kalerkantho


যাঁরা মসলায় রাঙিয়েছেন বিলাত

গেল শতকের মাঝের দিক। বিলাতে আসা বাঙালিরা খুঁজছিলেন টিকে থাকার উপায়। খুব কষ্টের ছিল দিনগুলো। কিন্তু কেউ হার মানতে চাননি। তাই সফলতাও এসেছে। সে সফলতার চিত্র আজ দেখানো হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। বার্মিংহামে প্রদর্শনীটি দেখে এসেছেন মোর্শেদ আখতারও

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



যাঁরা মসলায় রাঙিয়েছেন বিলাত

ষাটের দশকের সফল ব্যবসায়ী এখলাস মিয়া ও মতিন মিয়া, যাঁদের রেস্টুরেন্টের নাম ছিল ‘শাহবাগ’

বার্মিংহাম মিউজিয়াম। সারা বিলাতেই মশহুর।

বাংলাদেশিদের নিয়ে সেখানে হচ্ছে প্রদর্শনী। বিবিসিতে খবরটি পড়ে আর তর সইছিল না। অক্টোবরের ৩০ তারিখ ছিল সম্ভবত। অফিস শেষ করে গেলাম মিউজিয়ামে।

 

মোহাম্মদ আলীর দেখা পেয়ে গেলাম

মিউজিয়ামে ঢুকে সোজা গেলাম অভ্যর্থনাকেন্দ্রে। মেয়েটি জানাল, প্রদর্শনীটি এর মধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গ্যালারিতে গিয়ে দেখা পেয়ে গেলাম জনাব মোহাম্মদ আলীর। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা তিনি। কিউরেটরও।

তিনি বললেন, ‘জানেন নিশ্চয়ই, বিলাতের বাঙালিদের একটি বড় অংশ এসেছে সিলেট অঞ্চল থেকে। তাঁরা বিলাতে এসে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ই জড়িয়ে যান। শুরুটা হয়েছিল লন্ডন ও আশপাশের এলাকায়। পরে তা সারা বিলাতেই ছড়িয়ে পড়ে। এখন কিন্তু এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসাই বিলাতের অর্থনীতিতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। একদিনে যে আজকের এই অবস্থা তৈরি হয়নি, অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, তারই নমুনা রাখা হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। আমার বাবাও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ছিলেন। আমি নিজে ওয়েটার হিসেবে কাজ করেছি। প্রদর্শনীতে বেশি আছে গেল শতকের দ্রষ্টব্য। তবে ভুলে গেলে চলবে না, ব্রিটেনে প্রথম কারি হাউস বা বাংলাদেশি খাবারের দোকান বসেছিল ১৮১০ সালে। সেন্ট্রাল লন্ডনে। দীন মোহাম্মদ নাম রেখেছিলেন হিন্দুস্তানি কফি হাউস। ভারতফেরত ব্রিটিশদের জন্য তিনি বাংলা রান্না চালু করেছিলেন। ’ উল্লেখ্য, মোহাম্মদ আলী একজন নামি চিত্রশিল্পী।   

 

রেবেকার সঙ্গেও কথা হলো

বিলাতের মধ্যাঞ্চলে বার্মিংহাম। মিউজিয়ামের ইসলামিক এবং দক্ষিণ এশীয় আর্টবিষয়ক কিউরেটর রেবেকা ব্রিজম্যান। এই প্রকল্পের সঙ্গে তিনি দারুণভাবে জড়িত। বললেন, ‘এমন একটি চমকপ্রদ বিষয়ের ওপর এমন আয়োজন সারা দেশে এই প্রথম। এই কারণে শুধু মধ্যাঞ্চলেরই নয়, দর্শক আসছেন সারা দেশ থেকে। ’

 

