kalerkantho


বাঙালির বিশ্বদর্শন

ওয়ারশ ইহুদি গোরস্তান

সেঁজুতি দাশ   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ওয়ারশ ইহুদি গোরস্তান

সিমেট্রিতে লেখক ও তাঁর বন্ধুরা

এপ্রিলের শুরু ছিল তখন। বসন্ত ছিল দুয়ারে।

আবার বৃষ্টিও এলো। বৃষ্টি নিয়েই অভিজিৎ, আমি, শুভ্রদা আর মেহেদী রওনা দিলাম। যাচ্ছি ওয়ারশ জুইশ সিমেট্রি দেখতে। ইউরোপের অন্যতম বড় ইহুদি গোরস্তান। ওয়ারশ মধ্য ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডের রাজধানী। ওয়ারশ আমি আগেও দেখেছি। রোমান পোলানস্কির দ্য পিয়ানিস্ট ছবিতে। আমার কাছে ওয়ারশ তাই যুদ্ধ হয়েই আছে। বিধ্বস্ত ও ভয়ার্ত। তবে গিয়ে কিন্তু ভুল ভাঙল। ঝাঁ চকচকে একটি শহর। বিরাট বিরাট দালান। কেউ বিশ্বাসই করবে না এই শহরটি দুই-দুইবার বিশ্বযুদ্ধের ঝড়ে পড়েছিল।

 

অল্প ইতিহাস

ইহুদি সমাধিক্ষেত্রটি কিন্তু অনেক আগের। ১৮০৬ সালে এর গোড়াপত্তন। বয়স এখন ২১১ বছর।   ওয়ারশর ওকোপোয়া স্ট্রিটে এর অবস্থান। গোড়াতে নারী ও পুরুষের জায়গা আলাদা ছিল। এখন কিন্তু এটি চার ভাগে বিভক্ত—অর্থডক্স কোয়ার্টার (সনাতনপন্থীদের জন্য), রিফর্ম কোয়ার্টার (সংস্কারবাদীদের জন্য), অর্ডিনাল কোয়ার্টার (রাষ্ট্রীয় ও  সামরিক কাজে নিয়োজিতদের জন্য) ও চাইল্ড কোয়ার্টার। ১৯১৩ সাল থেকে এ বন্দোবস্ত।  

 

ঢুকে পড়লাম

প্রবেশদ্বারটি সাবেক আমলের। অল্প এগোলেই ইস্পাতের তৈরি বাতিঘর দেখা যায়। আছে একটি টিউবওয়েল আর ফোয়ারা। শেষকৃত্যের কাজে ব্যবরত হয় এমন একটি সাদামাটা ছোট ঘরও আছে। এগুলোর সবই শতবর্ষী। তারপর একটা উঠানমতো জায়গা খালি পড়ে আছে। উঠানের পর যত ভেতরে যাওয়া যায় উঁচু উঁচু গাছের ভিড়। হাঁটার সময় পায়ের নিচে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যায়। কোথাও কোথাও স্যাঁতসেঁতে ঘন আগাছা। কবরখানার শেষ প্রান্ত অনেকটা বনের মতো দেখতে। ডাল-পাতায় প্রাকৃতিক ছাদ তৈরি হয়েছে। আকাশ দেখা সহজ হয় না।

অভিনেত্রী এস্তার রাখেল কামিনসকার সমাধি

৮৩ একর জায়গা

দেড় লাখেরও বেশি কবর আছে এখানে। কোনো কোনো সমাধিফলক ছয় ফুট পর্যন্ত উঁচু। অনেকগুলোই হেলে গেছে বা কাত হয়ে পড়েছে। তবে সদ্য মোমবাতি জ্বালানো কান্নাভেজা সমাধিও দেখলাম। সমাধিফলকগুলোই এ সমাধিস্থলের সম্পদ। বিচিত্র সব নকশা। গবেষকরা বলেন, মধ্যযুগীয় ওয়ারশ শৈলী থেকে শুরু করে মিসরীয় রিভাইভাল স্থাপত্য শৈলীর নমুনাও আছে। পাবেন আধুনিক ফরাসি ডেকোরও নমুনা। আর ইহুদিদের গতানুগতিক মাডজিভা এবং ওহেলরীতির সমাধিফলক তো পাবেনই। কোনো কোনো ফলকে কবিতা লেখা, সংক্ষিপ্ত জীবনী আর মৃত্যুর কারণ প্রায় সব ফলকেই আছে। কোনো কোনোটিতে প্রতিকৃতিও আঁকা।

 

গণকবর খুঁজে পেলাম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওয়ারশ ঘেটোতে হলোকাস্টের শিকার ইহুদিদের গণকবরও খুঁজে পেলাম। পেলাম এস্পেরান্তো ভাষার (পৃথিবীর ২০ লাখ লোক এ ভাষায় কথা বলে। ইংলিশ, জার্মান, পোলিশ আর রাশিয়ান ভাষার মিশ্রণে তৈরি। ) আবিষ্কারক লুডভিগ জামেনহফের কবরও দেখলাম। এখানে আছে চিত্রশিল্পী আলেকজান্ডার লেসার, অভিনেত্রী এস্তার রাখেল কামিনসকা, পোলিশ এনসাইক্লোপিডিয়া প্রকাশক সামুয়েল ওরগেলব্রান্ড প্রমুখের কবরও।

পেছনে ঘুরতেই দেখলাম সাদা চুল-দাড়িওয়ালা ইয়া লম্বা এক দাদু আমার দিকেই হেঁটে আসছেন।   ছবি: অভিজিৎ নন্দী

ফন্দি আঁটছিলাম

শুভ্রদা একটা ভিতুর ডিম। ফন্দি আঁটছিলাম কিভাবে তাঁকে ভয় দেখানো যায়। কূটবুদ্ধি আঁটতে গিয়ে নিজেই দলছুট হয়ে গেলাম। খেয়াল হলে দেখি চারপাশে শুধুই সারি সারি সমাধি। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। ঝিরিঝিরি। হালকা মৃদু পায়ের আওয়াজ পেলাম দূরে। পরিবেশটা সত্যি অন্যরকম। পেছনে ঘুরতেই দেখলাম সাদা চুল-দাড়িওয়ালা ইয়া লম্বা এক দাদু আমার দিকেই হেঁটে আসছেন। গায়ে কালো রঙের ঢোলা জামা আর মাথায় বিশালাকার স্পোদিক টুপি। মানুষটির হাতে মোমবাতিও ধরা আছে। মনে হলো লর্ড অব দ্য রিংস সিনেমার গ্যান্ডল্ফকে দেখতে পাচ্ছি।   পেছনে বুঝি এখনই হবিটদের দেখা যাবে। তবে দাদুর পেছন থেকে হবিট নয়, সত্যি সত্যি আমার বন্ধুরা দেখা দিল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দুই ঘণ্টা চলে গেছে সময়। কবরখানায়। ফিরতেই হবে এবার। আকাশ ফাঁচফাঁচ করে কেঁদে উঠল। আমরা চলে যাচ্ছি বলেই কি না!


মন্তব্য