kalerkantho


ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব ২০১৭

অতিথিদের গল্প

আজ থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব ২০১৭’। এই আয়োজনের এটি তৃতীয় সিজন। উত্সব শুরু হবে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায়, প্রথম দিনের আয়োজন চলবে রাত দেড়টা পর্যন্ত। পরের দুই দিন রাত ১২টা পর্যন্ত। গান করবেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ইরান, মালি, ব্রাজিল ও তিব্বতের প্রায় ১৪০ জন শিল্পী। উত্সবে অংশ নিতে যাওয়া দেশি শিল্পীদের গান নিয়মিত শোনার ফলে তাঁদের সম্পর্কে সবার জানাশোনাটাও বেশি। তবে অতিথিদের নিয়ে বরাবরই থাকে কৌতূহল। সে ভাবনা থেকেই ‘রঙের মেলা’র এ আয়োজন। মাছরাঙা টেলিভিশনের পাশাপাশি উত্সবের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলও পুরো আয়োজন সরাসরি দেখাবে। লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন ও নূসরাত জাহান নিশা

৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অতিথিদের গল্প

মিকাল হাসান
পাকিস্তানের সুফি রক ব্যান্ড ‘মিকাল হাসান ব্যান্ড’। সংক্ষেপে ‘এমএইচবি’।

গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মিকাল হাসান ২০১০ সালে পাঞ্জাবে ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন। একের পর এক জনপ্রিয় গান ও অ্যালবাম উপহার দিয়ে দ্রুত ব্যান্ডটি সারা বিশ্বে পরিচিতি পায়। নিজস্ব রেকর্ডিং হাউসে বসেই রাত-দিন নতুন গানের ধ্যানে মগ্ন থাকেন ব্যান্ডের পাঁচ সদস্য। পপ, রক, সোল মিউজিক ও ব্ল্যাক রকের সঙ্গে মূল ধারার সংগীত মিলিয়ে-মিশিয়ে পারফর্ম করেন তাঁরা। ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা মিকাল হাসানের জন্ম লাহোরে। বেড়ে উঠেছেন সংগীতবান্ধব পরিবেশেই। তাঁর বাবা মাসুদ হাসান জ্যাজ মিউজিকের নিবেদিতপ্রাণ। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে বস্টনের বার্কলে কলেজ অব মিউজিক থেকে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেন মিকাল। এর পরই থিতু হয়ে যান সংগীতে। ২০০১ সালে ব্রিটিশ গায়ক পিট লকেটের সঙ্গে সিরিজ কনসার্টে পারফর্ম করেন মিকাল। ২০০৪ সালে প্রকাশ পায় ‘মিকাল হাসান ব্যান্ড’-এর প্রথম অ্যালবাম ‘শ্যামপুরাণ’। ২০০৯ সালে আসে দ্বিতীয় একক ‘সপ্তক’। সর্বশেষ অ্যালবাম ‘আন্দোলন’ প্রকাশ পায় ২০১৪ সালে।

তিনারিওয়েন

উত্তর মালির সাহারা মরুভূমির ব্যান্ড ‘তিনারিওয়েন’। যাত্রা শুরু করে ১৯৭৯ সালে আলজেরিয়ার তামানরাসেটে। ১৯৯০ সালে দেশটিতে তুয়ারেগ বিদ্রোহ শুরু হলে চলে আসে মালিতে। শুরুতে পরিবেশন করতে থাকে সাহারা অঞ্চলের গান। এরপর ধরে আরবের আধুনিক পপ ঘরানার গান। ২০০১ সালে মালিতে নিজেদের প্রথম অ্যালবাম ‘দ্য রেডিও তিসদাস সিজনস’ প্রকাশ করে তারা। মালির ইসাকানে ‘ফেস্টিভাল অব ডেজার্ট’ এবং ডেনমার্কের ‘রোজিল্ড ফেস্টিভাল’-এ গান পরিবেশন করে প্রশংসা কুড়ায় ব্যান্ডটি। ২০০৭ সালে প্রকাশিত ব্যান্ডটির তৃতীয় অ্যালবাম ‘আমান ইমান : ওয়াটার ইজ লাইফ’ আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয়তা পায়। ২০১২ সালে ‘তাসসিলি’ অ্যালবামটির জন্য ‘বেস্ট ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ ক্যাটাগরিতে সংগীতের সবচেয়ে বড় পুরস্কার ‘গ্র্যামি’ জেতে তারা। লোকসংগীত ছাড়াও ব্লুজ, রক ও ওয়ার্ল্ড মিউজিক করে থাকে ব্যান্ডটি। বিশ্বের বড় অনেক উত্সবে গান করেছে ‘তিনারিওয়েন’। এর প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম আগ আলহাবিব শৈশবে সিনেমায় দেখেন কাউবয় হ্যাট পরা এক গিটারবাদককে। এরপর টিনের পাত্র ও সাইকেলের ব্রেকের তার দিয়ে নিজেই একটি গিটার বানান। একসময় গড়েন ব্যান্ড।
তেনজিন চোয়েগাল

