kalerkantho


ওরা ভালো নেই

আশ্রয়ণের দুঃখ

চাওয়াই আর করতোয়া নদী ঘিরে আছে তিন পাশ। শুধু পশ্চিমে আলের মতো সরু কাঁচা সড়ক। সেটাও ভাঙনের মুখে। রাতবিরাতে অসুস্থ হলে কিচ্ছুটি করার থাকে না। নেই পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। এমনই দুর্দশা নিয়ে আছে পঞ্চগড়ের রাজারপাটডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। সেখানকার মানুষের দুঃখগাথা জানতে গিয়েছিলেন সাইফুল আলম বাবু

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আশ্রয়ণের দুঃখ

টিনের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি ঠেকাতে দেওয়া হয়েছে পলিথিনের ছাউনি

২০০১ সালে সরকারিভাবে গড়ে ওঠে পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের রাজারপাট আশ্রয়ণ প্রকল্প। ৩০ মুক্তিযোদ্ধা এবং ১২০ হতদরিদ্র মানুষকে নিয়ে এই গুচ্ছগ্রামের যাত্রা।

এখন বাস করে প্রায় দেড় শ পরিবারের নয় শ মানুষ। একটি পরিবারের জন্য দেড় শতক জমির ওপর টিনের ছাউনি ও বেড়া দেওয়া ঘর। প্রতি দশটি পরিবারের জন্য একটি টিউবওয়েল ও দুটি শৌচাগার। ভূমিহীন পরিবারগুলোকে দেওয়া হয় পাঁচ শতক করে চাষাবাদের জমি। শুরুর দিকে এলাকাটির কোনো দিকেই রাস্তা ছিল না। সন্ধ্যা হতেই চারদিক জনমানবহীন হয়ে পড়ত। বিকেল গড়াতেই ফিরতে হতো বাড়ি। ভাগ্য ভালো হলে নদী পারাপারে নৌকা পাওয়া যেত, নয়তো আসতে হতো পানি ভেঙে। একটু রাত হলেই কেউ ফিরত না ভয়ে। বর্ষাকালে দুরবস্থা চরমে পৌঁছত। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার অবস্থা ছিল না। ধীরে ধীরে অবস্থা কিছুটা বদলাতে থাকে। আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে চাষাবাদ শুরু হয়। লোকজনের যাতায়াত বাড়ে। শুকনো মৌসুমে মরা নদীর হাঁটু পানি ভেঙে যাতায়াত করা যায়। দুই-চারজন ছেলে-মেয়ে নদী পার হয়ে ৫ কিলোমিটার দূরের দোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। এলাকার ইউপি সদস্যকে অনুনয়-বিনয় করা হয় একটা রাস্তার জন্য। লোকজনের জমির ওপর দিয়ে নদীর ধার ঘেঁষে আলের মতো সরু কাঁচা রাস্তা করা হয়। ফলে শিশুরা ৫ কিলোমিটারের বদলে ২ কিলোমিটার দূরের আমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। মাধ্যমিক পড়ুয়াদের নদী পার হয়ে ৬ কিলোমিটার দূরের ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউটে যেতে হয়। কাজের সন্ধানে যেতে হলেও একই দূরত্ব পার হতে হয়।

