kalerkantho


সরেজমিন

বাবুরহাট

বাবুরহাটে সেদিন হাটবার ছিল। ভিড় ছিল বেদম। লুঙ্গি-গামছার জন্য দেশজোড়া খ্যাতি নরসিংদীর বাবুরহাটের। রায়হান রাশেদ ঘুরে দেখেছেন

১২ মে, ২০১৮ ০০:০০



বাবুরহাট

গাড়ির পেছনে গাড়ি। তার পেছনেও গাড়ি। রাস্তা নিশ্চল। তবু একসময় পৌঁছতে পারলাম। সূর্য তখন মাথায় চড়ে বসতে প্রস্তুত। বাবুরহাট পাইকারি পোশাকের গঞ্জ। তার পরও আজ হাটবার। গাড়ি থেকে নেমে মিনিট পাঁচেক হাঁটলাম। সদর দরজায় পৌঁছতে এর কমে পারলাম না। পুরো গঞ্জ রোদে ঝলকাচ্ছে। কাপড়ের গাঁটরি নামানো হচ্ছে একের পর এক। ফটকের পর পথটা সরু হয়ে যায়। টিনের ছাউনির ছোট-বড় ঘর দুই পাশে। অনেক ঘরের মেঝে পাকা। কোনো কোনোটার আবার বাঁশের খুঁটির ওপর কাঠের মেঝে। প্রচুর ভিড়। অনেক কথা। কারোর দিকে কারোর তাকানোর ফুরসত নেই।

 

এই যে বাবুরহাট

নরসিংদী শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে গঞ্জটা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে।

হাট বসে সপ্তাহে তিন দিন—বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার। অন্য দিনগুলোয় শুধু বড় বড় আড়ত খোলা থাকে। সব দোকানেই পাইকারি যেমন, খুচরাও বিক্রি হয়। সারা দেশে কাপড় যায় এখান থেকে। যায় বিদেশেও।

 

এবার কিছু সেদিনের কথা

১৯৩৪ সাল। হলধর সাহা ওরফে কালীবাবু ছিলেন জমিদার। তাঁত কাপড় তাঁর বড় প্রিয় ছিল। দেশের নানা জায়গা থেকে তিনি তাঁতিদের দাওয়াত করে আনেন। ব্রহ্মপুত্রের তখন ভরা যৌবন। পালতোলা নৌকা ভিড়ত নদীর কূলে। সওদাগররা আসতেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী বা বরিশাল থেকে। সঙ্গে তাঁদের শাগরেদরাও। কালীবাবু হাট বসান ব্রহ্মপুত্রের তীরে। মানুষের মুখে মুখে তখন কালীবাবুর নাম ফিরত। লোকে বলত কালীবাবুর হাট। একসময় নাম হয়ে যায় বাবুরহাট। গোড়ায় শুধু তাঁতের কাপড় বিক্রি হতো। পরে লুঙ্গি, গামছা আর শাড়িও বিক্রি হতে থাকে। ১১ একর জমির ওপর এই গঞ্জ। এখন এখানে গেঞ্জি, থান কাপড়, ভয়েল, পপলিন, সুতি কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, থ্রি-পিস মায় ধুতিও পাওয়া যায়। স্ট্যান্ডার্ড, পাকিজা, অনুসন্ধান, আমানত শাহ, এটিএম, স্মার্ট, বোখারি, রোহিতপুরী, ফজর আলী, জেএম লুঙ্গি কিন্তু এখানেই তৈরি হয়। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা টাঙ্গাইল থেকে ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানে কাপড় আসে ফি সপ্তায়।

 

ঘুরতিফিরতি কথা

সিলেটের সুলতান সরকার বাবুরহাটে আসেন দুই যুগ ধরে। প্রথমবার এসেছিলেন চাচার হাত ধরে। বললেন, ‘এখান থেকে কাপড় নিয়ে ভালোই লাভ করতে পারি। আমার ব্যবসাও এখন বেশ বড় হয়েছে। এখানে চাঁদা দিতে হয় না। টাকা নিয়ে ঝামেলা নেই কোনো।’

