kalerkantho


হয়ে ওঠার গান

লুকা মডরিচ

৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



লুকা মডরিচ

বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন লুকা মডরিচ। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে করা সে গোলটি অনেকেরই চোখে লেগে আছে। এই লুকাকে শৈশবে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। খবর নিয়েছেন আরিবা রেজা

 

পাহাড়ের ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম মডরিচি। এই গ্রামেই বাস করে মডরিচ পরিবার। ছয় বছরের একটি ছেলে, লুকা তাঁর নাম। দূরে ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখেন। মর্টারের গর্জন শোনেন। আকাশ তাঁর যুদ্ধে ঢাকা। দাদার নামেই তাঁর নাম। লুকা সিনিয়র মানে দাদা ছেলেটাকে দেখে দেখে রাখেন। মা-বাবা একটি গার্মেন্টের শ্রমিক। দিনের বেশিটা সময় সেখানেই চলে যায়। দাদা পশুপালক। লুকা জুনিয়রের জন্ম ১৯৮৫ সালে। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। খেপে যায় সার্বরা। লুকাদের গ্রাম দখল করে নেয় সার্বিয়ার লোক। তাঁরা মাইন পোঁতে। ঘর-বাড়ি জ্বালায়। ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনা। লুকা সিনিয়র কাছের এক পাহাড়ের ওপর গবাদিপশু চরাতে যান। সার্বিয়ার লোকেরা তক্কে তক্কে ছিল। লুকাসহ ছয়জনকে তাঁরা ধরে নিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে। লুকার মা-বাবা বুঝতে পারেন সময় ঘনিয়ে এসেছে, গাঁটরি বাঁধতে হবে, পালাতে হবে। তাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে যান। কাছের শহর জাডারে তাঁরা আশ্রয় নেন। আশা করতে থাকেন একদিন সংকট কেটে যাবে, আবার তাঁরা বাড়ি ফিরবেন। লুকার সেখানে মার্কো নামে এক বন্ধু হয়। দুজনে তাঁরা ফুটবল খেলে দিন কাটাতেন। লুকার তখন ছয় পেরিয়ে সাত। কেউ একজন লুকার খেলা দেখত মুগ্ধ হয়ে। একদিন সে স্থানীয় ক্লাব এনজেড জাডারের পরিচালক জসিপ বাজলোকে ফোন দেয়। বাজলো একদিন চুপিসারে এসে সাত বছর বয়সী ছেলেটার পায়ের কারুকাজ দেখে। খুশি হয়। নিয়ে গিয়ে খেলার একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করায়। লুকার মা-বাবার কাছে তখন টাকা-পয়সা নাই কিছুই। কিন্তু দূর সম্পর্কের এক চাচা সাহায্যের হাত বাড়ান। লুকার লুকা মডরিচ হয়ে ওঠার সূচনা সেটাই।

 

লুকার শরীর পলকা ছিল, যেন ভারি বাতাসে উড়ে যাবে। কিন্তু তাঁর বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা ঈশ্বরপ্রদত্ত। একজন শিক্ষানবিশের এমন দক্ষতায় তাঁর ইয়ুথ একাডেমির প্রধান টমিস্লাভ বাজিকও অবাক হতো। যুদ্ধ তখন শেষ। লুকার বয়স ১২। টমিস্লাভ তাঁকে দেশের সেরা ক্লাব ডায়নামো জাগরেবে ঢুকিয়ে দিলেন। পরিবার ছেড়ে রাজধানীতে ডেরা বাঁধতে হলো। নতুন পরিবেশ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। জাডারের ছোট্ট মাণিক জাগরেবে এসে ভিড়ের একজন মাত্র। ২০০৩ সালে ডায়নামো তাঁকে বসনিয়ান লিগের দল জ্রিনস্কি মস্তারে ধার দিল। বসনিয়ান লিগ খুবই মারকুটে। ডায়নামো বুঝতে পেরেছিল, লুকাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে বসনিয়ান লিগের বিকল্প নেই। লুকা লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হলেন। ডায়নামো তাঁর সঙ্গে ১০ বছরের একটি চুক্তি সই করল। পরিবারের ঋণ শোধের সুযোগ পেলেন লুকা। মা-বাবার থাকার জন্য জাডারে এক ফ্ল্যাট কিনলেন তিনি। মাকে বললেন, ‘দেখো মা, আমরা আর উদ্বাস্তু নই।’ মা বললেন, ‘১৩টি বছর কষ্ট করেছ। আরো বড় হও।’ পরের বছরগুলো শুধু এগিয়ে যাওয়ার। গোল করা, লিগ জেতা ইত্যাদি। জাতীয় দলের হয়ে ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেললেন লুকা।  ইউরোপের দলগুলো লুকার দিকে নজর দিতে থাকল। আর্সেনালের আর্সেন ওয়েঙ্গারও দেখে গেলেন তাঁর খেলা। ব্রোজান ক্রিকিচ সিনিয়র তখন বার্সেলোনার হয়ে খেলোয়াড় খোঁজার কাজ করত। কাতালোনিয়ায় নিয়েও গিয়েছিল লুকাকে। তবে শেষ অবধি টটেনহামের (ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল) হয়ে খেলতে নেমেছিলেন লুকা। টটেনহাম জাগরেবকে দিয়েছিলেন ১৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ড আর লুকার সঙ্গে ছয় বছরের চুক্তি করেছিল। শুরুর দিকে টটেনহামে তাঁর দিনগুলো ভালো যায়নি, তবে একসময় তিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ১৭টি গোলের মালিক হয়ে গেলেন। তত দিনে তিনি লেফট উইং থেকে মিডফিল্ডার। এমন এক দিনে হোসে মরিনহোর ফোন পেলেন। মরিনহো তখন বিশ্বের অন্যতম নামকরা ক্লাবের (রিয়াল মাদ্রিদ) ম্যানেজার। কিন্তু টটেনহাম তো তাঁকে বিক্রি করতে রাজি নয়। অবশেষে রিয়াল ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের টোপ দিল টটেনহামকে। ফলাফল ২০১২ সালে স্পেন পৌঁছাল লুকা মডরিচ। তবে রিয়ালে এসে লুকার নিজেকে চেনাতে কিছু সময় লাগল। অপেক্ষা করতে হলো ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের ৯৩তম মিনিট পর্যন্ত। ওই সময় তাঁর কর্নার শট খুঁজে নিয়েছিল সের্গিও রামোসের মাথা। আতলেটিকো মাদ্রিদের জাল খুঁজে পেয়েছিল বলটি। ওই বছরই লুকা স্পেনে খেলা সেরা মিডফিল্ডারের তকমা পান। মরিনহোর পরে রিয়ালের ম্যানেজার কয়েক দফা বদলেছে। লুকা কিন্তু দিনে দিনেই হয়ে উঠেছেন দুর্ধর্ষ। রিয়ালের ১০ নম্বর জার্সিটির মালিক হয়েছেন। লুকার আমলে রিয়াল ১২টি শিরোপা জিতেছে।

 



মন্তব্য