘ওদিকের ওই লোহার বেঞ্চে লাঞ্চের ব্যাগ রেখে টাইম ক্যাপসুলটা দেখতে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখি গায়েব। তার মানে নিশ্চয়ই কেউ চুরি করেছে। ’

‘তোমার ভুলও হতে পারে, ব্যাগটা তুমি হয়তো অন্য কোথাও রেখেছ। ’

‘না, তা রাখিনি। ’ বলল আকাশ। ‘আবর্জনা ফেলার ঝুড়িতে আমার ব্যাগ পাওয়া গেছে, খালি। লাঞ্চ হারানোয় আমি কিছু মনে করছি না। বাড়ি থেকে আমাকে চিঁড়া আর দই দিয়েছিল। চিঁড়া খেলে গলা শুকিয়ে যায়, বারবার পানি খেতে ইচ্ছা করে। আর এই মাঠে পানি পাওয়া যায় ওই ওদিকটায়, অনেকটা দূরে। ’

ঘাড় ফিরিয়ে পানির ফোয়ারাটা দেখল সৈকত। মাত্র তিন মিনিটের হাঁটা পথ। ‘সমস্যাটা আসলে কী?’

‘ওই ব্যাগে আমার একটা টাইম ক্যাপসুল এনভেলপও ছিল। ’ বলল আকাশ।

তারপর ব্যাখ্যা করল সে। গত সপ্তাহে একটা এনভেলপ দিয়ে গিয়েছিল এখানে, তাতে একটা ধাঁধা ছিল। কিন্তু ধাঁধাটা ভালো না হওয়ায় তার মন খুঁতখুঁত করছিল। তাই আজ নতুন একটা এনভেলপ কিনে তাতে ভালো দেখে নতুন একটা ধাঁধা ভরেছিল।

‘আমার মনে হয়েছে, ভবিষ্যতের ছেলে-মেয়েরা বর্তমানের ধাঁধা সম্পর্কে আগ্রহ বোধ করবে। দ্বিতীয় ধাঁধাটা বেশি জটিল, তাই এটা টাইম ক্যাপসুলে থাকা জরুরি। ওই খুদে চোরটাকে আমি ধরতে চাই। ’

‘কী করে বুঝলে তোমার লাঞ্চ কোনো বাচ্চা চুরি করেছে?’ জানতে চাইল নিষ্ঠা।

‘বড়রা কেউ লাঞ্চের ব্যাগ চুরি করবে না। ’ বলল আকাশ। ‘কিংবা আমার ধাঁধা। ’

‘তুমি ভাবছ চোর তোমার ধাঁধা কপি করেছে, তারপর একটা এনভেলপ কিনেছে, তাতে নিজের নাম লিখে টাইম ক্যাপসুলে ভরেছে?’ জিজ্ঞেস করল সৈকত।

‘অবশ্যই। ’ জবাব দিল আকাশ। ‘ওই ধাঁধা এখন আর আমি ব্যবহার করতে পারব না। কল্পনা করো, ধাঁধা এবং সমাধান-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট আমি, আরেকজনের পাঠানো ধাঁধার সঙ্গে কিনা আমার পাঠানো ধাঁধা মিলে যাবে! আমি স্রেফ ধ্বংস হয়ে যাব!’

‘যা-ই হোক, হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই। ’ বলল নিষ্ঠা। ‘ওদিকে তাকাও, ওরা এনভেলপ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে শুরু হবে অনুষ্ঠান। ’

‘আমি তোমাদের সার্ভিস ভাড়া করছি, চোরটা ধরে দাও তোমরা। ’ বলল মুক্ত আকাশ। ‘আমার কাছে একটা ক্লু আছে। আমার ওই ধাঁধা আশপাশের কোনো আবর্জনার বাস্কেটে নেই। কাজেই এখনো সেটি চোরের পকেটে আছে, আর ওই কাগজে লেখা আছে আমার নাম। ’

‘কিন্তু আকাশ, কাগজটা চোরের পকেটে থাকলেই বা কী! আমরা জানব কিভাবে, কোন পকেটে সেটি? আমরা তো সব ছেলে-মেয়েকে সার্চ করতে পারব না। ’ প্রতিবাদের সুরে বলল নিষ্ঠা।

‘তা না করলেও চলে। ’ বলল সৈকত।

কথাটা বলে কী বোঝাতে চাইছে সৈকত?


মন্তব্য