kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

ভাবির চায়ের দোকান

যশোর শহরতলীর পাশেই পুলেরহাট। পুলেরহাটে বিখ্যাত ‘ভাবির চায়ের দোকান’। যশোর শহর, বেনাপোল, খুলনা, ঢাকা এমনকি বিদেশ থেকেও অনেকে এই দোকানে চা খেতে আসে। ভাবির হাতে চা খেয়ে এসেছেন ফখরে আলম

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভাবির চায়ের দোকান

চা কি দাঁতে লেগে থাকে? চা খেলে কি নেশা হয়? এসব প্রশ্ন কেবল ভাবির চাকে ঘিরেই। ইজিবাইক-চালক মিন্টু বললেন, ‘ভাবির চা খেলে নেশা হয়।

এ জন্য দিনে দশবার ভাবির চা খেতে ছুটে আসি। ’ ওয়ার্কশপ শ্রমিক মোমিনউদ্দিন বললেন, ‘ভাবির চা দাঁতে লেগে থাকে। চায়ের স্বাদ ভোলাই যায় না। ’ আর ভাবি সখিনা খাতুন কাপে চামচ নেড়ে অন্য রকম এক বাজনার সৃষ্টি করে বললেন, ‘গরুর দুধ আর এক নম্বর পাতিই হচ্ছে আমার চায়ের আসল রহস্য। ’ যশোর-বেনাপোল সড়কের যশোর শহরতলীর পাশেই পুলেরহাট। পুলেরহাট বিখ্যাত খাসির মাংসের জন্য। প্রতি রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার এখানে প্রায় ৫০টি খাসি জবাই হয়। ১৪/১৫ কেজি ওজনের খাসির মাংস কেনার জন্য শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসে। খাসির মাংসের দোকান পার হয়ে কয়েক শ গজ এগোলেই ‘ভাবির চায়ের দোকান’। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে ভিড় থাকে। স্থানীয় ক্রেতা ছাড়াও যশোর শহর, বেনাপোল, খুলনা, ঢাকা এমনকি বিদেশ থেকেও অনেকে এই দোকানে চা খেতে আসে।

ঘড়িতে সকাল দশটা। আমি আর আমাদের ফটো সাংবাদিক পুলেরহাটের ভাবির চায়ের দোকানে গিয়ে দেখি ভাবি সালোয়ার-কামিজ পরে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে চা তৈরি করছেন। সাধারণ কাপের চেয়ে একটু বড় অনেক কাপ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে লাইন দিয়ে সাজিয়ে বিরাট একটি সসপ্যান থেকে জ্বালিয়ে হলুদ রং করা দুধ গোল চামচে করে তুলে কাপে ঢালছেন। এরপর কাঁচা পাতি সেই দুধে ঢেলে দিচ্ছেন। ভাবি ঘেমে গেছেন। ওড়না দিয়ে মুখ মুছে চামচ দিয়ে চা নাড়তে থাকলেন। নিজেই খরিদদারের হাতে তুলে দিলেন চা। আবার তিনি পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এর মধ্যে দোকান ঘুরে দেখি। সামনে ভাবির ছবিসহ বিরাট একটি সাইনবোর্ড, ‘পুলেরহাটের বিখ্যাত ভাবির চায়ের দোকান’। দোকানের মধ্যে আর এক দেয়ালে লেখা রয়েছে, ‘দুধ চা ১০ টাকা, লাল চা ৪ টাকা, কপি ২০ টাকা, মালটুপা ৩০ টাকা, বুস্ট ৩০ টাকা। ’ ছোট একটি বাচ্চার ছবি ঝুলছে। ছবিটি ভাবির ছেলে আকাশের। লম্বালম্বি দুটো কাঠের টেবিল পাতা। চেয়ারও আছে। বেঞ্চও আছে। নানা বয়সের কয়েকজন ব্যক্তি বেশ আয়েশ করে চা পান করছেন। একজন কর্মচারী বিরাট একটি কড়াইয়ে শিঙাড়া ভাজছেন। আর একজন ইনি ভাবির স্বামী কুদ্দুস আলী টেবিল থেকে খালি কাপ সরাচ্ছেন। আমরাও চায়ের অর্ডার দিয়ে ভাবির সঙ্গে কথা বলি। ভাবি বললেন, ‘প্রতিদিন কত কাপ চা বিক্রি হয় হিসাব নেই। তবে ৪০ কেজি দুধ লাগে। তাতে কয়েক হাজার চা তৈরি হতে পারে। ’ হাসতে হাসতেই বললেন, ‘অনেক সাহেবরা এখানে গাড়ি থামিয়ে আমার চা খেয়ে যান। যশোর, খুলনা, বেনাপোল, ঢাকা থেকেও অনেকে আসেন। চা খেয়ে প্রশংসা করেন। তাতে আমি খুব খুশি হই। গরুর দুধ জ্বালিয়ে গাঢ় করি। দুধের রং লাল বর্ণ ধারণ করে। সেই দুধ দিয়ে চা বানাই। এ জন্য চায়ের স্বাদ বেড়ে যায়। ’ চা খাওয়ার সময় কথা হয় লন্ড্রির দোকান মালিক সমরেন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘কৃষ্ণবাটি গ্রামে আমার বাড়ি। প্রতিদিন যাতায়াতের পথে সকালে আর রাতে ভাবির দোকানে এসে চা পান করি। এমন স্বাদের চা কোথাও পাইনি। ’ শহরের ডালমিল এলাকার মোটর শ্রমিক গোলাম রসুল তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ভাবির চা খেতে এসেছেন। তিনি বললেন, ‘আমরা মাঝেমধ্যে বন্ধুরা দলবেঁধে চা খেতে আসি। কোনো কোনো দিন ৩০ টাকা দিয়ে মালাই চা খেয়ে গান করতে করতে বাড়ি ফিরি। ’

সখিনাদের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া গ্রামে। বাবা কৃষি কাজ করেন। সংসারে অভাব বলে তিনি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সখিনাকে বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী কুদ্দুস আলী পান-সুপারির ব্যবসা করেন। কৃষ্ণবাটি গ্রামে তাঁর বাড়ি। পুলেরহাট বাজারে তাঁর ছোট একটি দোকান রয়েছে। সকিনা বাল্যবিয়ের শিকার হলেও বিচক্ষণতার সঙ্গে সংসারের হাল ধরেন। তবে অভাব থেকেই যায়। স্বামী ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসানে পড়েন। ২০০৪ সালের দিকে একপর্যায়ে তাঁর দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন ঘোমটা দেওয়া লাজুক সেই গৃহবধূ ঘর থেকে বের হয়ে এসে পুলেরহাটে চায়ের দোকান দেন। শুরু হয় ভাবির চায়ের পর্ব। চায়ের গরম পানিতে ভাবি সংসারের অভাব ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পুষে আরো খানিকটা সচ্ছল হয়েছেন। দুই মেয়েকে ঘটা করে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে আকাশ প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। স্বামী কুদ্দুস ভাই ভাবির সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। সখিনা বললেন, ‘আমার কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই। চা বিক্রি করতে কোনো লজ্জাও নেই। আমার স্বপ্ন একটাই—আমি যেন আমার চায়ের সুনাম ধরে রাখতে পারি। ’


মন্তব্য