kalerkantho


এক পাতা প্রেম

হারানো সুর ফিরিয়ে আনছেন

সুনির্মল দাস বাপী এখনো যুবা। প্রেমে পড়েছেন বাদ্যযন্ত্রের। এর মধ্যে ৪০টি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র নতুন করে তৈরি করেছেন। প্রসূন মণ্ডল দেখা করে এসেছেন

১২ মে, ২০১৮ ০০:০০



হারানো সুর ফিরিয়ে আনছেন

গোপালগঞ্জ জেলা উদীচীর সভাপতি নাজমুল ইসলামের কাছে ছিল খবরটা। গান্ধিয়াশুরের বাপী বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন, সেগুলো নিয়ে গবেষণাও করেন। পরের দিন সোমবার ছিল। ৭টায় বের হয়েছিলাম। কুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে গোপালগঞ্জ-টেকেরহাটের লোকাল বাস ছাড়ল সাড়ে ৭টায়। গান্ধিয়াশুর যেতে ৩০ মিনিট লাগল। বাপীর বাড়ি চিনতে অসুবিধা হলো না।

 

গিয়ে দেখি

বাপীর বাড়ির পেছন দিকের একটি ঘরে মেঝের ওপর পাটি পাতা। তার ওপর বাদ্যযন্ত্রগুলো ছড়ানো। একে একে নামও বলতে থাকলেন—দোতারা, বেহালা, সানাই, কাশি, খমক, একতারা, গুপীযন্ত্র শিঙা, বাঁশি, চটা, ঢাক, ম্যাচ, কাড়া, খোল, করতাল, জয়ঢাক, সারিন্দা, সরজ, খঞ্জনি, কাহন, জলতরঙ্গ, পাতাবীণ, মেরাকাচ, মন্দিরা, ম্যাচ বাক্স, শামুক, চুড়িছেকরা, নাল, ঢোল, বীণবাঁশি, মোহন বাঁশি, রাবণবীণা, ঝুমুর, তবলা, ডুগডুগি, প্রেমজুড়ি ইত্যাদি। একপর্যায়ে বাপীকে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। আমি প্রথমে জানতে চাইলাম পাতাবীণ সম্পর্কে।

তিনি বললেন, ‘সাইমন জাকারিয়ার লেখা ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র’ বইয়ে আমি এর ছবি দেখেছি। লেখাও ছিল কিছু। পরে নারিকেলের মালা, বাঁশ ও বড়শির (মাছ ধরার যন্ত্র) সুতা দিয়ে পাতাবীণ তৈরি করি। তারযন্ত্রটি ছড় দিয়ে বাজাতে হয়। এটিতে আমি কয়েকটি গানের সুর তুলেছি।’

 

মেরাকাচ, রাবণবীণা, শামুক, চটা ইত্যাদি

জানতে চেয়েছিলাম মেরাকাচ যন্ত্রটি নিয়ে।

বাপী বললেন, ‘টিভিতে দেখেছি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের এটি বাজিয়ে লোকগান গাইতে। আমার যন্ত্রটি তৈরি করার আগ্রহ হলো। আমি নারিকেলের মালা, পুঁতি ও কাঠ দিয়ে দুই দিন চেষ্টা করে যন্ত্রটি বানিয়েছি। আমি কয়েকটি গানের সঙ্গে এতে সুর তুলে দেখেছি। মেলামাইন প্লেট বা গ্লাসে আঘাত করলে যেমন শব্দ হয় এতেও তেমন শব্দ হয়।’

তারপর বললেন, রাবণবীণা নিয়ে, একটি প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র এই রাবণবীণা। প্রথমে দেখি জাতীয় জাদুঘরে। আমি বাড়ি এসে নারিকেলের মালা, কাঠ, চাবি, স্টিলের তার ও চামড়া দিয়ে যন্ত্রটি তৈরি করি।

জানতে চেয়েছিলাম, শামুক দিয়ে কি সত্যি সুর তোলা যায়?

বাপী বললেন, প্রায় চার বছর আগে যন্ত্রটি প্রথম দেখি অমূল্য দাদুর কাছে। আমাদের বাড়ির পাশেই বাড়ি। তিনি সুর তুলছিলেন যন্ত্রটি দিয়ে। দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথা থেকে পেয়েছেন? তিনি বললেন, এটি আমি ছোটবেলা থেকে নিজেই শিখেছি। তারপর আমি তাঁর কাছ থেকে শিখলাম।’

চটা যন্ত্র সম্পর্কে প্রথম বাপী জানতে পারেন গ্রামের মনোজ ঠাকুরের কাছে। তারপর অনেক খুঁজে নিজড়া গ্রামে ব্রজবাঁশি নামে এক লোকের সন্ধান পান। কিন্তু দেখা মেলেনি। পরে গ্রামের অন্য লোকের মুখে বিবরণ শুনে বাঁশের চারটি চটা দিয়ে যন্ত্রটি তৈরি করেন। পরে নিজের চেষ্টায় তাতে সুর তোলেন বাপী।

ম্যাচ বাক্স দিয়েও সুর তোলা যায়? জানতে চাইলে বাপী বললেন,  গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বেদগ্রামের শহীদ মিয়ার কাছে প্রথম খবর পাই। তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বিসিক শিল্পনগরীর পরিতোষ বিশ্বাসের কাছে যাই। তাঁর কাছে দিয়াশলাই বাক্স দিয়ে সুর তুলতে শিখি।

 

বাপীর বাড়িতে অভাব আছে

ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করেন বাপী। কাজ করার পাশাপাশি অবসরে বাড়িতে বসে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা করেন। এরই মধ্যে তিনি একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা আর খমকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বাজানোর কাজ শেষ করেছেন। বললেন, ‘আমার তৈরি করা যন্ত্রগুলোর টিউন আবহাওয়ার তারতম্যে নষ্ট হয় না। আমি চাই হারানো সুর ফিরে আসুক।’

যার কাছ থেকে

সেটা ১০ বছর আগের কথা। পাশের বাড়ির বিজয় পাণ্ডের সান্নিধ্যে এসে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। বিজয় পাণ্ডে মারা যাওয়ার পর থেকে বাপী বাদ্যযন্ত্র তৈরি শুরু করেন। অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক জীবনানন্দ কীর্তনিয়া বলেন, বাপীর গবেষণাকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিসিকের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা সম্ভব। এই শিল্পী যদি তাঁর তৈরি বাদ্যযন্ত্রের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতে চান, তাহলে আমারা তাঁকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দিতে পারি।’

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য