kalerkantho


সরেজমিন

বঙ্গবাজার

৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবাজার

সারা দেশের মানুষই বঙ্গবাজার চেনে, বিশেষ করে ছেলেপুলের দল। শার্ট, প্যান্ট, থ্রি-পিস, লুঙ্গি-গেঞ্জি, ওয়ান পিস, পাঞ্জাবিও পাওয়া যায়। অনেক কথার জায়গা, অনেক দামাদামি করতে হয়, সস্তাও পড়ে। মীর হুযাইফা আল মামদুহ দিন কয়েক আগে ঘুরে এসেছেন

 

বঙ্গবাজার টুকিটাকি

ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় বঙ্গবাজার। মূলত তৈরি পোশাকের বাজার। ১৯৬৫ সালে এখানে হকার ও ছোট দোকানদাররাই বেশি ছিল। জায়গাটি তখন ঢাকার প্রধান রেলস্টেশনের লাগোয়া ছিল। হালকা খাবার, টুকিটাকি জিনিসপত্র আর স্যুভেনির বিক্রি হতো বেশি। স্টেশন কমলাপুর সরিয়ে নেওয়া হলেও জায়গাটির গুরুত্ব কমেনি, যেহেতু চৌরাস্তার ধারে। হকার ও দোকানিরা বরং এখানে স্থায়ী হওয়ার চিন্তা করে। কিছু টিনশেড তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালে ঢাকা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ টিনশেডগুলো ভেঙে পাকা বাজার গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ জায়গার মালিকানা ছাড়তে রাজি হয় না। এ অবস্থায় দোকানিরা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বার্ষিক ইজারা চুক্তির ভিত্তিতে দোকান বসানোর অনুমতি পায়। শেষে ১৯৮৫ সালে সিটি করপোরেশন জায়গাটির মালিকানা পায় এবং ১৯৮৯ সালে পাকা বিপণিকেন্দ্র নির্মিত হয়। নতুনভাবে তৈরি বাজারটির মোট আয়তন ২১ হাজার ২৫০ বর্গফুট। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এটি তৈরি পোশাকের বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 

বিকেল ৩টায় পৌঁছালাম। আগে যাইনি কখনো। বন্ধুদের কাছে শুনতাম। মহানগর মার্কেটকেই ভেবেছিলাম বঙ্গবাজার। ঘুরছিলাম।  শুধু প্যান্ট আর মেয়েদের পোশাক দেখছিলাম। একজনকে বলতে শুনলাম, এক বছর হয় এখানে কাজ করছি, আগে বঙ্গমার্কেটে ছিলাম। আমি থমকে গেলাম। জানতে চাইলাম, আচ্ছা, বঙ্গবাজার কোনটা তাহলে। বলল, ওই দিক দিয়ে যান। একই রকম মার্কেট। মোটামুটি ৯-১০টা গলি। গলির দুই ধারেই দোকান। বেশির ভাগ দোকানের সাইজ বোধ করি পাঁচ হাত বাই আড়াই হাত। তবে বড় দোকানও আছে; কিন্তু খুব বেশি নয়। হাঁটার রাস্তা বেশির থেকে বেশি দুই হাত। চিপা ঘিঞ্জি, বাতাস কম বয়। শর্টস, টি-শার্ট, ফতুয়ার দোকানও আছে। তবে মেয়েদের পোশাক মহানগর মার্কেটেই বেশি। সবচেয়ে বেশি এখানে প্যান্টের দোকান।

লোকাল প্যান্টওয়ালা

মোহাম্মদ বেল্লাল প্যান্ট বিক্রি করেন। মালিক নন, কর্মচারী। আমাকে পুছ করলেন, কী লাগবে?

‘কিছু না, দেখতে আসছি।’

শুনে আগ্রহ করে তাকালেন। তারপর আলাপ হলো। জানলাম, কেরানীগঞ্জে বাসা। আগে ইলেকট্রিকের কাজ করতেন। মালিকের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় এক বছর আগে এখানে চলে আসেন। ভালোই লাগছে। আগের কাজে আর ফিরবেন না। দোকান মালিকের নাম পারভেজ। ১২ বছর ধরে বঙ্গবাজারে। লোকাল সব ধরনের প্যান্ট বিক্রি করেন। জিন্স, গ্যাবার্ডিন এসব। কালীগঞ্জে অনেক কারখানা। সেখান থেকে পাইকারি দরে প্যান্ট কিনে আনেন। পাইকারি দরেই বিক্রি করেন। খুচরা বেচেন না।

