kalerkantho


চলে গেলেন অতিথি

১২ মে, ২০১৮ ০০:০০



চলে গেলেন অতিথি

ছবি পরিচিতি: নিজের স্টুডিওতে আব্বাসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন শোয়েব ফারুকী

২৫ এপ্রিল চলে গেলেন। মশহুর আলোকচিত্রী আব্বাস আত্তার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও ছবি তুলেছিলেন। ২০০৫ সালে এসেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। শোয়েব ফারুকীর বাসায় কড়া নেড়েছিলেন এক সকালে। সঙ্গে এনেছিলেন একটি লাইকা ক্যামেরা আর একজোড়া জুতা। একাত্তরে ওই জুতাই ছিল আব্বাসের পায়ে আর হাতে ছিল লাইকা ক্যামেরাটি। শোয়েব ফারুকী স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেছেন এস এম রানার কাছে

 

একজন আব্বাস আত্তার

১৯৪৪ সালে ইরানে জন্ম আব্বাস আত্তারের। প্যারিসে ৭৪ বছর বয়সে মারা গেলেন ২৫ এপ্রিল ২০১৮। প্রায় পাঁচ দশক তিনি ক্যামেরা হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়—বাংলাদেশ, চিলি, ভিয়েতনাম, ইরান বা দক্ষিণ আফ্রিকায়। তুলেছেন যুদ্ধ, দুর্যোগ বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের ছবি। ম্যাগনাম ফটো এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন জীবনের বেশির ভাগ সময়। ম্যাগনামের প্রেসিডেন্ট টমাস ডোয়ারযাক বলছিলেন, আব্বাস হয়ে উঠেছিলেন পুরো একটি তরুণ প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের গডফাদার। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) প্রেসিডেন্ট পিয়েরে হাস্কি বলছেন, আব্বাস ছিলেন অসাধারণদের মধ্যে অসাধারণ। ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিয়ে তাঁর আলোকচিত্রের বই, ‘আল্লাহু আকবর : এ জার্নি ইন মিলিট্যান্ট ইসলাম’ একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। নিজের ছবি সম্পর্কে তিনি বলতেন, আমার ছবি শুরু হয় ঘটনা দিয়ে, আর শেষ হয় ধ্যানে।  সূত্র : উইকিপিডিয়া ও বিবিসি  

২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জেতার সুবাদে বিশ্বের কয়েকজন নামকরা আলোকচিত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয় আমার (শোয়েব ফারুকীর)। আব্বাসের সঙ্গেও যোগাযোগ সেই সূত্রে। ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাস হবে। প্যারিস থেকে ঢাকায় নেমেই আমাকে ফোন করলেন আব্বাস। আমি শুরুতে বুঝতেই পারিনি। পরক্ষণে মনে পড়ল আব্বাস আসছেন চট্টগ্রামে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিই। তারপর চট্টগ্রামে আসতে বলি। ওই দিনই চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন। এরপর আমাকে আরেক দফা ফোন দেন। আমি ফোনেই তাঁকে আমার লালখান বাজারের বাসার ঠিকানা জানিয়ে দিই। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, একসময় কড়া নাড়ার শব্দও শুনলাম। দেখলাম সাদাসিধে পোশাক পরা শ্মশ্রুমণ্ডিত মানুষটিকে (আব্বাস আত্তার)।  কাঁধে ব্যাগ। হাতে অনেক রকম ফল। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, প্যারিস থেকে আসা একজন মানুষ বাঙালিদের মতোই মেজবানের বাসায় ফলমূল নিয়ে এসেছেন। আমার স্ত্রী সোহেলী আক্তারও সমান বিস্মিত। 

 

আমার অতিথি

আব্বাস শুধু বিশ্বনন্দিত আলোকচিত্রীই নন, তিনি আমাদের যুদ্ধ দেখেছেন। যুদ্ধের ছবি তুলেছেন। একবার নাকি ছবি তোলার সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের মুখোমুখি পড়ে যাওয়ায় সৈন্যরা তাঁকে হ্যান্ডস-আপ বলে দাঁড় করিয়ে রাখে। ক্যামেরা ধরেই দুই হাত ওপরে তুলেছিলেন। আর সেই অবস্থায়ই ছবি তুলেছিলেন। লাইকা ক্যামেরার তো এই সুবিধা যে শাটার চাপলেও শব্দ হয় না। তাই এমন কাজ তিনি করতে পেরেছিলেন। সেই আব্বাস আমার বাসায়! আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সোহেলীকে বললাম, ‘ভালোমন্দ রান্না করো।’ সোহেলী আমার আরো অনেক বিখ্যাত বন্ধুকে রেঁধে খাইয়েছে। কিন্তু আব্বাস সবার চেয়েই আলাদা। সোহেলীও জানে, আব্বাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন। আব্বাস তিন দিন ছিলেন চট্টগ্রামে। কম কথার মানুষ। যা-ও বলেন নিচুস্বরে, ধীরে ধীরে। নাশতা করতে করতে চট্টগ্রাম বেড়ানোর পরিকল্পনা বললেন। আরো বললেন, ‘আমাকে সঙ্গ দিতে হবে।’  আমার রাজি না হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। আব্বাসকে বলেছিলাম, আমার বাসায় থাকতে। কিন্তু তিনি হোটেলে উঠতে চাইলেন। এমন হোটেল, যেটায় বড় সুইমিং পুল আছে। সে মতো হোটেল আগ্রাবাদে একটি ঘর ভাড়া করি। হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে কাজে নেমে পড়লেন আব্বাস। তিনি একজোড়া জুতা নিয়ে এসেছিলেন।

