kalerkantho

শখের তোলা

ছবিবাড়ি

চার শতাধিক চিত্রকর্ম আছে মঈন চৌধুরীর বাড়িতে। রয়েছে বাংলাদেশের বিখ্যাত সব শিল্পীর চিত্রকর্ম। দেখে এসেছেন চন্দন চৌধুরী

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ছবিবাড়ি

ড্রয়িংরুমের সব দেয়াল জুড়ে ছবি। সব আপনার কেনা? মঈন চৌধুরী জানালেন, কিছু পেয়েছেন পারিবারিক সূত্রে আর বাকিগুলো কিনেছেন।

তাঁর বাবা চৌধুরী শামসুর রহমান ছিলেন দৈনিক সুলতানের সম্পাদক। ছবি তোলা, চিত্রকর্ম সংগ্রহ, বাগান করা ছিল তাঁর শখ। বাবার কাছ থেকেই এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পান মঈন চৌধুরী। সত্তরের দশকে অস্ট্রিয়া আর জার্মানিতে পড়তে গিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চিত্রকলার গ্যালারিগুলো ঘুরে দেখেছেন। তখন অনেক ছবি ভালো লেগে যেত। আর ভাবতেন, আহা, এই ছবিটা যদি আমার থাকত! এই ছবিটা যদি কিনতে পারতাম! নিজেও ছবি আঁকেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশে প্রদর্শনীও করেছেন। তিনি বললেন, ‘ওখানকার মানুষের ছবির প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা রয়েছে। তারা সব ছবি কিনে নিত। কয়েকটি দেশে প্রদর্শনী করলেও বাংলাদেশে করিনি। আর ছবি আঁকা থেকেই সংগ্রহের নেশাটা পেয়ে বসে। ’

 

বাবার ছবিটি যামিনী রায়ের আঁকা

খাবার ঘর, শোবার ঘর, বারান্দা, বাড়ির সবখানেই ছবি। বাড়ির একটি কক্ষে মঈন চৌধুরীর বাবার ছবি। এটি যামিনী রায়ের আঁকা। যামিনী রায়ের ভক্ত ছিলেন তাঁর বাবা। সাংবাদিকতার সূত্র ধরেই যেতেন বিখ্যাত শিল্পীর কাছে। সেই ছবিসহ বাবার কাছ থেকে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের ছবিও পেয়েছেন মঈন চৌধুরী।

এরপর নিজের রোজগার শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ছবি কিনতে শুরু করেন। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, সফিউদ্দিন আহমেদ, হাশেম খানসহ তখনকার বিখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকর্ম কিনেছেন। বললেন, ‘একসময় এমন অবস্থা হলো, পকেটে টাকা থাকলে আর ছবি পছন্দ হলে নিজেকে বিরত রাখতে পারতাম না। এখনো পারি না। আমার কাছে এমনও ছবি আছে, যেটা কিনেছিলাম দেড় লাখ টাকায়, এখন দাম হবে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। ’

 

অনেকের সঙ্গে পরিচয়

ছবি কেনার নেশা থেকেই মোহাম্মদ কিবরিয়া, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী, সফিউদ্দিন আহমেদদের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়। তিনি বললেন, ‘আমি তখন তরুণ। জয়নুল আবেদিন বয়সে অনেক বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার বাবার বন্ধু। তাই তাঁর কাছে যেতে পারতাম না। এ সময়ের অনেক শিল্পীই আমার ঘনিষ্ঠ। সুলতানের সঙ্গে অনেক ভালো সময় কাটিয়েছি। ’

 

কার চিত্রকর্ম বেশি

সবচেয়ে বেশি ছবি আছে মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, এস এম সুলতান আর অলকেশ ঘোষের। তিনি বললেন, ‘জয়নুল আবেদিনের অনেক ছবি ছিল। সেগুলো আমার ছেলে-মেয়েরা অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গেছে। ওরা ওখানেই থাকে। ’

 

বিনা টাকায় মকবুল ফিদা হুসেনের ছবি 

একবার বোম্বের জাহাঙ্গীর গ্যালারিতে ঘুরতে গিয়েছিলেন মঈন চৌধুরী। সেখানে মকবুল ফিদা হুসেনের চিত্রপ্রদর্শনী চলছিল। তাঁর ছবির ন্যূনতম মূল্য ছিল এক লাখ রুপি। মঈন চৌধুরীর তখন ওই টাকা দিয়ে ছবি কেনার সামর্থ্য ছিল না। তিনি প্রদর্শনী ঘুরে দেখলেন। একপর্যায়ে ফিদা হুসেনের সঙ্গে পরিচিত হলেন। শেষে বললেন, ‘আপনার ছবি কেনার আমার খুব ইচ্ছা; কিন্তু এত টাকা আমার নাই। ’ ফিদা হুসেন তাঁর কথা শুনে একটি ছবি বিনা মূল্যে দিয়েছিলেন। মঈন চৌধুরী জানালেন, এখন সেই ছবির দাম ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা।

 

এত দাম! ৭০ টাকা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বন্ধুকে নিয়ে একবার গুলশানের সাজু গ্যালারিতে ছবি কিনতে গিয়েছিলেন মঈন চৌধুরী। স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘অনেক আগের কথা। মুর্তজা বশীরের একটি ছবি কিনতে গিয়েছিলাম। তখন উনার ছবির দাম এত ছিল না। ছবির দাম জিজ্ঞেস করলাম। তখন ৭০ হাজার হলে বলত ৭০। সতেরো বললে ১৭ হাজার। ৭০ বলার পরে আমার বন্ধুটি বলল, এত দাম! ৭০ টাকা! আমাদের দেশের বেশির ভাগ লোকেরই চিত্রকর্ম বিষয়ে তেমন ধারণা নেই। ছবির দাম আমাদের দেশে অনেক কম, অন্য দেশে অনেক বেশি। ’

মঈন চৌধুরী শুধু ছবিপ্রেমীই নন, কবিতা লিখেন, দর্শনের ওপর তাঁর বেশ কয়েকটি বই রয়েছে। অনেক ভাস্কর্যও সংগ্রহে আছে তাঁর। এগুলোর পাশাপাশি বড় বারান্দাজুড়ে করেছেন বনসাই বাগান।


মন্তব্য