kalerkantho


সুখবর বাংলাদেশ

আবার রোহান

৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আবার রোহান

আবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ট্রাভেল ফটোগ্রাফার অব দি ইয়ার কনটেস্টে পুরস্কার পেয়েছেন তানভীর হাসান রোহান। আবারও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

একজন রোহান

রোহানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পড়েছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে। তারপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক হয়েছেন। বেসিক ফটোগ্রাফির  কোর্স করেছেন প্রিজম থেকে। আকস্মিক মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরায় ধরে রাখতে পছন্দ করেন। ঘুরে বেড়ানোরও শখ আছে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালোবাসেন।

২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন তানভীর হাসান রোহান। এরই মধ্যে তাঁর ঝুলিতে জমা পড়েছে সাড়ে তিন শর বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ২৮ জুন আবার আলোচনায় আসেন রোহান। এদিন ‘ট্রাভেল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার কনটেস্ট ২০১৮’র বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। রোহানের তোলা একটি ছবি সেখানে পিপল ক্যাটাগরিতে তৃতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছে। গেল বছরও তাঁর স্যান্ড পোর্টার নামের ছবিটি পিপল ক্যাটাগরিতে পিপলস চয়েস পুরস্কার জিতেছিল। মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর তীরে বালুর ঝাঁকা বয়ে নিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ছবিটি তিনি ধরেছিলেন সাদা-কালো ফ্রেমে। রোহান বললেন, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আর কোনো আলোকচিত্রী পরপর দুবার পুরস্কার পেয়েছেন বলে আমার জানা নেই।’

এই ছবিটির জন্য এবার পুরস্কার পেয়েছেন রোহান

এবারের ছবিটি

২০১৩ সাল থেকে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে মানুষের ঈদযাত্রার ছবি তোলেন রোহান। এবারের পুরস্কার জেতা ছবিটিও রেলস্টেশনে তোলা। শিরোনাম চ্যালেঞ্জিং জার্নি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তুলেছেন ছবিটি। সেদিন সকালেই ক্যামেরা নিয়ে বিমানবন্দরে চলে গিয়েছিলেন। একের পর এক ট্রেন যাচ্ছিল লোক ভর্তি হয়ে। আর সেসব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিলেন রোহান। তখন মাঝদুপুর। একটি ট্রেন এসে বিমানবন্দর স্টেশনে থামল। অনেকেই হুড়মুড় করে উঠছিল। হঠাৎ রোহান দেখলেন মাঝবয়সী একটি লোক। পরনে ফুল হাতা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। ব্যাগ একটি ঝোলানো কাঁধে। কোলে আবার একটি ছোট্ট মেয়ে। ঘুমাচ্ছিল। লোকটি পরিবারসহ ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভিড় এত যে দিশাহারা অবস্থা। স্ত্রীকে একরকম ভেতরে ঠেলে দিতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। শিশুটিকে দেখে মায়া লাগল রোহানের।

কাছে গিয়ে বললেন, ‘ভাই, এভাবে যায়েন না। রিস্ক হয়ে যাচ্ছে।’ লোকটিকে অসহায় লাগল। নেমেও গেলেন। আবার ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে এমন অবস্থায় ওঠার চেষ্টা করলেন। এরই মধ্যে বৃষ্টি নামল। কেঁদে উঠল কোলের শিশুটি। লোকটি প্রথমে তাঁর স্ত্রীকে ঠেলে ওঠানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভেতরে ঢোকাতে পারলেন না। পরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ট্রেনের দরজার হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকলেন। ছবি তুলতে তুলতেই রোহান লোকটিকে বলতে থাকলেন, ভাই, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এভাবে যাওয়া রিস্কি।’

এর মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল। ট্রেনটি দূরে চলে গেলে রোহানের মন খারাপ হয়ে গেল। শিশুটির জন্যই বেশি। ঈদের সময় তো প্রায় সব স্টেশনেই ভিড় থাকে। লোকটি কখন যে ট্রেনের ভেতর ঢুকতে পারবেন কে জানে। যদি দুর্ঘটনা ঘটে?

যা হোক বাসায় এসে ল্যাপটপে ছবিগুলো দেখা শুরু করলেন। চোখ বেশি আটকাল এই ছবিটিতে। রোহান বললেন, ‘আমার কাছে দিনের সেরা ছবি মনে হলো। কারণ সব মিলিয়ে ছবিটিতে একটি গল্প তৈরি হয়ে গেছে। একজন বাবা, একজন স্বামী পুরো পরিবারকে আগলে নিজের মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করবেন বলে চলেছেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক কনটেস্টে দুই বছরের মধ্যে তোলা ছবি জমা দেওয়া যায়। নেচার, সিটি ও পিপল চয়েস—এই তিন ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা হয়। জমা পড়া ছবিগুলো থেকে বাছাই করে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন বিচারকরা। তারপর সেই তালিকাটি আবার যাচাই-বাছাই করেন। তার পরই চূড়ান্তভাবে প্রতি ক্যাটাগরিতে তিনজন করে বিজয়ী নির্ধারণ করেন। এর বাইরে প্রতি ক্যাটাগরিতে অনারেবল মেনশনও দেওয়া হয়। আর জিওগ্রাফিকের নিবন্ধিত আলোকচিত্রীদের ভোটে নির্বাচন করা হয় পিপলস চয়েস উইনার। এবার তিন ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১৩ হাজার ছবি জমা পড়ে। এ ছবিটিসহ আটটি ছবি পাঠিয়েছিলেন রোহান।

আঠারোর আরো বিজয়

প্যারিসের দ্য প্রিক্স ডি লা ফটোগ্রাফি, প্যারিস প্রতিযোগিতায় প্রেস ক্যাটাগরির ফিচার স্টোরি, ট্রাভেল বিভাগে এবং ফাইন আর্ট ক্যাটাগরির আর্কিটেকচার বিভাগে প্রথম পুরস্কার, ন্যাচার ক্যাটাগরির ল্যান্ডস্কেপ বিভাগে তৃতীয় পুরস্কার। মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ডসে পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি জার্মানির লুফথানসা ম্যাগাজিনের বিশ্বকাপ সংখ্যায় রোহানের একটি ছবি দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয়েছে।



মন্তব্য