 

ব্যাগ থেকে জুতাজোড়া বের করলেন

বেশ ভারী ধরনের, হেভিওয়েট জুতা। কোথাও কোথাও ছিঁড়ে গেছে। বললেন, ‘একাত্তরে তোমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ছবি তোলার সময়ের জুতা এগুলো। এ জুতায় ভর দিয়ে ঠাকুরগাঁও চষে বেড়িয়েছি। বগুড়ায়ও গেছি। কাঁদাপথ মাড়াতে সুবিধা হয়েছিল এগুলো দিয়ে।’ আমার মনে হয় তিনি জুতাজোড়া এনেছিলেন বাংলাদেশে আরেকবার ব্যবহার করবেন বলে। যত দূর মনে পড়ে, একদিন পরেও ছিলেন। লাইকা ক্যামেরাটিও (এই ক্যামেরাটি দিয়ে আমাদের যুদ্ধের ছবি তুলেছিলেন আব্বাস) বোধ হয় একই উদ্দেশে এনেছিলেন। তবে এগুলো তিনি এখানে রেখে যাননি। সঙ্গে করে ফেরত নিয়ে গিয়েছিলেন। আরো দুই-তিনটি ক্যামেরাও ছিল তাঁর ব্যাগে। রঙিন ছবি তোলার জন্য ক্যানন ক্যামেরাও ছিল। তবে আব্বাস সাদা-কালো ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করেন। তাই লাইকা তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। এক রাতে আমরা আব্বাসকে বাসায় খেতে বললাম। সোহেলী দেশি মুরগি, এক পদ মাছ, ডাল আর সবজি রান্না করেছিল।  সব মিলিয়ে তিনি তিন বেলা আমার বাসায় খেয়েছিলেন।

তখন তাঁর ষাট বা একষট্টি

তাঁকে আমি বয়স নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস  করিনি। তবে আন্দাজ করেছিলাম ষাট হবে। ভাবছিলাম, তিনি শিপইয়ার্ডে যেতে পারবেন কি না। সীতাকুণ্ডু শিপইয়ার্ডে যেদিন ছবি তুলতে গেলাম, সেদিন আমার ভুল ভাঙল। একটা ছবি ধরতে তিনি হঠাৎ করেই লাফ দিয়ে ট্রাকে উঠে গিয়েছিলেন। বললে আমি হয়তো মই জোগাড় করতাম। কিন্তু তিনি যেন চোখের পলকেই ট্রাকে উঠে পড়লেন। আমি আবার অবাক হলাম। শিপইয়ার্ডে তিনি লাইকা আর ক্যানন ডিজিটাল—দুই ক্যামেরায়ই ছবি তুলেছেন। সারা দিন কাজের পর আমরা ফটোব্যাংক গ্যালারিতে (শোয়েব ফারুকীর স্টুডিও) ফিরে আসি। তখন ফটোব্যাংকে ইন্টারনেট ছিল। আব্বাস কম্পিউটারে ছবি এডিট করে তাঁর অফিসে পাঠিয়ে দিলেন। তবে লাইকায় তোলা ছবিগুলো তিনি চট্টগ্রামে ওয়াশ করেননি। বললেন, ‘এগুলো প্যারিসে ওয়াশ করব।’  চট্টগ্রামে থাকার দিনগুলোয় সীতাকুণ্ডু শিপইয়ার্ড ছাড়াও তিনি চান্দগাঁওয়ের একটি মহিলা মাদরাসায় ছবি তুলেছেন।

 

আমার আফসোস

কেন জুতাজোড়া চেয়ে রাখলাম না? লাইকা ক্যামেরাটি তখনো সচল ছিল। এগুলো রেখে দিলে হয়তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষণ করা যেত। আব্বাস আমাকে তাঁর ‘আল্লাহু আকবর : এ জার্নি ইন মিলিট্যান্ট ইসলাম’ বইটি উপহার দিয়েছিলেন। বইটিতে দু-চার লাইন লিখে স্বাক্ষরও দিয়েছিলেন। কিন্তু বইটি আর খুঁজে পাচ্ছি না। আবেদন জানাচ্ছি, যদি কারোর কাছে বইটি থাকে দয়া করে এটি ফেরত দিন।

 

সেদিন সোহেলীও কেঁদেছিল

আমার কাছ থেকেই শুনেছিল সোহেলী যে আব্বাস মারা গেছেন। কেঁদে ফেলেছিল সে। বলেছিল, এত বড় একজন মানুষ অথচ কী অমায়িক! খুব ভদ্র। অনেক গুছিয়ে কথা বলেন।’ সোহেলী তাঁকে তিন বেলা রান্না করে খাইয়েছে। আব্বাস বলেওছিলেন একবার, রান্না খুব ভালো হয়েছে। আব্বাস প্যারিস ফিরে যাওয়ার দিনকয় পরে মহিলা মাদরাসার অনেক সাদা-কালো ছবি চট্টগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য। অথচ তিনি কাউকেই কথা দিয়ে যাননি যে ছবি পাঠাবেন। কিন্তু ছবি ঠিকই পাঠিয়েছিলেন। এমনটা একজন বড় মাপের মানুষই করেন।

 

আব্বাসের একাত্তর

 


মন্তব্য