kalerkantho


শেষ মানুষ

শিংশিল্পী মাহমুদ

৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শিংশিল্পী মাহমুদ

লালবাগের শিংশিল্প বহু পুরনো। কিন্তু এখন শুধু মাহমুদ হাসানকেই পাওয়া গেল। বাবার কাছ থেকে শিখেছেন। দেখে এসেছেন

পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

লালবাগের আমলীগোলা। বালুখোলা মাঠ পেরিয়ে একটু ডানে বেশ কিছু টিনশেড ঘর।

মাহমুদ সাহেবের মাকাম? একজনকে জিজ্ঞেস করলাম।

উদিকে—হাত বাড়িয়ে দেখালেন।

ঘরের ধারে যেতেই খুটখাট শব্দ কানে এলো। পর্দা সরাতেই দেখি মাঝবয়সী একজন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। খালি গা। দরজার দিকে মুখ করেই বসেছেন। তাঁর ডান পায়ের ওপর একটা খেলনা পাখি। পাখিটার পিঠ মসৃণ করছেন। পাশে দেয়াল ঘেঁষে ছোট-বড় বেশ কিছু শিং রাখা। কাছেই দোয়েল, চিংড়ি, নৌকার কিছু শোপিস। লোকটা এক মনে কাজ করে যাচ্ছিলেন। আমাদের উপস্থিতি ঠাহর করতে ভালোই সময় গেল। বললেন, ‘ভাই, কিছু মনে কইরেন না। ঠাণ্ডা মাথায়  করতে হয় এই কাজ। একটু গোলমাল হলেই পা যাবে।’ 

 

দেশে এমন আর কেউ নেই

মাহমুদই বলছিলেন, দেশে এখন আর কেউ এই কাম করে না। অথচ এই আমলীগোলায় এই কাম চইলা আসছিল কয়েক শ বছর হইব। আমি চইলা গেলে কামটা বন্ধ হয়ে যাইব। বেশি তো চলে না। বিদেশে কইলাম কদর আছে।

আমার বাবা হুমায়ুন কবির গাড়ি চালাইতেন। তয় সময় পাইলে শিং লইয়া বসতেন। আমার মা-ও এই কাম পারত।’  মাহমুদ বাবাকে হারান আট বছর বয়সে। অভাবের সংসারে পড়াশোনা বেশি করার সুযোগ হয়নি। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ে ইস্তফা দিতে হয়। তারপর মা-ছেলে মিলে শোপিস বানিয়ে বিক্রি করে সংসার চালাতে থাকেন। এই শিংয়ের কাজ করেই দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। নিজে বিয়ে করেছেন। বছর তিন আগে মা-ও চলে গেছেন। এখন দুই মেয়ে আর স্ত্রী মিলে চারজনের পরিবার চলে শিংয়ের ওপরই।  

শিং কেনেন কেজি দরে

গরু, মহিষ আর ভেড়ার শিং সংগ্রহ করেন মাহমুদ। তবে গরুর শিং দিয়েই কাজ করেন বেশি। চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট ও রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে শিং সংগ্রহ করেন। শিং কেনেন কেজি দরে। আগে গরুর শিং এক কেজি ১০-১৫ টাকায় কেনা যেত। এখন লাগে ৫০-৬০ টাকা।  মহিষের শিংয়ের দাম আরো বেশি। ১৫০ টাকা কেজি। ৫-১০ কেজি খুচরা কেনাও যায় না। কমপক্ষে আধা মণ কিনতে হয়।

 

অনেক কিছুই পারেন

আগে শিংয়ের লাঠির বেশ চাহিদা ছিল। বয়স্ক মানুষের কাজে লাগত। বিক্রি করতেন ৩০০ টাকায়। এখন অবশ্য চাহিদা নেই বললেই চলে। মাহমুদ লাঠি, উড়ন্ত বক, গাঙচিল, ময়ূর, বোতাম, কানের দুল, নৌকা, লাটিম, চুলের ক্লিপসহ এক শটার বেশি আইটেম বানাতে পারেন। তবে চাহিদা কম বলে এখন নিয়মিত বানান ১০-১২টি আইটেম। এগুলোর মধ্যে আছে বক, দোয়েল, চড়ুই, নৌকা, কলমদানি, ফুলদানি ইত্যাদি। কোনো কোনোটা ২০০০ টাকায়ও বিক্রি হয়। তিনি সাধারণত দোয়েলচত্বর আর  নিউ মার্কেটে পাইকারি বিক্রি করেন। কিছু বিক্রি করেন কারিকায়।

যেভাবে শিং থেকে শোপিস

কাঁচা শিং কিনে আনার পর ভিজিয়ে রাখতে হয় কয়েক দিন। তখন খুব দুর্গন্ধ হয়। যা হোক, নাকে-মুখে কাপড় গুঁজে প্রথমে শিংয়ের ওপরে ও গোড়ায় থাকা পাতলা চামড়া সরাতে হয়। তারপর গুঁড়া সাবান দিয়ে ভালো করে ধুতে হয়। এরপর রোদে শুকানো লাগে। তারপর সাইজমতো কাটতে হয়।  তারপর ঘষতে হয়। সব শেষে পালিশ করতে হয়। উল্লেখ্য, বাঁকা শিংকে হিট দিয়ে সোজা করা হয়।

 

প্লাস্টিক মারছে

দুই রুমের ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে থাকেন মাহমুদ। ঘরেরই একটা অংশ কারখানা হিসেবে ব্যবহার করেন। শোপিস বানাতে করাত, রেত, ফাইল মেশিন, চাপ মেশিন, টানা মেশিন লাগে।  চাপ মেশিন আর টানা মেশিন নিজেই বানিয়ে নিয়েছেন। কাজের সময় স্ত্রী তাঁকে সাহায্য করে। কয়েক বছর আগেও শিংয়ের তৈরি শোপিসের বেশ চাহিদা ছিল। তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজন কারিগরও ছিল। মাহমুদ  বললেন, ‘প্লাস্টিকের শোপিসের কাছে মার খেয়ে যাচ্ছি।’ তবে মাহমুদ সুখী। বিশেষ করে তখন খুব সুখী, যখন কেউ বলে, বাহ! খুব সুন্দর হইছে।

     ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

 

 


মন্তব্য