তিব্বতের শিল্পী, সংগীত পরিচালক, অ্যাকটিভিস্ট ও কালচারাল অ্যাম্বাসাডর তেনজিন চোয়েগাল। এক যাযাবর পরিবারে জন্ম। তেনজিনের পরিবার তিব্বতে নিপীড়নের শিকার হলে তাঁকে ভারতে নির্বাসনে পাঠানো হয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এই লোকসংগীত শিল্পী তাঁর যন্ত্রশৈলী রপ্ত করছেন বাবা আর গলার সুর ধার করেছেন মায়ের কাছ থেকে। চারপাশের প্রকৃতিও তাঁকে উত্সাহ দিয়েছে সামনে এগিয়ে যেতে। স্বদেশি সংগীতকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়া যান তিনি। সেটা করেও দেখান। পাহাড়, ঝরনা, বরফ, সুরে হূদয় জুড়াতে তেনজিন এবার আসছেন ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সবে।
কুটুম্বা

প্রথাগত বাদ্যযন্ত্রে ঠাণ্ডা মেজাজের নেপালি লোকগীতি বাজায় তারা। তবে একেবারে সেকেলে নয়। চালচলনে ব্যান্ডটা আধুনিক। নেপালি সুরের সুলুকসন্ধানে এ পর্যন্ত  ছয়টি অ্যালবাম করেছে। নামগুলোও কিছু কিছু পরিচিত—‘ফরএভার নেপালি ফোক ইনস্ট্রুমেন্টাল’, ‘ফোক রুটস’, ‘নাউলো বিহানি’, ‘মিথিলা’, ‘উত্সর্গ’, ‘কর্মঠ’। গান তৈরিতে নেপালের প্রথাগত বাদ্যযন্ত্র কোনোটাই তারা বাদ রাখে না। বাঁশি থেকে শুরু করে সারেঙ্গি, মাদল, টুংগা, ঢোল, ঝামটা, আরবাজু, ভুসিয়া, চুসিয়া, দামাহা, ধিমি, ধুমপা, ঘুংরু, ঘণ্টি, গং, জর ডামারু, কা, কাঠি, খিনসহ আরো অনেক কিছু বাজায় তারা। ব্যান্ডটি চালু হয়েছে ২০০৪ সালে। সদস্য ছয়জন। পাকিস্তানের কোক স্টুডিওতে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁরা। পাপন

২০১৫ সালে ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব’-এ গান করতে প্রথমবার বাংলাদেশে আসেন ভারতীয় গায়ক ও সংগীত পরিচালক পাপন। সে উত্সবে তাঁর সঙ্গে কথা হয় গীতিকার আসিফ ইকবালের। পরের বছরই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ পায় পাপনের গান ‘মন দরিয়া’। গানটি শ্রোতারা গ্রহণও করে বেশ। স্টেজ নাম পাপন নিলেও পুরো নাম অংগরাগ মহন্ত। জন্ম আসামের জনপ্রিয় শিল্পী খগেন মহন্ত ও অর্চনা মহন্তের ঘরে। আর তাই গানের সঙ্গে পরিচয় ছোটবেলায়ই। ভারতের তরুণ প্রজন্মের পছন্দের এ শিল্পী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গান আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে পরিবেশন করে থাকেন। ২০০৫ সালে প্রকাশ করেন প্রথম অসমীয়া গানের অ্যালবাম ‘জোনাক রাতি’। এর পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০০৭ সালে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ নামে একটি ব্যান্ড গড়েন। চলচ্চিত্রেও নিয়মিত শোনা যায় তাঁর কণ্ঠ। অসমীয়া ও হিন্দির পাশাপাশি বাংলা গানেও পারদর্শী পাপন।
মিকায়েল হেমনিতি উইনথার
৯ বছর বয়সেই ক্লাসিক্যাল পিয়ানো বাজাতেন। ১৮ বছরে এসে বনে যান গিটারের জাদুকর। কিন্তু পরিণত বয়সে আর গান-বাজনার জগতে পুরোপুরি ডুব মারেননি। অধ্যাপনা করেছেন কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটিতে। পরে হয়েছেন রাষ্ট্রদূত। ডেনমার্কের হয়ে নানা দেশ ঘুরে এখন আছেন বাংলাদেশে। দূতাবাসের হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েননি সংগীত। চর্চা চালিয়ে গেছেন নিয়মিত। পাশাপাশি বাইকেরও মহাভক্ত তিনি। গিটার ও পিয়ানো নিয়ে মিকায়েলের দুরন্তপনাও হতে যাচ্ছে এবারের ফোক ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ।
নুরান সিস্টারস

