kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

আমার মা বড় হোক

কিছুদিন আগে ছাত্রীর বাবা আর আমি বসে নাশতা করছিলাম। ভদ্রলোক বেশ ব্যস্ত সময় কাটান। জেনেছি, তিনি ছোটখাটো ব্যবসা করেন। আর এ নিয়ে সব সময় দৌড়-ঝাঁপের ওপর থাকেন। একেবারেই সময় পান না। কারো সঙ্গে অতিরিক্ত কথাও বলেন না। আজ শুধু আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যই একটু দেরিতে বাসা থেকে বের হবেন বলে জানালেন।

বুঝতে পারলাম, তিনি আজ আমাকে বিশেষ কিছু বলতে চান। পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সেই বিশেষ কিছু আমার একেবারেই মুখস্থ। তিনি হয়তো বলবেন, ‘স্যার, একেবারে এক ঘণ্টা পড়ালে কিভাবে হয় বলেন তো! সময়টা একটু বাড়িয়ে দিন দয়া করে। সপ্তাহে মাত্র চারটি দিন পড়ানো একেবারে কম হয়ে যায় না! আরো একটা দিন বেশি আসুন। এতে আপনার কী-ই বা ক্ষতি হবে!’

আমরা ছাত্ররা যারা বাসায় গিয়ে টিউশনি করাই, তারা সবাই জানি, ‘একটু বেশি পড়ান, এক দিন বেশি আসেন’—এসব প্রত্যেক অভিভাবকের প্রিয় স্লোগান। তবে বাচ্চার পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টা বাবাদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। ভাবলাম, ভদ্রলোকও ব্যতিক্রম হবেন। কিন্তু তিনি এতটা ব্যতিক্রম হবেন, সেটা আদৌ বুঝতে পারিনি।

যা হোক, তিনি ১০ বছরের কোমলমতি মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন আর গড়গড়িয়ে বলতে লাগলেন, ‘স্যার, আমার এই একটাই মেয়ে। আমি বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারিনি। বাবার এত টাকা ছিল না। আমারও এত টাকা নেই। কিন্তু আমি চাই, মেয়েটা পড়াশোনা করুক। আমার স্বপ্নটা পূরণ করুক। জানি, আমার অনেক কিছুর অভাব আছে। কিন্তু এই খাবার হাতে নিয়ে বলছি, যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন মেয়েকে পড়াশোনারত দেখতে চাই। প্রয়োজনে শরীরের রক্ত বিক্রি করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাব।’

আমি হাঁ করে তাঁর কথাগুলো গিলছিলাম। তিনি জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢাললেন। একটি দীর্ঘ চুমুক দিলেন গ্লাসের পানিতে। যেন প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘স্যার, জানেন, আমি মেয়ের মাকে কী বলেছি? যদি হঠাৎ মারা যাই তাহলেও যেন সে মেয়েটাকে পড়াশোনা করায়। মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করে। আমার যেটুকু জায়গাজমি আছে, সেটুকু বিক্রি করে হলেও যেন আমার মেয়েটাকে বড় করে তোলে।’

নির্বাক হয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছি। ভাবছি, কী বলব। কিছু একটা তো বলা দরকার। এমন সময় তিনি এক হাতে খাবার মুখে দিলেন আরেক হাতে গাল বেয়ে পড়া চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘অনেক কম বয়সে মাকে হারিয়েছি। এখন এই মেয়েটাই আমার মা। আমি চাই, আমার মা বড় হোক। আপনার মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। স্যার, আমি গরিব মানুষ। কিন্তু আমার আশাটা অনেক বড়। আমি যদি কখনো না থাকি, তা-ও আপনি আমার মায়ের প্রতি খেয়াল রাখবেন। যেভাবে মানুষ হওয়া যায়, সেসব উপদেশ তাকে দেবেন।’

ভদ্রলোক কথাগুলো বলছেন আর বাচ্চাদের মতো করে চোখের পানি মুছছেন। চোখ মুছতে মুছতেই আবার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মেয়েটা তার বাবার দিকে এক নজরে তাকিয়ে ছিল। তারপর মেয়েটাকে বুকে টেনে নিয়ে আবার চোখ মুছতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। আমি একটি কথা বলারও সুযোগ পেলাম না। তখন আমি রীতিমতো হতভম্ব। শুধু দেখলাম, একজন বাবা কাঁদছেন। শুধু তাঁর আদরের মেয়ের সুখের জন্যই। পৃথিবীর অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি আমি দেখছিলাম সোফায় বসে বসে।

মোহাম্মদ অংকন

শিক্ষার্থী, সিএসই, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)।

 