১৫ বছর ধরে আসছেন ঢাকার শেখ তরিকুল হাসান। সাধারণত থ্রি-পিস ও শাড়ি নেন। বললেন, ‘ঢাকার কাছেই বাবুরহাট বাজার। আমাদের যাতায়াতের সুবিধা। পাইকারি কিনি। এই বাজারে নিরাপত্তা আছে।’

খুচরা ক্রেতারা বরং বেশ খুঁতখুঁতে। তাঁরা রং পরখ করেন বারবার। দামও যাচাই করেন ভালোমতো। মধ্যবয়সী রিজিয়া খানমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ভৈরব থেকে এসেছেন। বললেন, ‘চার বছর ধরে আসি। তিন-চার মাস পরপর। এখানে দাম ভালোই কম। পছন্দ করার সুযোগ বেশি।’

বাবুরহাট বণিক সমিতির সহসভাপতি আবদুল বারিক মিয়ার সঙ্গেও কথা বললাম। তিনি বললেন, এখানে ভালোমানের কাপড় পাবেন। কম দামে পাবেন। মিলমালিকদের সঙ্গেও দরবার করি আমরা। বলি, এমন সুতায় কাপড় তৈরি করুন, যেন মানুষ পরে আরাম পায়।’

দেখছি আর ভালো লাগছে

অলিগলি ধরে হাঁটছি। এত রকম কাপড়ের পসরা যে চোখ জুড়িয়ে যায়। হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্সে গিয়ে ঢুকি। বেশ বড় দোকান। এদের কাপড়ের নাম আছে। নিজেদের মেশিনে তৈরি করে। ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন ম্যানেজার মো. ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে কথা বললাম, ‘পাইকার ও কাস্টমার আমাদের কাছে আপন ভাইয়ের মতো প্রিয়। তাদের খুশিই আমাদের খুশি। দূরের লোকদের আমরা রাতে থাকারও ব্যবস্থা করে দিই। আমরা উন্নতমানের সুতায় কাপড় তৈরি করি। মালিক আমাদের বলেন, ব্যবসাটাকে সেবা মনে কোরো।’

হাফসা থ্রি-পিসের মালিক মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বাবুরহাটে আমার বাড়ি। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। বাড়ির কাছে ব্যবসা করি। দেশ-বিদেশের মানুষ দেখি। হাটবারের দিন এখানকার শ্রমিকদের রোজগারও হাজার ছাড়ায়।’ বাবুরহাটে পাঁচ হাজার দোকান আছে। তিন দিনের হাটে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। ওই তিন দিন রাতেও সজাগ থাকে বাবুরহাট। হাটের দক্ষিণ পাশে একটি মাঠ আছে। নাম ধূমকেতু। খুচরা বিক্রেতারা মূলত ওই মাঠে ভিড় করে। মাঠের ধারে আলু, শিঙাড়া, ডালপুরি, সমুচার টঙঘর বেশ কয়েকটি। চায়ের দোকানও আছে। একটা মেয়েকে দেখি প্রেসার আর ডায়াবেটিস মাপার মেশিন নিয়ে বসেছেন। একটা বাক্সে কিছু ট্যাবলেটও রেখেছেন। তিন দিনই এসে বসেন। প্রেসার-ডায়াবেটিস মেপে দেন ক্রেতা-বিক্রেতাদের। মাঠের এক কোণে একটি শহীদ মিনারও আছে।

 

শব্দ শুনি

বাবুরহাটের এধার-ওধারের প্রায় গ্রামেই কাপড় বোনার শব্দ শোনা যায়। চৌয়ালা, মহিষাশুড়া, মাধবদী বা চান্দেরপাড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কাপড় বোনার কাজে জড়িত। বাবুরহাটে বেকার মানুষ কম।

 

ছবি : শেখ হাসান ও সংগ্রহ


মন্তব্য