kalerkantho


বিশাল বাংলা

খেলা হলো কাকুরিয়ায়

৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



খেলা হলো কাকুরিয়ায়

প্রাইমারি স্কুলে জড়ো হয়েছিল কাকুরিয়া

সোমবার, ২ জুলাই, শেষ বিকেল। অষ্টগ্রামের হাওর গ্রাম কাকুরিয়ায় রওনা হলেন কালের কণ্ঠর হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি নাসরুল আনোয়ার। উদ্দেশ্য পানিপুরীতে ব্রাজিলের খেলা দেখা

 

দর্শক সারিতে নারীরাও সরব ছিল

এক ঘন করচ বনের কিনারায় ট্রলার থামল। বন পার হতেই জেলেপল্লীর এ ঘর-সে ঘরের মাথায় পতাকা উড়তে দেখলাম। কিছু উড়ছে গাছের মাথায়। আর্জেন্টিনারই বেশি। মেসির দল বিদায় নিলেও ভক্তরা এখনো পতাকা নামায়নি। রাত ৮টায় খেলা হবে। গ্রামবাসী খেলা দেখে একটি প্রাইমারি স্কুলে। সেদিকে পথ গুনতে গুনতে অমৃত লাল দাস শোনালেন, ‘বাই দেশ শ টেখা দিয়া ফঞ্চাশটা ফটকা আইন্যা রাখছি (দেড় শ টাকায় ৫০টি পটকা এনে রেখেছি)। আউজগা দেখাইয়া দিমু।’

জানতে চাইলাম, আপনি কোন দল?

উত্তর, আর্জেন্টিনা।

ভাই, আপনার দল তো বিদায় নিয়েছে!

‘এর লাইগ্যা খিতা অইছে! মেক্সিকো জিতলেঅই অইবোনে!’ পেছন দিক থেকে এক ব্রাজিল সমর্থক টিপ্পনী কেটে বললেন, ‘দেইক্যো, তুমার মেক্সিকো আউজকা খয়ডা গইল খায়!’

 আমরা স্কুলে এসে থামলাম। জানতে চাইলাম, এখানে খেলা দেখার জায়গাটা কোথায়?

 রামচরণ দাস বললেন, ‘স্কুলের তলে বইয়া আমরা খেলা দেখি।’

সরু একটি সিঁড়ি বেয়ে নামলাম প্রাইমারি স্কুলের বেইজমেন্টে। পুরনো ভবনটি রংচটা। গ্রামের দক্ষিণে স্কুলটি হাওরের গা ঘেঁষে। মাঝেমধ্যে পানি এসে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে।

দর্শক সারিতে নারীরাও সরব ছিল

চার ঘণ্টা জেনারেটর চলে

খেলা শুরু হতে আরো কিছু সময় বাকি। পূর্ব দিকে দেয়ালের ধারে একটি টেবিলের ওপর ৪০ ইঞ্চি মাপের একটি টেলিভিশন বসাচ্ছে ছেলের দল। সমরেশ দাস উদ্যোক্তাদের একজন। হবিগঞ্জ শচীন্দ্র কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। বললেন, ‘গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। জেনারেটর দিয়ে আমরা টেলিভিশন চালাই। বড় একটা পর্দা লাগাতে চাইছিলাম; কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের প্রজেক্টর নষ্ট। ভাড়া করতে খরচ হয় অনেক।’ জানলাম, পাশেই সাপান্ত বাজার। সেখানকার জেনারেটর ব্যবসায়ী প্রদ্যোৎ কুমার দাস। পুরো খেলার মৌসুমের জন্য জেনারেটর ভাড়া দিয়েছেন ১০ হাজার টাকায়। সঙ্গে টেলিভিশন, ডিশ সংযোগ আর দুটি বাল্বও দিয়েছেন; কিন্তু ডিজেল খরচ কাকুরিয়াবাসীর। দুই ঘণ্টা করে প্রতি রাতে চার ঘণ্টা (নক আউট পর্বে খেলা শুরু হয় রাত ৮টা ও ১২টায়) জেনারেটর চলে। তবে গ্রুপ পর্বে চলেছে বেশি। ২ জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত মোট ৪৭টি ম্যাচে ডিজেল পুড়েছে সাত-আট হাজার টাকার। 

 ডিজেলের টাকা কিভাবে জোগাড় হয়? 

