kalerkantho


অবাক পৃথিবী

যারা আগুন জ্বালায় না

৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



যারা আগুন জ্বালায় না

নর্থ সেন্টিনেল। আন্দামান-নিকোবরের একটি দ্বীপ। পোর্টব্লেয়ার থেকে  মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে। নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে মানুষ থাকে ঠিকই। তবে তাদের সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের কোনো যোগাযোগই নেই বলতে গেলে। এমনকি আগুনের ব্যবহার পর্যন্ত জানে না তারা। ভারত সরকার এই দ্বীপে কাউকে প্রবেশের অনুমতিও দেয় না

 

এই দ্বীপটি ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ হিসেবে শাসিত হয়। কিন্তু বাস্তবে সেন্টিনেলরা তাদের অঞ্চলে, তাদের সব বিষয়ে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা ভোগ করে। ভারত সরকারের সম্পৃক্ততার মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ব্যতিক্রম কিছু ক্ষেত্রে দ্বীপটিতে পরিদর্শনের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষকে দ্বীপটিতে যেতে নিরুৎসাহিত করা। তাই এটি কাগজে-কলমে ভারত সরকারের অধীনস্থ অঞ্চল হলেও বাস্তবে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টিনেল দ্বীপে থাকে সম্ভবত বিশ্বের শেষ উপজাতি, যাদের ওপর এতটুকু ছাপ ফেলতে পারেনি আধুনিক সভ্যতা। সেন্টিনেল উপজাতিদের জীবনযাত্রা ঠিক কী রকম, তা কারো জানা নেই। খুব কমই জানা গেছে তাদের সম্পর্কে। কারণ তারা নিজেদের রাজ্যে বাইরের জগতের নাক গলানো একেবারেই সহ্য করে না।

 

নৌকা বা হেলিকপ্টার থেকে বছরের পর বছর নজর রেখে তাদের সম্পর্কে খুব সামান্য ধারণা করতে পেরেছেন নৃবিজ্ঞানীরা। এখানে কতজন মানুষ থাকে সেটাও নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আনুমানিক ৪০০ জনের মতো মানুষ এখানে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেন্টিনেলরা আগুনের ব্যবহারও জানে না। শেখেনি চাষাবাদও। দ্বীপের আশপাশে যে সমুদ্র বা জঙ্গল আছে, সেখান থেকে আহরণ করা খাবার খেয়েই তারা দিন কাটায়।

 

বিশ্বের অন্য যেসব উপজাতি আছে, তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা সেন্টিনেলরা। এরা একে অপরের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে, তা তাদের সবচেয়ে কাছের উপজাতির পক্ষেও বোঝা অসম্ভব। মনে করা হয়, এই আদিম মানুষরা আফ্রিকা থেকে এসেছিল এই দ্বীপে।

 

আধুনিক সমাজের সঙ্গে এদের যোগ স্থাপনের চেষ্টা অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। তার আভাস পাওয়া যায় মার্কোপোলোর একটি লেখায় এই দ্বীপের উল্লেখ থেকে (যদিও আদৌ তিনি ওই দ্বীপে নেমেছিলেন কি না তা নিয়ে ধন্দ আছে ইতিহাসবিদদের।)

 

১৮৮০ সালে ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ এম ভি পোর্টম্যানের নেতৃত্বে একটি দল ওই দ্বীপে যায়। কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন না করায় তাঁরা উপজাতিদের এক প্রৌঢ় দম্পতি এবং চার শিশুকে তুলে নিয়ে আসেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সমাজের সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন। কিন্তু আধুনিক সমাজে মানাতে পারেনি তারা। রোগাক্রান্ত হয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যায়। এই ঘটনার পর আধুনিক মানুষের প্রতি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সেন্টিনেলরা।

 

১৯৬৭ সাল থেকে ভারত সরকার যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা শুরু করে। ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ত্রিলোকনাথ পণ্ডিতই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ১৯৯১ সালের ৪ জানুয়ারি আন্দামান-নিকোবরের এই দ্বীপে গিয়ে সেন্টিনেলদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেই চেষ্টাও সার্বিকভাবে সফল হয়নি বলা যায়। কারণ এই চেষ্টার পরও ওই  উপজাতিরা আধুনিক মানুষকে তাদের রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বারবারই তাদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে আধুনিক মানুষকে। মৃত্যুও হয়েছে অনেকের।

 

২০০৪ সালে সুনামির পর হেলিকপ্টারে উত্তর সেন্টিনেল আইল্যান্ডে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিল ভারত সরকার। তখনো ত্রাণ নেওয়ার বদলে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে অতর্কিতে পাল্টা আক্রমণ চালায় তারা।

 

 অবশেষে তাদের বিরক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার। ওই দ্বীপ ও তার চারপাশে ৩ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সীমানা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ২০০৬ সালে সেন্টিনেল তীরন্দাজরা তাদের দ্বীপে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী দুজন জেলেকে তীর মেরে হত্যা করে।



মন্তব্য