কষ্ট বাড়ে, কষ্ট কমে

ম্যাসেঞ্জারে লাভ ইমো, কিস ইমো, লাভ স্টিকার, কিসি স্টিকার দেখলে আজকাল খুব রাগ হয়। কাউকে ইমো দিতে গেলে চোখের সামনে ইমোগুলো এসে পড়ে, স্টিকারগুলো এসে পড়ে। কত আর ভালো লাগে, বলুন! ইমোগুলো যদি বুঝত মানুষটার মন খারাপ, প্রিয়জন হারিয়েছে। লাভ ইমোগুলোর গা ঢাকা প্রয়োজন, যাতে চোখে না পড়ে, কষ্টগুলো না বাড়ে। ইমোগুলো কেন বোঝে না, ভাঙা মনটা এগুলো দেখলে আরো ভেঙে পড়ে, পুরনো স্মৃতিগুলো আবারও ভেসে ওঠে। এমন একটা সময় ছিল রাত-দিন যখনই মানুষটার সঙ্গে কথা হতো, ইমোগুলোর ব্যবহার অনবরত হতো। আজ কাকে দেব? আজ তো সে নেই, কাছের মানুষটা পাশে নেই। ব্যবহারের জন্য স্যাড ইমো আর নিজের কাছে স্যাড ইমোশন ছাড়া কিছু নেই। ফেসবুক কিংবা ম্যাসেঞ্জার যেখানেই যাই, লাভ সাইনটা পিছু ছাড়ে না। এমন যদি হতো মানুষের সিচুয়েশনভেদে যার যার ইমো অপশন থাকত।

যেমন ধরুন, এখন আপনি সিঙ্গেল আছেন কিংবা ব্রেকআপ সিজন চলছে। আপনার কাছে, শুধু লাফ ইমো, স্যাড ইমো, কনফিউশন ইমো ইত্যাদি ইমো থাকবে। আর যখন আপনার জমজমাট প্রেম চলবে, তখন বাকি ইমোগুলোর সঙ্গে এই ইমোগুলো অ্যাড হবে। তাহলে আর মনের মানুষ না থাকা মানুষদের মন ভাঙা কষ্টটাও অনুভব করতে হতো না। যার আছে সে-ও সুখী, যার নেই সে-ও না থাকার মাঝে ভালো থাকুক—শুধু শুধু কাটা ঘায়ে লবণ ছিটানো হবে না।

এগুলো নিতান্তই পাগলামি ছাড়া কিছুই নয়। ইমোজি, স্টিকার না থাকাটাই বোধ হয় ভালো ছিল। আগে খুব সহজেই মানুষ লেখা পড়ে বুঝে যেত ফিলিংসটা কেমন হবে। কিন্তু এখন ফিলিংস বোঝানোর জন্য ফিলিংসের ডেমো দেখানো হয়। আনন্দ-উচ্ছ্বাসগুলো প্রকাশ করা হয় একটা কিংবা একাধিক ইমোজি, স্টিকার দিয়ে। ভার্চুয়াল লাইফ এখন অনেকটাই আপডেট, সঙ্গে করে কষ্টগুলোও কারো জন্য বাড়ছে, কারো জন্য কমছে!

সোহানা পাহরিন

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ,

চট্টগ্রাম।

 

নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়

আদর-সোহাগ কে না চায়? আর যদি হয় তা মায়ের আদর, তাহলে তো কথাই নেই। সবাই চায় মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়তে। শাসনকে অনেক সময় নিজের ওপর জুলুম-অত্যাচারও মনে হয়। তবে আমার আজ খুব ইচ্ছা করছে বাবার শাসনে শাসিত হতে। এখন আমার অনেক কিছুর অভাব। কিছু কিছু অভাবের সমন্বয় করা গেলেও বাবার শাসনের অভাব কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা যায় না। একটা সময় ছিল যখন বাবার শাসন অনুধাবন করতে পারতাম না। বুঝতাম না এই শাসনের মূল্য কত? কারণ এটা না চাইতেই পাওয়া যেত। এখন সারা দিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে কেউ খাবার নিয়ে বসে থাকে না। দূরে কোথাও গেলে কেউ পথ চেয়ে থাকে না। বারবার ফোন করে জানতে চায় না কখন ফিরছি। কেউ মাথায় হাত দিয়ে বলে না, ‘বাবা, মাথাটা এত গরম কেন? জানতে চায় না কোথায় রোদে রোদে ঘুরি। তখন খুব মনে হয় সত্যিই কিছু একটা আমি হারিয়েছি। অনেক মূল্যবান জিনিস হারিয়েছি, যা এর আগে বিনা মূল্যে পাওয়ার কারণে মূল্যবান মনে হতো না। বাবার ভালোবাসার মূল্য পরিশোধ করা অসম্ভব।

আজ বাবাকে খুব বলতে ইচ্ছা করে, বাবা, তোমার ভালোবাসার মূল্য আগে বুঝতে না পারলেও আজ জীবনের মধ্যবয়সে এসে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আজ তোমার আদর ছাড়া নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। এই বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে খুব একা একা মনে হয়।

একটা সময় তোমার শাসনকে মেনে নিতে খুব কষ্ট হতো। নিজের ওপর জুলুম মনে হতো। শুধু চিন্তা করতাম, কবে এই শাসন থেকে মুক্তি পাব? আজ যখন তোমার কাছ থেকে দূরে, তখন এই শাসনকে খুব মিস করছি। এখন নিজেকে অভিভাবকহীন মনে হয়। মধ্যবয়সে যখন আমি কোনো খারাপ কাজ করলেও কেউ বাড়ন করে না, যখন কারো শাসন আমাকে অমঙ্গলের পথে চলতে বাধা দেয় না, তখন মনে হয় আমার কেউ নেই যে আমার কল্যাণ চায়। তখন এই শাসন থেকে মুক্তি চাইলেও আজ আবার সেই শাসনে শাসিত হতে, যে শাসন আমাকে ফিরিয়ে রাখবে সব অকল্যাণ ও অমঙ্গল থেকে।

অরণ্য সৌরভ

সরকারি সফর আলী কলেজ, আড়াইহাজার।



মন্তব্য