সমরেশ বললেন, ‘সবাই মিলে চাঁদা তুলে।’

কাকুরিয়ার বেশির ভাগ আর্জেন্টিনার সমর্থক। এরপর ব্রাজিল। জার্মানি আর ফ্রান্সেরও আছে। জেনারেটর চালু হতেই বাল্ব জ্বলে উঠল। দর্শকের ভিড়ও বাড়তে থাকল। কেউ কাঠের পিঁড়ি, কেউ টুল, কেউ প্লাস্টিকের মানে যে যা পারছে বসার জন্য নিয়ে এসেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এসেছে। কয়েকজন নারী দর্শকও দেখলাম। জানলাম, একটি ইএসপিএন চ্যানেল ধারাভাষ্য দেয়। কাকুরিয়ার লোকে সেটা দেখতেই পছন্দ করে। আমি অতিথি বলে আমাকে একটি চেয়ার দেওয়া হয়েছে। আমার পাশেই বসেছেন রাধাকৃষ্ণ দাস। ইনি অষ্টগ্রামের কলমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। বললেন, কাকুরিয়ায় প্রায় ২০০ পরিবার। লোকসংখ্যা এক হাজারের মতো। সবাই গরিব। হেমন্তে কৃষিকাজ আর বর্ষায় মাছ ধরা পেশা। গেল বছর অকাল বন্যায় বোরো ফসল মার খাওয়ায় গাঁয়ের লোক বলতে গেলে নিঃস্ব এখন। কৃষিতে আগ্রহ হারিয়েছে; এদিকে হাওরে মাছও কমে গেছে। আমরা কষ্টেই আছি। এই সময় বিশ্বকাপ একটা খুশি হয়ে এসেছে।’ 

 

খেলা শুরু

দর্শকপূর্ণ গ্যালারি। খেলা শুরু হয়ে গেছে। মেক্সিকো-ব্রাজিলের ম্যাচটিকে মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের ম্যাচ। ‘হারার পর আর্জেন্টিনার দর্শক বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গেছে। তাই খেলাগুলো আর একঘেয়ে লাগছে না।’ বলছিলেন সন্তোষ চক্রবর্তী। 

এর মধ্যে নেইমারের একটি শট মিস হওয়ায় ব্রাজিল সমর্থকরা খুব আফসোস করলেন। ওদিকে দক্ষিণ দিক থেকে হাওরের বাতাস এসে ঢুকছে। আচমকা বেইজমেন্টের সিঁড়ির ওপর দাঁড়ানো নারী দর্শকদের উল্লাস ভেসে এলো। ওরা ১৫-২০ জনের বেশি হবে না। বেশির ভাগই কিশোরী। একজন বিপাশা রানী। আর্জেন্টিনার সমর্থক। বাজিতপুর কলেজে পড়ছেন।

‘কেমন লাগছে খেলা?’

বিপাশা বললেন, ‘আর্জেন্টিনার সব খেলা দেখেছি। ব্রাজিলেরটাও দেখছি। খুবই ভালো লাগছে। তবে দুঃখ, কারেন্ট থাকলে বাড়িতে বসেই খেলা দেখতে পারতাম।’

চেয়ারম্যানের কাছে কারেন্টের বিষয়ে জানতে গেলাম। তিনি বললেন, ‘এখানকার ১২টি হাওর গ্রামের সাতটিতেই বিদ্যুৎ আসেনি। তবে খুঁটি গাড়া হয়েছে কয়েকটি গ্রামে। আমাদের বিদ্যুত্বঞ্চিত সাতটি গ্রাম হলো—কাকুরিয়া, চণ্ডীপুর, শান্তিপুর, ঢালারকান্দি, শিবলা, শরীফপুর, আছানপুর ও মুর্শিদপুর।’         

ডানদিকে কোলে ভাইপো প্রান্তিককে নিয়ে খেলা দেখছিলেন ব্রাজিল সমর্থক প্রদীপ দাস। বললেন, ‘ব্রাজিল জিতলে খুশি হই।’ নেইমার আর কৌতিনিয়োকে বারবার গোল মিস করতে দেখে ব্রাজিল সমর্থকদের আফসোস বাড়ছিল। এর মধ্যে নেইমার যেই না গোল করল, স্কুলটা বুঝি ভেঙে পড়বে। এরপর কৌতিনিয়োর বদলি খেলোয়াড় ফিরমিনোর দ্বিতীয় গোলের পর আর বসাও যাচ্ছিল না। মাটির জুতা বিছিয়ে তার ওপর বসে খেলা দেখছিল বিনোদ দাস। উন্মাদের মতোই লাফাতে থাকল সে। ওদিকে হেরে যাওয়া পটকাওয়ালা অমৃত দাস খুব মনমরা। একটাও পটকা ফোটাতে না পেরে তার কষ্ট হচ্ছে খুব। বললেন, ‘না, অইলো না। একটা বুমাও ফাডাইতারলাম না। মেক্সিকো জিতলে আউজগা দেহাইয়া দিতাম!’

     ছবি : লেখক



মন্তব্য