আমার অবাক হওয়া শুরু

শুরুতেই ১৯৫৯ সালের একটা অ্যারোগ্রাম দেখলাম। প্রায় অক্ষত। নিকটজনের সঙ্গে যোগাযোগের নমুনা হিসেবে প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। শুরুতে আরো আছে বাংলাদেশের ছবি। পুরনো আমলের পাসপোর্ট, ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইত্যাদি। আরো আছে বহু দুর্লভ ফটোগ্রাফ। আছে তৈলচিত্র, মেন্যু কার্ড, বিল কার্ড ইত্যাদি। আলোকচিত্রী রজার গোয়েনের ভিডিও ইন্টারভিউও প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। রজার মাস্টার নামেই এখানে বেশি চেনা রজার গোয়েন। তিনি বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু। নিজে বাঙালি রেস্টুরেন্টে (প্রথমে রাজভোজ, তারপর কারি কিং, শেষে লাইট অব বেঙ্গল) কাজ করেছেন। তাঁরা অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত বাঙালি সহকর্মীদের সহায়তা দিয়েছেন। আরেকটি বিষয় জানলাম, ওই সময় যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই লিখতে বা পড়তে জানতেন না। অনেককেই রজার মাস্টার কাজ চালানোর মতো ইংরেজি শিখিয়েছেন।

 

সেদিন আজকের মতো ছিল না

তখন বার্মিংহামের বাঙালি রেস্টুরেন্টগুলো আজকের মতো ছিল না। এই জনস ক্যাফের কথাই ধরা যাক। ইংলিশ ক্যাফে ছিল সেটি। মোহাম্মদ আফরোজ মিয়া ও আব্দুল আজিজ ক্যাফেটি কিনে নেন। ইংলিশ খাবার পরিবেশন করতে থাকেন। কিন্তু ১৯৫৪ সাল থেকে তাঁরা মসলাদার বাঙালি খাবার পরিবেশন শুরু করেন। নাম বদলে রাখেন দার্জিলিং। এটিই বার্মিংহামের প্রথম বাঙালি রেস্টুরেন্ট। ১৯৬০ সাল নাগাদ আরো কয়েকজন এ ব্যবসায় নামেন। তখনকার রেস্টুরেন্টগুলোর নাম ছিল এমন—দ্য শাহবাগ, শালিমার, শাহজাহান, জিন্নাহ, তাজমহল, লাইট অব এশিয়া বা মঞ্জিল। বার্মিংহামের হর্সফেয়ার, ব্রিস্টল স্ট্রিট আর সেলি ওক এলাকায় গড়ে উঠেছিল এগুলো। কারি হাউসগুলো সাজানো হতো মোগল বা রাজস্থানি চিত্রকলায় দেখা নারীদের ছবি দিয়ে। বশে কটিতে সিলেটের চা বাগান বা ধানক্ষেতের দৃশ্য ছিল। এখানে বার্মিংহাম প্লানেট পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটি বিজ্ঞাপনের কথাও বলতে হয়। তাতে লেখা ছিল, লাস্যময়ী মেয়েরা পানীয় পরিবেশন করে।

 

নাইটস অব দ্য রাজ

গোড়ার দিকে ব্রিটিশ জীবনকে যাঁরা মসলাদার করেছেন, তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়েই এ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শিরোনাম—নাইটস অব দ্য রাজ। প্রদর্শনীর কিউরেটর মোহাম্মদ আলী খুব যত্ন করে তাঁদের উপস্থাপন করেছেন। তাঁদের কয়েকজনের নাম—আব্দুল আজিজ, মালিক মিয়া গাজী, রানা দে, মোহাম্মদ আফরোজ মিয়া, নুরুজ্জামান খান, মফিকুল আম্বিয়া চৌধুরী, এখলাস মিয়া, মতিন মিয়া ও মোজাম্মেল মিয়া।

নাইটস অব দ্য রাজ নামকরণের কারণ জানতে চাইলে মোহাম্মদ  আলী বলেন, ‘নাইটদের সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই জানি। এক কথায় বলা যায় বীর যোদ্ধা। আমাদেরই পূর্বপুরুষরা নামমাত্র বিদ্যা নিয়ে বিলাতের মতো দেশে যে লড়াই-সংগ্রাম করে গেছেন তা ইতিহাস বৈকি! ভাবুন তো একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতিতে, সম্পূর্ণ ভিন্ন রুচির মানুষদের সঙ্গে তাঁরা তাল মেলাতে চেয়েছিলেন। তাঁরা যে বিজয়ী হয়েছিলেন তার প্রমাণ তো এই প্রদর্শনী। আমরা তাঁদের কষ্টার্জিত ফসল ভোগ করছি। তাঁদের তাই আমি নাইট না বলে অন্য কিছু বলতে পারছি না। ’

 