একমাত্র সরু রাস্তাটিও নদীভাঙনের মুখে

তবে ভরা বর্ষায় নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে ওঠায় নৌকায় যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়। ভাঙনের মুখে একমাত্র হাঁটা পথটিও বন্ধের উপক্রম হয়। কেউ কেউ নদীপথে যাতায়াত করলেও অধিকাংশই থাকেন ঘরবন্দি। আশ্রয়ণের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক (৭২) বলেন, ‘কিছুদিন আগে বন্যায় আমতলা হয়ে আসতে গিয়ে একবুক পানিতে নামতে হয়েছিল। ঘরে বসে খাওয়ার মতো কারো অবস্থা নেই। সে সময় কারো কারো ঘরে রান্নাও হয়নি। অথচ একটি ব্রিজ থাকলে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। ’ সামসুল হক (৭০) বলেন, ‘আগে ভ্যান চালাতাম। রাস্তা না থাকায় ভ্যান আনা-নেওয়ায় সমস্যার কারণে সেটা বিক্রি করে দিনমজুরি করছি। ’ রহিদুল ইসলাম (৩৫) বলেন, ‘কাজ করতে যেতে অনেক সময় এক-দুই ঘণ্টা দেরি হলে কেউ কাজে নিতে চায় না। ’ মালেকা বেগম (৩০) বলেন, ‘হামার চার পাখে (পাশে) মরণ। কোন পাখে যাবার রাস্তা নাই। এত কহার পরেও কাহ হামারতি কাহ দেখে না। একটা ব্রিজ আর কয়টাকা লাগে! সরকারের তো টাকা অভাব নাই। মানষিলার থেকে কী টাকার দাম বেশি। ’ সমলা বেওয়া (৫০) বলেন, ‘ঘরের টিনের চাল ফুটা হয়ে ঘরত পানি পড়ছে। গাও-গোসল করার পানি যাবার রাস্তা (ড্রেন) নাই। বালতি দিয়ে পানি অন্যঠে ফেলাছি। ’

ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে শৌচাগার

গত ১৮ বছরে প্রকল্পের কোনো বাড়ি-ঘর সংস্কার হয়নি। কোনো কোনো ঘরের টিনের চালা ফুটো হয়েছে, মাটির ভিটির ধার ধসে পড়েছে, অধিকাংশ টিউবওয়েল শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। নেই পানি ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। শুরুর দিকেই দুটি কমিউনিটি সেন্টার ছিল। সেগুলোর টিনের চালা ও দরজা-জানালা ঝড়ে উড়ে গেছে।

এখানকার বাসিন্দারা নদীতে মাছ ধরা, পাথর ভাঙা-কুড়ানো, কৃষি শ্রমিকসহ দিনমজুরির কাজ করে। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। তবু নিজেদের উদ্যোগে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়েছেন। শিগগিরই শুরু হবে শিক্ষা কার্যক্রম।

যাতায়াতে নৌকাই ভরসা

অনেকটা বিচ্ছিন্ন জনপদের বাসিন্দা হয়ে আশ্রয়ণের কেউ কেউ জীবনসায়াহ্নে পৌঁছেছেন। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে হোটেল শ্রমিক হাশিবুল (১৮) ও ভ্যান চালক জলিলের (৬০) মৃত্যুর করুণ সাক্ষী তারা। রাতে কেউ অসুস্থ হলে ১০ কিলোমিটার দূরের সদর হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ একটি সেতু হলে এসব দুর্দশার অনেক কিছুরই অবসান হতো। বছরের পর বছর তাদের লিখিত-মৌখিক কোনো অনুনয়-বিনয়ই কাজে আসেনি। তাই আজও হয়নি চাওয়াই নদীর ওপর কয়েক মিটারের একটি সেতু।

২০০১ সালেই ঝড়ে উড়ে গেছে কমিউনিটি সেন্টারের ছাউনি

পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘রাজারপাটডাঙ্গার অধিবাসীদের সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করেছি। তাদের সমীক্ষা চালিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠাতে বলা হয়েছে। ’ জেলা প্রশাসক অমলকৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা সরকারি নানা সহায়তা-সুবিধা পান। তাদের সমস্যার বিষয়টি আমরা অবহিত আছি। সংশ্লিষ্ট মহলকে সেটি জানানো হয়েছে। ’ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমানুল্লাহ বাচ্চু বলেন, ‘আমি ইউপি চেয়ারম্যান থাকার সময় একটি ব্রিজ তৈরি করে দিতে বিভিন্ন মহলে অনেক যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এখনো যোগাযোগ অব্যাহত আছে। এর পরও জেলা পরিষদের কোনো সুযোগ আছে কি না সেটিও দেখা হচ্ছে। ’


মন্তব্য