‘প্যান্ট নেয় মানুষ, টেকে এই প্যান্ট?’ পারভেজকে পুছ করি।

জবাব দিলেন পারভেজের সহকারী। বললেন, ‘ভাই, কী কন, সারা বাংলাদেশ থেকে এই প্যান্ট নেয়। ইভেন কি (এমনকি) বিদেশ থেকেও আইসা নিয়া যায়।’ নিজের পা উঠিয়ে প্যান্টের ওপর চাপড় মারলেন দুবার। ‘এই দ্যাখেন, আমি এইটা দেড় বছর ধইরা পরতাছি, কিচ্ছু হয় নাই, রংটাও জ্বলে নাই।’ ৩০০ টাকা দামেও প্যান্ট মেলে বঙ্গবাজারে। মুলামুলিতে (দামাদামি) যাঁরা অভিজ্ঞ তাঁদের জন্য ভালো জায়গা বঙ্গবাজার।

নাজমুল এসেছিলেন

পাঞ্জাবির দোকান। প্রাইস ট্যাগ লাগানো—৪০০ থেকে শুরু। হরেক রকমের, হরেক রঙের পাঞ্জাবি। কড়া ডিজাইন। খুচরা কিনতে এসেছিলেন নাজমুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিনে তিন বছর হয় কাজ করেন। দোকানি নাছোড়বান্দা, খুচরা বেচবেন না। পরে বলল, ‘থাউকগা কাস্টমার নাই আজকা। দিয়া দিই।’ অনেক মুলামুলি হলো। শেষে ৪০০ টাকা করে দুটি পাঞ্জাবি কিনলেন নাজমুল। একটি সাদা, অন্যটি নীলচে। সাদাটি বাবার জন্য। নীলচে পাঞ্জাবিটি নিজের। বাড়ি ঠাকুরগাঁও। ২৫ রোজায় বাড়ি যাবেন। প্রতি ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগে এখান থেকেই ঈদের বাজার করে নিয়ে যান। সস্তায় পাওয়া যায় বলেই। নিজের আর ছোট ভাইয়ের জন্য প্যান্ট কিনবেন। মায়ের শাড়িটি কেনা হয়ে গেছে। ঈদের বাজার এই-ই। দোকানি রাশেদ জানালেন,  কেরানীগঞ্জে তাঁদের কারখানা আছে। ইসলামপুর থেকে কাপড় কিনে পরে কারখানা থেকে পাঞ্জাবি বানিয়ে আনেন। মেয়েদের কাপড় আছে—এমন একটা দোকানের ক্যাশে এক কমবয়সী ছেলে বসে হিসাব করছিল। বললাম, কথা বলি?

উত্তর এলো, ‘না ভাই, কথা বলা যাবে না। আমি কোনো তথ্য দিতে পারুম না আপনারে।’

 

গেঞ্জির দোকানদার

মার্কেট ফাঁকাই লাগছিল। গেঞ্জির দোকানদার বসেই ছিলেন। ভালোই কথা হলো। জিজ্ঞেস করলাম, কাস্টমার কম ক্যান? ঈদের মাল কি বেইচা ফেলছেন, নাকি সামনে আরো চান্স আছে?’

বললেন,  এক দফা বেচছি ভাই, এখন টুকটাক বেচা বিক্রি চলে আর কী! আসলে কাস্টমারই কম। বিক্রি আগের মতো নাই।’

 জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, এখানকার দোকান মালিকদের টাকা-পয়সা কেমন?

উত্তর এলো, খুব ভালো অবস্থা থাকলে কি আর এইখানে দোকান নেয়? তয় এইখান থেইকা দোকান কইরা ম্যালা মাইনসেই বড়লোক হইছে। এই আমিই দেখছি।’

একটু থেমে, ‘আরেক সমস্যা, ব্যবসা আগের মতো নাই।  মাইনসের ট্যাকা কইম্যা গেছে। সবাই একই রকমের মাল আনে। কেউ নতুন কিছু আনা পারে না। ঝুঁকি লইবার চায় না আর কেউ-ই। এর লাইগা ব্যবসাও ভাই ঝিম মাইরা গেছে গা।’

খুচরা কাস্টমার যা-ও দু-চারজন ছিল, পাইকারি কাস্টমার পাওয়াই যাচ্ছিল না। একজনকে পেলাম, মধ্যবয়সী, লাল দাড়ি। তাড়াহুড়া করে দরদাম করছিলেন। বলতে শুনলাম, ‘ভাই, এট্টু জলদি, টঙ্গী  থেইকা আইছি, গিয়া তারাবিটা ধরতে হইব।’

এবার আরেকজনকে পেলাম। সাভার থেকে এসেছেন রায়হান। এখান থেকেই পাইকারিতে মাল কেনেন তিনি। সাভারে দোকান আছে।

‘বেশ ভালোই চলে। লোকাল মাল হইলে কী হইছে, টিক্যা যায়। মানুষ নেয়ও। একটু কম দামে পাইলে তো মানুষ নিবই।’

ওদিকে বেশ আগেই আসর নামাজের আজান শুনেছিলাম। ইফতার ধরতে হবে, নামাজও বাকি। ফেরার পথ ধরলাম।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

 


মন্তব্য