বিখ্যাত সুফি শিল্পী ওস্তাদ গুলশান মীরের কন্যা জ্যোতি নুরান ও সুলতানা নুরানের গানের দল ‘নুরান সিস্টারস’। শৈশবেই বাবার কাছ থেকে সুফি সংগীতের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে থেকে শিকড়সন্ধানী গান গেয়ে পুরো ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তাঁরা। খুব অল্প সময়েই তাঁদের গান পৌঁছে যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে। ২০১৪ সালে বলিউডের ছবি ‘হাইওয়ে’তে এ আর রহমানের সংগীতে প্লেব্যাক করেন। ‘সুলতান’ (২০১৬) ও ‘মির্জিয়া’ (২০১৬) ছবিতেও শোনা গেছে তাঁদের কণ্ঠ। পেয়েছেন ‘জিমা অ্যাওয়ার্ড’, ‘মির্চি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’, ‘স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডস’সহ অনেক পুরস্কার। গত বছর ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব’-এ গান করে প্রশংসা কুড়ান দুই বোন। এবারও প্রস্তুত তাঁদের কণ্ঠ। মরিসিও টিজুম্বা
ছোটবেলায়ই সাম্বার ছন্দে নাচতেন মরিসিও টিজুম্বা। সেই নাচ আজ অবধি থামেনি। পরে যোগ দেন ব্রাজিলিয়ান ব্যান্ড সেক্সটেটের সঙ্গে। নানা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অবশেষে সাম্বার দুলুনি নিয়ে হাজির হতে চলেছেন ঢাকার আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টে। তাঁর পরিচয় একাধিক— বাদ্যযন্ত্রবিশারদ, গায়ক, সুরকার, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তা। ১৯৭৩ সাল থেকে তাঁর সাংস্কৃতিক ক্যারিয়ারের শুরু। ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বের মিনাস গেরাইসের সবাই তাঁকে এক নামে চেনে। ১৯৯৬ সালে গড়ে তোলেন কমপানহিয়া বুরলান্তিস নামের একটি স্ট্রিট থিয়েটার গ্রুপ। তাঁর জনপ্রিয় সংগীতায়োজনের  মধ্যে রয়েছে ‘সা রাইনহা’ ও ‘মরিস টু প্যারিস’। তাঁর কাজকর্মে পাওয়া যায় আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান আর্টের ছোঁয়া। গানে ও সুরে তাঁর গল্প বলার ঢং দারুণ সমাদৃত।
বাসুদেব দাস বাউল
বাসুদেব দাস বাউলের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। গান নিয়ে দিন-রাত পড়ে থাকেন শান্তিনিকেতনে। তাঁর কণ্ঠে পাওয়া যায় মাটির গন্ধ। সুরে রয়েছে অদ্ভুত এক মায়া। নিজের মধ্যেই যেন বাউল ও ঝুমুর গানের এক বিরাট সম্ভার সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। প্রবীণ এই শিল্পী ‘চল মিনি আসাম যাব দেশে বড় দুখরে’, ‘মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া’,‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘পাগল মন মন রে’, ‘জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন’সহ অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। গানকে নিজের মতো করে পরিবেশন করতেই ভালোবাসেন  তিনি। শিল্পীর স্ত্রী-কন্যাও গান করেন। নবীন বাউলরা গুরু    এবং পরামর্শক হিসেবে সব সময় পাশে পেয়ে থাকেন      বাসুদেব বাউলকে।
রাস্তাক
বর্তমান সময়ের ফারসি লোকসংগীত, ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী নতুনভাবে উপস্থাপন করছে ‘রাস্তাক’। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের তেহরানে এ লোকগানের দলের যাত্রা শুরু ১৯৯৭ সালে। মূল ধারার সংগীতের সঙ্গে ফারসি লোকসংগীত মিশিয়ে পরিবেশন করে থাকে তারা। ফারসি লোকসংগীত নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করছে দলটি। বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের মাঝে ফারসি লোকসংগীতের নতুন দূত হিসেবে কাজ করছে ‘রাস্তাক’। দলটির প্রধান সিয়ামত সেপেহরির মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাঁদের সংগীত। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে আরো বৈচিত্র্যময় করে পরিবেশন করার স্বপ্ন তাঁদের। সে জন্য দেশের বিভিন্ন প্রদেশের সংগীতকে মিলিয়ে-মিশিয়ে পরিবেশন করেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানসূচি
৯ নভেম্বর
*    বাউলিয়ানা (ব্যান্ড) বাংলাদেশ

*    বাউলা (ব্যান্ড), বাংলাদেশ

*    মরিসিও টিজুম্বা অ্যান্ড  সেক্সটেট, ব্রাজিল

*    শাহ আলম সরকার ও আলেয়া বেগম, বাংলাদেশ

*    তেনজিন চোয়েগাল  তিব্বত

*    পাপন, ভারত

১০ নভেম্বর
*    ফকির সাহাবউদ্দিন বাংলাদেশ

*    কুটুম্ব (ব্যান্ড), নেপাল

*    মিকাল হাসান (ব্যান্ড) পাকিস্তান

*    শাজাহান মুন্সি, বাংলাদেশ

*    নুরান সিস্টারস, ভারত

১১ নভেম্বর
*    শাহনাজ বেলী, বাংলাদেশ

*    বাসুদেব দাস বাউল, ভারত 

*    রাস্তাক, ইরান

*    মিকায়েল হেমনিতি উইনথার, ডেনমার্ক 

*    তিনারিওয়েন (ব্যান্ড)  মালি


মন্তব্য