যত জানছি ততই অবাক হচ্ছি

খুব ধীরে ধীরে ব্রিটিশ মেন্যুতে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশি খাবার। ব্রিটিশ রুচিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। যেমস চিকেন টিক্কা মাসালা দারুণ উদাহরণ। ব্রিটিশ রুচি মাথায় রেখেই এটি তৈরি করা হয়। বাঙালি রেস্টুরেন্টে এসেই খান ব্রিটিশরা। সত্তরের দশকে যোগ হয় রোগান জোশ, ঝালফ্রাজি বা ভিন্ডালু। আমি আরো অবাক হই জেনে, একসময় বাঙালি রেস্টুরেন্টগুলোতে ইংলিশ, চাইনিজ খাবারও রাখা হতো গ্রাহক চাহিদার কথা বিবেচনা করে। কিন্তু দিনে দিনে সেগুলো বাঙালি খাবারের কাছে হার মেনে বিদায় নেয়। এরপর তান্দুরি কুইজিনের কথাও বলতে হয়। সত্তরের দশকেই  মাটির চুলার ওপর নান রুটি বা মাংস রান্নার এ বিশেষ পদ্ধতি বার্মিংহামে আসে।

 

প্রদর্শনীতে আরো আছে

রেস্টুরেন্টকর্মীদের থাকার ঘর আছে। রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয় এমন তৈজসপত্র আছে। আস্ত রান্নাঘরও আছে। সত্যি মজা লাগল, কোহিনূর নামের ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্টটির অভ্যন্তরীণ সজ্জার হুবহু নকল দেখে। রেস্টুরেন্টগুলো এ দেশে শুধু খাবারে নয়, অন্দরসজ্জাতেও বৈচিত্র্য এনেছে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ২০১৭ সালে নতুন রূপে সাজতে যাচ্ছে।

রেবেকা বললেন, ‘খবরটি জানতে পেরেই আমরা একটি টিম পাঠিয়ে দিই। তারা বাস্তব উপকরণ নিয়ে ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে এটি প্রদর্শনীতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ’

 

মোহাম্মদ আলী আরো বলেন

আমার পিতা ওয়াতের আলী ছিলেন বার্মিংহামের প্রথমদিককার একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। আমি বাবার রেস্টুরেন্টে কাজে লাগি ১১ বছর বয়সে। দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলাম। এখন অন্য পেশা নিয়েছি, কিন্তু রেস্টুরেন্ট ব্যবসার প্রতি মমতা একটুও কমেনি। আশা করি এ প্রদর্শনী সারা বিলাতের সব বাঙালি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের একত্রিত হতে সাহায্য করবে। আরো উজ্জ্বল দিন আনবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নতুন ও পুরনো অনেক ব্যবসায়ী এসেছিলেন। ওই দিন একদল যন্ত্রী আসরে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁদের ঢাকা থেকে আনা হয়েছিল। তাঁরা সে সব সুর বাজিয়েছেন যেগুলো আগের দিনের রেস্টুরেন্টে বাজানো হতো।

 

প্রতিদিন অনেকে আসছেন

যেমনটা জেনেছিলাম অভ্যর্থনাকেন্দ্রে, স্বচক্ষে দেখলামও। অনেক লোক আসছে প্রদর্শনীতে। যেমন ওয়েস্টন সুপার মেয়ার থেকে এসেছেন মোসলেক উদ্দিন। তিনি ইউকে কারি কানেক্টের পরিচালক। বললেন, ‘খবর শুনতে পেয়েই আমি ছুটে এসেছি। স্টাফ সংকটসহ আরো কিছু সংকট চলছে এখন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়। এ প্রদর্শনী সংকট কাটাতে সাহায্য করতে পারে। ’ আরেকজন দর্শক আতা সাহেব এসেছেন ব্রাইটন থেকে। বললেন, একসময় আমার পাঁচটি রেস্টুরেন্ট ছিল। কিন্তু নানা ধরনের জটিলতায় সব বিক্রি করে দিতে হয়েছে। এই প্রদর্শনী নীতিনির্ধারকদের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। ’ মোহাম্মদ আলীর কাছে জানতে চাইছিলাম তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। বললেন, ‘ইচ্ছা আছে এটি আগামী বছর নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার। বাঙালি অধ্যুষিত আরো কিছু শহরেও নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। শেষটা হবে অবশ্যই বাংলাদেশে।


মন্তব্য